পরিচালক | রোম্যান্টিক উপন্যাস

আমার নাম নীলিমা। বাবা বছর তিন হয়ে গেছে চলে গেছেন। তাই একমাত্র সম্বল মা’ই। তবে ব্যাপারটা ঠিক তেমন বেদনার নয়, কারণ বেশ কিছু বছর ধরে যার সাথে ঘুরে বেরিয়েছি, তাকে আর তিনদিন পরে সাতপাকে বাঁধতেও চলেছি। আর তা ছাড়াও, এখানে আমার সাথে নিবাস করে বেশ কিছু পরিচারিকা, যাদের অনেকে ঠিক পরচারিকাও নয়। মানে তারা হেয়ার ড্রেসার, ফ্যাশন ডিজাইনার, ইত্যাদি, আর এঁরা আমার বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

তাই একাকী আমি আর মা, এমন ভাবার কনো কারণ নেই। বাড়ি জুরে বিয়ের প্রস্তুতি। সমস্ত কাজ পরিচারিকারাই করছে, মা কেবল তদারকি করছেন। বাবা চলে যাবার এক বছর পর, সিঁড়িতে পাপিছলে পরে যাবার পর থেকে মা হুইলচেয়ারে। নিজের কাজ নিজেই করেন, সাথে সর্বক্ষণ একজন একনিষ্ঠ মেয়ে থাকে। আয়া নয়, কিন্তু আয়ার কাজই করে।

আর যা করেন তিনি, তা হলো আমাদেরই বাড়ির নিচের তলায় একটা বড় স্টুডিও মত আছে, সেখানে রোজ সকালে যান, আর কিছু ছাত্রছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দেন, সিনেমা নির্দেশনার প্রশিক্ষণ। হ্যাঁ, আমার মা নিজে একজন পরিচালক ছিলেন, আর তাই এখন পরিচালকদের প্রশিক্ষণ দেন। এখনো চিনতে পারছেন না, তাই তো! আমার মা হলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, শর্মিষ্ঠা বৈদ্য।

তবে মা, প্রথম থেকেই বিখ্যাত ছিলেন না, অখ্যাত থেকে বিখ্যাত হয়ে ওঠার একটা যাত্রা ছিল তাঁর। আর আজকে পেপারে একটা সাধুর ছবি দেখার পর থেকে কি হয়েছে জানি না, মা একটু উনুঝুনু হয়ে ছিলেন। আমার বিয়ের জন্য এক সপ্তাহ মত নিচের তলায় ডাইরেক্টর গ্রুমিং প্রগাম বন্ধ। তাই হয়তো মা একটু বেশিই উনুঝুনু হবার অবকাশ পেয়েছেন।

তা যাইহোক, মায়ের উনুঝুনু ভাবটা বেশ ভাবাচ্ছিল আমাকে। তাই শেষমেশ দুপুরে প্রশ্ন করে বসলাম, “মা, কি হয়েছে বলো তো তোমার! সকালে পেপারে কি একটা সাধুর ছবি দেখলে, আর তারপর থেকেই কেমন যেন একটা বেখেয়ালে রয়েছ! … কি হয়েছে একটু বলবে!”

মা উত্তরে বললেন, “শুনবি কি হয়েছে! … শোন তাহলে। জানিস কি তোর মা, যে আজ দু-দুবার কান ফেস্টিভাল থেকে গোল্ডেন পাম জেতা পরিচালক, আর যাকে অস্কার কমিটি বলে রেখেছে, তার অন্তিম কালে তাকে লাইফটাইম এচিভমেন্ট দেওয়া হবে, তার একটা অখ্যাত পরিচালক থাকার ইতিহাসও আছে!”

সবসময়েই ইচ্ছা ছিল, মায়ের পুরনো দিনের কথা জানবো, শুনবো। আজ মা সেই কথা নিজে থেকে বলতে, আমি একটু আগ্রহী হয়ে উঠলাম। আমার আগ্রহ বুঝে মা বললেন, “শুনবি তোর মায়ের অখ্যাত থেকে প্রখ্যাত পরিচালক হয়ে ওঠার কাহিনী!”

আমি হেসে বললাম, “শোনার তো বহুদিনের ইচ্ছা, তুমিই কিছু বলো না। তাই আমি আর প্রশ্ন করিনা। … না আসলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরই পিছনে একটা ডার্ক হিস্ট্রি থাকে। কিন্তু ঠিক ডার্ক নয় সেটা, অন্তত আমার তো তাই মত। সেই অন্ধকার অন্ধকার নয়, যেই অন্ধকার থেকে আলোর জন্ম হয়, তাই না! যা আমাদের অন্ধকারে পাঠিয়ে দেয়, তা হলো দানবীয় আসুরিক অন্ধকার। কিন্তু সেই অন্ধকার, যেই অন্ধকার থেকে আমাদের সকলের অস্তিত্ব! তিনিও তো গহন কালী, তাই না!

শূন্য তিনি, তাই অন্ধকার, আমাবস্যা রাত্রের থেকেও গহন অন্ধকার। হবেনাই বা কেন? যেই আদি তিনি, সেই সময়ে তো না সূর্য জন্মেছে আর না চন্দ্র। … তেমনই যেই ডার্ক হিস্ট্রির থেকে প্রতিভারা প্রকাশিত হয়, তা আর যাই হোক আসুরিক অন্ধকার নয়, তা হলো ঐশ্বরিক অন্ধকার।

কিন্তু … আসলে, মানে আমার কাছে সেটা ঐশ্বরিক অন্ধকার হলেও, যার ইতিহাস সেটি, মানে যে সেই অন্ধকারকে ঝেলেছে, তার কাছে সেটা ঐশ্বরিক নাও হতে পারে। তাই জানতে ইচ্ছা করলেও, বলিনা”।

মা হেসে বললেন, “না, আমার কাছে আমার ইতিহাস আসুরিক নয়, ঐশ্বরিক, কারণ হ্যাঁ, আমি নিজে কিছু আসুরিক ক্রিয়াকলাপ করেছি, কিন্তু আমার সাথে যা কিছু হয়েছে, তা অত্যন্ত বিশেষ ভাবেই ঐশ্বরিক। আমি ভাবতাম তুই জানতে চাসনা, তাই জোর করি নি। জানতে চাইলে, আমি সেই ঐশ্বরিক ডার্ক হিস্ট্রি বলার জন্য মুখিয়ে থাকি। … যাইহোক, তুই খালি আছিস কি এখন! … থাকলে বলবো”।

আমি হেসে বললাম, “আমার হবু স্বামী বাবার কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আর আমি সেই কোম্পানির চেয়ারপারশেন। তবে চেয়ারপারশেন বেশে আমার কাজ একটাই, ফাইলে সই করা, ব্যাস। বাকি কাজও পেন নিয়ে, কিন্তু সই নেই তাতে, বা বলা যেতে পারে পুরোটাই সই। … হুম, তাই তো। … পৃথিবীতে সেই মানুষেরই সব থেকে বড় সাক্ষর থাকে, যে একজন শিল্পী, কারণ তার সম্পূর্ণ শিল্পকলাই যে তার সাক্ষর। … তেমনই আমি একজন লেখক, ওরফে স্ক্রিপ্ট রাইয়াটারও। তাই সারাদিন আমি আমার সই করতেই থাকি, যার স্পেসিমেন সিগনেচার খালি আমার হবু স্বামীর ফাইলগুলোতে করি।

আর বাড়িতে, বাবার আর তোমার বিপুল খ্যাতি আর উপার্জিত অর্থের বলে, আজ সব মিলিয়ে দশদশটা পরিচারিকা। নিজের বিয়ের শুধু শপিংটাই আমি করেছি, বাকি সব তো তারাই করেছে। তাই আমার আর কাজ কি। বরং তুমি তোমার ঐশ্বরিক ডার্ক হিস্ট্রি বললে, আমার আরো একটা কাহিনী হবে, আরো একটা স্ক্রিপ্ট হবে”।

মা একটু বিরক্তির হাসি হেসে বললেন, “তোদের লেখকদের এই সমস্যা। তোরা সোজা কথা সোজা ভাবে বলতে পারিস না। সহজ কথা প্রশ্ন করলাম, সময় আছে শোনার। বললেই হয়, হ্যাঁ আছে, তুমি বলো। … তা না, সই, সাক্ষর, বৃহত্তম সাক্ষর, কত কথা শুনিয়ে দিলো আমাকে”।

আমার মা একদম রাগেন না। তবে এই যে একটু বিরক্ত হয়ে হাসিমুখে বকেন, এটা আমার ভারী প্রিয়। আমাকে দেখতে খারাপ নয়, মুখশ্রী বেশ পরিষ্কারই, গায়ের রংও বেশ ভালোই, মানে ফরসাই বলা হয় আমাকে। তবে আমার মা’কে দেখতে, এককথায় অ’সাম! … উনি যে কেন অভিনেত্রী না হয়ে পরিচালক হলেন, সেটা আমার মাথায় আজও ঢোকেনি। আমার মা’কে যা দেখতে, আর গায়ের যেমন দুধে আলতা রং, অভিনয় করতে নামলে, উনি অভিনয় না জানলেও, শুধু পর্দায় উনাকে দেখার জন্যই ভিড় লেগে যেত।

আজ উনি প্রায় ৬০… ৫৭ বোধহয়। এখনো যা রূপ আর গায়ের রং উনার, আমাকে আর মাকে বিয়ের সাজে একসাথে সাজালে, আমার কর্তা আমাকে না উনার সাথেই মালা বদল করে নেবে। কেন এই কথা বলছি! কারণ তখন আমি এই কথাটাই ভাবছিলাম, আর ভাবতে ভাবতে মায়ের মুখের দিকে বিভোর হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। সেটা বুঝলাম, যখন মায়ের থেকে একটা ধমক খেলাম।

মা ধমক দিয়ে উঠলেন, “কি রে নিলি! (নিলি আমার বাড়ির নাম, মানে নীলিমা নামেরই শর্টফর্ম) আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কি দেখছিস!”

