বিসর্জনে কৈলাস | রোমাঞ্চ উপন্যাস

সত্যি বলতে কি, প্রশ্নটা আমার খুব ভালো লেগেছিল, তাই হেসে উত্তর দিলাম, – ‘তোকেএখানেদুটো জিনিস বলি! প্রথম হল অর্জুন! অর্জুন যদি স্বমহিমায় যুদ্ধ করত, আর ইন্দ্রের কাছ থেকে সব পাওয়া অস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধ করতো, তবে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ একদিনেই শেষ হয়ে যেত! যার সাধনার তেজে পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছিল বলে, মহাদেবকে শবর রূপ ধরে তার কাছে যেতে হয়েছিল, তার সামনে ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ বা অন্যরা কি! কিছু কি! কিচ্ছু না! তাই শ্রীকৃষ্ণ প্রথমেই অর্জুনকে আবেগপ্রবণ করে দুর্বল করে দেন। আবার অন্যদিকে, ইন্দ্রের কাছ থেকে পাওয়া কোন অস্ত্র যাতে সে ব্যবহার না করতে পারে, সেই ব্যপারেও অর্জুনের কাছে শ্রীকৃষ্ণ কথা চেয়ে নেয়! কেন জানিস? কারণ দুর্যোধনদের কর্মফল দিতে হবে তো? যে যে যেই যেই কর্ম করেছে, ঠিক তেমন তেমন ভাবে তাদের সাথে ছলনা করে তাদের মৃত্যুব্যূহ নির্মাণ করলেন শ্রীকৃষ্ণ!’

একটু থেমে আবার বললাম, – ‘আর আরও গভীর কথা কি জানিস! ধর্ম আর অধর্মের যুদ্ধে ধর্মের জয় নিশ্চিত, কিন্তু সেটা জেনেও আসক্ত হলে চলবে না! তাই তো শ্রীকৃষ্ণ ধর্মের জয় নিশ্চয় জেনেও অর্জুনকে দুর্বল করে অনাসক্ত ভাবে সকলকে উচিত কর্মফল দিয়েছেন!’

অদিতি দেখলুম, ‘খুব তৃপ্ত হল উত্তরটা পেয়ে, অন্যদিকে খালিফা আমায় আবার প্রশ্ন করে – আচ্ছা মা! মহাভারতকে যে ধর্ম যুদ্ধ বলে – আসলে আমিও শুনেছি মহাভারতের কথা – কিন্তু ধর্মযুদ্ধ কেন বলা হয় ওটাকে?আসলে তো ওটা পাণ্ডবদের সম্পত্তি ফিরে পাবার জন্য যুদ্ধ! তাহলে ওটা ধর্মযুদ্ধ কেন?… আসলে… ধর্ম কি…ধর্ম কি জিনিস?’

কি ভালো আধার দেখেছিস! না হলে এই প্রশ্ন কেউ করতে পারে? আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে, হাসতে হাসতে বলতে থাকলুম –‘ধর্ম কি জিনিস সেটা পিতামহ ভীষ্মের মতন দিকপাল ব্যক্তিও বোঝেনি! আসলে কি বলতো, ধর্মকে কোন একটি বিধানের মধ্যে বেঁধে ফেলাই হলমানুষের সব থেকে বড় ভুল। ধর্মকে কখনো কোন নিয়মের মধ্যে বেঁধে রাখা যায় না! কখনই না! কেন জানিস?… আচ্ছা তোদের দুজনকেই কিছু প্রশ্ন করি। করবো?’

ওরা হ্যাঁ বলতে, আমি বলতে থাকি –‘আচ্ছা ধর একটি মেয়ে তার মায়ের মাথায় কোন ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করে, তার জীবনলীলা শেষ করে, তার মায়ের বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠলো! তোরা এই কাজটাকে কি চোখে দেখবি!’

ওরা দুজনেই বলে উঠলো –‘কোন মেয়ে এমন করবে?এটা সব সময়েই অধর্ম। ’

আমি হেসে আবার বললাম, – ‘আচ্ছা এবার ধর সেই মেয়েটির মা হল একটি রাজ্যের মহারানী আর রাজ্যের সকল প্রজাকে সে নিজের গোলাম বানিয়ে তাদের ওপর মানসিক ও শারিরিক অত্যাচারের মাধ্যমে শাসন করছিল। সেই অবস্থায় মেয়েটি রাজ্যটি উদ্ধারের জন্য ঠিক একইভাবে তার মায়ের হত্যা করল। এবার কি বলবি? মেয়েটা ঠিক করেছে?’

খালিফা যেন চিন্তায় পরে গেল –‘যেন দ্বন্দ্বে পরে গেছে! অন্যদিকে অদিতি বলে উঠলো, – না মেয়েটা ঠিকই করেছে, যদি ওর উদ্দেশ্য রাজ্যের কল্যাণ হয় তবেই ঠিকই করেছে। ’

আমি হেসে বললাম, – ‘একেবারে ঠিক বলেছিস! কিন্তু দেখ দুটোই কিন্তু মাতৃ হত্যা! কি তাই না!’

ওরা ঘাড় নাড়তে, আমি আবার বলতে থাকি –‘ধর্মঠিক এইরকমই। ধর্মকোন নির্দিষ্ট বিধান হতে পারেনা।  স্থান, কাল আর পাত্রের পরিবর্তনের সাথে সাথে ধর্মের চেহারাও পাল্টে যায়। কেমন দেখ! এই মানুষের গতিবিধি। জন্ম সূত্রে ব্রাহ্মণ! … ইনার কাজ কি? ইনার কাজ হল যজমানি, জ্ঞান চর্চা, ভক্তি চর্চা, সত্য উদঘাটন আর মানুষ তৈরি করা, মানে শিষ্য প্রস্তুত করা – কি তাই তো! ব্রাহ্মণ কিন্তু কোন সময়েই অর্থ রোজগার করবে না! ক্ষত্রিয় তাকে গো আর ক্ষেত দান করবেন আর বৈশ্য তাকে খাদ্যদান করবেন আর শূদ্র তার সেবা করবেন। কি ঠিক বলছি তো! কিন্তু এখন দেখ…! সমাজ এত নিচে নেমে গেছে যে ব্রাহ্মণকেও অর্থ রোজগার করতে হচ্ছে! কিন্তু কি বলবি – যেই ব্রাহ্মণ নিজের সব কাজ করেও তারপর সমাজের আসুরিক অত্যাচারে জীবিকা অর্জনের জন্য চাকুরী করছে সে কি অধর্ম করছে?’

ওরা দুজনেই বলল, ‘না!’ আমি তাই হাসতে হাসতে বললাম –‘কিন্তু সেই ব্রাহ্মণই যদি শুধু অর্থ রোজগারই করে, নিজের জন্মসূত্রে লব্ধ কর্ম না করে, তখন কি বলবি?’

খালিফা এবার বলে উঠল, – ‘এখন তো তাই হচ্ছে!’

অন্যদিকে অদিতি বলে উঠলো, -‘হ্যাঁ সে তো অধর্ম বটেই! … আচ্ছা বুঝেছি… এইভাবে কালের সাথে সাথে ধর্ম পাল্টে গেল! … কি তাই তো?’

আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বললাম, – ‘হ্যাঁ ঠিক তাই!’

আমি আবার বললাম, – ‘আবার দেখ… মনুসংহিতা, যেটা নাকি পৃথিবীর প্রথম সংবিধান, সেটা বলছে মৎসাহার মানে মাছ খাওয়া চরম অধর্ম, কারণ মৎস্য থেকে মানুষ মায়ার মধ্যে ক্রমাগত তলিয়ে যায়। কিন্তু আবার এই মনুসংহিতাইএক জায়গায় বলছে, সমুদ্র উপকুলে যারা বাস করেন, তারা মাছ খেতে পারেন– যেহেতু তারা মৎস্য আহার ছাড়া বেঁচেই থাকতে পারেনা, সেই জন্য এই বিধান। ’

খালিফা বলে উঠলো ( কি উৎকণ্ঠা ওর স্বরে) –‘মাছ খাওয়া ভালো নয়?’

আমার কিছু বলার আগেই, অদিতি বলে উঠলো –‘কিন্তু মা, মনু মহারাজ তো মাছ খেতে বারণ করেছিলেন, কারণ তাঁর সময়ে ভগবান বিষ্ণু, মৎস্য অবতার নিয়েছিলেন বলে, তাই না?’

আমি হেসে বললাম, – ‘না রে! যেই জীব যেরকম ভাবে জীবনযাপন করে, তার শরীরেও সেই সমস্ত গুণ থেকে যায়! যেমন ধর, মুরগী! মুরগীর গুন কি? মুরগী সবার আগে ঘুম থেকে ওঠে। কি তাই তো? তাই কোন মানুষ যদি রোজ, সারাক্ষণ মুরগীর মাংসর উপর নির্ভর করে, তখন সে ওই মুরগীর মতন সকাল সকাল উঠবে আর তার সাথে কিন্তু সে মুরগীর মতই কামুক হয়ে উঠবে। ঠিক তেমনই ছাগল – ছাগল সারাক্ষণ টোটো কোম্পানির মত ঘুরে বেড়ায় – খুব চঞ্চল। কেউ যদি ছাগলের মাংস বেশী খায়, তখনও তার মত হয়ে যাবে! সেরকমই হল মাছ। নদীর মাছ বল বা পুকুরের মাছ , দুবেলা জালে আর ছিপে ধরা পরতে পরতে, ওদের জালে পরাটা সহজাত হয়ে গেছে – তাই ওদের রোজ খেলে কি হয়, ব্যক্তি মায়ার জালে পরে থাকলে, পরেই থাকে, সেখান থেকে বেড়িয়ে আসার কোন ইচ্ছা বা হুঁশই থাকে না! তাই মনু মহারাজ মাছ খেতে বারণ করেছেন। দেখ, নদী বা পুকুরের মাছ এমনই হয়ে থাকে, কিন্তু সমুদ্রের মাছ তো সেই শঙ্কায় থাকে না! তাই না! তাই দেখ মনু মহারাজ সমুদ্রের মাছ খেতে বারণ করেননি!

খালিফা এবার বলল –‘এই হল স্থানের সাথে ধর্মের পরিবর্তন! তাই তো?’

আমি ঘাড় নাড়তে ও বলে উঠল, – ‘একটা পাত্রের পরিবর্তনের উদাহরণ দাও!’

আমি হেসে বললাম, – ‘প্রথম উদাহরণটা মনে আছে?মেয়েটা শয়তান মহারানীকে হত্যা করে রাজ্যের কল্যাণ করেছিল!’

ওরা হ্যাঁ বললে, আমি আবার বলি –‘এবার ওই মা-ই যদি মহারানী না হয়ে সাধারণ একটা সংসারের গৃহকর্ত্রী হত, তখন কি মেয়েটার কাজকে ধর্ম বলতিস!’

অদিতি বলে উঠলো, – ‘না! কিছুতেই নয়। সে তো মাকে পাল্টাতে না পারলেও অন্যভাবে সামলে নিতে পারতো! কি পারতো না?’

আমি হেসে বললাম, – নিশ্চয়ই পারতো!

খালিফা এবার বলে উঠলো, – ‘বুঝে গেছি আমি, কেমন করে স্থান, কাল আর পাত্রের সাথে ধর্ম পাল্টে যায়। কিন্তু ধর্ম কি! ধর্মের কি এমন কোন ব্যাখ্যা আছে, যা জানলে যেকোনো কাজ ধর্ম না অধর্ম বোঝা যায়?’

আমাকে বলতে না দিয়েই, অদিতি বলে উঠলো, – ‘সেবাই ধর্ম! কি তাই না, মা?’

আমি হেসে বললাম, – ‘সেবা নিশ্চয়ই ধর্মের এক অনন্য বিশেষণ। কিন্তু বিশেষণ কি কোন বস্তুর সারমর্ম হয়?… একটু থেমে আমি আবার বললাম, – আচ্ছা হীরের বিশেষণ কি?’

অদিতি বলেউঠল, – ‘হীরে কার্বনের একটি রকম ফের; হীরে পৃথিবীর কঠিনতম ধাতু; হীরে …’

পাশ থেকে খালিফা বলে উঠলো, – ‘হীরে চকচক করে! আর হীরে কাঁচ কাটে!’

আমি বললাম, – ‘বেশ! এবার আমায় বল, প্রতিটি শক্ত ধাতুই কি হীরে! নাকি প্রতিটি … কি বললি… ওই কার-বন না কি, সব ওররকম জিনিষই হীরে? নাকি সব চকচকে দেখতে বস্তুই হীরে! কোনটা?’

অদিতি একটু লজ্জা পেয়েই বলল –‘বুঝেছি সেবা হল হীরে চকচক করে, ধর্মের সেরকমই একটা বিশেষণ! তাই তো?’

আমি বললাম, – ‘হ্যাঁ। ঠিক তাই। সেবাই ধর্ম, কর্মই ধর্ম, চেতনাই ধর্ম, সত্য জ্ঞানই ধর্ম –এই সব কটি হল ধর্মের বিশেষণ, এরকম সব কটি ধর্মের বিশেষণ যদি এক সাথে অবস্থান করে, তবেই সেটা ধর্ম। কেমন বলতো? ঠিক যেমন, একটি বস্তু পাওয়া গেছে যেটা খুব চকচক করছে, যেটা ওই কার-বনের রকম ফের, যেটা খুব শক্ত ধাতু আর যেটা দিয়ে কাঁচ কাঁটা যাচ্ছে – এই সব কটা যদি ওর মধ্যে থাকে, তবেই সেটাই হীরে। ঠিক তেমন। ’

খালিফা এবার বলে উঠলো, – ‘তাহলে মা, এক কথায় ধর্ম কি, সেটাবলা যায় না! তাই তো?’

আমি বললাম, – ‘নিশ্চয় বলা যায় রে! নিশ্চয় বলা যায়! ধর্ম হল ঈশ্বরের বেদী! যার উপর ঈশ্বর বা সচ্চিদানন্দ বিরাজ করেন, তাকেই ধর্ম বলে। ধর্ম নামের সাথে সব নাম চলে – যেমন পিতার সাথে ধর্ম যোগ করলে হয় পিতৃধর্ম; একইভাবে রাজার সাথে ধর্ম যোগ হলে রাজধর্ম; পুত্রের সাথে ধর্ম যোগ হলে হয় পুত্রধর্ম – এইরকম। মানে কি জানিস? শোন তবে –

পিতৃধর্ম হল পিতার ধর্ম, মানে একটা পিতা তার সন্তানকে যেমন ভাবে সচ্চিদানন্দ উপলব্ধি করার পথে নিয়ে যায়। একই ভাবে হল মাতৃধর্ম, ভাইয়ের ধর্ম, ভগিনীর ধর্ম, কন্যা ধর্ম, পুত্র ধর্ম, স্বামী ধর্ম, স্ত্রী ধর্ম। গুরুধর্ম হল যেই উপায়ে গুরু তাঁর শিষ্যকে সচ্চিদানন্দের বেদী পর্যন্ত নিয়ে যায়। সব থেকে কঠিন ধর্ম হল এই গুরু ধর্ম, প্রজাপালন ধর্ম আর শেষে রাজধর্ম। রাজধর্ম হল একজন রাজা কিভাবে তার প্রজাদের সত্যের এবং সত্যের চেতনা ও আনন্দের, মানে সচ্চিদানন্দের সম্মুখীন করবে। তাই মা! ধর্মের মুল কথা হল সচ্চিদানন্দের কাছে পৌঁছানো।

ওরা মন দিয়ে শুনছে দেখে আমি আবার বলতে থাকি –‘সব শিষ্য যে সচ্চিদানন্দের বেদীর সামনে উপস্থিত হবে, তা কখনই নয়; একটি পিতার বা একটি মাতার সন্তান যে সচ্চিদানন্দের সামনে উপস্থিত হবেই তার কোন নিশ্চয়তা আছে কি? নেই! কিন্তু পিতার বা মাতার শাসন, অনুশাসন বা স্নেহ সবকটিই যেন সেই সচ্চিদানন্দ উপলব্ধি অভিমুখী হয় – এইটিই হল ধর্মানুরুপ আচরণ। রাজা বা রাজ্যের চালক যদি প্রজাদের পেটের দিকে, ভালো চাকরি পাবার দিকে, বেশী বেশী করে আমোদ প্রমোদের দিকে না ঠেলে, প্রজাদের সচ্চিদানন্দ লাভের পথে এগিয়ে নিয়ে যায় – এইটাই তাঁর ধর্ম। এক কথায় কি জানিস তো! এই সচ্চিদানন্দকে উপলব্ধি করানোর জন্য যা কিছু কর্ম, তাই ধর্ম। আর যেই কর্মই এই সচ্চিদানন্দ লাভের পথ সুগম না করে, মায়ার প্রভাব বিস্তার করে, বিস্মৃতির প্রভাব বিস্তার করে, তাই অধর্ম! এবার বোঝা গেছে। ’

জানিস, ওরা দুজনেই কেমন যেন আমাকে ওদের জীবনের সবকিছু ভাবতে আরম্ভ করে দিয়েছিল –‘সত্যি বলছি রে। যাই হোক, আমরা এইরকম বসে বসে কথা বলছি, হঠাৎই ওই চোখ ট্যাপা চীনা পুলিশ মেয়েটা আমাদের সামনে এসে হাজির। ’

এসে যেমন মৈত্রী নমস্কার করত, তেমন করে নমস্কার করে অদিতির হাতে কি সব কাগজপত্র ধরিয়ে দিল! তারপর অদিতিকে ইংরাজি ভাষায়কি একটা বলল। সেই শুনে অদিতি আমাদেরকে বলল –‘চলুন মা! চল খালিফা!’

