মহসিন হত্যা রহস্য | রহস্য উপন্যাস

আজ দিদির এক অন্যরূপ দেখলাম। অর্ণব প্রথম কথাই বলল, “আমি উকিল ছাড়া কথা বলবো না”।

দিদি কনো কথা না বলে, ঠাটিয়ে এক থাপ্পড় মারলেন অর্ণবের গালে। ঠোঁটের কষ দিয়ে সামান্য রক্তের ছেটা দেখা গেল, আর অর্ণব রীতিমত ভয় পেয়ে গেল। বুঝলাম দিদি সম্পূর্ণ ভাবে কনফিডেন্ট। আর আসামীর সাথে উনার ব্যবহারটা সম্পূর্ণই আলাদা।

দিদি বললেন, “নিজে বলবি না আমি বলবো! … নিজে বললে, স্বীকারোক্তি করার জন্য সাজা কম হবে। আমি বললে, স্বীকার না করার জন্য সাজা বেশি হবে। কোনটা চাই তোর!”

অর্ণব চেঁচিয়ে উঠলো, “আমি কিচ্ছু করিনি। মিথ্যা আরোপ দেওয়া হচ্ছে আমার উপর”।

দিদির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। বোধহয় আরো একটা চর বসিয়েই দিতেন, কিন্তু ফোন বেজে উঠলো দিদির। হামিদের ফোন। হামিদ আমাদের ক্রাইম ব্রাঞ্চ টাস্কফোর্সের একজন অফিসার। দিদি ফোন ধরে বললেন, “কিছু পাওয়া গেছে!”

ওদিক থেকে কিছু কথা আসার পর, দিদি বললেন, “সুইয়েজ চেক করো। … কিছু না কিছু ট্রেস পেয়েই যাবে। … ফাস্ট”।

ফোন রেখে দিলেন। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না। দিদি এবার অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিচ্ছু করিস নি, তাই তো তুই? … হুম প্রমাণ পেলাম বলে। … তবে তার আগে স্বীকার করে নে”।

অর্ণব আমার গলা চিড়ে বলল, “আমি কিচ্ছু করিনি। কেন ফ্রেম করছেন আমাকে!”

দিদি কটকট করে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে বললেন, “সুদিপ্তা ঠিক বলেছিল। তোর বুদ্ধি প্রচণ্ড তীক্ষ্ণ। … তুই খুব ভালো করে জানিস যে আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে নিয়েছি আর তাতে দেখে নিয়েছি যে সুদিপ্তার ছবি পেয়েছি। তাই সুদিপ্তার নিন্দা করলে, তোর উপর আমাদের সন্দেহ যাবে বলে, সরাসরি বলে দিলি, সুদিপ্তা খুন করতেই পারেনা, করলে ওর লস। … এক্সট্রিম লেভেলের খুরধর বুদ্ধি তোর। … যাই হোক, আমি চা খেয়ে আসছি ঠিক পাঁচ মিনিটে। তার মধ্যে ডিসাইড কর, তুই স্বীকার করবি নাকি, আমি সমস্তটা বলবো!… মনে রাখ, আমার কাছে সমস্ত প্রমাণ আছে। একটাই নেই। সেটাও হামিদ কিছুক্ষণের মধ্যেই পেয়ে যাবে। তাই ডিসাইড করে নে”।

এই বলে দিদি আমাকে নিয়ে ইন্টারোগেশন রুম থেকে বেড়িয়ে এলেন। আর বাইরে থেকে লক করে দিলেন।… বাইরে গিয়ে একটা সিগারেট খেলেন আর চাটা হাতে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কি হলো, কিচ্ছু বুঝতে পারছিস না তো! … না পারারই কথা। অর্ণব প্রচণ্ড ধূর্ত, আমাদের সকলকে এই বাচ্চা ছেলেটা নাকে দড়ি দিয়ে ছোটাল। … ভিতরে চল, ও তো শিকার করবেনা। আমিই সমস্ততা বলবো। তখন সব জেনে যাবি”।

দিদির ফোন বাজলো, হামিদের ফোন। ভিডিও কল। দিদি রিসিভ করলেন। হামিদ মাস্ক পরে হাতে কিছু নিয়ে দেখালো। আমিও দেখলাম, একটা আধপোরা দেহ যেন। বেশ কিছুটা পোরেনি। সুয়ারেজ থেকে পাওয়া গেছে। দিদি একটা মুচকি হাসি হেসে বললেন, “ধুয়ে, প্যাক করে নিয়ে চলে আয় হামিদ। ওটা একটা এভিডেন্স। তাই যত্ন করে, এভিডেন্স প্যাকে প্যাক করে নিয়ে আসবি”।

আমি দিদির মুখের দিকে তাকাতে, দিদি হেসে বললেন, “সুদিপ্তার চেহারা। প্রস্থেটিক মেকআপ। এটা পরে খুন করেছিল বলেই, সিসিটিভিতে সুদিপ্তার চেহারা দেখা গেছে”।

ডিআইজি স্যার, ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট স্যারকে নিয়ে এলেন। গাড়ি থেকে নেমেই দিদির দিকে তাকিয়ে বললেন, “কাস্টডিতে নেওয়া হয়ে গেছে!”

দিদি বললেন, “হ্যাঁ স্যার। আপনার জন্যই ওয়েট করছিলাম। … আরো একজনকে ওসি, ব্রজ স্যান্যাল নিয়ে আসছে। … একজন সাক্ষী”।

আমরা সকলে এবার ইন্টারোগেশন রুমে ঢুকলাম। ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তি করলে, তবেই সেটা কোর্টে একসেপ্ট করা হয়। তাই ডিয়াইজি স্যার উনাকে নিয়ে এসেছেন।

ইন্টারোগেশন রুমে আমরা সকলে ঢুকতে, অর্ণব নাকে কান্না কাঁদার মত করে বলল, “আমি কিছু করিনি। আমাকে ছেড়ে দিন!”

