৫.২। সাধপাল পর্ব
একদিকে মাতা যাত্রা করলেন, আর ঠিক বিপরীত দিশায় যাত্রা করলেন মৃষু। তিনটি পুর নির্মাণ করে, সেই পুরের সাথে এক অকাট্য বন্ধনে অবস্থান করছিলেন সাধপাল। সেই বন্ধন এমনই যে, স্বয়ং রমনাথও তা ভেদ করতে পারেন নি। মৃষু গেলেন সেই রহস্য ভেদ করতে। কি সেই রহস্য তা কারুর জানা নেই। রমনাথ, পীতাম্বর, শ্বেতাম্বর, ত্রিমূর্তিও সেই রহস্য ভেদ করতে পারেন নি, আর অন্যদিকে ডাহুক বাহুক, তথা ইচ্ছাধারীও সেই রহস্য ভেদ করতে অক্ষমই থাকে। পাশাপাশি সেই রহস্য ভেদ করার উপায় করতে সেখানে নিসাধরাও উপস্থিত হন, কিন্তু সকলের সাথে সাথে স্বয়ং নভও সেই রহস্য ভেদ করতে ব্যর্থ হন।
মৃষু সেই উদ্দেশ্যেই যাত্রা করলে, সেই কারণে নভ স্বয়ং এসে তাঁকে সেই কথা বলেন। মৃষু সমস্ত কথা শুনে প্রশ্ন করলেন, “কি নাম দিয়েছেন সাধপাল সেই পুরের?” নভ উত্তরে বললেন, “তেপুরম”।
মৃষু সেই কথা শুনে ঈষৎ হাসলেন, আর বললেন, “মায়ের আশীর্বাদ থাকলে, অবশ্যই এই রহস্য ভেদ হবে। চিন্তা করবেন না”।
নভ প্রত্যাবর্তন বা করে বললেন, “হে প্রকৃতিপুত্র, যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমরা সকল নিসাধ আপনার সাথে এই অভিযানে সঙ্গী হতে পারি”।
মৃষু হেস বললেন, “না নিসাধরাজ। আপনারা অংশ নিলে, সমস্ত সাধদেরও আহ্বান করে নেবে সাধপাল। কিন্তু আমার নিয়তি কেবলই সাধপালের দমন, বাকি সাধদের নয়। অর্থাৎ জয়লাভ করার যুদ্ধকে আমরা পরাজয়ের দিকে নিয়ে চলে যাবো সেই ক্ষেত্রে”।
নভ এই কথা শুনে হতচকিত হয়ে গিয়ে বললেন, “প্রভু, আপনি কি যোদ্ধা বেশেই জন্ম নিয়েছেন? আপনার প্রতিটি পদে যুদ্ধবেশ, প্রতিটি পদক্ষেপ যুদ্ধচরণ!”
মৃষু হেসে বললেন, “হে নিসাধরাজ, যিনি এই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা ও বিধাতা ও আমার পিতা, যখন তিনি আমার জন্মের পূর্ব থেকেই আমার মৃত্যুর জন্য সমানে ষড়যন্ত্র রচনা করে চলেন, সেই পুত্রকে তো যোদ্ধা হতেই হয়। ব্রহ্মাণ্ডকে যিনি অধিকার করে রেখেছেন, তিনি যাকে হত্যা করতে আগ্রহী, সে তারই পুত্র হলেও যে, স্বয়ং সম্রাটের সাথে যুদ্ধে রত। এই সম্পূর্ণ স্থূল ব্রহ্মাণ্ড আমার পিতার অধীনে। হ্যাঁ, আমার মাতাকে ছাড়া এই ব্রহ্মাণ্ড অচল, যতই তা ভ্রম হোক। আর তাই আমার মাতাই এই ব্রহ্মাণ্ডের চালিকা শক্তি। তবে আমার পিতার আপত্তিও ঠিক এই স্থানেই”।
“প্রকৃত অর্থে পিতার শত্রু আমি নই, আমার মাতা। আমার মাতাকে তিনি বশ করে রেখে, এই ব্রহ্মাণ্ডকে নিজের ইচ্ছা অনুসারে চালাতে পারেন না। তাই আমার মাতাকে তিনি শত্রু রূপে গণ্য করেন এবং সর্বক্ষণ তাঁকে বশ করার প্রয়াস করেন। আমার মাতা স্বয়ং ব্রহ্ম, কিন্তু তাঁর এই শত্রুতা তাঁকে ব্রহ্মময়ী করে উপস্থিত করে। তিনি স্বয়ং ব্রহ্ম, তাই ঈশ্বর তো এক ও একমাত্র তিনিই। সমস্ত সম্ভব প্রয়াস করেছিলেন আমার পিতা নিজের সৃষ্ট ব্রহ্মাণ্ড থেকে এই সত্যকে অবলুপ্ত করে দিতে। কিন্তু তাও মানবদের মধ্যে এই সত্যকে বৌদ্ধরা উপলব্ধি করেছিল, আর ইসলামরা উপলব্ধি করে আমার মাতাকে আল্লাহ ও আমার পিতাকে শয়তান বলেছিল”।
“পিতার ঘুম উড়ে যায় সেইদিন। মাতাকে বশ করতে চাইছিলেন, কিন্তু মাতাকে ঈশ্বর রূপে সনাক্ত করে নিলেন তাঁরই সৃষ্ট ব্রহ্মাণ্ডের একটি সামান্য যোনি! মাতাকে যাতে ঈশ্বর বলে কেউ চিহ্নিত করতে না পারে, সেই কারণে প্রচণ্ডবীর্য স্থাপন করে একটি জাতির নির্মাণ করলেন, যাদেরকে বৈদিক বললেন তিনি। আর তাঁদের মাধ্যমে নিজেকে ঈশ্বর রূপে প্রচার করিয়ে, নিজের অর্থাৎ পরমাত্মার পূজা করালেন”।
“কিন্তু আমার মাতার কনো দৃষ্টি ছিলনা এই সমস্ত দিকে। তিনি তো নিজের মাতৃত্ব নিয়েই উলমালা। ব্রহ্ম থেকে পরমাত্মের অনাচারপূর্ণ শত্রুতার দ্বারা ব্রহ্মগুণ অর্থাৎ চেতনার ক্ষয় রোধ করতে ব্রহ্ম ব্রহ্মময়ী রূপে এসে আমার মা মাতৃত্বের স্বাদ লাভ করে, নিজেকে ঈশ্বর বলে স্থাপন করাতে কনো ভাবে চিন্তিতই নন। কেবলই মাতা হয়ে তিনি অবস্থান করছিলেন, কেবলই মাতৃত্ব দ্বারা সন্তানদের সেবা করতে, সন্তানদের বুকের কাছে টেনে নিতে ব্যস্ত থাকেন”।
“তাই আমার পিতা নিজেকে ঈশ্বর বলে প্রচার করলেও, মাতা তার একটিবারও বিরোধ করে বললেন না যে ঈশ্বর আমার পিতা নন, কারণ আমার পিতা হলেন পরমাত্ম আর পরমাত্ম নশ্বর। যতক্ষণ না ব্রহ্ম থেকে ব্রহ্মময়ীর উদ্ভব হয়, ততদিন পরমাত্ম ভাবের অস্তিত্ব কেবলই শূন্যে লীন হয়ে থাকাই ছিল, আর অন্তে পরমাত্মকে সেই একই ভাবে ব্রহ্মে লীনই হয়ে যেতে হবে”।
“না পরমাত্ম ঈশ্বর আর না আত্ম। সত্য বলতে তো এঁদের অস্তিত্বও একটি ধারণা মাত্রা। আত্মের ভাবই হলো আত্ম, আর সমস্ত আত্মের ভাবের সমষ্টি হলেন আমার পিতা, আর তিনি হলেন পরমাত্ম। এই আমিত্ব ভাবের ততদিন মৃত্যু হয়না, যতদিন না আমিত্বের নাশ হয় জীবের মধ্যে, আর তাই খোলের পর খোল পালটে পালটে এই আত্ম জীবনমৃত্যুর চক্রে নিজেও আবদ্ধ থাকে, আর আমার মাতাকেও অর্থাৎ চেতনাকেও আবদ্ধ রেখে দেয়। যেদিন জীব আমিত্বের বোধ থেকে মুক্ত হয়ে যায়, সেইদিনই তার চেতনা আর মায়ের সন্তান থাকেনা, স্বয়ং আমার মা হয়ে যায়, নিজের সত্যতা জেনে যায়”।
“আর সেদিনই আত্মের লয় হয়ে যায় ব্রহ্মে, যাকে আপনারা বলেন মোক্ষলাভ। আর ঠিক এই ভাবে একে একে পরমাত্মের ভাণ্ডারের আত্মের সংখ্যা কমতে থাকে। আর যেদিন সমস্ত আত্ম লীন হয়ে যাবে ব্রহ্মে, আমার মায়েতে, মোক্ষদাতে, সেদিন পরমাত্মকেও পুনরায় ব্রহ্মে লীনই হয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ মৃত্যু আত্মের নেই, পরমাত্মের নেই, কিন্তু অমিত নয় তারা কেউ, আমার পিতাও। তাঁদেরকে লীন হতে হয়, যাকে মোক্ষ বলুন, নির্বাণ বলুন বা বলুন কেয়ামত, আর অন্তে আমার পিতাকেও সেই একই ভাবে লীন হয়ে যেতে হবে”।
“কিন্তু আমার মা যে মাতৃত্ব নিয়েই ব্যস্ত, তাই তিনি এই সত্য বলে আমার পিতার পূজাগ্রহণে কনো বিঘ্নদান করেননি। মা তিনি, আর মায়ের চিন্তা কেবল সন্তানের উদ্ধার, সন্তানের প্রেম। তাই তিনি ব্যস্ত থাকেন, সন্তানের মধ্যে চেতনা জাগরণের জন্য। সেই জাগরণ ঘটনার জন্যই আমার নির্মাণ করেন মা, আর সাথে সাথে, পরমাত্মের অন্তরে যেই শত্রুতার ভাব তাঁর প্রতি, সেই ভাবের বিনাশ করার জন্য তিনি আমার জন্মের কালে, আমার পিতার থেকেও সামান্য উর্জ্জা গ্রহণ করে, আমাকে নিজের পুত্র করার সাথে সাথে, পরমাত্মেরও পুত্র করে নেন”।
“কিন্তু পিতার ধারণা হয় যে, তাঁর সামান্য উর্জ্জাকে নিয়ে মাতা আমাকে জন্ম দিয়েছেন, তাঁর বিনাশ নিশ্চয় করতে, আর নিজেকে ঈশ্বর রূপে স্থাপন করতে। কিন্তু যার ঈশ্বরত্বের প্রতি নজরও নেই, কেবলই মাতৃত্ব নিয়ে যিনি উলমালা, তিনি কি করে ঈশ্বর কে সেজে বসে থাকলেন, তার প্রতি দৃষ্টি দেবেন! আমার মা তো পূজা গ্রহণই করতে চান না। সন্তানকে বক্ষে স্থাপন করতে চান কেবল; সন্তানকে নিয়েই তিনি উলমালা। সন্তান মা বলে ডাকলে, আল্লাহ বলে ডাকলে, পাগলের মত ছুটে যান তিনি”।
“কিন্তু সেই কথা আমার পিতার বিশ্বাস হয়না। এমনই হয় নিসাধরাজ, যখন কেউ যা সে নিজে নয় তা সেজে বসে থাকেন। পিতার থেকে ঈশ্বর উপাধি কেড়ে নেবার ইচ্ছা কারুর ছিলনা। ঈশ্বর রূপে নিজেকে স্থাপন করে পূজা গ্রহণ করে, তিনি খুশী আছেন, তাতে মাও খুশী। কিন্তু ওই! চোরের মন বোঁচকার দিকে! … পিতা নিজে তো ভালো করেই জানেন যে, তিনি নন, ঈশ্বর আমার মা। তাঁকে ইসলাম শয়তান বলে, তাঁর দূতকে ইসলাম দজ্জাল বলে, আর আমার মাকে বলে আল্লাহ, খুদা, আর তাঁর সন্তানকে নবী বলে”।
“তাই আল্লাহকে নিয়ে তাঁর সমস্যা হলো না। কিন্তু সমস্যা হলো নবীকে নিয়ে। ভয় জাগলো তাঁর অন্তরে যে, যদি নবী সেই সকলকে সমস্ত কথা বলে দেয় যারা তাঁকে ঈশ্বর, পরমেশ্বর মেনে চলেছে! তাঁর থেকে মুক্ত হয়ে ত্রিগুণ হয়ে স্থাপিত থেকে যারা ঈশ্বর হয়ে রয়েছেন, নবী যদি সকলকে সমস্ত সত্য বলে দেয়! … আর সেই ভয় থেকেই তিনি আমার হত্যা করার চিন্তা করা শুরু করলেন”।
