পরিচালক | রোম্যান্টিক উপন্যাস

শর্মিষ্ঠা আবার একটু মুচকি হেসে বলল, “তা আমাকে যে কাহিনীটি শোনালে, কনো বিশেষ কারণ? … না মানে, অন্য কনো বাঙালি থাকলেই, গল্প শোনাতে, নাকি তাকেও সুন্দরী মহিলা হতে হতো তোমার মুখ থেকে কাহিনী শোনার জন্য?”

রাজু লজ্জায় মাথা নেড়ে হেসে বলল, “কি যে বলেন ম্যাডাম। আপনি এতো বড় পরিচালক, সামনে সামনে দর্শন পেয়েছি, তাই শুনিয়ে দিলাম কাহিনী”।

শর্মিষ্ঠা একটু ভ্রুকুঁচকে বলল, “তুমি আমাকে চেনো?”

রাজু হেসে বলল, “ম্যাডাম, কলকাতার আর্ট কলেজ থেকে সিনেমার নির্দেশনা শিখেছি, আর আপনার নাম শুনবো না! … আমি তো আপনার সিনেমা প্রতিটি দেখি, কি পারফেকশন আপনার কাজে। নিখুঁত চিত্রাঙ্কন, প্রতিটি অভিনেতার থেকে যেই অভিনয় আপনি চান, সেটা বার করে আনেন। … আর হ্যাঁ, আপনার বেশ কয়েকবার পেপারে ছবি দেখেছি। তাই আপনাকে দেখেই চিনতে পেরেছি যে, আপনিই হলেন শর্মিষ্ঠা খান্না”।

শর্মিষ্ঠা ঠোঁটটা হাস্যসহকারে বেঁকিয়ে বলল, “আচ্ছা, তার মানে তুমিও একজন নির্দেশক, তাই তো?”

রাজু মাথা নেড়ে বলল, “না ম্যাডাম, জানি করতে, ইচ্ছাও আছে করার, কিন্তু আপাতত কেবলই নাটকের নির্দেশনা করি। নাম নেই, পয়সা নেই, মহিলাও নই যে তাবড় তাবড় পুরুষ প্রযোজকদের তুষ্ট করতে পারবো। জানেনই তো আপনি সবটা, তাহলেই বলুন, কোন প্রযোজক আমার সিনেমাকে প্রোডিউস করবে!” মুচকি হেসে একটা জোরে নিশ্বাস ত্যাগ করে, আবার বলল রাজু, “কেউ না”।

শর্মিষ্ঠা এবার একটু ইগো ধারণ করেই বলল, “তারমানে তুমি বলতে চাইছো, আমি এই ভাবেই সিনেমা পেয়েছি প্রযোজকদের থেকে!”

রাজু উত্তরে হেসে ফেলে বলল, “এই তো দেখলেন, কেমন ফেঁসে গেলাম! এবার যা কিছু বলি, ডিরেক্টলি না হলেও, ইনডিরেক্টলি অন্তত আপনাকে অপমান করাই হয়ে যাবে। একজন জুনিয়ারের কি এমন ভাবে একজন সিনিয়ার, যার কাজকে সে মন থেকে কুর্নিশ করে, তাকে অপমান করতে পারে! … তাই ক্ষমা করবেন ম্যাডাম, এই প্রশ্নটা করবেননা আমাকে”।

শর্মিষ্ঠা একটু মুচকি হেসে বলল, “আচ্ছা বেশ, অভয় দিলাম। গায়ে মাখবো না তোমার কথা। এবার উত্তরটা দাও, আমিও কি একই ভাবে কাজ পেয়েছি!”

রাজু একটু ইতস্তত করে, বারে বারে শর্মিষ্ঠার দিকে চোখ রেখে আবার সরিয়ে নিয়ে বলতে থাকলো, “দেখুন ম্যাডাম, প্রথম কথা তো আপনি বিখ্যাত বান্ধব বৈদ্যের একমাত্র কন্যা। তাই কদর তো আপনাকে করতেই হবে সকলকে। মানে ইচ্ছা না থাকলেও করতে হবে, নাহলে সনামধন্য নাট্যপরিচালক বান্ধব বৈদ্যকে অপমান করা হয়ে যাবে। … তারপরেও, আমার কি মনে হয় জানেন, … মানে আপনি অভয় দিলেন বলেই বলছি, আগে না পেলেও, সাকসেস পেলে, আপনার কাছে ওই … বুঝতে পারছেন তো, মানে এডাল্ট কথা তো, তাই খুলে বলতে পারছিনা, মানে প্রস্তাব দিতো আপনাকে, এমন একটা পরিকল্পনা রেখেই কাজ দিয়েছে আপনাকে প্রযোজকরা। মানে আমি ভুল হতে পারি, কিন্তু আমার মনে হয় ওটাই”।

শর্মিষ্ঠা ঠোঁট বেঁকিয়ে মুখ টিপে একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল, “ওটা মানে কোনটা। তুমি কি নাবালক না আমি নবালিকা, যে এডাল্ট কথা বলে বলতে পারছো না!”

রাজু এবার একটু ইতস্তত হয়ে গিয়ে বলল, “বুঝতে তো পারছেন, তারপর আবার কেন ম্যাডাম। প্লিজ বুঝুন আমার জায়গাটা। মানে কনো ইমশানের কারণে নয়, যার সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি, সে আমার কাছে একজন আদর্শ। তার সামনে আমি … মানে বলতে কুণ্ঠা হচ্ছে এসব কথা”।

শর্মিষ্ঠা এবার একটু অন্য ঢঙ্গে, মানে নিজের দুই হাতকে বিবেকানন্দের পোজে রেখে দাঁড়িয়ে বলল, “ধরো তুমি স্ক্রিপ্ট পড়ছো, আর আমি পরিচালক, আর তোমার আদর্শও। তখন কি করে বলতে এডাল্ট কথা! … বলতে তো, যেই ভাবে বলতে, সেই ভাবে বলো”।

রাজু এবার মাথা নামিয়ে নিয়ে বলল, “আমার বিশ্বাস এই যে, আপনার পিতৃ ও মাতৃপরিচয়ের কারণে আপনাকে সরাসরি মুখের উপর না বলতে না পারলেও, হ্যাঁও বলতেন না যদি আপনি প্রযোজকদের কাছে উপভোগ্য না মনে হতেন। হ্যাঁ, আপনার পরিচয়ের কারণে প্রথমেই কনো রকম অশ্লীল প্রস্তাব দেন নি, সাকসেস পেয়ে গেলেই দিতেন। আপনার স্থানে অন্য কেউ হলে, মানে যার কাছে আপনার মত পিতৃ বা মাতৃ পরিচয় নেই, তাহলে শুরুতেই এই প্রস্তাব দিতেন। … আরো একটা কথা, এটা একটু সরাসরি কথা। তাই বলতে পারছিনা”।

শর্মিষ্ঠা আবার দুষ্টুমি ধারণ করে বলল, “স্ক্রিপ্টে আছে, বলতে তো হবেই তোমাকে”।

রাজু একটু মুখভঙ্গি করে অনুনয় করলো যাতে তাকে বলতে না হয়, কিন্তু শর্মিষ্ঠা সমস্ত অঙ্গভঙ্গি দেখার পর ভ্রুনাচিয়ে বুঝিয়ে দিলো যে, সে ছাড় পেতে পারছে না। অগত্যা এবার রাজু একটু গুছিয়ে গুছিয়ে বলার চেষ্টা করে বলল, “আসলে কি জানেন তো ম্যাডাম, আপনি খুব লাকি। … এক তো আপনি সাকসেস পেলেন না বলে, যাদের আপনার উপর চোখ ছিল পুরোপুরি বাজপাখির মত, তাতের হাত থেকে আপনি ফসকে গেলেন।

শেষে, যখন তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো আপনার থেকে, মানে হয়তো মুখে তারা কারণ দেখিয়েছে আপনার ফেলিওর, কিন্তু আসল কারণটা আপনিও জানেন, তখন আপনাকে সেই একই পদ্ধতিকে নিজের থেকে লাগু করতে হলো, আহমেদ খান্নার উপর।

মাফ করবেন ম্যাডাম, এই কথাটা বলতে চাইছিলাম না, কারণ এটা সম্পূর্ণ ভাবে আপনার ব্যক্তিগত জীবন। তাও যখন বলতেই হয়েছে, তাহলে পুরোটাই বলি। হ্যাঁ, প্রতিটি প্রযোজক যা চাইছিল আপনার থেকে, সেটা আপনিও খুব ভালো করে জানেন। তার আপনার থেকে হিট সিনেমা নয়, আপনার থেকে … মানে … প্লিজ জোর করবেন না সেন্সার বোর্ড আমার কথাকে বিপ করে দিলে, আমি বললাম অন্য কিছু চাইছিল”।

রাজুর এই কথাটা শুনে, শর্মিষ্ঠার ভিতর থেকে একটা ডুকরে হাসি এসে গেল। রাজু আবার বলল, “আপনার হাজব্যান্ডকে নিয়ে বললাম বলে মাফ করে দেবেন। এটা আমার অধিকারের বাইরে গিয়ে বলা কথা ছিল আমার। … তবে হ্যাঁ, একটা শেষ কথা বলতেই হয়। আপনি সত্যই খুব লাকি, কারণ যাকে আপনি বশ করতে চাইলেন, শুধুমাত্র তিনি আপনার সিনেমা প্রডিউস করবেন বলে, তিনি কিন্তু একজন ভালো চরিত্রের, ভালো মনের মানুষ হলেন। … না হলে…”।

শর্মিষ্ঠা হেসে বলল, “নাহলে কি!”