দিদি কিছু বলতে যাবেন, অমনি উনার ফোন বেজে উঠলো। ব্রজ স্যান্যাল। দিদি ফোন ধরলেন, “এনেছেন!”… “ওকে, ইন্টারোগেশন রুমের বাইরে অপেক্ষা করুন, একটু পরে সাক্ষীকে নিয়ে হাজির হতে বললে, ঘরে ঢুকবেন”।

দিদি ফোন রেখে, অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ছেড়ে দেব। আগে বল, খুনের দিন খুনের সময়ে তুই কোথায় ছিলিস!”

অর্ণব বলল, “বাড়িতেই ছিলাম, কোথাও যায়নি। বাড়ি গোছাচ্ছিলাম। বাবামা সেদিন ফিরতো তাই”।

দিদি মুচকি হেসে বললেন, “ছাড়ার খুব ইচ্ছা ছিল, কিন্তু পারলাম না। … অনিল, ব্রজবাবুকে সাক্ষী নিয়ে আসতে বল”।

আমি দরজা খুলতে, ব্রজবাবু দুজনকে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঘরে ঢুকে আসতে, দিদি ব্রজবাবুর কাছে গিয়ে, ব্রজবাবুকে বললেন, “কই ফুটেজটা দিন”।

ব্রজবাবু একটা সিডি দিতে, সিডিটা দিদি নিজের ল্যাপটপে লাগিয়ে চালালে, সকলে দেখলাম সুদিপ্তার আকারের কেউ একটা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে, একটুখানি হেটে গিয়ে একটা গাড়িতে উঠলো”।

দিদি ভিডিওটা পজ করে ডিয়াইজি স্যার আর ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট স্যারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “স্যার, এটি সুদিপ্তা নয়। সুদিপ্তার উচ্চতা ৫ ফুট ২ ইঞ্চি, আর গায়ের মাপ ৩৪। আর একে দেখুন। গায়ের মাপ প্রায় ৪০ থেকে ৪২ আর উচ্চতা ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। … খুনের দিন, এই যে বাড়ি দেখছেন, এটি হলো অর্ণবের বাড়ি। সেখান থেকে এই চরিত্রটি বেড়িয়ে একটা উবের ইন্টারসিটি ক্যাবে ওঠে। স্যার। এই চেহারার পিছনে যে মানুষটা রয়েছে, সে অন্য কেউ নয়, এই অর্ণব”।

অর্ণব চিৎকার করে উঠলো, “মিথ্যা কথা”।

দিদিও ধমক দিয়ে উঠলেন, “চুপ!”

আবার বললেন দিদি, “স্যার, স্যাম্পেল নিয়ে আসছে হামিদ। অর্ণবের বাড়ির সুয়ারেজ থেকে আধপোরা সুদিপ্তার চেহারার আকারে তৈরি করা প্রস্থেটিক পোশাক নিয়ে। আমার কাছে সেই স্যাম্পেল কালেকশানের ভিডিওটা আছে এখনই”।

এই বলে দিদি সেই ভিডিওটা ফোন থেকে ল্যাপটপে নিয়ে চালালে সকলে দেখলেন। বেশ ভালো বোঝা যাচ্ছে যে সেটি সুদিপ্তার চেহারার প্রস্থেটিক, কারণ পোশাকটার মুখের দিকের বেশ খানিকটা অংশ পুড়ে যায়নি।

দিদি সেই ভিডিওটা পজ করে বললেন, “এছাড়াও প্রমাণ আছে স্যার যে, এই চরিত্রটি অর্ণবই। … আসলে একটা ভুল করে ফেলেছিল। পরিচিত গাড়ির মালিক যদি ফাঁস করে দেয়, সেই জন্য অপরিচিত ড্রাইভার নেবার জন্য, ও উবার ইন্টারসিটি বুক করে। কিন্তু ও ভুলে যায় যে, সেখানে বুকিংটা ওর নম্বর থেকেই হবে, আর তাই যাত্রীটি যে সে’ই, তা ধরা পরে যাবে”।

ব্রজবাবুর নিয়ে আসা সাক্ষী, এই ড্রাইভারটিই সেদিন সেই গারিটির ড্রাইভার ছিলেন। ড্রাইভারের কাছে গিয়ে দিদি বললেন, “বলুন, সেদিন কি হয়েছিল!”

ড্রাইভারটির নাম মুরশিদ আলি। উনি বললেন, “স্যার, সেদিন আমি যখন গাড়ি নিয়ে দাড়াই, তখন বুকিং দেখাচ্ছিল অর্ণব, মানে নাম ঠিক মনে নেই একজন ছেলের ফোন থেকে। আর গাড়িতে ওঠে একজন বেশ বড়সড় চেহারার মেয়ে। পোশাকআশাক ভালো ছিলনা মেয়েটির, তাই বারবার লুকিংগ্লাস দিয়ে চোখ চলে যেতে, মহিলাটি আমাকে যখন ধমক দেয়, তখন একটা পুরুষের কণ্ঠস্বর পাই। … খুন হবে, সেসব তো জানতাম না। তাই কিছু একটা গরবর আছে জেনেও চুপ করে যাই”।

দিদি আবার বললেন, “সুদিপ্তা, বিদিপ্তা অর্ণবের ছোটোবেলার বন্ধু। তাই তাদেরকে সকলে চেনে, আশেপাশের লোকেরা। তাই সুদিপ্তাকে এমন হৃষ্টপুষ্ট আর লম্বা দেখে অনেক প্রত্যক্ষদর্শীরই সন্দেহ হয়। আমি কাল সন্ধ্যায় ওদের পাড়াতে গিয়ে সেটা জেনে এসেছি। এঁদেরই মধ্যে, এই মধুবাবুর (ব্রজবাবুর সাথে আসা আরেক ব্যক্তির কাছে গিয়ে, তাঁর কাঁধে হাত রেখে) বাড়িতে সিসিটিভি থাকার কারণে, উনার কাছ থেকে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করি আমি। … আর সেটাই আজ ব্রজবাবু এনেছেন, আর আপনাদের একটু আগে চালিয়ে দেখালাম।

আর এই দেখুন স্যার, অর্ণবের ফোন থেকে বুকিং হওয়া সেদিন ওলা ইন্টারসিটি, যা মহসিন কলেজে বিকেল ৩টে ৪৫ মিনিটে পৌছায়। … এরপরটাও সমস্ত পূর্বপরিকল্পিত। অর্ণব জানে, ক্লাস কখন শেষ। অর্ণব এটাও জানে যে প্রান্তিক আর বিদিপ্তা সবাই চলে যাবার পরেও কলেজের মধ্যে খানিকক্ষণ থেকে আড্ডা মারে, তারপর যায়।… বাঁধা ছিল শুধু প্রান্তিককে স্পট থেকে সরিয়ে দেওয়া।

