৪.৩। অরাজগ পর্ব
মৃষু নিজের কথা রেখেছে, সে তাঁর মাতাকে পুনরায় সম্পূর্ণ করে দিয়েছে। অন্যদিকে পীতাম্বর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে রমনাথের উদ্দেশ্যে বললেন, “এবার মৃষুকে দণ্ড দিতেই হবে প্রভু। সে আসলে ছল করে, শ্বেতা ও শ্রীকে আমাদের থেকে তস্করি করে দেবী অম্বাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আমাদের ব্রহ্মাণ্ডে দাঁড়িয়ে, আমাদের উপরই বাটপারি করার সাজা পেতেই হবে”।
রমনাথ ও শ্বেতাম্বরও সেই মন্ত্রণায় সহমত হলে, তাঁরা ত্রিমূর্তি উপস্থিত হলেন মৃষুর সম্মুখে। মাতা সর্বাম্বা সবে পুত্রের সাথে মিলনের জন্য যাত্রা করেছিলেন। ত্রিমূর্তির কর্মকাণ্ড তাঁর ভ্রুকে উত্তলিত করে দিল। উত্তেজিত রমনাথ ক্ষিপ্র ভাবে মৃষুর উদ্দেশ্যে বললেন, “তুমি দেবী অম্বার পুত্র বলে যা খুশী তাই করে বেড়াবে, আর কি ভেবেছ, আমরা তোমার এই দুষ্কর্মের কনো প্রতিকার করবো না!”
পীতাম্বর বললেন, “ভুলে গেছ তুমি যে, যেই ব্রহ্মাণ্ডে তুমি স্থিত, সেই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা আমরা। ভুলে গেছ তুমি যে, যেই দেহধারণ করে তুমি নিবাস করছো, যেই যোনি ধারণ করে তুমি নিবাস করছো, তা আমাদের নির্মিত”।
শ্বেতাম্বরও উগ্র ভাবে বললেন, “বেশ কর্ম তুমি করে নিয়েছ, এবার কর্মের ফল ভোগ করার জন্য প্রস্তুত হও মৃষু। আমি তোমাকে শ্রাপ দিচ্ছি, তুমি তোমার অস্তিত্বের, তোমার মাতার, তোমার সামর্থ্যের, সমস্ত স্মৃতি ভুলে যাবে”।
রমনাথ বললেন, “এই শ্রাপ আমাদের সকলের তরফ থেকে তোমাকে। আমাদের ত্রিমূর্তির তরফ থেকে তোমাকে এই শ্রাপ প্রদান করলাম। তুমি সম্পূর্ণ ভাবে স্মৃতিহারা হয়ে যাও”।
মৃষু সেই কথাতে মৃদু হেসে বললেন, “আপনাদের তর্ক যথোচিত। আমি সম্পূর্ণ ভাবে সজ্জ শ্রাপ স্বীকার করতে। আমার যা করনীয়, তা করা হয়ে গেছে। এখন সহাস্যে দণ্ড ভোগ করতে পারি আমি”।
সেই শ্রাপে মৃষু সমস্ত স্মৃতি হারিয়ে ফেলল মাত্র, কিন্তু দেবী সর্বাম্বা যেন মূর্ছাপ্রায় হয়ে উঠলেন। দেবী কৃত্তিকা ও দেবী পাবনি তাঁর কোমল অঙ্গকে ধরলেন। মাতা সর্বাম্বার নয়ন থেকে অবিরাম ভাবে অশ্রু নির্গত হতে থাকে। দেবী পাবনি কুপিত হয়ে উঠে বললেন, “এত কালে মা আর পুত্রের মিলন হতে চলেছিল, আর শয়তান ঠিক শেষ মুহূর্তে এসে মা-সন্তানের মধ্যে অনন্ত কালের বিচ্ছেদরেখা টেনে দিলেন”।
দেবী কৃত্তিকা বললেন, “শুধু কি তাই। এই সুবাদে তারা সাগরমন্থনে যা কিছু সাধরা হারিয়েছে, সেই সমস্ত কিছুর বিকল্প নির্মাণে নেমে পড়বে। মাতা ও পুত্রের মধ্যে যেই ভেদ নির্মাণ করলেন তাঁরা, সেটিকে এতটাই বিশাল করে দেবেন যে, মাতা ও সন্তানের আর মিলন হতেই পারবেনা”।
দেবী পাবনি বললেন, “অসম্ভব। যেই পথ আমাদের মৃষু এতকাল চলেছে, তা কিছুতেই ব্যর্থ হয়ে যেতে পারেনা। আমার বিশ্বাস, আমাদের ম্মৃষু আবারও যাত্রা করবে। আবারও সে তাঁর মাকে খুঁজে নেবে। ত্রিমূর্তির ষড়যন্ত্রকে সে পুনরায় বিনষ্ট করবে”।
দেবী সর্বাম্বা একটি কথাও বললেন না, শুধুই পুত্রের আলিঙ্গন থেকে বিরত হয়ে থাকার কারণে অশ্রুপূর্ণ নেত্র ধারণ করে উদাস ভাবে বসে রইলেন। যেন পুত্রের প্রত্যাবর্তনের জন্য অধীর অপেক্ষায় স্থবির হয়ে গেলেন তিনি। অন্যদিকে, জেগে উঠলো সাধপাল ও সকল সাধরা। যন্ত্র ও মন্ত্রকে ধারণ করে, আহারজ্ঞান ও ওষধিজ্ঞানের ক্ষয়কে পুড়ন করার উদ্দেশ্যে তিনি উঠে পরে লাগলেন।
একদিকে ডাহুক ও বাহুক মানুষের মধ্যে কামনার বিস্তার করা শুরু করলেন এবং তাতে সাহায্য করলেন রমনাথ স্বয়ং। মানব যোনিতে দেহধারণ সহজ করে দিলেন তিনি। চেতনার বিস্তারের সমস্ত বিধিনিষেধ তুলে দিতে থাকলেন, যাতে করে অধিক থেকে অধিক জীব নিজেদের যোনি ত্যাগ করে মানব হওয়া শুরু করে। আর এই ভাবে জনসংখ্যার বৃদ্ধি আকাশছোঁয়া হলে, প্রয়োজন বৃদ্ধি হওয়া শুরু করে খাদ্যসামগ্রীর।
নূতন নূতন মন্ত্রের নির্মাণ করে ফসলাদির উৎপাদন বৃদ্ধি করার কৌশল সম্মুখে আনলেন জিতেশ যেন তিনি জনহিতের জন্য ক্রিয়া করছেন। আর তেমন কীর্তির বলে সমস্ত খাদ্য উৎপাদনকেই কৃত্তিম করে তোলা শুরু করলো সে। কৃত্তিম ফসলাদি আহার করিয়ে করিয়ে মানবের মেধাকে সীমিত করে দেওয়া শুরু করলো একদিকে, তো প্রকৃতির ধারাপাতে চিহ্নিত উভোভজী জীব মানুষকে তৃণভোজী করে তোলার প্রবঞ্চনা এবং মাসাদি আহার থেকে সরিয়া আনার প্রবঞ্চনা দ্বারা মানুষের মেধার পূর্ণগ্রাস করা শুরু করলেন সাধপাল। সেই একই সাথে, ধনসর্বস্ব করে তুলে মানবসমাজকে এমন করে দেয় যে, ধন না হলে তাঁরা আহার সংগ্রহ করতেই অক্ষম। আর এই ভাবে ধনের কাছে পরাধীন করে দেয় সমস্ত মানবকে।
কৃত্তিম আহার আর যা কৃত্তিম নয়, সেই মাসাদি আহার থেকে বঞ্চিত করা, তাই মেধার অভাব, আর মেধার অভাবের কারণে বিচারসামর্থ্যের অভাব, আর তারই মধ্যে ধনের উপর নির্ভরশীলতা। সমস্ত কিছু মিলিয়ে, মানবজাতি বিচার করতেই ভুলতে বসলেন। সত্য পথে চলা বন্ধই করে দিলেন আর তার পরিবর্তে নূতন নূতন মন্ত্র দ্বারা নূতন নূতন যন্ত্রের বিস্তার করা শুরু করলেন। সঠিক আহারাদি না লাভ করার কারণে কেবলই যে মেধার মান হ্রাস পেলো, তাও নয়। শরীরস্বাস্থ্যের মানও কমতে থাকলো মানুষের। জ্বরার বিস্তার করা সাধদের হাতে।
তাই জ্বরার বিস্তার করার কারণে, আহারের মন্ত্রে আহারগুণকে বিতাড়িত করে মন্ত্রগুণ ও যন্ত্রগুণকে নিয়োগ করে, মনুষ্যসমাজকে জ্বরার গুণে কাহিল ও ভয়ার্ত করে তোলা শুরু করলো সাধরা। খাদ্যগুণ নেই, জ্বরার ব্যবিচার আর সাথে সাথে আহারের চিন্তা নয়, ধনের চিন্তা অধিক করতে হলো মানবকে, কারণ ধনই আহার প্রদান করবে তাদেরকে। এই সমস্ত কিছুর কারণে, মানব এতটাই কাহিল হয়ে পড়লো যে প্রয়োজন পড়লো ওষধিজ্ঞানের।
কিন্তু ওষধিজ্ঞানের জন্য নিসাধদের সাহায্য প্রয়োজন, কিন্তু রমনাথ জিতেশকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, “মন্ত্র আর যন্ত্রগুণে চিকিৎসাশাস্ত্রকে এমন করে দাও যাতে তা চিকিৎসা না হয়, তা মানবকে অধিক অধিক ভাবে ধনের উপযোগিতা বোঝায়, আর তাই মানব এবার শুধু আহার বা নিদ্রা বা মৈথুনের জন্য ধননির্ভর না হয়ে, সুস্থ থাকার জন্যও ধননির্ভর হয়ে ওঠে। তবেই মানব বিচার থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে যাবে। বিচার করতে ভুলেই যাবে, আর সর্বক্ষণ ধনোপার্জনের চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে থাকবে”।
পীতাম্বর সম্মুখে এসে বললেন, “এমন করলে কিচু কি লাভ হবে প্রভু?”