আমি একটু চমকেই গেলাম। চমকে উঠে হেসে বললাম, “তোমাকেই দেখছিলাম। পাড়ার দুর্গাঠাকুরকেও এতটা সুন্দরী করতে পারেনা কুমোরটুলি, যতটা সুন্দর তোমাকে করেছেন স্বয়ং মা দুর্গা। … না না, আর কথা বাড়াবো না। বল তুমি বলো, তোমার ডার্ক ঐশ্বরিক হিস্ট্রি বলো। আমি সত্যই শুনতে অত্যন্ত আগ্রহী”।

মা একজন পরিচালক, আর শুধু পরিচালক নয়, শ্রেষ্ঠ পরিচালকদের মধ্যে একজন। তাই তাঁর গল্প বলার ধরনটাও অন্যরকম। মানে, উনি যেমন করে অনভিনেতাদের স্টোরি ন্যারেট করতেন, ঠিক তেমন ভাবেই আমায় নিজের কাহিনী বললেন, যেখানে একবারও তিনি, ‘আমি’ শব্দটি বা ‘তোর মা’ শব্দটি ব্যবহার করলেন না, বরং শর্মিষ্ঠা বৈদ্য এবং শর্মিষ্ঠা শব্দের ব্যবহার করলেন। তাই আমিও মায়ের ভাষাতেই আপনাদেরকে মায়ের কাহিনীর বিবরণ দিলাম। তিনি বলতে থাকলেন –

শর্মিষ্ঠার বৈদ্যের বয়স তখন এই ২৮-২৯ হবে। দুধে আলতা গায়ের রং, আর বেশ ডাকসাইটে সুন্দরী। কলেজে পড়ার সময়ে, অনেক পুরুষ তাঁর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করেছে, কিন্তু শর্মিষ্ঠা অত্যন্ত গভীর ভাবে কেরিয়ারেস্টিক। তার স্বপ্ন ছিল কান ফিল্ম ফেস্টিভালে গিয়ে হাতে গোল্ডেন পাম পুরস্কার নেবে। স্বপ্নটা তার ব্যক্তিগত হলেও, স্বপ্নটি দেখার পিছনের কারিগর ছিলেন শর্মিষ্ঠার বাবা, বান্ধব বৈদ্য।

বান্ধব বৈদ্য একজন প্রখ্যাত নাট্যকার ছিলেন। বহু নাটক পরিচালনা করেছেন তিনি, কিন্তু তার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, তার প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও, তাকে একটি সিনেমারও পরিচালনা করতে দেওয়া হয়নি। শেষ বয়সে এসে যখন একজন প্রযোজক রাজি হলেন তাঁকে দিয়ে সিনেমা পরিচালনা করানোর জন্য, কনো নায়ক রাজি হলেন না, তার সাথে কাজ করার। তাই বাবার থেকেই শর্মিষ্ঠা স্বপ্ন ধার করে নিয়ে, সেই স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন করে নিয়েছিল।

বান্ধব বৈদ্যের সাথে কনো অভিনেতা কাজ না করতে চাওয়ার একটি বিশেষ কারণ ছিল বান্ধব বৈদ্য নিজেই। আসলে বান্ধব বৈদ্য প্রথম জীবনে একজন অভিনেতা ছিলেন, আর রূপে গুণে তিনি এমনই একজন নায়ক ছিলেন যে, নাট্যজগতে তাঁকেই সকল নাট্যকার চাইতেন। আর সেই থেকে অভিনেতাদের ঈর্ষার পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি, আর সেই ঈর্ষাকে ফলিভুত করেন অভিনেতারা যখন বান্ধব বৈদ্য পরিচালনার ভূমিকাতে অবতীর্ণ হবার প্রয়াস করলেন।

বাবার থেকে শর্মিষ্ঠা কেবল স্বপ্নই ধার করেনি। স্বপ্নের সাথে সাথে, নির্দেশনার গুণও যেমন ধারণ করেছিল, তেমন বাবা বান্ধব বৈদ্য এবং মা স্নিগ্ধা বৈদ্যের থেকে অপরিসীম রূপও ধার করে নিয়েছিলেন। শর্মিষ্ঠাকে অভিনেত্রী করে পেতে নাট্যকাররা শুধু নয়, যেই অভিনেতারা বান্ধব বৈদ্যকে এককালে পরিচালকের ভূমিকাতে অস্বীকার করেছিলেন, তারাও নিত্য বিরক্ত করতেন।

আর তার কারণ শর্মিষ্ঠার গুণ যতটা, তার থেকে অনেক বেশি তার রূপ। ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতা, নধর গতর, অঙ্গের দুধে আলতা রং, স্পষ্ট ও লাবণ্য মিশ্রিত মুখশ্রী, আর নিষ্কলঙ্ক তৈলাক্ত অঙ্গরূপ। এই সমস্ত কিছুর কারণে, শর্মিষ্ঠার পিছনে স্কুল কলেজের ছেলেরা বেশি ভিড়তেই পারতো না, কারণ কনো না কনো অভিনেতা বা পরিচালক সব সময়ে তার পিছনে ঘুরঘুর করতো, যদি একবার শর্মিষ্ঠা সিনেমায় অভিনয় করতে রাজি হয়ে যায়, এই লালসায়।

আসলে বান্ধব বৈদ্যকে বলে কনো লাভ হয়নি। যখন শর্মিষ্ঠা স্কুলে পড়ে, তখন বান্ধব বাবু সরাসরি বলে দেন, মেয়ের পড়াশুনাতে মন আছে, এখন অভিনয় নয়। আর যখন কলেজে পড়ে শর্মিষ্ঠা, তখন তো শর্মিষ্ঠাও মনস্থির করে নিয়েছে, তাই বান্ধব বৈদ্য সরাসরি বলে দিতেন, মেয়ে অভিনয় করবেনা, ওর স্বপ্ন পরিচালনা করা। তাই বান্ধব বৈদ্যকে না পটিয়ে, সরাসরি মেয়েকেই পটানোর তালে পেটেলদারদের লেলিয়ে রাখতেন শর্মিষ্ঠার পিছনে।

শর্মিষ্ঠা ব্যাপারটা বেশ উপভোগও করতো। আসলে ছেলেরা তার পিছনে ঘুরঘুর করে, শর্মিষ্ঠার সেটা পছন্দ ছিলনা, আর এই পেটেলদারদের ঘোরাঘুরির কারণে, শর্মিষ্ঠাকে কনো ছেলে বিরক্ত করতেই পারতো না, বিরক্ত করা দূরে থাক, কাছেই ভিড়তে পারতো না। তাই শর্মিষ্ঠাও মনোযোগ সহকারে নির্দেশনাটা শিখে নেয়।

নির্দেশনা শেখার সময়ে, আর্ট কলেজেই বেশ কিছু প্রযোজকের আনাগোনা লেগে থাকতো। আর প্রযোজক মানেই পয়সাওলা, আর পয়সাওলা মানেই একটু আধটু তো মাতব্বর বটেই। মানে, পয়সা থাকলেই একটা ধারণা থাকে যে পয়সা দিয়ে সমস্ত কিছু কিনে নেওয়া সম্ভব। আর সেই সমস্ত কিছুর মধ্যে একটা সুন্দরীর শরীর থাকে তালিকার শীর্ষে।

তাই শর্মিষ্ঠার রূপে বেশ কিছু প্রযোজকও আকৃষ্ট হয়, আর শর্মিষ্ঠার সঙ্গ লাভ করার জন্য, তারা শর্মিষ্ঠার সিনেমা প্রযোজনা করতেও রাজি হয়ে যায়। কিন্তু সুন্দরী হোক বা রমণীয় হোক, একজন ব্যবসাদের প্রথম প্রেম তো মানব মনের বিষ্ঠা, মানে টাকা। তাই একাধিক সিনেমার প্রযোজনার পরেও, যখন শর্মিষ্ঠা কনো হিট সিনেমা কিছুতেই দিতে পারছিলনা, আর হিট সিনেমা দিতে না পারার ভরপাইটাও যখন শর্মিষ্ঠা বিছনাযুক্ত বদ্ধ কামরায় করতে রাজি নয়, তখন একে একে প্রায় সমস্ত প্রযোজকই শর্মিষ্ঠার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া শুরু করে দেয়।

