৩.৩। শক্তিবৃদ্ধি পর্ব
সকলে এসে গুণ, বল, অগ্নি, বারি ও অনন্যার সাথে সাথে সেবার পদচারণ করতে এলে, সকলে একত্রে মিলিত হলেন, এবং রাজা বিস্ময় বচন দিলেন, “সম্রাট সেবা, আমরা জানি, আগামী দিনে আপনাদের সামনে এক বিশাল এবং ভয়ঙ্কর যুদ্ধ অপেক্ষা করছে। বারির থেকে আমরা জেনেছি যে সেই যুদ্ধ অধিকারের যুদ্ধ নয়, খলনায়কের থেকে জগতকে মুক্ত করার যুদ্ধ। মানবজাতিকে রক্ষা করার যুদ্ধ। অহংকারী আর অত্যাচারীর থেকে মানবকে রক্ষা করার যুদ্ধ। আমি কথা দিচ্ছি, সেই যুদ্ধে আমরা তিন ভ্রাতাই আপনার পক্ষ থেকে যুদ্ধ করবো। আমি বিস্ময়, এবং আমার দুই ভ্রাতা অজিত ও সুজিত আজ এই মুহূর্ত থেকে সেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি শুরু করবো। আমরা জানি, কাশ্মিরার ভাই, কিরমিরা কাশ্মিরা সেনাকে নিয়ে অরুদের পক্ষ নেবে। আমিও তাই কথা দিচ্ছি, কিরমিরা আর তার সমস্ত ভাইকে, এবং কাশ্মিরা সেনার সেদিন নিধন করবো আমরা তিন ভ্রাতা এবং জমন রাজ্যের সেনা”।
দেবী বিনতা সম্মুখে এসে বললেন, “দেবী অনন্যা যদি আপনি আপত্তি না করেন, তবে আমার তিন ভগিনী আছে, নিপা, অনুপা আর স্বরুপা। এঁদেরকে তোমার পতিদের পত্নী হবার অনুমতি দেবে? তাহলে জমন রাজ্যের সাথে সুধাপুত্রদের আত্মীয়তার সম্পর্ক হয়ে যাবে, আর তাই অরুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ধূর্ত, অর্থাৎ মুণ্ড বা চারুকুলের ধার এসে আমাদের কাছে মহাযুদ্ধের কালে কনো সাহায্য চাইতেই পারবেনা”।
দেবী অনন্যা পূর্বথেকেই এই কথাতে প্রস্তুত ছিলেন। তাই সহমত প্রদান করতে, সেবার পত্নীরূপে নিপাকে, অনুপার সাথে বারির এবং স্বরুপার সাথে অগ্নির বিবাহ দিলেন, এবং একটি বৎসর তাঁরা সহবাস করলে, সমস্ত প্রতিশ্রুতি লাভ করে, স্নেহবিনিময় করে বনের পথে গুরজারা যাত্রা করলেন সুধাপুত্র ও অনন্যা। গুরজারার রাজা হলেন গুজ্রাজ, এবং সে নিজেই মহাবলবান। বলবান হবার সাথে সাথে সে অত্যন্ত ক্রুর এবং ধূর্তও।
সে নিজের রাজ্যের সমস্ত সেই প্রজা, যারা তাঁর এই দুরাচারের বিরোধ করে, তাঁদের নির্মম ভাবে হত্যা করেছেন। নিদারুণ সেই হত্যাকাণ্ডে, সে কেবল পুরুষদের হত্যা করেনি। তাঁদের স্ত্রীদের ও কন্যাদের সেনা দ্বারা শ্লীলতাহানি করিয়ে, তাঁদের গর্ভে সন্তান প্রদান করেছেন। সেই স্ত্রীদের মধ্যে যারা রূপসী, তাঁদেরকে সে নিজে সম্ভোগ করেছে। এবং নিপীড়নের এমনই মাত্রা যে, সেই স্ত্রীরা যখন অন্তঃসত্ত্বা হন, তখন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁদেরকে সমস্ত অন্য প্রজাদের সম্মুখে মুণ্ডচ্ছেদ করে হত্যা করেছেন।
মহাবলশালী সেও, আর তার ১৮টি সেনাপতিও। আর তাঁর রাজ্যে এমন কেউ নেই যে এই সমস্ত সেনাপতি আর রাজা গুজ্রাজকে হত্যা করতে পারে। তাই সুধাপুত্ররা কনো মার্গ খুঁজে পাচ্ছিলেন না গুরজারাকে মুক্ত করার। এমনই বিচারে যখন রত সকল সুধাপুত্র, তখন সেখানে উপস্থিত হলেন অনন্য ও ভদ্রা।
ভদ্রা সমস্ত সমস্যা শ্রবণ করে বললেন, “আপনারা ভাগ হয়ে যান। বারি ও অগ্নি ব্যাপারীর ছদ্মবেশে সন্ধি করুক গুজ্রাজের সাথে আর দুঃখ প্রকাশ করুক ধীরে ধীরে যে, মাদ্ররাজ্যের স্ত্রীদের জালিমাদেশে খুব চাহিদা। তাঁদেরকে সেখানে বিক্রয় করতে পারলে, গুরজারা রাজ্য সর্বশক্তিমান হয়ে উঠবে কারণ ধন যার কাছে, শক্তিও তারই কাছে। কিন্তু সমস্যা হলো মাদ্ররাজ্যের বিশাল বাহিনী”।
“অনন্যা, আমি আর তুমি মদ্ররাজ্যের কন্যাদ্বয়, শর্মিষ্ঠা ও বিশাখাকে প্রস্তুত করবো এবং সাথে সাথে ত্রিশ সহস্র স্ত্রীসেনাকে প্রস্তুত করবো। জানি এই কাজে মাদ্ররাজ দ্রাবিড় আপত্তি জানাবেন প্রথমে। তাই গুণের সাথে শর্মিষ্ঠাকে, এবং বলের সাথে বিশাখাকে বিবাহ দিয়ে এই কাজ শুরু করতে হবে আমাদেরকে”।
গুণ বললেন, “আমি আর ভ্রাতা বল একই সাথে ত্রিশ সহস্র পুরুষকেও প্রস্তুত করবো যুদ্ধের জন্য এই কালে”।
বল বললেন, “কিন্তু এই কাজে তো অনেক সময় লাগবে গুণ?”
অনন্য বললেন, “১১ বৎসরের বনবাস কালের মাত্র ৩ বৎসরই সময় গেছে। অর্থাৎ আমাদের কাছে আরো ৮ বৎসর সময় আছে। … বারি আর অগ্নি, তোমরা এখনই গুজ্রাজের কাছে যেও না, কারণ এখন থেকে মিত্রতা করলে, এই ৮ বৎসরে তোমাদেরকেও সে চরিত্রহীন হতে বাধ্য করে দেবে। … গুণ বল আর অন্যদিকে দেবী অনন্যা আর দেবী ভদ্রার কাজ সম্পন্ন হবার দিকে অগ্রসর হলে, তবেই তোমরা গুজ্রাজের কাছে গিয়ে, যেমন ভদ্রা বললেন, তেমন করো”।
অনন্য বললেন, “আমি তোমাদের অজ্ঞাতবাসের পরিকল্পনা করে ফেলেছি। অনন্যা সঙ্গীতবিশেষজ্ঞ। তাই সে আহমিরাজ্যের সঙ্গীতগুরু হয়ে উপস্থিত হবে। আর তোমরা সকলে সম্রাট সেবার ব্যক্তিগত সচিব ছিলে, এই বলে সেখানে যাবে, তবে আলাদা আলাদা করে প্রবেশ করবে। অর্থাৎ একজন অন্যজনের পরিচয় প্রদান করে, তাকে রাজ্যের কাজে নিযুক্ত করবে। আর সেই কাজের অগ্রণী ভূমিকা সেবাকে নিতে হবে”।
পরিকল্পনা অনুসারে কাজ হতে থাকলো। শর্মিষ্ঠা ও বিশাখা এবং তাঁদের সাথে ৩০ সহস্র স্ত্রীসেনা প্রস্তুত হতে থাকলো, আর অন্য দিকে গুণ ও বলের প্রভাবে দ্রাবিড় ও তাঁর সাথে ৩০ সহস্র পুরুষ সেনা প্রস্তুত হতে থাকলো। প্রায় ৬ বৎসর সময় লাগলো তাঁদের পূর্ণ ভাবে প্রস্তুত হতে। আর তাই ঠিক ষষ্ঠম বর্ষে বারি আর অগ্নি উপস্থিত হলো গুজ্রাজের কাছে। গুজ্রাজের বিশ্বাস ভাজন হতে বারি আর অগ্নির অধিক সময় না লাগলেও, ৬ মাস কেটে যায় গুজ্রাজকে মাদ্রদেশ আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করতে।
অবশেষে ১৮টি সেনাপতি, মদ্য, আদ্য, আম্ব, সাম্ব, অগ্র, জইশ্য, জাম্ব, ইন্দ্র, তুর্গ, সুর্গ, চর্ব্য, শুক্র, বুধ, শনি, অর্ক, চন্দ্র, তুর, তার ও সর্গ সহ ১০ সহস্র দক্ষ সেনা নিয়ে আক্রমণ করে মাদ্র দেশকে। কিন্তু তাঁরা জানতেনও না যে মাদ্রদেশে ৬০ সহস্র সেনা মতায়ন করা আছে। তাই যুদ্ধ অধিক দিন চলতেই পারেনা। অদ্ভুত কৌশলে যুদ্ধ করে মাদ্রদেশ, যেখানে রণনীতি একটিই হয়, আর তা হলো শত্রুর বিনাশ। তাই প্রতিটি গুরজারার সেনার সম্মুখে ৬টি করে মাদ্রসেনা এসে উপস্থিত হয়।
প্রবল যুদ্ধ করেও, একাক সেনা দুই মাদ্র সেনাকে, বা কেউ কেউ ৩ মাদ্রসেনার নিধন করতে সক্ষম হলেও, মাত্র তিন দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ ১০ সহস্র গুরজারা সেনা নিহত হয়, এবং মাদ্রদের কাছে তখনও ২৫ সহস্র সেনা অক্ষয় হয়ে থাকে।
এই তিন দিবসে, দেবী শর্মিষ্ঠা ও বিশাখাও অসাধারণ যুদ্ধ করেন, এবং গুজ্রাজের ১৮ সেনাপতির মধ্যে ৬ সেনাপতিকে যমের নিকটে পৌঁছে দেন, তো অন্যদিকে দ্রাবিড় একাকী তিন দিবসে তিন সেনাপতির নিধন করেন, এবং এই ভাবে মাত্র মাত্র ৯ সেনাপতি আর গুজ্রাজই অবশিষ্ট থাকেন রণক্ষেত্রে তিন দিবসের শেষে।
ভয়াবহ আরো হয়ে যায় গুরজারাদের পরিস্থিতি যখন, সেনাপতিরা দ্রাবিড় ও তাঁর দুই ভগিনী শর্মিষ্ঠা ও বিশাখার সাথে যুদ্ধ করা কালীন ২৫ সহস্র সেনা তাঁদেরকে চারিদিক থেকে আক্রমণ করে দেয়। শর্মিষ্ঠা গদার প্রভাবে সেনাপতিদের রথের নাশ করে ভূপতিত করে তো সঙ্গে সঙ্গে সহস্র সহস্র সেনা মিলে সেই সেনাপতিকে হায়নার দলের মত আক্রমণ করে, কেবল মুক্ত হস্তে প্রহার করেই মৃত্যু প্রদান করে দেয়।
অন্যদিকে দ্রাবিড় সমানে গুজ্রাজের সাথে যুদ্ধ করতে থাকলে, পরবর্তী তিন দিবসের মধ্যে দ্রাবিড় ও গুজ্রাজ উভয়েই অস্ত্রশূন্য হয়ে যায়। আর সেই তিন দিবসের মধ্যেই গুজ্রাজ নিজের সমস্ত সেনাপতিকে হারিয়ে ফেলেন, আর মাদ্রদেশের সেনার সংখ্যা তখনও ১৫ সহস্র অবশিষ্ট থাকে।
