আদি কৃতান্ত – প্রকৃত ঈশ্বরকথা

মৃষুর চতুর্থ স্তর উন্নত হলো। এবারের স্তরের সন্ধান পেয়েও পেলো না ত্রিমূর্তি। সন্দেহ কিছু হয়েছে, কারণ দেবী শ্বেতার কাছে, দেবী শ্রীর কাছে চলে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই যে অম্বিকাপুত্র, তেমন কনো প্রমাণও পেলেন না। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁদের জন্যও বিকট হয়ে যাচ্ছিল। পক্ষরা মুক্ত হয়ে গেছে। প্রকৃতির ২৭ ডাকিনী হয়ে গেছে তাঁরা। অন্যদিকে শাস্ত্রীরাও দুর্বল হয়ে গেছে। কাপালিকরা তো ছিলোই, সঙ্গে নিরাকারবাদীরা এসে গেল।

অন্যদিকে এদিকের পরিস্থিতও জটিল হয়ে গেছিল। কৃত্তিকা কার্ত্তিক মাস হয়ে ব্যপ্ত। শ্রী ও শ্বেতা আদিশক্তির আমন্ত্রণের অপেক্ষায় রত। আর এবার দেবী পাবনিও কলুষিত মানবযোনির ভারে ভারাক্রান্ত। অন্তিম ভার গ্রহণ তাঁর, মানবের বিনাশ পর্যন্ত চলবে এই ভারগ্রহণ।

তাই এবার কে হবে মৃষুর পঞ্চমস্তরের মাতা? দেবী মৃত্তিকা সম্মুখে এসে বললেন, “আমি হবো মাতা। আমি হবো তাঁর পরবর্তী তিন জন্মের মাতা। আপনার কারণে আমি মাতা হতে পেরেছিলাম এক কালে। তাই আজ আমি আপনার পুত্রকে আপনার কাছে পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবো”।

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “বেশ, পাবনি যেখানে চারীধার থেকে ভার বহন করে এনে ফেলে, আর তারপর সেখান থেকে সাগরে নিয়ে যায় সমস্ত ভার, সেই স্থানের নদীবক্ষে দেহধারণ করো। তোমার পুত্র যেন পাবনিকে দেখতে পায়, তার এই ভার বহন দেখে ব্যথিত হয়, আর যেন তাঁর মাতা পাবনির স্মৃতি আসে। তবেই এবার তাঁর পঞ্চম কলা উন্মুক্ত হবে”।

জন্ম নিলেন মৃষু, নাম এবার তাঁর অচিন্ত্য। দেহে এসে, মৃত্তিকা আসক্তিতে জরিয়ে পরলেন। বেঁধে রাখতে চাইলেন অচিন্ত্যকে। বিবাহ দিলেন ধরিত্রীর এক রূপের সাথে। মাতা অম্বিকার নির্দেশে, কাল তাঁকে ভুজঙ্গের বিষে দগ্ধ করলো। আসক্তি চরমে দেবী মৃত্তিকার, তাই দ্বিতীয় ধরিত্রী রূপের সাথে বিবাহ দিলেন। কিন্তু জল বহুদূর গড়িয়ে গেছিল তার মধ্যে। স্মরণ এসে গেছে অচিন্ত্যের নিজের পূর্বকলা, আচার্যের কথা। সেই সংগ্রাম যা তিনি তখন লড়েছিলেন, কাপালিক, শৈব, শাক্ত, আর নিরাকার নিয়ে।

আশেপাশে দেখেছেন তিনি কি চলছে। দেখেছেন যে, কাপালিকদের বেশ ধারণ করে শাস্ত্রীরা ভণ্ডামি করছে আর কাপালিকদের বদনাম করে ফিরছে। মিষ্ট হাসলেন এবার। এবার আর তমগুণ আর শাক্ত লড়বেনা। নিরাকারবাদিও আর বাঁধা দেবেনা। এবার লড়বে তম আর রজ। রজগুণে আর তমোগুণে লড়াই হবে এবার।

অনন্যকে রজগুণ পীতাম্বরের অবতার বানিয়ে দিয়েছে যক্ষরা। তাই অনন্যের নাম ধারণ করলেন তিনি, আর নির্মাণ করলেন রজকুল। তমকুলের সামনে এসে গেল আরো এক বড় বাঁধা। শাক্ত কুলরূপে কাপালিকরা ছিল, আচার্যের কুল ধরে ছিল নিরাকারবাদীরা, আর এবার এলো রজকুল। প্রায় চারকুল চারকুলের সাথে লাঠালাঠি করতে থাকলো।

অচিন্ত্য দেবী পাবনির কথা স্মরণ করে আবারও দেবী অম্বিকার সাথে নিজের সম্বন্ধকে পরখ করা শুরু করে দিলেন। দেবী পাবনি তাঁকে মাতার গন্ধ মাতার দুগ্ধে, মাতার দুগ্ধের গন্ধ মাতার পুত্রের অঙ্গে, এই কথা কেন বলেছিলেন। এক মাত্র মাতার চরণে পতিত হলে, তবেই কিছু দিশা প্রাপ্ত হবেন তিনি। পৌঁছলেন অম্বাদেবীর চরণখণ্ড যেখানে স্থাপিত ছিল, সেই নীল আঁচলযুক্ত সাগরতটে।

নিত্য যান তিনি মন্দিরে। মন্দিরের ভুতানকে নিয়ে তমকুলের আর রজকুলের যুদ্ধ। কার প্রতিনিধি তিনি। সতীকথাকে যারা বিকৃত করেছিলেন, সেই শাস্ত্রীরা বললেন, “ভুতান মানেই রমনাথ, তাই নিশ্চিত ভাবেই ইনি রমনাথ”, তো রজকুল বললেন, “না ইনি পীতাম্বর। দেখো না অনন্যের ন্যায় ইনি ভগিনী আর ভ্রাতা রূপে ভদ্র ও ভদ্রাকে ধারণ করে রয়েছেন! … অনন্য কার অবতার? পীতাম্বরের। এর অর্থ ইনি আমাদের আরাধ্য”।

এই তর্ক একদিকে চলতে থাকে, তো অচিন্ত্য নির্বিঘ্নে মাতার চরণে পতিত হয়ে সমস্ত রাত্রি পরে থাকেন মন্দিরে। এক পরিচারকের সন্দেহ হয়, তাই কিছু কান পেতে শুনে আসেন। বাইরে এসে শাস্ত্রীদের আর পণ্ডিতবর্গ বা পাণ্ডাদের বললেন সেই কথা।

সন্দেহের বীজ তরু হতেই, তাঁরা সকলে মন্দিরের দেওয়ালে কান পাতা শুরু করে দিলেন। অচিন্ত্য সেই কথা জানেন  না, কিন্তু মাতা জানেন। তাই মন্দিরের দেওয়ালকে বজ্রকঠিন করে দিলেন। বাইরে থেকে ভিতরে আর ভিতর থেকে বাইরে কনো শব্দ আর যাবেও না, আসবেও না।

অচিন্ত্যের আহ্বান মাতা অম্বিকাকে, “দর্শন দাও মা। দর্শন দাও”।

পুত্রের আহ্বানে মা না এসে কি করে থাকতে পারেন। মাতা অম্বিকা এলেন। অচিন্ত্য ব্যকুল হয়ে বললেন, “মা, আমাদের সম্পর্কের সত্য কি, বলে দাও মা”।

মাতা অম্বিকা হেসে বললেন, “স্মরণ করো পুত্র। পূর্বের সমস্ত কথা স্মরণ করো। দেখবে আসতে আসতে সমস্ত জট খুলে যাচ্ছে”।

অচিন্ত্য স্মরণ করলেন। স্মরণ করতে করতে অনেক অনেক কিছু উদ্ধার করলেন। পৌঁছে গেলেন কৃত্তিকালোকে। দেখলেন দেবী শ্রীকে, দেবী শ্বেতাকে, দেবী কৃত্তিকাকে, দেবী পাবনিকে তাঁর উদ্দেশ্যে মাতৃত্বের বর্ষণ করতে। দেখলেন গতির অবস্থা, সকলকে স্বরূপে সনাক্ত করলেন। দেখলেন আসনের অবস্থা, সকলকে সনাক্ত করলেন, আম্মিকে সনাক্ত করে কান্নায় ভেঙে পরলেন।

দেখলেন অনন্যের অবস্থা, সকলকে সনাক্ত করলেন। ভদ্রারূপে স্বয়ং মাতা অম্বিকা অবস্থান করছিলেন দেখে আরো অধিক ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। পূর্বের অবস্থা তাঁর স্মরণই আছে। কিন্তু কেন, প্রতিবার কেন মাতা অম্বিকা তাঁর রক্ষায় চলে আসেন। কি সম্পর্ক তাঁর সাথে?

মাতা অম্বিকাকে পুনরায় স্মরণ করলেন। মাতা অম্বিকা পুনরায় স্মরণ করতে বললেন। অচিন্ত্য আবারও স্মরণ করলেন। দেখলেন এক প্রকাণ্ড উর্জ্জা থেকে চারটি উর্জ্জা ভেঙে গেল আর তাঁরা হলেন তাঁর চার জননী, শ্রী, শ্বেতা, কৃত্তিকা ও পাবনি। আরো দেখলেন, সেই উর্জ্জা আসলে স্বয়ং মাতা অম্বিকা। আরো দেখলেন যে, মাতা অম্বিকার থেকে একটি উর্জাঅংশ ধুসর অন্ধকারের থেকে যেন বীর্যগ্রহণের মত করে উর্জাগ্রহণ করে একটি উর্জাপিণ্ড নির্মাণ করলেন, আর সেই উর্জাপিণ্ডকে যেন আরো এক শুভ্রধুসর উর্জ্জা ৭ খণ্ডে বিভাজিত করে দিলেন, আর সেই সাত খণ্ডের মধ্যে তিনি নিজেকে পঞ্চম স্থানে দেখলেন।

প্রথম স্থানে দেখলেন গতিকে, দ্বিতীয়তে আসনকে, তৃতীয়তে দেখলেন অনন্যকে, চতুর্থতে আচার্যকে। আর ষষ্ঠ তথা সপ্তম তখনও অস্পষ্ট। ব্যকুল হতে থাকলেন অচিন্ত্য। কিছুতেই কনো সমাধান পাচ্ছেন না। তবে কি মাতা পাবনি এই কথারই ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন যে, আমার চার মাতার জননী হলেন দেবী অম্বিকা। সকলের প্রকৃত আরাধ্য যার হওয়া উচিত তিনিই হলেন দেবী অম্বিকা?