শর্মিষ্ঠার এই বিফলতা যতটা না শর্মিষ্ঠাকে আঘাত করে, তার থেকে অনেক বেশি আঘাত করে তার বাবা, বান্ধব বৈদ্যকে। আর এবারের এই নিষ্ফল প্রয়াসকে তিনি আর নিতে পারেন না, তাই দেহত্যাগ করেন পরস্পর দুটি স্ট্রোক এট্যাক করে। বিধবা মা, স্নিগ্ধা বৈদ্যও তাঁর স্বামীর প্রতি প্রবল ভাবে আসক্ত ছিলেন। তাই স্বামীর দেহান্ত তাঁকে বেশ বিহ্বল করে দেয়, আর তা এমনই বিহ্বল করে দেয় যে, আহারনিদ্রার প্রতি উদাসীন হয়ে উঠতে থাকেন তিনি।

আর সেই থেকে দুর্বল হয়ে যাওয়া শরীর একদিন মাথা ঘুরে সিঁড়ি থেকে পরে গেলে, একটা নাট্যকারের সাথে একটা সিন ডিসকাস করাকালীন শর্মিষ্ঠার কাছে কাজের মেয়ের ফোন আসে। কিন্তু ফোন এসেও কিছু লাভ হলো না। মাকে নার্সিংহোমে ভর্তি করার দুঘণ্টার মধ্যেই ঘোষণা করে দেওয়া হলো, ‘সি ইস নো মোর’।

অনাথ হয়ে গেল শর্মিষ্ঠা। আর অবিভাবকহীন সুন্দরী যে সমাজের মধ্যে অসহায় হরিণী হয়ে যায়, সেই কথা প্রতিটি মেয়েই জানে। সমাজের পুরুষ থেকে নারী সকলে তখন একাকজন ক্ষুধার্ত হায়না হয়ে ওঠে, আর সেই সুন্দরী স্ত্রী হয়ে যায় তাদের কাছে অসহায় হরিণী। শর্মিষ্ঠা বেশ বুঝতে পারলো, যেনতেন প্রকারে সাফল্য এবার লাগবেই, নাহলে তাকে যারা শিকার করার চেষ্টা করছে, তারা বাঘ নয়, তারা হলো হায়নার দল। বাঘ সিংহ প্রবল শক্তিশালী হলেও, তারা শিকার করার সময়ে যথেষ্ট এথিকাল, কিন্তু হায়না! …

হায়নার অবিধানে এথিকস নামক কনো শব্দই থাকেনা। তাই এই হায়নার দলের থেকে বাঁচার একটিই উপায় আর তা হলো সাফল্য। আসলে সাফল্য একটি ধারালো অস্ত্র, যেই অস্ত্র হাতে থাকলে, হায়নারা অন্তত ধারে কাছে ঘেঁসতে পারেনা। হ্যাঁ বাঘসিংহ তখনও সুযোগের অপেক্ষা করে, কিন্তু হায়নার থেকে তিনি মুক্ত যিনি সাফল্যমণ্ডিত।

তাছাড়াও, নির্দেশনা আর পরিচালনা শর্মিষ্ঠার রক্তে রক্তে। সেটা তার বাবার স্বপ্ন, সেটা তার মায়ের স্বপ্ন, সেটা তার নিজের স্বপ্ন। শর্মিষ্ঠা একটু আধটু মদ্যপান করতো, তবে এবার একটু গহন বিচার করার সময় এসেছে। তাই একটু বেশি পরিমাণ মদ আবশ্যক হয়ে গেছিল। সেখানেও বিপদ। বারে বসে মদ খেতে গিয়ে শর্মিষ্ঠা দেখলো গহন বিচার দূরে থাক, হায়নার দলের মুখ দিয়ে লালা ঝরতে শুরু করে দিয়েছে তাই প্রাণের শঙ্কা এসে যাচ্ছে।

তাই বেশ খানিক স্টক করে নিয়ে, সে নিজের পৈত্রিক বাড়িতেই গাঢাকা দিয়ে দিলো। অনলাইনে চাটের অর্ডার দেয়, আর সেই চাটের সাথে সাথে মদ। সঙ্গে একটুআধটু সিগারেট। আর থাকে গহন বিচার। আত্মবিশ্লেষণের সিটিং। জানতেই হবে এবার। কেন, কি কারণে তার সিনেমা হিট করতে পারছেনা। তার নিজের নির্দেশিত সিনেমাগুলোকে নিজেই চালিয়ে চালিয়ে দেখলো কম্পিউটারে। নিজেরই ভালো লাগলো না।

আরো গহন বিচার করতে হবে। কোন জায়গায় খামতি হচ্ছে! … গল্পের অনুসারে পুঙ্খানুপুঙ্খ প্লট বানাচ্ছে, অভিনেতাদের মধ্যে চরিত্রের সমস্ত গুণ ফুটিয়ে তুলছে, সমস্ত আবেগকে স্থাপন করছে, কিন্তু তাও কোথায় যেন একটা জিনিস মিসিং! প্রায় ১০ দিন এমন বিচার করেও, যখন কনো সুরাহা পেলনা শর্মিষ্ঠা, তখন হতাশ শর্মিষ্ঠা এবার কেরিয়ার সুইচ করার চিন্তা করে একাদশতম দিনের বাংলা খবরের কাগজ তুলে নিলো। … তিনের পাতায়, একটি খবর তার নজর টেনে নিলো।

খবরটি বিখ্যাত পরিচালক দ্বিভদ্রের সম্বন্ধে। এই একটি মাস আগে তিনি কান ফিল ফেস্টিভাল থেকে গোল্ডেন পাম পুরস্কার পেয়ে, বিদেশের মাটিতেই বিভিন স্থানে ঘুরছিলেন, বিভিন্ন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অনুরোধে। তিনি দেশে ফিরেছেন, তিনদিন হয়েছে। উনার বাড়ি শিলিগুড়িতে। কলকাতার চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁকে সম্বর্ধনা দেওয়া হবে। তাই তিনি কলকাতা আসছেন। আর কলকাতা এসে, তিনি দিন সাতেকের মত সময় থাকবেন।

দ্বিভদ্র শর্মিষ্ঠার অত্যন্ত পছন্দের একজন পরিচালক। তার বাবা, বান্ধব বৈদ্যের অনুগত ছিলেন তিনি। বান্ধব বৈদ্য মধ্য বয়সে কালিম্পং শহরে খুব যেতেন। মেয়ে, মানে শর্মিষ্ঠা বছরে একবার করে ওয়ার্কশপে যেত, আর সেই সময়ে মিস্টার এন্ড মিসেস বৈদ্য কালিম্পংএ গিয়ে থেকে আসতেন। প্রায় প্রতিবারই দ্বিভদ্র আসতেন তাঁদের কাছে, এবং চলচ্চিত্র সম্বন্ধে অনেক কিছু শিখেজেনে যেতেন। বাবামায়ের মুখে অনেকবার নাম শুনেছে শর্মিষ্ঠা এই দ্বিভদ্রের।

যখনই তাঁরা দ্বিভদ্রের ব্যাপারে কথা বলতেন, শর্মিষ্ঠা একটি কথা শুনতে পেতোই পেতো, আর তা হলো, ‘দেখো, একদিন এই ছেলেটি খুব বড় পরিচালক হবে, মিলিয়ে নিও কথাটা’। মা বলতেন, ‘সব ভালো ছেলেটার, তবে স্পিরিচুয়াল ছাপটা ছেলেটার মধ্যে একটু বেশি মাত্রাতেই রয়েছে, তাই না! স্পিরিচুয়াল টাচটা একটু কম থাকলে ভালো হতো। এতটা স্পিরিচুয়াল হলে তো ওকে কেরিয়ারিস্টিক হতে দেবে না!’

উত্তর বাবা হেসে বলতেন, ‘স্পিরিচুয়াল বলেই তো এতো প্রতিভাবাণ। স্পিরিচুয়াল বলেই তো, এতো গভীরে যেতে পারে, এতো নিখুঁত বিচার ছেলেটার। … মিনি (শর্মিষ্ঠার মাকে তার বাবা এই নামেই ডাকতেন), কলা হলো আধ্যাত্মিকতার এবিসিডি, বুঝলে। তাই কলার জগতে মনযোগী থাকলে একটু আধটু তো স্পিরিচুয়াল হয়ই মানুষ। তবে যারা কলার জগতের গভীরে যায়, তারা অবশ্যই গভীর ভাবে স্পিরিচুয়াল। আসলে, কলা হলো প্রত্যক্ষ ভাবে ঈশ্বরের দান। আর যেখানে ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ প্রকাশ, সেখানে ব্যক্তি ঈশ্বরচিন্তায় চিন্তিত হবেনা, এটাই তো অস্বাভাবিক, তাই না!’