রমনাথ বললেন, “হবে তো। মৃষু এখন স্মৃতিশূন্য। তাঁর সামনে এমন এক বিশ্ব স্থাপন করে দিলে, সেই বিশ্বের মধ্যে সমস্ত মানবের সাথে সাথে, সেও ধনের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হবে। সেও ধনের পিছনেই ছুটতে শুরু করবে। সেও বিচারের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলবে। সেও মেধা হারিয়ে ফেলবে, আর মেধা হারিয়ে ফেললে, সে আর কনো ভাবেই নিজের স্মৃতি ফিরে পেতে পারবেনা, আর তাঁর মাতার স্মৃতিও ফিরে পাবেনা। সদা সদার জন্য মা-সন্তানের সম্পর্ক সমাপ্ত হয়ে যাবে। আপনাকে কেবল একটিই কাজ করতে হবে। মৃষুকে মাসাহার ও মৎস্যাহার থেকে বিরত করতে হবে। ব্যাস, অনন্ত বিচ্ছেদ”।
একই কথা দেবী পাবনিও বললেন সর্বাম্বাকে, যাতে দেবী কৃত্তিকাও সহমত পোষণ করলেন। তিনি বললেন, “অম্বা, পুত্রের কাছে যাও। তোমার পুত্রের স্মৃতি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় তার কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু স্মরণ নেই। যদি তুমি এখনও তার কাছে না যাও, তাহলে যেই ধনের, যন্ত্রের আর মন্ত্রের কল নির্মাণ করেছে ত্রিমূর্তি সাধদের সঙ্গে মিলে, সেই কল তোমার পুত্রকে সম্পূর্ণরূপে গিলে নেবে”।
দেবী সর্বাম্বা নিজের চোয়াল শক্ত করে বললেন, “আমার পুত্র সে। প্রাণ বসে তার আমাতে। তোমরাই বলো না এই সমস্ত কথা? এবার দেখবে, আমার পুত্রের দাপট। ঠিক কতখানি ভয়ানক সে, ঠিক কতখানি ভাবে ত্রিমূর্তির দুঃস্বপ্ন সে, এবার তোমরা সকলে দেখবে। আমার কিচ্ছু করার নেই এখন। কনো ভূমিকা নেই আমার। সে যে কতখানি প্রেম করে আমাকে, এবার দেখবে তোমরা, এবার দেখবে জগত, আর এবার দেখে নেবে ত্রিমূর্তিও। আমার পূর্ণ মমতা দ্বারা সৃজন করেছি আমি তাকে। আমার মমতার প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। এবার তোমাদের সেই আস্থার জোর দেখার পালা”।
দেবী কৃত্তিকা বললেন, “কিন্তু দেবী, বোঝার প্রয়াস করো। এইসময় জেদ ধরে থাকার নয়। এই সময় কিছু করতে হবে আমাদেরকে, নাহলে তোমার মমতাকে পূর্ণভাবে হত্যা করতে উদ্যত ত্রিমূর্তি নিজেদের মন্ত্রণাতে সফল হয়ে যাবে”।
দেবী সর্বাম্বা এবার এক হারহিম করা হাস্য হেসে বললেন, “আমার পুত্রের প্রেম এমন তুচ্ছ নয় যে তা স্মৃতিতে আবদ্ধ। সে যদি প্রেমী হয়, আমি স্বয়ং তাঁর প্রেম। স্মৃতি গেছে তার, প্রেম নয়। সে এখনো আমাকে প্রেম করে। হ্যাঁ আমার সাথে সে তার সম্বন্ধের স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছে, কিন্তু আমার প্রতি প্রেম সে হারায় নি। সে এখনো ততটাই প্রেম করে আমাকে, যতটা পূর্বে করতো। দেখেছ তুমি কৃত্তিকা, তাঁর প্রেমের সামর্থ্য। সে আমার কাছে শ্বেতা ও শ্রীকে ত্রিমূর্তির নাকের ডগা থেকে ছিনিয়ে এনে দিয়েছে। … আমার পূর্ণ আস্থা আছে, সে আবারও ত্রিমূর্তির নাকের ডগার সামনে থেকে নিজের স্মৃতি ছিনিয়ে নিয়ে আসবে”।
দেবী পাবনি উত্তেজিত হয়ে উঠে বললেন, “বেশ মানলাম, সে সমস্ত স্মৃতি ছিনিয়ে আনবে, কিন্তু যখন সে সমস্ত স্মৃতি ছিনিয়ে নিয়ে আসবে, তখন সেই স্মৃতির মধ্যে তো এই কথাও থাকবে যে, যখন তাঁর স্মৃতি চলে গেছিল, তাঁর মা তাঁর থেকে দূরে স্থিত ছিল। সেই কথা স্মরণ আসতে তোমাকে সে কখনো ক্ষমা করবে?”
সর্বাম্বা হেসে বললেন, “তাহলে তোমরা আমার পুত্রের প্রেমের সামর্থ্য জানোই না, বা আরো ভালো করে বলতে হলে, প্রেম কি, তাই তোমরা এখনো জানো না। প্রেম কখনো নাস্তিবাদকে দেখেই না। প্রতিটি নাস্তির মধ্যে অস্তিকে সন্ধান করাই প্রেম। আমি যে সম্মুখে গেলাম না পুত্রের, কারণ আমার তার উপর পূর্ণ আস্থা আছে, সেটা তোমরা বুঝতে পারছো না, কিন্তু আমার পুত্রের প্রেম তা অবশ্যই বুঝতে পারবে। আর আমি যে তাঁর সম্মুখ থেকে একদণ্ড সময়ের জন্যও সরিনি, আমি যে প্রকৃতি বেশে, তাঁর আরাধ্যা জগদ্ধাত্রী বেশে সর্বক্ষণ তাঁর সম্মুখে ছিলাম, আছি আর থাকবো, তা তোমরা বুঝতে না পারলেও, আমার পুত্রের প্রেম এতো দুর্বল নয়। আমার পুত্রের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। সে আমাকে পুনরায় খুঁজে নেবেই”।
“আমি যদি তাঁর সম্মুখে গিয়ে তাঁর স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করি, তাহলে ত্রিমূর্তি ভাববে, আমার পুত্রের সামর্থ্যই নেই। তাই তো তাঁর মাকে এই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হলো। আমার পুত্রের প্রতি তারা হাসাহাসি করবে। … (একনেত্র জল নিয়ে উগ্র ভাবে) আমি আমার পুত্রের সামর্থ্যের এই অপমান কিছুতেই মেনে নিতে পারবো না। তারা দেখবে আমার পুত্রের সামর্থ্য ঠিক কতখানি। তা দেখে তারা ভয়ার্ত হয়ে যাবে। আমার পুত্র তাদের কাছে যম হয়ে উঠবে। সেদিন আমার পুত্র যদি আমার উপর অভিমান করে দুইদিন মুখ ঘুরিয়েও থাকে, তাও আমার বক্ষ গর্বে পরিপূর্ণ হবে, কারণ আমার পুত্র সম্পূর্ণ ভাবে নিজের সামর্থ্যের জেরে তাঁর শত্রু, তাঁর মায়ের শত্রুকে ভয়ার্ত করে দেবে”।
দেবী পাবনি এবার সর্বাম্বার নিকটে বসে, তাঁর গায়ে মাথায় হাতবুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “কেমন ধারার মা তুই? এতো আস্থা রাখিস কি করে অম্বা? এত আস্থা তো কনো প্রেমী তার প্রেমিকার উপরও রাখতে পারেনা! এত আস্থা তো কনো প্রেমিকা তাঁর প্রেমীর উপরও রাখতে পারেনা! … এত আস্থার আধার কি? মাতৃত্বের এত শক্তি? এতো সামর্থ্য? কই জগতে যারা কেবল পঞ্চভূত একত্রিত করে একটি একটি করে দেহ প্রদান করে নিজেদের জননী বলে দাবি করে, তাদের মধ্যেও তো এমন মাতৃত্বের শক্তি নেই!”
দেবী কৃত্তিকা হেসে বললেন, “দেহপ্রদান করা আর মা হবার মধ্যে অনেক অনেক পার্থক্য দেবী পাবনি। তাঁরা দেহ প্রদান করেন, কিন্তু সেই দেহ তো নিষ্প্রাণ! শব সমান। সেই দেহ যে একটি একটি প্রাণ, তার কারণ তো আমাদের মাতা সর্বাম্বা। পরাচেতনার চেতনা সেই দেহের সাথে যুক্ত হবার কারণেই তারা দেহ থেকে প্রাণী, জীব থেকে জীবন। … তুমি যেই জননীদের কথা বলছো, তারা বাহ্যপ্রকৃতি থেকে সামগ্রী সমূহ একত্রিত করে, একটি একটি করে দেহ নির্মাণ করে। এই দেখো, যেই ভাবে আমি একটি মাটির ঢেলা নির্মাণ করছি, ঠিক সেই ভাবে। কি করে আমার এই মাটির ঢেলার প্রতি আস্থা থাকতে পারে? এর উপর আমার কনো নিয়ন্ত্রণ আছে? আমার কনো অংশ এঁর মধ্যে রয়েছে? তাহলে কি করে এঁদের উপর আমার আস্থা থাকবে?”
“তেমনই তুমি যাদেরকে জননী বলছো দেবী পাবনি, তাঁরা যে এই মাটির ঢেলার নির্মাতা। আমাদের অম্বা তাঁদের কাছে গিয়ে তাঁদের নির্মিত মাটির ঢেলারা যে তাঁর সন্তান সেটি দাবি করেনা বলে, তারা নিজেরাই সেই সন্তানদের জননী বলে দাবি করে করে, সেই প্রাণদের উপর নিজেদের অধিকার স্থাপন করা জননী। কিন্তু তাদের প্রকৃত জননী যে আমাদের অম্বা। তাঁরই চেতনার কারণে তারা একাকজন প্রাণ। … আর আমাদের মৃষু! তার তো সম্পূর্ণ গঠনই অম্বার হাতে। অম্বাই তাঁর সাত কলার প্রতিটি দেহের নির্মাতা, নিজের অঙ্গ দিয়ে নির্মাণ করেছে সে। নিজের চেতনা প্রদান করেছে সে। সে যে পূর্ণ ভাবে জননী তার। আস্থার রহস্য তো এখানেই। এবার ভাবো, যদি আমরাই এই রহস্যকে ভেদ করতে না পারি, তাহলে ত্রিমূর্তি কি করে এই রহস্যের ভেদ করবে? আমি নিশ্চিত, মৃষু সমস্ত বাঁধা অতিক্রম করে পুনরায় সম্মুখে আসবে, আর আরো বড় বিভীষিকা হয়ে ত্রিমূর্তির নিদ্রা খেয়ে নেবে”।
মৃষুর যাত্রা সহজ হলো না। সাধপাল জিতেশের নির্মিত কল, যা ত্রিমূর্তিদের দ্বারা প্রণোদিত, তার কারণে নিজের আশেপাশের সকলকে বিকল হতে দেখে, সেও একসময়ে বিকলঙ্গ হয়ে যাবার ভান করতে থাকলো। কিন্তু পরাপ্রকৃতি যে তাঁর সম্মুখে মাতা জগদ্ধাত্রী হয়ে বিরাজমান ছিলেন। আশেপাশের প্রকৃতি রূপেও তিনি বিরাজমান ছিলেন। এই দুইয়ের প্রতি আস্থা হারায়নি মৃষু। প্রকৃতির উপর স্থির দৃষ্টি রেখে, বিস্ময়কর তথ্য আবিষ্কার করলো সে।
নিকটতম সখাকে বলল, “প্রকৃতির সৌন্দর্যে মন দিও না। আত্মসর্বস্ব এই জগত, সেখানে মহাত্ম সকলকে ভ্রম আর মিথ্যার মধ্যে বদ্ধ রেখেছে পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা। তাই তো প্রকৃতি এই সৌন্দর্য ধারণ করেছে, যাতে পঞ্চইন্দ্রিয়কে মোহিত করার কারণে, তাকে আত্ম মর্যাদা প্রদান করে। আর সেই ভাবে তিনি বিরাজ করে, দেখো না, মাছি, মৌমাছি, বৃক্ষ, তরুলতা, পক্ষী, প্রতিটি জীব, পতঙ্গ, ভুজঙ্গ এবং তাদের আচরণ দিয়ে আমাদেরকে কেমন সত্যের সন্ধান দিয়ে চলেছেন”।
এই কথা শুনে কেবল দেবী পাবনি চমকিত হলেন না, বিস্মিত হলেন ত্রিমূর্তি, আর এক মধুর হাস্যরেখা দেখা গেল দেবী সর্বাম্বার ওষ্ঠে। সেই হাসির মধ্যে ছিল পুত্রের মেধার প্রতি গর্ব, পুত্রের অপার প্রেমের প্রতি শ্রদ্ধা আর ছিল পুত্রের প্রতি সুতীব্র মমতা। রমনাথের সর্বাঙ্গ স্বেদপূর্ণ হয়ে উঠলো সেই কথা শুনে। পীতাম্বর বললেন, “প্রভু, আমাদের এই ভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকলে হবেনা। মৃষু স্মৃতি হারিয়েছে, কিন্তু মেধা নয়। মায়ের অঙ্গজাত সে। তাই দেহের প্রতিটি কোষ, মনের প্রতিটি ভাব, সমস্ত কিছু মাতার সাথে যুক্ত। মাতাপুত্রের মধ্যে ভেদ সঞ্চার করা অসম্ভব”।
শ্বেতাম্বর বললেন, “কিন্তু কিই বা করতে পারি আমরা?”
