বিসর্জনে কৈলাস | রোমাঞ্চ উপন্যাস

সেখানে গিয়ে, গৌরীর অবস্থা দেখার মতন হল। গৌরী আনন্দ করবে, না উৎসব করবে, না কি করবে, কিছু বুঝতে না পেরে কেঁদেই ফেলল! রবার, মৈত্রী, অদিতি আর প্রিয়া সকলে একসাথে আছে! গৌরী ভাবল, পীতাম্বরকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করবে, কিন্তু কিছু বোঝার আগেই গৌরীর চার ছেলেমেয়ে, বহুদিন পর তাদের মাকে দেখতে পাবার আনন্দে, গৌরীকে ঘিরে ধরে এমন ভাবে আলিঙ্গন করলো, যে বাইরে থেকে গৌরীকে দেখাই গেল না!

বেশ কিছুক্ষণ পর, সকলে তাকে ছেড়ে দিলে, একজন একজন করে তার চরণ ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিল। সকলেই তৃপ্তির মুখ নিয়ে পাশে সরে গেলে, গৌরী এবার পীতাম্বরের দিকে অপরিসীম স্নেহ ভরা চোখ নিয়ে তাকালো। কিছু বলতে হল না গৌরীকে! পীতাম্বর নিজেই সব গড়গড় করে বলতে শুরু করল, ‘মাতাজি! আপনার করুণার শেষ নেই! সত্যি বলছি, আপনি একজনকেও ছাড়েননি! এই মেয়েটি (মৈত্রীকে দেখিয়ে) আমাকে একদিন ফোন করে বলে যে সে আমার কাছে আসতে চায়, আপনার সাথে দেখা করবে বলে।

আমি আসতে বললে, সে এই ছেলেটিকে (রবারকে দেখিয়ে) সঙ্গে নিয়ে চলে আসে। আর শঙ্কর বলে কেউ একজন পালোয়ান এই দুই মেয়েকে (অদিতি আর প্রিয়াকে দেখিয়ে) দিয়ে যায় আমার কাছে! আর সব শেষে, আপনি বলেছিলেন হরিদেবপুরে আপনি থাকেন, আমি এসে এই চায়ের দোকানের কাকাকে জিজ্ঞেস করতেই সে আপনার কথা বলে!’ একটু থেমে আবার সেবলে উঠল, ‘কিন্তু মাতাজি, এই সব কিছুই সম্ভব হয়েছে গঙ্গাদেবীর জন্যে! ইনিই আমায় কাল ফোন করে, আর আপনার সাথে আমার দেখা হয়েছে কিনা জানতে চায়।

আমি সেটা শুনেই এই ছেলেমেয়েগুলোর কথা ওকে বলি। ও সেই শুনে, আমায় বলে যেন আমি এখানে এসে আপনার বাড়ি চিনে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে এই সময়ে অপেক্ষা করি। তাই মাতাজি আমাকে ধন্যবাদ না দিয়ে, এই মেয়েটিকে ধন্যবাদ দিন। আমি তো বুঝতেই পারছিলাম না যে সবাইকে নিয়ে কি করবো? এরা সবাই ভক্ত! তাই ফিরিয়ে ভি দিতে পারছিলাম না! আমার নিজের ভি আপনার কাছে যাবার খুব ইচ্ছা ছিল! তাই ভেবেছিলাম, আপনার সাক্ষাৎকার করতে এঁদের মাধ্যমে আমি ভি সুযোগ পাব! কিন্তু এই গঙ্গাদেবী দিশা না দেখালে কি আর পারতাম!’

এবার গৌরী গঙ্গার দিকে তাকিয়ে, একরকম ডুকরেই কেঁদে ফেলল! গঙ্গাও লজ্জা-সরম সব কিছুর মাথা খেয়ে, সে যে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে সব ভুলে গিয়ে, হাউ হাউ করে কেঁদে ওর মাকে জড়িয়ে ধরল! যমুনার পুরো ব্যাপারটাই কিরকম যেন ধাঁধা ধাঁধা লাগছিলো! সে কিছু বুঝেই উঠতে পারছিল না, কি হচ্ছে, কে কি করছে, আর কেনই বা করছে! তাহলে কি কেউ কোন সন্দেহই করেনি! যত সন্দেহ কি সে একা করেছিল! দিদি যা করেছে সেটাকে মায়ের ওপর সন্দেহ বলা চলে না, সেটা তো মায়ের জন্যই করেছে! কিন্তু তাও কেন যেন মনে হল দিদির মনে আরও কিছু আছে! বেশ, যখন সব কিছু নিজে নিজেই জট ছাড়াচ্ছে, তখন ও আর মাথা ঘামিয়ে কি করবে! দুচোখ ভরে দেখেই নিক! এই ভেবে তখনকার মতন শান্ত হল সে। কিন্তু সেই শান্তি বেশিক্ষণ বিরাজ করল না!

সকলে একসাথে হয়েই গৌরীকে ওর বাড়ির দিকে, মানে ওর মামারবাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সকলের মুখে চোখে আনন্দের ভাব স্পষ্ট, শুধু দুজনের বাদে! একজন হল যমুনা আর আরেকজন হল গঙ্গা! গঙ্গার মুখে আনন্দের কনো ভাব নেই, সেটা ভেবেই যমুনার দুঃখ, আর তার সাথে তো ওর ফিরে পাওয়া মাকে হারাতে হবে, সেই বেদনা তো রয়েছেই!

যমুনার আবার গৌরীর কাণ্ডকারখানা সন্দেহজনক লাগতে আরম্ভ করল! রাস্তা দিয়ে যখন ওরা সবাই যাচ্ছিল, তখন গৌরীকে নিয়ে মৈত্রী মানে জিং আর প্রিয়া মানে খালিফা একদম সামনে ছিল, তাদের পিছনে ছিলে যমুনা, রবার আর এলিজাবেথ মানে অদিতি। একদম পিছনে ছিল গৌরী আর পীতাম্বর। ওরা দুজনে মিলে কি যেন কথা বলছে! যমুনা কান খাঁড়া করে ওদের কথা শুনছিল –

গঙ্গার কণ্ঠস্বরে ভেসে এলো, ‘কি পীতাম্বরবাবু, আপনি দেখেছিলেন, আপনাকে যা দেখতে বলেছিলাম!’

পীতাম্বরের উত্তর এলো, ‘দেখিনি আবার! আর শুধু দেখেছি তাই নয়! যা দেখেছি তাতে আমার মাথা ঘুরে গেছে!’

গঙ্গার উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর এলো, ‘কেন! মাথা ঘুরে যাবার মত আবার কি দেখলেন! ওগুলো পাথর না কি কাঁচ!’

‘কাঁচ! কি বলছেন!’ পীতাম্বর যেন খুব উত্তেজিত! সে আবার বলল, ‘ওগুলো হীরে বা চুনি হলেও আমি এত অবাক হতাম না গঙ্গাদেবী!’

গঙ্গা যেন কিচ্ছু বুঝতে পারছে না! সে বলল, ‘কি বলছেন, খুলে বলুন, হাতে বেশী সময় নেই! আমার বোন আমার উপর এমনিই নজর রাখছে! আমি আপনার সাথে এই ব্যাপারে বেশীক্ষণ কথা বলতে পারব না! তাড়াতাড়ি বলুন – কি ব্যাপার!’

পীতাম্বরের গলায় সেই উত্তেজনাই রয়েছে! সে বলল, ‘আরে গঙ্গাদেবী, মাতাজির কানে আর নাকে যেই পাথর দেখেছেন, সেটা হীরে নয়, ওটা টাফফাইট! হা… টাফফাইট! আপনি জানেন টাফফাইটের দাম কত!’

গঙ্গার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলনা যমুনা, বরং আবার পীতাম্বরের কণ্ঠস্বর তার কানে এল, ‘আরে বেহেনজী, কিমত ছাড়ুন, টাফফাইট, সারা পৃথিবীতে মাত্র ফিফটি ওয়ান পিস আছে, আর সেগুলো সব থাকে বড় বড় মিউজিয়ামে!’

এবার গঙ্গার উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর শুনতে পেল যমুনা। সে বলল, ‘বলেন কি! এত বিরল পাথর!’

পীতাম্বরের পাথরের সম্বন্ধে জ্ঞান সত্যিই অনবদ্য, সেটা তার পরের কথাটা থেকেই যমুনা বুঝল, কিন্তু ওর দিদির এইসব জেনে কি হবে! কে জানে! যাই হোক, পীতাম্বরের কথা সে এখন মন দিয়ে শুনছে। এখন কিছু ভাবতে যাওয়া মানেই কনো না কনো কথা বাদ পরে যাওয়া! পীতাম্বর বলল, ‘আরে বেহেনজী, আপনি বুঝতে পারছেন না! ওই পাথর আর পৃথিবীতে তৈরিই হয় না! বলে নাকি এই পাথর তৈরি হত আজ থেকে প্রায় বারো তেরো হাজার বছর আগে! তখনও নাকি হিমালয় বাড়ছিল, উচ্চতায় নয়, সাইজে! সেই হিমালয়ের সাইজ বাড়ার সময়ে, এই পাথর বেড়িয়ে আসতো! হা! আর এই পাথর হিমালয় আর স্পেশালি তিব্বত এরিয়া ছাড়া কোথাও পাওয়া যেত না! বলে কি জানেন বেহেনজী! এই পাথরগুলোকে বলে কুবেরকা ধন! কুবেরকা গুপ্ত ঘরমে, এই সব পাথর রাখা আছে, বাকি যে কটা সব মিউজিয়ামে! কিন্তু মাতাজি এগুলো পেল কাহা সে!’

এবার যমুনা দিদির কণ্ঠস্বর পেল। খুব গম্ভীরভাবেই গঙ্গা বলে উঠলো, ‘ছেড়ে দিন! অত ভাবতে যাবেন না! আর ধরে নিন এটা মায়ের কাছে কুবেরের কাছ থেকেই এসেছে! বা বলতে পারেন, কুবের নিজে দিয়েছেন মাকে!’ একটু থেমে গঙ্গা আবার বলে উঠলো, ‘আর পায়েরটা দেখেছিলেন!’

পীতাম্বর বলে উঠলো, ‘উড়ি বাপরে, বেহেনজী, ওই পাথর ভি মারাত্মক পাথর আছে! আর ওই পাথর ভি এখন আর পাওয়া যায় না! ওই পাথরকে বলে রেড বেরিল! এই পাথর একমাত্র মেক্সিকোতে পাওয়া যেত! ওখানে একটা ভয়ানক আগ্নেয়গিরি ছিল! এখনো ভি আছে, কিন্তু ডরম্যান্ট আছে, ওর ওভি বিশ ত্রিশ হাজার সাল সে! ওই আগ্নেয়গিরি যখন লাভা বার করে, সেই লাভা পাথরের উপর জমে এই পাথর তইয়ার করে, বুঝলেন! সেই পাথর হতেও দশ-পনেরো হাজার সাল লেগে যায়! এই পাথর ভি মিউজিয়াম ছাড়া কোথাও নেই! লোকে কি বলে জানেন! এই পাথর নাকি মহাভারত মে, যো ময় দানব ছিল, সে পাণ্ডবদের প্রাসাদে লাগিয়েছিল! ইস ময়কা ঘর ছিল মেক্সিকোতে, আর ও সেখান থেকেই এনেছিল! কিন্তু এটাই বা মাতাজি পেল কোথা থেকে!’

গঙ্গা পুরোপুরি চুপ করে গেছিল! এবার সে একটু গম্ভীরভাবেই বলে উঠলো, ‘আচ্ছা পীতাম্বরজী, বলতে পারেন, এই পাথরের সাথে গণেশের নাম কোন ভাবে কি জড়িয়ে আছে!’

পীতাম্বর যেন একটু ভেবেই নিল বোধ হয়! আসলে যমুনা দুজনেরই কণ্ঠস্বর অনেকক্ষণ শুনতে পেলনা, তাই ধরে নিল যে পীতাম্বর ভাবছে। একটু পরে সে আবার বলে উঠলো, ‘আছে বেহেনজী… তবে ও কতটা ঠিক বলতে পারবো না! … আসলে… লোক মুখ কা কথা আছে তো!’

গঙ্গা যেন ধড়ফড় করছে! সে বলে উঠলো, ‘কি কথা সেটা বলবেন তো!’

পীতাম্বর বলল, ‘লোকে বলে, … লোক বলতে বেসিক্যালি হরিয়ানা, হিমাচলের সাইডেরই লোক বলে যে, বেদব্যাস নাকি মহাভারত-কা পহেলা কিতাব, মাতলাব জয়াকি জ্ঞান দিয়েথে ইসলিয়ে, খুশী হয়ে গণপতি বাপ্পাকে এই পাথর দিয়েছিল। আর সে এই পাথর পেয়েছিল যুধিষ্ঠিরের কাছ থেকে, ও যো রাজসুয়া যজ্ঞ হয়েছিল না, তাতে বেদব্যাস অগ্নিহোত্রী হয়েছিল, সেই কারণে! … লেকিন ও সিরফ লোগো কা মান্না হে… উসমে সাচ্চাই কিত্না হে, ও মুঝে নেহি পাতা!’

গঙ্গা এবার জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘হু… কিন্তু মনে হয় আমি সবটাই বুঝে ফেলেছি… ঈশ্বরের অপার করুণা… তাই হয়তো বুঝতে পারলাম! হয়তো কেন, সেই জন্যেই বুঝতে পারলাম!’

‘কিন্তু কি বুঝলেন! সেটা তো বলুন!’ পীতাম্বরের জিজ্ঞাসা!

গঙ্গা বলে উঠলো, ‘আচ্ছা !মাতাজিকে আপনার কেমন লাগে! ভালো লাগে তো!’

পীতাম্বর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘মাতাজি আসলি সাধু হে! কারুকে উনি নিজে বলে না যে উনি সাধু আছেন! লেকিন উনিই আসলি সাধু আছেন!’

গঙ্গা এবার বলে উঠল, ‘বেশ সেটা মনে করেই, আপনার মাতাজির প্রতিটা কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করুন! এটাতেই মঙ্গল… আপনার মঙ্গল… আমার মঙ্গল… সবার মঙ্গল!’একটু থেমে গঙ্গা আবার বলে উঠলো, ‘ঠিক আছে, আপনি আমার বোনটাকে নিয়ে আসুন হ্যাঁ! আমি দেখি একটু মায়ের দিকে এগিয়ে যাই! ঠিক আছে!’

এই বলে গঙ্গা, যমুনার পাশ দিয়ে হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু যমুনা হাত টেনে ধরাতে দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য হলে, গঙ্গা বলল, ‘কি হল রে!’

যমুনার ভিতরে কাল রাত্রি থেকে জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিয়েই সে বলে, ‘হয়ে গেছে তোর সন্দেহ! নাকি এখনও সন্দেহ করবি!’

‘সন্দেহ!’চুপ করে গিয়ে আবার গঙ্গা বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ তবে এটাকে সন্দেহ বলতেই পারিস!’

যমুনার মনের প্রশ্ন আরও বেড়ে গেলে, সে বেশ জোর দিয়েই দিদিকে বলল, ‘আমাকে একটু খুলে বলতো দিদি, কি হয়েছে!’

গঙ্গা শান্ত মনে বোনের দিকে তাকিয়ে, মৃদু হেসে, মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘মাকে কনোভাবে হারাতে দেওয়া যাবে না বোন! কনো ভাবেই না! …… আর শোন মা যা বলেছে, সব সত্যি…… না শুধু সত্যি না… ধ্রুব সত্য… এমন কি যেই কথাগুলো মা তাঁর খেয়াল বলে উড়িয়ে দিয়েছে, সেগুলোও সে ইচ্ছা করেই বলেছে! … উনি আমাদের মা… সত্যি কারের মা… এখন এর থেকে বেশী প্রশ্ন করিস না… সময় নিশ্চয়ই আসবে… তখন বাদবাকি সবটা বলবো… আসলে এখন ঈশ্বরও চান না সব জানাজানি হয়ে যাক… শুধু একটা কথা বলতে পারি, আমাদের ভিটে মাটি সব বিক্রি করে এসে আমরা এখানেই মার কাছে থাকবো… বুঝলি। … কি তুই রাজী তো!’

যতক্ষণ দিদি কথাগুলো বলছিল, যমুনা নিজে একবারের জন্যও চোখের পাতা ফেলল না, আর এটাও দেখল যে ওর দিদিও একবারের জন্যেও চোখের পাতা ফেলেনি! অবাক বিস্ময়ে যেন তার চোখদুটো ছলছল করে উঠলো! গঙ্গা এগিয়ে গেল গৌরীর দিকে, আর যমুনা আবার ভাবতে আরম্ভ করলো, –

এটা ও কি করল! দিদিকে সন্দেহ করল! সেই দিদিকে, যেই দিদি ওর মায়ের থেকে কনো অংশেই কম নয়! সেই দিদিকে যাকে কনো দেবী বললেও কম বলা হয় না, তাকে … শেষে তাকে সন্দেহ করলো সে! … আর দিদি কি বলল! তার মাথামুণ্ডু কি দাঁড়ায়! … ধুর …কিচ্ছু বুঝতে পারছে না সে! … না বুঝতে যখন পারছেই না, তখন আর বোঝার চেষ্টাও করবে না! শুধু দিদি, পীতাম্বরকে আর ওকে যা বলল সেটা ও অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবে। এবার থেকে গৌরীর মুখ মানে ওদের মায়ের মুখ থেকে বেরোনো প্রতিটা কথাকে সে স্মরণ করে রাখবে আর প্রতিটা অনুরোধকে, নির্দেশকে, আবদারকে সে আদেশ মনে করবে…।

এত কিছু ভাবার পরেও যমুনার মনটা কেমন যেন ভারী হয়েছিল। কিন্তু সেই ভার অদিতি দিদি নিজে এসে হালকা করে দিল। অদিতি পিছিয়ে এসে যমুনার কাঁধে হাত রেখেই বলল, ‘কি মনটা খারাপ হয়ে আছে!’ উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে আবার বলে উঠলো, ‘ মন খারাপ কোরোনা! ঈশ্বরের পথে চলতে গেলে অনেক সময়ে মানুষ এতটাই উত্তেজিত হয়ে পরে যে বাইরে থেকে দেখে মনে হয় সে কাউকে সন্দেহ করছে! আসলে সেটা সন্দেহ নয়, সেটা হল নিশ্চয় করে নেওয়া! তোমার দিদিও সেটাই করছিল! এখন সে নিশ্চয় হয়ে গেছে … এবার তিনি নিজের সবটা দিয়ে দেবেন!’