যুদ্ধ যখন সপ্তম দিনে উপস্থিত হয়, তখন গুরজারা রাজ্য থেকে অবশিষ্ট ৩ সহস্র শ্রেষ্ঠ সেনা রণাঙ্গনে প্রবেশ করলেও, মুহূর্তের মধ্যে ১৫ সহস্র সেনা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পরলে, সেই দিনের শেষের মধ্যে গুরজারার সমস্ত সেনার নিধন হয়ে যায়, যেখানে মাদ্রদেশের তখনও ১২ সহস্র সেনা বহালতবিয়তে বিরাজমান থাকে।
একদিকে যখন সেনানিধন চলছিল, তখন অন্যদিকে গুজ্রাজনিধন কর্মও অব্যহত ছিল। গুজ্রাজ সর্বক্ষণ অন্যায় অন্যায় বলে চিৎকার করে যেতে থাকে, কারণ যুদ্ধের নিয়ম অনুসারে একটি যোদ্ধার সাথে একটিই যোদ্ধা যুদ্ধ করে, কিন্তু মাদ্রদেশ তা কখনোই অনুসরণ করেনি। অবশেষে গিয়ে বিশাখা উত্তর দিলেন গুজ্রাজকে, “যুদ্ধ হলো অন্তিম গতি। অর্থাৎ সমস্ত জীবনব্যাপী প্রকৃতিকে যেই মুখচ্ছবি দেখিয়েছে এক ব্যক্তি, তাকে সেই ছবিই দেখায় স্বয়ং প্রকৃতি। সমস্ত জীবন পাপিষ্ঠ তুই স্ত্রীদের উপর অন্যায় করে জীবনের অন্তিমক্ষণে ন্যায় কামনা করিস মূর্খ”।
বিশাখা এই কথা বলে, একটি বাণ নিক্ষেপ করলে, গুজ্রাজের দেহকে তিন গজ শূন্যে ভাসিয়ে শর্মিষ্ঠার কাছে উপস্থিত করে দিলে, শর্মিষ্ঠা নিজের গদার প্রহারে পুনরায় গুজ্রাজকে তিন গজ শূন্যে ভাসমান রেখে পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়। আর এই ভাবে বার সাতেক করতে, গুজ্রাজের আর উঠে দাঁড়ানোর বা কথা বলার সামর্থ্যও না থাকলে, বিশাখা একটি মোক্ষম বাণ দ্বারা গুজ্রাজকে মৃত্যু দিতে যান।
কিন্তু শর্মিষ্ঠা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “না বিশাখা, সহজ মৃত্যু এই পাপিষ্ঠের প্রাপ্তি নয়। নরক করে রেখেছিল সে নারীদের জীবন, তাই মৃত্যুর পূর্বে একে নরক দর্শন করানো আবশ্যক”।
এতো বলে শর্মিষ্ঠা নিকটে গেলেন গুজ্রাজের এবং নিজের গদা দ্বারা সমানে প্রহার করতে থাকলেন গুজ্রাজের সর্বাঙ্গকে। প্রায় শতাধিক প্রহার করলেন যতক্ষণ না গুজ্রাজের দেহ শব হয়ে নিজের চেতনাকে পূর্ণ ভাবে হারিয়ে না ফেললেন।
বিজয়ী দ্রাবিড়কে মাদ্রদেশ ও গুরজারা মিলিয়ে একটি দেশ করে, তার নাম দ্রাবিড় দেশ করে, তার রাজারূপে স্থাপন করলে, দ্রাবিড় সম্মুখে এসে সুধাপুত্রদের বললেন, “হে মান্যবর, আমার এই রাজ্য আপনাদের, এই সেনা আপনাদের আর আমার দুই ভগিনীও আপনাদের। আমি জানি হে সম্রাট সেবা, আপনাদের সামনে মহারণ অপেক্ষা করছে। তাই আমি কথা দিচ্ছি যে আমি স্বয়ং আর আপনাদেরই নির্মিত এই ১২ সহস্র দ্রাবিড় সেনা আপনাদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। তবে নাথ, ১২ সহস্র সেনার নাম শুনলেই দুরাধার ঝাঁপিয়ে পড়বে এদিকে”।
“নিজের মন্ত্রণাতে না করলেও, ওই ষড়যন্ত্রপ্রেমী ধারের মন্ত্রণায় আমার দুই ভগিনীকে তাঁরা ঠিকই বুঝিয়ে শুঝিয়ে বিবাহ করে নিয়ে আমাকে তথা আমার ১২ সহস্র সেনাকে নিজেদের দাস করে নেবে। তাই হে সম্রাট, আমার আপনাদের কাছে সমর্পণের ইচ্ছাকে সার্থক করুন। কৃপা করে, আমার এই দুইভগিনীকে আপনার ভ্রাতাদের সাথে বিবাহ দিন, এবং আমাকে তথা সম্পূর্ণ দ্রাবিড় সেনাকে আপনাদের সম্বন্ধী করে নিন। এটিই সঠিক রাজনীতি হবে এই ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে”।
“দেবী অনন্যা, দেবী ভদ্রা, আপনারা অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং আমার অত্যন্ত সম্মানের। আপনারা এই বিষয়ে কিছু বলুন। জানি আপনারা আপনাদের পতির ভাগ দিতে কুণ্ঠা বোধ করবেন কিন্তু …”
দেবী ভদ্রা কথার মাঝেই বললেন, “হ্যাঁ মহারাজ দ্রাবিড়, আপনি সঠিকই বলছেন, রাজধর্ম যেখানে এসে তোমার অংশ নেবার জন্য তোমাকে আহ্বান করে, সেখানে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনিচ্ছা, ভালো লাগা, অপছন্দ, এগুলি একাকটি কণ্টক ছাড়া অন্য কিছুই নয়। আপনি সত্যই বলছেন, যদি সুধাপুত্ররা আপনার সাথে সম্বন্ধ স্থাপন না করেন, আত্মীয়তা না করেন, তাহলে অরুবংশ সেই সম্বন্ধ করে নিয়ে আপনাদেরকে দাস বানিয়ে নেবে। … তাই যদি অনন্যার আপত্তি না থাকে, তাহলে গদাধারি দেবী শর্মিষ্ঠার সাথে মহাবলি বলের, এবং ধনুর্ধর বিশাখার সাথে গুণের বিবাহ স্থির করা উচিত”।
অনন্যা বললেন, “ভদ্রা যদি রাজি থাকে, তারপরে আমার আর কনো ভিন্ন মতামত থাকতেই পারেনা। এই বিবাহ মানুষের হিতের জন্য হওয়া আবশ্যক”।
সকলে রাজি হলে, শর্মিষ্ঠার সাথে বলের, এবং গুণের সাথে বিশাখার বিবাহ দেওয়া হয়, এবং একটি বৎসর তাঁদেরকে সহবাসে থাকতে দেওয়ার শেষে, দ্রাবিড়রাজ্যে অতিথি বেশে উপস্থিত হন অনন্য।
খাতিরযত্ন সমাপ্ত হলে, অনন্য সকল সুধাপুত্র ও অনন্যার কাছে তাঁদের পুত্রদের স্থাপন করলে, পিতাপুত্রদের ও মাতা সন্তানের মিলনের শেষে, তিনি বললেন, “এবার তোমাদের অজ্ঞাতবাসে যাবার সময় হয়েছে। যেমনটা বলেছিলাম, তেমন ভাবেই আহমি রাজ্যে প্রবেশ করো। প্রথমে সেবা তোমাকেই যেতে হবে। কি নাম রাখবে নিজের ভেব রেখেছ?”
সেবা বললেন, “সম্রাট সেবার প্রিয়পাত্র আমি, তাই আমার নাম হবে বান্ধব। আর এই আমার চার সাথি, যাদের সাথে আমার আলাপ সম্রাটের সেবক হবার পরেই হয়েছে। বলের নাম হবে বাণ, গুণের নাম হবে গ্রাহী, অগ্নির নাম হবে অনল, আর বারির নাম হবে প্রবাহ। আহমি রাজ্যের রাজা, গুহার কাছে আমি প্রথম যাবো, তাঁর বিশ্বাসের পাত্র হবো, আর ক্রমে এঁদেরকে নিযুক্ত করবো কাজে”।
অনন্য প্রশ্ন করলেন, “আর নিযুক্ত হবার পরে তোমাদের কাজ কি হবে?”
গুণ বললেন, “সেনা নির্মাণ। রাজা আহমির বয়স হয়েছে। তাঁর পক্ষে আর যুদ্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু তাঁর পুত্র হাটি একজন যুবক। তাকে সব ভাবে প্রস্তুত করা, আর তার সেনাকে প্রস্তুত করা হবে আমাদের সেখানে কাজ”।
ভদ্রা বললেন, “আর অনন্যাও অন্য দিক থেকে আহমি রাজ্যে প্রবেশ করে, সেখানের মহারানী বাসুমতি অত্যন্ত কলাপ্রেমী। অনন্যা তাঁর কাছে উপস্থিত হলে, অনন্যার কলাগুণ দেখে, তিনি একটি প্রশ্নও করবেন না। আর অনন্যা যে কতটা উচ্চমানের কলাশিল্পী ও প্রশিক্ষক, তা কেউ জানেনা, কারণ বিবাহের পশ্চাতে সে এই সমস্ত কিছুর চর্চা করলেও, তা একান্ত ভাবে নিজের জন্যই করতো। তাই তাঁকে অনন্যা বলে কেউ সন্দেহও করবে না”।
অনন্য বললেন, “রাজা গুহার এবং দেবী বাসুমতির দুই কন্যা আছেন স্বল্পবয়সী। তাঁদের নাম কাম ও রূপ। কামরূপকেও দেবী বাসুমতি কলাবিদ করতে আগ্রহী, কিন্তু উচিত প্রশিক্ষক পাচ্ছেন না তাঁদের জন্য। তাই অনন্যা তাঁদের উচিত প্রশিক্ষক বেশে স্থাপিত হয়ে যাবে অনায়সে”।
অনন্যা সেই কথা শুনে মুখ গম্ভীর করে নিলে, ভদ্রা তাঁর কাছে গিয়ে হেসে বললেন, “বয়স অত্যন্তই স্বল্প অনন্যা। তাঁরা তোমার পতিদের পত্নী হবেন না”।
অনন্যা বললেন, “তাহলে তাঁরা বিত্ত ও ক্ষেত্রের পত্নী হবে। আর এই ভাবেই আমরা আহমি রাজ্যের সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করবো”।
অনন্য হেসে বললেন, “বেশ তো, কিন্তু সেখানে কি নাম রাখবে নিজের, তা ভেবেছ অনন্যা!”
অনন্যা হেসে বললেন, “কলাবতী, এটিই মনে হয় উচিত নাম হবে আমার ক্রিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে। কিন্তু আমার একটি প্রশ্ন আছে ভ্রাতা। অজ্ঞাতবাসে তো আমরা চলে যাবো, কিন্তু অজ্ঞাতবাস থেকে মুক্ত হবো কি করে? একটি বছর পর, আহমিদের আমাদের নিজেদের পরিচয় তো দিতে হবে! তখন কি বলবো তাঁদের? সরাসরি গিয়ে বলবো, আমরা ছদ্মবেশে ছিলাম, মিথ্যা বলেছিলাম তাঁদের?”
