চতুর্থ পর্ব – ঘনীভূত প্রণয়
শর্মিষ্ঠা রাত্রি ২টোর সময়ে গিয়ে উঠলো রাজুর ফ্ল্যাটে। রাজুকে ফোন করে তুলে, গাড়ি পার্ক করে, রাজুর ফ্ল্যাটে চলে গেল শর্মিষ্ঠা। রাজু শর্মিষ্ঠাকে এতো রাত্রে তার কাছে আসতে দেখে একটু হতবাকই হলো। আরো অবাক হলো শর্মিষ্ঠার গতিবিধি দেখে। রাজু দরজা খুলতে, শর্মিষ্ঠা একটা ধাক্কা মেরে রাজুকে সরিয়ে দিয়ে, দরজা বন্ধ করে দিল।
রাজু কিছু প্রশ্ন করবে, তার আগেই রাজুর হাত ধরে একপ্রকার টানতে টানতে পাশের শোবার ঘরে নিয়ে এলো শর্মিষ্ঠা, এক প্রকার ধাক্কা মেরে, রাজুকে বিছানায় বসিয়ে দিল। রাজুর অবাক হওয়া ক্রমশ বেড়ে চলেছিল, কারণ আজ তার সামনে যেই শর্মিষ্ঠা দাঁড়িয়ে রয়েছে, সে যেন এক অচেনা শর্মিষ্ঠা। তবে শর্মিষ্ঠা আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল না। রাজুর সামনে মাটিতেই বসে পড়লো সে।
রাজু একটু চমকে উঠেই বলল, “আহা মাটিতে বসছো কেন? পাঁচকানের কাজে ব্যস্ত ছিলাম, কদিন ধরে ঠিক করে ঝাটও দেওয়া হয়নি। উঠে বসো”।
রাজু নিজের ঘরে যেমন পোশাক পরে থাকে, তেমনই ভাবে গায়ে একটা পাতলা ফতুয়া জামা, আর পড়নে লুঙ্গির মত করে পরা ধুতি। রাজুর কথাতে শর্মিষ্ঠা বিছনায় উঠলো তো ঠিকই, তবে উঠে প্রথম যেই কাজ করলো সেটা হলো রাজুর কলারটা চেপে ধরলো। আর এমন ভাবেই চেপে ধরলো যে রাজুর ফতুয়ার উপর দিকের দুটো বোতাম ছিঁড়ে গিয়ে, রাজুর বক্ষদেশকে উন্মুক্ত করে দিলো।
রাজু এবার একটু ভয়ই পেয়ে গেল। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠলো, “কি হয়েছে শর্মিষ্ঠা, আমি কি কিছু ভুল করে ফেলেছি। তোমাকে এমন উগ্র দেখাচ্ছে কেন? আমার তোমাকে আজ দেখে ভয় লাগছে”।
শর্মিষ্ঠা উগ্র স্বরেই বলল, “কেন? আমার পোশাক কি ভয় দেখানোর মত? স্লিভলেশ ব্লাউজ দেখে কি তোমার ভয় লাগে! নাকি আমাকে স্লিভলেশে দেখলে তোমার ভয় লাগে? … কোনটা বলো! … আমার শাড়ী আর ব্লাউজ আমার দেহের সৌন্দর্যকে আজ পুরো ঢাকতে পারছেনা। সেই জন্য তোমার ভয় লাগছে? … কি হলো বলো রাজু”।
রাজু ভীষণই ইতস্তত করলেও, একটু সাহস করে শর্মিষ্ঠার একটা গালে হাত রেখে বলল, “কি হয়েছে! একটু খুলে বলো শর্মিষ্ঠা। আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছিনা”।
শর্মিষ্ঠা চোয়াল শক্ত করে বলল, “বেশ, তোমার বোঝার জন্য আমি একটা কথা বলছি, দেখো তো বুঝতে পারো কি না। আমি আজ পাঁচকান দেখলাম। … বলো কিছু মেলাতে পারছো আমার মেজাজের সাথে!”
শর্মিষ্ঠার সর্বাঙ্গ দিয়ে প্রায় রাজুর শরীরকে বিছনার পাশে দেওয়ালে সেটে রেখে দিয়েছে। শর্মিষ্ঠার দেহের চাপ, তার দেহের মিষ্টি গন্ধ, আর অরধাবৃত দেহরূপ রাজুর উপর এমনই মিশ্রচাপ সঞ্চার করেছে যে রাজু অবিরাম ভাবে ঘামতে থাকে। তাই নাকের ডগা থেকে ঠোঁটের উপর পরে যাওয়া ঘামের বিন্দুকে জিভ দিয়ে সরিয়ে, রাজু বলল, “না, কিছু বুঝতে পারছিনা। কিছু ভুল দেখিয়েছি পাঁচকানে?”
শর্মিষ্ঠা এবার আরো বেশি চাপ প্রয়োগ করলো রাজুর কলারে। তাই ঘামে লতপত হয়ে যাওয়া রাজুর ফতুয়ার বেশ খানিকটা অঞ্চল ছিঁড়েই গেল শর্মিষ্ঠার চাপ সহ্য করতে না পেরে। এবার শর্মিষ্ঠা রাজুর মুখের খুব কাছে নিজের মুখ নিয়ে গেল। এতক্ষণ শর্মিষ্ঠার দেহের তাপ ও সুমিষ্ট গন্ধ রাজুকে প্রচণ্ড ভাবে অপ্রস্তুত করে রেখে ছিল। এবার তার সাথে শর্মিষ্ঠার শ্বাসের বাতাসও রাজুর মুখে এসে পড়ছিল, যা রাজুকে একপ্রকার অসংযত করে দিচ্ছিল।
হার হিম হয়ে যাচ্ছিল রাজুর, সেই সময়ে শর্মিষ্ঠা উগ্র ভাবে বলে উঠলো, “আমি কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি? পাঁচকানে যা দেখিয়েছ, তার আমি কিচ্ছু বুঝিনি! … আমি যেই পাঁচ লেখককে অপহরণ করেছিলাম, আর তাদের সাথে যা যা করেছিলাম, তাকেই তুমি কমেডির রঙে রাঙিয়ে পরিবেশন করেছ, আর যাতে কেউ রিলেট না করতে পারে তাই পাঁচটি লেখককে পাঁচটি পরিচালকদ্বারা রিপ্লেস করে দিয়েছ। … (আরো উগ্র হয়ে) কি করে জানলে আমার এই ঘটনা? (চাচিয়ে উঠে) বলো কি করে জানলে? আহমেদ পর্যন্ত জানেনা, এই কাজের কথা। তুমি কি করে জানলে?”
রাজু যেন এবার একটু স্বস্তি পেল। সে বলে উঠলো, “ও এই কথা!” শর্মিষ্ঠা রাজুর যেই মিষ্টি হাসি দেখে পাগল, সেই মিষ্টি হাসি হাসলো এবার রাজু। উত্তেজিত হয়ে গিয়ে শর্মিষ্ঠা আবার হুংকার ছেড়ে বলল, “তোমার মিষ্টি হাসিদিয়ে আমাকে বশ করার চেষ্টা করো না রাজু। আমার আজ হাসি নয়, উত্তর চাই”।
রাজু আবার একই প্রকার হাসি দিয়ে বলল, “আমার কিন্তু লাগছে শর্মিষ্ঠা। যেই ভাবে তুমি চেপে ধরেছ, তাতে আমার ঘাড়ে আর গলায় বেশ লাগছে। … আরে আমি তো পালিয়ে যাচ্ছিনা। বলছি, কলারটা ছাড়ো, একটু শান্তিতে বসতে দাও, সব বলছি”।
অভয় লাভ করে শর্মিষ্ঠা একটু শান্ত হয়ে রাজুকে একটু স্বস্তি দিলো। স্বস্তি পেয়ে, রাজু একটু হাফ ছেড়ে, দুচারবার নিজের ঘারটাকে এদিক সেদিক ঘুরিয়ে নিয়ে, হাত বাড়িয়ে সিলিং ফ্যানের সুইচটা অন করে, আবার দুচারবার নিশ্বাস নিয়ে বলল, “একজনকে তোমার মনে আছে শর্মিষ্ঠা? অস্মিতা হাজরা?”
