পরিচালক | রোম্যান্টিক উপন্যাস

শর্মিষ্ঠা খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে রাজুকে দেখতে থাকলো। তারপর সম্পূর্ণ ভাবে অপ্রত্যাশিত আচরনটাই করলো। মানে রাজুর কথা অনুযায়ী শর্মিষ্ঠা সচারচর সেই আচরণটাই করে যেটা অপ্রত্যাশিত, আর এক্ষেত্রেও তাই হলো। এই ক্ষেত্রে সেটা হলো, শর্মিষ্ঠা প্রাণপণে আলিঙ্গন করলো রাজুকে। প্রথমটা রাজু অপ্রস্তুতই হয়ে যায়। সঙ্গমের ইচ্ছা তার সেই সময়ে একদমই ছিলনা, তাই একটু ইতস্ততও করে। কিন্তু কিছুমুহূর্তের পর রাজু একটা মিষ্টি হাসি দেয়, কারণ শর্মিষ্ঠার সেই সময়ের আলিঙ্গনের মধ্যে ছিল শুধুই সমর্পণ।

অর্থাৎ শর্মিষ্ঠার আলিঙ্গনের মধ্যে না ছিল কামনা, আর না ছিল কামনার আভাস। সেই আলিঙ্গনে ছিল অর্ধাঙ্গিনী ভাব। সত্যি বলতে শর্মিষ্ঠা সেদিনই অর্ধাঙ্গিনীর অর্থ বুঝে ছিল। সে বুঝেছিল যে অর্ধাঙ্গিনী মানে, নিজের অস্তিত্বকে অপূর্ণ মনে করা নিজের অর্ধাঙ্গকে ছাড়া। আর তাই অর্ধাঙ্গিনী যখন তার অর্ধাঙ্গকে আলিঙ্গন করে, তখন তার আর কনো বোধ বা সচেতনতার প্রয়োজন হয়না যে তার কোন অঙ্গ তার অর্ধাঙ্গকে স্পর্শ করলো আর কোন অঙ্গ স্পর্শ করলো না।

তার আলিঙ্গনের মধ্যে থাকে একটা ধন্যবাদ। ধন্যবাদ অর্ধাঙ্গ হবার জন্য, ধন্যবাদ সমস্ত পরাধীনতার ছেদন করার জন্য, ধন্যবাদ আনন্দে মুখরিত করার জন্য। রাজুও শর্মিষ্ঠার আলিঙ্গনে সেই গুপ্ত কথা বুঝে গেছিল বোধ করা যায়। তাই মিষ্টি হাসি ছাড়া আর কিছুই দেয়নি সেদিন।

আপ্লুত শর্মিষ্ঠা রাজুর কাঁধ থেকে নিজেকে তুলে নিয়ে এবার বলল, “এমন অদ্ভুত রাজকাহিনী আমি কখনো দেখিনি কনো সিনেমার পর্দায়। শুনে মনে হচ্ছিল যেন দয়ানন্দের উত্থান-পতনকে কেন্দ্র করে চাণক্য-চন্দ্রগুপ্তের ছলনা ও কপটতার গুপ্ত ইতিহাসের বিবরণ শুনছিলাম, আর সেই ভালোমানুষির মুখোসের আড়ালে থাকা অভদ্রতা, অসভ্যতা আর পরাধীনতার শিকলকে সনাক্ত করে তাকে ছিন্ন করছে সম্রাট অশোক।

সমস্ত কথা যেন সেই সময়েরই কথা, অথচ যা আমরা ইতিহাসে পড়েছি সেই সম্বন্ধে, এই কথা তার থেকে ভিন্ন। যেন যা শুনেছি, তার মধ্যে রয়েছে প্রচুর জল, প্রচুর ভেজাল, প্রচুর রাজনৈতিক স্বার্থ, সাম্প্রদায়িক স্বার্থ চরিতার্থ করার দুর্গন্ধ, আর সেই দুর্গন্ধকে কাটিয়ে স্বচ্ছ ইতিহাসকে, অন্ধকারে রাখা ইতিহাসকে সামনে আনা হচ্ছে। রাজু, অসাধারণ একটা গল্প দিলে তুমি। এবার আমাদের কাজ হলো এই গল্পকে অসাধারণ ভাবে চিত্রায়ন করা।

ছলকে এমন ভাবে দেখাতে হবে যেন দর্শকের দাঁত কিড়মিড়িয়ে ওঠে রাগে। নির্বুদ্ধিতাকে এমন করে দেখাতে হবে যেন পাবলিক আশেপাশে কে রয়েছে না দেখে গালাগালি দিয়ে ওঠে। ফাঁসানোকে এমন ভাবে দেখাতে হবে যাতে দর্শক অপমানের লাঞ্ছনে জ্বলে ওঠে। হ্যাঁ রাজু, এই চলচ্চিত্রের পরিচালনা বেশ কঠিন হবে, বুঝতে পারছি। এক ভিন দেশের সেনা এসে চাবুক মেরে পরাধীন করে গেল কনো গোষ্ঠীকে, এটা দেখানো অনেক সহজ, কিন্তু এখানে আমাদের অন্য ভাবে পরাধীনতা বোঝাতে হবে।

