দ্বিতীয় পর্ব – ইন্টারোগেশন রুম
দিদির পিছুপিছু আমিও ঢুকলাম ইন্টারোগেশন রুমে। ঘরে ঢুকে দেখলাম, সুদিপ্তা মুহুর্মুহু চোখের জল মুছছে। যত সব ন্যাকামো! এটাই আমার মনে চলা কথা ছিল।
দিদি সুদিপ্তার সামনে বসে নিজের জিনসের সার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে বললেন, “খুব কাছের বন্ধু ছিল বিদিপ্তা!”
সুদিপ্তা উত্তরে অত্যন্ত গম্ভীর ভাবে বলল, “বিদিপ্তা আমার নিজের মাসির মেয়ে ছিল, আমরা এক সাথে বেড়ে উঠেছি, আর বলতে গেলে সে আমার থেকে বেশি ম্যাচিওর, আর তাই আমার বুদ্ধিদাতা ছিল। তাই ম্যাডাম, বন্ধুর থেকে অনেক বেশি কিছু ছিল সে আমার জন্য”।
দিদি এবার শোকস্তব্ধ কারুকে সান্ত্বনা দেবার মত করেই বললেন, “খুনের দিনে তুমি কলেজ গেছিলে?”
সুদিপ্তা উত্তরে বললেন, “না, যদি যেতাম, হয় বিদিপ্তার এই হাল হতো না, নয় আমরা দুইজনেই মরতাম। কাছাকাছি থাকলে, আমরা কেউ কারুকে ছেড়ে কখনো যাইনা। … আমার খুব অবাক লাগছে এটা ভেবে যে, বিদিপ্তা একা ওয়াসরুমে কি করছিল। লেডিস টয়লেট, তাই ঢুকতে হয়তো পারতো না, কিন্তু বাইরে তো প্রান্তিকের অপেক্ষা করার কথা। একসাথেই ওরা বাড়ি ফেরে সাধারণত”।
দিদি এবার প্রশ্ন করলেন, “প্রান্তিক কে?”
সুদিপ্তা উত্তরে বললেন, “বিদিপ্তার বয়ফ্রেন্ড। বিদিপ্তার ওর প্রপোজালে হ্যাঁ করার পর থেকে সবসময়ে বিদিপ্তার সাথে লেপটে থাকে প্রান্তিক। প্রান্তিক সিনহা”।
আমার মাথায় ঢুকছে না, দিদি এতো প্রশ্ন করছে কেন সুদিপ্তাকে! সিসিটিভিতে ওকেই দেখা গেছে, তাই সরাসরি কাস্টডিতে নিলেই তো হয়!
আমাকে আরো বিচলিত করে দিদি আবার প্রশ্ন করলেন সুদিপ্তাকে, “প্রান্তিকের সাথে কতদিনের সম্পর্ক বিদিপ্তার!”
সুদিপ্তা উত্তরে বলল, “এক বছর। ইন ফ্যাক্ট, এই ভ্যালেন্টাইনস্ ডে তে এক বছর হবে”।
দিদি প্রশ্ন করলেন, “এর আগে বিদিপ্তার বা প্রান্তিকের কনো এফেয়ার!”
সুদিপ্তা উত্তরে বললেন, “প্রান্তিকের ব্যাপারটা বলতে পারবো না। প্রান্তিক এই শহরের ছেলে নয়। বর্ধমানের ছেলে। তাই ওর কনো পাস্ট হিস্ট্রি আছে কিনা, আমাদের কারুর জানা নেই। যা জানি, ওর মুখ থেকেই জানি। আর ওর কথা মত, ও দুজনকে প্রপোজাল দিয়েছিল স্কুলে থাকতে, দুইজনেই রিজেক্ট করে দিয়েছে, এঁদের মধ্যে আবার একজন ওর প্রাইভেট টিউশনের টিচার ছিলেন।
বিদিপ্তার আগে কনো এফেয়ার ছিলনা। তবে হ্যাঁ, বরাবর ওর একজনকে খুব পছন্দ ছিল। সত্যি বলতে, সে কনো রকম সারা না দেবার জন্য, বাধ্য হয়েই প্রান্তিককে হ্যাঁ বলে বিদিপ্তা। আসলে অর্ণবকেই ওর পছন্দ। … মানে কাল যদি অর্ণব এসে ওর সাথে গাঁটছড়া বাঁধার চেষ্টা করে, তাহলে প্রান্তিককে ডিচ করে, অর্ণবের সাথেই সম্বন্ধে জরিয়ে যাবে বিদিপ্তা”।
দিদি গম্ভীর ভাবে মাথা নাড়িয়ে বললেন, “এই অর্ণবটা কে?”
সুদিপ্তা দিদির চোখে চোখ রেখে বলল, “আমাদের বন্ধু। খুব কাছের বন্ধু। স্কুল থেকে, আমি বিদিপ্তা আর অর্ণব, এঁরা গলায়গলায় বন্ধু। … অর্ণব আমাদের কলেজে, আমাদের ক্লাসেই পড়ে। আমাদের ক্লাসের বেস্ট স্টুডেন্টদের মধ্যে একজন। অত্যন্ত মেধাবী, সুদর্শন, এবং বুদ্ধিমান ছেলে”।
সুদিপ্তাকে আবার প্রশ্ন করলেন দিদি, “তাহলে প্রান্তিকই কেন অপেক্ষা করতো বিদিপ্তার জন্য! অর্ণবও তো অপেক্ষা করতে পারতো!”