শর্মিষ্ঠা উগ্র ভাবেই উত্তর দিল, “আনন্দবাজারের সাংবাদিক”।
রাজু নিজের গলার দিকে ঘাম মুছতে মুছতে, বলল, “হ্যাঁ, ওকে আমিই তোমার কাছে পাঠিয়েছিলাম, যাতে ও তোমার মাথায় পাঁচটা লেখককে আড়াল করে নেবার বুদ্ধি ঢুকিয়ে দিয়ে আসতে পারে। আর সেটাই সে করেছিল। … খেয়াল করে দেখো শর্মিষ্ঠা, তুমি প্রথম তিনজন লেখককে সরিয়ে নেবার কালে, সিয়াইডি তোমার পিছনে আদাজল খেয়ে লেগেগেছিল। আর তাই চতুর্থ ও পঞ্চম লেখক নিজের থেকেই তোমার কাছে আসে। কি করে এলো তারা তোমার কাছে? (হেসে) আমি পাঠিয়েছিলাম”।
শর্মিষ্ঠা এবার অনেকটা নরম হয়েছে। কাল রাত্রের অনুষ্ঠানে গায়ে মাখা আতর ঘামের সাথে মিশে সমস্ত ঘরকে সুমিষ্ট গন্ধে পরিপূর্ণ করে দিয়েছে। শর্মিষ্ঠার সেদিকেও যেমন কনো হুঁশ নেই, তেমন সে যে গরমে, উত্তেজনায় এবং উগ্রতার কারণে সম্পূর্ণ ভাবে ঘামে ভিজে গেছে, এবং তার গায়ের শুভ্র বর্ণ যে গোলাপি বর্ণে পরিবর্তিত হয়ে গিয়ে, তাকে সাখ্যাত রতির রূপ দিয়ে দিয়েছে, সেদিকেও তার হুঁশ নেই।
তার এখন দেহমন কেবল রাজুর কথাতেই আবদ্ধ রইল। তাই রাজুকে সে এবার একটু নরম ভাবেই প্রশ্ন করলো, “কিন্তু আমার যে কিছু লেখক প্রয়োজন, সেটা তুমি জানলে কি করে? আর যদি তুমি জেনেও যাও, তাহলে তুমি আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলে? সাহায্য করার জন্যই এইসব করেছ? কি ভাবে? কেন?”
রাজু উত্তরে বলল, “তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করো নি শর্মিষ্ঠা, যেদিন তুমি দ্বিভদ্রের কাছে গেছিলে, সেদিন তুমি যখন উনার ঘর থেকে বেড়িয়ে আসছিলে, আমি ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আশায় আশায় গেছিলাম যে উনার কাছে আমার একটা কাহিনী দেব।… কিন্তু তোমার সাথে যা যা কথা হয় দ্বিভদ্রের, তা শোনার পর, আর তা শোনার পরে তোমার মুখের মধ্যে ব্যর্থতার ভাব দেখে, আমি আর দ্বিভদ্রের সাথে দেখা করিনি। আমি অস্মিতাকে তোমার কাছে পাঠাই। তোমাকে পাঁচজন লেখককে সরিয়ে নিয়ে যাবার বুদ্ধি দিই। তুমি তাদেরকে লুকিয়ে রেখে, তাদের থেকে গল্প নিয়ে, সিনেমা করো। কিন্তু সেটা ফ্লপ না হলেও হিট হয়না। …
কিন্তু সেই পাঁচ লেখককে তোমার কাছে এনে দেওয়ার কারিগর ছিলাম আমি, আর তাদের সাথে তুমি যা যা করেছ, সেই নিয়ে আমি এই পাঁচকান সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখি। জানতাম, তুমি অপহরণকারী নও, তাই তোমার তাদের প্রতি আচরণ কখনোই অপহরণকারীর মত হবেনা। তারা তোমার থেকে পালিয়ে আসতো না। আমার তাদেরকে এমনই ইন্সট্রাকশন দেওয়া ছিল, কিন্তু সাথে সাথে এও ইন্সট্রাকশন দিয়ে রেখেছিলাম যে তোমাকে যেন তারা ভয় পাওয়াতে থাকে।
পুলিশকে বলে দেব, আমাদের তুমি আটকে রেখেছ, আমাদের তুমি আটকে রাখতে পারবেনা, আমরা ঠিক পালিয়ে যাবো। এই সমস্ত কিছু তোমাকে অনুক্ষণ যেন বলতে থাকে, এটাই ছিল আমার ইন্সট্রাকশন। কারণ একটাই। তাদের এই আচরণের কারণে তুমি ইতস্তত করবে, আর কমেডি সৃষ্টি করবে, নিজের অজান্তে। ওই পাঁচলেখকের খাতাতে ক্যামেরা লাগানো ছিল, আর তাই তাদের সমস্ত কীর্তি, আর তাদের প্রতি তোমার করা সমস্ত কীর্তিকে আমি দেখি, আর সেই অনুসারে পাঁচকানের স্ক্রিপ্ট লিখি”।
শর্মিষ্ঠা এবার আবার একটু উত্তেজিত হয়ে গিয়ে বলল, “কিন্তু কেন? … তোমার কাছে যেই স্ক্রিপ্ট আছে, যেটা তুমি দ্বিভদ্রকে দিতে গেছিলে অথচ দাওনি, সেটা আমাকে দিলেই তো হতো?… এই সমস্ত নাটকের কি প্রয়োজন ছিল? এমনকি পাঁচকানেরই বা কি দরকার ছিল?”
রাজু হেসে বলল, “তখন সম্পূর্ণ ভাবে ডিপ্রেশনে না থাকলেও, খানিকটা ডিপ্রেশনেই ছিলে তুমি শর্মিষ্ঠা। আর ডিপ্রেশনে থাকলে, আমার সেই বড় স্ক্রিপ্ট, যার থেকে তিনটি ভাগে তিনটে সিনেমা হবে, সেটা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। না সেই চলচ্চিত্র আমার একার পক্ষে শুটিং করা সম্ভব আর না তোমার একার পক্ষে। তোমার কাছে অভিজ্ঞতা আছে, ইকুইপমেন্ট আছে, ভিসুয়াল এফেক্ট দেবার স্টুডিও আছে, পারফেকশন আছে, আর আমার কাছে আছে গল্পের উপর দখল। আমাদের দুজনের কেমিস্ট্রি না ঠিক হলে, শুধু কমার্শিয়াল বা প্রফেসানালিজম দিয়ে এই সিনেমা করা তো যায়, কিন্তু তা এক ঐতিহাসিক সিনেমা করে রেখে দেওয়া সম্ভব হয়না। হৃদয় থেকে সিনেমাতা করতে হতো, মনপ্রান ঢেলে দিয়ে, এই সৃষ্টি করতে হতো। তাই তোমার সাথে এই কেমিস্ট্রি করা আবশ্যক ছিল”।
শর্মিষ্ঠা এবার একটু বেদনাগ্রস্ত ও আহতমন নিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠলো, “সেতো … দ্বিভদ্রের সাথেও করতে পারতে। আমার সাথে করতে এলে কেন?”