কনো চাবুক থাকবেনা, কনো যুদ্ধ থাকবেনা, থাকবে খালি খল আর ছল, আর সেই দিয়ে লোকহিত করা হচ্ছে, এমন ভাব প্রদর্শন করে পরাধীনতার হাতকড়া পরানো হবে মানুষকে। বিচিত্র এই পরাধীনতার মায়াজাল, আর তাই পিকচারাইজেশন সহজ হবেনা। আর সেই পরাধীনতার হাতকড়া এমন হবে যে কেউ বুঝতে বা মানতেই চাইবেনা যে তারা পরাধীন হয়ে গেছে।

আর ঠিক সেই সময়ে আমাদের হিরো এসে উপস্থিত হবে। সে বুঝতে পারে যে পরাধীনতার হাতকড়াতে সমস্ত প্রজা বন্দী, কিন্তু প্রজা সেই পরাধীনতা বুঝতেই পারছেনা। তাই সে হাতে তুলে নেবে অস্ত্র। আনবে প্রকাণ্ড প্রহার। বীরবিক্রম। পরাধীনতার বিস্তার যারা করেছে বা করছে, তারা ভয়ে হয়ে যাবে তটস্থ, আর যারা পরাধীন তারা খেয়ে যাবে ভ্যাবাচ্যাকা।

কিচ্ছু বুঝতে পারবেনা তারা, কেন এই আক্রমণ, কেন এতো রক্তপাত! কেউ বলবে সিংহাসন চাই, তাই এই রক্তপাত। তো অন্যে বলবে, না না সিংহাসন চাইলে, সিংহাসনে যে বসে রয়েছে তাকে হত্যা করলেই তো হয়ে যায়, এতো হিংসা কেন! হিংসাই যদি করে, সেনার উপর হিংসা করবে। শোষণই যদি করতে হয়, সাধারণ শ্রমজীবীদের শোষণ করবে। কিন্তু এ তো সমাজচালকদের হত্যা করছে, বণিকদের হত্যা করছে, তথাকথিত সমাজচালকদের অনুগামী রাজঘরনার নাশ করছে।

কেন করছে সে এমন? কি চাই তার! ক্ষমতা! আধিপত্য! বীরত্ব জাহির করতে চায়! … না কিছুই তো চায়না সে, তাহলে এমন হত্যালীলা করছে কেন? যখন আমাদের দর্শকের মধ্যে এই সমস্ত প্রশ্ন জট পাকিয়ে যাবে, তখন শ্রমিকশ্রেণী দ্বারস্থ হবে আমাদের হিরোর, আর ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবে। দর্শক এতক্ষণে বুঝতে পারবে যে এই ঘাতকই হলো প্রকৃত হিরো, যে শ্রমিকের উপর করা সমাজচালকদের অত্যাচার, বণিকদের শোষণকে লণ্ডভণ্ড করে দিতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে হাতে”।

শর্মিষ্ঠা কথা বলার শেষে চুপ করে থাকে, যেন সে তার চোখের সামনে সিনেমাটা কল্পনেত্রে দেখছে। রাজুও চুপ করে শর্মিষ্ঠার দিকে তাকিয়ে থাকলো। যেন সে তার শর্মিষ্ঠাকে প্রকৃত পরিচালক হয়ে উঠতে দেখলো। আর প্রত্যক্ষে আটকে নেই শর্মিষ্ঠা। সে এবার কাহিনীর মর্মভেদ করছে। কাহিনীর মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে, লুকনো কথাকে আবিষ্কার করে আনছে। আর সেই লুকনো রহস্যকে প্রকাশ করার প্রয়াস করছে, সেই লুকনো রহস্যকে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করার উপায়ের সন্ধান করছে।

সেদিন আর তাদের দুজনের মধ্যে প্রায় কনো কথাই হয়না। আর শুধু সেদিন কেন। প্রায় পরের দুই বছর তাদের মধ্যে আর অন্য কনো বিষয়ে কথা হয়নি, অন্ধকার ইতিহাস ছাড়া। অক্লান্ত পরিশ্রমে শর্মিষ্ঠা ও রাজু, দুজনেই জরিয়ে পরে। প্রথম বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে অন্ধকার ইতিহাস প্রথম পর্বের রিলিজ করে তারা। ব্যাপক সারা জাগিয়ে দেয় সমস্ত দেশে। বিদেশেও পারি দেয় চলচ্চিত্র। বিদেশের মাটিতেও বেশ জনপ্রিয় হয়।

৫০ কোটি টাকার সিনেমা, কিন্তু উপার্জন হয় প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। আহ্লাদিত ও উৎসাহিত আহমেদ খান্না। শর্মিষ্ঠার খ্যাতি বিশ্বজুরে ছড়িয়ে পরে। দ্বিতীয় খণ্ডের জন্য ১৫০ কোটি বরাদ্দ করে আহমেদ। অসামান্য চিত্রনাট্যতার কারণে শর্মিষ্ঠা জগৎবিখ্যাত হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ আসতে শুরু করেছে শর্মিষ্ঠার। দিকে দিকে প্রশ্ন উঠে এসেছে, কবে আসছে তৃতীয় ও অন্তিম খণ্ড ডার্ক হিস্ট্রির। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও সেই একই চর্চা।

দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ৭০০ কোটি উপার্জন দিলো আহমেদকে। ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করলো সে তৃতীয় খণ্ডের জন্য। দুবছর লেগেছে সমস্ত পরিচালনার জন্য। অতঃপরে যখন তৃতীয় খণ্ড রিলিজ হলো, তখন দেশবিদেশে একটাই নাম, শর্মিষ্ঠা খান্না। অসামান্য পরিচালনা, অসামান্য কাহিনী, অসামান্য চিত্রনাট্য, অসামান্য নির্দেশনা। অস্কারে মনোনীত হলো, আর শুধু মনোনীত হয়েই থেমে থাকলো না, শ্রেষ্ঠ বিদেশী সিনেমার পুরস্কার পেলো ডার্ক হিস্ট্রি, আর শ্রেষ্ঠ মুভি সিরিজ হিসাবে অনেক অনেক স্থান থেকে পুরস্কার আসতে থাকলো।

ক্যামব্রিজ ইউনিভারসিটি ডিলিট উপাধি দিয়ে ভূষিত করলো শর্মিষ্ঠাকে। অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটি এমফিল উপাধি দিলো তাকে। দিকে দিকে তার চর্চা। আর এরই মধ্যে কান ফিল্ম ফেস্টিভালে নিমন্ত্রণ পেল শর্মিষ্ঠা। এতো পুরস্কারও তাকে উত্তেজিত করতে পারেনি, যতটা কান ফিল্ম ফেস্টিভালের নিমন্ত্রণ উৎসাহ প্রদান করে। গোল্ডেন পাম পুরস্কারে ভূষিত হলো ডার্ক হিস্ট্রি। শর্মিষ্ঠা পেলো শ্রেষ্ঠ নির্দেশনার পুরস্কার।

আজ সে উচ্ছ্বসিত। এই সমস্ত কিছুর কৃতিত্ব এক ও একমাত্র রাজুর আর আহমেদের তার উপর বিশ্বাসের। শর্মিষ্ঠা প্লেনে বসে, রাজুর পারফিউমের গন্ধকে বড্ড মিস করছিল। আজ তার মনপ্রান কনো বাঁধা মানতে নারাজ। সে আজ ফিরে গিয়ে রাজুর পারফিউমের গন্ধে নিজেকে জড়িয়ে নেবে। তেমন করার জন্য যদি কলঙ্কও লাগে, লাগুক। আজ সে বেপরোয়া।

সঙ্গমের ব্যকুলতা শর্মিষ্ঠার ৬ ঘণ্টার প্লেন সফরকে ছয় মিনিটে নামিয়ে আনলো যেন। যেন কল্পনার মধ্যেই তার সঙ্গম হচ্ছে রাজুর সাথে। অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো সে, কখন প্লেন কলকাতায় ল্যান্ড করবে, আর কখন সে সোনার হাতের তালু নিয়ে রাজুর কাছে গিয়ে তাকে প্রাণপণে জরিয়ে ধরে, রাজুকে নিজের মধুতে স্নান করাবে।

প্লেন ল্যান্ড করলো কলকাতা বিমানবন্দরে। আশার করেছিল শর্মিষ্ঠা যে আহমেদের সাথে সাথে রাজুও উপস্থিত থাকবে এয়ারপোর্টে। কিন্তু তেমনটা হলো না। আহমেদ আর বেশ কিছু সাংবাদিক ঘিরে ধরে রয়েছে শর্মিষ্ঠাকে। শর্মিষ্ঠা এদিক সেদিক উকি মারতে থাকলো। তার দুইচোখ রাজুকে খুঁজছে।

আহমেদ কাছে এসে বলল, “আমার ভাষা নেই শর্মি, আজ সন্ধ্যায় একটা পার্টি থ্রো করেছি। টলিপাড়ার সকল পরিচালকদের নিমন্ত্রণ করেছি। নাম দিয়েছি ডাইরেক্টরস্‌ পার্টি। শর্মিষ্ঠা মিষ্টি হেসে জরিয়ে ধরলো আহমেদকে, আর বলল, “আজ একজন বিশেষ অতিথিও থাকবে এই পার্টিতে। তুমি বাড়ি যাও আহমেদ। আমি সেই বিশেষ অতিথিকে নিমন্ত্রণ করে ফিরছি”।

আহমেদ খুশী খুশী চলে গেল। শর্মিষ্ঠা সরাসরি রাজুর ফ্ল্যাটের নিচে গাড়ি পারকিং করে, গেট দিয়ে ঢুকতে যাবে, অমনি সিকিউরিটি গার্ড বললেন, “স্যার অধিকারীর কাছে যাবেন তো ম্যাডাম!”

শর্মিষ্ঠা আজ বড়ই আহ্লাদী। সে হেসে বলল, “জানোই তো। তাহলে প্রশ্ন করছো কেন?”