যাই হোক, শর্মিষ্ঠা কনোদিনই দ্বিভদ্রের সাথে সাখ্যাত করেনি, কিন্তু সাখ্যাত না করলেও, নিজের বাপমায়ের মুখ থেকে অনেক কথাই শুনেছে তার ব্যাপারে। আর সব থেকে বড় কথা, দ্বিভদ্রের প্রায় সমস্ত পরিচালিত সিনেমা দেখে শর্মিষ্ঠা, আর অন্তর থেকে দ্বিভদ্রের কলাপ্রতিভাকে কুর্নিশ ও সম্মান করে সে। বিচার করে শর্মিষ্ঠা, একমাত্র ইনিই ধরিয়ে দিতে পারেন আমার ভ্রান্তি কোন জায়গায় হচ্ছে, সেটা।

বাবার ফোনের ডায়রি থেকে নাম্বার বের করে সরাসরি ফোন করে সে দ্বিভদ্রকে। দ্বিভদ্রের আসল নাম ভদ্র। পুরো নাম ভদ্র ভদ্র, মানে নামও ভদ্র আর পদবিও। আর তাই সে নিজেকে দ্বিভদ্র নামে পরিচয় দেওয়া শুরু করে। তাই শর্মিষ্ঠা ফোন করে নিজের একটু খশখশে কণ্ঠস্বরে বলল, “হ্যালো, মিস্টার ভদ্র?”

উলটোদিক থেকে বলা হয়, “হ্যাঁ বলছি, আপনি কে?”

শর্মিষ্ঠা বললেন, “আপনি আমার বাবাকে হয়তো চেনেন, আমাকে চেনেন না। আমার বাবার নাম বান্ধব বৈদ্য”।

দ্বিভদ্র উত্তেজিত হয়ে উঠে বললেন, “ওহ … কি সৌভাগ্য। … আই এম ভেরি সরি। স্যারের মৃত্যু সংবাদও পেয়েছি, তখন একটা পরিচালনার মধ্যে ছিলাম বলে যাওয়া হলো না, আর ম্যাডামের মৃত্যু সংবাদ পাবার কালে, আমি দেশের বাইরে ছিলাম বলে যাওয়া হলো না। … আর হ্যাঁ, আপনার সাথে সাখ্যাত হয়নি ঠিকই, কিন্তু এমন নয় যে আপনাকে আমি চিনিনা। … শর্মিষ্ঠা বৈদ্য আপনার নাম, এবং আমি আপনার পরিচালিত ৫টা ছবিই দেখেছি। আর সাথে এও বলতে চাই যে, আপনার নির্মিত ছবির মান বেশ ভালো, বেশ মানে, খুবই ভালো”।

শর্মিষ্ঠা বললেন, “বাবার, মায়ের আর আমারও স্বপ্ন ছিল ভালো পরিচালক হবো আমি। কিন্তু পারলাম না! … কোন জায়গায় যে আমি কিছু মিস করছি, আত্মবিস্লেশন করেও ধরতে পারছি না। আমাকে একটু ধরিয়ে দেবেন স্যার!”

দ্বিভদ্র মৃদু হেসে বললেন, “প্রথম কথা তো আমাকে স্যার বলা বন্ধ করো। তোমার বাবা আমায় অত্যন্ত স্নেহ করতেন, এবং আমি উনার থেকে অনেক খুঁটিনাটি ব্যাপার শিখেছি। আর তুমি তাঁর মেয়ে, মানে আমার অত্যন্ত বিশেষ আত্মীয়। … আত্মীয়কে কেউ স্যার বলেনা, তাই স্যার বলা বন্ধ করো। … আর দ্বিতীয় কথা, অবশ্যই সাহায্য করবো। হ্যাঁ, তোমার চলচ্চিত্র সম্বন্ধে আমার কিছু বলারও আছে। আশা করি সেই কথাতেই তোমার কাজ হবে। …

আর শেষ কথা এই যে, স্যার বান্ধব বৈদ্যের কন্যার কনো প্রয়োজন নেই যে সে আমার থেকে এপয়েন্টমেন্ট নেবে। আমি কলকাতা যাচ্ছি কালকে। ৭ দিন থাকবো। নভোটেলে থাকছি। যেদিন আমি ফাঁকা আছি দেখবো, আমি তোমাকে এই নম্বরে ফোন করে ডেকে নেব। তুমি কি কনো সিনেমার শুটিংএ আছো এখন!”

শর্মিষ্ঠা উত্তরে নিজের উত্তেজনা চেপেই বলল, “না, সম্পূর্ণ ফাঁকা”।

দ্বিভদ্র বললেন, “বেশ, তাহলে তো ভালোই হলো। শুধু ফোনটা কাছে রেখো। আমি ফাঁকা আছি দেখলেই, তোমাকে ফোন করে দেব। ফোন করার কতক্ষণের মধ্যে আসতে পারবে নভোটেল?”

শর্মিষ্ঠা উত্তরে বলল, “বেশিক্ষণ নয়। আমি থাকি কেষ্টপুরে। গাড়ি আছে, নিজেই ড্রাইভ করে গেলে, এই মিনিট ১৫-২০ লাগবে হয়তো”।

দ্বিভদ্র বললেন, “বেশ, আমি ফোন করে দেব, আর রিসেপ্সানে শর্মিষ্ঠা বৈদ্য নামে কেউ আসবে দেখা করতে বলে রাখবো। … একটা আইডেন্টিটি কার্ড জাতীয় কিছু রেখো সাথে। হয়তো দেখতে চাইবে, মানে তুমিই শর্মিষ্ঠা বৈদ্য জানার জন্য”।

দ্বিভদ্র ফোন রেখে দিলেন। শর্মিষ্ঠা বেশ উত্তেজিত। দ্বিভদ্র একপ্রকার তার কাছে হিরোর মত। তাই তার সাথে এমন ওয়ান টু ওয়ান সাখ্যাত হবে, ভেবেই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলো শর্মিষ্ঠা।

ফোন এলো শর্মিষ্ঠার কাছে তিনদিন পরে সকাল ৮টা নাগাদ। শাড়ী ঠিক করেই রেখেছিল শর্মিষ্ঠা, যেটা পরে যাবে শর্মিষ্ঠা তার হিরোর সাথে সাখ্যাত করতে। সেটা চাপিয়ে, চিরাচরিত স্বভাব মত, কপালের মাঝে একটা কালো টিপ পরে, স্করপিও গাড়ি চালিয়ে নভোটেল পৌছায় শর্মিষ্ঠা। ফর্মালিটি করে, সুইট নম্বর ৭৭এ চলে গেলেন শর্মিষ্ঠা।

আগে থেকেই ফোন করে দেওয়া হয়েছিল। তাই দরজা খোলাই ছিল। নক করতে আওয়াজ এলো, ভিতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দাও। শর্মিষ্ঠা তেমনই করলো। দরজা বন্ধ করতে দেখলো তার সামনে তার হিরো বসে রয়েছে।

একমুখ কালো কুচকুচে দাড়ি দেওয়া কালো সানগ্লাস টাইপের ফটোক্রমিক চশমাযুক্ত একটা এই ৩৪-৩৫ বছরের যুবক বসে রয়েছেন। পড়নে একটা কালো জিনস আর কালোতে সাদা প্রিন্টের শান্তিনিকেতনী জামা পরা ব্যক্তি বসে রয়েছেন। শর্মিষ্ঠাকে দেখে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে পরলেন, আর বললেন, “আপনাকে তো আচ্ছা আচ্ছা নামি অভিনেত্রীর থেকেও বেশি সুন্দরী দেখতে! … বসুন। … বলুন কি নেবেন, চা, কফি, ঠাণ্ডা!”

শর্মিষ্ঠা মিষ্টি হেসে বললেন, “আপনার কথা অনেক শুনেছি, বাবামায়ের মুখে, সাখ্যাত এই প্রথমবার। … তবে আমি আপনার একজন ফ্যান বলতে পারেন। আপনি আমার শুধু পছন্দের নয়, একমাত্র পছন্দের পরিচালক বললেও ভুল বলা হবেনা”।

বসতে বসতে বলল শর্মিষ্ঠা, “কিন্তু আমি কিছুতেই ভালো ছবি করতে পারছি না জানেন!”

দ্বিভদ্র মিষ্ট হেসে, নিজের খ্যানখ্যানে গলায় বলল, “কি খাবে বললে না তো!”

শর্মিষ্ঠা উত্তরে হেসে বলল, “এখন আমার একমাত্র খাদ্য হলো সাফল্য”।

দ্বিভদ্র সেই কথার উত্তরে হেসে বলল, “স্ক্রিপ্ট রাইটারের স্ক্রিপ্টে কাজ করো নাকি লেখকের কাহিনীতে?”

শর্মিষ্ঠা একটু ভ্রু তুলে তাকালে, দ্বিভদ্র পুনরায় হেসে বলল, “আমি কনো স্ক্রিপ্টরাইটারকে দিয়ে গল্প লেখাইনা জানো। ভালো লেখকের গল্প স্ক্রিপ্টরাইটারকে দিয়ে স্ক্রিপ্ট করে, তার উপর সিনেমা করি”।

শর্মিষ্ঠা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল কথাতে। অজ্ঞাত ভাবেই বলে উঠলো শর্মিষ্ঠা, “দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কি?”