সুদিপ্তা বলল, “না, কাল অর্ণব কলেজ আসেনি। আসলে, ওর বাবামা সেমিনারের জন্য বিদেশে গেছে। আজ ফিরবে। … এবার ব্যাপার এই যে, আমরা ওর বাড়িতে এই শেষ ৫ দিন খুব পার্টি করেছি। বাবামা এলে কেস খেয়ে যাবে। তাই ও বাড়ি সাফ করার জন্য কাল কলেজ আসবে না, বলে দিয়েছিল”।
দিদি মাথা নেড়ে বললেন, “হুম, … প্রান্তিক এসেছিল কলেজ?”
সুদিপ্তা বলল, “হ্যাঁ এসেছিল, আমাকে এনিভারসারির উইশ করার জন্য, বিদিপ্তা আর প্রান্তিক মিলে আমাকে ভিডিও কল করেছিল এই দুপুর ১টা নাগাদ, কলেজের রুম থেকেই”।
দিদি ভ্রু কুঁচকে বলল, “এনিভারসারি!”
সুদিপ্তা উত্তরে এবার একটু লজ্জার সুরেই বলল, “আমার বয়ফ্রেন্ড, রঞ্জকের সাথে আমার ৫ বছরের এনিভারসারি ছিল কাল। সেই জন্যই কাল সারাদিন ওর সাথে ছিলাম। কলেজ যাইনি”।
দিদির শেষ প্রশ্ন, “প্রান্তিক বর্ধমানের কোন স্কুলে পরতো, জানা আছে?”
সুদিপ্তা উত্তরে বলল, “বর্ধমান টাউন স্কুল”।
দিদি সিট ছেড়ে উঠতে উঠতে প্রশ্ন করলেন, “আর তোমরা?”
সুদিপ্তার উত্তর, “এলিট”।
দিদি এবার একটা মুচকি হেসে বললেন, “তোমাকে এখানে কেন ডাকা হয়েছে জানো?”
সুদিপ্তা দিদির দিকে তাকিয়ে বললেন, “জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। বিদিপ্তার সব থেকে ঘনিষ্ঠ তো আমিই। সত্যিই আমি ওর সব থেকে ঘনিষ্ঠ, মাসিমনি আর মেসমশাইএর থেকেও। কেমন একটা দমফাটা অবস্থায় রয়েছি যেন আমি। জ্ঞান হওয়া থেকে কখনো বিদিপ্তা নেই, এমন কন্ডিশনের কথা ভাবতেও পারতাম না। জানেন ম্যাডাম, রঞ্জক আর প্রান্তিককে রাজিও করেছিলাম যাতে, একটা বড় ৪ বিএইচকে এপার্টমেন্ট একসাথে ওরা কেনে, আর আমরা দুই বোন বিয়ে করে একসাথে থাকবো। আমরা দুজন আলাদা থাকতে পারিনা। …
আজ শুধু হতাশ লাগছে। আগামীদিনগুলোতে বিদিপ্তা ছাড়া কি করে থাকবো, জানি না। বড় একা হয়ে গেলাম জানেন। … বিদিপ্তা ছিল, তাই কনো নতুন বন্ধু করার চেষ্টাও কনোদিন করিনি”।
দিদি মাথা নেড়ে, সুদিপ্তার কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “সময় সব ঠিক করে দেবে। … আচ্ছা, অর্ণবের গার্লফ্রেন্ড নেই কনো?”
সুদিপ্তা বলল, “ঠিক গার্লফ্রেন্ড নয়, একটা মেয়ে আছে, নাম রঞ্জাবতী মুখুজ্জে। রঞ্জা আমাদের সাথেই এলিটে পড়তো, এখন এইচআইটিতে পড়ে। ওর পিছনে অর্ণব খুব ঘুরঘুর করে। তবে মেয়েটাও পাত্তা দেয়না, আর অর্ণবও পিছু ছাড়েনা। … অর্ণব রঞ্জার দিকে আকৃষ্ট না থাকলে, বিদিপ্তা ওকে প্রপোজাল দিয়েই দিতো। কিন্তু, একদিকে আকৃষ্ট, আর অর্ণব আমাদের খুব কাছের বন্ধু। তাই…”।
দিদি বললেন, “হুম বুঝলাম। তুমি এখন এসো। আমরা তোমাকে কোথায় ড্রপ করবো, বাড়িতে নাকি কলেজে?”
সুদিপ্তা উত্তরে বলল, “বিদিপ্তার বডি পোস্ট মরটেম থেকে ছেড়েছে!”
দিদি উত্তরে বলল, “সরাসরি বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বডি”, আমার দিকে তাকাতে, আমি বললাম, “দিদি, পোস্ট মরটেম হয়ে গেছে, এবার ফেরানো হবে বডি”।
সুদিপ্তা বলল, “তাহলে আমাকে বাড়িতেই ছেড়ে দিন, শেষবার বিদিপ্তাকে দেখবো”।
দিদি মাথা নেড়ে বললেন, “ঠিক আছে চলো। তোমার বাড়ির লোকের সাথে আলাপটাও করে নিতে হবে। আজ জিজ্ঞাসাবাদ করবো না তাদেরকে। কাল গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবো”।
সুদিপ্তা এবার কান্নায় ভেঙে পরে বলল, “শত্রু থাকলে আমার থাকতে পারতো, কারণ রঞ্জকের সাথে সাথে আমি অনেককে মাঝে ঘুরিয়েছি। বিদিপ্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের। সব দিকেই ও এভারেজ। ওর কনো শত্রু ছিলনা, থাকতে পারেনা ম্যাডাম। আমার মনে হয়, খুন আমাকেই করতে চেয়েছিল। নাহলে বিদিপ্তাকে কেউ কেন! …”
দিদি ওকে সান্ত্বনা দিয়ে, গাড়িতে তুলে, ওর বাড়ির সামনে নামিয়ে, বাড়ির লোকদের সাথে আলাপ করে এলেন। বডি এলো বিদিপ্তার, সেটা হ্যান্ডওভার করে, আমরা সেখান থেকে বিদায় নেবার কালে, দিদি গাড়িতে উঠে আমাকে বললেন, “বর্ধমান টাউন স্কুল থেকে পাসআউট প্রান্তিকের ঠিকুজিকুষ্ঠি আমার লাগবে। আর সাথে সাথে, এঁদের এলিটস্কুলের ব্যাচের সমস্ত স্টুডেন্টের বর্তমান অবস্থান, আর নিজেদের মধ্যে কেমিস্ট্রি জানতে হবে। এই দুই ব্যবস্থা করো অনিল”।
আমি দিদির কথা নোট করে নিয়ে বললাম, “একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো দিদি, মানে ম্যাডাম!”