অদিতি আর সেই চীনা পুলিশ মেয়েটা আগে আগে চলল, আর পিছনে আমি আর খালিফা চললাম। যেতে যেতে খালিফা কি বলে জানিস! বলে –‘আচ্ছা আমি তোমাকে আম্মি বলে ডাকবো?… একটু চুপ করে আবার সেবলল, – আসলে আম্মি নামটা আমার কাছে খুব প্রিয়!’

আমি হেসে বললাম, – ‘যেমন তোর ইচ্ছা! জানিস আমি সেই বাড়ি থেকে বেরোনোর পর কতজন আমায় কত নামে ডাকে! কেউ বলে ভাবিজী, তো কেউ বলে মাতাজি। এলিজাবেথ তো (আসলে আমি তখনও এলিজাবেথকে অদিতি নাম দিইনি) আমাকে মা বলে ডাকে, তো তুই আমায় আম্মি বল না! সেই বলে যদি তোর অন্তরের জ্বালা জুড়োয়, তবে তাতে অসুবিধা কি?

সেই রাত্রে প্রায় দু থেকে তিন ঘণ্টা হেঁটে গিয়ে আমরা কৈলাসের নিচে পৌঁছে গেলাম। সেই চীনা পুলিশ মেয়েটা আবার সেই মাঝরাত্রেই ওই একইভাবে নমস্কার করে চলে গেল, আর যাবার আগে অদিতিকে কি সব বলে গেল। অদিতি আর খালিফা হাঁ করে কি যেন দেখছিল। এরপরটা ওরা কি করেছে, সেটা আমি পরে ওদের মুখ থেকে শুনি। আসলে কৈলাসের কাছে পৌঁছে যেন আমি অন্য কোথাও হারিয়ে গেছিলাম।

গৌরী এবার থেমে বলল, ‘গঙ্গা অনেক রাত্রি হয়ে গেছে রে! ঘুমিয়ে পর… আর জেগে থাকিস না বুঝলি!’

গঙ্গা সেই শুনে বলে উঠলো, – ‘কিন্তু মা! ঘুম আসছে না তো!’

গৌরী হেসে ওকে বুকের কাছে টেনে এনে বলল, ‘মা রে! আমি ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি তো তোকে! ঘুমিয়ে পর! দেখ তোর বোন ঘুমিয়ে পরেছে! আর তোর তো আবার সকাল সকাল ওঠা! ঘুমিয়ে পর মা!’

গঙ্গা যেন তারপর মায়ার সাগরে তলিয়ে গেল। সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখন সে সেই একই দৃশ্য দেখল, যে গৌরী তার পাশে নেই! গায়ের লেপটা ভালো করে দেওয়া! আরে কে যেন গঙ্গাকে ঠেলছে! ভূমিকম্প এলো না কি!

‘আরে তুমি?’ গঙ্গা দেখল গৌরী ওকে ডাকছে।

গৌরী হেসে বলল, ‘কটা বাজে খেয়াল আছে?ভোর পাঁচটা বাজে! তোর কাকা আর চাচারা ফিরে এলো বলে! যা তাড়াতাড়ি চান করে কাপড় পাল্টে নিচে যা!’

তখনও রোদ্দুর ফোটেনি, কিন্তু গৌরীকে কি সুন্দরী লাগছে! ভিজে চুল, এলো করে ছড়ানো আর পরনে একটা লাল পাতলা ছাপা শাড়ি– দেখে মনে হচ্ছে যেন সাক্ষাৎ ঊমা এসেছে ওদের কাছে! গৌরী আবার ঝাঁকা দিল, ‘কি রে?ওঠ!’

গঙ্গা এবার ধরমরিয়ে উঠে পরল। উঠে স্নান সেরে তাড়াতাড়ি কাচা শাড়ি পরে নিচের দিকে গেল। অন্যদিকে গৌরী জপে বসলো। গৌরী আসার পর থেকেই, যমুনা আজকাল খুব তাড়াতাড়ি উঠে পরছে! উঠে মশারী থেকে বেরিয়ে, চোখখানি কচলে সে উঠে দাঁড়ালো। প্রাতঃক্রিয়া করতে যাবার আগে ওর গৌরীর উপর চোখ পরল, আর তারপর ঘড়ি দিকে তাকিয়ে সে দ্যাখে সকাল সাতটা বাজে – এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে গৌরীর গায়ে – আর তাতে?

যমুনা বুঝে উঠতে পারল না, ও কি ঠিক দেখছে, না কি যা দেখছে তা ওর মনের ভুল! গৌরীকে যেন দেখাই যাচ্ছে না! যেন একটা হলুদ আর সাদা রঙ মিশিয়ে যেমন রঙ আসে, সেরকম একটা আগুনের পিণ্ড হয়ে রয়েছে! ওর সারা শরীর থেকে কি প্রচণ্ড তেজ বেরুচ্ছে! কি দেখছে ও! চোখ ভালো করে কচলে সে আবার তাকিয়ে দ্যাখে – না! না! এ তো গৌরী! আসলে ঘুম চোখে দেখেছে তো, তাই বোধ হয় ভুল দেখেছে! হ্যাঁ হ্যাঁ তাই হবে! কিন্তু কি সুন্দর লাগছে ওকে –পরনে লাল রঙের শাড়ীতে অসাধারণ লাগছে তাকে।  আর দুধের মধ্যে আলতা আর কাঁচা হলুদ মেশালে যেই রঙটা আসে, সেই রঙটা যেন গৌরীর গায়ের রঙ! আহা কি অসাধারণ লাগছে ওর গৌরী মাকে! সেই গায়ে রোদের ঝলক লাগতেই যেন জ্বলজ্বল করছে! কালো মিশমিশে চুল যেন পিছন থেকে ওর মাকে দেখতেই দিচ্ছে না!

যমুনা এবার সামনে গিয়ে গৌরীকে দেখতে লাগল– গৌরীর শরীরের ভিতরটা যেন তুলো দিয়ে ভরা! আর তার উপরের মোড়কটা যেন সব থেকে সেরা চন্দন কাঠের মসৃণ পালিশ করা! শাড়িটা কি সুন্দর– সম্পূর্ণ যৌবন ঢেকে তাকে মাতৃ সুলভ করে তুলেছে, আর সবার উপরে সেই মনোরমা অপূর্ব সুন্দর মুখখানি!

মায়ের ঠোঁটটার কি অদ্ভুত রঙ! কোনদিন বোধ হয় ঠোঁটপালিশ পরেনি! যেন পুরো গোলাপের পাপড়ি! না! ঠিক হল না! গোলাপের পাঁপড়ি অনেক রঙের হয়, লাল আর গোলাপি গোলাপের পাপড়ির যেই জায়গাটা গোলাপি রঙ ছেড়ে যায় আর লাল রঙ ফুলকে রাঙ্গিয়ে দিতে দায়িত্ব নেয়, সেই রঙটা – হ্যাঁ সেই রঙটা হল গৌরীর ঠোঁটের রঙ! তার সারা গাল আর থুঁতনিতে যেন সাদা তেল আর ঘামের বিন্দু লেগে রয়েছে – না হলে এত চকচক করে কি করে! গৌরীর নাকখানিও কি সুন্দর! যেন কোন মৃৎশিল্পী সারাদিন ধরে ওই নাকের উপর কাজ করে সম্পূর্ণরূপে সঠিক করে দিয়েছে – একেবারে নিখুঁত! আর তার উপরের দুদিকে দুটো চোখ যেন বসন্তের সময়ে দুটো কিশলয় – অপূর্ব চোখ দুটো! যেন দুটো পাতার মধ্যে কোন তারতম্য নেই –যেন পুরো যমজ বোন! কাজলের মত চোখ – কাজল না পরেও কারুর চোখ কি করে এত নিখুঁত টানা হয়! গৌরী এখন ধ্যানস্থ, তাই চোখ দুটো এখন বন্ধ – তাই তার চোখের পাতার রংটাও আজ ভালো করে দেখা যাচ্ছে! চোখের পাতায় যেন হলুদ আর আলতাটা একটু বেশী করে দেওয়া হয়েছে! কি অদ্ভুত সুন্দর! আর তার উপর…! এটা কি দেখছে ও!

চোখ কচলে যমুনা আবার গৌরীকে ভাল করে দেখে একটু শান্ত হল – কিন্তু হঠাৎ করে সে, ওরকম ত্রিনয়ন দেখলো কেন? কি সব দেখছে – গা দিয়ে আভা বেরিয়ে যাচ্ছে, ত্রিনয়ন দেখছে – সবই ওর মনের ভুল! না হলে চোখ কচলে দেখলে, থাকছে না কেন? যমুনার মন ভোরে তার গৌরী মাকে দেখতে থাকল। দ্যাখা শেষ হলে কাচা জামাকাপড় নিয়ে ও এবার কলঘরে চলে গেল। এই মিনিট পনেরো সময় পরে ফিরে আসতেই দ্যাখে– গৌরী উঠে পরেছে। শুধু ওঠেনি, উঠে মশারী ভাঁজ করে, বিছানা পরিষ্কার করাও হয়ে গেছে! যমুনার জন্যই সে অপেক্ষা করছিল। যমুনা আসতেই বলল– ‘চল, নিচের দিকে যাই – তোর দিদি একা হাতে সব করছে!’

দুজনে মিলে নিচে গিয়ে জলখাবার করলো! তিনজনে মিলে জলখাবার খেয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে ঢুকে গেল! যেন কি একটা অজানা কারণে সবার খুব তাড়া। গৌরীও লক্ষ্য করছিল – কেউ কারুর সাথে কোন কথা বলছে না! সকলে নিজের কাজ করে চলেছে! তাই শেষে আর থাকতে না পেরে গৌরী বলেই ফেলল –‘হ্যা রে তোরা কি দুই বোনে ঝগড়া করেছিস? কেউ কারুর সাথে কথা বলছিস না যে!’

গঙ্গা হেসে বলল, ‘না গো! আজ আসলে সময় কম! আজকে তো বাচ্চাগুলো পড়তে আসবে! তাই তাড়াতাড়ি করছি। ঝটপট রান্না শেষ করে, গল্প শুনবো – কি গো শোনাবে না!’

গৌরী হাসতে হাসতে বলে উঠলো, ‘দেখ মেয়েদের কাণ্ড! গঙ্গা মা! যমুনা না হয় বাচ্চা মেয়ে! কিন্তু তুই কি বলতো! তোর খালি বয়সটাই বেড়েছে! বাইরে একটা বড় মানুষের মুখোশ পরে থাকিস! কিন্তু ভিতরটা তোর যমুনার থেকেও বাচ্চা!’

গঙ্গা চুপ করে বসে থাকার মেয়ে নয়। তার উত্তর সব সময়ে তৈরি। গঙ্গা উত্তরে বলে উঠলো, ‘যাই বল মা! আমাদের মন যতই বাচ্চা হোক, তোমার থেকে তাদের বয়স বেশী! তোমার মন যে পুরো শিশুর মত!’ এই বলার পর গঙ্গা আর গৌরী দুজনেই হেসে উঠলো। যমুনা বড়দের মাঝে হাসবে কিনা ভাবছিল! কিন্তু কেন যেন মনে হল – ওর দিদির আর ওর মায়ের হাসি একসাথে মিশেপুরো ঘরে এক অদ্ভুত আলোড়ন এনে দিয়েছে! কেমন যেন সহস্র শিশু একসাথে হেসে উঠেছে! তাই সে ভাবল, এর মধ্যে ও যদি হাসেও, তখন কেউ নজরই দেবে না – তাই যমুনাও হাসির মালায় নিজের হাসির ফুলটাও গেঁথে দিল।

অন্যদিকে গঙ্গার আর গৌরীর প্রায় সব রান্না শেষ – আজ বাগানের পুঁই মেটুলী হয়েছে আর যমুনার প্রিয় গুগলি! যমুনা ভাতের হাড়ি উল্টে ফ্যান ঝরাতে দিয়ে তাড়াতাড়ি পাশের ঘরে গিয়ে গৌরীর বসার জায়গা করে দিল। তারপর ছোট্ট চৌকিতে বসে পা দোলাতে দোলাতে সে গৌরীর কথাই ভাবছিল– প্রায় পাঁচ মিনিট পরে গঙ্গা আর গৌরী হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো। ওদের হাসিটা অদ্ভুত সুন্দর। যাই হোক গৌরী এসে বসতেই, যমুনা গৌরীর কোলেশুয়ে পরল! গঙ্গা ওকে যেন বকতে গিয়েও থেমে গেল! হঠাৎ যেন কোথা থেকে মনে বেদনার সানাই বেজে উঠল – আর তো কিছুদিন পরেই গৌরী চলে যাবে! থাক না… মেয়েটা তো কোনদিন ওর মাকে পায়নি! আসলে গৌরী যতই বলুক যে ও ওদের দুইবোনকে ছেড়ে যাবে না – কিন্তু ছেড়ে তো যেতেই হবে!

গঙ্গা এবার বলে উঠলো – ‘হ্যাঁ মা! আজঅনেক সময় আছে  – দেখ আজ দশটার মধ্যে সব কাজ শেষ করে নিয়েছি। অনেক সময় আজ! বল তারপর কি হল!’

গৌরী বলল, ‘হ্যাঁ রে কাল কত অবধি বলেছিলাম রে?’

গঙ্গা বলল, ‘ওই কৈলাসে তোমরা পৌঁছালে আর তারপর অদিতি আর খালিফা কি করেছিল, তুমি কিছুই জানো না!’

‘ও হ্যাঁ, শোন না, ’এই বলে গৌরী বলতে শুরু করল –

তখন রাত্রি, ভোর হতে অনেকটাই দেরী। আমি তখন এক জায়গায় বসে পরেছিলাম। বসে বসে শিবের নাম করতে করতে, কি দেখি জানিস!

গঙ্গা যমুনা দুজনে একই সাথে জিজ্ঞেস করে উঠলো, ‘কি গো?’

গৌরী উত্তরে বলতে থাকে –

দেখি একটা কি বিশাল আকারের বলদ! আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে যেন কিছু বলতে চাইছিল! কিন্তু তবুও কিছু না বলে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছে আর চোখের জলে ভাসাচ্ছে! আমি থাকতে না পেরে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, – তুমি কাঁদছো কেন গো?

আমি অবাক হয়ে গেলাম জানিস! আমি যেন বলদের কথা শুনতে পারছি! কিন্তু কি করে?

আসলে আমি এই স্থূল শরীরে নিজেকে যে দেখছিলাম না, তখন সেটা বুঝবো কি করে! তবে পুরো ঘটনাটা আমি যা দেখেছি, তাই তোদের বলছি  –

সেই বলদ বলে, সে নাকি নন্দী!

তাকে দেখে আমার তো ভক্তি আসার উচিত ছিল –কিন্তু কেন যেন ভক্তি এলো না! এলো করুণা! আমি দুহাত বাড়িয়ে তাকে আলিঙ্গনের জন্যে ডাকলাম! আর সেও দেখি কি আমার কাছে এসে আমার পায়ে নিজের মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল!

বাস্তবে আমি বসে থাকলেও, সেখানে আমি নিজেকে দাঁড়িয়ে থাকতেই দেখি!

তারপর সে আমাকে তার নিজের কাঁধে বসতে বলল! আমি বসতেই, সে কৈলাস পাহাড়ে উঠতে থাকে! কি অবলীলায় উঠছিল না দেখলে বিশ্বাস করবি না! যেন পাহাড় নয়, কোন সোজা রাস্তা দিয়ে সে হেঁটে চলেছে!

