বিসর্জনে কৈলাস | রোমাঞ্চ উপন্যাস

তবে যমুনার যখন ঘুম ভাঙল, তখন বাজে সাড়ে সাতটা। তাকিয়ে দেখল গৌরীর স্নান হয়ে গেছে। গঙ্গা একটা লাল পেড়ে হলুদ ছাপা শাড়ী আর তার সাথে লাল ব্লাউজ গৌরীর জন্য বার করে রেখেছিল –সেটা পরে ধ্যানে রয়েছে, না জপ করছে, ঠিক বুঝতে পারল না। তবে ওর ওষ্ঠ যুগল নড়ছে, আর নিশ্বাস প্রশ্বাস চলছে –এ ছাড়া আর কিছু বোঝা গেল না। যমুনা আস্তে করে উঠে কলঘরে চলে গেল। প্রাতঃক্রিয়া সেরে এসে যমুনা দেখল, গৌরী একইভাবে বসে আছে। খুব সন্তর্পণে বাসি জামা পাল্টে, মশারিখানা তুলবে, নাকি তুলবেনা ভাবছে, এমন সময় হাত লেগে টেবিল ঘড়িখানা পরে গেল! গৌরী যেন সম্পূর্ণ একটা অন্যজগতে ছিল। ঘড়ি পরার আওয়াজে সে আবার এই জগতে ফিরে এলো।

যমুনা যেমন ওর দিদির থেকে বকা খায়, তেমনই বকা খাবে ভেবেছিল। কিন্তু প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বিপরীত। গৌরী নরম সুরেই বলে উঠলো, ‘কি গো তুমি উঠে পরেছ!’

যমুনা ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, ‘আসলে … আমি ঠিক! মানে!’

‘ঠিক আছে!’ গৌরী মিষ্টি স্নেহভরা স্বরে বলে উঠলো, ‘অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। আমি উঠেই পরতাম!’ ‘গৌরী দিদি! আমি কিন্তু আজ নদীর ধারে যাব না!’যমুনার সরল স্বীকারোক্তি।

‘ও মা কেন!’গৌরীর হাসিভর্তি মুখ থেকে বেরিয়ে এলো শব্দখানা। যমুনা একদিকে আনমনা হয়ে গৌরীর সমস্ত শরীরে, বিশেষ করে তার মুখে রোদ্দুর পোরে যে অদ্ভুত আলোড়ন সঞ্চার করেছে, তা দেখছিল। তাই গৌরীর কথাটা সে ঠিক শুনতেই পায়নি। গৌরী ফিরিয়ে প্রশ্ন করল এবার, ‘যমুনা মা! নদীর ধারে আজ যাবেনা কেন?’ এবারে যমুনার ঘোর কেটেছে। এতক্ষণ যেন সকালের প্রথম রোদ্দুরে একটি পদ্মফুল দেখছিল। সে বলে উঠলো, ‘তুমি বলবে বলেছিলে না, কেমন করে কৈলাস পৌঁছলে! জলখাবার খেয়ে সেই কথা শুনবো কিন্তু!’

গৌরী হেঁসে উত্তর দিল, ‘তোমার দিদি কি তখন ফাঁকা হয়ে যায়! ওরও খুব মনে মনে জানার ইচ্ছা সেই ব্যাপারটা। তাই আর কি!’

‘হ্যাঁ আমরা তিন জনেই তো একসাথে রান্না করবো। তখন রান্নার সাথে সাথে শুনবো। কি তখন বলবে তো?’ যমুনার কথা শেষ হতেই গৌরীর উত্তর, ‘বেশ তাই হবে। এখন তাহলে নিচের ঘরে যাওয়া যাক!’

জলখাবার খেয়ে গঙ্গা মুখ্য ভূমিকা নিয়ে রান্নাঘরে প্রবেশ করল। গঙ্গার গৌরীর উদ্দেশ্যে সকালের প্রথম প্রশ্ন, ‘ঘুম হয়েছে রাত্রে? বোন বেশি বিরক্ত করেনি তো?’ গৌরী বলে উঠলো, ‘না না! যমুনা তো লক্ষ্মী মেয়ে! ও আবার বিরক্ত করতে যাবে কেন?’ গঙ্গা যেন প্রশ্নের তালিকা হাতে নিয়ে বসে আছে। একের পর এক প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করে গৌরীকে আজ নাজেহাল করে দেবেই, এমনই ওর জেদ। আবার প্রশ্ন করল ও, ‘শুনলাম খুব সকাল সকাল উঠেছ! তারপর নাকি মাটিতে বসেছিলে! কি! তোমার বরের সাথে কথা বলছিলে নাকি!’গৌরী যেন লজ্জা পেয়েই বলে উঠলো, ‘ওই আর কি!’এই উত্তর শুনে গঙ্গা বিদ্রূপ করার মতন করে গৌরীর মুখের দিকে তাকাল।

গঙ্গা গৌরীর দিকে তাকাল, নাকি গৌরী উত্তরটাই এমন দিল যাতে গঙ্গা তাকাতে বাধ্য হয়, ঠিক বোঝা গেল না। কিন্তু গঙ্গা, গৌরীর দিকে তাকিয়ে  যে কাজটি করছিলো, কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চিতভাবে ভুলে গেছিল। গৌরীর মুখে কি এক অদ্ভুত দিব্য আলো। ওর ওই সুন্দর, মিষ্টি আর শুভ্র মুখখানা যেন সারা জগতকে আলো প্রদান করছে। কনো কথাতে নয়, গঙ্গার নিজেরই হঠাৎ হুঁশ হল–কি আজে বাজে ভাবছে ও! জানলা থেকে রোদ্দুরের আভা গৌরীর মুখে এসে পরেছে –তাতে তার বাঁ কানের আর নাকের গহনা এমন চক-চক করছে, যেন মনে হচ্ছে গৌরীই আলো বিকিরণ করছে!’ ওফ্ আমিও যমুনাটার পাল্লায় পরে, কিসব ভাবতে আরম্ভ করেছি!’ মনে মনেই গঙ্গা বলে উঠল।

গঙ্গা এবার গৌরীর উদ্দেশ্যে বলল, ‘হ্যাঁ গো গৌরী! তুমি আমিষ খাও তো, নাকি শুধু নিরামিষ! মানে আজ আমাদের পুকুরে খুব ভালো কাতলা মাছ উঠেছে –অন্যদিন জেলেদের বাজারে দিয়ে দিতে বলি! আজ তুমি আছ, তাই একটা রেখে দিতে বলেছিলাম! তো তুমি মাছ খাও তো!’

গৌরী একটু বেজার মুখ করেই বলল, ‘তুমি আমাকে সন্ন্যাসী বানিয়েই ছাড়বে নাকি গো! কাল থেকে আমায় সন্ন্যাসী সন্ন্যাসী ভাব দেখাচ্ছ! সন্ন্যাস ভাব আমার ভালো লাগে না! কিরকম নিরস নিরস! সবই খাই গো, সব খাই! কিন্তু কম খাই –বেশী খেতে পারি না! আসলে অনেক মুখে খাই তো!’

শেষের কথাটা গঙ্গা ঠিক শুনতে পায়নি। ‘কি বললে, কি দিয়ে খাও!’ গঙ্গা প্রশ্ন করল। উত্তরে গৌরী বলে উঠলো, ‘বাপু তোমাদের বাড়িতে কোথাও সিঁদুর খুঁজে পেলুম না জানো! আমি তো স্নান করে উঠে সিঁদুরই পরতে পারলুম না! কি করব!’

গঙ্গা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, পোস্তর বড়াটা নামিয়ে যমুনাকে বলল, ‘হ্যাঁ রে যমুনা! সত্যিই তো। ও তো আমাদের মত আর অবিবাহিত নয়! যা না বাবা, ও ঘরের বাঁ দিকের কুলঙ্গির উপর টাকা রাখা আছে, একটা সিঁদুরের বাক্স নিয়ে আয় না!’

‘আচ্ছা আনছি’ বলতে বলতে যমুনা পোস্ত বাঁটার শীলনোড়াটা ধোয়া শেষ করে সেটিকে জল ঝরতে দাঁড় করিয়ে রেখে ছুটল। গঙ্গা এবার চেঁচিয়ে যমুনাকে বলল, ‘আর শোন, একটু বেশী করে টাকা নে তো!’

পাশের ঘর থেকে যমুনার সারা এলো, ‘আচ্ছা!’

টাকা নিয়ে যমুনা, গঙ্গার কাছে এসে বলল, ‘আর কি আনতে হবে দিদি?’

‘হ্যাঁ, তুই একটা আলতার শিশিও আনবি। আর তার সাথে একটা কমদামী সিঁদুর কৌঁটো আনিস। হ্যাঁ কম দামিই আন, তুই ঠিক চিনতে পারবি না। আমি যখন পরে বেরুবো, তখন ভালো দেখে একটা সিঁদুরের প্যাকেট কিনে আনব’।

যমুনার যে এত বিচার করার ক্ষমতা, সেটা গঙ্গা জানতোই না। যমুনার উত্তর শুনে, তাই সে অত্যন্ত অবাক হয়ে গেল। যমুনা গৌরীকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আনন্দের সাথে বলে উঠলো, ‘তাহলে গৌরী দিদি আমাদের সাথেই থাকছে, তাই না দিদি?’

গঙ্গা এবার যমুনার উপর উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো, ‘তোর কি কোনদিনও কাণ্ডজ্ঞান হবে না! দেখছিস মেয়েটা বঁটি নিয়ে কুটনো কাটছে। এই অবস্থায় কেউ পিছন থেকে এরকম করে ধরে! কোন বিপদ হয়ে গেলে!’

যমুনার আনন্দের যেন কনো ঘাটতিই নেই। সে আনন্দের সাথেই গৌরীর উদ্দেশ্যে বলল, ‘দেখেছ বললাম না! দিদির বাইরেটাই কঠিন। ভিতরে খুব নরম ও!’

গৌরী এই কথায় মুচকি হাসলেও, গঙ্গা বোনের বদমাইশি বুদ্ধি দেখে, একটু মা মা হাসি দিল। হাসির ভাবই যমুনাকে বলে দিলো, ‘যা তাড়াতাড়ি আন গে। এদিকে অনেক কাজ পরে আছে! … পাগল মেয়ে একটা!’

যমুনার যেন পায়ে চাকা লাগানো। ছুটে গেল আর ছুটে এলো! এত তাড়াতাড়ি গিয়ে সে চলে এলো দেখে, গঙ্গা কিছু না বলে, শুধুই মাথা নাড়ল, সেখানেও মা মা ভাব একটা! তবে গৌরীকে দেখে যমুনাও বেশ অবাক হয়ে গেল। সে এই গেল আর এই এলো –গৌরীর এরই মধ্যে সব কুটনো কাটা হয়ে গেছে! মুখে কিছু না বললেও, মনে মনে তার বড় আনন্দই হয়েছে। আসলে, দিদি কাজ করার সময়ে অহেতুক কথা পছন্দ করে না। তাই রান্নার কাজ যত তাড়াতাড়ি শেষ হয় ততই ভালো –তত তাড়াতাড়ি যমুনা, গৌরীর থেকে কৈলাস যাত্রার গল্প শুনতে পারবে।

যমুনা দেখল দিদিরও মাছ চাপানো হয়ে গেছে। তাই সে তাড়াতাড়ি চাল ধুয়ে ভাতটাও চাপিয়ে দিল। মাছের তরকারিটা সাঁতলাতে সাঁতলাতে ভাত হয়ে গেল, যমুনা ভাতের হাড়ি উল্টে ফ্যান ঝরতে দিল। মাত্র এগারোটা বেজেছে আর পুরো রান্না শেষ –আজ তিন হাতে রান্না হয়েছে কিনা। দুই বোন চুপচাপ রান্নাঘরে বাকি কাজগুলো সারছিল –যেন দুজনেরই তর সইছে না –কখন রান্না শেষ হবে, কখন গৌরীর মুখ থেকে গল্প শুনবে। দুই বোন রান্না সেরে এই ১১.১৫ নাগাদ অন্য ঘরে এসে দেখে, তৃতীয় আসন, যেটা গঙ্গা শেষ করার আর সময় পায়নি, গৌরী সেটার সমাপ্তি ঘোষণা করার অপেক্ষায় রয়েছে। আসনের কাজ অল্পই বাকি ছিল, কিন্তু এতটাও কম বাকি ছিল না যে মাত্র ১৫ – ২০ মিনিটের মধ্যে পুরোটা শেষ হয়ে যাবে! গঙ্গা একটু সঙ্কোচ নিয়ে এবারে বলল, ‘তুমি আবার ওসব করতে গেলে কেন!’

গৌরীও কেমন যেন অপরাধীর সুরে বলল, ‘না আসলে কালকে তুমি আসনে বসতে পারনি –দেখলুম এই আসনটার আর একটুখানি বাকি! মানে… ঠাণ্ডা পরছে তো –মাটি থেকে ঠাণ্ডা উঠছে –তাই আর কি…!’

যমুনা যখন খুবই ছোট ছিল, তখন ওদের মা মারা যায়, কিন্তু ততদিনে গঙ্গার বোধবুদ্ধি হয়ে গেছিল। এক নিমেষে গৌরীর আচরণ ওকে তাদের মায়ের কথা মনে করে দিল। গঙ্গার চোখটা আবেগে আর অহেতুক ভালোবাসা দেখে ছল ছল করে উঠলো। একটু আদুরে স্বরেই সে বলে ফেলল, ‘তোমার কৈলাস যাত্রার গল্প শুনবো কিন্তু ! শোনাবে না!’বলে ফেলেই তার মনে হল, ‘গৌরী কি তার মায়ের জায়গা নিয়ে ফেলছি না কি!’

‘শোনাব বই কি! এসো বস! আগে দেখ, আসনটা হয়েছে?’ গৌরীর উত্তরে গঙ্গা বলতে থাকল, ‘এত তাড়াতাড়ি তুমি পুরো আসনটা শেষ করলে কি করে?’