মন্দিরের বাইরে থেকে কনো শব্দ পাওয়া যায়না, তাই পাণ্ডারা আর শাস্ত্রীরা একত্রে মন্দিরের মধ্যে রাত্রের গহন অন্ধকারে প্রবেশ করলেন। অচিন্ত্যের দেহ তখন দেবী অম্বার চরণখণ্ডের সম্মুখে শায়িত। প্রাণহীন দেহ, কারণ প্রাণ যে মাতা পাবনিকে বলা কথা অনুসারে, সাগরের মধ্যে ডুব দিয়ে মাতা অম্বিকার সন্ধান করতে গেছে।

দ্বিচারিতা হয়েছে তাঁদের সাথে। মুখে বলা হয়েছে পীতাম্বরের ভক্ত, কিন্তু না সে পীতাম্বরের ভক্ত আর না রমনাথের। আসলে সে একজন মাতা আদিশক্তির শরণাগত। দ্বিতীয়দিন, তৃতীয় দিন দেখলেন পাণ্ডারা আর শাস্ত্রীরা। তৃতীয়দিন রাত্রেই অচিন্ত্যের দেহকে হত্যা করলেন, এবং মাতা অম্বার চরণে তাঁর বলিই চড়ালেন একপ্রকার। শবদেহকে নিয়ে সাগরে ফেলে আসতে গেলেন, সকলের থেকে সত্য গোপন করতে।

অনেকেই আছেন যারা অনন্যকে নয়, পীতাম্বরকে নয়, শুধুই অচিন্ত্যকে বিশ্বাস করেন। তাঁরা যদি জেনে ফেলেন যে অচিন্ত্য মাতার শরণাগত, তাহলে তাঁরাও মাতার শরণাগত হয়ে যাবেন, সমস্ত কিছু ফেলে রেখে। তাই গোপনে সাগরে দেহকে মিশিয়ে আসতে গেলেন। কিন্তু তেমন কিছু করতে পারলেন না। কারণ যখন তাঁরা সাগরে পৌঁছালেন, তখন দেখলেন, সাগরের মধ্যে দুই বাহু উপরে তুলে অচিন্ত্য সাগরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে, কিন্তু সে ডুবছে না।

নিথর হয়ে গেল তাঁদের দেহ। ভয়ে তারা শবদেহকে ফেলে রেখে চলে এলো। পরের দিন প্রভাতে শবদেহ উদ্ধার হলো। চারিদিকে রোদনের শব্দ গুঞ্জন করে উঠলো। অন্যদিকে, মাতার চরণে তাঁরই সন্তানের বলির রক্ত লেগেছে। তাই এবার মাতা পূর্ণ ভাবে জেগে উঠলেন। অম্বার লীলা ধরাধামে রচিত হয়েছিল। এরপর থেকে দেবী অম্বিকা স্বয়ং কখনো ধরাধামে লীলা করেননি। অপেক্ষা করছিলেন নিজের পুত্রের।

তাঁর পুত্র বিভিন্ন কলারূপ ধরে লীলা করছিলেন, যাতে তিনি সহভাগি হয়েছেন। কিন্তু বলির রক্ত লাভ করে, এবার তিনি প্রত্যক্ষে আসা শুরু করলেন। আরাধ্যা হয়ে উঠলেন নিজেরই পুত্রের। আসন ও অনন্য, এই দুই নামকে ধারণ করা মৃষুর ষষ্ঠকলা, সন্যের প্রকাশের আরাধ্যা হলেন স্বয়ং তিনি। ছয়টি কলার মধ্যে রমনাথের কামনা মিশ্রিত ছিল। তাই সকলের মধ্যে কিছু না কিছু কলুষ ছিল। আর এই অন্তিম কলুষ মুক্তির ক্ষণ।

সন্য মাতাকে নিজের মাতা বলে তো সনাক্ত করতে পারলেন না, কিন্তু হ্যাঁ, তাঁর মাতৃত্বের সমস্ত রহস্য জেনে ফেললেন। গদগদ হয়ে গেলেন, মাতার মাতৃত্ব জেনে। গুণগান করতে থাকলেন মাতার। সহস্র সহস্র কথা বলতে থাকলেন মাতার ব্যাপারে, আর তার থেকেও বেশি বললেন, আত্মের ভাবে ঘেরা থাকার সেই আবহাওয়ার কথা, যার কারণে মাতার ঠিক ঠিক ধারণাও হয়না।

সমাজে প্রচলিত এই যে, স্বল্পবয়সে ঈশ্বরের পথে যাওয়ার অর্থ, নষ্ট হয়ে যাওয়া। তা যে নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়, তা বোঝাতে বললেন, বড় চুম্বক টানলে আর ছোট চুম্বক টেনে ধরে রাখতে পারেনা। জানেন তিনি পূর্ণ ভাবে আত্মভাবে গ্রসিতরা কতটা আক্রমণাত্মক। সত্যের সন্ধানীরা তাঁদেরকে অপমানিত করবেন না, কিন্তু তাঁরা সত্যসন্ধানীদের অপমান করতে বিন্দুমাত্রও কুণ্ঠিত নন, তা সেই সত্যসন্ধানী নিজের সন্তান হোক, ভ্রাতা ভগিনী বা স্বামীস্ত্রী।

সত্যসন্ধানীরা নাকি পাগল, উন্মাদ, জীবন ধারণেরই উপযুক্ত নয়, এমন সহস্র অস্ত্রদ্বারা সত্যসন্ধানীদের পূর্ণ ভাবে ঘায়েল করা হয়, কিন্তু সত্যসন্ধানীদের কাছে কনো অস্ত্রই নেই এই আত্মসর্বস্বদের ঘায়েল করার জন্য। তাই সন্য তাঁদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে গিয়ে তাঁদেরকে চারাগাছ বললেন, আর বললেন, চারা অবস্থায় বেড়া দিতে হয়, নাহলে গরুছাগলে অর্থাৎ আত্মসর্বস্বরা খেয়ে চলে যায়। আত্মসর্বস্বরা যে বিশ্বাসের অযোগ্য, তা বলতে তাঁদেরকে মাছির সাথে তুলনা করে বললেন, সবেতেই বসে তারা, মধুতেও আবার বিষ্ঠাতেও।

সাথে সাথে সত্যসন্ধানীদের উৎসাহ দিতে বললেন, তাঁরা হলেন মৌমাছি, মধু খাবে নয়তো হেদিয়ে মরে যাবে। সাথে সাথে তাঁদেরকে বুদ্ধি দেন কিভাবে এই আত্মভাবসর্বস্ব মনোভাবদ্বারা মণ্ডিত এই ধরাধামে দাঁড়িয়ে থেকে সত্যসন্ধান করা সম্ভব। সেই সুত্রে তিনি বলেন, আত্মভাবাপন্ন হলো পাঁক, আর সেখান থেকে মুক্ত হয়ে থাকতে হলে, হয় সত্যসন্ধানীদের প্যাকালমাছ হতে হবে, নয় পাঁকে পদ্ম।

তন্ত্রের উপরদ্রব তো ছিলই, সাথে সাথে যন্ত্রের উপদ্রবও কুর্নিশ করা শুরু করে দিয়েছিল মানবদের। আর সামান্য দূরে প্রকাণ্ড গতি নিয়ে সমস্ত মানবকে ভয়াবহ অস্ত্রের দ্বারা ভয়ে তটস্থ করে রাখার জন্য যন্ত্রও উঁকি মারছিল। সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে, মানবের এমন হাল করে দিয়েছে আত্মসর্বস্বরা যে তাঁদেরকে ধন উপার্জনের জন্য পথ চলতেই হবে। তাই সন্য বললেন, মন রাখো সত্যসন্ধানে, আর অন্য হাতে কাজ করে চলো, অর্ধেক মন দিয়ে। একবার হাত খালি হলেই দুইহাতে পুরো মনোনিয়োগ করে সত্যের সন্ধান করো।

মৃষুর ষষ্ঠ রূপ, তাই প্রায় পূর্ণ জাগরূকতা এসে গেছে তাঁর অন্তরে। হয়তো ভাবিকালের ভাবি সমস্ত ঘটনাও দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। আর হয়তো সেই কারণেই তিনি নিশ্চিত করতে চাইছিলেন যে, সমস্ত সন্তানের জন্মদাতা ও জন্মদাত্রীদের মধ্যে তাঁর বাণীর বীজ ছড়িয়ে দিয়ে মৃষুর অন্তিম জন্মকে নিশ্চিত করতে। হয়তো তিনি এও দেখতে পাচ্ছিলেন যে, মৃষুর অন্তিম কলার যাতে বিস্তার না হয়, তার কারণে ত্রিমূর্তি সর্বপ্রকার প্রয়াস করবে। সেই কারণেই হয়তো আপ্রাণ প্রয়াস করছিলেন নিজের বাণীর বীজ সম্পূর্ণ জম্বুদেশের উর্বর ভূমিতে ছড়িয়ে যেতে।

তাই ভীষণ ভাবে পবিত্র হবার দিকে জোর দিলেন, শুদ্ধতার দিকে জোর দিলেন, জোর দিলেন সেই ভাবের দিকে যা ভক্তির আচার অনুষ্ঠানের থেকে অনেক অনেক উর্ধ্বে স্থিত। সাথে সাথে বললেন, মাকে ডাকার মত করে ডাকতে হয়। সব বললেন অথচ কিছুই বললেন না। ডাকার মত করে ডাকা। একাকজন একাক অর্থ করলো তাঁর কথার, নিজের নিজের নির্মাণ করা অর্থকে নিজে নিজে স্বীকার করে নিলো আর অন্যের উপর জোর করে চাপাতেও চেষ্টা করলো।

কিন্তু বার্তা তিনি দিয়ে দিয়েছেন, কারণ তিনি একবারও বলেন নি, ঈশ্বরকে ডাকার মত করে ডাকতে হয়। তাই যারা ভেবে নিয়েছিলেন শাস্ত্র মেনে ডাকতে হবে, যারা মেনে নিয়েছিলেন আচার অনুষ্ঠান পালন করে মানতে হবে, যারা ভেবেছিলেন ভক্তের পোশাক ধারণ করে, ভক্তের ভঙ্গিমায় ডাকতে হবে, তারা সকলে নিজেরাই নিজেদের ভ্রমিত করতে থাকলেন। কারণ সন্য যে ঈশ্বরকে ডাকার কথা বলেনই নি, বলেছিলেন মা’কে ডাকার মত করে ডাকতে হয়। ‘মা কে ডাকা’, মা’কে কি ঈশ্বরের মত করে ডাকে? নাকি ভক্তের বেশে থেকে আচার করে, অনুষ্ঠান করে, মন্ত্র পাঠ করে, শাস্ত্র মেনে ডাকে?

মা ডাকের মধ্যে শুধু একটিই ভাব থাকে, তুমি আমার মা, আমি তোমার ছা। আমাদের দুইয়ের মাঝে, জগত থাকলেও যা, না থাকলেও তা। তবে এতো কিছু ভেঙে বললেন না তিনি। কেন বলবেন, তিনি কি চারাগাছ পুঁতছেন নাকি? তিনি তো বীজ ছড়াচ্ছেন। বীজের মধ্যে কি ডালপালা, ফুল ফল বাইরে থেকে দেখায়?