যমুনা কিছু বলবে কি, শুধু অবাক হয়ে অদিতিকে দেখছিল আর ওর কথা শুনছিল, অদিতি বলতে থাকল, ‘আসলে কি বল তো, বেশ কিছু ভক্ত নিজেকে ঈশ্বরের কাছে নিয়োজিত করলেও, ঈশ্বরের কাজকে ঈশ্বরের কাজ করেই দেখে। তাই তারা নিজেদের যতখানি দেবার ততখানিই দেয়, যদিও সেটা দেখেই জগতবাসী অবাক হয়ে যায়! বলে – এতটা নিবেদিত প্রাণ! কিন্তু কি জানো তো বোন! কিছু কিছু ব্যক্তি থাকে যারা হয় নিজেকে বেঁধে রেখে দেবে –কিছুতেই কিছু দেবে না, আর নয় নিজের সবটা দিয়ে দেবে! কিন্তু এই দুটোর মাঝখানে একগুচ্ছ প্রশ্ন এসে পরে, আর পরে প্রমাণ পাবার ব্যাকুলতা। প্রমাণ পেয়ে যাবার পর, সেই ব্যক্তি নিজেকে ঈশ্বরের থেকে অভিন্ন ভাবতে আরম্ভ করে!

ঈশ্বরের ইচ্ছাকেই সে নিজের স্বপ্ন মানতে শুরু করে দেয় আর হাসতে হাসতে নিজের জীবনটা ঈশ্বরের পায়ে লেপে দেয় – যত্ন করে দেয় যাতে জীবনটা লেপে দেবার পর, ঈশ্বরের পায়ের রঙে কোন তারতম্য না বোঝা যায়! এই ব্যক্তিদের জগৎ কি বলে জানো! … কিছু বলতেই পারে না! আসলে এদের মতিগতি বা জীবনধারা জগতবাসী কিছু বুঝেই উঠতে পারেনা! তোমার দিদি হল সেই রকম প্রাণ! … ও দেখেছো, আমার পরিচয়ই তো দিইনি তোমায়!’

যমুনা বলে উঠলো, ‘আমি জানি! তুমি এলিজাবেথ, মায়ের অদিতি। কি তাই তো!’

অদিতি এবার হেসে বলল, ‘হ্যাঁ… ঠিক ঠিক… আর তুমি হলে আমাদের সকলের মধ্যে সব থেকে ছোট্ট সদস্য – আমাদের আদরের যমুনা – কি তাই তো?’

যমুনার মুখে এবার হাসি ফিরে এসেছে! মনের কোনের সেই ঘন মেঘ যেন কেটে গেছে, কেটে গেছে সেই অশনি সঙ্কেত! এখন সে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত! এবার সে আবার নিজের ভাবের জগতে ফিরে যেতে পারে! সেই আনন্দে ভরা মুখটা দেখে, অদিতি বলল, ‘যাও তোমরা এগোতে থাকো, আমি বেশ কিছু সাদা কাগজ আর একটা পেন নিয়ে যাচ্ছি – তোমার দিদি বলল, কনো একটি কারণে সেটা নাকি পরে লাগবে!’

অদিতি চলেই যাচ্ছিল, সেই সময়ে পীতাম্বর বলে উঠলো, ‘পেন লাগবে না! আমার কাছে পেন আছে! একটা কি দুটো সাদা কাগজ নিয়ে আসলেই হয়ে যাবে। কি বলেন!’

অদিতি হেসে বলল, ‘হবে কিনা, কি করে বলব! আসলে কি কাজে লাগবে, সেটাই তোঁ মাথায় ঢোকেনি!’ এই বলে হাসতে হাসতে সে বই খাতার দোকানে চলে গেল।

অন্যদিকে যমুনা ভাবতে থাকলো – কি অদ্ভুত, তাই না! মায়ের সান্নিধ্যে এসে ইনারা সকলেই যে কম বেশী সাধু হয়ে উঠেছে! কি সুন্দর একজন আরেকজনের মনের কথা ধরে ফেলছে, আর কি সুন্দর মায়ের মত করেই সব কিছু সহজ ভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে দিচ্ছে, তাই না!

খুব আনন্দ করেই সকলে, গৌরীর মামারবাড়ি গেল। গিয়ে দেখে গৌরীর মামারবাড়িতে ম্যারাক খাটানো। কোন আনন্দ উৎসবের ম্যারাক। গৌরীকে সামনে রেখে সকলে বাড়িতে ঢুকল!

সবাই দেখল গৌরীকে বাড়ির সকলে চিনতে পারছে। গৌরীকে সেদিন এককথায় অপরুপা সুন্দরী লাগছিল! তার পরনে ছিল একটা সুন্দর নীল রঙের সিল্কের শাড়ী। শাড়ী সামলানোর কথা ওর মনেই থাকে না, তাই গঙ্গা বিভিন্ন জায়গায় জায়গায় সেফটিপিন দিয়ে আটকে দিয়েছিল, যাতে সে অসাবধান থাকেলেও, শাড়ী যেন অসাবধান না হয়! ধপধপ করছে গৌরীর গায়ের রং, তার উপর নীল রঙের সিল্কের শাড়ী, তাতে আবার লাল আর সবুজে কাজ করা আঁচল! সব মিলিয়ে গৌরী সেদিনকে অপরূপা, তিলোত্তমা! মাথার সিঁথিতে সুন্দরভাবে পুরু করে সিঁদুর পরানো আর পায়ে সুন্দর করে আলতা পরানো। সব মিলিয়ে পায়ের আলতা, ওর পায়ের দুধ আলতা রং কে রাঙ্গিয়ে দিয়েছে, গায়ের গম্ভীর নীল রঙের শাড়ী ওর সারা গায়ের রং কে যেন আলো জ্বেলে জ্বেলে দেখাচ্ছে, আর শেষে মাথা ভর্তি সিঁদুর! যেন দুই হাতে মা দুর্গা! সব কিছুর সাথে কানের আর নাকের গয়না যেন কোটি সূর্যের আলো মুখে ফেলে দিয়েছে। অনুষ্ঠান বাড়ির কেউ ওর থেকে মুখ সরাতেই পারছিল না! তাই ঘরের মেয়েকে দেখে সারা দিতে, বেশ খানিকক্ষণ সময় লেগে গেল তাদের।

মিনিট খানেক সময়ের মধ্যেই, সকলের মনোনিবেশ গৌরীর দিকে ঘুরে গেছে। সকলে এসে একই প্রশ্ন – কোথায় চলে গেছিলিস তুই! কতদিন পরে তোকে দেখলাম! কেমন আছিস! এরা কারা! আর কোথাও চলে যাবি না তো! আরও কত প্রশ্ন! এত প্রশ্ন তীরের মত ছুটে এলো, যে যমুনার মনে হল, কাল রাত থেকে ওর মনে যা প্রশ্ন এসেছিল, সেগুলো সব মিলিয়েও এঁদের প্রশ্নের সংখ্যার ১০ শতাংশও নয়। প্রথম প্রশ্নটা কি ছিল মনে আছে! না নির্ঘাত মনে নেই!

গৌরী সবার উদ্দেশ্যে হেসে বলল, ‘বারে বিয়ে হয়ে গেছে, এখনও মামার ঘাড়ের উপর বসে বসে খাবো, বল!– তাই বরের কাছে গেছিলাম!’

সকলে কথা শুনে হতবম্ব হয়ে গেছিল! কিন্তু সকলের মাঝখান থেকে একটা স্বর উঠে এলো –‘হ্যাঁ… তোর বরের কত বড় ঘর আছে না…! রাজার বেটা তো সে! … নিজের জন্মেরই ঠিক নেই! তার নাকি আবার বাড়ি!’

কথাখানা গৌরীর মামা বলে উঠলো। সেটাই স্বাভাবিক তাই না! আদরের ভাগ্নি বলে কথা! কাউকে না বলে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিল!

গৌরী এগিয়ে গিয়ে মামার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেল! কিন্তু ওর মামা প্রচণ্ড রেগে রয়েছে! সরে না গেলেও প্রণাম নিল না! দু হাতে করে কাঁধ ধরে তুলে দিল গৌরীকে। তারপর খানিকক্ষণ ভাগ্নির মুখখানা দেখে, ছোট ছেলের মত কাঁদতে কাঁদতে ওকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকলো! অনেকক্ষণ, তা মিনিট তিনেক তো হবেই – কাঁদতে কাঁদতে গৌরীকে আবার কাঁধ ধরে মুখের সামনে নিয়ে এসে এক চোখ জল নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ রে মামা তোর কেউ হয় না! কেউ না! একটা চিরকুট লিখে চলে গেলি!’

গৌরী মামার কথায় কিছু উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে তার শাসন শুনছিল, সেই দেখে ওর মামা আবার বলে উঠলো, ‘এতটা পর ভাবিস আমাকে!’

এবার গৌরী কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল! একজন ভদ্রমহিলা অভদ্রের মত ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো। মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো কোঁকড়ানো চুল, চুলের কনো বাঁধন নেই – পুরো ছাড়া; আর শাড়ীটা এমন করে পরে বেরুল, ঠিক যেন মনে হল একজন শাঁকচুন্নি! তার গলার কি জোর বাবারে! সারা পাড়া যেন শুনতে পাচ্ছিল! চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সে বলে উঠলো, ‘ওকে জিজ্ঞেস কর – আবার কেন এসেছে! কি কারণে ওর ফিরে আসা! ষোলো বছর ধরে আমাদের হাড়মাস চিবিয়ে হল না! আবার ফিরে এলো হতচ্ছাড়ি! … বেশ তো শিবের কাছে গেছিল…! তো কি শিব নিল না! … হতচ্ছাড়ি মেয়ে কোথাকার! … আর এলি তো এলি তোর অপয়া, বিষভরা চোখগুলো নিয়ে, সেই আমার মেয়ের বিয়ের দিনেই তোকে আসতে হল…! এই খবরদার বলে দিচ্ছি… ওই মেয়েকে একদম ঘরে তুলবে না! … আমি কিন্তু ওকে ঘরে তুললে, হুলুস্থুল বাঁধিয়ে দেব!’

সেই কথা শুনে গঙ্গা, যমুনা আর বোধ হয় উপস্থিত সকলেই ভাবছিল, – হুলুস্থুল বাধাতে কি আর বাকি রেখেছো বাপু! বাকিরা পুরো ব্যাপারটাকে বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে মজা করে করে উপভোগ করলেও, সেই কথাগুলো শুনে গঙ্গার, যমুনার, অদিতির, খালিফার এমন কি পীতাম্বরেরও গা জ্বলে উঠছিল! মনে হচ্ছিল, এক্ষুনি ওরা গৌরীকে নিয়ে চলে যাবে, আর কোনদিন এই পথই মাড়াবে না! … কিন্তু মাতাজি আদেশ না দিলে, সেটা তারা কি করে করবে! তাই চুপ করে দাঁড়িয়ে সেই ভাবেই সবকিছু সহ্য করছিল তারা, যেই ভাবে গৌরী নিজে করছিল। শুধু সেই বেদনা মৈত্রী আর রবারের হৃদয়ঙ্গম হচ্ছিল না, বাংলা ভাষাটা তারা ঠিক জানে না তো, তাই।

অন্যদিকে গৌরীর মামী বলতেই থাকে, ‘বেশ করেছিলি বরের কাছে চলে গেছিলি! তোর বর তো একজন মরা! তা তুই মরলি না কেন! আবার ফিরে এসেছিস! সম্পত্তির ভাগ নিতে এসেছিস! দূর হয়ে যা, দূর হয়ে যা আমার চোখের সামনে থেকে! আজ আমার মেজ মেয়ের বিয়ে। অনেক কষ্ট করে একটা ভালো পাত্র যোগাড় করেছি! সেটা কিছুতেই ভেস্তে দিতে দেব না! দূর হয়ে যা! দূর হয়ে যা!’ এই রকম বিচ্ছিরিভাবে চেঁচাতে চেঁচাতে সেই সামাজিকভাবে ভদ্র নামধারী মহিলা এবার ঝাঁটা তুলে নিয়ে এসে গৌরীকে মারতে গেল! গৌরীর ছেলে মেয়েদের এবার সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেছিল। এমনকি রবার আর মৈত্রী পর্যন্ত এবার বুঝতে পেরেছে, কি হচ্ছে। মৈত্রী ক্যারাটে শেখা মেয়ে! ওর তো মনে হচ্ছিল এবার ওই মহিলাটাকে গিয়ে সপাটে একটা লাথি কষিয়ে দেবে! ওরা সবাই একসাথেই এগিয়ে গেল!

গঙ্গা এবার এগিয়ে গিয়ে সবার সামনে ওর মামীর হাতটা চেপে ধরল, আর তারপর যা বলল, সেটা প্রত্যেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনল। কনো রাজনৈতিক নেতার কথা সকলে এমনভাবে কোনদিন শুনেছে কিনা, সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে! কিন্তু পুরো কথাটার মধ্যে, কেউ একবারের জন্যও গঙ্গাকে কনোভাবে বিরক্ত করল না। গঙ্গা বলতে শুরু করলো, – “বেশ করেছেন আপনি! বেশ করেছেন! নিজের সব থেকে বড় মেয়েকে উদরস্থ করে, কি বেশ করেন নি! উনি আপনার সন্তান ছিল, আপনার জন্যেই সে দেহ পেয়েছিল। তাই আপনার পুরো অধিকার ছিল তার দেহ ছিনিয়ে নেবার! বেশ করেছেন আপনি আপনার বাকি সন্তানদের শাসন না করে! আপনার সন্তান, আপনি তাদের শাসন করবেন, না আদর দেবেন আপনার ইচ্ছা! কিন্তু তার মানে এই নয় যে যাকে আপনি ভালোবাসতে পারেননি, যাকে আপনি আদর দিতে পারেননি, তাঁকেও আপনি শাসন করবেন! তাকে শাসন করার আপনার কনো অধিকারই নেই! শাসন করার অধিকার তারই থাকে, যে সেই ব্যক্তিকে ভালোবেসেছে! সেই শাসনের মধ্যেও তাই ভালোবাসা আর ভালো চাওয়াই লুকিয়ে থাকে! ”

সেদিন যেন উত্তেজিত গঙ্গার অসীম বাকশক্তির পরীক্ষা ছিল। সে বলতে থাকলো, -“শ্রী রামচন্দ্রকে মাতা কৈকেয়ী চোদ্দ বছরের জন্য বনবাস প্রদান করেছিলেন। সেটা তাঁর শাসন ছিল, আর সেই শাসনকে শ্রীরামচন্দ্র মাথা পেতে নিয়েছিলেন। কেন জানেন? কি করেই বা জানবেন?সে সব জানলে তো এইরকম ব্যবহার করার রুচি বোধই আপনার থাকতো না! শুনুন তবে মাতা কৈকেয়ীর কথা! মাতা কৌশল্যা নিজের গর্ভ থেকে শ্রীরামের জন্ম দিয়েছিলেন, কিন্তু মাতা কৈকেয়ী ছিলেন শ্রীরামের পালিতা মাতা! নিজের ছেলে ভরতের থেকেও তিনি রামচন্দ্রকে বেশী স্নেহ করতেন! প্রতি মুহূর্তে বিলাপ করতেন, কেন তিনি শ্রীরামের জন্ম দেননি! রাজা দশরথের তিন রানী, কৌশল্যা, কৈকেয়ী আর সুমিত্রা, এই তিনজনের মধ্যে মাতা কৈকেয়ীই ছিলেন, যিনি শ্রীরামকে সব থেকে বেশী স্নেহ করতেন! আর তার জন্যেই দেবতাদের, কৈকেয়ীকে কুমন্ত্রণা দিতে মন্থরাকে কাজে লাগাতে হয়েছিল। আর তাঁর সেই প্রিয় মাতার আদেশ শ্রীরামও মাথা পেতে নিয়েছিলেন, কেন জানেন! কারণ সেই শাসনে ভরা আদেশেও ছিল জগত কল্যাণ – রাবণ বধ।

মাতা কৈকেয়ীও শ্রীরামের বনবাসে গ্লানির যন্ত্রণায় নিপীড়িত হয়েছিলেন, কিন্তু সেই আদেশের মধ্যে থাকা স্নেহ, আর সেই আদেশের ফলে হওয়া জগত কল্যাণ একই সাথে মহারানী কৈকেয়ীকে কর্মফলও দেয়, আর সৌভাগ্যও দেয়।  সৌভাগ্য স্বরূপ পরের জন্মে তিনি পরমাবতার শ্রীকৃষ্ণের জন্মদাত্রী মা, দেবী দেবকী হলেন। আর কৈকেয়ীরূপে রামচন্দ্রকে চোদ্দ বছর বনবাসে পাঠানোর কর্মফল স্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ মাতা দেবকীকে ১৪ বছর অপেক্ষা করিয়ে, ১৪ বছর বয়সে মথুরা যান কৃষ্ণ কংস বধের উদ্দেশ্যে।

কিন্তু আপনি! আপনি তো সুযোগ পেয়েছিলেন ইনার পালিতা মা হবার – গৌরী দেবীর! কিন্তু কি করলেন! সারাটা জীবন তাঁকে অপদস্থ করতেই ব্যস্ত থাকলেন! কি তাই তো! এমনকি, আপনার বড় মেয়ে এই মেয়ের পালিতা মাতা হয়ে উঠছিল বলে তাকেও গিলে খেলেন! এই মা মরা মেয়েটাকে কোনদিন স্নেহ দিতে চেষ্টাও করেননি, দেনও নি! তারপর আবার কোন অধিকারে আপনি তার গায়ে হাত তুলতে যান!”