কি বিশাল দেহ ওর! ও সামান্য গতিতেই যাচ্ছিল, কিন্তু ওর বিশাল দেহতে বসে আমার মনে হচ্ছিল যেন সে চল্লিশ পঞ্চাশ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে চলেছে! খানিকক্ষণের মধ্যেই সে আমাকে একটা গুহার মুখে নিয়ে এলো!

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘নন্দী এটা কোথায় বাবা!’

সে বলল, ‘মা, এটা কৈলাস পর্বতেরই একটি গুপ্ত স্থান! সাধারণ মানুষ এই জায়গা দেখতেই পায়না! কেবলমাত্র পুণ্য হৃদয়ের ভুত, প্রেত, ডাক, ডাকিনী, যোগিনী, আর পুণ্য হৃদয়ের দেবতা – এরাই শুধু দেখতে পায়! মানুষ খালি চোখে এর কোন হদিশই পায়না! মানুষকে এই স্থানে আসতে গেলে, স্থূল শরীর ফেলে রেখে, সূক্ষ্ম শরীর নিয়ে আসতে হয়। তবে সেই সূক্ষ্ম দেহধারীকেও পবিত্র হতে হয়! রাবণ পর্যন্ত এই কৈলাসের পাদদেশের পর উপর অবধি উঠতে পারেনি!’

আমি বললাম, ‘তবে আমি যে উঠলাম! কি করে পারলাম! তোমার সাথে এসেছি বলে!’

নন্দী যেন চূড়ান্ত লজ্জাবোধ করে বলে উঠলো, ‘মা! একি বলছেন আপনি! আপনি যে কৈলাসস্বামিনী! আপনি যে প্রভুর অর্ধাঙ্গিনী!’

আমার তখন মনে খুব আনন্দ হল জানিস! মহাদেব তাহলে সত্যি করেই আমাকে স্বীকার করে নিয়েছেন! আনন্দের সাথেই বললুম, ‘আচ্ছা নন্দী, মহাদেব আর দেবী পার্বতী কি এখানেই বসতেন?’

নন্দী হেসে বলল, ‘মা! এইখানে প্রভু প্রতি মন্বন্তরের শেষে বিরক্তিতে থাকাকালীন সাধনায় বসেন! আপনি ভিতরে যান মা! আমার এর ভিতরে যাবার অনুমতি নেই!’

আমি বলে ফেললুম, ‘তুমি যেতে পার না, আমি পারবো!’

সে বলে, ‘হ্যা মা! এই পুণ্যক্ষণের জন্যই তো সমস্ত জগত সংসার অপেক্ষা করে বসে রয়েছে! যখন প্রভুর বিরক্তি ঘুচবে! আপনি প্রভুকে পতি রূপে স্বীকার করেছেন! তাই আপনার স্পর্শ পেলেই যে প্রভু জেগে উঠবেন!’

আমি গুহার ভিতরে গেলাম! আমার তো ভয়ে বুকটা ধুকপুক করছিলো জানিস! আমায় বোধ হয় মহাদেব এবার মদনদেবের মত ভস্ম করে দেবে! তাও ভিতরে গেলুম! মহাদেবকে একবার দেখব বলে মন ছটফট করছিলো! যেন কতদিন তাঁকে দেখিনি! ভিতরে গিয়ে দেখি কি! চারিদিকে ভর্তি কঙ্কালের খুলি! কাছে গিয়ে দেখতে কি দেখলুম জানিস! দেখলুম সব কটা কঙ্কালমুণ্ড একটা মালাতেই গাঁথা! আর সেই মুণ্ডুর মালার কাছাকাছি যেতেই চমকে গেলুম! আমি যেন কারুর গায়ে পা দিয়ে, তাঁর গলার মালা ধরতে উঠছি মনে হল!

হুড়মুড় করে নিচে নেমে এসে ভালো করে নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করি – কিন্তু কিছুই বুঝতে পারি না! কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি যেখানে পা দিয়ে উঠছিলুম, সেটা কারুর দেহ! ভালো করে দেখতে কি দেখলাম জানিস! এই গুহাটার মাঝখানটা হল ওই জায়গাটা! হ্যাঁ রে একেবারে মাঝখানটা! আমি যেই জায়গাটা গিয়ে দাঁড়িয়েছিলুম, তার উপরে প্রায় ত্রিশ ফিট হবে গুহাটা, কিন্তু যেই জায়গাটা দাঁড়িয়েছিলুম, তার নিচের দিকেও যেন সুরঙ্গ মত নেমে গেছে! এবার আমি ভয় পেয়েই বেশ খানিকটা দূরে সরে যাই! আরে ভয় কি এমনি পেয়েছি! দেখি কি, যেই জায়গাটার উপর পা দিয়ে মুণ্ডু মালাটা দেখতে যাচ্ছিলুম, সেই জায়গাটা থর থর করে কেঁপে উঠেছে!

নিশ্চয় ভূমিকম্প। এই ভেবে সবে ভেবেছি গুহা থেকে বেরুতে হবে, দেখি কি একটা অতিকায় মানুষ যেন উঠছে সেই স্থান থেকে – বিশাল মানুষ! খানিকটা ওই নিচের দিকের সুরঙ্গ থেকে টেনে তুলল নিজের শরীরটাকে আর বাদবাকিটা উপরেই ছিল! সবটা আসলে দেখে মনে হচ্ছিল – পাথরের দেওয়াল। আসলে ওটা একটা মানুষ! আমি বললাম না, আমার মনে হয়েছিল, যেন কারুর গায়ের উপরে পা দিয়ে উঠছি আমি!

এবার আর গুহা থেকে বেরুলাম না, তবে জানিস, কি প্রচণ্ড কম্পন! কতবার যে আমি দাঁড়িয়ে না থাকতে পেরে পরে গেলুম! শেষে আর দাঁড়াইনি! বসে বসেই সবটা দেখছিলুম – ধুর এতবার পরেছি! কি দেখলাম জানিস – দেখি ত্রিশ ফুটের একটা বিশাল দৈত্য সামনে এসে দাঁড়ালো! তারপর কি জোরে গা ঝাড়লো! যেন কত হাজার বছর ধরে গায়ে নোংরা পরে রয়েছে –দেখতে দেখতে পুরো গুহাটা ধুলোয় ভরে গেল! না রে! কম বলে ফেললাম! জায়গাটায় একটা আস্ত ধুলো-ঝড় উঠেছিল! কিছু দেখতেই পাচ্ছিলুম না! অনেকক্ষণ পরে যখন সাহস করে চোখ খুললুম, ভুত দেখার মতন করে চমকে উঠি!

ওই বিশাল দৈত্যের মতন দেখতে মানুষটা সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে! কিন্তু এ আমি কাকে দেখছি! চরণে কি বিশাল একটা বালা, পরনে বাঘের ছাল! সারা গায়ে প্রচুর রুদ্রাক্ষ! গলায় একটা বিশাল সাপ আর কঙ্কালমুণ্ডের মালা! মাথায় জটা! – এ যে প্রভু! আমি পরি কি মরি করে হামাগুড়ি দিয়েই তাঁর পায়ে লুটিয়ে পরবো বলে গেলুম, কিন্তু তিনি আমাকে ধরে নিলেন! আমি যেন তাঁর কাছে একটি ছোট্ট শিশু! তিনি হাঁটু গেড়ে বসলেন আর আমাকে তাঁর বুকে জড়িয়ে ধরলেন!

গঙ্গা আর যমুনা দুজনেই দেখতে পেল – ওদের মায়ের দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে গড়িয়ে পরছে! এ তো আনন্দের জল, তাই ওরা গৌরীকে আর আটকালো না! গৌরী বলেই চলেছে (কোনদিকেই যেন ওর কোন হুঁশ নেই) –

উনি যখন আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন, আমি স্পষ্ট অনুভব করেছি, আমার পিঠ বেয়ে উনার চোখের জল পরছিল! যখন উঠলাম তখন উনি একটাও কথা না বলে, আমাকে নিয়ে সোজা হাত ধরে গুহার বাইরে নিয়ে এলেন! বাইরে এসে কি দেখি জানিস!

সেখানে নন্দী দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর তার দুই পাশে রয়েছে দুটো ছেলে! আর সেই তিনজনের পিছনে রয়েছে কত মানুষ! সবাই প্রভুর দিকে হাতজোড়া করে প্রণাম করছিল! শুধু নন্দীর দুই পাশে যে দুই ছেলে দাঁড়িয়েছিল, তাদের একজনকে কি সুন্দর দেখতে, আর মহাদেবের মত তার উচ্চতাও বিশাল – এই কুড়ি ফুটের মতন উচ্চতা হবে! কাঁধের সাথে ঠেকানো রয়েছে একটা বিশাল বল্লম, আর হাতে একটা আরতির থালা! আমি বুঝলাম উনি শিব পার্বতীর প্রথম পুত্র কার্ত্তিক।  আর ওই পাশে রয়েছে গণেশ! হ্যাঁ আমি দেখেই চিনতে পেরেছি রে, সাদা হাতির বিশাল মুণ্ডু ওর মাথায়, আর বিশাল ভুঁড়ি। কি নাদুস নুদুস দেখতে! তাঁরও হাতে মঙ্গল প্রদীপ আর আরতির থালা!

ওদের সবার চোখে জল দেখে, যতক্ষণ না আমার ঘোর ভেঙেছে ততক্ষণ আমার মনে হয়েছে, আমি বোধ হয় এই গৌরী নয়, আসল গৌরী! প্রভুর দুই ছেলেই আমার কাছে এলো, এসে প্রথমে প্রভুকে প্রণাম করল, আর তারপর আমাকে প্রণাম করতে গেল! আমি প্রণাম নিতে পারি বল! যাদের সব সময়ে বাড়িতে পুজো হতে দেখে এসেছি, তাঁরা নাকি আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবে! সেটা হয় বল! তবে আমার কেমন যেন মনে হল, আমার স্পর্শ পেতে ওরা দুজনে আর বাকিরাও ব্যাকুল! তাই কার্ত্তিক আর গণেশকে কি মনে হতে সন্তান স্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরি! কি যেন অনাবিল আনন্দ হচ্ছিল তখন –কিছুতেই বলে বোঝাতে পারব না! ঠিক যেন মনে হচ্ছিল – ওরা সবাই আমার নিজের ছেলে, নিজের… একে বারে নিজের!

যাই হোক, ওই পিছনে থাকা মানুষগুলোও একের পর এক এসে প্রথমে প্রভুর পায়ে হাত দিয়ে, আর তারপর আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছিল! এক অদ্ভুত আনন্দের স্রোত শরীরে খেলে যাছিল !

শেষে প্রভু আর বাকিরা মিলে আমাকে কৈলাসের চূড়ায় নিয়ে গেল! চূড়াতে পৌঁছাবার আগেই একটা বিশাল বড় গুহা পরল – সেই গুহাটার সামনের দিকটা বিশাল বড়, খোলা আর একটা বড় বেদী মতন রয়েছে! সেখানে গিয়ে প্রভু বসলেন! আমি তাঁর সামনে গিয়ে হাত জোড় করে দাঁড়িয়েছিলুম! সেই দেখে গণেশ আমার কাছে এসে, আমার হাত ধরে প্রভুর পাশে বসতে বলল! আমার প্রচণ্ড কুণ্ঠা হচ্ছিল! মাতা পার্বতীর স্থানে কি করে আমি বসি! শেষে প্রভু আদেশ দিতে আমি বসতে বাধ্য হলাম। সেখানে নন্দীদের পিছনে দাড়িয়ে থাকা লোকগুলো অনেকক্ষণ নাচ গান করলো, শেষে আমি, প্রভু, নন্দী, গণেশ আর কার্ত্তিক – বাকিরা চলে গেল ! কোথায় গেল কে জানে?

আমি তখনও ভয়ে সিটিয়ে রইছি দেখে, প্রভু বললেন- ‘গৌরী! এটা তোমারই স্থান! এত কুণ্ঠা কেন!’

আমি কি বলব ভাবতেই পারছিলুম না! চুপ করে বসেছিলুম। তারপর গণেশ বলতে আরম্ভ করে, ‘জানো মা! তুমি সেই ফিরলে না! আর বাবা তখন থেকে ওই গুহাতেই বসেছিলেন! আর আসেনই না! মর্তলোকে সেই সময়টা পাঁচ হাজার বছরের বেশী কেটে গ্যাছে!’

আমি এবার আর লজ্জা না পেয়েই বলে ফেললাম, ‘আমি তো গৌরী, দেবী পার্বতী নই! তা হলে তোমরা আমাকে তাঁর স্থান দিচ্ছ কেন! এতে তো তাঁর অপমান হয়, তাই না!’

আমার কথা শুনে, গণেশের দুচোখ জলে ভরে উঠলো, আর কার্তিকেরও চোখ ছল ছল করে উঠলো! আমি কিছু বুঝতে না পেরে, প্রভুর দিকে তাকাতে, তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘গৌরী, তুমি এখানে থাকতে পারবে না! তোমাকে ফিরে যেতে হবে!’

এবারে আমার চোখ জলে ভরে যায়, শুধু তাই নয়! আমি যেখানে বসেছিলুম, সেখান থেকে প্রভুর চরণে গিয়ে, তাঁর কাছে অনুনয় করি, ‘প্রভু, আমাকে স্ত্রীর সম্মান দিতে হবে না! আমায় আপনার দাসী করে রাখুন! দয়া করে আমায় তাড়িয়ে দেবেন না!’

সেই দেখে প্রভু আমাকে উঠিয়ে আবার যেখানে বসেছিলুম, সেখানে বসালেন আর বললেন, ‘দেখ গৌরী! আমি এতদিন শব হয়ে ছিলাম ঠিকই, তবে ভবিষ্যতে কি ঘটতে চলেছে, সবটাই দেখেছি! হ্যাঁ এটা ঠিক যে এটাই তোমার নিবাসস্থল, তুমি আমার স্ত্রী! কিন্তু এর থেকেও যেটা বেশী ঠিক, সেটা হল, এই স্থান আর বেশীদিন বসবাস যোগ্য নয়! কিছু বছরের মধ্যে যে পৃথিবীতে মহাপ্রলয় আসতে চলেছে, তাতে এই কৈলাস আর থাকবে না, কারণ হিমালয় আবার সমুদ্রে পরিণত হওয়া শুরু হবে! তুমি আসাতে আমি শব থেকে আবার শিব হয়েছি, কিন্তু তোমার সামনে অনেক কাজ পরে রয়েছে! ফিরে যাও গৌরী! তোমার সাথে অনেক পুণ্যাত্মা যোগ দেবেন, অনেক ভক্ত যোগ দেবেন, তাদের নিয়ে আমাদের একটা বাসস্থান কর! সেই স্থানের চয়ন করে কাজ শুরু কর। তারপর কার্ত্তিক আর গণেশ তোমার সহায়তায় পৌঁছে যাবে! আর সবশেষে সেখানে গিয়ে আমি তোমাদের সবাইকে নিয়ে একসাথে নিবাস করবো! এই কাজের জন্যই তুমি জন্মেছ, এইটাই তোমার কাজ! আমি তোমার সাথে গিয়েই থাকবো! আমি কথা দিলাম! তোমার ছেলেরাও থাকবে! কিন্তু সবার আগে সেই স্থানের নির্মাণ কর!’

আমি সেটাই প্রভুর আদেশ মনে করে তাঁকে বললাম, ‘কোথায় নির্মাণ হবে! আর কি করেই বা নির্মাণ হবে! নির্মাণ করতে যে জায়গা লাগে! নির্মাণ করতে যে অর্থও লাগে, সেটা কোথায় পাবো প্রভু?’

তিনি হেসে বললেন, ‘সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে! তুমি এখান অবধি আসতে যাদের যাদের সাথে দেখা করেছ, তাঁরা সবাই এই নির্মাণ কাজে, তোমার সাথে যোগ দেবে, আর এরা ছাড়াও আরও বেশ কিছু মানুষজন আছে, যারা তোমার এই কাজের সাথে যোগ দেবে যুগে যুগে। আগে তাদের সকলকে একসাথে কর, তারপর তাদেরকে নির্মাণ কাজের অনুপ্রেরণা দিয়ে একটি উপযুক্ত বাসস্থান তৈরি কর , তারপর আমি তো যাবই, আমাদের পুরো পরিবারকে নিয়ে’।

সেই কথা শুনে আমি বললাম, ‘আমার সাথে সকলে কাজ করবে কেন?’

