পরিচালক | রোম্যান্টিক উপন্যাস

শর্মিষ্ঠা পরের দিন বাড়ির মধ্যেই তৈরি করা অফিসে রিভলভিং চেয়ারে বসে বসে ভাবতে থাকে, ‘কি না করেছে আহমেদ তার সুন্দরী স্ত্রীর জন্য। অফিস করে দিয়েছে, বাড়ির মধ্যেই স্টুডিও করে দিয়েছে। শুধু এমনি স্টুডিও নয়, ভিজুয়াল এফেক্টের আন্তর্জাতিক মানের স্টুডিওও করে দিয়েছে। … মানে এমন করে দিয়েছে যাতে, আউটডোর শুটিং ছাড়া বাইরে যেতেই না হয়। কিন্তু কনো প্রতিদান দিতে পারিনি আমি। … না না, এবার প্রতিদান না দিতে পারলে, আমার নিজের লজ্জা লাগছে’।

এমন বসে বসে ভাবছে শর্মিষ্ঠা, তার ফোন বেজে উঠলো। ট্রুকলারে দেখাচ্ছে জারনালিস্ট অস্মিতা হাজরা। একটা নিশ্বাস ছেড়ে, দুটি ওষ্ঠে চাপ দিয়ে, জীবনের হতাশা প্রকাশ করে, ফোনটা রিসিভ করলো শর্মিষ্ঠা। অন্যদিক থেকে কথা ভেসে হলো একটি মিষ্টভাষী মেয়ের, “মিসেস খান্না, একটা কি ইন্টার্ভিউ পাওয়া যাবে আপনার!”

শর্মিষ্ঠা উত্তরে একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “আমার ইন্টার্ভিউ কেন? না আমি কনো সফল পরিচালক, আর না সামনে আমার কনো চলচ্চিত্র প্রকাশ পেতে চলেছে। তাহলে আমি কেন?”

অস্মিতা হাজরা ফোনে বললেন, “না ম্যাডাম, সেই জন্য নয়। টলিপাড়াতে আপনার পরিচালনা নিয়ে বেশ চর্চা আছে। হিট না হতে পারে, আপনার চিত্রকারিতা অত্যন্ত নিখুঁত, আর প্রতিটি সিনের অভিনেতাদের এক্সপ্রেশন এতোটা পারফেক্ট থাকে, সেই নিয়ে বেশ চর্চা আছে। তাই আপনার থেকে সেই বিষয়েই ইন্টার্ভিউ করতে চাই, যাতে আগামী দিনের পরিচালকদের এই পারফেকশনের পাঠ দেওয়া যেতে পারে। তাই যদি আপনি একটু সময় দেন … মানে…”।

শর্মিষ্ঠা বলল, “খালিই বসে আছি। চলে এসো যেকোনো সময়ে। তবে হ্যাঁ, সন্ধ্যা করো না। আমার হাজব্যান্ড সেই সময়ে কাজে যান। আর আমি এতটাও ব্যস্ত নই যে, তাকে সিঅফ করবো না”।

অস্মিতা হেসে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম, আমি এই এক ঘণ্টার মধ্যে যাচ্ছি। সেক্টর ফাইভ থেকে বেড়িয়ে, হাইল্যান্ড পার্ক যেতে যতখানি সময় লাগে। স্কুটিতে যাবো। পেপারের জন্য যাবো, তাই আলাদা করে ক্যামেরাম্যানের প্রয়োজন নেই”।

শর্মিষ্ঠা মিষ্টি হেসে বললেন, “ঠিক আছে চলে এসো”।

অস্মিতা হাজরা প্রায় এক ঘণ্টা পরে এলেন। অফিস ঘর বন্ধ থাকে। মিনা নামে একটি মেয়ে অফিসের কাজে সব সময়ে থাকে। শর্মিষ্ঠা তাকে বলে রেখেছিল। অস্মিতার পরিচয় দেখে নিয়ে, তাকে ভিতরে নিয়ে আসে মিনা। গোলগাল নয়, একটু মোটাই বলা চলে। ঘাড় পর্যন্ত চুল, পড়নে জিনস আর হাফ-হাতা কুর্তি। কাঁধ থেকে ক্রসে একটা শান্তিনিকেতন মার্কা ছোটো ব্যাগ। সেই ব্যাগে স্কুটির চাবি রাখলো অস্মিতা, আর ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোনটা বার করে শর্মিষ্ঠার সামনের টেবিলে রেখে, অস্মিতা বলল, “বসবো ম্যাডাম?”

শর্মিষ্ঠা চোখের ইশারায় বসতে বলে, তারপর নিজের থেকেই বলল, “মাইনে পত্তর ভালোই দেয় তো! আই-ফোন ইউজ করছো! কোন পেপার যেন?”

অস্মিতা মিষ্টি হেসে বলল, “অফিস থেকেই দিয়েছে। পেজ থ্রি তো, যার ইন্টার্ভিউ করছি, তার ছবি নিয়ে আসতে হয়, ভালো নয়েজ রিডাকশান অ্যাপ দিয়ে ভয়েস রেকর্ড করার জন্য। নিজের ফোন পাতি, মটরলার। অফিসে এসে অফিসের লকারে রাখতে হয়, সারাদিন কাজ করে, দিনের শেষে নিজের ফোনে হাত দেওয়া যায়”।

শর্মিষ্ঠা প্রশ্ন করলো, “আর এই ফোনটা ইউজ করা হয়না!”

অস্মিতা উত্তরে বলল, “না, আই ফোন ব্যবহার করা অনেক ঝামেলার। শুধু অফিসের কাজেই লাগে। বাড়ি নিয়ে যেতে হয়, ভয়েস রেকর্ড, ছবি দিয়ে, গল্প সাজানোর জন্য। ব্যাস সেই জন্যই। আদারঅয়াইজ নিজের ফোন। … ও, আমি বর্তমান থেকে”।

শর্মিষ্ঠা ভ্রু কুঁচকে বলল, “তুমি যে বললে সেক্টর ফাইভ থেকে আসবে, বর্তমান ভবন তো বাইপাসে, স্প্রিং ডেলে। তাই না!”

অস্মিতা উত্তরে বলল, “সেক্টর ফাইভে একটা শুটিং চলছে, সোহম আর রিদ্ধিমার। ওটার কভারেজ করতে গেছিলাম। ওখান থেকে সরাসরি এখানে”।

শর্মিষ্ঠা এবার বলল, “তা বলো, কি জানতে চাও”।

অস্মিতা উত্তরে বলল, “ইন্টার্ভিউ শুরু করছি ম্যাম। আপনার থেকে পরিচালনায় খুঁটিনাটির দিকে চোখ রাখার ব্যাপারে ইন্টার্ভিউ করবো। তার আগে আমার একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন আছে। … অন্য ভাবে নেবেন না ম্যাম, ভালো লাগে আপনাকে। আপনার প্যাশান ভালো লাগে, আপনার সমানে চেষ্টা করে যাওয়া ভালো লাগে, আর আপনাকে দেখতে তো … অফ কি যে ভালো লাগে। সত্যি বলছি ম্যাম, যদি আপনি অভিনেত্রী হতেন না, শুধু আপনাকে দেখবে বলে হল ভরে যেত। তাই সত্যি বলছি ম্যাম, আমি আপনার ঠিক ফ্যান বলবো না, আপনার একজন প্রেমিকা বলতে পারেন। তাই আমি আপনাকে ভুলেও অপমান করতে একটি কথাও বলবো না, এই ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন”।

শর্মিষ্ঠা হেসে উত্তরে বলল, “কি জানবে! এতো প্রয়াস করেও, এতো লেগে থেকেও, এতো পারফেকশন এনেও সফল হতে পারছিনা কেন? এই তো জানতে চাইবে! … এর উত্তর আমাকে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার, দ্বিভদ্র বলেছেন। কাহিনীর মধ্যে পরোক্ষ কথা না থাকা কাহিনী নিয়ে সিনেমা করা একটি কারণ। আর দ্বিতীয় কারণ হলো, যদি তেমন কনো পরোক্ষ কথা থাকেও, তাও আমি সেটাকে সিনেমার মধ্যে রাখতে না পারার কারণে। এই দুই কারণে আমি সফল হতে পারছিনা।

কিন্তু কি করি বলো তো? স্ক্রিপ্ট রাইটারের উপর ভরসা না করে, লাস্ট তিনটে ছবি লেখকের রচনার ভিত্তিতে করলাম, কিন্তু তাও দেখো, পরিণাম এক। আসলে লেখক গল্পের মধ্যে পরোক্ষ ভাবে কি বলতে চেয়েছেন, সেটা আমি ধরতেই পারছি না!”