আর সেই কাজটাও ক্ষুরধর বুদ্ধিসম্পন্ন অর্ণব করে ফেলে। … আসলে সমস্তটাই আগে থেকে প্ল্যানড ছিল। … তাই ক্যাসকেড কোম্পানির ছেলে, নাম আলবার্ট ভন, যে ওর বাবার সুত্র ধরে পরিচিত আর অর্ণবের বন্ধু, তাকে দিয়ে অর্ণব প্রান্তিকের দাদা, সাগ্নিককে কল করায়, আর সাগ্নিককে ঠিক সেই সময়টাই দেয় সফটওয়্যার বুক করার জন্য, যেই সময়ে অর্ণব পৌঁছাবে কলেজে।

অর্ণব জানে ভালো করে যে, সাগ্নিকের ক্রেডিট কার্ড প্রান্তিকের কাছে থাকে, আর প্রান্তিক সেই ক্রেডিট কার্ড নিয়ে ঘোরে না। অর্থাৎ প্রান্তিককে তৎপর ভাবে ফিরে যেতে হবে বাড়িতে ক্রেডিট কার্ড ডিটেলস্‌ দেবার জন্য। আর ঠিক সেই ছকটাই কষে সে। এই দেখুন স্যার, আমাদের ডিপার্টমেন্টের এথিকাল হ্যাকারের সাহায্যে পাওয়া অর্ণব আর আলবার্টের মেলে কনভারসেসান”।

এই বলে দিদি সমস্ত কিছু যা বললেন, তার প্রমাণ দেখিয়ে দিলেন। … এরপর দিদি বললেন, “আর অর্ণব বিদিপ্তার বেস্ট ফ্রেন্ড হবার কারণে এটাও জানে যে, বিদিপ্তার পিরিয়ডস্‌ হয়েছে, আর ওর স্বভাব হলো কলেজ ছাড়ার আগে, প্যাড চেঞ্জ করা কারণ ওর পিরিয়ডসের সময় ব্লিডিং বেশি হয়। তাই বিদিপ্তাকে যে বাথরুমে একাকী পাওয়া যাবে, সেটা সম্বন্ধে অর্ণব নিশ্চিত ছিল, কারণ সেইদিন সুদিপ্তা যে কলেজ যাবেনা, সেটা অনেকদিন আগে থেকেই জানা ছিল ওদের পুরো বন্ধু মহলেরই, আর তাই খুনটা সেখানেই করে।  

পরে রইল মার্ডার অয়েপনের কথা। (মুচকি হেসে) চন্দননগর লিসিয়াস স্টোরে ও নিজেই বুচারের কাজ করে। এই তার পরিচয় (একটি লিসিয়াসের এমপ্লয়ি আর ডেসিগনেশনের তালিকা ধরিয়ে দিলেন যাতে লাল দাগ দিয়ে অর্ণবের নাম আর পাশে লেখা বুচার)। (আবার মুচকি হেসে বললেন) মার্ডার অয়েপন ফেলে আসার প্রয়োজনই রইল না। সরাসরি তাকে নিয়ে নিজের কাজে লাগিয়ে দিলো”।

এবার অর্ণবের দিকে কটমট করে তাকিয়ে দিদি বললেন, “আর কনো ভাবে কি তুমি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারো অর্ণব!”

অর্ণব মাথা নামিয়ে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠলো, “হ্যাঁ আমিই খুনটা করেছি। সুদিপ্তার কভারেজ আমিই তৈরি করেছিলাম। বাবা মা প্রস্থেটিক্সের কাজ করেন, হলিউডের মেকআপ আর্টিস্ট উনারা। ওদের সাথে হাতে হাতে করে, আমি নিজেও প্রস্থেটিক্সের কাজ জানি। তাই আমি নিজেই সুদিপ্তার মেকআপ দেভালপ করি। আর হ্যাঁ, আমি ওই ড্রেস পরে, সিসিটিভি ক্যামেরাকে ধোঁকা দিই, পায়ে ডাসটার লাগাই, তাই কনো ভাবেই আমার ট্রেস পাওয়া যায়নি। … আর হ্যাঁ, সাগ্নিককে আমি আলবার্টকে দিয়েই অন্যদিকে ঘুরিয়ে প্রান্তিককে ডেকে পাঠিয়ে আমার নিজের কাজ করার রাস্তা সাফ করি”।

ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট স্যার বললেন, “ক্যামেরাতে আমার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে তো ব্রজ!”

ব্রজবাবু বললেন, “হ্যাঁ স্যার”।

দিদির ফোন বাজলো। হামিদের ফোন। ফোন ধরলেন দিদি, আমাকে দরজা খুলে দিতে বললেন, হামিদ আধপোরা প্রস্থেটিক্সের স্যাম্পেল নিয়ে ঘরে ঢুকতে, দিদি অর্ণবকে প্রশ্ন করলেন, “এটা আধপোরা কেন? এটাকে পুরো ড্যামেজ করলেনা কেন!”

অর্ণব মাথা নামিয়ে তখনও থরথর করে কাঁপছিল। দিদির থেকে পরে প্রশ্ন করেছিলাম, এমন কাঁপার কারণ কি। দিদি বলেছিলেন, “ভয় পেয়ে থাকে আসামি। বাড়ির লোকের সম্মান যাবে, নিজের জীবন শেষ হয়ে যাবে। সেই সমস্ত কিছু অন্তরে খিচুরি পাকিয়ে গিয়ে, আততায়ী প্রথমবার ভয় পায়। এতক্ষণ তো নিজেকে বাঁচানোর প্রচেষ্টাতে ভয়কে জয় করে বসে থাকে সে। কিন্তু যখন ধরা পরে যায়, নিজের করা খুনকে সে নিজে প্রত্যক্ষ করে, আর তাই সেই খুনের দৃশ্যকে নিজের চেতনার দৃষ্টিতে দেখে ভয়ে আঁতকে ওঠার কারণেই এই কম্পন”।

