বিসর্জনে কৈলাস | রোমাঞ্চ উপন্যাস

পরের দিন সকালে, মৈত্রী একটি ছোট ব্যাগে ওর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে, আমাকে সঙ্গে করে  একটা ঘোড়া নিয়ে বেরুল। ওখান থেকে নন্দাবন মাত্র ষাট কিলোমিটার। গৌরীকে সামনে বসিয়ে, মৈত্রী ঘোড়া ছুটিয়ে চলল – সে নাকি এই ঘোড়াটাকে জঙ্গলেই ছেড়ে দিয়ে আসবে, ঠিক করেছে। ঘোড়া দ্রুতবেগে ছোটায়, মাত্র দুই ঘণ্টায় আমরা নন্দাবন পৌঁছে যায়। পাহাড়ের দেশ – রোদ্দুর ঠিক করে উঠতে বেলা আটটা বেজে যায়। আমরা ঘর থেকে বেড়িয়েছিলাম ভোর পাঁচটায়, এখন সাতটা মত বাজে– তাই হয়তো এখনও রোদ্দুর বেরোয়নি! তবে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে।

ঘোড়া থেকে নেমে, মৈত্রী বলল, – মাতাজি, ঘোড়াটাকে এখানেই ছেড়ে দিলাম, ঠিক আছে! কারণ ঘোড়া নিয়ে বনে ঢুকলে, ওর খুরের আওয়াজেই বনের পশুপাখি খবর পেয়ে যাবে, যে আমরা ঢুকেছি! আমরা ঘোড়াটাকে এখানে ছেড়ে দিয়ে পায়ে হেঁটে দুই কিলোমিটার যাবো – সেখান থেকে আমরা ঢুকবো বনে। আমরা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি, সেটা বনদপ্তরের নজরদারি করার জায়গার থেকে দুই কিলোমিটার দূরে। আর পরের নজরদারির জায়গা এখান থেকে ছয় কিলোমিটার। ওদের দূরবীন দিয়ে তিন কিলোমিটার অবধি দেখা যায়। তাই আরও দুই কিলোমিটার না গেলে , ওদের দূরবীনে আমরা ধরা পরবোনা!

আমরা তাই আরও দুই কিলোমিটার হেঁটে গেলাম, তারপর বনে ঢুকলাম। মৈত্রী আমাকে ওর একটা জামা প্যান্ট পরিয়ে দিয়েছিল! আমি বলেছিলাম, – আমি কিন্তু মানস সরবরের কাছে গিয়ে শাড়ী পরে নেব – প্রথমবার স্বামীর কাছে যাচ্ছি বলে কথা! জামা প্যান্ট পরে গেলে কি মনে করবে বল তো!

মৈত্রী তাতে এক মুখ হাসি নিয়ে রাজী হয়েছিল। ও যে ছোট ব্যাগটা নিয়েছিল, তাতেই আমার শাড়ী আর সিঁদুর কৌটো ভরে নিয়েছিল। আমরা যখন যাচ্ছিলাম, তখন ও আমায় কত কথা বলছিল জানিস! আমায় বলছিল যে এই নন্দাবন পেরোতে চার দিন লাগবে! এই জঙ্গলে নাকি খুব উঁচু উঁচু গাছ আছে! সেই গাছের মাথায় মাচা করে করে রাত্রিটা কাটাতে হবে! পশুদের থেকে ভয়ের থাকলেও, পাখিদের থেকে বিশেষ ভয় নেই! আসলে পাহাড় তো, তাই বেশী পাখি ওঠে না! আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম যে এই বনে কি কি প্রাণী আছে, ও পুরো একটা ফর্দ ধরিয়ে দিল। কি নেই সেই তালিকায়।  বাঘ, ওই স্নু লেপড, বেশ কিছু বিভিন্ন ধরনের হরিণ, একটা আধটা হাতি, শিয়াল, নেকড়ে, হায়না আরও কত কি! ওরা সংখ্যায় আগে অনেক বেশী ছিল, এখন অনেক কমে গেছে! মৈত্রী আরও বলল গুহা দেখলে আমাদের দূরে চলে আসতে হবে– সেগুলো নাকি বাঘ মামার চিলেকোঠা ঘর! আর একটু বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা দেখলে, সেখান থেকেও দূরে থাকতে হবে। হায়না, নেকড়ে আর লেপডের সাথে নাকি ফাঁকা জায়গায় ছুটে পারা যাবে না!

জঙ্গলে আমরা ঢুকে পরলাম আর ও আমাকে সাবধান করে দিল। বলল, – মাতাজি, জানবেন যে, কোন না কোন চোখ সবসময়ে আমাদের নজর রাখছে। তাই খুব সাবধান!

এই বলে নিজের ব্যাগ থেকে একটা বোতল বার করল। তরলের রঙ দেখে বুঝলাম, ওটা কেরোসিন তেল। দুটো লাঠি তৈরি করল – তার মাথায় ভালো করে দুটো বড় ন্যাকড়া জড়িয়ে সেটাকে তেল দিয়ে ভিজিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিল। আর তার একটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, – মাতাজি, এই নিন। এই মশালটাকে কখনো হাত ছাড়া করবেন না! বন্য পশু এই একটা জিনিসকেই ভয় পায় – একমাত্র এটা যতক্ষণ কাছে, ততক্ষণ ওরা কিছুতেই আমাদের কাছে আসবে না!

আমি বললুম, – তা বাছা, এই যে তুমি আগুন জ্বালালে, এতে তো ওরা সবাই জেনে গেল যে আমরা ওদের ঘরে এসেছি!

ও হেসে বলল, – মাতাজি, ওরা বন্য পশু! ওদের চোখে দেখতে হয় না! গন্ধ এতক্ষণে ওদের নাকে পৌঁছেও গেছে, আর ওদের কাছে খবর ছড়িয়েও পরেছে! এবার ওদের কথা হল, কে আগে আমাদের শিকার করবে! বাঘ, নাকি বাঘের আগে নেকড়ে বা হায়না! একটু পায়ের দিকে তাকিয়েও চলবেন মাতাজি! এখানে দুটো বড় অজগর সাপ আছে! ওরা তো আর বিষ ঢালবে না, ওরা আস্ত গিলে খাবে! এককথায় বলতে গেলে এখানে পদে পদে বিপদ! আসলে মানুষ এখানে বিশেষ একটা আসে না! আসলেও আমার মত কয়েকজন যারা সাপ ধরতে আসে, আর কিছু লোক, যারা বনদপ্তরের সাথে মিলে মিশে বাঘ বা হরিণ শিকার করে, ওদের চামড়ার ব্যবসা করে! আর তারা খুব একটা জঙ্গলের গভীরে ঢোকেনা। আমরা তো আবার পুরো জঙ্গলটাই পেরবো! বেরোনোটা অত সহজ হবে না!

আমরা তারপর যাত্রা শুরু করলাম – প্রচুর হায়না আর শিয়াললক্ষ্য করলাম, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৈত্রীই আমাকে দেখিয়ে দিল! আমাদেরকে যেন ছায়ার মত অনুসরণ করছে! কেন করছে কে জানে! কিছু বিষধর সাপও দেখলাম, তবে সাপ যেন মৈত্রীর কাছে কোন বাপারই নয়! ও যেন সাপেদের ভাষা বোঝে! সি-সি করে মুখে এক অদ্ভুত রকম আওয়াজ করছে, আর সাপগুলো সরে সরে যাচ্ছে, জানিস! সেইদিন আমরা অনেকটা এগিয়ে গেছিলাম – মানে মৈত্রীই বলল! সন্ধ্যে নামবার আগেই মৈত্রী ওর ব্যাগ থেকে একটা ভারী আর ধারাল অস্ত্র বার করে একটা গাছের মাথায় উঠে, প্রথমে ভালো করে দেখে নিলো, আর তারপর সেই গাছ আর পাশের গাছ নিয়ে তাদের ডালপালা কেটে একটা বড় মাচা তৈরি করে নিল। এরপর বেশ কিছু শুকনো ডাল নিয়ে ওই গাছ দুটোকে পুরো ঘিরে দিল। আমাদের যে মাচা, সেটার নিচেও প্রচুর সেরকম ডাল ছড়িয়ে দিল! তারপর আমাকে মাচার উপরে উঠে পরতে বলে, সেই ডালগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিল। জানিস, ও যেখানে যেখানে ডাল দিয়ে আগুন জ্বালিয়েছিল, তার দুই পাশে সেরকম অনেকগুলো ডাল রেখে দিয়েছিল, যেগুলোতে ও আগুন লাগালো না! আর, ও একটা বিশাল বড় লগার মত তৈরি করেছিল, সেটা নিয়ে উপরে উঠে এলো।

উপরে উঠে এসে বলল, – ‘কি মাতাজি! ভয় লাগছে নাকি!’

আমি বললাম, – ‘তুমি না থাকলে, বোধ হয় লাগতো জানো! তবে তুমি যা দক্ষ!’

সে হেসে বলল, – ‘আসলে আমার ছোটবেলাটা অনেকটা এইভাবেই কেটেছে!’

আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম –‘আচ্ছা মেয়ে, তুমি যেই কাঠগুলোতে আগুন লাগালে, তার পাশে ওরকম আরও কাঠ রেখে দিলে কেন?’

উত্তরে ও বলল, যেই কাঠগুলোতে সে আগুন দিয়েছে, সেগুলোতে নাকি অর্ধেক রাত অবধি জ্বলবে! বাকি অর্ধেক রাতের জন্য অবশিষ্ট কাঠগুলো রাখা আছে! আর যাতে নিচে নামতে না হয়, তার জন্য সেই বিশাল লগাটা!

আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, – আচ্ছা মাচাটা এত উঁচু করলে কেন গো? আর মাচার নিচে কেনই বা আগুন দিলে!

মৈত্রী খুবই অভিজ্ঞ! সে কি বলল জানিস! সে বলল, – ‘মাতাজি, বাঘ বলুন আর বাকিদের কথা বলুন, আগুন টপকে আসতে পারবে না, তাই এতদূর এসে গেলেও ফিরে যাবে! তবে চিতা লাফ দিয়ে এখানে এসে পরবে, বুঝলেন! তাই দেখে নিলাম, যে এই দুটো গাছ বাকিগুলোর থেকে অনেকটা দূরে। চিতা অন্য গাছে উঠে ঝাঁপ দিয়ে আসতে পারবে না! আর যদি ঝাঁপ দিয়ে মাচার নিচে অবধি এসেও যায়, তবে উপরে উঠতে পারবে না, কারণ মাচার নিচে আগুন জ্বলছে, বুঝলেন! আপনি শুয়ে পরুন। কোন চিন্তা নেই! আমি জেগে আছি! চিন্তার কিচ্ছু নেই! আমি দেখে নিয়েছি! এই দুটো গাছে, কোন সাপের বাসা নেই!’

আমি বললাম, – ‘সাপ গাছে বাসা বাধে নাকি?’

সে বলল, – ‘বাসা তো বাধে মাতাজি! আসলে এখানে মাটি তেমন নেই, পাথর আছে – আর পাথর ঠাণ্ডায় বেশী ঠাণ্ডা লাগে, তাই সাপ, বিশেষ করে অজগর, গাছের উপরে বাসা বাধে। আসলে ঠিক বাসা নয়! ওরা বিশাল লম্বা আর ভারী তো! ফলে ছোট গাছের ডালওদের ভার নিতে পারে না! তাই ওরা বড় গাছের সব থেকে শক্তিশালী ডালকে জড়িয়ে ধরে থাকে। থাকাও হল, আর তার সাথে শিকারের উপর নজর দেওয়াও হল! আপনি শুয়ে পরুন মাতাজি। কোন চিন্তা নেই! আর এইভাবে চললে, আজ যেরকম চলেছি, কালকের রাত বাদ দিয়েও পরশু সকালেই জঙ্গল পেরিয়ে যাব। যদি কোন বিপদে না পরি তো!

আমি বললাম, – ‘এরকম ব্যবস্থা করলে আর বিপদ কি করে হবে!’

ও বলল, – ‘না মাতাজি! একটা বিপদ সম্ভব! সেটা হল ঈগল! এখানে ভালো জাতের সোনালী ঈগল আছে!ওরা সেরা শিকারি– আর কি বলুন তো! ওদের আটকানো সম্ভবও নয়! নিচের দিকে থাকলে, ওরা কিছু করতে পারবেনা! কিন্তু নিচুর দিকে থাকলে যে বাকি সব জন্তুর থেকে ভয় আছে ! আসলে, ওরা রাত্রে তেমন বেরোয় না! তাই একটা ঝুঁকি নিলাম আর কি!

আমি ওর সাহস দেখে সত্যি তারিফ না করে পারলুম না! সেই রাত্রি খুব ভালোই কাটল! পরেরদিন সকালে আমরা আবার হাঁটতে শুরু করি, হাতে সেই মশালটা নিয়ে! মৈত্রী বলল, – মাতাজি আজ একটু বেশী সাবধান থাকতে হবে! কাল রাত্রে কিন্তু একটা বাঘিনী আর দুটো চিতা এদিকে এসেছিল! আগুনটাকে ঘিরে এক চক্কর দিয়ে, বিশেষ সুবিধা হবে না বলে চলে গেছিল! তার মানে ওরা আমাদের উপর নজর রাখছে! তাই খুব সাবধান! একবারের জন্যও মশাল হাতছাড়া করবেন না!

সেইদিনের পরেরদিন আমরা জঙ্গলে খুব সন্তর্পণে থাকি, তাই দিনের বেলায় কোন বিপদ হয়নি, রাত্রেও মৈত্রী আগের দিনের মত ব্যবস্থা করেছিল– তাই কোন বিপদ আমাদের ছুঁতে পারেনি। কিন্তু একটা মহাবিপদ এসে গেল শেষদিন ভোরের দিকে! আমি মৈত্রীর তৈরি করা মাচাতে ঘুমিয়ে ছিলুম! ঘুম ভাঙল একটা বিকট চিৎকারে! চোখ খুলে দেখি সব ঠিকই তো রয়েছে! মাচার তলায় আর পাশে তখনও দপ দপ করে আগুন জ্বলছে! আমি ভাবলুম – কোন স্বপ্ন দেখেছি বোধ হয়! কিন্তু দ্বিতীয়বারের চিৎকারে বুঝলুম – ওটা আমার স্বপ্ন ছিল না! – এ তো মৈত্রীর চিৎকার! চিৎকার তো নয়! এ তো আর্তনাদ!

পাশ ফিরে দেখি, মাচাতে মৈত্রী নেই! আমি ভয় পেয়ে গেছিলুম জানিস! ধড়ফড় করে মাচা থেকে কোন কিছু না ভেবে নেমে আসি! নেমে এসেও মৈত্রীকে দেখতে পেলাম না! সামনে একটা আগুনে পুড়ে যাওয়া লাল দগদগে কাঠ ছিলো – সেইটা কি মনে হল হাতে তুলে নিলুম! নিয়ে মৈত্রী মৈত্রী বলে চিৎকার করতে আবার সেই ভয়ার্ত আর্তনাদ শুনতে পেলুম – মাতাজি! মাতাজি!

সেই আওয়াজ শুনে একটু এগিয়ে যেতে যা দেখলুম, তাতে আমি প্রথমটাতে থতমতই খেয়ে গেছিলুম! কি দেখি জানিস? দেখি, মৈত্রী একটা পাথরের উপর পরে রয়েছে, তার পা-টা, দুটো বড় পাথরের ফাঁকে আটকে রয়েছে আর……!

গঙ্গা আর যমুনা একসাথেই জিজ্ঞেস করে উঠল, ‘আর কি? … বল! আর কি!’

গৌরী বলতে থাকলো –

আর দেখি মৈত্রীর থেকে এই হাত ছয়েকের দূরত্বে একটা বিশাল আকারের বাঘিনী – সদ্য মা হয়ে ওঠা বাঘিনী! দাঁত মুখ বার করে মৈত্রীকে শিকার হিসাবে ধরে নিয়ে যাবার জন্য, ওর সাথে দূরত্ব আস্তে আস্তে কমিয়ে চলেছে! দূরত্ব নিজের নাগালের মধ্যে এসে গেলেই, দেবে শেষ লাফ! মৈত্রী ভয়ে, আতঙ্কে এতক্ষণ কাঁপছিল! সেই কম্পন তখনও ছিল – তবে ভয় কেটে গেছে ওর! বোধ হয়, নিশ্চিত মৃত্যু ধরে নিয়েছে! আমি কি করবো কিছু বুঝে উঠতে পারছিলুম না! তবে মন বলছিল, কিছুই করবোনা! এটা তো হতে পারে না! তাই শিবের নাম করে, সেই বড় – লাল দগদগে কাঠটা মনের যত জোর আছে, সেই দিয়ে মাটিতে ঠুকি!

তাতে দেখলুম কাজ হয়েছে! সেই বাঘিনী এবার মৈত্রী ছেড়ে আমার দিকে মুখ ঘোরাল। আমার মনে যেন শিবের সাহস এসে গেছে – আমার দিকে তাকাতেই আমি সেই কাঠ নিয়ে ওর দিকে তাক করলাম – কাছে এলেই যেন এই আগ-জ্বলন্ত কাঠ ওর মুখে পুরে দেব! কিন্তু বাঘিনীটিকে দেখলাম আমার দিকে তাকিয়ে কিরকম যেন ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে! ভয়ে ঠিক মনে হল না! কিন্তু সেও খানিকক্ষণেরই ব্যাপার! এবার সে আমার দিকে নিজের পুরো শরীরটাই ঘুরিয়ে দিল – আর আস্তে আস্তে আমার দিকে এগোতে থাকলো!

