৫। মৃষু কাণ্ড
মাতা সর্বাম্বার এই সমস্ত কথা সম্বন্ধে মৃষুর কনো ধারণাই রইলনা। সে ক্রমশ নিজের আমিত্বকে পূর্ণ পূর্ণ ভাবে হারাতে থাকলো, আর মাতা সর্বাম্বার কাছে পূর্ণ পূর্ণ ভাবে সমর্পণ করতে থাকলো। এক এক করে, ছয়বার কৃতান্ত স্থাপন করে যখন নিজের সম্যক কর্তাভাবকে হারিয়ে ফেলল সে, তখন সে সপ্তম ও অন্তিম বার কৃতান্ত রচনা করে। আর এই রচনার কালে, সে সম্যক ভাবে নিজের মাতাকে অনুভব করে একমাত্র কর্তা বেশে।
স্পষ্ট অনুভব করে সে যে, জগতের নির্মাতা যতই পরমাত্ম হোক, প্রকৃতিই একমাত্র কর্তা। আত্মের প্রভাবে যে যতখুশী চিন্তা করতে সক্ষম, কল্পনা করতে সক্ষম আর ইচ্ছা করতে সক্ষম হোক, কিন্তু সেই কল্পনাই পূর্ণ হবে, যাকে প্রকৃতি সম্মতি দেবে। সেই ইচ্ছাই পূর্ণ হবে যাকে প্রকৃতি সম্মতি দেবে। আর প্রকৃতি সেই ইচ্ছাতেই সম্মতি দেন যা তাঁর বহু সন্তানকে একত্রে যুক্ত করে, বা যা সত্যকে স্পর্শ করে।
এই অনুভব মৃষুর হৃদয় নিজের মাকে সর্বোৎকৃষ্ট আসন প্রদান করে দেয়, আর সাথে সাথে মায়ের মমতাকে আরো ভালো ভাবে প্রত্যক্ষ করিয়ে দেয়। স্বয়ং ব্রহ্ম হয়েও, সমস্ত ঈশ্বরত্ব সম্ভোগের অধিকারকে ত্যাগ করে, তিনি শুধুই মা। শুধুই মাতৃত্ব ধারণ করে মমতার প্রবাহধারা তিনি। এত বড় ত্যাগের পর, আত্ম যার নিজের অস্তিত্বও এক আপেক্ষিকতার মধ্যে স্থিত তার নিজেকে ভগবান বলে দাবি করার ব্যকুলতার কারণে দিবারাত্র তাঁর মায়ের মমতার হত্যা করার প্রয়াসকে নিজের অন্তরে প্রত্যক্ষ করলেন মৃষু।
দেখলেন আদিকাল থেকে তাঁর মায়ের সাথে হয়ে আসা নিদারুণ ষড়যন্ত্রকে। যেই ষড়যন্ত্রকে তাঁর মা এক মুহূর্তের মধ্যে নাশ করে দিতে পারে, কিন্তু কেবলই মাতৃত্বকে ধারণ করে, সন্তানের চিন্তাতে নিজেকে আবদ্ধ রাখার কারণে তা করেন নি। আর এই সমস্ত কিছু দেখে, নিজের অন্তরে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করলেন যে, মায়ের মমতার হত্যা প্রচেষ্টার দণ্ড এবার ত্রিমূর্তিকে পেতেই হবে।
একদিকে যখন মৃষু এই সংকল্পে স্থিত, তখন অন্যদিকে মাতা সর্বাম্বা এবার হীরার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। আর সেই দেখে, মুমুপুত্র হাজতকে পুনরায় জাগ্রত করলেন ত্রিমূর্তি, আর তাই এবার হাজতও নিজের দুর্গে মাতাকে বন্দী করার জন্য নির্গত হলেন।
৫.১। হাজত পর্ব
মাতা সর্বাম্বার যাত্রাপথে নির্গত হবার ভূমিকাও বড়ই অসাধারণ। আর ঠিক অন্যদিকে মৃষুর সেই যাত্রায় যোগদানও। পূর্ণ সমর্পিত মৃষু নিজেও জানেনা যে সে আগামীদিনের পূর্ণপরিকল্পনাকে কৃতান্তে লিপিবদ্ধ করে ফেলেছে। আর তা না জেনেই, এবার পূর্ণ যোদ্ধা বেশে, সমস্ত আবেগদের বিনাশ করে, সমস্ত আত্মভাবকে বিনষ্ট করে, সমস্ত কর্তাভাবকে বিনষ্ট করে নিজের অজান্তেই মাতার সাথে পূর্ণ ভাবে সংযুক্ত হতে যাত্রায় নির্গত।
সর্বাম্বার যাত্রা নিয়ে কনো প্রকার উত্তেজনা নেই ত্রিমূর্তির, কারণ তারা নিশ্চিত যে হাজতের ছলনার কাছে সর্বাম্বার সরলতা বন্দী হবেই হবে। সর্বাম্বা ঈশ্বরী হতে পারে, স্বয়ং পরাশূন্য ব্রহ্মস্বরূপা ব্রহ্মময়ী হতে পারে, কিন্তু সারল্য তাঁর কোষে কোষে। মাতৃত্ব ধারণ করে থাকার জন্য, সেই সারল্যই তাঁর ভূষণ। আর তাই সহজেই হাজত দেবীকে বন্দী করতে চলেছে, এমন স্থির বিশ্বাস ত্রিমূর্তির। কিন্তু মৃষু নিজের সমস্ত আবেগকে বিনষ্ট করে দিয়েছে। এবার তো আত্মভাবদ্বারা তাঁকে আবদ্ধও করা সম্ভব নয়।
সরল সেও, কিন্তু সে তখনই সরল, যখন সে মায়ের সম্মুখে স্থিত। এক ও একমাত্র মায়ের কাছেই সে সরল। অন্যথা সে ভয়ানক জটিল। আবেগদের বিতাড়িত করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই আবেগদের হত্যা করেনি মৃষু। এক যোদ্ধার মত সেই সমস্ত আবেগকে নিজের অস্ত্র করে রেখে দিয়েছে, যাতে তাদের প্রয়োগ সম্ভব হয় সময়ে সময়ে। আর তাই ত্রিমূর্তি মৃষুকে নিয়ে তটস্থ রইলেন।
অন্যদিকে, মাতা সর্বাম্বা যে যাত্রায় নির্গত হলেন, তা হাজতের উদ্দেশ্যে নয়, তা একমাত্র হীরার উদ্দেশ্যে, তবে গন্তব্য হীরা হলেও, সম্মুখে এসে উপস্থিত হলেন এক দল চণ্ডালিনী। চাইতে আসেনি তাঁরা, দিতে এসেছে। সঙ্গে তাঁদের কিছু উচ্ছিষ্ট সামগ্রী মাত্র। দেবী মৃত্তিকা, দেবী পাবনি, দেবী কৃত্তিকা, এবং শেষে নভরাও চণ্ডালিনীদের বিরোধ করে উঠে বললেন, “মাতাকে উচ্ছিষ্ট কি করে দাও!”
সমস্ত কিছু শুনে হতবাক হয়ে যাওয়া দেবী সর্বাম্বা নিজের দুই কানে হাত দিয়ে আঁতকে উঠে বললেন, “চুপ, সকলে চুপ!”
সকলে চুপ করে গেলে, মাতা সর্বাম্বা পুনরায় বললেন, “প্রথম এই চণ্ডালিনীদের প্রশ্ন করো যে তাঁরা কার কাছে এসেছে, ঈশ্বরীর কাছে নাকি নিজের মায়ের কাছে। প্রশ্ন করো আগে দিদি ওদের”।
দেবী পাবনি প্রশ্ন করতে, চণ্ডালিনীরা বললেন, “আমাদের আদরের মৃষু আমাদের নিজের ভ্রাতা। প্রাণের থেকেও অধিক স্নেহ করে সে আমাদের সকলকে। তাঁর মার্গদর্শনেই জেনেছি, মাতা সর্বাম্বা আমাদের নিজেদের মা। মা, আমাদের কাছে এর থেকে বেশি আহার নেই। যা এনেছি, তা আমাদের উচ্ছিষ্ট নয়, আমরা তা ভেঙে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিয়েছি মাত্র”।
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “মা আর সন্তানের সম্বন্ধ অনেক অনেক গভীর হয় পুত্রী। … সন্তান মায়ের উচ্ছিষ্ট খায়, আর মা সন্তানের। এতটাই গভীর সম্বন্ধ হয় মাতা ও সন্তানের। তাই যখন পুত্রী হয়েই এসেছ, তবে উচ্ছিষ্ট করে দাও আগে তোমাদের নিয়ে আসা আহারকে। আমি তো উচ্ছিষ্টই ভোগ করবো”।
চণ্ডালিনীদের মাথা, দেবী উমা সম্মুখে এসে বললেন, “দেবী, যা বোঝার বুঝে গেছি আমরা। আপনাকে আর ছোটো হয়ে কিছু প্রমাণ করতে হবেনা। … আমাদের অনুমতি প্রদান করুন”।
এতো বলে উমা সমস্ত চণ্ডালিনীদের নিয়ে চলে গেলে, মাতা সর্বাম্বা একস্থানে দাঁড়িয়ে কেবলই উমার পথের দিকে তাকিয়ে নেত্রের অশ্রুকে কপোল বেয়ে ঝরতে দিলেন। দেবী পাবনি সামনে এগিয়ে এসে কিছু বলতে গেলে, মাতা সর্বাম্বা একটিও শব্দ উচ্চারণ না করে, সোজাসুজি কৃত্তিকালোক ত্যাগ করে, চণ্ডালিনীদের কাছে যাত্রা করতে শুরু করলেন।
সেই দেখে দেবী মৃত্তিকা, দেবী পাবনি ও দেবী কৃত্তিকা মাতা সর্বাম্বাকে আটকাতে এলে, মাতা সর্বাম্বা তীব্র ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দ্বারা সকলকে নিক্ষেপ করে বললেন, “নিজেদের দেবী ভাবতে চাও, ভাবো তোমরা। আমি নিজেকে দেবী ভাবতে পারিনা। আমার সন্তান আমার প্রতি রুষ্ট হয়েছে। তাই এই মা তাঁর সন্তানকে মানাতে তাঁর কাছে যাবে। প্রয়োজনে সন্তানের গালমন্দও শুনবে, অভিমানও দেখবে আর যদি সন্তান অভিমানে দুচারবার আঘাতও করে, তাও সইবে। তোমরা থাকো দেবী হয়ে। এই মা তাঁর অভিমানী সন্তানের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবেনা”।
দেবী পাবনি ও নভ সম্মুখে এসে করজোড়ে বসে বললেন, “ক্ষমা মা, ক্ষমা। … আমরা আমাদের ভুল বুঝতে পেরেছি। নিজেদেরকে উচ্চ মনে করে, আমরা আমাদের ভ্রাতাভগিনীদেরকে ভ্রাতাভগিনী বলে মান্যতাই দিতে পারলাম না। কিন্তু মা, আমাদের কথা শুনুন। হাজত, কয়লা, এঁরা সকলে আপনার বিশেষ ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র করে রেখে দিয়েছে। আপনি কৃপা করে যাবেন না। আপনি অত্যন্ত সরল মা, আর প্রতিপক্ষ অত্যন্ত জটিল, অত্যন্ত ধূর্ত”।
মাতা সর্বাম্বা ক্রোধের আবেশেই বললেন, “কেউ ষড়যন্ত্র করছে বলে, মা তাঁর সন্তানের কাছে যাবেনা, হতে পারেনা তা। যদি কনো বিপদ আসে, আমার মৃষু আছে তার মায়ের জন্য সে সমস্ত কিছু করতে পারে। … সন্তান থাকতে, মায়ের চিন্তার কনো কারণ থাকতেই পারেনা। আমার সন্তানদের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। তারা তাদের মায়ের কিচ্ছু হতে দেবে না”।
