আদি কৃতান্ত – প্রকৃত ঈশ্বরকথা

রমনাথ এবার পীতাম্বর ও শ্বেতাম্বরকে রমবনে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, “হে দ্বিমূর্তি, এবার আমাদের পরিকল্পনাকে অন্যধারায় পরিচালিত করতে হবে। কৃত্তিকা লোকে আমরা প্রবেশ করতে পারিনা। তাই আমরা জানতেও পারছিনা যে অম্বিকার সন্তনানের কত টুকরো সুরক্ষিত আছে। অম্বিকা একটি একটি করে নিজের সন্তানের প্রতিটি টুকরোকে স্বরূপে আনছে। আসন বেশে তাঁকে নীতিসচেতন করেছে; অনন্য বেশে তাঁকে ধর্ম ও রাজনীতি সচেতন করে তুলেছে। এবার না জানি, আর কত ভাবে সচেতন করবে। আমাদের এবার পদ্ধতির পরিবর্তন করতে হবে”।

পীতাম্বর বললেন, “ইতিমধ্যে তিন খণ্ডকে চেতনার আলোকে উদ্ভাসিত করা হয়ে গেছে দেবী অম্বিকার। যতটা ভেবেছিলাম, তার থেকে অনেক অধিক ভয়ঙ্কর যোদ্ধা তিনি। চুপচাপ নিজের শক্তিকে প্রকাশ্যে আনছেন তিনি। তিনিও জানেন যে আমাদের নির্মিত দুর্গের দ্বারপাল হলো জিতেশ। সাধপাল জিতেশের নাশ না করে, তিনি কিছুতেই দুর্গের অন্তরে প্রবেশ করতে পারবেন না”।

“তিনি স্বয়ংই জিতেশের নাশ করতে পারেন, কিন্তু তিনি এমন করবেন না কারণ এমন করলে তিনি নিজের সন্তানদের আস্থাই হারিয়ে ফেলবেন। আমাদের দেওয়া বরদানের মান রেখে তিনি আমাদের বরদান আর আমাদের নির্মিত দুর্গের নাশ করতে চাইছেন। তাই আমাদের এবার সাধপাল জিতেশকে জাগানো উচিত”।

শ্বেতাম্বর বললেন, “কিন্তু আসন, আর অনন্য, এই দুই কলারই তো বিস্তার দেখলাম আমরা। অন্য আরেক কলা বিস্তার কখন হলো? কি নাম তাঁর যার মধ্যে দিয়ে কলাবিস্তার সম্পন্ন হয়েছে আর আমরা জানতেও পারিনি!”

পীতাম্বর বললেন, “গতি। … হ্যাঁ, গতির ক্ষেত্রে আমরা বুঝতেও পারিনি যে আদিশক্তি নিজের সন্তানের কলাবিস্তার করছেন। আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে তাঁর পুত্রের নাশ হয়েছে আর তাই কনোদিকে নজর দিইনি”।

শ্বেতাম্বর বললেন, “কিন্তু সাধপালের জাগরণের চিন্তা কেন করছেন আপনি? অম্বিকাপুত্র যে তাঁর কাল!”

রমনাথ বললেন, “সেই জন্যই তো তাঁকে জাগ্রত করা, যাতে সে নিজের কালের বিনাশ করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা কেউই সরাসরি অম্বিকাপুত্রের বিরোধী হয়ে উঠতে পারছি না। কিন্তু সাধপাল সরাসরি বিরোধিতা করতে পারবে, আর তাই তাকে জাগানো অত্যন্ত আবশ্যক”।

পীতাম্বর বললেন, “কিন্তু তার কর্মপদ্ধতি কি হবে প্রভু!”

রমনাথ বললেন, “একটু বিচার করে দেখুন, অম্বিকা তাঁর পুত্রকে কি ভাবে বড় করছেন। জনকল্যাণ করাতে চাইছেন, যাতে সে আত্মভাব থেকে মুক্ত থাকে পূর্ণ ভাবে। … কিন্তু এই পদ্ধতির ফল কি হতে চলেছে পীতাম্বর? … সমস্ত মানবের মধ্যে আত্মবিরোধী ভাব প্রকাশ করতে চাইছেন তিনি। অর্থাৎ আমাদেরকে যে মান্যতা প্রদান করে মানব, সেই মান্যতাই নষ্ট করে দিতে চাইছেন। … তা কেন না আমরা সমস্ত মানবজাতিকেই বিষাক্ত করে দিই?”

শ্বেতাম্বর বললেন, “কিন্তু তা সম্ভব কি ভাবে?”

রমনাথ উত্তরে বললেন, “সাধপাল তিন শক্তির অধিকারী, তন্ত্র, মন্ত্র ও যন্ত্র। … তন্ত্রের মাধ্যমে সূক্ষ্মপঞ্চভূতের উপর অধিকার স্থাপন করে, তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে এনে, সমস্ত মানবজাতিকে অলৌকিক অশুভ শক্তির ভয়ে কুণ্ঠিত করে দিলে, তারা বাধ্য হবে আত্মচিন্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। একই ভাবে, মন্ত্র শক্তি হলো সেই শক্তি, যার দ্বারা পঞ্চভূতদের নির্মিত বিভিন্ন রসায়নিক বস্তুসামগ্রীকে দিয়ে ভয়াবহ অস্ত্র নির্মাণ করা যেতে পারে, আর তাই দিয়ে সমস্ত মানবকে বশীকরণ করে রেখে, তাঁদেরকে বাধ্য করা যেতে পারে আত্মসর্বস্ব হতে। আর শেষে পরে থাকে যন্ত্র। যন্ত্র হলো তা যার মাধ্যমে পঞ্চভূতের স্থূলরূপসমূহকে অর্থাৎ রাসায়নিক বস্তুদের মধ্যে সূক্ষ্মপঞ্চভূতদের সঞ্চালিত করে, তাদেরকে আত্মসুখ প্রদানের রসদ রূপে প্রদান করা, যাতে সকল মানব আত্মসুখসর্বস্ব হয়ে উঠে মনে করে যে তাঁরা শ্রেষ্ঠ কর্ম করেছে”।

পীতাম্বর বললেন, “প্রভু, আপনিও জানেন চেতনাপ্রবাহিত না হলে প্রাণের সঞ্চার হয়না। যদি এমন ভাবে মানবকে বিষাক্ত করে দেবার ফলে, চেতনা যে পূর্ণ ভাবে সুপ্ত হয়ে যাবে, তারপর পরাপ্রকৃতি চেতনারূপে তাঁদের মধ্যে স্থিত থাকাই বন্ধ করে দেন! … তাহলে তো মানবযোনির নাশ হয়ে যাবে!”

রমনাথ হেসে বললেন, “সেটাই তো চাই আমরা, তাই না? এক সন্তান বা সহস্র সন্তান, যেকোনো একটাকে বেছে নিতে হবে অম্বিকাকে। দুটিকে একত্রে সে কিছুতেই পাবেনা। যদি তাঁর সমস্ত মানবসন্তানদের তন্ত্র, মন্ত্র আর যন্ত্রের মধ্যে বশীকরণ করে রেখে দেওয়া যায়, তাহলে তিনি তাঁর সহস্র সন্তান হারাবার জন্য ভয়ার্ত হবেন। … দেব, আমাদের উদ্দেশ্য কি? প্রকৃতিকে আমাদের কাছে নতমস্তক করা। তাঁকে আমাদের দাসী করে রেখে দিয়ে, প্রাণের প্রবাহ তো থাকবে, কিন্তু আত্মের পূজা হবে সর্বত্র”।

“এর থেকে অধিক শ্রেয় উপায় কি হতে পারে? যখন প্রকৃতি তাঁর সহস্র সন্তানকে হারানোর ভয় পাবেন, তখন অবশ্যই অম্বিকা আমাদের শরণার্থী হবেন আর আমাদের দাসত্ব স্বীকার করবেন”।

শ্বেতাম্বর বললেন, “আর যদি অম্বিকাপুত্র পূর্ণ ভাবে সজ্জিত হয়ে সাধপালেরই বিনাশ করে দেয়? তাহলে তো আর তন্ত্র,মন্ত্র আর যন্ত্রের প্রভাব বিস্তৃত থাকবে না! তখন কি হবে?”

রমনাথ খলহাস্য হেসে বললেন, “মানবের স্মৃতিতে যা একবার অঙ্কিত হয়ে যায়, তা তাদেরকে দেহের পর দেহব্যাপী তাড়া করে ফেরে। তাই সাধপাল বিনষ্ট হয়ে গেলেও, অম্বিকাপুত্র সাধপালের নাশ করে দিলেও, মানুষের অন্তর থেকে তন্ত্রের কারণে ভয়, মন্ত্রের কারণে ক্ষমতা ধারণের লোভ, আর যন্ত্রের কারণে সুখলাভের কামনাকে রোধ করতে পারবেনা। অর্থাৎ সহস্র সন্তান হারাতেই হবে অম্বিকাকে যদি না আমাদের শরণার্থী না হয় সে”।

পীতাম্বর বললেন, “সঠিক বলেছেন প্রভু। আমরা কেনই বা অম্বিকাপুত্রকে নিয়ে এতো মাথা ঘামাচ্ছি? সে তো কেবল সাধপালের নাশ করবে। আমাদের উচিত, সাধপালের সাথে সাথে, সমস্ত দুর্গকেই জাগ্রত করে দেওয়া। শুধু সাধপালকে দিয়ে তন্ত্র, মন্ত্র আর যন্ত্রের বিস্তার নয়, দণ্ডশুণ্ডকে দিয়ে রোগভোগের বাড়বাড়ন্ত করতে হবে, মুমু আর মুমুপুত্র হাজতকে দিয়ে মানবের মধ্যে বিস্তার করতে হবে প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা”।

“স্ত্রীকে দাস করে নেবার আকাঙ্খার বিস্তার করাতে হবে মদমন্ত আর বারুদকে দিয়ে, যাদের নেতৃত্ব দেবে স্বয়ং ডাহুকবাহুক। চেতনার বিস্তার হলে ভাবের বিস্তার হবে, আর সেই ভাবকে অভিনয় করে ভণ্ডামি করে মানবকে ভ্রমিত করে দেওয়া যেতে পারে আর তা সম্ভব হীরাকয়লার সাহায্যে। শিশু, দুর্বল, আর গুণীব্যক্তির স্বাধীনতাহনন অত্যন্ত আবশ্যক, তা না হলে চেতনার বিস্তারকে কিছুতেই আটকানো সম্ভব হবেনা, আর সেই কাজ করবে মন্ত্রার, সংহার আর মোহক। আর এঁদের সকলকে নেতৃত্ব দেবে ইচ্ছাধারি”।

রমনাথ সেই কথায় সায় দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, আমরা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গেছিলাম। যাতে আমাদের দুর্গ নির্মাণ সফল হয়, সেই কারণে অম্বিকাকে ব্যস্ত করে দেওয়া দরকার ছিল, আর তা করার জন্য আমরা তাঁর পুত্রকে সাতটুকরে বিভক্ত করে দিয়েছি। তাঁদের নিয়ে দেবী ব্যস্ত হয়ে রয়েছেন। কিন্তু আমরা আমাদের লক্ষ্য ভুলে গিয়ে সেই দেবীর সন্তানের পিছনে পরে রয়েছি। আমাদের লক্ষ্য দেবীকে আমাদের কাছে সমর্পণ করানো। আর তা সম্ভব তখনই হবে যখন দেবীর সহস্র সন্তান বিলুপ্তির দ্বারে এসে উপস্থিত হবে। তাই আমাদের এবার সেইদিকেই নজর দেওয়া উচিত”।

পীতাম্বর বললেন, “আমি আর শ্বেতাম্বর সাধলোকে যাচ্ছি, আর সকল সাধের সাধদের সমবেত করে, তাঁদেরকে দায়িত্ব অর্পণ করছি। আপনি কেবল সাধপালের সাথে কথা বলে নিন। সে কারুর কথা শোনেনা আপনার কথা ছাড়া”।

রমনাথ বললেন, “বেশ তাই হোক”।

এই আলোচনা যেমন হলো, তেমন অনুসারেই সাধপালকে তথা সকল সাধ সম্রাটদের নির্দেশ দেওয়া হলে, শুরু হলো তাঁদের বিস্তৃত অজ্ঞানতা ও অন্ধবিশ্বাসের ডামাডোল মানব সমাজে।

নাগা ও যক্ষদের মাধ্যমে সাধপাল তন্ত্রের উত্থান করলেন। মন্ত্রের বিস্তার শুরু করলেন বালচের অধিষ্ঠাতা, যারা আত্মের পূজারি ছিলেন, তাঁদের মাধ্যমে। আর যন্ত্রের শুরুও তাঁদেরই আরো এক অংশ, যারা পশ্চিমে চলে গেছিলেন, তাঁদের মাধ্যমে করলেন। তবে মন্ত্রের ও যন্ত্রের বিস্তার হওয়ার জন্য প্রকৃতির সমস্ত রসায়নিক বস্তুর গবেষণা আবশ্যক অনুভূত হওয়াতে, সেই গবেষণার জন্য সময় নির্দিষ্ট করে দিলেন সাধপাল আর নাগা তথা যক্ষদের দিয়ে তন্ত্রের বিস্তার শুরু করলেন সেই মুহূর্তেই।

পঞ্চভূতের দুইধারার ক্রিয়া নিয়ে এই নাগারা আর যক্ষরা পূর্ব থেকেই গবেষণা করে রেখেছিলেন। একাধিক বিজ্ঞানতত্ত্বও ধারণ করে রেখেছিলেন নিজেদের কাছে। আর এই দুই ধারার বিস্তারের কারণে, একে অপরের বৈরীও ছিলেন। কিন্তু এবার সাধপালের নেতৃত্বে, এই দুই বৈরী গোষ্ঠী এক হওয়া শুরু করলেন, কারণ উভয়েরই উদ্দেশ্য এক, সমস্ত মানবকে এই পঞ্চভূতের রহস্য সম্বন্ধে অজ্ঞাত রাখা ও তাই দিয়ে ভয়ার্ত করা।