অনন্য মিষ্ট হেসে বললেন, “ওটা আমার উপর ছেড়ে দাও কলাবতী। উচিত সময়ে, তোমরা অজ্ঞাতবাস থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। নিশ্চিন্তে থাকো। … বেশ তবে এখন যাত্রা করো তোমরা”।
ভদ্রা শর্মিষ্ঠা আর বিশাখার উদ্দেশ্যে বললেন, “শর্মিষ্ঠা, বিশাখা, তোমরা আমার সাথে চলো। তরুরাজ্যে নিপা, অনুপা আর স্বরুপা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে অবস্থান করছে। আমার সাথে সেখানে চলো, আর তোমার পতিদের অজ্ঞাতবাসের পর্ব সমাপ্ত করতে৩ দাও”।
এত বললে, অনন্য ভদ্রা, শর্মিষ্ঠা ও বিশাখাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে গেলেন তরুরাজ্যে। আর সুধাপুত্ররা যাত্রা করলেন আহমিরাজ্যে। সেখানে গিয়ে একদিকে সেবা নিজেকে বান্ধব রূপে পরিচয় দিয়ে নিজের অসামান্য রাজনীতির জ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত করে স্থাপিত হলেন এবং ক্রমশ বিশ্বাস অর্জন করে করে, নিজের চার ভ্রাতাকে স্থাপিত করলেন আহমি রাজ্যে।
অন্যদিকে, দেবী অনন্যার কলাবতী রূপ এবং কলাগুণ মুগ্ধ করে তুলল দেবী বাসুমতিকে এবং তাঁর দুই কন্যা কাম ও রূপও ক্রমশ দেবী অনন্যাকে নিজেদের আরাধ্যার আসন প্রদান করে ফেললেন। নৃত্য, গীত, চিন্ত্রাঙ্কন, কাব্যরচনা, সমস্ত ক্ষেত্রে পারদর্শী হয়ে উঠতে থাকলেন কামরূপ। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর পরেও একটি সমস্যা রয়ে গেছিল আহমি রাজ্যে, আর তা হলো দেবী বাসুমতির ভ্রাতা দক।
দক অত্যন্ত কুচক্রী এবং কুটিল, কিন্তু সেটিই সমস্ত কিছু নয়, আসল কথা হলো সে সম্পূর্ণ আহমি রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাজা গুহা তাঁর বশ, এবং মহাবলবান দকের সামনা করার মত কেউ নেই বলেও সকলে তাঁর বশ। অজ্ঞাতবাস সমাপ্ত হবার জন্য মাত্র ১৫ দিবস বাকি তখন, অরুকুল হন্যে হয়ে সমস্ত স্থানে সুধাপুত্রদের সন্ধান করে ফিরছিলেন। কিন্তু সুদূর আহমি রাজ্যে গিয়ে যে তাঁরা অবস্থান করছেন, সেই কথা তাঁরা ভাবতেও পারেনি।
ঠিক সেই সময়েই, দেবী অনন্যার রূপে মোহিত হয়ে দেবী বাসুমতির কাছে গিয়ে দেবী অনন্যাকে চেয়ে বসলেন দক। দেবী বাসুমতি বহুতর ভাবে দককে প্রতিহত করার প্রয়াস করলেন, কারণ তিনি জানেন দেবী কলাবতী পূর্ণ ভাবে পবিত্র। কিন্তু দকের নাছোড়বান্দা আর দেবী বাসুমতি পুত্র হাটির বলি চড়াতে উদগ্রীব দেখে, কোন মা আর নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন! তাই দেবী কলাবতী কোকিলাপুত্র নদীর তীরে যেই ক্ষুদ্র স্থানে অবস্থান করেন, সেই স্থানের সন্ধান দিয়ে দেন।
তবে সেই কথা কামরূপ শুনে ফেলেন, এবং তাঁরা সেই কথা দেবী কলাবতীকে গিয়ে বলে দিলে, দেবী কলাবতী বাণ ও গ্রাহীবেশে থাকা বল ও গুণকে সেই সমাচার প্রদান করেন। আর তারপর, সেই রাত্রে যখন দক সেই স্থানে দেবী কলাবতীকে সম্ভোগ করতে উপস্থিত হন, তখন বল ও গুণ মিলে কেবল দকের হত্যাই করেন না, দকের হত্যা করার পর তার দেহের সমস্ত অস্থিজোর কে ভেঙে, অষ্টাদশ স্তরে ভগ্ন করে রাজপুরের সম্মুখে স্থাপিত রেখে দেন।
কেউ জানতে পারেনা যে মহাবলি দকের এমন ভাবে হত্যা কে করেছে, তবে হ্যাঁ দকের মৃত্যুর উৎসব শুরু হয়ে যায় আহমি রাজ্যে। সেই উৎসবের সমাচার পৌঁছে যায় অরুপ্রধান মুণ্ডের কাছেও, আর তাই তাঁরা নিশ্চিত হয়ে যায় যে আহমিরাজ্যেই নিশ্চয়ই সুধাপুত্র বল রয়েছে কারণ একমাত্র বলের পক্ষেই সম্ভব এই অসামান্য কীর্তি।
নিশ্চিত হয়ে গিয়ে, অজ্ঞাতবাসের পূর্বেই সুধাপুত্রদের পুনরায় বনবাসে প্রেরণ করতে পারার আনন্দে তিনদিন ব্যাপী মদ্যপান ও নারীসম্ভোগের উৎসবে মেতে ওঠে সম্পূর্ণ অরুকুল। আর ঠিক তারই মাঝে এসে উপস্থিত হয় কিরমিরা ও তাঁর সাথে এক সহস্র কাশ্মিরা সেনা। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আহমি রাজ্যকে দুই দিশা থেকে আক্রমণ করা হবে। কাশ্মিরা সেনা পর্বতারোহী, তাই তাঁরা উত্তর থেকে আক্রমণ করবে আহমিকে, এবং যখন কাশ্মিরা সেনার আক্রমণের উত্তরে সম্পূর্ণ আহমি সেনা যুদ্ধে রত হয়ে যাবে, তখন আহমির রাজধানীতে আক্রমণ করবে দুরাধার, মুণ্ড এবং সমস্ত মহারথীরা।
যেমন যোজনা করা হয়, তেমন ভাবেই ক্রিয়া করা হয়, তবে আহমি যাত্রা করতে তাদের প্রায় একটি মাস লেগে যায়, অর্থাৎ অজ্ঞাতবাসের সময়সীমাই সমাপ্ত হয়ে যায়, সেই ব্যপারে কারুর ধারণা থাকেনা। কাশ্মিরারা কিরমিরার নেতৃত্বে উত্তর থেকে আক্রমণও করে। আর উত্তর দেবার জন্য সেনা শিবিরকে পরীক্ষণ দেয়াতে রত গুণ ও বল, বারি ও অগ্নি এবং রাজা গুহাকে রথে স্থিত করে স্বয়ং সেবা রণক্ষেত্রে আসে। সুধাপুত্ররা কেউই যুদ্ধ করেনা, কিন্তু যেই ভাবে তাঁরা সেনাকে তৈরি করেছিল, সেই প্রশিক্ষণের জেরে আহমি সেনা কাশ্মিরাদের উপর ভয়ানক হয়ে চড়াও হলে, কাশ্মিরারা রণক্ষেত্র ত্যাগ করে পলায়ন করতে বাধ্য হতে থাকে।
কিন্তু নিশ্চিত করার জন্য যে আহমি রাজ্যের সমস্ত সীমা ত্যাগ করেছে কাশ্মিরারা, তাঁদেরকে প্রায় ৭ দিবস ব্যাপী অনুসরণ করতে থাকে সম্যক আহমি সেনা। অন্যদিকে সেই সময়ের মধ্যে মুণ্ড, করি, করিজ, অরি, দ্রথ সহ সমস্ত দুরাপুত্ররা আক্রমণ করে দেয় আহমিকে পূর্ব দিশা থেকে। সেনা নেই, রথী নেই, মহারথী নেই। এমন অবস্থায় রাজপুত্র হাটি রণক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে বিরোধ করার সিদ্ধান্ত নিলে, দেবী অনন্যা বলেন যে তিনি তাঁর সারথি হয়ে রণক্ষেত্রে যাবেন।
একরথে তাঁরা উভয়ে রণক্ষেত্রে উপস্থিত তো হয়ে যান, কিন্তু বিশাল অরুসেনা দেখে আর তার সামনে শ্রেষ্ঠ মহাবীরদের দেখে, ভিম্রি খেয়ে যায় হাটি, এবং সে রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করার পথে ধাবিত হয়। দেবী অনন্যা রথ ঘোরাতে আপত্তি করলে, রথ ত্যাগ করে মুক্তপদেই পলায়ন করা শুরু করে হাটি। তা দেখে, সকল অরু মহারথীরা হাসাহাসি করলে, দেবী অনন্যা রথ নিয়ে অনুধাবন করেন হাটিকে এবং যেই পিপুলগাছের উপর শবদেহের মত করে সমস্ত অস্ত্র রেখে এসেছিল সুধাপুত্ররা, সেই বৃক্ষতলে উপস্থিত হয়ে দেবী অনন্যা হাটির পথ আটকান, এবং ঘোড়ার লাগাম ধরতে বলে, পিপুল বৃক্ষের উপরে উঠে, সমস্ত অস্ত্র নামিয়ে নিয়ে এসে রথে স্থাপন করেন।
হাটি সমস্ত কিছু দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলে, দেবী অনন্যা নিজের ও সুধাপুত্রদের পরিচয় প্রদান করেন হাটিকে এবং গুণের শ্রীধনুশ ধারণ করে তাতে টঙ্কার দেন। সেই শব্দ শুনে কানে বারবার তালা লেগে যায় হাটির। হাটি সেই ধনুশ ধারণ করতে পারবেনা অনুভব করে দেবী অনন্যা হাটিকে সারথি করে, স্বয়ং শ্রীধনুশ ধারণ করে রণাঙ্গনে যাত্রা করলে, তাঁকে এক দেখা দেখেই সকলে সনাক্ত করে নেন যে তিনি দেবী অনন্যা।
দুরাধার ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হেসে বললেন, “আর যুদ্ধ করার প্রয়োজন আছে, নাকি আবার বনবাসে যাত্রা করবে!”
অনন্যা ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হেসে বললেন, “যদি দিবস ও বৎসরের হিসাব করা ভুলে না গিয়ে থাকো, তাহলে একবার হিসাব করে দেখে নাও। আজ ২০ দিবস হয়ে গেছে আমাদের অজ্ঞাতবাস সমাপ্ত হয়ে গেছে”।
মুণ্ড ও করি হিসাব করলে, ধার বললেন, “সঠিক বলছে অনন্যা। আজ ২০ দিবস হয়ে গেছে এঁদের অজ্ঞাতবাস সমাপন হয়ে গেছে”।
এই কথা শুনে ক্ষিপ্ত দুরাধার বললেন, “ভালোই হয়েছে যে আমাদের সামনে অনন্যা এসেছে রণসাজে সেজে। … দুর্বল স্ত্রী আমাদের মত বলবানদের সামনে কতক্ষণই বা আর টিকে থাকতে পারবে! … অনন্যার হত্যা করে দিলে, আর কনো কারণই অবশিষ্ট থাকবেনা সুধাপুত্রদের কাছে বেঁচে থাকার। মান সম্মান সমস্ত হারিয়ে তাঁরা নিজে থেকেই বনবাসী হয়ে যাবে”।
অনন্যা হুংকার ছেড়ে বললেন, “এতোই যখন নিজেদের বলের উপর ভরসা, তাহলে সমস্ত সেনা আর মহারথীরা মিলে এক সামান্য দুর্বল স্ত্রীকে পরাস্ত করে দেখাও দুরাচারী”।
মুণ্ড সেই কথাতে অতিশয় ক্ষিপ্ত হয়ে ধনুশে বাণ স্থাপন করতে গেলে, সকলে একত্রে ধনুশে বাণ স্থাপন করে অনন্যার হত্যা নিশ্চিত করতে আগ্রহী হলেন। আর তা দেখে অনন্যা শ্রীধনুশে টঙ্কার দিলে, সমস্ত মহারথীদের রথ সহ তাঁর নিজের রথও কম্পিত হয়ে উঠলো। হাটি ভয়ার্ত হয়ে উঠলে, অনন্যা বললেন, “শক্ত হাতে লাগাম ধারণ করো পুত্র, এবার আমি শ্রীধনুশে বাণ স্থাপন করতে চলেছি”।
এত বলে, শ্রীধনুশে এক মোক্ষম লৌহ বাণ স্থাপন করে, চিত্তশক্তিদ্বারা তাতে বল স্থাপিত করে, তা নিক্ষেপ করলে, অনন্যার অনন্ত বল সমস্ত মহারথীর সমস্ত ধনুশকে ভঙ্গ করে দেয়। ধনুশ ভঙ্গ হয়ে যেতে, এক স্ত্রীর কাছে পুরুষত্বের এমন বিপর্যয় লক্ষ্য করে, ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে, দুরাধার সমস্ত সেনাকে একাধারে আক্রমণের বার্তা দিলেন, যাতে তাঁরা নূতন অস্ত্র ধারণ করার সময় পেয়ে যায়।
কিন্তু অনন্যার বল সম্বন্ধে কনো ধারণাই ছিলনা কারুর। অনন্যা একটি হুংকার দিতে, সমস্ত সেনা যেমন মূর্ছা গেল, তেমন হাটির রথও এক যোজন পিছনে নিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়ে বিশেষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। হাটির মনে হতে থাকলো যেন, এই প্রথম সে এক যুদ্ধকে চাক্ষুষ করছে। এরপূর্বের সমস্ত যুদ্ধ যেন নিছকই ছেলেখেলা ছিল। না ছিল তাতে এমন অস্ত্রের সামর্থ্য আর না ছিল তাতে যোদ্ধার সামর্থ্য।
সাহসের থেকেও হাটি যা লাভ করলো তা হলো প্রেরণা। আর সেই প্রেরণা তাঁর হাতের লাগামকে অতিকায় ভাবে শক্তিশালী করে তুলল। তাই পরবর্তী যেই বাণ নিক্ষেপ করলেন দেবী অনন্যা, তাতে হাটির রথ অতীব সামান্যই আন্দোলিত হলো। আর তা হতে সেও বুঝেও গেল যে, যুদ্ধে সারথির ভূমিকে ঠিক কতটা। কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয় সারথির সামর্থ্য ও কৌশল, তা যেন প্রত্যক্ষ করলেন হাটি।
অন্যদিকে সেনার এমন মূর্ছা যাওয়া দেখে, হতবম্ব হয়ে যায় অরুদেশের সমস্ত মহারথী। অনন্যার বল যে এতটা ভয়াবহ, তার সম্বন্ধে কনো ধারনাই ছিল না তাদের। তাই তারা এবার তৎপর হয়ে উঠে দ্বিতীয় ধনুশ ধারণ করার প্রয়াস করলে, অনন্যার পরবর্তী বাণ পুনরায় সমস্ত মহারথীর ধনুশকে ভঙ্গ করে দিলো। এবার আর সেনাও নেই, তাই মুহূর্তের মধ্যেই অনন্যার পরবর্তী বাণ এসে যায়, আর তা সকল মহারথীর রথের ছাউনিকে ভঙ্গ করে দেয়।
কি পরিমাণ বল থাকলে তবে একটিই বাণের মাধ্যমে দশকের উপর মহারথীর রথের দণ্ডকে একত্রে ভঙ্গ করা যায়, তার আন্দাজ সকলেরই আছে। তাই এবার সকলে তটস্থ হয়ে গেল। কিন্তু তটস্থও ঠিক ভাবে হবার সময় দিলেন না দেবী অনন্যা। পরবর্তী বাণ অতীব অদ্ভুত ক্রিয়া করলো। সকল মহারথীর কেবল মুকুটই স্খলিত করলো না তা, সকলের কেশের বিস্তীর্ণ অংশকে ছেদন করে, সকলকে বিশ্রীদ্রষ্টা করে দিলেন তিনি।
এই কীর্তির পর, সকলকে যেমন দেখতে লাগে, তা দেখে একে অপরের উপর হাসাহাসি করতে শুরু করে অরুরা। আর যখন তাঁরা আবিষ্কার করে যে সকলেরই একই দশা করেছে অনন্যা, তখন লজ্জায়, অপমানে সকলের দেহ জ্বলতে থাকে। সেই দেখে দেবী অনন্যা হুংকার ছাড়লেন, “সম্পর্কে আপনারা কেউ আমার দেবর, তো কেউ আমার শ্বশুর, আবার কেউ আমার ভগ্নিপতি। তাই তোমাদের হত্যা করার আগে প্রশ্ন করছে এই অবলা নারী। সম্যক যুদ্ধে তোমরা আমার সামনা করতে অক্ষম, আমাদের অজ্ঞাতবাসও পূর্ণ হয়ে গেছে, তাই পুনরায় বনবাসে ফিরিয়ে দেওয়াও সম্ভব নয়। এমন অবস্থায় কি, আর যুদ্ধ করবে?”