“তখনও আমার জন্মই হয়নি, আমার বিনাশের জন্য, আর আমার বিনাশ থেকে উদ্ধার করার কালে, আমার মাতাকে আবদ্ধ করে রাখার জন্য সাধকুলের সঞ্চার করলো। … আমার মা, আমার রক্ষা করার জন্য মরিয়া হয়ে কৃত্তিকালোকের নির্দেশ দিলেন দেবী কৃত্তিকাকে। আর শুধু তাই নয়, এবার বদ্ধপরিকর হয়ে গেলেন মা, আর তাই অম্বাদেহ ত্যাগ করে অম্বিকা দেহ ধারণ করলেন”।
“আমার জন্ম দিলেন। তিনি স্বয়ং নিয়তি। তাই জানেন ভালো করেই যে পরমাত্ম অর্থাৎ রমনাথ বা আমার পিতা আমার মৃত্যুর ষড়যন্ত্র করবেন। তাই তিনি আমার জন্মের পূর্বেই আমার পালনের জন্য দেবী পাবনির রচনা করেছেন। আমার জন্মের পর, একই কারণে তিনি নিজেকে তিনটুকরে বিভাজিত করে নিয়ে শ্রী ও শ্বেতার স্থাপনা করলেন। আর দেবী কৃত্তিকা, দেবী পাবনি, আর দেবী শ্রী ও শ্বেতাকে স্থাপন করে আমার লালনপালন করেছেন”।
“আমার একটি একটি কলাকে পুষ্টিদান করেছেন। আজ আমি সম্পূর্ণ হয়েছি। আর সম্পূর্ণ হতে সেই সমস্ত ঘটনাকে নিজের মানসচক্ষে দেখেছি যা আমার জন্মের পূর্বে হয়েছে, আমার জন্মের কালে হয়েছে আর তার পরবর্তী সময়ে হয়েছে। আমার মাতা তো এতেই তুষ্ট যে আমি সুরক্ষিত। কিন্তু আমি নই। আমার মা’কে, জগজ্জননীকে, আল্লাহকে যে এই চরম বেদনা দিয়েছে, যে তাঁর মাতৃত্বকে, তাঁর মমতাকে আঘাত করার প্রয়াসও করেছে, আমি তাঁকে আমার মায়ের চরণে পতিত করেই ছাড়বো”।
“তাই আমি এক যোদ্ধা। কিন্তু নিসাধরাজ, আমাকে যে সামান্য যোদ্ধা হয়ে থাকলে চলবে না! … আমার শত্রু আমার পিতা, যাকে ইসমাইল বলেছিল শয়তান। আর আমার পিতা যে এই পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের সম্রাট। সম্রাটের কাছে বহু দাসদাসী আছে। কেউ যুদ্ধের সরঞ্জামের ধাতু প্রস্তুত করছে, তো অন্যকেউ সেই ধাতুদ্বারা বর্ম ও অস্ত্র নির্মাণ করছে; কেউ সেই অস্ত্রকে সান দিচ্ছে, তো কেউ সেই অস্ত্র চালানো শেখাচ্ছেন, আর অন্য একজন তা শিখছেন। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে যে এই সমস্ত কিছু আমাকে একাই করতে হবে নিসাধরাজ। হ্যাঁ, হতে পারে মাতার স্নেহের কারণে, আমার কিছুর ভ্রাতা ভগিনীও আমার সঙ্গে এসে জুড়বেন”।
“কিন্তু নিসাধরাজ, আমার যুদ্ধে আমি যে কারুকে শহীদ হতে দিতে পারিনা। সঙ্গে আমার যত খুশী ভ্রাতাভগিনী থাকুকনা কেন, সে আমার পিছনে, আমার সুরক্ষার ঘেরাটোপে থাকবে। নিসাধরাজ, আমরা সরকারপক্ষ নই, আর আমাদের সরকার, বিরোধীপক্ষকে অস্তিত্বে থাকার অনুমতি দেয়না। তাই আমি যে বিদ্রোহী, হে মহামান্য নভ”।
নভ বললেন, “প্রভু, আমাকে ও সম্পূর্ণ নিসাধকুলকে স্মরণ রাখবেন। আমরা সর্বক্ষণ আপনার সেবায় তৎপর থাকতে প্রস্তুত। … আর আরো একটি কথা বলবো আপনাকে। আপনি জানেন কিনা জানিনা। দেবী অম্বার দুই সখী ছিলেন, জয়া ও বিজয়া। তাঁরা জগতে দুই নবী হয়ে পূর্বে এসেছিলেন, আর পুনরায় আসবেন প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছিলেন। আপনার এই যুদ্ধে, তাঁদেরকে লাভ করলে, আপনার অনেক সহায়তা হয়ে যাবে”।
মৃষু বললেন, “ধন্যবাদ নিসাধরাজ। এখন আপনি প্রস্থান করুন, আর আমি যাত্রা করবো সাধপালের কাছে”।
এতো বলে, মৃষু সেই তেপুরমের দিকে অগ্রসর হতে, দেখলেন বেশ কিছু জীব, যার মধ্যে অধিকাংশই মানুষ, তারা ইতস্তত ঘোরাফেরা করছেন। সকলেই বেদনাগ্রস্ত আর সকলেই যেন কিছুর সন্ধান করছেন। নিজেকে আরো ঊর্ধ্বে নিয়ে গেলেন দেখার জন্য ও বোঝার জন্য যে তিনি ঠিক কোন স্থানে অবস্থান করছেন। মৃষু ঊর্ধ্বে উঠে দেখলেন তিনি সাধপালের রাজ্যের সম্মুখে দাঁড়িয়ে, আর তেপুরমের রয়েছে তিনটি স্তর, আর যেই জীবদের তিনি দেখছিলেন, তারা সেই তিন স্তরের প্রথম স্তর।
অবাক হয়ে গেলেন এটা ভেবে যে, সাধপালের রাজ্যের প্রথম স্তরে সেনা নেই! রয়েছে কিছু জীব, যারা সমস্তই বেদনায় আক্রান্ত! সত্যতা বুঝতে না পেরে মৃষু প্রথম স্তরের মধ্যে প্রবেশ করতে গেলে, অবাক হয়ে দেখলেন, অধিকাংশ যেই মানুষের বা অন্য জীবদের অস্তিত্ব রয়েছে, তাদের কারুর গণ্ডদেশ কাঁটা, কারুর মস্তকের বেশ কিছু অংশ নেই, এবং সকলেই কনো না কনো ভাবে ভীষণ ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত।
সমস্ত কিছু দেখেতে দেখতে মৃষু প্রথম স্তরের অন্তরে যেতে গেলে, এবার দেখলেন, সেই সকল জীব তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। সেই দৃশ্য দেখে, মৃষুর সন্দেহ হওয়া শুরু করে যে, “এরা নিশ্চিত ভাবে কনো অন্য ধরনের সেনা। সাধারণ সেনার মত যোদ্ধার সাজে সেজে নেই এঁরা। কিন্তু তেমন না থাকলেও এঁরা সেনা, আর এঁদের আক্রমণের ধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন”।
এমন অনুভব করে, একস্থানে দাঁড়িয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করতে চাইলেন যে এই সেনার ক্রিয়াধারা কেমন। দেখলেন যে, কনো শব্দ না করে, প্রতিটি জীব তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন। কনো প্রকার আঘাত করার প্রয়াস না করে, যেন একটি লম্ফ দিচ্ছেন তার তনুকে অধিকার করে নিয়ে বসার জন্য, আর তা না করতে পেরে, ছিটকে ভূমিতে পরে যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ এই আচরণ সকলের মধ্যে প্রত্যক্ষ করলেন, আর প্রত্যক্ষ করলেন যে তাঁর তনুকে অধিকার করতে না পেরে, যেন ভীষণ ভয়ার্ত হয়ে উঠেছে সকলে।
এবার সকলে তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, আর তাঁর দিকে এমন দৃষ্টি রেখেছেন যেন সে নিজে একটি অন্য ধরনের বিচিত্র প্রাণী। মৃষু এবার ক্রমশ সমস্ত কিছু বুঝতে শুরু করলেন। আর বুঝে গিয়ে, এক স্ত্রীর কাছে এগিয়ে গেলেন। স্ত্রীটি মৃষুকে নিকটে আসতে দেখে ভয়ার্ত হয়ে ভূমিতে পরে গেলেন। সেই দেখে মৃষুও ভূমিতে বসে পরলেন, ঠিক সেই স্ত্রীর সম্মুখে।
এবার মৃদু হাস্যে মৃষু বললেন, “মা! ভয় কিসের? আমাকে দেখে এমন ভয় পাচ্ছ কেন?”
সেই স্ত্রী যেন সেই কথা শুনে আরো ভয় পেয়ে গেলেন। আর অন্য সমস্ত জীবরা এবার মৃষুকে আর স্ত্রীকে বেষ্টন করে দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে মৃষুকে দেখতে থাকলেন। মৃষু তাঁদের মনের ভাব বুঝে হেসে বললেন, “অবাক হচ্ছ! ভাবছো, আমি কি সত্যই তোমাদের সকলকে দেখতে পাচ্ছি কিনা! তাই তো?”
স্ত্রীটি এবার এতটাই ভয়ার্ত হলেন, যেন মূর্ছা যাবার পরিস্থিতিতে পৌঁছে গেলেন। সেই দেখে মৃষু আবারও বললেন, “দেহ ত্যাগ করো নি কেন সম্পূর্ণ ভাবে? দ্যাখো ভালো করে, দেহ ত্যাগ হয়ে যাবার পরও দেহত্যাগ করো নি, তাই সমানে তোমাদের দেহ বিনষ্ট হয়েই চলেছে। পুষ্টি লাভ করার সামর্থ্য কি সূক্ষ্মশরীরের থাকে? (মাথা নেড়ে) থাকেনা মা। আর নেই বলেই তো, তোমাদের এই সূক্ষ্ম শরীর সমানে ঝরে পরে যাচ্ছে আর তোমাদেরকে দুর্গতির মধ্যে পতিত করে দিচ্ছে। ছেড়ে দাও এই সূক্ষ্ম শরীর। নতুন শরীর তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। একবার এই সূক্ষ্ম শরীর পূর্ণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে, পিশাচ আর পিশাচীনি হয়ে যাবে। তখন কিন্তু মাথা খুঁড়লেও আর কনো শরীর পাবেনা”।
স্ত্রীটি এবার সাহস করে বললেন, “তুমি আমাদের দেখতে পাচ্ছ? কিন্তু কি করে? আমরা যে মৃত, আর তুমি তো জীবিত?”
মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “জীবিত হও বা মৃত, প্রতি অবস্থাতেই আমার মায়ের অংশ তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান। ঢাকা পরে থাক আর প্রত্যক্ষ হয়ে প্রকাশ্যে থাক, চেতনা তোমাদের সবার মধ্যে বিদ্যমান। আর মা সন্তানের কাছে অদৃশ্য হয়ে থাকবেন, এটি মায়ের ধর্মবিরুদ্ধ আচরণ, আর আমার মা হলেন স্বয়ং শ্রেষ্ঠ ধর্ম, অর্থাৎ তিনিই শ্রেষ্ঠ ধারণ করার বস্তু বা অবস্তু। তাই তাঁর সন্তানের কাছে অদৃশ্য কি করে হয়ে থাকতে পারো তোমরা?”
