তৃতীয় পর্ব – টেবিল ইন্টারোগেশন
ঠিক ১১টার সময়ে আমি প্রান্তিককে নিয়ে হাজির হলাম ইন্টারোগেশন রুমে। দিদি একবার ঘড়ি দেখে, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “গুড, পাংচুয়াল হওয়াটা খুব জরুরি আমাদের পেশাতে”।
প্রান্তিককে ইন্টারোগেশন রুমে রাখা হলো, আর বাইরের কাঁচের জায়গায় পুলিশ পোস্টিং রাখা হলো, কারণ ওটা নিয়মের মধ্যে পরে, তবে দিদি সাউন্ডটা অফ করে দিলো, যাতে এখানে কি কথা হচ্ছে, কাঁচের বাইরে থেকে শোনা না যায়। আর রেকর্ডিংটা চালু রাখলো, তবে সেসে রেকর্ডিংটা নিজের ফোনে তুলে নিয়ে, ক্যামেরা মেমরি খালি করে গেল।
দুর্নীতির সাথে লড়াই করেছে দিদি। সেটা বেশ বুঝতে পারলাম। ডিপার্টমেন্টের মধ্যে এতো দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত যে বাইরের দুর্নীতি আর প্রয়োজন হয়না তদন্তে হেরফের করার জন্য। তবে দিদি অত্যন্ত সতর্ক। তিনি জানানোর আগে মিডিয়ার সামনে কনো খবর লিক হবার সম্ভাবনাই রাখলেন না। ডিআইজির কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের রিপোর্ট দিতে হয়। সেখানেও ফাইল লিখে দিলেন, ‘রেকর্ডিং অফ ইন্টারোগেশন হ্যাজবিন কেপ্ট ইন টাইট সিকিউরিটি অফ সেফ কাস্টডি অ্যান্ড উয়িল বি প্রভাইডেড অন কমপ্লিশান অফ ডি ইনভেস্টিগেশন’, মানে তদন্তের রেকর্ডিং যত্নসহকারে সুরক্ষিত হেফাজতে রাখা হয়েছে, আর তদন্তের শেষে তা প্রদান করা হবে।
ডিপার্টমেন্ট থেকে বেড়িয়ে যাবার আগেই, একটি অফিসিয়াল পেনড্রাইভে আর একটি নিজস্ব পেন ড্রাইভে রেকর্ডিংগুলি তুলে রাখলেন। অফিসিয়াল পেনড্রাইভটা অফিসের সেফ কাস্টডির লকারে রেখে, নিজে সই করলেন, আর সাপরটিং কাস্টডি রূপে আমাকে সই করালেন, আর লকারের চাবি নিজের কাছে রাখলেন। আর আরেকটা পেনড্রাইভ নিজের কাছে রেখে, মোবাইল থেকে সমস্ত কিছু ডিলিট করে দিলেন।
এই সমস্ত সতর্কতা দেখে আমি দিদিকে বললাম, “সমস্ত কিছু যে ডিপার্টমেন্টের মধ্যে তথ্য চালাচালি হয়ে মিডিয়ার কাছে না পৌছায়, সেই জন্যই করলে, সেটা বুঝতে পারলাম। কিন্তু মোবাইল থেকে সমস্ত কিছু ডিলিট করে পেনড্রাইভের নিলে কেন, আর সেফ কাস্টডিতে একটা কপি রাখলে কেন, সেটা বুঝলাম না”।
দিদি হেসে বললেন, “মোবাইল হ্যাক হতে পারে, তাই মোবাইল থেকে কপি নিয়ে ফাইল ডিলিট করে দিলাম। আর সেফ কাস্টডিতে একটা কপি রাখতে হয়, এটা নিয়ম, আর সতর্কতাও। যদি কনো ভাবে আমার কাছে থাকা পেনড্রাইভ মিসপ্লেস হয়ে যায়, তাহলে ইনভেস্টিগেশন ট্যাম্পারিংএর চার্জ লেগে যাবে। তাই একটা ব্যাকআপ কপি রাখা রইল ডিপার্টমেন্টের কাছেই। আর যাতে সেই পেনড্রাইভ কেউ হাতে না নিতে পারে, তাই জন্য আমার সাথে সাথে তোমাকেও কাস্টডিয়ান করলাম। ধরো তদন্তের সময়ে আমার কিছু হয়ে গেল, বা গুলি খেয়ে আহত হয়ে গেলাম বা ধর মরেই গেলাম, তাহলেও তুমি সেটা এদেরকে ধরিয়ে দিতে পারবে।
কি বলো তো অনিল, কোন কেসের সাথে যে হেভি ওয়েট জরিয়ে থাকে, তা বোঝা খুব কঠিন। আর যদি থাকে জরিয়ে, তাহলে যেন তেন প্রকারেণ কেসের তদন্ত বন্ধ করার প্রয়াস হয়, বিশেষ ভাবে যদি তদন্ত ভালো গতিতে এগোয়। … তদন্ত ভালো গতিতে এগোচ্ছে কিনা, সেই তথ্য ডিপার্টমেন্টের লোক ছাড়া কেউ জানতে পারেনা। তাই হেভি ওয়েটরা তাদের থেকেই সেই ইনফরমেশন বার করে নেয়। আর জেনে রেখো, সাধারণত ডিপার্টমেন্টের টপ লেভেলের অফিসাররাই এই হেভি ওয়েটদের সাথে সংযোগে থাকে, আর সেই টপ লেভেলের অর্ডার অনুসারে কনো অফিসার এই তথ্য পাচার করে।