রাজু উত্তরে বলল, “দ্বিভদ্রের সামনে আমি কিছু বলার জায়গায় থাকতাম না শর্মিষ্ঠা। উনি অনেক অনেক বেশি অভিজ্ঞ, অনেক অনেক বেশি দক্ষ। তার সামনে আমি নিতান্তই একটা বাচ্চা ছেলে। … পরিচালনার দিক থেকে, তোমার কাছেও আমি শিশু, কিন্তু তুমি ডিপ্রেশনে রয়েছ, নিজের উপর আস্থা হারিয়ে বসে আছো। সেই অবস্থায় তুমি আমার কথা শুনবে, আমাকে স্বাধীনতা দেবে। … আর তা ছাড়া… ছাড়ো”।
শর্মিষ্ঠা কটমটিয়ে তাকিয়ে বলল, “কেন ছাড়বো? কেন ছাড়বো আমি! … আজ তোমাকে সমস্ত কিছু বলতে হবে রাজু। সমস্ত কিছু। তোমার মনসা, তোমার অভিপ্রায়, সমস্ত কিছু বলতে হবে। বলতেই হবে। নাহলে আজ আমি তোমায় … সিরিয়াসলি বলছি, আজ রাত্রেই খুন করে দেব”।
রাজু একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “খুন করে দাও। আজ তুমি বিবাহিতা। তাই তোমাকে এই কথা বলা উচিত নয়”।
শর্মিষ্ঠা আমার রাজুর কলার চেপে ধরে দেওয়ালে সেটে দিলে, রাজু হকচকিয়ে উঠে কিছু বলতে গেলে, শর্মিষ্ঠা উগ্র আর চাপা গলায় বলে উঠলো, “কেন আমার হৃদয় নিয়ে ছেলে খেলা খেললে রাজু! … তোমার সিনেমা করার দরকার ছিল, আমাকে বললেই পারতে। কিন্তু আমার হৃদয়কে কেন ছিনিয়ে নিলে। কেন আমার হৃদয়ের অভ্যন্তরে এসে বসে পরলে”।
রাজুর চোখে জল। সেই জল নিয়েই বলল সে, “আইডিয়া ছিলনা। ভেবেছিলাম, বয়স কম বলবো। ছোটো ভাই করেই মানবে। কিন্তু, তুমি যে মন দিয়ে দেবে, আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি। … বুঝতে পারলে এই দুঃসাহস কিছুতেই দেখাতাম না। … আসলে, তুমি শুধু আমার কাছে স্বপ্নের পরিচালকই নও, আমার কাছে স্বপ্নের মানুষ। সেই স্বপ্নের মানুষের কাছাকাছি থাকতে পারবো, সেই স্বপ্নের পরিচালকের সাথে মিলে মিশে কাজ করতে পারবো, এই বিচার মনে আসতেই এমন আনন্দ হলো যে, দ্বিভদ্রকে সেই স্ক্রিপ্ট পড়ালামই না।
তবে সরাসরি তোমার কাছে স্ক্রিপ্ট নিয়ে আসলে, হয় তুমি রিজেক্ট করে দিতে আর যদি রিজেক্ট নাও করতে, প্রফেসানাল সম্পর্ক রাখতে, যা দিয়ে সেই সিনেমা নির্মাণ সম্ভব হলেও, তাকে জীবন্ত করে তোলা যেত না। … তাই… কিন্তু তুমি যে মন দিয়ে দেবে, আমি সেটা ভাবতে পারিনি। … তোমার আর তোমার হাজব্যান্ডের মধ্যে এসে যাবো, এটা আমি চাইনি শর্মিষ্ঠা। … হ্যাঁ ভালো বেসেছি তোমাকে সমানেই। কিন্তু যখন তুমি বিয়ে করে নিলে, তখন থেকে তোমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করাই বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তোমার চরিত্রকে আমি কলঙ্কিত করতে পারবো না”।
শর্মিষ্ঠা নিজেকে আবার কাছে নিয়ে এলো রাজুর, আর রাজুর কাছে গিয়ে বলল, “তুমি আমাকে ভালোবাসতে!”
রাজু একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, “বান্ধব স্যারের ছাত্র ছিলাম। তুমি আমার কাছে সেই যৌবনের প্রথম থেকে একজন দেবী ছিলে, আমার স্বপ্নের মানুষ ছিলে। … কিন্তু সময় তোমাকে আহমেদের কাছে নিয়ে গেছে। আর আমি সময়ের বিরোধিতা করতে পারবো না। তাই … তাই … মানে, তোমার কাছে আসার আর চেষ্টা করিনি। কিন্তু দ্বিভদ্রের কাছে তোমাকে ডিপ্রেশনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, আর থেমে থাকতে পারিনি। নিশ্চয় করেনি মনে মনে যে, তোমাকে ডিপ্রেশনে যেতে দেবনা। … আর তাই … মানে”।
শর্মিষ্ঠার এবার ঠোঁট কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে। রাজু শর্মিষ্ঠার গালে হাত রেখে বলল, “কাঁদছও কেন শর্মিষ্ঠা!”
শর্মিষ্ঠা একটা ঢোক গিলে নিজের কান্নাকে গিলে নিয়ে একচোখ জল নিয়ে বলল, “যখন তুমি তোমার তিনটে ছবির স্ক্রিপ্টের কথা বললে, তখন মনে হলো যেন তুমি আমার মন নিয়ে খেলা করেছ। … আমি তো তোমায় মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছি রাজু। … মনটা ভেঙে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল তুমি তোমার সিনেমা নির্মাণ করার জন্য আমাকে ব্যবহার করেছ”।
রাজু এবার দুহাত দিয়ে শর্মিষ্ঠার দুইগালকে ধরে হেসে বলল, “না শর্মিষ্ঠা। আমার স্বপ্নের মানুষের সাথে আমি ছল কি করে করি। হ্যাঁ, তার কাছে যাওয়া দরকার ছিল, তাকে ডিপ্রেশন থেকে তুলে এনে, শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পদে স্থাপিত করার জন্য। তাই পাঁচকান করি। তবে তোমার মন নিয়ে আমি খেলা করি নি, করার কথা ভাবতেও পারিনা। … তবে এভাবে মন জয় করার ইচ্ছা ছিলনা। ভাই সেজে থেকে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার সংসার ভেঙে দেবার ভয় হয় আমার আজ”।
শর্মিষ্ঠা আবার খানিকটা উগ্র হয়ে উঠে বলল, “ভাঙলে ভাঙুক, কলঙ্ক লাগলে লাগুক। কিন্তু আর তোমার থেকে তোমার স্বপ্নের মানুষ দূরে থাকতে পারবেনা। … তুমি অদ্ভুত জাদুগর রাজু। কাল পর্যন্ত আমি ছিলাম তোমার স্বপ্নের মানুষ, আর আজ দেখো, তুমি আমার কাছে স্বপ্নের মানুষ”।
এতো কথা বলার পর, রাজু কিছু বোঝার আগেই, শর্মিষ্ঠা রাজুর ঘাড় ধরে রাজুর মুখকে কাছে টেনে এনে, রাজুর ঠোঁটে নিজের ঠোঁটকে গুজে দেয় শর্মিষ্ঠা। রাজু এর জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলনা। অন্তর পরিপূর্ণ তার কামনাতে, আর অনুশোচনাতে। আজ রাজুর রোমে রোমে অনুশোচনা যে সে তার সব থেকে কাছের মানুষের সংসার না ভেঙে দেয়, আর সাথে সাথে কামনাতে অস্থির, তার স্বপ্নের মানুষ আজ তার সাথে একাত্ম হতে ব্যকুল।
এই দুই বিপরীত ভাব মিলে রাজু কনোক্রমে নিজের ঠোঁটকে শর্মিষ্ঠার মুখগহ্বর থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। লজ্জিত বোধ করে, অপরাধী বোধ তাকে ছিঁড়ে খেতে আরম্ভ করে, কিন্তু শর্মিষ্ঠা আজ নাছোড়বান্দা। রাজু মাথা নেড়ে বলল, “না শর্মিষ্ঠা, এটা আমি তোমার সাথে অন্যায় করছি। … গ্লানি জন্মাচ্ছে আমার অন্তরে”।
শর্মিষ্ঠা আজ সম্পূর্ণ ভাবে বাঘিনী। হিরণশাবকের কনো কথাই সে আজ শুনতে রাজি নয়। রাজুকে প্রবল বেগে নিজের কাছে টেনে নিলো সে, এবং রাজুর গলদেশ থেকে আরম্ভ করে বহু অঙ্গকে নিজের প্রেমচুম্বন দ্বারা বশীকরণ করা শুরু করে দেয় শর্মিষ্ঠা। ক্রমশ রাজু নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসলো, বিশেষ করে যখন রাজুর সর্বাঙ্গকে প্রগলের মত চুম্বন করা শুরু করলো শর্মিষ্ঠা।