অর্ণব দিদিকে কাঁপতেই কাঁপতেই বলল, “বিদিপ্তা আমার খুব কাছের জন ছিল। খুন তো করে দিই, ওর খুনের চিত্রটা আমার চোখে সমানে ভাসছিল, আর তাই কান্না পাচ্ছিল। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে, মা বাবার প্লেন ল্যান্ডের সময় চলে আসে, আমি খেয়াল করিনি। তাই তাড়াতাড়ি করে প্রস্থেটিক্সটা পুরিয়ে দিয়ে, আধপোরা অবস্থাতেই প্যানে ফেলে, দুবার তিনবার করে ফ্ল্যাশ করে, সুয়ারেজে পাঠিয়ে দিই। আমার পালা যে আপনার মত মাস্টারমাইন্ডের সাথে পড়বে তখন তো জানতাম না। জানলে হয়তো আরো একটু সতর্ক হতাম”।

সত্যিই দিদি মাস্টারমাইন্ড। সত্যি বলতে আমি তো তখনও জানিনা, কি ভাবে দিদি সমস্ত কিছুর জট খুললেন। অর্ণবকে এরেস্ট করার পর, একটু তৎপরতার সাথেই চার্জসিট তৈরি করে দিতে হয়। বিকালের মধ্যে সেই সমস্ত কিছু করার পর, যখন আমাকে আর হামিদকে দিদি ভালো কাজ করার জন্য ট্রিট দিলেন, তখন প্রশ্ন করেছিলাম, আর তখনই বুঝলাম, সত্যই দিদিকে কেন লেডি ব্যোমকেশ বলা হয় ডিপার্টমেন্টে।

তবে তার আগে, ডিয়াইজি স্যার ঘরের মধ্যেই দিদিকে প্রশ্ন করলেন, “সব কিছু বুঝলাম, কিন্তু সীতা, অর্ণবের মটিভটা কি?”

দিদিকে ইপ্সিতা না বলে অনেকেই সীতা বিলে ডাকেন ডিপার্টমেন্টে। মন্দ বলেনা। চারিত্রিক দিক দিয়ে সত্যই তিনি পবিত্রা। তখন অতটা জানতাম না, তখন কেবল দিদি পেয়েছি, এটা ভেবেই খুশী হয়েছিলাম। পরে পরে উনার চরিত্রকে যখন চাক্ষুষ করি, তখন বুঝি, উনাকে সীতা নাম দেওয়াতে, মাতা সীতাকে বিন্দুমাত্রও অপমান করা হয়নি।

দিদি উত্তর ডিয়াইজি স্যারকে বললেন, “অর্ণব বিদিপ্তাকে ভালোবাসতো। বিদিপ্তা প্রান্তিকের সাথে গাঁটছড়া বাঁধছিল। কিন্তু অর্ণবের স্থির বিশ্বাস ছিল যে প্রান্তিক কেন, অন্য কারুর সাথেই বিদিপ্তার সম্পর্ক হবেনা। কলেজ শেষ হলেই, এই সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে। … কিন্তু সমস্ত ভাবনা এদিকসেদিক হয়ে যায়, যখন তিনমাস আগে প্রান্তিক আর বিদিপ্তা ফিসিকালি ইন্টিমেট হয়ে যায়।

অর্ণব আর নিজের স্নায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনা। সে বিদিপ্তাকে খুন করবে সেদিনকেই স্থির করে ফেলে। লিসিয়াসে জয়েন করে বুচার হয়ে, নিজের মার্ডার অয়েপন নির্ধারণ করে নেয়। আর আমার বিশ্বাস তখন থেকেই ও সুদিপ্তার প্রস্থেটিক্স তৈরি করা শুরু করে দেয়। সমস্ত কিছু যখন রেডি, যখন বুচার হিসাবেও হাত পাকা হয়ে গেছে, এক কোপে গলার নলি কেটে দিতে পারবে, তখন সঠিক সময়ের অপেক্ষা করে ও।

সুদিপ্তা আর রঞ্জকের এনিভারসারিতে ওরা দুজন ময়দানে থাকবেনা দেখে, আর বিদিপ্তার সেই সময়তেই পিরিয়ডস্‌ হয়েছে দেখে, আলবার্টের সাথে কথা বলে, সমস্ত কিছু তাড়াতাড়ি সেট করে নিয়ে, বিদিপ্তাকে চোখের সামনে থেকে চিরকালের জন্য সরিয়ে দেয়”।

অর্ণব দিদির এই কথা শেষ হবার পর, নিজের চোখটা ঝপ করে বন্ধ করে নেয়। আমার মনে হলো অসুস্থতার ভান করছে অর্ণব। তাই ওর কাঁধে হাত দিতে, ও চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “উনি কি অন্তর্যামী! আমার সমস্ত মানসিকতাকে উনি নিখুঁত ভাবে কি করে ধরে ফেললেন!”

দিদি এই কথাতে বিরক্ত হয়ে উঠে অর্ণবের সামনে ঝুঁকে পরে বললেন, “তোমার এখনও গিলটি ফিলিং আসছে না! … এখনও কে তোমাকে ধরে ফেলেছে, সেই নিয়ে চিন্তা হচ্ছে তোমার!”

অর্ণব একটা বিদ্রূপের নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “দিদি বলেন আপনাকে অনিল আর হামিদ। তাই আমিও দিদিই বলছি। সত্যই আপনি ব্রিলিয়ান্ট। আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলে, আমি আরামসে বেড়িয়ে যেতাম কেস থেকে। … আর কি বললেন, গিলটি ফিলিং। ম্যাডাম, বিদিপ্তা যেদিন প্রান্তিকের সাথে শুয়েছিল, আমি তো সেদিনই মরে গেছিলাম। … তাই গিলটি ফিলিং আমার নেই। বিদিপ্তাকে আমি না পেলে, আর কেউ পাবেনা। এটাই ছিল আমার সংকল্প। আর আমি তাই করেছি”।

খানিক থেমে, উত্তেজিত হয়ে উঠে বলল অর্ণব, “আপনি জানেন আমি কি কি করেছি বিদিপ্তাকে পাবার জন্য!”