উত্তরে দ্বিভদ্র বলল, “একজন জাতের লেখক হলেন একজন কলাশিল্পী। তার লেখার মধ্যে থাকে দর্শন। তার লেখার মধ্যে থাকে একটি প্রত্যক্ষ কাহিনী আর একটি পরোক্ষ অর্থ, দর্শন ও বার্তা। আর একজন পরিচালকের কাজ হলো সেই লুকিয়ে থাকা মানে পরোক্ষে থাকা অর্থ, দর্শন আর বার্তাকে বাইরে টেনে এনে স্থাপন করা। … কেমন জানো?

মহান সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাকে খেয়াল করো। বাচ্চাদের সিনেমা, হীরক রাজার দেশে। বার্তা কি রয়েছে এর মধ্যে? মগজধলাই। … বিচার করে দেখো শর্মিষ্ঠা, সারাজগতে আজ প্রতিটি দেশের প্রতিটি সরকার, এই মগজধলাই-ই করছে অনুক্ষণ।

আরো বিচার করে দেখো, তাঁরই সিনেমা, গুপী গাইন বাঘা বাইন। কি বলা হচ্ছে তাতে? হাল্লার মহামন্ত্রী জহর রায় জাদুগরকে বলছে, প্রজাকে কথা বলাতে হবে তো। প্রজা যদি কথা না বলে, তাহলে জানবো কি করে যে প্রজা কি চাইছে, আর তা যদি না জানা যায় তাহলে প্রজার কণ্ঠরোধ করবো কি করে!

কিছু কি বুঝলে? বাইরে এক কাহিনী, কিন্তু ভিতর দিয়ে চলে যাচ্ছে বিদ্রোহের সুর। পথের পাঁচালি সিরিজ কি বলছে আমাদেরকে? বলছে যে শুধু সেলিব্রিটির জীবনই সিনেমা নয়, নিরীক্ষণ করতে পারলে প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রাই একাকটি কাহানী, একাকটা সিনেমা।

এটাই হলো এক বিশেষ পরিচালকের গুণ। একজন বিশেষ পরিচালক শুধু সুপারহিট সিনেমা দেওয়া কাজ থাকেনা। সে একজন সমাজ সচেতনতা প্রদানের আসনে বিরাজমান ব্যক্তি। তাই সমাজকে সচেতন করা তার ভূমিকা, তার দায়িত্ব।

তোমার একটা চলচ্চিত্র ছিলনা! কি নাম যেন! … হ্যাঁ, অভ্যুত্থান। … তাই না!”

শর্মিষ্ঠা মন দিয়ে শুনছিল কথা। তাই একটু দেরি করে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, ওটা ভেবেছিলাম ভালো হিট হবে”।

দ্বিভদ্র মুচকি হেসে বলল, “দক্ষিণের আদলে করা একটা সিনেমা। ওই দক্ষিণের সিনেমাতে থাকেনা যে, দুর্নীতিগ্রস্ত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, মন্ত্রী, সেই সব দেখিয়েছিলে। … কিন্তু … বিচার করে দেখো। তুমি একজন পরিচালক, একজন শিল্পী। এই সমস্ত কিছু তো সাধারণ মানুষ যারা কলার কিচ্ছু বোঝে না, তারাও দেখতে পাচ্ছে। যদি দেখতে নাও পেত, একটা দুটো দক্ষিণের আর দুচারটে বলিউডের সিনেমা তা ধরিয়ে দিতেই সাধারণ মানুষ তা ধরে নিয়েছে। … কিন্তু যেই জায়গায় একটা সাধারণ মানুষ পৌছাতে পারছেনা, সেখানে কে পৌঁছে দেবে তাদেরকে?

আমার কথার মানে এই যে, যদি একজন পরিচালকও সামান্য মানুষের মত করে ভাবে, তাহলে সামান্য মানুষ কার থেকে ভাবতে শিখবে? … বিচার করে দেখো শর্মিষ্ঠা, তোমার চলচ্চিত্রের কাহিনীতে যদি এমন দেখানো হতো যে, একজন মানুষ ভালো কিছু হবার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার পরিবার, তার সমাজ সমানে তার কাছে টাকা টাকা করে যাচ্ছে, আর সেই টাকা টাকা শুনতে শুনতে মানুষটা একসময়ে বিরক্ত হয়ে উঠে দুর্নীতির আশ্রয় নিলো। আর একবার দুর্নীতির আশ্রয় নিতে ক্রমশ সে হয়ে উঠলো একজন আস্ত সয়তান … ভেবে দেখেছো এই দৃষ্টিকোন দিয়ে?

দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ অত্যন্ত খারাপ। কখনোই আমি তোমাকে তার পক্ষ নিতে বলবো না। কিন্তু তোমার চলচ্চিত্রের এঙ্গেলটা তো ভিন্ন হতেই পারে, তাই না! … মানে আমার কথা এই যে, সবসময়ে একজন ভিলেনকে দেখানো হয় চলচ্চিত্রে যে সে ভিলেন হয়ে বিরাজ করছে। কিন্তু কেন না তোমার সিনেমা এমন হলো যে, তুমি একজন মানুষ যে ভিলেন নয়, তাকে ভিলেন হতে দেখালে। … আর ভিলেন হবার পর, তার কীর্তি দেখালে দ্বিতীয় পর্যায়, আর তৃতীয় পর্যায় তার দুর্নীতি এমন হয়ে যায় যে, একজন হিরো এসে তার সংহার করছে।

আর সেই সাথে সাথে দেখালে যে, সেই ভিলেনের সংহার তো সম্ভব হলো, কিন্তু দুর্নীতির সংহার হলো না। একটি নয়, তিনটি সিনেমা হয়ে গেল দেখো। আর মানুষও তোমার সিনেমার মাধ্যমে ভাবতে শুরু করবে যে, দুর্নীতির উৎস দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি নয়, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি তো দুর্নীতির দ্বারা প্রভাবিত। তাহলে দুর্নীতির উৎস কি!”

অবাক ভাবে শর্মিষ্ঠা দেখছিল দ্বিভদ্রকে। কথা শুনছিল নাকি কথা দেখছিল, সে নিজেও জানেনা। দ্বিভদ্র আবারও বললেন, “আবার একটা অন্য প্লট দেখো। বিচার করে দেখো, শয়তান অন্ধ হয়, কারণ সে একবার শয়তানকে নিজের অন্তরে বাসা বাঁধতে দিলে, তারপর সেই শয়তান আর কিচ্ছু দেখবেনা। কাকে লুটছে সে, কাকে ঠকাচ্ছে সে, কিচ্ছু দেখে না, সামনে যা আসে, তার বিনাশ করা শুরু করে দেয়, তা সে দীনবন্ধু হোক, দীন হোক, আর বিত্তবান হোক।

আবার আরো একটা সিনেমাতে বা সেই সিনেমারই একটি অন্য দিকে দেখালে যে, আইনও অন্ধ। সেও কিচ্ছু দেখতে পায়না। তাই সাক্ষী মিথ্যা হোক, বা প্রমাণ বানানো হোক, প্রমাণ বা সাক্ষী এজলাসে পরলেই আইন সম্মত হয়ে যায়। আর এই দুটি সত্যকে দেখিয়ে, তারপর তোমার দর্শকদের দেখালে যে, আইনের এই স্বভাবের কারণেই শয়তান হয়ে ওঠা এক দুষ্কৃতি সকলের সর্বস্ব লুটে নিয়ে যায়, আর মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখে, কিন্তু কিচ্ছু করতে পারেনা।

অর্থাৎ আমার বক্তব্য বুঝতে পারছো শর্মিষ্ঠা! একজন পরিচালকের হাতে রয়েছে ক্যামেরা নামক এক যন্ত্র, আর সেই যন্ত্রের সাহায্যে সে যেমন বর্তমানের ক্রিয়াকলাপের ভবিষ্যতের দুস্পরিনামকে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে, তেমন বর্তমান ক্রিয়াকলাপের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত ভিলেন, যেটা মানুষ নয়, যার প্রভাবে এসে মানুষ দুষ্কৃতি হয়ে যায়, তাকেও দেখাতে পারে।

আর আমি তোমাকে সেই কথাই বলতে আজ ডেকেছি। তোমার সিনেমা যদি যা কিছু বলার তা মুখের উপরেই বলে, তাহলে একজন তোমার সিনেমা পছন্দ করলেও, একবারই দেখবে। কেন? আর যদি একাধিকবার দেখেও, তা তোমার জন্য দেখবে না, দেখবে তোমার সিনেমাতে কাজ করা তার পছন্দের অভিনেতাকে দেখার জন্য। কিন্তু যখন তোমার সিনেমার মধ্যে থাকবে একটা লুকানো কথা, একবার দেখে সেই লুকানো কথাকে মানুষ উদ্ধার করতে পারবেনা, কিন্তু বুঝতে পারবে যে একটা লুকানো কথা রয়েছে।