পীতাম্বর উত্তরে বললেন, “জিতেশের কাছে বরদান আছে যে, এক মৃষুই তাঁর নিধন করতে সক্ষম, স্বয়ং মৃষুর মা-ও তাই জিতেশের কাছে পরাধীন। আর এখন মৃষু নিজের স্মৃতিতে নেই। তাই সেই কথা স্মরণও নেই তার। এই অবস্থায়, দেবী অম্বাকে তো জিতেশ বন্দী করতেই পারে! … একবার তা করে নিলে, আমরা ত্রিমূর্তি মিলে, তাঁর সমস্ত শ্লীলতা হনন করে নিয়ে, যেমন করে আমরা শ্বেতা, শ্রীকে বশ করে রেখেছিলাম, ঠিক তেমন ভাবেই পুনরায় পরাপ্রকৃতিকে ত্রিখণ্ডে বিভক্ত করে, ত্রিদেবীকে বশ করে রাখবো”।
রমনাথ বললেন, “উচিত বলেছেন পীতাম্বর। পূর্ণপরাপ্রকৃতিকে বশ করে রাখা অসম্ভব, কিন্তু তাঁকে ত্রিখণ্ডে বিভাজিত করলে তো তা করা সম্ভব। … জিতেশকে বার্তা দাও। অম্বাকে অপহরণ করার নির্দেশ দাও। হয়তো পাবনি আর কৃত্তিকাও এই কাজে বাঁধা দিতে চেষ্টা করবে, হয়তো সমস্ত নিসাধ আর পক্ষরাও এই কাজে জিতেশকে বাঁধা দিতে সচেষ্ট হবে। তাই ডাহুক বাহুককেও বার্তাও দাও যে, তারা যেন সাধনিসাধের এই মহাসংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকে”।
এমন নির্দেশ শুনে জিতেশ হুংকার দিয়ে বলে উঠলেন, “এই দিনের জন্যই তো আমি এতকাল অপেক্ষা করছিলাম। … আমার কাছে এমন এক কারাগার উপস্থিত আছে, যার থেকে মুক্ত হবার সামর্থ্য কারুর নেই, স্বয়ং পরাপ্রকৃতিরও নেই, কারণ সেই কারাগারে স্থিত হয়ে প্রকৃতির কনো ভূমিকাই অবশিষ্ট থাকেনা। যন্ত্র, মন্ত্র আর তন্ত্র এই তিন কক্ষবিশিষ্ট এক প্রকাণ্ড কারাগার, যার নাম দিয়েছি শোণিতনগর। আমি দেবী অম্বাকে সেখানে এনে বন্দী করে রাখবো”।
ডাহুক বললেন, “কিন্তু সাধপাল দেবী অম্বাকে নিয়ে আসবেন কি করে? পরাপ্রকৃতি তিনি। হতে পারে বরদান অনুসারে, তিনি আপনার নাশ করতে পারবেন না, কিন্তু তার উপর বলপ্রয়োগে আপনি সক্ষম হবেন, এতো বরদানের কোথাও বলা নেই!”
জিতেশ বললেন, “কথা তো তোমার উচিতই। মানছি যন্ত্র মন্ত্র ও তন্ত্রের কাছে প্রকৃতি নিষ্ক্রিয়, কিন্তু প্রকৃতির কাছেও তো তারা নিষ্ক্রিয়। সেক্ষেত্রে, ওই অম্বাকে নিয়ে আসা যায় কি ভাবে?”
বাহুক বললেন, “দুইজন আছেন, যারা এই অসাধ্য সাধন করতে পারেন। হীরাকয়লা। ভুলে গেলেন? কয়লার কাছে নাগাস্ত্র জ্ঞান আছে, আর হীরার কাছে আছে ভক্তিবল। ভক্তি আর নাগাস্ত্র, দুইশক্তি এক হলে, ভীষণ রূপ ধারণ করতে পারে। আর তাদের বলেই আমরা অম্বাকে এখানে টেনে আনতে পারি”।
এমন মন্ত্রণার শেষে, যখন জিতেশ, ডাহুক আর বাহুক উপস্থিত হলেন হীরাকয়লার কাছে, তখন কয়লা বলেন, “তোমরা দেবীকে সম্ভোগ করে আনন্দ করবে, অতঃপরে ত্রিমূর্তি তাঁদেরকে ত্রিখণ্ডে বিভাজিত করে সম্ভোগ করবে, তো আমরা এই কাজ কেন করবো? কি পাবো আমরা এই কাজ করে?”
ডাহুক খল হাস্য হেসে বললেন, “তোমরা তাঁকে যখন তন্ত্র, যন্ত্র কক্ষ পেরিয়ে মন্ত্র কক্ষে আবদ্ধ করবে, তখন সে তোমাদের সাথেই থাকবে কয়লা। তোমরা যা খুশী করতে পারো সেই সময়ে। আদিশক্তি সে, তার থেকে কিছু শক্তিই হনন করে নিতে পারো!”
হীরা সম্মুখে এসে বললেন, “মাতা আমাদের সাথে থাকবেন? … মাতা থাকবেন আমাদের সাথে? … (কয়লার উদ্দেশ্যে) ভ্রাতা, থাকবেন আমাদের সাথে মাতা। মাতার কাছে আমি থাকবো! আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছেনা! মাতা আর আমরা একসাথে থাকবো!”
পীতাম্বর রমনাথের কাছে এসে দেখলেন, পূর্ব থেকেই সেখানে শ্বেতাম্বর উপস্থিত। তাই সকলের সম্মুখেই বললেন, “প্রভু, এই কাজে হীরাকয়লাকে সংযুক্ত করার অর্থ, এক বিচিত্র ঘটনাক্রমের সূত্রপাত হবে এবার। দেবী অম্বাকে বিচিত্র উপায়ে উত্তেজিত করে এগিয়ে নিয়ে যাবে হীরাকয়লা, অর্থাৎ প্রকৃতির থেকে কিছু উগ্ররূপ প্রকাশিত হবে, আর সেই রূপের সাথে সাথে সেই রূপের অনিয়ন্ত্রিত উর্জ্জার কারণে বিবিধ প্রকৃতিউপাদান, চেতনা উপাদানের বিস্তার হবে। … বুঝতে পারছেন, সমস্ত জগতে এক অনিয়ন্ত্রিত শক্তির বিস্তার শুরু হয়ে যাবে”।
রমনাথ বললেন, “আর সেই অনিয়ন্ত্রিত শক্তিকে কারা গ্রহণ করবে? ৬৪ যোগিনী আর ২৭ পক্ষ, যারা এখন ২৭ ডাকিনী”। অট্টহাস্য হেসে পুনরায় বললেন, “যাদের নিজেদেরই কনো ঠিক নেই, তারা সেই উর্জ্জাভক্ষণ করেই বা কি করবে? পীতাম্বর আপনি বৃথা চিন্তা করছেন”।
শ্বেতাম্বর বললেন, “কিন্তু প্রভু, প্রকৃতির যেই রূপপ্রদর্শনের কারণে এই সমূহ অনিয়ন্ত্রিত শক্তির বিকাশ ঘটবে, সেই রূপমহিমা যে জগতকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে দেবে। আমাদের আরাধনা বন্ধ হয়ে গিয়ে, তাঁর আরাধনা শুরু করে দেবে?”
রমনাথ হেসে বললেন, “আর তিনি তো আরাধনা পছন্দই করেন না। অর্থাৎ তিনি সেই সমস্ত রূপকে নিজেই লুকিয়ে প্রকাশ করবেন। … তাই কনো চিন্তা করবেন না। বরং দেবী অম্বাকে অন্বেষণের কল্পনা করে কামনার সাগরে ডুব দিন আপনারা। শীঘ্রই সে আমাদের বশ্যতা স্বীকার করে, আমাদের কামসঙ্গিনী হতে চলেছে”।
পীতাম্বর বললেন, “কথা এটা নয় যে, তিনি পূজা চাননা, তাই গুপ্ত ভাবে প্রকাশ করবেন নিজের সমস্ত প্রকাশকে। কথা এই যে, স্থূল জগতে এই প্রকাশ লুপ্ত থাকলেও, সূক্ষ্ম জগতে তা গুপ্ত থাকবে না। যদি এই ফাঁকে বেশ কিছু সাধ সেই রূপের কাছে উপস্থিত হয়ে গিয়ে বিচিত্র বরদানে নিজেদের ভূষিত করে নেয়? তখন কি হবে? প্রভু, সাধরা সাধ অর্থাৎ ইচ্ছার স্বামী। সমস্ত ইচ্ছার জন্ম তাদের থেকেই হয়। আবেগের জনক তারা। তাই তাদের মধ্যে অনেকেরই ভাব এরকম যে তারা আমাদের ত্রিমূর্তির অধীনেও থাকতে চায়না”।
“প্রভু, কিন্তু সেই সাধ তাদের পুড়ন করার মত কেউ নেই। এমন অবস্থায় যদি স্বয়ং পরাপ্রকৃতি তাদেরকে এই বরদান প্রদান করে দেন? বুঝতে পারছেন, এমন হলে আগামীদিনে পরিস্থিতি কতটা আমাদের নিয়ন্ত্রণ রেখার বাইরে চলে যাবে! … সাধদের মধ্যে কারুর কারুর আমাদেরকেও বশ করে ফেলার সামর্থ্য এসে যাবে। অর্থাৎ আমরা কেবল মৃষুর ভয় থেকে, আর আদিশক্তির ভয় থেকে বাঁচার প্রয়াস করে, আমাদেরই পুত্র, সাধদের হাতে বন্দী হয়ে যাবো”।
রমনাথ তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন, “কেন এসব দুশ্চিন্তা করছেন দুধেশ্বর? আমরা আত্মভাব। আমাদের ছাড়া এই ব্রহ্মাণ্ড অস্তিত্বতেই থাকবে না। … তাই আমাদেরকে বন্দী করে, বশ করে, কে কিই বা করতে পারবে?”