সেই জন্য, তদন্ত কোন দিকে এগোচ্ছে, তা পরিষ্কার করে বলবোই না। আর যেই তথ্য তদন্তের কথা বলবে, সেই সমস্ত কিছুকে গোপন রেখে দেব। আর সঙ্গে সঙ্গে এজ কুইক এজ পজিবিল তদন্তের সমাপ্তি করবে। এই তিনটি করতে পারলে, তোমার তদন্তের মধ্যে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবেনা। হ্যাঁ, এমন হতেই পারে যে, তোমার তদন্ত হয়ে যাবার পরেও, তোমাকে চার্জসিট দিতে না দিয়ে, তোমাকে ট্রান্সফার করে, অন্য কারুকে এনে, নিজের মত করে কেস সাজিয়ে দিতে পারে টপ লেভেল।
তবে এমন করতে গেলে, পুলিশমন্ত্রীর সই চাই। তাই ছোটখাটো হেভি ওয়েট হলে, এসব হবে না। তবে হ্যাঁ, যদি পুলিশ মন্ত্রীর থেকেও চিঠি চলে আসে, নিশ্চিত থেকো যে তোমার তদন্ত্বের রিপোর্ট আর কনোদিনই বাইরে আসবেনা। আফসোস রেখো না সেই ক্ষেত্রে, তুমি তোমার কাজে কনো প্রকার গাফিলতি করো নি। তোমাকে তদন্ত করা থেকে কেউ আটকাতে পারেনি, তবে ক্রিমিনাল এতটাই হেভি ওয়েট যে, তার এগেন্সটে চার্জসিট দিলে গদি টলে যাবে সরকারের। তাই ইচ্ছা না থাকলেও, মাথা পেতে মেনে নিতে হবে এই সিদ্ধান্ত, আর ভুলেও এই ক্ষেত্রে প্রটেস্ট করতে যাবেনা। তোমার বা তোমার পরিবারের প্রাণ নিয়ে টানাটানি পরে যেতে পারে সেই ক্ষেত্রে”।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, “গদি টলে যাবে! এমন হেভি ওয়েট মানে তো কনো মন্ত্রী বা এমপি এমএলএ, তাই তো!”
দিদি উত্তরে বললেন, “নট নেসেসারি, সেই ব্যবসাদারও হতে পারে, যে ইলেকশান কেম্পেনিং করতে বিপুল বিনিয়োগ করে, আবার সেই গাংস্টারও হতে পারে যার দৌলতে কনো কনো স্থানের ভোট যেতে সরকারপক্ষ”।
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “এর মানে, পুরোদমে কাজ করতে গেলে, ডিপার্টমেন্টকে জানার সাথে সাথে, রাজনীতি জানাও খুব আবশ্যক, তাই না দিদি!”
দিদি হেসে বললেন, “রাজনীতি তো আর জগতে চলেই না, এখন চলে বণিকনীতি আর প্রজানীতি। … হ্যাঁ এইদুটো জানতে হয়”।
দিদির থেকে সমানেই কিছু না কিছু শিখতে থাকতাম এইভাবে। খুঁটিনাটি, কোন পরিস্থিতিতে কি করা উচিত, কি কি ভাবে লিকেজ হতে পারে, কে কে লিকেজ করায়, কখন কখন করায়, আর তার থেকে বাঁচার উপায়, এমন অনেক কিছু সমানেই জানতে থাকতাম। যাই হোক, এবার সেদিনের পাঁচসেট ইন্টারোগেশন, মানে অফিসিয়ালি তিনটি, আর আনঅফিসিয়ালি দুটিতে কি কি হলো, সেই কথা বলি।
প্রথমেই প্রান্তিক। দিদির ইন্টারোগেশন টেকনিক অদ্ভুত। প্রথমেই প্রশ্ন করলেন, “বাবার মাংসের ব্যবসা। তা চোপার চালাতে পারো তুমি!”
প্রান্তিক আকস্মিক এমন একটা প্রশ্নতে একটু হকচকিয়েই গেল। তারপর বলল, “বাবার ব্যবসার জায়গায় আমি সর্বসাকুল্যে তিনবার গেছি। হ্যাঁ, ছাগল যেখানে চড়াতে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে অনেকবার গেছি। ছাগলগুলির সাথে বেশ বন্ধুত্বও হয়ে যাচ্ছিল আমার। তারপর থেকে মাটন খাওয়া বন্ধ করে দিই। খারাপ লাগতো। … সেই জন্য বাবা, এখানে পড়তে পাঠিয়ে দিলেন, যাতে আমার মন পালটে যায়, আর পরে ব্যবসায় টেনে নিতে পারেন”।
দিদি মাথা নেড়ে বললেন, “খুনের দিন তুমি তো কলেজে গেছিলে। তা বিদিপ্তার জন্য অপেক্ষা না করে চলে এলে যে!”
প্রান্তিক উত্তরে বলল, “ফোন এসেছিল একটা। আমার দাদার। ক্রেডিট কার্ডের ডিটেলস লাগতো। আমার রুমে ছিল। বিদিপ্তাই আমাকে চলে যেতে বলল, আর বলল, ওর পিরিয়ডস হয়েছে, বাথরুমে গিয়ে প্যাড পালটে নিয়ে ও চলে যাবে”।
দিদি প্রশ্ন করলেন, “দাদা কি কিনলেন সেদিন!”