এত বলার পরে গৌরীর মামী গঙ্গাকে দুটো কটু কথা শোনাতে যাবে, কিন্তু গঙ্গা তাকে সেই সুযোগটাও দিল না! সে আবার বলে উঠলো, “আপনি ওকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছেন তাই তো! বেশ করেছেন! ঠিক করেছেন! আর খুব ভালো করেছেন! আগেরবার, আপনাদের কাউকে না বলে, শুধুই আপনার ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিল, এবার আপনি নিজে তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন! এবার আর ওর কনো রকম গ্লানি থাকার প্রশ্নই ওঠেনা! আপনি ভেবে বলছেন তো, কি বলছেন! ”

এবার মামী আর কোন কিছু বলার চিন্তা না করেই, নিজের বাড়িতে দাঁড়িয়ে, এক পাড়া লোক, এক বাড়ি লোকের সামনে অপদস্থ হয়ে বলে ফেলল, ‘এতে আবার ভাবার কি আছে! এই বাড়িতে ওর কনো জায়গা নেই! বিয়ে দেওয়া হয়েছে! এবার যেখানে খুশী যাক! যাক যার সাথে বিয়ে হয়েছে…”

গঙ্গা আজ প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক। কনো কিছুই সে মানবে না, শুনবেও না, যেটা সে নিজে শুনতে চাইছে সেটা ছাড়া! সে গৌরীর মামীর কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়েই বলল, “বেশ, তবে এই কাগজটায় (অদিতির থেকে কাগজ নিয়ে) আমি লিখে দিচ্ছি – আজকের এই অক্টোবরের ৯ তারিখ, ২০১৮, বাংলায় ২২ শে আশ্বিন, ১৪২৫ সালের দুপুর ১ টা ১৭ মিনিটে, আপনি এখানে উপস্থিত সকলের সামনে দাঁড়িয়ে অঙ্গিকার করছেন যে আপনি শ্রীমতী গৌরীদেবীর সাথে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করলেন। এই মুহূর্তের পর থেকে, না তো গৌরীদেবী আপনার ও আপনাদের কারুর মুখদর্শন করবে, আর না আপনারা কেউ গৌরীদেবীর মুখদর্শন করবেন। উভয়দিকেই যে-ই অন্যের দ্বারস্থ হবে, তাকে গাধার পিঠে চাপিয়ে, মুখে কালি মাখিয়ে, গলায় মাখন লাগিয়ে, রুটি ঝুলিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে (যাতে কুকুরে তাকে নিয়ে টানাটানি করে)। কি ঠিক আছে! এটাই লেখা হোক! আপনাদের তরফে আপনি আর আপনার বাধ্য কাউকে, তারিখ দিয়ে সই করবেন, উল্টো দিকে গৌরীদেবী এতে সই করবে, আর তার সাথে আমরা সকলে সই করবো। কি রাজী তো! ”

সেই কথা শুনে গৌরীর মামীর তো আনন্দে হাত পা তুলে নাচতে ইচ্ছা হল! গঙ্গা মুখে যা বলল, তাই পাতায় লিখিয়ে সই করাল। ও অদিতিকে দিয়ে দুটো পাতা আনিয়েছিল। একই জিনিস দুটো পাতায় লিখে, দুপক্ষকে দিয়ে সই করিয়ে একটা ওর মামীর হাতে ধরিয়ে দিলো, আর একটা নিজের কাছে রেখে দিল। দিয়ে সে আবার বলল, ‘এই চিঠি প্রমাণ হিসেবে আমার কাছে রাখলাম! আমি জানি গৌরীদেবীর দ্বারে আপনি একদিন আসবেনই! সেদিন গৌরীদেবী আপনাকে মামী বলে সম্মান দেখাতেও আসবে! কিন্তু আমি বলছি, আমি গৌরীদেবীকে উপেক্ষা করে সেদিন আপনার এই অবস্থাই করবো, জা এতে লিখলাম’। এবার পিছনে গৌরীর দিকে তাকিয়ে গঙ্গা বলে উঠলো, ‘চল সবাই!’

সম্পূর্ণ দাপটের সাথে গৌরীকে আর যমুনাকে নিয়ে গঙ্গা বাইরে চলে এলো। ওদের পিছনে পিছনে পীতাম্বর, অদিতি, রবার, প্রিয়া আর মৈত্রী চলে এলো। গৌরীর মামা কান্নায় ভেঙে পরল, আর গৌরীও মামার কথা মনে করে একবার চোখের জল মুছল! তারপর সবার সাথে এগিয়ে গেল! সত্যি করে বলতে গেলে আজ গৌরীর কোন দুঃখই নেই! সে তার সব ছেলে মেয়েদের ফিরত পেয়ে কি পরিমাণ যে আনন্দ পেয়েছে, তা সে নিজেই বলে বোঝাতে পারবে না।

যমুনা খুব চিন্তায় পরে গেল– প্রথমত, ওর দিদি ওই পাথরগুলো নিয়ে কি বলল, সেটাও বুঝেই উঠতে পারেনি। দ্বিতীয়ত ওর দিদি যেন সবকিছুই পরিচালনা করছে –তবে এত চিন্তার মাঝে একদিকে ওর ভালোই লাগছে, দিদি নিজে সেইসব করেছে বলে, কিন্তু অন্যদিকে চিন্তাও হচ্ছে, দিদির অন্যকিছু মতলব নেই তো! আর তৃতীয়! এবার গৌরীর কি হবে! এতজনকে নিয়ে গিয়ে তাদের গ্রামের বাড়িতে ওঠা তো সম্ভব নয়! তাহলে গৌরী কোথায় থাকবে!

গঙ্গা সকলকে নিয়ে পীতাম্বরের বাড়ির উদ্দেশ্যে চলল! পীতাম্বরও একজন, যেন ওর কনো কিছুতেই কোন অসুবিধা নেই! অদ্ভুত ব্যাপার এই যে পীতাম্বর কিন্তু দিদিকে বা মাকে কিছু জিজ্ঞেসও করছে না! দিদি কি ওকে সব আগে থেকেই বলে রেখেছে! এখন কি করবে সবাই!

গঙ্গা আর যমুনা বাদে সকলেই এই কদিন পীতাম্বরের আশ্রয়েই ছিল। কি করে সকলে সেখানে এলো, সেটা সকলে বোধ হয় ওরা নিজেরাই জানে, আর কেউ জানে না। সকলকে নিয়ে পীতাম্বর ওর বৃন্দাবন গার্ডেনসের ফ্ল্যাটে উঠলো।

সকলেই যেন একটা চাপা চিন্তায়ে ছিল – কি হবে! গৌরী এখানে সকলের মা, নয়তো মাতাজি, শুধু খালিফা মানে প্রিয়ার ছাড়া! প্রিয়ার কাছে গৌরী হল আম্মি!

সকলে বসে পরল ফ্ল্যাটের একটা বিশাল হল ঘরের মত ঘরে। সেখানে বসে প্রথম মুখ খুলল গঙ্গা। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘এবার থেকে মা আমাদের সাথেই থাকবে!’ একটু থেমে গিয়ে আবার সে বলল, ‘কিন্তু চিন্তার ব্যাপার হল, মা থাকবে কোথায়!’

পীতাম্বর বলে উঠলো, ‘চিন্তার কিছু নেই! আমার নিউটাউনে আরও একটা ফ্ল্যাট আছে। রোসডেল নাম ওই ফ্ল্যাটটার।  বিশাল বড় – তাই ওখানে সবাই থাকতে পারবে। চারটে ঘর ভি আছে ওতে! মাতাজি আর মাতাজিকে সব সময়ে যে দেখবে, সে একটা ঘরে থাকবে, আর বাকিরা অন্য ঘরে থাকলেই হল! সেই নিয়ে পরে চিন্তা করা যাবে, কিন্তু আভি সবার ভুক লেগেছে, দুপুর ভি হয়ে গেছে, কেউ কিছু খায়নি! আমি কিছু খাবার অর্ডার করে দিই! আচ্ছা সবাই নন-ভেজ খায় তো!’

অদিতি বাদে কেউ কিছু বলল না! অদিতি কৃষ্ণ ভক্ত, তাই আমিষ থেকে ওর মন উঠে গেছে, তবে কনো বাছবিচার নেই। গৌরী কিছু বলছে না দেখে, পীতাম্বর গঙ্গাকে জিজ্ঞেস করল! গঙ্গা গৌরীকে পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘মা তুমি মাংস খাও!’ গৌরী চোখের দিকে ফেল ফেল করে তাকিয়ে বলল, ‘না রে! তোরা খা না! তোরা খা! আমায় একটু আলু ভাতে করে দিলেই হবে!’ গৌরী ছাড়া পীতাম্বর এবার সবার জন্য অনলাইনে খাবার অর্ডার করে দিল।

অন্যদিক থেকে রবার বলে উঠলো, ‘মাতাজি তেমন কিছু খায় না! পনির টনিরও খায় না!’ রবার আসলে মাতাজি মানে গৌরীর সাথে সব থেকে বেশী দিন থেকেছে! গঙ্গা পুরোটা শুনে পীতাম্বরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা পীতাম্বরবাবু, এখানে রান্না করার ব্যবস্থা নেই!’

‘হ্যাঁ আছে তো, কেন থাকবে না! … কিন্তু চাল ডাল কোথায় কি আছে, আমি কুছু জানি না… আসল মে, আমার একটা কাজের মেয়ে আছে – ওহি সব করে নেয়!’

গঙ্গা এবার যমুনার উদ্দেশ্যে বলল, ‘বোন যা তো, নিচের কনো মুদির দোকান থেকে গোবিন্দ ভোগের চাল নিয়ে আয় তো! আর সঙ্গে আড়াইশো আলুও আনিস।  মা-র জন্য গরম গরম আলু সেদ্ধ ভাত করে দিই!’ যমুনা উঠতেই যাচ্ছিল, গঙ্গা আবার বলে উঠলো, ‘আর হ্যাঁ, পীতাম্বর বাবু! ঘরে ঘি আছে!’

‘হা ওটা আছে, আমার ওটা খুব লাগে’ এই বলে একটু হেসে সে দেখিয়ে দিল যে কোথায় ঘি আছে! গঙ্গা এবার যমুনার উদ্দেশ্যে বলল, ‘যা রে বোন… ও দাড়া তোকে টাকা দিইনি তো!’ পীতাম্বর এবার বলে উঠলো, ‘রুকো রুকো! আরে ও কলকাতা শহরে কিছু চেনে না কি! রুকো, মে লেকার আতা হু! ছোটা মেয়ে আছে, এখানে গাড়ি টারি বেশী আছে… মে লাতা হু! তা চাল কতটা আনব গঙ্গাজি!

আড়াইশো চাল আনলেই হবে।  পীতাম্বর যেন জানে এবার মাতাজিকে নিয়ে অনেক কথা হবে, তাই সব কথা শুনবার জন্য যেন তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল, তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে বলে!

পীতাম্বর আসতেই সবাই আবার কথা বলতে শুরু করল। তার আগেও সবাই যেসব কথা বলছিল – বেশীর ভাগই গৌরীর উদ্দেশ্যে! মৈত্রী জিজ্ঞেস করল চীনের সীমান্ত পেরোবার পর কি হল! রবার জানতে চাইল পরের কি কি ঘটনা হয়েছে, এই সব!

পীতাম্বর বাজার নিয়ে আসলে, গঙ্গা সেই চাল ধুয়ে, আলু কেটে, হাঁড়িতে চাপিয়ে দিল। আর মিনিট দশের মধ্যেই সেই ফ্ল্যাটে ডেলিভারি বয় পীতাম্বরের অর্ডার করা খাবার দিতে চলে এলো। সকলে খাবার নিয়ে সব ব্যবস্থা করে বসে রইল – মাতাজি আগে খাবে, তারপর সবাই নিজেদের খাবারে হাত লাগাবে!

গঙ্গা ভাত করে নিয়ে এলে, প্রথমে গৌরীর খাওয়া হয়ে গেলে, তারপর সকলে পরপর করে খেয়ে নিল! আসলে সকলের খুব খিদে পেয়েছিল কিনা! খেয়ে, হাত মুখ ধুয়ে সকলে গৌরীর কাছে এসে বসলো। এবার গৌরী একজন একজন করে প্রশ্ন করতে আরম্ভ করল, আর একজন একজন করে উত্তর দিতে থাকল।

গৌরীর প্রথম প্রশ্ন এলো অদিতি আর প্রিয়ার কাছে। গৌরী খুব চিন্তায় ছিল ওদের নিয়ে!ওদেরকে একা ফেলে চলে এসেছিল তোঁ! তাই।

খালিফাই বলতে শুরু করল, ‘আম্মি! তুমি আমাদের দেখে এত সঙ্কোচ করছো কেন! তুমি তো আমাদের এমনি এমনিও ছেড়ে আসোনি, এমন কি নিজের ইচ্ছাতেও ছেড়ে আসোনি! তাহলে!’

গৌরী কিছু বলতে গেলে, অদিতি পাল্টা বলে ওঠে, ‘মা আমরা শঙ্করের কাছ থেকে সবটাই জেনেছি! তুমি সেদিনকে ওই হোটেলের মালিককে তুলে আছাড় মেরে ছিলে! সে আসলে ওখানকার কাউন্সিলারের ভাই, তাই ওরা তোমার পিছনে পরে গেছিল! শঙ্কর তোমাকে সেখানে থাকতে বারণ করে, তোমাকে নিয়ে মোগলসরাই ষ্টেশনে গিয়ে ট্রেনে তুলে দেয়! এই তো!’

গৌরী এবার বলল, ‘তোদের এইসব কে বলল!’

খালিফা মানে প্রিয়া উত্তর দিল, ‘শঙ্কর! সে যে খুব ভালো মানুষ! গরীব দুঃখীদের জন্য তার কত ভাবনা! দুই ভাই ওর! তারাও খুব ভালো – সব ছোট ছোট! তা কত বয়স হবে! একজনের বয়স এই ছয়, আরেকজনের এই বছর ১১ হবে! জানো মা! আমরা তো হারিয়েই গেছিলাম, শেষে অদিতি বলল, একমাত্র গঙ্গার ঘাটে গেলে, তবেই আমরা তোমায় খুঁজে পেতে পারি! তাই আমরা সেখানে গেলাম, আর অমনি শঙ্কর বলে মানুষটা আমাদের পিছন থেকে ডাক দিল!’

অদিতি এবার বলতে শুরু করল, ‘আমাদের কি করে চিনলো কে জানে, কিন্তু ঠিক চিনে, আমাদের দুজনের নাম ধরে ডাকে! বলে আমাদের কেমন দেখতে আর কি পরে আছি, তা নাকি তুমি বলে গেছিলে! তা ছাড়াও সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমরা কাকে যেন খুঁজছিলাম, তাই ওর মনে হয় আমরাই তারা! সে নাকি তোমায় কথা দিয়েছিল, যে আমাদের খুঁজে বার করে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে – তুমিও নাকি পীতাম্বর ভাইয়ের পরিচয় দিয়ে তার কাছে আমাদের দিয়ে আসতে বলেছিলে!’

‘হ্যাঁ! বাবা! সে (শঙ্কর) সবই মনে রেখেছে!’ গৌরী বলে উঠলো। সেই শুনে প্রিয়া আনন্দে ডগমগ করে বলে উঠলো, ‘শুধু কি তাই! তুমি কেমন করে সেদিন ওই হোটেলের মালিককে উল্টে আছাড় দিয়েছিলে, সেটাও সে বলেছে আমাদের! আর বলেছে, তুমিই হলে বিশাল শক্তির আঁধার – আমাদের রক্ষাকর্তি! তুমিই হলে ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ আঁধার – তোমার মত ভালোবাসার ক্ষমতা কারোরই নেই!’

অদিতি আর খালিফা তাদের মাকে সমস্ত ঘটনা পালা করে বলছিল। এবার অদিতি বলে উঠলো, ‘জানো মা! এই বলে শঙ্কর আমাদের আবার প্রশ্ন করে – কোন কারণে আমরা তোমার কাছে আবার ফিরে যেতে চাই – তুমি আমাদের রক্ষাকর্তি বলে নাকি তুমি আমাদের ভালোবাসো বলে! আমি তো দ্বন্দ্বে পরে গেছিলাম – কি বলবো! তুমি তো সত্যিই আমাদের রক্ষা করেছিলে – সেটা যদি স্বীকার না করি, তাহলে তো অন্যায় বলা হয়! আবার তোমার ভালোবাসার কারণেই তোমাকে এক দণ্ড না দেখতে পেলেই দিশাহারা লাগে! কিন্তু কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছিলাম না, কি বলি! আর যেন মনে হচ্ছিল যে দুটোর মধ্যে ঠিকটা বেছে নিলে তবেই সে আমাদের তোমার কাছে নিয়ে আসবে! তাই মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল! রীতিমত ভয় লাগছিলো জানো, যেন মনে হচ্ছিল তোমাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবো!