সেই স্ত্রীটির ভাব অশ্রুবিসর্জন করার মত, কিন্তু পঞ্চভূতের উপর কনো নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে অশ্রু এলো না চোখে। গদগদ ভাবেই বললেন তিনি এবার, “কে তুমি? কে তোমার মা?”
মৃষু এবার একটু শব্দ করেই হেসে বললেন, “আমি! আমার মা! … আমি তাঁর সন্তান, যিনি তোমাদের সকলের মা। আমি জগন্মাতা সর্বাম্বার সন্তান, মৃষু”।
সেই কথা শুনে সকল উপস্থিত বেষ্টন করে দাঁড়িয়ে থাকা জীবরূপী প্রেত ভয়ার্ত হয়ে কিছু পদ পিছনে চলে গেলেন। সেই স্ত্রীরও অবস্থা একই রকম হলো, কিন্তু তাঁর এতটাই কাছে মৃষু অবস্থান করছিলেন যে তার নড়ার ক্ষমতা নেই। ভয়ার্ত হয়েই তিনি বললেন, “তোমার হাতেই তো সাধপালের মৃত্যু। মানে তুমি আমাদের সকলকেও মেরে দেবে, তাই না!”
মৃষু উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন এবার। আর হাসি থামিয়ে বললেন, “শোনো মেয়ের কথা! মৃতকে কি ভাবে আবার করে মৃত্যু দেওয়া যায়! তাও কি সম্ভব! … তোমরা আমাকে বলো যে, তোমরা পূর্ণ ভাবে দেহত্যাগ না করে এখানে কেন অবস্থান করছো? কেন সাধপালের কথা শুনে প্রতিটি আগুন্তকের দেহকে কব্জা করে নিতে চাইছো?”
স্ত্রীটি বললেন, “সাধপালের এমনই আদেশ। এই ভাবেই তাঁর এই তেপুরমে যে যখন আসবে, সে আমাদের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে যাবে, আর পলায়ন করবে এখান থেকে। … এক প্রভু রমনাথ এসেছিলেন, আর এক তুমি এসেছ, যে আমাদেরকে দেখতে পেলে, আর যার উপর আমরা কনো প্রভাব ফেলতে পারলাম না!”
মৃষু হেসে বললেন, “তাঁর উপর প্রভাব বিস্তারের প্রয়াসই করো নি তোমরা। … আর আমার ক্ষেত্রে সেই প্রয়াস করে ব্যর্থ হয়েছ। তাঁর ক্ষেত্রেও ব্যর্থ হতে, কারণ তোমরা তাঁর উপর আঘাতের প্রয়াস করলে, তিনি সূক্ষ্ম দেহ থেকে কারণ শরীর হয়ে যেতেন, আর তেমন হয়ে গেলে, তিনি তোমাদের দেখতে পেলেও, তোমরা তাঁকে আর দেখতে পেতে না। আর আমার ক্ষেত্রে তোমরা অপারগ রইলে, কারণ আমার অন্তরে আমার মা জাগ্রত। চেতনা জাগ্রত কারুর উপর স্থূল, সূক্ষ্ম বা কারণ, কনো কিছুই প্রভাব বিস্তার করতে পারেনা। কিন্তু আমার প্রশ্ন এই যে, তোমরা এখানে এই ভাবে গলাপচা দেহ নিয়ে বিরাজ করছো কেন? কেন এই সূক্ষ্ম গলাপচা দেহ ত্যাগ করে নতুন সতেজ দেহ গ্রহণ করছো না?”
সেই স্ত্রী কিছু বলার আগে, একটি সাহসী পুরুষ সামনে এগিয়ে এসে বললেন, “সাধপাল, আমাদেরকে বহু ধনরত্ন দেয়। আমাদের সকলের একটি একটি করে তেজারতি করে রেখে দিয়েছেন তিনি, আর আমাদের মধ্যে যে যখন কনো আগুন্তুককে বশ করে, তাঁকে তেপুরমে প্রবেশ করা থেকে আটকাতে পারি, তার তেজারতিতে তিনি বহু ধনসম্পদ দিয়ে দেন”।
মৃষু মিষ্ট হাস্য মুখ করে বললেন, “আর সেই ধনের লোভে, তোমরা এখানে পরে রয়েছ!” এই বলে উচ্চস্বরে হাস্য প্রদান করে আবার বললেন মৃষু, “কই যে কেউ একজন, নিজের ধনরাশির থেকে একটি মুদ্রা অন্তত এনে দেখাও আমাকে। যে কেউ, একটি মুদ্রা মাত্র”।
এই কথা শুনে সকলে সকলের মুখে দিকে তাকাতে শুরু করলেন আর প্রকাশ করা শুরু করলেন যে, কি করে তা সম্ভব! মৃষু আবার একটু হেসে বললেন, “সম্ভব নয়, তাই না? আপনারা তো স্থূল কনো কিছুকে ছুঁতেই পারেন না। তাহলে আপনারাই বলুন, সাধপাল আপনাদের সেই ধন দিচ্ছেন, নাকি নিজের সম্পদকে আপনাদের হেফাজতে রেখে দিচ্ছেন?”
এক স্ত্রী সম্মুখে এসে বললেন, “কিন্তু আমরা তো এমনিই মুক্ত নই। কারুর না কারুর কাছে তো আমাদেরকে বন্দী থাকতেই হবে! হয় সেটা কনো নাগা, নয় সেটা কনো শাস্ত্রী। তারা তো আমাদের ধমক দিয়ে অন্যের দেহে প্রবেশ করতে বাধ্য করে, আর তাঁদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে, আবার নিজেরাই সামনে এসে প্রেত ছাড়ানোর নাম করে আমাদেরকে সেই দেহ থেকে বার করে নিয়ে যায় ধ্বনি বা রঙিন পাথর দেখিয়ে, আর নিজেদের কাছে বন্দী রেখে দেয়। সাধপাল অন্তত আমাদেরকে ধমক দেয়না। ধন দেয়”।
মৃষু বিকৃত মুখে হেসে বললেন, “সেই ধন, যেই ধন আপনারা স্পর্শও করতে পারেন না। তাই তো?”
অন্য এক স্ত্রী বললেন, “কিন্তু আমরা বন্দী হতে তো বাধ্য। তাই নয় কি? এই ব্যাপারে তো কনো সন্দেহ নেই। আছে কি?”
মৃষু এবার দাঁড়িয়ে পরে, দৃঢ় কণ্ঠস্বরে বললেন, “আছে। আর শুধু সন্দেহই নয়, রয়েছে আপনাদের মূর্খতা। … আচ্ছা আপনারা আমাকে একটি কথা বলুন। আপনাদের মধ্যে একটিও শিশু নেই কেন? একটিও অতিবৃদ্ধ কেন নেই? কেন কিশোর কিশোরী, যুবক যুবতী আর প্রাপ্তরাই আপনাদের সমস্ত জনসংখ্যা!”
এক পুরুষ প্রশ্ন করলেন, “এ আবার কেমন ধরনের প্রশ্ন? আমাদের মধ্যে কেন নেই এমন শিশু বা বৃদ্ধ, তা আমরা কি করে জানবো?”
মৃষু যেই স্ত্রীর সামনে এতক্ষণ বসেছিলেন, তিনি বললেন, “জগন্মাতার সন্তান যখন কনো প্রশ্ন করেছেন, নিশ্চিত ভাবে তা আমাদের হিতের জন্যই করেছেন। তাই আমাদের উত্তর দেওয়া উচিত”।
মৃষু হেসে বললেন, “উত্তর থাকবে, তবে তো বলবে। আমি দিয়ে দিচ্ছি উত্তর। … দেখুন, আপনাদের মধ্যে কেউ রয়েছেন যিনি প্রতারণার শিকার, কেউ হিংসার বা প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রতিশোধের আগুনে জাজ্বল্যমান। আর যারা এমন নন, তারা দুশ্চিন্তার শিকার। আমার মৃত্যুর পর, আমার স্বামীর কি হবে, সন্তানের কি হবে, স্ত্রীর কি হবে। অর্থাৎ আপনারা সত্যই বন্দী। হ্যাঁ সকলে, সত্যি সত্যিই বন্দী আপনারা। তবে নাগা, বা শাস্ত্রী বা সাধপালের টোপ দেওয়া ধনের কাছে বন্দী নন”।
“আপনারা বন্দী নিজেদের অপূর্ণ ইচ্ছার কাছে। যতক্ষণ না কারুর চেতনা জাগ্রত হয়, সে ইচ্ছা করেই যায়, আর নিজের ইচ্ছার কাছে নিজেকে বন্দী করে রেখেই যায়। চেতনা জাগ্রত হবার পরেও ইচ্ছা যায়না। এই আমাকেই দেখুন না। পূর্ণ ভাবে চেতনা জাগ্রত হবার কারণে, আমার আমিত্ব চলে গেছে। আমি বাঁচলাম, মরলাম, সম্মান পেলাম, অসম্মানিত হলাম, এই সমস্ত তো ঘুচে গেছে। কিন্তু তাও ইচ্ছা রয়ে গেছে। আমার ও আমাদের প্রাণপ্রিয় মা, যিনি নিজেকে পূর্ণ ভাবে বিলিয়ে দিয়েছেন সন্তানদের জন্য, তাঁর মমতাতে আঘাত হয়েছে, আর তার প্রতিকার নেবার ইচ্ছাতে আমি রয়েছি। আর সত্য বলতে সেই ইচ্ছার কারণেই, আমি এখানে এসেছি”।
“কিন্তু চেতনা জাগ্রত হয়েছে। তাই আমি জানি, যতক্ষণ না আমার এই ইচ্ছার নাশ হবে, ততক্ষণ আমি জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হবো না। অর্থাৎ ততক্ষণ একটি দেহ যাবে, অন্য দেহ নেব। আর তা নিতেই থাকবো। এই কারণেই আমি ইসমাইলের বংশে ২৪ বার জন্ম নিয়েছি; বুদ্ধ গোষ্ঠীতে ২৭ বার জন্ম নিয়েছি; জৈনদের মধ্যে ২৪ বার জন্ম নিয়েছি, আর তা ছাড়াও নিজের কলা প্রকাশের জন্য এই সপ্তমবার জন্ম নিয়েছি। আরো জানি না কতবার জন্ম নিতেই থাকবো। কিন্তু দেখুন, একটিবারও আমি প্রেত হইনি। কেন?”