প্রান্তিক উত্তরে বললেন, “কি একটা সেলস অরগানাইজিং সফটওয়্যার, ক্যাসকেড না কি নাম। … মানে, মোবাইলে মেসেজ ওই নামেই এসেছে, ক্রেডিট কার্ড থেকে পয়াসা কাটার পর”।
দিদি ক্যাজুয়ালি প্রশ্ন করলেন, “তা তোমার ক্রেডিট কার্ড নিলেন কেন? তোমার দাদার নিজের ক্রেডিট কার্ড নেই!”
প্রান্তিক উত্তরে বললেন, “ওটা দাদারই। আমাকে দিয়ে রেখেছিলেন, বাইরে আছি, যদি কিছুতে কাজে লাগে, সেই জন্য”।
দিদি হেসে বললেন, “দাদার ক্রেডিট কার্ড, অথচ মেসেজ তোমার ফোনে আসে!”
প্রান্তিক উত্তরে বলল, “না না ফোনে আসেনি। মেলে এসেছিল। কোম্পানির মেল। আমার বাবা, জ্যাঠা, দাদা আর আমার কাছে ওর আইডি পাসওয়ার্ড থাকে। ফোনে সিঙ্ক্রনাইজ করা আছে। সেখানেই মেল আসতে দেখেছি। আছে মেলটা দেখাবো!”
দিদি চোখের ইশারায় আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, স্ক্রিনসট নিয়ে নিতে। দিয়ে প্রান্তিকের দিকে বললেন, “উনাকে দাও, আমি ওসব বেশি বুঝিনা”।
আমি স্ক্রিনসট নিলাম। মেলটা এসেছে ৩১শে জানুয়ারি বিকেল ৪টে ১৫তে। ছেলেটা ঠিকই বলছে। আমি স্ক্রিনশট নিয়ে রাখলাম, পরে প্রিন্টআউট করে নিই, ফাইলে রাখার জন্য।
দিদি প্রশ্ন করলেন প্রান্তিককে, “তোমার বাবা খালি ছাগল চড়ান, ষাঁড়!”
প্রান্তিক প্রশ্নের মাঝেই বলল, “না না, বিফের ব্যবসা, আমার জ্যাঠার। সাগ্নিক, মানে আমার দাদার বাবা। এন্টারপ্রাইজটা একটাই নামে, তবে ভাগ আছে। বিফেরটা জ্যাঠার, আর ছাগলেরটা বাবার। জ্যাঠারটা তো ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের। বিদিপ্তার বাবার সাথে কাজ করতেন উনি”।
দিদি ভ্রুকুঁচকে প্রশ্ন করলেন, “করতেন কেন? আর করেন না!”
প্রান্তিক একটু চুপ করে যেতে, দিদি আবার প্রশ্ন করলেন, “পারসোনাল প্রশ্ন করে ফেললাম!”
প্রান্তিক মাথা তুলে বললেন, “না, একটু ইমসানাল হয়ে গেছিলাম। … সাগ্নিক, আমি ছাড়াও আমাদের একটা দিদি ছিল, নাম সাগরিকা। জ্যাঠার মেয়ে, আমাদের দুইজনেরই অত্যন্ত প্রিয় দিদি। … দিদির একটা বড় অপরেশন হবার ছিল। গুরগাউএর একটা বড় নার্সিংহোমে ভর্তি ছিলেন। বিদিপ্তার বাবার সাথে একটা বড় কন্ট্রাক্ট ছিল। যেইদিন কন্ট্রাক্টের অর্ধেক কিস্তি আসবে, তারপরের দিনই সেই টাকাটা পুরো দিয়ে দিতে হত, তবে দিদির অপরেশন হতো।
শেষ মুহূর্তে এসে, বিদিপ্তার বাবা একজন অন্য বিফ সাপ্লায়ারের থেকে কম দামে সাপ্লাই পেয়ে যায়, তাই ডিল ক্যান্সেল করে দেয় আমাদের সাথে। দিদির অপারেশন করা যায়না, পরেরদিন দুপুরেই দিদি মারা যান। … এই জন্য একটু ইমসানাল হয়ে গেছিলাম, আপনার প্রশ্নটা শুনে”।
দিদি প্রশ্ন করলেন, “যার জন্য তোমার দিদির প্রাণ চলে গেল, তারই মেয়ের সাথে তোমার এফেয়ার, বাড়ির লোক জানে!”
প্রান্তিক মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ জানে। অনেকবার বারং করেছে। … বাট, এতে বিদিপ্তার কি দোষ! … সেতো এসবের কিছুই জানেনা। … আর আমরা প্রায় তিনবছর হয়ে গেছে, সম্পর্কে জরিয়ে রয়েছি। দুজনেই সিরিয়াস। … আমরা, সরি টু সে, ফিসিকালও হয়ে গেছি কিছু মাস আগে। এরপর ছেড়ে দেওয়ার মানে তো ডিচ করা। … সুদিপ্তা হলে, ঠিক আছে, ও অনেকের সাথে অনেক দূর নিয়ে গেছে সম্পর্ক, কিন্তু বিদিপ্তা একজন সুচরিত্রের মেয়ে। এই ভাবে ওকে ব্যবহার করে ফেলে দেব!… বাড়িতে বলে দিয়েছিলাম, যদি মেনে নিতে না পারে, বাড়ি ছেড়ে দেব, কিন্তু বিদিপ্তাকেই বিয়ে করবো। … বিদিপ্তার বাবা আমাকে কথাও দিয়েছিল, উনি আমার কেরিয়ার তৈরি করে দেবেন, যদি বাড়ি ছেড়ে দিতে বাধ্য হই”।
দিদি চুপ করে সমস্ত কথা শুনলেন, আর একটা মিষ্টি হাসি হেসে বললেন, “আর কিছু কি তুমি নিজের থেকে বলবে! … মানে কারুকে কি সন্দেহ হয় তোমার!”