প্রিয়া সেই সময়ে আমাদের বাঁচিয়ে দিল আর বুঝিয়ে দিল –যেকোনো হৃদয়বান ব্যক্তিই বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে, কিন্তু ভালোবাসতে, শুধু আর শুধুমাত্র তুমিই পারো! খালিফা কি বলল জানো! বলল – জীবন তো দুদিনের! কে কতদিন আর বাঁচাবে! একদিন না একদিন তো মরতেই হবে! কিন্তু ভালোবাসা –ভালোবাসা জীবনের সব থেকে সেরা প্রাপ্তি! আম্মি আমাদের কনো কারণ ছাড়া, কনো উদ্দেশ্য ছাড়া ভালোবেসেছে! তাঁকে একবার দেখব বলে, সেই ভালোবাসার টানে মন একেবারে পাগল হয়ে উঠেছে! সেই শুনে শঙ্করের কি আনন্দ! সে নিজে এসে পীতাম্বর ভাইয়ের কাছে আমাদের দিয়ে গেছে!’

‘জানো মা!’ এবার খালিফা বলতে আরম্ভ করল, ‘শঙ্কর বলেছে সে তোমার কাছে আসবে, তার দুই ভাইকে নিয়ে, তবে কাশীর অবস্থার একটু উন্নতি করে তবেই আসবে! তার আগে নয়!’

গৌরী মিষ্টি হেসে এবার অদিতি আর খালিফা দুজনের দিকেই তাকিয়ে, তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলতে আরম্ভ করল, ‘এই দেখ গঙ্গা যমুনা, এই হল অদিতি আর এই প্রিয়া!’ তারপর মৈত্রী আর রবারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি সীমান্তের ওপারে যাবার পর, এদের সাথে আলাপ হয়েছিল – খুব বিপদে পরেছিল মেয়ে দুটো! খুব ভালো মেয়ে ওরা! কৈলাস থেকে পুরো কাশী অবধি ওরা আমার সাথে ছিল! তারপর আলাদা হয়ে গেছিল, আবার ফিরে এসেছে!’

গৌরী এবার একটু অভিযোগের সুর করেই অদিতি আর খালিফার উদ্দেশ্যে বলল, ‘হ্যা রে তোরা আমায় ছেড়ে চলে গেছিলি কেন?’

অদিতি দুঃখ করেই বলল, ‘সে আর বোল না মা! সেদিন ওই ভিড়ের মধ্যে প্রিয়াকে একটা ষণ্ডামার্কা লোক টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছিল! সেই দেখে আমি সেই লোকটারদিকে পাথর ছুঁড়তে ছুঁড়তে ছুটতে থাকি, সবশেষে লোকটি প্রিয়াকে ছেড়ে পালায়, কিন্তু তখন আমরা অচেনা একটি জায়গায় পৌঁছে গেছি! কিন্তু তুমি নেই সেখানে! আমাদের দুজনেরই সে কি পাগল পাগল অবস্থা, কি বলব তোমায়!’

পীতাম্বর কিছু বলছিল না, সে বসেও নি! সকলকে সে যেন একসাথে দেখতে চাইছিল! সব কিছু দেখে মনে মনে বলল – সত্যি জগদম্বার অশেষ কৃপা! গঙ্গাদেবী ঠিকই বলেছে! না হলে, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সব একসাথে হয় কি করে! সবাই যেন সবাইকে নিজের ভাইবোনের মত ভালোবাসে! এখানে কেউ সুদূর ইংল্যান্ড থেকে এসেছে, তো কেউ বাংলাদেশ থেকে! কেউ চীন থেকে তো কেউ আফগানিস্তান থেকে! সব কিরকম মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে – সচ মে, ভালোবাসা থাকলে, জাত, দেশ কোই কুছ ভি নেহি কর শকতা! জয় মাতাজি! জয় মাতাজি! আপনার বহুত সারা গুণ আছে, কিন্তু এই ভালোবাসার গুণ– লাজবাব! লাজবাব! শত্‌ শত্‌ প্রণাম!’

এবার গৌরীর চোখ ঘুরল মৈত্রী আর রবারের দিকে। শুধু চোখ ফেরারই যেন অপেক্ষা! রবার হিন্দিতে বলতে শুরু করে দিল, ‘মাতাজি! আমার সাথে তো চমৎকার হয়ে গেছে! এই দেখ তোমার দেওয়া আঙটি! পুরো হলুদ হয়ে গেছে! তাই মৈত্রীকে আমি ফোন করেছিলাম! মৈত্রী বলে সে তোমাকে কোথায় খুঁজবে? আমি ভেঙে পরেছি দেখে আমাকে ওর কাছে ডেকে নেয়! আমিও চলে গেছিলাম যোষিমঠ! সেখানে গিয়ে তোমার সব কথা বলতে বলতে পীতাম্বর ভাইয়ের কথাও বলি! মৈত্রী আবার পীতাম্বর ভাইকে চেনে!’

এবার মৈত্রী রবারের কথাটা ধরে নিল।  ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে সে বলতে শুরু করল, ‘আসলে যখন সাপের ব্যবসা করতাম, তখন পীতাম্বরবাবু যোষিমঠে আমার কাছে একবার এসেছিলেন – সাপের মাথার মণির খোঁজে! তাই উনার নম্বর ছিল আমার কাছে! রবার আমাকে বলতেই, আমি উনাকে ফোন লাগাই, আর উনি কলকাতায় চলে আসতে বলেন!’

গৌরী এবার প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা মৈত্রী তোর ফিরতে অসুবিধে হয়নি তো!’

জিং মানে মৈত্রী হেসে বলে উঠলো, ‘নেহি মাতাজি! ফিরতে কনো অসুবিধে হয়নি! আসলে আমি ফেরার সময়ে জঙ্গল দিয়ে আসিনি! পাহাড়ের গা ধরে ধরে চলে এসেছি! এসে প্রথমে ঘোড়াটাকে আর তারপর সাপগুলোকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এলাম! কিন্তু কিছুই ভালো লাগছিলো না জানো! ঘুরতাম ফিরতাম আর তোমার কাছে চলে আসতে ইচ্ছা করত! খুব মনে আসতো, সারাদিন তোমার কথাই ভাবতাম আর মনে মনে কাঁদতাম!’ এই বলে মৈত্রী ছোট মেয়ের মত মায়ের কোল খুঁজে নিয়ে নিজেকে তাতে পুরো ভাসিয়ে দিল! গৌরী ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে শান্ত করল, কিন্তু মৈত্রীর চোখ অঝোর ধারায় বর্ষণ করতেই থাকলো! সে চোখ ভর্তি জল নিয়েই বলে উঠলো, ‘আমি আর কোথাও যেতে চাই না মা! সারা জীবন তোমার কাছেই থাকবো শুধু এটাই চাই!’ কথাটা মৈত্রী বললেও, যেন সে সকলের মনের কথাটাই বলল।

সেই কথা শুনে, সবার চোখে জল দেখে, পীতাম্বর নিজের মনে মনে বলে ঊঠলো যে – আমার দশ মিনিটের দেখাতেই আমি মাতাজিকে ভুলতে পারিনি, আর এরা তো দিনের পর দিন তাঁর সাথে থেকেছে ! না! সারাজীবন খালি পয়সা পয়সা করেছি! এবার কিছু পুণ্য কর্ম করবো! এবার এই সব ভক্তদের জন্য কিছু করবো!

এরপর গৌরী, সবার সাথে গঙ্গা আর যমুনার পরিচয় করালো, তারপর বলল, ‘আমি একটু শোব!’ সেই শুনে পীতাম্বর বিছানা তৈরি করতে প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পরল! যমুনা আর খালিফাও বিছানা তৈরি করতে পীতাম্বরের সাথে হাত মেলালো।  কিন্তু গৌরীর কথা আর কাজের মধ্যে যেন বিন্দুমাত্র সময়ের পার্থক্য থাকে না! সে গঙ্গার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েই পরল! বিছানা করে এসে যমুনা দেখল, গৌরী ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছে আর গঙ্গা যেন নিজের মেয়েকে আগলে রাখার মত গৌরীর পুরো শরীরটাকে নিজের পা ছড়িয়ে কোলে তুলে নিয়েছে!

সবাই এবার এক বিশাল চিন্তায় পরে গেল! গৌরীর কি ঘুম ভাঙ্গাবে! গঙ্গা রবারকে বলে উঠলো, ‘রবার ভাই, মাকে একটু শুইয়ে দাও না!’ রবার কুণ্ঠা করছিল দেখে গঙ্গা হেসে বলে উঠলো, ‘রবার! পাহাড়ে চড়ার সময়ে মাকে হাত ধরে তুলে ওঠাও নি! তবে এখন কুণ্ঠা কিসের! মায়ের শরীরে ছেলে হাত দেবে, তাতেও কুণ্ঠা!’

রবারের যেন একটু অনুশোচনাই হল কথাটা শুনে! খুব যত্নের সাথে গৌরীকে তুলে বিছানায় শুয়ে দিলে, যমুনা একটা চাদর দিয়ে সুন্দর করে ওর মায়ের গলা অবধি ঢেকে দিল। অদিতি ছাড়া সেই ঘরে আর কেউ রইল না – অদিতির যেন মাকে ছেড়ে একদণ্ডও থাকতে ইচ্ছা করছেনা!

বাইরে এসে সকলে একে অপরের সাথে আলাপ আর আনন্দ করতে মত্ত হয়ে রইল, কিন্তু সবার যেন একটাই চিন্তা! মায়ের যেন ঘুম না ভেঙে যায় – তাই সবার গলাই চাপা! পীতাম্বর সব দেখছে আর আনন্দে বিভোর হয়ে যাচ্ছে – সকলের একের অপরের উপর বিশ্বাস আর ভালোবাসা একটা মোটা সুতোর মালায় গাঁথা।  আর সম্পূর্ণ মালাটা হল তার মাতাজি!

কিন্তু কে এই মাতাজি! কেনই বা ইনার এত সহ্য ক্ষমতা! কেনই বা ইনার এত করুণা! পীতাম্বরের সেদিকে হুঁশ নেই। যমুনা ভাবতে লাগলো একমাত্র পীতাম্বরই জানে – ওর দিদি পীতাম্বরকে কিছু বলেছে, যাতে হয় পীতাম্বরের সমস্ত সংশয় চলে গেছে, নয় সে দিদির সাথে মিলে কিছু একটা করার চেষ্টা করছে! যমুনার ভাবনার তরঙ্গ, পার অবধি পৌঁছাবার আগেই পীতাম্বরের কথায় সবার আকর্ষণ তার দিকে চলে গেল।

পীতাম্বর বলতে আরম্ভ করল, ‘ভাইরা আর বোনরা! আমরা এখানে যারা রয়েছি, তাদের সকলের ভাষা এক না, দেশও এক না, এমনকি আমাদের জাতিও আলাদা।  তবুও আমাদের মনের মিল এক হওয়ায় আজ আমরা সকলে একসাথে রয়েছি।  আর আমাদের সেই মনের মিলের কারন হল মাতাজি আর তার অফুরন্ত ভালবাসা।  আজ আমি বুঝলাম ভালবাসতে গেলে ভাষা, জাতি বা দেশ বাধা হয়ে দাড়ায় না।  সেটা মাতাজি হি আমাদের শিখিয়েছেন।  আসলে মাতাজি জাতপাত ও ধর্মের উপরে গিয়ে সবাইকে ভালবেসে আপন করে নিতে পারেন।  আমার তো মনে হয়, আমাদের মাতাজি শিবের নাম করলেও, তিনি তথাকথিত হিন্দুত্ববাদীও নন! আপনারা কি বলেন!’

রবার প্রথম আওয়াজ তুলল হিন্দিতে, ‘মাতাজি আমাদের মাতাজিই! তিনি না তো হিন্দু, না তো অন্য কনো জাতির! তিনি নিজেই একটা জাতি আর সেই জাতির কাছে সব জাতি যেন একই বাড়িতে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন আলমারি! মানে মাতাজি সব জাতির উপরে, সব জাতি তাঁর কাছে খোলামকুচির মত, যদি তাতে ভালোবাসা না থাকে! তাই আমার মনে হয় আমাদের মাতাজিই হল আসল জাতি – প্রেমী জাতি!’

ঘরে উপস্থিত সকলেই আওয়াজ তুলল, ‘কেয়া বাত! কেয়া বাত!’ বলে। সেই শুনে অদিতি পাশের ঘর থেকে একরকম ছুটে এসেই বলল, ‘মা ঘুমাচ্ছে!’

পীতাম্বর এবার অদিতির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মাতাজি কি ঘুমিয়ে পরেছে!’ অদিতি ঘাড় নাড়লে, পীতাম্বর আবার অদিতিকে বলে, ‘অদিতি, আমরা এখানে একটা জরুরি কথা বলছি, আমার মনে হয় তোমারও এখানে থাকা উচিত!’

অদিতি মিষ্টি হেসে বলল, ‘খালিফা আছে তো! ও যা বলবে আমারও তাই কথা! বাকিদের উপরও আমার সমান বিশ্বাস আছে, কিন্তু খালিফাকে তো আমি কাছ থেকে দেখেছি, তাই ওর উপর আপাতত বিশ্বাসটা একটু বেশী! … মা ওই ঘরে একা আছে! আমি বরং একটু তাঁর কাছে গিয়ে বসি! … আসলে মার থেকে একটুও দূরে থাকতে ইচ্ছা করছে না…! অনেকদিন তাঁকে দেখিনি তো!’

গঙ্গা হেসে বলল, ‘ঠিক আছে যাও! কি ঠিক হয়, খালিফা তোমাকে বলে দেবে। ঠিক আছে!’ পাল্টা মিষ্টি হাসি দিয়ে অদিতি চলে গেল পাশের ঘরে আর দরজাটা একটু চেপেই বন্ধ করে দিল, যাতে বাইরের আওয়াজে মায়ের ঘুম না ভেঙে যায়!

পীতাম্বর এবার বলে উঠলো, ‘আমি আর রবার যে ঠিক বলছিলাম, তার সব থেকে বড় উদাহরণ এই মুহূর্তে আমরা পেয়ে গেলাম  – খালিফা ইসলাম আর অদিতি খৃষ্টান – কিন্তু দুজনের একের অপরের প্রতি বিশ্বাস আর শ্রদ্ধা দেখে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় – মাতাজির কৃপায় সব জাতি এক হয়ে গেছে!’

পীতাম্বরকে এবার খালিফা বাঁধা দিয়ে বলল, ‘আমার নাম প্রিয়া আর এলিজাবেথের নাম হল অদিতি! আমরা আর না তো খ্রিস্টান, না তো ইসলাম, আর না হিন্দু – আমরা সকলে এখন প্রেমী! আম্মির নামে প্রেমী!’

সেই উত্তেজনাময় কথাটা শুনে, সকলেই আনন্দ পেল আর বলে উঠলো, ‘বেশ আমরা আজ থেকে নতুন এক জাতি – প্রেমী জাতি!’

তাতেও সকলে বাহ বাহ করে উঠতে, সকলকে থামিয়ে পীতাম্বর আবার বলা শুরু করল, ‘বেশ মাতাজির প্রেমীরা, একটা জিনিস আমাদের ঠিক করতে হবে – আর সেটা হল, সকল প্রেমীকে এক জায়গায় থেকে, একসাথে ওঠা বসা করে, আর সবার মাঝে মাতাজিকে রেখে আমাদের প্রেমকে, ভাবে চেঞ্জ করে দিতে হবে! কি তাই তো!’

সবার সম্মতি পেলে, পীতাম্বর তার কথা নিয়ে এগোতে থাকে। সে বলে, ‘বেশ তবে আমি আগেই যা বলেছিলাম, আমার রোসডেলে একটা ফ্ল্যাট আছে, সেখানেই সবাই থাকবে! ওখানে চারটে ঘর আছে, বাথরুম আছে তিনটে আর তার সাথে আছে কিচেন আর বসার-খাবার জায়গা! বড় জায়গা! একটা ঘরে মাতাজি আর অদিতি থাকবে! কারণ সবাই মাতাজিকে ভালোবাসলেও, অদিতি মাতাজির সেবাকেই নিজের জীবন মেনে নিয়েছে! কি বল তোমরা?’

সকলেই পীতাম্বরকে সমর্থন করল। তাই পীতাম্বর তার পরের কথায় চলে গেল। সে বলতে থাকল, ‘একটা ঘরে ছেলেরা থাকুক – মানে আমি যখন যাবো তখন, আর রবার। এ ছাড়াও মহেন্দ্র বলে একজন আছে, যাকে গঙ্গাজী পরে ডেকে নেবে বলেছে! আর আরও যে একটা ঘর রয়েছে, সেটাতে মেয়েরা থাক, মানে মৈত্রী, খালিফা, গঙ্গা আর যমুনা! আরেকটা ঘর খালি থাকছে, সেখানে যমুনা লেখাপড়া করবে – ওর এখনও বয়স কম, লেখাপড়া ভি করতে হবে, কি বেটিয়া!’

যমুনার যেন ইচ্ছা নেই, কিন্তু পাশে দিদি বসে আছে, এদিক ওদিক করলেই ধমক খাবে। তাই আস্তে করে হেসে ওঠে! ’বসার জায়গায় গান, মজলিস আরো অনেক আনন্দ হবে! কি চলবে তো?’ পীতাম্বরের এবার সকলের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন।

গঙ্গা এতক্ষণ শুনছিল। সে এবার বলে উঠলো, ‘দুটো, না তিনটে জিনিস বলার আছে। বলব পীতাম্বরজী?’