তাই তারা তোমার সিনেমাকে বারবার দেখবে, তোমার সিনেমায় অভিনয় করা অভিনেতাকে দেখার জন্য নয়, তোমাকে দেখার জন্য। তোমার মেধাকে দেখার জন্য। তোমার অন্তর্দৃষ্টিকে দেখার জন্য, তোমার দূরদৃষ্টিকে দেখার জন্য। যখন এমন হবে, তখনই তুমি একজন পরিচালক রূপে সফল হবে।

আসলে ব্যাপার কি বলো তো! পরিচালকরা ভাবে যে, হিট সিনেমা দিতে পারলে, তবেই তারা সফল। … না শর্মিষ্ঠা। বলিউডে দেখো, কত কত হিট সিনেমা হচ্ছে, কিন্তু একটা পরিচালকও সত্যজিৎ রায় হচ্ছেন? একজনও মৃণাল সেন হচ্ছেন? … বিশেষত্ব জানো ইনাদের? ইনাদের বিশেষত্ব এই যে, এঁদের নির্মাণ করা চলচ্চিত্রকে এঁদের জন্য স্মরণ রাখা হয়, অভিনেতার জন্য নয়।

অভিনেতার জন্য যেই সিনেমাকে স্মরণ করা হয়, তাকে তোমরা বলো হিট সিনেমা, আর পরিচালকের জন্য যেই সিনেমা স্মরণ করা হয়, তা হয়ে থেকে যায় একটি ঐতিহাসিক ফলক, ঠিক যেমন আজও আমাদের কাছে পথের পাঁচালি, হীরক রাজার দেশে, গুপী গাইন বাঘা বাইন, মৃগয়া, আগুন্তুক, শাখা প্রশাখা ঐতিহাসিক ফলক হয়ে থেকে গেছে।

শর্মিষ্ঠা, তুমি থাকতে তোমাকে কদর দেবার লোক অনেককে পাবে। একজন শিল্পী তখনই জাতের শিল্পী, যখন সে চলে যাবার পর তাকে বেশি স্মরণ করা হয়, তার জীবিত থাকার কালের থেকেও। আজ আমরা সত্যজিৎ রায়কে রন্ধে রন্ধে স্মরণ করি, কারণ আমাদের কলাশিল্প আজ সেই মানে পৌছাতেই পারছেনা, যেই মানে তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন। … তাই হিট সিনেমার চিন্তা না করে, ক্লাসিক সিনেমা দেবার চিন্তা করো।

সমাজের চিরাচরিত অন্ধবিশ্বাস, ভ্রান্ত ধারণা আর একগুঁয়েমির ভীতকে নাড়িয়ে দেবার মত সিনেমা করো। কিন্তু স্মরণ রেখো, প্রত্যক্ষ ভাবে সেই কথা বলবে না, তোমার সিনেমাকে ব্যান করে দেওয়া হবে। তোমার পুরো কাহিনীর মধ্যে এক সুপ্ত সরস্বতীর মত জ্ঞানপ্রবাহকে বৈতরণী করে রেখে দাও। এটিই হলো শিল্পকলা। … আর সেই কারণে শর্মিষ্ঠা, তোমার এবার স্ক্রিপ্ট রাইটারকে দিয়ে সস্তায় স্ক্রিপ্ট করিয়ে নেওয়ার ভাবনা থেকে সরে আসতে হবে।

আমি কি করি জানো? আমি সেই লেখকদের সন্ধান করি, যাদের লেখা পাবলিশাররা পাবলিশ করতে চায়না। হ্যাঁ, সত্যি বলছি। আমি পাবলিশার হাউজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। যারা পাবলিশার হাউজ থেকে মুখ থমথমে করে বেড়িয়ে আসতো, আমি তাদের কাছে যেতাম।… পরের দিকে বেশ কিছু লেখক পাবলিশারের দ্বারস্থ না হয়ে কেবল ইন্টারনেটেই নিজেদের লেখা গল্প ছাড়ে, তাদের লেখা পরা শুরু করি, আর আমার প্রতি সিনেমা তাদের গল্প থেকে বানানো”।

শর্মিষ্ঠা বলল, “কিন্তু এমন কেন? … যারা প্রতিষ্ঠিত রাইটার, মানে যাদের লেখা পাবলিশাররা পাবলিশ করছে, তাদের লেখা কেন নিচ্ছেন না আপনি!”

দ্বিভদ্র বললেন, “যেমন পুরো মানবজাতি ধনের কৃতদাস হয়ে গেছে, পরাধীন হয়ে গেছে সম্পূর্ণ মানব যোনি, তেমনই পাবলিশাররাও হয়েছে। … শর্মিষ্ঠা, লেখক কখনো পাবলিকের পছন্দ অনুসারে গল্প লিখবেনা। পাবলিক কি ট্রেন্ড সেট করে দিয়েছে, সেই অনুযায়ী যারা কাহিনী লেখে, তাদেরকে লেখক নয়, স্ক্রিপ্ট রাইটার বলে। লেখক পাবলিকের তৈরি করা ট্রেন্ড ফলো করবেনা, বরং তারা তো ট্রেন্ড তৈরি করে, যেটা পাবলিক ফলো করবে।

কিন্তু ধনের কৃতদাস হয়ে যাওয়া পাবলিশাররা নিজেদের হাতে সামান্য ধন পেয়ে গিয়ে, নিজেকে কেউকেটা ভাবা শুরু করে দিয়েছে। ওই ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের কথা আছে না একটা, একবার একটা ব্যাঙের কাছে একটি মুদ্রা আসে তাই সে হাতিকে আওয়াজ মারে। তেমনই এঁদের অবস্থা। তাই আমি সেই লেখকদের কাছে যাই, যাদের লেখা পাবলিশ করতে নারাজ হয় পাবলিশাররা। তাদের মধ্যে একাংশের অবশ্যই এখনো লেখক বেশে দুধের দাঁত পরে যায়নি, কিন্তু বেশ কিছু লেখক আছে যাদের চারটে আক্কেল দাঁতও গজিয়ে গেছে। … আমি তাদের লেখা নিয়ে সিনেমা করি।

আসলে কি বলো তো শর্মিষ্ঠা। মানুষ আজকে অধমতম যোনিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। এমন যোনি হয়ে গেছে মানুষ যে, প্রতিটি অন্য যোনি এই যোনিকে একপ্রকার ঘৃণা করা শুরু করে দিয়েছে। একটু প্রকৃতির মধ্যে একাকী ঘোরাঘুরি করা শুরু করো, বুঝে যাবে এই কথার সত্যতা কতখানি।

(একটু হেসে) আমার একটা গল্প আছে। প্রযোজনা করতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লাগবে, থ্রিডি এনিমেশনে করতে হবে সিনেমাটা। যদি কনোদিন পয়সা হয়, করো তাহলে সিনেমাটা”।

শর্মিষ্ঠা প্রশ্ন করলো, “কি নিয়ে সিনেমাটা? আপনি নিজে করবেন না কেন?”

দ্বিভদ্র একটু হেসে বললেন, “আমি করবো না কারণ এতো পয়সা আমার নেই। … কিছু প্রযোজক রাজি হয়েছে সিনেমাটা করতে। কিন্তু তারা সকলে মাতব্বর। আর মাতব্বরি করে এমন কিছু পরিবর্তন করতে বলছেন স্ক্রিপ্টে যার কারণে সম্পূর্ণ সিনেমার বক্তব্যই পালটে যাবে”।

শর্মিষ্ঠা আবার কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলো, “কিন্তু কি নিয়ে সিনেমাটা?”

দ্বিভদ্র একটু দাঁড়ির ফাঁক দিয়ে হেসে বলল, “গল্পটা! … অনেক সিনেমা দেখেছ না, যেখানে পৃথিবীর নাশ হতে চলেছে। তাই না? … আমার এই গল্পটা সেই সময়ের, যেই সময়ে পৃথিবী ধ্বংস হচ্ছে। আর তাতে কি দেখানো হচ্ছে জানো? দেখানো হচ্ছে যে, পৃথিবী ধ্বংস হচ্ছে, আর প্রতিটি যোনি নিজের নিজের মত করে প্রয়াস করছে বাঁচার। মানুষও প্রয়াস করছে। প্রতিটি যোনি নিজে বাঁচার কালে, কাছে এসে উপস্থিত হওয়া অন্য যোনির জীবকেও উদ্ধার করার প্রয়াস করছে। কিন্তু যখনই সেই অন্য যোনির জীবটি মানুষ, তখন সেই মানুষটি যাতে বাঁচতে না পারে, তার জন্য সকল যোনি প্রয়াস করছে। … বুঝলে কিছু? মানুষকে কতটা ঘৃণা করে সকল যোনি, সেটা দেখাতেই সিনেমাটা, পৃথিবীর ধ্বংস এখানে কেবলই একটা প্লট, একটা উপলক্ষ”।