দিদি উত্তরে বলল, “দিদি নামটাই তো বেশ, আবার ম্যাডাম কেন! দিদি বললে, আপন আপন লাগে। … হ্যাঁ, তোমার প্রশ্ন। প্রথম কথা, সিসিটিভিতে যেই সুদিপ্তাকে দেখেছিলে, তার হাইট কতো?”
আমি বললাম, “৫ ফুট ৮ ইঞ্চি”।
দিদি আবার বললেন, “আর বাস্তবে সুদিপ্তাকে দেখলে। হাইট কতো?”
আমি উত্তরে বললাম, “৫ ফুট ২ ইঞ্চি”।
দিদি মাথা নেড়ে, একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, “হয় আততায়ী সুদিপ্তাকে ফ্রেম করার চেষ্টা করছে, নয় সুদিপ্তা আমাদের কনফিউজ করার জন্য পায়ের তলায় এমন কিছু লাগিয়েছিল, যাতে ওকে ৫ফুট ৮ ইঞ্চি লাগে। দুটোর মধ্যে কোনটা, কনফার্ম হবার আগে সিসিটিভিতে কি দেখা গেছে, আর আমরা কাকে সন্দেহ করছি, সেটা বলে দেওয়া মানে আততায়ীকে সতর্ক করে দেওয়া।
অনিল, গোয়েন্দা বই লেখা আর গোয়েন্দার কাজ করার মধ্যে একটা বিশাল পার্থক্য আছে জানো। … গোয়েন্দা বই যে লেখে, সে দেখায় গোয়েন্দা প্রকাশ্যে সকলকে সন্দেহ করছে। আর সেটা কেন করে জানো? কারণ সে হয় প্রাইভেট ডিটেকটিভ। এর মানে বোঝো?”
আমি না বলতে দিদি হেসে বললেন, “প্রাইভেট ডিটেকটিভের সাথে কনো স্পেশাল টাস্ক ফোর্শ থাকেনা। তাই আততায়ী তাকে পাত্তাই দেয়না। আর তাই যখন আততায়ী দেখে যে তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে, তখন হয় প্রাইভেট ডিটেকটিভকে হুমকি দেয়, নয় তার প্রাণনাশের প্রয়াস করে। আর সেই ভাবে ডিটেকটিভের কাছে ক্লূ এসে যায়। … কিন্তু আমাদের ব্যাপারটা অন্য। আমরা সরকারি ডিটেকটিভ। আমাদেরকে ভয় দেখিয়ে পার পাওয়া যায়না, আমাদের ক্ষতি ততক্ষণ করা যায়না, যতক্ষণ না আততায়ী একজন গাংস্টার হয়। … তাই আমরা যদি কারুকে সন্দেহ করছি বলি, সে আমাদের ক্লূ দেবেনা, বরং সমস্ত ক্লু মুছে ফেলবে, আর আমাদের তদন্তকে আরো কঠিন করে দেবে”।
আমি আর কথা বললাম না। বুঝলাম দিদি অত্যন্ত বিচক্ষণ, আর শুধু পেশাগত ভাবে নয়, স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই তিনি গোয়েন্দা। ভরসা জাগলো প্রথমবার দিদির প্রতি। কাজটা ইনি বেশ ভালো ভাবেই জানেন, এটা বলা ভুল হবে, কারণ কাজ প্রায় সকলেই জানেন, ইনি কাজটা নিষ্ঠা আর মনোযোগ দিয়ে করেন। মস্তিষ্ক ইনার সঠিক দিশায় চলে, আর ইনি তা চলতে দেন।
বেশ বুঝতে পারলাম যে, এরকম একটা মামুলী খুনের কেসেও যদি ইনার মাথা এইভাবে চলে, তাহলে হেভি হয়েট কেসে, কেন ইনি অনেকের মাথাব্যাথার কারণ হবেন না। ভালোই বুঝতে পারলাম কেন ইনাকে উচ্চপদে কেউ দেখতে চান না, না ডিপার্টমেন্টের মধ্যের লোক, আর না ডিপার্টমেন্টের বাইরের লোক।
এইসবই সাতপাঁচ ভাবছিলাম। দিদির কথাতে ঘোরটা কেটে গেল। দিদি একপ্রকার হাঁকড়ানি দিয়েই বলে উঠলেন, “অনিল! … অনিল!”
আমি চমকে উঠেই বললাম, “হ্যাঁ দিদি!”
দিদি উত্তরে বললাম, “ঠিকুজি কুষ্ঠির পিছনে লেগে পরো, আর দেরি করো না। … আচ্ছা, ফরেনসিক মার্ডার অয়েপন সম্বন্ধে কি বলেছে!”