দিদিও একটা বড় নিশ্বাস নিয়ে বললেন, “জানি। রঞ্জার প্রতি তোমার প্রেম জেগেছে, এই নাটক করা শুরু করেছিলে। তখনও বিদিপ্তা আর প্রান্তিকের সম্পর্ক হয়নি। ওদের সম্পর্ক হয়েছে ৩ বছর ধরে। আর তুমি রঞ্জার প্রতি ইন্টারেস্ট দেখিয়েছিলে ৫ বছর আগে থেকে। … যাতে করে বিদিপ্তা রঞ্জার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে, জেলাস হয়ে উঠে তোমার সাথে সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেয়। এই তো বলতে চাও তুমি!”

অর্ণব ভ্রুকুঁচকে বলে উঠলো, “এটা আপনি কি করে জানলেন! এটা কেউ জানে না!”

দিদি বললেন, “জানে। তুমি ছাড়াও একজন জানে। রঞ্জক। কি জানে তো!”

অর্ণব চোখ বন্ধ করে নিয়ে দাঁত কিরমিরিয়া বলে উঠলো, “বাস্টার্ড …”

দিদি মুচকি হেসে বললেন, “ওকে গালাগাল দিয়ে লাভ নেই। আমার ওর সামনে কথাই এমন ছিল যে, ও এই কথা বলে দিতে বাধ্য হয়ে যায়। … তবে এবার তোমাকে একটা কথা বলবো, যা শুনে তুমি নিশ্চিত ভাবে গিলটি ফিল করবে”।

অর্ণব বিদ্রূপের হাসি হাসলে, দিদি অর্ণবের কাছে ঝুঁকে পরে বললেন, “তুমি একটা জিনিস জানো না। কেউ জানেনা। একমাত্র সুদিপ্তা ছাড়া। … বিদিপ্তা তোমাকে ভীষণ ভালো বাসতো। … তুমি একবার প্রপোজ করলেই, সে প্রান্তিককে ছেড়ে তোমার কাছে চলে আসতো। … কিন্তু তুমি রঞ্জাকে নিয়ে এতটাই ক্রেজি হয়ে গেছিলে, মানে ওদেরকে স্পেশালি বিদিপ্তাকে দেখিয়েছিলে যে, তোমার আশা ছেড়ে ও প্রান্তিকের সাথে সম্পর্ক করে”।

অর্ণব দিদির এই কথা শুনে একটু থমকে গেল। তারপর চেঁচিয়ে উঠে বলল, “নো ওয়ে। … আপনি আমাকে গিলটি ফিল করানোর জন্য মিথ্যা বলছেন। তাই না!”

দিদি কথার উত্তর না দিয়ে, সরাসরি সুদিপ্তাকে ফোন করলেন। ফোন লাউডস্পিকারে দিলেন। তারপর প্রশ্ন করলেন, “সুদিপ্তা, আমি ইপ্সিতা ম্যাম”।

সুদিপ্তা উত্তরে বলল, “হ্যাঁ ম্যাম, বলুন। নাম্বার শেভ করা আছে আপনার”।

দিদি বললেন, “তুমি সেদিনকে আমায় বলছিলে না, বিদিপ্তা অর্ণবকে ভালোবাসতো!”

সুদিপ্তা উত্তর বলল, “শেষ দিন পর্যন্ত অর্ণবকেই ও ভালোবাসতো। … একবার যদি অর্ণব রঞ্জার থেকে সরে আসতো। বিদিপ্তা ওয়াজ রেডি টু প্রপোজ হিম। প্রান্তিক ওয়াজ নো ইস্যু, এট অল”।

দিদি মুচকি হেসে বললেন, “ওকে থ্যাঙ্ক ইউ। পরে যোগাযোগ করছি। এখন একটু কাজে আছি। রাখছি”। … “ওকে, বাই”।

দিদি ফোন রেখে দিলেন। অর্ণব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। খানিকক্ষণ পর থেকে, থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে কাঁদা শুরু হলো তার। দিদি কাছে গিয়ে বললেন, “গিলটি ফিল হচ্ছে এবার!”

অর্ণব এবার কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো, “আমার জীবনে তুমি আগে এলে না কেন দিদি! … বিদিপ্তা … (কথা খুঁজে পেলো না বেশ কিছুক্ষণ)। … ম্যাডাম, আমি তো জুভেনাইল নই। সজ্ঞানে, ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছি। আমার ফাঁসি হবে না!”

দিদি মুচকি হেসে বললেন, “না মনে হয়। যাবজ্জীবন হতে পারে”। … ম্যাজিস্ট্রেট স্যার আর ডিয়াইজি স্যার চলে গেলেন। ম্যাজিস্ট্রেট স্যার যাবার সময়ে বললেন, “ইপ্সিতা, মাস্ট সে, ইউ আর রিয়েলী স্পেশাল। … ওয়েব সিরিজ দেখেছি, ফেলুদা পরেছি, দেখেছি। চাক্ষুষ করলাম আজ একজন রিয়েল টাইম জিনিয়াসকে। … গ্রেট এচিভমেন্ট। পুলিস ডিপার্টমেন্ট মাস্ট বি ভেরিমাচ প্রাউড টু হ্যাভ ইউ ইন ডি স্কোয়াড। আমি নিশ্চিত ভাবে রেকমেন্ড করবো, যাতে তোমাকে এই অসামান্য তদন্তের জন্য পুরস্কৃত করা হয়”।

দিদি বললেন, “ধন্যবাদ স্যার। জয়হিন্দ”।

ডিয়াইজি স্যার বললেন, “স্যার, ডিপার্টমেন্ট ওকে লেডি ব্যোমকেশ বলে ডাকে”। …

ম্যাজিস্ট্রেট স্যার বলতে বলতে বেড়িয়ে গেলেন ঘর থেকে, “সি রিয়েলী ঈশ সো”।

ঘর থেকে সকলে চলে গেলে, আমি, হামিদ আর দিদি ছিলাম অর্ণবের সাথে। দিদি অর্ণবের দিকে ঝুঁকে গিয়ে বললেন, “হয়তো তুমি যখন জেল থেকে ছাড়া পাবে, তখন আমি রিটায়ার করে যাবো। … আমাকে ময়নাগুরি গিয়ে, ‘শেষ আশা’ নামুক একটা অনাথ আশ্রমে পাবে। … তোমার জীবন শেষ করার নায়িকা হয়ে রইলাম আমি। যদি বদলা নিতে ইচ্ছা হয়, চলে যেতে পারো। আর যদি একটা সুস্থ জীবন পেতে ইচ্ছা হয়। তাহলেও চলে যেতে পারো। ছোটো ভাই করেই কাছে টেনে নেব। অনাথ আশ্রমে, অনাথ বাচ্চাদের সাথে থেকে মনটা হাল্কা হবে”।