‘হা জরুর, জরুর!’ পীতাম্বরের গঙ্গাকে প্রাধান্য দেওয়াটাতে যমুনার অসুবিধা নেই, কিন্তু ওর যে কিসের একটা সংশয় মাথার মধ্যে চলছে! কিছুতেই তার নিরাময় হচ্ছে না!

গঙ্গা অনুমতি পেয়ে এবার বলতে শুরু করল, ‘প্রথম হল, আমরা যে সবাই এক সাথে থাকবো, তা সবার খাওয়া দাওয়া, পোশাক আসাকের খরচ কোথা থেকে আসবে!’ পীতাম্বর উত্তর দিতে যাচ্ছিল, গঙ্গা তাকে থামিয়ে দিয়ে পীতাম্বরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আগে আমি বাকি দুটো কথাই বলে নিই! ঠিক আছে পীতাম্বরজী!’ এবার সবার দিকে তাকিয়ে গঙ্গা বলল, ‘দ্বিতীয় কথাটা হল, আমার বাড়ি রয়েছে গ্রামে… আমি ভেবেই রেখেছিলাম যে সেটা বিক্রি করে দেব! এবার সত্যিই দেব, আর সেই থেকে আসা টাকাতে আমাদের সবার থাকা খাওয়া বেশ কিছুদিন ধরে চলবে। কিন্তু সেটাও বা কতদিন! … আর শেষ কথাটা হল এই যে, একটা জিনিস রয়েছে, যেটাকে মায়ের এক বিশেষ কাজ বলতে পারো, বা স্বপ্নও বলতে পারো। সেই কাজে বিপুল অর্থ আর বিপুল খ্যাতিও লাগবে! সেটা কি করে যোগাড় হবে!’

পীতাম্বরের ব্যবসাদার মানুষ। মাথাখানা খাসা! ওর কথার ধাঁচ দেখলেই বোঝা যায়, ব্যবসাদাররা নিজের বিষয়ের বুদ্ধি খালি টাকা কামানোতে লাগিয়ে সত্যিকারে বুদ্ধির অর্ধেকটাও ব্যবহার করে না! সত্যিকারের গঠনমূলক কাজে সেই বুদ্ধি ব্যবহার করলে, পৃথিবীর চেহারাটাই পাল্টে যেত! পীতাম্বর বলতে থাকলো, ‘গঙ্গাজীর সব কটা কথার উত্তর একটা জিনিসেই সম্ভব! সেটা হল সিনেমা! যে ভালো গল্প বলতে পারে, তাকে আমি একজনের কাছে নিয়ে যাবো। তাকে সে গল্প বললে, সে ভি সেটাকে লিখবে আর সেই লেখাটা একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট হয়ে যাবে। তারপর সেই স্ক্রিপ্টের উপর একটা সিনেমা হবে, এখনও পর্যন্ত মাতাজির যা কিছু হল, সেটার উপর সিনেমা হবে, সেকেন্ডটা মাতাজি আগে আগে যা করবে, সেটার উপর হবে, আর শেষ একটা সিনেমা হবে, যেটা অনেকদিন পরে বেরুবে! সেই সিনেমা থেকে টাকা ভি এসে যাবে, আর সাথে সাথে মাতাজি ফেমাস ভি হয়ে যাবে! সেই টাকায় মাতাজির যো স্বপ্না আছে, সেটাকে করা যাবে! কেয়া বলতে হো সব?’

খালিফা এবার বলে উঠলো, ‘আর আমরা বাকিরা সব বসে বসে খাবো, কিছু করবো না!’

পীতাম্বর হেসে উত্তর দিল, ‘না! না! বসে বসে খাবে কেন?সেই সিনেমাতে আমরা বাইরের কাউকে নিব কেন! আমরাই সবাই অভিনয় করবো! আচ্ছা আপ সব হি বলিয়ে, আপনাদের কি লাগে! আমাদের মনের ভালোবাসাটা অন্য কেউ বোঝাতে পারবে ? … আচ্ছা ছোর হি দিজিয়ে আমাদের কথা, মাতাজির ভালোবাসা! কে পারবে ওটা দেখাতে! বলুন আমাকে?’

সবাই চুপ করে গেছে দেখে, পীতাম্বর আবার বলে উঠলো, ‘এতে কি হবে, মাতাজির সেবা ভি হবে, আর তার সাথে মাতাজির কাজ ভি হবে! একহি সাথে আমরাও চুপ করে বসে সোবাই খেলাম না, আর শুধু একজন খালি  খেটে খেটে মরলোও না! কি বলেন গঙ্গাজী! এটা ভালো হবে না? মাতাজি আমাদের সবার মা! আমরা সবাই মিলে তাঁকে ভালো রাখবো! সবাই মিলে আমরা তাঁর কাজ করবো!’

সকলের মনের মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় একটা আনন্দের বিদ্যুৎ খেলে গেল! সকলে সম্মত হলেও, মাঝখান থেকে গঙ্গা বলে উঠলো, ‘আমাকে কিন্তু কিছুদিনের জন্য বাড়ি যেতে হবে। ওখানে গিয়ে বাড়ির বিক্রির ব্যবস্থা করে আসতে হবে! বেশ কিছুদিন মানে প্রায় মাস দুয়েক!’

‘না দিদি, এতদিন কি করে হবে!’ খালিফা বলে উঠলো! মৈত্রীও আপত্তি করে উঠলো। মৈত্রী হিন্দিতে বলে উঠলো, ‘তুমি এখন যাও, এক সপ্তাহ থেকে বিক্রির ব্যবস্থা করে এস! তারপর না হয় আমরা একেকজন পাল্টে পাল্টে গিয়ে দেখাশুনা করে আসব!’ একটু থেমে গিয়ে মৈত্রী আবার বলল, ‘আসলে আমরা সবাই সেই বাড়ি বিক্রির টাকাটায় খাব, কিন্তু পরিশ্রম তুমি একা করবে, তা বললে কি করে হবে বলো!’

এবার প্রিয়া বলে উঠলো, ‘সবার আগে, আমাদের যমুনাকে একটা স্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে। অন্য যেই যাক দিদির সাথে, দিদিকে যেতেই হবে, কারণ পাড়া গাঁয়ের ব্যাপার, যার বাড়ি সে না গেলে, গোলমাল হয়ে যাবে। একবার মৈত্রী, তুমি গেলে, একবার রবার গেল, আর যমুনা আমার কাছে থাকলো! … (যমুনার দিকে তাকিয়ে) কি যমুনা এই দিদির কাছে থাকবে না!’

যমুনার যেন ভরা সংসার! কি আনন্দ ওর! কত দিদি, কত দাদা আর তার সাথে মা! ওর আনন্দ দেখে কে!

অন্যদিক থেকে গঙ্গা বলে উঠলো, ‘তার আগে মহেন্দ্রকে ডেকে নিতে হবে! আমরা এখানে মা-কে পেয়ে আনন্দ করছি, আর ও বেচারার কাজে কনো মন নেই, সারাক্ষণ মাকে নিয়ে ভাবছে, আর রেলের ঘানি টেনে যাচ্ছে!’

রবার এবার বলল, ‘হা ও এসে গেলে, পীতাম্বর ভাইয়েরও একটু সুবিধা হবে! সরকারী কাজ করে তো, অনেক জানাশুনা থাকবে ওর!’

পীতাম্বর এবার বলে উঠলো, ‘বেশ গঙ্গাজী আপনি মহেন্দ্রকে একেবারে রোসডেলেই ডেকে নিন! আর সবার আগে সেখানে আমাদের মাতাজিকে নিয়ে যেতে হবে!’ একটু থেমে এবার গঙ্গার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তু মাতাজির কাজটা কি! মাতাজি তো শিবজীর সন্ধান করছিল – আবার কি কাজ!’

গঙ্গা চুপ করে বসেছিল দেখে, একে একে সবাই ওকে প্রশ্ন করতে থাকলো, ‘কাজটা কি মাতাজির!’

তার উত্তরে গঙ্গা এবার বলতে থাকলো, ‘কাজ কি! … বেশ বলছি! … তবে তার আগে আপনারা সবাই একটা কথা বলুন তো! … আচ্ছা আপনাদের মাতাজি বা আম্মি আসলে কে! … কেন আমরা সকলে ওর প্রতি এইভাবে আটকা পরে গেছি, বলতে পারেন?’

সেই কথা শুনে, প্রথমে রবার বলতে শুরু করল, ‘এটা ভি ঠিক কথা! মাতাজি আসলে কে! … আমরা এই রকম বিচ্ছিরি ভাবে উনার কাছে ধরা দিতে বাধ্য হয়েছিই বা কেন… সত্যি কথা বলতে, উনাকে দেখার পর থেকে অন্য কিছু যেন আর ভাবতেই পারছি না!’

ওর কথায় মৈত্রীও সঙ্গ দিল। সে বলে উঠলো, ‘ঠিকই! আমার তো মন প্রাণ, সব ঘিরে খালি উনি রয়েছেন! ছোটবেলা থেকে পশু পাখি নিয়েই দিন কাটিয়েছি। উনাকে দেখার পর থেকে একটা মানুষকে যে এত ভালোবাসা যায়, সেটা আমি প্রথমবার জানলাম!’

এবারে পালা খালিফার। সে বলে উঠলো, ‘উনি আমার সব কিছু হয়ে গেছেন! সব মানে সব!’

এই কথা শুনে পাশের ঘর থেকে অদিতিও বেরিয়ে এসে বলল, ‘সত্যিই! উনি যেন আমার  শ্রীকৃষ্ণ! মূর্তি থেকে বেরিয়ে সামনে এসে গিয়েছেন!’

যমুনাও গলা মেলাতে ছাড়ল না , ‘উনি আমার মা! আমি ওকে ছাড়া বাঁচবোই না!’

গঙ্গা বলে উঠলো, ‘তাহলে সকলে ভেবে দেখ, উনি কে এমন যে তাঁকে ছাড়া তোমরা বাঁচবে না!’

প্রথমে রবার মাতাজি সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করল, ‘আমি প্রথম দেখাতেই মাতাজিকে দেখে অবাক হয়ে গেছিলাম। ঠাণ্ডারসময় তাও ঠিক আছে, কিন্তু বরফের উপর দিয়ে যাবার সময়েও যার ঠাণ্ডা লাগে না, সে কেমন জন চিন্তা কর! সাধুদের না হয় বোঝা যায়, বছরের পর বছর সাধনা করার ফলে, সাধনার উষ্মায় তাদের ঠাণ্ডা লাগে না! কিন্তু মাতাজির ব্যাপারটা তো সম্পূর্ণ আলাদা! তিনি তো সেরকম কোন সাধনাই করেননা! তবে মাতাজির কি করে এত উষ্মা আসে!’

যমুনা বলে উঠলো, ‘আমিও এটা মায়ের মধ্যে দেখেছি! মায়ের কাছে থাকলে কনো ঠাণ্ডাই লাগে না! আমি মায়ের পাশে শুতাম, তখন খেয়াল করেছিলাম!’

রবার বলতে থাকলো, ‘শুধু কি ঠাণ্ডা! আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম, অমরনাথ গুহায় মাতাজি কিরকম ভাবে ভাবস্থ হয়ে গেছিল! আর সব থেকে বড় কথা কি জানো! যখন হরিণগুলো মায়ের কাছে এসে নিজেদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল, তখন আমি তো তা দেখে অবাক! ভালোবাসা তো বুঝলাম, কিন্তু সাহস! ওই জায়গার কেউ ওই হরিণের সামনা সামনি হতেই পারে না! মাতাজি তো অবলীলায় তাদের সামনা সামনি শুধু হলেনই না! উল্টে তাদেরকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করলেন! আর সব থেকে আমার আশ্চর্য লেগেছিল এইটা ভেবে আর দেখে যে মাতাজির মধ্যে এমন কিছু ক্ষমতা আছে, বা এমন কিছু তাঁর মধ্যে আছে, যার জন্য যেকনো পশুই তাঁর কাছে আদর পাওয়া ছাড়া অন্য কোন কারণে আসতেই পারে না!’

রবারের কথা এবার মৈত্রী ধরে নিল। এবার সে বলতে থাকলো, ‘হরিণ তো তাও শান্ত পশু, মানে মানুষ তো আর তার খাদ্য নয়! মানুষকে গুঁতোয়, কারণ সে ভয় পায় যে মানুষ তার ক্ষতি করে দেবে! কিন্তু সাপ! বিষধর সাপ, যাদের দেখলেই মানুষ ভয়ে সিটিয়ে যায়, যারা নাকি মানুষ দেখলেই হয় পালায় নয় তাদের ওপর বিষ ঢেলে দেয়! সেই সাপ নাকি আদর খেতে মাতাজির কাছে চলে গেল! এটাও কি সম্ভব! আমি যখন প্রথমবার দেখলাম, আমার তো যেন প্রাণটাই বেরিয়ে যায় যায়! এই রবারও তো ছিল আমার সাথে। পরে সব মিটে যেতে ভেবেছিলাম, কি করে এটা সম্ভব হল! সাপ মানুষের কাছে আদর খেতে গেছে, জীবনে কোনদিন শুনেছো! আমি এতদিন পশুপাখি নিয়ে কাজ করছি, কিন্তু কোনদিন শুনিনি!’

একটু থেমে আবার সেবলতে শুরু করল, ‘ঠিক আছে সাপ না হয় ছেড়েই দিলাম, কিন্তু সেই বাঘিনী!’…‘বাঘিনী!’ চমকে উঠে বলে উঠলো অদিতি আর খালিফা।

মৈত্রী উত্তরে বলতে থাকলো, ‘হ্যাঁ বাঘিনী! নন্দাদেবী বন থেকে আমরা যেদিন বেরুব, সেদিন আমি তো বাঘিনীর খপ্পরে পরেছিলাম। আমার পা আটকে গেছিল পাথরে! কিছুতেই বার করতে পারছিলাম না! আমি তো নিশ্চিত ছিলাম যে আমার মৃত্যু সামনে! কিন্তু মাতাজি! সেই মাতাজি! শুধু লাঠি দিয়ে পাথরে একটা ঠোক্কর! আমি তো ভেবেছিলাম ভূমিকম্প এসে গেছে! সারা জায়গাটা নড়ে গেছিল সেই লাঠির ধাক্কায়! এটা কি করে সম্ভব হল আমার কাছে আজও তা ধোঁয়াশা! সাধুর কি এমন ক্ষমতা থাকে! আমার পা যেই পাথরটাতে আটকে ছিল, আমি জোর করে বলতে পারি তিন থেকে চারজন শক্তিশালী পুরুষ মিলেও সেই পাথর নড়াতে পারতো না। মাতাজি একটা সামান্য লাঠির ধাক্কায় সেই পাথরটাকে পাঁচ থেকে ছয় খানা টুকরোতে ভেঙে দিল! সেদিন সেটা কিভাবে হল, তা আজও আমার মাথায় কিচ্ছুটি ঢোকেনি!’

মৈত্রীর কথা তখনও শেষ হয়নি! সে বলতে থাকলো, ‘সেই বাঘিনী তার সব কটা ছেলে মেয়ে নিয়ে, বন থেকে বেরনোর সময়েও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে এলো! বাঘিনীটা বাচ্চাদের প্রথমে এগিয়ে দিয়ে, তারপর নিজে মাতাজির পা এমন করে ছুঁয়েছিল, ঠিক যেন মনে হল, মাতাজির পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিতে এসেছিল! আর এটা আমি নিজের চোখে দেখেছি! তোমরা কি বলবে, এটা সাধুর কর্ম! আমি তো ধরেই নিয়েছি, মাতাজি গুয়ানী ছাড়া আর কেউ নন!’

সবাই কথা কি বলবে, মন্ত্রমুগ্ধের মত সব শুনছিলো! মৈত্রীর বিস্ময় তখনও শেষ হয়নি! সে বলতে থাকলো, ‘আর শেষে যেটা হল, সেটাকে অলৌকিক ঘটনা ছাড়া আরকি বলব! ঘুম থেকে উঠে দেখি কি মাতাজি সীমান্তের ওপারে! কিছু চমৎকার হলেই নাকি শিবজী করেছেন! এদিকে রবার বলেছিল, মাতাজিকে নাকি শিবজী অমরনাথ গুহায় বলেছিলেন, তিনি নাকি শব হয়ে রয়েছেন – উনি না গেলে তিনি আবার শিব হবেন না! কি রবার তাই তো!’

রবার অন্যদিক থেকে বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ! মাতাজি  গুহা থেকে বেরিয়ে এই কথাটাই বলেছিল!’

মৈত্রী বলতে থাকলো, ‘তাহলেই ভেবে দেখ! শিবজী না চমৎকার করতে পারেন, কিন্তু একতা শব কি করে এই চমৎকার করবেন!’

এবার যেন অদিতি আর খালিফার বলার সময় এসেছে। ওরা দুজন ভাগ করেই পুরো ঘটনাটা  বলতে থাকলো! প্রথমে খালিফাই শুরু করল, ‘আমি আর অদিতি বারংবার শুধু আম্মির চমৎকারই দেখেছি! চমৎকারগুলো আম্মি করেনি, কিন্তু চমৎকার তো হয়েইছে! একের পর এক হয়েছে!’

এবার অদিতি বলে উঠলো, ‘মা চমৎকার করেনি কোথায়! ভিকির সময়টা ভুলে গেলি! কি প্রচণ্ড শক্তি! উনার শক্তির কাছে ভিকি আর ওর চ্যালাদের মিলিত শক্তিও যেন কনো কিছুই নয়! মা-র সামনে ওরা দাঁড়াতেও পারেনি! একবার খালি ওঠার সাহস দেখিয়েছিল, কিন্তু সেইবারের মারে ওরা পুরোপুরি ধরাশায়ী!’