রাজু মাথা নেড়ে বলল, “কিচ্ছু না!”

শর্মিষ্ঠা হেসে বলল, “নাহলেটা আমিই বলে দিচ্ছি। … পর্দায় সাবিত্রী, আর পর্দার আড়ালে ব্যাশ্যা হয়ে জীবন কাটাতে হতো, এই তো!”

রাজু একটু কুণ্ঠিত হয়েই বলল, “মাফ করবেন ম্যাডাম, এই কথাগুলোই সত্যি, কিন্তু এই সত্যিটা সত্যিই খুব বেদনাদায়ক। আমরা কলাকার, কেউ নির্দেশক, কেউ অভিনেতা, কেউ অন্য কিছু, কিন্তু দিনের শেষে এটাই আমাদের নিজের কাছে নিজের দেওয়া পরিচয় যে, আমরা কলাকার। … কলা আমাদের কাছে সাধনা, কলা আমাদের কাছে ঈশ্বরের দান। কিন্তু সেই কলাকারীতার প্রকাশ করার জন্য লাগে ধন, মানে টাকা। আর তাই বণিকদের দ্বারস্থ আমাদের হতেই হয়। …

হতেই হয়, হ্যাঁ এই শব্দই ঠিক শব্দ। আপনিও একজন কলাকার। তাই ভালো করে জানেন। কলাকারের মধ্যে কলার প্রকাশ হতেই থাকে। তা প্রকাশ না করতে পারলে, দম ফেটে মরে যায় একজন কলাকার। কেমন বলুন তো, এক স্ত্রীর অণ্ডকোষের মতন। ব্যবহৃত হলে, তার থেকে সন্তান উৎপন্ন হয়, সৃষ্টি রচিত হয়, আর না হলে, স্ত্রী রজশীলা হয়ে যান, অর্থাৎ সেই অণ্ডকোষই ভেঙে চুরে, রক্তক্ষরণ করে বেদনার সঞ্চার করে।

তাই আমাদের যেতে হয় প্রযোজকের কাছে। আর সেখানে যাওয়া মাত্রই, (চোখে জল চলে এলো রাজুর কথা বলতে বলতে) আমরা আমাদের আরাধ্যা, মাতা সরস্বতীর থেকে বরদানের মত করে যেই কলাভাব লাভ করেছি, তাকে বিক্রি করে দিই। … এক কথায় আমরা আমাদের ঈশ্বরকেই বিক্রি করে দিই”।

শর্মিষ্ঠার বুকের কাছে জরকরে রাখা হাত নেমে গেছে। চোখ তারও ছলছল করছে এবার। রাজু বলতে থাকলো, “তাই ম্যাডাম, আমি না … ওই প্রযোজকদের কাছে দুচারবার যাবার পরে, আর যাবার চেষ্টাই করিনি। রজসিলা হবো অনেক ভালো, কিন্তু ধনাসুরদের বীর্য নিয়ে গর্ভবতী আমি হবোনা”।

রাজু চশমাটা সরিয়ে, হাত দিয়ে চোখের কোনের জল মুছে আবার চশমা পরে নিলে, শর্মিষ্ঠা অনেকটাই তার কাছে এগিয়ে এসেছিল। সে এবার রাজুর কাঁধে হাত রেখে বলল, “রাজু আমার সাথে মিলে সিনেমা করবে? কনো প্রযোজকের কাছে যেতে হবেনা। আমার স্বামীই আমার সিনেমার প্রযোজক। … করবে? তোমার গল্প খুবই ভালো, কিন্তু শুধু সেই কারণে বলছিনা। যিনি তোমার আরাধ্যা, তিনি আমারও, প্রতিটি কলাকারেরই আরাধ্যা। তাঁর প্রতি তোমার স্নেহ দেখে, আমার মনে হচ্ছে এই কথা।

ঠিক যেমন তোমার গল্পে, ওই মেয়েটিকে প্রকৃতি রেখেছিলেন, মানুষটার ক্যান্সার সারাতে, তেমনই এই গল্পে স্বয়ং মা সরস্বতী আমার সামনে তোমাকে রাখছেন। করবে রাজু, আমার সাথে মিলে সিনেমার পরিচালনা?”

রাজু উত্তরে একটু ভেবে বলল, “করতে পারি ম্যাডাম, তবে মুখ আপনিই থাকবেন। আমি আপনার নিচে কাজ করবো। প্রয়োজনে সমস্ত কাজ আমিই করবো, কিন্তু আহমেদ স্যারের কাছে বা মিডিয়ার কাছে বা সর্বত্র আপনিই থাকবেন। আমি যে আছি, সেটা শুধু আপনিই জানবেন, আর আপনার অভিনেতারা আপনার বিশ্বস্ত লোক বলে আমাকে চিনবে, বা আপনার চেলা বলে”।

শর্মিষ্ঠা হেসে বলল, “এবার, এটা কেন?”

রাজু উত্তরে বলল, “আসলে ম্যাডাম, আপনাকেই সকলে চেনে। আমাকে নয়। আর যেখানে প্রযোজক আপনার স্বামী, সেখানে যদি আমরা প্রফিট এনে দিতে পারি উনার কাছে, তাহলে তো অন্য কনো প্রযোজকের ব্যানারের প্রয়োজনই পরবেনা, তাই না!”

শর্মিষ্ঠা পুনরায় বিবেকানন্দ পজে চলে গিয়ে, ঘাড়টা একটু বেঁকিয়ে রাজুর দিকে তাকিয়ে, খানিক পরে হাসি হাসি মুখ করে বলল, “তোমার খ্যাতি পেতে ইচ্ছা হয়না!”

রাজু হেসে, একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, “না ম্যাডাম, খ্যাতি আমার প্রয়োজন নয়। সত্যি বলতে আমার কনো প্রয়োজনই নেই। প্রয়োজন আমাদের সকল শিল্পীদের আরাধ্যার, মানে মা সরস্বতীর। তিনিই তাঁর প্রয়োজন অনুসারে আমাদের মানে শিল্পীদের অন্তরে বিভিন্ন কাহিনী, নাট্য, নৃত্য, সুর, সামর্থ্য, ইত্যাদি সমস্ত কিছু প্রদান করতে থাকেন।

আসলে কি বলুন তো ম্যাডাম, আমরা তাঁকে মা মানি, অন্যরা হয়তো মানে না। কিন্তু তিনি তো সকলে মা, কারণ তিনি তো সেই পরাপ্রকৃতিরই এক অভিন্নপ্রকাশ। (অন্য দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে) আমরাই, বাণিজ্য, ধনপার্জন, ইত্যাদিকে মাথায় রেখে রেখে, তাঁর দেওয়া সুর, তাঁর দেওয়া কলা, তাঁর দেওয়া কাহিনীর পথে না গিয়ে, চলে যাই সেই সমস্ত নির্মাণের পথে, যার দ্বারা দেহের উদ্দীপনার বৃদ্ধি হয়। (এবার শর্মিষ্ঠার মুখের দিকে তাকিয়ে) আমি তাঁর দেওয়া কলাকে তাঁর সমস্ত সন্তানের কাছে পৌঁছে দিতে উৎসাহী।

মায়ের কথা সন্তান শুনতে পাক আবার করে, এই আমার প্রয়োজন। আর কনো কিছুর নয়। কলার প্রতিভা ও বোধ তিনিই প্রদান করেছেন আমার মধ্যে, অর্থাৎ আমি তাঁর বেছে নেওয়া কিছু সন্তানদের মধ্যে একজন, যার মাধ্যমে তিনি তাঁর বাকি সমস্ত সন্তানদেরকে কিছু বলতে চান। (আবার একটা জোরে শ্বাস নিয়ে, মিষ্টি হেসে) নিরাকার তো তিনি, তাই কনো না কনো মাধ্যম মানে মিডিয়াম লাগে, বুঝলেন তো ম্যাডাম। এবার আপনিই বলুন, যিনি আমাকে বেছে নিয়ে, আমাকে প্রতিভা, কলাবোধ দিয়ে সাজালেন, আমি তাঁর কাজ না করে, নিজের চিন্তা, নিজের খ্যাতির, উপার্জনের চিন্তা করি কি করে?”