এবারে আমি কিন্তু ভয় পেলাম না জানিস! আর সত্যি কথা বলতে, যেন কোথা থেকে এক অসীম সাহস আর মনের বল ছুটে এলো আমার দিকে! – আমি খানিকক্ষণ প্রস্তুতি নিয়ে, ওই জ্বলন্ত কাঠটা ডান হাতে ধরে, কাঁধের উপরে বল্লমের মত করে নিয়ে, ধেয়ে গেলাম বাঘিনীটির অন্তর্জলি যাত্রা নিশ্চিত করতে! কিন্তু দেখলাম, উল্টো কাণ্ড! বাঘিনী ভয় পেয়েছে! সে ঘাড় ঘুরিয়ে, ভয় পেয়ে চলে গেল!

আমি তাড়াতাড়ি মৈত্রীর কাছে গিয়ে, সেই জ্বলন্ত অঙ্গারটা দিয়ে, যেই পাথরটাতে ওর পা আটকে ছিল, সেটাতে আঘাত করলাম! আর দেখি কি! ওই পাথরটার একটা কোণা ভেঙে গেল আর মৈত্রীও পা বার করে নিতে পারল! তবে জানিস! … বাঘিনীটা এখনও যায়নি! সে গাছের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পরেছে! আমাদের দুজনের উপর, বিশেষ করে আমার দিকে, ঠিক বাঘের মতন নয় – বরং বিড়ালের মতন করে ঘাড়টা নিচু করে জুলজুলে চোখ নিয়ে দেখছে!

বাঘিনীটার আবেগ, ঠিক বুঝতে পারলুম না জানিস! ও কি শিকার হারাবার জন্য দুঃখ করছে! না কি অন্য কিছু! কিন্তু ওর চোখে তখন আর কোন হিংসা যে ছিল না, এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই! মৈত্রী তখন উঠে পরেছে, দাঁড়াতে পারলেও, ঠিক ভাবে হাঁটতে পারছে না! ওর একটা হাত আমার কাঁধে নিয়ে আমি ওর দ্বিতীয় পা হয়ে উঠি – এক হাতে জ্বলন্ত অঙ্গারটা ছাড়িনি! আমরা সেখান থেকে এগিয়ে গেলাম – বাঘিনী তখনও আমাদের উপর কড়া নজর রেখে চলেছে – কিন্তু কি সুন্দর নরম সে দৃষ্টি!

যমুনা এবার বলে উঠলো – ‘তোমার তো সাঙ্ঘাতিক সাহস মা! আমি হলে তো বাঘ দেখেই মরে যেতাম!’

গৌরী হেসে বলল, ‘সাহস কি আমার রে বোকা! সাহস সময়ে সময়ে শিব আমার মনে দিয়ে দেয়! না হলে অন্য সময়ে তো সাহস থাকেই না! এই দেখ না, তোর দিদিকেই আমি কি ভয় পাই! দেখিস না?’

গঙ্গা এবার গৌরীর কোলে, পেটের দিক করে মাথা গুঁজে, প্রচণ্ড আদরের সাথে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তুমি যে কি বল না! … যে বাঘ ভয় পায় না, সেকি গঙ্গাকে ভয় পায়! … উমমঃ!’

গৌরী বলে উঠলো, ‘তা ভয় পাব না! তুই যে গঙ্গা! তোর উপর দিয়ে যে ওর মত কত বাঘিনী ভেসে গিয়ে চান করে! হাতি ডুবে যায় তো বাঘিনী কোন ছার!’

গঙ্গা একবার রাগ দেখিয়ে কোল থেকে উঠে পরল, আবার আপ্লুত হয়ে আরও বেশী দেহের চাপ দিয়ে গৌরীকে জড়িয়ে ধরল – এমন করে ধরল যেন মনে হল, সেই আঁটুনি কোনদিনও ও হালকা করবে না! গৌরীকে কোথাও যেতেও দেবেনা ! এমনটাই সে মনে মনে ভাবছিল, কিন্তু গৌরীকে বাড়ি দিয়ে আসতে হবে – এটা মনে পরতেই, মনটা যেন বিষণ্ণতায় ভরে উঠলো! বন্ধনটার জোরও হালকা হয়ে গেল, আবার পরের মুহূর্তে ভাবল, যতদিন ওদের সাথে রয়েছে, ততদিন তো গৌরী ওদের! হ্যাঁ ওদের, শুধুই ওদের … ওদের মা! নিজের মা! সেই ভেবে আরও বেশী জোরেই বোধ হয়, হ্যাঁ বোধ হয় কেন আরও অনেক বেশী জোরে জড়িয়ে ধরল গৌরীকে! গৌরীও বেশ বুঝতে পারল তার মনের কথা –যে পরের জড়িয়ে ধরার মধ্যে একটা ভয় কাজ করছে! তাই, যেটা ও কোনদিনও বলে না, সেদিন সেটাই বলল! বলল, ‘ছাড় রে গঙ্গা মা, বড্ড লাগছে তো!’

যমুনা পুরো ব্যাপারটাই দেখছিল। এই দৃশ্য দেখে যমুনাও পুরো ব্যাপার বেশ বুঝতে পারল। যমুনার জ্ঞানের কথা মাথায় তেমন ঢোকে না! আসলে ও জ্ঞান নিতেই ভালোবাসে না! কিন্তু ভাব গ্রহণের অদ্ভুত ক্ষমতা ওর! ও পুরো ব্যাপারটা বুঝে মনে মনে ভাবল – ওদের মা যেন অদ্ভুত! ভালোবেসে যত কষ্টই দাও, হাসি মুখে সে সব নিয়ে নেবে! কম অত্যাচার করেছে, ও আর ওর দিদি মিলে!এত সরলতা ওদের মায়ের! কিন্তু সেই সরলতার মাঝেও কেমন যেন এক অদ্ভুত দৃঢ়তা আর নীতি পরায়নতা বিদ্যমান! মনে সন্দেহ নিয়ে তার কাছে পৌঁছালে নিজের সন্তানকেও তিনি পর করে দেন! সব কিছু মিলে, যেন ওদের মা পৃথিবীর সব থেকে জটিল আবার সব থেকে সরল – কি অদ্ভুত সামঞ্জস্য!

গৌরী আবার বলতে শুরু করে দিয়েছে-ওই বাঘিনী আমাদের পিছন শেষ অবধি ছাড়েনি! তারপর থেকে সমানে ছায়ার মত আমাদের অনুসরণ করেছিল! নিজেকে আড়ালে রেখে সমানে আমাদের সঙ্গে যাত্রা করছিল – এক সময়ে তো মনে হচ্ছিল, ও আমাদের সাথেই যাচ্ছে – আমাদের সঙ্গী হয়ে!

এর মাঝে আমি মৈত্রীকে নিয়ে এসে মাচার নিচে আগুনের পাশে বসি। সেখানে বসে ওর পায়ে হাত বুলিয়ে দিতে থাকি – যেখানটায় ওর ব্যথা লেগেছিল। সে মেয়ে এক অদ্ভুত চোখে আমাকে দেখছিল! কি রকম একটা অন্য নজরে ! … কি বলে যে বোঝাই! … এই ঠিক যেন একটা ভালো ভুত দেখে ফেললে যেমনটা হয়, তেমনটা! … মানে… যেমন ভুত দেখার জন্য যে ভয় বা আতঙ্ক থাকে, সেটাও রয়েছে, আবার ভুতটা যে ভালো, তাতে এক অদ্ভুত অবিশ্বাস মেশানো বিস্ময় ধরা পরেছে তার মুখে! … আমি থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেললুম, – ‘কি গো মেয়ে! এমন করে কি দেখছ!’

সে বলে, – ‘মাতাজি! আপনাকে যতই দেখছি, ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি! আগে আপনার অপার করুণা আর ভালোবাসা দেখেছি! আজ দেখলাম অসামান্য সাহস আর শক্তি!’

আমি বললাম, – ‘হ্যাঁ আসলে সে সময়ে শিব সাহস দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু শক্তি আবার কোথায় দেখলি রে মা?’

সে বলে –‘শক্তি! … তুমি কি কিছুই জানো না! … সত্যিই কিছু জানো না!’

মৈত্রী কখন যে আপনি থেকে তুমিতে চলে এসেছে তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি।

আমি বললাম, – ‘না রে! শক্তির কি দেখলি, সে তো কিছুই বুঝতে পারছি না!’

সে আবার বলে উঠল, – ‘তুমি জানো! …… নিশ্চয় জানো…!’

আমি বললাম, – ‘সত্যি বলছি রে! জানিনা আমি! কিচ্ছু জানিনা! কোন শক্তির কথা বলছিস তুই?’

সে এবার বলল, – ‘শোনো তাহলে! যখন তুমি কাঠের অঙ্গারটা মাটিতে ঠুকলে! তুমি জানো! সেই সময়ে কি বিশাল এক তরঙ্গ হয়েছিল? … আমার তো মনে হল – ভূমিকম্প এসে গেছে! সেই কাঠের ধাক্কাতেই আমার পা যেই পাথরে আটকে ছিল, সেই পাথর খানিক সরে গেছিল! … আর যদি সেটাও ছেড়ে দিই, তবে যখন তুমি যে কাঠের আঘাত করলে সেই পাথরটার উপর – তুমি দেখেছো – একটা কাঠের আঘাতে অত ভারী আর শক্তিশালী পাথর ভেঙে গুড়িয়ে গেল! … এবার কি বলবে তুমি!’

আমি বললাম, – ‘ওরে ওসব আমার কাজ ভাবিসনা! ভুল করেও ভাবিসনা! … ওসব কাজ যে শিবের! … হ্যাঁ শিবের… আসলে শিব বাবাজী আমার উপর তখন ভর করেছিল মনে হয়! … তাই বোধ হয়, যতটা যা দরকার, ঠিক হয়ে গেছে!’

সে বলল, – ‘জানিনা অত কিছু! তবে এটুকুনই বুঝে গেছি যে তুমি সাধারণ নও! তোমার রবার ঠিকই বলেছিল –আমি তোমাকে এখনও চিনতেই পারিনি!’

আমি বললাম, – ‘হয়েছে, অনেক হয়েছে! এবার ওঠার চেষ্টা কর তো! আমি তোর মত করে মশালটা জ্বালাচ্ছি দাঁড়া!’

এই বলে আমি মশাল জ্বালাতে চেষ্টা করছিলুম, কিন্তু জানিস কিছুতেই পারছিলুম না! হঠাৎ দেখি মৈত্রী আমার হাতটা খপ করে এসে ধরেছে! আমি অবাকটাও ঠিক করে হতে পারিনি, মৈত্রী হাঁটু গেড়ে বসে বিড়্ বিড়্ করে চোখ বন্ধ করে কি সব বলতে থাকলো! ওর চোখ পুরো বন্ধ, আর হাত দুটো চেপে জোর করে ধরে রেখেছিল! আমি বুঝতে না পেরে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি হোল রে তোর! ও কেমন পাগলের মত, ওই বসা অবস্থাতেই আমাকে জড়িয়ে ধরে, ‘গুয়ানি’ না কি বলে হাউ মাউ করে চেঁচাচ্ছিল আর কাঁদছিল – সে কি কান্না! আমি বলে বুঝিয়েও ওকে সামলাতে পারিনা! অনেক কষ্টে যখন ওকে সামলালাম, ও আমাকে পাগলের মত জড়িয়ে ধরে আবার কাঁদল! কিছুতেই কারণ বলেনা – কিছুতেই না! অনেকক্ষণ এইভাবে থেকে বলে উঠলো, – ‘চল মাতাজি, আমরা এবার যাই!’

আমি বললাম, – ‘একটু বিশ্রাম নিয়ে নে মা! তোর পায়ে তো খুব জোরে লেগেছে!’

ও বলল, – ‘কেন এরকম বলে আমায় লজ্জা দিচ্ছ! তুমিই তো আমার পা পুরো ঠিক করে দিয়েছ! দেখ, পায়ে যে কেটে ছড়ে গেছিল, সেই দাগগুলোও নেই! তুমি যে আমার ‘গুয়ানি!’ হ্যাঁ তুমিই আমার ‘গুয়ানি!’ তুমি দেখ আমি শুধু হাঁটতে নয়, আগের থেকেও ভালো করে ছুটতে পারছি!’

এই বলে আমাকে ঘিরে, পুরো বাচ্চাদের মত ও তিন চক্কর ছুটে এসে, হাঁপাতে হাঁপাতে আবার জড়িয়ে ধরল আর বলল –‘আমি সব বিক্রি করে দেব! আমি সব সাপ ফিরে এসে জঙ্গলে ছেড়ে দেব! তুমি মানুষ গড়ার কারিগর মাতাজি! আমি সারাটা জীবন তোমার পায়ের কাছে বসে থাকবো আর তুমি যা বলবে আমি ফাইফরমাশ খাটবো! অনেক হয়ে গেছে টাকা করি! এখনও যা আছে আমার ব্যাঙ্কে, তাতে আমার বাকি জীবন কেটেও বেশী হয়ে যাবে! আমি আর টাকা চাই না! এবার শুধু তোমায় চাই!’

গঙ্গা মা! তুই জানিস না! ও ঠিক কিরকম করছিল! কি পাগলামো! যেন আমি ছেলে বা ও ছেলে হলে আমাকে বিয়েই করে নেবে, এরকম!

যমুনা সেই শুনে কি হাসি! গঙ্গাও থমকে থমকে হাসছে দেখে, গৌরী ওর উদ্দেশ্যে বলল, – ‘হ্যাঁ রে গঙ্গা! গুয়ানি মানে কি রে! মৈত্রী তখন আর মাঝে মাঝেই ওই নাম ধরে ডাকতো! ও কলকাতায় চলে আসবে জানিস! ও বলেছে! ও আসবেই!’

গঙ্গা বলে উঠলো, ‘বাবা! তুমি তো যেখানে গেছ, সেখান থেকেই একজন করে ধরে এনেছ! এই কলকাতার এড্রেসে সব কুরিয়ার করে দিয়েছ দেখছি! হ্যাঁ! এবার শুধু রিসিভ করার পালা! এদিকে মহেন্দ্রকে ধরলে, ওখানে রবার, তারপর আবার কি যেন …..? ….. ওই …… আরে বল না! হ্যাঁ ঘরেওয়াল আবার এখানে মৈত্রী মানে জিং! হ্যাঁ! তুমি তো দারুন! আবার এখানে এসে গঙ্গা যমুনাকে মজিয়ে দিয়েছ! এমন মজিয়েছো যে এই গঙ্গা যমুনা নিজেদের জীবনটাকেই তোমার নামে লিখে দিতে বাধ্য হয়েছে! সাংঘাতিক তো তুমি!’

গৌরী এবার রাগ করেই বলল, ‘বুঝেছি, তুই ওই গুয়ানি মানে জানিসনা, তাই তো! সেটা সোজাসুজি বললেই হত! … আর দেখ … আমি কাউকে আসতে বলিনি আমার সাথে! সকলে নিজে নিজে আসবে বলেছে! আমি কি বলব তাতে!’

সেই রাগ দেখে যমুনা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে আর মনে মনে তার দিদির উপর খুব রাগ হচ্ছে – দিদি এমন করে সব বলেনা! এবার যদি গৌরী মা রাগ করে চলে যায়!

গঙ্গা কিন্তু গৌরীর কথায় কিছুই মনে করল না! গৌরী ওর এখন কাছের লোক – ও গৌরীকে বা ওকে গৌরী এখন যা কিছু বলতে পারে! সে বরং গৌরীর রাগে একটু আনন্দই পেয়েছে – না একটু নয়, খুবই আনন্দ পেয়েছে! এতটাই আনন্দ পেয়েছে যে, গৌরীকে একবার জড়িয়ে ধরে বলল, – ‘মা গো, তুমি যে এই দুটো মা মরা মেয়ের উপর কি মায়া করলে, তুমি নিজেও জানোনা! দুদিন পরে তো আমাদের ছেড়ে চলেই যাবে! তখন যে আমাদের কি হবে, কে জানে! যমুনা তো আবার নদীর ধারে চলে গিয়ে মাছ ওঠা দেখে দিন কাটিয়ে নেবে, আমি বোধ হয় হেদিয়ে হেদিয়ে মরেই যাবো! আমার জীবনের সেরা দুদিন আসলে তুমি আমায় উপহার দিলে কিনা!’ এই বলে গঙ্গা একটু বিষণ্ণ হয়ে পরল! যমুনারও কথাটা শুনে চোখ ছল ছল করে উঠলো! অন্যদিকে গৌরী বলে উঠলো, ‘এক কথা বার বার বলিস কেন বলতো বাপু! আমি একবার বলেছি তো – আমি যেখানে যাব, তোদের দুজনকে নিয়ে যাবো! একবার বলেছি মানে প্রতিবার একই কথা বলব! আমার প্রতিশ্রুতি ওত ঠুনকো নয়, হ্যাঁ।’

একটু থেমে আবার গৌরী বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ রে তুই বললি না! গুয়ানি মানে কি! … কি রে বল না!’