অস্মিতা কাছে এগিয়ে এসে বলল, “যেই লেখকদের কাহিনী নিয়ে কাজ করছেন, তাকে নিজের কাছে রেখে দিচ্ছেন না কেন? তাহলে তো সেই লেখকই আপনাকে বলতে থাকবে, পরোক্ষ ভাবে কাহিনীর মধ্যে কি রয়েছে! আর যদি আরো কিছু লেখককেও সিনেমার পরিচালনার সময়ে রেখে দিতে পারেন, তাহলে তারাও পর্যালোচনা করে, পরোক্ষ কথাকে বলতে থাকবে আপনাকে। তাহলেই তো হয়ে যায় সমস্যার সমাধান, তাই না!”

শর্মিষ্ঠা কথাটা শুনলো অস্মিতার। কনো উত্তর দিলো না, শুধু বলল, “নাও তোমার ইন্টার্ভিউ শুরু করো”।

অস্মিতার সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করার পর, মানে ইন্টার্ভিউ দেবার পর, শর্মিষ্ঠা তাকে প্যাটিস-কোল্ডড্রিঙ্কস খাইয়ে বিদায় দিলো। যাবার সময়ে অস্মিতা খালী বলল, “ম্যাম, এই যে আপনি প্যাটিস-কোল্ডড্রিঙ্কস খাওয়ালেন, আমার মনে হয় কি জানেন, আমাদের এই কথাটাও লেখা উচিত কাগজে। আসলে কি জানেন তো, পাঠকরা মনে করে, আমরা সকলকে বিরক্ত করি, সমস্ত সেলিব্রিটিদের। আসলে যে আমরা তাদের খুব ঘনিষ্ঠ, সেটা তারা জানেই না”।

শর্মিষ্ঠা হেসে বললে, “শুরু করে দাও বলা। নতুন একটা ট্রেন্ডও হবে, আর পাঠকের দ্বন্ধও মিটবে”।

অস্মিতা হেসে চলে গেল। সেইদিন শর্মিষ্ঠা দুপুরে আর অফিসে বসলো না। আহমেদের সাথে ঘনিষ্ঠ হলো, আর তার সাথে অনেক ধরনের গল্প করলো। দিন সাতেক, এমন ভাবেই যাবার পর, একদিন পেপারে বড়বড় করে একটা হেডিং এলো, “বিখ্যাত পরিচালক, দ্বিভদ্রকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। পুলিশ তদন্তে নেমেছে”।

খবরটা পরে, শর্মিষ্ঠা একটু চিন্তিতই হয়ে গেল। দ্বিভদ্র তার আদর্শ, তার অনুপ্রেরণা। তার আবার কে শত্রু হয়ে উঠলো? আবার খানিক বিচার করে মনে মনে শর্মিষ্ঠা ভাবলো, দ্বিভদ্র নেই মানে, ময়দান খালি। আর কেউ তেমন পরিচালক নেই যার কাজকে তার কাজের সাথে তুলনা করা সম্ভব। এবার দরকার তো কেবল ভালো কাহিনীর।

এমন ভেবে, ভালো কাহিনীর সন্ধান করতে দ্বিভদ্র যেই পদ্ধতি বলেছিলেন, সেই পদ্ধতিই ধারণ করার প্রয়াস করলো শর্মিষ্ঠা। রাতের পর রাত জেগে জেগে, সেই সমস্ত লেখকদের কাহিনী পরা শুরু করলো সে, যারা শুধু ওয়েবসাইটে নিজেদের লেখা পাবলিশ করে। এমন করতে করতে, একটা ভালো কাহিনীকারের সন্ধান পেল শর্মিষ্ঠা।

নিশ্চয় করলো পরের দিন তার সাথে সাখ্যাত করবে, আর সেই অনুসারে পরেরদিন সকালে ব্লগার অমিতাভ রক্ষিতের সাথে সাখ্যাত করে এলো শর্মিষ্ঠা। কিন্তু বাড়ি ফিরতে দেখলো, একজন সিআইডি অফিসার তার জন্য অপেক্ষা করছে, তারই অফিসে। সুজাতা বক্সি নাম তাঁর। নিজের পরিচয় দিতে, শর্মিষ্ঠা তাঁকে সামনের চেয়ারে বসতে বলে বলল, “কনো তদন্তের ব্যাপারে এসেছেন?”

অফিসার সুজাতা বললেন, “হ্যাঁ, জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছি, অন্তর্ধানের দুদিন আগে, আপনি উনার সাথে সাখ্যাত করতে গেছিলেন, নভোটেলে। উনি কি আপনার ব্যক্তিগত ভাবে পরিচিত ছিলেন?”

শর্মিষ্ঠা সামনে ঝুঁকে পরে বললেন, “সরাসরি পরিচিত নন। আমার বাবা, প্রয়াত বান্ধব বৈদ্যের সাথে তাঁর খুব আলাপ ছিল। নিজের পরিচালনার সাফল্যের জন্য তাঁর সাথে সাখ্যাত করে, কিছু টিপস নিতে গেছিলাম। অত্যন্ত সুহৃদ ব্যক্তি। এতো বড় পরিচালক, কনো অহংকার নেই। সাহায্য চাইতে, পুরো বুঝিয়ে বলে দিলেন”।

সুজাতা বললেন, “ম্যাডাম, আপনি একজন নামকরা পরিচালক, আর দ্বিভদ্র একজন বিখ্যাত পরিচালক, যিনি সম্ভবত আপনার গুণকে ওভারশেডো করে দেন। সেই সুত্রে, আমার তো সন্দেহ হচ্ছে যে, আপনার কাছে সব থেকে বেশি কারণ আছে উনাকে কিডন্যাপ করার। … আপনি কি বলেন, এই ব্যাপারে!”

শর্মিষ্ঠা বিরক্তের হাসি হেসে বলল, “এমনিই সাকসেস পাচ্ছিনা বলে পাগলের মত ছুটে বেড়াচ্ছি, তারপর উনার মত একজন হেভিওয়েটকে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করে… কি ভাবেন বলুন তো, এতটা বোকা আমি! … নিজের কেরিয়ারকে ঠিক করার জায়গায়, শেকড় থেকে নষ্ট করে দেবার কাজ করবো!”

সুজাতা বিকৃত একটা হাসি হেসে বললেন, “কিন্তু উনিই তো আপনার পথের কাঁটা, তাই না!”