শর্মিষ্ঠা মন দিয়ে রাজুর কথা শুনছিল, আর যেমন যেমন শুনছিল, তার মুখমণ্ডলের পরিভাষা সমানে পালটে যাচ্ছিল। শর্মিষ্ঠার মুখের মধ্যে একটা সম্ভ্রম, সদ্ভাব ও স্নেহের ভাব প্রত্যক্ষ হয়ে উঠছিল সমানে। রাজু নিজের কথা শেষ করতে, শর্মিষ্ঠা একটু আনমনা হয়ে থাকলেও, রাজুর দিকে তাকিয়ে একবার জোরে শ্বাস গ্রহণ ও বর্জন করে মিষ্টি হেসে বলল, “তুমি যা বলছো রাজু, প্রতিটি শিল্পীরই এমন করে দেখা উচিত জীবনটাকে। কনো শিল্পী এই ভাবে দেখেছে আমি জানিনা, তবে হ্যাঁ আমি অন্তত দেখিনি এই ভাবে”।

একটা ডুকরে হাল্কা হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে আবার বলল শর্মিষ্ঠা, “তোমার সাথে থাকার লোভ হচ্ছে রাজু। তোমার এই অভিব্যাক্তির প্রতি লোভ জাগছে। মনে হচ্ছে যেন, তুমি মায়ের সুপুত্র, আর আমি কুপুত্র। আর লোভ জাগছে, সঙ্গে সঙ্গে আশাও জাগছে যে, কু থেকে সু হয়ে উঠতে পারবো। … (আবার একটু নিঃশব্দ হাসি প্রদান করে) যে দেয়, শর্ত সে রাখতে পারে, যে নেবে সে নয়। এখানে দাতা তুমি, তাই তুমি শর্ত রেখেছ, কিন্তু আমি তো এখানে গ্রিহিতা। তাই আমি কনো শর্ত রাখতে পারিনা। হ্যাঁ নিঃশর্ত হয়েই আমি তোমার সাথে কাজ করতে প্রস্তুত”।

একটু থেমে, ভ্রুকুঁচকে শর্মিষ্ঠা বলল, “এখানে আছো কোথায় বললে? তাঁবু খাটিয়ে না! … আমার সাথে আমার বাংলো তো চলো। অনেকগুলো ঘর আছে। একটা ঘরে থাকবে সেখানে”।

রাজু উত্তরে বলল, “আহমেদ স্যার কিন্তু আমার পরিচয় জানবেন না ম্যাডাম। তিনি আপনার উপর গর্ব করতে চান। আমি উনার সাথে আগে আলাপ করেছি, আমার সিনেমার প্রযোজনা করতেও বলেছি। উনি আমার মুখের উপর বলে দিয়েছেন, ‘যদি প্রযোজনা করি, কেবল আমার স্ত্রীর জন্যই করবো, অন্য কনো কারুকে নয়, কারুর জন্য নয়। আমার স্ত্রী শুধু রূপে নয়, গুণেও শ্রেষ্ঠ, আমি প্রমাণ করিয়েই ছাড়বো। সুন্দরী স্ত্রীকে বিয়ে করেছি বলে, ঈর্ষায় হোক বা যেই কারণেই হোক, অনেকে অপমান করেছে শর্মিকে। দাঁতে দাঁত চিপে রয়েছি, শর্মির সাফল্য একদিন সকলকে মুখের উপর উত্তর দিয়ে দেবে’। … তাই ম্যাডাম, আহমেদ স্যার যেন শুধু আপনাকেই চেনেন, আমাকে নয়, যাতে সাফল্য লাভের পর, উনি আপনার জন্য গর্ব করতে পারেন”।

শর্মিষ্ঠা হেসে বলল, “উনি খুব ভালো মানুষ রাজু। ভীষণই ভালো মানুষ। … ঠিকই বলেছিলে। সুন্দরীদের ভাগ্যে সাধারণত ভালো স্বামী জোটেনা”।

রাজু বলল, “যদি কিছু মনে না করেন, একটা প্রশ্ন করবো আপনাকে ম্যাডাম!”

শর্মিষ্ঠা ভ্রুটা কুঁচকে বলল, “ম্যাডাম বলা বন্ধ করে, আমার নাম ধরে ডাকতে পারলে, একটা নয় হাজারও প্রশ্ন করতে পারো”।

রাজু হেসে একটু মাথা চুলকে নিয়ে বলল, “আসলে … আচ্ছা, বিয়ে হয়েছে আপনাদের প্রায় ৫-৬ বছর হয়ে গেল, কিন্তু সন্তান নেননি কেন এখনো?”

শর্মিষ্ঠা মাথা নামিয়ে একটু ঠোঁট আর থুতনির দিক শক্ত করে নিয়ে বলল, “উনার স্পার্ম হেলথ খুব খারাপ। যদিও, আমি উনাকে অন্য কথা বলে রেখেছি। আমি উনাকে বলেছি, সমস্যাটা আমার। আর তাই উনাকে দেখানোর জন্য, আমি বেশ কিছু ওষুধ কিনে আনি মাসে মাসে। খাইনা, ফেলে দিই। কিন্তু উনাকে দেখাই  যে আমারই ট্রিটমেন্ট চলছে”।

রাজু ভ্রু কুঁচকে বললেন, “এটা কেমন ধরনের সাইকোলজি?”

শর্মিষ্ঠা মুচকি হেসে বলল, “এমনিই সঙ্গমকালে উনি দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী থাকতে পারেন না বলে, উনার মনে হয়, উনি আমাকে তৃপ্ত করতে পারছেন না। তারপর এই বাড়তি জিনিস বললে, উনি না ডিপ্রেশনে চলে যান। … আর তা ছাড়া, ধীরে ধীরে, উনার কাছে আমিই একরকম মেয়ে হয়ে যাচ্ছি, আর উনি বাবা হয়ে উঠছেন আমার। এই ব্যাপারটা দারুণ ভাবে এঞ্জয় করছি। উনি স্বামী বা প্রেমিকের থেকে অনেক ভালো বাবা”।

রাজু হেসে বললেন, “বেশ সুন্দর বললেন তো। … যাই হোক, সেই জন্যই বলছিলাম। আমি যদি আপনাদের বাংলোতে গিয়ে উঠি, তাহলে আহমেদ স্যার আমার কথা জেনে যাবেনা!”

শর্মিষ্ঠা হেসে বললেন, “উনার স্মৃতিশক্তি তেমন শক্তিশালী নয়। তাই উনি তোমার নাম তো মনে রাখতে পারবেন না, আর মুখও। তাই জানাবো তো উনাকে অবশ্যই, কিন্তু ওই যে তুমি শর্ত রাখলে, আমার হয়ে কাজ করবে, সেটাই বলবো। আহমেদের থেকে লুকিয়ে আমি যদি কিছু করিও, সেটা আহমেদের ভালো লাগবে বলেই করি।

আমি ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছিলাম, তাই আহমেদ চিন্তিত হয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আমাকে এখানে এনে রেখে গেছে। এবার যদি সে দেখে যে, একটা যুবকের আগমনে, আমি ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠছি, তাহলে কি উনি খুশী হবেন না!”

