বিসর্জনে কৈলাস | রোমাঞ্চ উপন্যাস

এবার আর ওর চোখের জল পুরুষ মানুষের বাঁধও মানল না। দুচোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছিল ওর। আর অবাক দৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হিন্দিতে বলল, এত করুণা আপনার! আমার হয়রানি হয়েছে ভেবে আপনার চোখে জল! সত্যি বলছি মাতাজি – আমি আর হিন্দুও নই, মুসলমানও নই, আমি আপনার দাস হয়ে রইলুম! আপনি যেমনটা বলবেন – তেমনটা করব! আমাকে দয়া করে ছেড়ে যাবেন না, মাতাজি! এত ভালোবাসা, আমি কখনো দেখিনি, কখনো শুনিনি! এত করুণা দেখে, মাতাজি আমার একটাই লোভ জেগেছে – আমি আপনার দাস হয়ে সারা জীবন থাকবো! কি হবে তাতে জানি না! কি পাব তাতে, তাও জানতে চাই না! কিন্তু কিছু না পেলেও এই ভালোবাসা তো পাব! এটা আর কোথাও পাব না, মাতাজি! আমায় কথা দিন, আপনি যেখানে যাবেন সেখানে আমায় নিয়ে যাবেন!

আমি এবার রাগ দেখিয়েই বললাম, এরকম করলে কিন্তু আমি চলে যাব! ও আবার বলল, নেহি মাতাজি, এরকম বলবেন না! আপনি আমায় যা সাজা দেবেন দিন – এই অভাগাটাকে ফেলে চলে যাবেন না! আমি বললাম, আচ্ছা হয়েছে ওঠ! ও আবার বলে উঠল, আপনি যেখানে যাবেন, আমায় নিয়ে যাবেন তো! কথা দিলেন তো! আমি এবারে বললাম, দেখ, আমি তো কৈলাস যাব এখন – সেখানে তো তুমি যেতে পারবে না – কারণ ভারতীয় নয় বলে তোমায় যেতে দেবে না! সেখান থেকে ফিরে ঠিক সময়ে আমি তোমায় ডেকে নেব!

সে ছেলের কি অদ্ভুত বিশ্বাস গো গঙ্গা, জানো না! আমায় একবার জিজ্ঞেসও করল না, আমি তাকে কিভাবে খবর দিয়ে ডাকবো! আমি বললাম ডেকে নেব – আর সে যেন অবিচল ভাবে বিশ্বাস করে নিল – আমি ঠিক ডেকে নেব!

রবার আমার জন্য একটা তাঁবু ঠিক করেছিল। সেই তাবুতে নিয়ে গিয়ে সেইখানে রাতটা থাকতে বলল। ও বলল, পরের দিন ভোর চারটের সময়ে আবার রওনা দেবে। ফিরে গিয়ে আমার কৈলাস যাত্রার ব্যবস্থা করবে ও। আমি শুয়ে পরলুম প্রথমে। একটুখানি শুয়েই মনে হল, আচ্ছা রবার কোথায় শোবে? তাঁবুর মধ্যে দেখতে না পেয়ে বাইরে বেরুতে গেলাম – দেখি কত লোক, সব একাকটা তাবুতে। রবারকে দেখতে পেলাম না – কিন্তু কয়েক জন মহিলা এসে জিজ্ঞেস করল, ‘দেখে বাঙ্গালী বাঙ্গালী মনে হচ্ছে – কোথা থেকে?’ আমি যাহোক করে উত্তর দিয়ে এড়িয়ে যাবার জন্য বললাম, কলকাতা? কিন্তু তারা বাপু গল্প করার ছন্দে ছিল – বলে ঠাণ্ডা লাগছে না – একটা কাপড় জড়িয়ে রইছো যে বড়? তো এত ছোট বয়সে? কি ব্যাপার?

কত প্রশ্ন জানো না? বিরক্ত লাগে? কোন কাজ নেই, শুধু ঘুরে বেড়ায় আর সবাইকে বিরক্ত করে – আমি এমনিই রবারকে দেখতে পাচ্ছি না বলে চিন্তা করছি! শেষে ওদের থেকে বাঁচতে রবারকে ডাকতে ডাকতে চলে যাচ্ছিলাম! ওরা আমার বরকে খুঁজছি ভেবে মুখ টিপে হেসে চলে যাচ্ছিল – উল্টো দিক থেকে রবারের গলা শুনতে পেলাম! …মাতাজি… মাতাজি… ওকে দেখে একটু স্বস্তি পেলাম… আর এদের মুখ দেখে খুব মজা হল – এইটুকু মেয়ের অত বড় ছেলে দেখে, ধরে নিয়েছিল আমি সাধু টাধু… তাই কেরকম ভয়ে ভয়ে চলে গেল…

এই বলে গৌরীর কি খিল খিল করে হাসি!

’তুমি সংসারীদের কেন সহ্য করতে পার না বলতো?’ – গঙ্গার প্রশ্ন। গৌরী বলতে থাকলো, ‘আসলে এদের চাল, চুলো, ভিত্তি কিচ্ছু নেই, তাই এরা রইল বা না-রইল, তাতে কিছু এসে যায় নাকি!’

‘কিন্তু মা’, গঙ্গা বলতে থাকলো, ‘এরা নাকি শত ভুল করলেও মানুষ শরীর ঠিকই পেয়ে যায়!’

‘আরে ওরা তো মানব শরীর এমনিই পায় না!’গৌরী বলতে থাকলো, ‘কলি যুগের অপেক্ষায় বসে থাকে! কেউ কেউ কলিতে দেহ পেয়ে কিছু ভালো কাজ করে এগিয়ে যায়! বাকিরা যে তিমিরে, সে তিমিরেই পরে থাকে! আবার কুকুর, বেড়াল, ইঁদুর, ছুঁচো হয়ে দিন কাটায় – এসব হয়ে তো মায়া কাটানো খুব কঠিন! তাই না!’

‘কেন? এদের তো আমাদের মত সংসার নেই?’ গঙ্গা বলল, ‘তাহলে এদের ক্ষেত্রে কঠিন কেন  সংসারের মায়া কাটানো ?’

গৌরী এবার হাসতে হাসতে বলল, ‘ওরে বোকা মেয়ে! এটা কে বলেছে তোকে যে সংসার তৈরি করা হয় মায়াতে বদ্ধ করতে – হ্যাঁ! সংসার তো তৈরিই করা হয়েছে, যাতে মানুষ মায়া কাটাতে পারে! কি বলতো, বিশাল বড় গারদের পিছনে ভিড়ে মিশে থাকলে কি আর গারদে আছি মনে হয়! আর গারদ বলে মনে না হলে কি আর সেই গারদ ভেঙে বেড়িয়ে আসতে ইচ্ছা হয়!’ এই বলে গৌরীর আবার খিল খিল করে হাসি!

সেই দেখে, গঙ্গা গৌরীর ঘাড়ে মাথা গুঁজে ছিল, সেখান থেকে মুখ তুলে নিয়ে বলল, ‘এর মানেটা ঠিক বুঝলাম না মা!’ গৌরী এবার বুঝিয়ে দেবে বলে, ভালো করে বলতে থাকলো, ‘দেখ, এই জগতটাও একটা মায়ার গারদ – এই গারদে হাতি, গাছ, মাছ, সাপ, বাঘ, সিংহ, কুকুর, নেকড়ে, বিড়াল, শিয়াল, ইঁদুর, ছুঁচো, মানুষ, বানর, গরু, ছাগল এমন কি পোকামাকড়ও রয়েছে! এই ভিড়ের মধ্যে কি এই গারদটাকে গারদ মনে হয়?’ গঙ্গা বলল ‘না! এটা তো ভালো লাগে!’

গৌরী আবার বলল, ‘এইটাই তো বলছিলুম! মানুষ সংসার বানিয়েছে যাতে সেই গারদটাকে কাছ থেকে দেখা যায়! তবেই না, গারদটা থেকে বেরুতে মন চাইবে! কি বল?’ গৌরী গঙ্গার উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলতে থাকলো, ‘আর এই – যাদেরকে সংসারী বললি তুই তাদেরকেই দেখ! এই গারদে থেকে, গারদটাকেই জীবন বানিয়ে ফেলেছে!’

এই বলে আবার খিল খিল করে হাসতে হাসতে গৌরী বলল, ‘আসলে এদের এখনো গতি হবার সময় হয়নি! তাই! এরা মানুষ রূপ না ধরলেও যতটা আর যেমনটা ঈশ্বরকে ডাকে, মানুষ হলেও তেমনটাই! এঁদের কোন খবরই নেই যে ঈশ্বর তাদের অন্তরেই রয়েছে – মন্দিরে মাথা ঠুকলেই হল! বাপু, কর্মে মন দিতে হয়! কর্মের আগে চিন্তনে মন দিতে হয়! চিন্তনের আগে সত্যকে আঁকড়ে ধরতে হয় আর সত্যকে আঁকড়ে ধরার আগে চেতনাকে জাগাতে হয়! চেতনা জানিস তারই জাগ্রত হয়, যে এই সংসারে থাকুক আর না থাকুক, সাংসারিক কোন কিছুতেই মন লাগে না! আর যারই দেখবি সংসারের বাইরে কিছু ভাবতেই মন কেঁপে ওঠে, তাদেরকে শিবও করুণার পাত্র জ্ঞান করে – পুরো কলিটা মানুষ করে ফেলে রেখে দেয় – তাও এদের কিছুই হয় না!’ আবার খিল খিল করে হাসি!

গঙ্গা এবার বলল, ‘তাহলে কি সংসার করা উচিত!’

গৌরী বলে উঠল, ‘উচিত বইকি! ধর্ম স্থাপনের সেপাই হিসাবে অনেককে লাগে – তাদের ঈশ্বর বর বা বউ জোটায়ই না – ভিতরে ভিতরে দেখা দিয়ে আদেশ দিয়ে দেয় – আয় সংসার ছেড়ে চলে আয়। যাদের সেই আদেশ আসে না – তাদের সবার সংসার করা উচিত! সবার! সংসারে থেকে এই মায়ার গারদটাকে কাছ থেকে দেখা যায়! তবেই না সত্যকে জানবে! কারুর কারুর সত্যকে পুরপুরি জানার আগেই চেতনা জেগে ওঠে। তারা আবার কি বলে জানিস – আর বিয়ে করবে না! ব্যাস! শেষ! ওখানেই শেষ! বিয়েও করল না, পুরো সত্য জানাও হল না আর চেতনা জাগরণও পুরো হল না – আনন্দ পাবে কি করে! সব শেষ! সংসারে থেকে মায়াকে জেনে নিলে – সংসারে থাকতে থাকতেই সব মায়া কেটে যায়! তখন বাইরে লোক দেখে বলে, আহারে বউটা মরে গেল! কিন্তু সেই লোক জেনে যায় – আমার বাঁধন ছিঁড়ে গেল! এবার আমি যাব চেতনা সাগরে!’ আবার খিল খিল করে হাসি গৌরীর।

যমুনা এতক্ষণ সব শুনছিল। এবার উঠে গিয়ে রান্নাঘরে, গোবিন্দভোগ চাল আলু দিয়ে বসিয়ে চলে এলো – দিদিকে এসে বলল, ‘পনেরো মিনিট পরে গেলেই হবে তো দিদি!’ গঙ্গা ঠিক নজর দেয়নি যে যমুনা উঠে গিয়ে চাল চাপিয়ে দিয়ে এসেছে। সে আসলে গৌরীর কথায় এক অদ্ভুত ঘোরে চলে গেছে – সবটা তো বোঝেনি ও, কিন্তু যতটা বুঝেছে তাতেই মাথা যেন বন বন করে ঘুরছে! একটু প্রকৃতিস্থ হয়ে যমুনার কথায় প্রায় যন্ত্রের মতই সায় দিল। গঙ্গা এবার প্রায় অভিযোগের সুরেই বলল, ‘তাহলে সমাজ যে এই সকল মানুষকে ভক্ত বলে, মা!’

গৌরী একরকম রাগ দেখিয়েই উত্তর দিল, ‘সমাজ! এখন যে সমাজ রয়েছে! এই সমাজ কি শিবের গড়া নাকি? এটা তো ওই কলিযুগে মানুষ হয়ে ওঠা জীবগুলোরই তৈরি! শিব সমাজ গড়েছিল – চার চারটি ঘোড়া দিয়ে – সেই রথে কত বৈভব! কত অস্ত্র! কত শক্তি! কত তেজ! রথে আসীন হয়েছিল নিজে আর সারথি করেছিল আদি মাতার অবতারকে – মহাভারত দেখিসনি!’

‘ওর সাথে সমাজের কি সম্পর্ক!’ গঙ্গা বলে উঠল উদ্বিগ্ন কণ্ঠে!

‘ওরে ওটাই তো সমাজ! চারটে ঘোড়া হল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। যখন এই চারজন এক সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলে, তখন সদাশিব অর্জুন তাতে আসীন হয়ে তার শোভা বাড়ায়! আর আদি মাতা কৃষ্ণ বেশে তার সারথি হয়ে, সেই সমাজকে গতি ও দিশা দেয়’। গৌরী আবার বলল, ‘যেই সমাজকে আধ্যাত্ম পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় সেই সমাজই তো প্রকৃত সমাজ! বুঝলি! আর আধ্যাত্মের মাহাত্ম কোথায়, যদি সে সমাজের প্রতিটা জীবকে চেতনা সাগরে ডুবিয়ে শুদ্ধ না করতে পারে! আজকে আবার সমাজ বলে কিছু আছে নাকি! এখানে আধ্যাত্মের নামে খালি লক্ষ্মীর তছরুপ চলছে, আর তারা নাকি আবার সমাজ চালাবে! সমাজেও একই অবস্থা – সবাইকে অচেতনতার সাগরে ডুবিয়ে অসুরে পরিণত করছে!’

যমুনার ডাক এলো এবার, ‘দিদি চলে আয় – ভাত হয়ে গেছে!’

গৌরীকে নিয়ে গঙ্গা রান্না ঘরের সামনের দেউলে উঠে গেল।

খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে এবার বিছানা করার সময় – আজ শুধু যমুনাও নয়, গঙ্গারও খুব ইচ্ছা গৌরীর কাছেই শোয়া। সকালে উঠতে হবে, সব কাজ করতে হবে, ওসব কিছু মাথাতেই আসছেনা ওর। কিন্তু কি করে বলবে! অত সাত পাঁচ চিন্তা না করে সোজাসুজি সে গৌরীকে বলে দিল, ‘মা, আজ কিন্তু আমি তোমার কাছেই শোব!’ গৌরী হেসে সম্মতি দিলেও যেন গঙ্গার মন ভরল না। সে আবার বলল, ‘আজ থেকে আমি রোজ তোমার কাছেই শোব!’ গৌরী এবারে হেসে বলল, ‘হ্যাঁ বাবা হ্যাঁ, পাগলী মেয়ে আমার!’

একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করা গেল – গৌরীর প্রতি গঙ্গার বিশ্বাসটা দেরী করে এলেও, সেটা গভীরতম স্থানে যেতে খুব বেশী সময় লাগল না। কিন্তু যমুনা যতই সরল হোক না কেন, ও কিন্তু অতটাও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে ওঠেনি – যতটা গঙ্গা হয়েছে। বোধ হয় গঙ্গার মত মানুষেরা সরলতাটাকে গভীর তলদেশে সযত্নে লুকিয়ে রেখে দেয় – যাতে কেউ খবর না পায়। কিন্তু যমুনার মত মানুষেরা যা আছে, তাই উপরে রেখে দেয়! না হলে, এই বৈষম্যের কিই বা ব্যাখ্যা হতে পারে!

বিছানা হয়ে গেল – যমুনা একদম শেষে উঠবে, তাই দেওয়ালের দিকে চলে গেলে, মশারীর মধ্যে ঢুকে, গৌরী মাঝখানে শুয়ে পড়ল আর গঙ্গা একদম ধারে রইল! যমুনা আজকে কিন্তু গৌরীকে জড়িয়ে শুলো না, কিন্তু একটা হাত গৌরীর গায়ে রেখে বলল, ‘অমরনাথ থেকে ফেরার গল্প বল’। তবে সে শুয়ে শুয়ে গৌরীর গায়ের সুন্দর গন্ধের মজা নিতে থাকল। অন্যদিকে গঙ্গা আজ একেবারে বাচ্চা মেয়ে হয়ে গেছে। সে গৌরীকে এক রকম জাপটে ধরে রইল। গৌরীর গায়ের মিষ্টি শিউলি ফুলের গন্ধের সাথে আজ তার মাথার জুঁইয়ের গন্ধ মিশে গেছে। সব মিলে এক অপূর্ব শোভা তৈরি করেছে। তার সাথে, ঘরের যে নীল আলোটা জ্বলছে, সেটাতে গৌরীকে মনে হচ্ছে এক নীল পদ্ম। গায়ের সাদা ধবধবে রঙ যেন সেই নীল রঙের ছটা লেগে একটা পূর্ণিমার আকাশ নির্মাণ করেছে। যমুনা দেখতে পাচ্ছে কিনা জানে না, তবে গঙ্গার মনে হতে থাকলো গৌরীর অঙ্গ থেকে যেন এক দিব্য নীল আভা বের হচ্ছে – ঠিক যেমনটা আকাশের রং হয় পূর্ণিমার চাঁদের আলো পরলে, তেমন। তার সাথে জুঁই আর শিউলির গন্ধ – সব মিলিয়ে গঙ্গার মনে হচ্ছিল – যেন সে মাকে জড়িয়ে গঙ্গার ধারেই শুয়ে রয়েছে।

গৌরীর গরম লাগে বলে, পূর্ব দিকের একটা জানলা খোলা ছিল – তার থেকে হালকা বাতাস এসে লাগছিল ওদের গায়ে। সেই হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে লাগতে, গঙ্গার পুরোপুরি মনে হচ্ছিল যেন নদীর পাশে শুয়ে রয়েছে সে। আর যতই সেই ভাব বেশী হতে থাকলো, ততই সে গৌরীকে বেশী করে বেষ্টন করতে লাগল! গৌরীও গঙ্গাকে নিজের কাছে জড়িয়ে রেখেছে। গৌরীর কেমন লাগছে ঠিক বলা যাবে না, তবে গৌরীর অঙ্গ থেকে একটা হালকা উষ্মা গঙ্গা অনুভব করছিল। সেই উষ্মাতে গঙ্গা সমানে মজে উঠছিল! ওর খালি মনে হচ্ছে – কি যেন এক অপ্রতিভ পবিত্রতা ওকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে – আর সে যত বেশী গৌরীর কাছে যাচ্ছে, ততই সেই পবিত্রতা যেন তাকে বেষ্টন করে রয়েছে।  একসময় গঙ্গার মনে হল যেন নিজের শরীরের চাপে গৌরীকে বড় ব্যথা দিয়ে ফেলছে– তাই একটু হালকা হল – তবে সেটা বড়ই হালকা, যেন ছেড়ে আসার কোন ইচ্ছাই নেই ওর মনে। গঙ্গা গল্পের কথা মনে করে দেবার জন্য, বলল, ‘তা তোমার রবার, তোমাকে একা ফেলে রেখে কোথায় চলে গেছিল?’

গৌরী এবার বলতে শুরু করল ওর অমরনাথ থেকে ফেরার গল্প –‘সে কোথাও যায়নি, রাত্রের খাবার আর একটু বাবার প্রসাদ নিয়ে আসতে গেছিল। আমরা দুজনেই খেয়ে নিতে ও বলল আমাকে তাঁবুর ভিতর গিয়ে শুয়ে পরতে। আমি বললাম, না আমি আজ আর ঘুমাব না, বাকি রাতটা শিবের নাম জপ করব। তোমার ঠাণ্ডা লাগছে – তুমি তাঁবুর মধ্যে শুয়ে ঘুমাও, আমি পাশে বসে বসে জপ করব!

সেই কথা শুনে, সে দেখলুম কোন না করল না। শুধু মুচকি হেসে প্রথমে ওই পাশ ফিরে শুয়ে পরল। আবার খানিক পরে দেখি তার মাথাটা ঝুলে গেছে। সেই দেখে, ওর মাথা কোলে নিয়ে নিলুম – সে দেখি কোলের গরমটা পেয়ে বেশ সুন্দর করে ঘুমাচ্ছে! আমার সেদিন রাত্রে জপ কতক্ষণ করেছি মনে নেই, ধ্যান হয়ে গেছিল – ধ্যানে কত কিছু দেখলুম! যেন কত জন্মের গল্প দেখলুম! চোখ খুললাম অনেকক্ষণ পরে। ঠিক বুঝতে পারছিলুম না, কটা বাজে। মনে পড়ল, রবারের হাতে ঘড়ি আছে। সেটায় দেখি তিনটে পঞ্চাশ বাজে। আমি রবারকে ডাকলুম। সে ধরমর করে উঠে পরে, ঘড়ির দিকে দেখে হিন্দিতে বলল, চলুন মাতাজি আমাদের এবার যেতে হবে!

তাঁবু ছেড়ে আমরা দুটিতে রাতের অন্ধকারেই বেরুলাম। রবারের যেন নিশাচরের চোখ – চাঁদের আলো পড়ছিল – কিন্তু তাও অন্ধকার বেশ ভালই। সে দেখি, ঠিক রাস্তা খুঁজে এগিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে দেখে নিচ্ছে – আমি ঠিক আসছি কিনা। আমরা আর কোথাও দাঁড়াইনি। তাই সকাল সাতটার মধ্যে বরারির জঙ্গলে ঢুকে পরি। হালকা হালকা দিনের আলো দেখতে পাচ্ছিলুম – ভোরের আলোয় জঙ্গলটা কি সুন্দর দেখাচ্ছিল! সেই একই ভাবে সাপ খোপ, বন্য পশুর খপ্পর থেকে বেঁচে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেগে গেল জঙ্গল পেরোতে! ঠিক যখন বনটা পেরিয়ে বাইরে বেরুব, তখন কিছু হাঁক ডাক শুনে আমরা দাঁড়িয়ে পরলাম।

দেখি কি জানিস! এক পাল হরিণ, সবার মাথায় সেই হরিণটা, যাকে যাবার সময়ে আদর করেছিলুম! রবার দেখলাম ভয় পেয়ে গেল! আমি ওকে হিন্দিতে বললাম, ভয়ের কিছু নেই – ওদের বন্ধু ওদের খবর দিয়েছে যে ও আদর খেয়েছে। তাই পুরো দলবল এসেছে আদর খেতে! আমি এগিয়ে গেলুম দেখে রবারও বাধ্য হয়ে আমার পিছু পিছু এগিয়ে গেল, যদি কোন বিপদ হয়! কিন্তু যেমনটা ভেবেছিলাম তেমনটাই! প্রায় গোটা দশেক হরিণ আমাকে ঘিরে ধরে নিজেদের গা ঘষতে আরম্ভ করল! সে কি আদর জানিস না! কেউ কেউ আবার গা থেকে মুখ উঠিয়ে নিয়ে আমার মুখের কাছে নিজের মুখ নিয়ে চলে আসে! ঈশ কি ইচ্ছে হচ্ছিল সেদিন, যদি দশভুজা হতাম, সকল কে এক সাথে আদর করতে পারতুম!

প্রায় আটটা বাজে বাজে, রবার বলে উঠল, মাতাজি আটটা বাজতে চলল– এবারে কিন্তু বন্য পশুগুলো বেড়িয়ে পরবে! আমাদের তো ছেড়ে দিন, এই হরিণগুলোও মারা পরবে। জানিস, হরিণগুলো এত বেশী করে জড়িয়ে ছিল, যেন ওদের কনো ভয়ই নেই – ওরা শুধু আদর খাবে! ওদের বিপদ হতে পারে ভেবে একটার মুখ হাতে করে ধরে, তার কানে কানে বললাম, এবার যাও, না হলে বিপদ হবে! সে জানিস, মনে হয় কান খাড়া করে শুনল কথাটা আর তারপর সকলের কাছে গিয়ে গিয়ে যেন ওই কথাটা বলল! নাহলে কেনই বা সকলে এরকম পথ ছেড়ে দিল! আমরা চলে আসছিলুম! কি মনে হল একবার পিছন ফিরে দেখলুম! দেখি একটা হরিণও সেখান থেকে যায়নি! দাঁড়িয়ে আছে আর অপলক দৃষ্টিতে আমাদের দেখছে! ঘাড়টা ঘুরিয়ে সামনে দেখতে যাব, অমনি দেখি কি! যেই হরিণটার সাথে প্রথমে আলাপ, সেইটা লাফিয়ে লাফিয়ে কাছে এগিয়ে এলো! আমি এবারে ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আদর করি – জানিস আমি স্পষ্ট দেখেছি – রবারও দেখেছে – ওকে যখন ছেড়ে আসছি – ওর চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল!

যখন আমরা বালতাল ফিরছি তখন রবার চা খেতে খেতে বলেছিল – সে দেখেছে ওর চোখে জল। সে হিন্দিতে আরও বলল, – মাতাজি আপনার ভালোবাসা বিলানোর যেন এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে – সেই জন্যেই হরিণগুলো এরকম করল! না হলে, এই জঙ্গলে লোকে সাপ আর লেপডের থেকেও এই হরিণগুলোকে বেশী ভয় পায়! এরা নাকি মানুষ দেখলেই গুঁতিয়ে দেয় – আর দেখলেন তো কি বড় বড় শিং– গোঁতালেই পেট এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায়!  ও আরও বলল – মাতাজি, আমি তো প্রথমে খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম, কিন্তু পরে সবটা দেখে আমি তো অবাক! আমি ফিরে গিয়ে সবাইকে বলব এই কথা। ভালবাসতে পারলে সবাই ঠাণ্ডা হয়ে যায়, এটা সবার জানা খুব দরকার, মাতাজি, আপনি কি বলেন!

ওর এইসব কথা আমি শুনে হাসলাম, কিন্তু মনটা সেই কৈলাসেই পরেছিল! রবার মনের কথাটা বুঝে গেল। তাই বালতালের থেকে যখন চড়াই উতরাই পথ ধরে নামছি, তখন ও বলল, – আপনি চিন্তা করবেন না! আপনার কৈলাস যাবার সব ব্যবস্থা আমি করে দেব। ’

যমুনা অনেকক্ষণ হয়েছে ঘুমিয়ে পরেছে। এতক্ষণ গঙ্গা একাই শুনছিল। এবারে সে বলে উঠল, ‘মা আজকে আর চোখ খুলে রাখতে পারছি না! বড় ইচ্ছা করছে পুরোটা শুনতে, কিন্তু…!’

গৌরী ওকে থামিয়ে দিয়েই বলল, ‘না … না, ঘুমিয়ে পর… তোর সকালে উঠে অনেক কাজ থাকে… আর গল্পের এখনও অনেক বাকি …… সারা রাত্রি শুনলেও শেষ হবে না মা…… ঘুমিয়ে পর’

‘মা … একটু পিঠটা হাত বুলিয়ে দাও না – আমার মা দিত জানো…’ ছোট মেয়ের মতই আবদার করে উঠলো গঙ্গা।

মুচকি হেসে, গৌরী বলল, ‘ও তাই… ফের দেখি… দেখ দেখিনি কোন মা বেশী ভালো পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়!’

গঙ্গা বেশ কিছুক্ষণ সেই হাত বুলানো অনুভব করল আর ভাবল – ওর মা খানিকক্ষণ দেওয়া হয়ে গেলেই একবার পিঠ চাপড়ে দেখে নিত, মেয়ে ঘুমল কি না… কিন্তু সত্যি এই মা যেন নিজের মায়ের থেকেও বেশী আপন …… কতক্ষণ হয়ে গেল হাত বুলিয়ে দিচ্ছে… একবারও বিরক্তি নেই…! তবে এই ভাবনা আর বেশিক্ষণ ভাবতে পারল না গঙ্গা…… কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমের কোলে জড়িয়ে পরল সে।

ভোরবেলায় গঙ্গা উঠে পরল। সারা গ্রামের প্রথম সে ওঠে – এই তিনটে তিরিশ নাগাদ। জেলেরা, ক্ষেতিরা চারটে থেকে সারে চারটের মধ্যে এসে যায় – তারপর যে যার কাজে যায়। ছটা তিরিশের মধ্যে ক্ষেতি, জেলেরা হাট ঘুরে এসে যা রোজগার হয় সব গঙ্গার হাতে দিয়ে দেয়। গঙ্গা সেটা নিয়ে, অঙ্ক কষে, যাকে যা দেওয়ার দিয়ে, লভ্যাংশ নিজের কাছে রেখে দেয়। জেলে, খেতমজুর সকলেই বয়স্ক– অনেকদিন ধরে গঙ্গার কাছে তারা কাজ করে। খুব বিশ্বস্ত – শুধু তাই নয়, গঙ্গাকে নিজের ঘরের মেয়ের মতই স্নেহ করে। গঙ্গাও তাদের স্নেহ করে খুব। প্রয়োজনের থেকে একটুও বেশী রাখে না নিজের জন্য।

যমুনা মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করলে, গঙ্গা বলে – ‘কি হবে বেশী রেখে! ওরা খেটে খাওয়া মানুষ! কাল ঘাম ছুটিয়ে গরমে ঠাণ্ডায় ক্ষেতে গিয়ে, জলে নেমে কাজ করে! সবার অভাব তো মেটাতে পারবনা! কিন্তু যে কজন আমার কাছে কাজ করছে – সে কজন যেন সুখে থাকে, সেই চেষ্টাটা অন্তত করি! কি বল!’ যমুনা এই উত্তরটা এতবার পেয়েছে, যে ওর মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু এই উত্তরটা খুব ভালো লাগে ওর– তাই মাঝে মাঝেই সে এই প্রশ্নটা তার দিদিকে করে থাকে।

আজকে গঙ্গা নিজের মত উঠে কলঘরের দিকে গিয়ে দ্যাখে, গ্রামের প্রথম জেগে ওঠা মানুষ সে আজ আর নেই – গৌরী বেরিয়ে আসলো কলঘর থেকে – স্নান, প্রাতঃক্রিয়া সেরে পরিষ্কার কাপড় পরে। গায়ের শিউলি ফুলের গন্ধটা এখন আর অল্প নেই! খুব স্পষ্ট আর খুব স্নিগ্ধ। কলঘর থেকে বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়েছিল গঙ্গা। সেখান থেকেই সেই গন্ধটা পেয়ে গঙ্গা যেন বাধ্য হল গৌরীর দিকে তাকাতে – কি অদ্ভুত স্নিগ্ধতা সেই রূপে – ঠিক যেন ভোরের প্রথম ফোটা শিউলি ফুল। গঙ্গা বলে উঠলো, এত সকালে ওঠ তুমি! এই ঠাণ্ডায় এত সকালে ঠাণ্ডা জলে স্নানও করে নিলে! এখনও তো রোদ ওঠেনি! কি করে চুল শুকাবে! এত বড় চুল, ভিজে থাকলে শরীর খারাপ করবে না!’