‘কিন্তু ওই আমরা কোথায় যেন চলে গেছিলাম! আমরা যখন ফিরলাম, তখন আমাদের পেট ভর্তি, আমাদের পোশাক পাল্টে গেছে, আর আমাদের সাথে তো আমাদের জন্য তিনটে শাড়ীও ছিল! কি করে এলো সেই সব!’

এবার গঙ্গা বলতে শুরু করলো, ‘এর উত্তর আমি দিচ্ছি! তোমরা তো কিছুই দেখতে পাওনি! তাই না! কিন্তু মা দেখতে পেয়েছে! তোমারা একটা ঝিলের পাশে বসে ছিলে তাই তো! তার পরেই এই নতুন কাপড় টাপড় দেখ, কি তাই তো!’

অদিতি আর খালিফা সহমত প্রকাশ করলে, গঙ্গা বলতে থাকে, ‘সেই সময়ে একজন মোটা লোক তোমাদের কাছে আসে আর মাকে তার সাথে যেতে বলে! তোমরা তাকে দেখতে পাওনি, কারণ তাকে চেতনা ছাড়া দেখা যায় না! সে ছিল সূক্ষ্ম শরীরে – তাই তোমরা দেখতে পাওনি! কিন্তু মা তাকে দেখেছিল শুধু এইটাই নয়, যেখানে তোমাদের নিয়ে গেছিল, সেটাও দেখেছে!’

যমুনা এবার বলে উঠলো, ‘দিদি! তুই তখন কথাগুলো শুনেছিস! আমি তো ভেবেছিলাম, তুই বোধ হয় শুনছিস না!’

গঙ্গা হেসে বলল, ‘তোমাদের সব সংশয় শোনা হয়ে গেলে, আমি তোমাদের সব সংশয়ের উত্তর দেব! হ্যাঁ উত্তর দেব! আমি উত্তর দিতে পারব, কারণ আমাকে তার উপলব্ধি করতে দেওয়া হয়েছে! এর থেকে বেশী এখন কিছুই বলব না – বলব তোমাদের বলা হয়ে গেলে!’

অদিতি আবার বলতে থাকলো, ‘মায়ের অদ্ভুত জ্ঞান! জানো! অদ্ভুত জ্ঞান! আর মা যখন বলে, তখন যেন মনে হয়, শুধু আমি নয়, শুধু খালিফাই নয়, সেই কথা সকলেই শুনছে! আর চমৎকার! সব থেকে বড় চমৎকার তো হয়েছিল কৈলাসে গিয়ে! মা তিনদিন সমাধিস্থ হয়েছিল! সেই সময়ে নাকি তাঁর মহাদেব দর্শন হয়েছে!’

প্রিয়া এবার বলতে থাকলো, ‘না! সেটা তো আম্মি নিজেই বলেছে যে সেটা তাঁর স্বপ্ন! সেটা নিয়ে চিন্তার কি আছে! সে তো কত কিছু বলেছিল, মহাদেব কত মান দিয়েছিল, নন্দীকে নাকি স্বপ্নে তাঁকে নিয়ে যেতে আর ফিরিয়ে নিয়ে আসতে দেখেছিল, আর মা-কে গণেশ কি যেন একটা পাথর দিয়েছিল! ওগুলো তো মা নিজেই বলেছে মায়ের কল্পনা ছিল!

‘স্বপ্ন! স্বপ্নতেও মহাদেবের দর্শন পাওয়া কি মুখের কথা! তুই পেয়েছিস! তোমরা কেউ পেয়েছো!’ অদিতি বিদ্রোহের স্বরেই বলে উঠলো।

এবার প্রিয়া মানে খালিফা বলতে থাকলো, ‘না আমি অবাক হয়েছিলাম কৈলাস থেকে কাশী! এতখানি পথ তিনদিনে চলে এলাম! আর আরও বড় কথা, ফেরার সময়ে, পাহাড়পর্বত কনো কিছুই যেন বাঁধা হল না! এটাও কি সম্ভব!’

গঙ্গা ওদের থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলো, ‘এখানেও একটা কথা আছে, যেটা তোমরা জানো না! সেই যে মোটা লোকের কথা বললাম, আরে যে তোমাদের কাপড় জামা দিয়েছিল, সেই নাকি মায়ের কাছে এসেছিল মা-কে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে বলে! মা তোমাদের কথা ভেবে সেই লোককে বলে যে তোমরা নাকি কিছু দেখতে না পেলে ভয় পেয়ে যাও, তাই এমন কিছু করতে, যেটা তোমরা দেখতে পাবে! তার পরেই একজন এসে তোমাদের গাড়ি করে নিয়ে যায়!’

পীতাম্বর পুরো কথাটা শুনছিল। এবার সে বলতে আরম্ভ করল, ‘চমৎকারের পর চমৎকার! এত চমৎকার! গঙ্গাজী আপনি ঠিকই বলেছিলেন, উনি সাধারণ মানুষ বা সাধারণ সাধু নন! স্পেশাল কেউ হবেন!’

একে একে সবাই বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ তাই হবে! কিন্তু কে উনি!’

গঙ্গা এবার গলা খাঁকিয়ে ওর সম্পূর্ণ উপলব্ধিবলতে শুরু করল। সে বলল, ‘তোমরা কি মায়ের রূপটা ভালো করে দেখেছো! এমন রূপবতী নারী এর আগে দেখেছো তোমরা! তোমরা সকলেই তো রূপবতী, এখানে একজনও নেই যার রূপ নেই, কিন্তু মায়ের মত রূপ কি কেউ দেখেছো!’

সকলেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে না বলতে, গঙ্গা আবার বলে উঠলো, ‘সেই রূপকে অসীম বললেও কম বলা হবে! আমি উনাকে খুব ভালো করে দেখেছি, খুব কাছ থেকে, আর উনার রূপ দেখব বলেই দেখেছি! দেখে কি বুঝেছি জানো! বুঝেছি যে উনার নিজস্ব গায়ের রং বলে কিছু নেই! যেই রং দিয়ে উনাকে দেখবে, উনি সেই রং ধারণ করেন! যদি রোদে দেখ, তখন দেখবে গাঁয়ের রং হলুদ আর মুখের, শরীরের সব খাঁজ দিয়ে লাল আভা বের হচ্ছে! যদি চাঁদের আলোতে দেখ, তখন দেখবে সাদা ধব ধব করছে তার গায়ের রঙ আর শরীরের সাথের মুখের খাঁজগুলো থেকে চাঁদের ছটা বেরুচ্ছে! আর যদি ঘরের আলোতে দেখ, দেখবে যেই রঙের আলো তোমার ঘরে জ্বলছে, সেটাই তার গায়ে রং!’

এর উত্তরে রবার বলল, ‘হ্যাঁ এই কথাটা আমাকে মৈত্রী কয়েকবার বলেছিল বটে, তবে ও নিজেও সেই কথায় বেশী জোর দেয়নি, আর আমিও দিইনি!’

অদিতিও বলে উঠলো, ‘মা যখন কৈলাসের সামনে বসে ধ্যানে মগ্ন ছিল, তার মধ্যে একদিন আমাবস্যা ছিল। সেদিন খালিফা আমাকে বার বার বলছিল ও নাকি মা-কে দেখতে পাচ্ছে না!’

খালিফা সমর্থন করেই বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ গো দিদি (গঙ্গাকে উদ্দেশ্য করে) একটু দূরে সরে গেলেই সেদিন আর মা-কে দেখতে পাচ্ছিলাম না!’

গঙ্গা সবার কথা শুনে আবার বলতে থাকলো, ‘আমি দেখেছি, খুব কাছ থেকে দেখেছি! কিন্তু ততদিন কিছু বুঝিনি, যতদিন না!’ মিষ্টি হেসে বলল, ‘সময় এলো, আর কি!’

বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে, গঙ্গা আবার বলতে আরম্ভ করল, ‘এ তো গেল গায়ের রঙের কথা, আর বাকি রূপ! সেটার কি বলবে!’

এখানে সব থেকে আশ্চর্যজনক কথা বলল যমুনা। সে বলল তার সেইদিনের সকালের অভিজ্ঞতার কথা, যখন ও ওর মা-কে এক আলোক পিণ্ড দেখেছিল আর দেখেছিল ত্রিনয়ন। গঙ্গা শুনে ওর বোনকে বলল, ‘কই আমাকে তো এই সব জানাসনি!’

যমুনা মাথা নিচু করে বলে উঠলো, ‘ভেবেছিলাম তুই বিশ্বাস করবি না! তুই মা-কে যা অবিশ্বাস করিস!’

গঙ্গা ঠোঁট বেঁকিয়ে এবার একটু হাসল। দিয়ে আবার বলা শুরু করল, ‘বেশ, এখনকার মত রূপের কথা বাদ দিলাম।  ফিরে আসি তোমাদের কথায়! তোমরা মায়ের প্রতি বিভিন্ন পশুপাখির আকর্ষণ আর স্নেহ পাবার ইচ্ছাকে লক্ষ্য করেছ বললে। কি তাই তো! এটা কার হয় জানো!’

পীতাম্বর এবার বলে উঠলো, ‘ডাইনির! আমি জানি, বিহারে আমার বাসস্থানের কাছে একজনকে সবাই ডাইনি বলতো! তার কাছে পশুপাখিরা খুব আসতো! আর তার কথা শুনে সেই পশুগুলো, বিশেষ করে বিড়াল আর কুকুর সবার অনিষ্ট করত!’

‘মার ক্ষেত্রে পশুরা আকর্ষিত হয় ঠিকই, কিন্তু উনার কাছে আসে শুধুই একটু আদরের টানে! এটাকে কি বলবেন!’ গঙ্গা বলে উঠলো।

পীতাম্বর সমেত সবাই বলে উঠলো সেইটার কনো উত্তর নেই তাদের কাছে। আর এর উত্তরে সব থেকে জোর দিয়ে কথাটা বলল মৈত্রী, মানে জিং, যার নাকি পুরো জীবনটাই পশু নিয়ে কেটেছে! মৈত্রী বলল, ‘আমার প্রতি আকর্ষণ ছিল একমাত্র আমার হাতির, তাও অনেকদিন আমার সাথে ঘর করার পর!’

গঙ্গা মিষ্টি হেসে বলল, ‘বেশ তাহলে মায়ের সংশয় জাগানো কাণ্ডের মধ্যে প্রথমটা হল মায়ের রূপ, দ্বিতীয়টা হল মায়ের প্রতি পশুদের আন্তরিক আকর্ষণ, যাতে মায়ের কনো হাত বা ডাক থাকে না। কি তাই তো!’

মৈত্রী আবার বলে উঠলো, ‘তিন নম্বর হল মাতাজির অদ্ভুত শক্তি! মাঝে মাঝেই সেটা আমি দেখেছি, এমনকি এই অদিতিও দেখেছে। কি তাই তো!’

অদিতি সায় দিয়ে বলল, শুধু আমি একা না, খালিফাও নিজের চোখে দেখেছে! কিন্তু এমন চমৎকার আমরা দেখিনি, যেমন তুমি দেখেছো যে মা, বর্ডারের এপার থেকে ওপারে চলে গেল!’

সকলকে থামিয়ে দিয়ে গঙ্গা আবার বলে উঠল, ‘অদিতি, তুমি আর খালিফা চমৎকার দেখনি? আমি তো বলব, সেরা চমৎকারটা তোমরাই দেখেছো!’

খালিফা বলে উঠলো, ‘সেরা চমৎকার! মানে কি দিদি, তুমি আম্মির ওই কাপড় জামা আনার কথা বলছ! – কিন্তু সে তো বললে কে একজন দিয়ে গেছে!’

‘ঠিক বলেছ! একদম ঠিক বলেছ!’ গঙ্গা বলে উঠলো। একটু থেমে সে আবার বলল, ‘সত্যি করে বলতে গেলে, ওইখান থেকেই আসল চমৎকার ঘটতে আরম্ভ করেছে। এর আগে যা ঘটেছে, তার মাথা মুণ্ডু কিছুই বোঝা যেতনা, যদি না এই চমৎকারগুলো ঘটতো!’

সকলে গঙ্গার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে রয়েছে দেখে গঙ্গা এবার গুছিয়ে বলতে আরম্ভ করল, ‘শোনো তবে – আগে তোমাদের সেই সময়ে যা ঘটেছে আর তারপরে মা যখন কৈলাসের সামনে ধ্যানে বসেছিল, সেই সময়ে যা ঘটেছে, সেটা বলি। আমি ছাড়া এই পুরো কথাটা যমুনা জানে, কারণ মা আমাদের পুরো গল্প বলার সময়ে এটা বলে যে, সেদিন যখন তুমি (অদিতিকে দেখিয়ে), খালিফা আর মা ঝিলের ধারে বসেছিলে, তখন মা সেই ঝিলের জলে চান করে উপরে ওঠে। কি তাই তো!’

খালিফা বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ… হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পরেছে, মা কার সাথে যেন কথা বলছিল, কিন্তু যার সাথে কথা বলছিলো, তাকে আমরা দেখতে পাইনি!’

‘ওই যে বললাম’ গঙ্গা বলতে থাকলো, ‘ফোর্থ ডাইমেন্সন দিয়ে তাকে দেখা যায়! যাই হোক গল্পটা পুরোটা বলি, আমাদের মা যা বলেছে। সেই লোকটা নাকি প্রচণ্ড মোটা ছিলেন। সে এসে প্রথমে মাকে নিয়ে যেতে চায়, তারপর মায়ের নির্দেশেই তোমাদেরও নিয়ে যায়। নিয়ে তো গেল, তোমরা কি জানো যে, তোমাদের আকাশ পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল! হুম, তোমরা তো দেখতেই পাওনি! আর তোমরা জানোও না, কারণ তোমাদের চোখের উপর হাত বুলিয়ে তিনি তোমাদের হিপ্নোটাইজ করেছিলেন! তোমরা তাকে দেখতে পাবে না এটাইতো স্বাভাবিক, কিন্তু আকাশপথে তোমরা উড়ে যাচ্ছ, এটা দেখতে তো তোমাদের বারণ ছিল না! তাই তোমাদের হিপ্নোটাইজ করা হল, যাতে তোমরা কি দেখলে, কিচ্ছু যেন তোমাদের মনে না থাকে!’

সকলে অবাক হয়ে শুনছিল গঙ্গার কথা। এমনকি যমুনাও শুনছিল। আসলে সে গল্প তো শুনেছে, কিন্তু সেই গল্প নিয়ে অঙ্ক কষেনি, আর তাই কিছুর মানেও বুঝে উঠতে পারেনি! 

গঙ্গা তখন এক নাগাড়ে বলে চলেছে, ‘তোমাদের যেখানে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে নাকি প্রতিটা মানুষ, ছেলেমেয়ে সবাই বিশাল বড় বড়! সেখানে গিয়ে তোমাদের চান করানো হয়, নতুন কাপড় পরানো হয় আর খাওয়ানোও হয়। মায়ের কানের আর নাকের যেই গয়নাগুলো দেখছো সেগুলো সেখান থেকেই উনাকে দেওয়া হয়। এরপর সেই লোকটা তোমাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসে, যেখান থেকে নিয়ে যায় সেখানে নয়, মানসসরোবর হ্রদের পাশে। কি তাই তো!’

অদিতি আর খালিফা একসাথেই বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ! এটা তো বলতে ভুলেই গেছিলাম!’ অদিতি আবার বলল, ‘মা-কে আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম। মা কিন্তু বলেছিল – একজন আমাদের নিয়ে গেছিল আর খাইয়ে দাইয়ে আমাদের এখানে দিয়ে গেছে! কি খালিফা তাই না!’

খালিফা ঘাড় নাড়তে গঙ্গা বলে উঠলো, ‘এই ঘটনার ব্যাখ্যা আমি পরে দিচ্ছি, আগে কৈলাসের সামনে বসে মা-র যখন ধ্যান হয়েছিল, মা যা কল্পনা করেছিল সেটা বলি ?’

রবার আর মৈত্রীর যেন রোম রোম খাড়া হয়ে উঠেছে! তারা উত্তেজনার বশেই বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ বল!’

গঙ্গা একটা জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলতে থাকে, ‘মা দেখে যে একটা বিশাল আকারের বলদ তাঁর সামনে এসে হাজির! সেই বলদ তাঁকে প্রণাম করে নিজের পরিচয় দেয় নন্দী বলে। তারপর মাকে পিঠে চাপিয়ে নিয়ে হাজির হন একটা গুহার সামনে। সেই গুহার মধ্যে মহাদেব পাঁচ হাজার বছর ধরে বৈরাগী বেশে সাধনা করছিলেন। আমাদের মা বিশাল আকারের শিবকে, শিব বলে চিহ্নিত করতে না পেরে, তাঁর গায়েই পা দিয়ে গুহার উপরে রাখা কঙ্কালের দিকে এগোতে যান। সেই সময়ে মহাদেবের ধ্যান ভঙ্গ হলে, তিনি ধ্যান ছেড়ে উঠে আসেন। তারপর তিনি মাকে নিয়ে গুহার বাইরে আসতে গণেশ, কার্ত্তিক সহ সকলে উনাদের আরতি, সম্মান করে মহাদেবের আসনে দুজনকেই বসান। মহাদেব মাকে নতুন একটা কৈলাসের নির্মাণ করতে বলেন, যেখানে তিনি সপরিবারে যাবেন আর থাকবেন। তাই তিনি মাকে ফিরে যেতে নির্দেশ বা অনুরোধ করেন। সেখান থেকে ফেরার আগে গণেশ শেষ বেলায় মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার সময়ে, মা-কে সম্মান পূর্বক একটা পাথর দেন। শেষে নন্দী মা-কে, মা যেখানে বসে ধ্যান করছিল, সেখানে দিয়ে যান। কি যমুনা! এইটাই বলেছিল তো মা!’