রাজু হেসে বলল, “যেমন আপনি ঠিক বুঝবেন। তবে একটু সতর্ক থাকবেন। যদি দেখেন যে আপনাদের স্বামীস্ত্রীর মধ্যে আমার উপস্থিতি কনো রকম বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, তাহলে অবশ্যই আমাকে বলবেন। আমি দূরে থেকে আপনার হয়েই কাজ করবো। কিন্তু আপনাদের দাম্পত্য জীবনে কলহ হোক আমার জন্য, এটা আমার কিছুতেই কাম্য নয়”।

শর্মিষ্ঠা বুঝতে পায়নি হয়তো রাজু কি বলেছিল বা কিসের ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু যেই ইঙ্গিত দিয়েছিল রাজু, শর্মিষ্ঠা নিজের অজান্তে সেই দিকেই যাচ্ছিল। হ্যাঁ আহমেদকে সে বলেছিল, একজন যুবককে তিনি পেয়েছেন, যে ভালো গল্প লেখে, আর অল্প বিস্তর হলেও ছেলেটি পরিচালনা জানে। আর এও বলেন যে তিনি ভাবছেন কলকাতাতে গিয়ে স্টুডিওতে তাকে নিয়ে চলচ্চিত্র করবেন একটা।

আহমেদ স্ত্রীকে ডিপ্রেশন থেকে বেড়িয়ে আসতে দেখে, বেশ খুশীই হয়েছিলেন। শর্মিষ্ঠা রাজুর লেখা বেশ কিছু কাহিনীকে সংক্ষেপে বলেও আহমেদকে। আহমেদেরও মনে হয় যে, এমন কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র করলে, বেশ অন্যরকম হবে। সমস্তই ঠিক রেখেছিল আহমেদের সাথে। কিন্তু আহমেদের সাথে ঠিক রাখলে কি হবে, শর্মিষ্ঠা নিজে ঠিক থাকছিল না যে, সেই দিকে সে নিজেই তাকান বন্ধ করে দিয়েছিল।

আসল কথা এই যে, রাজু শর্মিষ্ঠার জীবনে আসাতে, শর্মিষ্ঠার জীবনটা অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল। যেই শর্মিষ্ঠার জীবনে আহমেদ ছাড়া দ্বিতীয় কনো পুরুষের স্থান ছিলনা, সেই শর্মিষ্ঠার মনে একজন পুরুষ বাসা বাঁধছিল। রাজুর নিঃস্বার্থ ভাব, সাহিত্য ও কাহিনীর উপর দক্ষতা, জীবনের দর্শনকে শর্মিষ্ঠার চোখের সামনে চলচ্চিত্রের মত করে তুলে ধরার সামর্থ্য, আর পরিচালনার সম্বন্ধে ধারণা ও কৌশল, এই সমস্ত কিছু শর্মিষ্ঠাকে প্রতিদিন বেশি বেশি করে আকৃষ্ট করছিল রাজুর প্রতি।

শর্মিষ্ঠা তা বুঝতে পারছিল, বা হয়তো পারছিলনা, কিন্তু ক্রমশ সে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছিল রাজুর প্রতি। ক্রমে শর্মিষ্ঠা স্বপ্নের মধ্যেই রাজুকে দেখা শুরু করে, আর স্বপ্নতে রাজুর সাথে নিজেকে অন্তরঙ্গ ভাবে দেখে যেন তার খারাপ লাগেনা বরং তৃপ্তি জাগে। রাজুর রঙে শর্মিষ্ঠা সমানে গহন, আরো গহন ভাবে রেঙ্গে উঠছিল। আর এমন করতে করতেই, একদিন রাজু স্নান করে বেড়িয়ে খালি গায়ে আয়নার সামনে চুল আছড়াচ্ছিল, সেই সময়ে শর্মিষ্ঠা যেন মধুমক্ষিকার মত বিবশ হয়ে মধুপানে চলে গেল।

রাজুর কাছে যেতে, রাজু প্রথমটা অপ্রস্তুত হয়নি। কিন্তু পূর্ণ সমর্পণ বোধ নিয়ে যখন শর্মিষ্ঠা রাজুর পিঠে হাত দিয়ে, সেই হাতকে ক্রমশ পেটের দিকে নিয়ে আসতে শুরু করে, রাজুর শ্বাস গভীর হতে শুরু করে। চোখ যেন আর খুলে রাখতে পারছিলনা রাজু। দ্বন্ধ, এক প্রকাণ্ড দ্বন্ধ যেন রাজুকেও ঘিরে ধরা শুরু করে দিল।

অন্তরমন বলছে যা হচ্ছে, তা ঠিক হচ্ছেনা, কিন্তু দেহ ও বাহ্যমন যেন বশীকরণের শিকার হয়ে গেছে। অন্যদিকে শর্মিষ্ঠা যেন থামার নামই নিচ্ছেনা। যেন ক্ষুধার্ত সাপ একটা বড় শিকার পেয়ে, সম্পূর্ণ শিকারকে জরিয়ে ধরছে। রাজুর মুখে কনো শব্দ নেই, শুধুই জোরে জোরে শ্বাস পরছে। শর্মিষ্ঠা রাজুকে দেওয়ালে ঠেসে দিয়েছে। আর ক্রমশ নিজেকে রাজুর কাছে সঁপে দিচ্ছে।

রাজুর উত্তেজনা বাড়তে থাকলো, আর শর্মিষ্ঠা পূর্ণ ভাবে উত্তেজিত। নেশা ক্রমশ যৌনতা ত্যাগ করে সঙ্গমের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতে থাকলে, শর্মিষ্ঠা রাজুর মুখমণ্ডলকে নিজের দুই হাতদিয়ে চেপে ধরেছে, আর এবার রাজুর ওষ্ঠকে নিজের মুখগহ্বরে নিয়ে নিয়েছে সে। রাজুর নিজের উপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে, তাই সে শর্মিষ্ঠার দেহকে এবার সরিয়ে দিতে চেয়ে, হাতটা শর্মিষ্ঠার শরীরে রেখে শর্মিষ্ঠার শরীরকে সরিয়ে দিতে সচেষ্ট হলো। কিন্তু যেই ক্ষণে শর্মিষ্ঠার উদর ও কটি দেশে রাজুর হাতের স্পর্শ লাগে, শর্মিষ্ঠা যেন নিজেকে পূর্ণ ভাবে অর্পণ করে দিল রাজুর কাছে। রাজু অস্থির হয়ে শর্মিষ্ঠাকে ঠেলে সরিয়ে দিল আর হাফিয়ে উঠতে শুরু করলো।

শর্মিষ্ঠা সম্পূর্ণ ভাবে উদ্ভ্রান্ত, যৌনতার গন্ধ তার অপরূপ শ্রীকে সম্পূর্ণ  ভাবে মাতাল করে রেখেছে। আবার এগিয়ে আসার প্রয়াস করলো শর্মিষ্ঠা। রাজু এবার শক্ত ভাবে শর্মিষ্ঠার কাঁধ ধরে নিয়ে চাপা অথচ উগ্র কণ্ঠে বলে উঠলো, “কি করছো শর্মিষ্ঠা, তুমি আর তোমার নিজের মধ্যে নেই। আমি আহমেদ নই, আমি রাজু। তুমি বিবাহিত শর্মিষ্ঠা। শারীরিক ভাবে তুষ্ট না করতে পারলেও, তুমি জানো তোমার স্বামী তোমাকে অত্যন্ত স্নেহ ও বিশ্বাস করেন”।

একপ্রকার ধমক দিয়েই এই কথা বললে, শর্মিষ্ঠার কর্ণকুহর পর্যন্ত সেই কথা পৌঁছায়। শর্মিষ্ঠা হকচকিয়ে যায়। রাজুর দিকে তাকাল এবার শর্মিষ্ঠা। রাজু আবার বলল, “আমার মনে হয় আমার এখানে থাকাটা ঠিক হচ্ছেনা। তুমি … তুমি দুর্বল হয়ে যাচ্ছ”।

শর্মিষ্ঠা একটা জোরে শ্বাস নিয়ে চোখটা বন্ধ করে বলল, “যাচ্ছি না, গেছি। … হুম, তুমি আমি দুজনেই ফেঁসে গেছি রাজু। প্রকৃতি আমাদেরকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন। তুমি যদি এখন চলে যাও, আমি নিশ্চিত ভাবে আবার ডিপ্রেশনে চলে যাবো, আর যদি না যাও, তুমি আমার সঙ্গম আহ্বান বেশিদিন অবহেলা করতে পারবেনা। আর আমি চেয়েও বেশিদিন এই সঙ্গম আহ্বানকে বন্ধ রাখতে পারবো না। … আমরা জরিয়ে গেছি রাজু, খুব বাজে ভাবে জরিয়ে গেছি”।

রাজু মাথা নেড়ে বলল, “আমাদের কি করা উচিত এবার তাহলে?”