সিকিউরিটি গার্ড বললেন, “আসলে স্যার নেই। দুদিন হয়েছে তিনি চলে গেছেন। … আমাকে ঘরের চাবিতা দিয়ে গেছেন আর আপনাকে সেটা দিতে বলে গেছেন। … এই নিন”।

শর্মিষ্ঠা এবার একটু মনঃক্ষুণ্ণ হলো। অনেক আশা করেছিল, আর আজকেই রাজু চলে গেল! কি এমন রাজকার্য আছে ওর! … মনের ক্ষেদ মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখেই চাবি নিয়ে তিনতলায় চলে গেল শর্মিষ্ঠা। ঘরের চাবি খুলে ঘরে প্রবেশ করতে, ঘরে একটা মিষ্টি গন্ধ পেল শর্মিষ্ঠা। রাজুর পছন্দের পারফিউম। সামনে একটি টুলের উপর সেই আতরের শিশিটা রাখা। ঠিক তার মাথার উপরে সেলফে লেখা, “তোমার অতিপ্রিয় আতরের শিশিটা রেখে গেলাম তোমার জন্য”।

শর্মিষ্ঠা কাছে এগিয়ে গেল। আতরের শিশির নিচে একটা দিস্তা খাতা মতন। তার প্রথম পাতায় একটা চিঠি লিখে স্টেপ্লার দিয়ে পিন করা।  শর্মিষ্ঠা টুলের সামনে বসে পরে, সেই চিঠিতা পরা শুরু করলো –

“আমার অতিপ্রিয় শর্মিষ্ঠা। শাহরুখ খানের সিনেমা দেখেছিলাম, ‘রাব নে বানা দি জোরি’, সেখানে একটা গান ছিল, ‘তুজমে রব দেখতা হ্যাঁয়’। … সিনেমাটা ভালো লাগলেও, একটু বোকা বোকা লেগেছিল, মানে মনে হয়েছিল, ‘অবতার নাকি যে মানুষের মধ্যে ভগবান দেখতে পাবো’। … কিন্তু ট্র্যাজেডি দেখো শর্মিষ্ঠা, আমার সাথে ঠিক সেটাই হলো। আজ থেকে বহুকাল আগেই, তোমার মধ্যে আমি রবকে দেখতে পেয়েছিলাম।

তোমার অদ্ভুত দিব্যরূপের জন্য কিনা জানিনা, কিন্তু হ্যাঁ আমার ভাব ঠিক এমনই ছিল। … ইচ্ছা হয়েছিল তাই যে, তোমার সান্নিধ্য লাভ করবো। তোমার সাথে সিনেমা পরিচালনা করবো। তোমার মুখ থেকে কথা শুনবো। … ঈশ্বরের আশীর্বাদে তা সম্ভব হলো। তবে সামনে এসে, আমার ভ্রম ভেঙে গেল। … ভ্রম ছিল এই যে, তোমাকে এতটাই সুন্দরী দেখতে যে তোমার মধ্যে ঈশ্বর খুঁজে পেতাম। কিন্তু কাছে এসে দেখলাম, তোমার প্যাশান, তোমার ডেডিকেশন, পরিশ্রম করার ক্ষমতা, সাবলীলতা, আর অত্যন্ত সাধারণ ভাব তোমার রূপকে যেন অন্তর থেকে বিকশিত করে তুলেছে। অর্থাৎ তোমার রূপ শুধুই বাহ্যিক ভাবে সুন্দর নয়, আন্তরিক ভাবে তা আরো সুন্দর।

খুব এঞ্জয় করছিলাম তোমার সঙ্গ। নিজের আরাধ্যার সাথে সময় কাটানোর আনন্দই আলাদা। কিন্তু এরই মধ্যে তুমি আমাকে রমণসঙ্গী করে নিলে। তোমার রূপে, গন্ধে, মধুতে আমি জলে ফেলে দেওয়া পিঁপড়ের মত হাবুডুবু খাওয়া শুরু করলাম। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম পুরোপুরি। আমার চোখে, আমার মনের চোখে দেখা জগতের শ্রেষ্ঠ সুন্দরীর মধুপান করছি আমি। আমার অন্তরমন যাকে দেবী জ্ঞান করে, তার অমৃতরস পান করেই চলেছি।

এর কারণে আমি অহংকার করবো! নাকি আমার স্বপ্নের মানুষটার সাথে অবৈধ সম্বন্ধ গড়ে তুলে, তাকে কলঙ্কে লিপ্ত করছি, তার জন্য নিজেকে গালাগালি করবো! বুঝতে পারছিলাম না। কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না। আহমেদ, তোমার স্বামী অত্যন্ত ভালো মানুষ। আর সে তোমাকে অত্যন্ত বেশি ভাবে বিশ্বাস করে, স্নেহ করে, আর তুমিও সেটা জানো আর বোঝো আর সেই স্নেহ লাভের জন্য যতটা না গর্বিত বোধ করো তার থেকেও বেশি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও।

নিজের কাছে নিজে ছোটো হয়ে যাচ্ছিলাম শর্মিষ্ঠা। তোমার সাথে অবৈধ প্রণয়ে লিপ্ত হয়ে, তোমাকে কলঙ্কিত করা, আহমেদের ভালো মানুষীর সুযোগ নেওয়া, সব মিলিয়ে আমি নিজের কাছে নিজেই ধিক্কারের পাত্র হয়ে যাচ্ছিলাম। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আর নয়। আর আমি তোমার আর তোমার স্বামীর ভালোমানুষীর সুযোগ নিতে পারবো না।

জানি আমাকে দেখতে না পেয়ে তুমি খুব ভেঙে পড়বে, হয়তো আমার উপর দারুণ ভাবে রেগে যাবে। কিন্তু বিশ্বাস করো শর্মিষ্ঠা, কান ফিল্ম ফেস্টিভাল থেকে ফিরে তুমি যে কামনায় পরিপূর্ণা হয়ে রমণীয় আলিঙ্গন প্রদান করে সঙ্গমের আবাহন করবে আমার কাছে, আমার পক্ষে তা প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব হবেনা। জানিনা বুঝতে পারছো কিনা, তবে নিজের আরাধ্যের আলিঙ্গনকে উপেক্ষা করা যায়না। কি করে সম্ভব! তাঁর আলিঙ্গন লাভের জন্যই যে আমরা এই শিল্পীরা দিনের পর দিন বেছে থাকি। শর্মিষ্ঠা, তুমি আমার কাছে আমার আরাধ্যা, মাতা সরস্বতীর ভৌতিক রূপ।