শর্মিষ্ঠা মাথা নাড়িয়ে একটি বিকৃত মুখে বিরক্তের হাসি হেসে বললেন, “আমার বাবার সম্বন্ধে একটু পড়াশোনা করে নেবেন ম্যাডাম। আমার মানসিকতা উনিই তৈরি করেছেন। … নিজে ফার্স্ট হতে পাচ্ছিনা বলে, ফার্স্টগার্লকে পরীক্ষা দিতে দেবনা, এই মানসিকতা বাবা আমাকে শেখান নি। দ্বিভদ্র আমার থেকে অনেক অনেক গুণ বড় পরিচালক। আমার কাজে তো খালিই পারফেকশান থাকে, উনার কাজে পারফেকশানের সাথে সাথে থাকে দূরদৃষ্টি। সিনেমার কাহিনীর পিছনে থাকা পরোক্ষ ভাবকে প্রত্যক্ষ করে দেবার সামর্থ্য ধরেন উনি”।

সামনে ঝুঁকে পরে শর্মিষ্ঠা আবার বললেন, “বুঝতে পারছেন কি বলছি! … সত্যজিৎ রায়ের পর, এই প্রতিভা ঋতুপর্ণ দেখিয়েছিলেন, আর তারপরই দ্বিভদ্র। আমার তো মনে হয়, সত্যজিৎ রায়ের পুনর্জন্ম উনি। ঠিক উনার মতই পারফেকশন, উনার মতই বুদ্ধিদীপ্ততা। …

শুধু সাফল্য পাবার জন্য, যাকে নিজের আদর্শ মনে করি, আইডল মনে করে, তাকে অপহরণ করে নেব!” বিরক্তির প্রকাশ করে, মুখ দিয়ে একটা জোরে শ্বাস ছেড়ে পুনরায় শর্মিষ্ঠা বলল, “যতসব!”

সুজাতা মুচকি হেসে বললেন, “কারুকে সন্দেহ!”

শর্মিষ্ঠা উত্তরে বলল, “সঠিক করে বলতে পারবো না। উনার ব্যক্তিগত জীবনে কনো শত্রু থাকলে, তার কথা আমি জানি না। তবে হ্যাঁ, ফিল্ম জগতে, উনি একজন অন্য মাত্রার পরিচালক। প্রতিটি অভিনেতা, অভিনেত্রী, অন্য পরিচালকরা সকলে উনার গুণগ্রাহী, তাঁর প্রতিভার জন্যও, আর তাঁর চারিত্রিক সৌজন্যতার কারণেও। … তাই আমার ধারণা, শুধুই ধারণা হ্যাঁ, কনো ভিত্তি নেই এই ধারণার, অকারণই বলতে পারেন, তাও আমার ধারণা এই যে, যদি অপহরণ বা যেই ধরনেরই ক্ষতি উনার করার প্রয়াস হয়ে থাকে, তাহলে তারা এই ক্রাইমের সাথে জড়িত, যাদের স্বার্থে আঘাত লেগেছিল উনার নির্মিত সিনেমার কারনে”।

সুজাতা ঠোঁটকে বিকৃত করে, মনে মনে কিছু চিন্তা করে, মাথা নেড়ে বললেন, “হুম, ভালো এঙ্গেল। … দেখছি খতিয়ে। আজকে উঠি”।

শর্মিষ্ঠা বলল, “চা-কফি কিছু খেয়ে যান”।

সুজাতা মুচকি হেসে বললেন, “আজ না, অন্য একদিন হবে। … এনি অয়ে থ্যাংকস অফার করার জন্য আর সরি, বিরক্ত করার জন্য”।

শর্মিষ্ঠা বলল, “না দ্বিভদ্রের আমাদের সঙ্গে থাকাটা খুব প্রয়োজন। এখনো অনেক ভালো ভালো সিনেমা উপহার দেবার সামর্থ্য আছে উনার। মানুষের প্রয়োজনে তাকে খুঁজে বারকরা খুব আবশ্যক”।

সুজাতা হ্যান্ডসেক করে চলে গেলেন। শর্মিষ্ঠা নিজের দেহটা অফিসের রিভলভিং চেয়ারে এলিয়ে দিলো। তারপর এক কাপ চা খেয়ে, নতুন করে ওয়েবসাইট থেকে গল্প মাইনিং করতে বসে পড়লো।

কিছুদিন ব্যাপী খুব ব্যস্ত শর্মিষ্ঠা। ভালো গল্প খুঁজে বার করতেই হবে তাকে। এমনই সময়ে, দুদিন যেতেই, সুজাতা এসে আবার হাজির। শর্মিষ্ঠার কাজের মেয়ে, মিনা দরজা খুলে দিতে, সরাসরি সুজাতা অফিসের মধ্যে চলে এসেছে। শর্মিষ্ঠা মনোযোগ সহকারে একটা স্ক্রিপ্ট পড়ছিল, তাই খেয়াল করেনি সুজাতার আগমনকে।

সুজাতার কণ্ঠস্বর তাই থতমত খাইয়ে দিলো শর্মিষ্ঠাকে। হকচকিয়ে উঠে শর্মিষ্ঠা সামনের দিকে তাকালে, সুজাতা বলে উঠলেন, “কি ব্যাপার! আমাকে দেখে এমন ভয় পেয়ে গেলেন যে!”

শর্মিষ্ঠা মুচকি হেসে বলল, “আপনার জায়গায় যেই থাকতো, ভয় পেয়ে যেতাম। একটা স্ক্রিপ্ট পরছিলাম, ক্রাইম নিয়ে। সেই সময়ে আপনি চলে এসেছেন। …তা যাই হোক, দ্বিভদ্রের কনো হদিশ পেলেন!”

সুজাতা মুচকি হেসে বললেন, “না … কনো ট্রেস নেই। তবে, আজ দ্বিভদ্রের জন্য আসি নি আপনার কাছে”।

শর্মিষ্ঠা ভ্রুকুঁচকে বলল, “তাহলে! অন্য কনো তদন্ত, নাকি অন্য কনো প্রয়োজন?”

সুজাতা সরাসরি প্রশ্ন করলেন এবার, “অমিতাভ রক্ষিত বলে কনো ব্লগারকে কে চেনেন!”

শর্মিষ্ঠা ইতস্তত করে বলল, “ব্লগার! … হ্যাঁ ইদানীং কিছু ব্লগারের সাথে আলাপ করছি ঠিকই। মানে ভালো কাহিনীর সন্ধান দ্বিভদ্র এঁদের থেকেই করতে বলেছিলেন আমাকে। সেই কারণে। … তবে নাম তো সকলের মনে থাকেনা”।

সুজাতা উত্তরে বলল, “খুব রিসেন্টলি আপনি দেখা করেছেন উনার সাথে, উনার বাড়ি গিয়ে”।

শর্মিষ্ঠা একটু স্মরণ করার চেষ্টা করে বলল, “ব্যারাকপুরে গেছিলাম। … আপনি আগে যেদিন এসেছিলেন, সেদিন ওখান থেকেই একটা ব্লগারের বাড়ি থেকে এসেছিলাম। তবে তার নাম আমার মনে নেই। আর গতকাল একজনের কাছে গেছিলাম। ওটা কলকাতায়, ট্যাংরা অঞ্চলে। … দাঁড়ান উনার নাম আর ফোন নম্বরতা আমার কাছে টোকা আছে। তার আগেরদিন অনেক রাত্রে উনার নামনম্বর যোগার করেছিলাম, পরের দিন ফোন করবো বলে, লিখে রেখেছিলাম”।

শর্মিষ্ঠা নিজের ড্রয়ার হাটকে, একটা স্টিকি নোটসের কাগজ বার করে বলল, “হ্যাঁ এই তো, রিয়ান ব্যাপারী নাম ইনার”।

সুজাতা বললেন, “ব্যারাকপুরের ভদ্রলোকের নাম কোথাও লিখে রাখেন নি!”

শর্মিষ্ঠা একটু চোখ বন্ধ করে বললেন, “নাম তো লিখে রাখিনি। … উনার সাইট কি নামে ছিল একটা। … হ্যাঁ, বইটই। … দাঁড়ান, এক মিনিট”।

ল্যাপটপে সাইটটা খুলে, নিচের দিকে স্ক্রল করে বলল, “হ্যাঁ, ইনিই তো অমিতাভ রক্ষিত”।

সুজাতা বললেন, “নাম মনে ছিলনা, তাই না! … তা গল্প নিয়েছেন ইনার থেকে?”

শর্মিষ্ঠা বলল, “না, এঁদের সকলকে আলাদা আলাদা একটা করে গল্প লিখতে বলেছি আমার জন্য। যারটা পছন্দ হবে, সেটা নিয়ে সিনেমা করবো?”