রাজু আরো একবার প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শর্মিষ্ঠার দৃঢ় কণ্ঠস্বর বলে উঠলো, “আজ কনো কথা নয় রাজু। আজ আমি তোমার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে অর্পণ করতে ব্যকুল। নিজের হৃদয় মন অনেকদিন আগেই সঁপে দিয়েছিলাম, আজ আমার দেহলাবণ্য তোমার কাছে সঁপে দেবার ক্ষণ এসেছে।
রাজু আর প্রতিবাদ করতে পারলো না। শর্মিষ্ঠার কটিদেশকে আকর্ষণ করলে, শর্মিষ্ঠা কামনায় অস্থির হয়ে রাজুর ছেঁড়া ফতুয়ার মাঝে উন্মুক্ত বক্ষে নিজের তনুকে দিয়ে ঠেসে দিলো। এবার রাজু শর্মিষ্ঠার অঙ্গমর্দন শুরু করে, আর শর্মিষ্ঠা আর রাজু ক্রমশ একে অপরের মধ্যে ডুবে যায়। নেশাগ্রস্ত হলেও, সঙ্গমপর্বের পর রাজুর মধ্যে তখনও অপরাধ বোধ কাজ করছিল, কিন্তু শর্মিষ্ঠার মধ্যে একচুলও অপরাধবোধ কাজ করছিলোনা।
তাই পরের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত যতক্ষণ শর্মিষ্ঠা রাজুর কাছে অবস্থান করছিল, তার মধ্যে বারেবারে রাজুকে সঙ্গমের জন্য আহ্বান করেই চলেছিল। আর রাজু যেন বশ হয়ে গেছে শর্মিষ্ঠার কাছে। সে আহবানে সারা দিতে চাইছে নাকি চাইছেনা, সেই বিচারশক্তিও হারিয়ে ফেলেছে।
শুধু সেই দিনের কথা নয় এটি। সেইদিনের পর থেকে, প্রায় প্রতিদিন শর্মিষ্ঠা রাজুর কাছে উপস্থিত হতো, আর প্রতিদিন দুইজন কপতকপতি সঙ্গমে আবদ্ধ থাকতো, একে অপরের লাবণ্যকে গ্রহণ করার জন্য। পরের দিন চারেক, প্রায় সংলাপ হয়না বললেই চলে দুইজনের মধ্যে। শব্দ যা কিছু উচ্চারিত হতো তাদের দুইজনের মধ্যে তা হলো চুম্বনের ধ্বনি ও সঙ্গমতৃপ্তির ধ্বনি।
চারদিন পর, শর্মিষ্ঠার আগ্নেয়গিরি বোধ করা যায় একটু শান্ত হয়েছিল। সে রাজুর কাছে যেতে, রাজু তার মাথায় হাত রেখে বলল, “শুধুই ভোগ আর সম্ভোগের মধ্যে আমাদের সম্বন্ধেকে আটকে রেখো না শর্মিষ্ঠা। আমরা দুজন মিলে জগতকে, মানবসভ্যতাকে অনেক কিছু দিতে পারি। … আমরা কি শুধুই একে অপরকে সঙ্গমসুখ প্রদানকারী! একে অপরের বন্ধু নই?”
শর্মিষ্ঠা হেসে বলল, “নেশাগ্রস্ত হয়ে গেছিলাম, তাই না। আমি তো হয়েছিলামই, তোমার কথা বলতে পারবো না”।
রাজু হেসে বলল, “আমিও। … তোমার রূপলাবণ্য আমার সমস্ত অন্য ভাবনাকেই বন্ধ করে দিয়েছিল। ভয়ঙ্কর নেশা। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব সঠিক বলেছেন। ধনের নেশা আর কামের নেশা অতিসর্বনাশা। সজ্জন ব্যক্তিদেরকেও দুশ্চরিত্র লম্পট করে দেয়”।
শর্মিষ্ঠা ডুকরে হেসে উঠে বলল, “না না রাজু, তুমি এমন কিছু করো নি। বরং চরিত্রহীনার ভূমিকায় আমিই বেশি ছিলাম। সম্ভোগ সর্বস্ব হয়ে উঠেছিলাম এই কয়দিন। যেন মনে হচ্ছিল, সম্ভোগের জন্যই দেহ ধরেছি আর সম্ভোগের জন্যই দেহ ধরে রয়েছি”।
রাজু মাথা নেড়ে বলল, “পরস্ত্রীকে মর্দন, এর থেকে বেশি দুশ্চরিত্রের কর্ম কিই বা হতে পারে”।
শর্মিষ্ঠা হেসে উঠে বলল, “নারীর অভিপ্রায় অনুসারে তাকে মর্দন করা পুরুষ কখনোই দুশ্চরিত্র হয়না রাজু। তুমি আমার অভিপ্রায়কেই তুষ্ট করেছ। আমার উপর তুমি কনো সময়ে, কনো প্রকারে জোর খাটাও নি, না মনের উপর, না দেহের উপর আর না চরিত্রের উপর। … ছাড়ো অসব কথা ছাড়ো। … এই শর্মিষ্ঠা তোমার। … তোমার যখন ইচ্ছা হবে, একে ভোগ করতে পারো। জানি তুমি এই অনুমতি দেবার পরেও, একপাও আগে বাড়াবে না, কারণ সত্যই তুমি একজন আদর্শপুরুষ। … তবে চিন্তা করো না, আমি সময়ে সময়েই আছরে পরবো তোমার উপর।
(দুষ্টু হাসি হেসে) যাইহোক, এবার তোমার কাহিনীটা বলো তো। … পুরোটা বলো না। জানোই তো সুন্দরী স্ত্রীদের মেধা একটু দুর্বল হয়। … তাই পুরো কাহিনী বললে, যদি গুলিয়ে ফেলি!”
রাজু উত্তরে বলল, “মিছে কথা, সুন্দরী স্ত্রী বা ওরকম কনো ব্যাপার নেই। যে সর্বক্ষণ নিজের রূপ নিয়ে চর্চা করে, সে পুরুষ হোক বা স্ত্রী, মেধার থেকে দূরে তারা সরে আসে। শরীরসর্বস্বতাই মেধার হ্রাসের কারণ, রূপ বা সৌন্দর্য নয়। … তাই আমি তোমাকে আজ পুরো কাহিনীরই বিবরণ দেব। শোনো মন দিয়ে এবার”।
এই বলে রাজু তার কাহিনী বলা শুরু করে, যার নাম ‘অন্ধকার ইতিহাস’, ‘ডার্ক হিস্ট্রি’। রাজু বলা শুরু করে, “গল্পের শুরু হচ্ছে একটা রাজ্যের একটি অত্যাচারী গোষ্ঠীর কীর্তি থেকে। পিকচারাইজেশন এরকম যে, সেই রাজ্যে একটি উন্নতমনের আদিবাসী সম্প্রদায় বড়ই সুখশান্তির সাথে বিরাজ করছে। আর অন্য একটি বহিরাগত গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে জল্পনা করছে যে, তারা এই সম্প্রদায়কে অধিকার করে নেবে।
প্রশ্ন ওঠে যে কি ভাবে তা সম্ভব! একজন এঁদের মধ্যে সম্মুখে আসে, যে অত্যন্ত চতুর ও বলা চলে ধূর্ত। আর সে সম্মুখে এসে বলে, ধনের প্রাধান্য এমন ভাবে বৃদ্ধি করতে হবে যাতে ধন ছাড়া কনো মানুষ বেঁচে থাকতে না পারে। তারপরে সমস্ত ধনকে কুক্ষিগত করে, এই সম্প্রদায়কে পায়ের নিচে রাখা যাবে। আবার প্রশ্ন ওঠে যে, কি ভাবে তা করা সম্ভব হবে। তো উত্তর দেয় সেই ধূর্ত ব্যক্তি, এই আদিবাসীদের রাজকর্মচারীদের মধ্যে মিশে যেতে হবে, আর এঁদেরকে অত্যাচারী রূপে দেখাতে হবে। এই বলে এক দল এই বহিরাগত চতুর দাঙ্গাবাজ আদিবাসী সম্প্রদায়ের রাজার সেনা, মন্ত্রীদের সাথে মিশে গেলে, কাস্টিং আসবে, অন্ধকার ইতিহাস বলে”।
শর্মিষ্ঠা বলল, “সিনেমার ভূমিকা এটা। তাই তো! … বেশ ভালো। বেশ অন্য রকম। পিকচারাইজেশন হচ্ছে চোখের সামনে। একটু ফাস্ট চলছে এই জায়গাটা। মানে ৫-৭ মিনিটের মধ্যে এই সমস্ত কিছু দেখিয়ে দেওয়া হলো”।
রাজু বলল, “সাবাস। … এবার আসল সিনেমা শুরু হলো। সেখানেও ছবির গতি বেশ ফাস্ট। একের পর এক, সেনা, মন্ত্রীমণ্ডল, জ্ঞানসভা, বিদ্যাপীঠে এই দাঙ্গাবাজরা একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে করে, আধিকারিকদের মনে বিষ সঞ্চার করতে থাকলো সিনেমার পরের ১৫ মিনিট। আর তারপরের ১০ মিনিটে দেখানো হলো যে সম্পূর্ণ সম্প্রদায় অত্যাচারী হয়ে উঠে দুভাগ হয়ে গেল। আর তাদের মধ্যে এক দল দাঙ্গাবাজ রাজার সেনার সাথে মিলে, দুই গোষ্ঠীর এক গোষ্ঠীর প্রয়াত সেনাপতির গর্ভবতী স্ত্রীর পিছনে ধাওয়া করলে, একটি গোশালায় সেই স্ত্রী লুকিয়ে নিজের প্রাণ রক্ষা করে।
আর ঠিক তারপরে দেখানো হচ্ছে যে, আমাদের সিনেমার মুখ চরিত্র, অর্থাৎ সেই ভিলেন, যেই অতি ধূর্ত লোক, আর যাকে এখনো পর্যন্ত পিছন থেকেই দেখানো হচ্ছিল, তিনি প্রবেশ করছেন। এই চরিত্রটি একটি স্টারকাস্ট হতে হবে শর্মিষ্ঠা, কারণ এই চরিত্রের অভিনয়ও যেমন বিস্তর আছে তেমন এর অভিনয়ের মধ্যে থাকবে ধূর্ততা আর গ্রেভিটি, বুঝলে!”