পীতাম্বর বিরক্তির সাথে বললেন, “আপনি বুঝতেই চাইছেন না ব্যাপারটা। … ব্রহ্মাণ্ডের কল্পনা আমরা করেছি ঠিক। কিন্তু আমরা এমনি এমনি ব্রহ্মাণ্ডের রচনা করিনি। পরাপ্রকৃতির উপর আধিপত্য বিস্তার করার জন্যই তা করেছি। অর্থাৎ আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের পিছনে রয়েছে বড় এক স্বার্থ। তাই, কাল যদি কেউ আমাদের বন্দী করে নেয়, আমরা ব্রহ্মাণ্ডের নাশ করে দিতে পারবো না। পারবো কি? ব্রহ্মাণ্ডের নাশ করার সামর্থ্য আমাদের আছে, কিন্তু নাশ করতে কি পারবো আমরা?”
শ্বেতাম্বর উত্তরে বললেন, “পীতাম্বর, আপনি কথা সঠিক বলছেন, কিন্তু এমন গহন কথা উদ্ধারের সামর্থ্য কনো সাধের নেই। … আছে কি, আপনিই বলুন না”।
পীতাম্বর মাথা নেড়ে বললেন, “না থাকতে পারে, কিন্তু ইচ্ছা তাদের ষোলোআনা আছে, আমাদের ত্রিমূর্তিকে অপসারিত করে ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি হয়ে ওঠার”।
রমনাথ বললেন, “শুধু ইচ্ছা কেন, সামর্থ্যই তো রয়েছে জিতেশের, ডাহুক বাহুকের। নেই? জিতেশের নাশ একমাত্র মৃষু করতে পারবে, আর মৃষু নিজের স্মৃতি হারিয়ে বসে আছে, অর্থাৎ এইক্ষণে জিতেশ সর্বশক্তিমান! … ডাহুকবাহুকের নাশ একমাত্র অম্বা করতে পারে, কিন্তু পূর্ণ নগ্ন অবস্থাতে। সমস্ত জগতে যার সন্তান ছড়িয়ে রয়েছে, সে নগ্ন তো হবেনা, অর্থাৎ ডাহুক বাহুকের নাশ অসম্ভব। … কই তারা তো আমাদের উপর অধিকার স্থাপন করছেনা! চাইলেই পারে। কিন্তু করছে কই?”
পীতাম্বর ও শ্বেতাম্বর উভয়েই অসন্তুষ্ট হয়ে মাথা নামিয়ে নিলে, রমনাথ আবার প্রশ্ন করলেন, “আপনারা ঠিক কি চাইছেন, আমাকে স্পষ্ট ভাবে বলুন তো?”
পীতাম্বর বললেন, “মুমুপুত্র হাজত মহাশক্তিশালী। বহুল বল তার, আর তার কাছে এক মহাদুর্গ আছে। … সেই দুর্গ অভেদ্য। দেবী অম্বার কালে, সে তপস্যা করেছিল, আর দেবী অম্বার থেকে বরদান লাভ করেছিল যে, একমাত্র তাঁর নিজের প্রহারের কারণেই তার দুর্গের নাশ সম্ভব। আর একমাত্র দুর্গের নাশ হলে, তবেই দেবীর হাতে তার নাশ হবে। অর্থাৎ বুঝতে পারছেন, যদি আমরা তার কাছে দেবীকে বন্দী করাই, তবে না তো দেবীর থেকে উগ্র অনিয়ন্ত্রিত উর্জা প্রকাশ্যে আসতে পারবে, আর না সেই সাধরা বলবান হতে পারবে, যারা আমাদেরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে করতে চায়”।
রমনাথ বললেন, “বেশ, তার জন্যও অম্বাকে যাত্রা করতে হবে। অম্বা যদি যাত্রা না করে, তাহলে তাকে হাজত নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখবে কি করে? … তাই আগে তাকে যাত্রা শুরু করতে দিন”।
সকলে এই প্রস্তাবে সহমত হলে, যে যার নিজের ধামে উপস্থিত হয়ে আগামী কর্মসূচির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলেন। তো ঠিক সেই কালে, নভ স্বয়ং উপস্থিত হলেন কৃত্তিকালোকের দ্বারে আর মাতা সর্বাম্বার উদ্দেশ্যে বললেন, “মাতা, আপনার ও আপনার পুত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। একদিকে ডাহুক, বাহুক আর জিতেশ আপনাকে হীরাকয়লার মাধ্যমে জিতেশের নির্মিত ত্রিলোক বিশিষ্ট শোণিতনগরে বন্দী করতে চাইছেন। অন্যদিকে ত্রিমূর্তি আপনাকে হাজতের দুর্গে আবদ্ধ করতে চাইছেন”।
মাতা সর্বাম্বা সেই কথা শুনে খানিক চুপ করে থেকে বললেন, “নভ, তোমার এবার তোমার অধিকার ফিরে পাবার সংগ্রামে যোগদান করা উচিত। সেনা সজ্জ করো, আর সাধদের বিরোধ করো। এই যুদ্ধ বহুকাল চলবে। বহুক্ষয় হবে তোমাদের, কিন্তু ভয় পাবেনা। অমৃত কলস আছে তোমাদের কাছে। সঠিক ভাবে তার ব্যবহার করবে যাতে এই দীর্ঘায়ু যুদ্ধে তোমরা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারো। এখন এসো, আর নিজের সেনাকে একত্রিত করতে মন দাও”।
নিসাধরাজ চলে গেলে, দেবী পাবনি বললেন, “এখনো তুমি কিছু করবে না অম্বা?”
দেবী সর্বাম্বা মাথা নেড়ে বললেন, “আমার পুত্র যে আমাকে ভুলে যায়নি, সেটা সকলে জেনে ফেলেছে। এবার তাঁর পূর্ণ শক্তির সাথে পরিচয় হবার সময় এসেছে। আমার পুত্র যে আমারই সমান, সেটা আমার পুত্রের নিজেরও জানা আবশ্যক। তাই আমি তাঁর অন্তরে চেতনারূপে, প্রকৃতিরূপে এবং নিয়তিবেশে প্রকাশিত হবো, আর ক্রমশ তাঁর অন্তরের সমস্ত কর্তাভাবের নাশ করে, তাঁর আত্মকে সে যাতে নাশ করে দিতে পারে, সেই দিকে নিয়ে যাবো আর প্রথম পূর্ণ কৃতান্তিক করে তুলবো”।
দেবী কৃত্তিকা বললেন, “অর্থাৎ করতে কি চাইছও তুমি দেবী?”
দেবী সর্বাম্বা বললেন, “লীলা। … লীলার মাধ্যমে তাঁকে জ্ঞানের জন্য উন্মাদ করে দেব। আর জ্ঞানের মধ্য দিয়ে, তাঁর অন্তরে কৃতান্ত স্থাপন করবো। সর্বাম্বা, জগদ্ধাত্রেয় আর সর্বশ্রী রূপে তাঁর অন্তরে মহাজ্ঞান জাগ্রত করবো, আর তার কাছে প্রত্যক্ষ করে দেব যে, সে আর আমি অভিন্ন”।
দেবী পাবনি বললেন, “ইতিমধ্যেই সে তোমার জন্য পাগল হয়ে আছে অম্বা। দিবারাত্র সে তোমার কাছে যাবার মার্গের সন্ধান করে ফিরছে। গুহায় গুহায় গিয়ে, সাধুদের সাখ্যাত করে, সে মার্গ জানতে যাচ্ছে, কিন্তু আসলে প্রেমের সমর্পণের মাহাত্ম তাঁদেরকে বলে আসছে। কিন্তু দিনের শেষে সে মার্গ লাভ না করে, প্রগল হয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায়, সে বিচার করেছে। বিচার করে দেখেছে যে তুমি জগজ্জননী, সকলের চেতনা হয়ে বিরাজ করছো। তাই দরিদ্রদের কাছে গিয়ে, বিত্তবানদের কাছে গিয়ে, তাদের সাথে মিশে মিশে, তোমার কথা জানার প্রয়াস করছে”
“দিবারাত্র ব্যর্থ হচ্ছে, আর হতাশ হয়ে সে তোমার সন্ধান করেই চলেছে। এখন সে বিচার করে দেখেছে যে, জগতকে সম্পূর্ণ ভাবে বশীকরণ করে রেখেছে ধন, আর ধনের বিস্তার হচ্ছে বাণিজ্যকে মাধ্যম করে। তাই সমস্ত মানুষের মধ্যে যে মনস্তত্ত্ব, তাকে এখন বশ করে রেখেছে বাণিজ্য, আর তাই সে বাণিজ্যবিদ্যা জানার জন্য ছুটে চলেছে। এমন অবস্থায় তুমি আর তাকে নূতন করে কি পাগল করবে সর্ব্বা? সে তোমার জন্য এমনিই পাগল হয়ে রয়েছে, আর নূতন করে কি পাগল হবে সে?”