দেবী পাবনি, দেবী কৃত্তিকা, দেবী মৃত্তিকা, নভ আর কনো শব্দ সন্ধান করতে পারলেন না। তাই বাধ্য হয়েই মাতা সর্বাম্বাকে আর আটকাতে পারলেন না। আর মাতা সর্বাম্বা যেন দিগ্বিদিকশূন্য। তাঁর সন্তান তাঁর প্রতি রুষ্ট। তাই, তাঁর আর কনো দিকে দৃষ্টি দেবারও প্রয়োজন মনে করছেন না।
নভ সমস্ত কিছু দেখে বুঝে, এবার মৃষুর কাছে গিয়ে বললেন, “মৃষু, মাতা সর্বাম্বা অভিমানী হয়ে নির্গত হয়ে গেছেন কৃত্তিকালোক থেকে। চণ্ডালীদের কাছে গেছেন তিনি, উদ্দেশ্য হীরার কাছে যাওয়া। কিন্তু পথে হাজত আর কয়লা রয়েছে তাঁকে বন্দী করার জন্য। কিছু করো মৃষু”।
মৃষু হেসে বললেন, “হ্যাঁ, মা তিনি। তাই যাবো অবশ্যই। তাঁর মমতার উপর আঘাত করা হয়েছে, তাই তাঁর সন্তানরা উত্তর অবশ্যই দেবে, কিন্তু ভুলে যাচ্ছেন আপনি যে, তিনি সাখ্যাত ব্রহ্ম। তিনি না চাইলে তাঁকে বন্দী করে এমন কার সামর্থ্য! আর যদি তিনি চান বন্দী হতে, তাহলে নিশ্চিতই কনো লীলার পথে রয়েছেন তিনি। তাই হে নিসাধরাজ, শান্ত হন, আর মাতার লীলায় অংশ নিন, লীলার বিরোধ করতে চেষ্টা করবেন না, কারণ প্রথমত তা আপনার সামর্থ্যের অতীত, আর দ্বিতীয়ত তাঁর লীলাই জগতের জন্য হিতকর”।
“ব্রহ্মময়ী তিনি। ভুলেও এই ভ্রমে থাকবেন না নিসাধরাজ যে, তিনি কনো ভুল করছেন। ভুল করেও তিনি ভুল করতে পারেন না। ঈশ্বরী বেশে যদিও তিনি কনো ভুল করলেও করতে পারতেন, মা বেশে তিনি কিছুতেই ভুল করতে পারেন না। তিনি মা, তাঁর সন্তানদের কনো কারণে বিপদে ফেলবেন না, আর যদি ফেলেনও তা তাঁর সন্তানদের সত্যের পথে উন্নীত করার জন্যই করেন। আপনি নিশ্চিন্তে ফিরে যান। আমি হাজতের কাছে যাত্রা করছি। আমার অন্তরে স্থিত মা, অর্থাৎ আমার চেতনা বলছে, চণ্ডালিকাদের কাছে আমার কনো প্রয়োজন নেই, বরং হাজতের কাছে আছে। তাই আমি সেখানেই যাচ্ছি”।
এত বলে মৃষুই নির্গত হয়ে গেলে, নভ ও সমস্ত নিসাধরা এক দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাতে থাকলেন। অন্যদিকে মাতা সর্বাম্বা চণ্ডালিনীদের কাছে এসে উপস্থিত হলে, চণ্ডালিনীরা চমকিতও হয়ে যান আর সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্তও। তবে দেবী উমা নির্বিকার থাকেন। খালি মাতার দিকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখেন আর অভিমান দেখিয়ে নিজের কাজ করেন।
পাহাড়ের কোলে চণ্ডালিনীদের জীবনধারণ দেখে মাতা উচাটন হয়ে ওঠেন। না রয়েছে সেখানে কনো সামগ্রী, না উদ্ভিদ, না শিকারের পশু, না কিচ্ছু। সেই দেখে মাতা চণ্ডালিনীদের প্রশ্ন করলে, তাঁরা বলেন, “যতবার নিসাধরা এখানে বর্ষণাদি প্রদান করতে আসে, ততবার ত্রিমূর্তি এসে আমাদেরকে অপমান কোরে, এখান থেকে তাদেরকে তারিয়ে দেয়। তাই এই চত্বর এমন রুক্ষ আর সামগ্রীহীন”।
মাতা সেই কথাতে গম্ভীর হয়ে গিয়ে, সেই চত্বরকে সম্পূর্ণ ভাবে সবুজের আবরণে আবৃত করে দিলেন। উমা তাও দেখলেন, কিন্তু তার তখনও মনে হতে থাকে যে, মাতা যা কিছু করছেন, তা ঈশ্বরত্বের বিস্তারের জন্যই করছেন। তাই তাঁর অভিমানপর্ব চলতেই থাকে।
মাতা সেখানে থাকতে উচ্ছিষ্ট ছাড়া আহারই করতেননা। চণ্ডালিনীদের শিশুদের জীবন বলে কিচ্ছু ছিলনা। তাই তাঁদেরকে মৃষুর ইতিহাস বলতে থাকেন, আর মৃষুর রচিত কৃতান্ত বলতে থাকেন, আর সঙ্গে সঙ্গে সংগীতাদি দ্বারা সকল শিশুদের আনন্দ দিতে থাকেন এবং তাঁদেরকে কলাগুণে ভূষিত করতে থাকেন।
মাতা যে ধরাধামের এতোটা নিকটে রয়েছেন, সেই সংবাদ হীরা নিজের ভাবকে ধারণ করেই লাভ করেছে, তাই মাতার সন্ধানে সে চণ্ডালিনীদের কাছে যাত্রা করে। আর মাতার উপর অধিকার স্থাপনের ইচ্ছা ধারণ করে কয়লাও তার সাথে যাত্রা করে, আর সমস্ত সময়ে হীরাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যস্ত থাকে কয়লা। অন্যদিকে, হীরাকয়লার এই যাত্রার কারণে অখুশী থাকেন রমনাথ আর পীতাম্বরও। তাঁদের আশঙ্কা, কয়লা জিতেশের বন্দীশালায় দেবী অম্বাকে বন্দী করে রাখার প্রয়াস করার কালে, দেবী ভয়ানক ভাবে উত্তেজিত হবেন, আর তা থেকে যেই শক্তি উৎপন্ন হবে, তা তাঁদেরকে ভবিষ্যতে সহ্য করতে হতে পারে।
কিন্তু শ্বেতাম্বর আর নিসাধরা সকলে কয়লাকে ভরসা করছে। তাই আপত্তি থাকতেও হীরাকয়লাকে প্রতিহত করতে পারলেন না রমনাথ ও পীতাম্বর। তবে সর্বক্ষণ তাঁরা সহায়তা করতে থাকলেন হাজতের, কারণ তাঁরা চান যে কয়লা নয়, হাজত দেবীকে বন্দী করুক। কারণ সেই ক্ষেত্রে এই উর্জাস্ফীতির সম্ভাবনাও থাকবেনা, আর তাই ভাবিকালে কনো বিপদের শঙ্কাও থাকবেনা।
অন্যদিকে, মাতা সর্বাম্বা আর উমার অভিমান নিতে পারলেন না। এবার সরাসরি রন্ধনরত উমার কাছে উপস্থিত হয়ে, শিশুর ন্যায় উমার স্কন্ধে নিজেকে অর্পণ করে উমার কণ্ঠদেশকে ধারণ করলেন তিনি। মাতা সর্বাম্বার স্পর্শমাত্রেই উচাটন হয়ে উঠলেন উমা। তাঁর সর্বাঙ্গে এক অতি অপ্রতিরোধ্য পুলক তাঁকে প্রায় প্রগল করে দিল। মাতা সর্বাম্বার অঙ্গের সুবাস তাঁকে মোহিত করে দিল।
অন্যদিকে মাতা বললেন, “মায়ের সঙ্গীরা ভুল করেছে মানে, সেই ভুল মায়েরই। মা না একটা ভুল করে ফেলেছে। তাবোলে কি মাকে ক্ষমা করা যায়না উমা!”
সেই কথাতে উমা ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, “না মা, এমন বলছো কেন? ভুল তো আমার হয়েছে। আমিই ভেবে নিয়েছিলাম যে, ঈশ্বরত্ব বিস্তারের জন্য তুমি আমাদের মধ্যে এসেছ”।
দেবী সর্বাম্বা বললেন, “না উমা, আমার পুত্র তোমাদেরকে বলেনি! আমি পূজা পেতে আগ্রহীই নই। আমার ভগবান হয়ে থাকতে ভালো লাগেনা, আড়ষ্টতা অনুভব করি। আমার তো আনন্দ আমার সন্তানদের সাথে একসাথে মিশে থেকে, খুনসুটি করাতে, স্নেহ করাতে, অভিমান করাতে, অভিমান ভাঙ্গাতে, একসাথে এক থালে খেতে”।
উমা এবার মাতা সর্বাম্বার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মা, শুনেছিলাম সেই কথা মৃষু বাবার মুখে, কিন্তু তা যে এতটা ভাবতে পারিনি। ভেবেছিলাম, যতই মা হোক, তিনি তো পরমেশ্বরী। ব্রহ্মময়ী তিনি। তাই কিছু তো ভেদ রাখবেই আমাদের সাথে। কিন্তু সে যে নিজের, একান্ত আপন মা, … মৃষু বাবা বলেছিল, আর এও বলেছিল যে যখন কেউ মায়ের সান্নিধ্য লাভ করে, তখনই সে বোঝে এই সত্য, এই সম্বন্ধের সত্য, তার পূর্বে শত শুনলেও ভাবতেও পারেনা যে আমাদের মা কতটা আপন, কতটা মা সে। … ঠিক বলেছিলে মৃষু বাবা। সত্যই, এখনো বিশ্বাস করতে পারছিনা। এখনও মানতে কষ্ট হচ্ছে যে, স্বয়ং ঈশ্বর যিনি, একমাত্র অস্তিত্ব যিনি, যাকে ঈশ্বর বলে দাবিই করতে হয়না কারণ তিনি ব্যতীত কেউ ঈশ্বর হতেই পারেন না, কারণ আর কারুর অস্তিত্বও নেই, তিনি এতটা ঈশ্বরত্ব থেকে বিমুখ আর এতটা মাতৃত্বসর্বস্ব!”
মাতা সর্বাম্বার নেত্রে জল। তিনি বললেন, “উমা, দেবীরা, নিসাধরা যেই আচরণ করেছে তোমাদের সাথে, আমি তার অনুমানও করতে পারিনি। আর ত্রিমূর্তি তোমাদের সাথে যা করে গেছে এতাবৎ কাল, তার ধারণাও আমার ছিলনা। তাই সমস্ত কিছু মিলে, আমি হতবাক হয়ে গেছিলাম। নিসাধদের আচরণেও হতবাক হয়েছিলাম, আর ত্রিমূর্তি তোমাদের সাথে যেই দ্বিচারিতা করে তোমাদের হৃদয়ে পূর্ব থেকেই অভিমান ভোরে রেখেছিল, যার ফলে তোমরা অতি সহজে রুষ্ট হয়ে গেছিলে, তাতেও হতবাক হয়ে গেছিলাম। … গ্লানি, বেদনা সব মিলিয়ে, আমার হৃদয় আজ ভারাক্রান্ত। উমা তুমি যদি এবারও আমাকে ক্ষমা না করো, তাহলে আমিও নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিনা!”