তবে যাদের কাছে এই সমস্ত বীজ পৌঁছে গেলে মৃষুর যাত্রা সম্পন্ন হবে, তাঁদের কাছে সন্য পৌঁছে দিলো সমস্ত বীজ। কিন্তু মৃষু মানেই যোদ্ধা। কেবল যোদ্ধা নয়, ভয়ানক যোদ্ধা, স্বাভাবিক যোদ্ধা। ত্রিমূর্তির সাথে সমানে যুদ্ধ করে আসছেন তিনি। তাই জানেন তাঁদের গতিপ্রকৃতি কি হতে চলেছে।

তাই বীজ যেখানে ছড়িয়েছেন তিনি, তার থেকে সকলের মন অন্যদিকে নিয়ে চলে গেলেন, কিছু সন্ন্যাসী শিষ্য চেয়ে। জানতেন তিনি, আমন্ত্রণ করে দিয়েছেন তিনি। পরমাত্ম ত্রিমূর্তি একে একে প্রকাণ্ড কিছু যোদ্ধা পাঠাবে এবার, এই মৃষুকলার প্রকাশকে খর্ব করার জন্য। কিন্তু প্রথম কলাপ্রকাশ আর ষষ্ঠ কলাপ্রকাশ এর মধ্যে বহুল পার্থক্য। মাতার সাথে এবার তাঁর আলাপ হয়েছে, বুঝেও গেছে সন্য যে ঈশ্বরীর থেকে অনেক ভিন্ন তাঁর মা। বুঝে গেছেন, ইনি তিনি যিনি স্বয়ং ব্রহ্ম হয়েও পূজা পেতেই চাননা, চান মা ডাক শুনে চোখের জল মুছতে মুছতে হন্যে হয়ে ছুটে গিয়ে সন্তানকে কোলে ধারণ করতে।

কিন্তু সাথে সাথে এও বুঝে গেছেন যে, সেই দৌড়ে যাবার শেষে আনন্দ প্রায় অবশিষ্টই থাকেনা, কারণ যতই তিনি নিজেকে সত্য-ঈশ্বর-ব্রহ্ম কিছুই না মেনে মা মানুন, বাস্তবে তো তিনি দুটিই, মা-ও আবার ব্রহ্মও। লেশ মাত্র আমিত্ব ব্রহ্মকে ধারণ করতে দেয় না, সামান্য আমি-ভাবও কলুষতা, ব্রহ্মের সাথে মিলনের পথে বাঁধা। তাই মা সন্তানকে আলিঙ্গন করবো বলে গিয়েও সেই কলুষতার বাঁধার কারণে সন্তানের সামনে মা চেয়েও প্রত্যক্ষ হতে পারেন না। কিন্তু ব্রহ্মত্ব যেমন তাঁর সত্য, তেমনই মাতৃত্ব। তাই সন্তানকে জরিয়ে ধরতে না পেরে, বিকট ক্রন্দনে ফেটে পরেন, যা ভূকম্পন, ঘূর্ণাবর্ত আরো কতকি প্রাকৃতিক বিপর্যয় হয়ে সামনে আসে সকলের।

তাই একদিকে যেমন বীজ ছরানোর কালে, প্রতিটি বীজের মধ্যে আমিত্বের থেকে মুক্ত হবার কথা বলে রাখলেন, তেমনই মাতার একত্রে মাতৃত্ব ও ব্রহ্মত্বের সত্যতাকেও বলে গেলেন। বলার সময়তেই জানেন, এক ও এক মাত্র মৃষুর অন্তিম কলারই সামর্থ্য আছে বীজ থেকে সেই সার কথা উদ্ধারের। নিরাকার, কাপালিক, রজ, তম, নাগা, যক্ষ, রক্ষ, সমস্ত কিছুর সত্য ধারণ করে নেবার। তাই তিনি নির্দ্বিধায় মায়ার প্রলেপ লাগাতে থাকলেন নিজের নির্মিত বীজের উপর।

স্বয়ং মহামায়ার পুত্রকে মায়া কি ভাবে ভক্ষণ করতে পারে। মায়া ক্রোড়ে তো নেবে তাঁকে, কিন্তু সন্তানজ্ঞানে বক্ষে জরিয়ে ধরবে। মা যে, সন্তানকে আঁকড়ে ধরা ছাড়া দ্বিতীয় কনো ভাবনাই আসে না। তাই সন্য নিশ্চিত, ত্রিমূর্তি মৃষুর যাত্রা বিনষ্ট করতে পারবেনা, কারণ মায়ার আঁচলে এমন ভাবে বেষ্টন করে তিনি তাঁর জন্য বীজ লুকিয়ে রেখেছেন যে, একমাত্র মায়াপুত্রই সেই ভেদকে উন্মোচন করতে সক্ষম, অন্য কেউ নয়।

কিন্তু তাও বিপদ থেকেই যায়। এক যোদ্ধার স্বভাবেই আছে যে সে নিজের শত্রুকে কখনো কম মনে করেন না। তাই শত্রুকে ভ্রমিত করে দেবার জন্য বীজ আর আর বীজ যেখানে অর্পণ করা হয়েছিল সেই সংসারীদের ছেড়ে সন্ন্যাসীতে মন দিলেন। নিপুণ যোদ্ধা। প্রথম নিজের জয় নিশ্চিত করলেন, অতঃপরে শত্রুর পরাজয়ও নিশ্চিত করা শুরু করলেন। দেবী কৃত্তিকা, দেবী পাবনি, দেবী শ্রী, দেবী শ্বেতা সকলে ব্যকুল ভাবে পুত্রের প্রশংসা করে বললেন, “অভাবনীয়। এমন যোদ্ধার সামনাসামনি হওয়ার সামর্থ্য কার আছে? ত্রিমূর্তির আছে?”

সন্ন্যাসীবর্গ বিকৃত করলো সন্যের মতধারা। করবে যে, সন্য ভালো করেই জানতো। ত্রিমূর্তি যে তাঁর সন্ন্যাসী শিষ্য কামনার উত্তরে নিজের শ্রেষ্ঠ সেনাকে প্রেরণ করবেন, তা কি আর সন্য জানতেন না? খুব ভালো করেই জানতেন। জানতেন বলেই তো চেয়েছিলেন। শত্রুকে শত্রুতা প্রদর্শনের স্থানও দেওয়া হলো, আবার শত্রুর থেকে নিজের বীজসমূহকে রক্ষাও করা হলো। অদ্ভুত যোদ্ধা তিনি! শত্রুকে চোখের সামনে রাখলেন, শত্রুকে সঙ্গীরূপে কামনা করে, শত্রুকে সেই সেই আচরণ করতে বাধ্য করলেন, যেমনটা তিনি চান! এমন রণকৌশল যে ত্রিমূর্তির ধারণারও অতীত!  

বীজ রক্ষিত হয়েছিল, আর তাই মৃষুর সপ্তমকলাপ্রকাশ সম্ভবও হলো, আর সন্যের বাণীও প্রস্তুত রইল, উচিত সময়ে তাঁর সম্মুখে আসার। ভয়ানক যোদ্ধা মৃষু। শত্রু নিজের চালের পরিকল্পনা করার বহুপূর্বে সেই চালকে ধরে নেবার সামর্থ্য যেই একমাত্র যোদ্ধা রাখেন, তিনি হলেন মৃষু।

এবার মৃষুর মধ্যে আর কনো কলুষ নেই। সপ্তম কলা পূর্ণ ভাবে তাঁর মায়ের নির্মিত কলা। পূর্ণ পবিত্র। তাই আর কনো পিছুটান নেই। সরাসরি মাতৃত্বে মজে গেলেন। তবে অত্যন্ত কৌশলে। কার্ত্তিক মাসে জন্ম নিয়ে, প্রথম দেবী কৃত্তিকাকে নিজের কাছে রাখলেন। পাবনিবক্ষে জন্মগ্রহণ করে, তাঁকে সঙ্গে রাখলেন। আর শ্রী-শ্বেতার মিলিত রূপকে যেখানে মাতা বেশে জগদ্ধাত্রী মূর্তিতে আরাধনা করা হয়, সেখানে জন্মগ্রহণ করে আশ্বাস দিলেন যে এবার তিনি সকল মা’কে একত্রে ধারণ করবেন।

সন্ধান এরপরেও দেবী অম্বিকারই। প্রাণ জেনে গেছে, চেতনা নিশ্চিত যে দেবী অম্বিকা সকলের প্রকৃত মা, আর এও জেনে গেছে মৃষু যে, কেবল চেতনাধারণ করে নয়, সে স্বয়ং তো মাতা অম্বিকারই উর্জ্জা। রমনাথের বীর্যকে ধারণ করে সেই উর্জা প্রকাশ্যে এনেছিলেন দেবী অম্বিকা যাতে, তমগুণের যুদ্ধংদেহী স্বভাবও ধারণ করে তাঁর পুত্র। আর তাই দুর্ভাগ্যক্রমে সে রমনাথেরও পুত্র। দুর্ভাগ্য কেন? কারণ পিতা হলেও, তাঁর জন্মেরও পূর্বক্ষণ থেকে সেই পিতা পুত্রের বিনাশের প্রয়াস করে চলেছেন, এখনও করছেন।

কিন্তু সেই পুত্র এবার পূর্ণ ভাবে প্রস্তুত। ছয় কলা ধারণ করে সে এবার পূর্ণ সচেতন। আত্মভাব থেকে পূর্ণ ভাবেমুক্ত। আর তা হতেই শুরু হয়েছে তার মধ্যে তাঁর সমস্ত মাতাকে একত্রিত করার প্রয়াস। অনন্য বেশে সে যেই প্রকার যোদ্ধা ছিল, তাতেই ত্রিমূর্তি হিমসিম খেয়ে গেছে, কিন্তু সে এখন আরো পরিণত যোদ্ধা। অতীব বলশালী তো বটেই, শক্তির সন্তান শক্তিহীন তো হতেই পারেনা, কিন্তু তারই সাথে সাথে এবার আর লুকোচুরির কনো প্রয়োজন নেই। তাই সরাসরি মৃষু নামই ধারণ করলেন তিনি।  

রণকৌশলে সে ক্রমশ অদ্বিতিয়ম হয়ে উঠছিল, আর সাথে সাথে ছিল তাঁর মাতৃভক্তি, আর মাতার প্রতি অপার প্রেম। মা অন্ত প্রাণ সে, মায়ের বেদনাকে সে সর্বক্ষণ অনুভব করে, আর তাই সর্বক্ষণ পাগল হয়ে থাকে মায়ের বেদনার নাশ করতে। সাহস তাঁর অপরিসীম, যুদ্ধবল ও কৌশল সেই সাহসের সহায়, আর তাই সেই সাহস, প্রগলতা, যুদ্ধ কৌশল ও যুদ্ধপারঙ্গমতা মিলে সে এবার প্রত্যক্ষ ভাবে ত্রিমূর্তিকে যুদ্ধে আবাহন করতেও পিছুপা নয়।

মানব দেহে বয়স অনুসারে সে তখন মাত্র ৬ বৎসরের। তাই পীতাম্বর একত্রিত হলেন শ্বেতাম্বরের সাথে রমবনে। একত্রে তাঁরা দুইজন রমনাথকে বললেন, “হে রমনাথ, আমাদের এবার কিছু করা উচিত। মৃষু এবার ভয়ঙ্কর, কনো মর্যাদার মধ্যে সে এবার থাকতেই রাজি নয়। যেকোনো মূল্যে সে এবার আমাদের দমন কামনা করছে। তিল তিল করে নিজেকে প্রস্তুত করছে আমাদের দমনের উদ্দেশ্যে। আর সব থেকে বড় কথা, ঠিক যেমন আমরা পরাপ্রকৃতিকে নিজেদের ত্রিকালদর্শন দ্বারা চিহ্নিত করতে পারিনা, তাঁর পুত্রকেও আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারছিনা”।

শ্বেতাম্বর বললেন, “হ্যাঁ প্রভু, আমাদের হাতের নাগালের বাইরে চলে যাক সে, তার আগে আমাদের কিছু করা উচিত, নচেৎ হতেও পারে যে বড্ড দেরি হয়ে যাবে”।

রমনাথ আবেগপ্রবন হয়ে বললেন, “বিলম্ব ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। আমাদের প্রথম ভুল ছিল এই যে, তাঁকে সাত খণ্ডে বিভাজিত করার পর নিজেদেরকে বিজয়ী ভেবে নেওয়া। ভুলে গেলাম কি করে আমরা যে, সে শক্তির পুত্র? পরাচেতনা সজ্ঞানে, সচেতন ভাবে, স্বয়ং মাতৃত্ব প্রদান করে তাঁকে জন্ম দিয়েছে। আর তো আর, আমার থেকে উর্জ্জাবলও সে নিয়ে সেই পুত্রকে দিয়েছে, আর তাই তাঁর পুত্র ভয়ানক ভাবে উগ্র”।

“প্রকৃতির উগ্রতা অসহনীয় কিন্তু তা বিশেষ সময়ে জাগ্রত হয়, কিন্তু আমার উর্জ্জা থাকার কারণে মৃষুর মধ্যে সর্বক্ষণ উগ্র উর্জা ক্রীড়া করে ফেরে। … আমাদের দ্বিতীয় ভ্রান্তি, তাঁকে এক এক করে কলাপ্রকাশ করতে দেখেও, আমরা তাঁর কলাপ্রকাশের দমন না করে, তাকে বশীকরণ করার প্রয়াস করেছি। … পীতাম্বর, বশীকরণ তো তার করা সম্ভবই নয়। সে যে প্রকৃতির অন্য সন্তানদের মতন, কেবলই চেতনার বিস্তার তাঁদের অন্তরে থাকার কারণে শক্তির সন্তান নয়। সে যে শক্তির সজ্ঞানে জন্ম দেওয়া সন্তান। যেকালে আমরা শক্তিকে বশ করতে পারিনা, সেই কালে আমরা শক্তির পূর্ণমাতৃত্বদ্বারা সিঞ্চন করা পুত্রকে বশ কি ভাবে করতে সক্ষম হতাম?”