দেবী সর্বাম্বা হেসে বললেন, “সে যে অনন্ত। তার পাগল হবার সামর্থ্যও অনন্ত। এতক্ষণ সে নিজে মার্গ সন্ধান করে ব্যর্থ হয়ে পাগল ছিল, এবার মার্গ আমি দেখাবো তাকে। এবার সে মার্গে চলমান হবার জন্য প্রগল হবে। এই প্রগলতার কারণে একদিন সে নিজের অন্তরে আমাকে প্রত্যক্ষ করবে, আর একবার তা করে নিলে, সেই আমিই তাঁকে কৃতান্তজ্ঞাতা কৃতান্তিক করে তুলবো। … আর তারপর আমার পুত্র, আমার মৃষু আমাকে হাজতের থেকে মুক্ত করবে, আর শুরু হবে তার জয়যাত্রা। সময় হয়ে এসেছে, এবার আমার মৃষু পূর্ণ হবে। সময় এসে গেছে, আমার পুত্র এবার পরমাত্মের, সাধদের ভয়ের কারণ হয়ে উঠবে, আর আশার আলো হয়ে উঠবে নিসাধদের, আর সমস্ত আমার সঙ্গীদের। দেখতে থাকো কেবল”।
দেবী কৃত্তিকা মুখ গম্ভীর করে বললেন, “কিন্তু এই অভিশাপ যে একটি ষড়যন্ত্র ব্যতীত অন্য আর কি? এমন ষড়যন্ত্রের যদি প্রতিবাদ না করা হয়, তাহলে তো আবারও করা হবে এমন। তাই নয় কি?”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “স্মৃতি ছিনিয়ে, সাধদের দ্বারা জগতকে বেষ্টন করে তার মধ্যে মৃষুকে রাখা হয়েছে। কৃত্তিকা, তুমি একে অভিশাপ দেখছো, কিন্তু আমি দেখছি বরদান। সাধদের বিস্তার মনুষ্যকুলের মধ্যে সমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সাধদের বিস্তার কেন হচ্ছে মানুষের মধ্যে, সেই সম্বন্ধে মৃষুর কি কনো ধারণা ছিল কৃত্তিকা? কিন্তু এই অভিশাপ তাঁকে সেই রহস্য সমাধান করতে বাধ্য করবে”।
“সাধের স্বভাবই নেই মৃষুর মধ্যে। তাই মৃষুকে স্মৃতিভ্রষ্ট করে, তাকে সাধদের বিস্তারের মধ্যে রেখে মহাভুল করলো ত্রিমূর্তি। যদি এই সময়ে নিসাধদের আধিপত্য বিস্তার করতো ত্রিমূর্তি, তাহলে হতেও পারতো যে মৃষুর স্মৃতি আর ফিরতোই না, কারণ নিসাধদের মানসিকতা তাঁকে উষ্ণতা, স্নিগ্ধতা আর স্বাচ্ছল্য প্রদান করতো। কিন্তু সাধদের মানসিকতা যে না তাকে স্বাচ্ছন্দ প্রদান করবে, না উষ্ণতা আর না স্নিগ্ধতা। রুক্ষতা, অস্বস্তি, আর অসমাঞ্জস্যতা ঘিরে ধরবে তাকে। আর সেই সমস্ত কিছু তাকে ক্রমশ নিজের স্মৃতির দিকেই এগিয়ে দেবে। মৃষু একজন পূর্ণ যোদ্ধা। যোদ্ধা কখনো অস্বস্তিকে, রুক্ষতাকে মেনে নেয়না। সে যুদ্ধ করে, সমস্ত রুক্ষতা, সমস্ত অসামাঞ্জস্যতাকে পরাস্ত করার মার্গ ”।
“ক্রমশ সে অনুভব করতে থাকবে যে নিসাধ আর সাধদের মধ্যে ভেদ কি? আর তাই স্মৃতি ফিরে পাবার সাথে সাথে, সে নিসাধ হবার রহস্য ভেদ করে, আগামীদিনে এই নিসাধতত্ত্বের বিস্তার কর্মে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করবে। তাই যা হয়েছে, তা অভিশাপ নয়, বরদান রূপে মৃষুকে ঘিরে রয়েছে। আর রইল কথা এই ষড়যন্ত্রের নাশ, কৃত্তিকা ষড়যন্ত্র ভালোও হয়না, মন্দও হয়না। ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য তাকে ভালো করে বা মন্দ করে। যদি ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য সুচরিত্র দান করা হয়, তবে সেই ষড়যন্ত্রও শুভ। কিন্তু ত্রিমূর্তির ষড়যন্ত্র পরাধীনতার শিকল বিস্তার করার উদ্দেশ্যে স্ফীত। তাই সেই ষড়যন্ত্র একসময়ে নিজেই নিজেকে দংশন করবে”।
“কৃত্তিকা, সর্প যখন নিজের বিষকে নিজের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার না করে, নিজেকে শক্তিশালী প্রমাণ করতে কাজে লাগায়, তখন সে নিজেরই পুচ্ছকে নিজের বিষ দ্বারা আঘাত করে ফেলে। ত্রিমূর্তির ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই হবে। নিশ্চিন্তে থাকো কৃত্তিকা। আমার মৃষু আছে তো। তাঁর সামর্থ্যের ভানও নেই ত্রিমূর্তির। তবে সেই ভান স্বয়ং মৃষুরও নেই। নিজের সাথে করা ষড়যন্ত্রকে সে গুরুত্বও দেবেনা। তবে যদি গুরুত্ব দেয় সে কখনো এই ষড়যন্ত্রের, তখনই এই ষড়যন্ত্রের নাশ করে দেবে। নিশ্চিন্তে থাকো, সঠিক সময়ে আমার পুত্রকে এই বিষয়ে আমি মার্গ দেখাবো। তবে এক্ষণে তার নিজের সামর্থ্য সম্বন্ধে জানার সময় আসন্ন। তাই তাকে সেই বিষয়ে প্রস্তুত করা প্রয়োজন”।
দেবী পাবনি সম্মুখে এসে বললেন, “কিন্তু কি ভাবে সর্ব্বা?”
দেবী সর্বাম্বা মৃদু হেসে বললেন, “মৃষুর পথে যাও। তোমার সাথে কৃত্তিকা আরো বেশ কিছু পক্ষ যুক্ত হবে শিষ্য বেশে। নিজের উপর কনো নিয়ন্ত্রণ রাখবেনা। আমি তোমাদের সকলকে চালনা করবো। আমিই তোমাদের মুখ দিয়ে কথা বলবো। মৃষু অত্যন্ত ব্যহত হবে, ক্লান্তও হবে, আর হতাশও হবে। কিন্তু আবেগশূন্য থেকো, তবেই আমার বার্তা তার কাছে তোমরা পৌঁছে দিতে পারবে। নিজের দর্শক নিজে হও, তবেই বুঝতে পারবে আমি কিভাবে এবং কেন সেই ভাবে তোমাদেরকে চালনা করছি”।
দেবী পাবনি ও দেবী কৃত্তিকা বেশ কিছু পক্ষদের সাথে মৃষুর পথে এলেন। দেবী পাবনিকে দেবী পাবনি বলে চিহ্নিত করতে পারলো না মৃষু, কিন্তু পালিতা মাতা সে তাঁর। তাই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হবে না, তা কি করে হতে পারে? মায়ের সাথে সন্তানের যে অঙ্গের গন্ধের সম্পর্ক। তাই শুভ্র পোষাকে আবৃত পুরুষ সাধু বেশে থাকা দেবী পাবনির প্রতি আকৃষ্ট হলো মৃষু, এবং তাঁর সাথে আলাপ করে মার্গদর্শন লাভ করার জন্য তাঁর পিছু নিলো সে।
দিনের পর দিন পথ চলতে থাকলেন দেবী পাবনি ও তাঁর শিষ্যরূপে থাকা সমস্ত পক্ষরা। আর মৃষু তাঁদের ছায়াসঙ্গী হয়ে পথ চলতে থাকলো। সেও বুঝলও সাধুবেশে থাকা দেবী পাবনি তাঁর উপস্থিতি সম্বন্ধে জানেন, কিন্তু জেনেও যেন গুরুত্ব দিচ্ছেন না তাঁকে। কিন্তু মৃষু জিজ্ঞাসু, দেবী পাবনির প্রতি আকৃষ্ট। তাই অনাহারে দুর্বল হয়ে গেলেও, আশা ছাড়লেন না মার্গদর্শন লাভের।
অন্তে যেদিন আর মৃষুর পথ চলার সামর্থ্য নেই। এক টানা ১০ দিবস অনাহারের সাথে যোজন যোজন পথ অতিকরম করার কারণে সঠিক ভাবে তার মানবীয় দেহের দাঁড়িয়ে থাকারও ক্ষমতা নেই, সেই রাত্রে দেবী পাবনির অন্তরে মাতা সর্বাম্বা তাঁর চেতনা হয়ে, মৃষুর সম্মুখে গিয়ে উপস্থিত হলেন অন্নপূর্ণা রূপে, এবং নিজহাতে অন্ন খাওয়ালেন মৃষুকে। সামান্য উর্জা লাভ করে, কথা বলার সামর্থ্য লাভ করলে, মৃষু করজোড়ে নিবেদন করলেন তাঁর সম্মুখে থাকা সাধুর কাছে, “আমার মার্গ দর্শন করুন প্রভু। … আমি সম্মুখে কনো মার্গ খুঁজে পাচ্ছিনা। যেই ভাবে মনুষ্য সমাজ চলছে, আমি সেই পথে চলতেই পারছি না। স্বার্থচিন্তা করতে পারছিনা, অর্থচিন্তা করতে পারছিনা। লোভ করতে পারছিনা, কামনার সাগরে ডুব দিতে পারছিনা। কিন্তু এগুলি না করে, কি যে করবো, তাও বুঝতে পারছিনা”।
“প্রভু, আমার যেন মনে হচ্ছে আমি সত্য থেকে ভ্রষ্ট। মনে হচ্ছে যেন আমি অনাথ না হয়েও অনাথ। আমার মা কে? মায়ের অঙ্গের গন্ধ আপনার থেকে পাচ্ছি, কিন্তু তাও যেন তা আমার মায়ের অঙ্গের সুবাস নয়। মায়ের সন্ধান চাইছি প্রভু। আমি মা-হারা হয়ে গেছি”।
সাধু বললেন, “আর কে আছে তোমার, মা ছাড়া?”
মৃষু বললেন, “কেউ নেই, আর সত্য বলতে কারুকে চাইও না, শুধু মা চাই। মা ছাড়া, কার জন্য বাঁচবো, কার জন্য কাঁদবো, কার জন্য হাসবো? নিজের জন্য বাঁচতে পারছিনা। মায়ের জন্য বাঁচার জন্য প্রাণ ছটফট করছে, কিন্তু মায়ের সন্ধান পাচ্ছিনা। মার্গ পাচ্ছিনা মায়ের কাছে যাবার, মায়ের সন্ধান পাবার। … মার্গ প্রভু, মার্গ!”
দেবী পাবনির নেত্র অশ্রুপূর্ণ হয়ে উঠলো। ঠিকই বলেছিলেন মাতা সর্বাম্বা, তাঁর পুত্র তাঁকে ছাড়া কিচ্ছু জানেও না, চেনেও না। সে নিজেকেও জানে বা চেনে না, আর জানতে বা চিনতে চায়ও না। শুধুই মা, তাঁর অস্তিত্বই যেন মা’কে ঘিরে। কিছু বলতে গেলেন তিনি, মাতা সর্বাম্বা চেতনা বেশে তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, “উমহুম আবেগ নয়, কথা আমি বলবো, তুমি নয়!”
দেবী পাবনি চুপ করে গেলেন, সাধু বললেন, “বাছা, তোমার মার্গ দর্শন করানোর সামর্থ্য আমার কেন, কারুরই নেই। তুমি যে মার্গের নির্মাতা। মার্গের নির্মাতার মার্গ কে-ই বা দেখাতে সক্ষম? পুত্র, তোমাকে মার্গ নির্মাণ করতে হবে, তোমার মাতার কাছে যাবার মার্গ”।
মৃষু জিজ্ঞাসু ভাবে বললেন, “কিন্তু আমার মা কে? সেটাই তো আমি জানি না? তাঁর কাছে আমি কি করে যাবো? কি ভাবে তাঁর কাছে যাবার মার্গ নির্মাণ করবো?”
দেবী পাবনি নিজের আবেগের নাশ করে দিয়েছেন এতক্ষণে। তাই এবার তিনিই বললেন, আর মাতা সর্বাম্বাকে বলতে হলোনা। তিনি সাধুর মুখ দিয়ে বললেন, “পুত্র, তোমার মা তিনি, যিনি আমারও মা। আমাদের সকলের মা। জগজ্জননীই তোমার মা”।
মৃষু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে বললেন, “কিন্তু তাঁর সন্ধান পাবো কি করে?”