আমি বললাম, “ধারালো আর শক্তিশালী কনো অস্ত্র। মোস্ট প্রবাব্লি, পাঠার মাংস কাটার অস্ত্র, এমনই এক্সপার্ট বলছে”।
দিদি উত্তরে বললেন, “হুম, ওজন ভালোই হয়, আর ধার খুব। আর আরো বড় কথা এই যে, আততায়ী একবারই চালিয়েছে অস্ত্রটা, মানে অভ্যস্ত অস্ত্রটা চালানোতে। … অনিল, তুমি বিদিপ্তার বাবামায়ের প্রোফাইলটাও একটু দেখো। কি করেন ভদ্রলোক, আর তাঁর কনো তেমন শত্রু থাকতে পারে কিনা, যে তাঁর কন্যাকে এমন ভাবে হত্যা করতে পারে। এই দিকের ইনফরমেশনও কালেক্ট করো অনিল”।
আমি বললাম, “মানে অন্য আরো একটা দিক থাকতে পারে, বলছেন!”
দিদি মাথা নেড়ে বললেন, “বন্ধুদের মধ্যে কেউ ভারা করা গুন্ডা আনবে না নিশ্চয়ই। অর্থাৎ বন্ধু মহলের কেউ যদি খুনটা করে থাকে, তাহলে সে নিজেই করেছে। প্রথমত সুদিপ্তার কথা অনুসারে, বিদিপ্তাকে বন্ধু মহলের কেউ খুন করতে পারে, এই সন্দেহ অত্যন্ত ক্ষীণ থেকে যাচ্ছে। আর তা ছাড়া, মাংস কাটার অস্ত্রে পারদর্শীতা তাদের কারুর কি করে থাকা সম্ভব! … তাই এমন তো হতেই পারে যে, বাবা বা মায়ের দিকের কেউ শত্রু আছে! হতে পারে কি না! … তাঁর পক্ষেই ভারা করা গুন্ডা দিয়ে এমন খুন করানো যেতে পারে। আর পুরো কেসটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেবার জন্য কলেজের বাথরুম বেছে নেওয়া, আর সুদিপ্তার এমন অদ্ভুত ছদ্মবেশ”।
আমি বললাম, “আপনি সিওর যে আততায়ী সুদিপ্তা নয়!”
দিদি পকেট থেকে একটা কিং সাইজ গোল্ডফ্লেক বার করে জ্বালিয়ে আমাকে একটা দিলেন। দিদি নিজে দিচ্ছেন, তাই স্বাচ্ছন্দেই নিলাম আর জ্বালালাম। দিদি বললেন, “হুম, একপ্রকার সিওর। কারণ সিসিটিভিতে যে ছিল, সে না তো কেবল উচ্চতায় ৫ ইঞ্চি বড় সুদিপ্তার থেকে, আকারেও সুদিপ্তার থেকে বেশ মোটা। বিশেষ করে, ব্রেস্টের সাইজটা সিসিটিভির চরিত্রের প্রায় ৪৪, আর সেখানে সুদিপ্তার ৩৪। অর্থাৎ, হয় কনো মোটা লম্বা মেয়ে, সুদিপ্তার মুখোসের আড়ালে রয়েছে, নয় হতে পারে কনো পুরুষ। আমার মনে আততায়ী কনো পুরুষই, বুচার”।
একটু থেমে বললেন, “তোমাকে যা যা বললাম, সেই খবর গুলো তাড়াতাড়ি নাও। প্রান্তিকের খবর, আর বিদিপ্তার বাবা মায়ের খবর”।
আমি বললাম, “হুম, নিয়ে নিচ্ছি। বর্ধমানেরটা তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবো। আগে যেখানে পোস্টিং ছিলাম, সেখানের আমার কলিগ, নাম শঙ্খ রায়, এখন বর্ধমানের ক্রাইম ব্রাঞ্চে পোস্টিং। আজ রাত বা কাল সকালের মধ্যেই সমস্ত খবর দিয়ে দেবে। আমি জানিয়ে দিয়েছি ওকে। … বিদিপ্তার বাবামায়ের দিকটা দেখছি। … আচ্ছা দিদি, প্রান্তিকের উপর তোমার সন্দেহ গেল কেন?”
আপনি থেকে তুমিতে চলে এসেছিলাম নিজের অজ্ঞানতোই। দিদিকে বেশ বিশ্বাস হচ্ছিল। দিদিও দেখলাম নোটিস করলো না, নাকি নোটিস করেও করতে চাইলো না। তাই অনায়সেই বললেন, “চারজন একসাথেই থাকে প্রায়। প্রান্তিক, সুদিপ্তা, বিদিপ্তা, আর অর্ণব। এঁদের মধ্যে সুদিপ্তা নেই, অর্ণব নেই। পরে রইল প্রান্তিক। সে নিজের গার্লফ্রেন্ডের জন্য অপেক্ষা করবেনা!”
আমি বললাম, “লেডিজ টয়লেট, তাই হতেও তো পারে অপেক্ষা করে করে চলে গেছে!”
দিদি বললেন, “আবার এটাও তো হতে পারে যে, আততায়ী সে নিজেই! … হুম দেখছি, তুমি আগে খবরটা আনো। প্রান্তিক, রঞ্জক আর অর্ণবকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই হবে। তার আগে কিছু তথ্য হাতে থাকাটা আবশ্যক। নাহলে যে আততায়ী নয়, তাকে বারবার ডেকে এনে হ্যারাস করার কনো মানে হয়না”।
আমি বেড়িয়ে পরলাম, বিদিপ্তার বাবামায়ের সন্ধান পেতে। প্রান্তিকের খবর সন্ধ্যা ৮টার মধ্যেই পেয়ে গেছিলাম। বিদিপ্তার বাবা মায়ের খবর পেয়েছি রাত্রে, এই ৩টে নাগাদ হোয়াটসআপে মেসেজ আসে। পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙলো, দিদির ফোনে।
দিদি বলল, “গুড মর্নিং, কিছু তথ্য পেলে!”