শর্মিষ্ঠা উত্তরে বলল, “পিকচারাইজেশনটা হেভি লাগছে। … মানে আমাদের সিনেমাটা ভিলেন-বেসড!”
রাজু উত্তরে বলল, “না। … তবে আমাদের সিনেমাতে হিরো আর ভিলেন একসাথে কখনোই স্ক্রিন শেয়ার করছে না। … পুরো সিনেমা, মানে তিনভাগের সিনেমার অর্ধেকটা সময়ে আমাদের ভিলেন, যিনি একজন স্টারকাস্ট, তিনি একাকী সিনেমার উপর আধিপত্য বিস্তার করে থাকছেন। আর বাকি অর্ধেক সময়ে হিরো আসছে, আর তখন হিরো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। … মানে যখন ভিলেন দাপট দেখাচ্ছে, তখন হিরো জন্ম নেয়নি, আর যখন হিরো দাপট দেখাচ্ছে তখিন ভিলেন অলরেডি মরে ভূত হয়ে গেছে”।
শর্মিষ্ঠা খানিক চুপ করে থেকে বলে উঠলো, “মানে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে পুরো সিনেমাটা। অনেকটা রেইয়েলিস্টিক, আর সাথে সাথে ড্রামাটিকও। … হুম, বেশ অন্যরকম। হিরো আর ভিলেন কখনোই মুখোমুখি হচ্ছেনা, কারণ দুজনের টাইম স্কেলটাই আলাদা। কিন্তু দুজনেই নিজের নিজের সময়ে দাপট দেখাচ্ছে। … দারুণ ক্লাইম্যাক্স। সম্পূর্ণ অন্যরকম। … ভিলেন সিনেমায় ঢুকছে, সিনেমার আধ ঘণ্টার মাথায়। তারপর বলো”।
রাজু বলতে থাকলো, “ভিলেন যখন ঢুকছে, ততক্ষণে সেই অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সন্তানের জন্ম দিয়ে দিয়েছেন আর সেই সন্তান ৩-৪ বছরের একটি ডানপিটে ছেলে। ভিলেন সরাসরি সেই সন্তানের মায়ের কাছে গিয়ে বলে, তার সন্তানকে উনার চাই। এই অত্যাচারী রাজা, মুকুন্দের থেকে যদি কেউ রাজ্যবাসিকে মুক্ত করতে পারে, তাহলে সেটি তার সন্তান সোম’ই, তবে তার সন্তানকে সেই কাজ করার জন্য পারদর্শী হয়ে উঠতে হবে, যেটা তিনি স্বয়ং করবেন।
চোখে মুখে অভিনয় থাকবে ভিলেনের। মানে, সোমের মায়ের কাছে, সাধারণ মানুষের কাছে তিনি একজন ভগবান, মানে রক্ষক সাজবেন, অথচ তিনি কাজ করছেন সেই বহিরাগত গোষ্ঠীর হয়ে, অর্থাৎ সম্পূর্ণটাই তার ষড়যন্ত্র। বুঝতে পারছো তো! একই সঙ্গে ভগবানতুল্য ভালো মানুষ যিনি একজন দৃঢ়চিত্ত যে প্রজাকে ভালো জীবন দেবেন, সেটিও থাকবে, আর একজন খল অর্থাৎ যিনি সুখে থাকা গোষ্ঠীকে পরগাছা করে তুলতে চান, এটিও থাকবে। … বেশ ভালো অভিনেতা নিতে হবে এই ব্যক্তিত্বের কারণে। … প্রয়োজনে নাট্যজগত থেকে কারুকেও নিতে পারো। আমার নজরে তিনজন এমন আছেন। আমরা বেরুবো কাল, নিয়ে যাবো তোমাকে এঁদের কাছে। এঁদের অভিনয়ের ক্ষমতা দেখবে, তারপর সিদ্ধান্ত নেবে”।
শর্মিষ্ঠা খানিক ভেবে বলল, “ঠিকই বলেছ, বাংলা চলচ্চিত্রে এখন যারা রয়েছেন, তাদের মধ্যে শুধু খল হবার ক্ষমতাধারিও আছে, আবার দুটি চরিত্র একসাথে করার অভিনেতাও আছে। … কিন্তু বাইরের কারুকে চাইছ কেন?”