শর্মিষ্ঠা হেসে বলল, “ওই যে তুমি বলেছিলে, প্রকৃতির কাছে সঁপে না দিয়ে আমরা আমাদের নামযশের পিছনে ছুটি। … তাই এবারে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, প্রকৃতি যেমন চালাবে, তেমনই চলবো। সেই জন্যই তো এখন, আমার বোধ আমাকে বলেছে, ‘তোর স্বামী আছে’, ‘তোর স্বামী তোকে স্নেহ করে’, কিন্তু আমার প্রকৃতি আমাকে বলছে, ‘তুই রাজুর কাছে নিজেকে অর্পণ করবিনা!’ তাই আমি আর আমার মাথার কথা শুনিনি, আর শুনবোও না”।

রাজু ইতস্তত হয়ে বলল, “কিন্তু!”

শর্মিষ্ঠা মুচকি হেসে বলল, “আমার কাছে একটা কিন্তুই আজ যথাযথ, আর তা হলো তোমার সম্মতি রাজু। আমি জানি, আমি তোমার প্রতি বারবার আকৃষ্ট হবো, কারণ আমি তোমার সামনে আসলেই নিজেকে হারিয়ে ফেলছি। … যেদিন তুমিও আমাকে গ্রহণ করে নেবে, সেদিন আমরা সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে যাবো রাজু। … মাথা খাটিও না, এটাই প্রকৃতির ইচ্ছা। তুমি বলো না, আমার আলিঙ্গন তোমাকে সুখ দিচ্ছিল না!”

রাজু মাথা নামিয়ে নিয়ে বলল, “আমি তোমাকে তখন আমার নিজের থেকে অভিন্ন বোধ করছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন আমরা অর্ধনারীশ্বর হয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছিল যেন আমি তো চিরতরেই তোমারই ছিলাম, আজ অফিসিয়ালি তোমার হয়ে যাচ্ছি”।

শর্মিষ্ঠা কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, “তাহলে নিজেকে আটকালে কেন? কেন একেঅপরকে অন্যের কাছে হারিয়ে যেতে দিলেনা!”

রাজু বলল, “অপরাধ বোধ চারা দিয়ে উঠলো। মনে হলো, আমি তোমার ভালোমানুষির সুযোগ নিচ্ছি না তো! আমি তোমাকে আহমেদের কাছে ছোটো করে দিচ্ছি না তো!” শর্মিষ্ঠা আবারও রাজুর কাছে এগিয়ে গেল। রাজুর কেশহীন বক্ষে হাত রেখে, হাত বোলাতে বোলাতে বললে সে, “এই কারণেই তো তোমার কাছে সমর্পণ করতে ইচ্ছা করে রাজু। যে নিজের প্রাপ্তির থেকে অন্যের প্রাপ্তি আর ক্ষয়ের চিন্তায় মগ্ন থাকে, তার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া এক নারীর পক্ষে হয় গর্বের, তৃপ্তির।

হ্যাঁ রাজু, এই তৃপ্তি কেবল শরীরের তৃপ্তি নয়, এই তৃপ্তি মনের, অন্তরের, হৃদয়ের। মন, হৃদয় যে সর্বক্ষণ বলতে থাকে, এই তো সেই মানুষ, যার কাছে সে নিজে নয়, তুই গুরুত্বপূর্ণ; যার কাছে নিজের দেহসুখ নয়, তোর তৃপ্তি অধিক গুরুত্বপূর্ণ”।

রাজু আবার দুর্বল হতে থাকলো, শর্মিষ্ঠার স্পর্শ পেয়ে, তার নিশ্বাসের আভাস বক্ষস্থলে মুহুর্মুহু লাভ করে করে। রাজু এবার শর্মিষ্ঠাকে আঁকড়ে ধরলো। শর্মিষ্ঠাও অনুমতি পেয়ে গেল। জরিয়ে ধরলো একে অপরকে, আর একে অপরকে তৃপ্তির চরমে উন্নীত করার দিকে নিয়ে গেল তারা।

সুদীর্ঘ সঙ্গমলাভের পর, শর্মিষ্ঠার প্রায় উলঙ্গ শরীরটি রাজুর পূর্ণ উলঙ্গ শরীরের উপর শুয়ে থাকলে, রাজু প্রশ্ন করলো, “অনুশোচনা হচ্ছে না তো!”

শর্মিষ্ঠা উত্তরে বলল, “আমি খালি আজ তৃপ্ত হয়েছি, পুরোপুরি তৃপ্ত হইনি রাজু। আমাদের কলকাতা ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। কাজে ফেরার সময় হয়ে গেছে। … কি বলো তো রাজু, শিল্পীদের কাজ থেকে সরে আসতে নেই। সরে আসলেই, এই প্রকার সঙ্গমের ভূত চেপে বসে তাদেরকে। আসলে শিল্পীরা তৃপ্তির নেশা করে। যতক্ষণ না তৃপ্ত হয় তারা, ততক্ষণ হাল ছারেনা। যখন কাজ থাকে, তখন কাজেই তৃপ্তি, আর যখন থাকেনা, তখন সঙ্গম, নেশা এইসবে তৃপ্তি খোজে। তৃপ্তির কাছে আমি তুমি সকলে বিবশ রাজু, বিবশ”।

আরো তিনদিন পরে শর্মিষ্ঠা কলকাতায় ফিরে আসে। রাজুও ফেরে কিন্তু ট্রেনে। কলকাতায় একটা ফ্লাট ভারা আছে তার। সেখানে উঠে, নিত্য শর্মিষ্ঠা-আহমেদের স্টুডিওতে যায় আর শুটিং করতে থাকে, শর্মিষ্ঠার পরিবর্তী চলচ্চিত্র, ‘পাঁচকান’।

শর্মিষ্ঠা সমস্ত শুটিংএর সময়ে কমই সেটে থাকলো। সে আসলে রাজুতে মজেছিল। রাজু তার কাছে বিস্ময় পুরুষ নয়, বরং অকল্পনীয় আদর্শ পুরুষ। আসল কথা হলো এই যে, নারীর পরিচয় মাতৃত্বে আর পুরুষের পরিচয় আদর্শে। তাই যখন এক পুরুষ এক নারীর মধ্যে মাতৃত্বকে পরিপূর্ণ অবস্থায় দেখে, সেই আক্রশন অনেক অনেক বেশি হয়, নারীর রূপের প্রতি আকর্ষণের থেকে।

আসল কথা হলো নারীর রূপের প্রতি আকর্ষণ অত্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য আকর্ষণ। যতটা শীঘ্র তার জন্ম হয়, ততটা শীঘ্রতার সাথে সেই মোহের বুদবুদ ফেটেও যায়। ওই ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন না, বাইরে থেকে যেমনই লাগুক, ভিতরে তো সেই হাড়মাস মেদাদির জঞ্জাল। যতই রূপের প্রতি আকর্ষণ জন্মাক, কিছু সময়ের পর থেকেই, সেই হাড়মাস, মেদাদি, বিষ্ঠা, পুঁজের গন্ধ আসতে শুরু করে, আর মোহের বুদবুদ ফেটে যায়।

একই ভাবে, নারীও পুরুষের দেহের প্রতি আকর্ষিত হন, কিন্তু সেটিও তো সেই একই প্রকার ক্ষণস্থায়ী মোহের বুদবুদ। কিন্তু নারীর মধ্যে যখন মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়া যায়, পুরুষের মধ্যে যখন ঘনীভূত আদর্শের গন্ধ আসে, সেই গন্ধতে যে হাড়মাস, মেদাদি, বিষ্ঠাপুঁজের গন্ধ থাকেনা। অত্যন্ত পবিত্র তা, আর সেই পবিত্রতার প্রতি আকর্ষণ একবার জন্ম নিলে, মানুষটা দেহত্যাগ করে দিলেও, সেই মোহ যায়না।

শর্মিষ্ঠাও রাজুর মধ্যে সেই আদর্শের গন্ধ পাচ্ছিল, আর শুধু পাচ্ছিল না, ক্রমশ সেই গন্ধের নেশায় মাতাল হয়ে চলেছিল। তাই রাজু ছাড়া আর কিছুই সে দেখতে পাচ্ছিলনা। আহমেদের সেই দিকে নজর পরেছিল কিনা শর্মিষ্ঠা জানে না, আর জানতে চায়ও নি। তবে আহমেদের সেই নেশার ভান না পাবারই কথা, কারণ শর্মিষ্ঠা আহমেদকে পতি কম আর পিতা অধিক মানা শুরু করে দিয়েছিল।