গৌরীর যেন স্থির বিশ্বাস – গঙ্গা জানেই মানেটা! গঙ্গা বললো, ‘সবই তো জানো! এটাও জানো যে আমি ওর মানে জানি, আর এটা জানো না ওর মানেটা কি! তুমি আসলে খুব দুষ্টু, খুব! খুব! খুব! বেশ আমিও দেখব, তুমি কেমন করে তোমার কথা রাখো! আমার মাথায় তো কিছুই আসছে না যে কিভাবে তুমি এসব করবে! আর হ্যাঁ গুয়ানি না! গুয়ানি মানে হল, চীন দেশের এক দেবী – দয়া, মমতা আর ভালোবাসার দেবী, … এই যেমন … যেমন! … আচ্ছা হ্যাঁ, আমাদের যেমন দেবী দুর্গা! স্নেহের আধার, তেমন! কি বুঝলে! আরও একটা কথা বলব? রাগ করবে না তো!’

গৌরী অভিমানের সুরেই বলল, ‘দেখ আমি কাউকে ফেলে রেখে চলে যাব বলে তার কাছে যাই না, তাকে নিয়ে যাবো বলেই তার কাছে যাই! তাই ফেলে চলে যাবার কথা আমায় বলবি না! বাকি যা কিছু বলতে পারিস’।

গঙ্গা হেসে বলল, ‘না না সে কথা আর কেউ বলে! গঙ্গার মিষ্টি মুখখানা একেবারে লাল হয়ে গেছিল! ঠিক যেন লাল জবা! মা এর উপর আর সে কথা বলবে! পাগল! শেষে বাঘকে রাগ দেখানোর মত আমাদের রাগ দেখালে তো এখানেই মারা পরবো!’ একটু চুপ করে থেকে, ফিক করে হেসে গঙ্গা আবার বলল, ‘সে তুমি যখন দায়িত্ব নিয়েছ আমাদের সাথে থাকার, কি করে তা পূরণ করবে সে তুমিই জানো! আমরা ওসব নিয়ে ভাববো না! তবে হ্যাঁ! যদি ফেলে চলে যাও, আর কোনদিন তোমার সাথে কথা বলব না! যমুনা বললেও, আমি বলব না! যাই হোক… তোমায় মৈত্রী কিন্তু কিচ্ছু ভুল বলেনি! তুমি কিন্তু সত্যিই দেবী গুয়ানির মতই!’

গৌরী এবার বলল, ‘শোন না, তারপরের কথাটা তো তুই শুনিসইনি! সেই কথা তো আমারও মধ্যে শিহরন ফেলে দিয়েছিল! হ্যাঁ রে সত্যি বলছি!’ এই বলে গৌরী আবার বলা শুরু করলো –

আমরা তখন মোটামুটি জঙ্গলের শেষের দিকে পৌঁছে গেছি! মৈত্রী বলল – হাতি পর্বতকে বাঁদিকে আর কলঙ্ক পর্বতকে ডানদিকে দেখা গেলে, সেখান থেকে নন্দাদেবী বনের শুরু আর যখন ডানদিকে ত্রিশূল পর্বত দেখা যাবে, তখন থেকে নন্দাদেবী বনের শেষের শুরু হল। আমি একটা ডান দিকে বড় তুষার মাখানো পাহাড় দেখে, সে সম্পর্কে মৈত্রীকে জিজ্ঞেস করতে ও বলল – যে আমরা এসে গেছি শেষের দিকে। সেখান থেকে নয় কিলোমিটার দূরে ছিল ভারতের সীমান্ত। মৈত্রী বলল আমরা একটু ঘুরে যাবো! ঘুরে না গেলে তুষার পাবনা ঠিকই, তবে সেখানটাতে ভারতীয় সেনার কড়া পাহারা! ও বলল, চীনা সেনা সাধু, সন্ন্যাসীদের ছেড়ে দেয়, কিন্তু ভারতীয় সেনা – উফ্ সে যা বলল! আমিও বুঝলাম, ও কেন ভারতীয় সেনা এড়িয়ে যেতে চাইছে!

আমরা যখন শেষের দিকে এসে গেছি, তখন মৈত্রী আমাকে চীনা সীমান্ত রক্ষার জায়গাটা দেখালো! ও আমাকে নিয়ে সেদিক দিয়েও যে যাবেনা সেটা বোঝানোর জন্য বলল – মাতাজি, একটু পাহাড় ভাঙতে পারবে! যদি পারো, তবে তিনটে ধাপে একটা পাহাড় পেরিয়ে আমরা চীনে ঢুকে যাব! তাহলে কাকপক্ষীও জানতে পারবে না!

আমি সম্মতি দিতেই আমরা সেই দিকেই এগোলাম, কিন্তু বাধ সাধল ঠিক যেখান থেকে জঙ্গল হালকা হতে আরম্ভ করেছে, সেখান থেকে! দেখি দুটো তিনটে বাঘের ছানা খেলা করছে! আমরা সেদিকে যেতেই একটা ছানা আমাদের দিকে একেবারে আমার পায়ের সামনে চলে এলো! জানিস, কি সুন্দর ভাবে গা ঘষছিল আমার পায়ে! সেই দেখে আমি আর লোভ সামলাতে পারলাম না! ওকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করছিলুম! আস্তে আস্তে দেখি আরও একটা ছানা এদিকে চলে এসেছে! ওদের নিয়ে যখন মেতে রয়েছি, তখন আমরা খেয়ালও করিনি, কখন ওদের মা সেখানে এসে হাজির!

তাকে প্রথম লক্ষ্য করল মৈত্রী! ওর তো ভয়ে সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে! ওই বিশাল আকারের দানবী আমাদের থেকে মাত্র তিন হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে! এক লাফে আমাদের যেকোনো একজনকে নিয়ে চলে যেতে পারে! আমি আস্তে আস্তে বসে পরলুম আর বসে ওর ছানা, যেটা আমার কোলে ছিল, সেটাকে মাটিতে রেখে দিলুম! ছানাটাকে ছেড়েদেবার পরও সে তার মা-র দিকে যাচ্ছিল না! এক জায়গায় বসে বসে গা চুলকচ্ছিল! অন্যদিকে ওদের মা বাকি একটা ছানাকে চেটে চেটে আদর করতেই যেন ব্যস্ত! আমরা তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি! কিন্তু আমার মধ্যে কেন যেন ভয় চলে গেছিল –কেন যেন মনে হচ্ছিল এই বাঘিনী হল সেই বাঘিনীটাই, যেটা আমাদের ছায়ার মত অনুসরণ করছিল! দেখলাম, সে যেন কোন অনিষ্ট করার কথা ভাবতেই পারছে না! শিকারের দিকে ওর মনই নেই!

খানিকক্ষণ পরে আমি একটু বাঁ দিকে সরে যেতে একটা গাছহাতে পেলুম। সেটাতে গায়ের যত জোর আছে, তা দিয়ে হ্যাঁচকা মারতে, একটা মোটা বড় ডাল ভেঙে আমার হাতে এলো। বাঘিনীকে দেখলাম, প্রথমটা ভয় পেলেও, পুরো ভয় পেয়ে চলে যেতে, যেন সে আসেনি! যেন অন্য উদ্দেশ্যে এসেছে! ও আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে আসছিল – কিন্তু ওর চোখ ছিল ওর সেই ছানার দিকে, যেটা আমার পায়ের দিকে বসেছিল! – আমি মনে মনে ভাবলুম – এটাকি ওর শিকারের ছক? হাতের ডালটা ভাল করে ধরে নিয়েছি – মনে যেন এত শক্তি এসে গেছে যে একবার ঘা বসালেই ও শেষ হয়ে যাবে! কিন্তু বাঘিনীটিকে দেখলুম, ছানার কাছে এসে ও ওর ছানাকে চেটেই চলেছে! আমাদের কি ও দেখতে পাচ্ছে না!  আমি ভাবলুম, শিবজী কি আমাদেরকে অদৃশ্য করে দিল নাকি! না হলে বাঘিনীটি এরকম আচরণ করছে কেন!

আমাদের আর বিশেষ করে মৈত্রীর চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল পরের কাণ্ডটা দেখে – দেখি কি সেই বাঘিনীটি আমার পায়ের কাছে এসে নিজের মাথাটা আমার পায়ে ডলেই চলেছে! আমার সারা শরীরে শিহরণ দিচ্ছিল – আস্তে আস্তে সেই শিহরণ আর সহ্য করতে পারলাম না! এরপর আমি যা করেছি, সেটা আমার মনে নেই – মৈত্রীর কাছ থেকে জেনেছি! ও পরে যেতে যেতে বলেছিল – আমি নাকি হাঁটু গেড়ে বসে বাঘিনীটির মুখটাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরি! মৈত্রী আরও বলেছিল যে আমার এই কীর্তি দেখার পর , ওর যেন মনে হচ্ছিল – ওটা বাঘ নয়, একটা বিড়াল! সেই বাঘিনী নাকি আস্তে আস্তে ওর নিজের বিশাল দেহটা আমার পুরো শরীরটার মধ্যে এলিয়ে দেয় আর আমি…! মৈত্রী আরও বলল আমি নাকি পাগলের মত ওকে আদর করতে থাকি।  আমার আর ওর দুজনের চোখ দিয়েই নাকি অঝোর ধারায় জল পরছিল! এরকম নিবিড় আলিঙ্গনে আমরা প্রায় পাঁচ সাত মিনিট ছিলাম, তারপর আমার শরীরটা কাপড়ের দলার মত নেতিয়ে পরে যায়! বাঘিনীও আমার পায়ের কাছে অনেকক্ষণ বসে বসে চোখের জল ফেলেছিল। শেষে ওর ছানা তিনটে ওর ঘাড়ে আর মাথায় উঠে ওকে এত বিরক্ত করে, যে সে ওদের নিয়ে ও চলে যায়!

যমুনা এত অবধি শুনে একটা অদ্ভুত কাণ্ড করে বসে। গঙ্গা-যমুনা বিছনাতে বসে গল্প শুনছিল– হঠাৎ যমুনা বিছানা থেকে নেমে গিয়ে গড় হয়ে গৌরীকে প্রণাম করে বলল, ‘যেদিন থেকে দিদি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছে, সেদিনই জানতাম আমি! সেদিনই জানতাম!’ গৌরীও ওর কথায় যেন উপযুক্ত সাড়া দিল! গৌরী এবার গঙ্গার মুখটা ধরে, তার কপালে একটা স্নেহচুম্বন এঁকে দিল! যমুনার পুরো ব্যাপারটা ধোঁয়াশা লাগলেও, ও কিন্তু কোনরকম প্রতিক্রিয়া দেখাল না – যেন না বোঝাটাকে, না বোঝাই রেখে দিতে চাইল! এদিকে গৌরী আবার গল্প বলতে শুরু করে দিয়েছে –

মৈত্রী তারপর আমাকে নিয়ে, হাত ধরে ধরেই একটা পাহাড়ে ওঠাল। পাহাড়টায় একটাও বন্য পশু নেই, কিন্তু বেশ বড় বড় সাপ দেখলাম – বেশীরভাগই অজগর ধরনের – মানে বিষ নেই! কিন্তু আস্ত একটা মানুষ গিলে খেয়ে নিতে পারে!

সেই পাহাড় থেকে নামতে নামতে আমাদের একটা কাঁটাতারের বেড়া পেরোতে হবে। মৈত্রী খুব চিন্তিত হয়ে বলেছিল – শেষবার যখন ও দেখেছে, তখন এই তার ছিলো না! ওই তার টপকানো একরকম অসম্ভব! ও তারে শরীর বা কোন কাপড় ঠেকলে তো চীনা সেনা জানতে পারবেই! শুধু তাই নয় – সেই তারের দুই ফুট উপর দিয়েও যদি কেউ যায়, তবেও চীনা সেনাদের কাছে বার্তা চলে যায়! সেই তারের জাল প্রায় ছয় ফুট উঁচু, আবার সেই তার নাকি দুই ফুটের উপর থেকে টপকাতে হবে! আমি তো বুঝেই গেলাম – সব পরিশ্রম জলে! তাই উদাস মনে শিবের কাছে প্রার্থনা করতে থাকি আমাকে যেন ওই জাল পার করে দেয় – কিন্তু কোথায় কি! সেদিনের কথা আমার আর কিছুই মনে নেই জানিস! শুধু এইটুকুনি মনে আছে যে সেদিন সূর্য ঢলবে ঢলবে করছিল, আর আমি শিবের নাম করছিলাম আর কাঁদছিলাম। বোধ হয় কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েই পরেছিলাম! ভোরে যখন ঘুম ভাঙল, তখন আরও বেশী অবাক হয়ে গেলাম! দেখলাম একটা ঘাস দেওয়া পাহাড়ের চূড়ায় আমি একা পরে রয়েছি –আর মৈত্রী আশে পাশে কোথাও নেই!

অনেকক্ষণ এদিক ওদিক খুঁজতে দেখি কাঁটাতারের ওপারে মৈত্রী! সেও যেন আমাকে খুঁজছে! আমি ওর নাম ধরে চ্যাঁচালাম! ও আমার ডাক শুনতে পেলেও, আমাকে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিল না! আমি আর দুবার ডাকতে, সে দেখি আমাকে দেখতে পেল! আমাকে দেখে, সে বলল – ‘মাতাজি, তুমি ওদিকে গেলে কি করে!’

আমি চেঁচিয়ে উত্তর দিলাম –‘জানি না, কি করে এলাম! সকালে ঘুম ভাঙতে দেখি আমি এখানে!’

সে কাঁটা তারের কাছাকাছি চলে এলো, এসে বলল –‘তার মানে এই যে, তোমার শিব চায় না, যে আমি তোমার সাথে কৈলাস অবধি যাই!’

একটু মন খারাপ করেই বলল –‘দেখ মাতাজি, এই পাহাড় থেকে উল্টো দিকে (বলে আঙ্গুল দিয়ে বলে দিল কোনদিকে) নামবে, ঠিক আছে! নেমে, উত্তর পূর্ব দিকে হাঁটতে থাকবে – ধু ধু করছে জায়গাটা – কিচ্ছু নেই – কোন মানুষ, পশু , পাখি কিচ্ছু নেই! নব্বই কিলোমিটার হাঁটতে হবে! পারবে তো! নব্বই কিলোমিটার – তা প্রায় তিরিশ দিন মত লাগবে – বুঝলে! কি করে যাবে জানি না! এই রাস্তা দিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ কৈলাস পৌঁছাতে পারেনি! দুটো বিশাল হ্রদ দেখতে পাবে – ওইগুলোই হল মানস সরোবর আর রাক্ষসতাল। ওখান থেকে কৈলাসের অনেক পর্যটক পেয়ে যাবে!’

আমার চোখে জল দেখে ও আবার বলল, – ‘আমি জানি তুমি ঠিক ফিরবে। আমি এদিকে সাপগুলোকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে, সব কিছু বিক্রি টিক্রি করে কলকাতায় চলে যাব – সেখানে তোমার সাথে দেখা হবে, ঠিক আছে!’

আমি বললাম, – ‘হ্যাঁ গো মেয়ে! তুমি কি আবার ওই জঙ্গলের পথেই যাবে!’

ও বলল, – ‘হ্যাঁ আমি ওদিক দিয়েই চলে যাবো – তবে এদিকের পাহাড় ঘেঁসে যাবো –তাহলে বেশী জঙ্গল পাব না  – ত্রিশূল আর কলঙ্ক পাহাড় পেরোলেই তো যোষিমঠ!’

অন্যদিকে ও চলে যেতে, আমি কৈলাসের পথে যেতে থাকলুম। যেমন মৈত্রী বলে দিয়েছিল, ঠিক তেমন ভাবেই ওই পাহাড় থেকে নেমে, উত্তর পূর্ব দিকে এগোতে থাকলুম। বেশ ঘণ্টাখানেক এগিয়ে যেতে যেতে, দেখলুম একটা নদীর মত পথ। প্রথমটা দেখে ভেবেছিলুম যে ওটা একটা নদী, কিন্তু পাহাড় থেকে নেমে দেখি, ওটা একটা পথ, যেটা বরফে ঢেকেছিল, সেটাকেই নদী ভেবেছিলুম, বুঝলি।

সেখানে একটা চোখ টেপা লোক দেখতে পেয়েছিলুম। প্রথমে হিন্দিতে তারপর বাংলায় ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এই জায়গার নাম কি! সে, কিছু বলেই না। শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না আমার ভাষা – উনার মুখ দেখে তো তাই মনে হল! কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে কে যেন পাশ থেকে বলে উঠলো – ‘নাগুয়ো ডিরকু’।

আমি মুখ ঘুরিয়ে দেখতে গেলে, একটা সুপুরুষ দেখতে কৃষ্ণকায় ব্যক্তি আমার দিকে তাকিয়ে এক মুখ হেসে উঠলো। কাছে এসে বলল, – ‘আপনি বাঙালী, তাই তো!’

আমি ঘাড় নাড়তে সে কাছে এসে বলল, – ‘আমার নাম ভিকি! ভিকি স্যান্যাল! আর আপনি?’

আমি বললাম –‘গৌরী! আপনি এখানে কি করছেন!’

ভিকি বলল, ও পাহাড়ে গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা করায়। মানসসরোবর মাথা থেকে নাকি শুরু হবে সেই প্রতিযোগিতা।

চীনা ভাষায় মানসসরোবরকে ওরা কি নামেডাকে জানিস… ‘লাফাঙ্গা চো’ না কি একটা! সেখান থেকে শুরু করে নাকি একশোপঁচিশ কিলোমিটার ধরে সেই প্রতিযোগিতা চলবে! শেষ হবে যেখানে, সেখানকারও নাম বলেছিল। কি যেন ‘দাবাজিং’ না কি! সেই জায়গাটা নাগুয়া ডিরকু থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে। সে আমায় বলল, ওর গাড়ির পিছনে বসতে, আমাকে সে মানসসরোবর অবধি নিয়ে যাবে!