কিন্তু আমি আমার আরাধ্যাকে কলঙ্কিত করতে পারবো না। তাই বিদায় নিলাম শর্মিষ্ঠা। জানি ক্ষমা করতে পারবে না। না পারলে জোর করে ক্ষমা করোও না। কিন্তু আমাকে যেতে হবে, তোমার দেহমন পূর্ণ ভাবে পবিত্র। আমার উপস্থিতি তোমার দেহকে অপবিত্র করে দিচ্ছে, হয়তো আরো বেশ কিছুদিন থাকলে, মনটাকেও অপবিত্র করে দেবে। না, সেই দৃশ্য কল্পনা করলেও ভয় লাগে।

নিজের আরাধ্যার অংশরূপ বলে যাকে মানি, তাকে যদি দেখি কালিমালিপ্ত হয়ে যেতে, আর সেই কালিমার কারণ হই আমি, সেই গ্লানি আমাকে ঘাতক হার্ট এটাক করিয়ে দেবে। … তাই বিদায় নিলাম শর্মিষ্ঠা। … আর হ্যাঁ, যাবার আগে, দুটো জিনিস। তোমার পছন্দের আতর। আর আমার লেখা চতুর্থ স্ক্রিপ্ট। তুমি আজ পূর্ণ ভাবে অভিজ্ঞ। খেয়াল করে দেখো, অন্ধকার ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায়তে আমি প্রায় ক্যামেরার পিছনে দাড়াইই নি। পুরোটাই তুমি শুটিং করেছ।

তাই আমার বিশ্বাস, এই চতুর্থ স্ক্রিপ্টটা তুমি একাকী শুটিং করতে সক্ষম। তোমার ফেরার দুদিনের মাথায় অস্মিতা হাজরা আবার যাবে তোমার কাছে। ওর কাছে এই সিনেমা করার সমস্ত ব্যক্তিগুলির তথ্য দেওয়া আছে। একবার করে ফোন করে নিও তাদেরকে। বলা আছে, তোমার কাছে চলে আসবে, তুমি ফোন করলেই।

আর হ্যাঁ, রাগ করো আমার উপর, কিন্তু শোক করো না। আমি তোমারই ছিলাম, আছি আর থাকবো। কিন্তু তুমি আমার হতে পারো না। তুমি তোমার নিজের, সিনেমা জগতের, আর তোমার স্বামী আহমেদের। সে তোমাকে স্নেহ করাতে কনো প্রকার কুণ্ঠা করে না। তাকে কোন অপরাধের শাস্তি দিচ্ছ তুমি আমার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে! … তাকে সাজা দিও না। সে তোমাকে অত্যন্ত আপনজন মানে। বিদায় শর্মিষ্ঠা। তোমার অঙ্গের গন্ধ আমার সর্বাঙ্গে তুমিই মাখিয়ে দিয়েছ। যা দিয়েছ তা যথেষ্ট বাকি জীবন কাটিয়ে দেবার জন্য। … ইতি – তোমার আদরের রাজু”।

শর্মিষ্ঠা হাত কেঁপে উঠলো। না চাইতেও ঠোঁট কেঁপে উঠলো। ভিতরটা যেন সমস্ত জট পাকিয়ে গেছে। কি করবে সে, কিচ্ছু বুঝে পেলো না। প্রাণের প্রিয় মানুষটা তাকে একা করে চলে গেল, যে তাকে হাতে করে ধরে পরিচালনা শেখালো, সে চলে গেল, সেই জন্য সে কাঁদবে, নাকি সেই কান্নার মধ্যে আরাধ্যার সম্মান পাবার জন্য হাসবে, কিচ্ছু বুঝে পেলো না শর্মিষ্ঠা।

কিচ্ছু ভাবলো না, ভাবতে পারলো না সে। অবশেষে মিনিট পাঁচেক চুপ করে, থুম মেরে বসে থাকার পর, চেঁচিয়ে উঠলো সে, “মিথ্যুক, হ্যাঁ মিথ্যুক তুমি। সবসময়ে বলে এসেছ, আমি আনপ্রেডিক্টেবিল। আজ প্রমাণ করে দিলে যে আনপ্রেডিক্টেবিল আমি নই, তুমি”। এরপর ডুকরে কেঁদে উঠলো শর্মিষ্ঠা। তারপর দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সমানে কাঁদতে থাকলো, আর রাজুর সাথে কাটানো সুন্দরমধুময় সময়টাকে সম্পূর্ণ ভাবে দেখলো নিজের মানস নেত্রে।

তারপর চোখের জল মুছে, দাঁড়াতে গেলে, সামান্য মাথাটা ঘুরে যায় তার। নিজেকে সামলে স্ক্রিপ্টটা সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। পার্টি হয়, সেখানে অনেক অনেক কথা বলা হয় শর্মিষ্ঠার প্রশংসার জন্য। শর্মিষ্ঠার যেন কনো কিছুতেই আর মন নেই। পার্টির শেষে, আহমেদ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে শর্মিষ্ঠাকে আলিঙ্গন করে। শর্মিষ্ঠার অঙ্গে রাজুর আতরের গন্ধ পেয়ে আহমেদ, বেশ কিছুবার প্রশ্ন করে, “কি দারুণ গন্ধ। কি নাম পারফিউমটার?”