শর্মিষ্ঠা উঠে চলে এলো। যখন বাইরে এলো। তখন বাইরে একজন অপেক্ষা করছিল। অন্য কারুর এপয়েন্টমেন্ট আছে হয়তো। কিন্তু মনে মনে শর্মিষ্ঠা অত্যন্ত বিচলিত। আজ যা শুনলো সে, সেই সমস্ত কথাকে একত্রিত করলে, সফল পরিচালক হতে তাকে আরো অনেক কাঠখড় পোয়াতে হবে। সেই নিয়ে সে একটু বিচলিত।

আর তার থেকেও বড় কথা, তার সাথে এখন কনো প্রযোজকই আর কাজ করতে চাইছেনা। এই সমস্ত কথা নিয়ে ভাবতে ভাবতে, পার্কস্ট্রিটের একটি বারে প্রবেশ করলো সে। একটা একটা করে, প্রায় ৪টে সিক্সটি এমএলের পেগ নিয়ে টেবিল ছাড়তে গেলে, একটু মাথাটা যেন ঘুরে গেল। পাশের টেবিলে একজন একটু কালো আর হোমরাচোমরা ধরনের আর এই ৪৫এর আশপাশে ব্যক্তি ছিলেন। শর্মিষ্ঠার কোমল টলমল শরীরটাকে তিনি ধরে নিলেন।

শর্মিষ্ঠার মাথায় যা চলছিল, সেটাই বলল সে, “আপনি কি কনো প্রযোজক! আমার সিনেমা প্রযোজনা করবেন?” ভদ্রলোক শর্মিষ্ঠাকে ধরে নিয়ে নিজের স্করপিওতে তুললেন, আর বার ম্যানেজারকে বলে রাখলেন, একটু পরে এসে, তিনি শর্মিষ্ঠার স্করপিওটা নিয়ে যাবেন। ভদ্রলোক মনে হয় প্রায়ই আসেন সেই বারে, তাই সকলেই প্রায় তাঁকে চেনে।

শর্মিষ্ঠাকে ভদ্রলোক নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন, আর খানিক পরে এসে শর্মিষ্ঠার গাড়িটা নিজের বাড়িতেই নিয়ে গিয়ে রাখলেন। শর্মিষ্ঠা নেশার ঘোরে ঘুমিয়ে পরেছিল, যখন ঘুম ভাঙলো, তখন বাজে প্রায় দুপুর ৩-৪টে হবে। চোখ মেলতে একটু কষ্ট হলো। হ্যাং ওভার রয়েছে। ভদ্রলোক বললেন, “এই ডিপ লাইম ওয়াটারটে খেয়ে নিন। হ্যাংওভার কেটে যাবে”।

শর্মিষ্ঠা নেশার ঘোরেই একটু জরিয়ে জরিয়ে বলল, “আপনি কে? এটা তো আমার বাড়ি নয়। আমি কোথায়?”

ভদ্রলোক বললেন, “আমার নাম আহমেদ খান্না। আপনি যেই বারে বসে মদ খাচ্ছিলেন, আমি সেখানে রোজ বেলার দিকে যাই। আপনি একটু বেশি খেয়ে ফেলাতে টলমল হয়ে গেছিলেন। তাই আপনাকে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছি”।

শর্মিষ্ঠা নিজের বারবার বুজে যাওয়া চোখকে কষ্ট করে করে খুলে খুলে বলতে থাকলো, “তুমি কি কনো পরিচালক!… এদিকে কাছে এসো। আমার হুঁশ আছে। সজ্ঞানে বলছি। মনে পরেছে সব। মদ খেলাম, … এই … এই চার পেগ হবে। … চেয়ার ছেড়ে উঠতে গেলাম, মাথাটা ঘুরে গেল”।

জরিয়ে জরিয়েই কথাগুলো বলছিল। একটু থেমে আবার বলল শর্মিষ্ঠা, “আরে, বারের বিলটা তো পেমেন্টই করা হয়নি!”

আহমেদ মানে ভদ্রলোক বললেন, “আমি করে দিয়েছি। আপনি এখন বিশ্রাম করুন নিশ্চিন্তে”।

শর্মিষ্ঠা সেই জরানো সুরেই বললাম, “হয়ে গেছে ঘুম। … আচ্ছা, তুমি আমার বিল পেমেন্ট করে দিলে কেন? বড়লোক! … অনেক বড়লোক তুমি, তাই না! … ঘরও তো বেশ বড়, … কত আসবাব!”

আহমেদ উত্তরে বলল, “আপনার নেশাটা পুরো ছাড়েনি এখনো। লেমন ওয়াটারটা খেয়ে নিন, ছেড়ে যাবে নেশা”।

শর্মিষ্ঠা উত্তরে বলল, “নেশা ছেড়ে গেছে। মাথাটা একটু ধরে আছে, আর বুঝতে পারছি, কথাটা একটু জরিয়ে যাচ্ছে। … কই লেমন ওয়াটারটা কই! … খাইয়ে দাও আমায়”।

আহমেদ লেমন ওয়াটারের গ্লাসটা হাতে নিয়ে শর্মিষ্ঠার পাশে বসে, শর্মিষ্ঠাকে খাইয়ে দিতে গেলে, বেশ কিছুটা জল শর্মিষ্ঠার গায়ে পরে। শর্মিষ্ঠা আড় চোখে আহমেদকে দেখলো, তার গলা বুকের দিকে লেবুর জল পরে চিকচিক করছে, আর আহমেদ সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। তাই শর্মিষ্ঠা একটু আদিখ্যেতা করেই বলল, “কই পুঁছিয়ে দাও, যেটা গায়ে পড়লো”।

আহমেদ একটু ইতস্তত করে, একটা তুয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিলো বুকের দিকটা। শর্মিষ্ঠা আহমেদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো, আর দেখলো, ইচ্ছা তো ছিল হাত দিয়েই মুছিয়ে দেওয়া, কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে, তুয়ালে ব্যবহার করলো।

শর্মিষ্ঠার নেশা প্রায় পুরোই ছেড়ে গেছিল। তাও একটু নেশার ভান করে বলল, “কি নাম বললে, আহমেদ খান্না! … তুমি কি অনেক গুলো আইটি কোম্পানির মালিক! বিদেশে সফটওয়্যার এক্সপোর্ট করার ব্যবসা! … তাই না!”

আহমেদ উত্তরে মাথা নাড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ, আপনি জানেন আমাকে!”

শর্মিষ্ঠা দুষ্টুমি মাখা একটু অশ্লীল হাসি হেসে বলল, “তা পরিচালকদের একটু বড়লোকদের খবর রাখতে হয় বুঝলে আহমেদ সাহাব। … নাহলে যে না খেয়ে মরতে হয়। … তো শোনো না, আমায় পছন্দ তোমার!… বিয়ে করবে!”

আকস্মিক এই কথাতে কি উত্তর দেবে আহমেদ, কিছু বুঝে পেলো না। আসলে মেকআপ টেকআপ নেওয়া একটু আধটু সুন্দরী নিশ্চয় দেখেছে, এতো বড় ব্যবসাদার, কত লোকের সাথে ওঠাবসা। কিন্তু মেকআপ ছাড়া, এতো সুন্দরী মেয়ে প্রথমবার দেখছে সে। ইতস্তত করতে থাকলো, আর এদিক দিয়ে সেদিক দিয়ে শর্মিষ্ঠার শরীর, শরীরের গঠন, মুখের আদল, গায়ের রং, চামড়ার মসৃণতা, সমস্ত কিছু মাপতে থাকলো।

যেন অন্যের দামি গাড়ি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে, এমন ভাব। শর্মিষ্ঠা কনোদিন কনো পুরুষের সাথে সম্পর্কে জরায়নি, তবে পুরুষদের আদবকায়দা বেশ ভালোই জানে, মানে অনেক পুরুষেরই তার রূপের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি পরেছে তো, তাই বেশ জানা আছে, কিসে কি হয়। তাই শর্মিষ্ঠা সরাসরি আহমেদের যৌনতার মধ্যে পরিবর্তনকে নিরীক্ষণ করে নিলো, আর যখন দেখলো যে আহমেদ যৌনভাবে কাহিল হয়ে পরছে তার প্রতি, তখন শর্মিষ্ঠা নিজেই একটু আহমেদের দিকে হেলে পড়লো।

শর্মিষ্ঠার কোমল শরীর আহমেদের বুকে আশ্রয় নিতেই, আহমেদ একটু বেশিই অস্থির হয়ে উঠলো। শর্মিষ্ঠা আহমেদের দ্রুত চলা হৃদস্পন্দন শুনতে পেয়ে মনে মনে হাসলো, আর আসতে আসতে আহমেদকে একটু একটু করে বেশি জরিয়ে ধরে, আহমেদকে একপ্রকার বশীকরণ করে নিতে শুরু করলো। যখন সম্পূর্ণ বশ হয়ে গেছে আহমেদ, নিজের স্নায়ুর উপর আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিলনা সে, তখন শর্মিষ্ঠার সাথে সঙ্গমের উদ্দেশ্যে আহমেদ এগিয়ে গেলে, শর্মিষ্ঠা নিজের শরীরটা আহমেদের থেকে সরিয়ে আনে।

আহমেদ একটু অপস্তুত হয়ে যায় এবার। যেন কনো অপরাধ করতে যাচ্ছিল, অপরাধের আগেই তাকে হবু-অপরাধী বলে চিহ্নিত করে নেওয়া হয়েছে। শর্মিষ্ঠা হেসে বলল, “যা চাইছো, তা নেবে? তাহলে বিয়ে করো!”