পুরোরাস্তাটা কিভাবে যাব তাও বলেছিল। নামগুলো ভুল বললে, হাসবিনা কিন্তু, … হ্যাঁ… বলে দিলুম… ওই শক্ত শক্ত ভাষা মনে নেই আমার! যা মনে আছে বলছি!

প্রথমে নাকি ‘লুজিপু’ যাবো আমরা। সেটা ওখান থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে। গাড়িতে যেতে গেলে লাগবে ঘণ্টাতিনেক। সেখান থেকে ‘সুয়ো গাংরংকু’ যাবো। সেটা লাগবে দুই ঘণ্টা – মাত্র তেরো কিলোমিটারের পথ নাকি! আর সেখান থেকে উৎরাই! এইটুকু যেতেই সাত ঘণ্টা লাগবে –আর সব মিলিয়ে লাগবে হল বারো ঘণ্টা। মাঝে সেই ভিকি কিছু কাজ করবে বলে থামবে – তাই সব মিলিয়ে এই পনেরো ঘণ্টা লাগবে!

আমি দেখলাম, বেশ ভালোই হল – বোধ হয় শিব-বাবুই আমার খুব কষ্ট হবে বলে একে পাঠিয়েছে! তাই কোন কথা না বলেই রাজী হয়ে গেলুম! গাড়িতে উঠতেই ভিকি বলল, কি একটা দড়ি পরে নিতে কোমরে, পাহাড়ে ওঠা নামার সময়ে গাড়ি থেকে পরে যেতে পারি! আমি তাই করলাম, কিন্তু যেই মুহূর্তে ওর গাড়িতে উঠতে গেলাম, কি যেন এক আশ্চর্য বিদ্যুৎ ঝলকের মত আমার শরীরে লাগলো! আমি বুঝে গেলুম, ভিকি ছেলেটি ভালোমনের নয়! তাও ভাবলাম, এই বিস্তীর্ণ এলাকায় আমাকে তো কেউ পথ বলে দিতে পারবে না! তবে এই মানুষটাকেই একটু বিশ্বাস করে দেখি! সেই ভেবে আমি ওর গাড়িতে উঠে বসলাম।

গাড়ি চালাতে চালাতে ও অনেক কথা বলছিল – ওর নাকি বাংলাদেশে এক সময়ে খুব যাতায়াত ছিল। সেখানেও ও গিয়ে একই ধরনের কি… রেস… না কি একটা করে! ওখানে ওর প্রেমিকা থাকে। নাম বলেছিল খালিফা… খালিফা খাতুন। সেই মেয়ে নাকি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে। এখন সে রয়েছে মানসসরোবর হ্রদের কাছে। ওকে নিয়ে ভারতে ফিরবে ও আর সেখানেই দুজনে বিয়ে করবে।

আমরা যখন লুজিপু পৌঁছলাম, তখন ভিকি ঘড়ি দেখে বলল সাড়ে এগারোটা বাজে। ভিকির শরীর থেকে এত বাজে রকম এক তরঙ্গ বেরুচ্ছিল যে আমি ঠিক সহ্য করতে পারছিলুম না! মাথা ধরে গেছিল! যাই হোক ও নিজের গাড়ি করে আমাকে নিয়ে যাচ্ছিল। তাই কিছু খারাপ ভাবাটা ঠিক নয় মনে হল। ওর গাড়ি করে এবার পৌছালাম গাংরংকুতে! ভিকিকে আমার যে একটা নিচু মানসিকতার মানুষ বলে মনে হচ্ছিল, সেটা আসলে আমার মনের ভুল – আর এটাই আমি ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু গাংরংকুতে যা দেখলুম, তাতে আমার ধারণাতে যে কোন ভুল ছিলনা, সেটা স্পষ্ট বুঝে গেলুম।

দেখলুম কি জানিস! পাঁচটা হৃষ্ট পুষ্ট ছেলে মিলে দুটো মেয়েকে জোর করে ধরে রেখেছে! মেয়ে দুটো জোরে জোরে চিৎকার করছিল, কিন্তু দূর দূরান্ত পর্যন্ত কোন লোক দেখতে পেলুম না, যারা নাকি তাদের ডাকে সারা দেবে! এদের মধ্যে একটি মেয়ে একটা কামিজ পরেছিল – যার উপরের দিকের বেশ কিছু অংশ ধস্তা ধস্তিতে ছিঁড়ে গেছে। মেয়েটার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে প্রায় মুখটা ঢেকে ফেললেও, ওর রূপের বাহার সেই মলিনতা দিয়ে কিছুতেই ঢাকা যাচ্ছিল না! পাশে আরও একটা মেয়েকে দেখলাম – অপরূপা বললেও কম বলা হয় তাকে! হ্যাঁ রে! কি রূপ! যেমনি গায়ের রঙ, তেমনি রূপ – একে দেখে বিদেশিনী মনে হল।

এর পরনে প্যান্ট আর জামা। প্যান্টটার বেশ কিছু জায়গা ছেঁড়া ! অবশ্য ও পরে বলেছিল যে সেগুলো ও নিজেই ছিঁড়েছে। কিন্তু উপরের জামাটা তিন জায়গায় ছেঁড়া আর তার ভিতরে আরও একটা, … কি বলি… এই ছেলেরা যেমন গেঞ্জি পরে না, সেরকম একটা – সেটাও বেশ কিছু জায়গায় ছেঁড়া ফাটা আর, সেই ফাঁক দিয়ে গায়ের ধপধপে সাদা রঙ উঁকি মারছিল! তবে সেটাকেও চেপে দিচ্ছিল বেশ কিছু দগদগে রক্তের ছাপ! বেশ বুঝতে পারছিলুম – এদেরকে টেনে হিঁচড়ে আনা হয়েছে – কিন্তু এরা কারা! কোন অপরাধী! মনে মনে ভাবলুম, সেটাই হবে, না হলে এমন বিচ্ছিরি করে ধরে এনেছে কেন! কিন্তু পরের মুহূর্তে দেখলুম, ভিকিকে দেখে ওই পাঁচটা ছেলের কি মজার হাসি!

ভিকিও কেরকম একটা বাজে ভাবে হেঁটে গেল ওদের দিকে – তারপর সে যা বলল, তাতে তো আমার গা হিম হয়ে গেল –সঙ্গে সঙ্গে রাগে আমার গায়ের রঙ লাল হয়ে গেছিল!

গঙ্গা মন দিয়ে শুনছিল। এবার প্রচণ্ড উত্তেজনা নিয়ে বলে উঠলো– ‘কেন কি হল!’

ভিকি ওই কামিজ পরা মেয়েটার কাছে যেতেই, মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠলো – বাঁচাও ভিকি! বাঁচাও! দেখ না – এইগুলো কি বাজে লোক, আমাকে কিরকম করে ধরে রেখেছে দেখ!

একটু থেমে সে আবার বলল, – এই আমায় ছারো তোমরা! এটা কে জানো! এটা হল ভিকি! বিশাল বড় বাইক রেচার… না কি একটা বলল!

যমুনা হেসে বলল, ‘ওটা বাইক রেসার গো মা! মানে হল যে খুব ভালো গাড়ি চালায় – মোটরবাইক! বুঝলে!’

গৌরী বলে চলল – হ্যাঁ পরে জেনেছিলুম, কিন্তু কি জানিস তো, ইংরাজি শব্দ ঠিক মনে থাকেনা! তো শোন না – ভিকি সেই কথা শুনে প্রথমে হাসল, তারপর কেমন যেন হাসিটা অসুরের মত হয়ে গেল।

তারপর ভিকি কি বলে জানিস! বলে –‘আচ্ছা সত্যি তো, তোরা এভাবে ওদের ধরে রেখেছিস কেন! এখানে কাউকে দেখতে পাচ্ছিস! তাহলে কিসের ভয়! এদেরকে কে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে ? হ্যাঁ!’

জানিস, ভিকিকে ওই ছেলেগুলো বলে কিনা ওস্তাদ, মানে বুঝেছিস – এই ভিকিই ওদের দলের পাণ্ডা!

ভিকিকে ওরা বলল, – ‘না ভিকি ভাই, এখন ছাড়া যাবে না! দেখছ না, এখান অবধি নিয়ে আসতে, এমনিই গা হাতপা ছড়ে গেছে! এরপর তো ছেড়ে দিলেই আবার পালাবার চেষ্টা করবে! তখন গা হাত পা আরও কেটে যাবে না!

ভিকি অসুরের মত একটা হাসি হেসে বলল – তা ঠিক! তা ঠিক! … যাই হোক শোন, তোরা বলছিলি না! আমরা ছ’জন, দুটো মেয়ে আমাদের কম পরবে! এই দেখ – আরও একটাকে নিয়ে এসেছি!

দিয়ে আমার দিকে আঙ্গুল তুলে দেখাল! এবার ওই মেয়েটা একটা অদ্ভুত ভাবে চিৎকার করল, – তুমি এরকম ভিকি! ছি ছি! আমি এইরকম একটা শয়তানকে মন দিয়েছিলাম! তুমি না কি আমাকে বিয়ে করবে! তাই না! … সে বলেই তো আমাকে বাড়ি থেকে বার করে আনলে! … তোমার এই ছিল মনের ইচ্ছা, যে আমাকে শুধু একা নয়, এই আহাম্মকগুলোকে দিয়ে ছিঁড়ে খাওয়াবে! আমি শুধু একবার ছাড়া পাই, তারপর দেখবে – নিজেকে কুরবান দিয়ে দেব, তবু তোমার হাতে লাগবো না!

ভিকি আবার একটা আসুরিক হাসি দিয়ে ঔদ্ধত্যের সাথে বলে উঠলো, – ‘পালাবে!’ বলে কি অট্টহাসি! ‘বেশ পালাও! …পালাও! পালাও… (এবার চেঁচিয়ে) কই পালাও…! (তারপর চুলের মুঠি ধরে ও বলল) – শোনরে … এই ভিকি কাউকে ভালো ফালো কোনদিন বাসেনি… আর কোনদিন বাসবেও না! এই ভিকির রোজ একটা নতুন মেয়ের শরীর চাই! … আরে হতচ্ছাড়ি, বোকা মেয়ে… তুই কি ভাবলি! … শুধু বাইক চালিয়েই আমি কোটিপতি হয়ে গেছি! (আবার সেই হাসি) … (আবার বলতে থাকলো) শোন বোকা মেয়ে… রোজ একটা নতুন মেয়ে লাগে আমার, আর আমার এই শরীরের জ্বালা জুড়লে তাদের বিক্রি করে দিই! … (একটু থেমে আর একটু পায়চারি করে সে আবার বলতে থাকলো) … মনে আছে (মেয়েটার মুখের কাছে গিয়ে) তোদের খুলনা থেকে আমি থাকতে ফাতিমা, শবনম সব গায়েব হয়ে গেছিল? কি মনে পরছে?ওটা গায়েব হয়নি … বিক্রি হয়ে গেছে… বিক্রি! … হা! হা! হা! … তিনজন ছিল – একেবারে টাটকা টাটকা ছিল… লেকিন হা! বলতে হবে! … আমি ভি মজা পেয়েছি… আর … সবাই কে মজা নিতে ভি দিয়েছি! … কি ভালো করিনি?’(আবার অট্টহাসি)

মেয়েটার চোখ দিয়ে জল বেরুচ্ছে, কিন্তু দুঃখে নয়! … রাগে! … সেই দেখে ওই অসুরটা আবার বলতে শুরু করল… ‘কি … বললি না যে… ভালো করিনি! … ও আচ্ছা… তুই এবার বলবি … আমার কি লাভ! … হয়েছে হয়েছে… চিন্তা করিস না…. লাভ হয়েছে… তিনজনে ৪ কোটি রুপিয়া… না রুপিয়া না… তোমাদের বাংলাদেশের টাকা পেয়েছি!’ (আবার সেই বিদঘুটে হাসি)।

সে আবার বলল, আরে তোমাকে বিক্রি করার ইচ্ছা ছিল না আমার! … সত্যি বলছি… কিন্তু কি করি! … কাউকে পাচ্ছিলামই না… তাই ভাবলাম, তোমাকে ওদের কাছে দিয়ে দেব… সেই জন্যেই তো…! কিন্তু ডার্লিং… ভুল বুঝ না প্লিজ… মাইরি বলছি… এই মেয়েগুলোকে (পাশের বিদেশিনীকে দেখিয়ে আর তারপর আমার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল)… এদেরকে অনেক পরে পেলাম… তার আগেই যে তোমায় দেখিয়ে ফেলেছিলাম… তবে হ্যাঁ বলতে হবে… ওরা কিন্তু খুব দিল দরিয়া… আমার গার্লফ্রেন্ড জেনে পঞ্চাশ লাখ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে… পুরো দুই কটি টাকা তোমার একার জন্য… কেয়া বাত!

মেয়েটার এবার গলা শোনা গেল –‘ছি ছি! লজ্জা করছে না তোমার এইসব কথা বলতে! তুমি এত নিচ! আমাকে তুমি চেন না! … আমি কিন্তু বড়লোক বাড়ির মেয়ে নই! … বাপ মা হারা মেয়ে আমি!’

ভিকি অসুর আবার বলল –‘তোমায় বলি! তুমি তো জানই না! … তোমার বাপ মা তোমার জম্মের সময়েই … হুশ (হাত দিয়ে এক ভঙ্গি করে দেখিয়ে)… হ্যাঁ হারিয়ে গেছে! হ্যাঁ… সত্যি বলছি… মা কসম দেখ…! তোমার এই বস্তি বাড়ির মা তোমায় দেখে খুব … কেয়া বলতে হে… হা করুণা … (বিকৃত ভাবে বলল আবার) … করুণা হয়েছিল! … থ্যাংকস আম্মিজান… থ্যাংকস …! সেদিন যদি তোকে হারামজাদি না কুড়িয়ে আনত, তা হলে তো এই দুই কোটি টাকা পেতামই না…! বহত খুব!’

মেয়েটা রাগে বলে উঠলো –‘আমি তোকে পুলিশে দেব!’

ভিকি হো হো করে হেসে উঠে তার সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বলল –‘যা… ছেড়ে দে ওকে… পুলিশে যাবে! … তারপর মন্ত্রীর কাছে যাবে… যা যা যেতে দে…বে… হ্যাঁ ওদেরকেও তো কিছু করতে দেওয়া উচিত কি বল! … কি রে?… খালি বসে বসে কমিশনগুলো খায়… এবারে কিছু করে কমিশন নিক… ছাড়! ছাড়! ছাড়! … ছেড়ে দে!

ওর সাথিগুলো মজা দেখছিল! এবার বলে উঠল, – কেন আমরা মজা নেব না! … এটা ঠিক নয় ভিকি!

ভিকি চেঁচিয়ে উঠলো – দেখ ভিকির উপর চোখ রাঙ্গাবি না! জন্মেছিলাম হিন্দুর ঘরে… তারপর মুসলমানরা ভালো দেখতে হয় বলে, মুসলমান হয়েছিলাম… তারপর বিদেশে গিয়ে বিদেশিনী পাচার করতে … ওদের দেশের নেতারা বলল খ্রিস্টান হতে… আমি তাই করেছি… আর নিজের গার্লফ্রেন্ডকে দিতে পারব না! … চল… তোরা ওকে নে… আমি এই মেয়েটাকে (আমাকে দেখিয়ে) দিয়েই কাজ চালিয়ে দেব… ওরা দুটোই তোদের… যা! দান করে দিল তোদের ভিকি… যা মজা কর!

এই বলে ভিকি আমার দিকে একটু ঘুরে দেখল। তারপর আমার দিকে এগোতে থাকলো সে! আমারও সেই সময়ে কি প্রচণ্ড যে রাগ হচ্ছিল, সে তোদের বলে বোঝাতে পারব না! সত্যি করে বলতে কি জানিস!আমার রাগ হচ্ছিল বুঝতে পারছিলুম, কিন্তু সেটা যে এতটা বেশী, সেটা আমিও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি! বুঝলাম যখন ভিকি নামক অসুরটা আমাকে ছুঁতে এলো – আমায় সে ছুঁতে না পেরে কেমন যেন ছিটকে যাচ্ছিল! কিন্তু আমার তাতে যেন মন ভরল না! আমি ওকে সজোরে একটা লাথিই মেরে বসলাম! তারপর যা দেখলুম, তাতে আমার সেই সময়ে হার হিম করা না হলেও, পরে দৃশ্যটা মনে পড়তে ভয় লেগে গেছিল! আসলে সেই সময়ে খুব রাগে ছিলুম তো!

গঙ্গা আর যমুনা দুজনে প্রায় এক সাথেই বলে উঠলো – ‘কেন কি হল!’

গৌরী বলতে থাকলো, – আর বলিস কেন! সেই যে লাথি মারলুম, তাতে সেই ভিকি প্রায় দশপনেরো ফুট দূরে ছিটকে গিয়ে পাহাড়ের একটা বড় চাঙ্গরে ধাক্কা খেল।  চাঙ্গরটি না থাকলে ও খাঁদে গিয়ে পরত! (হাসতে হাসতে গৌরী বলতে থাকলো)। এরপর ওই পাঁচ জন একটু যেন ভয় পেয়ে গেছিল। ওদের কাছে ধেয়ে যেতে, ওরা একটু থেমে গিয়ে আমায় আঘাত করতে আসে, তবে কেমন যেন একরকম প্যাঁচে ওদেরকে শুধু পরে যেতে দেখলুম না, গুরুতর জখমও হয়েছিলো, জানিস! তারপর দেখি কি, ওই দুই মেয়ে অবাক চোখে আমাকে দেখছে! আমি ওদের বললাম – কি দেখছিস? এখান থেকে চল!