তার উত্তরে তিনি বললেন, ‘গৌরী! আমার কি সাধ্যি যে আমি তোমার কাজের গতি প্রগতি নির্ধারণ করে দিই! তোমার কাজের প্রণালী যে তোমারই, তোমার একার! আমরা সকলে তো সেই প্রণালীর দর্শক আর রক্ষক মাত্র!’

এত বলে, নন্দীকে ডেকে তিনি আমাকে পাহাড়ের নিচে নামিয়ে দিয়ে আসতে বললেন। সেখান থেকে আসার আমার কনো ইচ্ছাই ছিল না জানিস! কার্ত্তিক, গণেশ এমনকি নন্দীরও আমাকে বিদায় দেবার কনো ইচ্ছা ছিল না। গণেশ আমাকে একটা উপহার দিয়েছিল! একটা অদ্ভুত দেখতে পাথর! সেই পাথর দিয়ে আমায় সে বিদায় জানায়! সেই দেখে আমার চোখের জল যেন বাঁধ মানছিল না! কিন্তু যখন দেখলাম প্রভুর চোখেও জল, তখন আমি আর কাঁদিনি! সত্যি বলছি! আর একবারো কাঁদিনি! মনে মনে সেদিন সংকল্প নিলাম – আমাকে দ্বিতীয় কৈলাস নির্মাণ করতেই হবে! আমার মতন করে করতে হবে!

নন্দী আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে চলে যেতে, আমার ঘোর ভাঙ্গে! কি কান্না কেঁদেছিলুম তখন জানিস! খুব কেঁদেছিলুম! তবে এটা ভেবে কেঁদেছিলুম যে আমার দেখা পুরো জিনিসটা একটা স্বপ্ন! আমি আসলে শিব বাবাজীর দেখাই পাইনি! সবটাই কল্পনা! তবে মনে মনে নিশ্চয় করে ফেলি! আরও একটা কৈলাস তৈরি করতেই হবে!

যমুনা এবার উৎকণ্ঠার সাথে প্রশ্ন করে উঠলো, ‘এসে অদিতির আর খালিফার কি অবস্থা দেখলে?’

‘সে কথা আর বলিস না!’ গৌরী যমুনাকে বলতে থাকলো। ‘ফিরে এসে কুইনের দিকে তাকাতেই যেন দেখলুম যে, ও কতগুলো দেব শিশু সামলাচ্ছে! কেন জানি মনে হল, সেটাই ভবিষ্যৎ! তাই ওর নাম অদিতি দিয়ে দিলুম, আদিত্যদের মা – অদিতি! আর খালিফা তো বলেইছিল, ওর নাম পাল্টে দিতে – তাই ওকে প্রিয়ম্বদা বলে ডাকি! ওটাই ওর নাম হলেও, আমিই পরে বলি, ওকে আমি প্রিয়া বলেই ডাকবো, প্রিয়ম্বদা নামটা বড্ড বড় কি না!’

গঙ্গা এবার বলে উঠলো, ‘তখন নিশ্চয়ই দিন হয়ে গেছিল!’

গৌরী হেসে বলল, ‘দুই মেয়ে মানে প্রিয়া অর্থাৎ খালিফা আর অদিতি তো আমার উপর খেপে লাল! আমি নাকি তিনদিন ধরে ধ্যানস্থ ছিলাম!’এই বলে গৌরীর কি হাসি!

গঙ্গা বলে উঠলো, ‘এবার তার মানে ফেরার পালা! তাই তো!’

গৌরী হেসে বলল, ‘হ্যাঁ! এবার ফেরার পালা আর সাথে সাথে দুর্ভোগও!’

গৌরী আবার বলতে শুরু করে দিয়েছে, কিন্তু গঙ্গা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে! সাধারণত কেউ ভাবনায় হারিয়ে গেলে, গৌরী তাকে ফিরিয়ে আনতে ব্যস্ত হয় না – কিন্তু আজ সে ব্যস্ত হল! গঙ্গা ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলে, গৌরী বলতে শুরু করে –

অদিতি আর প্রিয়া! সে দুজনকে দেখলে তুই হাসতে হাসতে মরে যাবি! মা সাড়া না দিলে, বাচ্চারা যেমন ছটফট করে, ঠিক তেমনটা করছিল। সে কি ছোটাছুটি দুজনের জানিসনা! একজন দেখি বেশ কিছু বরফ নিয়ে এক জায়গায় বসেছে অন্যদিকে আরেক জন আগুন আনতে ব্যস্ত।  সেই বরফ গলিয়ে যে জল পাবে তা নাকি আমার মাথায় ঢালবে!

আমি চোখ খুলতেই দেখি ওরা দুজন আমার কাছে ছুটে এলো! এসে এমন হাঁপাচ্ছিল যেন ওরা কত দূর থেকে ছুটে এলো! হেসে হেসে বলতে থাকলো – মা! তুমি তো আমাদের ভয়ই পাইয়ে দিয়েছিলে!

তারপর খালিফা অভিযোগের সুরে বলতে শুরু করল, – আর বলো কেন! এই এলিজাবেথ আমাকে কি বলে জানো! বলে অনেক সময়ে নাকি সাধুরা এমন অবস্থায় চলে যায় – আর তাঁরা ফেরেই না! কথা শুনে তো আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে গেছিল!

আমি তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে বলি, এবার আমাদের যেতে হবে! অনেক কাজ পরে রয়েছে। জানিস, আমি যেন ওদের ভবিষ্যৎ সেই মুহূর্তে দেখতে পাচ্ছিলুম! খুব অল্প সময়ের জন্যই সেটা ছিল! দুজনকে বললাম, কাশী পৌঁছে তোরা কিন্তু আমাকে হারিয়ে ফেলবি! কিন্তু আবার পেয়েও যাবি – কলকাতা যেতে হবে তোদের! সেখানেই আমার দেখা পাবি। তোরা কলকাতায় গিয়ে বৃন্দাবন গার্ডেনসে পৌঁছে পীতাম্বর ঘারেওয়াল বলে একজনের খোঁজ করবি। সেই তোদেরকে আমার কাছে নিয়ে যাবে!

দেখলুম ওদের চোখটা ছলছল করে উঠলো! আমি আবার ওদেরকে কাছে ডেকে বললুম, – হ্যাঁ রে চিন্তার কি আছে! আমি তো রয়েছি আর আমি থাকবোও! তোরা আমাকে হারিয়ে ফেলবি ঠিকই! কিন্তু আবার খুঁজেও পেয়ে যাবি! চিন্তার কিছু নেই!

ওরা আশ্বস্ত হলে, আমরা এবার রওনা দিই! কিন্তু রাস্তা তো আমরা চিনি না! কি করবো! একবার ভাবলাম, ওই মোটা লোকটাকে ডাকবো! পরের মুহূর্তে মনে হল, মহাদেবের কথা! আমাকে একাই চলতে হবে আর সকলকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে!

কিন্তু জানিস! সেই সময়টা মনের কি জোর ছিল! একবার মনে মনে ভেবেছি আর অমনি হাজির সেই লোকটা! আমার কাছে এসে সে প্রণাম করতে আমি বললাম, – ‘আচ্ছা তুমি সেদিন কি করেছিলে বলো তো! এই দুটো মেয়ের কিছুই মনে নেই!’

সে হেসে বলে –‘দেবী! সাধারণ মানুষ আমাদের দেখতে পায় না! আমাদের দেখতে হলে চার দৃষ্টি দিয়ে দেখতে হয়! মানুষ সব কিছু তিন দৃষ্টি দিয়ে দেখেন, তাই আমাদের দেখতে পান না!’

আমি বললাম, – ‘এটা আবার কি! তিন দৃষ্টি, চার দৃষ্টি!’

সে হেসে বলে, – ‘দেবী, বইয়ের পাতায় বা অন্যত্র যা কিছু দেখতে পান আপনারা সবই হল দুটি দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখা – স্থান এবং পাত্র! কালের দৃষ্টিকোণ সেখানে থাকে না! মানুষ নিজের চোখে যা দেখে, সেটা হল তিনটি দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখা! এতে কালের প্রতিফলনও থাকে, কাল অকৃত্রিমভাবে গতিমান, তাই সচল! এখন মানুষ অবশ্য আপেক্ষিকভাবে, কৃত্রিম উপায়ে এই তিন নম্বর দৃষ্টিকোণকে জাগ্রত করেছে, তবে তার পরিধিও সীমিত! এ ছাড়াও আরও একটি দৃষ্টিকোণ রয়েছে – তা হল চেতন কোন। চেতন কোন সকলের জাগ্রত অবস্থায় থাকে না! তাকে জাগ্রত করতে লাগে আধ্যাত্মিক শক্তি ও উর্জা! যাদের যাদের সেই শক্তি জাগ্রত হয়, তারাই আমাদের দেখতে পায়, যেমন আপনি।’

আমি বললাম, – তা হ্যাঁ গো, এমন কিছু করা যায় না, যাতে আমরা তিনজনেই তোমাকে দেখতে পাই! আসলে কি বলতো, সবাই তো এই সব আর বুঝবে না! এই সব আমি দেখছি, অন্যরা পারছে না, এরকম করলে, সকলে , অতিজাগতিক কিছু হচ্ছে ভেবে বসে! তাই বলছিলুম আর কি!

এই কথাটা তার মনে ধরেছিল বুঝলি! সে বলল, ‘আপনি আপনার দুই কন্যাকে নিয়ে মানসসরোবর পর্যন্ত যান, আমি দেখছি কি করা যায়।’ এই বলে বিদায় নিতে, আমরা তিনজনে এগোতে থাকি। দুটো তিনটে ছোটো পাহাড় পেরিয়ে আমরা যখন মানসসরোবরের দিকে নামছিলুম, তখন দেখি একজন চোখ টেপা লোক আমাদের দিকে এগিয়ে এসে আমার উদ্দেশ্যে বলল, ‘মা ঠাকরুন, আমাকে বৈষবাবু পাঠিয়েছেন, আপনাদের পুরো রাস্তা নিয়ে গিয়ে কাশী মানে বারাণসী অবধি পৌঁছে দিতে!’

আমি বুঝতে পেরে বললাম, ‘তা কতদিন লাগবে সেখানে পৌঁছাতে?’

সে হেসে বলে, ‘আজ্ঞে মা ঠাকরুন বেশী দিন লাগবে না, এই তিন দিনের মধ্যে পৌঁছে যাব আমরা! মাঝে নেপাল দেশ পরবে, ওই দেশ পেরোতে আমাদের এক দিন লাগবে, আর তারপর পরবে ভারত, মাঝে সেখানে তিনটে শহর পাব!’

আমি তার কথা শুনে তো অবাক হয়ে গেলুম! বলে কিনা পায়ে হেঁটে তিন দিনে পৌঁছে যাবো! তা ওকে বললুম, ‘হ্যাঁ বাবা! কিসে করে যাবো আমরা?’

যেন সে প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিল, ‘আজ্ঞে মা ঠাকরুন আমার গাড়ি আছে, গাড়িতে নিয়ে যাবো আপনাদের! আপনারা সব দেখবেন, কিন্তু আপনাদের কেউ দেখতে পাবে না!’

আমি বুঝে ফেললুম, কি বুদ্ধি খাটিয়েছে ওই মোটা ভালো লোকটা! তাই আর কিছু না বলে ওদের দুজনকে নিয়ে ওই চোখ টেপা লোকটার পিছনে পিছনে যাচ্ছিলুম। খানিকটা যেতেই সে এখনকার একটি আধুনিক গাড়িতে আমাদের বসাল, তারপর নিজে চালকের আসনে বসে গাড়ি চালাতে থাকলো।

জানিস ! কি আনন্দ ওদের সেই গাড়িতে বসে! কোন ঝাঁকুনি নেই, কোন বিরতি নেই! আমার যেন মনে হলো, গাড়িটা যেন মাটিতে ঠেকছেই না! না হলে এত সাবলীলভাবে পাহাড়ের উপর দিয়ে গাড়ি চলে বলতো!

গাড়ি চলতে থাকলে, আমি একাই কিছুক্ষণ জেগেছিলুম! দুই মেয়ে গাড়িতে উঠতেই ঘুমের দেশে চলে গেছে। আসলে মেয়ে দুটোর খুব ধকল গেছে তো! আমি নাকি তিনদিন ধরে ধ্যানে বসেছিলুম আর ওরা তিনদিন ধরে নাওয়া, খাওয়া ঘুম ছেড়ে আমায় পাহারা দিয়েছে! এ কদিন ধরে মেয়ে দুটোর ঘুম নেই! খাওয়াও নেই!

খাওয়া নেই এই কথা মনে করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পরলুম কে জানে! ঘুম ভাঙতে একটু ধরমরিয়েই বসে পরি! ঈশ, মেয়ে দুটোকে খাওয়াতে হবে! আমি উঠে বসে দেখলুম, বড়দিদির যে টাকাটা এনেছিলুম, সেই টাকার থলেটা আছে কি না! আসলে অনেকদিন ওর কোন প্রয়োজনই পরেনি, কিনা! তাই একটু খোঁজ করতে হল – তো দেখি সেই থলে কোমরেই গোঁজা রয়েছে! তাই দেখে ওই গাড়ি চালক কাকুকে বললুম, – ‘কাকু একটু গাড়ি থামিও! আমরা কত দূর এসেছি?আর কত বাকি?একটু খেয়ে নিতে হবে তো! তুমিও খাবে তো!’

সে আমার প্রশ্নের উত্তর দিল, – ‘মা ঠাকরুন আমরা এখন নেপালে। মুচু পেরিয়ে আমরা এখন রুগিনের খুব কাছাকাছি! এখান থেকে ভারতের দূরত্ব মাত্র তিন ঘণ্টা! ভারতে ঢুকে গেলে আরও একদিন লাগবে! আচ্ছা আমি গাড়ি দাঁড় করাচ্ছি!’

এই বলে একটা খুব ফাঁকা জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল সে। গাড়ি থেকে নেমে, আমি, অদিতি আর প্রিয়াকে খাওয়াতে নিয়ে গেলুম। ওখানকার লোকেরা হিন্দি বোঝে! ভাতও পেলুম জানিস! তিন জনেই খুব তৃপ্তি করে খেয়ে ওই চোখ টেপা কাকুর জন্য খাবার নিয়ে এলুম। সে খেয়ে নিয়ে আবার গাড়ি চালাতে শুরু করল! এরকম আমরা আরও দুবার দাঁড়িয়েছিলুম – রাজপুর আর ভাবরিতে! ভাবরিতে কে নাকি আবার প্রিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল আমরা কোথা থেকে আসছি! ও বলে কৈলাস থেকে – সেই শুনে লোকজন নাকি অবাক হয়ে যায়! আমি ওর কথা শুনেছি – বুঝেওছি যে কিছু অবাক করা ঘটনা ঘটছে! তাই চুপ করে গেছি – আর কথা বাড়াইনি!

ভাবরি পেরনোর দুই ঘণ্টার মধ্যে আমরা কাশী পৌঁছলুম। গাড়ি থেকে নেমে ওরা দুজন একটু এগিয়ে যেতে আমি আমার ট্যাঁক থেকে ওই কাকুকে একটা পাঁচশো টাকার নোট দিতে গেলে, সে কাকু কিছুতেই নেবে না! শেষে আমি তাকে টাকা নিতে রাজী করালুম, আমার আশীর্বাদ মনে করে – সে তখন টাকাটা নিতে রাজী হয়ে গেল। গাড়ি থেকে নেমে আমাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে সে ফিরে গেল!

কি অদ্ভুত সব ঘটনা! সবই শিব বাবাজীর কৃপা! সবই শিব বাবাজীর কৃপা!

আমরা যখন গংরংচু থেকে সেই অদ্ভুত জায়গায় গেছিলুম তখন ওই মোটা লোকটার থেকে নিয়ে, অদিতির হাতে তিনটে গরদের শাড়ী দিয়ে রেখেছিলুম। সেই তিনটি শাড়ি নিয়ে আমরা গঙ্গার ঘাটে গেলুম। একজন একজন করে আমরা তিনজনে গঙ্গা স্নান সেরে উপরে এসে, সেই গরদের শাড়ী পরে বাবা বিশ্বনাথের দর্শন করতে গেলুম।

সেখানে গিয়ে আরেককান্ড জানিসনা! লোকজন আমাদের পিছনে পরে গেছে আমাদের জুতো খুলিয়ে দেবে বলে! শেষে আমি ওদের শাড়ীর পাড় তুলে দেখিয়ে দিই – আমাদের পায়ে জুতো নেই! মন্দিরের সামনে তো কত লোক! একটা সারি বেঁধে দাঁড়ালুম। সেইখানে আবার একটা হোমরা চোমরা লোক এসে একজন আর একজনকে কি যেন বলছে আর তাদের অন্য দিকে নিয়ে চলে যাচ্ছে! কিছু বুঝতেই পারছিলুম না, কি হচ্ছে! ওইরকম করেই দাঁড়িয়ে রয়েছি, দেখি অদিতির কাছে সেই লোক এসেছে! এসে কি বলে জানিস!