নাগারা সূক্ষ্মরূপে পঞ্চভূত নিয়ে ক্রিয়া করেন। এক পঞ্চভূতের দেহের নির্মাণ করেন প্রকৃতি থেকে সামগ্রী সংগ্রহ করে তাদেরকে পতির বীর্যের চরিত্রগুণ দ্বারা বন্ধনে আবদ্ধ করে এক জননী, এবং সেই দেহকে নিজের গর্ভে ধারণ করে তাকে যথার্থ করে তোলেন যতক্ষণ না জগজ্জননী নিজের কনো চেতনাপ্রকাশ সন্তানকে সেই গর্ভে স্থাপিত করে, সেই দেহকে প্রাণদান করে, সেই ভরুনে মেধার হৃদস্পন্দন প্রদান করছেন। সেই দেহে প্রাণ সঞ্চার হবার পর, তা ভূমিষ্ঠ হয় এবং জীবনযাপন করে সত্য সন্ধানের উদ্দেশ্যে।

যখন সেই দেহ গঠনের বিনাশ হবার সময় এসে যায়, বা সেই দেহে লক্ষ্যের দিকে আর অগ্রসর হওয়া অসম্ভব হয়ে যায়, তখন প্রকৃতি ও কালের ক্রীড়াতেই সেই দেহকে মাতারপদত্ত প্রাণ ত্যাগ করে, এবং নিজের অগ্রগতির মানদণ্ড অনুসারে অন্য নির্মিত দেহে স্থান গ্রহণ করে লক্ষ্যের পথে যাত্রাকে অব্যহত রাখতে হয়। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মাঝে অবশিষ্ট থাকে দুটি জিনিস, এক সেই দেহের পঞ্চভূত সার, আর দুই সেই দেহের প্রতি সেই প্রাণযুক্ত আত্মের আসক্তি। যতই সেই আসক্তি প্রবল হয়, ততই সেই পঞ্চভূতের পুনরায় প্রকৃতিতে লীন হয়ে যেতে অধিক সময় লাগে, আর যত অধিক সময় লাগে এই কাজে, ততই অধিক প্রকৃতির ভারসম্য বিনষ্ট হতে থাকে।

দেহকে ততদিন যদি রেখে দেওয়া হয়, তাহলে সেই দেহের পঞ্চভূত গঠনের বিকৃতির কারনে যেই দুর্গন্ধ সৃষ্টি হবে, তা বিরক্ত করে দেবে সকল মানুষকে। তাই সেই দেহকে জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রথা নির্মাণ করেছে মানুষ। আর এই জ্বালিয়ে দেবার শেষে, আর সেই পঞ্চভূতের সংগঠন স্থূল অবস্থায় থাকেনা, বরং সূক্ষ্মরূপে অবস্থান করে যতক্ষণ না প্রকৃতি সম্পূর্ণ সেই পঞ্চভূতকে নিজের মধ্যে লীন করে নিয়ে, তাকে পুনরায় ফুল, ফল বা ইত্যাদিতে পরিবর্তিত করেন, যাতে তা গ্রহণ করে দেহগঠনকারী জনক ও জননী নির্মাণ করতে পারে নূতন দেহ।

এই সূক্ষ্ম অবস্থায় অবস্থান করা পঞ্চভূতের সংগঠনকে বাহ্য-ইন্দ্রিয় দ্বারা দেখা যায়না, অনুভবও করা যায়না। কেবল যাদের ঘ্রাণ শক্তি অধিক, তাঁরা এঁর স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ অনুভব করতে পারে। তবে যারা সাধনার কারণে সূক্ষ্মে অবস্থান করা শুরু করে, তাঁরা এই সমস্ত কিছুকে নিজেদের চেতনার দৃষ্টি দ্বারা দেখতে সক্ষম। আর তাই সেই সামান্য সাধনা ধারণ করেন নাগারা, আর অতঃপরে, সেই জমাট অবস্থায় থাকা ঈষৎ ঘন সূক্ষ্মরূপে বিরাজমান পঞ্চভূত সংগঠনকে নিজেদের কাছে আবদ্ধ করে রাখে।

সাধারণত ধ্বনি ব্যবহার করে, সেই ধ্বনিকে মন্ত্ররূপে উচ্চারণ করেই এই আবদ্ধিকরন প্রক্রিয়া চলে। কিন্তু সেই ধ্বনি নির্গত করার উদ্দেশ্যে নিজেদের দেহকে বিভিন্ন বিকৃত ভঙ্গিমায় স্থিত করতে হয়, আর তাই এঁদেরকে এই আচার করার কালে দেখে মনে হয় যেন, এঁরা অঙ্গবিকৃতি করে করে মন্ত্র পাঠ করছেন।

এই মন্ত্ররূপ ধ্বনির দ্বারা এঁরা সেই পঞ্চভূত সমষ্টি সমূহদের নিজেদের কাছে আবদ্ধ রাখে, এবং নিজেদের অধিকারে স্থাপিত করে রেখে প্রকৃতির ভারসম্যতা সমানেই বিনষ্ট করতে থাকেন। সেই কারণে, এই নাগারা কখনোই স্বীকৃতি পেতেন না প্রাচীন জম্বুসমাজে, যা গতির মতধারা অনুসারে স্থাপিত ছিল। কিন্তু ত্রিমূর্তির নির্দেশে সাধপাল তাঁদেরকে এবার স্বীকৃতি প্রদান করা শুরু করলেন, আর তাঁকে সমাজে স্থাপিত করার ভূমিকা গ্রহণ করলেন, বালচের সেই অধিবাসীরা যারা জম্বুদেশকে ছলদ্বারা অধিগ্রহণ করে নিয়ে, এখানে নিজেদের আর্য রূপে স্থাপিত রাখতেন। আর স্বীকৃতি লাভ করে, এঁরা এই অধিকার করে নেওয়া পঞ্চভূত সমষ্টিদের বিভিন্ন জীবন্ত মানুষের দেহে প্রদান করে, তাঁদের দেহের পঞ্চভূত সংগঠনকে সম্পূর্ণ ভাবে বিকৃত করে দেওয়া শুরু করে।

সেই বিকৃতির ফলে, সেই মানব, যাদের উপর এই পঞ্চভূত সামগ্রী প্রয়োগ করা হয়, তারা একদিকে যেমন মানবের থেকে অধিক দেহবলসম্পন্ন হয়ে যায়, তেমনই তাঁদের আহার বিহার, গতি প্রগতি সমস্তই অধিক হয়ে যায় অন্যদের থেকে। আর এই অধিক হয়ে ওঠার পিছনে সেই মানবদের কনো নিয়ন্ত্রণ থাকেনা কারণ, তাঁরা তো সেই অধিক সামর্থ্য নিজের প্রয়াসে বা সচেতনতায় লাভও করেন নি।

আর নাগারা এঁদেরকে দেখিয়ে দেখিয়ে প্রেতের ভয় দেখানো শুরু করে সকল মানবকে, এবং সেই ভয় দেখিয়ে, তাঁরা সত্য বিজ্ঞানকে না বলে, কেবলই প্রেতের অস্তিত্ব আর সেই প্রেত যে হিংসাবৃত্তি করবে, তাই প্রচার করতেন। নিজেদেরকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য, তাঁরা সেই ব্যক্তির অন্তরে বিরাজমান সূক্ষ্ম পঞ্চভূতকে দিয়ে হিংসাপ্রসারের মত ক্রিয়াও করান। যখন অতিকায় ভয়ার্ত হয়ে যায় মানবসমাজ সেই প্রেতের থেকে, তখন নাগারা তাঁদেরই নিয়ন্ত্রণে থাকা সেই অনাবশ্যক পঞ্চভূতসামগ্রীকে সেই মন্ত্রের ধ্বনির সাহায্যেই বাইরে নিয়ে এসে, সেই ব্যক্তির প্রাণরক্ষা করেন, আর সেই ব্যক্তির থেকে অন্যদের প্রাণ রক্ষা করেন, এমন দেখানো শুরু করেন।

আর এই প্রাণরক্ষার কারণে, তাঁরা সমাজে গুরুত্বলাভ করা শুরু করলেন। মানবরূপে ঈশ্বর রূপেও তাঁদেরকে মান্য করা শুরু হয়ে যায়। আর শুরু হয়ে যায় প্রেতের প্রকোপে পরার ভীতি। যে বা যারা আসন ও অনন্যের প্রদর্শিত মার্গে চলে সত্যজ্ঞ হবার প্রয়াস করলেন, তাঁদের সকলকে এমন ভাবে ভয়ার্ত করে রাখলেন, আর অন্যসকলকেও এঁদের মাধ্যমে ভীতির দাস করে রাখলেন।

পরাপ্রকৃতিও এই নাগাদের বিস্তার দেখেছেন, আর তা দেখে, নিজেকে বহু বিক্রাল চেতনায় বিভাজিত করে রাখলেন। যখন যখন কনো স্থানে এই নাগাদের উৎপাত বৃদ্ধি পায়, বা নাগাদের সহায়ক হয়ে গিয়ে পুরুষদের নারীর উপর নির্যাতন বৃদ্ধি পায়, বা শক্তিশালী হয়ে উঠে দুর্বলের উপর অত্যাচার বৃদ্ধি পেতে থাকলো, তখন তখন কনো না কনো নির্যাতিতা বা নির্যাতিতের শবদেহকে শবদেহ রূপে চিহ্নিত করার পূর্বেই নিজের সেই বিক্রাল চেতনা স্থাপন করে দিতেন।

নাগাদের এঁদের উপর কনো নিয়ন্ত্রণ থাকেনা, কারণ এঁরা যে সাখ্যাত মাতা। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও, এঁদেরকে ডাক ডাকিনী, যোগিনী নামকরণ করে করে, দাবি করতে থাকলেন অজ্ঞানী মানুষের কাছে যে, তাঁর কাছে এইসমস্ত কিছু আছে, যা দ্বারা সে যেকোনো কারুর অনিষ্টও করতে পারে, আবার অনিষ্ট করা থেকে আটকাতেও পারে।

একদিকে যখন নাগাদের এমন বিস্তার হওয়া শুরু করলো, পঞ্চভূতের বিজ্ঞানকে লুকিয়ে পাপাত্মা হয়ে নিবাস করে, তখন অন্যদিকে যক্ষদেরও উত্থান হওয়া শুরু হয়ে যায়। যক্ষরা সূক্ষ্ম পঞ্চভূত নিয়ে নয়, অতিস্থুল পঞ্চভূত নিয়ে কাজ করতেন। প্রকৃতির গর্ভ থেকেই বিভিন্ন জলধারক কঠিন প্রস্তর আবিস্কার করে, যা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এরপর সেগুলিকে বিভিন্ন ক্রমে সাজিয়ে, তাঁদেরকে দিয়ে, যেকোনো ব্যক্তির অন্তরে বিরাজকরা পঞ্চভূতকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেন।

মূলত প্রতিফলন শক্তিরই ব্যবহার করতেন তাঁরা, আর তা ব্যবহার করে করে, একাকটি রঙের জলপ্রস্তর দিয়ে একাকটি আদিত্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম তারা, আর একাকটি আদিত্যকে নিয়ন্ত্রণ করে করে, সমস্ত পক্ষদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এমন সামর্থ্য নির্মাণ করে, সমস্ত মানবকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এঁরা বাকি মানবের কাছে দেবসমান ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন সেই সমর্থ্য বিজ্ঞানের জন্য, আর এঁরা যেমন কারুকে বিপাকে ফেলতেন এই বিজ্ঞানের প্রয়োগের মাধ্যমেই, তেমনই শরণাগতের রক্ষাও করতেন এই একই বিজ্ঞানের প্রয়োগে।

যেমন ভাবে নাগারা নিজেদের আবিষ্কৃত বিজ্ঞানকে লুকিয়ে রেখে, প্রেতের ভীতির প্রসার করে সমস্ত মানবকে এঁদের কাছে একপ্রকার তটস্থ রেখে ভ্রমিত করে রেখেছিলেন, তেমনই যক্ষরাও নিজেদেরকে দেবতার নিয়ন্ত্রক রূপে দাবি করে, জ্যোতিষ নামক যন্ত্রের নির্মাণ করে, সকল মানবকে তটস্থ করে রেখেছিলেন।

এই তটস্থ করে রাখার একটিই উদ্দেশ্যে আর তা হলো এবার থেকে তাঁরা যা করতে বলবেন, তেমনই করবে সকলে। আসন বা অনন্যের পথ যাতে কেউ না গ্রহণ করে, তারই উপায় ছিল এটি। যখন এই উপায় করে সাধপাল সমস্ত মানবকে নিজের অধিকারে আনতে পারলেন, তখন সিদ্ধান্ত নিলেন যে যেই রমনাথের কারণে এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছে সে, এবার তাঁকেই সকলের কাছে স্থাপিত করে, প্রকৃতির দিকে তাকানোও বন্ধ করে দেবেন তিনি।

আর তাই নাগা আর যক্ষদের মাধ্যমেই শুরু হয় রমনাথের প্রতিষ্ঠা ক্রিয়া। পরমাত্মই পরমেশ্বর, আর সেই পরমাত্মের অংশরূপ আত্ম সকলের মধ্যে বিরাজমান, কারণ সকলে সেই পরমেশ্বরের অংশরূপ দাস, প্রজা বা সেবক, আর সেই অংশরূপ হলো আত্ম। তাই সকলের উচিত আত্মচিন্তন করা, আত্মকে সুখে রাখা, আত্মকে তৃপ্ত করা, এবং আত্মের ইচ্ছা, চিন্তা এবং কল্পনাকেই আশ্রয় করে জীবনধারণ করা। এই ধারার বিস্তার করে, সাধপাল আগামীদিনে যখন সে মন্ত্র ও যন্ত্রের বিকাশ করবে জগতে, তখনকার কাজকে সহজ করে রেখে দিল।

আত্মকেন্দ্রিক না হলে, আত্মসুখের চিন্তা না থাকলে, মানুষের কাছে ক্ষমতার লোভই থাকবেনা। বিলাসবহুল জীবনযাপনের ইচ্ছাই থাকবেনা। বিলাসবহুল জীবনযাপনের মাধ্যম দিয়েই তো যন্ত্রের বিস্তার করবে সাধপাল। তাই যদি বিলাসবহুল ভাবধারাই না থাকে, তাহলে ধনের প্রতি আকৃষ্ট করবে কি করে সকলকে? যদি ধনের প্রতি সকলকে আকৃষ্ট না করে তাহলে মন্ত্রের মাধ্যমে যেই অস্ত্রসমূহ অন্যকারুকে নষ্ট করে দিতে পারে, তা ধারণ করার উপযোগিতাই বা বুঝবে কি করে মানুষ। আর যদি তেমন না হয়, তবে আত্মসুখে নিমগ্ন হবে কি করে মানুষ?