আমার কথা শুনে ওরা যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত আমার সাথে চলতে থাকলো! আসলে ওদের শরীরে আর সেই বল নেই যে ওরা ছুটতে পারে! তাই বাধ্য হয়েই হেঁটে চলছিলুম আমরা। সেই সময় দেখি, ওই ছয় শয়তান আবার উঠে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে আমাদের দিকে আসছে, হাতে কি একটা কালো রঙের ছোট অস্ত্র টস্ত্রও ছিল মনে হয় জানিস! কিন্তু কি পরিমাণ যে শক্তি শিব বাবাজী আমায় তখন দিয়েছিল কে জানে! আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে একবার তেড়ে যাবো বলে পা খানা মাটিতে ঠুকেছি! অমনি দেখি আবার কতখানি দূরে ওরা ছিটকে পরে গেল! বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখেছিলুম – কিন্তু এবার আর ওরা ওঠেনি। শেষে ওই ফুলের মত মেয়েদুটিকে নিয়ে এগোতে থাকি। প্রায় দুঘণ্টা হেঁটে সামনে একটা ছোট জলাশয় দেখতে পেয়ে ওদেরকে নিয়ে সেখানে বসি! আসলে ওদের একটু সেবা করা দরকার ছিল – ওরা যে আর হাঁটতে পারছিল না!

এতখানি শুনে, যমুনা বলল ‘দিদি আজকে ভাত মাখন দিয়ে, আলুর চোকা দিয়ে আর ডাল ভাতে দিয়ে খাবি!’

গঙ্গা দেখল, আজকে যমুনার গল্প শোনা ছাড়া অন্যদিকে কনো মনই নেই। তাই ওর কথায় সায় দিল। আসলে সেটা ওর নিজেরও মনোভাব! তাই আরও বেশী করে সায় দিল।

যমুনা ভাত, ডাল আর আলু উনুনে চাপিয়ে দিয়ে, ফিরে আসতে মিনিট পনেরো সময় নিল। আর ও আসতেই, গৌরী বলতে শুরু করল–

আমরা গিয়ে যে জায়গাটায় বসলুম, সেখানটা একটা সুন্দর হ্রদ ছিল! হ্রদে জলটা সম্পূর্ণ নীল …তবে তাকে ঠিক নীল বলা যায় না – সুন্দর একটা সবুজ ভাব ছিল তাতে! আশপাশটা কোন গাছগাছালি ছিল না! তবে পাথরগুলো এত সুন্দর আর জায়গাটা এত পরিষ্কার যে – খুব ভালো লাগছিল! আসলে জায়গাটায় একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা ছিল জানিস!

এই সব মিলিয়ে জায়গাটা কেমন হবে বলতো! আমাদের এখানকার পুকুরের মতো।  এর থেকে বেশি বড় হবে না! ওই দুটো মেয়ের মনটা একদম ভালো ছিলনা! আর সবথেকে বড় কথা ওদের এতো টানাটানি করা হয়েছে না, যেসব জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেটে গেছিলো – কিছু কিছু জায়গা কেটে ছড়েও গেছিল! তা হলেও ওদের কিন্তু জায়গাটা বেশ ভালো লাগছিলো! আসলে একটু স্বাচ্ছন্দ্যে পেয়েছে মনে হচ্ছিল। তবে মনের মধ্যকার ভয়টা তখনও পুরোপুরি যায়নি!

ওরা কেমন যেন থুম মেরে বসেছিল – যেন জীবনটাই শেষ হয়ে গেছে! আর কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই – এইরকম একটা ভাব! আমিও খুব ক্লান্ত হয়ে গেছিলুম! এক তো গাড়ির পিছনে বসে অতক্ষণ গেছি, তার উপর আবার ওই ভিকি নামক ছেলেটার শরীরের থেকে যেন একটা কাঠ পোড়া, কাঠ পোড়া গন্ধ আসছিল –সেইটাও মাথার থেকে তখনও পুরো যায়নি! এরপর গংরংকু থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে আসার ধকল তো ছিলই! আর সব থেকে বেশী যেটা ছিল, সেটা হল – ভিকি আর ওর সঙ্গী সাথিদের উপর যখন রাগ জন্মেছিল তখন শরীরে এত তাপ এসে গেছিল, যে সেই তাপটা কিছুতেই যাচ্ছিল না, জানিস!

প্রথমে সেই হ্রদের জলে হাত মুখ ধুচ্ছিলাম! কিন্তু সেই তাপ কিছুতেই যাচ্ছে না দেখে, বিরক্ত হয়ে সেই হ্রদের জলে একটা ডুবই মেরে দিই! কি সুন্দর শীতল জল! কি সুন্দর, ঠাণ্ডা! যেমনটা হলে শরীরের জ্বালা জুড়ায়, ঠিক তেমনটা! একবার ডুব দিতে এত ভালো লাগলো যে, আরও চার পাঁচ খানা ডুব দিয়ে দিই।

গঙ্গা বলে উঠলো। ‘তোমার কাছে অন্য কাপড় ছিল না কি!’

গৌরী হাসতে হাসতে আবার বলতে থাকলো, –

সে আর বলিস না! আমার কি তখন অত মাথায় ছিল! শরীর এত জ্বলছিল যে ডুব মেরে স্নান তো করে ফেললাম, কিন্তু উঠে এসে মনে পরল, সঙ্গে তো কোন জামাকাপড় নেই! কি করবো! ভিজে কাপড়েই উঠে এলাম! নিজে ঠাণ্ডা হতেই মনে হল যে মেয়ে-দুটো আমারই অপেক্ষায় বসে রয়েছে! উঠে গিয়ে ওদের কাছে যেতে, ওরা আমাকে কি অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখছিল জানিস!  বোধহয় ওই ঠাণ্ডার মধ্যে চান করে, ভিজে গায়ে, ভিজে কাপড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম বলেই ওদের ওই অবাক হওয়া! কিন্তু কি করে ওদের বোঝাই বলতো, যে আমার কাছে আর কোন কাপড়ই নেই?

আমি ওদের কাছে গিয়ে ওদের নাম জিজ্ঞেস করার আগে, কামিজপরা মেয়েটাকে বললাম – তুমি খালিফা তো!

মেয়েটা অবাকদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালে, আমি আবার বলি – ভিকির কাছ থেকেই তোমার নাম জেনেছিলুম। তোমাদের কথোপকথনে আমি বুঝেছি যে তুমিই সেই খালিফা–কি তাইতো?

মেয়েটা আমার দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। দেখে কি মনে হচ্ছিল বলতো? মনে হচ্ছিল যেন সেই দৃষ্টিতে প্রচুর ভাষা লুকিয়ে রয়েছে। যেমন তাকে সম্মান আর লাজ রেখে বাঁচিয়ে আনার ভাষা রয়েছে, তেমন রয়েছে যে অদ্ভুত শক্তি আমার দেখেছে তার প্রতি বিস্ময়ের ভাষা, আবার এর সাথে রয়েছে নিজের প্রিয়জনের কাছ থেকে পশুতুল্য আচরণ পাবার ব্যথার ভাষা আর শেষে রয়েছে আমি কে, সেই ভাষা!

আমি সেটা বুঝেই ওকে বললাম – আমার নাম গৌরী, কলকাতা থেকে আসছি। শিবের সাথে আমার মামা আমাকে বিয়ে দিয়েছে, তাই শিবের সাথে ঘর করবো বলে এই কৈলাসে এসেছি, আর ওই শক্তির কথা ভেবো না! ওটা আসলে আমার নয়! আমি বিপদে পরলেই শিব বাবাজী আমাকে দিয়ে এই সব অদ্ভুত কাজ করায়! আমি নিজেই জানতুম না, এই কিছুদিন হয়েছে আমিও প্রথম দেখছি! আমি তোমাদের মতই এক সাধারণ মেয়ে – নিতান্তই সাধারণ।

মেয়েটা জানিস, কনো কথা বলল না! শেষে হঠাৎই আমাকে জড়িয়ে ধরে, আমার ঘাড়ের উপর নিজের মুখ গুঁজে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো। অনেকক্ষণ কাঁদল, আর অন্য দিকে দেখি, ওই বিদেশিনী মেয়েটাও চোখের জল মুছছিল! বাঁ হাত দিয়ে সেই বিদেশিনীর মাথায় হাত দিয়ে আদর করতে গেলাম – তাকেও সান্তনা দিতে বড় মন করছিল। কি মিষ্টি মেয়ে জানিস সেই সাদা মেয়েটি! আমার হাতটাকে জড়িয়ে ধরে নিজের ডান গাল আর কাঁধের মধ্যে রেখে যেন আমার স্নেহ ধার চাইছিল – আর আস্তে আস্তে ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরছিল।

অন্যদিকে এই খালিফাকে নিজের দুহাত দিয়ে ওর মুখটা ধরতে , ও হর হর করে নিজের মনের ক্ষোভ বিক্ষিপ্ত স্বরে আগ্নেয়গিরির লাভার মত উগরে দিতে থাকলো।

গঙ্গা এবার বলে উঠলো, একটু রসিকতা করেই বলল, ‘বাবা! তুমি এমন সাহিত্যের ভাষাও জানো!’

গৌরী মৃদু হাসলো ঠিকই, তবে হাসিটা ওর যেমন সাবলীল বালিকার বাৎসল্য মাখানো হাসি, সেরকম নয়! এই হাসিটার মধ্যে যেন একটা অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা বেদনা রয়েছে।

গৌরী বলল, –

না রে! মেয়েটার দুঃখের কথা শুনে আমারও চোখ ভরে গেছিল! ঈশ্বর ওকে মায়ার জ্বলন্ত জালে জড়িয়ে ধরে রেখে পুড়িয়ে খাঁটি সোনা করে দিচ্ছিল! কিন্তু এই নচ্ছার ছেলে ভিকি ওকে সেই জ্বলন্ত অগ্নি থেকে উদ্ধারের নাম করে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলার চক্রান্ত করছিল। আসলে কি বলতো, মহামায়া জালে জড়াবেন, আগুনে জ্বালাবেন, কিন্তু সেই সবের উদ্দেশ্য হল সেই মায়া থেকে ব্যক্তিকে ঠেলে বার করে দেওয়া – আর একবার চেতনা জেগে গেলেই ছুটে মুটে সে পালাবে! কিন্তু ওই অসুরগুলোর হল জ্বালার জাল! – সে তো মহামায়ার জাল নয়, সে যে পিশাচের জাল!

জানিস মেয়েটা ওর সম্বন্ধে বলছিল – ওকে নাকি ওর আসল মা বাবা জন্মের পরেই আস্তা-কুঁড়ে ফেলে চলে গেছিল! আস্তা-কুঁড়েতে কাঁদতে দেখে এক বস্তির দরিদ্র মহিলা ওকে বাড়ি নিয়ে যায়! উনি নাকি নিঃসন্তান ছিলেন – তাই খালিফাই ওর দুচোখের মনি! সেই মহিলাকেই ও আম্মি বলে ডাকতো! সেই আম্মি নাকি ছেঁড়া বস্তা ও ন্যাতা কুড়িয়ে, বিক্রি করে সংসার চালাত।  অন্য কিছু আর সে দেখতোও না, ভাবতও না! কিন্তু ওর আব্বা মানে বাবা ওর মা-কে খুব মারত! সে নাকি জুয়া খেলত আর পয়সা হেরে খালি হাতে বাড়ি ফিরত! ওদের ছোট্ট বস্তির বাড়িতে ওর আম্মি যেখানে যেখানে পয়সা লুকিয়ে রাখত, সেখান থেকে ওর আব্বা সেই টাকা তছরুপ করে নিয়ে গিয়ে জুয়া খেলত! খুব কম দিনই হত, সে জিতে বাড়ি ফিরত! বেশীরভাগ দিনই হারতো! সেই হারের জ্বালা ওর আম্মিকে পিটিয়ে মেটাত – জানিস!

ও আরও বলছিল, ওর আম্মি ওকে আট ক্লাস অবধি যে ভাবেই হোক পড়িয়েছে, কিন্তু আট ক্লাস পাস করার পর, ওর আম্মি মারা যায়! আর তারপর থেকে আম্মিকে ঘিরেও যতটুকুনি সুখ পেত, সেটাও হারালো! সংসার চালাতে, ও প্রথমে বাড়ি বাড়ি কাজ করত। ভালো দেখতে হওয়ায় মাঝে মধ্যেই লাজ রক্ষা করতে কাজ ছেড়ে দিতে হত! তারপর আবার আব্বার মার সহ্য করতে হত সেই টাকা হাতিয়ে নেবার জন্য! শেষে নাকি ও বাঁশের বাড়ির চারটে বাঁশের মধ্যে সেই টাকার বেশীরভাগ অংশ লুকিয়ে রাখত। কেন জানিস! কারণ আব্বা কোন টাকা না পেলে তো ওকেই জ্যান্ত মেরে ফেলবে, তাই কিছু টাকা বাইরে রাখত – আর আব্বা ফিরে আসছে দেখলেই, ও বাড়ি থেকে পালাতো! ফিরে এসেই তো ওকে মারবে– তাই! এইভাবে চলছিল – ও বাড়ি বাড়ি কাজের সাথে উল বুনে সোয়েটার তৈরি করত আর সেই থেকে বেশ কিছু আয়ও করত! পরেরদিকে ও, ওদের বস্তির মেয়েদের উল বোনা শিখিয়ে কাজ করাত! তাই দিয়ে, সব মিলিয়ে ও একসময়ে মাসে প্রায় পাঁচহাজার টাকা অবধি রোজগার করেছে!

তারপরই এলো ভিকি! ওর বয়স তখন আঠেরো ছেড়ে উনিশ এর পথে! ভিকি ওকে স্বপ্ন দেখাত আর কিছু পয়সাও দিত! বিশেষ করে ওর বাবার হাতে নাকি ভিকি অনেক টাকা দিয়েছিল! সে নাকি ভিকির কাছে জানতেও চেয়েছিল, আব্বুকে সে টাকা দিচ্ছে কেন? যখনই জিজ্ঞেস করত, ভিকি বলতো, আমার আব্বু নাকি ওরও আব্বু! তাই জুয়া খেলার পয়সা দিচ্ছে! আজ এতদিন পরে সে জানলো যে, ওর আব্বু আসলে ভিকিকে মেয়ে ধরিয়ে দিত – তাই ওকে পয়সা দিত!

কাঁদতে কাঁদতে ও আমাকে আরও বেশী করে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকলো – এবার আমি কোথায় যাবো? আমার তো যাবার আর কোন জায়গা নেই!

অনেক সান্তনা দিয়ে শেষে ওকে বুঝিয়ে বললাম – আমি শিব বাবাজীর কাছে যাচ্ছি! আমার সাথে তুমিও চলো। শিব বাবাজীকে জিজ্ঞেস করে ঠিক একটা উপায় বেরিয়ে যাবে।

জানিস, ও খুব ভালো! তোদের মত নয়! শিব বাবাজীর কাছে যাচ্ছি বলতে ও একবারেই মেনে নিয়েছিল – তোরা তো! (একটু রাগ দেখিয়ে) মানবি কি, ব্যাঙ্গ করতেই মত্ত!

গঙ্গা বলল, ‘আর ওই মেয়েটার কি হল? … ওই বিদেশিনীর?’

ওর নাম হল কুয়িন… কি পুরো নাম একটা … এলেন্স … কুয়িন … এলিজাবেট… ওই রকম একটা!

গঙ্গা এবার তো হেসেই খুন। হাসতে হাসতেই বলে উঠলো, ‘ওটা এলিজাবেট নয়… ওটা এলিজাবেথ’। খানিক থেমে আবার  গৌরীর উদ্দেশ্যেবলল, ‘তো তুমি এদের কিছু নাম দাওনি…  তুমিতো সবাইকে একটা করে নাম দিয়ে দাও!’

গৌরী হাসতে হাসতেই বলল, ‘হ্যাঁ দিয়েছি তো, তবে অনেক পরে দিয়েছি! আসলে প্রথম দিকে ওই সাদা মেয়েটাকে আমি মেয়ে মেয়ে বলেই ডাকছিলুম! পরে ওর একটা নাম দিয়েছিলুম– অদিতি!’

‘বাঃ বাঃ পুরো বাঙ্গালী নাম হ্যাঁ! ওফ্ তুমি পারও বটে!’ গঙ্গা গৌরীকে জড়িয়ে ধরে বলল। খানিক পরে আবার বলে উঠলো, ‘আচ্ছা, ওই খালিফার কোন নাম দিলে না কেন?’

গৌরী বলে উঠল, ‘না ওকেও দিয়েছি! … হ্যাঁ দিয়েছি… আসলে কি বলতো, ও নিজেই বলল ওকে একটা নাম দিতে, ও চায় না যে আগের নামে ওকে কেউ মনে রাখুক’।

যমুনা এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল। এবার বলে উঠলো, ‘আচ্ছা মা, ওই অদিতিকে দেখতে কেমন ছিল?’

গৌরী বলতে শুরু করল –

অপূর্ব দেখতে! যেমনি গায়ের রঙ, তেমন রূপ – চুলগুলো একটু লাল লাল, তবে কালো ভাবটাই বেশী –পরে যখন শাড়ী পরেছিল, কি ভালোই না লাগছিল! এই খালিফা মেয়েটাও খুব সুন্দরী! ওর মুখ চোখ আরও বেশী পরিষ্কার, জানিস! গায়ের রঙও সাদা! তবে হ্যাঁ অদিতির গায়ের মত রঙ না। শাড়ী পরে ওকেও খুব মিষ্টিই লাগছিলো! আসলে ওর উচ্চতাটা খুব সুন্দর – এই আমার মতই… না… আমার থেকে বোধ হয় এই এক ইঞ্চি মত লম্বাই হবে!