দেবী পাবনি সাধুর মুখ দিয়ে বললেন, “তা তো জানিনা পুত্র, তুমি তাঁর কাছে পৌঁছানর মার্গ নির্মাণ করলে, তবেই আমরা সেখানে পৌছাতে পারবো। তবে এটুকু বলতে পারি যে, তিনি সকলের চেতনা হয়ে বিরাজ করেন। সমস্ত কিছুর প্রাণ তিনিই, আর সেই প্রাণ তখনই অনুভূত হয় যখন তিনি চেতনা হয়ে যুক্ত হন জীব, উদ্ভিদের সাথে। একটি জীবের সম্মুখে উপস্থিত সমস্ত জীবের উদ্ভিদের চেতনাকে একত্রিত রূপে তাঁকে প্রকৃতি বলা হয়। আর সমস্ত জীবের, সমস্ত উদ্ভিদের চেতনার সমষ্টিরূপে তিনি স্থিত, তাই তাঁকে পরাপ্রকৃতি বলা হয়”।
“কিন্তু পুত্র, এর থেকে অধিক আমি কিচ্ছু জানি না, কেউ কিচ্ছু জানেনা। কি ভাবে সেই চেতনার, সেই প্রকৃতি, সেই পরাপ্রকৃতির কাছে মার্গ বলবো তোমায়? পৌঁছাবার মার্গ যে কারুর জানা নেই। আরে আমাদের তো, তোমার মাতার প্রতি যেই টান রয়েছে, মাতার কাছে যেতে পারছো না বলে যেই অস্বস্তি, যেই হতাশা রয়েছে, তাও নেই। তাই আমার বিশ্বাস পুত্র, এক ও একমাত্র তুমিই সেই মার্গের নির্মাণ করতে পারবে। যাও ফিরে যাও, নিজের অন্তরে প্রবেশ করো। তোমার কাছেই তোমার মায়ের প্রতি সেই অমোঘ টান আছে, যা তোমাকে নিশ্চিত ভাবে তাঁর কাছে পৌঁছে দেবে। তবে হ্যাঁ, সাবধান, ভ্রমের পচা শামুক চারিপাশে ছড়ানো রয়েছে। সেই শামুকে পা কেটে ফেলো না”।
মৃষু প্রশ্ন করলো, “এর অর্থ তো আমি অন্তরে প্রবেশ তখনই করতে পারবো যখন এই ভ্রমদের থেকে সুরক্ষিত হতে পারবো। কিন্তু সেটা হবে কি করে?”
দেবী পাবনি বললেন, “পুত্র, এই ব্রহ্মাণ্ড এক কল্পক্ষেত্র, আর এতে স্থিত সমস্ত কিছু তাই কল্পনা, ভ্রম। আর সেই কল্পনা আর ভ্রমকেই বিবৃত করা হয় সমস্ত পাঠ্যবিষয়ের মাধ্যমে। তাই যদি সমস্ত পাঠ্যের সার জেনে ফেলো, তবেই সমস্ত ভ্রমের ভান হয়ে যাবে তোমার। আর তবেই ভ্রমের পচা শামুকে নিজের পা গলিয়ে ক্ষত করা থেকে বিরত থাকতে পারবে। যাও প্রত্যাবর্তন করো, আর সমস্ত ভ্রমের সার ধারণ করো”।
ফিরলো মৃষু আর শুরু করলো সেই প্রগলতা, যেই প্রগলতার ইঙ্গিত মাতা সর্বাম্বা করেছিলেন, আর দেবী পাবনি যার কথা শুনেও চমকিত হয়ে গেছিলেন। দিবারাত্র এক হয়ে গেল তাঁর। আহার নিদ্রা অকারণ হয়ে গেল। সর্বক্ষণ সমস্ত পাঠ্য বিষয়ে মুখ গুঁজে থাকলো সে, আর মাত্র ৫ বৎসরের মধ্যে সমস্ত ভ্রমের সার গ্রহণ করলো সে। চিহ্নিত করলো সে নিজের তথা জগন্মাতার অবস্থানের।
মার্গ নির্মাণও করলো। ইচ্ছা চিন্তা ও কল্পনার মাধ্যমে আত্মভাব সমস্ত জীবকে বদ্ধ করে রেখে দিয়েছে, আর এই বদ্ধতার কারণেই জীব নিজের অন্তরে স্থিত মা-কে, পরাচেতনাকে সনাক্তও করতে পারছেনা। যেমন মাতা সর্বাম্বা বলেছিলেন, সেই ভাবেই মৃষু সাধ আর নিসাধদের ভেদও ধারণ করে নিলো। স্পষ্ট হয়ে গেল তার কাছে যে, আমিত্ব নিয়েই সকলে উলমালা। সম্মুখে প্রকৃতি বহুল ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন, সমস্ত ঘটনা থেকে শিক্ষা প্রদান করছেন, চেতনার মানহানি থেকে আরম্ভ করে আত্মভাবে জরাজীর্ণতা, সমস্ত দেখাচ্ছেন তিনি। কিন্তু সকলেই আত্মভাবে বিভোর।
কেবলমাত্র নিজের ইচ্ছার সাথে, নিজের চিন্তার সাথে আর নিজের কল্পনার সাথে কি খাপ খাচ্ছে, আর কি খাপ খাচ্ছেনা, সেই নিয়েই সকলে উলমালা। নিজের ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার বাইরে যেতেই অক্ষম সকলে। তাই কেমন ভাবে নিজের কল্পনাকে অন্য কেউ এসে বিনাশ করছে, নিজের চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে কেউ, আর নিজের ইচ্ছাগুলিকে কেউ বাহবা দিচ্ছে বা কেউ নাশ করছে, সেই নিয়েই সকলে ব্যস্ত।
সকলের ইচ্ছা, চিন্তা আর কল্পনার প্রতি আসক্তির কারণে সকলে যে সকলকে ঠকাতে ব্যস্ত, সকলকে সকলে পথে বসাতে ব্যস্ত, সকলে সেই সকলের অমঙ্গল কামনা করে চলেছে যে যে তাঁর ইচ্ছা আর কল্পনাকে নষ্ট করছে, আর সেই সকলের মঙ্গল কামনা করে যাচ্ছে, যে যে তাঁর ইচ্ছা ও কল্পনাকে অন্ধভাবে সমর্থন করছে, এই সমস্ত কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছেনা কেউ। আর এই দেখতে না পাবার কারণে সকলেই দুর্বল, কারণ সকলেই সামান্য ‘আমি’ হয়ে বিরাজ করছে।
সকলেই সামান্য এক ‘আমি’ হয়ে বিরাজ করে সেই ‘আমি’কে বিশ্বব্যাপী করে তুলতে যেকোনো প্রকার ছল, চাতুরী, নিকৃষ্টতা, লোক ঠকানো, হত্যা সমস্ত প্রকার সাধের অবতারণা করে করে, সকলে সাধদের মতই হীনবুদ্ধিসম্পন্ন আর সকলেই সাধদের মতই দুর্বল হয়ে কেবলই বরদানি কবচের সন্ধানে ভ্রম্যমান।
সেই কবচের খোঁজে কেউ যক্ষদের কাছে যাচ্ছেন আর বিভিন্ন রঙের পাথর ধারণ করছেন; কেউ সেই একই কবচের সন্ধানে নাগাদের কাছে গিয়ে সূক্ষ্মপঞ্চভূতরূপে পিশাচের সন্ধান করছে; আবার কেউ যন্ত্রের শরণাপন্ন হয়ে নিজের অক্ষমতাকে ঢাকার প্রয়াস করছে, তো কেউ মন্ত্রের শরণাগত হয়ে মন্ত্রনির্মিত অস্ত্র ও ওষধি ধারণ করে নিজের প্রাপ্ত বয়সকে লুকাচ্ছেন, নিজের সমস্ত প্রকার অক্ষমতাকে লুকিয়ে চলেছেন।
অন্যদিকে, এই কবচের সন্ধানে ভ্রম্যমান মনুষ্যবেশধারী সাধদের এই আচরণকে কাজে লাগিয়ে, নিজেদের সমস্ত কবচ ক্রয় করার প্রয়াস করে, কেউ ভণ্ড নাগা, কেউ ভণ্ড ভক্ত, কেউ ভণ্ড সন্ন্যাসী, কেউ ভণ্ড যক্ষরূপী শাস্ত্রী, তো কেউ আবার আরো অধিক উন্নত ঠগ হয়ে, যন্ত্রের মন্ত্রের এবং তন্ত্রের নির্মাতা হয়ে, অস্ত্রবিক্রেতা, ওষধিমন্ত্রের প্রচারক বৈদ্য। কেউ আরো শ্রেষ্ঠ ঠগ হয়ে শূন্যে ভ্রমণ করার মিথ্যাচারী, তো কেউ আবার এই সমস্ত ঠগপ্রথাকে সহজলোভ করে দেবার মিথ্যাচারন করে ভেদাভেদের বিস্তারক নেতা বা মন্ত্রী।
সমস্ত কিছু দেখলো মৃষু, সমস্ত কিছু অনুভব করলো। এও অনুভব করলো নিজের মধ্যে যে, যতক্ষণ এই আমিত্বভাব, যতক্ষণ এই নিজের চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার প্রতি আস্থা আর সেই নিয়েই সমস্ত আচার ও আচরণ, ততক্ষণই এই সাধভাব, ততক্ষণই সাধদের মত কবচের সন্ধান। সেই কবচ কখনো বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি তো কখনো যক্ষদের দেওয়া প্রস্তর, তো কখনো যন্ত্রের প্রলেপ, তো কখনো মন্ত্রের আবরণ। আর এই সমস্ত কিছুকে আনায়ন করার মাধ্যম রূপে সাধকুল, আত্মকুল, পরমাত্ম স্থাপন করে রেখেছে ধনকে।
আর তাই সকলে সাধ হয়ে ওঠার জন্য ব্যকুল হয়ে ধনরাশির পিছনে ধাবমান। প্রতিটি জনকজননী তাঁদের সন্তানদের এই ধনরাশি ধারণের জন্যই সর্বক্ষণ প্রেরণা প্রদান করছে। সন্তান এই ধনরাশি এনে দিতে পারলেই খুশী, আর না পারলেই অখুশী। এই সমস্ত কিছু দেখে, বিতৃষ্ণা এসে যায় সমাজের প্রতি মৃষুর। যেমন মাতা সর্বাম্বা বলেছিলেন, মৃষুকে স্মৃতিহারা করিয়ে সাধকুলের বিস্তার করতে দিয়ে ত্রিমূর্তি মহাভ্রান্তি করে ফেলেছে, ঠিক তেমনই প্রমাণিত হলো।
বিতৃষ্ণা জন্ম নিতে, ধনবিমুখ হয়ে উঠলো মৃষু। সমস্ত প্রকার কবচের থেকে দূরে চলে গেল সে। আর শেষে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে দিল। ত্রিমূর্তি বিপদের আশঙ্কা করে, তর্ক করে তাঁকে আমিত্বের দিকে ঠেলার প্রয়াস করা শুরু করলো। মৃষুর সম্মুখে ভয়ানক তর্কবাগীশদের প্রেরণ করা শুরু করলো ত্রিমূর্তি।
মৃষুর কঠিন উত্তর সেই সমস্ত তর্কবাগীশদের বাকশক্তিই হনন করে নিলো। সে বলল, “গ্রহণযোগ্য যদি কিছু থাকে, তা নিশ্চিত ভাবেই ভেদক হবেনা, তা হবে ধ্রুবক। তা আমার এই পরিচয়ের মধ্যে ধ্রুবক কোনটি, তা ব্যক্ত করো আমায়। … আমার এই নাম আপেক্ষিক, কারণ তা আপেক্ষিক ভাবেই আমায় দেওয়া হয়েছে। তা যদি ভিন্ন কিছু হতো, তাতেও কিছু এসে যেত না। আমার এই নামের সাথে উপাধিও আপেক্ষিক, কারণ তা আমার দেহদাতা পিতার থেকে প্রাপ্ত। এই দেহ অন্য কেউ প্রদান করলে, বা অন্য কেউ এই দেহের দেখভাল করলে, এই উপাধি পরিবর্তিত হয়ে যেত”।
“শুধু কি তাই, আমার এই দেহের গঠনও আপেক্ষিক। যদি অন্য কনো পিতার ঔরস আর অন্য কনো জননীর ডিম্ব ও গর্ভ এই দেহ ধারণ করতো, না তো এর আকৃতি এমন হতো, আর না এর বর্ণ এমন হতো। আমার ধর্ম, জাতি, ভাষা, সমসত কিছুই আপেক্ষিক। সমস্ত কিছুই একটি যোগাযোগের ফলে স্বল্পকালের জন্য স্থিত হয়ে থাকা একটি মন্ত্রের মত, যা পূর্বমুহূর্তেও ভিন্ন ছিল, আর পরমুহূর্তেও ভিন্ন হয়ে যাবে”।
“পূর্বেও আমি দেহ পেয়েছি, কিন্তু পিতা, জননী ভিন্ন হবার কারণে, সেই দেহের আকৃতি, বর্ণ ভিন্ন ছিল। পূর্বেও আমি দেহ পেয়েছি, কিন্তু সেই দেহের অবস্থান ভিন্ন হবার জন্য সেই দেহের ব্যক্তির ভাষা, জাতি, ধর্ম, পোশাক, রুচি, আহারাদি, সমস্ত কিছু ভিন্ন ছিল। তাহলে আমি কে? আমি একটা ক্ষণিকের অবস্থা, যা নির্ভর করছে অগুনতি কারণের উপর, আর যেই মুহূর্তে সেই কারণগুলি পালটে যাবে, সেই মুহূর্তে এই অবস্থা আর অবস্থান সমস্তই পালটে যাবে। এই সমস্ত কিছুতে ধ্রুবক কি?”
“কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু ধ্রুবক নয়। তাহলে আমার অস্তিত্ব কি করে সত্য হতে পারে? আমার অস্থিত্বই একটি কাল্পনিক অবস্থান। আমি স্বয়ং একটি কল্পনা। সেই কল্পনাকে নিয়ে আমি এতো উলমালা কেন থাকবো? কি চিন্তা এর, কি চাই এর, কি ইচ্ছা এর, কি কল্পনা এর, এর কি ভালো লাগছে, এর কি খারাপ লাগছে, একে কে মান দিচ্ছে, কে অপমান করছে, কে সম্মান দিচ্ছে, কে অসম্মান করছে, কে ঠকাচ্ছে একে, কে আগলে রাখছে, কি হবে সেসব জেনে? যেই অস্থিত্ত্বই দুইমুহূর্তের, যেই অস্থিত্বই একটা কল্পনা মাত্র, তার অস্থিত্বকে সত্য মানা তো এক শ্রেষ্ঠ মুর্খামি ব্যতীত কিচ্ছুই নয়!”
“আমি সমস্ত কিছুর মধ্যে ধ্রুবকের সন্ধান পেয়েছি। যেই ধ্রুবক কখনো পরিবর্তিত হয়নি, আর তা হলো আমার, তোমার, সবার অন্তরে স্থিত চেতনা। বাকি সমস্ত কিছু আপেক্ষিক, সমস্ত কিছু ভেদক। পঞ্চভূতের রসায়ন অনুসারে নির্মাণ হওয়া এই দেহও এক আপেক্ষিক অবস্থা, আর সেই দেহ চেতনার সাথে সাখ্যাত করে সেই চেতনাকে নিজের অধিকারে এনে যেই আত্মভাব স্থাপন করে, সেই আত্মাও”।
“এই পঞ্চভূতের অবস্থা আপেক্ষিক, পঞ্চভূতের থেকে অধিক আপেক্ষিক এই অবস্থা, কিন্তু সর্বাধিক আপেক্ষিক, সর্বাধিক বড় ভ্রম তো আত্মা। নিছকই ধ্রুবককে অধিকারে আনার এক কাল্পনিক প্রয়াস হলো সেই আত্মা, যার অস্তিত্বই এক কল্পনা, যার বাস্তবিকতাই এক মহাভ্রম। আর এই আত্মভাবকে, এই আত্মা নামক কল্পনাকে সত্য মনে করার কারণেই, এই এতো চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনা, আর তাদেরকে ঘিরে সমস্ত প্রকার ভীতি, আর সেই ভীতির থেকে বাঁচার জন্য সমস্ত কবচের আয়োজন”।
তর্কবাগীশকে মুখের উপর মৃষু বলে দিলো, “আমি আমার তর্ক তোমাকে মানতে বলছিনা হে তর্কবাগীশ। তুমি আসতে পারো। আমার নিজের কাছে আমার মায়ের কাছে পৌঁছানর মার্গ স্থির হয়ে গেছে। এই আপেক্ষিকতার প্রতি বিশ্বাস, এই আত্মাকে নিয়ে উলমালা ভাব, এই আমিত্ব নিয়ে সর্বক্ষণ চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনার কারণেই আমরা সকলে অনাথ না হয়েও অনাথ। আমাদের জন্ম জন্মের মায়ের থেকে আমরা পৃথক। যিনি আমাদের সত্য অর্থে মা, তাঁকে আমরা মাতার ন্যায় মনে করার ভ্রমে আবদ্ধ। যিনি আমাদেরকে কেবলই একটি করে শবদেহ প্রদান করেছেন, তাদেরকে আমরা জননী বলে ফিরি”।
“আমি এই দেহের প্রতি আসক্তি, এই মিথ্যার প্রতি আসক্তি, এই মহা আপেক্ষিক আত্মার প্রতি সমস্ত বিশ্বাস হারিয়েছি। এক ও একমাত্র চেতনার প্রতি আমার আস্থা। আর তাই আমি আমার অস্তিত্বকে আজ অস্বীকার করছি। দেখি আমার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, আত্মার জলাঞ্জলি দিয়ে, সমস্ত আত্মভাবরচিত ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার নাশ করে আমি আমার মায়ের কাছে পৌছাতে পারি কিনা। যদি পারি, তবে নিশ্চিতই মার্গ স্থাপিত হবে জগতের বুকে। কর্তা ভাবের নাশ করে যদি আমি মাতার কাছে উপস্থিত হতে পারি, তবে জগতকে আমি কৃতান্ত প্রদান করে যাবো, আর মাতার কাছে পৌঁছাবার মার্গ বলে যাবো”।
দেবী পাবনি ও দেবী কৃত্তিকা এই মহাশক্তিমান মৃষুকে দেখে বিস্মিত হয়ে দেবী সর্বাম্বার দিকে তাকালেন, আর বললেন, “এমন অদ্ভুত বিশ্বাস তুমি রাখলে কি করে অম্বা নিজের পুত্রের উপর? সমস্ত স্মৃতি হারিয়ে ফেলা মৃষু যে এমন মহাসত্যকে সম্মুখে এসে স্থাপন করে দেবে, এ তো আমাদের কল্পনারও অতীত ছিল। কিন্তু তুমি কি করে তা জানলে? কি করে নিশ্চিত ছিলে যে মৃষু একদিন এই উচ্চতায় স্থিত হয়ে যাবে!”
দেবী সর্বাম্বা হেসে বললেন, “প্রকৃত শক্তি তো এটিই দেবী কৃত্তিকা। প্রতিটি জীবের মধ্যে আমি বিদ্যমান। আমি অর্থাৎ স্বয়ং ব্রহ্ম। কিন্তু পরমাত্মের প্রকোপে, ত্রিমূর্তির কারণে সকলে আমিত্ব নিয়েই ব্যস্ত। এই মহাব্রহ্মাণ্ডে এই ‘আমি’ কে? এক তুচ্ছ আপেক্ষিক অস্তিত্ব মাত্র। কিন্তু যখন এই ‘আমি’র নাশ হয়ে যায়, তখন সে স্বয়ং প্রকৃতি হয়ে যায়”।
“স্বয়ং আদিশক্তি হয়ে যায়। তখন আর সে শক্তিমান হয়না, স্বয়ং শক্তি হয়ে যায়। … স্বয়ং ব্রহ্মাণ্ড হয়ে যায় সে। আর আমার মৃষু আজ সেই কথাই তো প্রকাশ্যে বলল। তবে সে শুধু বলেই ক্ষান্ত থাকবে না। সে এবার মার্গের নির্মাণ করবে। ইচ্ছা, চিন্তা, কল্পনা থেকে মুক্ত হয়ে, আত্মের নাশ করে, সমস্ত আবেগের বিনাশ করে, সমস্ত ভাবের সঞ্চার করে, সে এবার পূর্ণ ভাবে কর্তাভাবের নাশ করে, আমার সাথে মিলিত হবে”।
“জয়যাত্রা তো তারপর শুরু হবে তার। আমার সাথে সাখ্যাত করার পর সে কৃতান্তের রচনা করবে, আর স্থাপন করবে কৃতান্ত অর্থাৎ কর্তা ভাবের অন্ত করার মার্গের। সেই মার্গ নির্মাণ করবে সে, যেই মার্গের শেষে আমি বিরাজ করি, পরা চেতনা, পরাপ্রকৃতি, পরানিয়তি বিরাজ করে। আমিত্বের নাশ হলে যে এক সামান্য ব্যক্তিও কতখানি শক্তিশালী হতে পারে, তা প্রমাণ করে যাবে সে কৃতান্ত নির্মাণ করে। অপেক্ষার দিন শেষ দিদি, অপেক্ষার দিন সমাপ্ত হয়েছে কৃত্তিকা। আমার পুত্র যে সমাধিস্থ হলো বলে, এখানে আমার কাছে উপস্থিত হলো বলে”।
বলতে বলতেই, মৃষু এসে উপস্থিত হলেন মাতা সর্বাম্বার সম্মুখে। বিহ্বল সে। দেহ নিথর হয়ে গেছে। চক্ষুর অশ্রুবারিও শুকিয়ে গেছে। কেবলই ফ্যালফ্যাল করে মায়ের দিকে দেখছে, আর দূরে দাঁড়িয়ে মায়ের অঙ্গের সুবাসে মজে যাচ্ছে সে সমানে। দেবী সর্বাম্বারও অবস্থা একই প্রকার। পুত্র সম্মুখে স্থিত আলিঙ্গনের জন্য ব্যকুল। কিন্তু আলিঙ্গন করবেন কি তিনি! আলিঙ্গনের সুখের ভাবই তাঁকে ব্যকুল করে রেখেছে।
তাঁর কোমল কপোল বেয়ে প্রেমের অশ্রু অঝরধারায় তরান্বিত হতে থাকলো। যেন তিনি অবশ হয়ে গেছেন। চেয়েও একপা নড়তে পারছেন না। দেবী পাবনি বারবার দেবী সর্বাম্বার দিকে তাকাচ্ছেন আর আকারে ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইছেন, “পুত্র এতোদিন পরে মায়ের কাছে এসেছে। মা যদি এখন আলিঙ্গন না করে, পুত্র ভুল বুঝতে পারে!”