“কারণ আপনাদের মত আমি মূর্খ নই যে ভাবতে থাকবো, এই দেহ চলে গেলে প্রতিকার নেওয়া হবেনা, এই দেহ চলে গেলে আর স্ত্রীর, স্বামীর, সন্তানের দেখভাল করতে পারবো না। … আপনাদের মত মূর্খ নই আমি। তাই তো জানি যে, আমার অপূর্ণ ইচ্ছাকে পূর্ণ করার জন্য পূর্বের দেহে আমি পরিশ্রম করেছি। যতটা করতে পারতাম সেই দেহে, তা সম্পন্ন হয়েছে, আর এর পরবর্তী পরিশ্রমের জন্য, নতুন স্থানে, নতুন পরিবারে, নতুন দেহ প্রয়োজন। আর তাই ইচ্ছা অপূর্ণ থাকতেও আমি প্রেত নই”।
“আর অন্যদিকে রয়েছেন আপনারা সকলে। আপনারা এই ভেবে চলেছেন যে, আপনাদের মৃত্যু হয়ে ঠিক হয়নি। তাই হয় যার কারণে মৃত্যু হয়েছে, তার বিপদের কারণ হবেন আপনারা, নয় যেই দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেছে, সেই দায়িত্ব মৃত্যুর পরেও পালন করবেন। … মূর্খ আপনারা। আর আপনাদের মূর্খতাই আপনাদের বন্দী করে রেখেছে। না নাগা আপনাদের বন্দী করেছে, না শাস্ত্রী আর না সাধপাল। আপনাদের মূর্খতাকে এরা তো মাত্র কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে চলেছে”।
“আপনারা আসলে মুখে তো জগন্মাতা বলেন, কিন্তু তাঁর সম্বন্ধে কিচ্ছু জানেনই না। তিনি সমস্ত চেতনা, অর্থাৎ আমরা যাকে বলি প্রাণ। তাঁকে ধারণ করেই আমরা প্রাণী, নয় তো আমরা কেবলই একাকটি পঞ্চভূতের পিণ্ড, শব দেহ মাত্র। তাঁর কারণেই আমরা জীবন্ত। তিনিই সমস্ত চেতনার বেষ্টনী হয়ে প্রকৃতি বেশে আমাদেরকে সত্যশিক্ষা প্রদান করেন। আর তিনিই হলেন পরানিয়তি। তাঁর নির্দেশেই আমাদের মৃত্যু হয়েছে, আর এক্কেবারে সঠিক সময়ে হয়েছে”।
“পঞ্চভূতের বন্ধন যখন হাল্কা হতে থাকে, তখন বয়সযোনির কারণে আমাদের মৃত্যু হয়। আর তা ছাড়া, যখন আমাদের আসক্তি চরমে উন্নত হয়ে যায়, আর তা আমাদেরকে কল্পনার সাগরে সম্রাট বা সম্রাজ্ঞী করে দেয়, তখনই আমাদের অপঘাতে মৃত্যু হয়। আমরা তখন আকাশ পাতাল ভাবতে থাকি। আমাদের বুদ্ধিহীন সন্তানকে শ্রেষ্ঠ সন্তান মানা শুরু করে দিই, আমাদের শত্রুকে অশেষ শক্তিশালী ভাবা শুরু করে দিই, আরো কতো কিছু অসম্ভব, অবাস্তব কল্পনার মধ্যে ডুবে যাই আমরা”।
“যদি সেই ক্ষণে আমাদেরকে দেহ থেকে মুক্ত না করা হয়, আমরা এমন হয়ে যাবো যে আমরা আর প্রকৃতির ছত্রছায়ায় থাকা কনো যোনির দেহতেই স্থান নেবার অযোগ্য হয়ে যাবো। আর ঠিক সেই ক্ষণে আমাদের জন্য নেবে আসে অপঘাতে মৃত্যু। অর্থাৎ কারুর মৃত্যু একদণ্ডও আগে হয়না, পরেও হয়না। কেবল ও কেবল মাত্র সঠিক ও উচিত সময়েই আমাদের মৃত্যু হয়। আমাদের মা স্বয়ং আমাদের জন্মমৃত্যুর চক্রকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। আমার পিতা, যাকে আপনারা রমনাথ বলেন, তাঁর হাতে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড চালনার ভার থাকলেও, মা তা নিয়ে নেবার প্রয়াস করেন নি, কিন্তু জন্মমৃত্যুর চক্রকে তিনি কিছুতেই তাঁর হাতে দেন নি”।
“তিনি জানেন, রমনাথ হলেন আত্ম, পরমাত্ম, আর আত্মের স্বভাব অনুসারেই তিনি নিজের প্রশংসায় বিগলিত, আর নিজেকে ভগবান মানাতে সে ব্যস্ত। তাই কেউ তাঁর প্রশংসা করে, তাঁকে ভগবান মানলে, তিনি মৃত্যুর কালেও তাঁর মৃত্যুকে আটকে রেখে, আসক্তির পাহাড় নির্মাণ করে দেবেন সেই জীবের হৃদয়ে, আর সম্পূর্ণ ভাবে আত্মদাস করে দেবেন সেই জীবকে। আসক্তি আর বিরক্তিতে জর্জরিত তিনি, আর তাই তো নিজের বিরক্তিভাবকে বৈরাগ্য নাম দিয়ে ফেরেন তিনি”।
“বৈরাগ্যের অর্থ কি? আসক্তি ও বিরক্তি উভয় থেকে মুক্ত ভাবই হল বৈরাগ্য। বিরক্তি! সে তো শ্রেষ্ঠতম আসক্তি। যা লাভ করতে কেউ আসক্ত, তা যখন লব্ধ হয়না, তখনই তো বিরক্তির জন্ম হয়। অর্থাৎ বিরক্তি যে আসক্তিরই সন্তান। তাহলে বিরক্তকে বৈরাগ্য কি ভাবে বলা চলে? কিন্তু আপনাদের প্রভু রমনাথ, নিজেকে ভগবান দাবি করার জন্য, চরম ভাবে বিরক্ত হয়েও নিজেকে বৈরাগী বলে ফেরেন”।
“সত্যই যদি তিনি বৈরাগী হতেন, মা নিশ্চিত ভাবে জন্মমৃত্যুর ভার তাঁর হাতে দিতেন, কারণ জন্ম মৃত্যু হলো এই ভ্রমব্রহ্মাণ্ডের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ এর উপরই নির্ভর করে, আমাদের আত্ম থেকে ব্রহ্ম হয়ে ওঠার যাত্রাপথ। তাই তিনি এক বিরক্তকে এই ভার দিতে পারেন নি, নিজের হাতেই এই ভার রেখে দিয়ে তিনি পরানিয়তি, আর এই চক্র থেকে মুক্তি প্রদানী মোক্ষদা। … আপনাদের আসক্তি কি বলছে? এই না যে ব্রহ্মময়ী নিজের কর্মে ভুল করেছেন! … আপনাদের হত্যা হওয়া ঠিক হয়নি, আপনাদের মৃত্যু উচিত সময়ে হয়নি!”
এবার সকলে মাথা নামিয়ে নিলে, এক স্ত্রী সামনে এসে বললেন, “ক্ষমা প্রভু, আমরা সত্যই অজ্ঞানী। মা আমাদেরকে অসুর হওয়া থেকে আটকাতে অপঘাতে মৃত্যু দিলেন, আর আমরা কিনা নিজের আসক্তির প্রতিই আকৃষ্ট থেকে সেই অসুর হবার জন্য এগিয়ে যাচ্ছি। এবার আমরা বুঝতে পারছি যে কেন নাগা, শাস্ত্রী আর সাধপালদের কাছে আমরা বন্দী হই, আর কেন কনো তপস্বী, কনো সিদ্ধের কাছে নই। আমরা যে আমাদের অন্তরের সাধকে পালন করে, স্বয়ংই সাধ হয়ে উঠেছি, অসুরক্ষিত ভাবকে ধারণ করে করে অসুর হয়ে উঠেছি। তাই আমাদেরকে অসুরদের সাথেই থাকতে হয়, তাদের কাছেই আমরা বন্দিনী হয়ে পরে থাকি”।
মৃষুর সামনে যেই স্ত্রী পূর্বে পতিত হয়ে গেছিলেন, তিনি সম্মুখে এসে করজোড়ে বললেন, “সঠিক বলেছেন প্রভু, আমরা নাগাদের কাছে নই, শাস্ত্রীদের কাছেও নই, আর সাধপালের কাছেও নই। এঁদের কারুর কাছে বন্দী নই। আমরা তো কেবল আমাদের নিজেদের আসক্তির কাছেই বন্দী। হে প্রভু, তপস্বীরা সঠিক কথাই বলেন। জ্ঞানই মুক্তির কারণ। অজ্ঞানতাই বন্ধনের একমাত্র কারণ। … প্রভু আমরা মুক্ত হয়ে যেতে চাই। কিন্তু আমরা মুক্ত হয়ে গেলে, সাধপাল আপনাকে আক্রমণ করে দেবে”।
মৃষু হেসে বললেন, “কেউ আমাকে আক্রমণ করে দেবে বলে, তোমরা বন্দী হয়ে থাকবে, জগন্মাতার সন্তান এতটা স্বার্থপর কি করে হতে পারে?”
এক পুরুষ সম্মুখে এসে বললেন, “প্রভু, সাধপাল আপনাকে ভয় পায়। যদি আপনি এসে গেছেন সংবাদ পেয়ে যায়, আপনি এর পরের দুই লোককে অতিক্রম করার আগে সে রমনাথের কাছে গিয়ে লুকিয়ে থাকবে। তাই প্রভু আমাদের এই অনুরোধটা শুনুন, আপনি ফেরা পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করি এখানে। তাহলে সাধপাল খবরও পাবেন না যে কেউ আমাদের মধ্য থেকে অনুপ্রবেশ করে গেছে তেপুরমে”।
মৃষু হেসে বললেন, “আমাকে তোমরা প্রভুও বলছো, আবার তোমাদের নির্দেশ শোনার অনুরোধও করছো?”
সেই কথাতে সকলে মাথা নামিয়ে নিলে, মৃষু সম্মুখে এসে বললেন, “ছোটো ভ্রাতা মনে করলে অবশ্যই নির্দেশ দিতে পারো। আর সত্য অর্থে তো আমি তোমাদের ছোটো ভ্রাতাই, কারণ যিনি আমার মা, তিনি তো তোমাদেরও মা। … তাহলে এই প্রভু শব্দের প্রয়োগ কেন? যার মা স্বয়ং ঈশ্বর হয়েও, ঈশ্বরত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে মা হতে পাগল, তাঁর সন্তান কি করে কারুর প্রভু হতে পারে? ভাই হতে পারে সে, সখা হতে পারে সে, স্নেহের পুত্রও হতে পারে সে, বড়দাদাও হতে পারে সে, কিন্তু প্রভু কি করে হতে পারে?”
স্ত্রীরা সম্মুখে এসে তৃপ্ত ভাবে তাকিয়ে থেকে বললেন, “বলতে ইচ্ছা করে ভাই, তুমি বুঝবে না। নিজের হৃদয় অনেক বড় হয়ে গেছে তো, তাই বুঝবে না সঙ্কীর্ণ হৃদয়দের কথা। আমাদের হৃদয় এখনও সঙ্কীর্ণ ভাই। তাই সামনে যখন কারুকে বিশাল হৃদয় নিয়ে অবস্থান করতে দেখি, তাকে ভগবান মানতে ইচ্ছা হয়। … কিন্তু তোমার কথা ঠিক, যিনি ঈশ্বর হয়েও মা হয়ে থাকতে পছন্দ করেন, তাঁর সন্তান কি করে প্রভু হতে পারে। আর সত্য বলতে কি জানো, যোগ্য সন্তান তুমি তাঁর। সেই জন্যই মায়ের পথেই চলমান তুমি। সম্মান নয়, প্রেম তোমার কাছে অধিক প্রিয়, ঠিক তোমার মায়ের মত”।
মৃষু বললেন, “আচ্ছা আগের দুই লোকের কথা আমাকে কিছু বলতে পারবেন আপনারা? মানে জানা আছে আপনাদের কিছু? যদি জানেন তবে আমাকে সেই কথা বলে, একটু সহায়তা করুন, যাতে সাধপালের কাছে আমি শীঘ্রই পৌছাতে পারি”।
এক স্ত্রী সম্মুখে এসে বললেন, “ত্রিলোক আর তেপুরমের মধ্যে তেমন কনো ভেদ নেই মৃষু। ত্রিলোকের যেমন একটি লোকে আমাদের বাস, একটি লোকে যন্ত্রের, আর একটি লোকে মন্ত্রের, এখানেও ঠিক তেমন। তন্ত্র, মন্ত্র ও যন্ত্র, এই তিনই সাধপালের কাছে বন্দী। তন্ত্র দ্বারা আমাদেরকে বন্দী করে রেখেছিল সে। আর বাকি দুই লোককে সে যন্ত্র আর মন্ত্র দ্বারা আবদ্ধ করে রেখে দিয়েছে” ।
মৃষু উত্তরে বললেন, “বুঝলাম, সে যন্ত্রকে অধিকার করে রেখেছে রমানাথের নির্দেশে, সেই কারণেই মনুষ্যলোকে যন্ত্রের প্রতি এতো আসক্তি। স্বয়ং পরমাত্ম যন্ত্রকে ধারণ করে রেখে দিয়েছে, আর তাই প্রতিটি আত্ম সেই যন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট”।
এক পুরুষ সামনে এসে বললেন, “এর কি কনো প্রতিকার নেই? মনুষ্যযোনিকে কি এই যন্ত্রের থেকে মুক্ত করা যায়না! যদি না যায়, তাহলে তো একদিন মনুষ্য নিজেকেই নিজে সমাপ্ত করে দেবে!”
মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “রমনাথ নির্দেশ দিয়ে মনুষ্যকে রমনাস্ত্রের সাথে আলাপ করিয়েছেন। তিনি জানেন রমনাস্ত্রের কারণে প্রকৃতির সমস্ত যোনির বিনাশ হবে। আর তা জেনেই তিনি সেই অস্ত্রের রহস্য মানুষের কাছে উন্মোচন করেছেন। এর একটিই কারণ হতে পারে। আর তা হল রমনাথ চান না যে মনুষ্যযোনি অস্তিত্বে থাকুক। প্রকৃতির হাতে মনুষ্যযোনির নাশ নিশ্চয় করতেই তিনি এই কীর্তি করেছেন”।
অন্য এক স্ত্রী সম্মুখে এসে বললেন, “কিন্তু কেন এমন করেছেন তিনি? কি কারণে মনুষ্যযোনিকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইছেন রমনাথ?”
মৃষু হেসে বললেন, “বৌদ্ধ ও ইসলাম। এই দুই ধারাকে অনুসরণ করে, মানুষ চেতনার দ্বারে এসে উপস্থিত হয়ে, পরমাত্মকে শয়তান বলে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। তাই প্রকৃতির প্রতি বিদ্বেষ স্থাপন করে বেশ কিছু ধারার স্থাপনা করেছে সে, যেমন আর্য ও ইহুদি। তবে তাতেও বৌদ্ধ ও ইসলামকে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। তাই নিশ্চিত করেছে রমনাথ যে সেই যোনিকে অস্তিত্বে থাকতেই দেবেনা, যেই যোনির কারণে চেতনার স্থাপনা হয়, এবং পরমাত্মকে শয়তান রূপে জীব চিহ্নিত করে নিতে পারে”।
সেই প্রথম স্ত্রী সম্মুখে এসে প্রশ্ন করলেন, “তাহলে উপায়? মনুষ্য যোনিকে ধরে ধরে, যেটুকু চেতনার উত্থান হয়েছিল, তাও তো চলে যাবে মনুষ্য যোনির বিনাশের সাথে সাথে!”
মৃষু হেসে বললেন, “মা যখন একবার দেখে নিয়েছেন যে আত্মভাব অবস্থান করা সত্ত্বেও চেতনার বিস্তার হতে পারে, তখন তিনি নিশ্চিতই এমন কিছু করবেন, যার মাধ্যমে পরমাত্মের ভ্রম থেকে জীব মুক্ত হতে পারে, আর এও নিশ্চিত করবেন যে, রমনাথ এবার আর কিচ্ছু করতে পারবেনা, এঁদের ভ্রমিত করতে। আর হ্যাঁ, তিনি এও নিশ্চয় করবেন যে, রমনাথ কেন, কাকপক্ষী টের পাবেনা মায়ের সেই কাজের”।
সেই পুরুষটি আবার বললেন, “কিন্তু যদি সাধপালের নাশ হয়, তবুও কি এই তন্ত্র, মন্ত্র আর যন্ত্রের বশ্যতা থেকে জীব মুক্তি পাবেনা!”
মৃষু উত্তরে দৃঢ় ভাবে বললেন, “না। পাবেনা। ততক্ষণ পাবেনা, যতক্ষণ না পরমাত্ম আমার মায়ের দাস হচ্ছেন। সাধদের পিতা তাঁরা, আর সাগরের মন্থনের থেকে উৎপন্ন তন্ত্র, মন্ত্র ও যন্ত্রকে সাধরা লাভ করেছে। অর্থাৎ যদি সমস্ত সাধদের বিনাশও করা যায়, তারপরেও জীব এই তন্ত্র, মন্ত্র ও যন্ত্রের থেকে মুক্ত হবেনা। কারণ, সাধদের অনুপস্থিতিতে, সেই সমস্ত কিছু ত্রিমূর্তির করতলে চলে যাবে। তবে হ্যাঁ, সাধদের বিনাশ আবশ্যক”।
“সাধরা আজ সূক্ষ্মবেশে স্থিত হয়ে সমস্ত জীবকে প্রভাবিত করছে। তাই তাদের এই সূক্ষ্ম আবেশকে মেটাতেই হবে। সূক্ষ্ম আবেশকে মেটালে, তবে তারা কারণ বেশে অবস্থান করবে, অর্থাৎ যতক্ষণ না জীব তাদেরকে আবাহন করবে, ততক্ষণ তারা জীবের কাছে পৌছাতে পারবেনা। তবে এরপরেও যদি ত্রিমূর্তি মুক্ত থাকে, তাহলে পুনরায় তারা কারণ থেকে সূক্ষ্মে প্রকাশিত করবে সাধদের। আর তা করার অর্থ, পুনরায় সমস্ত জীব দাস হয়ে যাবে সাধদের। অর্থাৎ সাধদের দমন করার পর, তাদেরকে সূক্ষ্ম থেকে কারণে প্রত্যাবর্তন করিয়ে, ত্রিমূর্তির বন্ধনের কথাও ভাবতে হবে। তবেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে যে, মানবের মত অন্য যোনিদের নাশ করার ষড়যন্ত্র করা যাবেনা”।
সেই স্ত্রী বললেন, “এর অর্থ, মানবের নাশ হবে, এই ব্যাপারে কনো সন্দেহ নেই? কিন্তু মাতা কি কিচ্ছু করবেন না এই যোনিকে সুরক্ষিত করতে! এও তাঁরই সন্তান। এই সন্তানের উপর তাঁর গর্বও ছিলো!”
মৃষু হেসে বললেন, “আমাদের বৃহত্তর ভাবনা ভাবা উচিত। যেখানে প্রশ্ন ৮৪ লক্ষ্য যোনির, সেখানে একটি যোনিকে যদি মরতে দিতে হয় বাকি সকলকে সুরক্ষিত করার জন্য, সেটিই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে। যেহেতু মানবকে রমনাথ চিহ্নিত করে রেখেছে, সেহেতু তার সমস্ত ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু সেই দিকেই হবে। আর তাই, তার ভাবনাকে সেদিকেই সীমিত রেখে দিয়ে, বাকি সমস্ত যোনিকে সুরক্ষিত করে নিয়ে, অন্য বিকল্প সন্ধান করাই উচিত সিদ্ধান্ত হবে”।
সেই পুরুষটি বললেন, “আচ্ছা, সাধদের কারণ শরীরে কেন রাখতে হবে? তাদের সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়না?”
মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “সাধ কারা? সাধেদের অস্তিত্ব সম্ভব কি ভাবে হলো? তারা হলো হীনমন্যতার ভাব। স্বার্থভাব বা আত্মভাবের পরিণাম, অর্থাৎ কনো জীব যখন স্বার্থান্বেষী হয়ে যায় এবং আত্মভাবে ভাবাপন্ন হয়, তখন তাঁর এই ভাব হয় কর্ম, আর সাধ হয় সেই কর্মের কর্মফল। মনুষ্যের মধ্যে স্বার্থভাবের বিস্তার করে করেই ত্রিমূর্তি তাঁদেরকে এই কর্মফলের আবাহন করতে বাধ্য করেছিল, আর এখনও করে চলেছে। তাই যতকাল আত্মভাবের অস্তিত্ব থাকবে, ততকালই সাধদেরও অস্তিত্ব থাকবে। যদি স্বার্থভাব দুর্বল হয়, তাহলে সাধরা কারণেই সীমিত থাকবে, আর যদি স্বার্থভাব আজকের মনুষ্যের মত পুনরায় প্রকাশ্যে এসে যায়, তখন পুনরায় সাধরা কারণ থেকে সূক্ষ্মে এসে যাবার সুযোগ পেয়ে যাবে”।
সেই প্রথম স্ত্রী হাতজোর করে বললেন, “ভাই মৃষু, আমাদের আত্ম কি, সেই ব্যাপারে কিছু বলো। দেহে থাকা অবস্থায় আমরা প্রায়শই এই আত্ম নিয়ে চিন্তিত থাকতাম। কেউ আমাদের কাছে এসে বলতো, এই আত্মই শয়তান, আবার কেউ এসে বলতো, এই আত্মই ভগবান। আর উভয়েই বলতো, আত্মের মৃত্যু হয়না। বাস্তবে আত্ম কি? এই ব্যাপারে আমাদের স্পষ্ট জ্ঞান প্রদান করো ভাই”।
মৃষু মৃদুহাস্য প্রদান করে বললেন, “আত্ম আসলে কনো অস্তিত্ব নয়, এটি একটি ভাব। ব্রহ্মচেতনা হলেন আমাদের মা, যিনি এই ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র সত্য, আর ব্রহ্মাণ্ড না থাকেও তিনিই একমাত্র সত্য, কারণ তিনি স্বয়ং ব্রহ্ম। নিরাকারা তিনি, পরমশূন্য তিনি, যাকে ইসলাম বলে আল্লাহ, যিনিই একমাত্র অস্তিত্ব। তাঁরই বাৎসল্যের কারণে নিষ্ক্রিয়তা থেকে সক্রিয় হয়ে ওঠা, আর সেই সক্রিয়তার সাথে সাথেই, এক আমিত্ব ভাবের জন্ম হয়, যে নিজেকে ব্রহ্মের থেকে ভিন্ন এক অস্তিত্ব বলে দাবি করে”।
“এই আত্মভাব মাতার শক্তির সম্মুখে অত্যন্ত অসহায় বোধ করাতে, মাতা বাৎসল্য ধারণ করে যেই চেতনাপুঞ্জকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, সেই চেতনার বিনাশ করতে চায় পরমাত্ম। তার ধারণা, এই বাৎসল্যরসের কারণেই দেবী উপস্থিত, আর দেবী উপস্থিত বলেই, তাঁরা শ্রেষ্ঠ নয়। কিন্তু মূর্খ পরমাত্ম এটা জানতো না যে, মাতার বাৎসল্যের কারণেই তিনি শূন্যতা ত্যাগ করে, ব্রহ্ম থেকে ব্রহ্মময়ী হয়েছেন, আর তিনি ব্রহ্মময়ী হয়েছেন বলেই সে স্বয়ং, অর্থাৎ পরমাত্ম অস্তিত্বে রয়েছে। এতটাই মূর্খ সে যে, এটাও বুঝতে পারেনা যে, যেদিন মাতার বাৎসল্যের নাশ হবে, সেদিন তারও অস্তিত্ব স্বতঃই মুছে যাবে”।
“কিন্তু না বুঝেই মাতার গর্ভে চেতনার ভ্রূণ অর্থাৎ মেধাকে আঘাত করতে যায় পরমাত্ম। মাতা সন্তানের সুরক্ষার কারণে, প্রথমে আকাশ অর্থাৎ নভের নির্মাণ করে পরমাত্মের থেকে নিজের দূরত্বকে বিস্তীর্ণ করে নেন। তাতেও পরমাত্ম হার না মানলে, মৃত্তিকা নির্মাণ করে, পরমাত্মকে আঘাত করে দূরে সরিয়ে দিলেন মাতা। আর সেই মোক্ষম আঘাতে পরমাত্ম ত্রিমূর্তিতে বিভাজিত হয়ে গেলেন”।