হিন্দিতে বলে, – বাবা বিশ্বনাথকে তাড়াতাড়ি দেখতে হলে আমার সাথে আসুন!

অদিতি আমার মুখের দিকে তাকাতে আমি তাকে যেতে বারণ করি – সে না বলতে, লোকটা অদিতির হাত ধরে রীতিমত টানাটানি করতে শুরু করে, আর কি! সেই দেখে আমি ওর দিকে এগিয়ে যাই আর বাংলাতেই বলতে থাকি –‘কি হয়েছে বাপু! ওকে ওরকম বিরক্ত করছ কেন! ও আমার মেয়ে – কি হয়েছে বল দেখি!’

ও মা! যেই বলেছি, অমনি অদিতি হাত ছেড়ে সে আমার হাত ধরে টানাটানি করবে বলে সবে হাত বারিয়েছে! কি দেখি জানিস! সেই এক! আমাকে ছোঁবার আগেই সে চিতপটাং হয়ে পরেছে! আশেপাশের সকলে হো হো করে হেসে উঠলে, আমরা আবার গিয়ে সারিতে দাঁড়িয়ে পরি। বিশ্বনাথ দর্শন! সে যা হল না! এর থেকে না হওয়াই ভালো ছিল! দেখি কি! ওই যে হোমরা চোমরা লোকগুলো লাইনে দাড়িয়ে থাকা লোকেদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তারাই সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর যারা সারি বেঁধে ঢুকছে, তাদেরকে যেন বার করে দিতে পারলেই বেশী আনন্দ!

একরকম বিরক্তির সাথেই পুজো দেওয়া হল! মনে কোন আনন্দ নেই – ধুর এটা পুজো দেওয়া হল! মনের দুঃখেই তিনজনে গিয়ে একটু ভাত খাব বলে একটা হোটেলে ঢুকলুম! তিনজনেরই খুব খিদে পেয়েছিল, ভাত দেবার পর তিন জনেই গোগ্রাসে গিলতে থাকি! সবে হাত মুখ ধুয়ে টাকা দিচ্ছিলুম, দেখি সবাই হো হো করে ছুটে যাচ্ছে একদিক থেকে আরেকদিক! দেখি কি! হোটেলের মালিক আর কর্মচারীরা হোটেলের মধ্যেকার সকলকে হোটেল থেকে বার করে দিয়ে হোটেল বন্ধ করে দেবে ঠিক করেছে! সবাইকে ঠেলে ফেলে দিয়েই বাইরে বের করে দেবার যোগাড়! আমি এগিয়ে গিয়ে বলতে গেলুম – কি গো পয়সাটা নাও – খেয়ে পয়সা দেব না! তা আবার হয় না কি! কি বলে জানিস! বলে – ‘কাল এসে দিয়ে যাবেন! এখন যান!’

আমি জিজ্ঞেস করলাম – ‘কি হয়েছে?’

সে কোন উত্তরই দেয় না! আমি আবার বললাম, কোন বিপদ হয়েছে! সে এবারও চুপ ! আমি শেষ বারে খুব চেঁচিয়েই বলি – ‘কোন বিপদ হলে সকলকে তুমি বার করে দিচ্ছ কেন – দোকানের পাল্লা বন্ধ করে দাও না! সবাইকে বিপদের  মুখেঠেলে দিচ্ছ কেন ?’

আমাকে কিছু না করে, সে শেষে প্রিয়াকে আর অদিতিকে সজোরে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়! আমি আর ঘুরে দেখিনি ওদেরকে! এত মাথা গরম হয়ে গেছিল যে সেই মালিকটাকে জামা ধরে আস্ত তুলেই বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম!

শেষে বাইরে এসে কেমন একটা হুঙ্কার ছেড়েছিলাম মনে আছে – কিন্তু পুরোটা মনে নেই! আসলে কে যেন সেই সময়ে আমার শরীরটাকে কবজা করে নিয়েছিল! ওই মালিকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললাম, -কার থেকে তোর কি বিপদ আমি জানি না, জানতে চেয়েছিলাম, তুই বলিসনি! আর আমি জানতেও চাইনা! কিন্তু তোর বিপদ আসন্ন!এত বড় দোকান খুলে রেখে, যাদেরকে সেবা করার কথা, তাদেরকে বাইরে ঠেলে ফেলে দিচ্ছিস – এত সাহস তোর! যাদের সুরক্ষা দেওয়া উচিত, তাদের তুই গায়ে হাত তুলছিস! এত প্রাণের মায়া তোর! এই প্রাণের আর কোন দরকার নেই!

জানিস, আমি সত্যি বলছি, যেন কয়েক লক্ষ সিংহ আমার মধ্যে সেই সময়ে প্রবেশ করে গেছিল – আমি যেন তখন অতুল্য বলশালী হয়ে গেছিলুম! সেই লোকটা দেখি উঠে পরে, পাগলের মত আমার থেকে ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে! আমার ভিতরেও কে যেন বলে উঠলো – ওর আর বাঁচার কনো অধিকার নেই! তাই আমিও প্রথমটা ছুটলাম, তারপর কখন যেন হালকা বোধ হল নিজেকে! শান্ত হয়ে এলাম! শান্ত হতেই আমার মনে হল – অদিতি আর প্রিয়া কোথায়! কোথাও দেখতে পেলুম না জানিস!

প্রচুর খুঁজলুম, তন্ন তন্ন করে খুঁজলুম – কিন্তু কোথাও তাদের দেখতে পেলুম না! শেষে দেখি একটি যুবক ছেলে মোটরবাইক রেখে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো! আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলুম! সেই ছেলে দেখি গাড়ি ছেড়ে এসে গড় হয়ে আমাকে প্রণাম করল! আমি বললাম, – ‘তুমি কে!’

সে হিন্দিতে বলে – ‘আমি সেই যার ভয়ে সবাই সেই সময়ে পালিয়ে যাচ্ছিল মাতাজি!’

সেই কথা শুনে আমি খুব রেগে গেলুম! তাই দেখে ছেলেটা বলে উঠলো, – ‘মাতাজি! আপনি পুরোটা শুনে নিন! তারপর যা শাস্তি আমায় দেবেন, আমি মাথা পেতে নেব!’

আমি চুপ করে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রইলাম দেখে সে বলতে থাকলো, – ‘মাতাজি! এটা বাবার প্রিয় শহর কাশী! এটা হল সেই শহর, যেটা নাকি আগের মন্বন্তরের সময়ে হিমালয় ছাড়া একমাত্র অক্ষত ছিল! সেই শহরে বাবার দর্শন পেতে প্রচুর ভক্ত আসে! সকলের কি পয়সা আছে! আপনিই বলুন! বেশীরভাগ দর্শনার্থী গরীব, খুবই গরীব! অনেক কষ্ট করে এখানে আসে বাবার দর্শন করবে বলে! সেই জন্যে সরকার থেকে এই দোকানদারদের আর মালিকদের অনেক কম টাকায় চাল আর খাবার বিক্রি করে – যাতে তারা খুব কম পয়সায় রান্না করে, বাবার ভক্তদের সেবা করাতে পারে।

আর জানেন মাতাজি, এই আহাম্মকগুলো, সস্তাতে সব আনাজ পেয়েও সেই একইভাবে দাম চড়িয়ে খাবার বিক্রি করে! ভক্তরা তো সেই সব কিছু জানেও না! এই দোকানদাররা বেশী পয়সায় খাবার বিক্রি করে, সেই টাকার একভাগ প্রশাসনকে, আর একভাগ সরকারীকর্মী আর মাথাগুলোকে দিয়ে বাকিটা নিজেরা নিয়ে নেয়! তাই আমি এদের থেকে সেই সব আনাজ আর সবজি লুট করি আর সেই সবজি আর চাল দিয়ে গঙ্গার ঘাটে রান্না করে সব ভক্তদের বিনা পয়সায় খাওয়াই!

জানেন মাতাজি, পয়সা না নিলেও, আমাদের দেশের মানুষগুলো খুব ভালো! বড়লোকগুলোর সারা জীবন বিনা পয়সায় বাঁচতে পারলেই যেন শান্তি! কিন্তু গরীবেরা, যাদের কাছে সত্যিকারেই টাকা নেই, তারা বলে – “না না, বিনা পয়সায় কেউ ভাত খায়! এতে মা অন্নপূর্ণার অপমান করা হয়” – কম করে হলেও ওরা আমাকে যা দিয়ে যায় তাতে দিনের শেষে আমার রোজ প্রায় তিন হাজার টাকা রোজগার হয়! সেই টাকা আমি বাড়ি নিয়ে যাইনা! সেই টাকা দিয়ে ওই সাধুগুলোর জন্যে এই লেপটা, কম্বলটা এইসব কিনে দিই – যাতে ওরা একটু ভালো থাকে!

এতক্ষণ বলে সে বলে উঠলো, – ‘মাতাজি আমি সাধারণ মানুষের কনো ক্ষতি করিনা, করার কথা ভাবতেও পারিনা! পরিবারে আমার ছোট ছোট দুটি ভাই আছে আর আমি! আমাদের কতই বা পয়সা দরকার! যা আছে, যা পাই, তা প্রয়োজনের থেকে বেশী। আমি যখন এখানে আসি তখন এই হোটেলের মালিকগুলো ভয়ে নিজেদের হোটেলের ঝাপ নামিয়ে দেয় –আর হোটেলে খেতে আসা মানুষগুলোকে ভয় দেখিয়ে বার করে দেয়, যাতে আমার বদনাম হয়! আমি মহাদেবের ভক্ত! আমার কোন বদনামের ভয় নেই! এবার বলুন মাতাজি, আমি কি ভুল করি!’

ছেলেটাকে এবার ভালো করে দেখলুম! কি সুন্দর দেখতে! ছয় ফুট হবে না, তবে প্রায় ছয় ফুট উচ্চতা হবে, সুঢাম চেহারা! দেখে মনে হচ্ছিল যেন শরীরে হাজার হাতির বল আছে! কিন্তু মুখটার মধ্যে একটা বাচ্চা ছেলের ভাব রয়েছে! মাথা ভর্তি চুল, সেই চুল মাথা ছাড়িয়ে ঘাড়ের কাছে চলে এসেছে আর মুখে দাড়ি গোঁফ একদম নেই! আসলে ছেলেটার কথা আমি খুব মন দিয়ে শুনছিলাম! তাই তখন ওর চেহারার প্রতি সেরকম নজর যায়নি! তবে সত্যি বলতে কি, ওর কথা শুনে মনটা যেন পুরো গলেই গেছিল! তাই বললুম, – ‘কিন্তু তুমি জানো, সেই ঝঞ্ঝাটের জন্য, আমি আমার দুই মেয়েকে খুঁজেই পাচ্ছি না! আচ্ছা তুমি কি তাদের কোথাও দেখেছো! আচ্ছা তুমি আমাকে এই সব এসে বললে কেন?’

সে কিছু বলার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমায় কি নামে ডাকবে! আমারও না ওর মুখ থেকে মাতাজি ডাকটা ভালো লাগছিল না! তাই বলে উঠলাম, – আমার নাম গৌরী! আমাকে তুমি ওই নামেই ডাকতে পারো!’

সে বলল তার নাম শঙ্কর। শিবের নাম! আমার তো শুনে খুব ভালো লাগলো! আমি কিছু বলতে যাবো, সে বলে উঠলো, – ‘গৌরীমা, আমি দেখেছি কেমন করে তুমি ওই মালিককে ছুঁড়ে ফেললে আর এও দেখেছি তুমি ওকে কি বলেছিলে! সেই শুনেই আমার তোমার কাছে আসা! ঈশ্বর তোমার কল্যাণ করুক! কিন্তু সত্যিই কল্যাণ চাইলে, তোমাকে এখান থেকে এখনই চলে যেতে হবে!’

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম, – ‘চলে যাবো কি গো! আমার দুই মেয়ে এখানে রয়েছে!’

তার উত্তরে সে বলল, – ‘ওদের নিয়ে তুমি চিন্তা কোরো না! আমি ওদের ঠিক খুঁজে বার করে তোমার কাছে দিয়ে আসবো! শুধু কোথায় নিয়ে যেতে হবে আমায় বলে দিয়ো। আমি পৌঁছে দেব, কিন্তু এখন তোমাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে! এরা মানুষ নয়, অসুর! তুমি যার গায়ে হাত দিয়েছ, সে আসলে এখানকার কাউন্সিলারের ভাই! ও তোমাকে খুঁজছে! খুঁজে পেলে সবার সামনে তোমাকে গুলি করে মারবে! এদের উপযুক্ত জবাব দেবার কেউ নেই, আসলে এদের জন্যে স্বাধীন ভারতে কোন আইনই তৈরি হয়নি!’

আমি বললাম, – ‘এটা কি শুধু এই দেশেই! সব দেশেই তো একই রকম চলছে! শুধু ভারতকে দোষ দিয়েই বা লাভ কি!’

শঙ্কর বলল, – ‘গৌরীমা! বাকি দেশ হল শরীরের বাকি অংশ! আর ভারত হল এই পৃথিবীর হৃদয়! যখন হৃদয়ের এই অবস্থা, তখন বাকিদের তো এমন হাল হবেই! … না আর দেরী করে লাভ নেই! চটপট গাড়িতে উঠে পর! ওরা এলো বলে!’

আমি গাড়িতে উঠতেই, গাড়ি ছুটিয়ে দিল সে! কি গতি শঙ্করের গাড়িতে! বাবা! আমি গাড়িতে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করেছিলুম আমরা কোথায় যাচ্ছি – ‘সে বলে মুগ-ল-সরাই! সেখান থেকে আমায় ট্রেনে তুলে দেবে ও!’

গঙ্গা এতক্ষন মন দিয়ে শুনছিল। তারপর হাসতে হাসতে বলল স্টেশনের নাম মুগ-ল-সরাই না মোগলসরাই।  তারপর সে বলল, ‘কিন্তু তুমি যে বলেছিলে একজন সাধু তোমাকে ট্রেনে তুলে দিয়েছিল!’

গৌরী বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ শঙ্কর সাধুর থেকে কোন অংশে কম না কি!’

গঙ্গা আবার কি ভেবে যেন জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা মা, তোমাকে গণেশ একটা পাথর দিয়েছিল না!’

গৌরী অবলীলায় বলে উঠলো, ‘ধুর, সত্যি যদি দিত! আমি তো মাথায় করে রাখতুম! কিন্তু সবটাই যে আমার স্বপ্ন! তবে স্বপ্নেই আমার প্রভু আমাকে ওই কৈলাস নির্মাণের আদেশ দিয়েছেন! সেটা আমাকে করতেই হবে বুঝলি! প্রভুর নির্দেশ বলে কথা!’

গঙ্গা যেন কেমন আনমনা! সে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা কি রঙের পাথরটা ছিল মনে আছে!’

গৌরী আবার যেন বাচ্চা মেয়ে! সে উৎসাহের সাথে বলে উঠলো, ‘লাল রঙের! না! ঠিক লাল নয়! ওটা যেন খুব ঘন গোলাপি রঙের! আমায় দেবার আগে, সে হাতে করে দেখিয়েছিল আর বলেছিল ওই পাথর নাকি আমার কাছে কনো অশুভ শক্তিকে টিকতে দেবে না! তবে আমি যদি সেই অশুভ শক্তিকে নিমন্ত্রণ করে সাথে রাখি, তখন সেই পাথর আর কনো কাজ করবেনা! … কিন্তু কেন রে! ওই পাথরে কি কিছু আছে!’

গঙ্গা কি যেন বলতে গেল, কিন্তু গৌরী আবার গঙ্গাকে থামিয়েই বলে উঠলো, ‘কিন্তু জানিস, ওই মোটা লোকটা যে দুল দিয়েছিল আর নাকের গয়না দিয়েছিল, সেটা কিন্তু সত্যি! দেখ, আমার নাকে আর কানে রয়েছে! এগুলোতো ওরই দেওয়া!’