তাই ভবিষ্যতে যখন যন্ত্র আর মন্ত্রের বিস্তার করবে সাধপাল, যার বিস্তার করার জন্য সেই কালে গবেষণা করার নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন তাঁর অনুগামী মানুষদেরকেই, তা সম্ভব যাতে হয়, তাই এই তন্ত্রকে ব্যবহার করে, ভয় দেখিয়ে, সকলের কাছে পরমাত্মকে প্রতিষ্ঠা করলেন, আর আত্মের পূজা করিয়ে আত্মসর্বস্ব করে রাখলেন। আর এই ভাবে নাগা আর যক্ষদের একত্রিত করলেন সাধপাল, যারা একই স্বার্থসিদ্ধি হবার কারণে একত্রিত হয়ে শাস্ত্রী নাম ধারণ করলেন। আর তখন থেকে নাগাধারা আর যক্ষধারা একত্রিত ভাবে পাঠ, অনুশীলন ও অভ্যাস করা শুরু করলেন যারা, তাদেরকে শাস্ত্রী বলা শুরু হলো।

কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মাঝে, পরাপ্রকৃতি যে ডাকডাকিনী ও যোগিনীর বিস্তার করে দিয়ে তাঁর নিপীড়িত সন্তানদের সহায়তা প্রদানের পথ করে রেখেছেন, তার পূর্ণকথা না জেনেই, শাস্ত্রীরা এই ডাক, ডাকিনী ও যোগিনীদের নিজেদের কাছে বন্দী করে রেখেছেন, এমন দাবি করাতে, ক্ষিপ্ত হলেন প্রকৃতি আরাধকরা, যারা জম্বুর গহন অরণ্যে নিবাস করতেন।

যারা স্বয়ং মাতার অংশ, তাঁদেরকে প্রেত, অপদেবতা, পিশাচ, পিসাচিনি, ইত্যাদি নামে অবিহিত করে স্বয়ং মাতাকে কলঙ্কিত করছেন এই শাস্ত্রীরা। এই অনাচারের উত্তর তো অবশ্যই দিতে হবে, এই ধারণা রেখে এক বনবাসী, শবসাধকরূপী প্রকৃতি আরাধক প্রজাতি গহন সাধনায় লিপ্ত হলেন পরাপ্রকৃতির। তাঁদের একটিই দাবি, এই ডাক, ডাকিনী আর যোগিনীদের উপর শাস্ত্রীদের কনো নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও, তারা এই মিথ্যা দাবি করে স্বয়ং জগজ্জননীকে প্রেতপিশাচের দেবী করে দিয়ে তাঁর অঙ্গে কালিমা লেপন করছে।

তাই তাঁদের দাবি যে, তাঁরা এই ডাক, ডাকিনী ও যোগিনীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম হবেন, এবং তাঁদের কাছে অনুরোধ করতে পারবেন কনো স্থানে প্রকট হয়ে মাতার নামে যেই কালিমা লেপন হচ্ছে, তা নিষ্ক্রিয় করতে। আত্মভাবমুক্ত দৃষ্টিকোন, তাই মাতা তাঁদের আধার ও উর্জা বেশে দর্শন দিয়ে মার্গ প্রদান করলেন। তাঁরা জানলেন যে, সদ্যমৃত কারুর দেহেই প্রকট হন এঁরা। তাই শুরু করলেন শবসাধনা। শবদেহে নিজেদেরকে চেতনাকে স্থাপিত করে, দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে থাকলেন, কখন সেই দেহে ডাক, ডাকিনী ও যোগিনী প্রকট হবেন, আর তাঁদের সাথে তাঁরা আলাপ করবেন।

সফল হলেন তাঁরা মাতার কৃপায়, আর সফল হতেই তাঁরা শাস্ত্রীদের সম্মুখে এসে, তাঁদের সাথে ভয়ানক যুদ্ধে লিপ্ত হতে শুরু করলেন। শাস্ত্রীরা পঞ্চভূত দ্বারা মানবকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করলেন তো এই সাধকগোষ্ঠী বিভিন্ন প্রকার ডাক যেমন বেতাল, ব্রহ্মদৈত্য ইত্যাদিদের, বিভিন্ন প্রকার ডাকিনী যেমন ডায়েন, নাগীন ইত্যাদিদের, এবং ৬৪ যোগিনীকে প্রকাশ করে করে শাস্ত্রীদের অধিকারে স্থিত সূক্ষ্মভূতসমূহকে প্রকৃতিতে বিলীন করা শুরু করলেন, তো যক্ষদের জলপ্রস্তর শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করা শুরু করলেন।

আর তাঁরা এবার শুরু করলেন, মাতাকে আদিশক্তি বেশে প্রকাশিত করে, তাঁর আরাধনা করা। আর এই ভাবে সমস্ত সমাজে মাতার আরাধনা করে প্রকৃতির প্রতি সমর্পণ করার ধারা, আর পরমাত্মের প্রতি সমর্পণ করে আত্মসুখের চিন্তা করার ধারা, এই দুই ধারা সমস্ত মানবযোনিকে অতিষ্ঠ করে তুলল।

ভয়ার্ত হয়েই তাঁরা সর্বক্ষণ চলাফেরা করা শুরু করলেন। যক্ষের ভয়, নাগার ভয়, শাস্ত্রীর ভয় আর এই শ্মশানবাসী কাপালিকদের ভয়, আর এঁদের সাথে সাথে, যেই ধনবান পুরুষরা এঁদের সান্নিধ্যে থাকেন, তাঁদের অত্যাচারের ভয়। এই সমস্ত ভয় যখন একত্রিত হলো, আর এই সমস্ত ভয় যখন দেবী কৃত্তিকাকেও বন্দী করে নেওয়া শুরু করলো, যিনি বাস্তবে বন্দীদশা স্বীকারই করেন, মাতা অম্বিকার নির্দেশে মৃষুকে সমস্ত আসক্তির থেকে মুক্ত করতে, তখন মৃষু নিজের চতুর্থ কলাকে প্রকাশিত করলো।

এঁদের সমস্ত কিছুর সাথে সাথে সমস্ত মানবের স্নায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেছিল, তাই দণ্ডশুণ্ডের বিকাশ করা রোগভোগেরও বাড়বাড়ন্ত হওয়া শুরু করে। নারীদের উপর অত্যাচার, দুর্বলের উপর অত্যাচার, প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণের আপ্রাণ প্রয়াস, এই সমস্ত কিছুর বৃদ্ধি পেলে, মৃষুর যেই চতুর্থ কলা প্রকাশ্যে এলো, তার নাম হয় আচার্য। এবারে একাকী মাতা পাবনি, আর কেউ তাঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে রইলেন না। দেবী শ্রী, দেবী শ্বেতা নিজেদের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় দিন কাটাতে থাকলেন দুধসাগর এবং সপ্তধনুশে। আর দেবী কৃত্তিকা আদিত্যদের কাছে প্রত্যাবর্তন করেছেন, সন্তানের সমস্ত আসক্তির নাশ করার জন্য।

পূর্বের কালে, অনন্য অবস্থায় সে আসক্ত হয়ে থাকার কারণে, দেবী কৃত্তিকার সুধারূপের সহযোগে জন্ম নেওয়া অরির প্রতি দুর্বল ছিল। সঙ্গে সঙ্গে দেবী পাবনিপুত্র মুণ্ডকে তিনি নিজহাতে দণ্ড প্রদান করতে কুণ্ঠিত হয়ে গেছিলেন, কারণ তিনি মাতা পাবনির পুত্র। এবার তাঁর মাতারা আরো অধিক কঠোর। সত্যের সঙ্গে কখনো আপস করা যেতে পারেনা। মাতা অম্বিকার কঠোর নির্দেশ, প্রয়োজনে তিনি স্বয়ং অসত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকবেন, এবং তাঁর পুত্রকে বাধ্য করবেন তাঁকে আঘাত করতে।

দেবী কৃত্তিকা ও দেবী পাবনি এতটা কঠোর হতে না পেরে, ক্রন্দনের সুরেই বলে উঠেছিলেন, “গৌরি, তুমি অত্যধিক কঠোর হচ্ছ নিজের পুত্রের প্রতি। মা হয়ে এতো কঠোর কি করে হতে পারো তুমি”।

মাতা অম্বিকা স্পষ্ট ভাবে বললেন, “মা বলেই তো কঠোর। যদি শুধু দেহপ্রদান করা জননী হতাম, তাহলে কি এতো কঠোর হতে পারতাম। আমার পুত্রকে সত্যের যোদ্ধা হয়ে উঠতে হবে। অসত্যের পক্ষে যেই দাঁড়িয়ে থাকুক, স্বয়ং তাঁর মাতাই কেন না দাঁড়িয়ে থাকুক, তাকে আঘাত করতে হবে। সত্যের সাথে কনো কারণে, কনো অজুহাতে আপস করা ব্যক্তি আমার পুত্র হতে পারেনা। … সমস্ত আসক্তির বাঁধ ভেঙে দিতে হবে তার”।

দেবী পাবনি বললেন, “আমি পারবো না এতো কঠোর হতে। আমি চললাম গৌরি, তাঁর জননী হবো আমি এবার”।

এতো বলে চলে গেলেন সেই স্থান থেকে, তো দেবী কৃত্তিকা বললেন, “দেবী, পাবনি তোমার নিজের ভগিনী। তার সাথে এই বৈরী কেন গৌরি?”

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “সন্তান যা কিছু লাভ করে, মাতার থেকেই লাভ করে। মাতার আসক্তিই তো সন্তানের সামগ্রী হয়ে বিরাজ করছে। … দিদি ফিরে আসবে আবার, নিজের ভ্রান্তি বুঝে ঠিকই ফিরে আসবে সঠিক সময়ে। সে আমার বৈরী নয়, পুত্রের প্রতি আসক্ত, তাই মনে হয়েছে তাঁর যে আমি কঠোর হয়েছি, অন্যায় করছি এমন কঠোর হয়ে”।

দেবী কৃত্তিকা বললেন, “দেবী, বলার সাহস নেই, মানতেই কষ্ট হয়, তাই ভাবতে, মানতে বা বলতে পারছি না, কিন্তু অন্তরমনে আমারও কেন জানিনা মনে হচ্ছে যে, তুমি এতো কঠোর কি করে হতে পারো! … গৌরি, তুমি আমার কেবল সখী নও, আমার আরাধ্যা, আমারও মা তুমি। আমার বিশ্বাস যে আমিও নিশ্চিত ভাবে পাবনির মত আসক্ত পুত্রের প্রতি, আর তাই এমন ভাব আসছে আমার মধ্যে। কৃপা করে আমাকে মার্গ দেখাও দেবী। নিজের আরাধ্যাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে, আমি নিজেই নিজের শ্লাঘার আগুনে জ্বলে মরছি গৌরি। সহায়তা করো। মার্গ দেখাও আমাকে”।

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “কৃত্তিকা, তুমি জানো ভালো করে, আমার সন্তানদের ছিনিয়ে নিতে যারা আগ্রহী, তাঁরা কতটা খল। তাঁরা তো খলের ফাঁদ পেতে, সহজেই আমার সন্তানের কনো না কনো মাতাকে অসত্যের দ্বারে দ্বারপাল করে রেখে দেবে, যেমন অনন্যের ক্ষেত্রে পাবনিকে করা হয়েছিলো। … সে কেমন সত্যযোদ্ধা কৃত্তিকা, যে তাঁর মাতা দাঁড়িয়ে রয়েছেন বলে, অসত্যের সাথে আপস করে নেবে? … না কৃত্তিকা, মৃষু এমন দুর্বল হতে পারেনা। তাঁকে অনেক অনেক অধিক সবল হতে হবে। প্রয়োজনে তাঁকে মাতার বক্ষেই খড়গ বসাতে হবে। তবেই আমার পুত্র সত্য অর্থে সত্যযোদ্ধা হয়ে উঠবে। তবেই আমার পুত্র, এই খলপরিপূর্ণ ত্রিমূর্তির সাথে যুদ্ধে আমার যোগ্য সারথি হয়ে উঠবে”।

“কৃত্তিকা, যুদ্ধে সারথির ভূমিকা কতটা অশেষ, তা তো অনন্যের যুদ্ধ থেকেই অনুভব করলে। মৃষু আমার পুত্র, আমার প্রিয়তম সন্তান, তার থেকে অধিক শ্রেয় সারথি যে কেউ হতে পারেনা, তাও জানলে। এবার বলো, যদি সারথিই রথীকে দুর্বল করে দেয়, তাহলে রথী কি ভাবে যুদ্ধ জয় করবে?”