রাজু হেসে বলল, “চেহারা আর উচ্চতা। … শর্মিষ্ঠা, দীর্ঘকায় দেহ যাদের তারা এতো মাস লেভেলে খল হতে পারেনা। মাস লেভেলে খল হতে, ৫ ফুট আটের মধ্যে উচ্চতা হতে হবে, আর বেশ গাঁট্টাগোট্টা চেহারা হবে। … চোখে মুখের মধ্যে দাপট দেখা যাবে। জনমানসের সেবা করে যেন উপকার করছে তাদের উপর, এমন একটা দাপট থাকবে। কণ্ঠস্বর হবে কর্কশ অথচ কিছুটা গভীর। আর খলভাব থাকবে শুধু তার চোখ, ভ্রু আর ঠোঁটের মধ্যে, যা শুধু দর্শকরা দেখতে পাবে, একজনও স্ক্রিনের সাধারণ মানুষ দেখতে পাবেনা”।
শর্মিষ্ঠা মাথা নেড়ে বলল, “বুঝে গেছি। তারপর কি হলো বলো”।
রাজু বলতে থাকলো, “তারপর, সেই ৩-৪ বছর বয়সী সোমকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলো ভিলেন, আর সে বড় হয়ে উঠলো। তার বড় হওয়ার সময়কালের মধ্যে সেই বহিরাগত সম্প্রদায় সম্পূর্ণ রাজকাজকে বিষিয়ে দিয়েছে। প্রজাদের নিপীড়ন হচ্ছে। এমন সময়ে সেই ধূর্ত ভিলেন, যিনি কুটিলগুরু নামে পরিচিত হয়ে গেছেন, তাঁর নির্দেশে এক সেনা গোষ্ঠীর নির্মাণ হয়, আর তারা আক্রমণ করে সেখানে রাজা ও রাজসেনাকে। আর এরই মধ্যে কুটিলগুরুর নির্দেশে, রাজমহলে প্রবেশ করে সোম চোরাগোপ্তা রাজার হত্যা করে।
এই যুদ্ধের আবেশ তৈরি করা হবে আধ ঘণ্টা ধরে, যেখানে বেশ কিছু ডাইলগ আর উত্তেজিত চরিত্রদের উত্তেজনামূলক আচরণ নিয়ে, আর যুদ্ধ হবে আরো আধঘণ্টা। মানে সিনেমার এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট এখানেই চলে যাবে। তারপর দেখানো হবে, আরো একটি বহিরাগত সম্প্রদায় এই রাজ্যকে অধিকার করতে আসে, আর তাদের থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করে ভিলেন, চোরাগোপ্তা সেই নবাগত সম্প্রদায়ের সেনাপতির কন্যা, সেলিনাকে অপহরণ করে এনে, নতুন রাজার সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়, আর কন্যার শ্বশুরবাড়ি বলে সেই সম্প্রদায়কে যুদ্ধ থেকে অপসারিত করে দেয় কুটিলগুরু।
আবারও দেখা যায় যে, যেই রাজাকে হত্যা করে নতুন রাজা রূপে অবস্থান করছিলেন সোম, সেই পুরাতন রাজার এক কন্যা, দুহিতা, প্রতিশোধ স্পৃহা রাখলে, তারও বিয়ে দিয়ে দেয় কুটিলগুরু সোমের সাথে, আর এই ভাবে সমস্ত শত্রুতার নাশ করে দেয় সে। এই দুই মিলিয়ে আরো ৪৫ মিনিট সময় নেব। মানে আড়াই ঘণ্টা হয়ে গেল।
এবার প্রথম অধ্যায়ের শেষে এসে, দেখানো হবে যে সোমের এই দুই স্ত্রী মানে সেলিনা ও দুহিতা থাকা সত্ত্বেও নিঃসন্তান থাকে, আর তাই আরো একটি বিবাহ দেওয়া হয় তার। কিন্তু এই নতুন স্ত্রী, অধরা, গর্ভবতী অবস্থায় থাকাকালীন কেউ তাকে বিষ দেয়, আর তার কারণে তিনি দেহত্যাগ করেন, আর এই বিষ দেওয়ার অভিযোগে দুহিতাকে, যিনিও রাজার স্ত্রী ছিলেন, তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, এবং তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। আর এই সমস্ত কিছুর পরে, একটা খল হাস্য প্রদান করে কুটিলগুরু, আর ঠিক সেই অবস্থায় কুটিলগুরুকে পিছন থেকে কেউ তরবারি দিয়ে হত্যা করে।
কুটিলগুরু যখন পিছন ফিরে দেখে, তখন দেখে যে সোম হলেন তার হত্যাকারী। … প্রথম অধ্যায়ের সিনেমাকে এখানেই শেষ করা হবে, পুরো সাসপেন্স নিয়ে যে, কেন শিষ্য তার গুরুকে হত্যা করলো”।
শর্মিষ্ঠা আনন্দের সাথে বলে উঠলো, “ব্রেভো। দারুণ কাহিনী। … অদ্ভুত। কিন্তু সত্যিই তো কেন মারল শিষ্য গুরুকে?”
রাজু মুচকি হেসে বলল, “তুমি তো বললে শুধুই প্রথম পার্টটা শুনবে, আগে আর শুনবে না!”
শর্মিষ্ঠা শিশুসুলভ ভাবে বলে উঠলো, “বলো না। … খিদে বাড়িয়ে দিয়ে এখন আর খেতে দিচ্ছে না!”
রাজু হেসে উঠে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা, বলছি। … সেকেন্ড পার্ট, মানে অন্ধকার ইতিহাস ২, বা ডার্ক হিস্ট্রি ২ এর শুরু হচ্ছে। শুরুতে প্রথম পার্টের ওই সিনটা আবার দেখানো হবে, যেখানে শিষ্য গুরুর হত্যা করছে। আর দেখানোর পরে, ফাস্ট রিওয়াইন্ড করে, সেখানে নিয়ে চলে আসা হবে যেখানে রাজা সোমের তৃতীয় স্ত্রী, অধরা অন্তঃসত্ত্বা।
সেই কালে, আমাদের মহাগুরুর আসল ছলময় রূপ বাইরে আসা সবে শুরু করেছে। বিশাল সেনা নির্মাণ করে সে রাজা সোমকে দিয়ে, আর তারপর নিজবুদ্ধিহীন সোমকে ব্যবহার করে, বিভিন্ন স্থানের বন জঙ্গল সাফ করে করে, সেখানে ক্ষেতখামারি বসিয়ে দেওয়া শুরু করে। সমস্ত প্রজাকে সেই ক্ষেতে শ্রমিক রূপে নিযুক্ত করে দিয়ে, সমস্ত শ্রমজীবীদেরকে একটি পৃথক জাতিরূপে চিহ্নিত করে দেয়, আর তাদেরকে সেনা, সমাজচালক এবং বাণিজ্যকরা ব্যক্তিরা শোষণ করা শুরু করে, এমন দেখানো হয়।
সাথে সাথে এও দেখানো একাধিক সিন-দিয়ে যে, সমস্ত প্রজাকে এভাবে ধনের কাছে পরাধীন করে তুলল সেই মহাগুরু আর মেরুদণ্ডহীন সোম। অর্থাৎ, আর কেউ ফলাহার ও শিকার দিয়ে উদরপূর্তি করতে গেলে, অর্থাৎ আদিম প্রন্থা অনুসারে জীবন নির্বাহ করতে গেলে, তাকে বলা শুরু হয় অর্বাচীন এবং তাকে সমাজ থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়। সমাজে বসবাসের যোগ্য কেবল তাদেরকে বলা হয়, যারা ধন উপার্জন করে, এবং ধনের মাধ্যমে সমস্ত কিছুকে ক্রয় করে।
আর সেই পদ্ধতিতেই শ্রমজীবী হতে থাকলো দরিদ্র, কারণ তাদের শ্রমকে ব্যবহার করে করে, সমস্ত বণিক, সেনা, এবং বিদ্যজন বহু ধন সমন্বয় করা শুরু করে এবং উচ্চবিত্ত হয়ে ওঠে তারা। সমাজ যখন এই ভাবে ধনের কাছে পরাধীন হওয়া শুরু করলো, তখন এই মহাগুরু ও মেরুদণ্ডহীন রাজার রাজ্যকে সোনার পক্ষী বলা হতে শুরু করে, আর তাই সেই মহাগুরুকে সমাজের সমস্ত বিত্তবান, অর্থাৎ বিদ্যজন, সেনা ও বণিক আদর্শ মানা শুরু করে, তাকে বাস্তবেই মহাগুরু উপাধি দিয়ে দেয়।