‘মা তো আমাদেরও এইটা বলেছিল’ অদিতি বলে উঠলো। ‘আর মা এটাও বলেছিল, যে এটা মায়ের স্বপ্ন মাত্র!’ খালিফা পাশ থেকে বলে উঠলো।

গঙ্গা এবার বাঁকা ঠোটে মিষ্টি করে মুচকি হাসি দিয়ে বলে উঠলো, ‘কিন্তু এটা যে মায়ের স্বপ্ন ছিল না!’

প্রায় সকলেই একসাথে বলে উঠলো, ‘মানে!’

গঙ্গা হাসতে হাসতে বলতে থাকলো, ‘মানেটা হল, এটা মায়ের স্বপ্ন ছিল না! এটা বাস্তবে হয়েছে! হ্যাঁ বাস্তবে হয়েছে!’ একটু চুপ করে থেকে গঙ্গা আবার বলতে আরম্ভ করল, ‘প্রথম কথাটা মানে ওই মোটা লোকটার কথা আগে বলি। ঠিক আছে! সেই মোটা লোকটা আর কেউ না, ধনপতি কুবের ছিল। মাকে নিজের নামও সে বলেছিল – বৈষরাবণ অর্থাৎ কুবের! মা-কে নিজের পুষ্পক রথে করে নিয়ে গেছিলেন আর তোমাদেরকেও (অদিতি আর খালিফাকে দেখিয়ে গঙ্গা বলল)।

উনি যেখানে তোমাদের নিয়ে গেছিলেন সেটা ছিল যক্ষপুরী, যেখানে বিশাল বিশাল যক্ষের বাস। সেখানেই উনি মা-কে মায়ের কানের আর নাকের পাথরগুলো দেন। পাথরগুলোকে আমিও প্রথমে হীরে ভেবে ভুল করেছিলাম। তাই পীতাম্বরকে ডেকে পাঠাই। পীতাম্বর আমায় বলে যে, তোমরা সকলে এসে গেছ।  সেটা শুনে আমার মনের সন্দেহটা খানিকটা বিশ্বাসে পরিণত হতে শুরু করেছিল। তারপর যখন পীতাম্বর সেই পাথরগুলো দেখে বলল যে ওগুলো টাফফাইট, তখন আমার মাথা ঘুরে গেল। কই পীতাম্বর, একটু সবাইকে টাফফাইটের বিশেষত্ব বলবে না কি!’

‘হ্যাঁ বলব! নিশ্চয়ই বলব!’ এই বলে পীতাম্বর বলতে শুরু করল, ‘টাফফাইট হল একটা বিশেষ ধরনের পাথর, যা কেবল তিব্বত অঞ্চলে দেখা যেত, তাও আজ থেকে প্রায় পাঁচ ছয় হাজার বছর আগে বা তারও আগে। এই পাথর সারা পৃথিবীতে মাত্র পঞ্চাশ থেকে একান্ন খানা আছে, কিন্তু সেইগুলো সবই মিউজিয়ামে রয়েছে! রিসার্চার-রা এই পাথরগুলোকে কুবেরের ধন বলেন। তাদের কারুর কারুর কথায়, কলিযুগ শুরু হবার আগে নাকি কুবের, এই সব পাথরগুলো নিজের কাছে রেখে দেয়। যে কয়েকটা উনি নিজের কাছে রাখতে পারেননি, সেইগুলোই নাকি বিভিন্ন মিউজিয়ামে রয়েছে!’

‘কি পুরো কথা মিলে গেল!’ গঙ্গা বলে উঠলো। সকলে যেন মন্ত্রে পুষ্পাঞ্জলি দেবার মত করে একসাথে সম্মতি দিল। কিন্তু গঙ্গা যেন এইটুকুনিতে খুশী নয়! সে বলে উঠলো, ‘বেশ! এতেই হয়ে গেল! একবারও মনে প্রশ্ন এলো না যে, কুবের মা-কে নিয়ে গেল কেন, আর নিয়ে গিয়ে এত খাতির যত্নই বা করল কেন! সেই পাথরগুলোওই বা দিল কেন!’

কথাটা শুনেসকলের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠলো। সেই দেখে গঙ্গা বলতে শুরু করল, ‘কিছু বলার আগে আমি একটা পুরাণের গল্প শোনাবো। গল্পটা বলার একটা কারণ আছে, তাই শোনাবো। কি সবাই শুনবে তো!’

সকলের সম্মতি পেয়ে গঙ্গা শুরু করল, ‘গল্পটা কলিযুগের আগে, মানে পাঁচ হাজার কি পাঁচ হাজার পাঁচশো বছর আগেকার কথা। তখন অসুরদের রাজা মহারাজ বলি। ইনি ছিলেন ভক্ত প্রহ্লাদের বংশধর। তাঁর প্রপৌত্রের নাম ছিল বাণাসুর। এই বাণাসুর মহাদেবকে তুষ্ট করে সহস্র হাত নেন! সেই হাত দিয়ে মহাদেব ও দেবী পার্বতীকে তুষ্ট করে উনি একটা বর চান যে, উনাকে কনো কুমারী কন্যাই হত্যা করতে পারবে, অন্য কেউ নয়। আসলে কি বলতো বাণাসুর জানতো যে দেবী পার্বতী কখনই মহাদেবকে বিয়ে না করে থাকবেন না – তাই কুমারী হবার কনো সম্ভাবনাই নেই! তা যাই হোক, প্রতিটা অসুরই যেমন বরদান পেয়েই তার খারাপ প্রয়োগ শুরু করে দেয়, বাণাসুরও তাই করল। তখন শ্রীকৃষ্ণ বর্তমান ছিলেন, কিন্তু নারায়ণ, ভক্ত প্রহ্লাদকে বচন দিয়েছিলেনযে তিনি নিজে প্রহ্লাদের কনো বংশধরের হত্যা করবেন না – তাই বাণাসুরকে তিনি মারতেও পারলেন না। অন্যদিকে, দেবী জন্মালেন দক্ষিণে। তিনি মহাদেবের উপাসনা করলেন, কিন্তু কুমারী হয়ে তাঁকে থাকতে হবে বলে, মহাদেব তাঁর কাছে যেতে পারলেন না। বাণাসুরের বধ হল ঠিকই, কিন্তু দেবী শক্তির আর মহাদেবের মিলন হল না!’

একটু থেমে গঙ্গা আবার বলতে থাকলো, ‘আমি এই গল্পটা বলতাম না, যদি সেদিন মা যমুনাকে দক্ষের যে গল্পটা বলছিল, সেটা না শুনে ফেলতাম! আসলে আমাদের উপরতলায় যে কলঘর আছে, সেটার একটা দেওয়াল হল পাশের শোবার ঘরের দেওয়াল। সেদিন আমি কলঘরে রাত্রে গিয়ে শুনি যমুনাকে মা গল্প শোনাচ্ছে। সেইখানেই মা একটা কথা বলেছিল– প্রতি মন্বন্ত্বরের শেষে নাকি মহাদেব বিরক্ত হয়ে যান, আর তাই সেই সময়ে কলিরাক্ষস অত্যধিক ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। আমাদের এই মন্বন্ত্বরও শেষের দিকে। খালিফা বা অদিতি বা রবার হয়তো জানে না, তবে মৈত্রী জানতে পারে এই কথা।

আসলে হিন্দু প্রজাতি আর চৈনিক প্রজাতি খুব পুরানো! তাই তারা অনেক মন্বন্ত্বর দেখেছে – সেই কারণেই এঁদের কাছে মন্বন্ত্বর চক্র আছে। যাই হোক, এই মন্বন্ত্বরের শেষ সময় এখন চলছে। মানে এখন মহাদেবের বিরক্তির সময় চলার কথা! কি তাইতো! তাহলে এটাই স্বাভাবিক যে মহাদেব যে কুমারী দেবীর সাথে মিলিত হতে পারলেন না, তার জন্যই তিনি বিরক্ত! আর বিরক্ত শিব মানেই শব!’ এবার রবারের দিকে তাকিয়ে গঙ্গা বলে উঠলো, ‘কি রবার! অমরনাথ গুহা থেকে বেরিয়ে, মা এই কথাটাই বলেছিল তো? যে শিব উনাকে বলেছেন – আমি এখন শব হয়ে আছি, তাই তোমাকেই আসতে হবে!’

রবার বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ, মাতাজি তাই বলেছিলেন!’

গঙ্গা আবার মুচকি হেসে বলতে শুরু করল, ‘এবার আসল কথায় আসা যাক। গৌরীদেবীর বিয়ে হল শিবের সাথে আর তিনি চললেন শিবের সাথে ঘর করতে! এই শিব তাঁকে স্বপ্নে বলে দিলেন যে তিনি শব হয়ে আছেন, তাই গৌরীদেবীকেই তাঁর কাছে যেতে হবে! গৌরীদেবী অলৌকিক পথ ধরে পৌঁছালেন শিবলোকে আর শিবের ধ্যান ভঙ্গ করলেন। যেই শিবের ধ্যানভঙ্গ করার দোষে মদনদেবকে ভস্ম হতে হল, সেই শিব কিন্তু গৌরীদেবীকে কিচ্ছু বললেন না! উল্টে, তাঁকে নিয়ে গুহার বাইরে গেলেন এবং তাঁকে স্ত্রীর সম্মান দিলেন! আর গণেশ, কার্ত্তিক, নন্দী এমনকি কুবের পর্যন্ত তাঁকে মায়ের সম্মান দিলেন, এমনি এমনি! যেকোনো কাউকেই তারা মায়ের সম্মান দিয়ে দেবেন!’

খালিফা হঠাৎ বলে উঠলো ‘কিন্তু আম্মি তো বলল, ওটা উনার স্বপ্ন ছিলো!’। গঙ্গা তার উত্তরে মুচকি হেসে খালি বলল, ‘মা ঘুমাচ্ছে! তাই একসঙ্গে না গিয়ে একজন একজন করে গিয়ে মায়ের দুটো পায়ে যে দুটো মল রয়েছে, সেগুলোকে ভালো করে দেখে আসো!’

গঙ্গা যা বলল, সকলে তাই করে এসে বসলে, গঙ্গা বলে উঠলো, ‘দুটো পায়ের ঝুমুর ভালো করে দেখে এসেছ তো! কি দেখলে কেউ একজন বল!’

অদিতি বলতে শুরু করল, ‘দেখালাম মায়ের পায়ে দুটো রূপোর নূপুর! একটা এমনি, আর একটাতে একটা লাল পাথর বসানো আছে!’

গঙ্গা এবার বলতে আরম্ভ করল, ‘মা যখন আমাদের কাছে এসেছিল, তখন তাঁর এক পায়ে নূপুর ছিল। আরেক পায়ের নূপুর তিনি হাওড়া ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে কনো এক যুবককে দিয়েছিলেন। মায়ের ডান পায়ে যে নূপুরখানা ছিলনা, তা আজকে হাওড়া স্টেশনে ফিরে পেতে, তাতে আমি লাল পাথরটা দেখি আর সেই দেখে আমার খুব সন্দেহ হয়, রূপোর নূপুরে অত্যধিক মূল্যবান একটা পাথর! আমার মন বলছিল, স্বয়ং ঈশ্বর আমার কাছে একটা বিশাল ধাঁধার উত্তর দিচ্ছেন আর সেই ধাঁধার উত্তর ঠিক করে পেতে গেলে, আরও একটা নূপুর পাওয়া আবশ্যক। আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে ধাঁধার খোলসা করার দায়িত্ব আমাকেই দেওয়া হয়েছে, আজ যখন হাওড়া ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে মা সেই ছেলেটাকে, যাকে নাকি মা সেই নূপুরের আরেক পাটি দিয়েছিল, তাকে দেখিয়ে দিল। অবাক করা জিনিস হলেও সত্যি, ছেলেটা ওই নূপুর নিয়ে কিচ্ছু করতে পারেনি, তার থেকে দ্বিতীয় নূপুরটা পেয়ে মাকে পরিয়ে দিলাম। দেখলে তো এখন, মায়ের দুটো পায়েই নূপুর রয়েছে?’

সকলে হ্যাঁ বললেও, এবার যমুনা প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু এতে কি প্রমাণিত হয়?’

‘প্রমাণিত হয় যমুনা! প্রমাণিত হয়!’ গঙ্গা বলতে থাকলো, ‘যদিও সেই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাকে আমার অন্তর মন যা বলল, তাতে আমার পুরোটা খোলসা হয়নি! পুরোটা খোলসা করতে আমায় পীতাম্বরের সাহায্য নিতে হয়। পীতাম্বর তুমি সকলকে মায়ের পায়ে যে লাল পাথরটা রয়েছে, সেটা সম্বন্ধে একটু বলবে?’

পীতাম্বর এবার গঙ্গার নির্দেশেই বলতে থাকলো, ‘হ্যাঁ বলছি! ওই পাথরটা সামান্য কনো পাথর নয়! ওই পাথরটার নাম রেড বেরিল! যার দাম হীরের চেয়েও অনেক বেশী! আর সব থেকে বড় কথা হল, এই পাথর এখন আর পাওয়া যায় না! আজ থেকে প্রায় কুড়ি হাজার বছর আগে মেক্সিকোতে একটা আগ্নেয়গিরি থেকে যে লাভা বেড়িয়েছিল, সেটা ঠাণ্ডা হয়ে খুব অল্প পরিমানে এই পাথর তৈরি হয়েছিল, তারপর আর এই পাথর তৈরি হয়নি! এই পাথর আভি খালি মিউজিয়ামেই থাকে, কারুর কাছে আলাদা করে থাকেনা!’

গঙ্গা আবার পীতাম্বরের উদ্দেশ্যে বলল, ‘ওই পাথরের সাথে গণেশের সম্পর্কটা সবাইকে একটু বল!’

পীতাম্বর সেই শুনে প্রথমে গঙ্গাকে বলে উঠলো, ‘আসলে এটা লোকের মুখের কথা তো!’

গঙ্গা হেসে বলল, ‘যা রটে, তার কিছু তো বটে, পীতাম্বর! তুমি চিন্তা কোরো না! বল!’

পীতাম্বর বলতে থাকলো, ‘হরিয়ানা, হিমাচলের দিকে লোকে বলে যে এই পাথরের সব থেকে বড় পাথরের মাপ এই চার সিসি মত হবে, ঠিক যেমনটা মাতাজির পায়ে রয়েছে! সব থেকে বড় পাথরটা নাকি ময় দানব ইন্দ্রপ্রস্থ করার সময়ে পাণ্ডবদের দিয়েছিলেন। এই পাথর আবার যুধিষ্ঠির বেদব্যাসকে দিয়েছিলেন, যখন রাজসুয়ো যজ্ঞে বেদব্যাস অগ্নিহোত্রী সাধু হন, আর সেই পাথর নাকি, মহাভারতের প্রথম সঙ্কলনের সময়ে, বেদব্যাস গণপতি বাপ্পাকে দিয়েছিলেন!’

‘প্রথম সঙ্কলন!’ অদিতি বলে উঠলো। গঙ্গা তার উত্তরে বলল, ‘হ্যাঁ প্রথম যেই বই লেখা হয়, তার নাম মহাভারত ছিল না। তার নাম ছিল জয়া! আর সেই বই বেদব্যাস, গণেশের মাধ্যমে লিখেছিলেন। এর পরের সঙ্কলনের নাম ভারত, যা বলেছিলেন বৈশম্পায়ন মুনি। তিনি সেটা বলেছিলেন জন্মেজয়কে, মানে পাণ্ডবদের প্রপৌত্রকে। আর শেষের অধ্যায় লেখেন ঊগ্রসভ সৌতি – এরই নাম হল  ‘মহাভারত’।’

গঙ্গা একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল, ‘শুনলে তো! পীতাম্বর কি বলল! এবার বলি, এই নূপুর মাকে উনার মামা দিয়েছিলেন। তাই মামার পক্ষেওই রেড বেরিল পাথর দেওয়া সম্ভব নয়। সম্ভব কি! যদি নাই হয়, তবে সেই পাথর মায়ের পায়ে এলো কি করে, আর এলোই যদি, তা এক পায়ে এলো কেন, দুই পায়ে নয় কেন! আমি মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম – গণেশ তাঁকে সেই পাথর হাতের মধ্যে দিয়েছিল কিনা! উনি বলেছিলেন যে গণেশ হাতে করে পাথরটা দেখিয়েছিল, কিন্তু দেয় সে মায়ের পায়ে! আসলে সে মায়ের পায়ে শুধু নিবেদন করেননি! মায়ের ডান পায়ের নূপুরে সেটা বসিয়ে দিয়েছিল!’

এই কথা শুনে সকলে একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে দেখে, গঙ্গা আবার বলতে থাকে, ‘আসলে মা কৈলাসে সত্যিই গিয়েছিলেন। যেটাকে তিনি স্বপ্ন বলেছেন, সেটা আদপেও স্বপ্ন নয় – বাস্তব!’