সুজাতা আবার প্রশ্ন করলেন, “এখন কার লেখা পড়ছিলেন?”

শর্মিষ্ঠা যেই পাতাটা পড়ছিলেন, সেটা একটু পালটে নিয়ে বলল, “অজিত হালদার”। তারপর থেমে গিয়ে বলল, “কি হয়েছে বলুন তো! … কি জানতে চাইছেন একজ্যাক্টলি!”

সুজাতা এবার একটা জোরে নিশ্বাস নিয়ে বলল, “অমিতাভ রক্ষিতও কাল সন্ধ্যা থেকে গায়েব! … এবার কিন্তু আপনাকে সন্দেহ হচ্ছে আমার। … আপনি দ্বিভদ্রের সাথে সাখ্যাত করলেন, তিনি গায়েব। অমিতাভ রক্ষিতের সাথে সাখ্যাত করলেন, তিনি গায়েব। কি হচ্ছে এসব?”

শর্মিষ্ঠা চিন্তিত মুখ করে বলল, “নে এবার তো সত্যই চিন্তার ব্যাপার। … কেউ কি আমাকে তাহলে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে! … না না, তা হলে তো এই যে নাম বললাম, রিয়ান ব্যাপারী, আর (পাতাটা আবার পালটে নিয়ে) অজিত হালদার, এঁদেরও তো তাহলে লোপাট করে দেওয়ার কথা, তাই না!… কিন্তু চিন্তা হচ্ছে তাও। … আমি আবার কার পাকা ধানে মই দিলাম যে, আমার পিছনে পরলো!”

সুজাতা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, সেই সময়ে তাঁর ফোন বেজে উঠতে খালি বললেন, “এক্সকিউজমি প্লিজ!”

ফোন ধরে, ফোনে কিছু কথা বলা হলে, ফোনটা রেখে শর্মিষ্ঠার দিকে তাকিয়ে বললেন, “রিয়ান ব্যাপারী”

শর্মিষ্ঠা ভ্রুকুঁচকে বললেন, “হ্যাঁ, ওই তো ট্যাংরার লেখক। ভালো লেখে। ক্রাইম থ্রিলার ভুবই ভালো লেখে”।

সুজাতা চুয়াল শক্ত করে বললেন, “তৃতীয় অন্তর্ধান। রিয়ান ব্যাপারী গায়েব হয়েছে, কাল সন্ধ্যা থেকে”।

শর্মিষ্ঠা কথাটা শুনে পুরো শক খাবার মত রিয়েকশান দিয়ে, দুহাতে মাথা ধরে কনুইটা টেবিলের উপর রেখে, চোখটা বন্ধ করে নিলো। মুখ তার লাল হয়ে গেছে এবার দুশ্চিন্তার কারণে। সুজাতা বললেন, “হুম, কেউ তো আপনার উপর কড়া নজর রাখছেন, আর নিশ্চিত ভাবে আপনাকে কনো কিছুতে ফ্রেম করার চেষ্টা করছে”।

সুজাতা মাথা নেড়ে বলল, “আপনি পরিচালকের ভূমিকা থেকে সরে যান, এমন কেউ আছে যে চাইতে পারে!”

শর্মিষ্ঠা উত্তরে বলল, “এক নয়, অনেকে আছে। প্রায় প্রতিটি পরিচালক আমাকে অভিনেত্রী হবার জন্য রোল দিতে ব্যস্ত থাকে সর্বক্ষণ”।

সুজাতা উত্তরে বললেন, “আর আপনার স্বামী? … আপনার সিনেমার প্রযোজক তো উনিই হন। পরপর তিনটে সিনেমা ফ্লপ হয়েছে, অনেক পয়সার লস হয়েছে নিশ্চয়ই উনার”।

শর্মিষ্ঠা এবার উত্তেজিত হয়ে উঠে বললেন, “কি বলতে চান আপনি! আমার হাজব্যান্ড আমাকে ফ্রেম করার প্রয়াস করছেন! … খুব ভুল করছেন ম্যাডাম। আমার স্বামী আমাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন। হ্যাঁ উনার লস হচ্ছে, তাই আমাকে একটু সতর্ক হতেও বলেছেন। কিন্তু তা বলে আমাকে উনি ফ্রেম করবেন! … না না ম্যাডাম, যদি উনার অর্থসংকটের ব্যাপার থাকতো, তাহলে তো উনি সরাসরি আমাকে বলেই দিতেন, এই মুহূর্তে তিনি কনো সিনেমা প্রযোজনা করতে পারবেন না। উনিও জানেন, আমি উনার যথেষ্ট বাধ্য”।

সুজাতা ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে বললেন, “মাফ করে দেবেন, আমি বোধহয় স্বামীস্ত্রীর মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করে ভুল করে ফেলেছি”।

শর্মিষ্ঠা একটু শান্ত হয়ে উঠে বলল, “আমার স্বামী একজন ভালো মানুষ। সত্যি বলছি, খুবই ভালো মানুষ। অনেক প্রযোজকের কাছে গেছি, তাই অনেক বিত্তবানও দেখেছি আমি। কিন্তু বড়লোক হবার পরেও, উনি অন্যরকম। আর উনি আমাকে বিশ্বাস করেন, আর আমিও”।

সুজাতা ঠোঁটটা একটু ঘুরিয়ে, কিছু চিন্তা করে বললেন, “আপনার ইন্টারনেট, আর মোবাইল যদি আমরা ট্র্যাক করি, তাতে কি কনো আপত্তি আছে আপনার! … আই মিন, যদি আপনাকে কেউ ফ্রেম করতে চায়, আপনার প্রতিটি মুভের উপর নজর রাখতে, সে নিশ্চয়ই আপনার সমস্ত সিস্টেম হ্যাক করে বসে আছে। তবেই তো সে জানতে পারছে, আপনি কার সাথে কবে কখন দেখা করছেন”।

শর্মিষ্ঠা বললেন, “হ্যাঁ করুন। আপনারা আপনাদের কাজ করার জন্য যা প্রয়োজন, তা অবশ্যই করবেন। এনওসিতে সই করতে হলে, কারুকে পাঠিয়ে দেবেন, সই করে দেব”।

সুজাতা বললেন, “আচ্ছা এমনও তো হতে পারে যে, আপনার হাজব্যান্ডের কনো শত্রু এই কাজ করছে, তাকে বিব্রত করার জন্য। উনি তো আইটি রিলেটেড বিজনেস করেন, তো উনার প্রতিপক্ষ তো উনার সিস্টেমকে হ্যাক করার জন্য সমস্ত কিছু করতে পারে, তাই না!”

শর্মিষ্ঠা বলল, “আমার হাজব্যান্ডের সাথে একবার কথা বলে নেবেন। উনি বোধহয় সুলেমা খাতুন নামে একটি মেয়ের নম্বর দিয়ে দেবেন আপনাকে। সুলেমা উনার সম্পূর্ণ সিস্টেমকে সবসময়ে মনিটারিং করে। আসলে প্রতিপক্ষ ইনফিনিটি, আইবিএম আর কগ্নিজেন্টের মত কোম্পানিরা তো, তাই সেটা করতেই হয়”।

সুজাতা বললেন, “আপনার কাছে সুলেমার নম্বর নেই?”