গঙ্গা সেই কথায় যেন কান না দিয়েই বলল, ‘আচ্ছা! গণেশ তোমাকে সেই পাথরটা তোমার হাতেই দিয়েছিল না!’

গৌরী সেই শিশুদের মত হাসি দিয়েই বলল, ‘না রে! হাতে না! মাতৃ ভক্ত তো, চরণের সামনে  দিয়েছিল! … কিন্তু কি বলতো! ওদের ছেড়ে আসার ব্যথায় এতই মন খারাপ ছিল যে, পাথরটার কথা আর খেয়ালই নেই…! … ধুর ছাড় ওসব পাথর! … যখন পুরো জিনিসটাই স্বপ্ন, তখন আর পাথরের মায়া করে কি হবে! … সত্যি যদি হত, তবে কি মহাদেবকে ছেড়ে, পাথরের কথা ভাবতুম! … কি বলিস!’

গঙ্গা এবার বলে উঠলো, ‘এই জন্যেই তো তুমি তুমিই! সাধারণ সংসারী মানুষ হলে, সব ছেড়ে ওই পাথরেই মন দিত!’ একটু থেমে আবার গঙ্গা বলে উঠলো, ‘আচ্ছা মা! তুমি যে পীতাম্বর ঘরেওয়ালের কথা বললে, কলকাতায় থাকে! … মনে আছে তোমার!’

গৌরী হেসে বলল, ‘হ্যাঁ মনে থাকবে না আবার! … কি বলেছিলুম ওকে … একটা নেংটি পরে মেয়েমানুষের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল…’ বলে গৌরীর সেই হাসি, যেটাকে যমুনা বলে কোটি শিশু যেন একসঙ্গে হাসছে!

গঙ্গার যেন হাসি পাচ্ছে না! সে আবার বলে উঠলো, ‘আচ্ছা ওই পীতাম্বর কি জহুরী! … মানে পৃথিবীর ব্যতিক্রমি জহরত সঞ্চয় করে?’

গৌরী এবার একটু ভুরু কুঁচকে বলে উঠলো, ‘কই অতক্ষণ কথা বলল, এক বারো বলল না তো! … আমায় তো বলল, কি যেন… হ্যাঁ… সিনেমার কি করে… ডিরেক্টর না কি!’

গঙ্গা গম্ভীর মুখ করে বলল, ‘হুম…। আসলে আমি একজন পীতাম্বর ঘারেওয়ালকে চিনি! সেও সিনেমা টিনেমা করে… তবে তার আমার কাছে সব থেকে বড় পরিচিতি জহুরী হিসাবে!’

গৌরী সরল মনেই সব কথার উত্তর দিচ্ছিল, কিন্তু যমুনা বেশ বুঝতে পারছিল, ওর দিদি জেরা করছে ওদের মা কে। ব্যাপারটি যমুনার একদমই ভালো লাগছিল না, তাই কথা অন্যদিকে নিয়ে যাবার জন্য সে পাল্টা গঙ্গাকেই প্রশ্ন করল, ‘তুই সেই লোককে কি করে চিনলি দিদি!’

গঙ্গা কি যেন ভাবছিলো। যমুনার কথায় একটু আনমনা হয়ে থাকা গঙ্গা উত্তর দিল, ‘আমাদের মায়ের একটা হীরের নাকছাবি ছিল! সেটা আমাদের এখানকার শ্যাকরা কাকু বলেছিল ওটা নাকি নকল! আমি বাজি লড়াতে, সে আমাকে কলকাতায় এই পীতাম্বরের কাছে নিয়ে গেছিল – পীতাম্বর লাফিয়ে উঠেছিল সেই পাথর দেখে! সে এও বলেছিল, এখন আর এইরকমভাবে হীরে কাটা হয় না! আজ থেকে একশো থেকে দেড়শো বছর আগে হত! তাই এটাকে হীরে বলে শ্যাকরা কাকু চিনতে পারছিল না! …

ভদ্রলোকের কি অদ্ভুত পাণ্ডিত্য হীরে জহরত নিয়ে! কিন্তু সব থেকে বড় কথা হল… লোকটার কনো লোভ নেই! সে কিন্তু হীরেটা দেখে আনন্দ পেয়েছিল, কিন্তু একবারের জন্যও ওর চোখে সেটা নেবার বা পাবার লালসা ছিল না! … আমি প্রথমটা ভয় পেয়ে গেছিলাম, ভেবেছিলাম মায়ের গয়নাটা বোধ হয় আর থাকলো না! … কিন্তু লোকটা আমাকে আশ্বাস দিয়ে বলল – তোমার মায়ের গয়না তোমার! আমার জহরত কালেকশন করতে নয়, জহরত দেখতে আর চিনতে ভালো লাগে; দেখলে এই পৃথিবীতে মানুষ হয়ে জন্মাবার গর্ব হয়!’

গঙ্গা থেমে গিয়ে বলল, ‘লোকটার কাছে আমি বেশ কিছুবার গেছি – এই দুবার কি তিনবার! লোকটা আমাকে বলেছিল যে সে সিনেমার ডিরেক্টর আর প্রোডিউসারও! প্রচুর পয়সা ভদ্রলোকের আর ধর্মের উপর খুব নিষ্ঠা! … আমাকে ও …! !’

এই বলে গঙ্গা ধরমরিয়ে উঠে গিয়ে ওর পুরনো ডায়রিগুলোতে, কি যেন খুঁজতে থাকলো! খানিকক্ষণ পরে তৃপ্তি ভরা মুখ নিয়ে ও ঘুরে দাঁড়ালো। যেন যা খুঁজছিল, সেটা ও পেয়ে গেছে! কিন্তু ঘুরতে গিয়েই যেন থমকে দাঁড়িয়ে গেল! কি যেন একটা দেখে, সে স্তম্ভিত হয়ে গেল! বার বার গৌরীকে বিস্ময়ের সাথে দেখছে সে!

গৌরীর এই সময়ে আচরণটাও দারুন ছিল! একটা বাচ্চাকে ঠায় দেখে গেলে, বাচ্চা বিরক্ত হয়ে মাথা নামায় আর আস্তে করে অপরাধীর মত মাথা তুলে দ্যাখে যে এখনও তাকে দেখা হচ্ছে কি না, ঠিক সেইরকম! গঙ্গা সেটা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে কাছে এসে বলল, ‘হ্যাঁ বল, তারপর কি হল! ট্রেনে উঠলে!’ স্বাভাবিকের মত আচরণ করলেও, গঙ্গার যেন রাতের ঘুম চলে যাওয়ার মত ঘটনা চোখে পরেছে!

অন্যদিকে গৌরী বলতে থাকলো –‘আর কি বলব! তারপরটা তো তোরা জানিসই! ট্রেন থেকে নেমে সেই পায়ের মল ছেলেটাকে দিয়ে উলুবেড়িয়া গেলুম, তারপর বাউরিয়া আর সেখান থেকে মাঝি আর এখন এখানে!’

যমুনা এবার বলে উঠলো, ‘তাহলে আমাদের পুরো গল্পটা শোনা হয়ে গেল, … হ্যাঁ দিদি!’

গঙ্গা হেসে বলল, ‘হ্যাঁ! এবার চল আমার সাথে হাতে হাতে সব খাবারগুলো নিয়ে আসবি চল! মা! তুমি একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও! খাবার বেড়ে যমুনা তোমায় ডাকছে! … আমাদের গল্প শোনাতে গিয়ে, তোমার তো বিশ্রামটাই হয়নি!’

গঙ্গা যেন কি একটা গভীর চিন্তায় মগ্ন! যমুনা লক্ষ্য করছে – সমানে দিদি যেন কনো অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করছে!

যমুনা তখন দিদির মনের মধ্যে কি চলছে সেটা বুঝতে চেষ্টা করবে কিনা ভাবছে। কিন্তু বললেও ও কি বলবে! অনেক ভেবেই সে দিদিকে কাছে গিয়ে বলল, ‘দিদি! এই দিদি!’

গঙ্গা একটা জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল-হ্যাঁ বল!’

একটা ঢোক গিলে যমুনা বলল, ‘বলছি কি!’‘মায়ের তো পুরো গল্প বলা হয়ে গেল! এবার কি মা চলে যাবে!’

‘কেন মা যে আমাদের বলেছে, আমাদের ছেড়ে কোথাও যাবে না!’ গঙ্গা একটু গম্ভীর হয়েই উত্তরটা দিল।

এবার যমুনার একটু সাহস এসে গেছে। সে বলল, ‘কিন্তু তুই যে বলছিলি মা যখন তার বাড়ির কথা বলেছে, তখন তাকে নিয়ে যাওয়াটা উচিত!’

বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে, গঙ্গা ভাত বাড়তে বাড়তে গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলে উঠলো, ‘আমার মন বলছে, আমাদের মা আমাদের যা বলেছে সেটাই হবে! মা আমাদের সাথেই থাকবে!’

এবার যমুনা বলে উঠলো (বেশ উৎকণ্ঠা গলায় নিয়ে), ‘তাহলে কি, মা-এর মামারবাড়ি সম্বন্ধে যা বলেছে, সব ভুল কথা!’

‘অসম্ভব! অসম্ভব!’ অদ্ভুত প্রত্যয় নিয়ে গঙ্গা বলে উঠলো, ‘মা-র একটা কথাও মিথ্যে নয়, একটাও নয়!’ এমন কি যেটা মা বলছে যে তার নিজেরই মনের ভুল, সেটাও নয়!’

যমুনার এবারে ওর দিদির উত্তরটার মধ্যে কোন সন্দেহ নয়, এক অদ্ভুত বিশ্বাস দেখতে পেল! যেন ওর দিদি এক অজানা সত্য জেনে ফেলেছে! সেটা ভেবেই যমুনার মধ্যে একটা উত্তেজনা খেলে গেল। সেই উত্তেজনার বশেই সে বলে ফেলল, ‘মানে!’

গঙ্গা এবার একটু বাঁকা ঠোটে মুচকি হেসে বলল, ‘মানে! … মানেটা আমি এখনই তোকে বলব না! তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমি আমাদের মায়ের গোপন কথা জেনে ফেলেছি! … আমি এমন কি এটাও জানি না যে সেই গোপন কথাটা মা নিজে জানে কিনা! … কিন্তু আমার মন বলছে, এমন কিছু আমি জেনে ফেলেছি, যেটা জানার পর মায়ের একটা কথাও অসত্য হতে পারে, এটা ভাবতেও পারছি না!’

‘তুই কি যে বলছিস, আমার তো মাথায় কিছুই ঢুকছে না!’ যমুনা এবার নিজের মনের কথাটা বলেই ফেলল!

‘সর… সর তো… পায়ে পায়ে ঘুরিস না! আর মায়ের ভাতের থালাটা নিয়ে আয়! আর শোন, ভাত খাওয়া হয়ে গেলে মাকে নিয়ে উপরে গিয়ে শুয়ে পরবি। বুঝেছিস! মা-এর কিন্তু তিন দিন ধরে ভালো করে ঘুম হয়নি, আজ আর গল্প শুনতে হবেনা, নিজে ঘুমাবি আর মাকেও ঘুমোতে দিবি। বুঝেছিস! আর আমার মাথাটা একটু ধরেছে! আমি খাবার পর একটু শোব।

যমুনা মাথা নাড়িয়ে ভাতের থালা নিয়ে গৌরীকে দিল। আর দুই বোনও গৌরীর সাথে খেতে বসে পরল। যমুনা অনেক কিছু ভাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু কি যে ও ভাববে, সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না! অন্যদিকে গঙ্গা পুরো চুপ করে গেছে! যেন ওর চুপ করে যাওয়াটার মধ্যে অনেক কিছু কারণ লুকিয়ে রয়েছে! সবাই চুপ করে রয়েছে দেখেই বোধ হয় গৌরী ওর মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠস্বর দিয়ে নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল! সে বলে উঠলো, ‘গঙ্গা! আমার কিন্তু আজ বিকেলে চুলটা কেটে ছোট করে দিবি! … কি রে দিবি তো!’

গঙ্গার মুখে ভাত ছিল। সে গৌরীর মুখের দিকে তাকিয়ে যেন বাধ্য মেয়ের মতই বলল, ‘আচ্ছা!’ কিন্তু বাধ্য মেয়ে সে নয়, সে যে কড়া শাসনকর্ত্রী! পরের মুহূর্তেই সে বলে উঠলো, ‘দেব, কিন্তু দুপুরটা আজ যমুনাকে নিয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মত ঘুমাতে হবে! কনো গল্প চলবেনা আজ! তবেই চুল কেটে দেব!’ গৌরী মিষ্টি হেসে যমুনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শুনে নিয়েছ! এর অবাধ্য হলে চলবে না, ঠিক আছে!’

গৌরীর বলার উদ্দেশ্য বুঝে, যমুনা চুপ করে মুখ টিপে হেসে খাওয়ায় মন দিল। কিন্তু পরে ভাবল, কথা বার করে নেবার এই তো সুযোগ, তাই বলে উঠলো, ‘বেশ রাজী, তবে কথা দিতে হবে, রাত্রে গল্প বলবে!’

বদমাইশি বুদ্ধিতে গৌরীও কম যায় না! সেও নিজে উত্তর না দিয়ে, গঙ্গার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, বুঝিয়ে দিল যে সে গঙ্গার অনুমতি চাইছে। গঙ্গা মনে মনে ভাবল, – তোমরা দুটোই খালি বাচ্চা হয়ে থাকার অভিনয় কর! আসল বাচ্চা আমিই রয়ে গেলাম! যাই হোক, বোনের আর মায়ের কথার জালে যে, সে ফেঁসে গেছে সেটা বুঝতেই পারলো। তাই ঘাড় নেড়ে বলল, ‘বেশ বাবা বেশ! তাই হবে!’

খাওয়ার অধ্যায় শেষ। থালা বাসন মেজে, এঁটো জায়গাটা ন্যাতা দিয়ে মুছে গৌরী উপরের দিকে যাচ্ছে আর যমুনা যাবে যাবে করছে। সেই সময়ে যমুনা দেখল, গঙ্গা সেই পুরানো ডায়রি নিয়ে কি যেন করছে! তার আর বুঝতে বাকি নেই  – দিদির মাথা ধরেনি! আসলে দিদির কিছু গোপন আর জরুরী কাজ রয়েছে। সেই জন্যেই বলল মাথা ধরেছে, যাতে ওকে কেউ বিরক্ত না করে। কিন্তু গোপন কাজটা কি! সেটা কি মাকে নিয়ে!

যমুনার কপালে চিন্তার ভাঁজ পরে গেল। দিদি নিশ্চয়ই মাকে মায়ের মামারবাড়ি নিয়ে যাবার কথা ভাবছে। কিন্তু দিদি যে মাকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না! দিদিকে এত আনন্দে থাকতে, এর থেকে আগে কনোদিন দেখেনি সে! তবে কেন! ওর দিদি ওকে সব সময়েই বলতো, আবেগ আর কর্তব্যের মধ্যে সব সময়েই যুদ্ধ লেগে থাকে – কিন্তু তাতে জিত যেন সব সময়ে কর্তব্যের হয়। সেটাই নাকি প্রকৃত মানুষের চিহ্ন।

তাই জন্যেই কি দিদি! ….. না ও অত ভাবছে কেন! দিদি তো আছে! দিদি যেটা ঠিক, সেটাই করবে! … মা হয়তো সত্যিই চলে যাবে! …মনে খুব ব্যথা হবে… ওর থেকে ওর দিদির বেশী ব্যথা হবে! … কিন্তু দিদি কেন বলল, মা আমাদের সাথেই থাকবে! … আমাকে ভুলিয়ে রাখার জন্য! … না দিদি তো এরকম করে না কখনো… কোন কিছুর আগে দিদি আমাকে সতর্ক করে দেয়… যাতে আমি ভেঙে না পরি! … ঠিক আছে, এখন একটু ঘুমিয়ে পরি গিয়ে! দিদি কি করে, একটু পরে পা টিপে টিপে গিয়ে পাশের ঘরের জানলার উঁকি মেরে দেখে আসব!

যেমন ভাবা তেমন কাজ। উপরে গিয়ে সটান গৌরীকে জড়িয়ে ধরে যমুনা ঘুমিয়ে পরল। আসলে ও ঠিক ঘুমাতে চায়নি, কিন্তু গৌরীর শরীরের উষ্মাটা অদ্ভুত! কেমন যেন কাছে গেলেই নিজের মনের উপর থেকে সমস্ত অধিকার নিমেষের মধ্যে হারিয়ে যায়!