পীতাম্বর বললেন, “এখন আমাদের আর সেই সমস্ত চিন্তা করার সময় নেই। বারবার তিনবার। যদি আমরা এবারেও কিছু না করি, তাহলে বড় দেরি হয়ে যাবে”।

শ্বেতাম্বর বললেন, “কিন্তু আমরা এখন করতেও বা কি পারি? … ছয় কলা তাঁর সর্বত ভাবে প্রকাশিত হয়ে গেছে, আর এই অন্তিম ও সপ্তম কলাপ্রকাশে তো আমাদের কনো নিয়ন্ত্রণও নেই। এই কলা তো পূর্ণ ভাবে দেবী অম্বিকার সৃজন!”

রমনাথ বললেন, “উস্কানি দিতে পারি আমরা তাকে। তাঁর মা তাঁকে ত্যাগ দিয়েছে, এই কথা প্রমাণ করা তো কঠিনও হবেনা, কারণ অম্বিকা তাঁর সম্মুখে কখনোই মা-বেশে আসেনি। তাই মা তাকে ত্যাগ দিয়েছে, এমন উস্কানি প্রদান করলে, সে বিচলিত হয়ে যাবে, আর নিশ্চিত ভাবে কনো না কনো ভ্রান্তি করবে, যার কারণে আমরা অভিশাপ দিয়ে, তাকে দুর্বল আর পথভ্রষ্ট করে দিতে পারবো”।

পীতাম্বর বললেন, “উচিত কথা প্রভু। তবে আমার মনে হয়, মন্ত্রক আর মোহককে এবার জাগ্রত করা উচিত। এঁরা দুইজনেই খল আর ছল দ্বারা পরিপূর্ণ। তাই এঁদের সঙ্গত নিশ্চিত ভাবে সহজ সরল মৃষুকে ভ্রমিত করে দেবে, আর আমাদের তাঁকে অভিশপ্ত করা সহজ হয়ে যাবে”।

শ্বেতাম্বর বললেন, “আমি যাচ্ছি তাদের কাছে। দুর্নিবার নামক এক ঋষি, নভদের অজেয় করে দিতে চাইছে। যাতে কনো শাস্ত্রী, কনো নাগা, কনো যক্ষ তাদের উপর কনো প্রকার প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, এমন যজ্ঞফল প্রাপ্তির দিকে যাচ্ছেন তিনি। এমন সময়ে মন্ত্রকের ক্রিয়া সহজ ভাবেই দুর্নিবারের সেই প্রয়াসকে নষ্ট করতে পারবে। আর সাথে সাথে মোহকের খল আর চাল দুর্নিবারকে ভ্রমিত করে দেবে এবং নভদের সেই শক্তি না প্রদান করে, সরাসরি সেই শক্তি সাধদের কাছে এসে, সাধদের অজেয় করে দেবে”।

রমনাথ বললেন, “উচিত প্রস্তাব, কর্মে রূপান্তর করুন মন্ত্রণাকে হে শ্বেতাম্বর”।

শ্বেতাম্বরের প্রয়াসে জাগ্রত হলো মোহক আর মন্ত্রক। তটস্থ হয়ে গেলেন দেবী শ্বেতা ও দেবী শ্রী, এই দুই সাধের কারণে। দেবী পাবনি ও দেবী কৃত্তিকা সেই ত্রস্ত হবার কথা বললেন মৃষুকে। বললেন, কি মন্ত্রণার কারণে মোহক আর মন্ত্রককে জাগ্রত করা হয়েছে। মৃদু হাসলেন মৃষু। মাত্র ৮ বৎসর বয়সে সাখ্যাত করলেন মন্ত্রকের সাথে, আর প্রথম সাখ্যাতে অট্টহাস্যে মন্ত্রককে বিচলিত করে দিলেন মৃষু।

মন্ত্রক সমস্ত যক্ষ, নাগা, শাস্ত্রীদের অধীশ্বর। সূক্ষ্ম ও স্থূল সমস্ত পঞ্চভূতদের অধিকারে করে রেখেছিলেন তিনি। বাচাল বালক মৃষুর উদ্দেশ্যে বেশ কিছু এমন বশীকরণ করা পঞ্চভূত খণ্ড ক্ষেপণ করলেন। মৃষুর বালক দেহ ক্ষতিগ্রস্ত হলো, কিন্তু মৃষু অক্ষতই রইল। পুনরায় বিচলিত হয়ে উঠলো মন্ত্রক। ত্রিমূর্তিও মৃষুর উপর স্থির নজর রেখেছিলেন। তাঁরাও দেখলেন অতিভৌতিক কনোকিছু অম্বিকাপুত্রকে স্পর্শও করতে পারছে না।

এরপর যা দেখলেন, তাতে ত্রিমূর্তি বিচলিত হবেন কিনা, তাও বুঝতে পারলেন না। মৃষু হাস্যবেশে মন্ত্রকের উদ্দেশ্যে বললেন, “ধ্বনি, এই দিয়েই তো তুমি বশ করো পঞ্চভূতকে, কিন্তু সেই ধ্বনিই তোমার নিয়ন্ত্রণে নেই। দেবী শ্বেতা তোমার নিয়ন্ত্রণে স্থিতা কি? না তো! তাহলে তুমি যে দাবি করো, তুমি ধ্বনি দ্বারা এই সমস্ত কিছুর অধীশ্বর, তা কতটা সত্য?… বশ করো দেবী শ্বেতাকে, বন্দী করো, বাধ্য করো তাঁকে তোমায় ধ্বনির অধীশ্বর করে দিতে। তারপর তো তুমিই শ্রেষ্ঠ, তাই না?”

মন্ত্রকের কাছে মৃষুর কথা যুক্তিযুক্ত লাগে। আবাহন করে সে মাতা শ্বেতাকে, আর নিজের ভূতচক্র দ্বারা বন্দী করে নেয় সে দেবী শ্বেতাকে। দেবী শ্বেতা মৃষুর দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকালেন আর বলতে চাইলেন, “এ তুমি কি করলে পুত্র?”

মৃষু হেসে নিজের নেত্র দিয়েই বললেন, “আমার নেত্রে কি কনো প্রকার সংশয় দেখতে পাচ্ছ মা? নিশ্চিন্তে থাকো মা, তোমার প্রত্যাবর্তনের সময় আসন্ন এবার”।

মন্ত্রক দেবী শ্বেতাকে বশ করার প্রয়াসে বললেন, “বলো, কি চাই তোমার। তোমাকে কি প্রদান করলে, তুমি সন্তুষ্ট হয়ে আমার অধীনতা স্বীকার করবে, আর আমাকে সমস্ত ধ্বনির অধীশ্বর করে দেবে”।

মৃষু হেসে বললেন, “এ আবার কি ধরনের বোকা বোকা প্রশ্ন মন্ত্রক? স্ত্রীকে বশ করতে হলে, তাঁকে চমকিত করতে হয়, প্রভাবিত করতে হয়। প্রভাবিত করো দেবীকে। তিনি স্বতঃই তোমার পত্নী হয়ে যাবেন, আর তুমি হয়ে উঠবে সমস্ত ধ্বনির অধীশ্বর”।

শ্বেতাম্বর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন এই কথা শুনে, আর রমনাথের উদ্দেশ্যে বললেন, “প্রভু, অম্বিকাপুত্র তো অত্যন্ত চতুরও। মন্ত্রক আমাদেরই অস্ত্র, আর সে আমাদেরই অস্ত্র দিয়ে আমাদের উপর আঘাত করছে। আমার থেকে শ্বেতাকে ছিনিয়ে নেবার প্রয়াস করছে, আর মন্ত্রককে এইভাবে নিজের মিত্র করে নিচ্ছে”।

পীতাম্বর হেসে বললেন, “সেটাই তো দেখছি শ্বেতাম্বর। মৃষুর বল আমরা দেখেছি, অনন্য বেশে তার ক্রীড়াকৌশলও আমরা দেখেছি, কিন্তু এবার সে সম্যক এক শ্রেষ্ঠ সাধের সাথে ক্রীড়া করছে। কি তার মেধা, সেটা আমাদের জানা দরকার, কি তার প্রবণতা আর উদ্দেশ্য, সেটাও তো আমাদের জানা দরকার। আমাদের অম্বিকাপুত্রের মধ্যে দুর্বল স্থান খুঁজে পেতে হবে। বিচার করে দেখুন, এতকাল আমরা ভেবে যাচ্ছিলাম যে, মাতৃপ্রেমই তার শক্তি আর দুর্বলতা, আর তাই আমরা তার উপর প্রত্যক্ষ ভাবে আঘাত করতে পিছুপা হচ্ছিলাম এই ভেবে যে, তার উপর আঘাত করলে, সাখ্যাত পরাপ্রকৃতি আমাদের সাথে যুদ্ধে রত হয়ে যাবেন। কিন্তু শ্বেতাকে বন্দিনী করিয়ে, তার উপর মন্ত্রকে অধিকার স্থাপনের মন্ত্রণা প্রদান তো অন্য কথা বলছে শ্বেতাম্বর!”

শ্বেতাম্বর চিন্তিত হয়ে বললেন, “কিন্তু প্রভু শ্বেতা…!”

রমনাথ বললেন, “চিন্তা করবেন না, শ্বেতাকে আমরা পুনরায় উদ্ধার করেই নেব। আর মাতৃপ্রেম থেকে চ্যুত হবার কারণে, এমনিই তো পরাপ্রকৃতি নিজের পুত্রের প্রতি রুষ্ট হয়ে যাবেন! যেই কাজ আমরা করবো ভাবছিলাম যে, মা আর সন্তানের মধ্যে ভেদ তৈরি করবো, তা তো এবার অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে। যেই কাজ আমরা করতে পারছিলাম না, সেই কাজ তো স্বয়ং মৃষুই সহজ করে দিলো আমাদের কাছে। … এবার তো মা আর পুত্র একে অপরের শত্রু হয়ে সম্মুখীন হবে। মাতার হাতে পুত্রের নাশ হবে, আর পুত্রের নাশ করে মাতৃত্বের নাশ হতে, মাতাও প্রগল হয়ে গিয়ে আমাদের পিছু ছেড়ে গাঢাকা দেবে”।

এতো বলে একদিকে যখন ত্রিমূর্তি অট্টহাস্যে মেতে রইলেন, তখন মন্ত্রক প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু সেই যোদ্ধা কে, যাকে পরাজিত করলে, দেবী শ্বেতা আমাকে নিজের স্বামী বলে বেছে নেবেন?”