গৌরীর উত্তরে গঙ্গা যে কেন সন্তুষ্ট হল, সেটাই ও বুঝতে পারল না। গৌরী বলল, ‘না আসলে এই ঠাণ্ডায় তোমার খুব কষ্ট হচ্ছিল কি না!’ আসলে এটা তো কোন উত্তরই নয়, কিন্তু এই কথার মধ্যে যে আদর আর স্নেহ রয়েছে, সেটাই বোধ হয় গঙ্গাকে তৃপ্ত করে দিল।

এবার গৌরী বলতে শুরু করল, তার কৈলাসযাত্রার বিবরণ। গঙ্গা, যমুনা যেন মুগ্ধ হয়ে শুনল। বেঁচে থাকতে গিয়ে জগতের প্রতি গঙ্গার যে চরম জটিল আর অবিশ্বাসী মানসিকতা জন্মেছিল, সেটা যেন ওর সামনে একবারও বাঁধা হয়ে উঠতে পারল না। অকপটভাবে গৌরীর মুখ থেকে নির্গত প্রতিটা শব্দকে শুধু স্বীকারই করল না, উল্টে প্রতিটি শব্দকে সে আলিঙ্গন করে নিল। যমুনার তো এমনিই সরল মন। ও শুধু কথা বিশ্বাস করে না – ও পুরো ব্যক্তিটাকে বিশ্বাস করে নেয়। এই অল্প সময়ের মধ্যেই গৌরী ওর কাছে সব চাইতে বিশ্বাসযোগ্য পাত্রী হয়ে গেছে, মানে, গৌরীর প্রতিটা কথা যেন যমুনার কাছে বেদের পংক্তি। সব মিশিয়ে পুরো ঘরটায় এমন একটা বাতাবরণ তৈরি হল যে শুধুই গৌরীর মিষ্টি কণ্ঠস্বরটাই শোনা গেল। আর যত গল্প এগোতে থাকল, ততই যেন গৌরীকে দুই বোনই আপন করে নিতে থাকল।

এতটাই আপন যে, যমুনা গৌরীর বাম কোলে মাথা রেখে ওর মুখের দিকে নিজের মুখ রেখে পুরো গল্পটা শুনতে থাকলো , আর গঙ্গা একটু দেরিতে হলেও শেষে নিজের পুরো শরীরটাই গৌরীর ডান কাঁধে এলিয়ে দিল– যেন মুখের কাছে কান নিয়ে চলে গেল, পাছে গল্পের শব্দ যেন বাদ না পরে যায়! গৌরীরও অদ্ভুত স্নেহ প্রদানের ক্ষমতা দেখা গেল। যমুনার ডান হাতের উপর নিজের বাম হাতটি রেখে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকল, আর অন্যদিকে ডান হাতটা ঠিক তানপুরা ধরার মতন করে গঙ্গার সারা শরীরটাকে বেষ্টন করে নিল, ঠিক যেমন মা নিজের সন্তানকে বুকের কাছে টেনে নেয়, তেমন করে।

যমুনা গৌরীকে একইরকম আঁকড়ে পরে থাকলেও, গঙ্গার হাত আস্তেআস্তে গৌরীকে জড়িয়ে ধরার মত করে আলিঙ্গনেই বদ্ধ করে নেয়। আসলে গঙ্গাও খুব ছোট্ট বয়সে বাব-মা ছাড়া হয়েছে, কিন্তু ছোট বোনটাকে মানুষ করার জন্য অন্তরের সব স্নেহলাভের ইচ্ছাকে স্নেহ প্রদানের ইচ্ছাতে পরিণত করে ফেলেছিল। আজ যেন সেই স্নেহ ফিরিয়ে দিতেই গৌরীর আগমণ। এক কথায় বলতে গেলে, দুই বোন এমনভাবে গৌরীকে বেষ্টন করেছিল, যে সামনে থেকে দেখলে, গৌরীকে আর দেখাই যাবে না। ঠিক যেন, এক মায়ের কোলের দুই সন্তান!

গৌরীর কৈলাস যাত্রার বিবরণ অনেকক্ষণ আরম্ভ হয়ে গেছে –

‘আমার বড়দিদি আমাকে বলত, শিবের ঘর কৈলাসে আর অমরনাথে শিবের খুব আনাগোনা। অমরনাথ হল কাশ্মীরে মানে ভারতে আর কৈলাস হল ভারতের বাইরে। এই বড়দিদিই, যা টাকা জমাত সব আমার জন্য একটা টিনের বাক্সে রেখে দিত। যখন শিবের কাছে যাব বলে ঠিক করলাম, প্রথম সেদিনই বাক্সটা আমি খুলি – খুলে গুনে দেখি ১২৫০০ টাকা আছে। আমি জানি না এতে আমার অমরনাথ যাত্রা হবে কি না! কিন্তু সব টাকা নিয়ে একবস্ত্রে বেড়িয়ে পরি। সেই প্রথমবার আমার একা একা বাড়ির বাইরে পা দেওয়া। বয়স তখন আমার ১৬ ছেড়ে ১৭ হবে হবে করছে। বাড়ি থেকে রাতের অন্ধকারেই বেরুতে হবে – তাই করলাম। তবে যাবার আগে মামার উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখে এসেছিলাম। চিঠি বলা ভুল হবে –অত বড় লেখা আমি লিখতে পারিনা। তাই একটা ছোট কাগজে লিখে এসেছিলাম – ‘আমি শিবের ঘরে চললাম’।

কি করে যাব তা তো আমি জানি না! তাই পাড়ার মাথায় যে চায়ের দোকানের কাকাটা আছে তার কাছে গেলাম। কাকা আমাকে আর বড়দিদিকে খুব ভালোবাসতো। আমি গিয়ে দাঁড়াতেই, কাকা তাকিয়ে বলল, কি ব্যাপার গৌরী মা, এত রাত্রে! তোর মামা কই?

আমি চোখের ইশারায় বললাম, একবার উঠে আসতে। উনি এলেন। আমি তখন বললাম, কাকা! আমার বিয়ে তো শিবের সাথে হয়েছে। তাই আমি ঠিক করেছি শিবের কাছে গিয়ে উনার সাথেই ঘর বাঁধবো। সেই কথা শুনে কাকা কেন জানি না – হো হো করে হেঁসে উঠল। বলল, দেখ মেয়ের কাণ্ড!

আমি তাকে আরও আস্তে আস্তে বললাম – না গো কাকা আমি যাচ্ছি অমরনাথে। ওখানে শিব মাঝে মাঝে আসে। কিন্তু কি করে যেতে হবে তা তো জানি না! আমায় একটু বলে দাও না গো– তুমি তো অনেক জায়গায় গেছ!

কাকা অনেকভাবে আমায় বোঝাবার চেষ্টা করল, যাতে আমি বাড়ি ফিরে যাই। আমি শেষে জেদ ধরেই বললাম – দেখ কাকা, তুমি আমায় বললেও আমি শিবের কাছে যাব, না বললেও যাব! যদি একটু বলে দিতে তো ভালো হত। যদি না বল, তাহলে আর কি করবো– লোককে জিজ্ঞেস করতে করতেই যাব!

এই কথা শোনার পর, খানিকক্ষণের জন্য কাকা কেমন যেন চুপ করে গেল। তারপর বলল, তুই যে যাবি, তোর মামা তো জানে না! আমি সম্মতি দেওয়াতে উনি বললেন, কাল সকালে উঠে যখন জানবে, কি ভাববে!

আমি বললাম, কেন মামী মামাকে বলছিলেন – এমন লোকের সাথে ভাগ্নির বিয়ে দিলে যে তার ঘর দোর কিছুই নেই – কিন্তু আমায় বড়দিদি বলেছিল – শিবের বাস কৈলাসে, আর ওর নাকি অমরনাথের গুহায় খুব আনাগোনা! তাই আমিও বরের কাছে গিয়ে দেখিয়ে দেব – আমার বরের ঘর দোর আছে – বেশ ভালো আছে!

কাকা আবার হাসে – সে যে কি বাজে হাসি কি বলবো। যেন মনে হল কি অপরাধ করে ফেলেছি, কথাটা বলে! আমি একরকম রেগেই বলে উঠলাম – বেশ তুমি হাস কাকা, আমি চললাম!

কাকা তখন আমাকে দাঁড়াতে বলে, বলল – আচ্ছা বেশ তুই যাবিই! এটাই বোধ হয় তোর নিয়তি! বেশ যা! শোন অমরনাথ যেতে হলে প্রথমে শ্রীনগর যেতে হবে, ট্রেনে করে জম্মু যেতে হবে। হাওড়া ষ্টেশনে আগে যা। সেখান থেকে জম্মু তাওয়াই এর ট্রেন ধরে জম্মু পৌঁছা। ওখানে গিয়ে একটা গাড়ি ভাড়া করে শ্রীনগর পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে পাহাড়ের পথে হেটে ১৪ কিলোমিটার উঠতে হয়, তবেই অমরনাথ গুহা। আর শোন – জিজ্ঞেস করলে বলবি, বালতাল হয়ে যাবি – পয়সা কম লাগবে। দাঁড়া তোর মনে থাকবে না – আমি তোকে একটা কাগজে লিখে দিচ্ছি। আর হ্যাঁ রে টাকা পয়সা কিছু আছে?

আমি বললাম, কত লাগবে গো কাকা? কাকা বলল, এই হাজার তিনেকের মতন থাকলে গিয়ে ফিরে আসতে পারবি। আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, হ্যাঁ আছে! কাকা বলল দাঁড়া। এক মিনিট দাঁড়া! এই বলে গুমটির মত দোকানটায় ঢুকে তার ছোট্ট ফোনটা নিয়ে এলো। এসে কি সব করে একটা ফোন করল – তারপর হিন্দিতে কথা বলল, হোসেন বেটা! কেয়সে হো আপ! সালাম ওয়ালেকুম! পেয়চানা মুঝে! …… ঠিক ঠিক। আপকা বিবি মাতলাব মেরি বেটিয়া কেইসি হে! …… আচ্ছা বহুত খুব। বহুত খুব। …… আচ্ছা শুনিয়ে না … মেরা এক মদত কর দেঙ্গে! …… বাত ইয়ে হে কি, ইহা কলকাত্তা মে, মেরা এক বেটিয়া হে। ও অমরনাথ জানে কেলিয়ে বহুতই উতাবলা হো রেহি হে! বালতাল, বারাই, সঙ্গম হোকে, উসকো অমরনাথ পৌঁছা সাক্তে হে! …… নেহি আখের মে বাত ইয়ে হে কি, উসকি পাস জাদা পেয়সা নেহি হে…। নেহি কুছ তো লিজিয়েগা জরুর! …… আচ্ছা ঠিক হে। তব মে উসকে হাত মে এক খত দেতা হু। আপকা নাম ওর ফোন নাম্বার লিখকে। ঠিক হে! ও তো আপকো নেহি পেয়চানেগি, লেকিন মে বোল দেতা হু – ও দেখনে মে বহুতি খুব সুরত হে – গোরি হে ওর ও লাল রঙ কা শাড়ী পেহেনা হুয়া হে। শ্রীনগর বাসস্ট্যান্ড মে ও আপকা ইন্তেজার কারেগি। কিস দিন… কিস দিন… আজ ২১ সিতাম্বর হে না! ও ২৫ সিতম্বর কো সুভে বাস স্ট্যান্ড মে ইন্তেজার করেগি। উসকে পাস ফোন তো নেহি হে…… নেহি ঠিক হে ও আপকো ইসি নম্বার সে ফোন কর লেগি…… নাম বাতায়েগি গৌরী। …… মদত কর দিজিয়ে গা হা …… হা খুদা হাফিস্।

কথা বলা হয়ে গেলে, কাকা দোকানের ভিতর চলে যায় – আর সেখান থেকে আমার জন্য একটা ছোট ফোন নিয়ে এসে আমায় দেয়। বলে, দাঁড়া এই ফোন থেকে সব নম্বর বার করে দিই। কিছুক্ষণ ফোনটা নিয়ে কি সব করে, আমাকে একটা কাগজে নম্বর লিখে দিল আর সেই নম্বরটাতে ওই ছোট ফোন থেকে একটা ফোন করল। ফোনটা সেই লোকটাকেই করেছে সেটা বুঝতেই পারলুম। ফোন করে বলল কাকা, হা হোসেন … ইসি নম্বার সে ফোন জায়েগি তোমারে পাস … ঠিক হে! …… হা গৌরী! বলে ফোনটা কেটে আমায় ফোনটা ধরিয়ে দিল। দিয়ে বলল, ফোন ব্যবহার করতে পারিস? আমি বললাম হ্যাঁ একটু একটু। উনি বললেন, বেশ দেখ তো, শেষ যেই নম্বরটাতে ফোন করলাম, সেটার কাছে যেতে পারিস কিনা! আমি করে দেখাতে বলল, বাহ এবার যা। শ্রীনগরে পৌঁছে এই নম্বরে একটা ফোন করে বলবি – তুই গৌরী বলছিস। ছেলেটার নাম হোসেন – আলাম হোসেন। আসলে যখন কাশ্মীর বেড়াতে গেছিলাম, ওর বউয়ের বরফে পা আটকে গেছিল – আমি আর তোর কাকিমা খুব চেষ্টা করে ওকে বরফ কেটে বার করেছিলাম। তাই আমায় ও খুব মান দেয় – প্রায় ছয় বছর হয়ে গেছে – দেখলি না কেমন এককথায় চিনতে পারল। ঠিক আছে – যা সাবধানে থাকিস। আমি এই কথা কাউকে বলব না। কিন্তু দেখ এই ফোনে আরও একটা নম্বর রয়েছে – এইটা আমার নম্বর। কোন বিপদ আপদ হলে ফোন করতে ভুলবি না। আর এই নে এই কাগজটা রাখ। হেসেনের সাথে দেখা হলে ওকে এই কাগজটা দিবি। ঠিক মনে থাকবে তো! আমি ঘাড় নেড়ে, কাকাকে একটা প্রণাম করে চলে গেলাম। কাকা হরিদেবপুরের একটা মিনিবাসে আমায় তুলে দিল। আমি চলে এলাম হাওড়া ষ্টেশনে। ’

গৌরী বলতে থাকলো, – ‘ষ্টেশনে পৌঁছে একটা কালো কোর্ট পরা লোকের কাছে গিয়ে বললাম আমি জম্মু যাবো। সেই লোকটা চশমার ফাঁক দিয়ে আমায় দেখে জিজ্ঞেস করল, কিসে যাবেন! আমি বললাম, তা তো জানি না –জানিনা বলেই তো তোমাকে জিজ্ঞেস করছি। সে আবার আমাকে চশমার ফাঁক দিয়ে দেখে বলল, জেনারেলে যেতে পারবে! আমি বললাম হ্যাঁ। উনি আবার বললেন, অনেক লোক থাকবে কিন্তু! আমি বললাম, তাতে কি হয়েছে!’

বেশ বেশ, বলতে বলতে তিনি আমার নাম আর বয়স জিজ্ঞেস করলেন। তারপর বললেন – আজকের ট্রেন চলে গেছে। কাল ট্রেন ছাড়বে রাত্রি ১১.৫০ এ। আমি বললাম “ঐ ট্রেনেই আমি যাবো”। শুনে তিনি আমার থেকে ট্রেনের ভাড়া বাবদ ৪১৩ টাকা চাইলেন। আমি টাকাটা দিতেই সামনের একটি ঘরের কাছে গিয়ে একটা কাগজ নিয়ে এসে আমার হাতে দিয়ে বললেন এটা তোমার ট্রেনের টিকেট, ২৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন আসবে, ট্রেন দিলে উঠে পরবে।

লক্ষ্মী মেয়ের মত সেটা হাতে নিলাম, নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। কি মনে হল, ফিরে এসে আবার জিজ্ঞেস করলাম – ট্রেনের নাম কি জেনারেল! লোকটা হা করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, পড়াশুনো জানো? আমি ঘাড় নাড়তে, উনি বললেন, কাগজে লেখা আছে ট্রেনের নাম। প্রথমে নাকি ইঞ্জিন পরবে, তারপর কি একটা সেল বলল, সেটা পরবে, তারপর যে প্রথম কামরা পরবে, তাতে সবার আগে উঠে বসে পরতে বলল।

গঙ্গা এতক্ষণ গৌরীর কথা মন দিয়ে শুনছিল। এবার একটু হাসতে হাসতে আর একটু বেশী করে জড়িয়ে ধরে ডান কোলে শুয়ে পরে বলে উঠলো, ওটা পার্সেল, ‘কি সেল’ নয়!

‘হ্যাঁ হ্যাঁ ওই ওই’, বলে গৌরী আবার বলতে থাকল। ‘আমি ওই ২৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে গিয়ে কোথায় বসি, কোথায় বসি, ভাবছি, অমনি আবার একটা কালো কোর্ট পরা লোক এগিয়ে এলো। এই লোকটা একটা জোয়ান ছেলে। এসে হিন্দিতে বলল, কাহা যানা হ্যাঁ আপকো! বড়দিদি আমায় হিন্দি ভাষাটা ভালো করেই শিখিয়েছে। আমি তার মুখের উপর কাগজ দেখিয়ে বললাম, “হিমগিরি যাব। কেন!”