তবে ঘুমিয়ে পরলেও, যমুনার ঘুম বেশীক্ষণের হলনা। চোখ খুলেই, পাশের টেবিল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে, প্রথমে লাফিয়ে উঠে পরল, তারপর মনে হল, মা পাশে ঘুমাচ্ছে! তাই আস্তেআস্তে উঠে চলে এলো। পা টিপে টিপে পাশের ঘরের জানলার কাছে গেল। ওই ঘরেই দিদি শুয়ে রয়েছে! জানলার কাছে কান পেতে যমুনা শুনছিল যে–তার দিদিকি করছে! ও শুনল দিদি কারুর সাথে কথা বলছে, মনে হয় ফোনে! … কিন্তু কার সাথে! খানিকক্ষণ কান পেতে ও শুনতে পেল – ঘারেওয়ালের সাথে কথা বলছে। কনো চায়ের দোকানের কাছে কালকে দিদিকে যেতে বলছে!

কোন চায়ের দোকান! ওদের মায়ের মামারবাড়ীর কাছের চায়ের দোকানটা নয়তো! তাহলে কি দিদি কাল সত্যিই মাকে নিয়ে চলে যাবে! ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে গেল যমুনার! ফিরে গিয়ে শুলো এবার, কিন্তু ওর মায়ের শরীরের উষ্মাকে আলিঙ্গন করেও যেন ঘুম এলোনা – শুধু মনের কোনে প্রবল এক কান্না ভেসে এলো, আর তাই সে মাকে আরও বেশী করে জড়িয়ে ধরল! কিন্তু সে চমকে উঠলো এই দেখে, যে গৌরী জেগে আছে! গৌরী পাল্টা যমুনাকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে শুধু বলল, ‘চিন্তা করিস না! সব ঠিক হয়ে যাবে!’ যমুনার সরল মন! মা হঠাৎ কেন বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে – এই সব কনো ভাবনাই এলো না ওর মাথায়! তার মা, চিন্তা করতে বারণ করা সত্ত্বেও যমুনা কিছুতেই নিজের চিন্তা আটকাতে পারল না।

তবে এবারে যমুনার আর ঘুম হল না! বেশ খানিকক্ষণ পরে সে উঠে পরল। আজ দিদি যে জুঁইয়ের মালা গেঁথেছে সেটা আগের দিনের মত বিশাল বড় হয়নি! গৌরী চুল কেটে ফেলবে বলেছে না, তাই হয়তো!

বিকেলে গঙ্গাও কাঁচি, চিরুনি নিয়ে গৌরীর চুল কেটে, একেবারে পিঠের মাঝখান অবধি করে দিল! দিয়ে ভালো করে চুল বেঁধে, তাতে মালা পরিয়ে সুন্দর করে খোঁপা করে দিল– গঙ্গার আজকের প্রতিটা কাজের মধ্যে যেন বেশী বেশী করে শ্রদ্ধা নিবেদিত হচ্ছে! যেন ভালোবাসাকে আজ শ্রদ্ধা জিতে নিয়েছে! আজ সে কম কথা বলছে, আর একটু বেশীই সম্মান দিচ্ছে গৌরীকে। যমুনারও সেই সব চোখে পরেছে! আজ যমুনার মনটা খুব খারাপ, তাই সে নদীর ধারে গেছে! কিন্তু গঙ্গা কি করে তার বোনকে বোঝাবে, যে ওদের মা ওদের ছেড়ে কোথাও যাবে না!

যাই হোক, সেদিন সেই একই কাণ্ড হল। সন্ধ্যে হতে বাচ্চাগুলো এলো, তাদের পড়ানো হয়ে গেলে, গঙ্গা রান্নাঘরে আসে। সেখানে গৌরী তরকারি রান্না করছিল আর যমুনা রুটি বেলছিল। গঙ্গা এসে দুজনের উদ্দেশ্যেই গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো– ‘কাল সকাল সকাল সবাই উঠিস! কাল আমরা তিনজনে মিলে কলকাতায় যাবো!’ তারপর গৌরীর দিকে তাকিয়ে গঙ্গা খুব দৃঢ় কণ্ঠেই বলে উঠল, ‘কাল তোমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিনের মধ্যে একটা হতে চলেছে! তৈরি থেকো!’

যমুনা তারপর থেকে কারুর সাথে একটা কোথাও বলেনি – শুধু নিজের মনের মধ্যে বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে, পৃথিবীর প্রতিটা সমুদ্রের উথাল পাথার দেখছিল।

হাজার একশো প্রশ্ন যেন ওর মনটাকেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র করে তুলেছে। সারারাত ও ঘুমিয়েছে  কিনা কে জানে, তবে মাধ্যমিক পরীক্ষার আটখানা বিষয়ের, প্রতিটা প্রশ্নপত্রের সবকটা প্রশ্ন যেন সেদিন ওর মাথায় ঘুরেছে, সেটা ওর সকালে উঠেও বেশ মনে আছে! সেই প্রশ্নপত্র পড়া শেষ হতে সে ঘুমিয়ে পরেছে কিনা, সেটা আর তার আর মনে পরছে না! তবে হ্যাঁ, মা আর দিদির সাথে যেতে যেতে  সেই প্রশ্নগুলোর আবার করে স্মরণ করে নিল!

দিদি কি তবে মাকে মা বলে মানেইনি! মা বলে মানলে, দিদি কি করে পারল মাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে! কিন্তু দিদি মাকে কাল কেন বললো, আজ মা-র জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ন দিন! তবে মা  আসলে ভালো লোক নয়! সে কি অসৎ লোক! দিদি কি তাকে ধরে ফেলেছে! আচ্ছা, মা ভালো না খারাপ, সেটার সাথে ওই ঘারেওয়ালের কি সম্পর্ক!

ঘারেওয়াল সম্বন্ধে দিদি কি যেন বলেছিল ? জহুরী না ? কিন্তু জহুরির সাথে, মা এর সমন্ধ কোথায়? মায়ের কানের আর নাকের পাথর – তবে সেগুলো কি চোরাই মাল! সেইটার জন্যেই কি দিদি কাউকে কিছু না বলে, হঠাৎ কলকাতা চলে এলো? না না! মা এমন হতে পারে না! কিছুতেই না! কি করে মা সেজে মেয়েদেরকে কেউ এমন ঠকাতে পারে? আচ্ছা যদি মা খারাপ লোকই হয়, তবে সেই প্রথমদিন মা-কে ছুঁতে গিয়ে লোকগুলো ছিটকে পরে গেছিল কেন? ওটাতো আর মায়ের বলা গল্প নয়! ওটাতো আমি নিজের চোখে দেখেছি! তবে? দিদি আগে বলতো, ভেল্কিবাজি! মা যা দেখিয়েছে, তা কি তবে ভেল্কিবাজি? এতটা খারাপ! কি যে হচ্ছে, কিছুই যেন সে বুঝতে পারছে না! মা যে কি চাইছে! দিদিই বা কি চাইছে! কে জানে!

এইসব ভাবতে ভাবতে যমুনা যাচ্ছিল, হঠাৎ দেখে কি একজন লোক ছুটছে, আর তার পিছনে পিছনে মা ও ছুটেছে! যমুনা দেখছে, ওদের মা যেন ভিড়ে মিশে যাচ্ছে! তাহলে ওর দিদিই ঠিক! যে আমাদের কাছে মা বেশে ছিল, সে আসলে ভালোমানুষ নয়, তাই তো! তাই তো ভিড়ের মধ্যে গা ঢাকা দিচ্ছে! কিন্তু ওই তো মা! পালায়নি তো! যার পিছনে পিছনে ছুটছিল, তাকে একজন পুলিশ ধরে নিয়ে আসছে, আর মা তার সঙ্গেই আসছে! মা কি সত্যি পালায়নি, নাকি পালাতে গিয়ে ধরা পরল! যমুনার মনের মধ্যে যেন এক দেবাসুর সংগ্রাম চলছে! সারাক্ষণওর মনের অসুরটা সন্দেহের অস্ত্র চালাচ্ছে  আর দেবতা পাল্টা বিশ্বাসের অস্ত্র নিক্ষেপ করছে! ওদের মা আসলে কে! কে জানে! সে কি মহাপাতক না কি মহাদেবী – যমুনা নিশ্চিত এই দুটোর মধ্যে যেকোনো একটা হবেই, আর সেটা ওর দিদি জেনে ফেলেছে।

হয়তো পুলিশ মাকে ধরে ফেলবে, এটাও দিদি জানতো! না হলে দিদি এমনভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল কি করে – মা ছুটে চলে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গ যেন চিন্তা ছিল না ওর! সেটা সম্ভব কি করে! যমুনার মনের দেবাসুর সংগ্রাম, এবার বিশ্বযুদ্ধের আকার ধারণ করে ফেলেছে! কিন্তু সেই যুদ্ধে যেন, কেউ শান্তি প্রস্তাব নিয়ে এলো – রামায়ণের কথা মনে এলো যমুনার! যেন বালি পুত্র অঙ্গদ শান্তি প্রস্তাব নিয়ে রাবণের দরবারে এসেছে! দেখাই যাক না, কেউ তার বজ্রকঠিন পা সরাতে পারে, নাকি রাবণকে সিংহাসন ছেড়ে নেমে আসতে হয় নিজের সেই পা নাড়াবার নাছোড়বান্দা মানসিকতা নিয়ে!

রেল পুলিশ সেই লোকটাকে, তার পরে থাকা লুঙ্গির খুটটাকে পিছন থেকে ধরে নিয়ে গঙ্গা ও যমুনার সামনে নিয়ে এলো। সেখানে কি হচ্ছে তা দিদি জানল কি করে! আরকি করেই বা বলল! যমুনা অবাক হয়ে দিদির বলা কথাগুলো শুনল!

গঙ্গা মিষ্টি হেসে গৌরীকে বলে উঠলো, ‘তুমি পারও বটে! কারুর চিন্তা না করে নিজেই ছুটে গেলে ওকে ধরতে! তা এই হল সেই মাঝি, যে তোমাকে বাউরিয়া থেকে নৌকায় তুলেছিল! কি ভুল বললাম?’

গৌরী হেসে বলল, ‘হ্যাঁ ঠিক ঠিক!’ এবার সেই লোকটার দিকে তাকিয়া ওদের মা বলল, ‘এবার নিজে মুখে বল তো দেখি!’ একটু থেমে আবার বলল, ‘কি হল বল! কেন আমাকে সেদিন নৌকা থেকে ফেলে দিয়েছিলে!’

লোকটা তখন কাঁদছিল, কিন্তু সেকান্না, দুঃখ পেয়ে কাঁদা নয়, ভয়ে কাঁদছিল, কারণ কাঁদার সাথে সাথে সে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিলো। এবার মা নয় দিদি ধমক দিয়ে উঠলো, ‘কি হল! কথা কানে যাচ্ছে না!’ ধমকটা যেন খুব কর্কশ ছিল, একটু মাত্রাতিরিক্ত বললেও অত্যুক্তি হয়না!

যমুনা দেখল, দিদির বকা খেয়ে সেই লোকটা কিরকম যেন ভয় পেয়ে গেল! সে ধরমরিয়ে বলে উঠল, ‘আসলে দিদিভাই, আমি মা ঠাকরুন কে ফেলে দিই নাই! আমি নিজেই জলে পরি গেসিলুম! আর আমার জন্য নৌকাও উল্টি যায়!’

যমুনা দেখল, ওর দিদি যেন রণচণ্ডী রূপ ধারণ করেছে। সে আবার একরকম চেঁচিয়েই উঠল, ‘পুরোটা বল! কি হয়েছিল পুরোটা বল কাকা… কিছু গোপন করতে যেও না, তোমার বিপদ তাতে বাড়বে বই কমবে না!’

সেই লোক যেন আরও বেশী ভয় পেয়ে, ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘আসলে দিদিভাই, মা ঠাকরুনের কানে আর নাকে যেই হীরাগুলা রয়েসে, সেগুলো দেখে আমার খুব লোভ হয়! একা মেয়ে মানুষ, কি আর করবে! এই ভেবে নৌকায় তুলে নিয়ে সিলুম! মা ঠাকরুন নৌকায় উঠি ঘুমিয়েও পরিসিলো। সেইটাকেই সুযোগ ভেবি আমি ওই কানের আর নাকের গয়না হাতাতে গেসিলুম, আর তাতেই হল বিপদ!’ একটু থেমে বেশ আওয়াজ করেই গলায় ঢোক গিলে সে আবার বলতে থাকে, ‘আমি মা ঠাকরুনের গায়ে হাত দিতিই পারলুমনি! সত্যি বলসি দিদিভাই! পারি নাই গো! পারি নাই! আমায় কে যেন সি্টকাইয়া ফেলি দিল জলে! আর আমার পায়ের ধাক্কায় ডিঙ্গিও উল্টি গেল! আমি আর মা ঠাকরুনের খোঁজ করি নাই তারপর! ভিতরি ভিতরি খুব ভয় পাইসিলুম! খুব ভয় পাইসিলুম! আমার মন কয়েসিল, মা ঠাকরুন নিসসই কোন সতী সাবিত্রী! নইলে অমুন সুতে পারলুমনি কেন!’

এতক্ষণ বলে চুপ করে গেল সেই লোক! পুলিশটা সেই লোককে এক ঘা পিঠে দিল – বেশ কষিয়ে দিয়েছিল! তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে পুরে দেবে বলছিল! সেই শুনে লোকটা গঙ্গার পায়ে পরে গেল আর আর্তনাদ করতে থাকলো, ‘দিদিভাই! আমার ভুল হয়ি গেসে! আমায় একটিবারের জন্য ক্ষমা করে দেও দিদিভাই! আমি আর কখনো এমন কম্ম কব্বনে! আমি কথা দিসসি! গরিব মানুষ মিছে কথা কয় না দিদি গো! এইবারটি সে্রি দাও!’

যমুনা দেখলো ওর দিদি এবার নরম হয়েছে। সে পুলিশ কাকুকে বলল, ‘স্যার, ওকে আপনি কি অপরাধে ধরবেন! ও তো চুরি করবে ভেবেছিলো, চুরি তো করতে পারেনি! চুরিও করেও নি! চুরি করবো ভাবার জন্য তো আইনের পাতায় কোন সাজা নেই! তাইনা স্যার!’

অফিসার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গঙ্গার উদ্দেশ্যে বলল, ‘ম্যাডাম, এই আপনাদের মত ভালোমানুষের জন্য না, এই অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায়! ’আর একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনি গঙ্গাকে বলতে থাকলেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আপনাদের সাথে অপরাধ হয়েছে। আপনারাই যদি মনে করেন ও অপরাধী নয়, তখন আমার কি সাধ্যি ওকে সাজা দিই!’

এবার উনি লোকটার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘ভালো মানুষ পেয়েছিলিস, তাই এই যাত্রায় বেঁচে গেলি! পরের বার যদি ধরি তোকে, কেউ বাঁচাতে পারবে না! এই বলে দিলাম’। এই বলে অফিসার চলে গেলে গঙ্গা ঘড়ি দেখে বলল, এখন পরের ট্রেন আসতে পনেরোমিনিট বাকি। চল গিয়ে বসি!

সেই লোকটা ধন্যবাদ জানাতে গঙ্গার পায়ে পরে গেল। গঙ্গা বলে উঠলো, ‘আরে কর কি! কর কি! … ওঠ… যাও তোমার কাজে যাও… আর শোনো এরকম আর কোনদিন করবে না!’ এই বলে গঙ্গা ও যমুনা চলে আসছিলো – সেই সময়ে দ্যাখে গৌরী নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে! সে এবারে একেবারে বসে পরল, বসে পায়ের নথটা খুলছিল! গঙ্গা যেন অদ্ভুত ভাবে গৌরীর প্রতিটা চাল চলন বুঝতে শুরু করে দিয়েছিল! সে তড়িঘড়ি গৌরীর কাছে গিয়ে ওর হাত ধরে বলল, ‘উমম কি করছ কি! আমি বুঝেছি! তোমার ওকে কিছু দেবার ইচ্ছা হয়েছে! তুমি গয়না না দিয়ে, অন্য কিছু দাও! … তোমার কাছে টাকা আছে না! সবতো শেষ হয়নি! সেখান থেকে দাও! … ও গরিব মানুষ গয়না বিক্রি করে টাকা আয় করতে গেলে, দারোগা ওকে ভুল ভাববে!’