প্রান্তিক বলল, “আমি বুঝতে পারছিনা। বিদিপ্তা জেনুইনলি একজন ভালো মেয়ে। ভালো চরিত্রের, ভালো মনের, আর সুহৃদয়ের। ওকে কেউ কেন! … (একটা জোর শ্বাস ছেড়ে) … কিচ্ছু ভেবে পাচ্ছিনা”।
দিদি বললেন, “তোমার বাড়ির লোক তোমাকে সরিয়ে আনার জন্য এই কাজ কি করাতে পারেন!”
প্রান্তিক দিদির চোখের দিকে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে দেখে শেষে বলল, “না না, মাংসের ব্যবসা করে ঠিকই, মানুষ মারেনা আমার বাড়ির লোকরা। … ভালো লোক ওরা। … বেশ ভালো লোক”।
দিদি হেসে বললেন, “তা ফিসিকাল কবে হলে বিদিপ্তার সাথে!”
প্রান্তিক মাথা নামিয়ে বলল, “এই মাস তিনেক হয়েছে”।
দিদি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওকে যেখান থেকে নিয়ে এসেছিলে, সেখানে ড্রপ করে দিও”। … প্রান্তিক, তোমার ফোননম্বরটা আমাকে দিয়ে যাও। … আবার প্রয়োজন পরলে, ডেকে নেব, বা ফোনে কথা বলে নেব। … বাড়ি যাবার প্ল্যান আছে নাকি!”
প্রান্তিক দাঁড়িয়ে পরে বলল, “ছিল, আমি আর দাদা মিলে গয়া যেতাম, দিদির পিণ্ডদান করতে। … আমার জায়গায় জ্যাঠা যাচ্ছে। … এখন তো এই কেসের মীমাংসা হবার আগে এখান থেকে যেতে পারবো না, তাই না। … আর সত্যি বলতে, কনো কিছু ভালোও লাগছে না এখন। কান্না পাচ্ছে, কিন্তু বন্ধুরা বলবে বিয়ে না হয়েই বউয়ের জন্য কাঁদছিস, তাই কাঁদতেও পারছিনা। বিদিপ্তা আমাকে অন্য এক মানুষ করে দিয়েছিল। … না, এখন কিছুই বলবো না। … তবে সত্যি বলতে, আর কারুর সাথে আমি জরাতেই চাইনা”।
দিদি মুচকি একটা সান্ত্বনাদায়ক হাসি হেসে, আমার দিকে চোখের ঈসারা করতে, আমি প্রান্তিককে নিয়ে চলে গেলাম। আর ফেরার পথে অর্ণবকে নিয়ে এলাম। দিদির কথার মত, আমার পক্ষ থেকে কারুকে জানালাম না যে এর আগে কাকে নিয়ে আসা হয়েছিল, আর সে কি কি বলেছে।
অর্ণবকে নিয়ে আসলে, দিদি অর্ণবকেও সরাসরি একটা প্রশ্ন করলেন, যা অর্ণবের ধারণার বাইরে ছিল। বেসিক্যালি এটাই দিদির স্টাইল। পরে দিদিকে প্রশ্ন করলে, দিদি এই বিষয়ে বলেছিলেন, “সেই ছোটো বেলায় মৌখিক পরীক্ষা দেওয়া থেকে আমাদের এই অভ্যাস রয়ে গেছে যে, আমাদেরকে কি কি প্রশ্ন করা হতে পারে, সেই একটি প্ল্যান করে নিয়ে আমরা জিজ্ঞাসাবাদের মঞ্চে উঠি। তাই প্রথমেই সেই প্ল্যানটা ভেস্তে দিই, যাতে সে নিজের প্ল্যান নিজেই ভুলে যায়”।
অদ্ভুত টেকনিক বলতেই হবে। বড় বড় ইন্তারভিউয়াররাও দিদির কাছে ডাহা ফেল, এই ব্যাপারে কনো সন্দেহ নেই। অর্ণবকে চমকে দিয়ে দিদি যেই প্রশ্নটা করেছিল, “বেস্ট ফ্রেন্ডের এমন অকস্মাৎ মৃত্যুর শোক একদিনে কাটিয়ে উঠলে অর্ণব!”
প্রশ্নটা শুনে, অর্ণব কেন, আমিও চমকে গেছিলাম। অর্ণবও একটু বোকা বেনে গেল। তবে অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছেলে, যেমনটা সুদিপ্তা বলেছিল আমাদেরকে। সে খানিক থেমে, একটা হতাশার হাসি দিয়ে বলল, “কি জানেন তো ম্যাডাম, যা দুদিনের, তার জন্যই আমরা প্রতিক্রিয়া অধিক দিই। … এই যেমন ধরুন, বিয়ের বিদায়ের সময়ে কনের কান্না। পরেরদিন বউভাতের ডাইসে দেখলেই বোঝা যায়, আগের দিনের কান্নাটা কেবলই তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া ছিল”।
দিদিও তেমনি, টেক্কা মারতে তিনি দেবেন না। দিদি প্রশ্ন করলেন, “তা তোমার ক্ষেত্রে কোনটা, কালকে কেঁদে আজকে বউভাত, নাকি কান্নার সময়ক্ষণ এখনো খুঁজছো!”