সেই লোকটা হাসতে হাসতে হিন্দিতেই বলল, ঠিক হ্যে, আপনি ওখানেই বসেন। বলে একটা সুন্দর ঘেরাটোপের মত জায়গা ছিল, সেখানটা দেখিয়ে দিল। আমি চলে গেলাম আর বিরক্ত হয়ে খালি ভাবছিলাম, খালি এখান থেকে ওখান আর ওখান থেকে এখান, এই করছি। যাই হোক, একটা পাথরের বেঞ্চির উপর গিয়ে বসলাম। বসে থাকতে থাকতে কখন যে বেঞ্চিটা দখল করে ঘুমিয়ে পরেছি, বুঝতেই পারিনি। ঘুম ভাঙল পরের দিন সকালে। ’

গঙ্গা বলল, কি করে বুঝলে যে পরের দিন?

গৌরী আবার বলতে থাকল –ঘুম থেকে ঊঠে সামনেই একটা কালো কালো যন্ত্র ছিল, সেখানে লেখা উঠছিল – ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮। সময়ও লেখা ছিল সকাল– ১০ টা ৩৭ মিনিট। আমি আগের দিন যখন ওখানে বেঞ্চির উপর বসেছিলাম, তখন ওখানে ২২ তারিখই দেখাচ্ছিল, তবে তাতে লেখাছিল, ২ টা ২৮ মিনিট –মানে রাত প্রায় আড়াইটা। আমি বুঝি গো! কিছু বুঝি!

তো শোন না, ঘুম ভাঙতে দেখি সেই কালো কোর্ট পরা জোয়ান ছেলেটি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ধরমরিয়ে উঠে পরলুম। ভাবলুম, এখানে শুয়ে পরেছি বলে ডাকতে এসেছে। উঠে বসতেই সে হিন্দি বাংলা মিশিয়ে বলে উঠলো, আপনার টিকিটটা একবার দেখান না। আমি হিন্দি বলতে ভুলে গেছিলুম প্রথমটা। বাংলাতেই বললাম, “কেন দেখাব তোমায়!”

সে হেসে বলল, “আমি রেলেরই কর্মী – টিকিটটা দেখান, সাহায্য করার জন্যই চাইছি”। আমি ভয়ে ভয়ে কোমরে যে কাগজটা গুঁজে রেখেছিলুম, সেটা দিলুম।

সে কাগজটাতে চোখ বুলিয়ে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল –আপনি জেনারেলে যেতে পারবেন? ওখানে তো অনেক ভিড় হবে!

আমি ঠিক বুঝতে না পেরে বললাম, কি বলছ ভিড়! লোকটা বলে, হ্যাঁ ভাবিজী ভিড় হবে অনেক। সে কোমর থেকে একটা কাগজের বান্ডিল বার করে বলল, এক কাজ করুন – আপনি তো আগে ৪১৩ টাকা দিয়েছেন, তাই না! আমি হ্যাঁ বলতে ও বলল, আমাকে আরও ৩৫০ টাকা দিন – আমি আপনাকে একটা স্লিপার ক্লাসের টিকিট কেটে দিচ্ছি। আমিও টাকাটা বের করে দিলাম। ’

তোমার থেকে চাইল আর দিয়ে দিলে! কেন চাইছে একবারও জিজ্ঞেস করলে না! গঙ্গা বলে উঠলো।

গৌরী বলে উঠলো, ‘কেন ও ছোকরা তো আগের দিন কালো কোর্ট পরে ছিল। ও রেল কা আদ্মি ছিল! এত সন্দেহ কেন বাপু মনে!

সে ছোকরা একটা বড় কাগজের রিল বার করে কি সব দেখল, দেখে একটা বান্ডিলের পাতায় আমার নাম, বয়স, কোথায় যাবো, কোন ট্রেন ধরব আর কোন সিটে বসব, সব লিখে দিয়ে আমার হাতে ধরিয়ে দিল আর বলল, ভাবিজী এখন আমি আসছি। ঠিক আছে? রাত্রি সাড়ে এগারটায় আপনার ট্রেন। আপনি এখানেই আমার অপেক্ষা করবেন। ঠিক আছে! আমি এসে আপনাকে ট্রেনে উঠিয়ে দেব। চিন্তার কোন কারণ নেই। আপনি শুয়ে পড়ুন আর হ্যাঁ, কিছু খাবার হলে (একটা কাঁচের ঘর দেখিয়ে বলল) ওখান থেকে খাবেন। খাবার সস্তাও হবে আর ভালও হবে।

আমি বলে উঠলাম, ওই কোর্ট পরা সাহেব যে বলেছিল, ট্রেনে সবার আগে উঠতে হবে!

ছেলেটি খুব ভালো, হেসে বলল, এখন আর তার প্রয়োজন নেই, ভাবিজী! এখন আপনার  রিজারভেশন রয়েছে। আপনি যেকোনো সময়েই ট্রেনে উঠতে পারেন। ঠিক আছে! এই বলে চলে যাচ্ছিল। আবার ঘুরে এসে হাঁটু গেড়ে ছোট ছেলের মত বসে বলল, আর হ্যাঁ, এই কথাটাও মনে রাখবেন – আপনি কোথায় যাবেন?

আমি বললাম, আমি জানি, আমি জানি, হিমগিরি!

ছেলেটা হেসে গড়িয়ে পরলো আর বলল, না আপনি যাবেন জম্মু, কোথায়? আমি বললাম জম্মু। ও বলল, ঠিক! আর আপনি কোন ট্রেনে যাবেন?

ও আবার হাসবে বলে আমি বললাম, জানিনা। ও মুচকি হেসে বলল, হিমগিরি এক্সপ্রেস। ঠিক আছে! তো আরও একবার বলুন আমায়  – কোথায় যাবেন আপনি?

আমি বললাম – জম্মু।

ও আবার বলল, কোন ট্রেনে যাবেন!

আমি বললাম, হিমগিরি এক্সপ্রেস।

ও হেসে বলল, ঠিক! আর ভাবিজী শুনুন, কেউ আপনাকে জিজ্ঞেস করলে এটাই বলবেন, আর বলবেন আপনার কাছে টিকিট আছে, কিন্তু কাউকে টিকিট দেখাবেন না, যদি না সেই লোক কালো কোর্ট পরা হয়। ঠিক আছে? আমি ঘাড় নাড়তে, মিষ্টি হেসে ছেলেটা চলে গেল।

ছেলেটা চলে যেতে আমি উঠে কলের কাছে গেলাম – মুখে চোখে একটু জল দিলাম। তারপর ট্যাঁক থেকে টাকা বার করে একটু কচুরি খেলাম – মেজদিদির কথা মনে পড়ছিল। ও কচুরি খেতে খুব ভালোবাসে। একটানা বসে থেকে আমার ভালোও লাগছিলো না। খুব শিবের কথা মনে হচ্ছিল। মানুষটা কেমন আছে কে জানে! আমার অপেক্ষায় বসে আছে বোধ হয়। কে যে খেতে দিচ্ছে, কি যে দিচ্ছে, কে জানে! এই ভাবতে ভাবতে কোন এক অন্য জগতে চলে যাই জানো!

সেখানে শুধুই আলো, শুধুই আলো। কতক্ষণ ওইখানে ছিলুম! – কেউ নেই, আমি একা আলোর সাগরে ঘুরে, নেচে বেড়ালুম। বাইরে যে আমার শরীরটা ঘটের মত উল্টে গেছে বুঝতেই পারিনি। হঠাৎ একটা ধাক্কায় চোখ খুললুম। এক খাঁকি পোশাক পরা মেয়ে ডাকছিল। চোখ যেন খুলতেই পারছিলুম না। কোনরকমে চোখ খুলেই প্রথম চোখ পড়ল সামনের ঘড়িটায় –২২ সে সেপ্টেম্বর ২০১৮ আর সময় দেখাচ্ছে ১৯ টা ৫৪ মিনিট।

মেয়েটা আমাকে কিছু প্রশ্ন করার আগেই আমার প্রশ্ন ওর কাছে পৌঁছলো– ১৯টা কটা গো! মেয়েটা দেখলাম হেসে উত্তর দিল – ১৯ টা মানে সন্ধ্যে ৭ টা। কোথায় যাবে তুমি! আমি বললাম – আমি! আমি যাবো … এই জম্মু। মেয়েটা বলল, হিমগিরি এক্সপ্রেসে! আমি ঘাড় নাড়লুম। মেয়েটা আবার বলল, স্লিপারে যাবে তো? আমি বললুম, আমি টিকিট দেখাব না! আমায় বারণ করেছে। বলেছে শুধু কালো কোর্ট পরা লোককেই দেখাতে।

মেয়েটা হেসে বলল, তাহলে নিশ্চয়ই মহেন্দ্র রাণা হবে। ওই একমাত্র এত সাহায্য করে। ঠিক আছে। তুমি শুয়ে পর –ট্রেন ছাড়তে এখনও চার ঘণ্টা দেরী আছে। ট্রেন ঠিক টাইমে আছে।

আমি এর মানে ঠিক বুঝলুম না – মেয়েটা চলে গেল। আমি বসে বসে সেই আলোর জগতের কথা ভাবছিলুম। কি সুন্দর জগতটা। আবার শিবের জন্য বড্ড মন কেমন করছিলো – উঠে বসে খানিকক্ষণ শিব শিব বলে আওরাতে থাকলুম – যেন মনে হল স্বয়ং শিব এসে সামনে দাঁড়িয়েছে! আমি ওর হাত ধরে উঠে পরলুম। উনি আমার হাত ধরে নিয়ে কোথায় যেন একটা নিয়ে এলেন আর বসিয়ে বললেন – তাড়াতাড়ি এস আর ভালো লাগছে না তোমায় ছাড়া!’

গঙ্গা কোলে মাথাটা একটু গুঁজে নিয়ে আবার বলে উঠলো, ‘তোমার যত সব আজগুবি খেয়াল! আর শোনো প্রত্যেক কথায় খেলুম, পরলুম, হাসলুম এরকম না বলে খেলাম, পরলাম, হাসলাম এরকম ভাবে বলতে পার না?’

গঙ্গার কথা শুনে গৌরীর হাসতে হাসতে বলল ‘আচ্ছা বাবা এবার থেকে ওভাবেই বলব। আসলে এত দিনের অভ্যাস তো তাই ওরকম কথা মুখ থেকে বেরিয়ে যায়। আর ওসব আমার কোন খেয়াল নয় রে। তুই বুঝবি না। আমার সাথে সে কত কথা বলল জানিস। কথা বলতে বলতে কখন যে ওই চার ঘণ্টা চলে গেছে বুঝতেই পারিনি!

হঠাৎ ওই ছোকরার ডাকে ঘোর কেটে গেল, ভাবিজী আপনি এখানে কেন চলে এসেছেন? আমি আপনাকে ওখানে খুঁজছিলাম! যাই হোক, আপনি কিন্তু একদম ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। আপনার বগি এখানেই আসবে। আর এই নিন – আপনার কাছে তো খাবার বা জল কিছুই নেই! এই নিন জলের বোতল আর এই ব্যাগে বিস্কিটের প্যাকেট আর কিছু মিষ্টি আর তার সাথে কিছু কাজু ও কিসমিস আছে। রাস্তায় যেতে যেতে লাগবে।

আমি এবার বলে উঠলাম, কিন্তু এই সব তুমি আমার জন্য কেন করছ?

জানিনা ভাবিজী, কিন্তু যেই সময়ে আপনাকে প্রথমবার দেখি – আপনার মনে আছে না নেই জানি না, কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে। আপনাকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কোথায় যাবেন? তার জবাবে আপনি আপনার টিকিট দেখিয়ে বলেছিলেন – আপনি হিমগিরি যাবেন। জানেন ভাবিজী, আমার ঘরেও আমার বড় ভাইয়া আপনার মত এক ভাবিজী এনেছিল। তার বয়স আপনারই মতন – ষোলো বা সতেরো। আমার মাতাজি, উনার আসার আগে কত না বলেছিল – তার কোন মেয়ে নেই, ভাবিজী তার মেয়ের মত হবে। কিন্তু যখন সময় হল, দেখিয়ে দিল শাশুড়ি শাশুড়িই হয়, মা কোনদিনও হতে পারে না! আমার ভাইয়াকেও উনি ভড়কে দিয়েছিল, কেন – কেন না ভাবিজীর কাছ থেকে দেহেজ পুরো আসেনি। জানেন ভাবিজী, এই মানুষগুলো স্রেফ আর স্রেফ পয়সা বোঝে আর সমাজে দেখায় যেন এরা কত বোঝদার! মুখে দেখ! কত বড় বড় কথা!

জানেন ভাবিজী – উনি নামেই খালি আমার ভাবি ছিল, বয়সেও আমার থেকে ছোট আর সত্যি করে বলতে গেলে, আমার ছোট বোন ছিল। আমার মা তাকে এত বিরক্ত করেছে, এত বিরক্ত করেছে যে, ওই ফুলের মত মেয়েটি অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেল। বাপের বাড়িও যায়নি! সবাইকে ছেড়ে ছুড়ে কোথায় যে চলে গেল, কে জানে! আপনার মতন এত দেবীর মতন সুন্দরী তো ছিল না, কিন্তু যেমনই ছিল, ছিল তো আমার বোন! কথাগুলো বলতে বলতে ছেলেটার চোখ ছল ছল করে উঠেছিল জানিস!’

গঙ্গার মুখও থমথমে হয়েগেছিল। সে ভারী চোখ হালকা করে নিয়ে বলল, ‘এই টাকা টাকা করে না সমাজটা পুরো শেষ হয়ে গেল জান তো মা!’  ও যে গৌরীকে মা ডাকল, বোধ হয় নিজেই খেয়াল করেনি! কিন্তু যমুনা ঠিক শুনেছে। সে একবার মুখ ঘুরিয়ে তাকাল দিদির দিকে – দিদির মুখে এই মা ডাকটা শুনে গৌরীর প্রতি আকর্ষণ ওর আরও বেড়ে গেল। সেইটাকে অনুভব করে কোলটাকে আঁকড়ে ধরে গৌরীর পরের কথার জন্য অপেক্ষা করে রইল।

গৌরীর যেন কোন কিছুতেই কিছু এসে যায় না! সে বলতে থাকল, ‘ছেলেটা খুব নরম মনের – দেখ না নিজের মায়ের পেটের বোনও নয়, কিন্তু কি দয়া! কি ভালোবাসা।

ছেলেটা কিন্তু তখনও থামেনি! ও বলতেই থাকলো –না তো এই মানুষগুলো ভালোবাসা কি জিনিস জানে আর না কাউকে ভালোবাসতে পারে – এরা সব ধরতি কি বোঝ। এই জন্যে আমি ঠিক করেছি– আমি আর কখনো বাড়ি ফিরবো না! সে  ঈশ্বর চান বা না-চান, আমি আর বাড়ি ফেরত যাবনা! বিয়ে করার ইচ্ছা তো নেই, কিন্তু তিনি যদি কাউকে আমার জন্যে চুনারি পেতে অপেক্ষা করিয়ে রাখেন, তো বিয়ে তো করতেই হবে! ঠিক আছে, কোন ব্যাপার নয় – কিন্তু বাড়ি আর কিছুতেই ফিরে যাব না। ওই মানুষগুলো স্রেফ আর স্রেফ নামেই মানুষ, বাস্তবে আমি ওদের মানুষ কেন, পশুও মনে করি না – এটা কলিযুগ তো, সেই জন্যেই হয়তো ভগবান এদেরকে মানুষের শরীরটা দিয়ে দিয়েছে!