উমা মাতার ওষ্ঠে হাত রেখে ভ্রুকুঞ্চিত করে উৎকণ্ঠার সাথে বললেন, “জগন্মাতা ক্ষমা চাইতে পারেনা। … পরমেশ্বরী ক্ষমা চাইতে পারেন না। এমন করবেন না দেবী! এমন করলে যে আমাদের পাপ লাগবে!”
দেবী সর্বাম্বা বললেন, “জানিনা তোমরা কাকে পাপ বলো আর কাকে পুণ্য বলো, তবে আমার কাছে আমার উপর অভিমান করা নিষ্পাপ সন্তানের অভিমান ভেঙে তাকে বুকে আঁকড়ে ধরে থাকাই ধর্ম। এটিই আমার শূন্য থেকে অস্তিত্বে আসার একমাত্র কারণ”।
উমা এবার নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলো না। সরাসরি মাতা সর্বাম্বার বক্ষদেশে নিজেকে অর্পণ করে, মাতা সর্বাম্বার কটিদেশকে নিজের দুই বাহু দ্বারা আকর্ষণ করে ক্রন্দন করে উঠে বললেন, “এমন প্রেমের সাখ্যাত আমি কখনো করিনি মা। … নিজের উপর ক্রোধ জন্মাচ্ছে, তোমার উপর অভিমান করার জন্য, তোমার হৃদয়ে বেদনার সঞ্চার করার জন্য”।
মাতা সর্বাম্বা উমাকে বক্ষে জাপটে ধরে বললেন, “ধুর বোকা মেয়ে, মায়ের উপর অভিমান করবিনা তো কার উপর করবি। বেশ করেছিস রাগ করেছিস। আবার ভুল করলে এই মা, আবার করবি…”।
দেবী সর্বাম্বা ও উমার কথোপকথন হয়তো আরো বিস্তৃত হতো, কিন্তু তারই মধ্যে, হীরাকয়লা সেই স্থানে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। হীরা মাতার উর্জার আভাস পেয়ে, আর মাতার অঙ্গের সুবাস লাভ করে দূর থেকে, “মা, মা” করে লম্ফ দিয়ে চণ্ডালিনীদের আশ্রমে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু এঁরই মধ্যে কয়লা তাঁকে ধরে রেখে, তার হাতে একটি মিষ্টান্ন প্রদান করে বললেন, “মাতা উচ্ছিষ্ট ছাড়া ভোজন করেন না এখানে। তাই ইনার নাম হয়েছে উচ্ছিষ্টা দেবী। আমার এই উচ্ছিষ্ট করে দেওয়া, মন্ত্রপূত মিষ্টান্ন প্রদান করো মাতাকে”।
“ওই দেখ, এখানে হাজতও এসেছে। যেই দর্পে সে এসেছে, নিশ্চিত ভাবে রমনাথ পাঠিয়েছে তাকে। … এই মন্ত্রপূত মিষ্টান্ন দাও তোমার মাতাকে। নিশ্চিত ভাবে একসময়ে মাতার উপর এই মিষ্টান্ন ক্রিয়া করবে, আর তিনি তোমার কাছে চলে আসবেন”।
হীরা বললেন, “ভ্রাতা, ওই রমনাথ আমার মাতাকে খুব বিরক্ত করে। হাজতকেও নিশ্চয়ই সেই কারণেই পাঠিয়েছে”।
কয়লা উত্তরে বলল, “চিন্তা কেন করো হীরা। মাতা ঠিকই তোমার কাছে আসবেন। যেটা বলছি, সেটা করো। হাজত তাঁর কাছে যাবার আগে এই মন্ত্রপূত মিষ্টান্ন প্রদান করো মাতাকে। দেখবে, ঠিক মাতা তোমার কাছে ছুটে চলে আসবেন। যাও, সময় নষ্ট না করে যেমনটা বললাম, তেমনটা করো”।
হীরা এগিয়ে গিয়ে, “মাতা, মাতা” বলে ডাকতে, দেবী উমা ও মাতা সর্বাম্বার একাত্মতার মধ্যে বাঁধা সঞ্চারিত হয়। সন্তানের আকুতিপূর্ণ আহ্বান শুনে, মাতা সর্বাম্বা দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে উঠে গেলেন, আর উমা মাতার এমন অচল মাতৃত্ব দেখে আপ্লুত হতে থাকলেন। হীরাকে সম্মুখে দেখে, মাতা সর্বাম্বা মিষ্ট হেসে দুই বাহু প্রসারিত করে দিলেন পুত্রের উদ্দেশ্যে। সেই দেখে, হীরাও দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে মাতার উদ্দেশ্যে ছুটে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সেই সময়ে সম্মুখে চলে এলেন হাজত।
হাজত সম্মুখে আসতেই মাতা সর্বাম্বার মধ্যে গাম্ভীর্য ফিরে এলো, আর তিনি দুই বাহু নামিয়ে নিলেন। তাই হীরার আর মাতার কাছে গিয়ে আলিঙ্গনসুখ লাভ করা হলো না। শিশুর মতই একটি কোনে দাঁড়িয়ে, গুমরানির মত করে একবার হাজতকে দেখে, দ্বিতীয়বার মাথা নামিয়ে নেয়। আর হাজত সামনে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “মাতা, ধরাধামের উদ্দেশ্যে তুমি যাত্রা শুরু করে দিয়েছ। একবার ধরাধামে পৌঁছে গেলে আর কি তোমার সান্নিধ্য পাবো মা? দয়া করো মা। … এই অধম সন্তানকে তুমিই একসময় অক্ষয় দুর্গ নির্মাণের বরদান দিয়েছিলে। আমার অঙ্গের ধাক্কাতেই আমার দুর্গের নাশ হবে, নচেৎ হবেনা। কিন্তু সেই দুর্গ আমি তোমাকে দেখাতেই পারিনি”।
“মা, যার বরদানেই সেই দুর্গের নির্মাণ হয়েছে, যদি তাকেই সেই দুর্গ দেখাতে না পারি, তাহলে সেই দুর্গের কৃতিত্ব আর কিই বা অবশিষ্ট থাকে? … তাই মা, কৃপা করো, আর আমার সাথে দয়া করে চলো। ধরাধামে যাওয়ার আগে অন্তত একবারের জন্য তোমার বরদানের মাহাত্ম তো দেখে আসবে চলো”।
মাতা সর্বাম্বা ঈষৎ হাসলেন সেই কথাতে। তাঁর ওষ্ঠের ফাঁক থেকে দন্তও বিকশিত হলো না। দেবী উমাও দেখলেন, আর হীরাও দেখলেন। দুইজনেই বুঝলেন, “মা ডাকে ডেকেছে হাজত। তাই সারা দিতে বাধ্য তিনি। কিন্তু সেই ডাকে সারা দেবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই দেবীর”।
হীরা এই আপত্তিজনক হাস্যের নাট্য থেকে মাতাকে মুক্ত করতে, সম্মুখে এসে বললেন, “মা, এই দেখো আমার ভ্রাতা কয়লা এই মিষ্টান্ন দিয়েছে আমাকে। তুমি উচ্ছিষ্ট ছাড়া গ্রহণ করো না, তাই না! … তোমাকে তাই তো উচ্ছিষ্টা দেবী বলেছে এই শুদ্ধ চণ্ডালিনীরা। … এই দেখো আমিও তোমার জন্য উচ্ছিষ্ট ভোগ এনেছি। … আমার ভ্রাতা বলেছে, তুমি এই ভোগ গ্রহণ করলে, নিশ্চিত ভাবে আমার কাছে এসে থাকবে। … মা, আমি তোমার কাছে থাকতে চাই। তোমায় ছাড়া আমি থাকতে পারছিনা!”
মাতা হীরার থেকে মিষ্টান্ন নিয়ে নিজের ওষ্ঠের সামনে সবে ধরেছেন, সেই সময়েই হাজত হীরার উপর হাবি হয়ে এসে বললেন, “কোথায় রাখবে তোমরা দুই ভাই মাতাকে? ওই পাহাড়ের খুবরি গুহাতে! … সেখানে তো পোকামাকড়, রক্ত মাংস সমস্ত কিছুর গন্ধে টেকা দায়। পরমেশ্বরীকে সেখানে গিয়ে রাখবে! … ভুলে যেও না হীরা, মাতা হলেন প্রভু রমনাথের পত্নী। তাঁর অযত্ন হলে, তুমি কি ভেবেছ, প্রভু রমনাথ তোমাকে ছেড়ে দেবে! মাতাকে আমার সাথে যেতে দাও, মূর্খের মত নিজের কাল ডেকে এনো না”।
হীরা ভীরুপ্রকৃতির। তার উপর কেউ চোখরাঙালে সে ভিতুর মত মুখ বন্ধ করে নিজের অন্তরে অন্তরেই গোমরাতে থাকে। কিন্তু উমা নয়। হীরার এমন ভীরুভাব আর মাতার প্রতি শুদ্ধ সন্তানের ভাব দেখে, তিনি সম্মুখে এসে বললেন, “মাতা কোথায় যাবেন আর কোথায় যাবেন না, তা কি আমরা ঠিক করে দেব? … মাতা সন্তানদের স্নেহ করেন, তাই যোগ্য সন্তানের কাছে অবশ্যই যান, কিন্তু তাই বলে তিনি সন্তানদের কাছে হাততোলা হয়ে যাননি। তিনি কোথায় যাবেন, সেই সিদ্ধান্ত তিনি স্বয়ংই নিতে সক্ষম”।
মাতা সর্বাম্বা মিষ্ট হেসে মিষ্টান্ন গ্রহণ করলেন, আর হীরার উদ্দেশ্যে বললেন, “যেমন তোমার ভ্রাতা তোমাকে বলেছেন আমি ঠিকই একদিন যাবো তোমার কাছে থাকতে, তেমনই ঠিক যাবো। তবে যখন যাবো, তখন তুমিও প্রস্তুত থেকো হীরা। তোমার কাছে আজও আমার সাথে থাকার অর্থ পরিষ্কার নয়। সেদিন যেন তা পরিষ্কার থাকে পুত্র। নিজের ধারণাকে তার মধ্যে পরিষ্কার করে নাও। তুমি যত শীঘ্র তা পরিষ্কার করে নেবে, তত তাড়াতাড়ি আমি তোমার কাছে যাবো। তার মধ্যে আমার কিছু কাজ আছে, তা করে আসি। ঠিক আছে?”