মৃষু হেসে বললেন, “সেটা আমি নই, দেবী শ্বেতা স্বয়ং বলবেন। তিনিই আবাহন করবেন সেই যোদ্ধাকে, যাকে পরাস্ত করুন আপনি, সেটা তিনি চান। তবেই তো আপনার প্রতি আস্থা জাগবে তাঁর। তাইনা সাধশ্রেষ্ঠ?”

মন্ত্রকের এই কথা বেশ পছন্দের হলে, দেবী শ্বেতার কাছে উপস্থিত হয়ে তিনি বললেন, “আবাহন করুন দেবী শ্বেতা, সেই বীরের আবাহন করুন, যাকে পরাজিত করা অসম্ভব বলে জ্ঞান করেন আপনি। আবাহন করুন দেবী”।

দেবী শ্বেতা মৃষুর দিকে তাকালে, মৃষু কেবল একটি মিষ্ট হাস্যদ্বারা বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর অন্তরে কি চলছে সেই কথা। দেবী শ্বেতাও মিষ্ট হেসে আবাহন করলেন স্বয়ং মাতা অম্বিকাকে। … প্রকট হলেন তিনি, তাঁর উর্জাপ্রকাশে ছিটকে পরে গেলেন মন্ত্রক। বীরত্ব ধারণ করে একের পর এক সমস্ত বশীকরণ করা ভূতপ্রেত দের ক্ষেপণ করলেন দেবী অম্বিকার দিকে। কিন্তু দেবী অম্বিকা যে স্বয়ং ভূতানী! একে একে সমস্ত প্রেতদের তিনি নিজের অন্তরে ধারণ করে নিলে, মন্ত্রক শক্তিহীন হয়ে গিয়ে পলায়নের প্রয়াস করতে থাকলেন।

সমস্ত জগতে নিজের সত্ত্বা স্থাপনের জন্য সহস্র সহস্র স্ত্রীদের বশ করে রেখেছিলেন মন্ত্রক ত্রিমূর্তির সহায়তায়। তাঁদের সকলকে আদেশ দিলেন, দেবী অম্বিকার সাথে লড়াই করার। দেবী অম্বিকা ভূমিতে একটি পদাঘাত করতে, সেই সমস্ত স্ত্রীর বশীকরণ বিনষ্ট হয়ে যায়, এবং তাঁরা মাতা অম্বিকাকে প্রণাম করে, নারীত্বের রক্ষক রূপে তাঁকে বারংবার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে, সেই গুহা থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন। নিরস্ত্র মন্ত্রকের কাছে আর কনো উপায় নেই পলায়ন ছাড়া। কিন্তু সে যে মূর্খ।

ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা পরমাত্ম, অর্থাৎ ত্রিমূর্তি। সকল যোনির অন্তরে আত্মভাব স্থাপন করে, সেই আত্মভাবকে ধারণ করার জন্য বাধ্য করে, সকলকে বশে করে রাখতে সচেষ্ট ত্রিমূর্তি। কিন্তু সমস্ত শক্তি যে পরাপ্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে। তাই যেকেউ নিজের আত্মভাবে যা খুশী কল্পনা করতে পারে, ভাবতে পারে, চিন্তা করতে পারে, ইচ্ছা করতে পারে, কিন্তু বলতে, করতে তাই পারে, যাকে প্রকৃতি সম্মতি প্রদান করেন। তাই মন্ত্রক এক কদমও আগে এগোতে পারলো না।

মাতা অম্বিকা কেবল নিজের দৃষ্টির ইশারাতে ভূমিতে ঘষটে ঘষটে টেনে আনলেন মন্ত্রকের সূক্ষ্মদেহকে। আর যতই নিকটে আসতে থাকলো মন্ত্রক, ততই দেবী অম্বিকার অবয়বের আকৃতি বিশাল হতে থাকলো। তাই যখন মন্ত্রকের ভূমিষ্ঠ দেহকে দেবী অম্বিকা নিজের দুই বাহুদ্বারা উত্তোলন করলেন ভূমি থেকে, তখন আর মন্ত্রকের দেহকে বৃহতাঙ্গ  লাগছিলনা, আর সুপুরুষও দেখাচ্ছিল না তাকে, কারণ ভূমিতে হেঁচড়ে হেঁচড়ে তাঁকে টেনে আনার কারণে, তার সমস্ত দেহ লহুতে সিক্ত হয়ে গেছে।

দেবী অম্বিকা একটি হস্তে ধারণ করলেন মন্ত্রকের মুণ্ড আর অন্য হস্তে ধারণ করলেন মন্ত্রকের দুইচরণকে। আর সামান্য একটি হেঁচকা দিতে, মন্ত্রকের সম্পূর্ণ অবয়ব বেশ কিছু অংশে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলে, সম্পূর্ণ মৃত্তিকা রক্তিম হয়ে ওঠে, আর তাই সেই মৃত্তিকাকে রাঙামাটি বলা হতে থাকে। দেবী শ্বেতা বন্ধন মুক্ত হন, আর মৃষু বললেন, “মা, তোমার তিন অঙ্গের এক অঙ্গ, মাতা শ্বেতা আজ পুনরায় তোমার সাথে একাত্ম হয়ে যাবে। তোমার দ্বিতীয় অঙ্গও অনুরূপ ভাবে শীঘ্রই তোমার সাথে পুনরায় মিলিত হবেন। গ্রহণ করো মা, পূর্ণ হয়ে যাও মা পুনরায়”।

দেবী শ্বেতা মৃষুর সম্মুখে এসে, মৃষুকে নিজের ক্রোড়ে তুলে নিয়ে তাঁর সর্বাঙ্গ চুম্বন করতে করতে বললেন, “ক্ষমা করে দিও পুত্র তোমার মাতাকে। … একমুহূর্তের জন্য হলেও, আমি বিচলিত হয়ে গেছিলাম তোমার আচরণে। ভেবেছিলাম, আমার পুত্র আমাকে পুনরায় বন্দী করার মন্ত্রণা কেন প্রদান করছে। … যোদ্ধা তুমি পুত্র। ভয়ানক যোদ্ধা তুমি। তাই তো অনায়সে তুমি তোমার মাতাকে তোমার মায়ের মধ্যে পুনরায় ফিরিয়ে দিলে”।

দেবী শ্বেতা মাতা অম্বিকার মধ্যে স্থান গ্রহণ করলে, মৃষু গুহা থেকে নিঃশব্দে চলে যেতে থাকলেন। দেবী অম্বিকা তাঁকে পিছু ডেকে বললেন, “মায়ের সাথে কথা কইবে না পুত্র?”

মৃষু একচোখ জল নিয়ে, একবার পিছন ঘোরার প্রয়াস করলেন, তারপর বিচার করলেন যে, সে নিজের নেত্রের অশ্রু মা’কে দেখাবেনা। তাই স্থির হয়েই ঢোক গিলে বললেন, “আমার পুরো মা চাই। অর্ধেক মা নয়। অম্বা নয়, আমার সর্বাম্বা চাই। … যেদিন অম্বা পুনরায় সর্বাম্বা হয়ে উঠবে, সেদিনই আমার অধিকার থাকবে, আমার মায়ের চোখে চোখ রাখার”।

মৃষুর কণ্ঠস্বর কম্পমান। দেবী অম্বিকার পুত্রের প্রেমের ঝলক মাত্রেই নেত্র ছলছল করে উঠলো। তাঁর স্তন মমতার দুগ্ধে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। গলা ফেরে ডাকতে ইচ্ছা হলো একবার, “পুত্র…!” কিন্তু তাঁর কণ্ঠপূর্ণ হয়ে গেছিল মমতা আর বাৎসল্যের ক্রন্দনবারিতে। তাই তাঁর কণ্ঠ থেকে শব্দই উচ্চারিত হলো না। শুধুই নেত্র বন্ধ করে, পুত্রের অবয়ববকে নিজের নেত্রের সম্মুখে অনুভব করে, দুই নেত্র অহরহ অশ্রু বিসর্জন করলো। একই অবস্থা তাঁর পুত্রেরও।

দেবী পাবনি তাঁকে শান্ত করতে সূক্ষ্ম বেশে এলেন। এসে বললেন, “এমন কেন মায়ের সাথে অভিমানের খেলা খেলছো পুত্র। তোমার মা তোমাকে বক্ষে ধারণ করার জন্য কবে থেকে ব্যকুল হয়ে রয়েছেন, সে সম্বন্ধে তোমার ধারণা আছে পুত্র?”

মৃষু ক্রন্দনকে অন্তরে ধারণ করে বাইরে হেসে বললেন, “কিন্তু আলিঙ্গন করেন নি তিনি, কারণ যদি তাঁর আলিঙ্গনে মেতে গিয়ে আমি আমার সমস্ত ৭ খণ্ডকে স্বীকার করার পথ থেকে সরে যাই, সেই কারণে। … মাতা, জানেন আপনি, মাতা কেন নিজেকে ত্রিখণ্ডে বিভাজিত করেছেন? কারণ তিনি তাঁর পুত্রকে তার ৭ খণ্ডে বিভাজিত হয়ে যাবার পীড়া একাকী ভোগ করতে দিতে চাননি। যেই পীড়া তাঁর পুত্র ভোগ করছে, সেই একই পীড়া তিনি নিজেকে প্রদান করতে, নিজেকে তিন খণ্ডে বিভাজিত করে দিয়েছিলেন”।

“মাতা, তিনি আমাকে আলিঙ্গন করেন নি, ততক্ষণ করেন নি, যতক্ষণ না সমস্ত ৭ কলাকে আমি ধারণ করি। যতক্ষণ না আমি পূর্ণ হই। … তাই আমিও তাঁকে ততক্ষণ আলিঙ্গন করবো না। যতক্ষণ না তিনি পুনরায় পূর্ণ হয়ে যান”।

দেবী পাবনি আর কিচ্ছু বলতে পারলেন না। নিঃশব্দ হয়ে গিয়ে কেবল দেখলেন যে, “মা আর পুত্র একই ধাতু দ্বারা নির্মিত। দুজন দুজনের সমস্ত পীড়াকে অনুভব করতে মত্ত। দুজন দুজনের জন্যই যেন অস্তিত্বে স্থিত। অদ্ভুত প্রেম, মা আর পুত্রের মধ্যে”।

ছুটে গেলেন দেবী অম্বিকার কাছে, আর বললেন, “অম্বিকা, কষ্ট পেও না। তোমার পুত্র তোমাকে…”।

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “জানি, এতটা প্রেম বোধ হয় আমিও তাকে করতে পারিনি, যতটা প্রেম সে আমাকে করে। … আজ মনে হচ্ছে, আমি সত্যই মা হতে পেরেছি। … দিদি, আজ আমার বুক খাঁখাঁ করছে, দিবারাত্রের জ্ঞান হারিয়ে যাচ্ছে আমার থেকে। খালি পথ চেয়ে বসে রয়েছি যে, আমার পুত্র কবে আমাকে আলিঙ্গন করবে”।

দেবী কৃত্তিকা সম্মুখে এসে বললেন, “কিন্তু দেবী, ত্রিমূর্তি সতর্ক হয়ে গেছে দেবী শ্বেতার ক্ষয় থেকে। দেবী শ্রীকে কিভাবে আনবে মৃষু ফিরিয়ে?”