শর্মিষ্ঠা উত্তরে বলল, “আছে, কিন্তু আমি সেই নম্বর আপনাকে দিতে পারিনা। এটা উনার ব্যাবসার ব্যাপার। তাই কার নম্বর উনি শেয়ার করবেন বা করবেন না, সেটা এক্কেবারে উনার ঐকান্তিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তে আমি হস্তক্ষেপ করতে পারিনা, কারণ আমি উনার ব্যবসার ব্যাপারে তেমন কিচ্ছুই জানিনা”।

সুজাতা হেসে বললেন, “ওকে। আপনারা স্বামীস্ত্রী বেশ নজরকারা। আই মাস্ট সে, এমন বড়লোক পরিবারে, এই বনিবনা খুব একটা দেখা যায়না। … স্বামী স্ত্রীর, আর স্ত্রী স্বামীর সমস্ত ব্যাপার জানে, অথচ এটাও জানে যে কোন ব্যাপারে ডিটেল করা তার এক্তিয়ারের মধ্যে আর কোনটা তার এক্তিয়ারের মধ্যে নয়। … ভালো লাগলো শর্মিষ্ঠা। মাস্ট সে, ইউ আর ফরচুনেট এনাফ। সাধারণত সুন্দরী স্ত্রীদের ভাগ্যে, এমন জেন্টিলম্যান স্বামী জটেনা। আবার সাধারণত সুন্দরী স্ত্রীরা স্বামীর প্রতি এতটা লয়ালও হয়না”।

শর্মিষ্ঠা হেসে বলল, “আসলে সুন্দরী হয়েছি, বাবামায়ের কারণে। তবে সৌন্দর্যকে ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে খাওয়ার মনোভাব কনোদিন ছিলনা। ইন ফ্যাক্ট আমার মা আমাকে এই ব্যাপারে সরাসরি সতর্ক করতেন। তিনি বলতেন, সৌন্দর্য ঈশ্বরের দান। সৌন্দর্যকে ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে খাওয়ার অর্থ হলো ঈশ্বরকে নিয়ে ব্যবসা করা”।

সুজাতা হেসে বললেন, “কালচারড ফ্যামিলি। … ঠিক আছে, আজ উঠি। হ্যাঁ কারুকে পাঠিয়ে দেব, এনওসি সই করার জন্য, আর আপনার হাজব্যান্ডের সাথে কথা বলে উনার সিস্টেমের ডিটেলটার উপরও একটু নজর রাখবো”।

শর্মিষ্ঠা বললেন, “আজকে তো চা খেয়ে যান!”

সুজাতা হেসে বললেন, “বেশ, আগের দিন আপননাকে কথা দিয়েছিলাম”।

চা করে আনলো মিনা। শর্মিষ্ঠা ও সুজাতার অনেকক্ষণ কথা হলো। শেষে সুজাতা উঠে বিদায় নিলো শর্মিষ্ঠার থেকে। তবে এই অন্তর্ধান রহস্য শর্মিষ্ঠার পিছন ছাড়লো না। কারণ দুদিনের মধ্যে এবার অজিত হালদার গায়েব হয়ে গেলেন। তবে এরপরে কেস ঘুরে যায় কারণ, এরপর আরো দুজন লেখক গায়েব হয়, যাদের নাম হলো আফ্রান হামেদ, আর মাইকেল সাহা। আর এদের সাথে শর্মিষ্ঠার কনো যোগসুত্র খুঁজে পায়না সিয়াইডি।

তবে এতে, যতটা না সুবিধা হলো, তার থেকেও বেশি অসুবিধা হলো পুলিশের। সুবিধা হলো শর্মিষ্ঠার আর আহমেদের, কারণ পুলিশ নিশ্চয় করে নেয় যে, তারা কারুর টার্গেট নয়, তবে অসুবিধা হলো পুলিশের। যদি সমস্ত কিছু শর্মিষ্ঠা আর আহমেদকে ঘিরেই হতো, তাহলে তদন্ত করা সুবিধা হতো, কিন্তু সেই অঙ্কও এদিকসেদিক হয়ে যেতে, তারা কেসের একদম শুরুতেই ফিরে গেল, মানে উইথ এবসোলিউট নো ক্লু।

পুলিশি ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়ে, শর্মিষ্ঠা এবার পুরপুরি কন্সেন্ট্রেট করলো তার স্বামীর প্রযোজনার চতুর্থ চলচ্চিত্রতে। অক্লান্ত পরিশ্রম করে শর্মিষ্ঠা। গ্র্যান্ড প্রিমিয়ার করে চলচ্চিত্র রিলিজ হলো। প্রায় ১০০টা হলও পেলো সাসপেন্স থ্রিলার ছবি, ‘বিষারদ’। ফ্লপ গেলো না সিনেমা, তবে হিটও হলো না। দিন ১৫’র পর থেকে হল খালি থাকা শুরু করলে, একমাসও গেল না, সিনেমা উঠে গেল হল থেকে, আর ওটিটি রিলিজ নিয়ে, সিনেমার জন্য খরচ করা টাকাটাই খালি উঠলো।

স্টোরিলাইনও বেশ ভালো। পুরো সিনেমাতে সর্বসাকুল্যে ৫টা খুন আছে। প্রতিটি খুনে ব্যবহার করা হয় আলাদা আলাদা বিষ। সিরিয়াল কিলার, কিন্তু প্রতিটি ছায়াছবির মত এখানে সিরিয়াল কিলার নির্দিষ্ট ট্রেন্ড ব্যবহার করেনা। তাই গোয়েন্দা দপ্তর হিমসিম খেয়ে যায় কেস সল্ভ করতে। ঘটনাটা চলতে থাকে একটা পরিবারের মধ্যেই, মানে সেই পরিবারের কাকার দুই ছেলে এক মেয়ে, জেঠুর এক ছেলে এক মেয়ে, আর গল্পকথকের বাবার দুই মেয়ে আর দুই ছেলে, আর চারটে কাজের লোকের মধ্যে। সন্দেহ আসে, একজন বিফল বৈজ্ঞানিক, বড় ভাইয়ের ছেলের উপর।

সন্দেহ আসে এরপর কাকার মেয়ের উপর, যে বটানির প্রফেসার হওয়ার জন্য গাছপালার ব্যাপারে বিশারদ। কিন্তু শেষে জানা যায় যে, খুনগুলো করছিলেন এক কাজের লোক, যিনি কাজের লোক সেজে থাকা গল্প কথকের পিসেমশাই, যিনি একসময়ে আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ছিলেন। মোটিভ কি? পিসি সমস্ত ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে করতেই অসুস্থ হয়ে, নিঃসন্তান হয়ে দেহত্যাগ করেন, সকলের অবহেলার পাত্র হয়ে। তাই পিসেমশাই নিজের স্ত্রীর মৃত্যুর বদলা নিচ্ছিলেন রাঁধুনির ছদ্মবেশে থেকে, আর সম্পূর্ণ পরিবারকে ধ্বংস করার সংকল্প নিয়ে ছিলেন। কিস্তু তাও হিট ছবির মুখ দেখতে পেলো না শর্মিষ্ঠা। আর তাই একপ্রকার ভেঙে পড়লো সে।

প্রথম দিকে একটু বিচার করে সে যে, কেন তার সিনেমা হিট হলো না, কি কারণে তার সিনেমা নির্দিষ্ট ঘেরাটোপেই থেকে গেল। কিন্তু এক সময়ের পর থেকে সেই বিচারও আর করা সম্ভব হলো না শর্মিষ্ঠার পক্ষে, আর তাই সম্পূর্ণ ভাবে ডিপ্রেশনের মধ্যে চলে গেল। ঠিক করে খায়না, ঠিক করে ঘুমায় না। কারুর সাথে কথা বলে না। আর সিনেমা! সিনেমা নিয়ে একটা কথাও কারুর সাথে বলেনা।

অন্যদিকে, অমিতাভ রক্ষিত , রিয়ান ব্যাপারী, অজিত হালদার, আফ্রান হামেদ আর মাইকেল সাহা, এই যে পাঁচ লেখক অন্তর্হিত হয়েছিলেন, তারা আচমকাই আবার নিজের নিজের ঘরে দেখা গেলে, তাদের ঘরের লোক পুলিশে, এঁদের ফিরে আসার কথা জানায়। সেই কারণে পুলিশের দপ্তরে তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে, তারা সকলেই বলে, ‘একটা বড় গল্পের জন্য তারা অন্যত্র চলে গেছিলেন, আর তারা একসাথেই ছিলেন। খুব তাড়াতাড়ি তাদের গল্প নিয়ে সিনেমা আসতে চলেছে’।