অর্ণব একটা সম্মানের হাসি দিয়ে বলল, “আপনার নিচে যারা কাজ করে, তারা আপনাকে এমনি এমনি ম্যাডাম না বলে দিদি বলেন না। … ডিউটিতে নিষ্ঠা, প্রচণ্ড মেধার সাথে সাথে, আপনি একজন অত্যন্ত যত্নশীল দিদি। … হ্যাঁ দিদি, যাবো নিশ্চিত। ‘শেষ আশা’ই আমার শেষ আশা হবে। … বিদিপ্তার প্রতি বেদনা কমবে। বাচ্চাদের সাথে থাকবো বলে কতটা জানিনা। আপনার কাছে থাকবো বলে নিশ্চিত ভাবে তা কমবে। … খুব ভালো লাগলো ম্যাডাম, আপনার সান্নিধ্য পেয়ে। …

আপনার কাছে এমন ধরা পরে গিয়েও আমার কনো লজ্জা নেই। আপনার মেধা আমার থেকে অনেক অনেক সূক্ষ্ম আর তীক্ষ্ণ। … তবে আপনার মেধার থেকেও ভালো কি জানেন! … ইউওর পিওর হার্ট। … বিদিপ্তারও এমন পিওর হার্ট ছিল। … পারলাম না তার কদর করতে। … ‘শেষ আশা’তে নিশ্চিত ভাবে যাবো আমি। … পিওর হার্ট এট্রাক্টস মি আ লট। … দেখে নেবেন, আপনার শেষ বয়সে আমি আপনার সেবা করে, বিদিপ্তার সাথে যেই অন্যায় আমি করলাম, তার গ্লানি আমি মুছেই যাবো”।

দিদি মুচকি হাসলে, অর্ণব আবার বললেন, “না দিদি, আপনি একদম ভাববেন না যে, আমি ‘শেষ আশা’তে আপনার প্রাণ নিতে যাবো। আই প্রমিস ইউ, এটাই আমার করা ফার্স্ট আর লাস্ট ক্রাইম হবে। … আই উইল সার্ভ মাই রেস্ট লাইফ এস ইউওর ব্রাদার”।

দিদি অর্ণবের মাথায় হাত রেখে, চোখটা বন্ধ করে নিলেন। চোখের কোনে জল। আমরা সকলে দেখেছি, অর্ণবও দেখেছে। দিদি বলেলন, “কেন করলি বলতো … পুরো জীবনটা শেষ হয়ে গেল”।

অর্ণব হেসে বলল, “না দিদি, শেষ হয়নি। দিশা পেল জীবন। শেষ হয়ে যেত। … তোমার খোঁজ পেয়ে গেলাম, এই জঘন্য কাজ করে। শেষ জীবনটাতে আমি নিজেকে একটা সেরা মানুষ রূপে দেখতে পাচ্ছি। যে তোমার সাথে থাকবে, সে সেরা মানুষ হবেই হবে। আমিও হবো। কথা দিলাম দিদি। আমি যাবোই। …এ ব্যাপারে কনো সন্দেহ নেই যে, আমার জেলে থাকার সময় শেষ হবার পর, আমাকে সম্পূর্ণ সমাজ আর গ্রহণই করবে না। কিন্তু আমি নিশ্চিত, তুমি ফেলে দেবেনা। … তাই আমি ‘শেষ আশা’তে আমার জীবনের ‘শেষ আশা’ নিয়েই যাবো। কথা দিলাম”।

হামিদ অর্ণবকে ঈসারা করতে, অর্ণব উঠে দাঁড়ালো। আমরা অর্ণবকে জেলে রাখলাম। কাল কোর্টে পেশ করা হবে ওকে। দিদি আমাকে আর হামিদকে আমাদের কাজের জন্য ডেকে নিয়ে গিয়ে স্ট্যান্ডার্ডএ ট্রিট দিলেন দুপুরের লাঞ্চ।

পরে একটা গিফটও দিয়েছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেটও কথা রেখেছিলেন। দিদিকে মুখ্যমন্ত্রী একটা মেডেল, সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন, আর চুঁচুড়া ম্যুনিসিপ্যালিটি দিয়েছিল একটি শাল আর মেমেন্টো। চন্দননগর কমিশানারেট দিদিকে আরো একটা মেমেন্টো আর একটা পাশ্মিনা কাজ করা পিওর সিল্কের শাড়ী দিয়েছিলেন।

আর দিদি সেদিন আমার আর হামিদের কৌতূহল শান্ত করেছিলেন, সেদিনই স্ট্যান্ডার্ড রেস্টুরেন্টের টেবিলে বসে। আমিই প্রথম প্রশ্ন করলাম, “কি করে ধরলে বলো তো দিদি! আমার তো মাথাতেই ঢুকছে না!”

দিদি বললেন, “এখান থেকে দুপুরে বাড়ি চলে গিয়ে শুয়ে শুয়ে পুরো কেসটা প্রথম থেকে মনের মধ্যে সাজাচ্ছিলাম। ইন্টারোগেশনের সময়ে যে যা বলেছে মনে সাজাচ্ছিলাম। সেই সময়েই দুয়ে দুয়ে চার হয়ে গেল”।

হামিদ বলল, “কি ভাবে!”