শর্মিষ্ঠা যেন শুনতেই পায়না, মানে সত্যিই শুনতে পায়না সে। আহমেদ সেই গন্ধের সাথে সাথে শর্মিষ্ঠারও নেশা করার অভিলাষ নিয়ে, তার আদররের শর্মিষ্ঠাকে রমণীয় ভাবে চুম্বন করতে থাকলে, শর্মিষ্ঠা আহমেদকে ভুলে গেছে এমন অনুভব হয়। শর্মিষ্ঠার নাকে কেবলই নিজের অঙ্গে লাগানো রাজুর পারফিউমের গন্ধ, আর সেই গন্ধ তাকে ভ্রমে রেখে দেয় যে আহমেদই রাজু, আর তাই আহমেদ নিজের স্ত্রীর সাথে সেই রাত্রে রমণ করলেও, শর্মিষ্ঠা যেন রাজুর সাথেই রমণে লিপ্ত হয়ে ছিল সমস্ত রাত্রি।

সপ্তাহ খানেক লাগে শর্মিষ্ঠার সমস্ত কিছু হজম করতে। আর একবার হজম হয়ে গেলে, তার কাছে অস্মিতা হাজরা আসে। রাজুর কথা মত সমস্ত কন্ট্যাক্ট দিয়ে যায় অস্মিতা। আদাজল খেয়ে শর্মিষ্ঠা লেগে পরে সিনেমাটা করার জন্য। সিনেমা শেষ হয়, আবারও সারা পৃথিবীতে সারা পরে যায় শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে। কি অদ্ভুত গল্প, কি অদ্ভুত পিকচারাইজেশন।

পৃথিবী ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে। সমস্ত পৃথিবীতে লণ্ডভণ্ড হচ্ছে। প্রতিটি যোনির জীব বাঁচার চেষ্টা করছে, মানুষও। সকল যোনি সকল যোনিকে সাহায্য করছে বাঁচার জন্য। কিন্তু যখন মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে সাহায্য পাবার আসায় বাঁদরের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, বাঁদর মানুষের হাত ধরে ফেলে দিচ্ছে। কুকুরও তাই, সমস্ত জীব মানুষকে প্রত্যাখ্যান করছে। আর সেই সমস্ত প্রতারণার শেষে, যখন অন্তিম মানুষটি মৃত্যু লাভ করছে, তখন সে ফ্ল্যাশব্যাকে দেখছে, মানুষ যোনি নিজেদের আধিপত্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে, কি করে এসেছে এতদিন।

যন্ত্র, যন্ত্র নির্মাণ আর যন্ত্র বিস্তার করে করে মানুষ সমস্ত প্রকৃতিকেই প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিল। তন্ত্র, মন্ত্র আর যন্ত্রের বলে মানুষ নিজেকে ভগবান মানা শুরু করেছিল আর প্রকৃতি তথা প্রকৃতির প্রতিটি জীবকে, প্রতিটি যোনিকে নিজেদের অধীনে রাখার প্রয়াস করে গেছে। এমন বোঝানোর ভান করে গেছে মানুষ যে সকলে মানুষের আশ্রয়েই আশ্রিত। …

যখন প্রায় সম্পূর্ণ চিত্র ফ্ল্যাশব্যাকে দেখা হয়ে যায়, তখন একটি অট্টালিকার অংশ সেই অন্তিম জীবিত মানুষটার বুকে পরে মানুষ যোনির সমাপ্তি ঘোষণা করে দিলে, সমস্ত জীব সেই মানুষটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে, বিদ্রূপের হাসি হেসে, যে যার দিশায় চলে যায় নতুন পৃথিবীতে, মানুষ বিহীন পৃথিবীতে বসবার করার উদ্দেশ্যে।

উচ্ছ্বসিত প্রশংসাই কেবল নয়। অসাধারণ থিম, গল্প, সিনেমাট্রোগ্রাফি, আর পরিচালনার কারণে শর্মিষ্ঠা আবার বহু পুরস্কারে ভূষিত হলো, এবং সম্পূর্ণ দেশের শ্রেষ্ঠ একজন পরিচালক রূপে খ্যাতনামা হলো। এই সিনেমা করার সময়েই শর্মিষ্ঠা প্রেগন্যান্ট থাকে, আর এই সাফল্যকে বিশেষ ভাবে পালন করতে পারেনি শর্মিষ্ঠা, কারণ সিনেমার রিলিজের পরপরই সে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়।

সন্তানকে কোলে নিয়েই কান ফিল্ম ফেস্টিভালে গেছিল সে এবার। আর তারপর একটা বড় ধরনের বিরাম নেয় সন্তানকে মানুষ করার জন্য। … সন্তান বড় হবার পর মানে, আরো ১২ বছর পরে, দুটি সিনেমা করেছিল শর্মিষ্ঠা। প্রশংসিতও হয়েছিল। কিন্তু তারপর আর সিনেমা করেনি। বরং পরিচালকদের প্রশিক্ষণের সেন্টার খুলে বসে সে।

আর আজও সেই প্রশিক্ষণ চলছে। তার কন্যা আজ বড় হয়েছে, আজ বাদে কাল তার বিয়ে। সে এখন লেখক, আর তার লেখা বই নিয়ে শর্মি ফিল্ম ইন্সটিটিয়ুট অনেক সিনেমাই করেছে। শর্মিষ্ঠার স্বামী গত হয়েছে, বছর দুয়েক হয়েছে, তারপর সে একদিন সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পরে গিয়ে আজ হুইল চেয়ারে”।

শর্মিষ্ঠা নিজের কথা থামালে, নীলিমা প্রশ্ন করলো, “আর কনোদিন রাজু ফিরলো না মা?”