আমি বললাম, “হ্যাঁ দিদি, দুইদিক থেকেই চাঞ্চল্যকর তথ্য পেলাম। অফিসে গিয়ে বলছি”।
দিদি উত্তরে বললেন, “সরাসরি আমার ফ্ল্যাটে চলে এসো। প্রান্তিককে ১১টার সময়ে, অর্ণবকে ১টার সময়ে, রঞ্জককে ৩টের সময়ে, আর বিদিপ্তার বাবামাকে বিকেল ৫টার সময়ে ইন্টারোগেশনের জন্য ডেকেছি। পুলিশের গাড়িতে করে তাদেরকে নিয়ে আসবে। তার আগে, আমাদের হোমওয়ার্কটা করে নিতে হবে। তাই চলে এসো। এখানে এসেই চা খাবে”।
এর আগে আমাকে এই ভাবে কেউ ডাকেনি। এক তো ডেকেছে, তার উপর আবার মহিলা। কেমন যেন মনের ভিতর একটা কুণ্ঠা হচ্ছিল। একটু ভয়ে ভয়েই গেলাম। বাইক নিয়ে থামতে, দিদি ব্যালকনিতে বেড়িয়ে এসে বললেন, “গ্যারেজে বলা আছে। বাইক পারকিং করে উপরে চলে এসো। চা ব্রেকফাস্ট রেডি আছে”।
যেমন দিদি বললেন, তেমনই লক্ষ্মীছেলের মত করে উপরে, সেকেন্ডফ্লোরে গেলাম। কলিং বেল বাজাতে হলো না। দরজা খোলাই ছিল। দিদি হাঁক পেরে বললেন, “ভিতরে ঢুকে দরজাটা লক করে এসো”।
আমি এবার একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। আড়ষ্ট হয়েই ভিতরের দিকে যেতে, ডিনার টেবিলের সামনে দিদি একটা ওড়না ছাড়া কুর্তি আর সিক্স পকেট পরে ব্রেডে বাটার মাখিয়ে মরিচ ছড়াতে ছড়াতে ঠিক বাদিকের একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন, “হুম বসো। ব্রেকফাস্ট করা হয়নি তো!”
আমি বললাম, “না আসলে। …”
দিদি বললেন, “হুম, লেট রাইজার। নাও, তোমার ব্রেকফাস্টও করেছি। চা ব্রেকফাস্ট করে নাও। ব্রেকফাস্ট করতে করতে হোমওয়ার্কটা সেরে ফেলা যাক”।
আমি বললাম, “আপনি একাএকাই করেন! … মানে কনো কাজের লোক রাখেন নি!”
দিদি বললেন, “না, আমাদের কাজে কনো টাইমের ঠিক থাকে! … যাই হোক, বসো। … আরে বসো, দাঁড়িয়ে রইলে কেন!”
আমি একটু ইতস্তত করছি দেখে দিদি বললেন, “আমি তোমার থেকে অনেকটাই বয়সে বড় অনিল। কাজেই আশা করি যে কেবল সম্বোধনের জন্য দিদি বলে ডাকো না আমাকে!”
এই কথাটা সত্যই খুব গায়ে লাগার মত ছিল। মানে আমার লজ্জাই লেগেছিল কথাটা শুনে। আমি কিন্তু কিন্তু করে বললাম, “না না, অন্য ভাবে নেবেন না! আসলে অনেক রকম শুনেছি তো”।
দিদি বললেন, “কাল তো বেশ তুমিতে চলে গেছিলে। আজ আবার আপনিতে ফিরে এলে!”
বেশ বুঝলাম, অত্যন্ত বিচক্ষণ মহিলা। সমস্ত কথার উপর উনার নজর থাকে সর্বক্ষণ। আর কিছু বললাম না। সরাসরি চেয়ারে বসে পরে বললাম, “প্রান্তিকের বাবা একজন বুচার”।
দিদি বললেন, “হুম জানি, সুদিপ্তার থেকে অলরেডি জেনেছি এই তথ্য। অর্ণবের বাবা মা দুজনেই মেকআপ আর্টিস্ট। বলিউড নয়, হলিউডেও কাজ করে। রঞ্জকের বাবা একজন রেশন ডিলার, আর মা হাউজ ওয়াইফ। আর বিদিপ্তার বাবা এক্সপোর্টের ব্যবসা করে, বিফ এক্সপোর্ট করে”।
আমি বললাম, “উড়ি বাবা। সমস্ত তথ্য কি সুদিপ্তার থেকেই …”
দিদি মাথা নাড়িয়ে পাউরুটির মধ্যে ডিমের অমলেটটা হাতে করেই সাজাতে সাজাতে বললেন, “হ্যাঁ। তুমি আর কিছু অন্য তথ্য পেলে?”
আমি বললাম, “প্রান্তিকের বাবার মাঝে একটা বিশাল লস হয়েছে। কনো একটা বড় ডিল চলে গেছে হাত থেকে। আর বিদিপ্তার বাবাকে প্রান্তিকের বাবা চেনে”।
দিদি বললেন, “আর সেই সুত্রেই বিদিপ্তার সাথে প্রান্তিকের আলাপ। প্রান্তিকের আলাপ বিদিপ্তার সাথে, প্রান্তিকের বড়দাদা, সাগ্নিকের তিন বছর আগের বিয়ের সময় থেকে”।
আমি মুচকি হেসে বললাম, “এতো তথ্য আমি সংগ্রহ করতে পারিনি দিদি”।
দিদি আমার চোখের দিকে লক্ষ রেখে বললেন, “ধরে নাও, বিদিপ্তার বাবা একটা ডিল প্রান্তিকের বাবার সাথে করেও, শেষ মুহূর্তে সেটা ক্যান্সেল করে দিলো, আর তাতে প্রান্তিকের বাবা বড়সড় লস খেলো। তার জন্য কি, মেয়ের প্রাণ নিয়ে নেওয়া সম্ভব!”