“যদি করো, তাহলে আমি তোমাদের সকলকে হত্যা করতে এক দণ্ডও বিলম্ব করবো না। আর যদি প্রাণ প্রিয় হয়, তবে তোমরা আমার স্বামীদের আত্মীয় হবার জন্য, প্রাণভিক্ষা দিতে পারি। আমার অপমানের, এবং প্রজার সাথে যেই অবিচার আর অধর্ম করেছ, তার দণ্ড প্রদান করা আমার কর্তব্য নয়, আমার স্বামীদের কর্তব্য। যদি যুদ্ধ করতে চাও তাহলে, তোমাদের ইচ্ছার কারণেই তোমাদের হত্যা করে, স্বামীদের কর্তব্য আমি পালন করবো। আর যদি চাও যে অবলার হাতে মৃত্যু লাভ করার অপমান গ্রহণ করবে না, তাহলে সুযোগ দিলাম, ফিরে যাও নিজের রাজ্যে, আর সাম্রাজ্য ফিরিয়ে দেবার চিন্তা করগে যাও”।
অপমানকর এই বার্তা শ্রবণ করার পরে, দুরাধারের সমস্ত দেহ যেন জ্বলতে থাকে। সেই দেখে ধার বললেন, “না দুরাধার, এখন নয়, এভাবে নয়। আমরা রাজ্যে ফিরে যাই। পরিকল্পনা করি কি ভাবে সাম্রাজ্য সুধাপুত্রদের থেকে সুরক্ষিত করা যায়, অতঃপরে যদি যুদ্ধ করতেই হয়, তাহলে সুধাপুত্ররা অনন্যার মত এমন মানসিক ভাবে সবল নয়। কনো না কনো উপায় করে, তাদেরকে দুর্বল করেই দেওয়া যাবে। এখন ফিরে চলো”।
অরুর রাজপুত্ররা, মুণ্ড, অরি, করি ও করিজ সহ ধার ও ধারের পুত্র সকলে রণক্ষেত্র ত্যাগ করে চলে গেলেন। হাটি নতজানু হয়ে, করজোড়ে বললেন, “আমার ভগিনীরা আপনাকে আরাধ্যা জ্ঞান করেন। আজ জেনে গেলাম কেন তাঁরা এমন জ্ঞান করে। আমি জানিনা আমার সম্মুখে আমি জগন্মাতাকে দেখছি কিনা, তবে আমি নিশ্চিত যে, আপনি যদি জগন্মাতা নাও হন, নিশ্চিত ভাবে তাঁরই অংশপ্রকাশ”।
দেবী অনন্যা মিষ্ট হেসে বললেন, “পুত্র, এবার আমাদের রাজ্যে ফিরে যাওয়া উচিত। তোমার মা ও ভগিনীরা অপেক্ষা করছেন তোমার”।
হাটি বললেন, “দেবীমা, আপনাদের অজ্ঞাতবাসেরও তো সমাপ্তি ঘোষণা করতে হবে। অনুমতি দিন মাত, এই শুভকাজটি আমাকে করার অনুমতি আর বুদ্ধি প্রদান করুন”।
দেবী অনন্যা হেসে বললেন, “তাই হবে পুত্র। চলো ফিরে চলো”।
ফিরে আসতে, দেবী বাসুমতি পুত্রকে ভালো করে নিরীক্ষণ করলেন ব্যকুলতার সাথে। পুত্রকে সকুশল দেখে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন যেন তিনি। সেই দেখে পুত্র হাটি বললেন, “মা, আমার কি করে কিছু হবে? আমি তো যুদ্ধ করিই নি! … যুদ্ধ তো করেছেন দেবী অনন্যা। ভয়ানক যোদ্ধা তিনি। সমস্ত অরু মহারথীদের মুহূর্তের মধ্যে পরাজিত করে দিলেন”।
দেবী বাসুমতি ও রাজা গুহা একত্রে বলে উঠলেন, “দেবী অনন্যা! তাঁকে কোথায় পেলে? তিনি তো এখন অজ্ঞাতবাসে!”
হাটি মিষ্ট হেসে বললেন, “অজ্ঞাতবাসে ছিলেন, তাঁদের অজ্ঞাতবাস সমাপ্ত হয়ে গেছে। আর তাই তিনি সম্মুখে এলেন। আপনারা যাকে দেবী কলাবতী বলেন, তিনি অন্য কেউ নন, স্বয়ং দেবী অনন্যা। যাকে আপনারা গ্রাহী বলেন তিনি হলেন মহাযোদ্ধা গুণ, এবং যাকে আপনারা বাণ বলেন, তিনি হলেন মহাবলী বল। আর পিতা, আপনার সহায়ক সকলে, অর্থাৎ অনলরা এবং স্বয়ং বান্ধব হলেন সম্রাট ও তাঁর ভ্রাতারা”।
সকলে সম্মুখে এসে উপস্থিত হলে, রাজা গুহা বললেন, “তাই বলি, কার এমন সামর্থ্য যে আমার শ্যালকের হত্যা করে! … আমি ধন্য হয়ে গেলাম আপনাদের আমাদের সাথে এই ভাবে নিবাসের জন্য। আমি কথা দিচ্ছি হে সম্রাট, আমার এই সম্পূর্ণ ৩ সহস্র সেনা, যাকে আপনারাই নির্মাণ করেছেন, তা আপনাদের হয়ে যুদ্ধ করবে”।
বল সম্মুখে এসে বললেন, “আর যাকে দেবী অনন্যা নিজের সারথি করেছেন, সেই হাটি হবে আমার সারথি”।
দেবী বাসুমতি সম্মুখে এসে বললেন, “দেবী, আপনারা চলে গেলে, সর্বাধিক বেদনাগ্রস্ত হবে আমার এই দুই পুত্রী। তাঁদের প্রাণ যে আপনাতে বসে!”
দেবী অনন্যা হেসে বললেন, “দেবী ভদ্রা আর অনন্য শীঘ্রই এখানে আসছেন আমাদের সম্পূর্ণ পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে। দেবী ভদ্রার দুই পুত্র, বিত্ত ও ক্ষেত্রের পত্নী করে, আর নিজের পুত্রবধূ করে আমি কামরূপকে নিয়ে যাবো, যদি আপনার আপত্তি না থাকে তো”।
রাজা গুহা এগিয়ে এসে বললেন, “আপত্তি! থাকতেই পারেনা আপত্তি! স্বয়ং সুধাপুত্র, অনন্য, দেবী ভদ্রা আর দেবী অনন্যার সংসর্গ পাবার সুযোগ যেখানে রয়েছে, সেখানে আপত্তি যে থাকতেই পারেনা দেবী! … আমরা সকলে মিলে বিবাহের আয়োজন করছি। কারা কারা আসছেন, যদি বলেন!”
কথা শেষ হতে না হতেই, রাজা গুহার কাছে সমাচার এলো যে অতিথিরা দ্বারে এসেছেন। উপস্থিত হলেন অনন্য, দেবী ভদ্রা, তাঁর পুত্ররা বিত্ত ও ক্ষেত্র, এবং উপস্থিত হলেন সস্ত্রীক অনন্যার পাঁচপুত্র, সেবাজ, বলজ, গুণজ, অগ্নিজ ও বারিজ। সকলকে দেখে, সকলের সাথে মিলন আলিঙ্গন করে, দেবী অনন্যা প্রশ্ন করলেন অনন্যকে, “ভ্রাতা ভদ্রকে দেখছিনা!”
ভদ্রা বললেন, “আসছিলেন তিনি এখানে। কনো একজনের থেকে কনো একটি বার্তা লাভ করে, তিনি মাঝপথেই চলে যান সেখানে”।
অনন্য গম্ভীর মুখ করে, মিষ্ট হেসে বললেন, “করি, ধার আর মুণ্ডকে সাক্ষী রেখে, দিরাধার কিছু বলার জন্য বার্তা পাঠিয়েছেন ভ্রাতা ভদ্রকে। জানোই তো, সেবার মতই তারও অগ্রজ, অনুজ, জ্যেষ্ঠ ইত্যাদি কুলধর্মের প্রতি নিষ্ঠা অধিক। … তাই তিনি চলে গেছেন তাঁদের কাছে”।
সেবা সম্মুখে এসে বললেন, “আর সেই সমস্ত ভাব নেই আমার অনন্য। আমি বুঝে গেছি, রাজধর্মই জাগতিক ভাবে শ্রেষ্ঠ ধর্ম, আর যদি তার থেকে অধিক গুরত্বপূর্ণ কনো ধর্ম থাকে তা হলো সত্যধর্ম, অর্থাৎ সত্যের উদ্দেশ্যে যাত্রার ধর্ম। কুলধর্ম, জাতধর্ম, সাম্প্রদায়িক ধর্ম, এই সমস্ত আসলে হৃদয়কে বন্দী করে রেখে দিয়ে রাজধর্ম থেকে আর সত্যধর্ম থেকে ভ্রমিত করে দেয় আমাদেরকে। এই বনবাস আমার ভ্রাতা আর পত্নীর জন্য একটি কর্মফল। আমার মত ভ্রান্ত ধারণা রাখা ব্যক্তিকে অনুসরণ করার কর্মফল। তবে আমার জন্য তা হলো বরদান। আমার অন্তরের কলুষতা দূর করে শুদ্ধ করে তুলেছে এই বনবাস। আমি আজ প্রস্তুত যুদ্ধের জন্য। আমাকে, আমাদের যুদ্ধ করতেই হবে, কারণ মানবজাতিকে উচ্ছন্নে পাঠাতে ব্যস্ত দুরাধার ও তাঁর মার্গদর্শকরা। আর তাই যুদ্ধ করাই আমার রাজধর্ম, আমার মনুষ্যত্বের ধর্ম”।
অনন্য হেসে বললেন, “অতি উত্তম”।
গুণ বললেন, “ভ্রাতা ভদ্রকে নিয়ে গেছেন মানে, নিশ্চিত ভাবে কনো ষড়যন্ত্র করছে ওরা”।
অনন্য বক্রওষ্ঠে হেসে বললেন, “দুরাচারীর ষড়যন্ত্র বাহ্যিক ভাবে ঘাতক দেখতে হলেও, সেই আঘাত প্রকৃত অর্থে তাঁদেরই কাছে ফিরে যায়, বিশেষ করে যখন যার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে, সে যখন ধর্মপথের পথিক হয়। … তাই দুশ্চিন্তা করো না। … বিবাহের প্রস্তুতি গ্রহণ করো। দেবী নিপা, অনুপা আর স্বরুপা ও তাদের থেকে জাত একটি করে কন্যা সন্তান আমাদের সঙ্গেই এসেছে। কিন্তু দেবী শর্মিষ্ঠা আর বিশাখাকে আনতে পারিনি, কারণ তাঁরা এখন অন্তঃসত্ত্বা। তাই দেবী নিপা, অনুপা আর স্বরুপার সাথে মিলিত হয়ে নাও সেবা”।
একদিকে যখন বিবাহ সম্পন্ন হলো, তখন অন্যদিকে ভদ্র আর আহমিরাজ্যে না গিয়ে সরাসরি ফিরে গেলেন নিজের রাজ্যে। আর অন্যদিকে, রাজা দ্রাবিড়, তথা রাজা বিস্ময় অজিত ও সুজিতকে সঙ্গে নিয়ে যোগ ফিলেন অনন্য ও সুধাপুত্রদের সাথে”।
দ্রাবিড় বললেন, “সম্রাট, আমার মতে, আপনাদের এখান থেকে আমার রাজ্যে চলে যাওয়া উচিত। আমার রাজ্যে ১২ হাজার সেনা রয়েছে। আহমির ৩ হাজার সেনা আর রাজা বিস্ময়ের ৩ হাজার সেনাকে অনায়সে রাখতে পারবে সেখানে। আর সঙ্গে সঙ্গে, আমাদের শিবিরও সেখানেই থাকা উচিত, যাতে করে আমরা রণক্ষেত্র থেকে অধিক দূরত্বে অবস্থান না করি”।
অনন্য বললেন, “আমার ভ্রাতা কি কথা দিয়ে আসবেন আজ দুরাধারকে, আমি জানিনা। যদি সেনাকে দুই ভাগ করে দেন, তাহলে আমার নিজস্ব ৩ সহস্র সেনা আছে, তারা আপনার সাথেই থাকবে সম্রাট। সেই ক্ষেত্রে, অরুদের নিজস্ব ১০ হাজার সেনা রয়েছে। সঙ্গে থাকবে ধারের ৫ হজাজার সেনা, আর সাম্রাজ্য ছিনিয়ে নেবার পর, সেই সমস্ত সেনা মেলালে সংখ্যায় প্রায় আরো ৪ হাজার। জালিমার সেনাকেও যুক্ত করেছে তারা। তাই সেই থেকেও ৩ হাজার সেনা। আর যদি আমার ভ্রাতার থেকে তরু বংশের সেনা চেয়ে বসে, তাহলে তারাও সংখ্যাতে প্রায় ৭ সহস্র সেনা। অর্থাৎ সমস্ত কিছু মেলালে, তাদের সেনার সংখ্যা হবে ২৯ হাজার সেনা”।
রাজা বিস্ময় বললেন, “কিড়মিড়ের এক হাজার সেনাও আছে। মানে সর্বসাকুল্যে ত্রিশ হাজার সেনা। আর সেখানে আমাদের মাত্র ১৮ হাজার সেনা!”