আমি ওকে বললাম, এমন বলে না – মা বাপ হয় তোমার! ও আরও স্পষ্ট করে বলতে থাকল, পাপ লাগবে – এটাই বলবেন তো আপনি! তো শুনুন ভাবিজী – লাগতে দিন পাপ! পাপের ভয়ে যাদের হৃদয় নামক বস্তুটাই নেই, মনুষ্যত্ব বলে কিছু বস্তুই নেই, তাদেরকে মানুষ বলতে পারব না! আপনি নিজেকেই দেখে নিন! আপনি একজন কম বয়সী মহিলা! তাও আবার বিবাহিতা – আর আমি একজন অচেনা ছেলে, তাও কম বয়সের। কই! আপনি তো আমাকে একবারও পর ভাবলেন না? কেন?

কারণ আপনি একজন মানুষ – আপনি আরেক মানুষের উপর বিশ্বাস করতে জানেন। কোথায় আপনার বয়স, আর কোথায় আমার মা-বাপের! তারা তো, সব সময়ে নিজের মুখে নিজের বয়সের বড়াই করে বেড়ায়! এত বয়সের অহংকার যে সেই অহংকারে মনুষ্যত্বই ভুলে গেছে! এর পরেও কি আপনি স্রেফ মা বাপ বলে তাদের সামনে গিয়ে নিচু হতে বলেন! আপনি বলবেন – পুত্রধর্ম – তাই না! আমার তবে আপনার কাছে এই প্রশ্ন যে – আমার মানুষ হয়ে জন্মে, মনুষ্য ধর্ম আগে না কি পুত্র ধর্ম! আগে আমি মানুষ হয়েছি, না আগে উনাদের ছেলে! আপনি নিজেকেই দেখে নিন না! আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে যে আপনার একমাসও বিয়ে হয়নি  – দেখুন আমার ভাবির মতই আপনিও আপনার শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন!

আমি ওকে সবে বলতে যাচ্ছি, যে আমি শ্বশুরবাড়ি থেকে পালাচ্ছি না – শ্বশুরবাড়িতে পালাচ্ছি! কিন্তু তার আগেই ট্রেন ঢুকে গেল। ও ছেলেও খুব ব্যস্ত হয়ে পরল। আমার থেকে ট্রেনের টিকিটটা একবার চাইল – ট্রেনে ঢুকে আলো জ্বেলে দেবার পর, ও দরজার কাছে গিয়ে, সেখানে একটা কি বড় তালিকা ছিল, সেটা থেকে নাম মিলিয়ে নিয়ে আমায় ডাকল। আমার জন্য যে জলের বোতল আর খাবার নিয়ে এসেছে সেগুলোও ওর হাতেই। তাই আমি খালি হাতেই ট্রেনে উঠলাম। ও ফোন থেকে কি একটা আলো বার করে একটা সিটে বসিয়ে দিল। খানিকক্ষণের মধ্যেই ট্রেনের ভিতরের আলোগুলো জ্বলে উঠলো। আমার সিট পরেছিল, একদিকের জানলার ধারে। ও আমার জলের বোতলটা একটা হুকে আটকে দিল আর ব্যাগে করে যে খাবার এনেছিল, সেটাকেও হুকে আটকে দিল।

আমার হাতে টিকিটটা দিয়ে বলল, কেউ টিকিট চাইলে, সে যদি কালো কোর্ট না পরা থাকে, তবে আপনি নিজের টিকিট দেখাবেন না, ঠিক আছে ভাবিজী! আমি বাধ্য মেয়ের মত ঘাড় নাড়লাম। ও বলল, হিন্দি পড়তে পারেন? আমি বললাম, হ্যাঁ পারি। ও বলল, বহুত আচ্ছা! ট্রেন থেকে তখনই নামবেন যখন সামনে যে বড় হলুদ রঙের বোর্ড থাকবে, তাতে জম্মু তাওয়াই লেখা থাকবে। ঠিক আছে?

ট্রেনের ওই জায়গায় আরও সব মিলিয়ে সাতখানা সিট ছিল। ওই সাতটাই একটা পরিবারের। তারা ছেলেটাকে হিন্দিতেই জিজ্ঞেস করল কোথায় যাবেন উনি? ও বলল, জম্মু তাওয়াই। ওরা বলল, এই ট্রেন তো তার পর আর যাবেই না! ছেলেটা বলল, সে জানে! সে হাওড়া ষ্টেশনের টিকিট কালেক্টর। আপনারা কোথায় যাবেন! তারা বলল, কাশ্মীর। ছেলেটা বলল, তবে তো আপনারাও জম্মুতেই নামবেন! তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ভাবিজী এরাও সেখানেই নামবেন, যেখানে আপনি নামবেন। যখন এরা সবাই এক সাথে ট্রেন থেকে নেমে যাবে, তখনই আপনি নামবেন, ঠিক আছে!

আবার বলল, না আমাকে এবার নামতে হবে! ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে করছে। আপনি এক কাজ করুন ভাবিজী! আপনার কাছে ফোন আছে! আমি হ্যাঁ বলতে, ও বলল, দিন আমাকে একবার, আমি আমার নাম্বারটা সেভ করে দিচ্ছি। যেকোনো সময়ে, যেখানে হোক, জরুরি মনে হলে, এই ভাইটাকে ভুলে যাবেন না! আমি ফোন বার করতে, ও বলল, আপনি নম্বর সেভ করতে পারেন! আমি বললাম না! ও হাত থেকে ফোনটা নিয়ে কি সব করে আমায় দেখিয়ে দিল- এই দেখুন। এখানে তো মাত্র তিনটেই নাম রয়েছে। এই তিন নম্বর নামটা আমার। আমার নাম সেভ করা রইল। ঠিক আছে! প্রয়োজন হলেই ফোন করবেন!

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল, ও ছেলে চলন্ত ট্রেন থেকেই নেমে গেল। নামার পর একবার হাত তুলে দেখাল। আমার মনে হল, খুব কাছের একজনকে ফেলে চলে যাচ্ছিলাম! সত্যি বলছি! শেষে ফোনে ছেলেটার নাম দেখলাম – মহেন্দ্র রাণা। ’

ঘড়িতে তখন দুটো বাজে। সাধারণত, দুটোর মধ্যে দুই বোনের খাওয়া হয়ে যায়, কিন্তু গল্প শুনতে এতটাই ব্যস্ত যে দুই বোনেরই আজ খিদেই পায়নি। যমুনার তো যেন কথাতেই পেট ভরে গেছে! আর গঙ্গা – একি গৌরীর দেহতাপের উষ্মায় সে যে মায়ের কোলে শিশুর মত ঘুমিয়ে পড়েছে। যমুনা তার দিদিকে এতটা নরম কখনো দেখেনি – এতটা কাউকে বিশ্বাস করতেও কোনদিন দেখেনি! এ যেন এক অন্য দিদিকে দেখছে সে! গৌরীকে পেয়ে যেন তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরে এসেছে!

‘এই দিদি, খাবি না! খিদে পেয়েছে তো ওঠ! ওঠ না!’ যমুনার কথাতে গঙ্গা একরকম ধরমরিয়েই উঠলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কি যেন অজানা তাড়ায় রান্নাঘরের দিকে উঠে গেল। ভাত বাড়তে বাড়তে, আবারও খেয়ালে ডুবে গেল –

এই গৌরী ওকে মায়ায় ফেলে দিয়েছে। ওর সব কিছু যেন পবিত্র! ওর রূপ, ওর কথা, ওর আচরণ এমনকি ওর স্নেহও! গঙ্গা এতক্ষণ ধরে গৌরীকে চেপে জড়িয়ে ধরেছিল, কিন্তু গৌরীর যেন কোন বিরক্তিই নেই – উল্টে তার জড়িয়ে থাকাতে সে অত্যন্ত তৃপ্ত – ঠিক যেমন একটা মা তার সন্তানের জড়িয়ে থাকাতে তৃপ্ত হন।

ভাতবাড়ার সময়ে ভাতের থেকে উঠে আসা ধোঁয়ার জন্য নাকি আবেগের জন্য, গঙ্গার চোখ দুটো জলে ভরে এলো! এর কারণ গঙ্গা ঠিক ঠাঊড় করতে পারলো না। মনকে সেবোঝাল, ‘না না এটা আবেগের জন্য নয়, গরম ভাতের তাপের জন্যই!’ যেন অজানা কোন দ্বন্দ্ব তার মনকে ঘিরে রয়েছে। আবার ভাবল , ‘গৌরীর কৈলাসযাত্রার বর্ণনা কি শেষ হয়ে গেছে! না! কিচ্ছু মনে পরছে না –আসলে আমি ঘুমিয়ে পরেছিলাম তো–তাই কিছু মনে নেই বা হয়তো শেষটা শুনিইনি! ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কি মানুষ শুনতে পারে ? শুনিইনি –আমি শুনিইনি। তাই তো কিছু মনে নেই। ঠিক আছে –যদি গল্প শেষ না হয়, তবে যমুনা কি ছেড়ে দেবে! যমুনা খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে ঠিক আবার চেপে ধরবে গৌরীকে। তখনই বোঝা যাবে –কতটা বলেছে আর কতটা বাকি!’

গঙ্গা তিনটে থালায় খাবার বেড়ে নিয়ে এসে দেখল, যমুনা আর গৌরী দুজনেই আসন পেতে বসে রয়েছে। তার জন্যও একটা আসন পেতে দিয়েছে। গঙ্গা আসনে বসে খাবার পরিবেশন করে খেতে বসল – এদিকে গৌরীর কোন দিকে কোন হুঁশই নেই। দিব্যি খেয়ে চলেছে। যমুনা একটু একটু করে খাচ্ছে আর গঙ্গার তো খাবার মুখেই উঠছে না। যতবার মুখে খাবার তুলছে, ততবার কালকের রাত্রের খাবারের কথা মনে পরছে। কি এক অদ্ভুত গুণ ছিল সেই রান্নায় –যা আজকের তরকারিতে নেই! গৌরীর হাতের গুণ – সেই রান্নায় যেন ওর অনাবিল স্নেহ রান্নার গুণে ও স্বাদে পরিণত হয়েছিল! ছিল তো শুধু পিঁয়াজকলি, বেগুন আর আলুর তরকারি –কিন্তু কি অপূর্ব স্বাদ সেই রান্নার প্রতিটি পদে! লোকে মাছ, মাংস ছেড়ে দিয়ে সেই পদ খাবে। শেষে আর গঙ্গা থাকতে না পেরে –বলেই ফেলল, ‘গৌরী, একটা কথা বলব!’

গৌরী একমুখ খাবার নিয়ে, কথা বলতে গিয়েও বলতে পারল না, ঘাড় নেড়েই জানতে চাইল কথাটা কি! গঙ্গা উত্তরে একটু সংকোচ করেই বলল, ‘বলছি কাল থেকে তরকারিটা তুমি চাপাবে গো ? আসলে তোমার হাতের রান্না খাওয়ার পর, আমার নিজের হাতের রান্নাটা আর ভালোই লাগছে না!’ যমুনার মনের কথা যেন বলে দিল গঙ্গা। কিন্তু এ কথাটা বললে, পাছে দিদি যদি মনে আঘাত পায়, তাই সে বলতে পারছিলনা।

গৌরী (মুখের খাবারটা শেষ করে) বলল, ‘সেই ভালো, তুমি একা হাতে আর কত করবে! রান্নার দিকটা আমিই সামলাই? সঙ্গে সঙ্গেই যমুনা বলে উঠলো, ‘না। আমি আর দিদি তোমাকে হাতে হাতে এগিয়ে দেব। তুমি একা হাতে করবে কেন?’ গৌরী বাঁ হাতটা যমুনার মাথায় দিয়ে, হাত বুলিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, তাই হবে!’

গঙ্গার প্রথমে সবটাতে আনন্দ হলেও, মনের কোনে একটা ব্যথা অনুভব করল– ‘গৌরী যদি সব সময়ের জন্য আমাদের কাছে থাকতো, কি ভালোই না হত! না, তা তো সম্ভব নয়! ওকে ওর বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতেই হবে! কি যে করি! মন যেন ওকে বড্ড আপন করে নিয়েছে! যেন ওকে নিজের মা মনে করে নিয়েছে! কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? ও তো বয়সেও আমার থেকে ছোট! কিন্তু ওর ভালোবাসা আর আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা অকল্পনীয়। এই দুদিন সবে হয়েছে ওর সাথে থাকছি, কিন্তু দেখ! মনে হচ্ছে যেন – ওর সাথে কতদিনের সম্পর্ক! মনে হচ্ছে যেন ওকে ছেড়ে থাকতেই পারব না। কাল অবধি, কাল কেন আজ সকাল অবধি ওর প্রতি অবিশ্বাস ছিল – কিন্তু ওর স্নেহ এতটাই অপরম্পার যে ওর প্রতিটা কথাকে এখন অন্ধের মত বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে! কি অদ্ভুত, তাই না? আচ্ছা এমন কিছু করা যায় না, যাতে গৌরী নিজের ঘরও পেয়ে যায়, আবার আমাদের সাথেও থাকে? ধুর, কি আবোল তাবোল ভাবছি? এমন ভিত্তিহীন ভাবনা কবে থেকে শুরু হল আমার?’

গৌরীর সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর গঙ্গাকে ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবের জগতে ফিরিয়ে আনল, ‘কি গো গঙ্গা মা খাবে না!’

গঙ্গা যেন এবার একটু তাড়াতাড়ি করে খেয়ে নিতে চেষ্টা করল, খেয়ে উঠে আজ সে কৈলাস যাত্রার গল্প শুনবে! হটাৎই গঙ্গা আদরের সুরে অভিযোগ করলো – ‘আচ্ছা তুমি কেমন ধারার গো! যমুনাকে দেখেছি – একবার তুই বলো, একবার তুমি বলো– মানে যা মুখে আসে বলে দাও! আর আমাকে– একবার বলো গঙ্গা দিদি, একবার বলো দিদিমণি আবার পরের মুহূর্তে গঙ্গা মা! কোন নির্দিষ্ট ডাক নেই তোমার?’

‘আসলে কি জানো তো!’ গৌরী বলতে থাকে, ‘ধর মা নিজের ছেলেকে যখন ডাকে – মায়ের যেমন মেজাজ তখন তেমন ডাকে। যখন মেজাজ তুঙ্গে, তখন বলে, – হতচ্ছাড়া ছেলে হয়েছে আমার! আবার যখন আদর করে, তখন বলে, – লক্ষ্মী সোনা ছেলে আমার! এইরকম আর কি! নিজের লোকদের কি আর এক নামে ডাকা যায়! এই দেখ না আমার স্বামীকে, কখনো শিব বলি, কখনো উনি বলি আবার যখন অভিমান হয়, তখন বলি ভোলা! আবার যখন খুব স্নেহ জাগে, তখন আবার বাবা বা নাথ বলে ডাক চলে আসে – যখন যেমন ভাব!’

গৌরী ওদেরকে নিজের লোক বলাতে দুই বোনের যেমন খুশী হল, তেমন একটা বেদনার সুরও বেজে উঠলো – কদিন পরেই এই নিজের লোক পর হয়ে যাবে! কিন্তু মনে মনে ভাবল, কি অদ্ভুত দুদিনের দেখা, সত্যিই যেন কত কাছের মানুষ হয়ে গেছে! শুধু ও নয়, আমরাও তো ওকে আমাদেরই একজন ভেবে নিয়েছি – ভাবতে বাধ্যই হয়েছি বলা চলে।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে, মুখ হাত ধুয়ে গৌরী বসে রইল, একটু যেন মনঃক্ষুণ্ণ। গঙ্গা কাছে এসে, কাঁধে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কি গো, কি হল আবার!’