আসলে গঙ্গার কাছে, গৌরী আর বাইরের লোক নয়। সে এখন ঘরেরও নয়, গঙ্গার মনের সব থেকে আপনজন হয়ে গেছে। তাই বোধ হয়, গঙ্গার মন থেকে সেই মা মা ভাব গৌরীর ক্ষেত্রেও স্বাভাবিক ভাবেই উঠে এলো! গৌরী বলে উঠলো, ‘চিন্তা করিস না – এক তো অনেক দিনের অভ্যাস। তা ছাড়াও ভিতর থেকে এত তাপ বার হয়, ঠাণ্ডা জল বেশ ভালই লাগে!’ হালকা খিল খিলে হাসি গঙ্গার মনটাকে যেন মাতৃত্বের রসে ভরিয়ে দিল। কিন্তু না, এখন এসব নিয়ে ভাবলে হবে না – জেলে কাকারা আর ক্ষেতি চাচারা এসে পরবে! তাড়াতাড়ি করতে হবে! গামছা ও সকালের পরিষ্কার কাপড় নিয়ে গঙ্গা কলঘরে ঢুকে গেল।

স্নান করতে করতে গঙ্গা আবার ভাবনার দেশে চলে গেল – কি অদ্ভুত ব্যাপার! কখনো মনে হচ্ছে ও আমার মেয়ে, আবার কখনো মনে হচ্ছে আমি ওর মেয়ে! কি যে হচ্ছে! বার বারই একই ভাবনা আসে, আর গঙ্গার মনে হয় দেরী হয়ে যাচ্ছে– তাই বালতি বালতি জল নিয়ে নিজের মাথায় ঢালতে থাকে। এ কি ব্যাপার! আজ যে দু বালতির জায়গায় পাঁচ বালতি জলে চান করে ফেলল সে! এ কি ভাবনার ফল, নাকি ওর শরীর থেকেও গৌরীর মত তাপ বেরুচ্ছে! ভগবান জানেন!

গামছা দিয়ে গা মুছতে মুছতে গঙ্গা আবার ভাবনার জগতে চলে গেল – সত্যি কি অদ্ভুত উষ্মা গৌরীর শরীরে! ছোটবেলা থেকেই গঙ্গা একটু শীত কাতুরে – লেপ নিয়েও ওর ঠাণ্ডা কমে না! কিন্তু কাল কেমন যেন ঠাণ্ডাই লাগেনি ওর! সকালে উঠে দেখল গায়ে ভালো করে লেপ মুড়ি দেওয়া – কিন্তু তার মনে আছে, রাত্রে সে লেপ গায়ে রাখতে পারছিল না! সকালে বোধ হয় গৌরী ওর গায়ে লেপটা ভালো করে মুড়ি দিয়ে দেয়! রাত্রে গৌরীকে জড়িয়ে ধরে ছিল যখন, মাঝে মাঝে গলার দিকে বিন্দু বিন্দু ঘামও হচ্ছিল! ওর ঘুম যমুনার মতই পাতলা! সব হালকা হালকা মনে আছে – কে যেন সেই ঘাম মুছিয়ে দিচ্ছিল! কে ঘাম মুছিয়ে দিচ্ছিল! গৌরী! ও সারারাত ঘুমায়নি!

পরিষ্কার জামাকাপড় পরে বাইরে একরকম হন্তদন্ত হয়েই বেরিয়ে গঙ্গা গৌরীর কাছে চলে গেল – ‘তুমি কাল রাত্রে ঘুমাওনি!’

গৌরী মৃদু হেসে, ‘কেন! ঘুমাব না কেন! বেশ ঘুমিয়েছি’।

গঙ্গার উত্তরটা পছন্দ হল না। একরকম অভিযোগের সুরেই সে বলে উঠলো, ‘তাহলে আমার গায়ের কপালের ঘাম, কে মুছে দিয়েছিল!’

গৌরী এবার একটু খিল খিল করে হেসে উঠলো। ঘরে যমুনা অকাতরে ঘুমাচ্ছে! তাই বাচ্চা মেয়ের মতই গৌরী, নিজের দুহাত দিয়েই নিজের মুখ চেপে ধরল! সেই দেখে গঙ্গার যেন আবেগ বাঁধ মানল না – দু পা দূরে ছিল – ছুটে গিয়ে একবার সেই বাচ্চা গৌরীকে জড়িয়ে ধরল, আর বলল, ‘বল না! ঘুমাওনি কাল!’

‘হ্যাঁ রে ঘুমিয়েছি! তুই অত চিন্তা করিস কেন! আসলে মায়ের ঘুম পাতলাই হয়! পাশে মেয়ে ঘুমোতে ঘুমোতে ঘামছে, সেটা না দেখলে আর কেমন মা!’

এই উত্তরটা গঙ্গা কিছুটা আশা করেছিল – কিন্তু যতটা করুণা আশা করেছিল, তার চেয়ে ঢের বেশী সেই করুণা! এতটাই করুণা যে সেটাকে আশা করাই সম্ভব নয় – আসলে মানুষ সেটাই আশা করতে পারে, যেটা সে ভাবতে পারে! এতটা করুণা যে গঙ্গার ভাবনারও অতীত!

গৌরী এবার বলে উঠলো, ‘তুই যা, নিচের দিকে যা, তোর জন্য সকলে অপেক্ষা করছে যে!’

গঙ্গার যেন সেইদিকে হুঁশই ছিলনা। গৌরী বলাতে সে তড়িঘড়ি নিচে গিয়ে দ্যাখে জেলে কাকা, ক্ষেতি কাকারা সকলে তার জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে।  এটাকি করে জানল গৌরী! গৌরীর বিশেষ কিছু ক্ষমতা আছে, যেগুলো সত্যিই অদ্ভুত! বরফের মধ্যে থেকেও ঠাণ্ডা না লাগা, অসৎ লোকে ওকে ছুঁতে এলেই ছিটকে পরে যাওয়া, মনের কথা সঠিক করে বলে দেওয়া, ঘটনা যা হচ্ছে –দূরে কোথায় কি হচ্ছে, সেটা সঠিকভাবে বলে দেওয়া আর সর্বোপরি অপার করুণা – এইগুলোর একটাও সাধারণ মানুষের গুণ নয়! খুব সন্দেহ আছে –আদও এগুলো সাধুদের গুণ কি নাও! আচ্ছা শিবের সাথে ওর ব্যাপারটা ঠিক কি! ওটা কি ওর কল্পনা, না কি সেখানেও কিছু সত্যতা আছে! যদি সত্যতা লেশমাত্রও থাকে, তবে নিশ্চিত যে গৌরী সাধারণ কেউ নয়!

আচ্ছা একটা কাজ করলে হয় না! গৌরী তো বলল, ওর মামারবাড়ি কলকাতায় হরিদেবপুরে! সেখানে একবার যোগাযোগ করলে কেমন হয়! সত্যাসত্য অনেকটাই সামনে এসে যাবে! কিন্তু কিভাবেই বা যোগাযোগ করবে! তাহলে গৌরীকে নিয়ে যেতে হবে তাদের সামনে! তবেই সম্ভব। কিন্তু গৌরীকে নিয়ে গেলে যে সেখানে রেখেও আসতে হবে! গৌরীকে ছাড়া গঙ্গা, যমুনা আবার অনাথ হয়ে যাবে যে! কি যে করে সে! ……আরও একটা কাজ করা যায় … গৌরীকে চা ওয়ালা কাকা ফোন দিয়েছিল না! ওই ফোনে তো সেই কাকার নম্বরও আছে! তাকে যোগাযোগ করলে কেমন হয়! ……

ছি! ছি! একি করছে…… নিজের মায়ের উপর সন্দেহ করছে! …… না এটা সেই সন্দেহ নয়…… গৌরী যে সোনা, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই…… কিন্তু জানতে ইচ্ছে করছে, ও কতটা খাঁটি সোনা! …… আসলে মাঝে মাঝে মনে হয় যেন – ও সোনাই নয়, সোনার উৎস! গৌরী মামারবাড়ি সম্বন্ধে যা বলেছে, সেটা যেন মিথ্যে হলেই বেশী ভালো হয়! তাহলে যে গৌরীকে আর কোনদিন হারাতে হয় না…… হে ঈশ্বর, যেন ওর মামারবাড়ির কথাটা গল্প হয়!

‘গঙ্গা মা, ও গঙ্গা মা’, জেলে কাকার ডাকটা শুনে গঙ্গা যেন কোথা থেকে ফিরে এলো! জেলে কাকা আবার বলে উঠলো, ‘কি গো মা! আনমনা লাগছে যে বড়! সব ঠিক আছে তো!’ ক্ষেতি চাচাও একই সুরে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ এরকম আনমনা তো গঙ্গা মা-কে কোনদিন দেখায় না! এই নাও সব টাকাপয়সা বুঝে নাও!’ গঙ্গা সব হিসাব পত্তর বুঝে ওদেরকে বড় গামলায় করে মুড়ি সাথে, আলু সেদ্ধ, একটা করে পিঁয়াজ, ক্ষেতের কড়াইশুঁটি আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে বলল, ‘আমি একটু উপর থেকে আসি, দেখি যমুনার ঘুম ভাঙল কি না!’

ক্ষেতি চাচা বলে উঠলো, ‘যমুনা মায়ের শরীল ভালো আছে তো!’ সেই উত্তরে গঙ্গা কিছু বলার আগেই, জেলে কাকা বলে উঠলো, ‘না গো, মনে হচ্ছে সেসব নয়! কোন একটা কাজ করবে নাকি, করবে-না, ভাবনায় পরে রয়েছে ও!’ খানিক থেকে আবার বলল সে, ‘বলি মা, যদি কোন সিদ্ধান্তে আসতে সংশয় হয়, তবে সেই সংশয় আগে ভাঙতে হয়! তোমায় দেখে মনে হচ্ছে, কোন জিনিস নিয়ে খুব চিন্তায় রয়েছ! … তো বলি, অত ভাবনা কেনে! … ঠিক ভুল বিচার না করে, কি হলে কি হারাবে, সেসব নিয়ে না ভেবে, কর্তব্যটা কর – পথ বেরিয়ে আসবে’।

খানিক থেমে আবার কাকা বলল, ‘আসলে কি জানো তো মা, কখনো কখনো আবেগ আমাদের মনের কাছে দ্বন্ধ এনে দেয় – কি যে করা ঠিক আর কি না, কিছুই বোঝা যায় না… তখন, সব কথাকেই ঝেড়ে ফেলে, কর্তব্যে ফিরে যেতে হয় – যেটা ঠিক, সেটা এমনিই হয়ে যায়…… কিছু মনে কোরো না মা! তুমি তো আমাদের মেয়ের মতন! সেই ছোট্ট বয়স থেকে দেখছি… তাই বললাম!’

গঙ্গার কেমন যেন মনে হল কথাগুলো এই কাকা বা চাচা বলছে না… কাকারা তো এত ভারী ভারী কথা আজকের আগে কোনদিনও বলেনি… তাহলে হঠাৎ আজ কেন! এটা যেন অন্য কেউ বলছে, মুখটা এদের! সেই ভাবনা সরিয়ে রেখে গঙ্গা বলল, ‘না যাই কাকা, উপরের দিকে একটু যাই! দেখি যমুনাটা ঘুম থেকে উঠল কিনা! যত বড় হচ্ছে মেয়েটা, তত আস্ত একটা কুম্ভকর্ণ হয়ে উঠছে! তোমরা যাবার সময়ে সদরের দরজাখানা ভিজিয়ে দিয়ো, কেমন…!’ এই বলে গঙ্গা উপরের দিকে উঠে গেল।

গঙ্গা উপরে গিয়ে দেখে, যমুনা উঠে স্নান সেরে বাসি কাপড় ছেড়ে, গৌরীর কাছে বসে কি যেন একটা গল্প শুনছে। বাবা! মেয়ের এত উন্নতি! সকাল সাতটা বাজেনি, এখনই সব কাজ সারা হয়ে গেল! না থাকতে পেরে, জিজ্ঞেসই করে বসল গঙ্গা, ‘হ্যাঁ রে, নিজে থেকে উঠলি, না কি মা ডেকে দিল!’

যমুনা একটু অভিযোগের সুরেই বলল, ‘নিজে নিজে উঠেছি! ভালো লাগছিলো না, তোরা দুজন উঠে পরার পর, কি ঠাণ্ডা লাগছিল! সারা রাত ঠাণ্ডা লাগেনি, জানিস!’

গঙ্গার আবার ভ্রু কুঁচকে উঠলো। মনে মনে ভাবল, – সেই গৌরীর উষ্মা! এই উষ্মার জন্যই সারারাত ওর ঠাণ্ডা লাগেনি! ও উঠে পড়তেই ঠাণ্ডা! যাই হোক, মেয়েটার অভ্যাসটা এইভাবেই যদি ভালো হয় – তাই হোক! বড় হয়ে উঠছে – অথচ বেলা অবধি পরে পরে শুয়ে থাকা! ভাবনার ফাঁকে গঙ্গা গৌরীর উদ্দেশ্যে একটা প্রশ্ন চলে এলো, ‘ছোট মেয়েকে একা একা কি গল্প শোনানো হচ্ছে গো মা!’

গৌরী হেসে বলল, ‘ও কিছু না, ওই হরিণগুলোর কথা কাল বলছিলাম না! সেগুলো কেমন দেখতে, সেটাই বলছিলাম!’

গঙ্গা মুচকি হেসে যমুনাকে বলল, ‘এই বোন, উঠে পরেছিস যখন, নিচের দিকে আয়! হাতে হাতে একটু পরোটা করে নিই! জলখাবার হয়ে যাবে!’

গৌরী বলে উঠলো, ‘তরকারিটা আমি চাপিয়ে দিই!’ গঙ্গা মনে মনে একই কথা ভাবলেও, মুখে বলতে পারছিলো না – হাজার হোক অতিথি তো! গৌরী বলতে সম্মতি দিল খালি – গৌরী কিন্তু ততক্ষণে নিচে যাবার জন্য উঠে পরেছে!

নিচে গিয়ে গঙ্গা ও যমুনা পরোটা করতে লেগে পরল, আর গৌরী আলু কেটে, উনুনে তরকারি চাপিয়ে দিল! মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে তিনজনে সব কাজ সেরে নিয়ে জলখাবারের পর্ব মেটাল। এবার দুপুরের রান্না! গঙ্গা বলল, ‘আজকে ঠিক করেছি একটু পালং শাক করব, ডাল করবো আর সাথে ঝিঙে আলু পোস্তের তরকারি! কি হবে না!’ গৌরী আর যমুনার যেন খাওয়া দাওয়াতে কিছু এসে যায় না, তারা সম্মতি দিতে গঙ্গা আবার বলে উঠলো, ‘আজ একটু পায়েস করবে মা! তোমার হাতে পায়েস খেতে খুব ইচ্ছা করছে!’