হীরা এইটুকু কথাতেই খুশী মনে চলে গেলে, মাতা সর্বাম্বা উমার উদ্দেশ্যে বললেন, “সামনের দিনগুলি অত্যন্ত কঠিন উমা। হয়তো আমাকে যাত্রা বদলও করতে হতে পারে। সাবধানে থেকো, আর সকলকে ভালো রেখো। উমা, দেহের প্রতি মোহ রেখো না। জানি স্ত্রী দেহ লাভ করে মমতার অনুভব পেয়ে বহুল আনন্দ লাভ করেছ উমা। কিন্তু প্রয়োজন পড়বে সামনে, যেখানে তোমাকে পুরুষ দেহ নিতে হবে, তোমাদের সকলকে নিতে হবে। এই মায়ের কাজের জন্য নিতে হবে, নবযোনির অভ্যুত্থানের পর, তার বিস্তারের জন্য নিতে হবে। তার জন্য প্রস্তুত থেকো”।
উমা একচোখ জল নিয়ে সামনে এসে বললেন, “তুমি থাকবে তো মা? মৃষুবাবা থাকবে তো সেখানে? ব্যাস আর কিচ্ছু চাইনা। … যেখানে তোমরা মা-ছেলে থাকবে, সেখানে তো এমনিই আনন্দের হাট বসবে। তোমার স্নেহ, আর তোমার স্নেহের বাখান বলতে মৃষুবাবার সবসময়ে ব্যস্ততা। … মা, এই অবস্থান থাকলে, তুমি ব্যাঘ্রের সাথে থাকতে বললে, তাই থাকবো”।
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “পাগলি মেয়ে। বেশ তাই হবে। এখন আমাকে হাজতের সাথে যেতে হবে। উদ্বিগ্ন হয়ে যাসনা পরিণতি নিয়ে। উত্থানপতন থাকেই যুদ্ধে। যেখানে তোর মৃষুবাবা আছে, জানবি যুদ্ধ না করে সে একচুলও স্থান ছাড়বে না কারুকে। তার মায়ের চরণ রাখার জায়গা থাকবেনা, সে কিছুতেই মেনে নেবে না তা। তাই নিশ্চিন্তে থাক। তবে হ্যাঁ, বারবার এই কথা বলছি কারণ মাঝে দুশ্চিন্তার কারণও জাগতে পারে। তবে জেনে রাখবি, আমি আর মৃষু, যদি কখনো আমরা দুইজনেই একত্রে পরাজিত হই, সেদিনই সমস্ত কিছুর শেষ। যদি আমাদের দুইজনের মধ্যে যেকোনো একজন অবশিষ্ট থাকে অন্যজনের ভার সামলাতে, তাহলে জানবি, আমরাই যুদ্ধে জিতছি। শুধুই দিশা পালটাচ্ছি”।
উমা নিকটে এসে মাতা সর্বাম্বাকে আলিঙ্গন করলেন। প্রাণপণে সেই আলিঙ্গনে নিজের দেহের সমস্ত ভার অর্পণ করে দিলেন মাতার উপর। চণ্ডালিকাদের শিশুকন্যারাও, এবং অন্য চণ্ডালিনীরাও মাতাকে প্রাণপণে আকর্ষণ করে আলিঙ্গন করলেন, আর এমন ভাবেই তাঁর তনুর উপর নিজেদের অর্পণ করে রাখলেন যেন মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত এই ভাবেই আলিঙ্গনে থাকবেন।
মাতা সকলকে স্নেহ প্রদান করতে থাকলেন, বিশেষ করে শিশুদের। আর শেষে হাজতের সাথে যাত্রার কালে, উমার কাছে এসে, নিজের থেকে আলিঙ্গন করলেন উমাকে। আর তা দেখে, থরথর করে কেঁপে উঠে কেঁদে উঠলেন উমাও আর এই দৃশ্যদেখা হীরাও। হীরা থরথর করে কেঁপে বলে উঠলেন, “মা! … সর্বভাবে তুমি শুধু মা। মৃষু সঠিক বলেছে। ধ্রুব সত্য বলেছে। তুমি শুধুই মা। মা ছাড়া তুমি যে কি, তা যেন তুমি নিজেই ভুলে গেছ। তুমি যেমন বলেছ, আমি পরিষ্কার করবো নিজের কাছে, অপেক্ষা করবো মা তোমার”।
হীরা এই সমস্ত কথা নিজের মনে মনে বললেও, মাতা সেই মনের কথা শ্রবণ করেই তৃপ্ত হয়ে, হীরার কাছে গিয়ে তাঁর কপোলে নিজের স্নেহ হস্ত রাখলে, হীরার দুই নেত্র থেকে অবিরাম অশ্রু নির্গত হতে থাকে। মাতা চলে গেলেন হাজতের সাথে।
অত্যন্ত ধূর্ত হাজত সরাসরি রমনাথের কথা মত কাজ করা শুরু করলেন। আতিথেয়তা দেখিয়ে দেবী সর্বাম্বাকে নিজের দুর্গের গহনে নিয়ে গিয়ে বন্দী করে রেখে দিলেন। মাতা অম্বার বরদান যে হাজতের নির্মিত দুর্গকে এক হাজতই ধ্বংস করতে পারবে, অন্য কেউ পারবে না। আর তার অনুমতি ছাড়া দুর্গের কনো বন্দী মুক্ত হতে পারবেনা। তাই মাতা সর্বাম্বা সেই বরদানকে ভঙ্গ করতেও পারলেন না।
হীরা অন্যদিকে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে কয়লাকে বললেন, “ভ্রাতা, মাতার কনো আভাস পাচ্ছিনা! এমন কেন হলো?”
কয়লা গম্ভীর হয়ে বললেন, “রমনাথ চায়না যে আমরা শক্তিশালী হই। তাই হাজতের বরদানকে কাজে লাগিয়ে মাতাকে বন্দী করে রেখেছে তোমার মাতাকে”।
হীরা নাছোড়বান্দা হয়ে বললেন, “আমি যাবো, মাতাকে মুক্ত করে আমার কাছে নিয়ে আসবো”।
কয়লা হুংকার ছেড়ে বললেন, “রমনাথের বিরোধ করো না হীরা। মাতা ঠিকই মুক্ত হবেন, তারপর তোমার আহ্বানে তিনি নিশ্চিত ভাবে আসবেন। আহ্বান করো তাঁকে। তোমার আহ্বানেই তিনি আসবেন এখানে”।
হীরা ব্যকুল হয়ে বললেন, “কিন্তু ভ্রাতা!”
কয়লা উত্তরে ধমক দিয়ে বললেন, “কনো কিন্তু নয়। যেমন বললাম তেমন করো”।
হীরা মাতাকে আবাহন করতে থাকলেন। মাতাও সেই আবাহনে অস্থির হতে থাকলেন। আর অস্থির হয়ে গিয়ে মাতা মৃষুকে আবাহন করলেন। মৃষু বুঝে গেছেন তাঁকে কি করতে হবে। সে হাজতের দুর্গের সন্ধান করা শুরু করলো।
সাধপালের কাছে উপস্থিত হলেন রমনাথ আর বললেন, “সাধপাল, মৃষুকে আটকাও। সে যদি একবার হাজতের কাছে পৌঁছে যায়, তোমার কাছে পৌঁছানো কনো বড় ব্যাপার হবেনা”।
সাধপাল হেসে বললেন, “প্রভু, ডাহুক বাহুক হীরাকয়লাকে জাগ্রত করেছে। হীরা দেবীকে আবাহন করছে, আর তাই দেবী মৃষুকে আবাহন করেছেন। মাতার আহ্বানে মৃষু যাবেনা, এতো হতে পারেনা! আপনি কেন হাজতকে এঁর মধ্যে ঢোকালেন?”
রমনাথ বললেন, “তুমি বুঝতে পারছো না সাধপাল, একবার যদি কয়লা দেবীর সংসর্গে এসে যায়, তাহলে সে এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠবে যে, তাকে ধরে রাখা আর কারুর পক্ষে সম্ভব হবেনা। তাই হাজতকে এঁর মধ্যে প্রবেশ করানো আবশ্যক ছিল”।
সাধপাল বলল, “আমি একাধিক আমার শ্রেষ্ঠ সেনাকে প্রেরণ করবো মৃষুকে আটকাতে। কিন্তু যদি তবুও মৃষু সফল হয় হাজতের কাছে পৌঁছে যেতে?” ঈষৎ হেসে, “আপনি বৃথাই চিন্তা করছেন আমাকে নিয়ে। আচ্ছা, আমি এখন প্রস্থান করছি, আপনি আমার লোকে, আমার কাছে উপস্থিত হয়ে দেখান দেখি। যদি না পারেন, তাহলে আমার একটি কামনা থাকবে আপনার কাছে”।
এতো বলে, সাধপাল অবলুপ্ত হলে, রমনাথ তাঁর কাছে পৌছাতে চান, কিন্তু তন্ত্র, মন্ত্র ও যন্ত্রের দ্বারা তিন লোক নির্মাণ করে, সেই তিনলোক দ্বারা এমন ভাবে একটি গোলকধাঁধা নির্মাণ করে রেখে দিয়েছে সাধপাল জিতেশ যে, কনো ভাবেই রমনাথ তাঁর কাছে পৌছাতে পারলেন না। বহু কাল সেই প্রয়াস করেও ব্যর্থ হবার পর, সেখানে সাধপাল স্বয়ং উপস্থিত হয়ে বললেন, “দেখলেন তো প্রভু, যেই চক্রব্যূহকে আপনিই অতিক্রম করতে পারলেন না, তাকে আপনার পুত্র, ওই নাবালক মৃষু পারবে, ভাবলেন কি করে?”
রমনাথ হেসে বললেন, “বলো কি কামনা তোমার?”
সাধপাল হেসে বললেন, “যদি সমস্ত কিছুর পরেও মৃষু আমাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়, তাহলে আপনার বিধান কি হবে সেটাই জানতে চাই। প্রভু, আমি যা কিছু করেছি, সমস্তই আপনার নির্দেশে করেছি। তাই সাধপালের নাশ মানে স্বয়ং বিধানদাতা, বিধাতার অবমাননা। তা বিধানদাতা কি তখন চুপ করেই থাকবেন?”
রমনাথ হেসে বললেন, “অবশ্যই নয়। মৃষুকে এই দেহে আর থাকতেই দেব না তখন। তার স্থূলশরীর ত্যাগই আমার বিধান হবে”।
সাধপাল হেসে বললেন, “তাতে কি আপনার শেষ রক্ষা হবে? … দেবী সর্বাম্বা পুনরায় মৃষুকে তৈরি করে নেবেন। হ্যাঁ বেশ কিছু সময় জ্ঞাপন হবে এর কারণে। এর থেকে অধিক কিছু হবেনা”।
রমনাথ প্রশ্ন করলেন, “তাহলে কি করতে বলো আমাকে তুমি?”
সাধপাল বললেন, “দেবী অম্বিকাকেই দেহান্তরে প্রেরণ করে দিন। ছল করুন, তাঁকে নিজেকেই দেহান্তরে যাবার জন্য অনুরোধ করতে দিন। সে স্মৃতিমুক্ত হলে, তাঁর স্মৃতি কে ফেরাবে?”