পাঁচজনেরই এক ভারসান হবার কারণে, পুলিশ কেস ক্লোজ করে দেয়। কিন্তু আহমেদ স্ত্রীর মনের ও শরীরের স্বাস্থ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন হওয়া শুরু করলেন। সর্বক্ষণ প্রাণোচ্ছল থাকা, ঈষৎ দুষ্টুমি করতে থাকা, তার আদরের শর্মি কেমন যেন নিঝুম হয়ে গেছে। দিন চার-পাঁচ শর্মিষ্ঠার এই ভাব অপরিবর্তিত দেখে আহমেদ একদিন শর্মিষ্ঠাকে অন্যদিকে নিয়ে যাবার কথা বলে বললেন, “শর্মি, তোমার রূপ এমন যে, তুমি যেকোনো পরিচালকের কাছে গিয়ে অভিনেত্রী হতে চাইলে, তারা লুফে নেবে। পরিচালক হবার জন্য, তোমার অভিনয়ও জানা আছে”।

আহমেদ আশা করেছিলেন যে শর্মিষ্ঠা তার এই কথাতে হয়তো একটু বিরূপ প্রতিক্রিয়া দিতে পারে, কিন্তু বারবার অসফল হবার কারণে সম্মতিও দিতে পারে তার কথায়। কিন্তু শর্মিষ্ঠার প্রতিক্রয়া ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। প্রথমবারে উত্তর দেয়না কিছু শর্মিষ্ঠা। তাই আহমেদ বেশ কিছু এদিক সেদিকের যুক্তি দিয়ে বেশ কয়েকবার কথাটা বলতে থাকে। কখনো বলে, “সত্যি বলছি, তোমার রূপ দেখার জন্য, এমনিই হল ভর্তি থাকবে, যেকোনো পরিচালক এক কথায় রাজি হয়ে যাবে”, আবার কখনো বললেন, “যদি বলো, আমি টিভি সিরিয়ালের সাথে কথাও বলতে পারি”।

এমন বেশ কিছুবার বলার পরে একবার শর্মিষ্ঠা নিজের স্নায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সরাসরি আহমেদের জামার কলার ধরে নিজের মুখের কাছে আহমেদের মুখকে ক্ষিপ্র ভাবে টেনে নিয়ে এসে, চিৎকার করে শর্মিষ্ঠা বলে উঠলো, “যদি পরিচালক রূপে আমি অক্ষম হই, তাহলে গৃহবধূ থেকে, তোমাকে আলাদা আলাদা রান্না করে খাওয়াবো, তা ঢের ভালো। আমার যদি কেরিয়ার বলে কিছু হয়, তা শুধু পরিচালক রূপেই হবে”।

আহমেদ একটু ভীতই হয়ে গেল, কারণ শর্মিষ্ঠার এমন আচরণ কখনো দেখেনি সে। আহমেদের ভয়ার্ত মুখ দেখে, শর্মিষ্ঠার বোধ জাগে যে সে কি করছে। অপরাধ বোধে, নিজের প্রতি ঘৃণায়, আত্মশ্লাঘায় শর্মিষ্ঠা এবার কাঁপতে শুরু করলো। চেঁচিয়ে উঠে, আহমেদের কলার ছেড়ে দিলো সে। গ্লানি বোধে ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠলো সে। আর আসতে আসতে আহমেদের পায়ের নিচে বসে পরে, হাত জোর করে কাঁদতে থাকলো।

আহমেদ ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। সেও শর্মিষ্ঠার সামনে বসে পড়লো, শর্মিষ্ঠার ক্রন্দনের কারণে কম্পিত ক্ষমাপ্রার্থী হাতকে আহমেদ নিজের হাতে ধরে, বলা শুরু করলেন, “কিচ্ছু হয়নি শর্মি। কাঁদছো কেন? কেঁদো না, প্লিজ কেঁদো না”।

শর্মিষ্ঠা কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকলো, “আমি হেরে গেছি আহমেদ। … সম্পূর্ণ ভাবে হেরে গেছি। মাথার ঠিক নেই আমার। নাহলে তোমার গায়ে হাত তুলি… ছি ছি… কি হয়ে গেছে আমার!”

আহমেদ আর কনো কথা না বলে, শর্মিষ্ঠাকে প্রাণপণে জরিয়ে ধরলে, শর্মিষ্ঠা আঁকড়ে ধরার মত আহমেদকে জাপটে ধরে অঝরধারায় কাঁদতে থাকলো। বেশ কিছুক্ষণ এমন কাঁদার পর, আহমেদ শর্মিষ্ঠার মুখকে নিজের কাঁধ থেকে তুলে, দুই হাত দিয়ে শর্মিষ্ঠার দুই গালকে, ভালো করে মুখকে মুছিয়ে বললেন, “আমার একটা কথা শুনবে শর্মি! … আমার সাথে, আমার একজন বন্ধুস্থানীয় সাইক্রিয়াটিস্ট আছে, তার কাছে যাবে! … কেউ জানবে না, শুধু আমি আর তুমি”।

শর্মিষ্ঠা কি ভাবে রিয়েক্ট করবে, সেই নিয়ে ভয়ে থেকে, আহমেদ আবার বললেন, “অন্য কনো কারণে নয়, একটু মানসিক ভাবে নিজেকে স্থিত করার জন্য। … আমার বন্ধু হয়। না প্রয়োজন পরলে কনো ওষুধ দেবে না, খুব বেশি হলে ঘুমের ওষুধ দেবে হয়তো, যাতে ভালো ঘুম হয়। … প্লিজ শর্মি, অন্য ভাবে নিও না আমার কথাকে। আমি তোমাকে এই ভাবে দেখতে পাচ্ছিনা। … কনো কাজে মন দিতে পারছি না, ভিতর থেকে কান্না আসছে, তাম্র এই অবস্থার কথা মনে পরলেই কেমন যেন অবশ হয়ে যাচ্ছি। … ইউ নো ভেরি ওয়েল শর্মি, হাউ মাচ ইউ আর ফর মি। … তুমি জানো শর্মি, তুমি আমার সব থেকে কাছের মানুষ। … বিলিভ মি, কেউ জানবেনা। দেখাবে ডাক্তার!”

শর্মিষ্ঠা মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ দেখাবো। দরকার আমার সাইক্রিয়াটিস্ট। স্নায়ুর উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে আমার, নাহলে তোমার গায়ে আমি হাত তুলতে পারিনা। … মাথার ঠিক থাকলে, উত্তেজিত হয়ে গেলেও, প্রচণ্ড রাগ হলেও, আমি তোমার গায়ে হাত তুলতে … না না, তোমার গায়ে হাত তুলেছি মানে, আমার মানসিক ভারসম্য নষ্ট হয়ে গেছে। তুমি ডেট নাও ডাক্তারের। আমি যাবো”।

আহমেদ শর্মিষ্ঠাকে জরিয়ে ধরলো আবার, আর শর্মিষ্ঠার কানের কাছে মুখ রেখে বলল, “কিচ্ছু হবেনা শর্মি তোমার। কিচ্ছু হতে হবেনা। তুমি যদি ভালো ডিরেক্টর নাও হতে পারো, তাও তুমি আমার শর্মি হয়েই থাকবে। … আমিও চাই তুমি ভালো ডিরেক্টর হও, কারণ সেটা তোমার স্বপ্ন। আমার স্বপ্ন তো শুধুই তুমি। তোমার থেকে কিচ্ছু চাইনা। শুধু তোমাকে চাই। … এই একটাই রিকুয়েস্ট তোমার কাছে, জীবনে যাই হয়ে যাক, জানবে, আমার কনো কিছুতে কনো আপত্তি থাকবেনা, যদি সেই সমস্ত কিছুর পরেও তুমি আমার কাছে থাকো”।