দিদি উত্তরে বললেন, “রঞ্জক বলল, অর্ণব বিদিপ্তার জন্য পাগল, আর বিদিপ্তাকে পাবার জন্যই অর্ণব রঞ্জার প্রতি আকৃষ্ট এই অভিনয় করছিল। … ফাস্ট পয়েন্ট। … প্রান্তিক বলল, ও আর বিদিপ্তা তিন মাস আগে ফিসিকালি ইন্টিমেট হয়। … সেকেন্ড পয়েন্ট। … রঞ্জক বলল, বিদিপ্তার শ্বশুরবাড়ির ব্যবসাতে যোগ দিতে অর্ণব লিসিয়াসে বুচার হলো, ঠিক তিন মাসের মাথাতেই। আর তখন রঞ্জা এই বুচার হওয়া পছন্দ করেনা, তাতে কিছু যায় আসেনা অর্ণবের। … থার্ড পয়েন্ট।

এই তিন পয়েন্ট একসাথে হতেই, কেমন যেন একটা খটকা লাগা শুরু হলো। … অর্ণব বিদিপ্তার জন্য পাগল। সে জানলো বিদিপ্তা ফিসিকাল হয়ে গেছে। ওর সমস্ত মাথার তার ছিঁড়ে গেল। ও বুচার হতে ছুটলো। … মার্ডার অয়েপন চপার। সেটা তারমানে আরামসে অর্ণবের কাছে থাকবে। ফরেনসিক অনুসারে হত্যাকারী এক্সপার্ট চপার চালানোতে। তিনমাস ধরে প্র্যাকটিসের ফলে অর্ণব এক্সপার্ট হয়ে উঠেছিল চপার চালানোতে। আর কলেজে কে কখন থাকে, যায়, আসে সমস্ত কিছু অর্ণবের নখদর্পণে।

বিদিপ্তার পিরিয়ডস্‌ হয়েছে সে জানে, কারণ সে বিদিপ্তার বেস্ট ফ্রেন্ড। পরে রইল প্রান্তিককে সিন থেকে সরানোর প্রসঙ্গ আর সুদিপ্তার ছদ্মবেশ ধারণ করা। … প্রথম অর্ণবদের পাড়ায় সন্ধ্যাবেলায় গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে আমার সন্দেহ সঠিক প্রমাণিত হলো। আমার সন্দেহ আগেই হয়েছিল কারণ অর্ণবের বাবামা হলিউডের সাজসজ্জা করায় মানে প্রস্থেটিকসের পোশাক ওর কাছে এভেলেবেল হওয়াটা বড় ব্যাপার নয়।

যখন পাড়ার লোকদের জিজ্ঞাসা করতে জানলাম যে সেদিন দীর্ঘদেহী কিছুটা অশ্লীল পোশাক পরা সুদিপ্তাকে দেখেছে। আমার সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হয়ে যায়। সেই বাড়ির সন্ধান করি, যেই বাড়িতে সিসিটিভি লাগানো আছে। একটা বাড়ি পেয়ে যাই, আর তার থেকে সিসিটিভি রেকর্ড দেখে, আমার বিশ্বাসকে দৃঢ় করে নিই। ওই সিসিটিভি ফুটেজ থেকেই সেই গাড়ির নম্বর দেখে নিই, যেই গাড়িতে করে অর্ণব সুদিপ্তার সাজ সেজে গেছিল। তারপর ব্রজদাকে সেই গাড়ির নম্বর নিয়ে, ড্রাইভারের সন্ধান করতে বলি।

সন্ধ্যের মধ্যে ব্রজদা ড্রাইভারের সন্ধান দিয়ে দিলে, ড্রাইভারের থেকে সেই সময়ের রেকর্ড চেক করে দেখে নি যে অর্ণবই ওর গাড়ি বুক করেছিল আর মহসিন কলজের উদ্দেশ্যেই গেছিল সে। আর সন্দেহ ছিলনা আমার। শুধু একটা প্রশ্ন ছিল মনে। সাগ্নিক কেন টিপ করে সেই সময়তেই ক্রেডিটকার্ডের সন্ধান করলো! অর্থাৎ যদি না করতো সাগ্নিক ক্রেডিট কার্ডের সন্ধান, তাহলে প্রান্তিক সেখানেই হতো, আর অর্ণবের সমস্ত প্ল্যান বানচাল হয়ে যেত। কিন্তু অর্ণব অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে সমস্ত কিছু প্ল্যান করেছে। তাহলে কি, প্রান্তিককে সরিয়ে দেওয়াটাও অর্ণবের প্ল্যানের মধ্যে ছিল!

বেশ খানিকক্ষণ ভাবতে, মনে হলো যদি যেই সফটওয়্যার কোম্পানির কারণে কার্ড লেগেছে সাগ্নিকের, সেই সফটওয়্যার কোম্পানির সাথে অর্ণবের যোগসুত্র থাকে, তাহলে পুরো সাফ হয়ে যাবে ব্যাপারটা। বিদেশ কোম্পানি, তাই মালিকও বিদেশীই হবে। আর বিদেশির সাথে অর্ণব যদি যোগাযোগ রাখেও, তাহলে নিশ্চিত ভাবে মেলে যোগাযোগ করবে, কারণ মেল হলো এন্ড টু এন্ড সিকিওরড প্ল্যাটফরম।

তাই অনিল, তোকে ফোন করে হ্যাকারকে অর্ণবের ফোন ক্র্যাক করতে বললাম। মেলের এক্সেস পেতে, সমস্ত কিছু জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল আমার সামনে। বিদিপ্তা ফিসিকাল হয়েছে জেনেই, অর্ণব সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যে বিদিপ্তাকে ও খুন করবে। তাই আর রঞ্জার সাথে নাটক না করে, সরাসরি মার্ডার অয়েপন পেতে আর চালানো শিখতে লিসিয়াসে জয়েন করলো। সঙ্গে সঙ্গে, সন্দেহটা সম্পূর্ণ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে, সুদিপ্তাকে ফ্রেম করতে চাইলো আর তাই সুদিপ্তার প্রস্থেটিক্স কভারেজ তৈরি করা শুরু করে দিলো।

কেন সুদিপ্তাকে বেছে নিলো? কারণ প্রস্থেটিক বানাতে পুরো ডিটেল লাগে। সুদিপ্তা, বিদিপ্তা আর অর্ণব ছোটো বেলার বন্ধু। তাই সুদিপ্তার ডিটেল কালেক্ট করতে গেলে, অর্ণবকে সব থেকে কম পরিশ্রম করতে হবে। তারপর সুদিপ্তা যেদিন থাকবেনা, সেদিনটার দিকে নজর রেখেছিল অর্ণব। এনিভারসারির প্ল্যান কি, রঞ্জকের থেকেই জেনেছিল অর্ণব। তাই নিশ্চিত ছিল যে সেদিন সুদিপ্তা থাকবেনা।