আমি মাথা নামিয়ে খানিক চিন্তা করে বললাম, “তাও আবার হবু বউমার! … কিন্তু যদি এমন হয়ও, তারপরেও সুদিপ্তার ছদ্মবেশ কেন! ওকে ফ্রেম করার প্রচেষ্টা করা কেন? শুধুই কি কেসটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেবার জন্য!”
দিদি মাথা নাড়িয়ে খাবার খেতে খেতে বললেন, “হুম, মেয়ের প্রাণ নেওয়া কেন? লস যাওয়ার সাথে প্রাণ নেওয়ার কি সম্পর্ক!… হিসেব মিলছে না অনিল, হিসেব মিলছে না!”
খানিক থেমে, মন দিয়ে ব্রেড অমলেট শেষ করলেন দিদি। তারপর চায়ে বেশ কিছুবার চুমুক দিয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ, শোনো, প্রান্তিক, অর্ণব আর রঞ্জককে পুলিশের গাড়ি করে সরাসরি ইন্টারোগেশন রুমে নিয়ে আসবে। আর আমি তুমি ছাড়া কেউ থাকবেনা, জেরার সময়ে। অন্যদিকে, বিদিপ্তার বাবামাকে, আমার গাড়ি করে নিয়ে আসবে এখানে, মানে আমার বাড়িতে। ঠিক আছে। ডট ৫টায়। আমার থেকে চাবিটা তখন নিয়ে নেবে বাড়ির। আমি পরে এসে ঢুকবো, তুমি আগে ওদের নিয়ে চলে আসবে।
রাত্রে ওদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে, আমি এড্রেস দিচ্ছি, ব্যান্ডেলের একটা লজের। সেখানে চলে যাবে গাড়ি নিয়ে, আর প্রান্তিকের বাবাকে ওখান থেকে নিয়ে আসবে। আর জিজ্ঞাসাবাদের পর আমি তোমার সাথে যাবো। উনাকে উনার লজে আর তোমাকে তোমার বাড়িতে ড্রপ করে, আমি ফিরে আসবো”।
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, “ডিপার্টমেন্টে জেরা করবেন না!”
দিদি বললেন, “ইনফ্লুয়েন্সিয়াল লোকদের ডিপার্টমেন্টে সবসময়ে চর থাকে, জানো কি! … যদি ইনফ্লুয়েন্সের ব্যবহার করে এই খুন হয়ে থাকে, তাহলে ডিপার্টমেন্টের চরের থেকে খবর পেয়ে গিয়ে, কালকেই এই ইনভেস্টিগেশনের স্টে অর্ডার চলে আসবে। … একটি মেয়ে কলেজের মধ্যে অঘরে প্রাণ হারালো। এই ভাবে ইনভেস্টিগেশনের মধ্যে জল ঢেলে দিতে পারবো না। … তাই, যাদের সাথে ইনফ্লুয়েন্স থাকতে পারে, তাদেরকে কি ভাবে জেরা করা হচ্ছে, সেটা ডিপার্টমেন্টের কারুকে জানতে দিতে চাইনা”।
আমি হেসে বললাম, “দিদি, আপনি কিন্তু খুব এফিসিয়েন্ট, আর বোধহয় সেই কারণেই আপনাকে উঁচুতে উঠতে দেওয়া হয়না। অনেকের অনেক বিপদ হয়ে যাবে তাতে”।
দিদি মুচকি হাসি হেসে দিয়ে বললেন, “১২ বছর হয়ে গেছে অনিল, চাকরিতে রয়েছি। … মালদায় পোস্টিং ছিলাম, তারপরে হাওড়ায়, তারপর কাকদ্বীপের পর লালবাজার হয়ে এখন এখানে। বছরে, তিন থেকে চারটে নেমন্ত্রন পাই জানো। কারুর বিয়েতে, কারুর অন্নপ্রাশনে, কারুর আবার শ্রাদ্ধে। … সকলেই সাধারণ মানুষ। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তও আছে। … উঁচু পোস্টের থেকে এই ভালোবাসা আর ভরসাটা অনেক বড় পাওনা। বিয়ে থাওয়া আমি করিনি, আর করবোও না। তাই বড় পোস্ট, বেশি টাকার পেনশন, এসব নিয়ে কি করবো আমি! … যা উপার্জন আছে, তাই থেকে যা সেভিংস হয়, সেই দিয়ে বুড়ি বয়সে একটা বিশ্বস্ত লোক রেখে দেব। ব্যাস …”।
আমি বললাম, “বিয়ে থাওয়া করবেন না কেন? এখন তো বেশি বয়সেও মেয়েরা বিয়ে করছে!”