যমুনা আবার বলে উঠলো, ‘ওই এলিজাবেথ খুব লম্বা নাকি!’

গৌরী বেশ খানিকক্ষণ ভেবে বলল, –

কই না তো! খুব লম্বা তো নয় – খালিফা যদি আমার থেকে এক ইঞ্চি বেশী লম্বা হয়, তবে ওই মেয়ে আমার থেকে দুই ইঞ্চি লম্বা হবে! তার থেকে বেশী নয়!

গঙ্গা এবার পুরো অভিযোগের সুরে বলে উঠলো, ‘কিন্তু তোমাদের সাথে তো কোন কাপড় জামা ছিল না – তবে সবাই শাড়ী পেলে কোথা থেকে?’

গৌরী বলে উঠলো, –

আরে সে অনেক কথা, শোন তবে… দাঁড়া তার আগে, তোদের ওই অদিতির কথা পুরো খুলে বলি!

যমুনা বলে উঠলো, ‘মা! এরপর থেকে রাত্রে শুয়ে শুয়ে শুনবো! হ্যাঁ! এবার খেয়ে নিই চল!’

গঙ্গা এতক্ষণ ঘড়ির দিকে তাকায়নি। এবার দেখে চমকে উঠে বলল, ‘ওরে বাবা এত বেজে গেছে! চল মা! আগে খেয়ে নিই!’

তিনজনে খাওয়া দাওয়া করে হাত মুখ ধুয়ে, এঁটো বাসন সব ধুয়ে উপরতলায় গিয়ে বিছানা করে ফেলল। ঘরের সেই নীল আলো আর গৌরীর শরীরের জুঁই মিশ্রিত শিউলি ফুলের গন্ধ ও তার পবিত্র উষ্মা, সঙ্গে মৃদু পুবের হাওয়া যেন ঘরের পবিত্রতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে! যমুনা মশারির শেষ দিকে চলে গেল, গৌরী উঠে বসে নিজের বিশাল চুলের বিনুনিটা একটু সামলে বিছনার উপর দিকটা পুরোটা ঢেকে দিল, আর গঙ্গা! যেন অধীর আগ্রহে বসেছিল ঠিক এই সময়ের জন্য যখন সে জেগে জেগে স্বপ্নের দেশে চলে যাবে –আর সে ঠিক চলেও গেল সেই দুনিয়ায়!

অবাক বিস্ময়ে গৌরীকে দেখছিল গঙ্গা – কি অদ্ভুত ওর রূপ! ওদের গ্রামের সব থেকে বেশী ফর্সা গায়ের রঙ ওর থাকলেও, ও যখন বই কিনতে কলকাতায় যেত, তখন ওর নিজের থেকেও ফর্সা মানুষ কলকাতায় দেখেছে – কারুর কারুর গায়ের রঙ গৌরীর চেয়েও অনেক বেশী ফর্সা হবে! কিন্তু গৌরীর গায়ের রঙটা যেন বড় অদ্ভুত! দিনের আলোয় দেখলে মনেহয় যেন গায়ের ভিতর থেকে লাল রোদ্দুর বেরিয়ে আসছে! আবার চাঁদের আলোয় দেখলে, যেন মনে হয় ওর শরীরের প্রতিটা খাঁজ থেকে চাঁদের ছটা বেরিয়ে আসছে! এখন নীল বাল্বের আলোতে দেখছে – যেন মনে হচ্ছে সারা শরীরটা নীলাভ হয়ে গেছে আর শরীরের প্রতিটা ভাঁজ থেকে সেই নীল আলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে – এরকম কারুর গায়ের রঙ হয়! যেন নিজের কনো রঙই নেই, যেই রঙ ওর উপর ফেলা হবে সেই রঙেরই দেখাবে ওকে! আর ওর গায়ের গন্ধ! ওফ্ কি মনমাতানো! ওর পাশে শুয়ে রয়েছে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন কত দূর থেকে সেই গন্ধ ভেসে আসছে! কিন্তু সেই গন্ধে নেই কনো তীব্রতা, রয়েছে শুধুই স্নিগ্ধতা! ওর মধ্যে সব থেকে বিস্ময়কর ব্যাপার হল ওর চুল –এত বড় চুলের বিনুনী ডাইনির হয় শুনেছিল। কিন্তু ডাইনির নিজের চুলের প্রতি প্রচণ্ড আসক্তি, কিন্তু গৌরীর! ওর যে এত বড় চুল আছে–তা ওর শুধু শোবার সময়ে মনে পরে। আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার রয়েছে গৌরীর শরীরে – ওর যৌবন! স্বাভাবিক নয় এই যৌবনটা… না কিছুতেই স্বাভাবিক নয়! … ওর যৌবন যেন বহু প্রাচীন – যেন বহু হাজার বছর ধরে নিজের যৌবন রক্ষা করে আসছে – অথচ স্বভাব! স্বভাবটা যেন শিশুর মতন!

যমুনা অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছিল, ওর দিদি মুগ্ধ হয়ে গৌরীকে দেখে চলেছে। তাই এবার বলেই উঠলো, ‘কি রে দিদি শুবি না?’

যমুনার কণ্ঠস্বরে গঙ্গা সেই দুনিয়া থেকে বাস্তবে ফিরে এলো – কিন্তু কোথা থেকে ফিরে এলো? মনে কি করতে পারছে সে! না! কিছুতেই মনে পরছে না – কিন্তু সেটা মনে হয় পৃথিবী নয়! মনে হবার কি আছে –এত সুন্দর রঙিন জায়গা সারা পৃথিবীতে কোথাও থাকতে পারেনা! গঙ্গা বইয়ে পরেছে – নরওয়ে দেশে নাকি কিরকম একটা অরোরা দেখা যায়! রঙিন হয়ে ওঠে আকাশ! কিন্তু ও যেখানে ছিল – সেখানে তো একটা নয়, জগতের প্রায় সব রঙই ছিল – সেটা কোথায়! – না না ! এ সব মনের ভুল! সব মনের ভুল!

শুয়ে পরতেই, যমুনার আবদারে গৌরী গল্প বলা শুরু করে দিয়েছিল। বলে চলছিল এক অদ্ভুত মায়া জগতের কথা – কিন্তু গঙ্গা যেন এখনও সেই দেশ থেকে ফেরেনি! মাঝে মাঝেই ও সেখানে ফিরে যাচ্ছিল! তাই প্রথমটা ও শুনতে পায়নি  – কিন্তু তাতে গঙ্গার কোন দুঃখই নেই – আসলে ও জানবে তো গৌরী কিছু বলেছে, তবে না, না শোনার দুঃখ হবে! এদিকে গৌরী বলে চলেছে –

জানিস, সেদিন আমি আমার জীবনে দেখা সব থেকে বড় বিস্ময়কর কাণ্ডটা দেখেছিলুম। আমরা হ্রদের ধারে বসে বসে কথা বলছি, হঠাৎ একটা বাংলা ভাষীর কণ্ঠস্বরে আমাদের সবার দৃষ্টি সেই দিকে চলে গেল! দেখি কি, একটা এই বড় চেহারার লোক, কি বড় ভুঁড়ি! আমাদের দিকে তাকিয়ে, শেষে আমার উদ্দেশ্যে বলল – দেবী, আমি আপনাকে নিতে এসেছি! আমার সাথে আসুন!

আমি তো ভাবলুম লোকটাকে ভিকি পাঠিয়েছে, তাই নিজের অজান্তেই কেমন যেন রণমূর্তি ধরে ফেলছিলূম! কিন্তু সেই লোকটা– কেমন করে যেন ধরে ফেলল যে আমি রেগে রণমূর্তি ধরতে চলেছি! যেন আগেও সে আমার এই মূর্তি দেখেছে!

আমায় শান্ত করে সে বলে উঠলো, – ‘দেবী, আমি আপনার কোন ক্ষতিসাধন করতে আসিনি! আমি তো আপনার দাস মাত্র – আপনার সেবক! আপনি আমার মায়ের মতন নন – আমার মা স্বয়ং!’

কি অদ্ভুত শুদ্ধ ভাবে বাংলা বলছিল জানিস! আমি তো শুনে অবাক! অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করে ফেললাম, – ‘হ্যাঁ গো তুমি কে গো! এই চীন দেশে দাঁড়িয়ে এত ভালো আর শুদ্ধ বাংলা বল কি করে!’

সে কি বলে জানিস! বলে –‘মা, আপনার দয়ায় জগতের প্রতিটা মানুষের ভাষা আমি জানি! মা আপনি আপনার স্বরূপ এখন ভুলে রয়েছেন – না হলে আপনি তো প্রতিটা জীব, প্রতিটা অজীবের ভাষা জানেন! তাই হে দেবী, আমায় অযথা সম্মান দিয়ে লজ্জিত করবেন না!’

আমার না বড়দিদির একটা কথা খুব মনে আসছিল। দিদি কি বলতো জানিস! বলতো, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ! এই লোকের ব্যবহার দেখে আমার সেরকমই মনে হচ্ছিল! তাই আমি এবার রেগে-মেগেই বলে উঠলাম –‘এই লোকটা! তুমি কে বল তো? ভালো সাজছো যে বড়!’

ভদ্রলোক এর উত্তরে কিছু না বলে, আমাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, – ‘মা, আমার নাম বৈষরাবণ, আমি আপনার একনিষ্ঠ সেবক। আপনি এভাবে আমার দেশে এসে পায়ে হেঁটে চলবেন, এটা তো হতে পারেনা! আপনি অনুমতি দিলে একটি নিবেদন করবো মা?’

আমি একরকম ভয়ে ভয়েই বললাম, – ‘কি বল!’

সে বলে কি–‘এখান থেকে একটু দুরেই আমার ঘর! আপনি আমার সাথে এসে আমার আতিথেয়তা স্বীকার করলে আমি ধন্য হই মা! আমার গৃহে আমার স্ত্রী অলকা রয়েছেন! তিনিও ঘরের দ্বারে আপনার পাদপদ্ম দর্শন করার অভিলাষা নিয়ে অপেক্ষা করছেন! আমার সাথে আমার যান্ত্রিক শকট রয়েছে – আপনি যদি অনুমতি দেন, এই দাস নিজে সেই শকট চালিয়ে আপনাকে আপন গৃহে নিয়ে যাবে।’

আমি আবার ভয়ে ভয়ে বললাম, – ‘এত সেবা সেবা করছ কেন! তোমার কোন বদ মতলব নেই তো! এক তো তুমি বাংলা ভাষায় কথা বলছ, আবার বলছ তোমার সাম্রাজ্য! আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না!’

সেই মোটা লোকটা হেসে আবার বলল – মা! আপনি তো সকলের চোখের দিকে তাকিয়েই তার মনের অন্দরের কথা জেনে যান! তা হলে আমার চোখে দেখছেন না কেন? আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কি মনে হচ্ছে আপনার, আমি কি মিথ্যা বলছি?

আমি বললাম, – ‘আমার তো তা মনে হচ্ছে না, তবে…! তবে আমার সাথে এই দুই মেয়েও রয়েছে! এদেরকেও আমার সাথে নিয়ে যেতে হবে!’

সেই মোটা লোক বলে –‘আপনার কথা আমার কাছে নির্দেশ মাতা! যথা আজ্ঞা!’

এই বলে, খালিফা আর অদিতি দুজনের কাছে গিয়ে ওদের চোখের সামনে হাত দিয়ে কি একটা করল! ওরা তারপর কেমন যেন যন্ত্র হয়ে গেল জানিস! পুরো রাস্তাটা আমার সাথে ওরা গেল, ওরা এলো, ওই মোটা লোকের বাড়িতে রইল, কিন্তু একটাও কথা বলল না জানিস!

যমুনা যেন খুব মনঃসংযোগ দিয়ে সবটা শুনছিল। অন্যদিকে গঙ্গার দিক থেকে কোন সাড়াশব্দই নেই। যমুনা বলে উঠলো, ‘এরপর কি হল, বল না মা?’

গৌরী বলতে থাকলো –

লোকটা একটা ছোট্ট সোনার গাড়ির সামনে আমাদের তিনজনকে নিয়ে গেল– হ্যাঁ সোনার! কি সুন্দর দেখতে সে গাড়ি! আমরা গাড়িতে উঠতেই দেখি কি – গাড়িটা উড়তে শুরু করেছে!

কত পাহাড় আর দুটো বড় হ্রদ পেরিয়ে একটা সুন্দর জলাশয়ের কাছে গিয়ে গাড়িটা মাটিতে নামলো। নামতেই দেখি –বিশাল বিশাল দেহধারী কিছু মানুষ যেন আমাদের স্বাগত জানাবার জন্যেই দাড়িয়ে আছে!ওদের মধ্যে বেশ কিছু মহিলাও ছিল।  প্রত্যেকের গা প্রচুর সোনার আর হীরের গয়নায় ভর্তি! সকলকে দেখি সেই মোটা লোকটাকে মাথা নিচু করে প্রণাম করছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার আমার পায়ে পড়ে, গড় করে প্রণাম করছিল জানিস! আমি সব দেখে কিরকম যেন একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলুম – খাব না! এত বড় বড় দৈত্যের মত দেখতে লোকগুলো আমার পায়ে পড়ে যাচ্ছে!

কি সুন্দর সুন্দর বাগান, দীঘি আর সুন্দর সুন্দর গাছ! এমন সুন্দর গাছ আগে কোনদিনও দেখিনি জানিস! সব পেরিয়ে আমায় ওই মোটা লোকটা নিয়ে গেল একটি বিশাল প্রাসাদের মত দেখতে বাড়ির সামনে! সেখানকার ব্যাপার স্যাপার তো পুরো রাজা রাজড়াদের মত! সবাই থালা থেকে ফুল নিয়ে আমাদের মাথায় দিচ্ছিল আর তার সাথে গোলাপ জল ছেটাচ্ছিল! সবাইকে কি বড় বড় দেখতে – লোকগুলোর উচ্চতা কেমন হবে – এই আট নয় ফুট আর মেয়েগুলো ছয় থেকে সাত ফুট হবে!

যমুনা আবার বলে উঠলো, ‘এত বড়!’

‘হ্যাঁ রে!’ গৌরী বলে উঠলো।

আবার গৌরী বলতে শুরু করল –

সবাইকে পেরিয়ে যখন প্রাসাদের দরজার সামনে পৌঁছলুম, একটা সুন্দর দেখতে ভদ্রমহিলা, পুরো দেবীর সাজ সেজে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের দেখে, আমার দিকে এগিয়ে এসে হাতের থালা দিয়ে আমার আরতি করে, আমার সিঁথিতে আর হাতের পলায় সিঁদুর পরিয়ে দিল। তারপর প্রদীপ দিয়ে আরতি করে, একরকমের সুগন্ধি আমার গায়ে ছড়িয়ে শেষে মিষ্টি খাইয়ে জল খাওয়ালো। কি সুন্দর খেতে মিষ্টিটা আর জলটাও! এমন স্বাদের মিষ্টি আর জল কোনদিনও খাইনি!

এইসব হয়ে যাবার পর, আমি ভাবলুম সেই মহিলার এত বয়স, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবো! হ্যাঁ রে, আমার বড়দিদি বেঁচে থাকলে যেমন বয়স হত, তেমন বয়স হবে উনার! কিন্তু দেখি কি জানিস, আরতি করা হয়ে গেলে, সেই মহিলা, একজনের হাতে সেই আরতির থালা ধরিয়ে দিয়ে, আমায় সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল! আমি তো দেখে অবাক! এত বয়সের একজন মহিলা আমাকে কেন যে প্রণাম করল কে জানে! সবার কিরকম এক অদ্ভুত আচরণ তোদের বলে বোঝাতে পারব না! আমাকে ওদের মধ্যে পেয়ে সবারই যেন আনন্দের কোন শেষ নেই! কি যে দেখেছে আমার মধ্যে! আমি যে শিবের বউ– সেটা কি ওরা জানে?কে জানে?সেই জন্যেই কি এত কদর!

উনি আমাদের তিনজনকেই ভিতরে নিয়ে গেল! আমাকে একটা সুন্দর দেখতে লাল শাড়ী পরিয়ে দিল –আর সঙ্গে কত সুন্দর সুন্দর গয়না পরালো! দেখ না এই পায়ের, হাতের আর গলার এই সব গয়না ঊনিই তো আমায় পরিয়ে দিয়েছিল! সাথে এই দেখ কানের আর নাকের পাথরটাও পরিয়ে দিয়েছে! এই কানের আর নাকের গয়নাগুলো নাকি, আমার স্বামী, মানে শিব বাবাজী আমাকে পরানোর জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন! আমার ওগুলো পরে কি আনন্দ যে হয়েছিলো, বলে বোঝাতে পারবো না! আর সবার আগে আমাকে একটা দীঘিতে স্নান করতে দিয়েছিল – সেখানে সোনালী রঙের পদ্মফুল ছিল! দুটো ওরকম বিশাল বিশাল মেয়ে আমাকে কি সব মাটি মাখিয়ে চান করিয়ে দিতে জলে নেমেছিল জানিস!