ঠিক যেমন একটি মেয়ে স্বামীসোহাগ পেলেও, পিতার প্রতি তার স্নেহ কমে না, তেমনই শর্মিষ্ঠা রাজুর সোহাগে মাতোয়ারা হলেও, আহমেদের প্রতি তার স্নেহ অক্ষুণ্ণ থাকে। হয়তো সেই কারণে আহমেদ শর্মিষ্ঠার এই মাতালভাবের সন্ধানও পায়নি। পেতো, হয়তো পেতো, যদি রাজু অসংযত হতো। কিন্তু রাজু সংযত, রাজু অত্যন্ত জমাট। আদর্শ, সমাজচেতনা, নারীর প্রতি আন্তরিক সম্মান, আর মানুষ তথা সকল জীবের প্রতি স্বাভাবিক স্নেহ ও কর্তব্যবোধ তাকে এক পরিপূর্ণ পুরুষ করে রেখেছিল।

তাই যেমনটা শর্মিষ্ঠা আকর্ষিত ছিল রাজুর প্রতি, তেমনটা আহমেদও ছিল। রাজু তার কাছে এক অনন্য পুরুষ হয়ে গেছিল। এতটাই ভালো লেগেছিল রাজুকে যে একবার সরাসরি বলেই দিল আহমেদ, “সিনেমা করা ছেড়ে দিলেও, যোগাযোগ রেখো ভাই। … বড় ভালো লাগে যখন তোমার মত একজন মানুষের সান্নিধ্যে থাকি”।

শর্মিষ্ঠা একাধিকবার রাজুকে সঙ্গমে লিপ্ত করতে আগ্রহী হলেও, রাজু বারেবারেই তাকে সতর্ক করে দূরে সরিয়ে রাখে যে, তাঁর স্বামী তাঁকে যথাযথ বিশ্বাস করে, সেই বিশ্বাসের মান রাখা উচিত শর্মিষ্ঠার। শর্মিষ্ঠাও সেই কথাকে সঠিকই মানে, তাই নিজেকে রাজুর নেশায় মাতাল করে রাখতে ব্যকুল থাকলেও, হৃদয়ে পাথর চাপা দেবার চেষ্টা করে।

(ডুকরে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে) কিন্তু কথা এই যে, নদী যখন খরস্রোতা অবস্থা থেকে সমতলে নেমে বিশাল হয়ে উঠতে শুরু করে, তখন সে যে বড় বড় পাথরকে ভেঙে পলি মাটি করে দেয়। শর্মিষ্ঠার সাথেও তেমনটাই হচ্ছিল। রাজুর প্রতি তার আকর্ষণ ক্রমশ পাহাড়ি খরস্রোতা নদীর রূপ ছেড়ে, বিশালাকায় সমতলের নদী হয়ে উঠছিল, আর তাই যেই পাথরদিয়েই হৃদয়কে চেপে ধরে থাকুক না কেন, তা নদীর জলে তলিয়ে পলি মাটি হয়ে যাচ্ছিল।

রাজুও বুঝতে পারছিল সেই কথা, আর হয়তো তাই, সেও শর্মিষ্ঠার পূর্ণ সমর্পনের বিশালাকায় লহরিমা আসছে, তেমন বুঝেগেছিল। মানে এই যে, শর্মিষ্ঠা যখন পূর্ণ সমর্পণ করে দিল রাজুর কাছে, শর্মিষ্ঠা বেশ বুঝতে পারে যে রাজু তার জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু নদীর সমতলে নামা তখনও দেরি ছিল। তখনও যে নদী পাহাড়ের পাথর ভেঙে কেটে, রাস্তা তৈরি করছিল সমতলে নামার, বহন করে চলেছিল প্রচুর প্রচুর পলিমাটি নতুন জমির জন্ম দেবার জন্য।

রাজুর সিনেমা শুটিং শেষ হলো। শেষ হতে প্রায় ৬ মাস লাগলো। অন্যদিকে আহমেদ একটা বড় টেন্ডারের জন্য বিদেশ যাবে। বেশ কিছুদিন সেখানে গিয়ে থাকতে হবে, মানে মাস তিনেক। আসলে বড় টেন্ডার পাওয়াটাও অনেকটা নদীর গতিপথের মতই, বা বলা যেতে পারে ভারী বর্ষণের মত। তিল তিল করে জলিয় বাষ্প সংগ্রহ করে করে, ভারী হতে হয়। সেই ভার এমন হয়ে উঠবে যে, গগনে ভীত গজিয়ে অট্টালিকা গড়ে ফেলেছে মনে হবে। তবেই তো দমকা হাওয়া আসবে, আর সেই হাওয়াতে মেঘের থলে চলকে উঠে, বৃষ্টির ধারা হয়ে ভূতলকে স্নান করাবে।

বড় টেন্ডারের পেতে গেলেও, এমন মাটি কামরে অনেকদিন পরে থেকে থেকে, জলিয় বাষ্পের মত পক্ষপাত অর্জন করতে হয়। পক্ষপাতের ভাণ্ডার অর্জন করে ভারী হয়ে গেলে, তখন টেন্ডার যিনি দেবেন, তিনি বাধ্য হন দমকা হাওয়া দিতে, আর তবেই বৃষ্টিপাতের মত করে টেন্ডার মেলে। তাই টেন্ডারটা পেতে আহমেদকে অন্তত তিনমাস, আর প্রয়োজনে আরো একটি বেশি সময় এলজেরিয়াতে গিয়ে থাকতে হবে।

বিদেশের মাটিতে রাঁধুনি পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার, আর পেলেও এতটাই বেশি খরচ যে পাচন পাচ্য হতে বেগতিক হয়ে ওঠে। এই কারণে, বহু ভারতীয়, বিশেষ করে বাঙালিদের বিদেশ গেলেই মলদ্বারের রোগ জন্ম নিয়ে নেয়। তাই শর্মিষ্ঠা আহমেদকে চুটিয়ে রান্না শেখাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো। আহমেদ আগেও বিদেশ গেছে, আর এই সমস্যার সম্মুখীন সে হয়েছে, ভালো ভাবেই হয়েছে। তাই শর্মিষ্ঠার এই প্রয়াসে আহমেদ এবারে কনো প্রতিবাদ করলো না।

আর শর্মিষ্ঠা এই কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলে, একপ্রকার সেটে যাওয়াই বন্ধ করে দিল। রাজু এতে একটু হাফ ছেড়েই বেঁচেছিল বোধ করা হায়, কারণ শর্মিষ্ঠার উপস্থিতি রাজুকেও যে তার প্রতি আকর্ষিত করতো, আর সাথে সাথে সেই আকর্ষণ আহমেদের সাথে করা অন্যায় বলেই তার বোধ হতো। তা যাই হোক, শেষ ৩-৪ মাস শর্মিষ্ঠা সেটে গেলই না, তবে হ্যাঁ, প্রিমিয়ার, এলবাম রিলিজ, ট্রেলার রিলিজ, প্রেস রিলিজ, এই সবের জন্য শর্মিষ্ঠাকে যেতেই হত, তবে সে শুধুই যেত, কারণ সমস্ত এরেঞ্জমেন্ট রাজুই করে দিতো, আর প্রতিটি রিলিজে গিয়ে কি বিবৃতি দিতে হবে, সেটাও রাজুই শর্মিষ্ঠার জন্য লিখে দিতো।

তাই, ‘পাঁচকান’ সিনেমার মধ্যে যে কি গল্প রয়েছে, সেটা ঠিক ভাবে শর্মিষ্ঠা জানতোই না। কিন্তু জানুক বা না জানুক, সকলে জানলো যে ‘পাঁচকান’ পরিচালক শর্মিষ্ঠা খান্না। আর তাই সিনেমা রিলিজ হবার পর যেই হিল্লোল উঠেছিল সর্বদিকে, তার শ্রেয় শর্মিষ্ঠার কাছেই আসতে থাকে।

একমাসের উপর ধরে সমস্ত হল হাউজফুল। সেই দেখে, হিন্দি আর তামিল ভাষায় ডাবিং করে সিনেমাটা রিলিজ করা হলে, বাইরের রাজ্য থেকেও বেশ ভালো প্রফিট আসা শুরু করে। এমনকি সিনেমাটাকে শেষে ইংরাজিতেও করতে হয়, এবং বিদেশে পাঠাতে হয়। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এমন কি এমেরিকাতেও বেশ ভালো নাম ছড়িয়ে যায় শর্মিষ্ঠার।