গৌরীর যেন আনন্দের কোন সীমাই নেই! রান্না করতে ও খুব ভালোবাসে। তিনজনেই হাতে হাতে রান্না করতে থাকলো – সঙ্গে টুকিটাকি কথা – এই গৌরীর মামার অবস্থা কিরকম ছিল, গৌরীর বাবা কি করতেন, অন্যদিকে গঙ্গার বাবা মা কেমন ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। গঙ্গা জানল গৌরী ব্রাহ্মনের সন্তান – ওর বাবা বক্রেশ্বরের শক্তিপীঠের যজমান ছিলেন, তাঁর নাকি ঈশ্বরে খুব ভক্তি ছিল! এই সব সাত পাঁচ কথা বলতে বলতে, আজ দশটাও বাজল না, সব রান্না শেষ। গৌরীর তৈরি পায়েসের সুগন্ধে পুরো ঘর সুরভিত হয়ে উঠেছে।  গৌরীর তৈরি পায়েস খাবার জন্য বলে গঙ্গার যেন তর সইছে না।  যাহোক ভাতটা গরম গরম খাবে বলে, ফ্যানটা উপর করে দিয়ে তিনজনে পাশের ঘরে চলে গেল।

পাশের ঘরে গিয়ে গঙ্গা আজকে তিনটে বালিশ দিয়ে ছোট চৌকিটায় শুধু গৌরীর বসার মত ব্যবস্থা করল। আর পুরো ব্যবস্থাটা চৌকির ঠিক মাঝামাঝি করল, যাতে দুই পাশে দুই বোন বসতে পারে। যমুনার বা-দিক খুব পছন্দের। সে সেই দিকটায় বসল। শোবে শোবে করছিলো, গঙ্গার এক হাঁকে উঠে পরল, ‘এই উঠে বস! ভগবান শিরদাঁড়া দেয়নি! খালি শুয়ে পরা কেন?’ সেই শুনে যমুনা উঠে টানটান হয়ে বসে পরল। গৌরী আসতেই তাকে ঠিক মাঝখানের খোপরে ঢুকিয়ে নেওয়া হল। প্রথমে দুই বোন বসেই ছিল – আসলে ওদের দুজনেরই মনে হচ্ছে যেন গৌরীর উপর অত্যাচার করছে ওরা।

কিন্তু গৌরী গল্প বলতে থাকলে, ওরা আস্তে আস্তে নিজের রূপে ফিরে যায়। যমুনা সেই ঘষটে ঘষটে বাঁদিকের কোলে শুয়ে পড়ল, আর গঙ্গা নিজের শরীরটা গৌরীর ডানদিকের কাঁধে আস্তে আস্তে এলিয়ে দিল। গৌরীও গল্প বলতে বলতে তার বা হাতটা রাখল যমুনার ডান কাঁধের উপর, আর ডানহাতটা রাখল যমুনার বাঁ কাঁধের উপর।  গঙ্গা আর গৌরী, দুজনের উচ্চতাই একইরকম – পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি, গঙ্গার চেহারাটা ঠিক ভারী না হলেও ভারীরই দিকে। অন্যদিকে গৌরীর চেহারা বরং ছিপছিপে – পুরো তহ্নি মেয়ে। তবে তিনজনে একসাথে বসলে, গঙ্গা আর যমুনা, দুজনকেই গৌরীর কাছে শিশু শিশু লাগে। যমুনার ক্ষেত্রে না হয় ব্যাপারটা বোঝা যায়, কিন্তু গঙ্গার ক্ষেত্রে এটা কেন যে হয়, কে জানে! গৌরী কিন্তু তার গল্পের পরবর্তী অধ্যায় শুরু করে দিয়েছে –

‘জানিস গঙ্গা মা, আমরা অমরনাথ থেকে ফিরে এসে পরের কাজে লেগে পরলাম, মানে কৈলাসে যাবার তোড়জোড়ে! মনে আমার আনন্দের ঢল নেমেছিল! যদিও কাজ আমি তেমন বিশেষ করিনি! কাজ যা করছিল, তা সেই রবারই! ছেলেটা কি তৎপর রে বাবা! এসেই জম্মু থেকে হৃষীকেশের টিকিট কেটে ফেলল। হরিদ্বার থেকে যোষিমঠের গাড়ি ভাড়া ইত্যাদি সব দেখে নিল। আমরা ফিরেছিলাম এক শনিবারে। তারিখটা বোধ হয়, ২৯ শে সেপ্টেম্বর ২০১৮। সোমবার অর্থাৎ পয়লা অক্টোবর আমাদের টিকিট কাঁটা হল, হেমকুন্ড এক্সপ্রেসে।

আমাকে নিয়ে রবার শ্রীনগর গেল, সেখান থেকে গেলাম জম্মু। সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় আমাদের ট্রেন। আমরা ষ্টেশনে পৌঁছে গেছি প্রায় দুপুর দুটো নাগাদ। সঙ্গে মালপত্তর বিশেষ কিছু নেই। এখানের থেকে অনেক কম ঠাণ্ডা, তাই রবার তেমন বিশেষ জামাকাপড় নেয়নি, দু একটা আলখাল্লা ধরনের জামা, ও যেরকম পরে আর কি! আর আমার তো অন্য কিছুই নেই, একটা থলে ছাড়া। সিঁদুর পরেছিলাম সেই অমরনাথে গিয়ে। তা দুদিনের পুরনোও হয়ে গেছে! ওখানে সিঁদুর পেলুম না জান!

ট্রেনে উঠে আমরা দুজনে অনেক গল্প করতে করতে রাত্রি হয়ে গেছিল। রবার রেল কোম্পানির থেকেই খাবার কিনল, নিজে মাংস খেল আর আমার নিরামিষ। খেয়ে দেয়ে, আমায় উপরে তুলে দিল বাঙ্কে আর নিজে নিচে শুয়ে পরল। শোবার আগে বলল, সকালে তাড়াতাড়ি উঠে পরতে। ট্রেনটা সাড়ে আটটায় হৃষীকেশ ঢুকবে। আমার ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ঠিক ঘুম আসে না – আগেরবারেও দেখেছি! তবে ট্রেনের ঝাঁকুনিটা ভালো লাগে খুব – কেরকম দোলনা খাওয়ার মতন – তাই না!

গঙ্গা যমুনা আর গৌরী একসাথেই হেসে উঠলো! গৌরী বলতে থাকলো –           

সকাল সাড়ে পাঁচটায় আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি কলঘরে গেলুম, সেখানে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে চলে এলুম। রবার আগেই সব কাজ করে নিয়েছিল। সকালে ও একটু চা খেল। আমার চা টা ঠিক পোষায় না! আমি দুটো বিস্কুট খেলুম। ট্রেন আধঘণ্টা দেরী করল। আমরা নটার সময়ে পৌঁছলুম হৃষীকেশে। তবে কি জানিস! বাতাবরণে আর সেই পবিত্রতা নেই! সব জায়গায় পয়সা পয়সা গন্ধ – আকাশে বাতাসে, মাটিতে সবেতে! অমরনাথের পথে যে জঙ্গলটা দেখেছিলুম, সেটাতে কিন্তু ওই গন্ধ ছিলনা !  হৃষীকেশ নেমে রবার বলল, এখানকার ভাত খেতে খুব ভালো নাকি– তাই দুজনে এক মুঠ করে খেলুম। খেয়ে সরকারী বাস স্ট্যান্ডের দিকে গেলুম। সেখানে গিয়ে জানা গেল – হয় কালকে সকালের বাস ঠিক করতে হবে, নয় আজ সন্ধ্যে ছটার বাস। আমায় রবার বলল, ওর নাকি ঝিঙের সাথে কথা হয়েছে – আরও একবার সেকথা বলে নিচ্ছে। এই বলে ফোন করে, আর ইংরাজিতে কিসব কথা বলে ওই ঝিঙে মেয়েটির সাথে।

গঙ্গা বলে উঠলো, ‘বললাম না, ওটা ঝিঙে নয় – জিং!’

গৌরী বলল, ‘ওই হোল! … আরে ছাড় না! … আমি ওকে একটা ভালো নাম দিয়ে এসেছি! মৈত্রী !… ওর মৈত্রী নামটা খুব পছন্দও হয়েছে… সে কথা পরে বলছি তোদের… আগে ওর কাছে পৌঁছাতে তো দে!’ এই বলে গৌরী আবার বলতে থাকে –

‘রবার ফোন রেখে বলল, বাস সন্ধ্যে ছটায় ছাড়লে, কাল বিকেল পাঁচটার মধ্যে পৌঁছে যাবে। ঝিঙে!…মানে…ওই মেয়েটা ! … সে নাকি জিপ গাড়ি নিয়ে সেখানে অপেক্ষা করবে।

আমি বললাম, তাহলে তো ভালোই হল! আজকের রাতটা কোথায় থাকবো ভাবছিলুম! তা কোথাও থাকতেই হবে না! বাসেই সময় কেটে যাবে!

তখন সবে এগারোটা বাজে! রবার বলল – এখন বাজে এগারোটা আর আমরা বাস ধরব সেই ছটায়! মাঝখানে সাতঘণ্টা! কি করা যায় মাতাজি!

আমি বললাম, কাছে পিঠে কোন ভালো মন্দির টন্দির নেই!

ও বলে, দাঁড়ান মাতাজি। ফোনে নাকি সামনে মন্দির কোথায় আছে সেটা দেখে নিচ্ছে! ও, ফোন দেখে আমাকে বললও, আর নিয়েও গেল! কিন্তু কি করল কে জানে! হ্যাঁ রে গঙ্গা মা, ফোন দেখে কোথায় মন্দির আছে কি করে জানা যায় রে?

গঙ্গা বলল, ‘ও সব ভালো ফোন… দাঁড়াও তোমায় দেখাচ্ছি!’ এই বলে গঙ্গা উপরে গিয়ে ওর ভালো ফোনটা নিয়ে এলো। অ্যান্ড্রয়েড ফোন – সেটা খুলে গঙ্গা গৌরীকে দেখাচ্ছিল, হৃষীকেশে কি কি দেখার আছে। সেই দেখে গৌরী পুরো বাচ্চাদের মতন বলে উঠলো, ‘এই তো পরমার্থ নিকেতন – এখানে গেছিলুম! সে ঢুকে দম বন্ধ হয়ে আসে আসে মনে হয়!’ আবার খানিকক্ষণ যেতে রাম ঝুলা দেখে বলে, ‘এই দেখ – এটার নাম রাম-ঝুলা, এটা গঙ্গা মায়ের এপার থেকে ওপারে হেঁটে যেতে হয়! খুব ভালো লাগে!’

গঙ্গা বলল, ‘ওর নাম যে রাম-ঝুলা, সে তো লেখাই রয়েছে তলায়!’

গৌরী মুখ গোমরা করে বলল, ‘ওটা ইংরাজিতে লেখা! বড়দিদি আমায় ইংরাজি পড়তে লিখতে শেখায়নি!’

গঙ্গা এই আদুরে ভাবে সহজ আর সরল স্বীকারোক্তি দেখে, কোন কিছু না ভেবে একবার গৌরীকে জড়িয়েই ধরল – ‘সত্যি তুমি না! যেটা জানো না, সেটাও এত সুন্দর ভাবে বল!’

আবার ছবি দেখতে দেখতে গৌরী বলে উঠলো, ‘এই তো সেই শিব-পার্বতীর মূর্তি! … এটা জানিস তো ত্রিবেণী ঘাটের পাশে ছিল! ওই জায়গাটাও খুব ভালো – তবে কি বলতো সব জায়গাতেই পয়সার আঁশটে গন্ধ! যেন পিছুই ছাড়ে না!

যমুনা হঠাৎ বলে উঠলো, ‘সে তো টাকা এখানেও রয়েছে!’

গৌরী বলে উঠলো, ‘টাকার কি আর গন্ধ আছে মা! গন্ধটা যে মানুষের মন থেকে আসে, মানুষের গা থেকে আসে!’

যমুনা বুঝতে পেরে চুপ করে গেল। গৌরী আবার বলতে থাকলো –

‘রবার আমাকে এই তিন জায়গাতেই নিয়ে গেছিল জানিস! এই তিনটেই নাকি খুব কাছাকাছি! বাকি সব দূরে দূরে! ত্রিবেণী ভালো লেগেছিল, রাম-ঝুলার উপর দিয়ে হেঁটে যেতে তো কি ভালোইনা লাগছিলো! কিন্তু পরমার্থ নিকেতন ভালো লাগেনি! জানিস ওটা নাকি যোগ শেখানোর জায়গা! রবার বলতে, খুব আনন্দ নিয়ে গেলুম! দেখলাম কি জানিস! খালি হাত তুলছে আর পা তুলছে! আমি একজনকে হিন্দিতে জিজ্ঞেসও করলাম, – হে গো এখানে যোগ হয় বলে, ভগবৎ চর্চা হয় না! কীর্তন হয় না!’

‘সে কি বলল, জানিস!’

গঙ্গা বলে উঠলো, ‘কি বলে!’

সে বলে নাকি ভগবৎ চর্চা করে কি আর যোগ হয়! ব্যায়াম করতে হয়, ব্যায়াম!

আমি আর থাকতে পারলুম না, বলেই ফেললুম, – যোগ তো মনের ক্রিয়া, শরীর নাচিয়ে কি হবে গো! যে টুকুনি শরীর নাচাতে হয়, সে তো কীর্তনে নাচলেই হয়ে যায়! ভগবৎ চর্চা না করলে, কি করে আর মনের ব্যায়াম হবে বল দেখি!

আমার আধো আধো হিন্দি শুনে, সে বলল – আপনি কি বাঙালী!

আমি হ্যাঁ বলতে সে ছেলে বাংলায় বলে উঠলো, ‘খুব ভালো, খুব ভালো! আমিও কলকাতায় থাকি! বৃন্দাবন গার্ডেনস এ ! আপনি কোথা থাকেন!’

ওর আধো আধো বাংলা শুনে বুঝলাম যে ও আসলে অবাঙালী। বাংলায় থাকে তাই বাংলা একটু একটু বলতে পারে! আমি বললাম, হরিদেবপুর। ও শুনে কি ভাবল কে জানে! বলে উঠলো, বহুত খুব, বহুত খুব! সে আবার বলল, – আমার নাম পীতাম্বর ঘরেওয়াল। আমি সিনেমা প্রোডাকশন আর ডিরেকসন ভি করি! আপনি কি চাকরি কোরেন!

আমার ভালো লাগছিল না ওর সাথে কথা বলতে। কি জানিস তো, আমি মনে একরকম আর মুখে আরেকরকম বলতে পারি না! তাই সোজাসুজি বলে দিলুম – তুমি কেমন গো! খালি গায়ে, একটা নেংটি পরে মেয়ে মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা কইছ? লজ্জা সরম নেই তোমার?