আহমেদ যেন সম্পূর্ণ ভাবে বশীকরণের শিকার। এবার তার স্নায়ুতে স্নায়ুতে শর্মিষ্ঠা এমন ভাবে বসে গেছে যে, আর কনো স্ত্রীর কারণে তার হৃদপিণ্ড গতিশীল হতেই পারবেনা। আহমেদ এবার বলল, “প্রযোজনা আমি কনোদিন করিনি। তবে করবো। তুমি চাইলেই করবো। বিয়ে করো আমাকে”।

শর্মিষ্ঠা যা চাইছিল, তা হাসিল করে নিয়েছে। আহমেদের সম্পত্তির অংশীদার হয়ে যেতে চেয়েছিল সে। বিয়ে করে সেই দিকে এগিয়ে চলল শর্মিষ্ঠা, আর অন্য প্রযোজকরা শর্মিষ্ঠাকে দিয়ে সিনেমা করাতে নারাজ ছিল, তাই পরিচালক শর্মিষ্ঠা নিজের প্রযোজক যোগার করে নিলো।

বিয়ে করলো শর্মিষ্ঠা আর আহমেদ খান্না, শর্মিষ্ঠা এবার বৈদ্য থেকে খান্না হয়ে গেল। আর শর্মিষ্ঠা খান্না এবার এক নতুন পরিচালক রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত। এক এক করে, তিনতিনটি সিনেমার প্রযোজনা করলেন আহমেদ খান্না। স্ত্রীকে ভালোবাসেন। শর্মিষ্ঠা শুধু যে সুন্দরী তা নয়। স্বভাব তার খারাপ নয়। শুধু প্রযোজক পাবার জন্য সামনে যেই সুযোগ এসেছিল, তাকে হাতছাড়া করতে চায়নি বলে, একটু বেহেল্লাপনাই করেছিল আহমেদকে বিয়ে করার জন্য।

তবে অকৃতজ্ঞ সে নয়। আহমেদ তাঁকে স্নেহও করে, আর সম্মানও। আহমেদও চারিত্রিক ভাবে বেশ ভালো, মানে চিরাচরিত ভাবে বড়লোকদের মত দুশ্চরিত্র সে কনো ভাবেই নয়। তাই শর্মিষ্ঠাও আহমেদের বেশ যত্ন নেয়। আহমেদ স্ত্রী বেশে শর্মিষ্ঠাকে পেয়ে বেশ খুশী। শর্মিষ্ঠা তার জীবনে আসার পর, তার শ্রীবৃদ্ধিও বিস্তর হয়েছে। বিয়ের আগে ১০টি আইটি কোম্পানির মালিক ছিল। আর বিয়ের দুই বছরের মধ্যে কলকাতার প্রায় সমস্ত আইটি কোম্পানিকেই কিনে নিয়ে, এখন সে কগ্নিজেন্ট, ইনফিনিটি এঁরা সকলে মিলে কলকাতার থেকে যত টাকার সফটওয়্যার এক্সপোর্ট করে, তাদের সকলের মিলিত পরিমাণের তিনগুণ অর্থ উপার্জন করে, আজ সে একজন বিজনেস টাইকুন হয়ে গেছে।

একটিই ব্যাপার, শর্মিষ্ঠাকে শারীরিক ভাবে তুষ্ট করতে পারেনা আহমেদ, কারণ শর্মিষ্ঠা তুষ্ট হবার অনেক আগেই সে নিজে তুষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু তাতে শর্মিষ্ঠার কনো অভিযোগ নেই। বাকি সুন্দরীদের মত শর্মিষ্ঠা কনো ভাবেই কামুকী নয়। তার ধ্যানজ্ঞান একটা ভালো চলচ্চিত্র পরিচালনা করা। কিন্তু এক এক করে তিনতিনটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করে ফেলেছে আহমেদ, কিন্তু শর্মিষ্ঠা সাফল্য পায়নি।

আহমেদ তাই একদিন বিরক্ত হয়ে গিয়ে শর্মিষ্ঠাকে বললেন, “আর কতগুলো চলচ্চিত্র করে পয়সা নষ্ট করবে শর্মিষ্ঠা!”

শর্মিষ্ঠা সেই কথাতে একটু লজ্জাই পেয়ে গেল। ঠিক লজ্জা নয়, একটু গ্লানিই হলো তার। মাথা নামিয়ে নিলে, আহমেদ তার সুন্দরী বউকে মানাতে কাছে গিয়ে বসে, নিজের হাতে করে শর্মিষ্ঠার নামিয়ে নেওয়া মাথা তুলে বলল, “আমি তোমার জন্য গর্ব করতে চাই শর্মি, আমি চাইনা যে তুমি আমার চোখে চোখ রাখতে লজ্জা পাও। সত্যি বলছি, আমি চাই তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে দাপটের সাথে আমার চোখে চোখ রাখো”।

শর্মিষ্ঠা আবারও মাথা নামিয়ে নিলে, আহমেদ বলল, “বেশ, যখন তুমি নিজের মধ্যেই দ্বন্ধে রয়েছ, তাহলে আমি তোমাকে বলছি, আমি তোমার আরো তিনটে চলচ্চিত্র প্রযোজনা করবো। যদি সাফল্য পেতে পারো এই তিনটের মধ্যে, তাহলে আবার করবো। আর যদি এই তিনটের মধ্যেও সাফল্য না আনতে পারো, তাহলে আর চতুর্থ চলচ্চিত্রের জন্য টাকা চাইবেনা, এই কথা তো দিতে পারো তুমি, তাই না! … আমি কি কিছু অতিরিক্ত দাবি করে ফেললাম। তুমি বলো আমাকে”।

শর্মিষ্ঠা মাথা তুলে এবার বলল, “না আহমেদ, তুমি ভালো মানুষ। তুমি একজন দায়িত্ববান এবং সুচরিত্রের পুরুষ। … তোমার স্ত্রী হবার জন্য আমি সত্যই ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই। এতো সাপোর্ট কজন স্বামী করে তার স্ত্রীকে। আমারও খারাপ লাগছে আসলে, বারবার ব্যর্থ হয়ে পয়সার শ্রাদ্ধ করার জন্য। … ঠিক বলেছ তুমি, এই তিনটি ছবির মধ্যে হয় আমি সফল হবো, আর তা না হলে, পরিচালক রূপে সাফল্য আমার জন্য নয়, এমনটাই মেনে নেব। কথা দিলাম তোমার আহমেদ”।

আহমেদ একটু নরম হয়ে বলল, “মন থেকে বলছো তো! আমার কথাতে খারাপ লাগার জন্য বাধ্য হয়ে বলছো না তো!”

শর্মিষ্ঠা একটা জোরে শ্বাস নিয়ে বলল, “না, একদম যে মন থেকে বলছি, তেমনটা নয়। এটা বলতে একটু খারাপই লাগলো আমার। কিন্তু তোমার কথাটা যুক্তিযুক্ত। পরস্পর ব্যর্থ সিনেমা করে যাবো, আর তুমি দু-হাতে পয়সা লুটিয়ে যাবে। … না না, এটা তো অন্যায়। … সমস্ত কিছুর একটা সীমা থাকা উচিত। … তাই খারাপ লাগলেও, মন থেকে বলছি আমি কথাটা। তুমি খারাপ ভেবো না। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি আহমেদ। জানি আমি, আমি সফল হলে, সব থেকে বেশি খুশী তুমি হবে। আর এও জানি আমি যে, আমি সফল হচ্ছিনা বলে তুমিও হতাশ। … পয়সা নষ্ট হচ্ছে বলে নয়, আমার মন ভেঙে যাচ্ছে বলে তুমি চিন্তিত। … আই ট্রাস্ট ইউ, আহমেদ”।

আহমেদ নিজের সুন্দরী স্ত্রীকে জরিয়ে ধরলেন। শর্মিষ্ঠাও স্বামীকে গর্বের সাথে জরিয়ে ধরলেন। সাফল্যের প্রয়াস, আর অসফলতা লাভের কারণে, স্বামীস্ত্রী অনেকদিন ঘনিষ্ঠ হতে পারেনি। তাই দুজনেই আরো ঘনিষ্ঠ হবার জন্য প্রয়াসশীল হলে, সঙ্গমসুখের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন দুজনে। আর সমস্ত কিছুর পরে, শর্মিষ্ঠা নিজের অন্তরে অন্তরে সংকল্প নিয়ে বলে, “আহমেদ যথেষ্ট করেছে। এবার তাকে প্রতিদান দেবার সময় হয়েছে। যে করেই হোক, সাফল্য এবার আমার লাগবেই”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5