গুণ বললেন, “যুদ্ধ সেনাবলে জেতা যায়না মহারাজ বিস্ময়। যুদ্ধ জিততে লাগে সাহস আর কৌশল”।
বল বললেন, “আমার ভ্রাতা গুণ একাকীই ত্রিশ হাজার সেনার নিধন করতে সক্ষম। তাও একটি দিনেই। আর সেই কথা দুরাধারও জানে। আর গুরু করি আর তাঁর পুত্র করিজও; সেই কথা ওই ধূর্ত ধারও জানে আর তার পুত্র দ্রথও। আর সেই কথা মুণ্ডও জানে আর সাথে সাথে অরি সহ সকল দুরাধার ভ্রাতারাই জানে”।
সেবা বললেন, “যুদ্ধ করার প্রসঙ্গ এখনই উঠছে কেন? যদি অরুরা শর্ত মেনে সমস্ত সাম্রাজ্য আমাদের ফিরিয়ে দেয়, তাহলে তো যুদ্ধের প্রয়োজনই থাকেনা”।
বারি বললেন, “আপনার এখনও মনে হয় যে তারা শর্ত মানবে? রাজ্য ফিরিয়ে দেবে! এতদিনেও চিনলেন না ওদেরকে!”
সেবা বললেন, “না মানলে যুদ্ধে যেতেই হবে। কিন্তু সেই মাঙ্গ তো আমাদের একবার রাখতে হবে! রাজধর্ম বলে, সমস্ত উপলব্ধ সম্ভাবনা নিষ্ক্রিয় হলে, তবেই যুদ্ধে যাওয়া উচিত। যুদ্ধ মানেই প্রাণক্ষয়, যুদ্ধ মানেই রসদের নাশ অর্থাৎ জনজীবনের ক্ষয়। যুদ্ধ মানেই ভয়ানক দূষণ, অর্থাৎ প্রকৃতির উপর আঘাত”।
অনন্য বললেন, “সম্রাটের কথা যথাযথ। যদি তিনি অনুমতি দেন, তবে আমি নিজে সম্রাটের দূত হয়ে হস্তীতে যাবো, আর মুণ্ড, দুরাধার, অরি, করি, করিজ, ধার, দ্রথ সকলের সামনে প্রস্তাব রাখবো শর্ত মেনে সাম্রাজ্য ফিরিয়ে দেবার। আর এও বলে আসবো যে, যদি তাঁরা সাম্রাজ্য না ফিরিয়ে দেয়, তাহলে যুদ্ধ নিশ্চিত। আর যুদ্ধ হলে তাঁদের কি ক্ষয়ক্ষতি হবে, তাও বুঝিয়ে আসবো”।
গুণ বললেন, “কিন্তু সখা, ভ্রাতা ভদ্রকে কি কি বললেন, তা একবার জেনে সেখানে গেলে হতো না!”
অনন্য হেসে বললেন, “আমি আমার ভ্রাতাকে চিনি। যদি যুদ্ধের কথা কিছু বলে থাকে দুরাধার আর ভ্রাতা তা মেনে থাকেন, তাহলে তিনি যুদ্ধ আরম্ভের সায়াহ্নেই সেই কথা বলবেন, তার পূর্বে নয়। অর্থাৎ ভ্রাতার থেকে কিচ্ছু জানা যাবেনা। অন্যদিকে দুরাধারকেও চিনি আমি। যদি সাম্রাজ্য ফিরিয়ে না দিয়ে, যুদ্ধের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়, তাহলে সে অবশ্যই আমার ভ্রাতাকে যা যা শর্ত দিয়ে বেঁধেছে, সেই সমস্ত কিছু বলে আমাকে ভয়ার্ত করতে সচেষ্ট হবে। অর্থাৎ আমি সেখানে গেলেই বরং ভ্রাতাকে কি কি শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা সহজে জানবো”।
সেবা বললেন, “বেশ তাহলে, দূত হয়ে তুমি যাও অনন্য সেখানে। আর তাঁদেরকে বার্তা প্রদান করে, তাঁদের বার্তা নিয়ে আসো। তারপর না হয় আমাদের অবস্থান, সেনার সম্মিলন, এবং রণকৌশল নির্ধারণ করা যাবে”।
অনন্য বললেন, “হ্যাঁ আমি এখনই প্রস্থান করবো। আমাকে তাঁদের রথীবলও খতিয়ে দেখতে হবে। তবেই আমাদের যুদ্ধকৌশল নির্মাণ করা সম্ভব হবে”।
যেমনটা অনন্য ভেবেছিলেন, ভদ্রকে শর্ত তার থেকেও অধিক দিয়েছে দুরাধার। গদাচালনায় দুরাধার তাঁর শিষ্য, আর সেই সুত্রেই গুরুর থেকে বচন নিয়েছে বহুল পরিমাণ। তবে অনন্য এই ক্ষেত্রে সঠিক ছিল যে দুরাধার নিজেই তাঁকে এই সমস্ত শর্ত বলে দেবে।
অনন্য যখন অরুপ্রদেশে উপস্থিত হলেন, তখন মুণ্ড, করি ও ধার সকলেই তাঁর প্রতি আতিথেয়তা প্রদর্শন করতে এলে, তিনি স্পষ্ট ভাবে বললেন, “প্রথমত আমি এখানে অতিথি হয়ে আসিনি। সম্রাট সেবার দূত হয়ে এসেছি। আর দ্বিতীয় কথা এই যে, যেই রাজ্য এবং যেই রাজ্যের শাসকগোষ্ঠী স্ত্রীজাতি নির্যাতনে সহায়ক, সেই রাজ্যবাসীর প্রদত্ত জলস্পর্শ করতেও আমার রুচিতে বাঁধে”।
অতি যত্নবাণ অনন্য নিজের শব্দপ্রয়োগে। তিনি জানেন, দ্বিতীয় কথাতে সকলে চুপ হয়ে গেলেও, প্রথম কথার প্রতিক্রিয়া স্বয়ং দুরাধার দেবে। হলোও তাই। দুরাধার গর্জন করে উঠলেন, “সম্রাট! আপনার সম্রাট সেবা যে আর সম্রাট নেই! সম্রাট এখন আমি!”
অনন্য হেসে বললেন, “তুমি তো সম্রাট হতেই পারো না দুরাধার, কারণ তরুরাজ্যের অধিপতি আমি, আর তরুরাজ্য সমস্ত ভূখণ্ডের এক তৃতীয়াংশ। তাই যার সাথে এক তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডই নেই, সে সম্রাট কি করে হতে পারে! … দুরাধার, আমি একাকী সেই সম্যক ভূখণ্ডের অধিপতি এবং সম্রাট সেবাও এক তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডের অধিপতি। আর আমি তাঁকে সমর্থন করি, অর্থাৎ তিনি দুই তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডের অধিপতি। আর তাছাড়াও, তোমাদের দেওয়া শর্ত অনুসারেই তো তোমার সাম্রাজ্য তো আর তোমার নেই। সুধাপুত্র ও অনন্যাকে তো তুমি অজ্ঞাতবাসের কালে সনাক্ত করতে পারো নি। অর্থাৎ তোমার অংশেরও অধিপতি তো সম্রাট সেবাই”।
দুরাধার গর্জন করে উঠলো, “তিন ভাগের এক ভাগ যদি সাম্রাজ্যের অধীনে না থাকে, তাহলে তিনি সম্রাট হননা। আর আমি কনো শর্ত মানি না। আমি আমার রাজ্য কারুকে প্রদান করবো না, বিনা যুদ্ধে তো কিছুতেই নয়”।
অনন্য মিষ্ট হেসে বললেন, “তাহলে প্রস্তুত হয়ে যাও যুদ্ধের জন্য। রাজ্যের সাধারণ জনবসতিকে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইনা। তাই মধ্যভূমির রেবানদীর তীরে, বিস্তীর্ণ মাহিস্মতি সংলগ্ন স্থানে আমরা উপস্থিত হয়ে যাবো আজ থেকে ঠিক তিন মাসের মাথায়। যদি সেখানে তোমরা অবস্থান না করো, তাহলে আমাদের সেনা তোমাদের এই হস্তীতে উপস্থিত হয়ে যাবে”।
দুরাধার মুখবিকৃতি করে বললেন, “কিন্তু কার বলে যুদ্ধ করবেন মহামান্য ঈশ্বরকটি অনন্য! … আপনার ভ্রাতা আমার গুরু, আর তিনি তো বচন দিয়ে গেছেন যে আপনি সম্যক যুদ্ধে ভাগ নেবেন না, আর তিনি স্বয়ং এই যুদ্ধে ভাগই নেবেন না। … সাথে সাথে এও প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন যে, তরুসেনা এই যুদ্ধে ভাগই নেবেনা, না আমাদের পক্ষে না আমাদের বিপক্ষে। তাহলে কার ভরসায় যুদ্ধ করবেন?”
অনন্য হেসে বললেন, “বেশ আমি না সম্যক ভাবে৩ ভাগ নেব না যুদ্ধে। কিন্তু গুণ আর বলের সামনা করার সামর্থ্য আছে তো তোমাদের!”
অরি সম্মুখে এসে বললেন, “আমি থাকতে এই কথা বলার আগে দ্বিতীয়বার কি করে ভাবলেন না আপনি মহামতি!”
দুরাধার হেসে বললেন, “গুণকে তো অরি সামলে নেবে। সাথে করিজকেও পেয়ে যাবে সে। কিন্তু সম্যক যুদ্ধে যে মহাবলী মুণ্ড, ধার, আর গুরুদেব করি ভাগ নেবেন! তাঁদের সামনা করার সামর্থ্য কার আছে?… উনাদের সাথে আমরা সকল অষ্টভ্রাতা আছি, আর আমাদের সকলের দুটি করে বলবান পুত্র রয়েছে। দ্রথসহ, আমাদের কাছে আছে ৬টি বিশারদ যোদ্ধা, রয়েছে আমরা ভাইরা অর্থাৎ ৮ মহারথী, আর রয়েছে কিড়মিড় সহ আমাদের সকলের পুত্ররা, অর্থাৎ ২২টি রথী, আর সাথে ২২ হাজার সেনা। কে সামনা করবে আমাদের!”