রমনাথ বললেন, “আর যদি কয়লার কাছে পৌঁছানোর জন্য অম্বিকাকে আর তোমার হত্যা করার জন্য মৃষুকে, দুজনকেই স্মৃতিহারা করি? তাহলে তো কেউ কারুর স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারবেনা”।
সাধপাল বললেন, “উচিত, সর্বত উচিত কথন। চলুন এবার আপনাকে আমার রাজ্য আর আমার ব্যূহ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আসি”।
সাধপাল রমনাথের কথা অনুসারে একের পর এক দূত পাঠাতে থাকলেন। তবে সেই দূতসমূহে মৃষুর বাঁধা কম হলো আর সাহায্য অধিক। যেই হাজতের দুর্গের সন্ধানই ছিলনা মৃষুর কাছে, তা সাধপালের দূতরা প্রদান করতে থাকলো মৃষুকে। মৃষুর বল, রণকৌশল আর অন্তরে স্বভাবিক যোদ্ধা স্বভাবের সামনে সাধপালের কনো দূতই অধিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। আর মৃষু সমানে এগিয়ে যেতে থাকলো হাজতের কাছে।
হাজতের কাছে পৌছাতে, হাজত প্রচণ্ড উগ্র হয়ে সম্মুখে এগিয়ে এলে মৃষু তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, “আমার মা আমাকে ডেকেছেন। আমাকে তাঁর কাছে যেতে দাও হাজত”।
হাজত উগ্র ভাবে উত্তর দিলেন, “আমার হাত থেকে রক্ষা পেলে পৌঁচে দেখাও তোমার মায়ের কাছে। এই বলে হাজত মৃষুকে আঘাত করলে, মৃষু এক সামান্য পদাঘাত করেন, আর হাজত সেই আঘাতে ছিটকে পরে যায়”।
প্রবল প্রতিহিংসা একত্রিত করে পুনরায় আঘাত করতে এলো হাজত। মৃষুও পুনরায় আঘাত করার জন্য তৎপর হয়ে যান। কিন্তু সেই ক্ষণেই মাতার কণ্ঠস্বর তাঁর কানে ভেসে ওঠে, “বাবা, একমাত্র হাজতের আঘাতেই তার দুর্গের নাশ হবে। আর দুর্গ নাশ হবার পরে, সে আমার হাতেই নিহত হবে”।
মৃষু এবার স্পষ্ট বুঝে যান যে মাতার নির্দেশ কি করতে বলে তাঁকে। তাই এবার হাজত আক্রমণ করতে এলে, মৃষু তাঁকে পাল্টা আঘাত করলেন না। উপরন্তু তাঁর আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে, তাঁর আঘাতকে দুর্গের প্রাচীরে স্থাপিত করলেন। একের পর এক বার হাজত আঘাত করতে চেষ্টা করে গেলেন, আর মৃষু নিজেকে বাঁচিয়ে সেই আঘাতে দুর্গের প্রাচীরকে দুর্বল করাতে থাকলেন।
এমন মুহুর্মুহু আক্রমণের পর, এবার হাজতের দুর্গে ফাটল দেখা দিলো। সেই ফাটল মৃষুর চোখে পরলেও, উত্তেজিত আর প্রতিহিংসায় জরাজীর্ণ হাজতের দৃষ্টিতে এলো না। তাই সে বারংবার মৃষুকে আঘাত করতে সচেষ্ট হতেই থাকলো, আর সেই আঘাতের ফলে দুর্গের ফাটল বিস্তার পেতেই থাকলো। জাগতিক ভাষায় প্রায় একটি বৎসর সেই আঘাত আর আঘাত থেকে বাঁচা আর দুর্গের ফাটল বৃদ্ধি চলতেই থাকলো। এক বৎসর পরে, সেই দুর্গ ভাঙতে শুরু করলো।
তাসের ঘরের মত করে হুরমুরিয়ে ভাঙা শুরু হলো দুর্গ। হকচকিয়ে গেল হাজত। মৃষু হেসে বলল, “তোর আঘাতেই তোর দুর্গ ভাঙতে পারতো। তাই না? এক বছর ধরে তুই দুর্গকে আঘাত করে করে ভেঙেছিস তাকে। পরিণাম তোর সামনে”।
হাজত এবার বিচলিত হয়ে গেল। এক বৎসর ব্যাপী সে যা করেছে, তার সম্পূর্ণ কথা স্মরণে এসে গেছে। আর তার থেকেও বড় কথা এই যে, তাঁর এও স্মরণে এসে গেছে যে, দুর্গের নাশের পর, স্বয়ং পরাশক্তি তাঁকে দমন করবে। … বিচলিত হয়ে সে পলায়নের প্রয়াস করা শুরু করলো।
অন্যদিকে মৃষু ব্যস্ত হয়ে উঠলো, ভেঙে পরা দুর্গের কারণে তাঁর মায়ের কনো ক্ষতি না হয়ে যায়, সেই বিষয়ে। কোন দিকে যে তাঁর মা বন্দী, সে জানেও না। তাই ধ্যানস্থ হয়ে মায়ের উর্জ্জাস্রোতকে অনুভব করতে থাকলো। উত্তর দিক থেকে সেই উর্জ্জা প্রবাহিত হচ্ছে। তাই ধ্যান থেকে মুক্ত হয়ে প্রাণপণে মৃষু উত্তরের দিকে দৌড়াতে শুরু করলো। কিন্তু অধিক দূর যেতে হলো না তাঁকে। কিছুক্ষণ এগিয়েই দেখতে পেলেন, তাঁর মা, জগজ্জননী মাতা সর্বাম্বা দুর্গের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসছেন।
পীতাম্বর সমস্ত কিছু দেখে আর্তনাদ করে উঠলেন, “অসম্ভব! … দেবীর কাছে কারুর কনো বরদানই যেন কনো বাঁধা নয়। বরদান পাওয়া আর ভাঙা যেন তাঁর কাছে লীলা! … অপ্রতিরোধ্য যেন তিনি!”
রমনাথের কাছে উপস্থিত হলেন পীতাম্বর ও শ্বেতাম্বর। করজোড়ে পীতাম্বর বললেন, “কিছু করুন প্রভু! … দেবীকে এখনই না আটকালে, খুব বড় বিপদ আসতে চলেছে আমাদের উপর”।
রমনাথ বললেন, “মানবকুলে অনন্যের রূপ ধরে যাও, যাতে তোমাকে পীতাম্বর বলে নয় অনন্য বলে সকলে চেনে। রমনাস্ত্রের বিজ্ঞান সর্বত্র বলো গে যাও পীতাম্বর। মানবের কাছে এমন অস্ত্র এনে দাও, যার কারণে প্রকৃতি স্বয়ং তাঁদের ধ্বংস করে দেয়। প্রকৃতি মানবকুলের বিনাশের বীজ কনো এক তুষারস্তূপে লুকিয়ে রেখেছে। সেই স্তূপের সন্ধান কেউ কনোদিনও পাবে না, যদি স্বয়ং প্রকৃতি তা কারুর কাছে খোলসা করেন। তা তিনি তখনই করবেন যখন মানুষের কাছে প্রকৃতি বিনষ্ট করার সামর্থ্যধারী রমনাস্ত্র উপস্থিত থাকবে”।
“আর শ্বেতাম্বর। তুমি মানুষের মধ্যে আত্মভাবের বিস্তার করো। আমার সহায়তা সর্বক্ষণ পাবে তুমি সেই কাজে। মানুষের উপলব্ধি করার সামর্থ্যকে ক্ষীণ করে দাও। আত্মভাবে মুখিয়ে দাও তাঁদের। ধনের প্রতি মানুষের আকর্ষণ আছে। মানবসমাজে এই ধনকে মানুষের থেকেও অধিক গুরুত্ব প্রদান করে দাও। যাতে প্রতিটি মানুষ চেয়ে বা না চেয়ে, এই ধনের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়, এমন পরিস্থিতির নির্মাণ করো”।
পীতাম্বর জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “কিন্তু প্রভু, মানুষকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে, পরাপ্রকৃতিকে কিভাবে আটকাবেন আপনি!”
রমনাথ একটি ক্রুর হাস্য প্রকাশ করে বললেন, “পীতাম্বর! তোমাকে বৃথাই সকলে ধূর্ত বলে। নিজের ধূর্ত দৃষ্টিকে একবার কাজে লাগিয়ে দেখো। দেবী এতটা আগ্রাসী কেন? কারণ মাবনব জাতি তাঁকে আশা জাগিয়েছে যে, তাঁরা তাঁদের অন্তরে অনুভবশক্তির মাধ্যমে চেতনাকে জাগ্রত করতে সক্ষম। আর চেতনার জাগরণের মানেই আত্মভাবের নাশ, অর্থাৎ আমাদের পরাজয়। তাই সেই মানবযোনিকেই নাশের দিকে এগিয়ে দাও, যার কারণে দেবী এমন ভাবে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছেন”।
পীতাম্বর বললেন, “আচ্ছা এবার বুঝেছি। যেই মানবযোনির উপর ভরসা রেখেই প্রকৃতি আমাদের সম্মুখে এগিয়ে আসছেন, আর আমাদেরকে দমন করতে এগিয়ে এসে নিজের সমস্ত সন্তানকে আমাদের থেকে অর্থাৎ আত্মভাব থেকে মুক্ত করে চেতনার বিস্তার করতে চাইছেন, সেই মানবযোনিকেই বিনষ্ট করে দেবার দিকে এগিয়ে দিতে বলছেন আপনি। এই তো?”
রমনাথ সেই কথার সম্মতি প্রদান করে মিষ্ট হাসলে, শ্বেতাম্বর উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “কিন্তু রমনাস্ত্রের বিজ্ঞানের সাথে কি সম্পর্ক এই বিনাশের। আত্মভাবের বিস্তারের কারণ না বুঝলাম। আত্মভাব বিস্তার হবার অর্থ, মানব ক্রমশ দেবীর শত্রুযোনি হয়ে উঠবে। কিন্তু রমনাস্ত্রের বিস্তার?”
রমনাথ তির্যক হাস্য প্রদান করে বললেন, “শ্বেতাম্বর, আত্মভাব বিস্তার পেলে, দেবী বিচলিত হবেন না। দেবী একের পর এক নিজের পুত্র মৃষুকে অবতরণ করাবেন মানবকুলে আর তাঁদেরকে আত্মভাবের থেকে মুক্ত হবার দিকে অগ্রসর করতে থাকবেন। স্মরণ নেই, ইসমাইলের পুত্রদের ক্ষেত্রে কি করেছিলেন দেবী! মনে নেই বৌদ্ধদের কশেওত্রে কি করেছিলেন দেবী? জৈনদের ক্ষেত্রে কি করেছিলেন তিনি! … সেই কালেও তো আত্মভাবের বিস্তার করে করে মানবকে বর্বরে পরিণত করে দিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু দেবী সমস্ত কিছু সামলে নিয়েছিলেন”।
“তাই আত্মভাবের বিস্তার করার কথা এই কারণে বলছি যে, তাঁরা রমনাস্ত্রকে ব্যবহার করার দিকে আগ্রহী হয়ে উঠবে। যন্ত্র ও মন্ত্র জগতে শীর্ষস্থান গ্রহণ করে নেবে। আর মানব এই যন্ত্র ও মন্ত্রের কাছে দাস হয়ে থেকে রমনাস্ত্র ব্যবহারের পরিস্থিতি বারংবার তুলে আনবে জগতের বুকে। … আসল আঘাতটিই হলো রমনাস্ত্রের বিস্তার। রমনাস্ত্রের কারণে ধরিত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিন্তু প্রকৃতি ধরিত্রীকে আবারও উজ্জীবিত করে দেবেন। কিন্তু রমনাস্ত্রের কারণে যে বাকি সমস্ত যোনির জীবনও বিনষ্ট হয়ে যাবে! … তারা তো প্রকৃতির সন্তান!”