প্রথমটায় তো আমি ভয়ই পেয়ে গেছিলুম! তারপর দেখলুম, আমায় ওরা বেশ ভালো ভাবেই চান করিয়ে দিল। আর জানিস! চান করানোর পর তারা আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল  – আমি ওদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলুম– তোমরা সকলে আমায় প্রণাম করছো কেন গো?

সেই শুনে, ওই মেয়ে দুটো আমাকে অবাক দৃষ্টিতে দেখে, মাথা নিচু করে চলে গেল! কিছু উত্তরই দিল না!

ওরা আমার ওই মেয়ে দুটোকেও সুন্দর শাড়ী পরিয়ে দিয়েছিল আর কিছু গয়নাও। ওদের সাথে আমার আর ওদের জন্য কিছু গরদের শাড়ীও দিয়ে দিয়েছিল!

শেষে আমাদের কি সুন্দর খাবার খাওয়ালো আর সবের শেষে সকলে আমাকে প্রণাম করল। তারপর ঐ বৈষরাবণ লোকটি আমাদের তিনজনকে সেই গাড়িতে উঠিয়ে, উড়িয়ে নিয়ে, দুটো বিশাল হ্রদের সামনে নামিয়ে দিয়ে প্রণাম করে আমায় কি বলে জানিস! বলে –‘মাতা, এবার অনুমতি দিন! আপনার কনো প্রয়োজন হলে শুধু একবার বৈষ বলে ডাক দেবেন! এই দাস আপনার সেবায় হাজির হয়ে যাবে। ’

এই বলে সে আমার দুটো মেয়ের সামনে গিয়ে আবার চোখের সামনে হাত বুলিয়ে কিছু একটা করল, তারপর মাথা নিচু করে বিদায় নিয়ে চলে গেল।

তারপরে কি দেখি জানিস! দেখি ওই দুই মেয়ে যেন কোথায় হারিয়ে গেছিল–কি একরকম ভাব করে এদিকে সেদিকে ঘুরতে লাগল। আমি কাছে যেতে, আমায় হা করে দেখতে দেখতে বলল– কি সুন্দর লাগছে গো তোমায়!

আমি তো অবাক হয়ে গেলাম! ওই বিদেশিনী বাংলা জানল কি করে! আমি ওকে জিজ্ঞেস করতে ও ওর কাহিনী বলতে শুরু করল। কিন্তু একটা জিনিস তার আগে আমি জানলুম যে ওরা নাকি কিছুই জানে না, যে, কে ওদের নিয়ে গেছিল, কে ওদের স্নান করিয়ে পরিষ্কার করে নতুন কাপড় পরিয়ে দিয়েছে, কে ওদের খাবার দিয়েছে! ওরা সত্যি কিছুই জানে না। আমি তো অবাক হয়ে গেলুম! আমার মনে পরল যে ওই বৈষরাবণ লোকটা ওদের চোখের সামনে হাত নাড়িয়েছিল – বোধ হয় এই কারণেই ওদের কিছু মনে নেই! তাই আমি খুব সংক্ষেপে ওদেরকে বললাম যে কি হয়েছিলো। ওদের বিস্ময়টা অনেক কমে গেল! তবে কি বলতো! ওই বিশাল বিশাল লোকের কথা, সোনার বাগান, সোনার ফুল, উড়ন্ত গাড়ি – এইসবের কনো কথাই ওদের বলিনি! এরপর অদিতি একটু বিশ্রাম নিয়ে ওর কাহানী বলতে শুরু করল, যে কি করে ও বাংলা বলতে আর বুঝতে জানে।

অদিতির বাড়ি সুদূর ইংল্যান্ডে। সেখানের কি একটা জায়গা, … কি নাম বলেছিল … কি একটা ইয়াম! সেখানকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে ও……

এতক্ষণ গঙ্গা পুরোপুরি বেখেয়ালে ছিল আর গৌরীর গায়ের গন্ধের নেশায় মত্ত ছিল। এবার সে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে… হ্যাঁ পৃথিবীতেই ফিরলো সে… এসেই গৌরীর উদ্দেশ্যে বলল, ‘আচ্ছা মা! তোমার এত বড় চুল নিয়ে অসুবিধা হয় না!’

গৌরীও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, যেন এই প্রশ্নটারই অপেক্ষাই করছিল। ও বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ রে! আমার চুলটা একটু কেটে দিবি? চুলটা বড্ড বড় হয়ে গেছে – যেন ডাইনির চুল! একটু ভালো করে খোঁপাও বাঁধা যায় না! দিবি হ্যাঁ রে?’

গঙ্গা বলল, ‘আচ্ছা কাল দেব – ঠিক আছে? তুমি কি গল্প বলছো? আমাকে বলবে না!’

যমুনা এবার অবাক হয়ে বলে উঠলো, ‘কি রে দিদি! তুই শুনছিলি না!’

গঙ্গা উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ …মানে …না… আসলে কোথায় যেন মনটা চলে গেছিলো!’

গৌরী বলল, ‘আমি কিন্তু আবার প্রথম থেকে বলতে পারব না!’ একটু অভিমানী সুরে বলে উঠলো সে। কেমন যেন মনে হল গৌরী চাইছিলো না যে গঙ্গা এই কথাটা শুনুক! তারপর সে, এলিজাবেথের ব্যাপারে আবার বলতে  শুরু করল, মানে অদিতির ব্যাপারে –

অদিতি হল ওর পরিবারের কনিষ্ঠ কন্যা। ওর দুই দিদি ছিল জানিস। বড় দিদি পড়াশুনায় খুব ভালো – তাই সকলের প্রিয় ছিল; মেজ দিদি ছিল মায়াবিনী আর সঙ্গে ভালো অভিনেত্রীও ! সিনেমাতেও নাকি প্রচুর কাজ করেছে! শহরের অধিকাংশ মরদই নাকি তার প্রেমে মগ্ন ছিল। ওদের বাবা নিজের ব্যবসা নিয়েই মত্ত থাকতো আর সময় পেলেই মেজ মেয়ের অভিনয় চর্চা দেখতো–ওর মা নিজে খুব পড়াশুনা ভালোবাসতো – কিন্তু তার বাপের বাড়ির পরিবারের অর্থাভাবের কারনে বেশিদূর পড়াশুনা করতে পারেনি! তাই বড় মেয়ের পড়াশুনা নিয়ে তিনি সর্বদাই ব্যস্ত থাকতেন। আর এলিজাবেথের ওর দুই বোনের মত কোন গুণই ছিল না, ফলে না তো কেউ তাকে দেখতে পারত আর না তো সে কারুর উপর ভরসা করতে পারত!

ওর নাকি একটা ভারতীয়বান্ধবী ছিল! তার কাছেই ও প্রথম শ্রীকৃষ্ণের ছবি দেখেছিল, আর তার কাছ থেকেই প্রথম মহাভারত পেয়ে সেটা পড়েছিল! মেয়ের কি ভাব জানিস না! সেই মহাভারত পরে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তার অন্তরাত্মা এত কাঁদে, যে ভারতে চলে আসে আর এক প্রখ্যাত শ্রীকৃষ্ণের ক্ষেত্রে চলে যায়, শুধু তাঁর সম্বন্ধে বেশী বেশী করে জানবে আর তাকে নিজের জীবনটা অর্পণ করবে বলে!

আসলে ও ভারতে আসার আগে অনেক হিন্দু ধর্মের বই পড়েছিল – সেখানে ও সন্ন্যাস ধর্ম সম্বন্ধে অনেক পড়াশুনা করেছে। ও কি বলে জানিস! বলে – মা (আমায় মা বলেই ডাকতো) জানো! যা বইয়ে পড়েছি, তার সাথে এই প্রতিষ্ঠানের সকলের বাইরের দেখনদারি খুব মেলে – পুরো মিলে যায়! কিন্তু সন্ন্যাসীরা যেভাবে জীবনযাপন করেন, তার সাথে ওদের কোন মিল নেই! এক কথায় বলতে গেলে সম্পূর্ণই উল্টো!

এখানে এসেই তার দুর্দশার শুরু! প্রথমে ওর গায়ের রঙ সাদা দেখে সেই ক্ষেত্রের কর্তৃপক্ষ তাকে নাকি খুব খাতির যত্ন করে! তারপর তাকে নিয়ে যায় ওরই মত দেখতে মহিলাদের কাছে! সেখানে গিয়ে ওর এক পরিচিত মহিলাও পেয়ে যায়! সেই মহিলা ওর কনো স্কুলের বান্ধবীর দিদি! সে ওকে দেখে চিনতেও পারে! প্রথমে ওর খুব খাতির হচ্ছিল – ওকে গেরুয়া কাপড় পরিয়েছিল, বাংলা বলতে শিখিয়েছিল, হিন্দি বলতেও নাকি শিখিয়েছিল! একরাত্রি বেলায় ওই বান্ধবীর দিদি ওর ঘরে আসে!

ওই বান্ধরীর দিদি যখন ওর ঘরে আসে তখন ও ঘুমিয়ে পরেছিল! আসলে ওখানে খুব ভোরে উঠে ভজন-কীর্তন করতে হত তো, তাই। আর পরেরদিন সকাল থেকে ওর সন্ন্যাস ধর্মের শুভারম্ভ হবার কথা ছিল! তাই সেদিন সে তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পরেছিল। দিদির ডাকে সারা দিয়ে যখন উঠে সে দরজা খোলে তখন সেই দিদি ওকে ভিতরে ঠেলে দিয়ে তাড়াতাড়ি করে দরজা বন্ধ করে দেয়!

সেই দিদি ঘরের ভিতরে এসে, ছোট আলো জ্বেলে তাকে বলে – হ্যাঁ রে তুই এখানে কি করছিস! অদিতি বলে ও এসেছে শ্রীকৃষ্ণের কাছে নিজেকে আত্মনিবেদন করতে, কথা শুনে নাকি সেই দিদি খুব হাসে! হেসে বলে – তাই!

তারপর ওই দিদির এলিজাবেথের উপর কেমন যেন এক করুণা হয় আর বলে – তুই কি বহু পুরুষের সাথে সহবাস করতে ভালোবাসিস!

এই অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে অদিতি তো হতবম্ব হয়ে গ্যালো, তখন সেই দিদি তাকে আবার প্রশ্ন করল, আচ্ছা বহু পুরুষ ছার শুধু একটি ছেলের সাথে?

এলিজাবেথ ওখানে গেছিল পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণের কাছে নিজেকে আত্মনিবেদন করতে, শ্রীকৃষ্ণকে আরও ভাল করে জানতে।  স্বভাবতই সে না বলতে, দিদিটা বলে – তাহলে এখান থেকে চলে যা! আজকে ভোর ভোর একটা দল এখান থেকে নেপাল হয়ে তিব্বতে কৈলাসের পথে যাচ্ছে – তাদের সাথে চলে যা!

এলিজাবেথ আবার অবাক হলে সেই দিদি ওকে কি বলে জানিস! শোন তবে, বলে – দেখ এখানে বিদেশিনীরা আর বিদেশীরা আসে বিপুল চোরাই অর্থ নিয়ে! নিজের দেশে সেই অর্থ তো রাখতে পারবে না! এই দেশে কনো অসুবিধা নেই – এই দেশ নাকি ব্রিটিশরা ছেড়ে যাবার আগে নিজেদের শিরদাঁড়াটা বেশ সোজা দেখিয়েছিল! … উমম… ব্রিটিশ চলে যেতেই তার নতুন রূপ বেরিয়েছে! … টাকা দেখলেই সব ভুলে যায়! তাই এখানে সব দেশ বিদেশ থেকে যত চোরাই টাকা আসে আমরা সে সব নিয়ে এসে বসি! বসে সেই টাকা রাখবো কেমন করে?

কোন একটা দেশী ছেলের ঘাড় ভেঙে নিই! তাকে বিয়ে করে, সমস্ত সম্পত্তি তার নামে করে আমাদের কাছেই রেখে দিই! ছেলেটাকেও বাড়ি, গাড়ি, মাসোয়ারা সব দিই! ব্যাস! এবার যা খুশী করগে! তারপর যত ছেলে দরকার নিয়ে নে না! কনো অসুবিধে নেই! পারবি এরকম করতে!

অদিতি মানে এলিজাবেথ বলে, না তো সে এরকম করার কথা ভাবতে পারবে আর না সে কনো সম্পত্তি নিয়ে এখানে এসেছে ! সে তো বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে, শুধু শ্রীকৃষ্ণের স্মরণে থাকবে বলে! সেই শুনে সেই দিদি ওকে বলে – দেখ এইভাবে এখানে বাঁচতে পারবি না, পুরো শেষ হয়ে যাবি। তাই আমার সাথে আয়! আমি তোকে ওই কৈলাস যাত্রীদের দলে ভিড়িয়ে দিচ্ছি!

এই বলে, ওকে ওদের কাছে নিয়ে যায়! মানসসরোবরের কাছে এসে অদিতি কি জানে জানিস! জানে যে ওই দিদি ওকে সব সত্যিই বলেছিল! আর এটাও জানে যে তাকে এতদূর নিয়ে আসা হয়েছে কারণ ওই দিদি এক কোটি টাকার বিনিময়ে অদিতিকে তাদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে বলেই! আর সেই লোকগুলো ওকে এখানে নিয়ে এসেছে কারণ ভিকির কাছে অদিতিকে সাড়ে তিন কোটি টাকায় বিক্রি করবে বলে! এইটুকুনি শুনে, ও পালাতে চেষ্টা করেও পারেনি – ভিকির সঙ্গীরা ওকে ধরে ফেলেছিল! তারপরের ঘটনাতো আমার সামনেই হয়েছে!

কি বলবি বল! কি নৃশংস! তোরা তো অনেক বুঝিস! অনেক জানিস! হ্যাঁ রে, তারা যে ঈশ্বরের নামে এই সব করছে, ধর্মে সইবে! আগামী তিরিশ হাজার বছরের মধ্যে আর কোনদিন মানুষ দেহ নিতে পারবে! হ্যাঁ রে বল না! পারবে?

গঙ্গা যমুনা দুজনেই চুপ করে গেলে দেখে গৌরী কাপড়ের আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছছে। সেই দেখে গঙ্গা বলে উঠলো, ‘কি গো মা! তুমি কাঁদছ?’

গৌরী সেই চোখের জল মুছতে মুছতেই বলল, ‘আসলে কি বলতো, এই জগতের মানুষদের কর্মের মার্গ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে ব্যাসদেব কোনদিনও একদণ্ড বসলোনা, কিন্তু দেখ এই কলিযুগে! মানুষ সেই মধুসূদনের নাম করে কি করে চলেছে!’ একটু থেমে গৌরী আবার বলে উঠলো, ‘কি জানিস তো! কলিরাক্ষস তোদের, লেখাপড়ার নাম করে সমাজে অর্থ, বৈভব আর কামনাকে উচ্চাসন প্রদান করে এমন কাণ্ড করে রেখেছে, যে জগদম্বার কনো ছেলেমেয়ে তার কোলের দিকে যেতেই পারছে না! যার যাবার ইচ্ছা হচ্ছে, তাকে কলির সমাজ এমন চাপ দিচ্ছে, যে সে বাপ বাপ বলে ঈশ্বরকেও গোপনে ডাকে! ঈশ্বরকে কেউ গোপনে ডাকছে দেখলে কলিসমাজে যে সাংসারিকরা রয়েছে, তারা সেই লোকের এমন পিছনে লেগে যায় যে সে শেষে বাধ্য হয় সেই মায়ার জগতে –অর্থাৎ বেশী অর্থের চাকুরী, বাণিজ্য করে বেশী বেশী অর্থ লাভের পথে চলে যেতে! শেষমেশ কি হল জানিস তো – মায়ের কোল সেই ফাঁকাই রয়ে যায়! কি বলতো, এই সব কিছুই হয় না যদি মহেশ্বর বিরক্তি নিয়ে বসে না থাকেন! কিন্তু কে তাঁকে বোঝাবে! যেই ঊমার প্রেমে ব্যথিত হয়েই তিনি বিরক্ত, সেই ঊমাই যে তাঁর বিরক্তিতে সব থেকে বেশী পীড়া পায়!’ এই বলে আবার সে চোখের জল মুছলে, এবার গঙ্গা যেন আর সহ্য করতে পারল না!

সে তার মাকে বুকে জড়িয়ে নিল! যেন নিজেরই কন্যা – অন্য কেউ নয়! বেশ খানিকক্ষণ সে একটা কথাও বলল না, গৌরীকে প্রাণভরে নিজের অন্তরে অনুভব করে পরিতৃপ্ত হলো, তারপর সে বলল, – ‘মা, এর থেকে বেরনোর কি কনো উপায় নেই! কি গো?’

গৌরীর উত্তর এলো। গঙ্গার বুক থেকে মাথা উঠিয়ে বলল সে, ‘একমাত্র যদি এই কলির নাশ হয় তবেই সম্ভব! আসলে কি বলতো ত্রিপুরেশ্বরের বিরক্তির কারণে জগতের অধিকাংশ মানুষ অসুরে পরিণত হয়েছে। কৈলাসনাথ যে বিরক্তিতে শব হয়ে গেছে! তাঁকে আগে শব থেকে শিবে পরিণত করতে হয়, তারপর আনতে হয় প্রলয় – মহাপ্রলয়। যাতে একটা অসুরও জীবিত না থাকতে পারে!’

গঙ্গা উৎকণ্ঠার সাথে বলে উঠলো, ‘কিন্তু এবার মহাদেবের বিরক্তিটা অহেতুক না! এবারে তো আর সতী দেহত্যাগ করেন নি!’