শর্মিষ্ঠা হেসে বলল, “রাজুর চতুর্থ স্ক্রিপ্টের উপর যেই সিনেমা হয়েছিল, তার বাংলায় নাম ছিল ‘ইতি নর’, ইংরাজিতে নাম ছিল, “লস্ট রেস”। এই সিনেমার পরিচালনার শেষেই শর্মিষ্ঠা সন্তানের জন্ম দেয়। আর তার শিশু যখন মাস ছয়েকের, তখন সে সমস্ত পুরস্কার নেবার জন্য বিভিন্ন স্থানে যায়। এমনই একবার সে মুম্বাইতে ফিল্মফেয়ার এওয়ার্ড নিতে গেছিল।

এওয়ার্ড নেবার শেষে, নিজের ভ্যানিটি ভ্যানে বসে মেকআপ সবে তুলে, মুখে চোখে জল দিয়ে আয়নার সামনে বসেছে। আয়নায় তখনও মুখ দেখেনি। ব্লাউজ আর চুলের ফাঁকে যেখানে পৃষ্ঠদেশ উন্মুক্ত, সেখানে একটা হাতের স্পর্শ পেয়ে সে চমকে ওঠে। আয়নাতেই দেখে সে, তার পিছনে দ্বিভদ্র। দ্বিভদ্র শর্মিষ্ঠার প্রেরণা, আদর্শ, আর একপ্রকার গুরুও। তাই সরাসরি নিজের শরীরকে ঘুরিয়ে নিয়ে মিষ্টি হাসি দিলো শর্মিষ্ঠা।

দ্বিভদ্র হেসে বলল, “গুড জব, … যাই হোক, আমি আর সিনেমা পরিচালনা করিনা। তাই আমার হলো সারা, তোমার হলো শুরু”।

শর্মিষ্ঠা নিজের গুরুকে এতদিন পরে দেখে, এতটাই আনন্দ পেয়েছিল যে কনো কথাই বলতে পারলোনা সে। দ্বিভদ্র চলে গেল। শর্মিষ্ঠা তখনও বসে বসে ভাবছে, ‘যাক দ্বিভদ্র বেঁচে আছে, এটাই অনেক। উনার মত গুণী ব্যক্তি এই ভাবে কি করে চলে যেতে পারে’।

এমন ভেবে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে, পাশে থাকা জলের বোতলের ছিপি খুলে জল খেতে যাবে, এমন সময়ে শর্মিষ্ঠা থেমে গেল। আসতে আসতে তার মুখের হাসিও চলে গেল। গলা শুকিয়ে এলো। চোখ চোখের জলে ফুলে উঠলো। … তার পিঠে যেই হাতের স্পর্শ পরেছিল, এই স্পর্শ যে বড়ই পরিচিত তার। বড় প্রিয় স্পর্শ তার। যেই গন্ধটা দ্বিভদ্রের অঙ্গ থেকে আসছিল, সেই আতর! এতো রাজুর আতর! …

ভিম্রি খেয়ে যায় শর্মিষ্ঠা। তড়িঘড়ি উঠতে গিয়ে, আয়নার সামনের সমস্ত সরঞ্জাম ভ্যানের ফ্লোরে ফেলে দেয়। নার্ভাস হয়ে গিয়ে সেগুলো ওঠাতে থাকলে, আবার থেমে গেল শর্মিষ্ঠা। যেই স্ক্রিপ্টটা রাজু দিয়ে গেছিল, মানে ‘ইতি নর’র স্ক্রিপ্ট, এই গল্পটাই তো দ্বিভদ্র নভোটেলে বসে তাকে বলেছিল! … এর মানে! …”

শর্মিষ্ঠা নিজের নির্বুদ্ধিতার কথা স্মরণ করে, হতাশ হয়ে চোখ বন্ধ করলো। ভিতর থেকে তার কান্না ফেটে বেড়তে চাইলো। কিন্তু এখন কান্নার সময় নয়। সবকিছু ফেলে রেখে, ঊর্ধ্বশ্বাসে ভ্যান থেকে নেমে খালি পায়ে শর্মিষ্ঠা বেশ কিছুদূর ছোটাছুটি করলো, কিন্তু সে আর নেই। না আছে দ্বিভদ্র, আর না আছে রাজু! … দুইজনে তো আলাদাই নয়। আহমেদের সাথে বিয়ে করে ফেলেছে শর্মিষ্ঠা, তাই সামনে আসেনি।

দ্বিভদ্র হয়ে সামনে আসলে বড় নিউজ হতো। তাই দ্বিভদ্র গায়েব হয়ে গেল। সামনে এলো রাজু অধিকারী। শর্মিষ্ঠাকে পরিচালনা শিখিয়ে বিঝ্যাত করে দিয়ে সে চলে গেল। শর্মিষ্ঠা রাস্তার উপর মাটিতেই বসে পড়লো। তার টিম তড়িঘড়ি করে এসে তাকে তুলে ধরলো। আওয়াজ এলো দিকদিক থেকে, “কি হয়েছে ম্যাডাম! শরীর খারাপ করছে!”