“প্রকৃতি কিছুতেই তাঁর একটি সন্তানের জন্য অন্যসন্তানদের ক্ষতি হোক, সেটা মেনে নেবে না। তাই রমনাস্ত্রের বিস্তারও যেমন করতে বলছি মানবের মধ্যে এবং মানবকে প্রকৃতির সমস্ত সন্তানের নাশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বলছি, তেমনই মানবের মধ্যে আত্মভাবের বিস্তার করতে বলছি। যতই আত্মভাবের বিস্তার হবে ততই মানব সেই সমস্ত রমনাস্ত্রকে ব্যবহার করার দিকে এগিয়ে যাবে। আর ততই প্রকৃতি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে যে, মানবযোনির বিনাশ আবশ্যক তার বাকি সন্তানদের সুরক্ষিত করার জন্য”।
পীতাম্বর বললেন, “যেই মানবের মধ্যে সামর্থ্য আছে চেতনার বিস্তার করে, আত্মভাবের বিনাশ করে মোক্ষলাভ করার, আর এই সামর্থ্যের কারণেই প্রকৃতি তাঁদের প্রতি যত্নশীল হয়ে গেছেন, এবং আমাদের বিরোধিতা করতে প্রত্যক্ষে আগত হতে চাইছেন, সেই মানব যোনির বিনাশ প্রকৃতির হাতেই করিয়ে দাও। … যতই অবাধ্য হোক, যতই দুরাচারী হোক, সমস্ত কিছুর শুরুতে আর শেষে তো সত্য এই যে, সমস্ত যোনি তাঁরই সন্তান। তাই মানবযোনির নাশ নিজে হাতে করার কারণে, প্রকৃতি অনন্ত শোকে চলে যাবেন, আর আমরা পুনরায় অক্ষয় হয়ে যাবো”।
শ্বেতাম্বর বললেন, “বুঝে গেছি নাথ। আমি এখনি সমস্ত সাধদের আদেশ দিচ্ছি যাতে তারা সমস্ত মানবের মধ্যে বিস্তৃত হয়ে যায়। আর সাথে সাথে সমস্ত বিপ্রদের কাছে গিয়ে গিয়ে রমনাস্ত্রের বিজ্ঞান ব্যখ্যা করে আসছি”।
পীতাম্বর বললেন, “আচ্ছা প্রভু, যদি মানব নিজেই আত্মভাবকে বর্জন করে, চেতনার পক্ষ নেয় তো? তখন কি হবে? তখন তো আমাদের সমস্ত যোজনা ব্যর্থ হয়ে যাবে!”
রমনাথ বললেন, “যন্ত্র আর মন্ত্র শিক্ষাকেই শিক্ষা আর বাকি সমস্ত কিছু অপশিক্ষা, এই নীতি স্থাপন করো নিজের ভক্তদের দিয়ে। মানব সমাজ যেন চেতনার আভাসও না পেতে পারে, আর যিনি তা পাবেন, যিনি সেই দিকে যাবেন, তাকে সমাজ প্রগল ও উন্মাদ বলে, তাঁর বহিষ্কার করে দেয়, তার নিজের জনকজননীই যাতে তাকে বহিষ্কার করে দেয়, এই পরিস্থিতির নির্মাণ করো। চেতনার বিস্তার হতেই দেওয়া যাবে না মনুষ্যদের মধ্যে। ধনসর্বস্ব করে দাও; এমন করে দাও যাতে তারা মনে করে যে ধন উপার্জন যা যা ভাবে করা যায় তাই হলো উচিত মার্গ। শ্রীকে ধনের দেবী রূপে প্রচার করে দাও। আর সেই ধনের সাহায্যে তাদের হাতে তুলে দাও যন্ত্র”।
“শ্বেতাম্বর, নিশ্চয় করো যাতে, সেই যন্ত্রের সাহায্যে মানবযোনি আরাম ও আয়েশ করতে পারে, আর একবার আরাম আর আয়েশের সাধ পেয়ে গেলে, আর কখনোই তাঁরা নিজেদের অন্তরে চেতনার বিস্তার করতে পারবেনা। চেতনার বিস্তার করার একটিই উপায়, আর তা হলো নিঃস্বার্থ হয়ে পরিশ্রম করা, তাই তা বন্ধ করে দাও। ধন, যন্ত্র মানুষকে নিঃস্বার্থ হতে দেবেনা। আরাম আর আয়েশের ভাগ হয়না, প্রতিষ্ঠার ভাগ হয়না। যার কাছে ধন আছে সেই হবে প্রতিষ্ঠিত, যার কাছে যন্ত্র থাকবে সেই হবে শ্রেষ্ঠ মনুষ্য”।
“আর এরই সাথে মন্ত্রবলের সামর্থ্য বৃদ্ধি করো। সমস্ত রমনাস্ত্র, দুধাস্ত্র, আর কোকিলাস্ত্র যেন কেবল মাত্র মন্ত্রের বলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে, আর সেই মন্ত্রকে সঞ্চিত করে রাখবে একটি যন্ত্র। অর্থাৎ রমনাস্ত্র, কোকিলাস্ত্র আর দুধাস্ত্র ক্ষেপণ যেন মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসে। তবেই তো প্রকৃতি নিজের সমস্ত সন্তান হারানোর ভয় পাবেন, আর তবেই তো তিনি মনুষ্য যোনির নাশ করবেন”।
শ্বেতাম্বর ও পীতাম্বর বললেন, “বুঝে গেছি নাথ। আমাদের অনুমতি দিন। সমস্ত মানবকে আমরা বশ করে তবেই ছাড়বো”।
রমনাথ বললেন, “মৃষুকে বশ করার প্রয়াসও করবেনা। না তো তাকে বশ করতে পারবে, আর না তাকে বশ করা সম্ভব। অন্যদিকে তাকে বশ করতে যাবার অর্থ, তোমরা তোমাদের কাজেই বিঘ্ন ঘটাবে। যতই আত্মভাবের বিস্তার হবে, ততই চেতনার অভাব হবে, আর যতই চেতনার অভাব হবে, ততই মৃষুকে মানুষরাই প্রগল বলা শুরু করবে, আর তার থেকে দূরত্ব রাখা শুরু করে দেবে সকলে। সাথে সাথে, চেতনার অভাব মানে মাতার অভাব। মাতৃভক্ত মৃষু মাতার অভাব দেখলে, এতটাই বেদনাগ্রস্ত হয়ে যাবে যে তার আর কনো কিছু করার সামর্থ্যই থাকবেনা”।
“আর সর্বাপেক্ষা কথা এই যে, যন্ত্র ও মন্ত্র, এই দুইয়ের ধারও ধারবেনা মৃষু। প্রকৃতিপুত্র সে, তাই যন্ত্র আর মন্ত্রের থেকে সে সহস্র সহস্র যোজন দূরে থাকবে। তাই স্বতঃই সে মনুষ্যকুল থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। তাই তাঁর দিকে নজর দেবার তো কনো মানেই হয়না। সে কিছু মনুষ্যকে নিশ্চিত ভাবেই নিজের কাছে টেনে আনবে, আর তাদের অন্তরে চেতনা বিস্তারের প্রয়াস করবে, কিন্তু সেই দিকে দৃষ্টিই দিও না”।
“প্রথমত, সে ছাড়া সমস্ত মনুষ্য যদি আমিত্বের পূজারি হয়ে যায়, আত্মা ও পরমাত্মার আরাধনা করা শুরু করে দেয়, এর অর্থ সে আর কারুকে চেতনার দিকে অগ্রসর করতেই পারবেনা। আর যদি একাধজনকে অগ্রসর করেও চেতনার দিকে, প্রকৃতি যখন মানব যোনির নাশ করবেন, তখন মৃষুর সেই অনুচররাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তারই মাতার কারণে। তাই মৃষুকে নিয়ে মাথাই ঘামিও না”।
পীতাম্বর বললেন, “দেবী হাজতের দুর্গ থেকে মুক্ত হয়ে গেছেন। এবার নিশ্চিতই হাজতের নাশ হবে। অতঃপরে দেবী যাত্রা করবেন হীরার দিকে। নাথ, আমার মতে, বেশ কিছু সাধকে এই সুযোগে মাতার থেকে বরদানি শক্তি নেবার দিকে আমাদের প্রেরণ করা উচিত। এতে আপনি যে কয়লাকে নিয়ে ভয় পাচ্ছেন, সেই ভয়ের অবসান হবে। সেই বরদানপ্রাপ্ত সাধরাই তখন কয়লার বিরোধ করে, তার নাশ করবে”।
রমনাথ বললেন, “সঠিক বলেচেন পীতাম্বর। আমি স্বয়ং যাচ্ছি সেই কাজের উদ্দেশ্যে। সংহারকে আর বারুদকে প্রেরণ করছি সেই কাজে। আর ডাহুক বাহুকের যদি পতন হয় তখন ইচ্ছাধারী হবে সাধকুলের সম্রাট। তাকে তার দলবল নিয়ে প্রস্তুত হতে বলছি উগ্র দেবীর কাছে। উগ্র তো তিনি হবেনই। কয়লার মন্ত্রপুত আহার এখন ক্রিয়া করা শুরু করে দিয়েছে দেবীর মধ্যে। যত বিরোধ আসবে, যতবার পথ আটকানোর প্রয়াস করা হবে, তা বরদানের কামনাতেই হোক বা আঘাতের, তাঁর উগ্রতা বৃদ্ধি পাবে। আর সেই উগ্রতার কারণে তিনি এমন কিছু বরদান দিয়ে বসবেন, যাকে তিনি নিজেই কাটতে পারবেন না। তোমরা তোমাদের কাজে যাও, আমি সংহার, বারুদ আর ইচ্ছাধারীর কাছ থেকে আসছি”।
প্রথমেই যার কাছে গিয়ে উপস্থিত হলেন রমনাথ, তিনি হলেন সংহার। সংহার প্রণাম জানিয়ে বললেন, “প্রভু! আপনি অকস্মাৎ আমার কাছে? আমার জন্য কনো আদেশ?”
রমনাথ বললেন, “আদেশ নয়, সহায়তা। প্রদান করতে এসেছি তোমাকে এক সহায়তা। তোমার আশ ছিলো, তুমি অমর হয়ে যাবে। আমি কি বলেছিলাম তোমাকে তখন? অমরত্ব প্রদান করার জন্য যেই সামর্থ্য প্রয়োজন, তা আমার নেই। যার আছে, তিনি সাধারণত কেন কিছুতেই অমরত্বের বরদান প্রদান করেন না। তিনি হলেন, দেবী অম্বিকা। তবে এই ক্ষণে তিনি মন্ত্রপূত ভোগের কারণে অসংযত হতে চলেছেন। অর্থাৎ, যদি বুদ্ধি করে তাঁর থেকে বরদান কামনা করো, তাহলে অমরত্ব পেয়ে যেতে পারো”।
“স্মরণ রেখো, তিনি উগ্র হলেই তাঁর কাছে যাবে। তার পূর্বে নয়। আর দ্বিতীয় কথা এই যে, তাঁর কাছে অমরত্ব শব্দের উচ্চারণও করবে না। স্মরণ রাখবে তিনি উগ্র থাকবেন, অর্থাৎ পূর্ণ ভণ্ডামির অভ্যাস করেই যাবে, নচেৎ অমরত্বের বরদান তো ছেড়েই দাও, প্রাণ নিয়েও ফিরতে পারবেনা”।
সংহার বললেন, “কিন্তু কি ভাবে চাইবো অমরত্বের বরদান প্রভু?”