দেবী কৃত্তিকা পাবনির চঞ্চল স্বভাব সম্বন্ধে জানেন। বাঁধা দিলেন তিনি দেবী পাবনিকে আর বললেন, “মায়ের ভাব যে আমরা কেউ বুঝতে পারিনা পাবনি। দেখ আমাদের মৃষুকে। তাঁর মা যে কতটা ব্যকুল ছিলেন তাঁর সাথে আলিঙ্গনের জন্য, মায়ের এই স্থবির ভাব যেন তাঁকে সেই কথা বলে দিচ্ছে। তাঁর মায়ের এই স্থবির ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে অশ্রু বিসর্জন করা তাঁকে বলে দিচ্ছে যে, তাঁর মা তাঁকে কতটা প্রেম করে। বলে দিচ্ছে যে, তাঁর মা কতকাল অপেক্ষা করেছে এই মিলনের জন্য। তাই প্ররোচনা নয়, এই দিব্য প্রেমমিলনের সাক্ষী হও পাবনি”।
নীরবতা ভাঙলেন প্রথম যিনি, তিনি মৃষুই। দৌড়ে এসে মায়ের বক্ষে নিজেকে স্থাপন করলে, প্রগলের মত মাতা পুত্রকে, এবং পুত্র মাতাকে আলিঙ্গন করলেন। দুই দেহই ঘর্মাক্ত হয়ে গেল, আর সেই স্বেদের সুবাস সমস্ত জগতে, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে পড়লো। সুতীব্র ও প্রকাণ্ড ভাবে ঝাঁঝাল সেই মধুর সুবাসে, ত্রিমূর্তি মূর্ছা চলে গেলেন। নিসাধরা, পক্ষরা, যোগিনীরা আনন্দে বিহ্বল হয়ে গেলেন। আর সাধদের যেন অযাচিত কারণে সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠতে শুরু করলো। সকল অন্তঃসত্ত্বা সাধ স্ত্রীরা নিজেদের গর্ভের সন্তান হারিয়ে ফেললেন সেই সুবাসের ফলে। একই অবস্থা মনুষ্যযোনিরও হলো, কারণ তারাও যে সাদ আর ত্রিমূর্তিদ্বারা আত্মভাবে প্রভাবিত। লক্ষ লক্ষ মানব স্ত্রী মাতার হবার সামর্থ্য হারিয়ে ফেললেন সেই সুবাসের ফলে।
আলিঙ্গনের থেকে মুক্ত হলেন মাতাপুত্র। দেবী সর্বাম্বা করুন ভাবে বললেন, “ক্ষমা করো পুত্র, আমি প্রত্যক্ষ ভাবে তোমার কাছে যেতে পারিনি”।
মৃষু উত্তরে বললেন, “আর কত প্রত্যক্ষ ভাবে কাছে থাকতে মা? আর কি ভাবে নিকটে থাকা সম্ভব? প্রাণ হয়ে তুমি প্রবাহিত হচ্ছিলে অন্তরে। জীবন হয়ে তুমি বাহ্যে প্রবাহিত হচ্ছিলে। চেতনা রূপে তুমি সমস্ত বোধশক্তি প্রদান করছিলে। প্রকৃতি বেশে সমস্ত শিক্ষা প্রদান করছিলে। আর কি ভাবে মা? আর কি ভাবে স্নেহ দেওয়া যায়? আর কি ভাবে কাছে থাকা যায়? আরো কাছে কি ভাবে থাকা যায় মা? হৃদয়ের সাথে হৃদয় লাগিয়ে রেখে দিয়েছিলে তুমি। আর কি ভাবে মা?”
“না মা, ক্ষমা চেয়ে আর লজ্জা দিও না। আমিই, আমরা সকলেই আমিত্ব ধারণ করে করে, তোমার এই নৈকট্যকে অস্বীকার করে এসেছি। তোমার এই একাকার হয়ে থাকাকে অস্বীকার করে এসেছি। তোমার এই অসামান্য প্রেমকে অদেখা করে এসেছি। … আজও দেখো না, তুমি প্রেমে জড়সড় হয়ে গেলে। নড়তে পর্যন্ত পারলে না। কিন্তু আমায় দেখো, আমি চলে এলাম তোমার বুকে। … এর থেকেও বড় প্রমাণ লাগে যে তুমি ঠিক কতটা প্রেম করো আমাদের সকলকে”।
“জানো মা, সব থেকে গর্বের কারণ কি আমার কাছে? আমার কাছে সব থেকে বড় গর্বের কারণ তোমার অসীমিত প্রেম। আমি তোমার অঙ্গজাত, তোমার স্বেচ্ছায় প্রকাশিত সন্তান। কিন্তু তার কারণে একটিবারের জন্যও তুমি আমার জন্য বিশেষ কিছু করো নি, তাই করেছ, যা তোমার বাকি সমস্ত সন্তানের সাথে করো। যেমন সকলের অন্তরে প্রাণ হয়ে বইতে থাকো তুমি, আমারও অন্তরে একই ভাবে প্রবাহিত হলে। যেমন সকলের অন্তরে তুমি চেতনা রূপে প্রবাহিত হও, আমার অন্তরেও ঠিক তেমনটাই হলে”।
“যেমন সকলের বাইরে প্রকৃতি রূপে, জীবন রূপে প্রবাহিত হও তুমি, আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমন ভাবেই প্রবাহিত হলে। …কনো কারণে, কনো ভাবে যিনি তাঁর কনো সন্তানের মধ্যে ভেদাভেদ করেন না, তিনিই আমার মা। … সকলকে একত্রে যিনি অপরিসীম প্রেম করেন, কারুর থেকে কারুকে অধিক নয়, কম নয়, তিনিই আমার মা। … এটা ভাবতেও আমার গর্ব হচ্ছে। আমার মা আমার গর্ব। আমার মা আমার শিক্ষিকা, আমার মা আমার প্রেমিকা। আমার মা আমার জীবন”।
দেবী সর্বাম্বা মৃষুর মুখে হাত রেখে বললেন, “ব্যাস ব্যাস বাবা, এতকাল পরে সন্তানের আলিঙ্গন সুখ পেয়ে, মায়ের কি নিজের গুণগান শুনতে ভালো লাগে? গর্ব তো তুমি আমার বাবা। কি অপরিসীম বাঁধা না পেয়েছ সমস্ত স্তরে, সমস্ত ক্ষেত্রে, প্রতি পদে পদে, কিন্তু একদণ্ড সময়ের জন্যও যে নিজের মায়ের থেকে মন সরায় নি, তার স্থান আমি কোথায় দেব, আমার স্থানের অভাব হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন হৃদয় চিড়ে, তাতে রাখলেও সে আমার থেকে দূরেই থেকে গেল; মনে হচ্ছে যেন নিজের অস্তিত্বটা তাকে দিয়ে দিলেও, আপন করতে পারছিনা তাকে”।
মৃষু উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ, মা আজ আমার কাছে তোমার থেকে আমার এই যে ভিন্ন অস্তিত্ব, সেটিই অভিশাপ মনে হচ্ছে। তোমার এতো কাছে থেকেও যেন, তোমার থেকে ভিন্ন আমি, এটা ভাবতেও নিজের অস্তিত্বটাকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দিতে ইচ্ছা হচ্ছে। … কিন্তু মা, আমাকে এই পৃথক অস্তিত্ব রাখতে হবে। … হ্যাঁ রাখতেই হবে। তোমার মাতৃত্বকে, তোমার মমতাকে যারা হত্যা করার জন্য দিবারাত্র ষড়যন্ত্রের রচনা করে গেছে, এবার তাদেরকে উত্তর দেবার সময় আসন্ন”।
“প্রথম আমাকে কৃতান্ত রচনা করে মার্গের স্থাপনা করতে হবে। তুমি যাত্রা করো মা। হাজতকে দিয়ে তোমাকে বন্দী করার প্রয়াস করবে। কৃতান্ত আমাকে সেই শক্তি প্রদান করবে, যা দিয়ে আমি হাজতের দুর্গের নাশ করাবো তাকে দিয়েই। অতঃপরে তুমি তার বিনাশ করে, হীরাকয়লার কাছে যাত্রা করবে”।
দেবী পাবনি সম্মুখে এসে বললেন, “না পুত্র না। হীরাকয়লা অম্বাকে বন্দী করতে চায়”।
মৃষু বলল, “না মাতা, হীরাকয়লা মাকে বন্দী করতে চায়না। বন্দী করতে চায় কয়লা। কিন্তু হীরা কি দোষ করেছে? তার ভাব শুদ্ধ। সে নিজের মায়ের স্নেহ লাভ করতে চায়। এতে তার কি অপরাধ? যদি কয়লার এই ষড়যন্ত্র, ত্রিমূর্তির তাকে ঘিরে ষড়যন্ত্র হীরার মাতৃপ্রেমকে অদেখা করে দেয়, তাহলে প্রেমের উপরে ষড়যন্ত্র জয়লাভ করবে। তা কি করে হতে পারে?”
দেবী কৃত্তিকা মাথা নেড়ে বললেন, “কিন্তু পুত্র, হাজতের নাশ যে সম্ভব আর তা হবে, সেটা ত্রিমূর্তিও জানে। কারণ তার কাছে যে বরদান আছে, তা তো সহজেই ভাঙা সম্ভব। তারপরেও তাকে ত্রিমূর্তি ব্যবহার করলো কেন? কি কারণে?”
“আবারও অভিশাপে ভূষিত করার জন্য। … তাঁদের ব্রহ্মাণ্ড, তাই তাঁদের পুত্ররা ব্রহ্মাণ্ডের উত্তরাধিকার। তাদের হত্যা করার জন্য অভিশাপ দেবে আবার। সেই জন্য ব্যবহার করেছে হাজতকে”।
মৃষু উত্তেজিত হয়ে উঠে বললেন, “আবার অভিশাপ দিলে আবারও তা গ্রহণ করবো। একবার করে অভিশপ্ত হবো, আর একবার করে ওদের একটি করে সাধের নাশ করা হবে। … আমার মায়ের মমতাকে যারা হত্যা করেছে, তাদেরকে ছাড়বো না”।
মাতা সর্বাম্বা হেসে মৃষুর কাছে এসে বললেন, “যাও পুত্র, কৃতান্ত রচনা সমাপ্ত করো। মার্গের স্থাপনা করো”।
মৃষু বলল, “মা, আমার পক্ষে সেই মার্গ গুছিয়ে বলা অত্যন্ত কঠিন। তুমি যদি না বলো তাহলে… !”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “আমি তো সর্বক্ষণ তোমার সাথে আছি, সবার সাথে আছি। কর্তা ভাবকে ত্যাগ করে, তুমি যেই সমর্পণ করেছ, তারপর তো কেবল আমিই পরে থাকি। তাই না? তাহলে আর চিন্তা কি? যাও কৃতান্ত রচনা করো আর নিজেকে পূর্ণ করো”।
মৃষু সমাধি থেকে ফিরল, আর কৃতান্ত রচনা শুরু করলো। অন্যদিকে দেবী পাবনি ভয়ার্ত হয়ে সম্মুখে এসে মাতা সর্বাম্বাকে কিছু বলতে গেলে, মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “দিদি, যুদ্ধ এখনো অনেক বাকি। আমার পুত্র প্রস্তুত হয়ে গেছে যখন, তাকে আর পিছনে যেতে আমি দেব না। প্রয়োজনে আমি নিজে পিছিয়ে যাবো সামান্য। কিন্তু মৃষুকে নিয়ে আর চিন্তা করো না। আমাকে পিছতে দেখলে, সে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। তখন বুঝবে তোমরা মৃ্ষুর সামর্থ্য ঠিক কি। দেখতে থাকো দিদি এখন। ভয় পেও না। অনেক উপর নিচু হওয়া এখনো বাকি আছে। মৃষুর এখনো এক মোক্ষম শিক্ষা গ্রহণ বাকি আছে”।