“এতেও যখন মানলো না পরমাত্ম, তখন মাতা ধরিত্রী ও আকাশের ঘর্ষণ থেকে অগ্নি নির্মাণ করেন এবং ত্রিমূর্তির থেকে নিজের গর্ভকে সুরক্ষিত রাখতে চান। কিন্তু সেই অগ্নির তাপে, মাতার গর্ভপাত হয়, আর তাঁর চেতনা ভ্রূণ অবস্থাতেই মুক্ত হয়ে যায় তাঁর গর্ভ থেকে। আর এই ভ্রূণকে তোমরা বলো মেধা। এই মেধাকে এবার বিনাশ করার উদ্দেশ্যে ত্রিমূর্তি প্রয়াস করলে, মাতা বায়ুর নির্মাণ করে, ত্রিমূর্তিকে ছিটকে ফেলে দেন। কিন্তু সেই কালে ত্রিমূর্তি এক ভিন্ন আভার সন্ধান পেয়ে যান”।
“সন্তানকে ধারণ করার ইচ্ছা গ্রহণ করেছিলেন মাতা; সন্তানকে আঘাত করার প্রয়াস করছে পরমাত্ম, সেই কল্পনা করেছিলেন মাতা; আর সন্তানের সুরক্ষার চিন্তা করেছিলেন তিনি। তবে এই ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা, তিনই আত্মভাবের বিস্তার করে, তাই মাতা তাদেরকে নিজের থেকে মুক্ত করে দেন, কারণ ব্রহ্মময়ী কনোপ্রকার অপবিত্রতা গ্রহণ করতে পারেননা। আর ত্রিমূর্তি এই তিন মাতার থেকে মুক্ত হওয়া গুণকে ধারণ করে শক্তিশালী হয়ে উঠলেন”।
“পরমাত্ম থেকে ত্রিমূর্তির বিভাজনের আগে পরমাত্মের যেই রূপ উপস্থিত হয়েছিল, তা ছিলেন রমনাথ। তাই তিনিই কল্পনাকে, যাকে তোমরা বলো অপস্মার, তা গ্রহণ করলেন, আর ত্রিমূর্তির প্রভু হয়ে নিবাস করলেন। চিন্তাকে অর্থাৎ অলক্ষ্মীকে ধারণ করলেন দুধেশ্বর, আর চিন্তাকে অর্থাৎ অবিদ্যাকে ধারণ করলেন কোকিলা। আর এই তিনজন এবার একত্রে সেই প্রাপ্ত শক্তিদ্বারা আঘাত করলেন মেধাকে অর্থাৎ মাতার চেতনারূপ সন্তানের ভ্রূণকে”।
“সেই আক্রমণের কারণে, মেধা সহস্র টুকরে বিভাজিত হয়ে গেলেন, এবং বায়ুর কারণে চারিদিকে বিচ্ছিন্ন ভাবে ছড়িয়ে যেতে থাকলো সেই ভ্রূণ সমূহ অর্থাৎ সেই মেধা সকল। ত্রিমূর্তি মনে করে যে, মাতার তিনটি ভাবের যদি এতো সামর্থ্য হয়, তাহলে মাতার নির্মিত ভ্রূণ থেকে উৎপন্ন সন্তানের কতই না শক্তি হবে। তাই সেই শক্তিকে ধারণ করার জন্য, সেই কাল, সেই মুহূর্ত থেকে, সমস্ত মেধাকে আত্মরা ধারণ করে অবস্থান করছে। আত্মের ত্রিগুণ অর্থাৎ ত্রিমূর্তি প্রতিটি মেধকণাকে ধারণ করে অবস্থান করছে সেই কাল থেকেই”।
“আর শুধু তারাই নয়, মাতার থেকে জাত আকাশ, বায়ু, অগ্নি ও ধরিত্রীও একই ভাবে অনুসরণ করে মেধার আর সদা মেধার সাথে যুক্ত থাকে। এই কারণেই প্রতিটি জীবের মধ্যে আত্মভাবের উপস্থিতি, আর প্রতিটি জীবের মেধাকে মাতার থেকে জাত চার ভূত সর্বদা প্রয়াসরত থাকে যাতে মেধা নিজের ভ্রূণ অবস্থা থেকে চেতনা হয়ে উঠতে পারে, আর মাতাকে নিজের জননী বলে চিহ্নিত করে তাঁর ক্রোড়ে ফিরে যেতে পারে”।
“চেতনা স্বয়ং মাতা, তাই চেতনাকে প্রতিরোধ করার সামর্থ্য কারুর নেই, পরমাত্মেরও নেই। আর পরমাত্মও তা জানে, আর তাই মেধাকে সে সর্বদা কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তাদ্বারা আবদ্ধ করে রেখে দেয় যাতে সেই কখনোই চেতনা হয়ে উঠতে না পারে। আর অন্যদিকে, যতক্ষণ না মেধা চেতনা হয়ে ওঠে, ততক্ষণ চারভূত তাঁকে বারিধারা অর্থাৎ মেধারূপ করে পঞ্চভূত হয়ে অবস্থান করে, আর এই ভাবে পরমাত্মের থেকে অর্থাৎ ত্রিমূর্তির থেকে রক্ষা করার প্রয়াস করে মেধার”।
“যখন যখন তাদের ধারণা হয় যে এবার নিশ্চিত ত্রিমূর্তি মেধাকে নষ্ট করে দিতে পারে, তখন তখন নিজেরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, এবং তেমন হলেই দেহত্যাগ হয় জীবের। অর্থাৎ জীব না তো পূর্ণ ভাবে ভূতদের নিয়ন্ত্রণে স্থিত, আর না আত্মের। আর এই হিসাব আরো অন্যরকম হয়ে যায় যখন মাতা স্বয়ং এই সমস্ত কিছুর মধ্যে যুক্ত হন, নিজের সন্তানের প্রতি মমতাকে ধারণ করে”।
“প্রত্যক্ষ ভাবে তিনি যুক্ত থাকেন না, বা থাকতে পারেন না। প্রত্যক্ষ ভাবে তিনি তখন যুক্ত হন যখন কারুর মেধা চেতনায় পরিবর্তিত হয়ে যায়। কিন্তু যতক্ষণ না তা হয়, ততক্ষণ মাতা প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত থাকতে পারেন না কনো জীবের সাথে। কিন্তু মেধা! ভ্রূণ হলেও, সে তো সরাসরি মাতার মমতার ফসল। কিন্তু সে ভ্রূণ। তাই সে একাকী কনো কিচ্ছু করতে পারেনা, কিন্তু যখন একাধিক মেধা একত্রিত হয়, তখন মাতাকে প্রত্যক্ষ করে তোলে সেই মেধার সমষ্টি”।
“আর মাতা, সেই মেধারসমষ্টির মাধ্যমে বাকি সমস্ত মেধাকে, সমস্ত পঞ্চভূতকে মার্গদর্শন করতে থাকে, এই ব্রহ্মাণ্ডের সত্য উপলব্ধি করার জন্য, পরমাত্মের ও আত্মের সত্যতা অনুভব করার জন্য। আর এই মেধার সমষ্টিকে তোমরা বলো প্রকৃতি। আর যখন সমস্ত মেধাকে একত্রিত ভাবে প্রকাশ করতে চাও, তখন তাঁকে তোমরা বলো পরাপ্রকৃতি”।
“কিন্তু মাতা নিজের বাৎসল্যকে এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন না। তিনি সমস্ত ভূতের জননী। তাই ভূতদের উপর তাঁর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ, ও তাই ভূতরা সকলেই মায়ের নির্দেশ অনুধাবন করতে পারেন। মাতা এদের সকলকে নির্দেশদাত্রী রূপে পূর্ণ কারণ অবস্থায় বিরাজ করেন, যাকে তোমরা বলো নিয়তি। সেই অবস্থায় স্থিত থেকে তিনি জন্ম, মৃত্যু তথা সমস্ত চলন, চালন, এমনকি কথন, বচন, সমস্ত কিছুকে নির্ধারণ করতে থাকেন, আর এই সমস্ত কিছুর মাধ্যমে সকল মেধাকে মার্গদর্শন প্রদান করতে থাকেন”।
“ত্রিমূর্তিও সমান ভাবে প্রভাব বিস্তার করার কারণে মেধা পূর্ণ ভাবে আত্মভাব মুক্ত হতে পারেনা। কিন্তু মাতার মার্গদর্শনকে যদি একবার অনুধাবন করতে শিখে যায় সে, সেই মুহূর্তে সে মেধাধারী জীব, মেধা অর্থাৎ ভ্রূণ থেকে শিশু অর্থাৎ চেতনা হয়ে ওঠার দিকে যাত্রা শুরু করে। আর একবার চেতনা হয়ে যেতে পারলে, পূর্ণভাবে আত্মভাব থেকে মুক্ত হয়ে ওঠে সে, আর মাতার মধ্যে চিরতরে লীন হয়ে যান, কারণ চেতনা যে স্বয়ং ভাস্মর, স্বয়ং মাতা”।
“অর্থাৎ, আত্মের জন্ম ও মৃত্যু নেই, এটি ভ্রম, তবে এই কথা বলা হয়, কারণ যাকে তোমরা জন্ম ও মৃত্যু বলো, তা আত্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তোমরা দেহধারণ করে, সেই দেহে মেধাকে অনুভবন করার কর্মসূচিকে জন্ম বলো, আর সেই দেহের থেকে মেধার বিদায়কে মৃত্যু বলো। কিন্তু এই জন্মের কালেই, আর এই মৃত্যুর কালেও, উভয়কালেই মেধার সাথে ত্রিমূর্তি যুক্ত থেকে যায়, মেধার নাশ করতে, বা মেধাকে বন্দী করতে বা মেধাকে বশ করতে। আর এই আমিত্বের কারণেই, এই আমিত্বের ভাবের কারণেই, নিজস্ব অস্তিত্বকে মান্যতা প্রদান করে মেধা”।
“যেই মুহূর্তে, মেধা চেতনায় বিস্তার লাভ করে, সেই মুহূর্তে সেই জীব, যার মেধা চেতনার বিস্তার লাভ করেছে, তার ধারণা হয়ে যায় যে আত্মের কনো অস্তিত্বই নেই, আত্ম একটি ভ্রমভাব, আছে কেবল ও কেবল মাত্র ব্রহ্ম, কেবল মাত্র শূন্য, কেবল মাত্র আল্লাহ। সেই মুহূর্তে সে, আর জন্ম মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকেনা, অর্থাৎ জন্মমৃত্যুর বন্ধন থেকে সে মুক্ত হয়ে গিয়ে, আত্মের বিনাশ ঘটিয়ে, আত্মভাবের নাশ করে, শূন্যে লীন হয়ে গিয়ে পূর্ণভাবে ব্রহ্ম হয়ে যান। আর এই ঘটনাকে আপনারা বলেন মোক্ষ”।
উপস্থিত সকলে এবার একত্রিত হয়ে বললেন, “ধন্যবাদ ভাই। আর তোমাকে অপেক্ষা করাবো না। যাও তুমি সাধপালের বিনাশ ঘটাও। তুমি নিজের মেধাকে চেতনায় বিস্তৃত করে নিয়েও সমস্ত মেধার বিস্তারের জন্য সচেতন। এটিই প্রমাণ করে যে তুমি জগন্মাতার সন্তান, যাকে তিনি নিজের মমতা দ্বারা সিঞ্চন করেছেন। আর আমরা এও বুঝে গেছি যে, মানব যোনি বা কনো একটি যোনি গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো মেধাকে চেতনায় বিস্তৃত করা। যদি মানবের নাশই সেই বিস্তারের উপায়কে প্রশস্ত করে, তবে সেটিই সঠিক। আর কনো দ্বন্ধ নেই আমাদের মধ্যে। কেবল তোমার বিজয়কে দেখে, আমরা এই লোক থেকে মুক্ত হয়ে কনো না কনো যোনির দেহে প্রবেশ করে আমাদের মেধাকে বিস্তৃত করার প্রয়াস করে যাবো আমরা”।