সেই সঙ্গে, বিদিপ্তার পিরিয়ডস হতে, সমস্ত অঙ্ক মিলে গেল অর্ণবের। … আর তাই আলবার্টকে বলে, সাগ্নিককে সেদিনই, সেই সময়তেই সফটওয়্যার কেনার কথা বলে, যাতে প্রান্তিককে সেই স্পট থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। তারপর বিদিপ্তাকে নিজের চেহারা লুকিয়ে আরামসে খুন করলো সে। প্ল্যান আগে থেকেই ছিল, তাই বাবামা ফিরবে, সেই কথা বলে সেদিন কলেজেই গেল না, যাতে ওর উপর কারুর সন্দেহ না যায়। আর সুদিপ্তার সাজে সেজে গেছে তাই কনো কিছুতে ওর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ছিলনা।

পায়ের ফুটপ্রিন্ট যাতে না পরে পায়ে ডাস্টার ব্যবহার করেছিল। আর মার্ডার অয়েপন লুকতেও হবেনা, কারণ ওই মার্ডার অয়েপন দিয়ে ও পরের দিনগুলো যখন কাজ করেছে লিসিয়াসে তখন সমস্ত ট্রেস ওভারল্যাপ হয়ে গেছে। … সমস্ত প্ল্যান মতই করে, খালি একটু ইমসান্যাল হয়ে যাবার জন্য, প্রস্থেটিক্সএর পোশাকটা পুরো পরানোর সময় না পেয়ে ফ্ল্যাশ করে দেয়, যাতে ওটার আর ট্রেস না পয়া যেতে পারে।

ওই জায়গাটা ও প্রমাণ দিয়ে দিলো। আর চেনাজানা ড্রাইভার নেবেনা বলে উবার ইন্টারসিটি নিলো। এখানে রেকর্ড ছেড়ে গেল উবারের কাছে। আর নিজের বাড়িতে সিসিটিভি আছে, তার থেকে বাঁচার জন্য, বাড়ি থেকে ও গাড়িতে ওঠেনি, খানিকটা এগিয়ে গিয়ে গাড়িতে ওঠে। আর এই কারণে অনেকের চেনা সুদিপ্তাকে ভিন্ন চেহারায় দেখে ফেলেছিল। আর সাথে সাথে অন্যের বাড়িতে সিসিটিভি ফুটেজে বেমানান চেহারার সুদিপ্তার ছবি উঠে আসে। এই কয়েকটা কারণে ও ফেঁসে গেল, নাহলে প্ল্যান অসাধারণ করেছিল অর্ণব।

সাথে সাথে, ও জানে যে আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ফেলেছি। তাই আমাদের কাছে যদি সুদিপ্তার নিন্দা করে, তাহলে আমরা সন্দেহ করবো যে, নিশ্চিত ভাবে এই লোকটা জানে যে সিসিটিভিতে সুদিপ্তা দেখা গেছে, তাই সুদিপ্তাকে ফ্রেম করছে। সেই কারণে আমাদের কাছে বেমালুম বলে যায় যে সুদিপ্তা খুন করতেই পারেনা। আর এই ভাবে আমাদের সঠিক ভাবে ও বোকা বানিয়ে দিয়েছিল। … মানতেই হবে, জিনিয়াস কিন্তু অর্ণব। ভালো তীক্ষ্ণতা আছে বুদ্ধিতে”।

হামিদ হেসে বলল, “কিন্তু তোমার থেকে কম”।

দিদি মুচকি হেসে বলল, “ভালো ছেলে, কি যে মাথায় ভূত চাপলো, সারাটা জীবন নষ্ট হয়ে গেল!”

আমি হেসে বললাম, “অর্ণব ঠিকই বলেছে। ওর নিয়তিতে ছিল যে ও তোমার সাথে থাকবে। তাই এই ভাবে ও তোমার কাছে চলে এলো। … দিদি, তুমি ওকে বলতে গেলে কেন ‘শেষ আশা’র কথা। যদি সত্যই ও বদলা নেবার সংকল্প নিয়ে নেয়!”

দিদি হেসে বলল, “নিলে নেবে। … ব্রাইট ছেলে, জীবনটা ছারখার হয়ে যাবে। … একটা মারাত্মক অপরাধ করে ফেলেছে। যদি একটা সুযোগ দেওয়া যায়, ভালো মানুষ হয়ে ওঠার। … তাই বললাম। … এখন তো বলল, আমার কাছে এসে থাকবে। তবে জেলে অনেক অনেক অপরাধীর সাথে মিশবে এই ১৪-১৬ বছর। তাতে মত পরিবর্তন হয়ে গিয়ে বদলা নিতেও আসতে পারে”।

অদ্ভুত বিশ্বাস দিদির। দিদির বিশ্বাসের কিন্তু কদর করেছিল অর্ণব। ১৪ বছরের জেল হয় ওর। আর তারপর সে ‘শেষ আশা’তেই গিয়ে উঠেছিল। ওখানেই এখন থাকে। তবে দিদিকে যে ও মন থেকে দিদি মেনেছে, তার প্রমাণ দিয়েছে ও। … সেই কথা আরো এক অন্য কথা। তাই অন্য একদিন বলবো। তবে সেই কথার আগে আরো অনেকবার লেডি ব্যোমকেশের প্রশংসা করতে হয়। কেন করতে হয়? পরবর্তী কেসগুলির কথা জানলে, আপনারাও বুঝতে পারবেন। তবে অর্ণব দিদি বলে ডেকে, দিদি শব্দের মান রেখেছে। … দিদির শেষ কেস শলভের তাই অর্ধেক কৃতিত্ব ওরই। তাই লেডি ব্যোমকেশের কথার শেষ কথা অবশ্যই অর্ণব আর দিদির গাঁটছড়ার কেস হবে, এর থেকে বেশি কিছু বলবো না। বললে থ্রিলটা নষ্ট হয়ে যাবে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5