রমনাথ বললেন, “সম্যক যুদ্ধে তোমাকে কেউ পরাস্ত করতে পারবেনা, এমন কনো অস্ত্র বা এমন কনো বিশেষ আয়োজন কামনা করবে। আর মৃত্যু দেবীর থেকে আসবেনা, এমন কিছু বরদান”।
সংহার বললেন, “কিন্তু প্রভু, দেবী বরদান দেবেন কেন? মানলাম উগ্র তিনি, তাই ভক্ত আর ভণ্ডের মদ্যে ভেদ করতে পারবেন না। কিন্তু তাও যে তাঁর কাছে যাবে, তাকেই তিনি বরদান দেবেন সেই কালে? না তো? তাহলে আমি কি এমন করলে, তাঁর থেকে বরদান লাভ করবো?”
রমনাথ বললেন, “দেবী সঙ্গীত আর স্ত্রীসম্মান, এই দুইকে অত্যন্ত অধিক ভাবে পছন্দ করেন। বাকি তুমি যা ঠিক বুঝবে। আমি এখন আসবো। আমাকে আরো দুই স্থানে শীঘ্রই যেতে হবে। তুমি বিচার করে স্থির করে নাও, কি হবে তোমার দেবীর থেকে বরদান কামনার করার সম্পূর্ণ পরিবেশ”।
রমনাথ এরপর সেখান থেকে চলে গেলেন বারুদের কাছে আর তাঁকে একই কথা বললেন, আর বললেন যে তোমার পত্নী বারুদা ভণ্ড নন, প্রকৃত অর্থেই দেবীর প্রতি নিষ্ঠাবতী। তাঁর নিষ্ঠাকে কাজে লাগাতে পারো তুমি। তাঁকে বরদান লাভ করানো অধিক সহজ হবে, আর তাঁর বরদান দ্বারা নিজেকে আচ্ছাদিত করে দিতে পারো”।
বারুদের কাছে নিজের বার্তা দেওয়া সমাপ্ত হলে, ইচ্ছাধারীর কাছে উপস্থিত হলেন রমনাথ। ইচ্ছাধারী তখন রমনাথেরই তপস্যা করছিলেন। সম্মুখে রমনাথকে দেখে কৃতার্থ হয়ে ইচ্ছাধারী বললেন, “প্রণাম প্রভু। কবে থেকে আপনারই অপেক্ষা করছিলাম। অন্তে আপনার কৃপা করার ইচ্ছা হয়েই গেল”।
রমনাথ মাথা নেড়ে বললেন, “বৃথা সময় ব্যয় করলে এতকাল। এতোকালে তো ত্রিভুবন অধিকার করে নিতে পারতে!”
ইচ্ছাধারী হেসে বললেন, “আপনি আমাদের সাধ সকলকে নিজেদের সাথে নিজে লড়িয়ে শেষ করে দিতে চাইছেন? ত্রিভুবনের অধিকার করে তো ডাহুক বাহুক ইতিমধ্যেই বসে রয়েছে। আমিও একই কাজ করতে গেলে তো আমাকে ডাহুক বাহুক অর্থাৎ দ্বিতীয় কনো সাধই আক্রমণ করবে!”
রমনাথ হেসে বললেন, “উচিত কথা। তোমার বুদ্ধির কথা আমি শুনেছি, বাস্তবজ্ঞান সম্বন্ধেও আমি শুনেছি। আর তা প্রত্যক্ষ করলাম। কিন্তু শোনো ইচ্ছাধারী, রমনাথের থেকেও অধিক শক্তিশালী কেউ আছে। হ্যাঁ, সে নিজের শক্তির বিস্তার করে না। তার ঈশ্বরত্ব নিয়ে কনো মাথাব্যাথা নেই। তাই সে সকলের পিছনেই থাকে। কিন্তু এখন সে সামনে আসতে চাইছে। আর সামনে আসার কারণ হলো তার মাতৃত্ব”।
“ইচ্ছাধারী, তিনি কারুকে বরদান দেন না, কারণ তিনি ঈশ্বরত্বের প্রতি উদাসীন। তাই প্রচারবিমুখ তিনি। প্রচার করার জন্য যে বরদান দিতে হয়, এবং জনপ্রিয় হয়ে যেতে হয়, সেই বোধ তাঁর নেই। কিন্তু মাতৃত্বের আবাহন করছে হীরা, আর সেই মাতৃত্বকে এবং বাৎসল্যকে ব্যবহার করছে কয়লা আর তার কারণে ক্ষিপ্ত ও মহাউগ্র হয়ে উঠছেন দেবী। একসময়ে তিনি উগ্রতার সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে যাবেন। আর যে যে তখন তাঁর সহায়তা করবে, তাদের সকলকে তিনি বরদানে ভূষিত করবেন”।
“ইচ্ছাধারী, তাঁর থেকে এমন বরদানের কবচ নাও, যার কারণে তাঁর থেকে সুরক্ষিত হয়ে যেতে পারো তুমি। যদি তাঁর থেকে সুরক্ষিত থেকে যাও, নিশ্চিত ভাবে জেনো যে তোমাকে পরাস্ত করার সামর্থ্য কারুর নেই”।
ইচ্ছাধারী বললেন, “কিন্তু তাঁর সহায়তা আমি করবো কি করে?”
রমনাথ হেসে বললেন, “উগ্রতা বিবেক হনন করে নেয়। আর বিবেক হনন হয়ে গেলে, ভক্ত আর ভণ্ডের ভেদ করা অসম্ভব হয়ে যায়। তখন অনায়সে এক ভণ্ড ভক্তের পোশাক ধারণ করে নিজেকে ভক্ত বলে পরিচপয় প্রদান করে, বরদান লাভ করে নিতে পারে। ইচ্ছাধারী, বরদান কারুকে বলশালী করেনা। বল সকলের নিজের নিজের। নিজের ছল, খল ও বল দ্বারাই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে হয়। তুমি প্রকাণ্ড বলশালী। সাধদের মধ্যে বিবাদ চাওনা, নেহাত সেই কারণে তুমি দূরে সরে আছো। নাহলে তোমার বলের কাছে ডাহুক বাহুকের বলও কিচ্ছু নয়”।
“কিন্তু বৎস, বরদান এক মহাকবচ। তোমার থেকেও বলশালী যদি সম্মুখে আসে, আর তোমাকে আঘাত করে, তার আঘাতকে তুমি তোমার বলদ্বারা প্রত্যাখ্যান করতে পারবেনা। কিন্তু তা অবশ্যই পারবে, বরদানের কবচের মাধ্যমে। আর বরদানের কবচ তত অধিক শক্তিশালী হয়, যত অধিক সামর্থ্যবাণের থেকে তুমি সেই কবচ লাভ করছো। ইচ্ছাধারী, আমি যার কাছে তোমাকে প্রেরণ করছি, তিনি তোমার আমার, ডাহুক বাহুক বা পীতাম্বরের মত শক্তিশালী নন। তিনি স্বয়ং শক্তি। তিনি ঈশ্বর হবার অভিলাষী নন, তোমার আমার সকলের ঠিক বিপরীত। তিনি সত্য অর্থে ঈশ্বর। কিন্তু ঈশ্বর হলে কি হবে, মূর্খা তিনি। স্ত্রীরূপে আছেন, তাই হয়তো মূর্খা। আর মূর্খা বলেই, ঈশ্বরত্ব স্থাপনকে ফেলে রেখে, তিনি মাতৃত্ব নিয়ে উলমালা। বৎস, তাই তাঁর থেকে কবচ লাভ করলে, তুমি অপরাজেয় হয়ে যাবে”।
ইচ্ছাধারী হেসে বললেন, “আপনার কথা শুনে কি মনে হচ্ছে জানেন প্রভু? মনে হচ্ছে যেন, আপনি স্বয়ং তাঁর থেকে ভীত। … নেহাত তিনি ঈশ্বর হয়ে বিরাজমান হবার দৌড়ে ভাগ নেন না, তাই আপনি বা আপনারা ত্রিমূর্তি স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারছিলেন এতকাল। কিন্তু তাঁর উগ্র হয়ে ওঠা এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তিনি না চেয়েও ঈশ্বরত্বের দিকেই যাচ্ছেন। আর আপনারা ত্রিমূর্তি চাইছেন যে, এই সুযোগে, আমরা তাঁর থেকে অপরাজিত, অক্ষয় হয়ে যাবার বরদান নিয়ে, তাঁকেই দাসী করে রাখার সামর্থ্য লাভ করে নিই”।
“উচিত কথা। প্রস্তাবও অনন্য। চাইছেন নিজের হিত, আর দেখাচ্ছেন যে আপনারা আমাদের হিত চাইছেন। ভয় আপনারা তাঁর থেকে পান। আর তাই আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন আর তাঁকে পরাস্ত করার উপায় নির্গত করতে বলছেন। … হুম, ভালোই বুঝতে পারছি। … যাইহোক ধন্যবাদ। আপনি আমাকে এক অনন্য কথা বলে গেলেন। নিশ্চিত থাকুন, এক মোক্ষম সুরক্ষা কবচ নির্মাণ করবো আমি। ধন্যবাদ প্রভু”।
ইচ্ছাধারীর কথাগুলি স্মরণ রেখে রমনাথ পৌঁছালেন পীতাম্বরের কাছে। সমস্ত কথা তাঁকে বলতে, পীতাম্বর বললেন, “আপনি ইচ্ছাধারীকে বুদ্ধি দিয়ে ঠিক করেন নি নাথ। বুদ্ধিমান যিনি, তাকে কনো বুদ্ধি দিতে নেই। কারণ সে আপনার দেওয়া বুদ্ধিতেই ক্ষান্ত থাকবে না। তার নিজেরও বুদ্ধি আছে, আর সেই বুদ্ধিকে আপনার দেওয়া বুদ্ধির উপর আরোপ করে, এমন কিছু বুদ্ধি স্থাপন করবে, যা প্রকারন্তরে আপনারই ক্ষতি সাধন করবে”।
“আমার কথার অর্থ বুঝতে পারছেন আপনি প্রভু! … কাল যদি ইচ্ছাধারী এমন এক বরদান চায় দেবীর থেকে, যার কারণে সে আমাদেরও ধরাছাওয়ার বাইরে চলে যায়, আর তেমন হয়ে সে আমাদেরকেই উৎপাটন করতে চায়, তাহলে কি হবে ভেবে দেখেছেন?”
রমনাথ বললেন, “তা এখন কি করবো?”
পীতাম্বর বললেন, “একজন চতুরকে যদি চাতুরী করার বুদ্ধি দিয়ে ফেলেন, তাহলে … একটিই উপায় পরে থাকে। কনো একজন গর্ধবকে এমন শক্তি প্রদান করে দিন, যাতে যদি এই চতুর ব্যক্তি আপনার ক্ষতি সাধন করতে চায়, তাহলে এই গর্ধব ব্যক্তি আপনার সুরক্ষা কবচ হবে। … হ্যাঁ প্রভু, আপনি বরং, হুম, অনন্তবীর্যের কাছে যান। তাঁকে এক বিচিত্র বরদান দিন, যার সমাধান আপনারও জানা নেই। তবে শর্ত দিয়ে রাখুন সেই বরদানে যে, যদি কখনো সে ত্রিমূর্তির সামনে এসে সে নিজের শক্তিপ্রদর্শন করতে যায়, সেই মুহূর্তে তাঁর শক্তির নাশ হয়ে যাবে”।
“হতে পারে, ইচ্ছাধারী এই শক্তিশালীকে নিজের সেনা করে নেবে। কিন্তু সেনা করে নিলেও, সঙ্গী করতে পারবেনা, বিশেষ করে যখন সে আমাদের ক্ষতিসাধন করতে চেষ্টা করবে তখন। এই অনন্তবীর্যই তখন তাঁর বিরোধী হয়ে উঠবে, কারণ আমাদের ক্ষতিসাধন হলে, তার সুরক্ষাকবচও নষ্ট হয়ে যাবে”।
রমনাথ বললেন, “এর অর্থ, আমরা যতদিন অপরাজেয় আছি, ততদিনই অনন্তবীর্যের শক্তি বা বরদান কার্যকরী। বরদানের এই শর্ত প্রদান করলে, কনো ভাবেই ইচ্ছাধারী আমাদের দিকে দৃষ্টি রাখতে পারবেনা, তা সে অনন্তবীর্যকে নিজের মন্ত্রকে রাখুক বা না রাখুক”।
রমনাথ আর সময় নষ্ট না করে সরাসরি অনন্তবীর্যের সম্মুখে উপস্থিত হলে, অনন্তবীর্য ব্যকুল হয়ে বললেন, “প্রভু, আপনি এসেছেন? আমি আপনারই অপেক্ষা করছিলাম”।
রমনাথ বললেন, “কি বরদান চাও তুমি অনন্ত?”