অর্ণব সত্যই বুদ্ধিমান ছেলে। বেশ বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দিচ্ছিল। উত্তরে সে বলল, “পুষে রেখে দিয়েছি শোকটা। কনোদিনও যাতে না ভুলি, এমন সংকল্প নিয়ে”।
দিদিও অর্ণবের বুদ্ধিদীপ্ততা দেখে অন্তরে অন্তরে নিশ্চয়ই প্রশংসা করেছিলেন। সেই কারণেই প্রসঙ্গ পালটে দিয়ে তিনি বললেন, “বাবা মা ফিরে এসেছেন! … ফিরে এসে ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পেয়েছেন, নাকি সমস্ত ছড়ানো ছিটানোই ছিল!”
অর্ণব বুঝে গেল, আমরা আমাদের হোমওয়ার্ক করে বসেছি। তাই সে বলল, “হ্যাঁ পরিষ্কার পেয়েছে”।
এরপরের প্রশ্নটার কারণ আমি বুঝতে পারলাম না, আর পরে প্রশ্ন করবো সেটা মনেও ছিলনা। দিদি প্রশ্ন করলো, “সাগ্নিককে কতদিন চেনো?”
অর্ণব মাথা নামিয়েই ছিল। পাশ থেকে আমি দেখলাম, দুই তিন সেকেন্ড পরে ভ্রুটা কুঁচকে মাথা তুলে সে পাল্টা প্রশ্ন করলো, “কে সাগ্নিক!”
দিদি উত্তরে বললেন, “প্রান্তিকের দাদা”।
অর্ণব মাথা নেড়ে বলল, “আলাপ আছে। … উম, বিদিপ্তার পিসির বিয়েতে নিমন্ত্রিত ছিলেন। তখনই আলাপ হয়েছিল। তবে ওই ওইটুকুই। এর থেকে তো বেশি কিছু না”।
দিদি মনে হয় একটা অন্য সমীকরণও খুঁজছেন। নাহলে এমন প্রশ্ন করছেন কেন? দিদি প্রশ্ন করলেন, “প্রান্তিক কেমন ছেলে?”
অর্ণব মাথা নাড়িয়ে বলল, “ভালো ছেলে। … মানে বড়লোকের ছেলেরা যেমন বাঁধনছাড়া হয়, তেমন নয়। দায়িত্বজ্ঞান বোধ আছে। বিদিপ্তাকে জেনুইনলি ভালো বাসতো, লোক দেখানো নয়”।
দিদি আবার প্রশ্ন করলেন, “আর সুদিপ্তা!”
অর্ণব মাথা ঝাঁকিয়ে একটু মুখে মুচকি হাসি রেখে বলল, “রূপ আর বাপের পয়সা একসাথে থাকলে, যেমন একটু উড়নচণ্ডী হয়, তেমন। তবে রঞ্জক ওকে অনেকটা বেঁধে নিয়েছে। আগে আরো উড়নচণ্ডী ছিল”।
দিদি প্রশ্ন করলেন, “সুদিপ্তার কাছে কি কনো কারণ ছিল বিদিপ্তাকে খুন করার?”
অর্ণব একটু ভাবার ভঙ্গিমা করে বলল, “ওরই লস। ওর বাড়িতে সমস্ত ঝক্কি তো বিদিপ্তাই সামলাতো। আজ বাইরে রাত কাটাচ্ছে, কাল মদ খেয়ে ফেলেছে বলে বাইরে হোটেলে থাকছে। সমস্ত কিছু তো বিদিপ্তাই সামলাতো। তাছাড়াও সুদিপ্তা যে এতকিছু বেহেল্লাপনা করেও ফেঁসে যায়না, মানে কন্ট্রোল না থেকেও একটা কন্ট্রোলের মধ্যে থাকতো, সেটা বিদিপ্তার জন্যই তো”।
দিদি ঠোঁটের সাথে ঠোঁটকে চিপে একটা মুচকি হাসি হেসে বললেন, “হুম, আচ্ছা প্রান্তিকের সাথে সুদিপ্তার সম্পর্ক কেমন ছিল?”
অর্ণব একটু স্মরণ করার জন্য সময়ে নিয়ে বলল, “ঠিকঠাক, এমনি প্রান্তিক বিদিপ্তার সাথেই চিপকে থাকতো। অন্য দিকে মাথা দিতো না। বিদিপ্তা অন্য কারুর সাথে কথা বলতে ব্যাস্ত থাকলে, প্রান্তিক ফোনে রামি সার্কেল খেলতে থাকতো। ওটা ওর নেশা। আদারঅয়াইজ প্রান্তিক অন্যদের সাথে খুব একটা কথা বলতো না”।
দিদি আবার একটা দুষ্টুমিমার্কা হাসি দিয়ে বললেন, “সুদিপ্তার তো অনেক পুরুষে চোখ, প্রান্তিক তো হ্যান্ডসাম, আর বাপের ভালো পয়সা, তো সুদিপ্তা প্রান্তিকের দিকে চোখ দেয়নি!”