অনন্য হেসে বললেন, “বলের উত্তর বল দিয়ে দেওয়া, ছলের উত্তর ছল দিয়ে দেওয়ার অর্থ জানো দুরাধার! জানো না। আশা করি তোমার গুরু, মানে আমার ভ্রাতা তোমাকে শেখাননি। আমিও তোমাকে শেখাবো না, শুধু সেই বিদ্যার সারকথা তোমাকে শুনিয়ে যাবো। বাকি যা শোনাবো, তা প্রত্যক্ষ করাবো নর্মদাতীরে, অরুঞ্চলের ময়দানে, আজ থেকে ঠিক তিন মাস পরের কৃষ্ণপক্ষের শুরুর দিনে। শিক্ষার সার এই যে, তোমায় যখন কেউ বল প্রদান করে, তখনই তাকে বল প্রদর্শন করতে নেই। বল সঞ্চয় করে সেই বল প্রদর্শন করে তাঁকে ভূমিতে মিশিয়ে দাও। তোমার সাথে যখন কেউ ছল করে, তখন সেই সময়ে তাঁকে ছলের জালে চিরবন্দি করে দাও, যেই সময়ে সে ছল থেকে দূরে থাকতে চাইবে। চলি দুরাধার, রণক্ষেত্রে পুনরায় সাখ্যাত হবে”।
অরি আর করিজ বিকৃত হাস্য হেসে বললেন, “দাঁড়ান মহামতি। কোথায় যাচ্ছেন! আতিথেয়তা সহজে স্বীকার করে নিলেই ভালো করতেন। করলেন না যখন, তখন জোর করেই আমাদের আতিথেয়তা প্রদর্শন করতে হবে। … সিপাহী বন্দী করো এই দূতকে আর কারাগারে আবদ্ধ করো”।
অনন্য সেই কথা শুনে কেবলই হাসলেন। পিছন ফিরে না একবার তাকালেন, না কিছু বললেন। সিপাহীরা বিশাল বিশাল শিকল দ্বারা অনন্যকে বন্দী করতে গেলেন। কিন্তু সমস্ত সভা যা দেখলেন, তা দেখে তাজ্জব হয়ে গেলেন। শিকলের একটি অংশও অনন্যকে স্পর্শ করতে পারছে না যেন। যেন অনন্যের কনো অবয়বই নেই। বারংবার সেই একই প্রয়াস করতে থাকলেন সেনা।
সেই দেখে করিজ, দুরাধার, দুরাধারের ভ্রাতারা এবং অরি, তাঁরা সিপাহির হাত থেকে শিকল নিয়ে, স্বয়ং প্রয়াস করতে থাকলেন অনন্যকে আবদ্ধ করতে। কিন্তু অনন্য নিজের মৃদু ছন্দপূর্ণ গতিতে মৃদু হাসতে হাসতে, নিজের রথে উঠলেন, আর রথ চালিয়ে চলে গেলেন আহমি রাজ্যে। কেউ কিচ্ছু করতে পারলেন না, সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থ। হাফাতে হাফাতে অরি এসে বললেন, “চিন্তার কিচ্ছু নেই। অনন্য যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেনা”।
করিজ মাথা নেড়ে, হাফাতে হাফাতে বললেন, “ভাগ্যিস অংশ নিচ্ছেনা। নাহলে আমাদের যুদ্ধজয় অসম্ভব ছিল”।
অন্যদিকে সমস্ত কথা এসে যখন সম্রাটকে বলেন অনন্য, তখন সকলে হুংকার করে গর্জন করে ওঠেন, যুদ্ধ করার জন্য। গুণ হতাশ হয়ে যায় সমস্ত কিছুর মধ্যেও, কারণ অনন্য যুদ্ধে ভাগ নেবেনা। অনন্য তাঁর কাছে গিয়ে বলেন, “যুদ্ধে ভাগ নেবেন না যিনি, তিনি হলেন ভদ্র। আমি সম্যক যুদ্ধ করতে পারবো না, এমন তাঁদের শর্ত। আর সেই শর্তের উত্তর এই হবে আমার তরফ থেকে যে আমি এই যুদ্ধে গুণের সারথি হয়ে ভাগ নেব”।
গুণ সেই কথা শুনে হাস্যবেশে বললেন, “আর কিচ্ছু চাইনা সখা। তোমাকে ছাড়া এই মহাযুদ্ধ আমি করতে সক্ষম কিনা জানিনা, কিন্তু অরাজি আমি অবশ্যই। যেই যুদ্ধ ইতিহাসের পাতায় পাতায় লিখিত থাকবে, তাতে তোমার নাম থাকবে না, আমার এই প্রস্তাব মঞ্জুর নয়। হ্যাঁ তুমি যুদ্ধে সম্যক অংশ নেবেনা ঠিকই, কিন্তু আমার বিশ্বাস যে এই যুদ্ধে আমারা সকলে নায়ক হলেও, মহানায়ক হবে তুমি সখা”।
বল সম্মুখে এসে বললেন, “রণকৌশল কি হবে অনন্য?”
অনন্য বললেন, “রণকৌশল এই হবে যে, তুমি একাকী দুরাধার ও তাঁর সাত ভ্রাতাকে সামলাবে। আমি ও গুণ একরথে সামলাবো মহবীরদের, অর্থাৎ ধার, দ্রথ, করি, করিজ, করি এবং মুণ্ডকে। অগ্নি ও বারি সম্রাটের রথের দক্ষিণ চাকাকে পূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করে, এবং মহারাজ দ্রাবিড় আপনি বাম চাকাকে সুরক্ষিত করে, সমস্ত সেনা নিয়ে নাশ করবেন সমস্ত সেনার। আর বিত্ত ও ক্ষেত্র তোমরা আহমি সেনা এবং আমার সেনার নেতৃত্ব করে, সকল ৫ ভ্রাতাকে নিয়ে, এবং আমার পুত্রদ্বয় অরিঞ্জয় এবং মৃত্যুঞ্জয়কে নেতৃত্ব প্রদান করে বিনাশ করবে সমস্ত অরুকুলের পুত্রদের অর্থাৎ রথীদের। আর অন্তে রাজা বিস্ময়, আপনি অজিত ও সুজিতকে একত্রিত করে কিড়মিড়ের সম্মুখীন হবেন। বাকি স্ত্রীদের সুরক্ষার ভার রইল শর্মিষ্ঠা ও বিশাখার কাছে। যদিও অনন্যা আর ভদ্রার সম্মুখীন হবার সামর্থ্য কারুর নেই। তাই স্ত্রীমহলকে নিয়ে চিন্তার কনো কারণ নেই”।
সম্রাট সেবা সম্মুখে এসে বললেন, “বেশ, তাহলে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করা হোক। আমরা দ্রাবিড় রাজ্যে সকল রথী, অধিরথ ও মহারথীরা একত্রিত হবো সমস্ত সেনা নিয়ে”।
সকলে সেই কথাতে সহমত হলে, দেখতে দেখতে, সেনাকে দুই শিবিরই প্রস্তুত করতে করতে এসে যায় তিন মাস পরের পূর্ণিমা। আর সেই পূর্ণিমার রাত্রেই সুধাশিবির তাঁবু ফেলল রেবাতীরে, অরুঞ্চলে। মধ্যরাতে সেই স্থানের থেকেই ৩ শত যোজন দূরে তাঁবু ফেলল অরুকুল। আর পরবর্তী প্রভাতে শুরু হলো সেই মহারন, যার নাম অরুস্থল।
যুদ্ধের শুরুতে যখন দুই প্রান্তে, মাঝে এক শত যোজন স্থান ছেড়ে রেখে মালারূপে দুই পক্ষের সেনা স্থিত রইল, মুক্তহস্তে সেবা পদচারণ করে এগিয়ে গেলেন অরুপক্ষে। দুরাধার তাঁকে বন্দী করতে এগিয়ে গেলে, করি ও ধার বললেন, “ছল করার প্রয়াসও করো না দুরাধার। অনন্যকে দেখো। সে গুণের সারথি হয়ে অবস্থান করছে। লেশ মাত্র ছল করলেও, সে সমস্ত শর্ত ভুলে গিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নেবে। আর যেই যুদ্ধে কনো পক্ষ থেকে গুণ ও অনন্য একত্রে যুদ্ধ করে, সেই পক্ষকে পরাজিত করার সামর্থ্য কারুর নেই। সেবা মুক্ত হস্তে আসছে, অর্থাৎ কিছু কথা বলতে আসছে। আসতে দাও তাকে”।
সেবা সকলের সম্মুখে এসে, করজোড়ে বললেন, “মহামান্য মহারথীগণ, রথীগণ ও অধিরথগণ, সেবার প্রণাম স্বীকার করবেন। আপনারা সকলেই আমাদের কনো না কনো ভাবে সম্বন্ধী। যদি সমস্ত সম্বন্ধও ভুলে যাই, তাও একটি সম্বন্ধ ভুলে যাওয়া সম্ভবই নয়, আর তা এই যে আমরা সকলে জগন্মাতার সন্তান, অর্থাৎ সকলে সকলের ভ্রাতা। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে, একই মাতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও, মায়ের কিছু সন্তান বাকি সন্তানদের পীড়িত করতে, নিপীড়ন করতে, এবং দাস রূপে পরিণত করতে উদ্যত। তাই মাতার অন্য কিছু সন্তান আজ বাধ্য হয়েছে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে, এবং নিপীড়নকারীদের থেকে মায়ের বাকি সন্তানদের রক্ষা করতে”।
“যদিও দেহ মিথ্যা, তাও সেই মিথ্যা ভ্রমমাত্র দেহের সম্মানীয় কিছু ব্যক্তিও সেই বিপরীত পক্ষে আজ উপস্থিত ও রণে মত্ত হতেও প্রস্তুত। তাই এই সেবা, তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হয়েছে, তাঁদেরকে সম্মান জানিয়ে, তাঁদের সাথে যুদ্ধ করার অনুমতি গ্রহণ করতে। কৃপা করে, হে মান্যবর অরুশ্রেষ্ঠ মুণ্ড, গুরুদেব করি, এবং মাতুল ধার, আমাদের যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করে, আপনাদের উপর অস্ত্রাঘাত করার জন্য অনুমোদন প্রদান করবেন”।
মুণ্ড করি ও ধারের মুখের দিকে দেখে, গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “করি, মুণ্ড ও ধার একাকীই অজেয়। আজ তাদেরকে তোমরা বাধ্য করেছ একত্রিত ভাবে রণক্ষেত্রে অবস্থান করতে। এই যুদ্ধে তোমাদের পরাজয় ও বিনাশ, দুইই নিশ্চিত। তা জেনেও, এই যুদ্ধে কেন অংশ নিচ্ছ মূর্খের মত?”