গঙ্গার কথাটা গৌরীর খুব মনের মত হয়েছিলো। সে তাই করলো। সেই লোক প্রথমে টাকা নেবেনা নেবেনা করলেও, শেষে গঙ্গা বলাতে সে টাকাটা নিল। তারপর সে চোখের জল মুছতে মুছতে চলে গেল!

যমুনার কেন যেন মনে হল, যেই কথাটা ওর দিদি বলল তার মধ্যে অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল! যেন গৌরীর মন বুঝে কথাটা বলল সে! কি ভাবছে সে! এবার কি দিদিকে ও  সন্দেহ করবে!

পরের ট্রেন এলো, ওরা ট্রেনে উঠে হাওড়া ষ্টেশন উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল! যমুনার মনে কি যেন তুফান চলছে! দেবাসুর সংগ্রামে এবারে দেবতাদের পাল্লা ভারী! মন স্পষ্ট বলছে, গৌরী খারাপ লোক হতেই পারেনা! সে যে ফুলের মত পবিত্র!

ট্রেন হাওড়ায় পৌঁছল এই সাড়ে এগারোটা নাগাদ। সকলে হন্ত দন্ত হয়ে বাইরের দিকে ছুটেছে, গঙ্গাও যমুনা আর গৌরীকে নিয়ে সেইদিকে যাচ্ছে। কিন্তু যমুনা আবার লক্ষ্য করল, কি যেন এক অদ্ভুত জিনিস ওর দিদির মধ্যে সমানে চলছে! কেমন যেন এক অদ্ভুত তাড়ায় সে রয়েছে! যেন বিশেষ কিছু কাজ করার আছে! কিন্তু তাড়া থাকলে কি হবে! নিয়তি নিয়তির গতিতেই চলে! নিয়তি যে কারুর কথা শোনে না! কারুর নিবেদন, অনুরোধ, বিনয় – এইসবের তাঁর কাছে যেন কোন গুরুত্বই নেই! এই সময় সামনে এসে দাঁড়ালো একজন সুপুরুষ ব্যক্তি!

গৌরীকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল সে! একি ব্যাপার, একজন টিকিট চেকার ওদের মাকে প্রণাম করল কেন! সেই লোকটাই প্রথম কথা বলল, ‘আমায় চিনতে পারছেন, ভাবিজী!’

ভাবিজী শব্দটা শুনতেই যমুনার যেন মনে হল, – আচ্ছা এই সেই মহেন্দ্র! আবার প্রমাণ পেল সে, যে গৌরী মানে ওদের মা, একটা কথাও মিথ্যে বলেনি! তবে ওর দিদি এমন আচরণ করছে কেন! কি চলছে ওর মনে! যেটা চলছে, সেটাকে কি যমুনা ধরতেই পারছে না! সেটা কি সম্পূর্ণ একটা অন্য জিনিস! কে জানে!

গৌরী হেসে উত্তর দিল, ‘কেমন আছো বাবা! মন খারাপ নেই তো!’

লোকটাও হেসে উত্তর দিল, ‘না! মন ভালো আছে, তবে…!’

‘তবে কি বাবা!’ গৌরী হেসেই বলল।

‘তবে … মানে… ভাবিজী, এই চাকরিটা আর ভালো লাগছে না! … ভালো কিছু, মানে… বড় কিছু… মানে কি বলবো… অনেকের জন্য কিছু করতে ইচ্ছা হচ্ছে! … কিন্তু কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না!’

গঙ্গা সেই মানুষটাকে মন দিয়ে দেখছিল। এমন নরম দৃষ্টি দিয়ে সে কোনদিন কনো পুরুষ মানুষের দিকে তাকায়নি! যমুনা ওর দিদির চোখের দিকে তাকিয়ে ঠিক বুঝেছে – ওর থেকে ভালো ওর দিদিকে আর কেউ চেনে না! কিন্তু সব চিন্তা, সব ভাবনা ভেঙে যে হঠাৎ গঙ্গা এমন করে বলে উঠবে, সেটা যমুনা কল্পনাও করেনি! গঙ্গা মহেন্দ্রের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, ‘বড় কাজ আছে! খুব তাড়াতাড়ি আরম্ভও হবে সেটা! আপনাকে আমার ফোন নম্বরটা দিচ্ছি – সেভ করে রেখে দিন! মাকেও আপনার নম্বরটা দিন! আমি ঠিক সময়ে আপনাকে ডেকে নেব!’

কি বলছে ওর দিদি এসব! কেনই বা বলছে! যমুনার ছোট্ট মাথার যেন এবার ফেটে যাবার যোগাড়! সেই মাথার ঝিমঝিমুনি আরও বাড়িয়ে দিল, এই কথার পৃষ্ঠে গৌরীর কথাতে! ওর মা আর দিদি কি, কোন গাঁটছড়া বেঁধেছে! দুজনেই কি একই জিনিস নিয়ে কিছু ভাবছে! কি ভাবছে ওরা?

গৌরী বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ মহেন্দ্র! তাই কর। … ও আলাপ করিয়ে দিই! এই আমার দুই কন্যা… গঙ্গা আর যমুনা!’এরপর গঙ্গাকে দেখিয়ে গৌরী বলল, ‘এই হল আমার বড় মেয়ে, খুব বিচক্ষণ আর খুব বুদ্ধিমতী … জানো বাবা, এত বড় মন ওর!’ এই বলে গৌরী নিজের দুহাতকে যতটা বেশী সম্ভব প্রসার করে দেখালো। দিয়ে আবার বলল, ‘বড় কাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত, তোমার চাকরিটা কিন্তু ছেড়না বাবা! …একটা কাজের আগে নিজের কাজ থামিয়ে দিলে মনে হতাশা বাসা বাঁধে! বুঝলে!’ এই বলে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে গৌরী বলল, ‘নে রে … ওর নম্বরটা নে!’

যমুনা দেখল ওর দিদি আর সেই মহেন্দ্র নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করে একে অপরের নম্বরটা নিয়ে নিল – কি ভালো দেখতে লাগছিল ওদের দুজনকে একসাথে! যমুনার খুব ইচ্ছা আসলে ওর দিদির বিয়ে হোক! দিদির বেশে তো মায়ের মত একজনকে পেয়েইছিল, এবার তার স্বামীর বেশে বাবার মত একজনকে পাবে! যদিও গৌরী এসে সব হিসেব গড়বড় করে দিয়েছে! গৌরী একাধারে নিজেই যেন বাপ-মা দুটোই হয়ে উঠেছে!

দিদিকে মহেন্দ্রের সাথে দেখে, যমুনা বেশ ভালো মেজাজেই ছিল। কিন্তু যেই মহেন্দ্র চলে গেল, সেই দিদি যেন আবার কিরকম ব্যস্ততায় ঘিরে গেল! কিসের এত তারা ওর! কি যে ভাবছে! দিদিটা এত ভাবে কেন, কে জানে! নদীর ধারে গিয়ে বসে না, তাই বোধ হয় ওর এত ভাবনা! যমুনার শিশু সুলভ মনটাও যেন দেবাসুর সংগ্রাম থামাতে ব্যস্ত! কিন্তু সে যে থামার নামই নেয় না!

ষ্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে ওরা তিনজনে হরিদেবপুরের মিনিবাস ধরবে বলে যাচ্ছিল, সেই সময়ে হঠাৎই গৌরী বলে উঠলো, ‘ওই দেখ! ওই ছেলেটি আমাকে উলুবেড়িয়ার বাসে তুলে দিয়েছিল!’ সেই শুনে গঙ্গা যেন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ধেয়ে গেল সেই ছেলেটার দিকে! গিয়ে কনো কথা না বলে, সপাটে গালে এক থাপ্পড় মারল!

সেই কাণ্ড দেখে, আশেপাশের সবাই এমনকি ছেলেটা নিজেও হতবম্ব হয়ে গেছে! আর যমুনা বোধ হয় সব থেকে বড় বিষম খেয়েছে! কি করছে দিদি! এরকম অদ্ভুত ব্যবহার করছে কেন! যমুনার নিজেকে পাগল পাগল লাগছিল, কিন্তু গৌরী! … সে কেন পুরো ব্যাপারটায় অবাক হল না!

গঙ্গা এবার ছেলেটার জামার কলার ধরে একরকম টানতে টানতে নিয়ে এলো গৌরীর কাছে! এনে গৌরীর পায়ের সামনে একরকম ছুঁড়েই ফেলে দিল! ছেলেটা উঠে গৌরীর মুখ দেখে যেন ভুত দেখল! সে ভয়েই বলে উঠলো, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে! মাগো! আমার ভুল হয়ে গেছে! কি অদ্ভুত সেই নূপুর! আমার জীবনটা শেষ করে দিচ্ছে সে! আমার পিছন কখনো ছাড়ে না ওই নূপুর! মায়াবী নূপুর ওটা!’

গৌরী কিছু বলার আগেই, গঙ্গা বলে উঠলো, ‘লজ্জা করে না একজন দুঃস্থের থেকে লুট করতে!’ এই বলে আবার মারতে যাবে, গৌরী তখন গঙ্গার হাতটা ধরে নিল! ছেলেটা বলে উঠলো, ‘না মাগো! আসলে আমি সে সময় অনেকদিন খেতে পাইনি! তাই লোভ জেগেছিল! কিন্তু সেই নূপুর আজ পর্যন্ত কাছ ছাড়া করতে পারিনি!’ এই বলে পকেট থেকে একটা নূপুর বার করে দেখিয়ে বলে, ‘এই দেখ! আমার সাথেই রয়েছে!’

গঙ্গা নূপুরটাকে পুরো চিলের ছোঁ মারার মত নিয়ে কি যেন খুঁজল! সে বোধ হয় যা খুঁজছিল, তা খুঁজেও পেল! যমুনার তো তাই মনে হল ওর দিদির চোখের দিকে তাকিয়ে! – চোখটা যেন জ্বল জ্বল করে উঠলো! সেই খুঁজে পাওয়াটা কি?কে জানে?

তারপর ছেলেটাকে গৌরী দুহাত ধরে তুলে দাঁড় করিয়ে ট্যাঁক থেকে এক হাজার টাকা বার করে দিয়ে দিল! গঙ্গা তাতে কোন বাঁধা না দিয়ে বরং উৎসাহ দিল! ছেলেটা তারপর চলে যেতে ওরা তিনজনে হরিদেবপুরের মিনিবাসে উঠে পরে। যমুনা আর গৌরী একটা সিটে উঠে বসলো, আর গঙ্গা ওদের পিছনের সিটে বসলো। যমুনা দেখছিল, ওর দিদি কাকে কাকে যেন ফোন করছে আর কি যেন বলছে!

সন্দেহ যেন যমুনার মনকে সম্পূর্ণ ভাবে ঘিরে নিয়েছে! তবে এটা প্রথমবার নয়, যমুনা লক্ষ্য করেছে, যখনই ওর মনটা খারাপ হয়ে যায়, তখনই ও এরকম বিচ্ছিরিভাবে সকলকে সন্দেহ করতে আরম্ভ করে। কাছের লোক, দূরের লোক, তখন যেন কেউই ওর কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়! কিন্তু গৌরীকে ও কিছুতেই যেন মন খুলে সন্দেহ করতে পারছে না! আর বারবার কেন যেন ওর মনে হচ্ছে  দিদি তাকে সন্দেহ করছে! এটাও সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না!

বাসে যেতে যেতে যমুনা একটা কথাও বলল না! গৌরী মাঝে ওর মুখের দিকে তাকালো! ওর মনের পুরো ভাবটাই যেন ওর মুখে ফুটে উঠেছে! সেটা দেখে মুচকি বিজ্ঞের হাসি হেসে গৌরী বাইরের রাস্তা দেখতে আরম্ভ করল। যমুনা অন্যদিকে নিজের মনের ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত সমুদ্রের আছড়ে পরা ঢেউয়ের মতন উঠে আসা প্রশ্নগুলোকে শুনতে থাকলো – ওর দিদির আচরণটা যেন ওর কাছেসম্পূর্ণ অজানা! এতদিন ধরে ও দিদিকে দেখেছে, কিন্তু এরকম কোনদিন দেখেনি! আগেও ওর দিদি যাকে সন্দেহ করেছে, তাকে হাতে না হাতে ধরেওছে, কিন্তু সে সময় তার দিদির আচারণ এরকম ছিল না!

এখানে ওর দিদি যেন সত্যি প্রচণ্ডভাবেই অদ্ভুত! পুরোপুরি ভাবে যেন গৌরীকে হাতে নাতে ধরার চিন্তা করে ফাঁদ পাতছে! আবার একই সাথে গৌরীর প্রতি যারা অন্যায় করেছে, তাদের উপর অত্যধিক পরিমাণে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে! লোকগুলো গৌরীর কাছে অপরাধী – কিন্তু ওর দিদি এমন করছে, যেন গৌরীর কাছে নয়, ওর দিদির কাছেই অপরাধী! যদি ওর দিদি গৌরীকে সন্দেহই করে, যদি দিদি ওকে হাতে না হাতে ধরতেই চায়, তাহলে গৌরীর সঙ্গে যে অভদ্রতা করেছে, তাকে নিজের শত্রু মনে করছে কেন ? নাকি! এই সবটাই ওর দিদির দেখনদারি! যাতে গৌরী বুঝতেও না পারে যে ওর দিদি ওকে সন্দেহ করছে! সেটাও হতে পারে! কিন্তু গৌরী তাহলে কি! তবে কি ওর ভাবনাই ঠিক! গৌরী কনো জায়গা থেকে ওই পাথরগুলো চুরি করেছে! আর যদি তাই করে থাকে, তবে সে ওগুলো লুকিয়ে না রেখে, কেনই বা নাকে ও কানে পরে রয়েছে!

এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে ওদের বাস হরিদেবপুরে পৌঁছে গেছে, যমুনা টেরও পায়নি! তিনজনে বাস থেকে নেমে পরতেই গৌরী পথ দেখিয়ে গঙ্গা আর যমুনাকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করল। কিন্তু সামনেই একজনকে দেখে গৌরীর যেন খুব আনন্দ হল! আনন্দের সাথে উচ্চস্বরে সে বলে উঠলো, ‘আরে পীতাম্বর! কেমন আছো! তুমি কি এখানে আমার অপেক্ষা করছিলে?’

পীতাম্বরকে দেখে যমুনার দুজনের উপর খুব রাগ হল, একজন হল ওর দিদি আর দ্বিতীয়জন হল পীতাম্বর নিজে! কাছে আসতে সেই পীতাম্বর একটু চমকে দাঁড়িয়ে গেল! তারপর গঙ্গার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘কেমন আছ গঙ্গা দেবী! ভালো তো! ওই পাথরটা যত্ন করে রেখে দিয়েছ তো?’ এবার গৌরী বলে উঠলো, ‘হে গো পীতাম্বর! তুমি আমাকে সেদিন বলনি তো যে তুমি বড় জহুরি? আমি কালকে গঙ্গার মুখ থেকে তোমার সম্বন্ধে সেটা শুনি! দেখ না, আমার কানে আর নাকে কি ভালো দেখতে পাথর রয়েছে! দেখেছো!’

পীতাম্বর এবার বলল, ‘জরুর দেখেছি! জরুর দেখেছি!’এই বলেই পীতাম্বর, গঙ্গার দিকে আরচোখে একবার দেখতেই, গঙ্গা তাকে প্রণাম করার জন্য ইশারা করল। পীতাম্বর প্রণাম করতে নিচু হল, কিন্তু যেন সেখানে ভুত দেখার মত কিছু দেখে সে খানিকক্ষণ থেমে গেল! তারপর প্রণাম করে বলল, ‘মাতাজি! আমি আপনার জন্য এক নয়, দুই নয়, চার চার খানা সারপ্রাইজ নিয়ে এসেছি!’

গৌরী অবাক হয়ে বলে, ‘সারপ্রাইজ মানে – সেটা কি গো! খাবার জিনিস!’

গঙ্গা এবার গৌরীকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ওটা সারপ্রাইজ! ইংরাজি কথা। মানে হল আশ্চর্য করে দেবার মত জিনিস!’

গৌরীর সেই শিশুদের মতন আনন্দের ভাব জন্মাল। সে আনন্দের সাথে বলে উঠলো, ‘কই দাও! দাও!’

যমুনার পুরো ব্যপারটাই ভালো লাগছিল না। ওর যেন মনে হচ্ছে, গৌরীকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে!

কিন্তু সে কনো কথা না বলে চুপ করে, কি হচ্ছে সেটাই দেখতে থাকলো। পীতাম্বর ওদের তিনজনকে নিয়ে এক জায়গায় গেল।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6