আমার কথা শুনে ওর ভালো লাগেনি নিশ্চয়ই! কিন্তু সে ছেলের স্বভাব ভালো! সে বলে, দাঁড়ান, দাঁড়ান! আমি জামা পরে আসছি। আভি যাচ্ছি আর আভি আসছি।

সে সত্যিই গেল আর এলো! এসে বলল, – ‘আপনি কোন মাতাজি আছেন! …… না মানে…… আপনার কোথা শুনে তাই মনে হল!’

আমি সবে না বলতে যাচ্ছি, অমনি রবার পাস থেকে হিন্দিতে বলে বসল –‘হ্যা উনি মাতাজি আছেন! শিবজীর পত্নী আছেন!’

আসলে রবার বোধ হয় বুঝতে পেরেছিল, আমার ওর সঙ্গ ভালো লাগছে না! তাই বোধ হয় ওকে কাটিয়ে দিতে ওসব কথা বললে!

কিন্তু সেই পীতাম্বর তো অম্বর থেকে পাথর হয়ে গেছিল! সে যেন নড়বেই না! সে বলে উঠলো, – ‘মাতাজি নমস্তে! আসলে বাত ইয়ে হে কি, হামার ভি এখানে ভালো লাগে না! কিন্তু কেয়া করে! সিনেমা টিনেমা করে সারা বছর হাঁপিয়ে যাই! এরপর আসলে একটু ভগওান চিন্তা করতে মন চায় আর কি! কিন্তু ঠিকসে আর হয় কোথায় মাতাজি! এই এখানে এসেই যে টুক হয়!’

একটু থেমে আবার সে বলল, – ‘মাতাজি কলকাতা মে, আপনার আশ্রম কোথায় আছে! সেও কি সেই হরিদেবপুরেই!’

আমাকে যেন রবার কিছু বলতেই দেবে না! রবার বলে উঠল, – ‘আসলে মাতাজির ভক্তজনের বেশী পয়সা নেই! তাই উনার আশ্রম টাশ্রম নেই!’

পীতাম্বর আবার বলে উঠল, – ‘আমি কলকাতায় গিয়ে আপনাকে ঠিক খুঁজে নিয়ে একটা আশ্রম করে দেব!’

এবার তার থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে এলাম। তখন বাজে বিকেল পাঁচটা! আর মাত্র এক ঘণ্টা! রবার আমাকে নিয়ে একটা খাবার দোকানে গেল। সেখানে আমরা একটু ভাত খেলাম আর রবার কিছু খাবার আর জল কিনে নিল রাত্রের জন্য। বাসের ভাড়া আমি দেওয়ায়, ও আমাকে কিছুতেই খাবারের টাকা দিতে দিল না! খাওয়া দাওয়া করে সময় হয়েই গেছিল – আমরা বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে বাসে উঠে পরলাম।

বাসে যেতে যেতে পীতাম্বরের সম্বন্ধে রবার বলতে থাকলো। যা বলল ও, তাতে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, সে ক্ষমতাশালীদের একেবারে পছন্দ করে না! আমি তাই বলে উঠলাম, – বাবা, অর্থ থাকলেই সে খারাপ লোক হয় না, আবার অর্থ না থাকলেই সে ভালো লোক হয় না! আসলে কি জানো তো, অর্থ তিনি সকলকে দেন না, যাকে দেন, এই জন্যই দেন যাতে সেই অর্থ সে ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারে।

সেটা রবারের ঠিক মনের মত কথা হল না! সে বলল –‘মাতাজি, আচ্ছা টাকা সবার কাছে একরকম থাকলে ভালো হত না! যাদের কাছে বেশী টাকা আছে, তারা তো খালি নিজের টাকার গরম দেখায়, আর সবাইকে নিজের পায়ের নিচে রেখে দেয়!’

আমি হেসে বললাম, – ‘বাবা, টাকা হল অনেকটা সিদ্ধির মতন! সিদ্ধি বোঝো!’

সে বলল, সে বোঝে। সিদ্ধি তার কাছে হল সেই ক্ষমতা, যা দিয়ে অসাধ্যসাধন করা যায়, হয় কে নয়, নয় কে হয় করা যায়!

আমি হেসে বললাম, – ‘ঠিকই বলেছ বাবা। আচ্ছা, এবার তুমিই বল, তোমার কাছে সিদ্ধি থাকলে কি করতে! নিশ্চয়ই সেই সাধু বাবাকে মরতে দিতে না!’

জানো তার চোখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, সে বলল –‘হ্যাঁ সেটাতো করতামই, তার সাথে সেই ক্ষমতাশালীদের থেকে সব ক্ষমতা নিয়ে নিতাম!’

আমি হেসে বললাম, – ঠিক এই কারণেই সকলের কাছে সিদ্ধি থাকতে নেই! জানো বাবা, ঈশ্বরের প্রদত্ত প্রতিটা ক্ষমতার একটিই উদ্দেশ্য – সেটা হল চেতনা প্রদান! চেতনা প্রদানের পথে যা যা বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে, সেই সকল বাঁধাকে দূর করতে তার শক্তির প্রয়োগ দরকার।

সে বলল, – ‘তাহলে মাতাজি এই যে রোগ সারিয়ে দেয় সিদ্ধি দিয়ে, সেটাও কি ঠিক নয়!’

আমি আবার হেসে বললাম, – ‘বাবা, রোগ সারানো তারই উচিত, যাকে দিয়ে কনো বড় কাজ হবে, বা যে চেতনা লাভের দ্বারে দাঁড়িয়ে রয়েছে! তবেই না সেই শক্তির উপযুক্ত ব্যবহার হল! যদি যার তার রোগ সারিয়ে দেওয়া হয়, তবে তো জীবের এই দুদিনের শরীরটার উপর মায়া পরে যাবে! তাহলে যে তাকে চেতনা প্রদান না করে, আরও বেশী করে অচেতন করে দেওয়া হবে, তাই না!’

রবার এবার যেন কিছু ভেবে বলল, – কিন্তু টাকা সবার কাছে না থাকা ভালো কেন!

আমি এবার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, – দেখ বাবা! যেমন সিদ্ধি সকলের কাছে থাকলে, যে যার নিজের মায়া বৃদ্ধি করাতে কাজে লাগাতো, ঠিক তেমনই সবার কাছে টাকা সমানভাবে থাকলে, যে যার নিজেকে অচেতন করে রাখার জন্যই সেই টাকা ব্যাবহার করত। তুমি দেখই না! আজকে সকলের হাতে সমান টাকা না থাকলেও, অনেকের হাতে প্রয়োজনের থেকে বেশী টাকা রয়েছে, তাই না!

ও বোঝদারের মত ঘাড় নাড়লে আমি আবার বললাম – কিন্তু দেখ, সেই টাকা তারা কিভাবে ব্যবহার করছে! একটা গাড়ী থাকতেও, আরও একটা গাড়ী! একটা বাড়ি থাকতেও, আরও একটা বাড়ি! বাড়িতে স্ত্রী বা স্বামী থাকতেও, পরস্ত্রী বা পরপুরুষ! দেখতে কি পাচ্ছ না, বাবা!

ও এবার একটু অভিযোগের সুরেই বলল – ঠিকই বলেছেন যাদের হাতে বেশী বেশী টাকা রয়েছে, তারা তো এইসবই করছে, আর সব থেকে বড় কথা, অন্যদেরকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে চাইছে!

আমি বললাম, – হ্যাঁ বাবা! এই মুহূর্তে জগতে এটাই হচ্ছে, আর সেইটাই সব থেকে বড় বাঁধা! তিনি কাউকে বেশী টাকা দেন, যাতে সে সেই টাকা নিজে খেয়ে শেষ না করতে পারে – আর সেই অতিরিক্ত টাকা যেন সে সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারে! তারা যে সেটা করেনা তা তো তুমি দেখ – দেখ তো! আসলে যেটা দেখ, সেই দেখার মধ্যে অনেক না দেখা রয়েছে বাবা!

রবার অবাক হয়ে বলল, – ‘না দেখা!’

আমি হেসে বললাম – হ্যাঁ বাবা, না দেখা! আসলে সমাজের কল্যাণ করতেই তারা এগিয়ে আসে! তারা সিনেমা তৈরি করে, মানুষকে আনন্দ দেবে বলে; তারা নতুন ব্যবসা শুরু করে, মানুষকে নতুন কর্মসংস্থান দেবে বলে; আরও কত কিছু করে, কিন্তু কি জানো তো! সমাজের চালকের আসন থেকে তোমরা আধ্যাত্মকে সরিয়ে দিয়ে বৈভবকে বসিয়ে রেখেছ ! তাই তারা ভাবে, অন্যের বৈভব বৃদ্ধি আর নিজের বৈভব বৃদ্ধিই সমাজের কল্যাণ! সমাজ তাদেরকে ভুলিয়েই দিয়েছে যে চেতনা প্রসারই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য! ফলে সেই বড় মানুষগুলোও বিভ্রান্ত –যে তারা কিসে টাকা খরচ করবে আর কিসে করবে না। কিন্তু, চেতনার উন্মেষ ঘটানোই যে তাদের ইশ্বর প্রদত্ত এই বিপুল অর্থ দেবার আসল লক্ষ্য, সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার মতনও মানুষ সমাজে নেই! সেটা হতে পারত একমাত্র বিদ্যার দ্বারা! কিন্তু অপস্মারকে দেখ, সকলকে এমন বিভ্রান্ত করেছে যে পড়াশুনাটাও তোমরা সেই বৈভব–কেন্দ্রিকই করে দিয়েছো! ফলে সমাজে যে পড়াশুনা করে সেই চেতনার হদিশ পাবে, অপস্মারের বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত হয়ে সেই সুযোগও সে বন্ধ করে দিয়েছে!

আমার কথা থামিয়ে, রবার বলে উঠলো, – ‘মাতাজি, এই অপস্মার কে?’

আমি দেখলুম, অপস্মার বোঝাতে গেলে ওকে অনেক কথা বোঝাতে হবে! তাই বললাম, সে অনেক কথা, অন্য একদিন বলব! আপাতত, এইটুকুনি বোঝ যে অর্থ সবার হাতে সমান থাকা ঠিক নয়! তাতে বিভ্রান্তি আর মায়ার প্রসার বাড়ে বই কমেনা! বরং যাদের কাছে বেশি বেশি করে অর্থ রয়েছে, তাদের মধ্যে যাদের চেতনার প্রতি নজর আছে, তাদের চেতনার উন্মেষ ঘটানো সমাজের জন্য বেশী কল্যাণকর। এই পীতাম্বরকেই দেখনা – কি বলল সে! যোগ-অভ্যাস করতে সে আসে কেন!

রবার এবার শান্ত হয়েছে।  পুরোটা না বুঝলেও, সে বেশ কিছুটা বুঝেছে। বুঝে সে বলল, সব কাজের পর মন ভালো করতে হয়তো এখানে আসে!

আমি বললাম, – তাহলে দেখ, ও কনো ব্যবসার জন্য বা নাম কিনতেও আসেনা! আসে একটু ভালো থাকার টানে – তাই না! যোগ-ব্যামকেই কিছু অসাধু ব্যক্তি যোগের নাম দিয়ে চালাচ্ছে – এবার বল ! সেই পীতাম্বরের কি দোষ! সে তো কিছু বোঝে না! আর বোঝে না বলেই তো যারা সব বোঝে, এমন দাবি করে, তাদের কাছে সে ছুটে এসেছে – এবার তারাই যদি তাকে ভ্রমিত করে, তবে সেখানে দাঁড়িয়ে পীতাম্বরের কি দোষ!

ও ব্যাপারটা বুঝছিল – সেই দেখে আমি আবার বললাম, – বাবা! কাউকে তার বাইরেটা দেখে বিচার করবে না! বিচার যদি করতে হয়, তার অন্তরটা একটু দেখবে! অন্তরে যদি মলিনতা থাকে, তখন বিচার করবে, সেই মলিনতার জের কতখানি, একটু ধুলে হবে, নাকি আচ্ছাসে ধোলাই করলেও যাবে না! যাকে একটু ধুলেই হয়ে যাবে, তাকে একটু সঙ্গ দেবে, সময় দেবে, বুঝলে! জগতের বেশিরভাগ অসাধু হতে পারে, কিন্তু তুমি তো সাধু! অসাধু সঙ্গ করার ফলে, তার মলিনতা না গিয়ে থেকে গেছে – সাধু সঙ্গে তা চলে যাবে!

গঙ্গা এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল। এবার সে বলে উঠলো, ‘আচ্ছা মা! তুমি তো কোনদিন স্কুলে যাওনি, তেমন করে পড়াশুনাও শেখোনি! তাহলে এই গভীর গভীর কথাগুলো কি করে বোঝো, আর এত বুঝিয়ে বলও বা কি করে!’

গৌরী মিষ্টি সুরে কথা বলতে আরম্ভ করল – কথা তো বলছে না, যেন মনে হচ্ছে মালকোষের আলাপ ধরেছে। ও যা বলল, যমুনার মাথায় তেমন বিশেষ কিছু ঢুকল না, কিন্তু গঙ্গা তন্ময় হয়ে এই কথাশিল্পীর শিল্প প্রদর্শনী দেখছিল – হ্যাঁ দেখছিলই! যেন কান দিয়ে নয়, ও চোখ দিয়ে সব শুনছে! যমুনা আসলে তত্ত্ব কথা বিশেষ বোঝে না, ও শুধু গৌরীর স্নেহটাকেই ভালোবাসে।

গঙ্গা প্রথমে তত্ত্ব কথার প্রতি আকর্ষিত হলেও, এখন ও গৌরীর প্রায় পুরোটাই নিজের মধ্যে ধরে নিচ্ছে –কিন্তু ধরাতে কি আর পারছে! উপচে উপচে পরে যাচ্ছে যে! না না এখনও কানায় কানায় যায়নি – যেন খালি পাত্র নিয়ে বসেছিল ও! তবে খুব শিগগিরই ভর্তি হয়ে চলকে চলকে পরে যাবে – সে খবর কি আছে গঙ্গার কাছে! গঙ্গার কাছে রয়েছে কিনা জানা নেই, তবে গৌরীর সে দিকে টনটনে জ্ঞান রয়েছে – সে যেন চায়ই গঙ্গার ঘরা পূর্ণ হয়ে চলকে পরে যাক!

গৌরীর প্রতিটা শব্দই আসলে এখন গঙ্গার কাছে অমৃতবাণী। সে তন্ময় হয়ে শুনতে থাকলো, আর গৌরী বলতে থাকলো, – ‘ও রে মেয়ে! জ্ঞান কি আর বইয়ে থাকে? শিব কি বলে জানিস, মা! শিব বলে, সবার অন্তরে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের জ্ঞান রয়েছে – আসলে সবার অন্তরে যে আদিশক্তির নিবাস! শিব আবার বলে আদিশক্তি নেই এমন কোন স্থান, কাল আর পাত্রই হয়না! ও কি বলে জানিস! ও বলে, আদিশক্তির অন্তরেই এই ব্রহ্মাণ্ডটা আর এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটা কোণায় কোণায় সেই আদিশক্তি! প্রতিটা জীব দেহ তিনি নিজে, আর তার বুদ্ধি হল ব্রহ্মা, হৃদয় হল নারায়ণ! তাই আদিশক্তির পুরো জ্ঞান সবার অন্তরে রয়েছে – কিন্তু সেই জ্ঞানের উপর মহামায়া, ললিতা, জয়ন্তী আর ধনলক্ষ্মী মোটা মেঘের মত আবেশ ফেলে রাখে, আর পুরো জিনিসটা ভুলিয়ে রাখে অপস্মার – তাই সেই জ্ঞানের খবর কেউ পায় না!’