অন্যদিকে সেই বহিরাগত সম্প্রদায় সর্বত্র মহাগুরুর জয়জয়কার করলেও, মেরুদণ্ডহীন সোমের জয়জয়কার মহাগুরুর জয়জয়কারকে চাপা দিতে শুরু করে, আর তার কারণে মহাগুরু এবার প্রত্যক্ষ ভাবে ছলনা করতে, রাজা সোমের খাবারে বিষ দিয়ে তাকে হত্যা করার প্রয়াস করে, যাতে করে এবার শুধু তারই জয়গান গায় সকলে। কিন্তু এই কর্মের ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হয়ে গেল, কারণ সোম সেই আহার গ্রহণ না করে, সেই আহার গ্রহণ করে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, অধরা।
মৃত্যুর মুখে ঢলে পরলে, রাণী দুহিতা আপ্রাণ প্রয়াস করেন অন্তঃসত্ত্বা রাণীকে প্রাণে বাঁচানোর, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন রাণী অধরাকে বাঁচাতে। তবে তা সত্ত্বেও রাণী অধরা সন্তানের জন্ম দিয়ে তবেই মৃত্যু লাভ করেন। খল মহাগুরু এবার নিজেকে বিষ প্রদান করার অভিযোগ থেকে বাঁচাতে দুহিতাকে দোষী ঘোষণা করে দেন, কনো বিচার না করতে দিয়ে, এবং তাকে কারাবন্দী করে দেন। এখানে দ্বিতীয় খণ্ডের ইন্টারমিশান।
ইন্টারমিশনের পর দেখানো হয়, মেরুদণ্ডহীন সোম কিছুই বোঝেন না। তাঁর আরো এক রাণী, সেলিনা তাকে তাই বোঝানোর প্রয়াস করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। তাই এবার সেই রাণী বেশ কিছু তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে মহারাজের থেকে বিচার চান কারাবন্দী মহারানী দুহিতার জন্য। বিচারের সময়ে মহাগুরুর বিরুদ্ধে যখন সমস্ত তথ্য প্রমাণ চলে যায়, তখন মহাগুরু বলেন যে, তিনি মহারাজকে শত্রুর থেকে বাঁচানোর জন্য, প্রতিদিন একটু একটু করে বিষ প্রদান করেন, যাতে তার উপর কনো বিষক্রিয়া না হয়।
ভিত্তিহীন হাস্যকর কথা সেটি, তবে সকলে সেই কথাকে সম্পূর্ণ মিথ্যাকথা জানলেও, মেরুদণ্ডহীন সোম মহাগুরুর প্রতি অন্ধবিশ্বাস তাকে কিছুই বুঝতে দেয়না। কারামুক্ত হয় কারাবাসী রাণী দুহিতা। আর দুই রাণী মিলে রাজপুত্র শতবিন্দুকে এবার মানুষ করেন। রাজপুত্র শতবিন্দু বড় হতে, সে তার দুই মাতার থেকে সমস্ত কথা জানেন মহাগুরু সম্বন্ধে আর এতদিনে মহারাজ সোম সমস্ত কথা জানতে পারেন মহাগুরুর ব্যাপারে।
নিজের ক্রোধকে দমন করে তাই রাজা সোম রাজ্যত্যাগ করে সন্ন্যাসী বেশে রাজ্য থেকে চলে যান। আর রাজপুত্র শতবিন্দু এবার রাজার আসনে বসে, সুরক্ষাবিহীন মহাগুরুকে কারাবন্দী করেন, এবং মৃত্যুদণ্ড দেন। আসল কথা এই যে, সোমের এই পুত্রকে সোমের মতই দেখতে করা হবে, আর তাই সিনেমার প্রথম ভাগের শেষে দেখান হয় যে সোম মহাগুরুর হত্যা করছে, কিন্তু আসলে সেই হত্যা করছে শতবিন্দু।
সিনেমার একদম শেষে দেখানো হবে যে, মহাগুরুর হত্যার পর সেই বহিরাগত সম্প্রদায় খানিক দমে গেলেও, কিছুদিন পর থেকে শুরু হয় তাদের শ্রমিকশোষণ অধ্যায়, আর এবার মাত্রাছারা হয়ে যায় তাদের শোষণ। আর সেই সমস্ত কিছু দেখে প্রাপ্তবয়স্ক রাজা শতবিন্দু মাথায় হাত দিয়ে বসে পরেন, কারণ তিনি প্রজাদের উদ্ধার করার জন্য কিচ্ছু করতে পারেন না। আর ঠিক সেই সময়ে এক মহীয়সী নারী তার কাছে আসেন আর বলেন, ‘মহারাজ, চিন্তা করবেন না। আমার চিন্তা যিনি নিবারণ করবেন, সে এসে গেছে, আপনার চতুর্থ পুত্র জন্ম নিয়েছে’। অন্ধকার ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্বের এখানেই সমাপ্তি”।
শর্মিষ্ঠা অবাক বিস্ময়ে নিঃশব্দ হয়ে রাজুকে দেখতে থাকে। রাজু খানিক পরে শর্মিষ্ঠাকে বলল, “এভাবে দেখছো কেন? দেখ … আমার কিন্তু আর সঙ্গমের ইচ্ছা নেই। প্লিজ, আমরা ভালো বন্ধু, আর তুমি এই সঙ্গমের নেশা ধরিয়ে দিয়ে আমাদের বন্ধুত্ব সম্পর্ক থেকে আমাকে বারবার সরিয়ে আনছো”।
শর্মিষ্ঠা রাজুর কাছে এগিয়ে গেলে, রাজু নিজেই নিজের শরীরকে দেওয়ালে সিটিয়ে দিলো। শর্মিষ্ঠা রাজুর গালে হাত দিতে, রাজু চোখ বন্ধ করে নিলো। শর্মিষ্ঠা হেসে উঠে বলল, “তা যখন আমি এগিয়ে যাই, বাঁধা দাও না কেন? তুমি বাঁধা দিলে আমার কি এতো দেহবল আছে যে …”।
রাজু চোখ খুলে বলে উঠলো, “কি বলছো শর্মিষ্ঠা! … তোমার উপর শারীরিক বল প্রয়োগ করবো আমি! … না না, এ যে হতে পারেনা। … আর সত্যি বলতে, তোমার এমন রূপ যখন আমাকে জরিয়ে ধরে, আমি আর নিজের আদর্শকে ধরে রাখতে পারিনা, বশীকরণ হয়ে যায় যেন আমার উপর”।
শর্মিষ্ঠা একটা দুষ্টু হাসি হেসে বলল, “অদ্ভুত কাহিনী রাজু। এতো রাজারাজরা নিয়ে সিনেমা হয়েছে, কিন্তু এমন সিনেমা কখনো হয়নি। হয় রাজপুরের মধ্যের রাজনীতি, নয় রাজপুরের বাইরের রাজনীতি। একই সঙ্গে দুটো স্তরেই রাজনীতি চলছে, এমন গল্প আমি প্রথমবার শুনছি। অদ্ভুত পিকচারাইজেশনও। মানে, সঠিক জায়গায় সাসপেন্স, সঠিক জায়গায় মিস্ট্রি, দুরন্ত ধূর্ততা, কিন্তু একটা জিনিস এখনো পাইনি, যেটা পাবলিক খোঁজে, মানে দুরন্ত একশান”।
রাজু হেসে বলল, “শর্মিষ্ঠা, আশা করি প্রথম দুটো পার্ট আমাদের ১০০ কোটি করে অন্তত প্রফিট দিয়ে দেবে। লাস্ট পার্টে দুরন্ত একশান আছে, তবে ভিজুয়াল এফেক্টের কাজ প্রচুর। অনেক পয়সা লাগবে। আর সেই কারণেই এই সমস্ত কিছু লাস্টপার্টে রেখেছি”।
শর্মিষ্ঠা এবার দুষ্টুমি মাখা একটা হাসি হেসে বলল, “তাড়াতাড়ি বলো, নাহলে আমার কিন্তু ফিলিংস জাগছে। তোমার সমূহ বিপদ রাজু”।
রাজু ইয়ার্কিটা বোঝে নি। খানিকটা তোতলার মত করেই তাড়াতাড়ি তৃতীয় খণ্ড, অর্থাৎ ডার্ক হিস্ট্রি ৩এর গল্প বলা শুরু করে দেয়। শর্মিষ্ঠা রাজুর এই সরল স্বভাব দেখে মুচকি হেসে কাহিনীতে মনোযোগ দিলো। রাজু বলতে শুরু করলো, “শেষ পার্টে দেখানো হচ্ছে সেখান থেকে যেখানে দ্বিতীয় পার্টের শেষ হচ্ছে, মানে সেই বহিরাগত সম্প্রদায়ের আগ্রাসন, আর রাজা শতবিন্দুর আক্ষেপ।