গৌরী একটু রাগ দেখিয়েই বলল, ‘তুই কাল আমায় বলেছিলি, আজ মাখন খাওয়াবি। কি হল তার!’ গঙ্গা জিভ কেটে বলল, ‘ঈশ দেখেছো, এক্কেবারে ভুলে গেছি!’ হাত ধুয়ে আসতে আসতে যমুনা বলে উঠলো, ‘আমি ভুলিনি। এনেছি মাখন। এখন খাবে তুমি!’ গঙ্গা বলে উঠলো, ‘একটু পরে খেও, এখুনি খেয়ে উঠলে, এখন খেলে শরীর খারাপ করবে!’ গৌরী লক্ষ্মী মেয়ের মত, বলে উঠলো, ‘আচ্ছা আচ্ছা! যেমন তুমি বলবে গঙ্গা মা!’

গঙ্গা এবার প্রতিবাদের সুরেই বলে উঠলো, ‘তুমি আমাকে তুই বলবে– তুমি ডাকটা ভালো লাগেনা!’ যমুনাও একই সুরে বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ আমাকেও’। সেই শুনে গৌরীর যেন বাঁধনছাড়া আনন্দ হল। এবার গঙ্গা বলে উঠলো, ‘একটু শুয়ে নাও – নেবে তো?’ যমুনা আবদারের সুরে বলল, ‘না গল্প শেষ হয়নি! আগে গল্প শুনবো!’

গঙ্গা এবার একটু জেদ দেখিয়েই বলল, ‘সব সময়ে অত গল্প গল্প কেন? ওকে একটু বিশ্রাম তো নিতে দে!’ যমুনার মুখটা ব্যাজার হয়ে যেতে, গৌরী ওর গায়ে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘ঠিক আছে, দুই বোনে আর মান অভিমান করতে হবে না! দুজনের কথাই থাকবে। শুয়ে শুয়ে দুই বোনকে দুপাশে নিয়ে, আমি গল্প বলব – ব্যাস, সবই হল, বিশ্রামও হল আবার গল্পও। কি খুশী তো?’

যমুনার সব কিছুই তো বাচ্চাদের মত, কিন্তু এবার গঙ্গাও কেমন ১২-১৪ বছরের বাচ্চা মেয়ে হয়ে গেল। যমুনা ওপরতলায় গিয়ে ঘরের বিছানাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে, তাতে তিনটে বালিশ পেতে দিল। তারপর কি মনে হল, নিজের বালিশটা সরিয়ে নিল।

গঙ্গা এলো গৌরীকে নিয়ে। বিছানায় যে একটা বালিশ কম আছে, সেটি গঙ্গার নজর এড়ায়নি –গঙ্গার চালাক মস্তিষ্ক বুঝে ফেলে যে যমুনা নিজের বালিশটা সরিয়ে দিয়েছে – কারণ ও গৌরীকে আঁকড়ে ধরে শোবে। গঙ্গার নিজেরও ইচ্ছা হচ্ছে। কেমন যেন অদ্ভুত মিষ্টি একটা শিউলি ফুলের গন্ধ পায় গৌরীর গায়ের থেকে! এই গন্ধটা আবার যেন তার রূপের আর চরিত্রের পবিত্রতার সাথে খুব মেলে। যমুনা ছোট, তাই ওর ওরকম আচরণ মানায়, তবে গঙ্গার এটা শোভা পায় না – কিন্তু গঙ্গার মনে, গৌরীকে জড়িয়ে ধরে শুতে এতটাই ব্যাকুলতা জন্মেছে যেন সে চেয়েও ওর এই শিশুসুলভ ভাবটাকে আটকাতে পারছে না– যেন বার বার মনে হচ্ছে ওর মা ফিরে এসেছে!

বিছানায় আগে গঙ্গা উঠে দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেল, তারপর গৌরী উঠে মাঝখানে শুয়ে পরল, বিশাল লম্বা চুলটা এলো করে ছড়িয়ে দিল সে। যমুনা একটু অবাক হয়ে দেখল কতো চুল গৌরীর মাথায়! তিন ফুট উঁচু বিছানা – দাদুর আমলের। সেই বিছানার মাথা থেকে এক ফুট নিচে শুয়ে রয়েছে ৫ ফুট ২ ইঞ্চির গৌরীর মাতৃরূপা দেহটা। সেই একফুট আর খাটের উচ্চতার ৩ ফুট ছাড়িয়ে সেই চুল আরও ৬ ইঞ্চির মত ভাঁজ হয়ে মাটিতে লুটাচ্ছে – মানে সব মিলিয়ে ৫ ফুট ২ ইঞ্চির মানুষটার ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি লম্বা চুল! আর কি ঘন – পুরো কাজলের মত কালো চুলটা – ওদের চুলও কালো, কিন্তু রোদের ঝিলিকে জায়গায় জায়গায় লাল লাল মনে হয়। কিন্তু গৌরীর চুল যেন রোদ্দুর এসে পড়ায় আরও বেশী কালো হয়ে গেছে!

সেই চুল দেখতে যমুনা এতই মত্ত হয়ে গেছিল, যে হাতে ধরে থাকা জলের ঘটিটা, গঙ্গার ডাকে প্রায় ফেলেই দিচ্ছিল। গৌরীর প্রচেষ্টায় সেই ঘটিটা মাটিতে পরা থেকে বেঁচে গেল। কি করে ব্যপারটা ঘটল, সেটা ভেবে যমুনা পুরো ঘাবড়ে গেল – যেন ঘটিটা পড়বে নিশ্চিত – সেই অবস্থা থেকে সেটা তার হাতে উঠে এলো। ঠিক ভাবে জিনিসটা বুঝতে হলে, এমন দাঁড়ায় – ঘটিটা যমুনার হাত থেকে পরে গেল – পরে যাবার সাথে সাথেই যমুনা নিচু হয়ে সেই ঘটিটা ধরে নিতে ঝুঁকল – কিন্তু ঘটিটা যেই গতিতে নিচের দিকে যাচ্ছিল, যেন তার গতিটা কেউ রোধ করে দিল– তাই মাটিতে পরার আগেই, যমুনার হাত ঘটিটাকে ধরে ফেলল। পুরো ব্যপারটা যেন জাদুর মতো লাগছিল ! জাদুই হল না কি? না! অনেক ভাবনা হয়ে গেছে! যমুনা ভাবনা বন্ধ করে এবার উঠে পড়ল বিছানায়।

গৌরী যেন যমুনার অধিকার! ও বিনা চিন্তায়, বিনা ভাবনায় যেভাবে প্রথমেই গৌরীকে বাম দিক থেকে পা-বালিশের মত জড়িয়ে ধরল, তাতে তাই মনে হল। গঙ্গা একটু রেগেই গেল – তার মনে হল, যমুনা যেন গৌরীর উপর অত্যাচার করছে! সে একটু গলা চড়িয়েই বলে উঠলো , ‘উফ যমুনা! এই মাত্র খেয়ে উঠেছে সবাই! এরকম করে কেউ ধামসায়!’ যমুনার কথাটা শুনে ভালো না লাগলেও মনে হল যেন দিদি ঠিকই বলছে – তাই পা টা সরিয়ে নিতে গেল, কিন্তু গৌরী ওকে আঁকড়ে ধরল আর গঙ্গার উদ্দেশ্যে বলল, ‘আহা কিছু হয়নি! আমার কোন কষ্ট হয়নি! তুই ব্যথাটাই দেখলি, ভালোবাসাটা দেখতে পেলি না!’ সেই শুনে গঙ্গা চুপ করে গেলেও, মনে মনে গৌরীর এই অসামান্য ভালোবাসার ক্ষমতাকে কুর্নিশ না করে পারল না।

গৌরী এরপর বলতে শুরু করল, ট্রেনে করে জম্মু তাওয়াই যাওয়ার কথা। খানিক বলতেই, গঙ্গাও বালিশ ছেড়ে কখন যে নিজের মাথাটা নিয়ে গৌরীর ডান হাতের উপর রেখে দিয়েছে –সে ব্যাপারে কোন খবরই নেই তার কাছে। সময় গড়াতে গঙ্গাও ঠিক তেমন করেই গৌরীকে জড়িয়ে ধরল যেমনটা যমুনা ধরে ছিল। দুই বোনে গৌরীকে এমন করেই জড়িয়ে ধরে রয়েছে যে উপর থেকে দেখলে, গৌরীর বিশাল চুল, মুখ ও গলা আর নিচে ওর পা দুটো ছাড়া কিছুই দেখা যাবে না। গৌরীর সারা শরীর থেকে শিউলি, পদ্ম আর পলাশ মিশ্রিত একটা মিষ্টি- সুমিষ্ট গন্ধ পেতে থাকল দুই বোন। সেই গন্ধ যেন আরও বেশী করে তাকে আকর্ষণীয় করে তুলল।

অন্যদিকে, গৌরী বলতে থাকে –‘ট্রেনের সময়টা একদম ভালো লাগছিল না জানিস! সব কেমন যেন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। ওই যে সাতজনের পরিবারটা ছিল, তারা তো নিজেদের নিয়ে এতই ব্যস্ত যে মনে হচ্ছিল, কত বছর পরে যেন পরিবারটা এক জায়গায় হয়েছে! পরিবারটাতে ছিল, একটি যুবা ছেলে আর একটি যুবা মেয়ে – বুঝলাম ওরা স্বামী-স্ত্রী; একটি প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ আর একটি প্রাপ্ত বয়স্কা মহিলা – সময় যেতে বুঝলাম উনারা ছেলেটার বাবা আর মা; আর ওই যুবক যুবতীর তিন সন্তান। বড়টা একটি মেয়ে – এই বছর ৬ বয়স হবে। তারপরেরটা দাদুর নেওটা – ছেলেটার বয়স এই বছর তিন হবে আর তারপর একটা এক বছরের ছেলে ছিল।

বাচ্চাটা মায়ের কোলে খুব কমই যায় – বেশিরভাগ সময়েই দিদার কোলে থাকে। ও নিজের মা-এর কাছে গেলেই কান্না জুড়ে দেয় – আমি তো দেখে অবাক! ছোট্ট ছেলে মায়ের কোলে যেতে চায়না! একটা পুরো দিন যেতে বুঝলাম, ওর মায়ের অর্থাৎ যুবতীটা সন্তানকে জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন- নিজের রূপ চর্চা, ফোন আর বরের সাথে কথা বলতেই সদা ব্যস্ত। তাই বাচ্চারাও মা-এর কাছে একদম ঘ্যাঁসে না। বড় মেয়েটাকে দেখলাম বাবার কাছে খুব ঘ্যাঁসে– বাবার সহ্যশক্তি ভালো – তবে পুরো ট্রেনটায় উনাকে খালি সহ্য করে যেতেই দেখলাম। সহ্যশক্তি ভালো – তবে এতটাও ভালো নয় যে অচেতনতার সীমা ছুঁতে যায়।

একদম খুদেটা আমার কোলে একবার এসেছিল জানো! ওর দিদা একবার বাথরুমে যাচ্ছিল –তখন সে আর কারুর কাছেই যাবে না। শেষে বাচ্চাটি নিজেই আমার দিকে দু হাত বাড়িয়ে দেয়। দিদা সেই দেখে বাচ্চাটাকে আমার কোলে দিয়েছিল। প্রায় তিন ঘণ্টা ছিল কোলে – কখনো আমার চুল নিয়ে, কখনো আমার নাক নিয়ে, কখনো আমার কানের লতি নিয়ে খেলা করছিলো। আর যখনই ওর থেকে চোখ সরিয়ে নিচ্ছিলাম – ও ‘এই এই’ বলে ডেকে আমাকে ওর দিকে তাকাতে বাধ্য করছিলো।

এই বলে গৌরীর কি হাসি! পুরো শিশুর মত হাসি। ‘জানো সেই বাচ্চা শেষে কিছুতেই আমার কোল ছেড়ে ওর দিদার কাছে যাবে না! শেষে ওর মা এমন বকা দিল যে এক-চোখ জল নিয়ে দিদার কোলে চলে গেল – কিন্তু অভিমানে মায়ের কোলে আর গেলই না।

যাই হোক প্রায় দেড় দিন পরে জম্মু তাওয়াই ষ্টেশনে ট্রেন থামল। সবাই ট্রেন থেকে নেমে যাচ্ছিল দেখেও আমি কেমন যেন শিবের খেয়ালে সব ভুলে গেছিলাম। অদ্ভুত পরিবার জানো ওরা। সবাই নেমে গেল – অথচ কেউ আমাকে কিছু বললও না! শেষে ওই যুবক ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে আমার চোখের সামনে হাত নাড়িয়ে বলল, “আ গেয়া ষ্টেশন। উৎরিয়ে! ”

আমি প্রায় তড়িঘড়িই নেমে গেলাম। সেখানে লোকজনকে দেখে খুব ভয় পেয়েছিলাম জানো! মানুষগুলো এত জামাকাপড় পড়েছে মনে হচ্ছে যেন তারা মানুষ নয়, ভল্লুক একাকটা। আর আমায় দেখে সবাই কেমন যেন ভূত দেখার মত দেখছিল জানো! আমি প্রথমটা একটু অবাকই বনে যাই, তারপর বুঝতে পারি যে ওদের আমাকে ওরকম করে দেখার কারণটা হল, আমার গায়ে কোন শীতবস্ত্র নেই। কিন্তু সত্যি বলছি আমার কোন ঠাণ্ডা লাগছিলো না!

আসতে আসতে দেখলাম সবাই কোন দিকে যাচ্ছে – দেখে বুঝলাম ষ্টেশনের বাইরে যাবার পথ ডান দিকে। ধীরে ধীরে সেই দিকে এগিয়ে যেতে যেতে,  কালো কোর্ট পরা হোমরা চমরা একটা লোক আমার পথ আটকাল। আমায় টিকিট দেখাতে বলল। আমি দেখালাম। টিকিট দেখে টেকে সে আমায় রাস্তা দেখিয়ে দিল। আমি তাকেই জিজ্ঞেস করলাম, শ্রীনগরের বাস কথা থেকে পাব?

উনি বাসের জায়গা দেখিয়ে দিলেন। সেদিক পানে আমি এগোতে থাকি। জায়গায় গিয়ে দেখি – অনেক জায়গায় যাবার বাস সেখানে রয়েছে। তার মধ্যে একজন তো আমার হাত ধরেই টানতে যায়। কিন্তু দেখলাম, কাছে আসতেই কিরকম যেন নিজে নিজেই পরে গেল। আর তারপর দেখলাম, কেউ আমার কাছে ঘেঁষল না। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, শ্রীনগর যাবার সরকারী বাস কোথা থেকে পাব? প্রথমে বাংলাতেই বললাম, তারপর বুঝতে না পারলে তাকে হিন্দিতে বলি।

সে শুনে আমাকে যেন এক অন্যরকম বাসে উঠিয়ে দেবার খুব চেষ্টা করল – আমি শেষে বিরক্ত হয়েই বলে দিলাম – যাবনা আমি তোমার বাসে। সরকারী বাস কোথায় পাব বলতে হলে বল নাহলে এস! সেই শুনে ওই লোকগুলো কেমন যেন ভয় পেয়ে গেল আর আমাকে দেখিয়ে দিল সেই বাস। একটু পিছনের দিকে ছিল স্ট্যান্ডটা। দেখিয়ে দিতে, আমি সেইদিক পানে গেলাম। গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, শ্রীনগরের বাস কোনটা?