শর্মিষ্ঠা আহমেদকে একটু বেশি বলে আঁকড়ে ধরে বলল, “আই ট্রাস্ট ইউ। আই ট্রাস্ট ইউ”।

আহমেদ পরের দিনই ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিলো। দুদিন পরে, সন্ধ্যায় শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে যাবে সে, ডাক্তার রবিকান্ত স্যান্যালের কাছে, যিনি আহমেদের একপ্রকার অন্তরঙ্গ বন্ধু। শর্মিষ্ঠা তাঁকে চেনেও, কারণ অনেকবার তিনি আহমেদের কাছে এসেছেন। শর্মিষ্ঠাকে পরীক্ষণ করে, ডাক্তার সান্যাল বললেন, “চিন্তার কিচ্ছু নেই আহমেদ। শর্মিষ্ঠা ঠিক আছে। একটু মানসিক চাপে পরে গেছে, এইটুকুই খালি। ভালো করে খাওয়াদাওয়া আর ঘুম দিলেই, চাঙ্গা হয়ে যাবে আবার”।

ঠিক করে বসে বললেন, “এক কাজ করো আহমেদ, কালিম্পং চলে যাও। তুমি আর শর্মিষ্ঠা এক সাপ্তাহ সময় কাটিয়ে আসো। ভালো ভালো খাও, এঞ্জয় করো। একটু মনের জানলায় হাওয়া লাগবে শর্মিষ্ঠার। বদ্ধ হয়ে গেছে বড্ড। … তুমি তো ৭ দিনের বেশি ছুটি কাটাতে পারবেনা। তাই ওর সমস্ত ব্যবস্থা করে, ওকে এক দেড় মাস ওখানেই থাকতে দাও”।

আহমেদ চিন্তিত হয়ে বলল, “একা থাকবে শর্মি!”

ডাক্তার সান্যাল বললেন, “কেন তাতে কি আছে। … তোমার ওই ভেলির দিকে একটা বাংলো বাড়ি আছে না। ওখানে গিয়ে ওঠো। লোকজনও তো চেনা আছে। বলে দিও, বাজার দোকান করে দেবে। … আসল কথাটা এই যে, শর্মিষ্ঠার একটু একাকীত্বই প্রয়োজন এখন। ও ঠিক নিজেকে নিজে গুছিয়ে নেবে”।

প্রেসক্রিপশনের পাতায় কিছু খসখস করে লিখে আহমেদের হাতে দিয়ে বললেন, “পুরো দুমাসের ঘুমের ওষুধ। দাঁড়াও কিনতে হবেনা। দোকানে দিতে ঝামেলা করবে। হাল্কা ঘুমের ওষুধ, তাও …” নিজের ড্রয়ার হাতরে, একটা বাক্স থেকে ৪ পাতা ওষুধ বার করে দিয়ে দিলেন ডাক্তার সান্যাল, দিয়ে বললেন, “এম আর দের দেওয়া ফ্রি স্যাম্পেল।  … শর্মিষ্ঠা, এটা ডিনারের পর খেতে ভুলবে না। সারাদিন যাই হোক, দুশ্চিন্তা আসুক, পেনিক হোক, যাই হোক, চিন্তা করার কিচ্ছু নেই। কিন্তু রাত্রে নিয়ম করে এই ঘুমের ওষুধটা খেও দুই মাস”।

প্রেসক্রিপশনের পাতাটা ছিঁড়ে আহমেদকে দিয়ে বললেন, “মনে হয়না দুমাসের থেকে বেশি লাগবে ওষুধটা, তাও যত্ন করে প্রেসক্রিপশনটা রেখে দাও। ভালো ঘুম হলে, পেনিক, দুশ্চিন্তা সব চলে যাবে, আর ফিরে আসবে লজিকাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং। ব্যাস আর কিচ্ছু নয়”।

শর্মিষ্ঠা আর আহমেদ চেম্বার থেকে বেড়িয়ে এসে গাড়িতে উঠে বসলে, আহমেদ বলল, “শর্মি, আমি ফোনটা ফেলে এসেছি। আনছি, এক মিনিট। তুমি গাড়িতেই বসো। আসছি”।

এই বলে ফিরে গেল সে ডাক্তার সান্যালের কাছে, আর গিয়ে বলল, “সান্যাল, পাহাড়ে একাকি থাকবে, সুইসাইডাল এটেমপট করলে!”

ডাক্তার সান্যাল হেসে বললেন, “না না, শর্মিষ্ঠার মধ্যে সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি নেই। তুমি আছো তো ওর স্মরণে। যার কারুকে স্মরণ রাখতে ইচ্ছা হয়না, তার মধ্যেই সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি দেখা যায়। কিন্তু যাদের কাছে অন্তত একজন থাকে, যার স্মরণ আসে, যার প্রতি দুর্বলতা বিরাজ করে, তখন মানুষের সুইসাডাল টেন্ডেন্সি আসে না। … তাই নিশ্চিন্তে থাকো”।

আহমেদ সেই কথাতে আশ্বস্ত হয়ে, ফোন নিয়ে গাড়িতে ফিরে এলে, শর্মিষ্ঠা হেসে বলল, “পাহাড়ে একা থাকলে সুইসাইড করতে পারি, সেই ভয় পাচ্ছ! … আমি চলে গেলে, তোমার কি হবে আহমেদ! তোমার তো আপনজন বলে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। তোমাকে এভাবে একা ফেলে রেখে আমি যেতে পারি!”

আহমেদ শর্মিষ্ঠার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, শেষে ফিক করে হেসে ফেলে বলল, “ফোনটা আসলে আমি ইচ্ছা করেই ফেলে এসেছিলাম”।

শর্মিষ্ঠা মিষ্টি হেসে বলল, “এতদিন ধরে মানুষটাকে দেখছি, এটুকু জানিনি!” আহমেদ স্নেহপূর্ণ হাত রাখলও শর্মিষ্ঠার মাথায়, তারপর গাড়ি ড্রাইভ করা শুরু করলো”।

দুদিনের মধ্যেই শর্মিষ্ঠা আর আহমেদ বাগডোগরা এয়ারপোর্ট পৌঁছে, গাড়ি বুক করে নিয়ে চলে গেল কালিম্পং আর সেখান থেকে দিওলো ভ্যালিতে আহমেদের নিজের বাংলো বাড়িতে সরাসরি চলে গেল তারা। চারিপাশে সবুজ, অদূরে তিস্তা নদী, ঠাণ্ডা বাতাস, পাখির গুঞ্জন, আর এদিক সেদিক থেকে এলোমেলো উড়ে আসা প্রজাপতির ঝাঁক, সব মিলিয়ে সাতদিন মত সুন্দর সুন্দর খাবার আর সুন্দর বাতাবরণের কারণে, শর্মিষ্ঠা আহমেদের বেশ ভালোই দিন কাটে।

তারপর আহমেদের ইচ্ছা না থাকলেও, শর্মিষ্ঠাকে একাকী রেখে চলে আসতে হয় আহমেদকে, কারণ আর তার পক্ষে থাকা চলেনা, ফিরে এসে ব্যবসার কাজে মন দিতে হবে। শর্মিষ্ঠা তাকে হাসি মুখে বিদায় দিলে, পরের দিন সাতেকও সবুজ, প্রজাপতি আর পাখি দেখতে দেখতেই সময় কেটে যায় শর্মিষ্ঠার। জিয়াম্পু নামে একটি গ্রাম্য মেয়ে বাজার দোকান করে দেয় শর্মিষ্ঠাকে।

শর্মিষ্ঠার কাছে তার নিত্য নিমন্ত্রণ থাকে দুপুরে ভাত খাবার। শর্মিষ্ঠার হাতে রান্না খাবার পর, আর যেন জিয়াম্পুর নিজের বাড়ির খাবার খেতেই ইচ্ছা করেনা। শর্মিষ্ঠারও বেশ লাগে এই মিষ্টি গ্রাম্য মেয়েটিকে। তাই দুইবেলা আসতে বলে, আর নিজের সাথে সাথে তারও রান্না করে, আর খাওয়াদাওয়া করে। ফোনের একদমই নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়না সেখানে। তাই প্রায় কথাই হয়না আহমেদের সাথে। একটা বিশেষ টিলা গোচের জায়গা আছে তিস্তার কাছাকাছি। সেখানে গেলে ফোনে টাওয়ারের দুটো দাগ দেখায়। তাই দুইতিনদিন পর পর শর্মিষ্ঠা সেখানে গিয়ে একবার আহমেদের সাথে কথা বলে আসে।