অর্ণব একটা ডুকরানো হাসি দিয়ে বলল, “বিদিপ্তার সাথে গাঁটছড়া না থাকলে, নিশ্চয়ই তাকাতো। আর ও যার দিকে তাকায়, তার সাথে ঝুলেই পরে। … তবে বিদিপ্তা ওর খুব ক্লোজ। প্রয়োজনের জন্যই হোক, আর যেই কারণেই হোক, সুদিপ্তা অকৃতজ্ঞ নয়। বেশ কয়েকবার বড় বড় কেশ খাওয়া থেকে বিদিপ্তা ওকে বাঁচিয়েছিল। তাই বিদিপ্তার লস হোক, এমন কিচ্ছু ও করবে না, এটা কনফার্ম। আর রঞ্জকের পরিবারও বেশ বড়লোক। দুটো লেন্সকার্টের শরুম আছে ওর বাবার কলকাতার বুকে, আর কলকাতার বাইরে আরো বেশ কয়েকটা। তুলনামূলক ভাবে রঞ্জক প্রান্তিকের থেকে বেশি হ্যান্ডশাম, আর বেশি বড়লোক। সামনে তো আসবেই, দেখে নেবেন তখন”।
এই কথাটাতে আমার খটকা লাগলো। দিদি হেসে বললেন, “তা অর্ণব, বাড়ির থেকে একটু দূরের পার্ক থেকে তোলা হয়েছিল তোমাকে, সেখানেই নামিয়ে দেবে তো!”
অর্ণব বলল, “নো প্রবলেম, বাড়ির সামনেও নামাতে পারে। … বিদিপ্তা আমার ছোটো থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড। তাই তার মৃত্যুর জেরার জন্য আমাকে পুলিশ তুলবে, সেটা সকলেই জানে”।
দিদি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাড়িতেই ড্রপ করে দিয়ে এসো ওকে”।
এক ঘণ্টার মধ্যে এই জেরা শেষ। আমি অর্ণবকে বাড়িতে ড্রপ করে দেবার পরেও দেখলাম এক ঘণ্টা রয়েছে হাতে। তাই রঞ্জককে তোলার আগে দিদির কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলাম, “রঞ্জক যে আসবে, সেটা অর্ণব জানলো কি করে?”
দিদি বলল, “চেনে একে অপরকে, বন্ধুও হতে পারে”।
আমি বললাম, “তাহলে তো রঞ্জককে নিয়ে আসা বেকার হবে, ওরা তো সলাপরামর্শ করেই আসছে”।
দিদি হেসে বললেন, “নিয়ে এসো আগে, তারপর দেখছি”।
আর কথা বাড়ালাম না। নিয়ে এলাম রঞ্জককে। সত্যিই দিদির তদন্ত করার ধরন অনবদ্য। আর অর্ণবও সঠিক, রঞ্জক প্রান্তিকের থেকে অনেক বেশি হ্যান্ডসাম। দিদি সরাসরি প্রশ্ন করলেন রঞ্জককে, “অর্ণব তো তোমার বন্ধু, তা তোমার উপর এমন ক্ষেপে আছে কেন ও!”
রঞ্জক ভ্রুকুঁচকে বলল, “ক্ষেপে আছে আমার উপর! এই একটু আগে তো ফোনে কথা হলো। বলল, জেরার পর ওকে বাড়ি ছেড়ে এসেছে পুলিশ! ক্ষেপে আছে মনে হলো না তো! … আসলে মাস তিনেক ধরে ওর মেজাজ একদম ঠিক নেই। … নাহলে আপনিই বলুন, যেই রঞ্জাবতীর সাথে ৫ বছর আলাপ করতে পারছিল না, সেই রঞ্জার সাথে আমি আলাপ করিয়ে দিলাম, তারপরে এটা জেনেও যে রঞ্জা পিওর ভেজ, কেউ লিসিয়াসে পচারের কাজ নেয়! … কি না, বিদিপ্তার বরের দোকানে কাজ করবে। কনো মানে হয়!”
কি যে বলল দিদি, রঞ্জক গরগর করে সমস্ত কথা বলতে শুরু করে দিলো। দিদি হেসে বললেন, “বিদিপ্তার বরের দোকানে মানে!”
রঞ্জক উত্তরে বলল, “প্রান্তিকদের ছাগলের মাংস বিক্রির বড় ব্যবসা। প্রায় বর্ধমান জেলার সমস্ত জায়গায় সাপ্লাই করে ওরা শুধু ছাগল বা কাটা ছাগল। অর্ণবের মাথায় ভূত চরে যে, সে প্রান্তিকের বাবার বয়সায় কর্মচারী হয়ে যোগ দেবে। তাহলে বিদিপ্তার কাছে থাকতে পারবে”।
দিদি ভ্রুকুঁচকে বললেন, “কিন্তু কেন? বিদিপ্তা তো ওর বেস্ট ফ্রেন্ড, বেস্ট ফ্রেন্ডের প্রতি এমন আকর্ষণ কি কারণে?”
রঞ্জক মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ বেস্ট ফ্রেন্ড, কিন্তু অর্ণব বিদিপ্তাকে সবসময়েই ভালোবাসতো। বিদিপ্তা শেষে প্রান্তিকের সাথে জরিয়ে পড়তে, ও রঞ্জার দিকে সিরিয়াস হওয়া শুরু করেছিল। … (হেসে) আসলে, রঞ্জার প্রতি অর্ণব আকৃষ্টই ছিলনা। বিদিপ্তাকে একটু জ্বালানোর জন্য রঞ্জার পিছনে যেত। … আমিও এই কথা জানতাম না। যখন বিদিপ্তার বরের ব্যবসায় কর্মচারী হবে বলল, তখন প্রশ্ন করতে ও এই কথা বলে আমাকে”।
দিদি একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, “অর্ণবকে দেখে বুদ্ধিমান মনে হয়, আসলে ও ছেলে মানুষ”।
রঞ্জক মাথা নেড়ে বলল, “ছেলেমানুষ! না না, মাথা খারাপ ওর। … কারুর সাথে কনো কথা শেয়ার করেনা। … আনন্দ লুকায়, শোক লুকায়, সমস্ত কিছু লুকায় ও”।
দিদি মাথা নেড়ে বললেন, “হুম, অর্ণব তোমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু না!”