আমাকে একজন দেখিয়ে দিয়ে বলল, – “উহা সে টিকিট কর লিজিয়ে”। আমি গিয়ে ২১৩ টাকা দিয়ে একটা টিকিট করে নিয়ে এলাম। আমায় বাস দেখিয়ে দিলে সেই বাসে উঠে পরি। ভিতরে আরও একটা কাকু ছিল। তিনি টিকিটটা দেখতে চাইলেন আর আঙ্গুল দেখিয়ে আমি কোথায় গিয়ে বসব বলে দিলেন। আমি সেখানে গিয়ে একটা সিট ছেড়ে জানলার দিকের সিটটায় বসে পরলাম।

খানিকক্ষণ পরে আমার পাশের সিটটায় একটা সুদর্শন দেখতে ছেলে, লম্বায় প্রায় ছয় ফুটের মতন, আমার কাছে এসে বসল। কিছুক্ষণ পরে বাস ছেড়ে দিল – তারপরই ছেলেটা আমার নাম জিজ্ঞেস করল, আমি নাম বলতে, সে জিজ্ঞাস করল যে আমি কোথা থেকে এসেছি? আমি বললাম, কলকাতা। শুনে বলল, ‘নমস্তে নমস্তে – বহুত খুব!’ ও নাকি একবার কলকাতায় এসেছিল। ওর নাকি কলকাতা বড় ভালো লেগেছে তাই আবারও আসতে চায়। ও বলল, এখানে যে খোল বাজে সেটা ওর খুব ভালো লাগে –শুধু তাই নয়, ও এখানে এসে খোল বাজাতে শিখেওছে আর একটা খোলও কিনে এনেছে – এখন ওই খোলটাই ওর একমাত্র সঙ্গী !

আমি হিন্দিতেই জিজ্ঞেস করলাম, “কেন অন্য কেউ নেই তোমার! ”

সে একটু উদাসীন হাসি দিয়ে বলল –“আছে, বোধ হয় ভালই আছে! ”

ওর উদাসীনতা দেখে আমার মনটা বড়ই কেঁদে উঠলো। আমি শুধালাম তাকে – কেন কি হয়েছে! কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে নাকি তোমার সাথে?

সে বলল – ছাড়ুন ওসব কথা! এখন আমি খুব ভালো আছি।

কিছু গোপন করার চেষ্টা করছে – বললে মন হালকা হবে, তাই জিজ্ঞেস করলাম, যদি মন থেকে বোন মান, তাহলে এই বোনটাকে মন খুলে নিজের দুঃখের কথা বলতে পার।

সে শুনে একটু হাসল, তারপর মাথাটা সিটের ঠেসে রেখে চোখটা বন্ধ করে নিল। খানিকক্ষণ পরে সে নিজে নিজেই বলতে থাকল, – ‘আচ্ছা, কেউ কি খোল বাজালেই ইসলাম থেকে হিন্দু হয়ে যায়!’ একটু থেমে আবার বলে উঠলো সে, – ‘আচ্ছা আপনিই বলুন, ইসলাম হয়ে জন্মেছি মানে কি আর কোন ধর্মের কথার সাথে একমত হতে পারব না!’

আমি হেসে বললাম, কেন না, যাদের তোমরা বিভিন্ন ধর্মের নাম দাও – তারা যে সেই একই ধর্মের বিভিন্ন মুখ! আসলে এই যে একটা সম্প্রদায়ের মানুষ অন্যের থেকে দূরে দূরে থাকে, এর আসল কারণ কি জান? ভয় আর অধিকার! যেমন কোন বাড়িতে ভালো দেখতে স্ত্রী থাকলে, কারুর স্ত্রী তার স্বামীকে সেখানে যেতে দিতে চায় না, ঠিক তেমনই, ইসলাম বলো, হিন্দু বলো, খ্রীস্টান বলো এগুলো সব একাকটা ঘর। আর তাদের যে প্রধান, … প্রধান মানে…’ আমার কথা থামিয়ে ও কি একটা বলল – ইমাম না কি, আমি না বুঝেই বললাম, হ্যাঁ ওই, ‘ওই প্রধান ওই ঘরের স্ত্রী আর তোমরা সকলে সেই স্ত্রীর স্বামী। যখন তুমি কোন অন্য ঘরে যাও, তোমাকে তখন তোমার স্ত্রী, অর্থাৎ সেই প্রধানরা খারাপ নজরে দেখে।

ছোকরা বলে আমি নাকি খুব ভালো কথা কইতে পারি – কিছু মাথা মুণ্ডু বুঝলামই না, কি বললাম – আর বলে নাকি আমি ভালো কথা বলতে পারি!

তবে কথাটা ছেলেটার খুব মনে ধরেছিল। তাইই হয়তো খানিক পর থেকে আবার বলতে শুরু করে। সে বলে, – ‘জানেন মাতাজি, আমার সাথেও এমনি কিছু হয়েছিল। আমি আফগানিস্তান দেশের বাসিন্দা। আমার নাম রবানী বারী। আমার আব্বা একজন সাধারণ মেষপালক ছিল। একদিন আব্বা খুব অসুস্থ ছিল। সেই জন্য মেষের পাল নিয়ে আমি সেদিন চড়াতে গিয়েছিলাম। একটা গুহা দেখে একটু বিশ্রাম করে নেবার ইচ্ছা হয়। একটা হালকা গুঞ্জন শুনে গুহার মধ্যে কি আছে দেখতে ঢুকেছিলাম। দেখি কি এক বয়স্ক মানুষ, … যেমন আপনি ঠাণ্ডাতেও কোন ঠাণ্ডার জামা পরেননি, ঠিক তেমনই … একটা সাদা কাপর ছাড়া, উনিও কিছু পরে ছিলেন না! আমার দেখে খুব খারাপ লাগে – বুঝিনি যে উনার ঠাণ্ডা লাগেই না। উনার কাছে গিয়ে আমার গায়ে যে চাদর ছিল – সেটা পরিয়ে দিলাম। ওই গুঞ্জনটি তাঁরই মুখ থেকে আসছিল। চাদর দিতেই উনি চোখ খোলেন। … আমার সাথে কত কথা বললেন … হিন্দি ভাষা বলতেও আমি তাঁর থেকেই শিখি। উনি হিন্দু ছিলেন… উনার থেকে হিন্দু ধর্ম আর তার মধ্যে থাকা ভালোবাসা শুনে খুব ভালো লাগে। আমার এক ফুফা ভারতে থাকে  – উলের ব্যবসা করে। আমি উনার সাথে কথা বলে ভারতে আসি। জানেন মাতাজি, এখানে এসে খোল বাজাতে শিখি – কৃষ্ণ নাম করতে শিখি। এই কথাটা খুফা জানতে পেড়ে আমায় দেশে পাঠিয়ে দিল।

আমি কি তখনও জানতাম! কতগুলো চোখ আমার উপর নজর রাখছে! আমি কিছু না ভেবে ওই বাবাজীর কাছে গেছিলাম – ভারতে কি হয়েছে বলতে। কথার শেষে পিছন ফিরে দেখি – কত লোক আমাদের পিছনে দাঁড়িয়ে রইছে! উনাদের সাথে ইমাম ও ছিলেন, আর আমেরিকার সেনাও ছিল – পরে জেনেছিলাম ওই পৈশাচিক সেনাই সকলকে খবর দিয়েছিল! জানেন মাতাজি, আমার কোন কথাই শোনেনি তারা। সকলে মিলে আমাকে টেনে নিয়ে যায় আর ওই বাবাজীকে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল। এতখানি বলে, বাচ্চা ছেলের মত হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল সে। চোখ মুছে আবার বলতে থাকলো – আমার চোখের সামনে উনাকে মেরে ফেলল! জানেন, আমার চোখের সামনে! আর আমাকে একটা ঘরে বন্দি করে রাখল। শুধু আমার জন্য, আমার জন্য, তাঁকে মরতে হল! ঘেন্না এসে গেল সেদিন থেকে আমার সবার উপর – ঘেন্না এসে গেল!’

আমি তখন ওকে বললাম, ‘দেখ বাবা, এখানে কার বা কি করার আছে! কনো ধর্ম থোড়াই বলেছে সেই সাধুবাবাকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে! এই কাজ কনো ধর্ম করেনি! এই কাজ কিছু অবুঝ লোকে করেছে! তারা করেছে, যারা ধর্ম  কি জিনিস – সেটা বোঝেই না! ধর্ম কি জানো! ধর্ম না তো হিন্দু, না ইসলাম! ধর্মের মানে হল নিষ্ঠার সাথে কাজ করা আর ধর্মের উদ্দেশ্য হল শিবত্ব লাভ, কেন না শিবত্ব এলেই, তাঁর শক্তি, তাঁর বোধ, অর্থাৎ পরমেশ্বরীর সাথে ব্যক্তি মিশে যেতে পারে। আর শিবত্ব লাভের জন্য না তো হিন্দু হতে হয়, আর না ইসলাম! শিব তো সবকিছু হয়ে রয়েছে – হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্টান – সব। প্রতিটা জীব শিব, এই পুরো সৃষ্টিই শিব! তোমার ইসলামেরও এই কথা জানা আছে বইকি। সেই জন্যেই তো শিবত্ব বোঝাতে ইসলামের ধ্বজে চাঁদ রয়েছে! আর শুধু চাঁদই নয়, সেই চাঁদের উপর একটি তারাও রয়েছে – সেই শিবত্বের শক্তি বোঝাতে!’

ও মন দিয়ে শুনছে দেখে আমি আরও বললাম, – তাই, এই সমস্যা না তো ইসলামের, আর না হিন্দুর! সমস্যা মানুষের ভাবনায়! মানুষ আসল ধর্ম কি সেটা বুঝেই পায় না – হিন্দু, ইসলাম এসব করতে মত্ত। তোমার সাথে যা ইসলাম বেশধারীরা করেছে, অন্য জায়গায় ওই একই কাজ কনো হিন্দু বেশধারী করে চলেছে, আর সেই কাজই অন্য জায়গায় কনো খ্রীস্টান করে চলেছে। আমার মতে, হিন্দু, ইসলাম, খ্রীস্টান ছেড়ে আসল ধর্মকে গ্রহণ কর – যেই ধর্মের কোন নামই নেই – কেননা নাম যারা দেয়, তারা কেউ তার সম্বন্ধে জানেই না!

এত শুনে সে ভালো ছেলেটা কি বলে জানো? বলে, – মাতাজি! কোথায় পাব, সেই মার্গ দেখানোর লোক! সে কি নাছোড়বান্দা, তাকে বলতেই হবে। সে আরও বলে, ওর যা জমানো টাকা ছিল, ভারতীয় সেনাকে সেসব দিয়ে, নিজের ঘর ছেড়ে, সে ভারতে চলে আসে। আপাতত সে কাশ্মীরে রয়েছে কিন্তু ওর সেখানে মন লাগেনা। চলে যেতে ইচ্ছা করে যেখানে শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা! যেখানে একজন নিজের মনের বোঝা অন্যের উপর চাপায় না – বরং অন্যের মনের বোঝা নিজের মধ্যে নিয়ে নেয়! সে আবার নাছোড়বান্দা হয়ে বলে – মাতাজি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আপনার সেই জায়গা জানা আছে! এই জন্যেই তো আপনি সেইসব কথা বলতে পারলেন, যা আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে বলেনি! নিয়ে চলুন না মাতাজি, আমায় সেখানে নিয়ে চলুন না!

কি বলব ছোকরাটাকে, বুঝতেই পারছিলাম না। তাই শিবের কাছে জিজ্ঞেস করতে, সে আমার হাতে যে একটা পাথরের আংটি ছিল, সেটা দেখালো, আর এর পরের যে কথাগুলো আমি ওকে বললাম, সেগুলো কিছুতেই আমার কথা না, যেন শিব আমার মুখ দিয়ে বলে দিল। আমি বললাম, এই নাও, বলে হাতের ওই সাদা পাথর দেওয়া আংটিটা ওকে দিয়ে দিলাম। দিয়ে বললাম, যেমন কোন কিছু চাইলেই পাওয়া যায় না – সেটা পেতে হলে, সেই ইচ্ছা মনে, বুদ্ধিতে আর সম্পূর্ণ শরীরে ছড়িয়ে দিয়ে পরিপূর্ণ ভাবে চাইতে হয়, তেমন তোমার এই ইচ্ছাও তখনই পূরণ হবে যখন পুরোপুরি ভাবে এই ইচ্ছাটাই তোমার একমাত্র ইচ্ছা হয়ে দাঁড়াবে। যখন তোমার এই ইচ্ছা সম্পূর্ণভাবে তোমায় ঘিরে ধরবে, তখন এই পাথরটা হলুদ হয়ে যাবে আর সে তখন তোমায় মার্গ দর্শন করবে।

জানো এমন কথা আমি যে কি করে বললুম, সে আমি নিজেও জানি না! আদপে যা বলেছি, তার কনো মাথা মুণ্ডু আছে কি না, তাও জানি না! কিন্তু সত্যি বলতে, শিবের কাছে খুব প্রার্থনা করেছি যেন সত্যি হয় কথাটা, না হলে ছেলেটার মনটা পুরো ভেঙে যাবে – কতই না আশা করে রয়েছে ছেলেটা! চেতনারই তো আশা করেছে – তাই না! ধন সম্পদ তো আর চায়নি – কি বল!

গৌরীর কথা খানিক বন্ধ হল – মনে হল ছেলেটার কথা ভেবেওর মনটা ভারী হয়ে আসছে। এসব ব্যাপারে গঙ্গা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না – কিন্তু যমুনা অত্যধিক চটপটে! গৌরীর মন-পরিবর্তনের আগেই যমুনা বলে উঠল, ‘শিব সব ঠিক করে দেবে দেখ – শিব সব করে দেবে! ওঁ নমহ শিবায়! ওঁ নমহ শিবায়!’ গৌরী প্রকৃতিস্থ হল।

এবার গঙ্গা উদ্বেগ কাটিয়ে বলে উঠলো, ‘তুমি মাঝে মাঝে কি যে কর না, মাথায় কিছু ঢোকে না! মাঝে মাঝে মনে হয়, তুমি মানুষই নয় – আমি ভুল দেখছি! তবে যাই হও তুমি জানো, তুমি খুব ভালো!’ এবার গঙ্গার এক চোখ জল। যমুনা এমন দৃশ্য কোনদিন দেখেনি। বরাবর যমুনা দেখে এসেছে – তার গঙ্গা দিদি পাথরের মত শক্ত! আজ এ কাকে দেখছে সে! এ কি তারই দিদি! গঙ্গা দিদি! এত নরম! এত ভঙ্গুর!

গঙ্গাও যেন আর নিজের মধ্যে নেই। সে এক চোখ জল নিয়ে যেন প্রলাপ বকছে, ‘মা! মাগো! আমার তোমাকে মা ছাড়া কেন আর কনো নামে ডাকতেই ইচ্ছা করছে না! কি জাদু করলে মা! আমার মনের এত বিচার ক্ষমতা, এত বন্ধন, সব যেন অকেজো হয়ে গেছে মা! পারছি না! খুঁজেই পাচ্ছি না – কনো বন্ধনই খুঁজে পাচ্ছি না! মনে হচ্ছে নিজের সবটা তোমায় দিয়ে দিই – সবটা! সবটা! তোমায় সন্দেহ করতেও ছাড়িনি – বিচার করলে এখন তো আরও বেশী করে সন্দেহ করা উচিত! কিন্তু সন্দেহ আসছে না মা! যেন মন বলছে – তোমার জন্যই প্রভু অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে বসেছিল! মা আমি তোমায় সন্দেহ করেছি! তুমি কে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না! কিন্তু একটা জিনিস মনের কাছে পরিষ্কার– আমি তোমার জন্যই তৈরি! মা গো তোমাকে তোমার বাড়িতে ফিরিয়ে দিতে হবে – কিন্তু কি করে দেব? তোমায় ছাড়া বাঁচতে পারব না মনে হচ্ছে! মাগো! চুপ করে থেক না মা! কিছু তো বল!’ গঙ্গার দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা বয়ে চলেছে – এমন ভাবে বইছে, যেন গঙ্গার কনো খবরই জানা নেই সেই অশ্রুবারির সম্বন্ধে!