গৌরী বলল–‘গঙ্গা মা, প্রতি দ্বাপরের শেষে এরকমই হতে হয় – জগদম্বার অবতারকে ত্রম্বকেশ্বরের থেকে পৃথক হয়ে যেতে হয় – এটাই নিয়তির লিখন যে!’

গঙ্গার আবার প্রশ্ন, ‘কিন্তু এবারে তারা আলাদা হল কোথায়?’

গৌরী মৃদু হেসে স্নেহ ভরা কণ্ঠে উত্তর দিল, ‘কন্যাকুমারী রূপে যেহেতু কুমারী বেশে বাণাসুরের বধ করতে হবে, তাই সেই বেশে থেকেই যে শিবশক্তি আলাদা হয়ে গেছিল – তাই যে কলিযুগ!’ একটু সময় নিয়ে গৌরী আবার বলল, ‘সেই জন্যেই তো গঙ্গাধরের বিরক্তি আর তার পরিণতি স্বরূপ তিনি হলেন শব!’

গৌরী এবার যমুনার উদ্দেশ্যে বলল, ‘হ্যাঁ যমুনা মা! আজকে কি আর বলব? না… কাল সকালে!’

যমুনা শিশুর মতই এক রকম আবদার করে উঠলো, ‘এই দিদি তোর কি ঘুম পেয়েছে? আমার কিন্তু পায়নি!’

গঙ্গা একটু হেসে গৌরীকে বলল, ‘মা, তোমার ঘুম পায়নি তো! তা হলে বল, শুনতে বড় ইচ্ছা করছে!’

‘বেশ’ বলে গৌরী আবার শুরু করল –

শোন তবে সেদিন আমাদের কত কাণ্ড হয়েছিল! প্রথম তো ওই দুটো বিশাল হ্রদ! বাপরে! কি বিশাল! দেখে মনে হচ্ছিল এক একটা সমুদ্র! ওই দুটোই আসলে মানসসরোবর আর রাক্ষসতাল – চীনাদের ভাষায় ওদের নাম আলাদা কি সব! জানিস ওরা কৈলাসকেও অন্য কি একটা নামে ডাকে! যখন আমরা সেই হ্রদের সামনে এসে পৌঁছেছি, তখন বিকাল হয়ে গেছে। আমরা তিনজনে হ্রদের ধারে একটু দাঁড়িয়ে ছিলাম – ওদের দুজনকে দেখলাম হ্রদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছে। আমিও প্রথমটা উপভোগ করছিলাম জানিস! কি সুন্দর আবহাওয়া! গরম বল বা ঠাণ্ডা –আদপে কোন কিছুই যেন নেই এমনই মনে হচ্ছিল! আশেপাশে কত বরফ – অথচ কোন ঠাণ্ডা নেই! নির্মল নীল আকাশ আর তাতে মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় তুলোর মত মেঘ! দূরে কৈলাসের চূড়া দেখা যাচ্ছিল – পড়ন্ত রোদের ছোঁয়া লেগে যেন আগজ্বলন্ত লোহার রূপ ধরেছে সে !

কিন্তু কি বলতো, হ্রদের সামনে দাঁড়াতেই কি সব মনে হচ্ছিল ! মনে হচ্ছিল যেন আমি আর মহাদেব তার ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছি আর দুটো পবিত্র শ্বেতবর্ণের হাঁস সেই হ্রদে চলে বেড়াচ্ছে! যতবার নিজের মনকে বোঝাবার চেষ্টা করছিলাম যে যা দেখছি, সেটা আমার মনের ভুল, ততবারই সেই জিনিস যেন আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে! শেষে বিরক্ত হয়ে দুই মেয়েকে বললাম যেন আমাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। ওরা যেন আমার কথা মানার জন্যই জন্মেছে – এমন করছিল যেন নিজেদের কনো চাওয়া না-চাওয়া থাকতেই নেই! আমি বলতেই ওরা আমাকে নিয়ে সরে এলো। আমরা তিনজনে কৈলাসের দিকে এগোতে ক’জন পুলিশের মত দেখতে চোখ টেপা লোক আমাদের দিকে এগিয়ে এলো!

আমাদের দিকে তাকিয়ে কি যেন বলল – কিছুই বুঝতে পারলাম না! শেষে তাদের কথা যে আমরা একবর্ণও বুঝতে পারছিনা, সেটা বোধ হয় ওরাও বুঝতে পেরেছিল। তাই একজন ওরকম পুলিশ বেশে থাকা চোখ টেপা মেয়ে এগিয়ে এসে আমাদের আঙ্গুল দেখালো যেখানে কিছু তাঁবু রয়েছে। আর ও হাবে ভাবে বলল – ওখানে রাতটুকু থাকতে, আর কাল সকালে আবার এই পথে যেতে! আমি সামনে এগিয়ে এসে হাবে ভাবে বোঝালাম – আমাদের থাকার তাঁবু নেই! সে বুঝতে পেরে আমাকে উল্টো দিকে একটা জায়গা দেখিয়ে আকার ইঙ্গিত করে বোঝালো – যাতে আমরা ওখানে গিয়ে অপেক্ষা করি! আমরা তিন জনেই লক্ষ্মী মেয়ের মতই ওখানে গিয়ে বসে রইলাম।

সেখানে বসে থাকতে থাকতে ওই পুলিশ মেয়েটির উপর একবার নজর গেল – সেও আমাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল! তার দিকে তাকাতেই সে আবার ইশারা করে বলল, যেন আমরা পাথরটার পিছনে গিয়ে বসি। আমরা তাই করলাম আর প্রায় এক ঘণ্টা বসেছিলুম। এক ঘণ্টা পরে দেখি কি সেই মেয়ে আমাদের কাছে এসেছে। আমি আর খালিফা বাংলা আর হিন্দি বুঝি, কিন্তু অদিতি তো আসলে ইংরেজ! তাই সেই চীনা মহিলা অদিতির সাথেই কথা বলছিল।

মেয়েটা অদিতির সাথে কথা বলে চলে গেলে, আমরা অদিতিকে জিজ্ঞেস করি, যে সে কি বলে গেল। উত্তরে ও বলল  – ওই আমরা কে বা কারা জিজ্ঞেস করছিল! আসলে আমাদের দেখে বুঝেছে যে আমাদের এখানে পৌঁছাবার কোন ছাড়পত্র নেই। চীনা সেনা ধরলে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে, তাই এখানে গা ঢাকতে বলেছিল।

ও আরও বলল – আমি বলেছি যে আমার সাথে কি হয়েছে আর খালিফার সাথে কি হয়েছে। তুমি যে শিব বাবাজীর সাথে দেখা করতে এসেছ, সেটাও ওনাকে বলেছি। উনি বললেন – চীনা সেনা জানলে আমাদের ধরে নিয়ে চলে যাবে। ও তাই আমাদের তিনজনের নাম জেনে গেছে, যাতে আমাদের এখান থেকে ভারতে ফেরত যাবার ছাড়পত্র করে আনতে পারে আর রাত্রিকালে আমাদের কাছে আসবে। এসে আমাদের রাতের অন্ধকারেই অন্য পথ দিয়ে কৈলাসের কাছাকাছি নিয়ে যাবে। সেই দিকটায় নাকি চীনা সেনা পাহারায় থাকেনা – কেউ যায় না! তাই ওদিক থেকে কৈলাসের খুব কাছাকাছি যাওয়া যায়!

তারপর আরও কত কথা বলছিল! যেমন আমার দুই কোলে তোরা দুই বোন শুয়ে থাকিস, ওরাও আমার আমার দুই কোলে শুয়ে পরেছিল। শুয়ে শুয়ে কত কথা বলছিল।

অদিতি বলে কি জানিস! বলে শ্রীকৃষ্ণ কেমন ছিল আমি জানি কিনা! আমি বললাম, তিনি খুব বড় মাপের মানুষ ছিলেন –‘খুব বড় যোগী! অদিতি সেই শুনে বলে – তিনি কর্মযোগী, তাই না!’

আমি বললাম, – ‘হ্যাঁ কর্মযোগী! তিনি আসলে সারা জীবন ধরে কর্মযোগ অভ্যাস করেছেন আর শিখিয়েছেন। ’

সে বলে –‘আচ্ছা কর্ম যোগ আসলে কি… মা!’

আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম –‘এই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে হিন্দুরা শিব বলে। এই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের মায়াকে হিন্দুরা নারায়ণ বলে আর এই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের কল্পনাকারককে হিন্দুরা ব্রহ্মা বলে। ’

ওর খুব আগ্রহ জানিস! ও আরও জানতে চাইল, তাই বললাম – বুদ্ধি দিয়ে বিদ্যা লাভ করা যায় – তাই পরমেশ্বরী বুদ্ধির কাছে বা ব্রহ্মার কাছে সরস্বতী রূপে ধরা দেন। আবার মায়া দ্বারা মানসিক সৌন্দর্য আর ঐশ্বর্য লাভ করা যায় – তাই তিনি নারায়ণের কাছে শ্রী রূপে বিরাজ করেন। আর আদিশক্তিকে সম্পূর্ণরূপে লাভ করতে সর্বস্ব সমর্পণ করতে হয় – তাই এই সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের অর্থাৎ মহাদেবের কাছে আদিশক্তি ধরা দেন। আসলে এই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে পরমেশ্বরীর কল্পের মধ্যে। যেমন তোমার কল্পনায় প্রতিটা চরিত্র আসলে তুমি, তেমন এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটা অণু পরমাণু আসলে বা স্বরূপে তিনিই, তাই আদিশক্তিকে প্রকৃতি বলে হিন্দু।

সকলে এই মহাতত্ব ভুলে রয়েছে স্থান, কাল আর পাত্র, এই তিন মহামায়ার বিস্তারের কারণেই। তাই প্রয়োজন যোগের – মানুষ জীবনের সেই অন্তিম লক্ষ্য, অর্থাৎ স্বরূপে ফিরে যাওয়াকে নিয়মে বাঁধার চেষ্টা করে যোগ বিদ্যার নির্মাণ করেছেন তিনি!

তন্ময় হয়ে দুই মেয়েই সেই কথা শুনছিল! কি পবিত্র ওরা! জাত, জাতি, কুলের কোন চিন্তাই নেই! এত পরিষ্কার মন ওদের – বলে অন্তিম লক্ষ্যে যে পৌঁছে দেবে, তাকেই অনুসরণ করবে। আমি তাই বললুম, সকলেই অন্তিম লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে সক্ষম, কিন্তু কলির দাপটে সকলেই নিজেকে ভুলে রয়েছে! সেই শুনে একই সাথে দুজনে কি বলে জানিস! বলে আমি নাকি ওদের সেই জায়গায় পৌঁছে দিতে পারি! অদিতি বলে, পারলে আমিই নাকি পারি, নাহলে কেউ পারেনা! তাই ও আমার সঙ্গ আর কিছুতেই ছাড়বেনা। খালিফা তো বলেই উঠলো, সে জাত পাল্টে নেবে! আমি উত্তরে বললাম, – ধুর বোকা মেয়ে, জাত থাকবে তবে তো পালটাবি! আর পালটাবিই বা কেন! তুই যেই জাতিতে জন্মেছিস- সেই জাতিও যে খুব পবিত্র! খুবই নিষ্ঠাবান! তবে কেন পালটাবি!

সেই শুনে খালিফা কি বলে জানিস! বলে –‘তাহলে আমি কি হব! আমাকে কেউ জাত জিজ্ঞেস করলে কি বলব!’

আমি হেসে বললাম –‘বলবি, আমি আধ্যাত্মিক জাতির – আমার ধর্ম হল আত্মার অধ্যয়ন করা, বুঝলি!’

ওরা দুজনে বলে –‘হ্যাঁ এটাই ঠিক! এটাই ঠিক! অনেক জাতির নাম ধার নিয়েছি – আর নেব না! সমাজ নিন্দা করবে? ভয় করি না! এক জাতির থাকতেই সমাজ কি নিন্দা করতে বাদ দিয়েছে ? এবার আমরা কোন জাতির নয় – শুধুই আধ্যাত্মিক!’

এই সব হচ্ছিল, তখন অদিতি আবার জিজ্ঞেস করল –‘কর্মযোগ তাহলে কি মা!’

আমি আবার উত্তর দিতে বসে পরলাম –‘যোগ কি তা তো জানলি, এবার যোগের কিছু ধারার কথা বলি শোন! মহামায়ার তিন মায়ার অস্ত্র ভেদ করতে প্রথম যে জিনিস জীবের প্রয়োজন তা হল জ্ঞান! জ্ঞান জীবকে সত্য অসত্য বুঝিয়ে দেয় – বুঝিয়ে দেয় ঈশ্বর সত্য বাকি সব কিছু আড়াল করা সত্য!  এই যে মার্গ একে বলে – জ্ঞানযোগ। এই জ্ঞান লাভের পর – ব্যক্তির সামনে এসে যায় দুটো জিনিস – এক হল সেই সত্যের কাছে সমর্পণ আর দ্বিতীয়টা হল মায়ার কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করে আনা। এই সত্যের কাছে সমর্পণ করার সব থেকে সহজ উপায় হল ভক্তি! একে বলে ভক্তিযোগ! আর মায়ার কবল থেকে মুক্তি পাবার জন্য যেই পথ নেওয়া হয়, তাকে বলে কর্মযোগ!’

অদিতি বলে –‘এই কর্মযোগের পথ ঠিক কি ধরনের মা?’

ওর কথা শোনার ইচ্ছা দেখে আমি আবার বললাম –‘জ্ঞানযোগের মাধ্যমে সমস্ত জ্ঞানলাভ তো ব্যক্তি করেই ফেলে, নিজেকে ভক্তিযোগের মাধ্যমে সমর্পণ করে দেবে সেটাও নিশ্চয় করে, কিন্তু জানো তো তাও মানুষ এগোতে পারে না! কেন জানো – আসক্তির জন্য! জ্ঞান তো এই সেদিন লাভ করল, ভক্তির ইচ্ছাও এই সেদিনই জন্মালো, কিন্তু কোটি কোটি বছর ধরে যে অজ্ঞান অবস্থায়, অভক্ত অবস্থায় বাঁচছিলো, তার কি হবে? অতদিন যে সব কিছুর প্রতি আসক্তি জন্মেছে, তার কি হবে? সেই আসক্তি তাড়ানোর নাম হল কর্মযোগ, বুঝলে!’

অদিতি প্রচুর জানার ইচ্ছা নিয়ে বলল –‘কিন্তু মা!…আসলে মনে একটা কুণ্ঠা জন্মেছে… বলবো?’

আমি হেসে বলতে বললে, সে বলে –‘আরাধ্যের সম্বন্ধে মনে প্রশ্ন জাগলে কি তাঁকে অপমান করা হয়!’

আমি ওকে আরো বললাম, – ‘মা…রে! আরাধ্যকে সম্পূর্ণ স্বীকার করে নেওয়া ভক্তের কর্ম! আর কাউকে সম্পূর্ণ স্বীকার করে নিতে হলে যে তার ক্রিয়াকাণ্ড বুঝতেই হয়! সেখানে দোষ কি! আসলে কি বলতো! (মনে আছে এখান থেকেই আমি ওদেরকে তুই বলি) একই প্রশ্নের দুই প্রকার মানে হয়, দুই প্রকার আবেগ দিয়ে একই শব্দ ব্যবহার করলেও তাই হয়! যেমন ধর – ‘তুমি ওটা কেন করলে!’ এই প্রশ্নটাই যখন নরম সুরে বলা হয়, তখন হল তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করা। আবার সেই একই প্রশ্ন যখন উত্তেজিত ভাবে করা হয়, তখন কনো কাজের জবাব চাওয়া! জ্ঞান লাভের জন্য প্রশ্ন কখনই তাঁকে অপমান করা নয়, বরং তাঁকে সম্মান দেওয়া, উল্টো দিকে জবাব চাইবার মত করে প্রশ্ন অবশ্যই তাঁকে অপমান করা।

আবার ভক্তের ভগবানের উপর অধিকার থাকে, সেই জায়গায় দাড়িয়েও ভগবানের কাছে সে জবাব চাইতে যায়। রেগে মেগেই চায়! যেমন ধর ‘আমায় তুমি দেখা দেবেনা, তাই তো?’, বা ধর ‘এই কাজটা তুমি করতে পারলে!’ কিন্তু ভগবান ভক্তের এই আচরণে মনে ব্যথা পেলেও কিছু বলেন না, কেন জানিস? কারণ তিনি জানেন এই ভক্ত তাঁকে ভালোবাসে আর ভালবাসায় সে অন্ধ হয়ে গেছে! ভক্ত তখন এই ভাবছে যে তার ইচ্ছাতেই জগত চলবে, ভগবানের ইচ্ছায় নয়! তখন ভগবান সেই ভক্তকে কাছে টেনে নিয়ে বোঝায়, যাতে তার ভক্তি হানিকারক না হয়ে যায়! কেমন বলতো! এই রাবণের মতন! রাবণের ভক্তি সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছিল – মহেশ্বর তাকে বার বার বুঝিয়েছিল, যেন সে কর্তা না হয়ে ওঠে – কিন্তু কে কার কথা শোনে! দেখ রাবণের কি হল!’

অদিতি সেই শুনে বলল, – ‘আসলে মা আমার একটা প্রশ্ন জন্মেছে। প্রশ্নটা হল এই যে, শ্রীকৃষ্ণ সারাটা জীবন অনাসক্তি অভ্যাস করলেন, কিন্তু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তিনি সাফল্য লাভের জন্য কপটতার আশ্রয় নিলেন কেন?’

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6