দিদি হেসে বললেন, “কলেজে পড়তে প্রেম করতাম। অর্ধেন্দু সমাদ্দার। এখন একজন বারজার প্যান্টসের বড় ডিলার। বাবার ব্যবসা ছিল, বড় করেছে। যখন পুলিশ ট্রেনিং স্কুলে গেলাম, তখন প্রথম আপত্তি আসে, মূলত অর্ধেন্দুর বাড়ি থেকেই। তারপর যখন পুলিশে চাকরি পেলাম, তখন আমার বাড়িতে এসে বাবাকে শাসিয়ে গেলেন অর্ধেন্দুর বাবা। বাবা সেই শাসানি সহ্য করতে না পেরে হার্ট অ্যাটাকে দেহ রাখলেন। …
বাৎসরিক হতে, একমাত্র ছোটো বোনের বিয়ে দিলাম। স্বামী কগ্নিজেন্টে ম্যানেজার। পরে, যখন ক্রাইম ব্রাঞ্চে পোস্টিং হলো, তখন মালদার কওয়ারটারে একাকী মা’কে নিয়ে গেলাম। সেখানে গিয়ে আততায়ীদের থেকে বেশি উচ্চপদস্থ অফিসারদের হুমকি আসা শুরু হলো। এবার মা বললেন, চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করার কথা।
ভেবেওছিলাম একবার। কিন্তু জানতে পারলাম অর্ধেন্দুর বাবা অর্ধেন্দুর বিয়ে ঠিক করে দিয়েছে। মাস ছয়েক পরেই বিয়ে। ওর ওখানেই, মানে শিলিগুড়িতেই। … আমার বাড়ি শিলিগুড়িতেই। … তারপর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই যে, না আর চাকরি ছাড়বো না। যখন এই চাকরি আমার থেকে সমস্ত কিছু কেড়েই নিলো, তখন এই চাকরিকেই নিজের সর্বস্ব করে নেব। …
বোনের বর কানাডাতে পোস্টিং পেল। বোনকে নিয়ে সেখানে চলে যাবে। এবার মা বেকে বসলেন। শিলিগুড়ির বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে, আমাকে খানিক সম্পত্তির টাকা দিয়ে আমার সাথে সম্পর্ক মিটিয়ে বোনের সাথে কানাডা চলে যাবেন, এই সিদ্ধান্ত নিলাম। বাঁধা দিলাম না। শুধু সম্পত্তির টাকাটা আর নিইনি। তাও প্রায় ৮ বছর হয়ে গেছে। কনো যোগাযোগ নেই। মা বোন যেই মোবাইল নম্বরটা জানতো, সেটা ডোকোমোর ছিল। তাই পোর্ট করে সেটাকে বিএসএনএল করে রেখে দিয়েছি, নম্বরটা নষ্ট করিনি। কনোদিন যদি প্রয়োজন পরে, ফোন করে। যাই হোক, ঈশ্বরের তাঁদের প্রতি কৃপা রয়েছে। তাই এই ৮ বছরে আমাকে কখনো প্রয়োজন পরেনি। আর তাই কলও করেনি”।
আমি বললাম, “অর্ধেন্দু ছাড়া আর কি কনো ছেলে ছিল না! অন্য কারুকে বিয়ে করে নিতেন!”
দিদি হেসে বললেন, “যেখানে নিজের জন্মদাত্রী আর সহোদরাই ভরসা রাখতে পারেনি, সেখানে অন্য কারুর কাছে যাওয়া মানে কি জানো তো! … একটা বিশ্রী পিছুটান। কোন আততায়ীর আক্রোশ থাকবে, বা কোন উচ্চপদস্থ অফিসারের পিছনে বাঁশ লাগবে, আমাকে ছেড়ে, আমার শ্বশুরবাড়ি, স্বামী, সন্তানের পিছনে ছুটবে, আর আমাকে ব্ল্যাকমেল করবে। … ঠিক আছি এমনি। স্ত্রী হবার জন্য উলমালা ভাব, ওই যৌবনের প্রথমদিকটা একটু ছিল। … তবে মা হতে পারার ইচ্ছাটা রয়ে গেছে। … শিলিগুড়ির কাছে, ময়নাগুরিতে আমার একটা বান্ধবী অকালে বিধবা হবার পর, একটা অনাথ আশ্রম চালায়। ছুটিছাটা পেলে সেখানে যাই। শিশুগুলির আলিঙ্গন মমতাকে বাঁচিয়ে রাখে হৃদয়ে। ওই, দুধের সাধ ঘোলে মেটানো”।
দিদির কথা শুনে খুব ভালো লাগলো। এতো কিছুর পরেও, হৃদয় থেকে মাতৃত্বভাব যায়নি। একজন প্রকৃত স্ত্রী। … খানিকটা ভাবুক হয়ে গেছিলাম। দিদির কথাতেই ফিরে এলাম। দিদি বললেন, “দেখো, তোমার যদি গার্লফ্রেন্ড থাকে টাকে, আগে ভাগে বিয়ে করে নিও। পরে আবার বেঁকে বসবে!”
আমি হেসে বললাম, “না না, আমার কেউ নেই। বাবা কলেজে পড়তেই চলে গেলেন। তারপর থেকে মাও অসুস্থ হয়ে পরলেন। তাই অসুস্থ মায়ের সেবা করে করেই কাজ করি। হ্যাঁ, কাজের ভার বাড়ছে। তাই এবার একটা বিয়ে করতে হবে। গৃহবধূই চাইছি। তাহলে মাকে একটু দেখাশুনা করবে। গ্রামসাইডের মেয়ে হলে ভালো হয়। এখনকার শহরের মেয়েদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাটা অত্যধিক হয়ে উঠেছে”।
দিদি একটা ডুকরে হাসি দিয়ে বললেন, “মায়ের কি হয়েছে!”
আমি বললাম, “বাবা মারা যাবার পর মায়ের খুব মাথা ব্যাথা করতো। প্রথমে ভেবেছিলাম মাইগ্রেন জাতীয় কিছু। ৫ বছর পরে মাথা ঘুরে একদিন পরে যেতে, ডাক্তার দেখালাম আর জানলাম ব্রেন ক্যান্সার হয়েছে। এখন সেকেন্ড স্টেজ। … মায়ের ইচ্ছা, মৃত্যুর আগে নাতিপুতি দেখে যাবে। … তাই বিয়ের চিন্তা আমিও করছি”।
দিদি খানিক চুপ করে থেকে বললেন, “মা তোমার সাথেই তো পিপুলপাতির ভাড়াবাড়িতে থাকেন!”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, ফ্ল্যাট কিনতে পারি। কিন্তু বারবার ট্রান্সফার হবে, তাই না! … বৃদ্ধা অসুস্থ মাকে একা কি করে রেখে যাই বলো তো!”
দিদি বললেন, “হুম, গ্রামের মেয়ে বিয়ে করবে!… কত বয়স তোমার? … ৩০ না!”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। কনো পাত্রী জানা আছে?”