যমুনা কিছু বুঝতে পারছে না, কি হচ্ছে! সে উঠে বসে পরেছে, সে গৌরীর হাতে মাথা রেখে শুয়েছিল – কিন্তু এখন আর তা নেই! ও গৌরীর বাঁ দিকে উঠে বসে দিদিকে দেখছে – কি করে দিদিকে শান্ত করা যায়, ভেবেই উঠতে পারছে না। মা যেমন নিজের কোলের সন্তানকে কাছে টেনে নেয়– ঠিক সেরকম ভাবেই, গৌরী নিজের ডান হাতে রাখা গঙ্গার মাথাখানা নিজের বুকে টেনে নিল। গঙ্গার এবার সব বাঁধ ভেঙে গেছে – এবারে সে গৌরীকে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকলো। যমুনা শুনেছিল, বাবা মা গত হবার পর, গঙ্গা খুবই চুপিসারে কেঁদেছিল –তাকে আঁকড়ে ধরেই নাকি তার দিদি দৃঢ় পাথরের মত হয়ে গিয়েছিল। সেই কান্নায় যেন আজ ভেঙে পরেছে দিদি! গঙ্গার মাথাটা গৌরী তার বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে থাকল। গঙ্গার চোখের জল, গৌরীর বুকের আঁচল এমনকি আঁচল পেরিয়ে কাঁচা হলুদ রঙের লাল আভা যুক্ত ত্বককেও বেশ খানিকটা ভিজিয়ে দিয়েছে – সেই চোখের জলের উপর দুপুরের হালকা রোদের ছটা পরতে, যমুনার মনে হল যেন গৌরীর বুকে সহস্র নক্ষত্র ঝিকিমিকি করছে। সেইদিকে গৌরীর বা গঙ্গার কোন হুঁশ নেই – আজ যেন মা মেয়ের মিলনের দিন! গঙ্গার মুখখানা কাঁদতে কাঁদতে রাঙা হয়ে উঠেছে, গৌরী নিজের পদ্মফুলের পাপড়ির মত দুটো গোলাপি হাতে তাকে তুলে নিয়ে  বলে, ‘ধুর বোকা মেয়ে! পাশে ছোট বোনটা রয়েছে – এরকম করে কেউ কাঁদে! বোন কি ভাববে! বোনের মুখটা একবার তাকিয়ে দেখ – দিদির এরূপ দশা দেখে, সে যে হতাশ হয়ে পড়েছে! আর শোন – আমি তোদের কাছে এই জন্য আসিনি যে ছেড়ে চলে যাব! তুই তাড়ালেও যাব না!’

গৌরী এতখানি বলতে, গঙ্গা, দু তিন বছরের বাচ্চা শিশুর মত গৌরীকে জড়িয়ে ধরল আর যেন মায়ের কাছে সম্মতি নেওয়ার মত গুঙিয়ে গুঙিয়ে বলল, ‘আমি আজ আর এখুনি হতে তোমায় মা বলেই ডাকবো। তুমি সারা না দিলেও আমি ওই নামেই ডাকবো!’ গৌরী মুচকি হেসে বলল, ‘আচ্ছা বেশ, তাই হবে! তাই হবে!’ অন্যদিকে যমুনাও পিছন থেকে গৌরীকে জড়িয়ে ধরল, আর বলল, ‘দিদির মা মানে আমারও মা!’ গৌরী মেয়েদের ছেলেমানুষের মত আবদার শুনে অন্তরভর্তি তৃপ্তির হাসি দিয়ে বাঁ হাতটাকে পিছনের দিকে এনে যমুনার বাম গালে হাতটা রেখে সম্মতি জানালো। এই অবস্থাতেই গঙ্গা আর যমুনা খানিক থাকতে থাকতেই ঘুমিয়ে পরল।

তবে বেশীক্ষণের ঘুম নয় – এই আধ ঘণ্টা মত হবে – গঙ্গা ধরমরিয়ে উঠে পরল। দুই বোনের কি মিল। দিদি উঠতেই যমুনাও যেন টের পেয়ে গেল। গঙ্গা বলে উঠলো, ‘তুমি ঘুমাওনি!’ গৌরী আবার মুচকি হেসে বলল, ‘কতদিন পরে মেয়েটাকে আনন্দের ঘুম ঘুমাতে দেখলাম – মন ভোরে দেখছিলাম!’ গঙ্গা বলে উঠলো, ‘তোমার গল্প কিন্তু অর্ধেকও হয়নি! শ্রীনগরে পৌঁছালে! তারপর?’

গৌরী আবার বলতে আরম্ভ করল। যমুনা পিছন থেকেই গৌরীকে জড়িয়েই রইল। গল্প বলতে শুরু করায় আরও বেশী করে জড়িয়ে, কানটা মুখের যতটা কাছে পারল নিয়ে চলে এলো। অন্যদিকে গৌরী বললো –

আর কি বলব, শ্রীনগরে পৌঁছে তো সে আরেক পর্ব। কাকা যার ফোন নম্বর দিয়েছিল, সেই হোসেন কে তো ফোনে পাওয়াই যায় না। আমার তো দিশাহারা ভাব। কি যে করি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না! হঠাৎ দেখি ওই রবার এসে হাজির।

গঙ্গা অবাক হয়ে বলল, ‘রবার মানে?’

যমুনা বলল, ‘রবানি বারি, বুঝলি না! মার সব মনে থাকে, নাম কিছুতেই মনে রাখতে পারে না!’

গঙ্গা হাসতে হাসতে বলল, ‘তবে নামটা বেশ – রবার! তুমি কি ওই নামেই ওকে ডাকতে না কি!’

গৌরী বলল, ‘হ্যাঁ রবার বলেই ডাকতুম! ও রবার নামেই সাড়া দিত!’ বলে, ‘হি হি’ করে হাসতে থাকল। এই বলে, গৌরী আবার বলতে শুরুকরল –

‘রবার এসে বলে, – কি হল মাতাজি – আপনি যার কথা বলছিলেন, সে আসেনি বুঝি? আমি বললাম, ওর ফোনই তো লাগছে না! রবার বলল, ছাড়ুন ওসব! এদের মুখে একরকম, কাজে আরেক রকম…… আপনি অমরনাথ গুহা যাবেন তো! আমার সাথে আসুন। সেখানে যাবার জন্য প্রথমে ইন্ডিয়ান আর্মি থেকে একটা পাস নিতে হয়। আমার সাথে আসুন। আমার আর্মিতে চেনা আছে। এই বলেই ও তাড়াতাড়ি পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিল। আমি কি অত তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারি! খানিক পরে ও ঘুরে দ্যাখে, আমি অনেকটা পিছিয়ে! সেই দেখে আবার আমার দিকে এগিয়ে এলো। তারপর আমার সাথে সাথেই হাঁটতে শুরু করল। মিনিট পাঁচ-হাটার পর আমরা একটা ঘরের সামনে দাঁড়ালাম। ও আমাকে ঘরের বাইরের একটা কাঠের বেঞ্চিতে বসতে বলে, ভিতরে ঢুকে গেল। চার পাঁচ মিনিট পর, বাইরে এসে আমায় বলল, আপনি আসুন, ভিতরে আসুন! এই বলে আমায় ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল।

ভিতরে গিয়ে দেখলাম, তিন চারজন পুলিশ গোছের রয়েছে। রবার আমাকে একজনের কাছে নিয়ে গিয়ে, চেয়ার পিছিয়ে দিয়ে বসতে বলল। আমি বসতেই, সামনের পুলিশটা বলল, ‘কাহা সে হে আপ!’ আমি বললাম, ‘কলকাতা!’

কলকাতা বলতে একটু সিট ছেড়ে এগিয়ে এসে বলল, ‘আপনি বাঙালী!’ আমি ঘাড় নাড়তে সে বলল, ‘কোথা থেকে, বেলুড় মঠ না ভারত সেবাশ্রম!’ আমি বললাম, ‘ওসব কিছু নয়! আমার মামা আমাকে শিবের সাথে বিয়ে দিয়েছে। আমি শিবের কাছে যাচ্ছি!’ সে লোক তো আমার কথা শুনে হেসেই লুটোপুটি। আমি বললাম আপনি কি বাঙ্গালী? এত সুন্দর বাংলা বলছেন যে? পুলিশটি ঘাড় নাড়িয়ে সন্মতি দিয়ে হাসতে থাকল। হাসতে হাসতে হটাৎই চুপ করে গেল, তারপর বলতে শুরু করল, ‘আপনার ঠাণ্ডা লাগছে না! একটা পাতলা শাড়ী পরে রয়েছেন যে!’ আমি বললাম, ‘কই না তো!’

রবার পাশ থেকে হিন্দিতে বলে উঠলো, ‘স্যার আমি উনার সাথে জম্মু থেকে একসাথে বাসে এসেছি! হতে পারে উনি কোনো আশ্রমের সাথে যুক্ত নন, কিন্তু উনি সাধুই’। ওই পুলিশ হিন্দিতেই রবারকে বলল, আমারও তাই লাগছে! এত ঠাণ্ডা! অথচ উনার কোন ঠাণ্ডা লাগছে না – এ তো কোন সাধুর ক্ষেত্রেই একমাত্র সম্ভব!

খানিকক্ষণ থেমে আবার হিন্দিতে বলল, তুমি উনার সাথে যাচ্ছ, তাই তো!  রবার সন্মতি জানিয়ে হিন্দিতেই উত্তর দিল, উনার রাস্তা জানা নেই সাব! ওই বাঙালী পুলিশটি বলল, ঠিক আছে! এখনই বেরুচ্ছ কি! রবার উত্তর দিল, হ্যাঁ সাব। এখন বের হলে, সন্ধ্যের মধ্যে বালতাল পৌঁছে যাব। সেখানে আজ রাতটা থেকে – কাল সকালেই বেরিয়ে পরলে, সন্ধের মধ্যে অমরনাথ দর্শন হয়ে যাবে – কি বলেন স্যার!

পুলিশটা রবারের উদ্দেশ্যে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল, পয়সা আছে কিনা? কথাটা রবারকে বললেও, আমি উত্তর দিয়ে দিই, ‘হ্যাঁ আছে! কত দেব!’ আমি ভেবেছিলুম পুলিশটি টাকা নেবে। উত্তরে পুলিশটি বলল, রাখুন তো ওসব! বলে সিন্ধ নামে কাউকে ডাকল! দেখলাম একটা পুলিশ এসে মাথায় হাত ঠেকিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ালো। বাঙালী পুলিশটি সিন্ধ নামের পুলিশটাকে বলল, তোমার খাবার জলের ব্যবস্থা করতে বালতাল যেতে হবে বলছিলে না! উত্তরে সিন্ধ বলল, ‘ইয়েস সার’।  ওফ কি চেঁচিয়ে বলল রে বাবা! কানে তালা লেগে যায়। বাঙালী পুলিশটি আবার হিন্দিতে সিন্ধের উদ্দেশ্যে বলল, এখনই যাবে না কি! ও আবার চেঁচিয়ে উত্তর দিল, ‘ইয়েস সার’। আমাদের বাঙালী সাব বলল, এই দুজনকে বালতালের আর্মি বাংলোতে রেখে আসবে আর ফেরার সময় খাবার জলের ব্যবস্থা করে আসবে। আমি মেসেজ করে দিচ্ছি। এই বলে একটা ফোন করে কিরকম ভাষায় যেন কথা বলল –আমি তো কিছু বুঝলাম না!

একটা জীপ গাড়িতে আমি, রবার, সেই চেঁচানো সিন্ধ নামে লোকটা উঠে পরলাম। পরে রবারকে জিজ্ঞেস করলাম, ওই লোকটা কথা বলার সময় এত চেঁচাচ্ছিল কেন! রবার বলল যে আর্মির লোকেরা নাকি এইভাবেই কথা বলে। আর জিজ্ঞেস করলাম, ওই সাহেব শেষে কি ভাষায় কথা বলছিল! ও বলল ওটা উর্দু ভাষা।

বালতাল যত যাচ্ছিলাম, রবারকে দেখলাম, ঠাণ্ডায় সিটিয়ে যাচ্ছে। দেখে কি খারাপ লাগছিলো – কিছু নেইও সঙ্গে যে ওকে ঢেকে দেব! শেষে দেখলাম, ওই নিজের ব্যাগ খুলে, কি যেন একটা আলখাল্লা ধরনের জামা পরে নিল। তারপর ঠিক হল। আমাকেও ঠিক একইরকম একটা জামা দিয়ে বলল পরে নিতে। পরলাম, কিন্তু কি গরম লাগছিল – বাবা রে! গা হাত পা জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছিল – মুখ চোখ লাল হয়ে গেছিল গরমে। সেই দেখে রবারই বলল, মাতাজি আপনি ওটা খুলে দিন! আমার মনে হল আপনার ঠাণ্ডা লাগবে… তাই – কিন্তু আপনি তো ঠাণ্ডা কি জিনিস, সেটাই জানেনই না! খুলে দিন! খুলে দিন! আপনার খুব অসুবিধে হচ্ছে!

আমি খুলে দিতে ও ওটা হাতে করে ধরে রইল, ব্যাগে ঢোকাল না। এই ঘণ্টা চারেক গাড়ি চলার পর আমরা একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে পৌঁছালাম। একটা দোতালা কাঠের বাড়ির সামনে আমাদের জীপটা দাঁড়ালো। আমরা তিনজনেই নেমে পরলাম। ওই সিন্ধ আমাদের দুজনকে নিয়ে ভিতরে গিয়ে আবার ওই উর্দু ভাষায় কি বলল। তারপর রবারকেও কি সব জিজ্ঞেস করতে, রবার উত্তরেও কি সব হেসে হেসে বলল। তারপর আমাদের দুজনকে ভিতরের দিকে একটা ঘরে নিয়ে গেল। ছোট্ট কাঠের ঘর। ঘরের মধ্যে দুটো ঘর আর একটা কলঘর। আমি রবারকে জিজ্ঞেস করলাম, ওরা কি বলল? রবার বলল, ওই লোকগুলো একটা ঘর নিতে বলছিল। আমি বললাম – আমার সাথে একটি মহিলা আছেন আর কাল সকাল সকাল ঘর ছেড়ে দেব – তাই দুটো ঘর দিতে বলছিলাম। শেষে রাজী হল।

ও ব্যাগ রেখে বলল, মাতাজি আপনি আর কাপড় তো আনেননি! আপনি এক কাজ করুন। আমার কাছে একটা বড় কাপড় আছে। সেটা পরে নিয়ে আপনি আপনার কাপড়টা একটু কেঁচে নিন – আজ অনেকদিন পরে রোদ্দুর উঠেছে –তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে। আমি আপনাকে ওই বড় কাপড়টা দিচ্ছি, দাঁড়ান। আপনি তাড়াতাড়ি কাজ সেরে নিন। আমি বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসছি। আমি শুনে ওর হাতে কিছু টাকা দিতে গেলাম – ও কিছুতেই নিল না। আর বলল, যে দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিতে। আমার কাজ হয়ে গেলে তবেই খুলতে। আমি সব করে, কাপড় ধুয়ে ওই চাদরটাকে শাড়ীর মত করে পরে, কাঁচা কাপড়টি রোদে শুকোতে দিলুম। তারপর দরজা খুলে দিলুম। দেখলাম রবার বাইরে দাঁড়িয়ে রইছে। সে আমায় ব্লাউজ ছাড়া অবস্থায় দেখে বলল, একি! বলে ব্যাগ থেকে একটা জামা বার করে আমায় দিল – বলল, এটা পড়ে নিন – আর্মির লোকেরা মহিলাদেরকে ভালো চোখে দেখে না!