সিনেমা বানাতে লেগেছিল ৩০ কোটি টাকা। মাত্র দুমাসের মধ্যে উঠে আসে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। আহমেদ অত্যন্ত খুশী। এইটি তার পঞ্চম সিনেমা প্রযোজনা। আগের চারটে সিনেমাতে ৯০ কোটি টাকা লগ্নি করেছিল, উপার্জন হয়েছিল মাত্র ৬০ কোটি টাকা। আর এই সিনেমা নিয়ে তার অলগ্নই দাঁড়িয়েছিল ১২০ কোটি টাকা, সেখানে, একাকী এই সিনেমাই তাকে ১৫০ কোটি টাকা ফিরিয়ে এনে দিয়েছে। এখনো আসা বাকি কারণ সিনেমাটার ওটিটি রিলিজের চুকত করা বাকি।

যেদিন সেই চুক্তি হবে, সেদিন রাত্রেই আহমেদের আলজেরিয়া যাবার ফ্লাইট। তবুও আহমেদের ইচ্ছা, শর্মিষ্ঠার জন্য একটা পার্টি থ্রো করার। শর্মিষ্ঠার এই জয়লাভে আহমেদ বেজায় খুশী, আর তাই এই পার্টিটা দেবার জন্য আহমেদ একপ্রকার শর্মিষ্ঠাকে জোরই করলো, কারণ শর্মিষ্ঠার ইচ্ছা ছিলনা, বিশেষ করে এই কারণে যে সেদিনই আহমেদ বিদেশে চলে যাবে।

তবে যখন পার্টি থ্রো করা হবেই, এই নিশ্চয় হয়ে যায়, তখন শর্মিষ্ঠাও নিশ্চয় করে নেয় যে রাজুকে এবার সে সকলের সামনে আনবে। সকলের জানা উচিত শর্মিষ্ঠার এই সাফল্যের চাবির নির্মাতা কে। সেই আশা নিয়েই রাজুর কাছে চলে গেল শর্মিষ্ঠা। কিন্তু রাজু বেঁকে বসলো।

সে বলল, “শর্মিষ্ঠা, এটা তোমার জয়। তোমার স্বামী, আহমেদ খান্না ব্যকুল ছিল তোমাকে সফল পরিচালক রূপে দেখতে। মরিয়া ছিল সে। আর তাই তুমি সফল হয়েছ বলে, আনন্দে সে এই পার্টিটা দিচ্ছে। এখানে আমাকে রাখার মানে হলো এটা বলা যে, সফল তুমি হয়েছ কারণ আমি তোমার সাথে ছিলাম বলে। … না শর্মিষ্ঠা, ব্যাপারটা একটু বোঝার চেষ্টা করো। সফল তোমাকে হতে হবে, আমাকে নয়। তোমার বাবার সাথে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যেই অন্যায়টা করেছে, তার প্রতিকার করতে হবে, আর তোমাকে বলতে হবে যে তোমার বাবা যদি পরিচালক হতেন, তাহলে এই সাফল্যই অর্জন করতেন, তাই তোমার সাফল্যের চাবিকাঠি তিনি”।

শর্মিষ্ঠা একটু থতমত খেয়ে গেছে এবার। একটা মানুষ এতো বড় সাফল্য এনে দেবার পরেও, কি ভাবে এমনটা নিঃস্বার্থ হতে পারে! … এর কি সত্যই খ্যাতির প্রয়োজন নেই! বিস্ময় পুরুষ এমনিই ছিল রাজু শর্মিষ্ঠার চোখে। এখন সে বিস্ময় পুরুষ নয়, শর্মিষ্ঠার প্রাণ হয়ে উঠতে শুরু করে দিয়েছিল। রাজু তাই শর্মিষ্ঠাকে আবার করে মানানোর জন্য বলল, “যাও শর্মিষ্ঠা, পার্টিতে থাকো, আর আহমেদকে আনন্দ দাও। আহমেদ তোমার উপর গর্ব করার জন্য কবে থেকে অপেক্ষা করছে। তাকে তোমার উপর গর্ব করার সুযোগ দাও”।

শর্মিষ্ঠা ফিরে এলো। অন্যদিকে আহমেদ সমস্ত রকম এরেঞ্জমেন্ট করেছে এই পার্টির জন্য। বড় স্ক্রিন লাগিয়ে, সিনেমাটা সকল নিমন্ত্রিতদের দেখাবে, এমনটাও ঠিক করে নিয়েছে। সেই সমস্ত সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনাকে আরো উদ্দীপ্ত করে দিলো, সেদিনেরই বিকেলের ওটিটি লাইসেন্স সেলিংএর সময়, কারণ ৫০ কোটি টাকার বিমিময়ে জি-তে বিক্রয় হলো সমস্ত সত্ত্ব। অর্থাৎ ১২০ কোটি টাকার বিনিয়োগের থেকে ২৬০ কোটি আয় হলো আহমেদের।

উচ্ছ্বসিত সে, শর্মিষ্ঠার জন্য গর্বে পঞ্চমুখ আজ সে। পার্টিতে বিশাল আকারের ঘোষণা করলো আহমেদ। পরবর্তী সিনেমা হবে, বাংলা ভাষার সব থেকে বড় বাজেটের সিনেমা। ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে, সেই চেক তুলে দিলো শর্মিষ্ঠার হাতে, আর নিজের প্রযোজনার ইউনিটকেও স্থাপন করলো। নাম দিলো শর্মি প্রডাকশান হাউজ। শর্মিষ্ঠাকেও বক্তব্য রাখতে হলো। সে ডায়াসে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলো, পরবর্তী সিনেমার স্ক্রিপ্ট বা থিম কিছুই রেডি নেই। ৫০ কোটি টাকার বাজেট হবে, সেটা সেও জানতো না। তাই সেই অনুসারেই সে এবার সিনেমার স্ক্রিপ্টের সন্ধান করবে।

কিছু নাচগানও হলো। পাঁচকান সিনেমার থিম সং গাওয়া হলো, আর তার সাথে নাচও হলো। তারপর খাওয়া দাওয়া, মকটেল, ককটেল সমস্ত কিছু হলো, কিন্তু আহমেদকে আজ শর্মিষ্ঠা মদ্যপান করতে দিলো না। সরাসরি বলে দিলো, “এয়ারপোর্টে যাবে, এলকোহল টেস্টে ধরা পরলে, ফ্লাইটে উঠতে দেওয়া হবেনা”। আহমেদ স্ত্রীর কথা সবসময়েই শোনে, কারণ শর্মিষ্ঠার কথাতে থাকে অকাট্য যুক্তি। তাই এক্ষেত্রেও শর্মিষ্ঠার কথা শোনে সে। আর তাই, এবার বড় স্ক্রিনে ‘পাঁচকান’ সিনেমা চালানো হলো।

শর্মিষ্ঠাও সিনেমাটা দেখেনি। প্রথমবার দেখবে সেও। যদিও সেই কথা কেউই জানেনা, আহমেদও নয়। জানলে কি বলবে সকলে! স্বয়ং পরিচালকই জানে না সিনেমার কাহিনী কি, সিনেমা কেমন হয়েছে! তাই সামনের সারিতে বসে, কারুকে কিছু না বলে, সকলের সাথে শর্মিষ্ঠাও পাঁচকান দেখা শুরু করলো।

ক্রাইম কমেডি, খুবই রেয়ার থিম। গল্পটা সত্যই অনবদ্য। একজন পরিচালক উধাও হয়ে যেতে পুলিশ তদন্তে নামে। এরপর পুলিশের নাকের সামনে দিয়ে এক এক করে আরো দুইজন পরিচালক উধাও হয়ে যায়। পুলিশের কর্তাদের মধ্যেও কমেডি দেখান হয়েছে, মানে তাদের ডাইলগ বেশ কৌতুক জাগানো। কিন্তু এরই মধ্যে একটি অপহৃত পরিচালকের মৃতদেহ পাওয়া যায়, মানে পুলিশের এমনই ধারণা।