অনন্তবীর্য হেসে বললেন, “আপনার ভক্ত। আপনি স্বয়ং পরম আত্ম, আর তাই আপনার থেকে আত্মভাবই শিখেছি। তাই প্রভু, আমি আমার প্রতিটি রক্তবিন্দুতে আমাকে চাই। আমার প্রতিটি রক্ত বিন্দু যেন আমি হই, আমি স্বয়ং হই। আমার দেহ থেকে একটিও রক্তবিন্দু ক্ষয় হবেনা, কারণ তা ভূমি ছুলেই আমি হয়ে যাবে”।
রমনাথ হেসে বললেন, “বেশ, তোমাকে এই অনন্ত বরদান প্রদান করবো, তবে তা ততক্ষণই প্রযোজ্য থাকবে, যতক্ষণ আমরা ত্রিমূর্তি অপরাজেয় থাকবো। যেই ক্ষণে আমাদের কেউ পরাস্ত করে দেবে, সেই ক্ষণে তোমার এই বরদানের কবচও চূড় চূড় হয়ে যাবে”।
অনন্তবীর্য হেসে বললেন, “আমি আপনার ভক্ত প্রভু। ভক্তের ধর্ম তার ভগবানের রক্ষা করা। আমি তাই অবশ্যই রক্ষা করবো আপনাকে। বচন দিলাম এই”।
রমনাথ এরপর বরদানের কবচ প্রদান করে, সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। অন্যদিকে, দেবী অম্বিকা হাজতের দুর্গ ভেদ করে, উঠে এসেছেন, আর হাজত দেবীর আগমনের আন্দাজ করে পলায়ন করা শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু পরাপ্রকৃতির থেকে কে কিভাবে লুকাতে পারে? তিনি সমস্ত স্থূলে বিরাজমান, সমস্ত সূক্ষ্মে বিরাজমান, সমস্ত কারণে বিদ্যমান, সমস্ত শর্তে, সমস্ত শব্দে, সমস্ত ধ্বনিতে, সমস্ত শ্রীতে, সমস্ত গুণে, সমস্ত সুরে বিদ্যমান। কণায় কণায় যার অস্তিত্ব, যার অস্তিত্ব সত্য বলেই ভ্রমকেও সত্য বোধ হয়, তার থেকে কে কিভাবে লুকাতে পারে! সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের বিনাশ হয়ে গেলেও যিনি অস্তি, সেই পরব্রহ্মের থেকে কেই বা লুকাতে পারে!
তবে দেবীর লীলা অতি অদ্ভুত। তিনি ঈশ্বর হয়ে বিরাজ করেন না, তিনি ঈশ্বরত্ব লাভের লোভে, সকলের পূজা পাবার অছিলায় বরদান দিয়ে ফেরেন না। তিনি নিজের ঢাক তো কখনোই পেটান না। কিন্তু তিনি এই সমস্ত কিছু না করলেও যে ঈশ্বরই। তিনি মানুন আর না মানুন, তিনি চান আর না চান, তিনি প্রচার করুন আর না করুন, তিনিই যে ঈশ্বর। তাই তিনি এক পাও নড়লেন না। কনো অনুসন্ধান করলেন না হাজতের। সরাসরি নিজের মুখগহ্বর খুলে, শ্বাস নিলেন। আর সেই অসম্ভব শ্বাস গ্রহণের আকর্ষণের কারণে সমস্ত সাধ, সমস্ত নিসাধ, এমনকি ত্রিমূর্তিও যেন দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। উড়ন্ত ভাবে তাঁর মুখ গহ্বরের দিকে পিছনে যাত্রা করতে থাকলেন।
তবে সেই সমস্ত কারুর মধ্যে প্রথম সারিতে একজনই ছিলেন, হাজত। যখন হাজত সমক্ষে এসে উপস্থিত হলো সেই আকর্ষণের ফলে, তখন তাঁর থেকে সামান্য দূরে সকল সাধ, সকল নিসাধ, ত্রিমূর্তি, সকলে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তাই এরপরবর্তী যেই দৃশ্য সম্মুখে এলো, তা সকলে দেখলেন।
হাজত নিরুপায় হয়ে নিজেকে বীর প্রমাণ করার জন্য যুদ্ধবেশে ধাবিত হলেন দেবীর উদ্দেশ্যে। কিন্তু তাঁর আচরণ যেন দেবীর কাছে অত্যন্ত শিশুর মত দেখালো। তাঁর মুষ্ট্যাঘাতের পথ থেকে দেবী সরে গেলেন না। বরং মুষ্টিবদ্ধ হাজতের মুষ্টিকে নিজের মুষ্টিতে ধারণ করলেন, আর তা করে হাজতের দেহকে শূন্যে উঠিয়ে ভূমিতে পতিত করলেন। অতঃপরে নিজের বাম চরণের কনীনিকাকে হাজতের ভূপতিত দেহের পৃষ্ঠে স্থাপন করলেন।
সকলে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন যে, হাজত সেই কনীনিকার ভারে ছটফট করা শুরু করলেন। যেন কিছুতেই সেই বন্ধনের থেকে মুক্ত হতে পারছেন না, আবার কিছুতেই সেই ভারকে সহ্যও করতে পারছেন না। প্রথমে সকলে তা দেখে মনে করতে থাকে হাজত নাট্য করছে। কিন্তু এমন ভাবে কিছুক্ষণ যেতে, সকলে দেখলো, হাজতের সমস্ত দেহের শিরাউপশিরাতে চিড় ধরে, তার থেকে লহুপাত হচ্ছে।
ক্রমশ সেই লহু সমস্ত ভূমিকে রঞ্জিত করা শুরু করে দিলো। আর এক প্রহর যেতে, হাজতের সমস্ত দুর্গের ধ্বংসসারও তারই রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাওয়া শুরু করলো। হাজত তখনও ছটফট করছিল, কিন্তু ক্রমশ তার ছটফটানি শিথিল হতে শুরু করলো, কারণ তার দেহ থেকে সমস্ত রক্ত নির্গত হয়ে যেতে থাকে, কেবল মাত্র দেবীর কনীনিকার বলের কারণে।
উপস্থিত সকলের ভিড়ের মধ্যে ডাহুক বাহুকও লুকিয়ে ছিলেন। সকলের সাথে সাথে তাঁরাও দেবীর বলের সাক্ষী হলেন। আর এমনই সাক্ষী হলেন সকলে যেন সকলের সমস্ত দেহের লহু ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে জমাট বেঁধে গেছে। চাইলেই দেবী হাজতকে সহজ মৃত্যু দিতে পারতেন। একটি পদাঘাতের বেগ সহন করারও সামর্থ্য নেই তার। কিন্তু এই দুই প্রহরব্যাপী বেদনাদায়ক মৃত্যু যেন সমস্ত সাধদের উদ্দেশ্যে সংকেত রূপে দেবী প্রদান করলেন যে, ত্রিমূর্তির উস্কানিতে যে যে প্রভাবিত হবে, তার জন্য এমন নির্মম নিদারুণ ও পরম বেদনাদায়ক মৃত্যু অপেক্ষা করছে।
ডাহুক বাহুক, কয়লা, সাধপালের মুখের সমস্ত জলশুকিয়ে গেল হাজতের সেই অপরিসীম পীড়া আর আর আর্তনাদ শুনে। একই হাল ইচ্ছাধারীরও হলো। আর সংহার তথা বারুদেরও হলো। আর তার থেকেও করুন হাল হলো ত্রিমূর্তির।
দেবী যেন তাঁদেরকেই বললেন, “সংযত হয়ে যাও, নচেৎ অতিভয়ঙ্কর অতিবিস্তারিত মৃত্যুযন্ত্রণা সকলের জন্য অপেক্ষা করছে”।
ইচ্ছাধারী সেই দৃশ্যকে দেখলেন আর বুঝলেন যে কার সাথে ভিড়িয়ে দিচ্ছেন তাঁদের সকলকে ত্রিমূর্তি। এ যেন এক ক্ষুদ্র কীটকে দাবানলের অগ্নির সম্মুখে ছেড়ে দেওয়া। অগ্নি তাঁকে ভক্ষণ করে নাকি সে অগ্নির মুখগহ্বর থেকে পলায়ন করতে পারে, সেই ক্রীড়ার অবতরণ। সমস্ত কিছু দেখে ইচ্ছাধারী সেই স্থান ত্যাগ করে চলে গেল, এবং বিচার করা শুরু করলো যে, কি এমন বরদান দেবীর থেকে নেওয়া যায়।
সকলেই ভয়ার্ত ভাবে সেই স্থান ত্যাগ করলে, দেবী সর্বাম্বা মৃষুর উদ্দেশ্যে বললেন, “আর দেরি করো না পুত্র। এবার সাধপালের কাল ঘনিয়ে এসেছে। সেই পথে যাত্রা করো। আর স্মরণ রাখবে আমি তোমার হৃদয়ে বাস করি। তাই কখনোই নিজেকে নিরুপায় বোধ করবেনা। … আমি হীরার কাছে যাত্রা করলাম। আমাদের সাখ্যাত এখন হওয়া সম্ভব নয়। আমি জানি আমাকে উগ্র করে তোলার প্রয়াস হচ্ছে আর আমি উগ্র হবোও। তাই তুমি আমার কাছে এসো না। আর আমার চিন্তাও করো না”।
মৃষু হেসে বললেন, “মায়ের থেকে সন্তানের কি করে ভয় থাকতে পারে! আর মা, আমি জানি, তুমি উগ্র হও আর উগ্র না হও, তুমি নিজের উপর কখনোই নিয়ন্ত্রণ হারাও না। হ্যাঁ হতে পারে যে, কেউ কেউ তোমার উগ্র হবার অপেক্ষা করছেন নিজেদেরকে অক্ষয় করে তোলার জন্য। তাই তুমি উগ্র হবে। কিন্তু তারা মনে করে যে উগ্র হলে তুমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেল। (হাস্য প্রদান করে) তারা আসলে তোমাকে দেবী মনে করে। মা রূপে জানলে, এই ভ্রম তাদের থাকতো না। মা কখনোই নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় না। তাই মা, তোমাকে নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা করি না। আমি জানি, যা কিছু হয়, তোমার ইচ্ছাতেই হয়। তাই উগ্রতাও তোমার ইচ্ছা, আর নম্রতাও। আমাকে আশীর্বাদ প্রদান করো মা, যেন জগতকে সাধপালের থেকে মুক্ত করতে পারি”।