‘তার মানে দিদি তুমি বলছ যে কৈলাসে সত্যিই মহাদেবের বাস! এটাও কি সত্যি হতে পারে!’ অদিতি বলে উঠলো।

উত্তরে গঙ্গা বলতে থাকলো, ‘হ্যাঁ এটাই সত্যি! তোমরা বলবে তাহলে কেউ দেখতে পায় না কেন! তাই তো! কারণটাও খুব সোজা – সেই ফোর-ডি! এঁদের দেখতে হলে চেতনার উদয় আবশ্যক। আমাদের নেই তাই দেখতে পাইনা, মায়ের আছে তাই মা দেখতে পেয়েছে! এই ব্যাপারটা নিয়ে আমিও যে ভাবিনি তা নয়! কিন্তু ঈশ্বরের আমার উপর অসীম করুণা! তিনি আমাকে সত্য জানিয়েই ছাড়বেন, তাই বোধ হয় তিনি আমার সম্মুখে মহাদেবকে ধরিয়ে দিলেন!

কেউ যেন কানে কানে এসে বলে গেল – মহাদেবের অনুচরদের দেখ! ভূত, প্রেত! কি তাই তো! ভূত প্রেত মানে কি! মানে হল সূক্ষ্ম শরীর! মানে হল এই যে স্থূল শরীর নিয়ে মহাদেবের বা আসল কৈলাসের দর্শন করাই যায় না! তাকে দেখতে হলে সূক্ষ্ম শরীর ধারণ করতে হয়, আর সেটা তখনই কারুর পক্ষে সম্ভব, যখন সেই ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে চেতনা লাভ করেছেন! যেমন আমাদের মা!’

খালিফা এবার প্রশ্ন করল, ‘মায়ের চেতনা লাভ হয়েছে, সেটা না হয় বুঝলাম, কিন্তু সকলের মায়ের প্রতি এই শ্রদ্ধা কেন!’

খালিফাকে সমর্থন করে অদিতি বলে উঠলো, ‘সত্যিই তো! সকলের শ্রদ্ধা না হয় মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু মহাদেবের এত শ্রদ্ধা!’

গঙ্গা খুব বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলতে থাকলো, ‘কারণ উনি শুধু আমাদের মা নন! উনি হলেন জগতের মা! উনিই জগদম্বা!’

সকলে যেন সেই কথাটা শুনে চমকে গেল। তাই দেখে গঙ্গা বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ! উনি স্বয়ং জগদম্বা, আদি পরাশক্তি! দেবী পার্বতীর কলির নাশ করতে আবির্ভাব হয়েছে!’ একটু থেমে আবার সে বলল, ‘তাই জন্যেই তো মহাদেবের পাঁচ হাজার বছরের ধ্যান, তাঁর স্পর্শ মাত্রেই ভেঙে গেল! তারজন্যেই তো মহাদেবের ধ্যান ভেঙে যেতেও তিনি রেগে গেলেন না! আমাদের মা – ই আসল গৌরী, তাইতো মহাদেব তাঁকে নিজের আসনে বসতে দিয়েছেন! আমাদের মা-ই তাঁদের মা বলে, কার্ত্তিক, গণেশ, নন্দী আর বাকি গণপ্রেতরা মাকে এত ভালোবাসা দিয়েছে! আমাদের মা -ই সেই মহাগৌরী বলেই গণেশ মায়ের কাছে নিজের অর্জন করা সেরা সঞ্চিত ধন, উপহার স্বরূপ দিয়েছেন! আমাদের মা-ই জগন্মাতা বলে, ধনপতি কুবের তাঁকে মায়ের সম্মান দিয়ে নিজের অলকাপুরীতে নিয়ে গিয়ে সেবা করেছিলেন! আমাদের মা- ই সকলের মা বলেই, ধনপতি কুবের মাকে উড়ন্ত গাড়ি করে কাশী অবধি ছেড়ে দিয়ে এসেছেন! আমাদের মা – ই সেই বিশ্বমাতা বলেই অলকাপুরীতে প্রতিটা যক্ষ, মায়ের পা ছোঁয়ার প্রচেষ্টা করেছে! আমাদের মা -ই সবার জননী বলেই প্রতিটা পশু স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রতি আকর্ষণ বোধ করে! তিনি সেই মহামায়া বলেই বাঘিনীর মত হিংস্র জীবও নিজের স্বধর্ম ভুলে মায়ের পায়ে আত্মনিবেদন করেছিল! বিষধর সাপ একটু স্নেহ পেতে ছুটেছিল! যেই হরিণের দল মানুষের থেকে দূরে দূরে থাকে, সে পর্যন্ত মায়ের সান্নিধ্য পেতে ব্যাকুল ছিল! আমাদের মা-ই যে আদিশক্তি, মহামায়া, যোগমায়া সবই একাধারে! তাই জন্যেই তো শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা তাঁকে ছুঁতে পারে না! তাই জন্যেই তো তাঁর অপরিসীম শক্তি! তাই জন্যই তো অসৎ ইয়ক্তি তাঙকে ছুতে গেলেই ছিটকে পরে যায়! তাই জন্যেই তো তার এত এত চমৎকার! তিনিই যে জ্ঞানদা – সেই জন্যেই তো তাঁর এই অপরিমিত জ্ঞান! তিনিই যে অনাদি, অনন্ত, নির্গুণা, নিরুপমা – তাই তাঁর গাঁয়ের কনো রং নেই! তিনি সেরার সেরা, তাই জন্যেই তো মায়ের এই অসামান্য রূপ! তিনি নিজেই নিয়তি! তাইতো যমুনা তাঁর তৃতীয় নেত্র দেখেছিল! কন্যাকুমারী হওয়ার পর তিনি যে তাঁর স্বামীর সাথে মিলিত হননি! তাই জন্যেই তো কলির অবকাশ! ষে জন্যেই তো মহাদেবের শিব থেকে শবে পরিণত হওয়া! তাইতো মায়ের কৈলাসে আগমন! আর মহাদেবের পুনঃপ্রকাশ!’

এই কথা শুনে সকলের চোখে জল, কিন্তু গঙ্গার চোখে জল নেই –শুধু রইল একরাশ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর ব্যাকুলতা মিশ্রিত অমৃতকলস! পীতাম্বর এবার সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠলো, ‘কিন্তু মাতাজি যে কাজের কথা বলছিলেন! সেটা কি!’

গঙ্গা আবার বলতে থাকলো, ‘মায়ের সব কথাগুলোকেই ধরা উচিত, কারণ তাঁর মুখ থেকে বেরোনো প্রতিটা কথা হল জগদম্বার বাণী। সেটা যদি ধরা হয়, তাহলে মাকে মহাদেব যা বলছিলেন সেটার কথা স্মরণ কর!’

বেশ খানিকক্ষণ সকলে চুপ করে রইল, তারপর অদিতি বলতে শুরু করল, ‘এই কৈলাস আর বেশিদিন নেই! নতুন কৈলাস নির্মাণ করতে হবে! – এইটা বলছো দিদি!’

গঙ্গা কিছু বলার আগেই যমুনা বলে উঠলো, ‘আচ্ছা দিদি! মা প্রথম দিনেই এই কথাটা বলেছিল না! বলেছিল না –উনি শিবের একটা কাজ করতে এসেছেন!’

গঙ্গা একটা বুদ্ধিদীপ্ত হাসি দিয়ে যমুনাকে বলল, ‘হ্যাঁ ঠিক তাই!’ তারপর সবাইকে উদ্দেশ্যে বলল, ‘কৈলাস! এইটাই মায়ের কাজ! এই কাজটাতেই আমাদের সকলকে মনোনিবেশ করতে হবে!’

পীতাম্বর এবার বলে উঠলো, ‘কিন্তু এই কৈলাস হবে কোথায়? আর কেমন-ই বা হবে? আমরা তো এর কিছুই জানিনা!’

‘অপেক্ষা!’ গঙ্গা পুরো দমে বলতে শুরু করল, ‘আমাদের অপেক্ষা করতে হবে মায়ের পরবর্তী নির্দেশের জন্য। আমার স্থির বিশ্বাস, একবার যদি আমরা কৈলাস নির্মাণ করবো, এই সংকল্প নিয়ে নিই, তবে মা নিশ্চয়ই সেই কৈলাস গঠনের পদ্ধতি আমাদের বলতে থাকবেন!’

পীতাম্বর এবার আনন্দের সাথে বলে উঠলো, ‘বেশ তাহলে কৈলাস হবেই। তার জন্য যা পয়সা লাগবে, সেটা ওই সিনেমা থেকেই যোগাড় হয়ে যাবে। এই প্রথমবার কনো অবতার নিজেই নিজের রোলে অভিনয় করবে! প্রথমবার!’

খালিফা বলে উঠলো, ‘সিনেমা কেন! সিনেমাগুলো বল!’

রবার আনন্দের সাথেই বলে উঠলো, ‘আমাদের প্রথম সিনেমা হল “অবতরণ”, যেখানে মা যে অবতার হয়ে এসেছেন সেটা সবাইকে জানানো হবে!’

মৈত্রী একটু অভিযোগের সুরেই বলে উঠলো, ‘কিন্তু মা যে অবতার, সেটা সকলে জানলে খুব মুশকিল যে!’

গঙ্গা এবার হাসতে হাসতে বলতে থাকলো, ‘পীতাম্বর যে বুদ্ধি বার করেছে, সেটা কিন্তু অনবদ্য। এতে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙ্গবে না!’

‘মানে!’ অদিতির প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গঙ্গা পাল্টা বলল, ‘মা নিজে যদি নিজের চরিত্রে অভিনয় করে, তাহলে জগতের কাছে মা অভিনেত্রী থাকবে, কিন্তু আসলে মা-ই যে সেই অবতার, তা জগৎ ঠিক সময়ের আগে ধরতেই পারবে না!’

সকলে এর উত্তরে বাঃ বাঃ করে উঠলে, গঙ্গা বলল, ‘বেশ আমাদেরকে এবার কর্ম প্রণালীটা ঠিক করে নিতে হবে! মানে কার পর কোন কাজটা আমরা ধরবো!’

পীতাম্বর এবার এগিয়ে এসে বলতে শুরু করল, ‘প্রথমে আমরা সবাই মিলে আগে রোসডেলের ফ্ল্যাটে গিয়ে সেখানে ব্যবস্থা করে থাকবো। ঠিক আছে! সেখানে গিয়ে গঙ্গাজী আপনি মহেন্দ্রকে খবর দিয়ে ডেকে নিন! এরপর আমাদের সিনেমা তৈরি করার কাজ আরম্ভ করব। রবার ঠিকই বলেছে, আমাদের প্রথম সিনেমা হবে “অবতরণ” যেখানে মাতাজি যে অবতার আর জগদম্বা খুদ, সেটা বলা হবে। এর জন্য আমার একজন বন্ধু আছে, তার কাছে একজনকে নিয়ে যাবো। সে ছেলেটি বাঙ্গালী আর একটু ভক্তও বটে। আচ্ছা গঙ্গাজী! পুরো কথা তার কাছে গিয়ে কে বলবে ? আপনি ? ’ যমুনা বলে উঠলো, ‘না দিদি কতদিক সামলাবে! এদিক করবে, ওদিকে বাড়ি বিক্রির চেষ্টা করবে! আমি নিজে পুরো গল্পটা তাকে বলে লেখাবো। কি পারবো না দিদি! পারবো না অদিতি দিদি, খালিফা দিদি!’

কেউ কিছু বলার আগেই, খালিফা বলে উঠলো, ‘পারবি। পারলে তুই পারবি!’

পীতাম্বর আবার বলতে শুরু করল, ‘বেশ তবে প্রথম সিনেমার জন্য প্রথম কাজ হল সেই বইটা লিখে ফেলা, যেটা আমার বন্ধুটাকে দিয়ে যমুনা লেখাবে। এই সিনেমা থেকে যা পয়সা আসবে, সেটা দিয়ে আমরা কৈলাস তৈরি করবো। কি তাই তো! আর হ্যাঁ, মাতাজি এবার থেকে যা বলবে, সেটাও কেউ একজন নোট করতে থেকো – কারণ মাতাজির পরের কথাগুলো দিয়ে হবে পরের সিনেমা। কি গঙ্গা দেবী চলবে তো ?’

গঙ্গা বলতে থাকলো, ‘কিন্তু এত বড় একটা কাণ্ড, সেই ছোকরা একা লিখতে পারবে তো!’

‘পারবে পারবে! গঙ্গাজী… পারবে!’ বেশ প্রত্যয়ের সাথেই বলে উঠলো পীতাম্বর, ‘পারলে সেই পারবে! সে ছোকরা মায়ের দাস আছে। মাকে সে খুব ভালোবাসে আর মায়ের আদেশ পেতে ব্যস্ত! ছোকরা খুব ভালো পাখোয়াজ বাজায় আর মায়ের জন্যই বাঁচে! আমার খুব ভালো বন্ধু – ওর নাম সন্দীপ আছে! ওই পারবে! মাকে ভালোবাসে তো! ওই পারবে!’

‘বেশ! তাই হবে!’ গঙ্গা যেন একটা নিশ্চিন্ত হবার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠলো, ‘এবার আমি আমার দেশের বাড়িতে যাব। দিন দুই তিনের মধ্যে আমি ফিরে আসব, সঙ্গে মহেন্দ্রকে নিয়ে ফিরবো, সঙ্গে বাড়িটার একটা গতি করে আসতে হবে!’ একটু থেমে গঙ্গা ফের বলতে থাকলো, ‘যমুনা এখানে ওর বাকি দিদি দাদাদের সাথে থাকুক! ওকে ওখানে আর যেতে হবে না! এখানে থেকে ও সেই ছোকরাকে দিয়ে পুরো গল্পটা লেখাক!’

পীতাম্বর গঙ্গাকে থামিয়ে আরও একটা বিশেষ কথা বলতে শুরু করল, ‘আর হ্যাঁ গঙ্গাজী, আমার একটা ডিরেক্টর ছেলে আছে। নাগাল্যান্ডের ছেলে, কিন্তু কলকাতায় প্রায় বিশ সাল ধরে আছে, সেই পাঁচ বছর বয়স থেকে। বাংলা ভালই বলতে লিখতে পারে। লেখার সময়ে ওকে ভি আমি যমুনার সাথে পাঠাবো! ওর পুরো গল্পটা ইঙ্কলুডিং ভাব জানাটা খুব দরকার! না হলে ও ভালো করে ডিরেকশন দিতে পারবে না, ঠিক আছে!’

‘হ্যাঁ সেটা আপনারা যা ভালো বোঝেন করুন না! যমুনা আমার যেমন বোন, তেমন এখানে উপস্থিত সবার বোন! সবাই থাকতে আমার আর চিন্তা কি! আমার একটাই চিন্তা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসা। যতদিন না ফিরবো, মায়ের জন্য আর সবার জন্য মন কেমন করতে থাকবে!’ এই বলে মিষ্টি হেসে, গঙ্গা একটু বসলো।

যমুনা উঠে এসে দিদির পাশে বসে বলল, ‘দিদি! তুই এখনই বেরিয়ে পরবি!’

গঙ্গা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে হাসি মুখে বলল, ‘না! ঘুম থেকে মা উঠুক, তারপর বেরুবো! মা এখনই ঘুম থেকে উঠে পরবে! উনি তোঁ ঘুমিয়ে ছিলেন এই কারনেই, যাতে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারি যে তিনি আসলে কে! আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে, এবার তিনি উঠে পরবেন! উনাকে একবার প্রণাম করে, তবেই বেরুবো! কেন বল!’

যমুনা এক চোখ জল নিয়ে ওর দিদিকে বলল, ‘আমায় ক্ষমা করে দিস দিদি! আমি তোর উপর খুব সন্দেহ করেছিলাম! আসলে ভেবেছিলাম যে তুই মাকে সন্দেহ করছিস! এমনকি তোর সন্দেহ ধরতে গিয়ে আমি নিজেই মায়ের ব্যাপারে কি সব ভেবে ফেলেছিলাম!’

গঙ্গা আবার মিষ্টি হেসে বলে উঠলো, ‘যমুনা! বোন আমার! এটা ঠিক যে এটাকে সন্দেহ বললে ভুল বলা হয় না! আমি তো সন্দেহই করেছিলাম – কিন্তু হ্যাঁ সন্দেহতে এই দ্বন্দ্বটাই খালি ছিল যে আমাদের মা আসলে শুধুই আমাদের মা, নাকি সম্পূর্ণ জগৎ সংসারের মা! আমি জানি তুই আমার উপর সন্দেহ করছিলি, কিন্তু আমার সব অনুসন্ধানের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, এটা খুঁজে বার করা যে আমাদের মা আসলে সমগ্র জগতের মা কিনা! আসলে কি বলতো, ধনপতি কুবের আর মহাদেব পরিবারের থেকে মাকে যেই পরিমাণ সম্মান দেওয়া হয়েছিল, সেটা আমি কিছুতেই একজন মহাতপস্বী সাধিকার সাথেও মেলাতে পারছিলাম না – তাই আর কি! … আর শোন লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকবি! দিদিরা, দাদারা যেমন বলবে, তেমন করে থাকিস। …… আর মাকে বেশী বিরক্ত করবি না! ঠিক আছে! … ফিরে এসে যেন শুনি, গঙ্গা তোমার বোন খুব লক্ষ্মী মেয়ে…। … কি শুনবো তো?’

যমুনা এবার ওর দিদিকে জাপটে জড়িয়ে ধরল। সেই জড়িয়ে ধরার মধ্যে ছিল ভালোবাসা, ক্ষমাপ্রার্থনা, আদর আর সব থেকে বেশী, দিদিকে আগামী কয়েকদিন দেখতে না পাবার যন্ত্রণা। গঙ্গাও সেই ভাবের আনন্দ নিচ্ছিল, কিন্তু ওদিক থেকে গৌরী ডেকে উঠলো… ‘গঙ্গা কই!’

গঙ্গার সাথে সাথে উত্তর আর তাঁর ঘরে প্রস্থান, ‘আসছি মা…!’

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6