দেবী কৃত্তিকা হেসে বললেন, “গৌরি, তুমি বড়ই ভোলা। তোমার পুত্রের দুর্বলতা তুমি, তা তো তুমি দেখতে পাচ্ছ, কিন্তু তার কৌশল আর সত্যনিষ্ঠাকে দেখতে পাচ্ছনা? … মুণ্ড পাবনির পুত্র, তাই অনন্য কিছুতেই সরাসরি মুণ্ডকে আক্রমণ করবেনা। করেও নি। কিন্তু মুণ্ডের নাশ কি সে নিশ্চয় করে নি! … গৌরি, যেই কাজ স্বয়ং করা সম্ভব নয়, সেই কাজ অন্যকে ব্যবহার করে করার কৌশল শিখেছে তোমার পুত্র। … গৌরি, মাতার প্রতি তোমার পুত্রের অশেষ প্রেম। সেইটিই তার দুর্বলতা। এই দুর্বল স্থানে আঘাত করো না”।

“আমি আদিত্যদের কাছে যাবো। মৃষুর সাথে এবারে আমি যুক্ত থাকবো না। তবে এই কারণে নয় যে, তোমার পুত্র, আমাদের পুত্র, মাতার প্রতি দুর্বল। বরং এই কারণে যে, সে তো তাঁর আসল মাতার সাথে এখনো আলাপই করতে পারেনি। আমরা থাকলে, তার আসল মায়ের সাথে কখনোই আলাপ হবেনা তার। সেই কারণেই শ্রী, শ্বেতা সকলে মৃষুর উপর স্থির দৃষ্টি রাখলেও, তার থেকে দূরে সরে গেছে। আমিও গেছি, আর আমি জানি এই কথা তুমি পাবনিকে বলতে পারবেনা, কারণ এই কথা বলার সময়ে তোমার মধ্যে স্বার্থপরতা তুমি নিজেই দেখতে পাবে”।

“মাতা যদি স্বার্থপর হয়, তা দেখে সন্তান স্বার্থপর হবেই। না তো তুমি সত্য অর্থে স্বার্থপর হতে পারবে, আর না তোমার স্বার্থপর হতে ইচ্ছা করলেও তোমার পুত্রের মধ্যে যাতে স্বার্থপরতা না আসে, সেই কারণে স্বার্থপর হতে পারবে। … তাই পাবনিকে আমি এই কথা বুঝিয়ে বলবো। কিন্তু গৌরি, এতটা কঠোর হয়ো না পুত্রের প্রতি। মা ছাড়া তার কে আছে বলো তো। মায়ের প্রতি সে দুর্বল, মা অন্ত প্রাণ সে। আমাদের সকলের মধ্যে সে তোমাকেই খোঁজে। দেখেছিলে তো, দসীকেও অপূর্ণ মনে হয়েছিল তার আম্মিকে দেখার পর। … গৌরি, তাঁর মধ্যে এই দুর্বলতাটা থাকতে দাও”।

দেবী অম্বিকার চোখ ছলছল করে উঠলো। ক্রন্দনের সুরে উচ্চৈঃস্বরে তিনি বলে উঠলেন, “ভয় হয় কৃত্তিকা। এই দুর্বলতাকে ব্যবহার করে, ত্রিমূর্তি আমার পুত্রকে বিভ্রান্ত না করে দেয়! সেই জন্যই তো চাই যে, তার মধ্যে লেশমাত্রও দুর্বলতা যাতে না থাক”।

কৃত্তিকা হেসে পিছন ফিরে নিজের চোখের জল লুকিয়ে রাখা অম্বিকা দেবীর সামনে গিয়ে, তাঁর কপোলে হাত রেখে অম্বিকার অশ্রু মুছে বললেন, “ভয় ত্যাগ করো গৌরি। অনন্যবেশে মৃষু গুণকে দিয়ে পাবনিপুত্র মুণ্ডের নাশ করে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সে লক্ষ্যে সর্বদা অবিচল। আর তাই যদি ত্রিমূর্তি তাঁর মাতার মমতাকে ঢাল করে অসত্যের রক্ষা করতে যায়, সে মাতার মমতাকে আঘাত অবশ্যই করবে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সে স্বয়ং তাঁর মাতার মমতার নাশ করবে”।

“অনন্য বেশে মৃষু প্রমাণ করে দিয়েছে গৌরি যে, তাঁর সাথে ছল করা অতো সহজ নয়। আর তার সাথে ছল করে কেউ পার পাবেনা, ত্রিমূর্তিও না। … সে প্রমাণ করে দিয়েছে যে তার মত তার মাতাকে আর কেউ জানেনা। সে জানে যে তাঁর মাতা সত্যের প্রতি মমতাপূর্ণ, অসত্যের প্রতি নয়। তাই মুণ্ডকে পাবনির পুত্র করে রেখে ছল করার প্রয়াস ত্রিমূর্তি করলেও, সে কুণ্ঠিত হয়না মুণ্ডের নাশ করতে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সে স্বয়ং নিজের মাতার বক্ষে আঘাত করবে। সে জানে, তাঁর আঘাত তাঁর মাতা সহ্য করতে পারবেনা। তাঁর বলের জন্য নয়। সে জানে, সে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাঁর মাতার বক্ষে তার আঘাত শিশুর আঘাতের থেকে অধিক কিচ্ছু নয়”।

“কিন্তু সে এও জানে যে যদি সে স্বয়ং সেই আঘাত করে, পুত্রের হাতের আঘাত লাভ করার জন্য মাতা নিজের মমতার হত্যা করে দেবেন। তাই কিছুতেই সে নিজে আঘাত করলো না মাতার বক্ষে, কিন্তু যেই ভাবে আঘাত করলে, অসত্যের নাশ হবে অথচ মাতার মমতার নয়, সে তাই করেছে। … গৌরি, পুত্রের হয়ে সালিসি করছি মনে হতে পারে তোমার। কিন্তু বিচার করে দেখো, আমাদের পুত্র অনেক অনেক ভাবে নিজেকে যোগ্য করে তুলেছে, আরো করবে। তবে তাঁর থেকে তাঁর মাতার প্রতি দুর্বলতাকে ছিনিয়ে নিও না।  মাতার কারণেই সে আজ জীবিত, মাতা ছাড়া সে আর কিচ্ছু জানেনা, কিচ্ছু জানতেও চায়না। সেই মাতার প্রতি কঠোর করে দিলে, সে বেঁচে থাকার স্পৃহাই হারিয়ে ফেলবে গৌরি”।

দেবী অম্বিকা কেঁদে ফেললেন সেই কথা শুনে। কান্না থামিয়ে বললেন, “আমার দিদির কাছে যাওয়া উচিত। ক্ষমা চাওয়া উচিত। জানিনা কি কুকথা বলে ফেলেছি তাঁকে!”

কৃত্তিকা বললেন, “জগজ্জননী ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেনা গৌরি। বাস্তবে আমরা কেউ তোমার সখী নই, আমরা সকলেই তোমার সন্তান। তুমি সখী হয়ে তা ভুলে যেতে পারো, আমরা কি করে তা ভুলতে পারি গৌরি! এই সত্য আমারা ভুলে গেলে যে আমরা অনাথ হয়ে যাবো”।

দেবী অম্বিকা বললেন, “না কৃত্তিকা, পাবনি আমার দিদি, সে আমার জ্যেষ্ঠা। ছোটো বোন, জগজ্জননী বলে বড় দিদির কাছে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারবেনা!… না কৃত্তিকা, এ হতে পারেনা। তুমি আদিত্যদের কাছে যাও, আমি দিদির সাথে সাখ্যাত করে আসছি”।

মাতা অম্বিকা দেবী পাবনির কাছে চলে গেলেন। তাঁর গমনের পথ থেকে দেবী কৃত্তিকা হেসে বললেন, “আমাদের আপন করে নেবে বলে, তুমি কেমন কেমন লীলা করো গৌরি! … মা হয়েছ, কিন্তু নিজের অন্তরের শিশুটিকে ঠিক রেখে দিয়েছ। সেই কারণেই তো যে তোমাকে একবার জানে, সে তোমাকে হারানোর চিন্তা করলেও প্রাণ হারিয়ে ফেলে”।

দেবী অম্বিকা গর্ভবতী দেবী পাবনির কাছে উপস্থিত হলে, পাবনি অভিমানের সুরে বলে উঠলেন, “গর্ভে ধারণ করে নিয়েছি মৃষুকে, আর আমি ফিরতে পারবো না”।

দেবী অম্বিকা তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে ঈষৎ হেসে, তাঁর গালে হাত রেখে বললেন, “এখনো রেগে আছো বোনের উপর দিদি?”

পাবনি বললেন, “না রেগে নেই। তুমি বুঝতে পারছো না গৌরি। সকল মা একেবারে ছেড়ে চলে গেলে, তুমি কি তাঁর সামনে যাবে? না, যাবেনা। যেতে পারবেও না, কারণ তুমি এখন তার সম্মুখে সাখ্যাতে গেলেও, সে তোমাকে দেখতেই পাবেনা। প্রস্তুত হয়নি এখনো সে তোমাকে দেখার জন্য। সত্যতে দৃষ্টি রাখা এতো সহজ নাকি? … এবার বলো, কি করে তাহলে সকলে মিলে একসাথে ছেড়ে চলে যাই তাকে? মা ছাড়া সে আর কি বোঝে বলো তো গৌরি? … আর তুমি বলছো, মায়ের প্রতিও কঠিন করে দেবে তাকে”।

“বুঝি গৌরি, সর্বক্ষণ ভয়ে থাকো, ত্রিমূর্তি তাঁকে অযোগ্য প্রমাণ করার জন্য সমস্ত প্রয়াস করছে। সফল না হয়ে যায় সেই উদ্দেশ্যে, তারজন্য তুমি তার মধ্যের সমস্ত দুর্বলতাকে মিটিয়ে দিতে চাইছ। কিন্তু বিশ্বাস করো গৌরি, মায়ের প্রতি তোমার পুত্র আসক্ত নয়। প্রেম করে সে মাকে। … মায়ের প্রতি আসক্ত হলে না, দসীকে ছেড়ে সে আম্মির সন্ধান করতো না। দসী হলো শ্রী, তাকে সে পেয়েছে। আম্মি তুমি, তোমাকে সে কখনো প্রত্যক্ষভাবে পায়ইনি সে। তুমিই বলো, যদি আসক্তিই হতো, তাহলে দসীর থেকে আম্মিকে শ্রেষ্ঠ কি ভাবে মানতো সে?”

“তাঁর কাছে তুমিই মা। আমরা সকলে তোমার উপমা, কিন্তু মা নই। সেই কারণেই তো আম্মিকে পেয়ে দসীর অপূর্ণতাই তাঁর নজরে এলো। আসক্ত হলে কি আসতো? তুমিই বলো? … আসক্ত নয় সে, প্রেম করে তোমাকে। তাই তো সে তোমার আভাস মাত্র পেলেও, আমাদেরকে সরিয়ে রেখে তোমার দিকেই তাকিয়ে থাকে। … গৌরি, প্রেম কনো দুর্বলতা কি করে হতে পারে? তোমার থেকে অধিক এই ব্যাপারে কে জানে গৌরি? তুমি ছাড়া প্রেম কে করতে পেরেছে কবে? তোমার পরে যে প্রেম করতে পারলো সে হলো তোমারই পুত্র। যেমন মা, তেমন তাঁর ছা”।

“তুমি তোমার সন্তানদের প্রেম করো। তোমার কি এটা দুর্বলতা? না গৌরি না, এটিই তোমার বল। তোমার এই প্রেমের কারণেই, জগতে নাগা, যক্ষ, শাস্ত্রী, ত্রিমূর্তি, আত্ম, মহাত্ম, তন্ত্র, মন্ত্র, যন্ত্র এতো কিছু রাখার পরেও দেখো না কেমন নাজেহাল হয়ে থাকে ত্রিমূর্তি। প্রেম যদি তোমার দুর্বলতা হতো, তাহলে কি এমন নাজেহাল হয়ে থাকতো? সমস্ত ভাবে তোমাকে ঢেকে রাখতে চায় মানবের চোখে। কেন? কারণ তারা জানে যে একবার যেই মানব তোমার প্রেমকে দেখে ফেলবে, তাকে আর ধরে রাখা সম্ভব হবেনা। বুঝতে পারছো? তোমার আসল শক্তিই এই প্রেম। আর তোমার পুত্র তোমারই থেকে এই অপার প্রেম শক্তি পেয়েছে”।

“আর তুমি বলছো সেই শক্তি তার দুর্বলতা? … না গৌরি না, আসক্ত সে নয়, আসক্ত তুমি হয়ে আছো, আর তাতে কনো দোষ নেই। তুমি তোমার পুত্রকে সাতখণ্ডতে বিভক্ত হয়ে যেতে দেখেছ। অনুমান করাও সম্ভব নয় আমার পক্ষে যে, সেই সময়ে তোমার অন্তরে কি পরিমাণ হাহুতাশ উৎপন্ন হয়েছিল। … তাই আসক্তি এসে যাওয়া স্বাভাবিক, সন্তানকে হারাবার ভয়ে মা যে সবসময়ে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে। এটা মায়ের বশ্যতা নয়, এটা মায়ের প্রেম। … গৌরি, তোমার পুত্রকে ইতিমধ্যেই ত্রিমূর্তি ভয় পেতে শুরু করে দিয়েছে। তাই নিশ্চিন্ত হয়ে যাও গৌরি। যে ভয় পেয়ে গেছে, তার বিনাশ ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। তোমার পুত্র ভয় পায়নি ত্রিমূর্তিকে, ত্রিমূর্তি ভয় পেয়েছে তাকে। তাদের পরাজয় শুরু হয়ে গেছে গৌরি। তোমার বুকে আঘাত তো ছেড়ে দাও, আর স্পর্শও করতে পারবেনা ত্রিমূর্তি”।

অম্বিকা দেবী ক্রন্দন করে নিজেকে দেবী পাবনির স্কন্ধে অর্পণ করে ক্রন্দনের সুরেই বলে উঠলেন, “ক্ষমা দিদি, ক্ষমা”

পাবনি বললেন, “তুমি জানো গৌরি, তুমি আসার আগে অব্ধি আমার গর্ভে যে রয়েছে সে লাথালাথি করছিল। যেই ক্ষণে তোমার গলা শুনেছে, কান পেতে বসে রয়েছে, তোমার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য। তোমার পুত্র তোমার জন্য পাগল হয়ে উঠছে দিন প্রতিদিন”।

দেবী অম্বিকা নিজের চোখের জল মুছে বললেন, “আমিও, কবে তার মুখে মা শব্দটা শুনবো, আর যেন ধৈর্য বাঁধ মানছে না দিদি”।

পাবনি হেসে বললেন, “জানো তোমাকে এতো স্নেহ করি কেন? জগজ্জননী তুমি, কিন্তু তাও তুমি শিশু। একমুহূর্তও মনে থাকলো না যে তুমি পরমেশ্বরী? দিদির কাছে ক্ষমা চাইতে চলে এলে? লোক জানলে, পরমেশ্বরীর প্রতিষ্ঠার কি হবে?… না তো, তোমার তো নিজেকে ব্রহ্ম বলে পরিচয় দিতেও ইচ্ছা করেনা। পাছে তোমার সন্তানরা তোমাকে মা ডাকা বন্ধ করে দেয়। … তবে আমার কথা মিলিয়ে নিও গৌরি। তোমার এই ছেলে না, তোমার থেকেও অধিক জেদি। সে তোমাকে মাও বলবে, আর ব্রহ্মও বলবে। সারা জগতের সামনে সে একদিন খোলসা করে দেবে যে, তাদের মা’ই ব্রহ্ম, আর ব্রহ্মই তাঁদের সকলের জন্মজন্মান্তরে মা। … সম্মান ভালো লাগেনা তো তোমার। তৈরি থেকো, তোমার ছেলে তোমাকে সম্মান দিয়েই ছাড়বে”।

দেবী অম্বিকা এবার হেসে প্রশ্ন করলেন, “কি নাম রাখবে ছেলের? ঠিক করেছ দিদি?”