গৌরী একটু থেমে, আবার মধুর সুরে বলতে থাকে, ‘মা রে! আজকে না, কলিরাক্ষস সব দখল করে বসে রয়েছে! সেই জন্য, আজকে বিদ্যার মাধ্যমে সমাজের চালক নারায়ণ না হয়ে কুবের! কিন্তু দ্বাপরে তো তা ছিল না! সেই সময়ে দাড়িয়েই কত বড় বড় ব্রাহ্মণ পণ্ডিত পুঁথিকেই সর্বেসর্বা ভেবে বসে ছিল! আসলে কি বলতো? পুঁথি হল বিদ্যার আধার, বিদ্যা নয়! কেমন জানিস তো! ঠিক যেমন ওই কোনে যে কলসিটা রয়েছে, তেমন! যেমন ওই কলসিটাকি জল? না ওটা জলের আধার! কেউ যদি ওই কলসিটাকেই ভেঙে-চুরে খেয়ে নিতে চায়–তবে সে কি আর জল খেতে পাবে? পাবে না তো? শুধু কিচকিচে মাটি মুখে পরবে, তাই তো? জল পেতে হলে, সেই কলসির মধ্যে থাকা জলটা গড়িয়ে খেতে হবে – তাই না?

ঠিক তেমন, পুঁথির মধ্যে সব জ্ঞান রয়েছে – কিন্তু সেই পুঁথির বুলি আওরালে কি আর জ্ঞান লাভ হয়, না কি জ্ঞান বিতরণ করা যায়? জ্ঞান লাভ করতে হলে, সেই পুঁথির মধ্যে থাকা বিদ্যাকে গড়িয়ে গড়িয়ে খেতে হয় … মানে … বুঝে নিতে হয়! কি তাই তো? আর যদি আমার কথা বলিস, তবে বলি …… যা কিছু ওই পুঁথিগুলোতে পাবি, সবই এই তোর মধ্যে, এই যমুনার মধ্যে আর এই আমার মধ্যে রয়েছে। না তো কারোর বেশী আছে, আর না কারোর কম! পার্থক্য তবে কেন! পার্থক্য সেই অন্তরাত্মা – সেই পরম জ্ঞানীর উপর জমে থাকা মেঘের ঘনত্বের জন্য। যার সেই মেঘের ঘনত্ব যত কম, তার তত জ্ঞান; যার যত বেশী, তার তত অজ্ঞান! যার পুরো মেঘ দিয়েই ঢাকা, তার না তো জ্ঞান আছে, আর না সে জ্ঞান আয়ত্ত করতে পারে! কি বোঝা গেল?’

গঙ্গা কতটা বুঝল, সে নিজেও বুঝতে পারল না, তবে এটা বুঝে গেল যে – গৌরী সাধারণ নয়। ও অসাধারণ! হয়তো ও সেটাই যেটাকে মুখে বা ভাবে বা কোন কিছু দিয়ে বোঝানোই যায় না… যাকে বলে… অব্যক্ত!

এখন ঘড়িতে বাজে সবে সাড়ে বারোটা! গঙ্গা গৌরীকে আবার গল্প বলার অনুরোধ করল, তখন যমুনা বলে উঠলো, ‘দিদি খাওয়া দাওয়া করেনি গে চল! খাওয়া দাওয়া করে নিয়ে আবার গল্প শুনবো! …… আসলে …… এবারটা আর বিরতি ছাড়া শুনতে চাই…… এবার কৈলাস যাবে না মা!’

গঙ্গা বোনের কোথায় হেসে গৌরীকে জিজ্ঞেস করল, ‘কি গো, তাই করবে না কি?’

গৌরীও সম্মতি দিতে সকলে উঠে রান্না ঘরের দিকে গেল। আসলে আজ গঙ্গারও খাবার একটু তাড়া আছে – গৌরীর হাতের পায়েসটা খাবে না! পুরো খাওয়াটাতে গঙ্গার যেন মনই ছিল না – মন পরে ছিল পায়েসে! হাম হাম করে ভাত, তরকারি খেয়ে কখন পায়েসে পৌঁছাবে, সেই চিন্তাই ওকে ঘিরে ধরেছিল! পায়েসের বাটিটা মুখের কাছে ধরে শান্তি হল ওর। খুব তৃপ্তি করে পায়েসটা খেল গঙ্গা – যেন সত্যিই পরমান্ন ভোগ! অন্যদিকে যমুনা চটপট করে খেয়ে, নিচে থেকে বালিশ নিয়ে উপরে চলে গেছে। উপরে গিয়ে শোবার জায়গা পুরো সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে, জলের বোতল ভরে একবারে প্রস্তুত। আজ বাদ দিয়ে কালই দিদির বাচ্চাগুলো পড়তে চলে আসবে – আজকেই পুরো গল্প শোনা শেষ করতে হবে!

খাওয়া শেষ হলে, গঙ্গা বাসন মেজে এসে দেখে, গৌরী এঁটো জায়গাটা ধুয়ে, মুছে পরিষ্কার করে একসাথে উপরতলায় যাবে বলে ওর জন্য দাঁড়িয়ে আছে। গঙ্গা আজ আর গৌরীকে এই ব্যাপারে কিছু বলল না – ও ঘরের লোক হয়ে গেছে! দুজনে উপরে গিয়ে দেখে যমুনা সব ব্যবস্থা করে রেখে দিয়েছে! প্রথমে গঙ্গা, তারপর গৌরী আর শেষে যমুনা বিছনায় উঠে পরে খালি বিছনা, ভর্তি করে দিল। তারপর গৌরী শুরু করল –

‘বাস থেকে আমরা যখন নামলাম, তখনো সন্ধ্যে হয়নি। রবার বলল, ওখানেও দেরী করে সন্ধ্যে হয় – এই প্রায় সন্ধ্যে সাড়ে ছটা নাগাদ সূর্য ডোবে, আর পুরো অন্ধকার হতে প্রায় সাতটা – সাড়ে সাতটা বেজে যায়। বাস থেকে নামার পরই দেখি একটা ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লম্বায়প্রায়…, এই পাঁচ ফুট হবে… হ্যাঁ ওরকমই! আমার থেকে ছোট…! গায়ের রঙ ফর্সা… ফ্যাকাসে হলুদের মত, একটু গোলাপি আভা রয়েছে গায়ে। মুখটা খুব ছোট্ট, ছোট্ট ছোট্ট নাক, চোখ আর পাতলা সুতলি দড়ির মত ঠোঁটখানা মেয়েটার, জানিস – এককথায়, খুব মিষ্টি দেখতে, আর হাসিটা খু…ব মিষ্টি! ছেলেদের মত জামা প্যান্ট পরেছিল, তবে ব্যবহারটা খুব ভালো – খুব আন্তরিক। রবারকে দেখে ও নিজের বহুদিনের পরিচিত বন্ধুর সাথে দেখা হবার মত জড়িয়ে ধরল। তারপর হিন্দিতে জানতে চাইল, সে কেমন আছে, ওর কাছ অবধি পৌছাতে কষ্ট হয়েছে কিনা! মেয়েটা সবই বলছিল, কিন্তু হিন্দিটা বেশ ভাঙা ভাঙা, আমার থেকেও বেশী ভাঙা জানিস!

রবারকে দেখলাম, অবাক হয়ে যেতে ওর হিন্দি বলা দেখে! ও হিন্দিতেই উত্তর দিল, – ‘তুমি কবে হিন্দি বলতে শিখলে?’

মেয়েটা হিন্দিতেই হেসে উত্তর দিল, – ‘ভারতে রয়েছি আর হিন্দি বলতে শিখবো না! তা বললে হয়! হিন্দি না শিখলে, এখানে কাজ করবো কি করে!’

রবার হেসে বলল, – ‘বাঃ বাঃ, খুব ভালো, খুব ভালো…’

তারপর আমার সাথে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলল, ইনি মাতাজী। ’

সেই কথা শুনে মেয়েটার মুখটা কেমন যেন ছোট হয়ে গেল! রবার তারপর একটি ভাষায় বলে উঠলো, – ‘নো … নো … সি ঈশ রিয়াল… রিয়াল!’

তারপরেই দেখলাম, মেয়েটার মুখ চোখে কিরকম একটা জ্বলজ্বলে ভাব চলে এলো! সে কোমর থেকে পুরো শরীরটা সামনের দিকে হেলিয়ে দিল, এক মুখ হাসি নিয়ে উপরে উঠে বলল, – ‘নমস্কার!’

সেই নমস্কারটা একটা অদ্ভুত নমস্কার জানিস! আগে কোনদিন এমন দেখিনি! তবে মনে হল, নমস্কার শব্দটা খুব অন্তর থেকে বলল… মনে হল তো সেরকমই!

মেয়েটা নিজের নাম বলল, …… ওই যা তুই বলিস… কি জিং না কি, সেটা!

মেয়েটার বন্ধুত্ব করার ক্ষমতা খুব অদ্ভুত জানিস! ওর বাসায় আমাদের নিয়ে যেতেই দেখি… ওর ঘর ভর্তি কাঁচের ঘর করা অনেকগুলো ঘর রয়েছে! ছোট, বড়… সব মিলিয়ে … এই গোটা বিশ ত্রিশ হবে! সব কটাতে সাপ রয়েছে… বেশীরভাগ সাপকে চিনতেই পারলুম না, তবে চেনা সাপও ছিল……!

আমার পুরো কাহিনী, রবার যা জানে সবটা মেয়েটাকে বলল। মেয়েটাও অবাক হয়ে শুনল। মেয়েটা হিন্দি বলতে পারে তবে ভাঙা ভাঙা, তবে বুঝতে পুরোটা পারে……! রবার পুরোটা হিন্দিতেই বলছিল ওকে। আমি পুরোটা শুনিনি যদিও…! আসলে… আমি উঠে গিয়ে সাপগুলোকে দেখছিলাম। কি সুন্দর সুন্দর দেখতে! আর কি শান্ত জানিস! … অতক্ষণ সামনে ছিলুম, একটা সাপও টুঁশব্দটা করল না জানিস!

মন দিয়ে দেখছিলুম, এমন সময়ে মেয়েটার মিষ্টি কণ্ঠস্বরে চমকে উঠি। দেখি কি, মেয়েটার গলার স্বর পেয়েই, যে সাপগুলো কাঁচের ধারে আমার কাছে এসেছিল –তারা দূরে সরে গেল! সেই দেখে আমি হিন্দিতেই বললাম, – তোমায় কি সাপগুলো ভয় পায় গো! তুমি আসতেই দূরে সরে গেল!

মেয়েটাও যেন অবাক হয়ে কি দেখছিল! সে কথাটা শুনে একটু থতমত খেয়েই বলল, – ‘হ্যাঁ, একটু ভয়ই পায়, আবার ভালোও বাসে! মাঝে মাঝে খেলাও করে, কিন্তু সে আপনাকে দেখাতে পারব না! কারণ ওরা আমাকে কামড়াবে না। কিন্তু আপনাকে কামড়াতে ছাড়বে না!’

মেয়েটা এবার আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, – ‘আপনি কৈলাস কেন যেতে চান। ওখানে যেতে গেলে মাঝে একটা বড় জঙ্গল পরে। সেখানে খুব ভয়ানক পশু আছে! আর তারপরেও চীনা সেনা আছে – ওদের সাথে আমার চেনাশুনো আছে, কিন্তু তাও অনেক প্রশ্ন করে ওরা! সব শেষে, কৈলাস অবধি যাবেন কি করে! জঙ্গল আর চীনা সেনা পেরোনোর পরে প্রায় দুশো কিলোমিটার পথ! কোন গাড়ি নেই, গাড়ি যায়ও না!’

আমি বললাম, – মা! শিব যদি টানে দুশো কেন দুই লক্ষ কিলোমিটার পথ যে এক নিমেষে পৌঁছে যাওয়া যায়! তুমি যে কি বল – কি সেনা, আর কি পশু! সবই তো শিব! সবই শিব!

জানো সে মেয়েটা হা করে আমার দিকে দেখল, তারপর মুখটা একটা মিষ্টি ভাব দিয়ে চলে গেল! আমি ওর সাথে সাথেই গেলাম –তারপর হিন্দিতেই সে রবারকে গিয়ে বলল। আমি শুনতে পেলাম, ও বলছে! – রবার, আমার মনে হচ্ছে না তুমি যেটা বলছ, সেটা সত্যি! ইনি সামান্যই এক মহিলা! হ্যাঁ, হতে পারে যে ইনার ঠাণ্ডা লাগে না! কিন্তু সেই দিয়ে কি প্রমাণ হয়!

রবার হালকা হেসে বলল, – ‘আমি দেখেছি ইনি কে! তুমি এখনও দেখনি তো, তাই চিন্তা করছ! আমি নিশ্চিত – তুমি উনাকে নিয়ে রওনা দেবার আগেই বুঝে যাবে! মাতাজি সব বুঝিয়ে দেবে!’

জানিস, ‘এই কথা শুনে আমিও অবাক হয়ে গেলাম! কি বিশ্বাস! আমিও ওর কথা শুনে নিজেকেই প্রশ্ন করলাম – আমি কে গো শিব!’

রবার পরেরদিন সকাল সাতটার সময়ে হৃষীকেশের বাস ধরবে। মেয়েটা ওকে খুব বলছিল, যাতে ও বিকালের বাসটা ধরে! যদি বিকালের মধ্যে ও নিশ্চিত না হতে পারে যে এই অসাধ্য সাধন করতে আমি পারব, তবে যেন আমাকে নিয়ে চলে যায়!

শুনে মনে মনে খুব খারাপ লাগলো! শিবকে বললাম – শিব, আমায় তোমার কাছে নিয়ে যাবে না! তুমিই তো আমায় ডাকল, তবে এখন এমন করছ কেন!

সেদিনের রাত্রিটা আমার খুব খারাপ কেটেছে জানিস! শিবের কাছে সারাটা রাত কেঁদেছিলুম! ঘড়ি তো আমার কাছে নেই! তাই কটা বাজে জানিনা! তবে মোটামুটি মাঝরাত  – আকাশে তখনও চাঁদ রয়েছে – অর্ধেকের একটু কমই হবে! আমি উঠলুম, উঠে কলঘরে গেলুম। উঠে কি দেখি জানিস?

গঙ্গা উৎকণ্ঠার সাথেই বলে উঠলো, ‘কি দেখলে গো?’

দেখি কি একটা বিশাল সাপ হাতে করে নিয়ে, আরও একটা বিশাল সাপ কাঁধে করে নিয়ে ওই মেয়েটা যাচ্ছে আস্তাবলের কাছে! আমার ওকে এরকমভাবে দেখে, কি মনে হল ওর পিছনে পিছনে গেলাম। গিয়ে দেখি ওই মেয়ে সাপগুলোকে আস্তাবলে ছেড়ে দিতে যাচ্ছে! আমি আর থাকতে পারলুম না, চেঁচিয়ে বলে ফেললুম,  – ‘ও মেয়ে কি করছ গো! সাপগুলো যে ঘোড়াটাকে কামড়ে দেবে!’