মাথানত করেই সেবা বললেন, “মাতার অন্য সমস্ত সন্তানের নিপীড়নের প্রতিবাদ আমাদের করতেই হবে। যদি সেই প্রতিবাদ করার জন্য আমাদের পরাজিত ও মৃত্যুও লাভ করতে হয়, তাও আমাদের কাছে মঞ্জুর। কিন্তু তাঁদের উপর অন্যায়, নিপীড়ন এবং অত্যাচার অবিচার দেখার পরও যদি আমরা যুদ্ধ না করে নিশ্চুপ থাকি, তা মাতার প্রতি, মাতার মমতার প্রতি করা সন্তানের অধর্ম হবে। এক সন্তান তাঁর মাতার সাথে কখনো অধর্ম করতে পারেনা। যদি তেমন করার জন্য মৃত্যুও আসে, তাও মাতার নাম হৃদয়ে, জীবনে ও ওষ্ঠে ধারণ করে মৃত্যু লাভ করে, মাতৃঋণের মান রাখবো। এই আমাদের ধর্ম। আর সেই ধর্ম পালন করার কারণেই, যেমন আপনারা বললেন, নিশ্চিত মৃত্যু ও পরাজয় জেনেও মূর্খের মত যুদ্ধ করতে এসেছি, তেমন কর্ম করছি আমরা”।
মুণ্ড এবার বিকৃত হাসি হেসে বললেন, “বেশ, তাহলে ফিরে যাও নিজের শিবিরে আর যুদ্ধ করো। পরাজয় ও বিনাশ নিশ্চিত জেনেও, যখন যুদ্ধ করতে প্রস্তুত, তখন বীরের মত মৃত্যু লাভ করো। আমরা কেবল দিবসেই যুদ্ধ করবো। সূর্যাস্ত হয়ে গেলে, আমরা যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করবো। এবং পুনরায় পরবর্তী দিবসে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে যুদ্ধ শুরু করবো। যাও যুদ্ধের অনুমতি দিলাম তোমাদেরকে”।
সেবা হাস্যমুখে পুনরায় প্রণাম জানিয়ে নিজের রথে ফিরে গেলেন। আর দুরাধার সেনাকে, রথীদের, এবং মহারথীদের আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। আর সুধাশিবির নিজেদের যোজনা মতই যুদ্ধে ভাগ নিলেন। অজেয় মুণ্ডের কাছেই প্রথম অনন্য রথ নিয়ে এসে স্থাপন করলেন গুণের, তো গুণ প্রথম বাণ নিক্ষেপ করলেন মুণ্ডের চরণে। মুণ্ডকে এই ভাবে প্রণাম করলে, মুণ্ড আশীর্বাদ রূপে মৃত্যু প্রদান করতে আগ্রহী হলেন গুণকে।
আর সেই উদ্দেশ্যে কোকিলা বাণ নিক্ষেপ করতে গেলে, কেবলমাত্র শ্রীধনুশের টঙ্কারেই কোকিলাবাণকে নিষ্ক্রিয় করে দিলেন গুণ। সামান্য বাণ নিক্ষেপ করে বিরক্ত করা শুরু করলেন এরপর গুণ। প্রচণ্ড গতি তাঁর দুই বাহুতে। আর তার সাথেই প্রবল বল। বৃষ্টির মত তীব্রতায় আর বজ্রপাতের মতি গতির সাথে ছুটে আসা গুণের সমস্ত বাণ অতিষ্ঠ করে তুলল মুণ্ডকে।
করি মুণ্ডের এই অবস্থা দেখে, সেনাক্ষয় স্তব্ধ করে, মুণ্ডের সহায়তা করতে আসলে, গুণের সেই প্রকাণ্ড শ্রীধনুশের তাণ্ডবেই রথকে স্থির করে রাখা অসম্ভব কৌশলী সারথি রূপে অবস্থা করা অনন্য বললেন, “গুণ, ক্রীড়া বন্ধ করো, মুণ্ড ও করি একত্রিত হয়ে গেলে, যুদ্ধকরা অসম্ভব হয়ে যাবে। মোক্ষমবাণ নিক্ষেপ করে মুণ্ডের বিনাশ করো গুণ”।
সেই নির্দেশ মেনে, গুণ নিজের শ্রিধনুশে এবার স্থাপন করলেন মহা মহা প্রাণান্ত বাণ। মুণ্ড লক্ষও করতে পারেনি যে, সামান্য বাণের মধ্যে কখন অনন্য একটি মোক্ষম বাণ স্থাপন করে তা নিক্ষেপ করে দিয়েছে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করলো তা, তখন আর তার কিচ্ছু করার নেই, কারণ প্রাণান্ত বাণ তখন মুণ্ডের বক্ষে স্থাপিত হয়ে গিয়ে, মুণ্ডের দেহের সমস্ত বলকে হনন করে, তাঁর সম্পূর্ণ প্রাণকে শোষণ করা শুরু করে দিয়েছে।
মুণ্ডের এমন ও এতো শীঘ্র পতনের কথা কেউ কখনো ভাবতেও পারেনি। তাই করি ও ধার উভয়েই দ্রুততার সাথে গুণের সম্মুখে এসে গুণকে বাণদ্বারা ব্যস্ত করা শুরু করলো, যাতে সেই কালে মুণ্ডকে শিবিরে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে শুশ্রূষা করা সম্ভব হয়। কিন্তু গুণকে পরাস্ত করা অতো সহজ নয়। প্রথম কারণ হলো গুণের প্রবল গতি, আর দ্বিতীয় কারণ গুণের প্রকাণ্ড বল আর সেই বলকে শতগুণে শক্তিশালী করে তোলা শ্রীধনুশ।
জেরবার করে দিলো গুণ বাণের প্রবাহে, একত্রে করি ও ধারকে। যেই কালে করি ও ধার একত্রে পঞ্চবাণ নিক্ষেপ করছে, সেই একই সময়ের মধ্যে গুণ তাঁদের উদ্দেশ্যে ১০টি বাণ নিক্ষেপ করে দিচ্ছে। আর এই ভাবে, সূর্যাস্তের পূর্বেই করি ও ধারকে অস্ত্রশূন্য করে দেয় গুণ। কিন্তু ঠিক তারপরেই বেজে যায় প্রথম দিবসের যুদ্ধের অবসানের শঙ্খনিনাদ। তাই সেইদিনের জন্য করি ও ধার উভয়েই বেঁচে গেলেন, তবে অত্যন্ত বিশ্রী ভাবে তাঁরা ঘায়েল হয়েছিলেন।
সেই একই দিনের যুদ্ধে, ভয়ানক হয়ে উঠেছিল বল। আর সে বারংবার রথ ছেড়ে ভূমিতে নেমে আসে। আর নেমে এসে, সে দ্রথের রথ ভেঙে তাঁকে রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করতে বাধ্য করে। একই সাথে সে করিজের সারথিকেও হত্যা করে দেয় কালহরা গদার একটি আঘাতে। করিজ আক্রমণ করলে, করিজের গদাকেও মাত্র পঞ্চম আঘাতে চূর্ণ করে দেয়, আর করিজের বাম হস্তের অস্থিকে চুরমার করে দেয় গদার আঘাতে। সেই দেখে অরি করিজকে নিজের রথে তুলে নিয়ে বাণের আঘাত দ্বারা বলকে প্রতিহত করে, সেখানে থেকে শিবিরের দিকে চলে গেলে, সম্মুখে আসে দুরা মেধা ও দুরাভাব।
বলের গদার সম্মুখে পরে, তারা উভয়ে অর্ধেক প্রহরও যুদ্ধে টিকে থাকতে পারেনা। দুইজনই প্রাণ হারান। অন্যদিকে, বিত্ত ও ক্ষেত্রও দুরাধারের ভ্রাতাদের ১৬ পুত্রের মধ্যে ৬ পুত্রের হত্যা করে দেন প্রথম দিনেই। শেষে অরিপুত্র অস্থির আর করিজ পুত্র সুরঞ্জন বাকিদেরকে রক্ষা করতে গেলে, সুরঞ্জনকে মৃত্যুঞ্জয়ের হাতে নিহত হতে হয়, এবং অস্থিরকে হত্যা করে দেন অরিঞ্জয়। কিড়মিড়ের নাশ না করতে পারলেও, তার প্রায় সমস্ত সেনারই নাশ করে দেয় বিস্ময় ও তাঁর দুই ভ্রাতা। আর অন্যদিকে শিবিরে ফিরে গিয়ে সকলে জানেন যে মুণ্ড দেহত্যাগ করে দিয়েছেন।
অর্থাৎ প্রথম দিনের যুদ্ধতেই মহামারিরূপ ধারণ করে যায় অরুকুল, সুধাকুলের প্রকাণ্ড আঘাতের ফলে। ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সকলে সেই কারণে, আর আহত করি ও ধারকে শিবিরে রেখে, সকলে দ্বিতীয়দিনের যুদ্ধে বীর ভাবে অংশ গ্রহণ করতে যায়। কিন্তু বীরত্ব প্রদর্শন আর বীরের মধ্যে ভেদ আছে। অরি সরাসরি কোকিলা অস্ত্র নিক্ষেপ করে গুণের উদ্দেশ্যে। এবং সমানে কোকিলা অস্ত্র নিক্ষেপ করতেই থাকে।
সেই দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়ে অনন্য বলেন গুণকে, “সখা, কালশূন্য বাণ নিক্ষেপ করো একে। অন্যদিক থেকে করিজ আসছে আক্রমণ করতে। নিশ্চিত ভাবে সে রমনাস্ত্র নিক্ষেপ করবে। রমনাস্ত্রের ভাঁড়ার রয়েছে তার। তাই কোকিলাস্ত্র আর রমনাস্ত্রের একত্রিত আক্রমণ নিতে পারবেনা। নাশ করো অরি আর অরির অহংকারের। কালান্ত করে দাও তার।
সেই কথা শুনে গুণ কিছুক্ষণ সময় নেয় সেই মোক্ষম কালশূন্য অস্ত্রকে সন্ধান করার জন্য। আর সেই সময়কালে তিনতিনটি কোকিলাস্ত্রকে ভক্ষণ করে নেয় অনন্য। সেই অদ্ভুত কীর্তি দেখে চমৎকৃত হয়ে যায় করিজ আর অরি উভয়েই। আর সেই বিস্ময়ের কালেই, কালশূন্য বাণ নিক্ষেপ করে দেয় গুণ অরির ছাতিতে। অরির কালচক্র সমাপ্ত হয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে। যেন সে কালের গতির বাইরে নিক্ষিপ্ত। বেশ কিছুক্ষণ হাঁসফাঁস করে সে, করিজ তাঁকে সহায়তা করতে এগিয়ে যায়। আক্রমণ করতে আসে সেই সময়ে বেশ কিছু সেনা। গুণ সেই অল্প সময়ের মধ্যে সহস্র সেনার নিধন করে দেয় সামান্য বাণের মাধ্যমেই।
করিজ অরিকে বাঁচাতে পারলেন না। কিন্তু অরিকে বাঁচাতে না পেরে, সে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে, রমনাস্ত্র দ্বারা আক্রমণ করলেন গুণকে। গুণ নিজের শ্রীধনুশে মহাশূন্য বাণ স্থাপন করলেন, কিন্তু অনন্য বললেন, “দাঁড়িয়ে যাও গুণ। একটি রমনাস্ত্রকে ক্ষেপণ হতে দাও ভূমিতে। মানুষও তো জানুক কি আছে এই রমনাস্ত্রে। তুমি নাগাশূন্য বাণ নিক্ষেপ করে রমনাস্ত্রের দিশাকে জালিমার দিকে করে দাও, আর গতি প্রদান করে দাও, যাতে তা বহু দূরে ক্ষেপণ করে ভূমিতে”।
গুণ প্রশ্ন করলেন, “কি এমন আছে এই রমনাস্ত্রে সখা?”
অনন্য উত্তরে বললেন, “উত্তর তুমি নিজেই পেয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যে। যেমন বললাম তেমন করো”।
গুণ তেমনই করলেন যেমন অনন্য বললেন। রমনাস্ত্রের দিশাকে জালিমার দিকে করে তীব্র গতি প্রদান করে দিলে, তা সাগরকে ক্ষেপণ করে। আর তারপর যা হয়, তাতে সকলে তটস্থ হয়ে যায়। ৩০০ যোজন ঊর্ধ্বে উৎক্ষেপিত হয় সাগরের বারিধারা। আর তার সাথে মিশে থাকে ভয়ানক ধুয়া যা একটি ছত্রকের আকার ধারণ করে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও সেই বারিধারাকে মুহূর্তের মধ্যে ভূপৃষ্ঠে টেনে আনতে পারেনা। প্রায় এক প্রহর সেই জল ও ধূম্রের স্রোত গগনে বিদ্যমান থাকে। আর তারপর যখন তা ভূমিতে পতিত হয়, তখন সমস্ত পৃথিবীর সমুদ্রধারা উত্তাল হয়ে উঠে, প্রায় চারভাগের এক শতাংশ ভূমিকে গ্রাস করে নেয় মুহূর্তের মধ্যে।
সেই আগ্রাসন অতীব ভয়ানক। না মনুষ্য আর না কনো জীব সেই আগ্রাসন থেকে মুক্ত হতে পারলো। আগ্রাসিত ভূমির সমস্ত কিছুকে গ্রাস করে তা সাগরের গহনে টেনে নিয়ে চলে গেল রমনাস্ত্র। এই ভয়াবহতা দেখে, গুণ প্রশ্ন করলো, “সখা, তুমি এর ভয়াবহতা জানতে! তারপরেও তাকে ভূমিতে নিক্ষিপ্ত হতে কেন দিলে?”