মৃদু হাস্য প্রদান করে, এবার চলে গেলেন সাধপালের দ্বিতীয় স্তরে অর্থাৎ যন্ত্রের স্তরে। এই স্তর হলো স্থূল স্তর, আর তাই, মৃষু প্রবেশ করলেন সেখানে স্থূল রূপেই। সাধপালকে রমনাথের নির্দেশ অনুসারে, এবং সাধপালের সেখানে সমস্ত যন্ত্র কারিগরদেরকে দেওয়া নির্দেশ অনুসারে, যেই মনুষ্যই সেখানে প্রবেশ করবে, তাকে যন্ত্রের দাস করে দেওয়া হবে। তাই মৃষুর সাথেও একই ব্যবহার করা হয়। তবে মৃষুর কৌশল অনির্বচনীয়। কারিগররা বুঝতেও পারলেন না, কখন মৃষু তাঁদের যন্ত্র ব্যবহার করে, তাঁদেরই বিরোধিতা করে দিলো।
সমস্ত যন্ত্র ব্যবহার করলেন মৃষু, কিন্তু মাতা শ্বেতাকে স্মরণ রেখে সর্বক্ষণ সেই সমস্ত যন্ত্রের মধ্যে স্থাপিত রাখলেন, সমাজকে সত্য বলার কলাকে, সমাজকে মিথ্যা ও ভ্রম ধরিয়ে দেবার কলাকে, আর আগামী দিনের জগতনির্মাণের সুত্রকে। আর এই তিনকে ধারণ করে রেখে, মৃষু সমস্ত যন্ত্রের ব্যবহার করেই মনুষ্যজগতকে মহাসত্যের বার্তা দেওয়া শুরু করে দিলেন।
কাকপক্ষী টের পেলো না মৃষুর এই কর্মসূচির। সাধপাল জানতেও পারলো না, মৃষুর অনুপ্রবেশের। মৃষু যে তন্ত্রলোককে অতিক্রম করে যন্ত্রলোকে আধিপত্য স্থাপন করে বসে রয়েছেন ইতিমধ্যে, সেই সম্বন্ধে সাধপালের ধারণাও ছিলনা। কিন্তু যিনি এই সমস্ত যন্ত্রকারিগরের মধ্যে, তন্ত্র পঞ্চভূতের সূক্ষ্মরূপদের মধ্যে আত্ম রূপে বিরাজমান, সেই রমনাথ সমস্ত কিছু জেনে, ছুটে এলেন সাধপালকে সতর্ক করার জন্য।
মৃষুও জানতেন যে রমনাথ অবশ্যই আসবেন। তবে মৃষু যে এক ভয়ানক যোদ্ধা! সে শুধু সম্যক একাকী যুদ্ধে অপরাজিত নন, তিনি অপরাজিত যোদ্ধা নির্মাণ করতেও সিদ্ধহস্ত। যন্ত্রকে ব্যবহার করে এতকালের মধ্যে মৃষু ইতিমধ্যেই সেই বাহিনী নির্মাণ করে নিয়েছিলেন যারা রমনাথকে উপেক্ষা করবেন, যারা রমনাথকে শয়তান রূপে চিহ্নিত করে নেবেন।
তাই রমনাথের উদ্দেশ্য সফল হলো না। হ্যাঁ রমনাথ আসতে, যন্ত্র কারিগররা সচেতন হয়ে গেলেন আর জেনে গেলেন যে এতকাল তাঁদের মধ্যে মৃষু অবস্থান করে, যন্ত্রলোকের বিনাশকে যন্ত্রদ্বারাই নিশ্চয় করছিলেন। তবে, যন্ত্রলোকের বিনাশের উদ্দেশ্যে, মৃষু যে ৭টি মহারথী আর ৬৪টি রথী নির্মাণ করে নিয়েছেন ইতিমধ্যেই, তার টেরও পায়নি তারা। আর তাই রমানাথ আসতে, যেখানে সমস্ত যন্ত্রকারিগররা নতমস্তক হলেন, সেখানে মৃষু স্বয়ং ও তাঁর ৭ সেনাপতি তথা ৬৪ রথী ঘিরে ধরলেন রমনাথকে।
রমনাথ ক্রোধ ভোরে হুংকার ছাড়লেন, “আমার পথ ছাড়ো মৃষু, খুব বড় ভুল করছো তুমি। ভুলে যাচ্ছ যে, আমি এখনও ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি”।
মৃষু মৃদু হাস্য প্রদান করে বললেন, “ঠিক ঠিক, সেই কথা তো ভুলেই গেছিলাম আমি! … তবে কি জানেন তো, আমার প্রিয় পিতা? আপনিও একটি কথা ভুলে গেছেন। জানেন কি সেই কথা কি?”
রমনাথ উগ্র হয়ে বললেন, “কি সেই কথা?”
মৃষু পুনরায় হাস্য প্রদান করে বললেন, “এই যে, সাধপালকে আমার হাতে মৃত্যুর বরদান প্রদান করে, আপনিই নিয়তির খাতায় লিখে দিয়েছেন যে, আমার হাতে সাধপালের মৃত্যু হবে। … এটাই ভুলে গেছেন, কারণ ভুলে না গেলে, নিয়তিকে খণ্ডন করার উদ্দেশ্য নিয়ে, আপনি এখানে আসতেনই না। অর্থাৎ, আমি আপনার বিরোধিতা করার জন্য হয়তো পূর্বের মত আবারও একটি অভিশাপের সম্মুখীন হবো। কিন্তু হে মহানায়ক রমনাথ, হে পরমাত্ম, আপনি তো স্বয়ং নিয়তির কাছে দোষ করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই। আর তাই আপনি নিয়তির দণ্ড প্রাপ্তির জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। জানেন তো আপনি? … কি জানেন না? বিধাতাও নিয়তির কাছে দাস মাত্র! জানেন তো? ব্যাস, আর তো বেশি কিছু বলারই প্রয়োজন নেই আমার”।
রমনাথ ভয়ঙ্কর উগ্র হয়ে উঠে বললেন, “তুই জানিস না মৃষু, তুই কাকে এই সমস্ত কথা বলছিস। আমি হলাম পরমাত্ম, স্বয়ং বিধাতা। মুহূর্তের মধ্যে তোকে ভস্ম করে দেব”।
মৃষু হাস্যবশে বললেন, “আচ্ছা তাই নাকি? তাহলে করি হয়ে থেকে অনন্যকে কেন করলেন না ভস্ম? … আমি জানি আপনি কে। তবে মুখে নয়, আপনার আক্রমণ তো আমি বহু দেহে ভোগ করে এসেছি। কিন্তু সমস্তটাই ছিল পরোক্ষ আক্রমণ। মানে? সরাসরি আপনি আসেন নি আক্রমণ করতে। … পরিচয়টা সকলকে দিয়ে দিই, ইনি আমার পিতা। … আর পূর্বের ঘটনাবলির সম্বন্ধে বলেও রাখি সকলকে। ইনি আমার সমস্ত জন্মে, এমনকি জন্মের আগেও আমার বিনাশ করতে ব্যকুল ছিলেন। তবে কেউ জানতে পারেনি তাঁর এই কুকীর্তির সম্বন্ধে, কারণ ইনি আড়াল থেকে আক্রমণ করতেই ভালো বাসেন। তবে এক্ষণে, তিনি প্রত্যক্ষ ভাবে নিজের পুত্রকে আক্রমণ করবেন। সকলে উনার পথ ছেড়ে দাও, আর উনাকে আক্রমণ করতে দাও”।
সকলে সরে গেলে, রমনাথ ভয়ানক বীভৎস রূপ ধারণ করে, এক ব্রহ্মাণ্ড বিনাশী অগ্নির সঞ্চার করে তাকে মৃষুর দিকে ঠেলে দিলেন। মৃষু হাস্য বশে সম্পূর্ণ সেই অগ্নিকে ভক্ষণ করে যেন তৃপ্তি লাভ করেছেন, সেই সুরে বললেন, “ব্যাস এটুকুই? আরে আপনি তো জানেন, হে পরমাত্ম যে, আপনারই উর্জ্জা আমার মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে। তাহলে আপনার উর্জ্জা আমার বিনাশ কি করে করবে? … যা আপনার নয়, তেমন কিছু ব্যবহার করুন”।
রমনাথ উগ্র ভাবে এবার নিজের দুই হস্তের একটিতে কোকিলা আর অন্যটিতে দুধাস্ত্র ধারণ করে, দুটি একত্রে ক্ষেপণ করে বললেন, “নে মূর্খ, এতই যখন মরার সখ, তখন নে মর। এর আগে একাধারে কেউই দুধাস্ত্র আর কোকিলাস্ত্রকে প্রয়োগ হতে দেখেই নি”।
মৃষু সেই আঘাতে প্রায় গজ ১০এক পিছিয়ে গেলেন। তাঁর সর্বাঙ্গ স্বেদে ভোরে উঠলো। মাতা সর্বম্বা এই আক্রমণের অনুধাবন করে ভয়ঙ্কর ভাবে ক্রোধিত হয়ে উঠে হীরাকয়লার দিকে ছুটে গেলেন। রমনাথ সেই অনুভব করে কিছুটা বিচলিতও হলেন, কারণ দেবী এবার তাঁর নিয়ন্ত্রণের সমস্ত রেখা পার করে ব্রহ্মময়ীর অবস্থায় উন্নীত হতে চলেছেন।
অন্যদিকে, মৃষু হাফাতে হাফাতে বললেন, “কি জানেন তো রমমাথ! আপনি হলেন পরমাত্ম, আপনার থেকেই বাকি ত্রিমূর্তির দুই মূর্তির বিকাশ হয়েছে। তাই আপনার উর্জ্জার মধ্যে তাঁদেরও উর্জ্জা মিলিতই থাকে। হ্যাঁ, পূর্ণ উর্জ্জা দিয়ে আঘাত করেছিলেন, তাই আঘাত তো ভালোই পেয়েছি। আর এও বুঝে গেছি যে, এর পরের আক্রমণ আর সহ্য করতে পারবো না। আর সত্যি বলতে প্রয়োজনও নেই। সন্তান নিজের পিতাকে প্রথম আক্রমণ করবে না, না প্রত্যক্ষ ভাবে, আর না পরোক্ষ ভাবে। আর আপনি তো দুটি আঘাত করেই দিয়েছেন প্রত্যক্ষ ভাবে। তাই আর অপেক্ষা করার প্রয়োজনও নেই”।
এতবলে, নিজের অন্তর থেকে ত্রিমূর্তির শক্তিকে মুক্ত করলেন, আর সেই সমস্ত শক্তিকে কলা, শ্রী ও চেতনা অর্থাৎ প্রকৃতিদ্বারা বেষ্টন করে, মুক্ত করলেন রমনাথের উদ্দেশ্যে। এই তিন রশি-রূপ অস্ত্র ক্রমশ রমনাথকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিলে, মৃষু হেসে বললেন, “কি জানেন তো পরমাত্ম রমনাথ? আমার মাতা হলেন পরম সত্য। কিন্তু এই ব্রহ্মাণ্ড যে পরমভ্রম। তাই এই ভ্রমবিস্তারক পরমাত্মের থেকে ভ্রমশক্তি লাভ না করলে, এই ভ্রমবন্ধন, যা আপনাকে এখন বেঁধে রেখেছে, তার নির্মাণ করা যেতনা। তাই আপনার থেকে আগে ত্রিমূর্তির প্রকাশ করা ভ্রমকে গ্রহণ করে নিলাম। অতঃপরে নিজের মাতার সত্যতাদ্বারা সেই ভ্রমদের বন্ধনে আবদ্ধ করে আপনার উদ্দেশ্যে তা মুক্ত করলাম”।
“হ্যাঁ, আপনি আপনার ওই দুই সখাকে, মানে পীতাম্বর আর শ্বেতাম্বরকেও ডেকে নিতে পারেন। বন্ধন তারাও খুলতে পারবেনা। আমি ফিরে আসি আগে সাধপালের দমন করে। অতঃপরে আপনার বন্ধন খুলে, ওই যে অভিশাপ দেবেন, সেটা নিয়ে নেব আমি। ঠিক আছে? এখন আসি আমি?”