ও হেসে বলল, – ‘এটা তো লাগবে মাতাজি! সাপগুলো ঘোড়াটাকে কামড়ালে, তবেই না ঘোড়াটা নিজের শরীরে একরকম ওষুধ তৈরি করবে, আর সেই ওষুধটা ঘোড়ার থেকে বার করে নিয়ে, আমি বিক্রি করি!’

আমি উৎকণ্ঠার সাথেই বলে উঠি, – ‘কিন্তু ঘোড়াটার যে খুব ব্যথা লাগবে! কাউকে জেনে বুঝে ব্যথা দেওয়া কি উচিত!’

মেয়েটা বলল, – ‘কিন্তু মাতাজি, এইভাবেই তো সাপের বিষের ওষুধ তৈরি হয়! সাপের কামড় থেকে মানুষকে বাঁচার রাস্তা তো করে দিতেই হবে! না হলে যে মানুষগুলো সাপ মেরে মেরে শেষ করে দেবে!’

মেয়েটা আবার বলতে থাকে –‘মাতাজি, আমি চীন দেশের অধিবাসী। সেখানে সাপ মানুষের খাদ্য – তাই সাপ মেরনা বললে, সেই মানুষকে সেই সমাজে থাকতেই দেয়না! আমি পড়াশুনা করে দেখি যে ভারতে সাপকে মহাদেবের সঙ্গী মানা হয় –তাই মনেমনে বুঝি যে এই দেশে নিশ্চয়ই সাপের নিধন হয়না! তাই তো এই দেশে চলে আসি! এখানে এসে দেখি এখানেও সাপ মারা হয় – তাদের বিষে ভয় পেয়ে! তাই মনে মনে ঠিক করে নিই– এই ভয় যদি কাটানো যায়, তবে যে সাপ নিধন এই দেশ থেকে পুরোপুরিভাবে চলে যাবে! সেই কারণেই তো এই দুটো ঘোড়া নিয়ে এসে, তাদের সাপের বিষের কামড় দিয়ে, তাদের থেকে সাপের বিষ তাড়ানোর ওষুধ তৈরি করতে শুরু করি!’

আমি তখন ওকে বললাম, – ‘কিন্তু মা! এই বিষের নিরাময় করার ওষুধ হাতে থাকলে কি আর মানুষ সাপ মারবে না! যতক্ষণ না মানুষ মনস্থির করবে যে – যেমন তার জগতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তেমন সকলের অধিকার আছে, ততক্ষণ মানুষ এইরকম হত্যালীলা চালাতেই থাকবে।

আমার এই কোথা শুনতে শুনতে ঝিঙে আমার দিকে তাকিয়ে যা দেখল, আর সে বলার মত কোন অবস্থাতে ছিল না!

গৌরীর গলায় উৎকণ্ঠা দেখে, গঙ্গা উৎকণ্ঠার সাথে জিজ্ঞেস করে উঠলো, ‘কি দেখলো!’

গৌরী বলতে থাকলো, ‘সে দেখে ওর কাঁধে যে সাপটা ছিল, সেটা আমার গা বেয়ে উঠছে উপরের দিকে!’

গৌরী আর যমুনা একসাথেই চেঁচিয়ে উঠলো, ‘সর্বনাশ!’

গৌরী আনন্দের সাথে বলতে থাকে –‘সেই দেখে, সেই মেয়ে তো ভয়ে কাঁটা হয়ে গেছে! চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে থাকলো, যেন আমি ওর থেকে কত দূরে রয়েছি – নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাও! নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাও!’

প্রথমে হিন্দিতে বলল, তাপর যখন দেখল আমি ওর কথা যেন শুনছিই না, তখন ও বোধ হয় আবেগে আর ভয়ে নিজের ভাষাতেই একই কথা বলে উঠল ! আমি তাকিয়ে দেখি, সাপটার অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই! সে যেন কিসের খোঁজে এদিকে এসেছে! কালকেও যখন কাঁচের বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলুম, তখনও ওরা এই ধরনেরই চেষ্টা করছিলো – যেন কাছে আসতে চাইছে! আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, সাপটার গায়ের শীতলতা উপভোগ করছিলাম – অন্যদিকে মেয়েটা প্রায় পাগলের মত চেঁচিয়ে চলেছে! সেই চেঁচানো শুনে রবারও ছুটে চলে এসেছে! কি সুন্দর ঘুমচ্ছিল ছেলেটা! ক’দিন যা পরিশ্রম গেছে ওর! ছেলেটাকে শান্তিতে ঘুমাতেও দিল না! এত হাঁকডাকের কি প্রয়োজন ছিল কে জানে!

সাপ বাবাজী কি সুন্দর সারা শরীরটা আমার যেন শুঁকছে আর উপরে উঠছে! এই করতে করতে সে আমার গলাটা পুরো জড়িয়ে ধরে কানের পাসে মুখটা রেখে খানিক বিশ্রাম নিল! জানিস, তারপর ও আবার মাথায় উঠে গেল! মেয়েটি অর্থাৎ মৈত্রীপরে আমাকে বলেছিল – যেন সাপটা আমার মাথার মুকুট হয়ে বসেছিল!

এই বলে, গৌরীর কি হাসি! হাসি দেখে যমুনা জিজ্ঞেস করে উঠল, ‘তোমার ভয় করছিলো না!’

গৌরীর মৃদু হেসে উত্তর, ‘মা রে ভয় কখন লাগে, যখন সামনের জন কনো অনিষ্ট করতে আসে, তাই না? ও তো কনো অনিষ্ট করতে আসেইনি!’

গঙ্গা অবাক হয়ে দেখছিল আর ভয়ে প্রায় শিহরিত হয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর কি হল?’

গৌরী আবার বলতে থাকলো – সকলে ভয় পেয়ে গেছিল! রবার তো আমার কনো অনিষ্ট সহ্যই করতে পারে না! ও একটা বড় লাঠি তুলে এনেছিল – সাপটাকে মেরেই ফেলবে ও! মৈত্রীরও একই ইচ্ছা, কিন্তু সাপ ওর খুব প্রিয়! তাই বোধ হয়! … সাপটার অনিষ্ট করতে মন থেকে সায় পাচ্ছিল না! তবে রবারকে ও বাধাও দিল না! বরং, বোধ হয় ওর নিজের চীনা ভাষায় বলে উঠলো! – কিল হার রবানি! কিল হার! … আবার কি বলছিল, – কি যেন… দেটস ডা … অনলি না কিনলি… আরও একটা কি বলল … হ্যাঁ হ্যাঁ … ওয়ে! ওয়ে! কি জানি তার মানে কি! আমি ভাবলুম, রবার কি চীনা ভাষাও জানে না কি! তবে কি জানিস তো গঙ্গা মা! রবার তো ওই ঘটনার পরে পরেই চলে গেল – আর ওকে জিজ্ঞেস করতে সুযোগ পাইনি!

গঙ্গা বোধ হয় নিজেও অবাক হয়ে গেল – কি করে যে ওর ওই ভয়ের মধ্যেও হাসি পেল! কে জানে! ও হাসতে হাসতে বলে উঠলেও, মনের মধ্যের আতঙ্ক এখনও যায়নি! গঙ্গা বলল – ‘মা গো ওটা চীনা ভাষা নয় গো! ওটা ইংরাজি ভাষা! ওটা হল – ডেটস ডা অনলি ওয়ে… মানে… সেটাই একমাত্র উপায়! বুঝলে!’… বলে গঙ্গা আবার হাসতে থাকল। তবে এবারের হাসিটা দেখে মনে হল, ওর মনের ভিতরের ভয় কেটে গেছে!

গৌরী হেসে বলে উঠলো,  – ও, ওটা ইংরাজি ভাষা! তবে আমি ওর মানে কি তা না বুঝলেও, ওরা যে দুটোতে মিলে সাপটাকে মারবে ঠিক করেছে, সেটা বেশ বুঝতে পারলুম! তাই আমি এক কাণ্ড করে ফেলি! … আসলে দেখলাম যে, .. সাপটা শুধু শুধু প্রাণটা হারাবে! … তাই…!

গৌরী যেন কথাটা বলতেই পারছিল না গঙ্গার ভয়ে! সেই দেখে গঙ্গা বলে উঠল, ‘তুমি এমন করছ, যেন এখন ঘটনাটা ঘটছে! ঘটনা তো কবে ঘটে গেছে! তুমি দিব্যি এখন চলে ফিরে বেড়াচ্ছ! মানে, তোমার কিচ্ছু হয়নি! তাহলে এত ঢোক গিলছো কেন বলতে!’

গৌরী এবারে যমুনার থেকেও ছোট হয়ে গেছে! গঙ্গার উদ্দেশ্যে ছোট্ট মেয়ের মত করে বলল, ‘বলব! … বকবি না তো! … না তুই নিজে মুখে বল, … বকবি না!’

গঙ্গা এবার আর না হেসে পারল না, ‘আচ্ছা বাবা বকবো না… কথা দিলাম… হয়েছে…! এবার বলো!’

গৌরী এবার হাসতে হাসতে বলল, ‘আমি সাপটাকে হাতে করে ধরে নিয়ে আসি চোখের সামনে! সেই দেখে মৈত্রী তো পাগলের মত চেঁচিয়ে উঠলো, – মাতাজি, ওর বিষ আছে! …… খুব বিষ! …… দূরে ছুড়ে ফেলে দিন!

রবারকে দেখলাম, বাচ্চা ছেলের মত লাঠি হাতে এক চোখ জল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে!

আমি হেসে সাপ বাবাজীকে বললাম, – কি তোমার মাথায় ওঠার সখ কেন? দেখেছো এরা কেরকম ভয় পেয়ে গেছে! কাছেই যদি আসবে, তো লুকিয়ে লুকিয়ে আসবে তো!

এই বলে, ওর মাথায়, আর গায়ে আদর করছিলাম। কি দেখি জানিস, সাপ বাবাজী কি মন দিয়ে আদর খাচ্ছে! বিষধর সাপ … কে বলবে! পুরো পোকার মত পরেছিল! আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম, দুজনেই বিস্ময় মাখা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমি তাই আস্তেআস্তে সাপ বাবাজীকে মাটিতে শুইয়ে দিই – দিয়ে আদর করতে থাকি। মৈত্রী খুব তাড়াতাড়ি এসে সাপটাকে তুলে নিতে গেল, যে হাতে সাপ ছিল না, সেটা দিয়ে। ও কি করতে চাইছে বুঝে বলে উঠলাম, – এখন কাছে এস না, বুঝলে মেয়ে! এখন আসলে ও তোমাকে ছেড়ে দেবে না! ভুলে যাবে যে তুমি ওর বন্ধু!

মৈত্রী আমার কথা শুনল। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ আদর খাবার পর, সাপটাকে তুলে মৈত্রীর দিকে মুখ করে দিতে, ও চলে গেল ঝিঙে মানে আমার মৈত্রীর কাছে!

‘তুমি সেই ঝিঙে ঝিঙেই করে গেলে, হ্যাঁ! এত বলছি, ওটা জিং, ঝিঙে নয়!’ গঙ্গা অভিযোগের সুরে বলে উঠলে, গৌরী পাল্টা উত্তর দিল, ‘ওরে বাবা! আর আমি জিং, ঝিঙ্গে কোন নামেই ডাকবো না ওকে! আমি তো ওর নাম দিয়েইছি – মৈত্রী! জানিস ওর নামটা খুব পছন্দও! আর জানিস, সেদিনের পর থেকে রবারকেও ও রবার বলেই ডাকতো!’ এই বলে গৌরী খিল খিল করে হাসতে থাকলো!

গঙ্গা সেই কথার উত্তরে বলে উঠলো, – ‘তোমার নাম দেওয়া একটা স্বভাব আছে, জানো! সবাইকে একটা করে নাম দিয়ে দাও না!’

গৌরী এবারের অভিযোগের সুরেই বলল, ‘কই, আমি তোর বা যমুনার তো কোন নাম দিইনি, এমন কি মহেন্দ্র ছেলেটারও নাম দিইনি! আসলে যার নাম আমার মনে থাকে না, তার একটা নাম দিয়ে দি…। ’– গৌরীর সে কথা শুনে গঙ্গা আর যমুনা দুজনেই হাসতে থাকে।

একটু চুপ করে গঙ্গা আবার প্রশ্ন করল, ‘তো এবারের নামটা কেন?’

গৌরী বলল, ‘আসলে মেয়েটা খুব ভালো, জানিস! সাপেদের ও খুব ভালোবাসে! পরে অবশ্য দেখেছিলাম, ও জীবজন্তুই ভালোবাসে! মানুষকেও ও খুব ভালোবাসে আর সবার সাথে বন্ধুর মত মেশে! তাই ওর নাম মৈত্রী দিয়েছিলাম! কেমন ভালো না, নামটা!’

গঙ্গা কিছু বলার আগেই যমুনা বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ, কি মিষ্টি নামটা!’

গঙ্গা তার পরে পরেই বলল, ‘সকলকে ভালোবাসে তো, তোমাকে মাতাজি শুনে প্রথমে থমকে গেছিল কেন!’

গৌরী মুচকি হেসে বলল, ‘আসলে ও ভণ্ডদের একদম সহ্য করতে পারেনা! স্বভাবটাও খুব মিষ্টি! …আরে শোন না তারপর কি হল!’

গঙ্গা বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ বলো… বলো তারপর কি হল?’

গৌরী বলতে শুরু করল আবার–‘সেই দৃশ্য হবার পর যখন সাপ বাবাজী মৈত্রীর কাছে ফিরে গেল, তখন মৈত্রীর হাতের অন্য সাপটা খুব ছটফট করছিল– তাতে মৈত্রী একেবারে নাজেহাল হয়ে উঠলো!’

সেই দেখে মানুষকে বকার মতন, মৈত্রী সাপটাকে বকছিল জানিস! আমি তাই দেখে বললুম, – ওরে বোকা মেয়ে! ওর বন্ধু আদর খেয়েছে, ও কি, দেখে চুপ করে থাকবে! … ওকে ছেড়ে দে! … ওকে ছেড়ে দে!

মৈত্রী কথা শুনে ওকে ছেড়ে দিল, আর সেই সাপ বাবাজী ঠিক সুড়সুড় করে চলে এলো আমার কাছে! একই ভাবে ওকেও খানিকক্ষণ আদর করার পর, মুখ ঘুরিয়ে দিলাম – ও আবার মৈত্রীর কাছে চলে গেল!

তারপর মৈত্রীকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বললাম যাতে ও আর ঘোড়াটাকে এইভাবে আঘাত না করে! সে প্রথমে বলল যে ওর তাহলে কি করে চলবে! আমি বললাম, – দাঁড়া, দেখি শিব কি বলে! শুনে তোকে বলব, ঠিক আছে!