অনন্য উত্তরে মৃদু হেসে বললেন, “সখা, কেবল মুখে কিছুকে অহিতকর বললে, কারুকে অহিতকর বললে তা প্রমাণিত হয়ে যায় না। রমনাথ বা রমনাস্ত্র যে কতটা অহিতকর জগৎসংসারের জন্য, তার প্রমাণ রাখা আবশ্যক ছিল। এরপর আর কেউ রমনাথের উপর বা রমনাস্ত্রের উপর ভরসা করবেনা। সখা, যুদ্ধ কেবল শত্রুর নাশ করলেই হয়ে যায়না। শত্রুর থেকেও শত্রুর মনোভাব অধিক ভয়ংকর হয়। শত্রু তো একটি সামান্য জীব, কিন্তু তাঁর মনোভাব সহস্র সহস্র জীবকে প্রভাবিত করে তাঁরই প্রতিচ্ছবি করে তোলে”।
“এই ক্ষেপণাস্ত্রকে নিক্ষিপ্ত করতে এই কারণেই বলেছিলাম কারণ এই ক্ষেপণের ফলে রমনাথের প্রকৃত চরিত্র সকলের সামনে এসে গেল। সে যে কতটা অহিতকর তা সকলের সম্মুখে এসে গেল। সে যে মানবতার বিরোধী, প্রকৃতি বিরোধী, আর জনজীবনের বিরোধী, সেই মানসিকতাকে সকলের সামনে রেখে দেওয়া হলো। বিশ্বাস করো সখা, এই আঘাতের ফলে, একটি প্রজাতির জন্ম হবে, যারা রমনাথকে একচক্ষু শয়তান বলে চিহ্নিত করবে, এবং প্রকৃতিকে খুদা জ্ঞান করে তাঁর কাছে শরণাগত হবে। আর এই জাতির জন্মই হবে মনুষ্যত্বকে মিথ্যার সাগরে ডুবে যাওয়ার থেকে প্রতিরোধ”।
গুণ হাস্যমুখে বললেন, “সখা, তোমার কীর্তি বড়ই অদ্ভুত। দেখে তো তা সামান্যই মনে হয়, কিন্তু সেই সামান্যের মধ্যে এক অসামান্য দূরদর্শীতা লুকিয়ে থাকে”।
অনন্য বললেন, “সখা, এটা রণক্ষেত্র। এখানে বার্তালাপ করার অবকাশ নেই। রমনাস্ত্রের পর্দাফাঁস হতে, করি জেগে উঠেছে আবার। আর করিজ রমনাস্ত্রের ভয়াবহতা দেখে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে পুনরায় তোমার দিকে রমনাস্ত্র ক্ষেপণ করবে। এবার মহাশূন্য বাণ নিক্ষেপ করে রমনাস্ত্রকে ভক্ষণ করে, করিজকেও সেই একই মহাশূন্যের মধ্যে স্থাপিত করে, বিনাশ করো তার। এমন বিনাশ করো যেন, তাঁর মরদেহকে আর কেউ কনোদিনও সন্ধান না করতে পারে”।
অনন্য মহাসত্য বলেছিলেন। ধার ও করি যারা আসলে রমনাথ ও পিতাম্বরের মানবীয় প্রকাশ, তাঁরা করিজের দ্বারা রমনাস্ত্র নিক্ষেপের পর, রমনাথের প্রতি সকলের আস্থাকে নিয়েও যেমন সন্দিহান হয়ে পরলেন, তেমনই করিজের অস্তিত্ব নিয়ে। করি মানবীয় বন্ধনে রয়েছে, তাই সমস্ত মানবীয় আবেগ ও আসক্তি তাঁর মধ্যে প্রত্যক্ষ। পুত্রের বিনাশ সম্মুখে রয়েছে, এমন ধারণা করে হন্যে হয়ে রণক্ষেত্রে গমন করলেন। আর আবেগতাড়িত করির সুরক্ষার কথা চিন্তা করে, ধারও তাঁর পশ্চাৎগমন করলেন।
বল সেই কালে, দুরাধার ব্যতীত সমস্ত ধৃতপুত্রের নাশ করছিলেন। কিড়মিড়ের শিরচ্ছেদ করছিলেন তখন বিস্ময়। দ্রথ সেনাক্ষয় করছিলেন, আর সুধাপুত্রের পুত্ররা প্রায় সমস্ত দুরাদের আগামীপ্রজন্মের নাম জগত থেকে মুছে ফেলছিলেন। আকস্মিক ধার ও করির রণক্ষেত্রে প্রবেশে সকলেই চমকিত হয়ে যান। কিন্তু না গুণের কাছে আর না করিজের কাছে এই সমাচার ছিল। তাই করিজও যেমন পুনরায় রমনাস্ত্র ক্ষেপণ করলেন, তেমনই গুণ মহাশূন্য বাণ নিক্ষেপ করলেন।
মহাশূন্য বাণের সম্মুখে আগেও হয়েছেন দুরাগোষ্ঠী। কিন্তু অনন্য সেই অস্ত্রকে কেবলই শিক্ষাদানের জন্য ব্যবহার করেছিলেন। আঘাত করার উদ্দেশ্যে নয়। তাই মহাশূন্য বাণের সামর্থ্য জেনেও, তার বিশালতা সম্বন্ধে কারুরই ধারণা ছিলনা। সকলে শঙ্কিত হয়ে গেলেন এই ভেবে যে এই দুই প্রকাণ্ড শক্তি, মহাশূন্য ও রমনাস্ত্র একসাথে যখন মুখোমুখি হবে, তখন কি হবে ভূভারতে!
অনেকে অনেক প্রকার শঙ্কা করেছিলেন। কেউ কেউ এমনও ভেবে নিয়েছিলেন যে এই অন্তিম শ্বাস নেবার সময় এই ভূখণ্ডে। তাই ফুসফুস পূর্ণ করে শ্বাস নিলেন। কিন্তু যখন এই দুই শক্তি একে অপরের সম্মুখীন হলো, তখন যা হলো তা সকলের কাছে এক অত্যাশ্চর্যকর সত্যকে উন্মোচিত করলো। মহাশূন্য সম্পূর্ণ রমনাস্ত্রকে এবং রমনাস্ত্রক্ষেপক করিজকে ভক্ষণ করে নিলো। কিছু সময়ের জন্য সমস্ত জগতে যেন অন্ধকার ছেয়ে গেল। কেউ যেন নিজের নিজের অস্তিত্বকেও অনুভব করতে পারলেন না।
আর যখন পারলেন তখন না রয়েছে রমনাস্ত্র, না রয়েছে করিজ, তার রথ বা তার অস্তিত্বের কনো প্রমাণ। করি উন্মত্তের মত নিজের পুত্রকে সন্ধান করে যখন পেলেন না, তখন উন্মাদবৎ হয়ে গিয়ে সরাসরি অনন্যকে এসে আক্রমণ করলেন মুক্তহস্তে। গুণ গর্জন করে উঠলেন, “গুরুদেব, আপনি এমন অধর্ম করতে পারেন না! সারথিকে আক্রমণ করা কোন যুদ্ধনীতির অন্তর্গত!”
দুরাধার ব্যতীত সকল তাঁর সাত ভ্রাতার নাশ করে আসা বল, ধারের সমস্ত সেনার নাশ করে আসা বারি ও অগ্নি, কিরমিরের নাশ করে আসা বিস্ময় সকলে একই ভাষ্যে কথা বললে, দুরাধার গর্জন করে উঠলেন, “রণক্ষেত্রে একটিই নীতির পালন করা হয়, শত্রুর নাশ। তা যেই ভাবেই হোক। এই কথাও জানো না মূর্খ গুণ!”
অনন্য এবার চটুল ভাবে বললেন, “বেশ, আমি নিয়ম ভঙ্গ করবো না। তুমি আমার ভ্রাতা, ভদ্রকে শর্ত দিয়েছিলে যে আমি রণক্ষেত্রে অস্ত্র ধারণ করবো না। এখন আমি যদি অস্ত্র ধরি, তাহলে আমার ভ্রাতার অপমান করা হবে। তবে আমি নিশ্চুপও থাকবো না। মুক্তহস্তে আক্রমণ করেছে গুরুদেব করি, তাই আমিও মুক্তহস্তে, অস্ত্র না নিয়ে দমন করবো করির”।
ধার সেই কথাতে মৃদু হাসলেন কেবল আর মনে মনে বললেন, “অনন্য তুমি জানোও না, যার সাথে তুমি যুদ্ধ করতে যাচ্ছ, তিনি হলেন পরমেশ্বর স্বয়ং। স্বয়ং রমনাথ তিনি। আজ তোমার মৃত্যু নিশ্চিত”।
কিন্তু ধারের ধারণাও সম্পূর্ণ ভাবে ভ্রান্ত। সে ভুলে গেছিল যে, শক্তির পুত্র কখনো শক্তিহীন হতে পারেনা। শক্তির পুত্র শক্তিরই প্রতিচ্ছবি যে, তা প্রমাণ করে দিলো অনন্য। সত্য বলতে, করি অনন্যের আঘাতের সামনে একটিবারও দাঁড়াতে পারলেন না। অনন্যের একাকটি মোক্ষম পদাঘাত, মুষ্ট্যাঘাতে রক্তাক্ত হতে শুরু করলো করির দেহ। অন্তে যখন করির পরাজয় ও মৃত্যুকে নিশ্চিত করতে, করির মুণ্ডকে ভূমিতে স্থাপন করে রেখে, তাতে নিজের চরণ স্থাপন করে অনন্য, করির দেহ থেকে মুণ্ডকে পৃথক করতে উদ্যত হলো, তখন ধার ধনুর্বাণ তুলে নিয়ে দুধাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন নিরস্ত্র অনন্যের উদ্দেশ্যে।
গুণ তা দেখা মাত্রই, একটি বাণে দুধাস্ত্রকে নিরস্ত্র করতে যক্ষনাশী নিক্ষেপ করলেন। আর তার প্রভাবে, দুধাস্ত্র উত্তরে হিমপর্বতে আঘাত করতে, শুরু হয়ে যায় অসংখ্য অগ্নিসঞ্চার সেই অঞ্চলে। সমস্ত তুষার গলতে শুরু করে দেয় এবং সমস্ত পর্বততলদেশকে মুহূর্তের মধ্যে প্লাবিত করা শুরু করলো তা। আর তারই সাথে পর্বতের বনাঞ্চলে দাবানল লেগে যায়।
তা দেখে অগ্নি নিজের অস্ত্র নিক্ষেপ করে প্লাবনকে শোষণ করলেন তো বারি নিজের অস্ত্রকে নিক্ষেপ করে পর্বতে ভারীবর্ষণ করে দাবানলকে শান্ত করা শুরু করলেন। আর অন্যদিকে পুনরায় দুধাস্ত্র নিক্ষেপে তৎপর ধারের উদ্দেশ্যে এবার গুণ শ্রীধনুশ থেকে কালবেষ্টনী বাণ নিক্ষেপ করলে, সেই বাণ ধারকে সম্পূর্ণ ভাবে বেষ্টন করে নিয়ে, এমনই ভয়ানক চাপ দিতে শুরু করলো যে তাঁর হাত থেকে ধনুশ ভূমিতে পরে গেল, আর তার সমস্ত দেহ থেকে লহুপাত হওয়া শুরু করলো।
সেই দৃশ্য দেখে দ্রথ, ধারের পুত্র প্রতিহিংসা পূর্ণ হয়ে গুণের পুত্র বিত্ত ও ক্ষেত্রকে পীঠে ছুরিকা আঘাত করে মৃত্যু দিলে, মৃত্যুঞ্জয় নিজের তরবারি দ্বারা সরাসরি দ্রথের মুণ্ডছেদ করে দিলেন। অনন্য করির মুণ্ডকে ভূমিতে রেখেই, তাঁর দেহকে মুণ্ডের থেকে পৃথক করে শূন্যে ছুড়ে দিলেন আর তা একমাত্র জীবিত মহারথী দুরাধারের সম্মুখে এসে পতিত হলো।
ভয়ার্ত হলেন দুরাধার। সকলে তাঁকে চারিদিক থেকে বেষ্টন করে ফেলেছেন। একাকী তিনিই অবস্থান করছেন রণক্ষেত্রে। তাই নিজের দেহের ভার বৃদ্ধি করা শুরু করলেন দুরাধার। ক্রমশ তার দেহ ভূমির তলে চলে যাওয়া শুরু করলে, বল সেই দৃশ্য দেখে, সরাসরি ভূমিতে নিজের কালহারা গদাদ্বারা আঘাত করলে, দুরাধারের দেহ ধনুশ থেকে শর নিক্ষেপ করার মত করে ভূমি থেকে শূন্যে উঠে এসে ভূমিতে পুনরায় পতিত হলো।
আহত দুরাধার বললেন, “মৃত্যু যাত্রীর শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করো বল। মুক্ত হস্তে লড়াই করো আমার সাথে”।
বল মুখে কথা না বলে সরাসরি একটি উড়ন্ত চাকির মত নিজের দেহকে প্রবল বেগ প্রদান করে নিক্ষেপ করলেন দুরাধারের উদ্দেশ্যে। দুরাধারের কেবল দেহটিই পরে রইল রণক্ষেত্রে, তাঁর মুণ্ড আর তাঁর দেহের উপরে স্থাপিত থাকলো না! অতঃপরে, নিজের প্রতিশ্রুতি রেখে সেই মুণ্ডকে সমস্ত রণক্ষেত্রে পদাঘাত করে ক্রীড়া করলেন বেশ কিছুক্ষণ বল। অতঃপরে মুণ্ডবিহীন দুরাধারের শবদেহের ছাতিতে বসে তাঁর বক্ষদেশ চিড়তে গেলে, অনন্য বললেন, “ভ্রাতা, অকারণ হিংসা বীরকে শোভা পায়না। বীরকে জগত বিশ্বাস করে নিজের রক্ষক হিসাবে”।
অনন্যের কথাতে বল দুরাধারের দেহকে ত্যাগ করে চলে এলেন। সম্রাটের বেশে স্থাপিত হলেন সেবা, আর বহুকাল শাসন করলেন। অনন্যাকে কোকিলার কাছে যেতে হয়, সেবার দেওয়া বচনের কারণে। আর অনন্যাকে, নিজের মাতা শ্বেতাকে হারানোর কারণে ব্যথিত অনন্য ধ্যানসনে নিজের দেহ ত্যাগ করে, মৃষুর পরবর্তী কলা উন্মোচনকে সম্পন্ন করলেন।