শর্মিষ্ঠার মাথা বনবন করে ঘুরছিল। অজ্ঞান হয়ে গেছিল সে। অজ্ঞান হবার আগে আর জ্ঞান ফেরার পরে, একটাই কথা তার মুখে, “দ্বিভদ্র”।

টিম থেকেই কেউ বলে উঠলো, “উনি আর নেই। কত বছর হয়ে গেছে, উনি মিসিং। জীবিত থাকলে, নিশ্চয়ই ফিরে আসতেন”।

শর্মিষ্ঠা কিচ্ছু বলতে পারলো না। তার টিমের একজন মেয়ে বলল, “ও কিছু নয় ম্যাডাম। আপনি উনার একজন এডমাইরার। তাই আজ আপনার সাফল্যের কৃতিত্ব তাঁকে দিতে চাইছেন আপনি। সেই কারণেই উনাকে হেলুসিনেট করছেন, আর কিছু নয়”। শর্মিষ্ঠা আর কনো কিছু বলার অবস্থাতেই থাকলো না। … শুধু কিছুদিন নিজেকে নিজে গালি দিতে থাকলো, ‘রাজুই যে দ্বিভদ্র, সেটা তো তার অনেকদিন আগেই বোঝা উচিত ছিল। ইতি নর’র কাহিনীর কথক ছিল দ্বিভদ্রই। … যদি এতটা মূর্খ না হতাম, তাহলে আজ একবার আলিঙ্গন তো করতে পারতাম। অনেক কথা বলার ছিল তাকে’।

(একটা জোরে নিশ্বাস ফেলে) তারপর আর কনোদিনও সামনে আসেনি। … আজ পেপারে ওর ছবি দেখলাম। ‘একজন সাধু সমাধি অবস্থায় দেহত্যাগ করেছেন’। (আবার একটা জোরে নিশ্বাস, আর চোখের কোনে জল)”।

আমি বললাম, “ধুত, তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে মা। এই সাধুটাই রাজু! … যতসব! ঠিক করে দেখো। অন্য কেউ”।

শর্মিষ্ঠা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, “নিজের মুখ নাও চিনতে পারি, কিন্তু রাজুর মুখ চিনতে পারবো না, সেটা হতেই পারেনা। … ও যে আমার প্রাণ”।

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “যত সব আজগুবি, এই সব ধাপ্পাবাজ লোকে ভরে গেছে জগতটা। সমাধিতে দেহত্যাগ করেছে। … যত সব ফাজলামো”।

মা একটা কথাও না বললে, আমি আবার বললাম, “যদি এটা রাজুও হয়, তাহলেও এগুলো ভণ্ডামি”।

মা আমার দিকে এবার কটমট করে তাকিয়ে বলল, “নিলী, যা মুখে আসছে, তাই বলছিস! … উনি তোর বাবা। … এই কথাটাই তো তাকে বলার ছিল যে, তার ভালোবাসার ফল স্বরূপ আমি তোকে পেয়েছি। … তুই আমার আর দ্বিভদ্রের সন্তান নিলী। আর এই সাধুটি অন্য কেউ নন, তোর বাবাই”।

আমি যে কতক্ষণ বাকশূন্য ছিলাম জানিনা। যখন ঠিক করে হুঁশ এলো, ঘর থেকে চলে গেলাম। নিজের খাটে বসে বেশ কিছুক্ষণ কাঁদলাম। মনের ভিতরটা আনচান করছিল। মনে হচ্ছিল, বাবা হলেন তিনি, অথচ কোনোদিন বাবা ডাকটাও শোনাতে পারলাম না। হুইল চেয়ারের আওয়াজ এলো। মা এসছে। আমার কাছে এলেন। চোখে চোখ রাখতে পারলাম না।

মা আমার গায়ে হাত দিয়ে বললেন, “আসল কথাটা কি জানিস! … উনি আমার চোখে সাখ্যাত মা সরস্বতীর বরপুত্র ছিলেন। উনার সান্নিধ্য পাবার কালে, আমার কখনো মনে হয়নি যে আমি কনো পুরুষের সাথে রয়েছি, সবসময়ে মনে হয়েছে যেন আমি মা সরস্বতীর ছত্রছায়াতে রয়েছি”।

আমি কিছু বললাম না, শুধু মনে মনে মা সরস্বতীর উদ্ধেশ্যে বললাম, “হে পরাপ্রকৃতি, আসল পরিচালক তো তুমি। তোমার পরিচালনায় আমরা সকলে একাকজন পুতুল। কিন্তু অদ্ভুত মহিমা তোমার। এমন স্নেহ মাখিয়ে রেখেছ যে, আমরা সকলে তোমার কাছে পরাধীন হয়েও এমন বোধ করি যে, তোমার কাছে থাকাই যথার্থ স্বতন্ত্রতা। … জয় মা। প্রণাম নিও মা”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5