এরপর দেখানো হয় যে, রাজা শতবিন্দুর চার চারটি পুত্র ছিল যাদের মধ্যে কনিষ্ঠ পুত্রের নাম নির্দয়। প্রকাণ্ড বলশালী, আর উগ্র সেই পুত্র। বড় হয়ে ওঠার কালে, সে সমস্ত মহাগুরু ও তার সম্প্রদায়ের আগ্রাসনের কথা শোনে, আর সেই আগ্রাসনের কারণে বর্তমানে শ্রমিক শ্রেণী প্রজার উপর বাকিদের অত্যাচার ও শোষণও দ্যাখে আর বারবার তার প্রতিকার চায়, তার পিতা শতবিন্দু ও তার তিন জ্যেষ্ঠভ্রাতা শশী, বিগত, এবং ত্বিষের কাছে।
কিন্তু সকলেই তাকে থামিয়ে দেওয়ার প্রয়াস করে, কারণ সমাজকর্তাদের ভয়ে তারাও জড়সড়। নির্দয় কারুকে ভয় করেনা, কনো কিছুকে পরোয়া করেনা। সে সরাসরি এবার তাই যুদ্ধক্ষেত্রে অবতরণ করলো, এবং সেনা, বিদ্যজন এবং বণিকদের হত্যা করা শুরু করলো। প্রবল বল তার। নির্দয়ের বলের সামনা করার সামর্থ্য কারুর নেই। তাই বিদ্যজনদের সাথে মিলে বণিক আর সেনাধ্যক্ষরা রাজা শতবিন্দুকে এবং তাঁর বাকি তিন পুত্রকে বোঝালো এবং বোঝানোর থেকেও বেশি ভয় দেখালো।
রাজা শতবিন্দুর পুত্ররা নির্দয়ের হত্যা করার জন্য ষড়যন্ত্র করা শুরু করলো, আর সেই ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে, শোকে জর্জরিত হয়ে, রাজা শতবিন্দু দেহত্যাগ করলো। নির্দয়ের রাস্তাও পরিষ্কার হয়ে গেল, আর তার বাকি ভাওইদেরও। রাজা শতবিন্দু নির্দয়কে সরাসরি আদেশ দিতেন না। কিন্তু শশী রাজসিংহাসনে বসে নির্দয়কে যুদ্ধবিরামের আদেশ দিলো। নির্দয় সেই আদেশের অবহেলা করলে, রাজদ্রোহী উপাধি দিলো তাকে, এবং সমস্ত সেনাকে তার বিরুদ্ধে চালনা করা শুরু করলো।
সেনার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি নির্দয়কে নিজেদের আদর্শ মানে। কিন্তু তাও রাজার আদেশই শেষ কথা। আর তাছাড়া যার বিরুদ্ধে সমস্ত রাজ্য, তার তো রক্ষা পাওয়া সম্ভবই নয়। নিশ্চিত যার পরাজয়, তার সঙ্গ দেওয়ার অর্থ নিজের মৃত্যু ডেকে আনা, এমন পরামর্শ চলে সেনামণ্ডলীতে। অবশেষে দিকদিক থেকে নির্দয়ের উপর আক্রমণ আসে।
কিন্তু নির্দয় ভয়ানক যোদ্ধা। নামেও যেমন নির্দয়, কাজেও তেমন। রণক্ষেত্রে চরণ রাখলে সে যেন তাণ্ডব করা শুরু করে। শত্রুর রক্তে স্নান করা যেন তার কাছে এক নেশা। প্রকাণ্ড যুদ্ধ দেখানো হয়, যেখানে নির্দয় পুরোপুরি ওয়ানম্যান আর্মি। সেনা ভয় পায়। আর যেই সেনারা নির্দয়কে আদর্শ মানতো, তারা সকলে এবার নির্দয়ের সাথে যুক্ত হওয়া শুরু করে।
নির্দয় সেই সেনা নিয়ে এবার বিদ্যজন, বণিক ও অন্য সেনাদের জীবন অতিষ্ঠ করে দেয়। কেউ জানেনা পরের দিনের সূর্যোদয় তো তারা দেখবে, কিন্তু সূর্যাস্ত দেখবে কিনা। শ্রমিকদের মধ্যে নির্দয়কে নিয়ে আলোড়ন জেগে ওঠে। নির্দয় তাদের রাজা। তাদের উপর যারা অত্যাচার করেছে এতকাল, তাদেরকে হত্যা করছে নির্দয়। এমন বিচার করে শ্রমিক মণ্ডলী নির্দয়ের সাথে বারে বারে সাখ্যাত করে, আর শেষে তারা তাকে রাজি করায় যে, তাকেই রাজার পদে স্থাপিত হতে হবে। তবেই রাজ্যের কল্যাণ হবে।
অন্যদিকে নির্দয়ের তিন ভ্রাতা, রাজা শশীর তত্ত্বাবিধানে গড়ে তোলে এক মহাষড়যন্ত্র। সম্যক যুদ্ধে তাকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়, কিন্তু যদি তাকে দুর্গের মধ্যে আবদ্ধ করে নেওয়া যায়! … তাই রাজা শশী তাকে এক দূরদেশ, নীলাচলে যুদ্ধে প্রেরণ করে, আর সেখানে দুর্গের মধ্যে নিজেরা তিন ভ্রাতা ও সেই রাজ্যের সমস্ত সেনাকে সজ্জিত রাখে শশী।
নির্দয় যুদ্ধে রত হয়। দুর্গ থেকে আক্রমণও শুরু হয়। নির্দয়ের প্রচুর সেনা প্রাণ হারায়। ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে নির্দয়। দুর্গের মধ্যে ছদ্মবেশে প্রবেশ করে, আর সমস্ত সেনার একাকী নাশ করা শুরু করে। এবং শুধু সেনা নয়, যুদ্ধের কালে সে তার এক ভ্রাতার হত্যা করে, আর বাকি দুই ভ্রাতাকে কারাবন্দী করে, সিংহাসন দখল্ করে। কিন্তু তারপরেও তার যুদ্ধের স্পৃহা নষ্ট হয়না।
বাকি সেনাদেরও হত্যা করতে শুরু করে সে। আর ঠিক সেই কালে একজন দিব্যপুরুষের আগমন ঘটে সেই স্থানে। নির্দয়কে রণক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে সে বলে, “যাদের তুমি হত্যা করছো, তারা তো আগে থেকেই মৃত। তাদেরকে এককালে মহাগুরুর সম্প্রদায় লুণ্ঠন করেছে আর আজ তুমি তাদেরকে হত্যা করছো। যার সাথেই যুদ্ধ করো, যার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করো, প্রাণ তো এরাই হারায়, নিপীড়ন তো এঁদের উপরই হয়”।
নির্দয়ের হাত থেকে তরবারি পরে যায়। হাঁটু গেড়ে বসে পরে। প্রজাঅন্ত প্রাণ সে। আর প্রজার উপর নিপীড়নকারীদের হত্যা করতে করতে, সে এবার প্রজাদেরকেই হত্যা করা শুরু করে দিয়েছিল। আর্তনাদ করে ওঠে বেদনায়। আর সেই সময়ে সেই দিব্যপুরুষ নির্দয়কে বলে, ‘যেই প্রজার কল্যাণের জন্য এই সমস্ত হত্যামঞ্চ সাজিয়েছ, এবার সময় এসেছে, সত্য সত্য তাদের কল্যাণ করা। তাদেরকে নতুন ভাবে সজ্জিত করো, নতুন নাম দাও তাদের পরিশ্রমের, তাদের সেই পরিশ্রমী শ্রেণীদের, আর সমাজে তাদেরকে কর্মচারীর সম্মান প্রদান করো’।
নির্দয় সিংহাসনে আঢ়ুর হলো। দিব্যপুরুষের কথামত সমস্ত কিছু করলো সে। প্রজার কাছে সে রাজা কম, পিতা অধিক হয়ে গেল। তার মধ্যে এবার সেই দিব্যপুরুষের থেকে দিব্যজ্ঞান ও দিব্যতার ভান করার স্পৃহা জাগে। আর তা গ্রহণ করে সে হয়ে ওঠে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা, যার ভয়ে বণিক, বিদ্যজনরা গুহাবাসী হয়ে গেল, সেনা মাথা নিচু করে নিলো আর শ্রমিক সুস্থ জীবন বাঁচতে শুরু করলো। … গল্প সমাপ্ত হলো”।