পাবনি হেসে বললেন, “তোমার নামেই রাখবো ঠিক করেছি অম্বিকানন্দন আচার্য”।

দেবী অম্বিকা পাবনির নিকটে এসে প্রশ্ন করলেন, “আমার উপর একটি বারের জন্যও তোমার রাগ হয়নি দিদি!”

পাবনি বললেন, “কার উপর রাগ করবো? সেই মায়ের উপর, যে মা দিনরাত তাঁর সন্তানসমূহদের উদ্ধারের মার্গ খুঁজে বেড়াচ্ছেন? কার উপর রাগ করবো গৌরি, সেই মায়ের উপর, যে নিজের সবটুকু দিয়ে দিয়েছে সন্তানকে বুকে ফিরিয়ে আনবে পরমাত্মের বশীকরণ ভেঙে? করা যায় তার উপর রাগ, তুমিই বলো? যে স্বয়ং ব্রহ্মময়ী হয়ে, স্বেচ্ছায় সেই পরিচয়ই ত্যাগ করে দিয়েছে, কেবল মাত্র তাঁর সন্তানদের তাঁকে মা বলে ডাকতে কুণ্ঠা যাতে না হয়, তার উপর রাগ করলে যে ভিতর থেকে একটা কান্না জেগে ওঠে”

“না গৌরি, তোমার উপর রাগ করতে পারিনা, আমার আসেনা। বরং লোভ লাগে। প্রচণ্ড তীব্র এক ভাব জাগে। এই ভাব জাগে যে এই অজন্মা কি শুধুই মা! মেয়ে হতে পারে না সে? হিমরাজের কন্যা তুমি, হ্যাঁ কনো প্রকার বন্ধনেই তোমায় তিনি আবদ্ধ রাখতে পারতেন না, চাইতেনও না। নিজের মত করে কুঁড়ি থেকে জেগে ওঠা ফুলকেই দেখতে ভালো লাগে। একটি একটি করে পাপড়ি তার থেকে খুলে যায়, আর একটু একটু করে মাদক সুগন্ধ দেহমনসহ সমস্ত পঞ্চভূতকে মুহুর্মুহু রোমাঞ্চিত করে। কিন্তু আমি পিতার মুখবদন দেখেছি গৌরি। যখন তিনি তোমাকে দিনের কনো একটি সময়ে প্রাণ ভোরে আলিঙ্গন করতেন, তখন তাঁর মুখ আমি দেখেছি”।

“আনন্দে, পুলকে, রোমাঞ্চে, নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দেবার ভাব তাঁকে সারাদিন প্রগল করে রাখতো, অপেক্ষা করিয়ে রাখতো এই আলিঙ্গনের জন্য। জগন্মাতা, এই একটিই সাধ আমার। হ্যাঁ প্রিয়া, এই দুধের সাধকেই ঘোলে মেটানোর জন্য এই দেখো আচার্যের মা হতে এসেছি। তাঁর জননীর মুখ চুম্বন করতে পারবোনা, কিন্তু তাঁর জননীর অঙ্গের গন্ধকে তো আলিঙ্গন করতে পারবো তাঁরই পুত্রের মাধ্যমে”।

“লোভী হয়ে যাই, ভুলে যাই যে আমি পাবনি, মনে হয় যেন আমি শুধুই তোমার প্রেয়সী। তোমার অসীম কোমল, অসীম সুবাস, অসীম সৌন্দর্য, অসীম মমতা, অসীম বাৎসল্য, এই সমস্ত অসীমতার মধ্যে নিজের অস্তিত্ব ভুলে যেতে কামনা জাগে আমার গৌরি। যখন যখন এই কামনায় আমি অস্থির হয়ে উঠি, আমি যেন অসার হয়ে যাই, যেন মৃত্যুর সাগরে ডুবে যাই, কিন্তু সেই মৃত্যুতেও কেমন যেন নেশার ঘোর”।

অম্বিকা সেই কথাশুনে দুষ্টু মেয়ের মত হেসে উঠে বললেন, “তুমি তো স্বামীসোহাগের কথা বলছো দিদি!”

পাবনি ভ্রু কুঁচকে, একটা মাতৃত্বপূর্ণ মিষ্ট হাস্য দিয়ে বললেন, “ধুত, তুই না! মহাদুষ্টু! … তবে হ্যাঁ রে ঠিকই বলেছিস। স্বামী সোহাগই আমাকে আমার এই ভাবকে শব্দদিতে সাহায্য করেছে। তবে একটুও বাড়িয়ে বলছিনা গৌরি। সামান্যও আসক্তি নিয়ে বলছি না। তোর শুধু একটা স্পর্শই এক স্ত্রী সারা জীবনভর যা স্বামী সোহাগ লাভ করে, তার সমান। জানিনা তোর আলিঙ্গনে কি হবে! … শুধু তোর স্পর্শ পেয়েছি, তাই হয়তো ভাষা পাচ্ছি বলার। আলিঙ্গন পেলে হয়তো বলার শব্দ থাকবেনা, শুধুই প্রেমাশ্রু থাকবে”।

দেবী অম্বিকা পাবনির কাছে এসে, তাঁর নেত্র থেকে নির্গত বারিধারা মুছে বললেন, “একি দিদি, তুমি কাঁদছো!”

দেবী পাবনি নিজের অশ্রু লুকিয়ে, মুখ ঘুরিয়ে, দেবী অম্বিকার দিকে পিছন ফিরে বললেন, “মুছবিনা, এই চোখের জল মুছবিনা। এই অশ্রুর প্রতিটা কণাতে তোর নাম লেখা আছে। … তুই ভুলে গেছিস। মাতৃত্বের নেশা তোকে ভুলিয়ে দিয়েছে যে তুই কে। সমস্ত পরিচয় ছেড়ে তুই আজ শুধুই মা। তাই ভুলে গেছিস। কিন্তু তোর স্পর্শসুখ আমাদেরকে তা ভুলতে দেয়না, আর আমরা ভুলতেও চাইনা যে, তুই স্বয়ং ব্রহ্ম”।

দেবী অম্বিকা হেসে, পাবনির সম্মুখে গিয়ে, তাঁর দুই কাঁধে নিজের বাহু রেখে, রোমাঞ্চের সাগরে দেবী পাবনিকে প্লাবিত করে তুলে বললেন, “আমার ছেলে পারবে। … দেখে নিও দিদি। সেই পারবে আমাকে ব্রহ্ম বলে জেনেও ভুলে যেতে। শুধুই আমাকে মা বলে জ্ঞান করতে। সে বলবে একদিন দেখে নিও। সে বলবে, আমার মা যিনি তিনি ব্রহ্ম। তোমাদের মত সে বলবে না যে, যিনি ব্রহ্ম তিনি আমার মা। দেখে নিও দিদি, যেই অটুট সম্পর্কের জন্য আমি হাপিত্যেশ করে বসে আছি, আমার ছেলে একদিন নিশ্চিত তা সাকার করবে”।

“আমার দৃঢ় বিশ্বাস দিদি, একদিন সে জগতের সামনে আমাকে শুধুই মা বলে স্থাপন করবে, ব্রহ্ম যে আমি, তার কথা উল্লেখ করলেও, গুরুত্ব দেবে কেবল মা’কে। … দিদি, ব্রহ্ম মানেই একাকীত্ব, ব্রহ্ম মানেই একমঅস্তিত্ব, ব্রহ্ম মানেই নির্বিকারত্ব, অসীমত্ব। সেই সমস্ত কিছু থাকে দিদি মাতৃত্বে, কিন্তু সমস্ত কিছুর পরেও, একাকীত্ব থাকেনা। সন্তানকে বুকে ধারণ করে একা থেকে অসংখ্য হয়ে উঠি আমি। … তাই তো দিদি, ব্রহ্ম নয়, মা পরিচয়েই থাকতে চাই”।

দেবী পাবনি বললেন, “বুঝি না আমি গৌরি। এটা কি তোর পাগলামো নাকি নেশা নাকি এটাই ব্রহ্মত্ব! সর্বেসর্বা হবার পরেও এক মায়ের মত লাচার হয়ে কি করে থাকতে পারিস? যেখানে সকলকে সকল কিছু প্রদানের সামর্থ্য এক ও একমাত্র তোর, সেখানে এমন সামর্থ্যহীন সন্তানের কাছে মমতার ভিক্ষাপাত্র নিয়ে কি করে তুই দাঁড়িয়ে থাকতে পারিস! এই কারণে তোকে মহান বলতেও কুণ্ঠ হয়, যেন মনে হয় পাগল কি করে মহান হতে পারে! … আবার মহান না বললেও লজ্জা লাগে, যেন মনে হয় এটিই তো আসল মাহাত্ম”।

“ছোটো বড় হবার দর্প প্রদর্শন করতে লালায়িত থাকে, এতো পরমাত্মেরই গুণ। কিন্তু যখন বড় নিজের বড়ত্বকে ভুলে ছোটো হয়ে যায়, যখন অসাধারণ অতি সাধারণ হয়ে বিরাজ করে, তখন সম্মানে নয় শুধু, নিজের অকর্মণ্যতার প্রতি লজ্জায়, নিজের অহংকারকে দেখে নিজেরই প্রতি নিধা ও ধিক্কারে মাথা নেমে যায় গৌরি। তুই বুঝবিনা, সত্যি বলছি তুই বুঝবিনা। যে মহান বলে খ্যাত, সে যখন প্রকৃত মহানকে সামনে দেখে অথচ দেখে যে তাঁর মহান রূপে পরিচিত হবার কনো ইচ্ছাই নেই, তখন নিজেকে মহান নয় নীচ ও অধম মনে হওয়া শুরু হয়ে যায়”।

দেবী অম্বিকা এক চোখ জল নিয়ে পাবনির কাছে এগিয়ে এসে, তাঁর ওষ্ঠকে নিজের করতল দিয়তে বন্ধ করে বললেন, “ব্যাস দিদি ব্যাস, অনেক হয়েছে আর নয়”।

দেবী পাবনি সেই হাত সরিয়ে বললেন, “হ্যাঁ এই তো! শুরু হয়ে গেল! কেউ উনাকে মহান বললেই, উনার গাত্রদাহ হয়ে যায়। আর উনি আমাকে, কৃত্তিকাকে, মৃত্তিকাকে, ধরিত্রীকে সবসময়ে মহান বলে বিখ্যাত করে যাবেন। কেন রে? এমন অসভ্য কেন রে তুই? সমস্ত মহান আমরা, আর যার কারণে আমরা মহান, সে নিজের জন্য মহান অক্ষরটা শুনলেই সেখান থেকে পালিয়ে যায়।!… কেন? না আজ তোকে আমায় বলতে হবে, কেন নিজের সাথে এমন দ্বিচারিতা করিস তুই”।

দেবী অম্বিকা এবার ভারী নেত্র নিয়ে বললেন, “ভয়ে দিদি। এক মা যে সব থেকে বেশি ভিতু। ভয় হয়, যদি আমি মহান জেনে, আমার সন্তানরা আমার কোলে উঠতে ভয় পেয়ে দূরে সরে যায়, আমাকে জরিয়ে ধরতে না চায়! … দিদি, এটা ভাবলেও আমার বুক কেঁপে ওঠে”।

পাবনি মুচকি হেসে, ভ্রু তুলে একটি গভীর শ্বাস  নিয়ে বললেন, “দেখলি গৌরি, দেহ প্রদান করা মা, আর আসল মায়ের মধ্যে পার্থক্যটা তোর চোখে পড়লো? … আমি তোর মা হতে চাই। কৃত্তিকাও চায়, বলতে পারেনা। সে তো তোর নগ্ন কোমল শিশুশরীরকে বক্ষে ধারণ করতে চায় খালি, আমি তো নিজের দেহের লহুকে দুগ্ধ রূপে পান করাতেও চাই। দিবি আমাদের বরদান। হ্যাঁ একটু স্বার্থপরই শোনাচ্ছি, কিন্তু হলাম স্বার্থপর। … অজন্মাকে জন্ম দিতে চাই”।

দেবী অম্বিকা হেসে, পাবনির দুই গালকে নিজের দুই করতল দ্বারা বেষ্টন করে বললেন, “বেশ দিলাম দিদি, তোমাদের দুইজনকেই তোমাদের কামনাপূর্তির বরদান দিলাম। কিন্তু পিতা কে হবে আমার? সেটা তো বলো? আমার চরিত্রকে বীর্যরূপে ধারণ করতে পারে, কে আছে এমন?”

পাবনি বললেন, “তোর ছেলে। একমাত্র তারই বীর্যগুণ আছে তোর চরিত্রকে ধারণ করার মত”।

দেবী অম্বিকা ভ্রু কুঞ্চিত করে বললেন, “কিন্তু আমার পুত্র যে আমারই মত কামনাশূন্য! সে কি করে সন্তানের পিতা হবে?”

দেবী পাবনি বললেন, “সেটা আমাদের উপর ছেড়ে দেয়। আমিও তো তোরই উর্জ্জা কিনা। আমি ঠিক আদায় করে নেব”।

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “বেশ দিদি, আমি আসি এখন তাহলে”।

দেবী পাবনি বললেন, “এবারের মৃষুর জন্মলীলায় তুই কি দায়িত্ব পালন করবী বোন?… প্রথমবারে তো ক্ষণিকের প্রকাশ ছিল তোর। পরের বারে আম্মি, আর তারপরের বারে তুই ভদ্রা হয়েছিলিস। এবারে কি?”

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “ক্ষণিকেরই চরিত্র হবে এবার। নিরাকারের স্থাপনা করবে এবার সে। নাগা, যক্ষ রা পরমাত্মের স্থাপনা করেছিল। তাদের প্রকোপ কমিয়ে এনেছে কাপালিকরা। কিন্তু সকলে কাপালিকদের গ্রহণ করতে পারেনা, শ্মশানবাসী তো! তাই পরমাত্মের আরাধনাকে স্থগিত করবেনা মৃষু, কিন্তু তার লক্ষ্য সত্যের স্থাপনা। আর তাই নিরাকারের দিকেই এবার সে মনপ্রান দেবে। তাই শুধুই যখন মার্গ খুঁজে পাবেনা, তখন প্রকট হবো আর সত্যের যাত্রাপথ দেখাবো”।

পাবনি উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “আর তোর মাতৃত্ব? তার কি হবে? … নিরাকারই সত্য, মহাশূন্যই সত্য, কিন্তু পঞ্চভূত ধারণ করে আত্মভাব নিয়ে চেতনাকে দেখলে কি তাঁর নিরাকারত্ব খুঁজে পাওয়া যায়! … একমাত্র পরাচেতনা, পরাপ্রকৃতিকে ধারণ করলেই যে সেই নিরাকার পরমসত্যে পৌঁছানো যায়। কিন্তু তুই যদি সম্মুখে না আসিস, সেই কথা মৃষু উপলব্ধি করবে কেমন করে?”