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “ব্যকুল সে, এই মায়ের বুকে আছরে পরার জন্য। আর শপথ নিয়ে রেখেছে অন্তরে, শ্রীকে আমার কাছে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত সে আমার বক্ষে মাথা রাখবেনা। … প্রেম কৃত্তিকা। অপার প্রেম। এই প্রেমই তো আমার পুত্রের মহাবল। এই মহাবলের কাছে তো ত্রিমূর্তিকে পরাজয় স্বীকার করতেই হবে। এই মহাবলের কাছে তো কনো অস্ত্র, কনো শাস্ত্র, কনো ছল, চাল, চাতুরী, কনো কিচ্ছু কনো কাজ করেনা। … আমার পুত্র, শ্রীকে আমার কাছে আনবেই। ত্রিমূর্তি যেমন শ্বেতার ক্ষেত্রেও কিচ্ছু করতে পারেনি, তেমন এক্ষেত্রেও পারবেনা”।

অন্যদিকে শ্বেতাম্বর শ্বেতাকে হারিয়ে বিক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থিত হলেন রমনাথের কাছে আর বললেন, “কি হলো প্রভু, আপনি তো বড় মুখ করে বলেছিলেন, দেবী শ্বেতাকে আপনারা উদ্ধার করে আনবেনই। তো কই আনুন?”

রমনাথ মাথা নিচু করে থাকলে, পীতাম্বর বললেন, “আমরা এখনো ব্রহ্মাণ্ডের হর্তা কর্তা বিধাতা। দেবী শ্বেতাকে অপহরণ করার মন্ত্রণা প্রদানের জন্য দণ্ড তো আমরা এখনো দিতে পারি মৃষুকে। হাজার হোক সে আমাদের ব্রহ্মাণ্ডেই বিরাজমান। আমাদের ব্রহ্মাণ্ডে দাঁড়িয়ে অপকর্ম করার দণ্ড আমরা কি দিতে পারিনা তাকে?”

রমনাথ বললেন, “নিসাধরা পূর্ণভাবে সমর্থন করছে মৃষুকে, আর সঙ্গে সঙ্গে পক্ষরাও। এমন অবস্থায়, আমরা তেমন কিছু করলে, এরা সকলে মিলে আমাদের বিরোধ করবে। … পক্ষরা সমস্ত মাস হয়ে বিরাজ করছে। বিচার করুন পীতাম্বর, তাঁরা বিরোধ করলে সমস্ত জীব আমাদের বিরোধী হয়ে যাবে। সমস্ত প্রেত মুক্ত হয়ে গেছে মন্ত্রকের বিনাশের সাথে সাথে। এমন অবস্থায় শাস্ত্রী, যক্ষ, নাগা, কারুর কাছে ভণ্ডামি ব্যতীত কনো শক্তিই আর অবশিষ্ট নেই। তাই নিসাধরা অত্যন্ত শক্তিশালী। … এই অবস্থায় একমাত্র মোহকই ভরসাযোগ্য। দুর্নিবার নভকে ডেকেছে। আর নভকে বিভ্রান্ত করতে মোহকও গেছে ওই দেখুন”।

শ্বেতাম্বর হেসে বললেন, “আর মোহকের পিছনে রয়েছে মৃষু। ওই দেখুন। … এবার শ্রীর পালা। এবার আমাদেরকে শ্রীহারা করবে মৃষু। প্রভু, আপনারা এখনো মৃষুকে সামান্য এক বালক ভাবছেন। … কিন্তু ভুলে যাচ্ছেন, স্বয়ং আদিশক্তির দুলাল সে। মহার্ঘ্য শক্তি, মেধা আর কৌশল সম্পন্ন সে। আমার তো এমনও মনে হচ্ছে যে, দেবী অম্বিকার কিচ্ছু করতে পারবে না আমাদের নির্মিত দুর্গ, কারণ মৃষুই সেই দুর্গের নাশ করে দেবে। সময় থাকতে মৃষুর নাশ করুন প্রভু। মাতাপুত্রের মিলন হয়ে গেলে, সমস্ত কিছু ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। মিলিয়ে নেবেন আমার কথা”।

একদিকে যখন রমবনে এমন জল্পনা চলছিল, তখন নভের সাথে সাখ্যাত করে মোহক বললেন, “কি নিসাধরাজ, ওই বিষ ধারণ করতে নিমন্ত্রণ করেছে তো দুর্নিবার। এই সবে মন্ত্রকের নাশের পর আপনারা সমস্ত শক্তি ফিরে পেলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে দেখুন বিষ দিয়ে আপনাদের থেকে সমস্ত শক্তিকে পুনরায় ছিনিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে দুর্নিবার”।

নভ বললেন, “তুমি যে কতবড় ছলনা আর চক্রান্তকারী সেটা তো সকলেই জানে মোহক। তাই তোমাকে বিশ্বাস করার কনো কারণ কি আছে আমাদের কাছে?” আর তা বলে সেখান থেকে এগিয়ে গেলেন। মোহক কি করা যায় এমন ভাবতে থাকলেন, এদিকে মোহকের অগোচরেই দ্বাদশ বর্ষীয় মৃষু এবার নভের সম্মুখে গিয়ে বললেন, “কিন্তু আমাকে বিশ্বাস তো করা যেতেই পারে, তাই না নিসাধরাজ?”

মৃষুর দিকে সকলে নজর দিলে, মৃষু এবার বললেন, “মানছি মোহক একাধিক নোংরা কাজ করেছে। আমার ও সমস্ত জগতের জননীর প্রতি যৌন দৃষ্টি রেখে সে অত্যন্ত ঘৃণ্য। কিন্তু আমি বলছি নিসাধরাজ, মোহক সঠিকই বলছে। … তবে দুর্নিবারের তেজকে সহন করাও সহজ কথা নয়। তাই কেন না, তাঁর কাছে গিয়ে, সেই বিষকে গ্রহণ করে, মোহকের মন্ত্রণাকে ব্যক্ত করে, সেই বিষকে বিনষ্ট করে দেওয়া হোক?… বিচার করে দেখুন নিসাধরাজ। বিষও নষ্ট হবে, আর তাকে বিষ বলে সনাক্ত করা ঘৃণ্য ও মহাবলি সাধ, মোহকেরও”।

নভ মুচকি হেসে এগিয়ে গেলেন এবার দুর্নিবারের কাছে। দুর্নিবার একটি পুষ্প দিলেন নভকে আর বললেন, “নিসাধরাজ, আমি শুনেছি মন্ত্রকের নাশের কথা আর এও জেনেছি যে সমস্ত প্রেতের নাশ হয়েছে, আর তোমরা নিসাধরা পুনরায় শক্তিশালী হয়ে গেছ। এই নাও এই পুষ্প। এই পুষ্প তোমাদের শক্তিকে সুরক্ষিত রাখবে। আর কখনো তোমাদের শক্তির নাশ না হয়, এই পুষ্প এটি নিশ্চিত করবে”।

নভ অনহঙ্কারি হাস্য প্রদান করে সেই পুষ্প গ্রহণ করে, সেই পুষ্পের একটি একটি পাতাকে ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলতে থাকলেন, “আপনারা ঋষিরা যে কার গুলাম, সেটা সকলেই জানে। কিন্তু তা জেনেও, আমি যে কেন ভুলে যাই বার বার, তা জানিনা। ভালোই হয়েছিল পথে মোহকের সাখ্যাত হয়েছিল। সে সমস্ত কিছু স্মরণ করে দেয় আমাকে, আর আপনি যে আমাদের শক্তিকে পুনরায় শোষণ করার জন্য এই বিষফুল দিচ্ছেন, তাও বলে দেয়। কিন্তু এই দেখুন, আমি যে আপনার দেয় পুষ্পকেই নষ্ট করে ফেলেছি! … এবার কি হবে?”

রমনাথ হেসে বললেন, “দেখলেন শ্বেতাম্বর, পীতাম্বর, যেই কাজ মোহকও করতে পারেনি, সেই কাজ মৃষু করে দিলো আমাদের জন্য”।

অন্যদিকে দুর্নিবার ক্রুদ্ধ আবেশে গর্জন করে উঠলেন, “মূর্খ তুমি নভ। ওই ধূর্ত বাচাল মোহক, যে জগন্মাতার প্রতি যৌনদৃষ্টি রাখতে কুণ্ঠা করেনা, তার কথা শুনে তুই আমার যজ্ঞের ফুল নষ্ট করে দিলি? তোরা তো কেউ শ্রীর অধিকারী নস। শ্রী মানে জয়, শ্রী মানে বিজয়, শ্রী মানে সন্তান, শ্রী মানে ধান, শ্রী মানে সমৃদ্ধি, শ্রী মানে পবিত্র মেধা। … না মূর্খ, না … তোদের কারুর কাছে শ্রী থাকতে পারেনা”।

“প্রথম তো আমি ওই নিকৃষ্ট বালক মোহককে চূর্ণ করবো আমার তপস্যার বলদ্বারা। তারপর তোদেরকে আমি দেখছি”। এতো বলে, নিজের কাছে থাকা পবিত্র যজ্ঞের জল ধারণ করে তা মোহকের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করলে, মোহক অসম্ভব দেহের জ্বালায় পীড়িত হতে থাকলো। তা দেখে রমনাথ বিচলিত হয়ে উঠলে, পীতাম্বর একটি পদ্মকলি ক্ষেপণ করলেন মোহকের উদ্দেশ্যে, তার তাপকে সংযত করতে। কিন্তু সেই পদ্মকলি তার কাছে পৌঁছানর পূর্বেই, মোহকের দেহতাপ এমনই বৃদ্ধি পেল যে, তা তাঁর সম্পূর্ণ সূক্ষ্মদেহকে সহস্র সহস্র টুকরে বিভাজিত করে চারিদিকে ধুয়া ধুয়া করে দিলো, আর পীতাম্বরের কমলপুষ্প সেই ধূম্রের মধ্যে স্থিত হয়ে, স্বয়ং মলিন হয়ে গেল।

অতঃপরে দুর্নিবার ক্রুদ্ধ আবেশে হুংকার দিয়ে গর্জন করে উঠলেন, “শ্রীর কদর যখন বুঝিসই না, নে তখন সমস্ত  ব্রহ্মাণ্ড থেকে লুপ্ত হয়ে যাবে শ্রী। হৃদসাগরের গহনে শ্রী নিবাস করবে এবার থেকে, আর তাঁর উপর কারুর অধিকার থাকবেনা। সমস্ত সাধ, সমস্ত নিসাধ, সমস্ত ত্রিমূর্তি, সকলে শ্রীহীন হয়ে যাবে এই মুহূর্ত থেকে”।

পীতাম্বর এই কথনের খানিক পরেই মূর্ছাপ্রায় হয়ে গেলে, শ্বেতাম্বর তাঁকে ধরলেন, রমনাথ বললেন, “এর অর্থ, মৃষু দুর্নিবারের থেকে এই অভিশাপ প্রদান করার জন্য এমন মন্ত্রণা প্রদান করলো। শ্বেতাম্বর সঠিক বলেছ তুমি। শ্রীকে হননের প্রয়াস করছে এবার মৃষু। … নিসাধ আর সাধদের একত্রিত করতে হবে, শ্রীকে উদ্ধার করতে হবে। শ্রীর সাথে সাথে, সমস্ত সম্পদও সাগরে চলে গেছে”।

শ্বেতাম্বর বললেন, “সঠিক বলেছেন, সমস্ত সম্পদ উদ্ধার করতেই হবে আমাদেরকে। যক্ষস্ত্রীদের ছাড়া, যক্ষবিদ্যা যে হারিয়ে যাবে। নাগা স্ত্রীদের ছাড়া নাগাস্ত্র হারিয়ে যাবে। সুরা হারিয়ে গেলে, আমাদের বশীকরণের অস্ত্র হারিয়ে যাবে। কামগন্ধও সাগরনিচে চলে গেছে, তাহলে আর আমরা কামগন্ধ দিয়ে সকলকে বশীকরণ করবো কি করে? যক্ষস্ত্রী, নাগাস্ত্র, কামাস্ত্র, সুরাস্ত্র, খলাস্ত্র, যন্ত্র, মন্ত্র, অমৃত, জ্বরা, আহারজ্ঞান, ওষধিজ্ঞান এই একাদশ অস্ত্র না পেলে যে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাবো। মৃষু আমাদেরকে নিরস্ত্র করে দেবার মন্ত্রণা করেছে। আমাদেরকে এই একাদশ অস্ত্র উদ্ধার করতেই হবে রমনাথ”।

মূর্ছা অবস্থা থেকে পীতাম্বর মুক্ত হয়ে বললেন, “শ্রীর সাথে সাথে সকলের সকল সামর্থ্যও চলে গেছে। এমন অবস্থায় একা সাধরা এই উদ্ধার কাজ করতে পারবেনা। নিসাধদের সাথে একত্রিত হয়ে এই কাজ করতে হবে। দেবী শ্রী সহ দ্বাদশটি সম্পদ। … সাধ আর নিসাধ একত্রে তা উদ্ধার করলে যে, আমাদেরকে নিসাধদেরকেও সমান সমান ভাগ দিতে হবে, সমস্ত কিছুর তাই না?”