এত বলে, মৃষু নিজের সমস্ত দলকে নিয়ে চলে গেলেন মন্ত্রলোকে। তবে সেখানের কার্যক্রম বড়ই বিচিত্র। এটি কারণ লোক। এখানে মৃষু কারণ অবস্থাতেই প্রবেশ করলেন, আর নিজের দলকে দ্বারে রেখে দিলেন, কারণ কারণ লোকে তারা কারণ ভাবে প্রবেশ করতে পারবেনা। আর কারণ অবস্থায় প্রবেশ না করতে পারলে, তাদের যেকেউ ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম।
সেখানে প্রবেশ করে দেখলেন যে অজস্র যক্ষের প্রেত সেখানে উপস্থিত। তারা সকলে মিলে মন্ত্র উচ্চারণের সাথে সাথে, সেই মন্ত্রের নির্দিষ্ট ফল প্রদান করছে, যার কারণে পৃথিবীতে মানুষ সমস্ত প্রকার হিংসা ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। মৃষুকে দেখা মাত্রেই সমস্ত যক্ষপ্রেতরা মৃষুর দিকে এগিয়ে আসতে, মৃষু হেসে বললেন, “এই মাত্র রমনাথকে বন্দী করে এলাম আমি যন্ত্রলোক থেকে”।
শুধু মাত্র এই কথাটিই যথেষ্ট ছিল যক্ষপ্রেতদের আগ্রাসনকে স্থগিত করে দেবার জন্য। মৃষুও জানে যে, এই একটি কথাতেই কাজ হবে। তাই শুধুই এই কথাটি বললেন। আর তারপর বললেন, “প্রেত হয়ে আর কতদিন যক্ষপুরীকে সামলাবেন আপানরা? মনুষ্যযোনি যে বিনাশের পথে হাঁটছে! … শীঘ্রই বিনাশ হয়ে যাবে তাদের, আর নবউন্নত যোনির নির্মাণও শীঘ্রই হতে চলেছে”।
“জানি, আপনারা ততটাই ভবিষ্যৎ দেখতে সক্ষম, যতটা আপনাদের ভগবান, অর্থাৎ পরমাত্ম আপনাদের দেখান। কিন্তু জানেন নিশ্চয়ই? মানে, এতকাল ভবিষ্যৎ নির্মাণ নিয়ে কাজ করেছেন, তো নিশ্চয়ই জানেন যে, নিয়তির খেলাকে স্বয়ং পরমাত্মও আগে থেকে জানতে পারেনা! কি জানেন তো?”
“আমি হলাম মৃষু, স্বয়ং নিয়তি নিজের থেকে আমার নির্মাণ করেছিলেন, তাঁর কাজের সারথি করে নেবার জন্য। তাই আমি সেই কথা জানি, যেই কথা আপনারা কেউ জানেন না। কিন্তু কথা এই যে, আপনারা তো জানেন যে, শ্রেষ্ঠ যোনিতে জন্ম নিতে গেলে প্রকৃতির প্রতি সমর্পণ থাকতে হয়, আর থাকতে হয় সুকর্মের ভাণ্ডার। দীর্ঘকাল প্রেত হয়ে থাকার জন্য, সেই ভাণ্ডার তো আপনাদের নিঃশেষ হয়ে গেছে। তা কি করে সেই ভাণ্ডারে যাত্রা করবেন?”
যক্ষপ্রেতদের প্রধান দেবী হর্ষিতা সম্মুখে এসে বললেন, “আমরা যক্ষস্ত্রী, সংখ্যায় ১০৮। আমরা জগতের শ্রেষ্ঠ ১০৮ রূপসী। আমাদের দেখে তোমার প্রলোভন জাগছে না মৃষু? জগন্মাতার পুত্র হও আর যারই পুত্র হও, পুরুষ তো বটে তুমি? তা শ্রেষ্ঠ স্ত্রীরা তোমার সাথে সঙ্গমে তৎপর। আর তোমার সাথে সঙ্গম হলে, আমরা তো এই যক্ষপ্রেত থেকে মুক্ত হয়ে গিয়ে সেই নবযোনিতে জন্ম নিতে পারবো, কি তাই তো?”
মৃষু হেসে বললেন, “আপনারা বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন, আমার মায়ের প্রাপ্ত অভিশাপের কথা। আমার মায়ের মধ্যে ও তাঁর থেকে জাত প্রত্যক্ষ সন্তানের মধ্যে কামনার লেশ মাত্র থাকতে পারবেনা। … আমি তাঁর থেকে প্রত্যক্ষ ভাবে জাত সন্তান। তাই আমার মধ্যেও আমার মায়ের মতই কামনার বাস নেই। কি করি বলো?”
হর্ষিতা উগ্র ভাবে বললেন, “তাহলে তোমাকে মরতে হবে। এই আমাদের বিধান”।
মৃষু পুনরায় হেসে বললেন, “সমস্ত ভূত আমার মাতার সেবক। আর মাতার সেবক হবার কারণে, তারা আমারও সঙ্গী। তাই একদণ্ডের মধ্যে তোমাদের এই কারণ দেহ থেকে স্থূল দেহে নিয়ে আসতে পারি। হ্যাঁ অবশ্যই কনো না কনো হিংস্র জন্তু হবে তোমরা, কারণ তোমাদের স্বভাবই তা। … তারপর কি তোমরা একদণ্ডও আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে?”
মৃষু ভুল ভাবছিলেন যে হর্ষিতাই হলেন এঁদের প্রধান। প্রধান এবার সম্মুখে এসে বললেন, “আমি সুগন্ধা। আমি এঁদের সকলের প্রধান। জগন্মাতার সন্তানকে আমার ও সকল যক্ষস্ত্রীর প্রণাম। মৃষু, পুত্র তুমি তাঁর, কিন্তু তুমিও জানো, তুমি সমস্ত স্ত্রীর কাছে পুত্রবৎ। প্রতিটি স্ত্রী তোমাকে স্নেহ করে, কারণ তুমি তাদের সকলকে অপার সম্মান প্রদান করো। কনো স্ত্রীকে তুমি শত্রুর আসন প্রদানই করো না। তাই কনো প্রকার শত্রু ভাব না রেখে হাতজোর করে বলছি, আমাদের কথা শ্রবণ করো। আমাদের এই পরিণতির কথা তো জানো মৃষু। আমাদের কথা তো না বলা হয়, আর না বলতে দেওয়া হয়। … আর আমাদের কথা না শুনেই, আমাদেরকে সুন্দরী স্ত্রীদেহধারী হিংস্র পশুবৎ ধারণা করা হয়”।
“মৃষু, জানি না নাথ বলবো নাকি পুত্র বলবো। জানি তোমাকে পুত্র বললে, তোমার অধিক আনন্দ হয়, কারণ পুত্র না বললেও তো তুমি মাতার আসনই প্রদান করো প্রতিটি স্ত্রীকে। তাই পুত্র বলেই অনুরধ করছি। পুত্র, তোমার এই মাতাদের সাথে হতে থাকা অন্যায়ের কথা একবার অন্তত শ্রবণ করো। পুত্র, আমার বিশ্বাস, তুমি সমস্ত কথা জানলে নিশ্চিত ভাবে জেনে যাবে যে, আমরা এখানে বন্দী, আবদ্ধ। আর সত্য বলতে ত্রিমূর্তি আমাদের আবদ্ধ করে রেখেছে, সাধপাল তো তাদের এক সেবক মাত্র”।
মৃষু হাসি মুখে বললেন, “নিশ্চয়ই শুনবো মা। কেন শুনবো না। সন্তানের প্রথম ধর্মই হলো মায়ের বেদনার কারণ অনুধাবন করা, আর দ্বিতীয় কর্তব্য হলো মাতার বেদনার অন্ত করা। বলো আমাকে সুগন্ধা”।
দেবী সুগন্ধা মৃদু হেসে বললেন, “মৃষু, সাধপালের কাছে ততক্ষণ যাবার প্রয়াসও করো না, যতক্ষণ না মাতা সর্বাম্বা হীরাকে মোক্ষদান করে মুক্ত না হন। … রমনাথের বন্ধন খোলার মুহূর্তে, সে তোমাকে চূড়ান্ত ভাবে বন্ধনে আবদ্ধ করে দেবে, আর সেই বন্ধন থেকে মুক্ত করার সামর্থ্য একমাত্র তোমার মাতার আছে। তাঁর ছাড়া ত্রিভুবনের কারুর সামর্থ্য নেই সেই বন্ধন থেকে কারুকে মুক্ত করার। আর এমন ভেবো না যে, তোমার স্বার্থের চিন্তা করে এই কথা বলছি। পুত্র, যদি তোমাকে ওরা বন্ধনে আবদ্ধ করে নেয়, তবে সেই নবযোনিও আসতে পারবেনা, আর তার থেকেও বড় কথা, জগতের প্রতিটি স্ত্রীর জন্য সংকট হয়ে উপস্থিত হয়ে যাবে পরমাত্ম”।
“তাই আমার অনুরধ যে, তুমি আমাদের সঙ্গে এখানে নিরাপদে অবস্থান করো ততক্ষণ আর তোমার মাতার লীলাকে প্রত্যক্ষ করো আমাদের দৃষ্টি দিয়ে। আমরা ততক্ষণে তোমাকে সেই সমস্ত কথাও বলবো, যা আমাদের সাথে অতীতে হয়েছে। তা শুনে তুমি আমাদের প্রতিকার করো, আর আমাদেরকে সুস্থ জীবন প্রদান করো। না আমাদের কনো অসুবিধা নেই, যদি আমাদেরকে কনো হিংস্র যোনির মধ্যে অবস্থান করতে বলো। আমার বিশ্বাস, জগন্মাতার সন্তান আমাদের সাথে কনো অন্যায় হতে দেবেন না। যদি কনো ভিন্ন যোনিতেও অবস্থান করতে বলেন তিনি, তাও নিশ্চিত ভাবে আমাদের হিতের কারণেই হবে”।
মৃষু হেসে বললেন, “বেশ, আপনি আপনার কথা শুরু করুন। আমি তা শ্রবণ করার জন্য উদগ্রীব। নিপীড়িতকে নিপীড়ন প্রদান করার কনো উদ্দেশ্য নেই আমার। আর সত্য বলতে, সকলেই আমার মাতার সন্তান, কারণ সকলেই মেধাকে ধারণ করে উপস্থিত রয়েছেন। তাই আমি তো এই চাই যে, সকলে আমার মাতার কাছেই যাত্রা করুন আর মুক্ত হয়ে যান নিজেদের আত্মবোধ থেকে”।
দেবী সুগন্ধা বললেন, “সত্য অর্থে পুত্র তুমি বাবা। ঠিক যেমন পুত্রের মায়ের সুন্দর দেহের প্রতি কনো আকর্ষণ থাকেনা, শুধুই মায়ের বেদনা, মায়ের মমতার প্রতি আকর্ষণ থাকে, তোমারও ঠিক তাই। আমরা এই প্রথম পুরুষের সাখ্যাত করলাম, যে আমাদের মাতা বলতে দুইবার ভাবেনি। … রমনাথ, পীতাম্বর, শ্বেতাম্বর, সাধপাল বা নভও নেই এই তালিকায়। প্রথমে, তোমার মায়ের কীর্তি দেখো পুত্র। অনেক কিছু বোঝার আছে সেই কীর্তি থেকে। তোমার এই দল, যারা দ্বারে অবস্থান করছে, তাদেরকেও ডেকে নাও, কারণ তাদের সকলের ভাগ্যকে তুমি এই কীর্তির ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে চলেছ”।
“তোমার মাতা এমন কিছু করতে চলেছেন এখন, যা কেউই কল্পনা করতে পারছেনা। আমরা ছাড়ো, তুমিও কল্পনা করতে পারছো না। আর আগামীদিনে তিনি যা করবেন, তারই কর্মচিন্তা অনুসারে তিনি তা করবেন। তাই আগামীদিনে তুমি কি ভাবে তোমার দলকে চালনা করবে, কার ভিত্তিতে নবযোনি প্রকাশ্যে আসবে, তা অনুধাবন করার জন্য, তোমার মাতার এরই সমস্ত কীর্তি দেখা আবশ্যক। তাই পূর্বে তা দেখো”।