রঞ্জক হেসে বললেন, “আমরা একসাথে ক্রিকেট খেলতাম দেশবন্ধুতে। … ওর সুত্র ধরেই, সুদিপ্তার সাথে, পরে সকলের সাথে আলাপ”।
দিদির শেষ প্রশ্ন, “সুদিপ্তা কেমন মেয়ে?”
রঞ্জক হেসে বলল, “মনটা খুব ভালো। একটু বাঁধনছাড়া। বিদিপ্তা ওকে সামলে রাখতো। কিছুটা অর্ণবও। আর এখন আমার দায়িত্ব সামলে রাখা। … বিদিপ্তার মৃত্যুতে আমার বিশ্বাস ও অনেকটা পালটে যাবে। … খুব ডিপেন্ড করতো বিদিপ্তার উপর। আর বিদিপ্তা ওকে অত্যন্ত স্নেহ করতো। বোন নয়, যেন মেয়ে”।
দিদির অনুমতি পেয়ে রঞ্জককেও ছেড়ে এলাম। ফিরে এসে দিদির কাছে বসতে, দিদি বলল, “বাড়ি যাবো। ঘাড় ব্যাথা হয়ে গেছে। একটু বাড়ি গিয়ে বসবো। টাইম আছে বেশ খানিকটা। যাবে বাড়ি অনিল। … না, মাসিমা অপেক্ষা করবে তোমার”।
আমি বললাম, “না, মাকে বলে এসেছি, আজ ফিরতে রাত হবে। … তোমার বাড়িই চলো। … কিছু জানার আছে তোমার থেকে। কৌতূহল চেপে রাখতে পারছিনা”।
দিদি হেসে বললেন, “চা করতে পারো!”
আমি হেসে বললাম, “হ্যাঁ, সমস্ত রান্নাই পারি”।
দিদি হেসে বললেন, “বাড়ি গিয়ে চাটা তুই করিস। … আমি একটু টানটান শোবো”।
দিদি আমাকে তুমি থেকে তুইতে চলে এসেছেন, এটা ভেবেই ভালো লাগলো। দুইদিনের মধ্যেই আপন লাগা শুরু হয়ে গেছে দিদিকে। আসলে উনার কাজের প্রতি নিষ্ঠা, আর ম্যাচিউরিটি, এই দুটো সত্যই উনাকে বেশ কাছের মানুষ করে ভাবতে বলছিল আমার মন।
বাড়ি ফিরে গেলাম। চা করা হলে, ডিনার টেবিলে চায়ের ট্রে রেখে হাঁক পারতে, দিদি বললেন, “এই ঘরে নিয়ে চলে আয় বাপ। … একটু শুয়েছি। আবার উঠে যেতে পারছিনা”।
ঘরে ঢুকতে দেখলাম, দিদি ফর্মাল শার্ট ছেড়ে কুর্তি পরে নিয়েছেন, পরনে প্যান্টটা এখনো খাকি। অগুছালো দেহখানা আমি ঢুকতে, গুছিয়ে নিয়ে বিছনাতেই ঠেস দিয়ে বসলেন। চোখ পরলো। দিদির দেহরূপও বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু ভালো লাগলো আমার যে, চোখে পরলো, কিন্তু কনো রেখাপাত করলো না। নিজেরই ভালো লাগলো। মন থেকে উনাকে দিদি মানতে ইচ্ছা করছে। দেহরূপে আকৃষ্ট হলে, নিজের চোখে নিজেই ছোটো হয়ে যেতাম।
চা রাখতে, রাখতে প্রশ্ন করলাম, “মাথা ধরেছে?”
দিদি বললেন, “না, মাথা ধরেনি। … জট পাকিয়ে রয়েছে মাথাটা। … সবটাই কেরকম একটা ধোঁয়াশা। কালকে ডিআইজিকে ইন্টারমিডিয়েট রিপোর্ট সাবমিট করতে হবে, কিন্তু এখনো আমার কাছেই কনো কিছু পরিষ্কার নয়”।
আমি বললাম, “কেন, তুমিই তো প্রান্তিকের বাবাদের দিক থেকে বিদিপ্তাকে খুন করার কারণ খুঁজে পাচ্ছিলে না। সাগরিকার মৃত্যু হয় বিদিপ্তার বাবার কারণে। মেয়ে হারানর প্রতিশোধ যদি মাংস কাটা জহ্লাদরা না নেয়, তাহলেই তো অবাক হবার কথা, তাই না!”