রমনাথ বললেন, “আমি স্বয়ং ভাগ করবো সমস্ত কিছুর। যক্ষস্ত্রী, নাগাস্ত্র, অমৃত, আহারজ্ঞান আর ওষধিজ্ঞান আমি সাধদের প্রদান করবো। আর কামাস্ত্র, সুরাস্ত্র, খলাস্ত্র, যন্ত্র, মন্ত্র এই পাঁচটিকে নিসাধদের প্রদান করবো, কারণ ওদের এগুলো নিয়ে কনো উপযোগীতাই নেই অর্থাৎ সাধরা তা তাঁদের থেকে একসময়ে অধিগ্রহণ করেই নেবে। জ্বরাকে আমি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখবো, আর শ্রীকে আপনি। … তাই এই সাগরমন্থন শুরু করতে হবে আমাদেরকে।

সাধদের কাছে উপস্থিত হলেন ত্রিমূর্তি, এবং পরামর্শ দিলেন তাঁদেরকে নিসাধদের সাথে সন্ধি করে, তাঁদের সাথে মিলে হৃদসাগরকে মন্থন করার জন্য। সাধরা নিসাধদের সাথে সন্ধি করতে আপত্তি জানালে, সম্মুখে জিতেশ এসে বললেন, “যাদেরকে আমরা পায়ের তলায় রাখবো বলেই অস্তিত্বে এসেছি, তাঁদের সাথে সন্ধি! এতো অসম্ভব!”

পীতাম্বর সম্মুখে এসে বললেন, “কোথায় তোমার তন্ত্র, মন্ত্র আর যন্ত্র! সেই শক্তি ব্যবহার করে দেখাও সাধপাল”।

বাহুক বললেন, “সমস্ত কিছু সাগরের তলে চলে গেছে। সমস্ত বল হারিয়ে ফেলেছি আমরা”।

ডাহুক সামনে এগিয়ে এসে বললেন, “সেই জন্যেই তো ত্রিমূর্তি এসেছেন এখানে। বাহুক, সাধপাল বুদ্ধিমানির সাথে কাজ করো। নিসাধদের সাথে সন্ধি করে আমাদের বলসমূহকে পুনোরদ্ধার করে নিয়ে, আবার আমরা নিসাধদের পায়ের তলায় পিষে দিতে পারবো”।

সাধপাল সম্মুখে এসে বললেন, “সাগর আমরাই মন্থন করে নেব। নিসাধদের সঙ্গে নিলে যে ওদেরকেও সমান ভাগ দিতে হবে যা সাগর থেকে উঠবে। … বিচার করে দেখো, যা কিছু আমাদের, তা তো সাগরের থেকে পেয়েই যাবো আমরা, সঙ্গে সঙ্গে নিসাধদের সামর্থ্যও সাগরে চলে গেছে, সেই সকলও আমাদের হয়ে যাবে। … কিন্তু ওদের সঙ্গে নিলে, সমান ভাগ দিতে হবে ওদেরকে, অর্থাৎ যেমন পূর্বে ছিল, তেমনই হয়ে যাবে”।

পীতাম্বর কিছু বলতে উদ্যত হলে, রমনাথ তাঁর দিকে চোখের ঈসারা করে চুপ করে যেতে বললেন, আর সাধদের উদ্দেশ্যে বললেন, “বেশ তাই করো। হৃদসাগর মন্থন করা সহজ কাজ হবেনা। বিশাল সাগর তা, অনন্ত ভাবরাশি তাতে। এক বিশেষ মন্থন দণ্ড লাগবে, আর সাথে সাথে এক বিশাল মন্থন রশি লাগবে, আর মন্থনদণ্ডকেও এক বিশাল শক্তিশালী স্থাপত্য দ্বারা সাগরে ভাসমান রাখতে হবে, তবেই এই মন্থন সম্ভব হবে। সেই সমস্ত সামগ্রী প্রস্তুত করো”।

ডাহুক বললেন, “আমাদের সহায়তা করুন প্রভু। আমার বিচারে মহারাজ মদই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এই মন্থনদণ্ড হতে পারেন। তাঁর ন্যায় মদশ্রেষ্ঠই দৃঢ় ভাবে এই মন্থন কর্মে স্থিত থাকতে সক্ষম। বাকি কেউই ভার রাখতে পারবে না, না হৃদসাগরের ভাবের ভার রাখতে পারবে, আর না আমাদের বলের ভার সামলাতে পারবে। কিন্তু আপনি যদি না বলেন প্রভু, তাহলে সেই অজমুখ যে কিছুতেই রাজি হবেনা, এই কাজের ভার গ্রহণ করতে”।

রমনাথ হেসে বললেন, “নামই যার মদ, সে কারুর অনুরধেই সারা দেবে না। তোমাদের তাঁর কাছে গিয়ে নিজেদের বাহুবল প্রদর্শন করে তুলে এনে এই হৃদসাগরে পতিত করতে হবে”।

বাহুক বললেন, “সে তো আমরা আমাদের বলদিয়ে করে নেব, কিন্তু মন্থনের রশি কে হবে?”

সাধপাল জিতেশ বললেন, “দেবী বাসনা। এক তিনিই এই মন্থনের ঘর্ষণ সহ্য করতে সক্ষম। যিনি সহস্র সহস্র সন্তানের জন্ম দেবার ঘর্ষণ সহন করেছেন, তাঁর পক্ষেই এই কর্ম সম্ভব। তবে তিনি তখনই আমাদের সহায়তা করবেন, যখন তাঁর স্বামী আমাদের সাহায্য করতে রাজি হবেন। যদি অজমুখকে আমরা এই কাজে রত করতে না পারি, তাহলে তিনিও কিছুতেই এই কাজে রাজি হবেন না। তাই চলো প্রথম আমরা অজমুখকে নিয়ে আসি এখানে”।

এতো বলে সকল সাধ অজমুখ মদের কাছে উপস্থিত হয়ে অনুরধ করলে, তিনি বিরক্তির সাথে বললেন, “আমাকে তোমরা তুলে নিয়ে যেতে পারলে, নিয়ে যাও। আমি আর কনো কাজে নিজের থেকে রুচি রাখিনা”। সেই কথা শুনে, সকল সাধ একত্রে নিজেদের সমস্ত বল প্রয়োগ করে দিলেও, সামান্যও টলাতে পারলেন না অজমুখকে। ব্যর্থ হয়ে তাঁরা রমবনে গমন করলেন যেখানে ত্রিমূর্তি অবস্থান করছিলেন। নিজেদের ব্যর্থতা ব্যক্ত করলে, দীর্ঘদেহী সুদর্শন ডাহুক বললেন, “আমি তো আগেই বলেছিলাম, আমরা বলশূন্য হয়েছি। এই অবস্থায় আমাদের নিসাধদের সাথে সন্ধি করতেই হবে, নাহলে আমরা এই কাজে সফলই হবো না। একবার আমরা আমাদের বল ফিরে পেয়ে গেলে, তারপর ছলের মাধ্যমে আমরা সহজেই নিসাধদের থেকে সমস্ত কিছু ছিনিয়ে নেব”।

এই কথাতে রাজি হয়ে, সাধরা উপস্থিত হলেন নিসাধদের কাছে, আর প্রস্তাব দিলেন এই মন্থন কর্ম করে, সমস্ত উদ্ধার করা সম্পদকে অর্ধেক অর্ধেক ভাবে বিভাজন করে নেবে তাঁরা। কিন্তু নিসাধরা এই প্রস্তাবেও রাজি হলেন না, কারণ নভ তাঁদেরকে বললেন যে, সর্বক্ষেত্রে তাঁদের সাথে ছল হয়েছে, আর এবারেও তাই হবে। ত্রিমূর্তি তাই নিসাধদের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে আশ্বাসন দিলেন যে, এই বণ্টন কর্ম তাঁরা করবেন। নিসাধদের সেই কথাও মনের মত হয়না, তাই কিছু সময় চাইলেন সিদ্ধান্ত নেবার জন্য।

আর সেই সময়ে তাঁরা উপস্থিত হলেন মাতা অম্বিকার স্মরণে, কৃত্তিকালোকের দ্বারে। মাতা অম্বিকা হেসে বললেন, “তোমাদের অধিকার কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবেনা। হ্যাঁ, চেষ্টা অবশ্যই হবে ছিনিয়ে নেবার, কিন্তু তাও পারবেনা। … নভ, এই মন্থন পর্ব নিশ্চিত করে দেবে যে তোমাদের সম্পত্তি ঠিক কি কি। অর্থাৎ, সমস্ত ক্ষেত্রে, সমস্ত অবস্থায়, অনন্তকাল পর্যন্ত সেই সমস্ত সামগ্রীর উপর অধিকার তোমাদেরই থাকবে। হ্যাঁ হতে পারে, মন্থন পরবর্তী কালে, ছল দ্বারা সেই সমস্ত সামগ্রী তোমাদের থেকে ছিনিয়ে নেবে সাধরা, কিন্তু মন্থন সেই সামগ্রীদের উপর তোমাদের নাম খচিত করে দেবে, তাই ছিনিয়ে নেবার পরেও, তা তোমাদেরই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আর তাই এক না এক সময়ে সমস্ত কিছু পুনরায় ফিরে পাবে তোমরা। তাই এই মন্থনে ভাগ নাও, আর কিছু সামগ্রীর উপর নিজেদের নাম লিখে দাও কালের খাতায়, এই সেই সুযোগ। এমন সুযোগ বার বার আসেনা নভ”।

মাতা অম্বিকার উপর নিসাধদের পূর্ণ আস্থা। তাই নিসাধরা রাজি হলেন মন্থন কর্মে। তবে সাধনিসাধ মিলেও অজমুখকে একচুলও অপসারিত করতে পারলেন না। সেই দেখে ত্রিমূর্তিরও ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে গেলে, নিসাধরাও চিন্তিত হয়ে গেলেন। দেবী মৃত্তিকা হেসে বললেন, “অম্বিকা দেবী সাখ্যাত এই কর্মে ভাগ তো নেবেন না। তবে এই সমস্ত কিছু কর্ম যার প্ররোচনায় হয়েছে, একমাত্র সে যদি আপনাদের সাহায্য করে। … তাই একবার অম্বিকাপুত্র মৃষুর কাছে যান আপনারা”।