এই ধারণাকে নিয়েও কৌতুক আছে, কারণ পরিচালকের আগুনে দগ্ধ দেহ থেকে কনো প্রকার সামগ্রী পাওয়া যায়নি, যা দিয়ে প্রমাণ করা যেতে পারে যে সেই মৃতদেহ পরিচালকেরই। পরিচালকের বাড়ির লোকেরাও তাই কিছুতেই সেই শবদেহকে তাদের আত্মীয় বলে মানতে রাজি হয়না। কিন্তু পুলিশ কর্তা নাছোড়বান্দা এটা প্রমাণ করতে যে, সেই মৃতদেহ অপহৃত এক পরিচালকেরই।

এরই মধ্যে আরো এক দগ্ধ মৃতদেহ পাওয়া গেলে, পুলিশ নিশ্চিত করে নেয় যে, অপহরণকারী একজন সিরিয়াল কিলার। আর তাই ক্রাইম ব্র্যাঞ্চের বিশিষ্ট গোয়েন্দা নিযুক্ত হয়। কমেডি এরপর থেকে চরম আকার ধরে, কারণ এই গোয়েন্দার সাথে বাকি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের পুরো টম অ্যান্ড জেরি সো হতে শুরু করে দেয়।

গোয়েন্দা মানতে নারাজ যে দগ্ধ মৃতদেহগুলি পরিচালকদের। আর পুলিশ ডিপার্টমেন্ট নিশ্চিত করতে মরিয়া যে সেগুলি পরিচালকদেরই। এরই মধ্যে, আরো একটি পরিচালকের অপহরণ হয়, আর ঠিক সেই দিনই একটি দগ্ধ দেহ উদ্ধার হয়, যার কাছে একটি অপহৃত পরিচালকের দুটি সম্পদ দেখা যায়। তাই সেই পরিচালকের বাড়ির লোকরাও তাকে সনাক্ত করে নেয়, আর পুলিশ অধিকর্তা হম্বিতম্বি করা শুরু করে যে, সে ঠিকই বলছিল এতোদিন যে, দগ্ধ দেহগুলি অপহৃত পরিচালকদেরই।

গল্প এবার সিরিয়াস হয়ে ওঠে, থ্রিলিং হয়ে ওঠে। আর এই থ্রিলের মধ্যে আরো একটি পরিচালকের অপহরণ হয়। একে একে করে পাঁচটি পরিচালকের অন্তর্ধানও হয়, আর দগ্ধ দেহও উদ্ধার হয়। কিন্তু ক্রাইম এক্সপার্ট গোয়েন্দা, এই পাঁচ পরিচালকের মধ্যে কনো যোগসূত্র খুঁজে পায়না। এরই মধ্যে একটি ব্যাপারে তার খটকা লাগলে, সে অন্য ভাবে তদন্ত করা শুরু করে।

তদন্তের শেষে, তিনি একদিন পুলিশ অধিকর্তাকে নিজের দপ্তরে ডেকে এনে বলেন যে, তিনি কি প্রমাণ করতে চান! … শেষ তিন দগ্ধ দেহের কাছে যেই যেই সামগ্রী পায়া গেছে, যেই দিয়ে তাদের দেহ সনাক্ত করা হয়েছে, সেগুলিকে মেলালে এই পাওয়া যায় যে, প্রথম যেই পরিচালককে অপহরণ করা হয়েছিল, তিনি হলেন তৃতীয় মৃতদেহ, আর সেই ক্ষেত্রে এই দাঁড়ায় যে প্রথম যেই দগ্ধ দেহ উদ্ধার হয়েছে, তিনি হলেন তৃতীয় অন্তরহিত পরিচালক। কিন্তু যখন এই প্রথম দগ্ধ দেহ পাওয়া গেছে, তখন তো তৃতীয় পরিচালকের অন্তর্ধানই হয়নি।

জেরার মুখে পরে, পুলিশ অধিকারিক স্বীকার করে যে, আসলে কনো দগ্ধ দেহের কাছে কনো কিছুই পাওয়া যায়নি। তদন্তের সময়ে যা উদ্ধার করেছেন, সেইগুলোই তিনি দঘধ দেহের সাথে প্ল্যান্ট করেছেন। এই খানেও বেশ কমেডি রাখা হয়েছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে, একটি দগ্ধ দেহের সাথে যেটা পাওয়া গেছে, সেটি হলো তার বউএর লিপস্টিক। আসলে লিপস্টিকটা লাইটারের মত দেখতে, আর সেটাকে লাইটার ভেবে পুলিশ আধিকারিক তুলে এনে, ইমপ্ল্যান্ট করেছিল শব দেহের কাছে। কিন্তু আদপে সেটি একটি লিপস্টিক।

এমন অনেক অনেক কর্মকাণ্ড উপস্থিত সকলকে হাসাতে থাকে। আর যখন এমন হাসাহাসি চলতে থাকে, তখন একটা খবর আসতে, গোয়েন্দা কিছু পুলিশ কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও বেড়িয়ে যান। আর পুলিশ আধিকারিক কারুর থেকে কিছু না জেনেশুনেই এক বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে চলে যান গোয়েন্দার পিছুপিছু।

সশস্ত্র বাহিনী দিয়ে এমন পরিচালনা করা হয়েছে যেন একটা বড় স্ট্রিং অপরেশন হতে চলেছে, মানে দর্শককেও তেমনই বিশ্বাস করান হয়েছে। কিন্তু আলটিমেটলি সেটা একটি কমেডি সিন হয়ে যেতে দর্শক পেট ফাটিয়ে হাসে, কারণ গোয়েন্দা যেই খবর শুনে গেছিল, সেটি হলো এই যে, পাঁচটি অপহৃত পরিচালক একসাথে একটি বারে বসে মদ্যপান করছে।

পুলিশ আধিকারিককে নিয়ে প্রচুর কৌতুক হয়ে এই সিনে, যাতে দর্শকরা উচ্চস্বরে, পেটে হাত দিয়ে হাসাহাসি করতে থাকে। শেষে গোয়েন্দা জেরা করতে গেলে, পরিচালকরা বলে, “আমাদের অপহরণ হয়েছিল! … কবে? কখন? আমরা তো একটি সিনেমার নির্দেশনা করার জন্য এক পরিচালকের কাছে ছিলাম এতদিন, তাঁর স্টুডিওতে শুটিং করছিলাম। অন্য রকম সিনেমা, যাতে থ্রিল আছে, ক্রাইম আছে, কমেডি আছে, রোমান্স আছে, আর সাথে সাথে একসানও আছে। তাই এই পাঁচ ফিল্ডের পাঁচজন এক্সপার্ট পরিচালককে একত্রে রেখে পরিচালনা করানো হয়েছে।

কেসের নিষ্পত্তি হয়, আর শেষ সিনেও পুলিশ আধিকারিককে নিয়ে হাসাহাসি হয়। থ্রিলকে কৌতুকে ডুবিয়ে, আর কৌতুককে ত্রিলের মধ্যে ডুবিয়ে, এক অনবদ্য বিনোদনের সিনেমা সকলকে নিজেদের সিটে আঠা দিয়ে আটকে রাখার মত করে আটকে রাখলে, সিনেমার শেষে সকলে শর্মিষ্ঠাকে বারংবার ধন্যবাদ জানায় এমন একটি সিনেমা উপহার দেবার জন্য। আর সকলে একত্রে বলতে থাকে, এমন অসামান্য সিনেমা আর অভিনেতাদের না হাসতে দিয়ে দর্শককে হাসানোর মত পরিচালনা করার সামর্থ্য তো কেবলই শর্মিষ্ঠার আছে, আর কারুর নেই।

স্ত্রীর প্রশংসাতে উচ্ছ্বসিত আহমেদ শর্মিষ্ঠাকে বারংবার জরিয়ে ধরে গর্ব বোধ করেন, আর শেষে শর্মিষ্ঠার সাথে এয়ারপোর্ট গিয়ে, প্লেনে উঠে বসে আলজেরিয়া পারি দেয় আহমেদ। কিন্তু এই সমস্ত সময়ে একজন একদমই হাসেননি, আর তিনি হলেন শর্মিষ্ঠা। তার ভিতরে যেন কি একটা চলছে, তোলপাড় করছে তার অন্তরমনকে। তাই স্বামী আহমেদকে প্লেনে তুলে দিয়ে, বাড়ি এসে শুয়ে পরেও আবার উঠে পড়লো সে। কারুকে কিছু না বলে, কাজের মেয়ে, মিনাকে শুধু বললেন, “আমার ফিরতে কাল সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তুই ঘরদোর সাফসাফাই করে, দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে নিস”।

এই বলে গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে কোথায় যেন বেড়িয়ে পড়লো শর্মিষ্ঠা।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5