দিদি বললেন, “অজপারাগাঁয়ের নয় কিন্তু। উলুবেড়িয়ার মেয়ে। বাবার রেশনের দোকান ছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলকে পর্যাপ্ত তোলা না দেওয়ার জন্য, বাবামা দুজনকেই কুপিয়ে খুন করেছিল। চরিত্র হননের প্রয়াস করলে, মেয়ে পালিয়ে থানায় চলে আসে। তখন আমি সেখানের ইনচার্জ ছিলাম। মেয়েটাকে নিজের কাছে রেখে, কেসটা মিটিয়ে, মেয়েটাকে, ওই বললাম না আমার এক বিধবা বান্ধবী কিছু অনাথ বাচ্চাকে মানুষ করে, তার কাছে রেখে আসি।
মেয়ে গ্র্যাজুয়েট। ঠিক চাকরি করেনা, তবে একটা বেতন পায়। বয়স এই ২৩ কি ২৪ হবে। দেখতে বেশ মিষ্টি। উচ্চতা এই ৫ ফুট ২ ইঞ্চি। ছিপছিপে গড়ন। বাবামায়ের মৃত্যু চোখের সামনে দেখে বেশ শকড্ হয়ে গিয়ে বেশ কিছু বছর একটা কথাও বলতো না। তবে এবারে যখন গেছিলাম দেখলাম, বাচ্চাদের সাথে থেকে থেকে, একটু হাসিখুশি হয়েছে। স্বভাব খুব সুন্দর। মার্জিত, পুরুষ দেখলে ছুকছুকুনি একদম নেই। গায়ের রং আমারই মত। আমারটা পুরোপুরি খোসা চারানো বাদামের মত, আর ওরটা এই আখরোটের মত হবে। তবে এখন শিলিগুড়ির কাছে থেকে তো, প্রায় আমার মতই গায়ের রং হয়ে এসেছে এখন”।
আমি হেসে বললাম, “মা না হয়েও, মা হয়ে বসে রয়েছ তুমি দিদি। মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ দিচ্ছ মনে হচ্ছে”।
দিদি হেসে বললেন, “হ্যাঁ সেরকমই বলতে পারো। আমি ওর কাছে মা’ই একরকম। কাছে গেলে, আর ফিরে আসার সময়ে, একবার করে ওর জরিয়ে ধরাটা খুব উপভোগ করি। যখন ও সম্পূর্ণ ভাবে চুপ করে গেছিল, তখনও ওই জরিয়ে ধরাটা ছিল। … প্রথম যখন দেখেছিলাম, মেয়েটা দৌড়ে দৌড়ে থানার দিকে আসছে, আর পিছনে কিছু গুন্ডাগোচের পুরুষ মেয়েটার দেহটাকে সম্ভোগ করার লালসা নিয়ে ছুটে আসছে, তখন চোখে জল চলে এসেছিল।
মেয়েটা আমাকে এসে কনো ম্যাডাম ট্যাডাম বলেনি। সরাসরি এসে বলেছিল, “আমার বাপমারে খুন কইরে, আমার ইসজত লুইটছে আইসে জানোয়ারগুলি। … ও পুলিসদিদি, আমারে বাঁচাও”। সেই সময়ে ওকে ভরসা দিতে যেই আলিঙ্গন আমি করেছিলাম, সেই একটিবারের আলিঙ্গনকে সে যখনই দেখা হয় তখনই আমাকে ফিরিয়ে দেয়। … হ্যাঁ বলতে পারো, আমার একরকম মেয়েই ও”।
আমি হেসে বললাম, “বেশ, এবার যখন তুমি যাবে ময়নাগুরি, তোমার সাথে মাকে নিয়ে যাবো। মায়ের যদি মেয়েটিকে পছন্দ হয়, তাহলে তাকেই বিয়ে করবো”।
দিদি হেসে বললেন, “হুম, তোমাকে দেখে বোঝা যায়, এখনো তোমার গোঁফে অন্যায়ের সাথে আপসের তা লাগেনি। তাই তোমাকে এই বিয়ের কথা বললাম”।
আমি হেসে বললাম, “বছর তিনেক আমাকে সঙ্গে রাখো দিদি। তাহলে দেখবে আর কনোদিনই গোঁফে সেই আপসের ভাব আসবে না। … আসলে কি জানো তো দিদি, কেরিয়ারের শুরুর দিকে, একটা নিষ্ঠাবান দায়িত্বশীল আর হৃদয়বাণ সিনিয়ারের সান্নিধ্যটা খুব প্রয়োজন। অভ্যাসটা ভালো হয়ে যায়। একবার অভ্যাস খারাপ হয়ে গেলে না, আর কি বলো তো… ওই খারাপ অভ্যাসটাতেই অভ্যাস হয়ে যায়”।
দিদি হেসে বললেন, “না, আর দেরি করো না। বাড়ি গিয়ে স্নানাদি করে, মাকে সমস্ত কিছু করিয়ে, অফিসের গাড়ি নিয়ে প্রান্তিকের কাছে বেড়িয়ে পরো। ডিআইজির অর্ডার প্রান্তিক, অর্ণব আর রঞ্জকের কাছে দিয়ে দিয়েছি অলরেডি”।
আমি উঠে দিদির ফ্ল্যাট থেকে বেড়িয়ে আসার সময়ে বললাম, “দিদি, একটা কথা বলছি, ছোটো ভাইয়ের কথা মনে করে ক্ষমা করে দিও। … তুমি কিন্তু এখনও দেখতে বেশ সুন্দরী আছো। … চাইলে এখনো কিন্তু তুমি বিয়ে করতে পারো”।
দিদি হেসে বললেন, “না, আর কনে সেজে লাভ নেই। দিদি হয়ে বেশ ভালো আছি”।
আমি ফিরে এলাম।