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “দিদি যা বললে, সেও তো সত্যেরই অঙ্গ। মৃষুকে তো সত্য জানার ও স্থাপনার সময়ে এই কথাকেও উপলব্ধি করতে হবে। নাহলে সত্যকে জানবে সে, কিন্তু সত্যে পৌছাতে কি করে হয়, তা কিছুতেই জানবেনা। ব্রহ্মময়ী বিনা ব্রহ্মে যে যাত্রা করাই যায়না। সেটা তাঁকে উপলব্ধি করতে হবে দিদি”।

দেবী পাবনি বললেন, “সেই জন্যই তো বলছি গৌরি। তুই যদি ছেলের কাছে না থাকিস, তাহলে সে এই সত্যের পথে যাত্রা করার ক্ষেত্রে তোর প্রয়োজন বুঝবে কি করে?”

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “দিদি, যে অনাহারে দিন কাটায়নি কখনো, সে আহারের মাহাত্ম কখনোই বঝেনা। যে পদব্রজে চলেনি কখনো, সে যানবাহনের মাহাত্ম কখনোই বোঝেনা। তেমনই যে কখনো মার্গ হারায়নি, মার্গ হারিয়ে চিন্তান্বিত হয়নি, চিন্তান্বিত হয়ে বিষণ্ণচিত্ত হয়ে গিয়ে ব্যকুল ভাবে প্রগল হয়ে ক্রন্দন করেনি, সে মার্গের মাহাত্ম কখনোই বোঝেনা। তাই, আমি তার সামনে থাকবো না। তখনই আমি তার সামনে আসবো, যখন সে মার্গ হারিয়ে ফেলবে। বিচার করে দেখো দিদি, মার্গ হারিয়ে ফেলার পর যখন কনো কারণে মার্গ খুঁজে পাওয়া যায়, তখন যার কারণে সেই মার্গ খুঁজে পাওয়া যায়, তাকে কি মনে করা হয়?”

দেবী পাবনি বললেন, “বুঝে গেছি গৌরি। সত্যের পথে যাত্রা করতে চাইছে তোর ছেলে, আর তাই তুইও তাকে নিজের সত্য সম্বন্ধে পরিচিত করবি”।

হলোও তেমন, যেমনটা দেবী অম্বিকা বলেছিলেন। আচার্য অতি অল্প বয়স থেকেই বিরক্ত হতে থাকলেন নাগাদের পঞ্চভূত বিজ্ঞানকে সকলকে ভয় দেখানোতে কাজে লাগানোর জন্য। যক্ষদের আর শাস্ত্রীদের ধূর্ততার কারণেও বিরক্ত হওয়া শুরু করলেন। কাপালিকদের নিকটে গেলেন, জানলেন তাঁদের পবিত্রতা, কিন্তু বুঝলেন যে শ্মশানবাসী কাপালিকরা ভয় না দেখালেও, কপালের মধ্য থেকে জলপান করা, মৃতের চিতাভস্ম ধারণ করে থাকা কাপালিকের কথা শুনলেও ভয় পায় মানুষ। আর এই ভয়কে অধিক ভাবে আপামরের মধ্যে স্থির করে রেখে দিয়েছে এই শাস্ত্রীরা, নাগারা আর যক্ষরা।

গহন বিচার করে দেখলেন যে, এই শৈবদের সাথে তো যাওয়া যায়ই না কারণ তারা লোকহিতে নয় আত্মকে সর্বস্ব রূপে স্থাপন করে, অন্যকে পদদলিত করার উদ্দেশ্যেই স্থিত। আর শ্মশানকালী উপাসক, চিৎশক্তির সাথে সংযোগস্থাপক কাপালিকদের সাথে গিয়েও লাভ নেই, কারণ মানুষ তাঁদের প্রতি ভয়ার্ত হয়ে থাকার কারণে, কিছুতেও তাঁদের সংসর্গ গ্রহণ করবেনা মানুষ। এমন বিচার করে, তিনি অন্তর্মুখী হয়ে মার্গের সন্ধান করতে থাকলেন।

বাহ্যিক লোকমায়ার থেকে মুক্ত হলেন প্রথমে, কিন্তু উপস্থিত হলেন গিয়ে চতুর্বিংশতি তত্ত্বের মায়ায়। পক্ষদের সনাক্ত করলেন, সনাক্ত করলেন দেবী কৃত্তিকাকে। অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন যখন দেখলেন যে যক্ষদের নির্মিত আদিত্যদের বেষ্টনে তাঁর মাতা অবস্থান করছেন। অস্থির হয়ে দেবী কৃত্তিকার কাছে উপস্থিত হলেন তিনি সূক্ষ্মলোকে, এবং বললেন, “চলুন মাতা, আমার সাথে চলুন, আপনার পুত্র আপনাকে নিতে এসেছে”।

দেবী কৃত্তিকা মৃদু হেসে বললেন, “আর বাকি ২৬ পক্ষ তোমাকে বক্ষে ধারণ করেনি বলে তাঁরা তোমার মাতা নন? দেখো আচার্য, ওই দেখ দেবী মাঘা, তিনি তো তোমার অনন্য অবতারের মাতা ছিলেন। তা তাঁকে উদ্ধার করবেনা কেন? আর যদি উদ্ধার করই বা, তাহলে আমাদের অবস্থান কি করে করাবে? কোথায় রাখবে আমাদেরকে? এই আদিত্যদের অধীনে, তাঁদের দাসী হয়ে যদি আমরা না থাকি, তাহলে আমরা কার অধীনে থাকবো?”

আচার্য খানিক স্থির হয়ে বললেন, “মাতা, আমি কাপালিকদের কাছে গেছি। তাঁদের কথা অনুসারে, বিশেষ মেধাসম্পন্ন মানবস্ত্রীরাই পিশাচিনি হয়ে বিরাজ করে। আর বলেন যে ৬৪ যোগিনীরা হলেন সাখ্যাত জগদম্বার অংশরূপ। কিন্তু তাঁরা এও বলেন যে, ডাকিনীর সংখ্যা অত্যন্ত কম, বা প্রায় নেয়ই। মাতা, আমি আপনাদের সারা বৎসরের বারো মাস রূপে অবস্থান করাবো। আপনারা ডাকিনী রূপে, সমস্ত ১২ মাস অবস্থান করে, সমস্ত সময়ে প্রকৃতির ক্রিয়াকে সম্পাদন করবেন”।

“বৃষ্টির কালে বৃষ্টি। যেখানে অধিক অনাসৃষ্টি সেখানে অধিক প্লাবন দ্বারা অনাচারকে ধৌত করে দেবেন। যেখানে পাবনধাম, সেখানে বৃষ্টি দ্বারা ভূমিকে উর্বর করে দেবেন। গ্রীষ্মের সময়ে গ্রীষ্মতাপ প্রদান করবেন, পাবনভূমিকে তপ্ত করে সেখানের মৃত্তিকার নিচে স্বর্ণ উৎপাদন করাবেন। শীতের কালে শীত”।

দেবী পুষ্যা সম্মুখে এসে বললেন, “কিন্তু পুত্র, তুমি যা বললে, তা তো প্রকৃতির অধিকারে স্থিত। তা তুমি আমাদের প্রদান করবে কি করে? যা তোমার অধিকারের মধ্যেই নেই, তা তুমি কি করে প্রদান করবে আমাদেরকে?”

আচার্য প্রশ্ন করলেন, “এর উপায় কি মাতা? কি উপায়ে তাহলে আমি পরাপ্রকৃতির কাছে এই আবেদন করতে পারবো? তাঁকে এই যোজনায় রাজি করাতে পারবো? আমাকে মার্গ বলুন মাতা”।

দেবী কৃত্তিকা হাস্য মুখে বললেন, “উপায় একটি আছে। পরাপ্রকৃতির সাথে তোমাকে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। শুনেছি তিনি সমস্ত কিছুর থেকেও অধিক নিজের মাতৃত্বের উপরই জোর দেন। যদি তাঁর কাছে পুত্র হয়ে গিয়ে, তাঁর মমতা লাভ করতে পারো, তাহলে নিশ্চয়ই তোমার এই লোককল্যাণময়, জগতকল্যাণময় প্রস্তাবকে তিনি স্বীকৃতি প্রদান করবেন”।

ফিরে এলেন আচার্য পুনরায় লোকমায়ার মধ্যে। বিচার করতে শুরু করলেন যে পরাপ্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপন করবেন কি উপায়ে? সমস্যা নিয়ে উপস্থিত হলেন নিজের জননী, দেবী পাবনির কাছে। পুত্রের মুখ থেকে এমন অদ্ভুত প্রস্তাব শুনে, আর পরাপ্রকৃতির সাথে সাখ্যাত করার ইচ্ছার কথা শুনে, চমকিতই হলেন তিনি। প্রশ্ন করলেন, “পরাপ্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপনের বিচার তোমার মধ্যে কে প্রদান করলো পুত্র?”

আচার্য বললেন, “আমি সূক্ষ্মলোকে গেছিলাম, সেখানে ২৭ পক্ষের সাথে আমার আলাপ হয়। মাতা কৃত্তিকাকেও সেখানে দেখি। ১২ আদিত্যের দাসী হয়ে তাঁরা বিরাজ করছেন, মাতা কৃত্তিকাও। … কাপালিকদের কাছে আমি গেছি, তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে ডাকিনীর সংখ্যা কম, তাই সর্বক্ষণ এই প্রকৃতির দেখভাল করার মত কেউ নেই। তাই সেই প্রস্তাব দিই তাঁদের যাতে তাঁরা আদিত্যদের থেকে মুক্ত হতে পারেন। সেই কথা শুনে মাতা কৃত্তিকা আমাকে বললেন যে পরাপ্রকৃতির থেকেই এই অনুমতি নিতে হবে। তাই মাতা আমাকে পরাপ্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপন করতেই হবে”।

দেবী পাবনি আন্দাজ করেছিলেন যে, নিশ্চিত ভাবে দেবী কৃত্তিকা বা দেবী শ্রী বা দেবী শ্বেতার সাথে সাখ্যাত করে এসেছে তাঁর পুত্র, নাহলে এমন অদ্ভুত চিন্তা মাথায় আসে কি করে। … তাই ঈষৎ বিচার করে বললেন, “দেবী অম্বিকাই শুনেছি পরাপ্রকৃতির স্বরূপ। তাঁর সম্বন্ধে তোমাকে জানতে হবে পুত্র। তবেই মার্গ পাবে তাঁর সাথে সংযোগ স্থাপনের”।

আচার্য বললেন, “এর অর্থ তো আমাকে মাতা শ্বেতার সাথে সাখ্যাত করতে হবে। … বিদ্যাদাত্রী তো তিনিই। একমাত্র তিনিই আমাকে মাতা অম্বিকার ইতিহাস বলতে পারবেন”।

দেবী পাবনি দেখলেন, তাঁর পুত্র নিজের সকল মাতার সাথে সংযোগ স্থাপনের দিকেই এগচ্ছে। তাই মৃদু হেসে বললেন, “কথা তো তুমি উচিত বলেছ পুত্র। তাহলে যাও, তন্মাত্র অবস্থায় উন্নত হও। যেই চতুর্বিংশতি অবস্থায় তুমি উন্নত হয়েছিলে, তার পরে অবস্থান এই তন্মাত্র অবস্থার। সেখানে সমস্ত স্মৃতি, বিস্মৃতি, বিদ্যা ও কলার অবস্থান। সেখানে উন্নত হয়ে মাতা শ্বেতার কাছে উপস্থিত হয়ে তাঁর থেকে সেই সত্য জেনে এসো পুত্র”।

আচার্য পুনরায় সূক্ষ্ম লোকে উন্নীত হলেন, পৌঁছলেন সপ্তধনুশে, মাতা শ্বেতার কাছে উপস্থিত হলেন তিনি। মাতা শ্বেতা পুত্রকে দেখা মাত্রই বিগলিত হয়ে গেলেন। বললেন, “কি কামনা নিয়ে উপস্থিত হয়েছ পুত্র আমার কাছে, বলো, আমি কি প্রদান করতে পারি তোমাকে”।

আচার্য বললেন, “মা ইতিহাস জানতে চাই দেবী অম্বিকার। আমার জননী বলেছেন, তিনিই হলেন পরাপ্রকৃতি। আমাকে পরাপ্রকৃতির কাছে উপস্থিত হতেই হবে। উপায় রূপে আমাকে তাঁর ইতিহাস জানতে হবে”। মাতা শ্বেতা আনন্দে বিগলিত হয়ে দেবী অম্বিকার কথা শুরু করতে গেলেন, কিন্তু সপ্তধনুশের রক্ষকরা আচার্যের কাছে এসে বললেন, “আপনি পূর্বে দুধসাগরে গিয়ে, দেবী শ্রীর স্পর্শ লাভ করে শুদ্ধ হয়ে আসুন। মানবীয় অপূর্ণতা আপনার চরিত্রে এখনো অবস্থান করছে। এই অশুদ্ধতা নিয়ে এখানে আপনাকে অধিকক্ষণ থাকতে দিতে পারি না আমরা”।

সেই কথা শ্রবণ করে দুধসাগরের দিকে যাত্রা করলেন আচার্য। সকলে ভেবেছিলেন, সামান্য এক মানুষ তাঁকে দেবী শ্রী থোরাই স্পর্শ করবেন। কিন্তু মাতার স্নেহকে কে আর জানতে পারে! আচার্য দুধসাগরের দ্বার থেকে অন্দরেও প্রবেশ করেন নি, দেবী শ্রী পুত্রকে আলিঙ্গন করার আনন্দে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে ছুটে গেলেন। তাই দেখে উদ্বিগ্ন শ্বেতাম্বর পীতাম্বরের কাছে এলেন আর বললেন, “আচার্য তো ভয়ংকর গতি ধারণ করে এগোচ্ছে। কি হবে এর পরিণাম পীতাম্বর?”