নিসাধরা মৃষুর স্মরণে গেলে, মৃষু মিষ্ট হেসে, অন্তর্মুখী হয়ে নিজের হৃদয়ে অবতীর্ণ হয়ে, সেখান থেকে মদের কাছে উপস্থিত হন, এবং সরাসরি মদকে নিজের অন্তরমনের বলেই তুলে নিয়ে এসে হৃদসাগরে স্থাপন করে দিলেন। নিসাধরা ও সাধরা পরের কথা, এই অদ্ভুত কৃত্য দেখে, ত্রিমূর্তিও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। অম্বিকাপুত্রের সামর্থ্য সম্বন্ধে যে তাঁরা কিছুই জানেন না, তা পুনরায় প্রমাণিত হলো তাঁদের কাছে।

অজমুখকে মৃষু হৃদসাগরে স্থাপন তো করে দিলেন, কিন্তু সমস্যা এই হলো যে হৃদসাগরের অনন্ত ভাবধারার মধ্যে অজমুখ নিজের ভার সামলাতেই পারলেন না। ক্রমশ তলিয়ে যেতে থাকলেন ভাবের সাগরে। সেই দেখে, সাধ ও নিসাধরা ব্যস্ত হয়ে উঠলেও, কিচ্ছু করতে পারলেন না তাঁকে উন্নত রাখতে। সেই দেখে রমনাথ বললেন, “শ্রীকে ফিরে পেতে গেলে, এবার আমাদেরকেও আমাদের ভূমিকা পালন করতে হবে পীতাম্বর। আপনি যান মন্থন দণ্ডের ভার ধারণ করে অবস্থান করুন হৃদসাগরের তলদেশে”।

পিতাম্বর সেই কর্ম করতে হৃদসাগরে প্রবেশ করলেন এবং অজমুখের ভার ধারণ করে অবস্থান করলেন। মন্থনদণ্ড স্থিত হয়েছে দেখে, এবার সাধ ও নিসাধরা দেবী বাসনার কাছে গিয়ে বললেন, “দেবী, মহারাজ মদের অঙ্গঘর্ষণ সহন করার সামর্থ্য আপনার ব্যতীত কারুর নেই। এক আপনিই আছেন যিনি তাঁর অঙ্গঘর্ষণ থেকে এতো এতো সন্তান লাভ করেছেন। তাই একমাত্র আপনিই যদি মন্থনের রশি হন, তবেই অজমুখের কারণে সাগর থেকে লব্ধ হবে মহাসম্পদ সমূহ। তাই কৃপা করুন দেবী। স্বয়ং পীতাম্বর আপনার স্বামীর ভার ধারণ করে সাগরের তোলে অবস্থান করছেন। এক্ষেত্রে আপনিই একমাত্র সহায়ক হতে পারেন আমাদের”।

দেবী বাসনা সাধ ও নিসাধদের প্রস্তাবে রাজি হলে, তাঁকে নিয়ে উপস্থিত হলেন সকলে হৃদসাগরে, এবং তাঁকে স্বয়ং শ্বেতাম্বর মন্থনের রশি করে স্থাপন করলেন অজমুখের ঊর্ধ্বে। সম্পূর্ণ ব্যবস্থা সম্পন্ন হলে, এবার সাধরা একদিকে ও নিসাধরা একদিকে স্থিত হয়ে শুরু করলেন মন্থনকর্ম। দীর্ঘক্ষণ মন্থনের প্রয়াস চলতে থাকলেও, কনো লাভ প্রত্যক্ষ হলো না, কারণ কনো কিছুই সম্মুখে প্রকাশিত হলো না।

যখন সকলে নিরাশ হয়ে যাওয়া শুরু করলেন, তখন শুরু হলো এক বিপরীত পূর্বাভাস। চারিদিক গহন রক্তিম হয়ে উঠলো, যেন কনো আগামী মুহূর্তের নিদারুণ ঘটনার সূত্রপাতের ইঙ্গিত তা। সকলে বিচলিত হয়ে উঠলেন, তৎপর হয়ে উঠলেন মন্থন কর্মে। গহন রক্তিম হয়ে উঠলো আবহাওয়া। আর তারই মধ্যে থেকে পিত্তি রঙের এক বিষাক্ত ধুয়া চারিপাশে ছড়িয়ে যেতে থাকলো। সাধরা ও নিসাধরা সেই ধুয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে যাওয়া শুরু করলে, রমনাথের নির্দেশে শ্বেতাম্বর সকলকে ফিরিয়ে আনলেন হৃদসাগর থেকে।

রমনাথ বললেন, “জ্বরার উদয় হয়েছে শ্বেতাম্বর। আমি এই জ্বরা গ্রহণ করবো, আর যখন যখন যেই যেই জীব আমাদের বিরোধিতা করবে, তাদেরকে আমি এই জ্বরা দ্বারা আবদ্ধ করবো”।

এই বলে রমনাথ সেই জ্বরাধূম্র পান করা শুরু করলেন, আর যখন সমস্ত ধূম্র পান করে নিলেন তিনি, তখন তাঁর সমস্ত তনু নীলাভ হয়ে উঠলো। থরথর কাঁপতে থাকলো রমনাথ। এমনই উষ্মা তাঁর অঙ্গের যে কেউ তাঁকে স্পর্শ করা তো দূরের কথা, তাঁর নিকটেও যেতে পারলো না কেউ। সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড বিধ্বস্ত হতে শুরু করলো। সকলেই ক্রমে দুর্বল হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া শুরু করলো। দেবী বাসনারও একই দশা, অজমুখেরও এমনকি সাগরতলে স্থিত পীতাম্বরেরও সমান অবস্থা। দেবী মৃত্তিকা সেই দেখে প্রাণপণে মাতা অম্বিকার আবাহন করলে, দেবী অম্বা সকলের সম্মুখে উর্জ্জা বেশে প্রকট হলে, রমনাথের অন্তর থেকে সমস্ত জ্বরাধূম্রকে শোষণ করে নিলেন, এবং একটি অক্ষয়পাত্রে তা স্থাপন করে, জ্বরার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন, “তুমি কার কাছে যেতে চাও জ্বরা?”

জ্বরা পাত্রের মধ্যে স্থিত হয়ে করজোড়ে বললেন, “মাতা, আমার স্বভাব হলো ক্ষতি করা। অর্থাৎ সাধদের সাথে আমার স্বভাব অধিক ভাবে মেলে। তবে, কর্মের কর্মফল প্রদানের জন্যই আমার অস্তিত্ব, আর সাধদের কাছে আমি যদি থাকি তাহলে, আমাকে তাঁরা যখন তখন ব্যবহার করবে। তাই মাতা, আমার আপনার কাছেই থাকা সঠিক। কিন্তু আপনার সন্তানরা সেই ক্ষেত্রে বিপন্ন হয়ে যাবে। তাই উপায় বলুন আমাকে মাতা”।

দেবী অম্বা হেসে বললেন, “আমার সন্তানেরা আমার সমস্ত অঙ্গ স্পর্শ করে, কিন্তু আমার নেত্রের মণিকে তাঁরা স্পর্শ করেনা। তাই আমার নয়নের মণিতে স্থাপিত হও জ্বরা। তবে তোমার স্বভাব অনুসারে সাধদের কাছে তোমার অবস্থান হওয়া উচিত, তোমার এই তর্কও সঠিক। তাই আমার মণিতে স্থিত থাকলেও, যতদিন সাধকুল থাকবে, ততদিন তারা তোমার ব্যবহার করবে”।

জ্বরা বললেন, “মাতা, আমি আপনার মণিতে স্থিত থাকলে, আপনার মণি সর্বক্ষণ জ্বলবে, আর আপনি কখনোই নিদ্রা যেতে পারবেন না”।

দেবী অম্বা হেসে বললেন, “জানি আমি সেই কথা, আর জানি বলেই বলছি আমার মণিতে স্থিত হও। এক তুমি আমার মণিতে স্থিত থাকলে, তবেই আমার সন্তানরা সুরক্ষিত থাকবে”।

জ্বরা করজোড়ে বললেন, “সত্য অর্থে জননী আপনি মাতা। সর্বক্ষণ সন্তানের চিন্তা আপনাতে বিরাজ করে। বেশ আমি আপনার নেত্রের মণিতে বিরাজ করলাম। আর তাই আজ থেকে আপনার নাম হবে নীলমণি”।

এতবলে দেবীর নেত্রে জ্বরা স্থান গ্রহণ করলে, দেবীর কাছে প্রথম নিসাধরা, পরে সকলে করজোড়ে স্থাপিত হলে, সকলের উদ্দেশ্যে দেবী বললেন, “প্রতিটি সম্পদ যা উত্তলিত হবে, তারা নিজেরা সিদ্ধান্ত নেবে যে, তারা কোন পক্ষে যাবে। যেই পক্ষে তারা যাত্রা করবে, সেই পক্ষেরই হবে সেই সম্পদ”।

এত বলে মাতা অবলুপ্ত হলে, আবার মন্থন শুরু করলেন সকল সাধ ও নিসাধরা। তো একে একে যক্ষস্ত্রী প্রকাশ্যে এসে তা নিসাধদের পক্ষে গেলে, কামাস্ত্র উন্নত হয়ে সাধদের পক্ষে গেলেন। একই ভাবে নাগাস্ত্র, আহারজ্ঞান, ও ওষধিজ্ঞান নিসাধদের পক্ষে গেলে, সুরাস্ত্র, খলাস্ত্র সাধদের কাছে গেলে, যন্ত্র ও মন্ত্র উন্নীত হয়ে তা সরাসরি সাধপাল জিতেশের কাছে গেলেন।

আর এমন ভাবে বণ্টনের ফলে, ত্রিমূর্তি ভাবিত হয়ে গেলেন। যক্ষস্ত্রী ও নাগাস্ত্র নিসাধদের কাছে চলে যাবার অর্থ, ভূতদের আর কনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেনা সাধরাও আর তাঁরাও। আহারজ্ঞান আর ওষধিজ্ঞান নিসাধদের কাছে চলে যাবার অর্থ, যতই জ্বরার ব্যবহার করবে সাধরা, সেই জ্বরার ব্যবহারকে আহারজ্ঞান দ্বারা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া সম্ভব হবে আর ওষধিজ্ঞান দ্বারা জ্বরার প্রভাবকেই নষ্ট করে দেওয়া যাবে। একই ভাবে অমৃত নিসাধদের কাছে যাবার কারণে ভূতসমূহ সদাসদার জন্য অমর হয়ে গেল, আর তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবেনা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এক নতুন প্রক্রিয়াতে সাধদের আবার শক্তিশালী করে তুলতে হবে।

এরই মধ্যে চারিদিক অন্ধকার করে ঘনিয়ে এলে, আবারও সকলে ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। পূর্বে এমন হওয়াতে জ্বরার উত্থান হয়েছিল, আর তার ফলে পরিস্থিতি সমস্ত কিছু প্রতিকুল হয়ে গেছিল। তাই এবারও সকলে ত্রস্ত হয়ে গেলেন এই অন্ধকারের বিস্তারের কারণে। সাধ ও নিসাধরা মন্থন চালিয়ে গেলেন, আর তার থেকে উন্নত হলেন দেবী শ্রী। কিন্তু শ্রী উন্নত হবার পরেই তিনি সরাসরি চলে গেলেন দেবী অম্বার কাছে এবং দেবী অম্বার মধ্যে লীন হয়ে গিয়ে, মাতা অম্বাকে অম্বা থেকে সর্বাম্বা করে তুললেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22