লক্ষ্মী মেয়ের মত ও কথাটা শুনল, দিয়ে সাপগুলোকে আবার কাঁচের ঘরে রাখতে সে ভিতরের ঘরে চলে গেল। সাপগুলোকে রেখে ও রবারকে একবার ভিতরে ডাকল। রবার ভিতরে গেল আর হাসি মুখে ওর ওই ছোট্ট ব্যাগটা নিয়ে চলে এলো। এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, – ‘মাতাজি, আপনার মৈত্রী আপনাকে নিয়ে কৈলাস অবধি যাবে – ঠিক আছে! ওর রাস্তা জানাও আছে আর সব চেনাও আছে – ওই জায়গায়ও অনেক দিন কাজ করেছে – এই দুটো ঘোড়াও ও ওখান থেকেই পেয়েছে। তাই ভালো করে থাকবেন আর ওর কথা শুনে চলবেন – ঠিক আছে!’

এতটা বলে রবারের চোখ ছল ছল করে উঠলো। সে আবার বলল, – ‘মাতাজি আমি এখন আসছি! কিন্তু আপনি আমায় কথা দিয়েছেন, যে আমাকে আপনি ঠিক সময়ে ডেকে নেবেন আর হ্যাঁ এই আংটি ভি আমাকে পথ দেখাবে! আমি ঠিক চলে আসব আপনার কাছে…… খুব একটা দেরিও করবো না! আসছি মাতাজি!’

এই বলে পিছন ফিরে মৈত্রীর দিকে হাত নেড়ে সে চলে গেল হৃষীকেশ। মৈত্রী আমাকে নিয়ে ঘরে গেল আর নিজের কথা বলতে থাকল– ওর বাবা সার্কাসে খেলা দেখাত আর ও নিজেও নাকি পশু পাখিদের মাঝেই বড় হয়েছে; সে হাতির সাথে খেলা দেখাত আর তারপরই নিয়ম আসে যে পশু নিয়ে সার্কাসে খেলা দেখানো যাবে না! হাতিটাকে যখন বনে ছাড়তে গেছিল, তখন ওকেই যেতে হয়েছিল, কারণ হাতিটা ও ছাড়া কারোর কথা শোনে না! সেই গভীর জঙ্গলে হাতিটাকে ছেড়ে ওরা চলে তো এসেছিল – কিন্তু জঙ্গলের শেষ দিকে যখন চলে আসে, তখন হাতিটা ওদের পিছন পিছন বেড়িয়ে এসে মৈত্রীকে জড়িয়ে ধরে। তার জন্যে নাকি ওকে প্রায় সাতদিন জঙ্গলে থাকতে হয় – শেষে একদিন যখন হাতিটা ঘুমচ্ছিল, তখন ওকে না জানিয়ে চলে আসা হয়!

জানিস! ও হাতিটার জন্য খুব দুঃখ করছিল! বলে সেই হাতিটাই ওর সব কিছু ছিল! সেই হাতির শোক ভুলতেই নাকি ও সাপের খেলা দেখাতে আরম্ভ করে! আস্তে আস্তে ওর সাথে সাপেদের এত বন্ধুত্ব হয়ে যায় যে ওদের বিষ আর বার করতেই হত না! সেই সাপগুলোকেও ওর দেশের কিছু অধিবাসী চুরি করে মেরে খেয়ে নিয়েছিল! সেই ব্যথাটা ও আর নিতে পারেনি! তার জন্যেই ওর ভারতে আসা, সাপের বিষ দিয়ে ওষুধ তৈরি করা আর তাই নিয়ে ব্যবসা করা। মেয়েটা খুব ভালো জানিস, খুব দয়া ওর অবলা জীবদের প্রতি – ওদের পশু বলে আলাদা করে দেখেই না! সবের শেষে আমাকে বলল, যে আমি ঠিকই বলেছি – সাপের বিষের প্রতিরোধক দিলেও, মানুষের হিংসা কমছে না! আমার দিকে তাকিয়ে চোখে এক গাদা প্রশ্ন নিয়ে বলে, – ‘কেন বল তো! কেন মানুষের এত হিংসা!’

আমি ওর মাথা ঠাণ্ডা করিয়ে পাশে নিয়ে বসালাম। দিয়ে বললাম –‘দেখ মেয়ে! হিংসার উৎস কি জানো!’

সে অবাক দৃষ্টিতে তাকাতে আমি তাকে আবার বলি –‘হিংসার উৎস হল অনৈক্য ভাব আর এই অনৈক্য ভাবের কারণ হল অজ্ঞানতা, বুঝলে! আমরা সকলেই সেই অমৃতের সন্তান, আসলে আমরা সেই অমৃতেরই একেকটি প্রকাশ – এটাই হল জ্ঞান আর এই জ্ঞান আত্মস্থ হয় চেতনা লাভ হলে। যখন মানুষের সেই চেতনা জেগে যায়, তখন সে দ্যাখে সমস্ত জগতটাই তাঁর মধ্যে বিরাজ করছে, তিনিই সব হয়ে রয়েছেন – এই জীব, মানুষ, নির্জীব, পশুপাখি, গ্রহ নক্ষত্র – সব। যখন এই চেতনা জেগে যায়, তখন না তো আর অন্য মানুষকে হিংসা বা ঘৃণা করতে পারে, না তাদের লুঠ করতে বা ঠকাতে পারে, না পশু পাখিদের অযাচিত ভাবে মারতে পারে আর না এই পৃথিবীর বুক চীরে, হীরে মানিক বার করে নিয়ে আসতে পারে – বুঝলে! তাই যদি সত্যিই চাও যে মানুষ এই পশু পাখিদের, সাপেদের জীবনের মর্যাদা দিক, তবে তাদের চেতনা জাগানোতে মন দাও!’

সেই কথা শুনে, মৈত্রী বলে, – ‘আচ্ছা মাতাজি, আমরা যে মাছ মাংস খাই, এটা না খেলেই কি নয়! কত শাক সবজি তো রয়েছে, সেই দিয়ে খেলেই তো হয়ে যায়! তাই না! … শুধু শুধু জীব হত্যা!’

আমি বললুম – ‘ওরে বোকা মেয়ে আমার! শুধু কি প্রাণীগুলোই জীব, গাছ গাছলা কি অজীব? প্রাণীগুলোকে মারলে, তারা চেঁচিয়ে ব্যথা বোঝাতে পারে বলেই খারাপ লাগা, আর গাছ গাছলা ব্যথা বোঝাতে পারেনা বলে ওদের মেরে কেটে খেলে কোন দোষ নেই! … ওরে বাবা! ব্যথা গাছগুলোরও লাগে! ওরাও ব্যথা প্রকাশ করে – কিন্তু আমরা সেই ব্যথার ভাষা বুঝতে পারি না – এই যা! আসলে কি বলতো – ঈশ্বর এই জগতে একাধিক জীবের জন্ম দিয়েছেন, যাতে একজন আরেকজনের খাদ্য খাদক হয়ে শরীরটা রাখতে পারে – আরে! শরীর না থাকলে, কাজ কেমনে হবে! আর কাজ না হলে অভিজ্ঞতাই বা কেমন করে জন্মাবে! … কাজ করবে, সেই কাজ থেকে ফল বেরুবে, সেই ফল থেকে অভিজ্ঞতা জন্ম নেবে, সেই অভিজ্ঞতা জমে জমে তবেই না চেতনা জন্ম নেবে!’

মৈত্রী এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল। এবার সে বলে উঠলো, – ‘কিন্তু একজন আরেকজনকে হত্যা করবে পেট ভরাবার জন্য! এটা ঈশ্বরের কেমন বিচার!’

মেয়েটা আমাকে এতক্ষণে খুব আপন করে নিয়েছিল – আমার খুব কাছে এসে গা ঘেঁসে বসেছিল – এবার কেমন জানি একটু মাতৃত্বের স্বাদ চেয়ে আমার কোলে মাথা দিয়ে শুলো। আমি ওকে বললাম –‘ওরে মা! এই দেহ তো মায়ার বাঁধন! এই দেহে না থাকলে কর্ম হয় না আর তাই চেতনাও জাগে না! আর চেতনা না জাগলে, এই ভবসংসার থেকে বেরোনোও যায় না, তাই শরীরটা খুবই দরকার। কিন্তু অন্যদিকে, এই শরীরটা এতই মায়ার বাঁধন, এত আঁটুনি এতে – যে চেতনা, জীবন, জ্ঞান, মুক্তি সব ভুলে আমরা এই শরীরটার প্রতিই আকর্ষিত হয়ে পরি! ফলে কি হয়, … আমরা পাগলের মত সেই শরীরটাকে নিয়েই মেতে থাকি! … মা! এই শিকার, অন্য পশু বা গাছ গাছালি খাওয়া, এসব কি জানিস তো, এই শরীরটার উপর মায়া কমিয়ে দেয় – মনকে বুঝিয়ে দেয়, এই শরীর আজ আছে, কাল নেই – এটা মাধ্যম মাত্র, কিন্তু এটা কখনই লক্ষ্য বস্তু নয়! …… তাই মা! বাঘটাকে, হরিণটাকে, হাতিটাকে ভালোবাসো, কিন্তু তাদের শরীরটাকে নয়! সেই জন্য ঈশ্বর এমনি নিয়ম করেছে যে একজন একজনকে ভক্ষণ করবে – এইভাবে শরীরের প্রতি মায়া কাটাবে! কিন্তু একই সাথে একজন অন্যের জীবনটাকে সম্মান করবে – তাই প্রয়োজনের বেশী হত্যা, সে করবে না!

সবটা শুনে মৈত্রীর খুব ভালো লাগলো বুঝলি! ও বলে কি জানিস? বলে – মাতাজি, কি করে লোকের চেতনা জাগরণ করা যাবে!

আমি বললাম, – এই ধর, একটা আশ্রম বা সেই ধরনের কিছু হল – আর সেখানে বিভিন্ন রকম পশু থাকলো – স্বাধীন, স্বতন্ত্র আর ভালোবাসায় বদ্ধ হয়ে! কি! কেমন হয়!

সে এত আনন্দ পেল জানিস, বলে কি –‘আমি করবই এরকম একটা জায়গা আর সেখানে তোমাকেও নিয়ে যাব! আমি জানতাম, আমিই খালি পশু ভালোবাসোতে পারি! আজ তো নিজের চোখেই দেখলুম, আমি কি আর ভালোবাসোতে পারি! তোমার চোখেই এত ভালোবাসা, যে পশুরাও সেটা পড়তে পারে!’

গল্প বলতে বলতে কখন বিকাল পাঁচটা বেজে গেছে কারুর খেয়াল নেই। এবার চুল বাঁধার সময়। যমুনার যেন চোখের সামনে ঘড়ি বাঁধা! ঠিক পাঁচটা বাজল আর অমনি তিড়িং করে উঠে বাগানে চলে গেল –বোধ হয় জুঁই ফুল আনতে গেল! গঙ্গা বলল, ‘মা চল তোমার চুল বেঁধে দি গে! কালকের মত সুন্দর করে বেঁধে দেব। ঠিকাছে! আচ্ছা মায়েদের এত বড় চুল কেন বলোতো? আর সেই চুল এলোইবা কেন থাকে, যাতে করে পিঠ ঢেকে যায়! সব ঠাকুরেরই এরকম দেখেছি– লক্ষ্মী, সরস্বতী, দুর্গা আর সেরা থাকে মায়ের – মা কালীর! কেন গো?’

গৌরী উত্তর দিতে যাবে, এমন সময় যমুনা এসে হাজির। আজ সে সূচসুতো সব গুছিয়ে রেখে গেছে। এসেই মালা গাঁথতে বসে পরল। গৌরী বলতে থাকলো, ‘আসলে কি জানিস তো গঙ্গা মা! মাতৃরূপের সম্মুখ হতে জন্ম নেয় যত শুভ আছে সবকিছু, আর পিছন হতে জন্ম নেয় অশুভ সকল কিছু। কেমন? যেমন ধর লক্ষ্মীর পিষ্টদেশ থেকে জন্ম নেয়, অলক্ষ্মী, অশুচি এইসব! আবার দেখ, সরস্বতীর ক্ষেত্রে! তাঁর পিষ্ট দেশ হতে জন্ম নেয় অবিদ্যা আর স্বয়ং আদিশক্তির ক্ষেত্রে দেখ! তাঁর পিষ্ট দেশ হতে অপস্মারের জন্ম! আর এই সব অশুভ শক্তি যে তাঁর নিয়ন্ত্রনে রয়েছে, সেইটার জন্যই তো মায়ের এত বড় চুল – যেন চুলের আচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে সেই অশুভ শক্তিগুলোকে ভ্রমিত করে দিয়েছে!

গঙ্গা এতক্ষণ মন দিয়ে শুনে বলল, ‘এই সমস্ত মহাজ্ঞান তুমি কোথা থেকে পাও বলতো! এ সব তো কোন বইতেও পড়িনি! তোমার বইয়ের নাম কি গো?’

‘শুনবি নামখানা?’ গৌরী বলল, ‘তাহলে শোন – সেই বইয়ের নাম শিব’।

‘আর সেই বই কোথায় কিনতে পাওয়া যায়? কৈলাসে?’ এই বলে কি হাসি গঙ্গার।

গৌরীও মৃদু হেসে উত্তর দিল, ‘না রে! কৈলাসে নয়! ওই বইয়ের কথক অন্তরাত্মা, আর সেই বই লেখে মন, আর ছাপা হয় কোথায় জানিস? … মাথায়! … আর জানিস সেই বই কোথায় কিনতে পাওয়া যায়? … ওটা কিনতে পাওয়া যায় সেই মানুষ রূপি বাজারে, যার চেতনা জাগিয়ে দিয়েছে পরা-আদিশক্তি! …… আরও শুনবি? … সেই বই কোন দোকানে কিনতে পাওয়া যায়? …… সেই বাজারের কণ্ঠ রূপি দোকানে!’ এই বলে খিল খিল করে হাসি সে কি গৌরীর।

অন্য দিকে যমুনার মালা গাঁথা শেষ। গৌরীর চুল বাঁধাও প্রায় শেষ। সেই জুঁইয়ের মালা দিয়ে ভালো করে বিনুনি তৈরি করে দিলে, গৌরী এবার গঙ্গার চুল বেঁধে দিতে বসলো। গঙ্গার মাথাতেও চুল কম নয়, কিন্তু গৌরীর চুলের কাছে কোথায় লাগে সেই চুল! গঙ্গার জন্যও যমুনা আজ মালা গেঁথেছে। সেই মালা দিয়ে গৌরী খুব সুন্দরভাবে খোঁপা করে দিল গঙ্গার মাথায়! তারপর যমুনা আজ বায়না ধরেছে, ওকেও বিনুনি করে দিতে হবে। গৌরী মিষ্টি হেসে ওর মাথায় সুন্দর করে বিনুনি বেঁধে দিল। তারপর তিনজনে মিলে তুলসীতলায় সন্ধ্যে দিয়ে গৌরীকে নিয়ে বসে পরল গল্পের শেষটা শুনতে। গৌরী বলতে শুরু করলে, এবার তন্ময় হয়ে দুই বোন শুনতে থাকে। গঙ্গা যমুনা দুজনেই যেন অন্তরে কৈলাস দর্শনের আকাঙ্ক্ষা অনুভব করছে! শিবের দেশ! কে জানে, সেটি কেমন আসলে! অনেক ছবি দেখেছে, অনেক কথাও শুনেছে – আজ একজনের মুখে শুনতে চলেছে, যে তাদের সব থেকে কাছের লোক! গৌরী বলে চলল –

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6