দুধেশ্বর হেসে বললেন, “যতক্ষণ দেবী শ্বেতা তাঁকে বিদ্যা প্রদান করবেন, আপনি সম্মুখে উপস্থিত থাকবেন কেবল। তাহলে দেখবেন, রমনাথ বা আমাদের নিন্দা করতেই পারবেন না তিনি। আর এই ভাবে আচার্যকেও আমরা আমাদের ভক্ত করে নেব। … নিঃস্ব হয়ে যাবেন দেবী অম্বিকা, নিজের পুত্রকে এই ভাবে হারিয়ে”।

পীতাম্বরের মেধা দেখে আনন্দিত শ্বেতাম্বর নিজের লোকে চলে গেলেন, এবং দেবী শ্বেতার নিকটেই অবস্থান করা শুরু করলেন। অন্যদিকে দুধসাগরের দ্বারে দেবী শ্রী ও আচার্যের আলিঙ্গনের ফলে, সমস্ত মানবীয় অপগুণ থেকে আচার্য মুক্ত হয়ে গিয়ে, দেবী শ্বেতার কাছে পুনরায় এলেন, এবং সম্যক ইতিহাস শুনলেন। তবে পীতাম্বরের মন্ত্রণা যথার্থ ছিল। শ্বেতাম্বরের উপস্থিতির কারণে দেবী শ্বেতা কিছুতেই ত্রিমূর্তির নিন্দা করতে পারলেন না। ফলে, সমস্ত ইতিহাস তো জানলেন আচার্য, তবে এই নিষ্কাসন করলেন সেই ইতিহাস থেকে যে, যদি অম্বিকাপতি রমনাথের কাছে দেবী অম্বিকাকে ফিরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই দেবী অম্বিকার আশিস লাভ করবেন তিনি।

এমন বিচার করে তিনি এবার এসে রমনাথের আরাধনা শুরু করলেন। দেবী পাবনি তা দেখলেন, বিরক্তও হলেন পুত্রের এই কীর্তির কারণে, কিন্তু দেবী অম্বিকার কথা স্মরণ এসে যায় তাঁর, ‘মার্গ হারালে তবেই মার্গের সন্ধান করতে শুরু করে ব্যক্তি’। তাই কনো প্রতিবাদ না করে যা হচ্ছে, তা দেখতে থাকলেন কেবল।

ত্রিমূর্তি তো এটারই অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে, অম্বিকাপুত্র যখন স্থূল জগতে এসে, যোনিদের মধ্যে স্থিত হয়ে যাত্রা করছে, তখন কখনো না কখনো তো সে নিশ্চিত ভাবেই ত্রিমূর্তির শরণাপন্ন হবে। তাই রমনাথ অনায়সেই সম্মুখে চলে এলেন আচার্যের। আচার্য বিচলিত হয়ে বললেন, “প্রভু, একি আপনি একাকী কেন? পীতাম্বরের সাখ্যাত চাইলে, তিনি শ্রীসহ উপস্থিত হন; শ্বেতাম্বরের সাখ্যাত চাইলে তিনি মাতাশ্বেতাকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হন, কিন্তু আপনি একা যে? মাতা অম্বিকা কোথায়?”

আচার্যের এমন আচরণের জন্য রমনাথ প্রস্তুত ছিলেন না। তাই একটু ইতস্তত করেন তিনি। আচার্যও প্রচণ্ড ভাবে জেদি। তিনি বললেন, “পিতা সন্তানের কাছে সবসময়ে আপনজন হন, কিন্তু পিতাকে চিনতে পুত্র শেখেই মাতার দৃষ্টিদিয়ে। তাই আগে আমার মাতাকে সঙ্গে নিয়ে আসুন। অতঃপরেই আপনার সাথে সাখ্যাত করবো”।

নিরুপায় হয়ে রমনাথ ফিরে এলেন। ক্রুদ্ধও হলেন এক সামান্য মানবের এমন স্পর্ধা দেখে। তাই আচার্য পরবর্তী বেশ কিছু সময় তাঁর দর্শন কামনা করলেও, রমনাথ আচার্যের সামনে উপস্থিত হলেন না। পীতাম্বর সম্মুখে এসে বললেন, “প্রভু, এখন জেদ ধরে থাকার সময় নয়। এই আমাদের কাছে সুযোগ অম্বিকাপুত্রকে বশ করে নেবার, অম্বিকাকে নিঃস্ব করে দেবার। এই সুযোগ আমাদের হাত থেকে চলে গেলে আর আমাদের কাছে কনো উপায় অবশিষ্ট থাকবেনা”।

“আজ যদি আমাদের কিছু অপমান সহ্য করেও নিতে হয়, আমার মতে তা সহ্য করাই আমাদের উচিত হবে, কারণ একবার যদি অম্বিকার পুত্র আমাদের কাছে চলে আসে, তাহলে আর অম্বিকার কনো কিছু অবশিষ্ট থাকবেনা। সে নিঃস্ব হয়ে যাবে”।

রমনাথ সেই কথার বিচার করে সহমত পোষণ করে, পুনরায় আচার্যের কাছে গেলেন, কিন্তু পুনরায় সেই একাকীই গেলেন। আচার্য সেই দেখে মনঃক্ষুণ্ণ হলেন, কিন্তু একটি কথাও বললেন না। রমনাথ বললেন, “কি কামনা তোমার আচার্য। আমি তোমাকে বরদান দিতে চাই। বলো কি চাই তোমার”।

আচার্য মৃদু হেসে বললেন, “আমার যা চাই, তা আপনার দেবার সামর্থ্য নেই, আপনি তা প্রথম দর্শনেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, আর দ্বিতীয়দর্শনে আরো ভাবে বুঝিয়ে দিলেন। … তাই আপনার থেকে আমার কিছুই চাইনা। হ্যাঁ, আপনার দর্শন পাবো বলে, আপনাকে বেশ কিছু মন্দিরে লিঙ্গরূপে স্থাপন করেছি। তার একটা পারিশ্রমিক তো হয়। এই পারিশ্রমিকটা দয়া করে দেবেন না। এটাই আমার আপনাকে দেওয়া বরদান হবে”।

রমনাথ ফিরে গেলেন রমবনে। একত্রিত হলেন ত্রিমূর্তি। বুঝতে পারলেন না কেউই যে, কি এমন চলছে আচার্যের মনে যার কারণে এমন আচরণ করছে সে। অন্যদিকে আচার্যও মার্গ খুঁজে পেলেন না পরাপ্রকৃতির কাছে উপস্থিত হবার। তাই মাতা অম্বার ৫১ পীঠে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে থাকলেন, আর নিত্য তন্মাত্র অবস্থা থেকে উন্নত হবার প্রয়াস করতে থাকলেন।

এমন প্রয়াস থেকেই একদিন তাঁর সমাধির ন্যায় অবস্থা হয়ে যায়। সম্মুখে, পশ্চাতে সর্বত্র কেবলই শূন্য, কেবলই আলোর আবিষ্কার হবার পূর্বের অন্ধকার। না কনো বিকার, না কনো শব্দ, না কনো গন্ধ, না কনো আকার, না কনো বিশেষত্ব। বাহ্যে আচার্য থরথর করে কম্পমান রইলেন, আর সেই পরমসত্যের দর্শন করে আচার্য আর এককদমও আগে এগোতে পারলেন না, আর পিছতেও পারলেন না।

যেন মনে হতে থাকলো, এই অবস্থাতেই তাঁকে সারাজীবন থাকতে হবে। স্মরণ এসে যায় বিশ্বামিত্রের ত্রিশঙ্কু অবস্থার কথা। তিনিও যে এই অবস্থার কথাই বলেছিলেন। আর বলেছিলেন এক দেবী তাঁকে সেই বন্ধন অবস্থা থেকে উদ্ধার করেছিলেন, যাকে তিনি গায়ত্রী নাম দিয়েছিলেন। আচার্য মাতা গায়ত্রীকে আবাহন করার প্রয়াস করলেন, কিন্তু তাও পারলেন না। এমনই ভাবে প্রায় তিন দিবস কেটে যায় মানবলোকের সময়কাল অনুসারে, আর আচার্য সেই অবস্থাতেই আটকে পরে থাকে।

আর ঠিক সেই অবস্থায় এক বালিকারূপ দেবী তাঁর সম্মুখে এসে, তাঁর কর ধারণ করে, ঠিক যেমন মাতা শিশুর হাত ধরে নিয়ে যান, তেমন করে হাত ধরে বাহ্যলোকে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন। আচার্যের দেহ তখনও থরথর করে কম্পমান। ভয়ার্ত অবস্থাধারণ করেই সে বলল, “কে আপনি? আপনি কি গায়ত্রী? বিশ্বামিত্রের গায়ত্রী? আপনি কে?”

সেই দেবী আচার্যের কথাতে অট্টহাস্য হাসলেন কিন্তু মধুর ভাবে। মোহিত হয়ে আচার্য সেই দেবীকে দেখতে থাকলেন। পুনরায় বললেন, “কে দেবী তুমি? পরিচয় দাও তোমার! … কেন তোমাকে দেখা মাত্রই, তোমার স্পর্শ মাত্রই আমার মনে হতে থাকলো আমি আমার জীবনের লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। তোমার ছোঁয়ামাত্রই যেন আমার আঁখি ফেটে জল বেড়িয়ে আসতে থাকলো। যেন মনে হলো তোমাকে আঁকড়ে ধরি আর বলি, আর কনোদিনও তোমার থেকে দূরে যাবো না। মনে হলো যেন বুক চিড়ে বলি, আমাকে আর ছেড়ে যেও না। আর যে তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না! … কিন্তু আমি তোমাকে চিনিই না এদিকে”।

“কে তুমি, কৃপা করো, তোমার পরিচয় দাও দেবী। সম্পূর্ণ অপরিচিত হবার পরও কেন মনে হচ্ছে যে তোমারে থেকে আপন কেউ আর সম্ভবই নয়?”

দেবী হাস্যমুখে বললেন, “তুমি আমাকে কি নামে ডাকবে, কি পরিচয়ে রাখবে, তা তো তুমি জানো আচার্য। তবে এটুকু বলতে পারি যে, আমি সে যে তোমার হাত ধরে ব্রহ্মসমক্ষে নিয়ে গেছিল, আর হাত ধরে সেখান থেকে নিয়ে এলো। আমি হলাম পরাপ্রকৃতি”।

আচার্য ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে, মাতার চরণে পরে গিয়ে বললেন, “মা! … মা… অনেক কিছু ভেবছিলাম তোমাকে বলবো, অনেককিছু চাইবারও ছিল। কিন্তু না তো এখন সেই সমস্ত কিছু মনে পরছে, আর না তা মনে করতে ইচ্ছা করছে। মা, একটিই ইচ্ছা করছে এখন, আর তা হলো তোমাকে হৃদয়ের মাঝে জরিয়ে ধরে থেকে বসে থাকার। অনুমতি দেবে মা!”

দেবী অম্বিকা নিজের আনন্দের অশ্রু কিছুতেই চাপতে পারছিলেন না। তিনি জানেন, এখন একটি শব্দ উচ্চারণ করলেও, তাঁর ধরাধরা কণ্ঠস্বরকে তিনি পুত্রের থেকে লুকিয়ে রাখতে পারবেন না। দেবী শ্রী ও শ্বেতা, দেবী কৃত্তিকা তথা সমস্ত পক্ষ, দেবী পাবনি, দেবী ধরিত্রী সকলে অধীর ভাবে তাকিয়ে থাকলেন, মা আর পুত্রের মিলন আজ হবেই। দেবী কৃত্তিকা বলেই ফেললেন, “সেই কোন কাল থেকে জগন্মাতার বক্ষ খালি হয়ে রয়েছে। অনুমানও করতে পারছিনা তাঁর মধ্যে এখন ঠিক কি চলছে। কতই না সাগরের উচ্ছ্বাস চলছে”।

দেবী অম্বিকা শব্দ উচ্চারণ না করে কেবল আলিঙ্গন করলেন আচার্যকে। আচার্য একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। সচেতন ভাবেই করলেন না। আজ যেন শুধুই হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে তাঁর। কেন এমন হচ্ছে তার উত্তর নেই, তবে শুধুই মনে হচ্ছে, আর কিই বা চাইবার থাকতে পারে কারুর? আর যে কিচ্ছু চাইবার নেই”।

অন্যদিকে দেবী অম্বিকা প্রগলের মত যুদ্ধ করে চলেছিলেন নিজের সাথে নিজেই যাতে তিনি ক্রন্দন না করেন। যেন তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ না করেন। ইচ্ছা তো তাঁর হচ্ছিল পুত্রের সর্বাঙ্গ চুম্বন করার, নিজের অশ্রুর জলে পুত্রকে স্নান করিয়ে দেবার। চিরকালের জন্য নিজের বক্ষে পুত্রকে আঁকড়ে ধরে রাখার। কিন্তু জানেন তিনি, সেই দিব্যক্ষণ এখনো আসে নি। তাই চুপ করে শুধু সন্তানের প্রেম উর্জ্জাকে অনুভব করতে থাকলেন।

আলিঙ্গন পর্বের শেষে, ফিরে এলেন আচার্য। মন তাঁর মাতা অম্বিকার বক্ষতেই পরে রইল। তাঁর গন্ধে, সর্বক্ষণ মেতে রইলেন, তাঁর স্পর্শে আনন্দে বিভোর রইলেন। প্রত্যাবর্তনের পথে পক্ষদের পুনরায় দেখলেন আচার্য। দেখা মাত্রই তাঁর স্মরণ আসে, মাতা প্রকৃতির কাছে যে পক্ষদেরকে ডাকিনী রূপে স্থিত করে ১২ মাসে বিভক্ত করে দেবার কথা ছিল, তা তো করাই হলো না!

পুনরায় সাধনা শুরু করলেন এবার। ব্রহ্মই সত্য সকলকে বলা শুরু করলেন। ব্রহ্মতত্ত্ব প্রদান করে, ত্রিমূর্তির, নাগাদের, যক্ষদের সকলের রাজত্ববিস্তারকে খর্ব করে দিলেন। কিন্তু শেষ কীর্তি তখনও তাঁর থেকে প্রকাশিত হওয়া বাকি ছিল। যেদিন তা হলো, সেদিন তাঁর দেহধারণের অন্তিম দিন হলো।

পরাপ্রকৃতি দেবী অম্বিকা সম্মুখে এলেন আচার্যের। আচার্য বললেন, “মা, কিছু চাইবার ছিল, কিন্তু সেদিন তোমার সঙ্গসুখে এমন মজে গেছিলাম যে, তা আর চাইবার কথা স্মরণেই ছিলনা”।

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “জানি পুত্র, সেদিনও জানতাম, তুমি কি চাইতে চাও। আজও জানি। আমি কারুর ব্যক্তিগত আত্মচিন্তা কারণে চাওয়া বরদান প্রদান করিনা পুত্র। কিন্তু আমি জানি তোমার এই চাওয়ার মধ্যে না তো তোমার কনো নিজস্বার্থ আছে, আর না তোমার কনো আত্মচিন্তা আছে। তাই বরদান দিতে আমি প্রস্তুত। তবে তা প্রদান করার পূর্বে আমি জানতে চাই যে, এমন বরদান তুমি যে কামনা করছো, তার অন্তরায় কি?”