এমনই একদিন আহমেদের সাথে কথা বলে শর্মিষ্ঠা বাংলোয় ফিরছিল, একটা কমবয়সী যুবককে অন্য একটু বেশে, মানে সেই জায়গার মত নয়, একটু অন্যরকম, ঈষৎ কলকাতার বেশে দেখে শর্মিষ্ঠা কৌতূহল বশত এগিয়ে যায়। পড়নে একটা আলখেল্লা টাইপের কটন প্যান্ট, আর গায়ে একটা কটনের পাঞ্জাবি টাইপের জামা পরে, যুবকটি একটি খাতায় খসখস করে কি যেন লিখছিল।

দুষ্টুমি বুদ্ধি শর্মিষ্ঠার মধ্যে শিশুকাল থেকেই। সেইরকম দুষ্টুমি বুদ্ধি নিয়েই, সামনে থেকে না গিয়ে, পিছন থেকে শর্মিষ্ঠা এগিয়ে গেল যুবকের দিকে আর উকি মেরে ছেলেটির খাতার দিকে তাকিয়ে দেখলো, বাংলা ভাষায় কিছু লিখছে সে। সেই দেখে শর্মিষ্ঠা বলল, “বাঙালি!”

ছেলেটি হকচকিয়ে পিছনের দিকে তাকাতে, শর্মিষ্ঠা দেখলো, একজন সুপুরুষ দেখতে বাদামের মত বর্ণের যুবক। মুখে দাড়িগোঁফ কামানোর ছাপ আছে। কিন্তু অভারঅল, ছেলেটির বয়স ৩০এর মধ্যেই হবে। ছেলেটি এবার তড়বড়িয়ে উঠে দাঁড়ালে, শর্মিষ্ঠা দেখলো, বেশ সুন্দর স্বাস্থ্য ছেলেটির। চওড়া কাঁধ, বুকের পাটা বেশ উঁচু, ভুঁড়ি নেই, চোখে চশমা রয়েছে, তবে খুব বেশি পাওয়ার নেই।

এতক্ষণ পরে উত্তর দিলো ছেলেটি, “আজ্ঞে, আপনাকে দেখেও তো এখানের মানুষ মনে হচ্ছে না!”

ছেলেটির কণ্ঠস্বর বেশ সুন্দর। গলার স্বর শুনে মনে হয় বেশ ম্যাচিওরড। শর্মিষ্ঠা হেসে উত্তরে বলল, “কলকাতায় বাড়ি। এখানে বাংলো আছে। সেখানেই থাকি। … আর আপনি? এখানে তো তেমন কনো হোটেল টটেল নেই!”

ছেলেটি বললেন, “আজ্ঞে, তাঁবু ফেলেছি। … একটা গল্প লেখার জন্য এসেছি এখানে। সপ্তা তিনেক থেকে, গল্প শেষ করে চলে যাবো। আসলে গল্পের কন্টেক্সটটা এরকমই একটা পাহাড়ি গ্রাম্য অঞ্চলে। একটা পরিচালক কিছুতেই নিজের গল্পের জন্য সুন্দর দেখতে, বাচ্চা বাচ্চা হিরোয়িন পাচ্ছেন না। এই পথ দিয়ে রিশভ থেকে কালিম্পং ফিরছিলেন, বেড়াতে এসেছিলেন। পথে একটি মেয়েকে অবিকল নিজের সিনেমার অভিনেত্রী যেমন হবে, তেমন দেখতে পেয়ে। গাড়ি ছেড়ে এই পথে চলে আসে।

তারপর, পথ হারিয়ে ফেলে। পাহাড়ি পথ জানাও নেই। ভদ্রলোক তুরস্কের বাসিন্দা। তাই হিন্দি, বাংলা কিছুই জানেন না। তাই কারুকে জিজ্ঞেস করে হাইওয়ে পর্যন্ত ফিরতেও পারছেনা। এমন অবস্থায় এই স্থানের সৌন্দর্যকে বাধ্য হয়েই একরকম উপভোগ করছিলেন। এমনই একদিন, নিজের কাম্য অভিনেত্রীকে আবার দেখতে পান।

পিছু করেন মেয়েটির, কিন্তু নিজের গতি বাড়িয়েও মেয়েটির কাছে যেতে পারেনা। মেয়েটির পিছু করতে করতে, একটি বন্যগ্রামে চলে যায় লোকটা। সম্পূর্ণ ভাবে জনমানব শূন্য একটা স্থান, যেখানে গিয়ে আর তিনি মেয়েটিকে দেখতেও পেলেন না। বেশ কিছুদিন লোকটি দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত থাকে, কিন্তু অবশেষে বেগতিক দেখে, সেই স্থানটিতেই থাকা শুরু করেন।

সেখানেরই জল খান, সেখানেই কিছু পাখি শিকার করে, আর ফল পেরে পেরে আহার করে। এমন করতে করতে, লোকটি একটি পাথরের গায়ে আচর কেটে কেটে হিসাব করতে থাকে, আর সেই হিসাব অনুসারে তিন মাস কেটে যায়। আর তারপরে, সেই মেয়েটিকে আবার একদিন জলপান করার কালে দেখতে পান। আবারও পিছু করেন, আর পিছু করতে করতে, এবার তিনি হাইওয়েতে পৌঁছে যান, যার থেকে কিছু দূরে তিনি নিজের গাড়িটিকেও দেখতে পান, যেটা রাস্তা ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা নিচুতে রেখে গেছিলেন তিনি।

গাড়ি করে ফিরে আসেন শহরে। অভিনেত্রী পাবেনই, এই আশা করে ভারতে এসেছিলেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেকদিন। কাস্টমসে ফাইন ভরে, এমব্যাসির সাহায্যে দেশে ফিরে গেলেন। তিনি যেই ওষুধ খেতেন, সেই ওষুধও অনেকদিন সেস হয়ে গেছে। ক্যান্সারের রুগী তিনি। ওষুধের জোরেই বেঁচে থাকেন। তাই একবার ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে, ওষুধ কেনার চিন্তা করলেন।

ডাক্তার দেখে তাজ্জব হয়ে গিয়ে বললেন, ‘এমন কনো জলপান করেছেন আপনি, এমন কনো স্থানে বেশ কিছুদিন থেকেছেন, যার কারণে আপনার ক্যান্সার পুরোপুরি সেরে গেছে। দেহে ক্যান্সারের কনো ট্রেসই নেই। … ভদ্রলোক বাড়ি ফিরে গেলেন। একাকি বসে বসে কাঁদতে থাকলেন আর বিলাপের সুরে বলতে থাকলেন, ‘হে ঈশ্বর, হে প্রকৃতি, তুমি স্বয়ং সেই মেয়েটা হয়ে এসে আমাকে এমন স্থানে রেখে এলে, যেখানে থেকে আমার ক্যান্সার সারিয়ে দিলে! … প্রকৃতি তুমি অদ্ভুত, আর আমিও তোমাকে কথা দিচ্ছি, এই নতুন জীবন তোমার দেওয়া। তাই যতদিন এই দেহে থাকবো, তোমার উপরেই সিনেমা করবো, তোমাকে যারা অবহেলা করে, তাদেরকে তোমার কথা সমানে বলতে থাকবো’। … এই গল্পটাই এখানে বসে লিখছিলাম”।

শর্মিষ্ঠা হেসে উত্তরে বলল, “বাহ! বেশ গল্প লেখো তো! … তা কি নাম তোমার?”

ছেলেটি বলল, “আজ্ঞে ম্যাডাম, রাজু। রাজু অধিকারী”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5