দিদি চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, “একবার কেসটা সাজা তো ঠিক করে”।
আমি বলতে শুরু করলাম, “দেখো, প্রান্তিক নাছোড়বান্দা বিদিপ্তাকে বিয়ে করার জন্য। যদি তা না হতো, হতেও পারতো যে মেয়ের খুনিকে ছেড়ে দিতেন প্রান্তিকের বাপজ্যাঠা। কিন্তু এখানে প্রসঙ্গ কেবল মেয়ের মৃত্যুর বদলা হয়েই থেকে যায় না, নিজের ছেলেকে আর ব্যাবসার পাকা মাথা, প্রান্তিককে হারানোর সম্ভাবনাও জেগে যায়। … তাই পরে থাকে একটাই কাজ, বিদিপ্তাকে মানে পথের কাঁটাকে সরিয়ে দেওয়া। মেয়ের মৃত্যুর বদলাও নেওয়া হলো, আবার ঘরের ছেলেকে ঘরে ফিরিয়ে আনাও হলো”।
দিদি চায়ে চুমুক দিতে দিতেই বললেন, “চা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। চা খেতে খেতে বল্”।
আমি চায়ে একটা চুমুক দিয়ে উত্তেজিত হয়ে বললাম, “দেখো, প্রান্তিক এই খুনের সাথে জড়িত নয়। কিন্তু প্রান্তিক স্পটে থাকলে খুনটা করা যেত না। তাই ক্রেডিট কার্ডের কথা বলে, প্রন্তিককে সরিয়ে দেওয়া হলো স্পট থেকে। আর ভাড়াকরা গুন্ডাকে দিয়ে খুন করানো হলো। বুচার কোম্পানি, তাই চোপার চালানোর লোকের অভাব তো এঁদের কাছে নেই”।
দিদি চা শেষ করে কাপ ট্রেতে রেখে বললেন, “হুম, … কিন্তু প্রমাণ করা খুব কঠিন। মার্ডার অয়েপনও নেই। খুনির নিজের চেহারাও দেখা যাচ্ছেনা। … খুনির আসল চেহারা জানতে হবে অনিল। তবেই তাকে চাপ দিয়ে, স্বীকার করানো যাবে যে, কেউ তাকে সুপারি দিয়ে খুন করিয়েছে। নাহলে কনো ভাবেই … কিন্তু কি করে পাবো খুনির আসল চেহারার ছবি!”
আমি বললাম, “সাগ্নিককে তুলে এনে দু’ঘা দিলে, সব উগরে দেবে”।
দিদি হেসে মাথা নাড়িয়ে বললেন, “এত বড় ব্যাবসা করছে। এক্সপোর্ট করে তারউপর। কত উপরমহল পর্যন্ত হাত গেছে ভাবতে পারছিস! … তুলে আনলেই, ফোন এসে যাবে উপরমহল থেকে, ছেড়ে দিতে হবে সঙ্গে সঙ্গে। … তা ছাড়া!”
আমি বললাম, “তা ছাড়া কি দিদি!”
দিদি উত্তরে বললেন, “সবটাই অনুমান ভিত্তিক অনিল। সবটাই অনুমান ভিত্তিক। … এরকম অনুমানের ভিত্তিতে ডিআইজি এমন একটা এক্সপোর্ট বিজনেসের লোককে এরেস্ট করার পারমিশনই দেবেন না। … (বিরক্তির সাথে মাথা নাড়িয়ে) বারবার এমন হয় কেন বলতো! … তদন্ত করে যখনই শেষ সীমানায় পৌছাই, এই হেভিওয়েট ফ্যাক্টর বিড়ালের মত রাস্তা কেটে চলে যায়”।
আমি বললাম, “আজ প্রান্তিকের বাবা তো আসছে। কনো একটা ক্লু যদি পাওয়া যেতে পারে উনার থেকে!”
দিদি বললেন, “হুম, এই একটাই উপায় খোলা আছে। … ছাড়, কিছু খাবি। ম্যাগি করবো একটু সবজী দিয়ে! … হ্যাঁ রে, মাসিমার বিকেলের খাবার কিছু করে এসেছিস!”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, সুজি করে মাইক্রোওভেনে রেখে এসেছি। একবার চালিয়ে গরম করে খেয়ে নেবে”।
দিদি বললেন, “আর রাত্রে!”
আমি বললাম, “মা অনেকদিন ধরে চাউমিন খাবে, চাউমিন খাবে বলছে। চুঁচড়োতে স্ট্যান্ডার্ড রেস্টুরেন্টের চাউমিনটাতে বেশি তেল থাকেনা। ওদেরকে পেয়েমেন্ট করে রেখেছি। ওরা বলেছে ১২টার মধ্যে যেতে, খাবার রেডি থাকবে। … (খানিক থেমে) দিদি, তুমি কি খাবে রাত্রে। তোমারও একটা বলে দেব করতে!”
দিদি বললেন, “এখন ম্যাগি খেয়ে, আবার রাত্রে চাউমিন! … ছেড়ে দেয়, আলুসিদ্ধ ভাত খেয়ে নেবো”।
আমি বললাম, “খাও না আজ দিদি। খাবার নিয়ে এক্কেবারে বাড়ি চলে যাবো। আমাদের বাড়িতে বসেই খেয়ে দেয়ে, মায়ের সাথে দেখা করেই না হয় একবারে বেরোবে”।
দিদি হেসে বললেন, “বেশ, তাই হোক। বলে দে। … তাহলে এখন কি খাবি!”
আমি বললাম, “একটু মুরি মাখো। মুরি আছে বাড়িতে!”
দিদি হেসে বললেন, “বাঙালির ঘরে মুরি থাকবে না, তা কি হয়। … আম তেল খাস তো!”
আমি মাথা নাড়িয়ে সায় দিতে, দিদি রান্নাঘরে চলে গেলেন। বেশ খানিক পরে মুরিমাখা নিয়ে এলেন। একটাই বড় চাঁচ। একজায়গা থেকেই দুজনে খেলাম। বেশ আনন্দ লাগছিল। ছোটো থেকে দুঃখ ছিল, দিদি পাইনি বলে। বেশ মনে আছে, মাকে ছোটবেলায় বলতাম, ‘একটা দিদি দিতে পারলে না!’ … ঈশ্বর দিদি দিয়ে দিলেন।