আচার্য বললেন, “নিঃস্বার্থ নই মা। আমার মা, দেবী কৃত্তিকার বন্ধনের পীড়া থেকে তাঁকে মুক্ত করা আমার স্বার্থ। সকলে পক্ষরা আমার মাতাসমান, তাই তাঁদের মুক্ত করাও আমার স্বার্থ। আর অন্তে, যেই যক্ষরা আর শাস্ত্রীরা এই আদিত্যদের স্থাপন করে তাঁদের দিয়ে পক্ষদের বশ করে রেখে মানবজাতিকে বশ করে রেখে দিয়েছে, তাঁদের থেকে মুক্ত করতে চাই মানবপ্রজাতিকে”।

মাতা অম্বিকা হেসে বললেন, “বেশ পুত্র, তাই হোক। পক্ষদেরকে আমি ডাকিনী বেশে স্থাপিত করে, তাঁদের কাছে ১২ মাসের, এবং সমস্ত ঋতুর দায়িত্ব দিলাম। এবার আমি আসি তবে”।

আচার্য অশ্রুপূর্ণ নয়নে বললেন, “এক দণ্ড মা। মা, তোমার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক কেবলই ভক্ত ও ভগবানের?”

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “ভগবান? আমি তো ভগবান নই বাছা। যদি আমি ভগবান হতাম তাহলে না তুমি, আমার ভক্ত হতো! আমি তো ভগবানই নই। তাহলে আমার ভক্ত কি করে সম্ভব?”

আচার্য হতবাক হয়ে বললেন, “যখন যখন তুমি কাছে আসো আমার, আমার মধ্যে এমন অদ্ভুত ভালো লাগা কেন কাজ করে? যেন মনে হয় যে আমার জীবন সার্থক হয়ে গেল, আমার জীবন সার্থক হয়ে গেছে। আর আমার কিচ্ছু চাওয়ার থাকতেই পারেনা। এমন অদ্ভুত কেন মনে হয়? জানো মা, সেদিনও আমি পক্ষদের নিয়ে এই চাওয়াই চাইতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি, কারণ? কারণ এই একই, আর কিছু চাওয়ার থাকতেই পারেনা, এমন ভালো লাগার কারণে সমস্ত কিছু ভুলে গেছিলাম। আর আজও দেখো না, এই একই। কি করে যে স্মরণ রেখে তোমার থেকে চাইলাম সমস্ত কিছু, তা আমিই জানি। কিন্তু কেন এই অদ্ভুত ভালো লাগা? কি সম্বন্ধ তোমার আর আমার?”

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “আমি প্রকৃতি, তাই সমস্ত কেউ আমার সন্তান। আমার ভালো লাগার কারণ এই যে, আমার সন্তান আমার কাছে এসেছে। … একটিই রশির দুই প্রান্তে আমি আর তুমি। তাই যদি সেই সুত্রেই ধরো, তাহলে তোমার ভালো লাগার কারণ হয়তো মায়ের কাছে আসার কারণে, হতে পারে। এর বেশি আমার তো জানা নেই পুত্র। ভালো লাগার উৎস তোমার মধ্যের, তাই তার রহস্যভেদ তো তোমারই পক্ষে সম্ভব”।

আচার্য তাঁর দেহদাত্রী মাতার কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়ে বললেন, “মাতা, দেবী অম্বিকার সম্মুখে আপনি কখনো দাঁড়িয়েছেন?”

প্রশ্নটি শুনে একটু চমকিতই হলেন দেবী পাবনি। মিষ্ট হেসে বললেন, “হ্যাঁ, জননী তিনি আমাদের সকলের। যা কিছু ভাবা যায়, যা কিছু ভাবা যায়না। সম্যক কিছুর জননী তিনি। তাঁরই চেতনাকে ধারণ করে তো আমরা সকলে অবস্থান করছি”।

আচার্য আবার প্রশ্ন করলেন, “আমার প্রশ্ন এটা ছিলনা মাতা। তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়েছেন কখনো? তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে কি আপনার আনন্দের সাগরে পতিত হয়ে গেছেন, এমন বোধ হয়?”

দেবী পাবনি হেসে বললেন, “আনন্দের সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর লহরিমায় স্নান করছি, এই বোধ তো হয়, কিন্তু সেই সাগরে পতিত হয়ে গেছি, এতটা বোধ আমার হয়নি কখনো”।

আচার্য প্রশ্ন করলেন, “তাহলে আমার এমন অনুভব হয় কেন? যেন আমি বাকরোহিত হয়ে যাই। যেন আর আমার অস্তিত্বের কনো প্রয়োজনই নেই এমন বোধ হয়। যেন এক অনাবিল আকর্ষণ আমাকে যেন তাঁর সম্মুখে থেকে সরে যেতে দেয়না। তিনি সম্মুখ থেকে সরে গেলেই যেন শিশুর কান্না এসে যায় অন্তরে। এমন কেন হয়? কি সেই বিশেষ টান তাঁর সাথে? কেন এতোটা বিশেষ টান? সকলেই উনার চেতনা ধারণ করে রয়েছেন। কারুর টান এমন বিশেষ নয়, আমারই টান কেন এমন বিশেষ?”

দেবী পাবনি হেসে বললেন, “তুমি তো দুধসাগর পর্যন্ত ভ্রমণ করে এসেছ। তো সমস্ত পূর্বস্মৃতি তো উঠিয়ে এনেছ। স্মরণ করে দেখো, কিছু খুঁজে পাও কিনা”।

আচার্য দেবী পাবনির পথ আটকে বললেন, “না মা, এই ভাবে চলে যেতে পারেন না আমাকে উত্তর না দিয়ে। আপনি জানেন এর উত্তর, বলুন আমাকে”।

দেবী পাবনি হেসে বললেন, “মাতার অঙ্গের গন্ধ তাঁর দুগ্ধে লেগে থাকে। সেই দুগ্ধের গন্ধ পুত্রের অঙ্গে লেগে থাকে। এমন অবস্থায় পুত্র যদি এই প্রশ্ন করে যে, সে কোন স্ত্রীর দুগ্ধ পান করেছে, তাহলে তার উত্তর একটিই হয়, যেই মাতার দুগ্ধ তুমি পান করেছে, তার গন্ধ স্মরণ করো আর সেই স্ত্রীর অঙ্গের গন্ধ গ্রহণ করো যার সাথে সেই দুগ্ধের গন্ধ মিলে যায়”।

আচার্য পুনরায় মুখ ঘুরিয়ে চলে যাওয়া দেবী পাবনির সামনে এসে উপস্থিত হয়ে বললেন, “হেঁয়ালি নয় মা, উত্তর চাই। উত্তর দিন আমাকে মাতা”।

পাবনি উত্তরে নয়নভর্তি অশ্রু নিয়ে বললেন, “জানো পুত্র, উনি, দেবী অম্বিকা, আমাদের সকলের প্রকৃত জননী। কিন্তু তিনি কখনো এসে তা দাবি করেন না। কেন জানো? … (মিষ্ট হেসে) যদি এক মাতাকে নিজমুখে এসে বলতে হয় আমি তোর জননী, তা তাঁর মাতৃত্বের অপমান, তা তাঁর মমতার অপমান। … এক মা যে মা, তাঁর মাতৃত্ব, তাঁর মমতাই তার প্রমাণ। … তাই তিনি কখনো এসে বলেন না আমাদেরকে যে তিনি আমাদের আসল জননী। কখনো স্মরণ করিয়ে দেন না যে, আমরা পঞ্চভূত লাভ করেছি পিতার ঔরস থেকে মাতার ডিম্ব থেকে, সেই পঞ্চভূত থেকে দেহগঠন করেছি জননীর গর্ভে স্থিত হয়ে, কিন্তু সেই দেহে প্রাণ কি করে এলো? সে যে চেতনা। তাঁরই অংশ যে সেই সমস্ত চেতনা। কি করে বলবেন? তাঁর মাতৃত্ব যে আমাদের কাছে এই সত্য প্রমাণই করতে পারে না। তাই তিনি নীরবে চোখের জল মুছে চলে যান”।

আচার্যের অন্তর বেদনায় অস্থির, কিন্তু মুখে রইল জেদ। সে বলল, “মাতা, আপনি এখনও হেঁয়ালিই করে যাচ্ছেন। … বেশ, তিনি সকলে মা। সকলের কাছে তিনি মাতৃত্ব প্রমাণ করতে বাধ্য, কারণ আমরা সকলে আত্মসর্বস্ব হয়ে থেকে, আত্ম আমাদেরকে পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে যেই মায়াতে ভুলিয়ে রেখেছেন, তাতে আমরা মজে আছি। মানলাম সেই কথা। ধ্রুব সত্য এই কথা”।

“হ্যাঁ, সত্য কথা এটি। পরাপ্রকৃতি সেই কারণেই, এই মায়ার মধ্যে থেকে নিজের সত্য প্রকাশ করার জন্যই সুন্দর সুন্দর বৃক্ষ, তরু, পুষ্প, রামধনু, জলধারা, ঝর্নার স্নিগ্ধতা, বাতাসের মাধুর্য সমস্ত কিছু ধারণ করে বসে আছেন। পঞ্চেন্দ্রিয়কে তারা সকলে তৃপ্ত করে, তাই সেই সমস্তকিছুকে আত্মবোধ সহমতি প্রদান করে। আর তাই সেই সমস্ত কিছুর বেশ ধরে তিনি আমাদের কাছে এসে নিজেকে স্থাপন করে, এবার তিনি সেই সকল বৃক্ষ, পুষ্প, ডাল, পালা, জীব, জীবের স্বভাব, সমস্ত কিছুকে আমাদের সামনে রেখে এই মায়ার ভেদ দেখান ও শেখান”।

“এই সত্য আমিও প্রত্যক্ষ করেছি মাতা। তাই এককথাতে মানলাম সেই কথা। কিন্তু মাতা, সেই অনুযায়ী তো সকলের আনন্দের সাগরে পতিত হবার ভান হবার কথা, তাই না? সাগরের লহরিমায় স্নান করার অভিজ্ঞতা নিশ্চিত ভাবে হতো সকলের। যদি তা না হয়, যদি সকলের সাগরের লহরিমায় স্নান করার অভিজ্ঞতা হয় আর আমার সাগরে ডুব দেওয়ার, এই ভেদ কেন মা। এই প্রশ্ন আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। … এমন কি কিছু সম্বন্ধ আছে, সম্পর্ক আছে আমার ও তাঁর, যা আমি স্বীকার করছি না বলে তিনি মনবেদনায় ছটফট করছেন? যদি তা না হয়, তাহলে আমাকে দেখার পর তিনি আপ্রাণ চেষ্টা কেন করছিলেন যাতে তিনি অশ্রুপাত না করেন?”

দেবী পাবনি বুঝলেন, “সাখ্যাত ভাবের জননী যিনি, তাঁর পুত্র দাঁড়িয়ে রয়েছেন সম্মুখে। ভাব লুকানো যেমন এঁর মাতার কাছে সম্ভব নয়, তেমন এঁর কাছেও নয়। প্রশ্নের বাণে যেকোনো কারুকে দগ্ধ করে দিতে সক্ষম সে। স্বয়ং আদিশক্তির উর্জ্জা থেকে জাত, প্রচণ্ড তীব্র চেতনা সে। কনো কিছু তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনা। স্মরণে আসে তাঁর, পূর্বে রমনাথ স্বয়ং করন হয়েছিলেন, পীতাম্বর রমণ; পরে ত্রিমূর্তি করি, ধার আর করিজ হয়েছিলেন। কেউই এই অম্বিকাপুত্রের সামনাসামনি হতে পারেনি। সামান্য সৃজন নয় সে, বিশেষ, অতিবিশেষ সৃজন জগদম্বার”।

তাঁর মমতা নিয়ে খেলা করা হয়েছে। তাই তিনি উত্তর দিতে, সম্মুখে রেখেছেন নিজের মমতাকে। নিজের পুত্রকে। অম্বিকা, আমি নিরুত্তর। কিছু বলে দাও। কি বলি আমি আচার্যকে? ইচ্ছা তো হচ্ছে সমস্ত সত্য বলে দিই। কিন্তু তুমি তার মাতা বলে তাকে তোমার কাছে নিয়ে যেতে হলে, তুমি নিজেই তা এতদিনে করতে! তাই নয় কি? … কি করি তাহলে? তোমার ছেলেকে তুমিই সামলাও অম্বিকা। আমার ভয় লাগছে তার সামনে যেতে। কি বলতে কি বলে ফেলবো, এমন মনে হচ্ছে। মা আর ছেলের মধ্যে দূরত্বকে কম করতে গিয়ে বাড়িয়ে না ফেলি, সেই ভয় করছে। মার্গ দেখাও ভগবতী”।

পাবনি নেত্র খুললেন তো দেখলেন এক বৃদ্ধা অসুস্থ হয়ে ভূমিতে পরে গেলেন, এবং মৃত্যুবরণ করলেন। দেবী পাবনি সেই বৃদ্ধাকে সহায়তা করতে এগিয়ে যাবেন দেখলেন সম্মুখে কেউ নেই। খানিক থতমত খেয়ে গেলেন। অতঃপরে বুঝতে পারলেন জগজ্জননীর নির্দেশ কি। মূর্ছিত হয়ে সেই স্থানেই পরে গেলেন। আচার্য মাতার সেবা করলেন, কিন্তু সুস্থ করতে পারলেন না। আর তাই নিজের প্রশ্নের উত্তরও পেলেন না। … বাকি জীবন আচার্য গিরিনন্দিনীর স্তব করতে করতেই কাটিয়ে দিলেন। অনুভুতি বহু হলো, কিন্তু সাগরে ডুব দিলেন না তিনি, তাই সত্যও প্রকাশিত হলো না।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22