আমি জামা খানা পরে নিলুম। বিকেলের দিকে আমার শাড়ী ব্লাউজ শুকিয়ে যেতে রবার বলল, মাতাজি আপনি আপনার কাপড় পরে নিন। আমি বাইরে থেকে রাতের খাবার নিয়ে আসছি। এবারে আমি জবরদস্তি ওর বুক পকেটে একটা একশো টাকা গুঁজে দিই। ও ফিরে আসতে আসতে আমার কাপড় জামা পাল্টানো হয়ে গেছে। রবার ভিতরে এসে, প্রথমে আমার বিছানাটা পরিষ্কার করে দিল। ও বুঝে গেছিল যে আমি কম্বল গায়ে রাখতে পারব না। তাই যেই চাদরটা সকাল থেকে জড়িয়ে ছিলাম, সেটাই গায়ে দেবার চাদরের মত ভাঁজ করে পায়ের দিকে রেখে দিল। আমায় বলল, মাতাজি, আপনি শুয়ে পরুন, কাল সকাল সকাল আমরা বেরিয়ে পরবো। পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে বেরিয়ে পরবো।

এই বলে সে পাশের ঘরে চলে গেল। আমি শুয়ে পরেছিলাম। খানিকক্ষণ পরে মনে হল, ছেলেটা একা একা কি করছে কে জানে। উঠে দেখি বিছনায় বসে, কি সব লাঠি ঠিক করছে। আমি কাছে যেতে ও চমকে গেল। জিজ্ঞেস করতে বলল, যে রাস্তা দিয়ে আমরা যাব সেটা নাকি খুব খাঁড়াই। তাই এই লাঠিগুলো কাজে লাগবে। এটা করেই ও শুয়ে পরবে। একবার আমাকে একটা লাঠি ধরিয়েও দিল, দিয়ে দেখতে বলল যে, শরীরের ভর দিলে লাঠি নিতে পারছে কি না! আমি দেখলাম – কি শক্ত লাঠি রে বাবা! পিঠে মারলে, পিঠের হাড়গোড়ই ভেঙে যাবে। সেই কথা শুনে, সে তো হেসেই খুন।

আমি আস্তে আস্তে তাকে বললাম –যেখানে যাচ্ছি সেখানে শিবের দেখা না পেলে আমি ফিরবো না – কৈলাস যাব। শুনে সে বলে, কৈলাস যে অন্য দেশে! আমি যাব কি করে? আমি নাছোড়বান্দা দেখে সে বলল, উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে যোষিমঠ বলে একটা গ্রাম আছে, সেখানে তার এক চিনা বন্ধু আছে। সে নাকি মেয়ে –চিনা মেয়ে। ভারতে সাপের ব্যবসা করে। বাংলোয় আগে যে কদিন ছিল, সেখানেই নাকি আলাপ। সে তার কাছেই নিয়ে যাবে। সেখান থেকে নন্দাবন বলে একটা বন আছে, সেটা পেরোলেই কৈলাস। ওই বন্ধুটার নাকি চীনা সেনার সাথে জানাশোনা আছে। সেই দিক দিয়ে আমায় কৈলাস যাবার ব্যবস্থা করে দেবে, কিন্তু তার জন্য আমাকে অমরনাথ থেকে ফিরতে হবে – এই একটাই শর্ত তার। আমিও দেখলুম ছেলেটা আমার জন্য এত ভাবে – ওকে বিপদে ফেলা হয়ে যাবে – তাই সম্মতি দিলাম। আর মনে মনে ভাবলাম – শিবের যেমন ইচ্ছে!

রোজ ঘুম ভাঙ্গে, কিন্তু সেদিন আমার ঘুম আর ভাঙেনি! আচমকা মনে হল, আমার পা ধরে কেউ নাড়াচ্ছে। চোখ চেয়ে দেখি রবার, আমার পা ধরে নাড়িয়ে আমায় ডাকছে। আমি উঠে বসতেই বলল, – হাত মুখ ধুয়ে নিন – আমাদের বেরুতে হবে। না হলে, বিকালের মধ্যে পৌঁছাতে পারবনা!’ আমি মুখ টুক ধুয়ে চলে এলুম। রবার যেন আমার বাপ! ছোট মেয়ের মত নিয়ে বেরিয়ে পরল।

তখনও ঠিক মত দিনের আলোটাও ফোটেনি! রবার বলল, সেখানে রোদ্দুর উঠতে উঠতে প্রায় নয়টা বাজবে। তার মধ্যে আমরা দমিয়াল পেরিয়ে বরারির কাছাকাছি থাকবো। পথে যেতে যেতে সে বলছিল দমিয়াল নাকি সেখান থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটারের পথ। পাহাড় ভেঙে ভেঙে যেতে হয়। পথে একটু একটু বরফ পাব, তবে বরফ খুব বেশী পাব বরারির কাছাকাছি। সেখানে নাকি বছরের বেশিরভাগ সময়েই বরফ থাকে। বরারির বরফ পাবার আগে একটু জঙ্গলও পাব। ও বলছিল, চিন্তার কিছু নেই, যখন আমরা বরারির জঙ্গল পেরুব, তখন রোদ না উঠলেও, দিনের আলো ফুটে যাবে – বন্য প্রাণীরা নাকি সেই সময়ে শিকার করে না – সকালের রোদ্দুর বেরোবার পর ওদের শিকার – তার আগে আমরা জঙ্গল পেরিয়ে যাব।

দমিয়ালের পথ খুব বন্ধুর – বড্ড চড়াই উৎরাই সেই পথ। একেক বার তো রবার উঁচুতে উঠে গিয়ে হাত ধরে আমায় টেনে তুলছিল। প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা দমিয়াল পৌঁছালাম। রবার ঘড়ি দেখল – দেখে বলল, ঠিকই চলেছি আমরা – স্রেফ সাতটাই বেজেছে, সামনে বরারির জঙ্গল আসবে – হাঁটাপথে জঙ্গল পৌঁছতে মাত্র আধ ঘণ্টা লাগবে – আর আরও আধঘণ্টা লাগবে জঙ্গল থেকে বেরোতে। তারপর ঘণ্টা খানেক হাঁটলেই বরারি গ্রামে পৌঁছে যাব। সামনের চায়ের দোকান থেকে ও চা খেল, আমায় চা খেতে বললে, আমি বললাম – আমি শিবের সাথে দেখা করার আগে কিচ্ছু খাব না! সেই শুনে ও হেসে বলল, ঠিক আছে মাতাজি।

চা খেয়ে আবার সে আমায় নিয়ে চলতে শুরু করল। ও বলছিল, চায়ের দোকানের সবাই ওকে জিজ্ঞেস করছিল আমার কথা –আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? এই ভয়ঙ্কর শীতে আমার ঠাণ্ডা লাগছে না কেন? আরও কত কিছু। কথা বলতে বলতে খানিকক্ষণ পর হঠাৎ থেমে রবার আমায় বলে ঊঠলো, – মাতাজি, আপনিতো হাঁপিয়ে যাচ্ছেন না ! আমরা পাহাড়ে থাকি, পাহাড়েই বড় হয়েছি, তবুও হাঁপিয়ে যাচ্ছি – কিন্তু আপনাকে দেখে মনেই হচ্ছে না যে আপনি হাঁপিয়ে উঠছেন! প্রত্যুওরে আমি খালিই হাসলাম, সেই দেখে ও পাল্টা হেসে চলতে থাকল। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এই রাস্তা সে এত ভালো চেনে কি করে? ও বলল, এখন তো ও গাইডের কাজই করে। বলল, যেই সাহেবের কাছে ও আমাকে শ্রীনগরে নিয়ে গেছিল, সেই সাহেবই নাকি ওকে গাইড হতে সাহায্য করেছে।

আরও অনেক কথা বলছিল। বলছিল বেশীরভাগ সাহেবরাই নাকি খুব খারাপ প্রকৃতির হয়। মেয়ে মানুষ দেখলেই কিরকম যেন শিকারি নেকড়ের মত হয়ে যায় – লোকজনের সাথে, বিশেষ করে গ্রামবাসীদের সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে। কিন্তু কয়েকজন আছে – যারা সত্যি খুব ভালো। তাদের জন্যই নাকি গ্রামবাসীরা এখনও ভারতে থাকতে পারছে! আরও অনেক কথা বলতে বলতে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকলাম আমরা।

তবে জান ঠিক জঙ্গল জঙ্গল মনে হল না – বেশী ঘন নয়! কয়েক জায়গায় রবারকে দেখলাম দাঁড়িয়ে গিয়ে আমার হাত ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে এলো – কারণ জিজ্ঞেস করলে বলল, বরফের চিতার পায়ের ছাপ – কি একটা কথা বলেছিল – স্নু…স্নু… লেপড, না কি একটা।

গঙ্গা হেসে বলে উঠল, ‘ওটা স্নো লেপার্ড!’

গৌরী শুনে হাসতে হাসতে বলতে থাকল, ‘ওই হল বাবা, লেপড!’

সেই শুনে তিনজনেরই হো হো করে হাসতে থাকল। তারপর যমুনা বলে উঠল, ‘এরপর কি হল?’ গৌরী আবার বলতে আরম্ভ করল –

এই জঙ্গলেই নাকি অনেক ধরনের সাপ পাওয়া যায়। কিছু পাহাড়ি বন্য হরিণ আছে, আর আছে ওই লেপড। এই জঙ্গলে সাপ ধরতে এসেই নাকি ওর ওই চিনা বান্ধবীটি হারিয়ে যায়! সেইখান দিয়েই রবার কয়েকজনকে নিয়ে সঙ্গম যাচ্ছিল। রবার দ্যাখে, যে ওই চিনা মেয়েটি সাপ দেখিয়ে লেপড তাড়াচ্ছে। রবার মেয়েটিকে বাঁচাতে দুটো শুকনো গাছে আগুন লাগিয়ে দেয় – জন্তুরা নাকি আগুন খুব ভয় পায় – আগুন দেখে সেই লেপড তৎক্ষণাৎ পালায়! তারপরে রবার মেয়েটাকে নিয়ে সঙ্গম যায় আর ফেরার পথে ওকে নিয়ে আসে শ্রীনগরে। সেইখানেই ওদের আলাপ – সে চীনা মেয়েটা নাকি সাপ ভালোবাসে আর কি যেন একটা সব বাড়িতে বাড়িতে ছড়িয়ে দিতে চায়, যাতে মানুষ সাপকে আর ভয় না পায়। মেয়েটার নাম জিজ্ঞেস করেছিলাম। কি বলল জানো? বলল, ঝিঙে ছাউ?

এই বলে গৌরীর কি হাসি – সে হাসি আর থামে না। যমুনা কিছু বুঝল না – শুধু ঝিঙে ছাউ কথাটা শুনে ওরও খুব হাসি পেল। অন্যদিকে গঙ্গা পুরোপুরি হেসে খুন। গঙ্গার হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হবার জোগাড়। হাসি থামতে, (তখনও হাসতে, হাসতে) বলল, ওটা ঝিঙে ছাউ নয় গো – ওটা জিং চোউ। বুঝেছি, আর নামও শুনেছি এই মেয়েটার – একবার খবরের কাগজে ওর নাম বেরিয়েছিল – ও নাকি বিপুল পরিমাণে এন্টিভেনম প্রস্তুত করে – এবং খুব কম দামে বিভিন্ন রাজ্যে রাজ্যে দেয়। সাপ ধরতে ও ওস্তাদ আর সাপের সাথে ওর সখ্যতাও অদ্ভুত!’

গৌরী বলল, হ্যাঁ ওই মেয়ের সাথে আমার পরে দেখা হয়েছে – রবার নিয়ে গেছিল। কি ভয়ানক সাহস মেয়েটার – কিন্তু কি সুন্দর ফুটফুটে দেখতে! মনটাও ভারী ভালো মেয়েটার।

গঙ্গা বুঝে গেল, যে গৌরীর কথা একশো শতাংশ খাঁটি – কনো গল্প নেই এতে। কি মারাত্মক এডভেঞ্চারটাই না করে এসেছে সে ! অসামান্য!

গৌরী আবার বলে চলল, আমার ছেলে রবারেরও সাহস কম নয় – আমায় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে যেতে কত রকম সাপ দেখিয়েছে – একেকটা কত বড় বড় সাপ, মাথা দেখা যায়, লেজ দেখা যায় না! বেশ কিছু হরিণও দেখিয়েছে। জানো, একটা হরিণ কাছে এসেছিল। রবার বলল, সরে আসতে, ওরা গুঁতিয়ে দেয় – কিন্তু আমার কেন যেন মনে হল, ও আমার কাছে আদর খেতে এসেছে! তাই এগিয়ে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম – ও চোখ বন্ধ করে রইল। এবার দেরী হয়ে যাবে বলে রবার চলে আসতে বলল। সে আমাদের পিছনে পিছনে খানিকটা এলো, তারপর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পরল।

গঙ্গা এই কথাটা শুনে অবাক হয়ে গৌরীকে দেখছিল আর মনে মনে ভাবছিল, কে এই মহিলা যার কাছে বন্য হরিণও চুপ করে রইল!

গৌরী নিজের মত বলে চলল, জঙ্গল পেরোতেই দেখলাম চাঙ্গর চাঙ্গর বরফ, কোথাও হেলে রয়েছে আবার কোথাও গাছের উপর থেকে ঝুলছে। রবার ওর ব্যাগ থেকে ওই আলখাল্লা জামা বার করে পরে নিল আর একটা কি কুরনিক মত বার করল। আমায় জিজ্ঞেস করল আমার ওরকম আলখাল্লা লাগবে কি না! আমি আসলে আঁচলের কাপড়টা জড়িয়ে নিয়েছিলাম তো –ঠাণ্ডা লা গছিলই না! ওকে দেখলাম ওই কুরনিকের মত জিনিসটা দিয়ে বরফ সরাচ্ছে আর আমরা আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছি। পিছন ফিরেই দেখি কি – আবার বরফ হয়ে গেছে জায়গাটা। এরকম করতে করতে প্রায় একঘণ্টা হয়ে গেল, আমরা পৌঁছলাম বরারি গ্রামে। তখন রবার ঘড়ি দেখে বলল, সাড়ে নটা।

ও বলল, একটু জল খাবার খেয়ে নিয়ে দশটায় পথ চলা আরম্ভ করবে। আর মাত্র ছয় কিলোমিটার রাস্তা। একটু গড়ানো রাস্তা হবে – বরফ থাকবে একটু, তবে অসুবিধে হবে না। তারপর আর কনো বরফ নেই – সুন্দরবন, সুন্দর সুন্দর ফুল আর সুন্দর সুন্দর পাখির ডাক আর প্রজাপতি দেখতে দেখতে কখন পৌঁছে যাব বোঝাই যাবে না। কঠিন রাস্তা শেষ। সঙ্গম অবধি একটু বরফ পাব, তারপর আর কনো বরফ নেই। সঙ্গম আর মাত্র তিন কিলোমিটার মতন রাস্তা, তবে নিচের দিক তো! তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব। খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল রবারকে! তাই জিজ্ঞেস করলাম আর সব মিলিয়ে কতক্ষণ লাগবে? ও বলল, আর দু ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা। সঙ্গমে গিয়ে একটু কিছু খেয়ে নেবো। তারপর সোজা গুহার সামনে। পাহাড়ে রাত হয় দেরীতে। সূর্য ডুবতে ডুবতে প্রায় আটটা। ততক্ষণ অবধি গুহা খোলা থাকে। আমি বললাম – তাহলে ভাই তুমি একটু বিশ্রাম করে নাও, বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমায়। ও হেসে বলল, এই প্রথমবার কাউকে নিয়ে এলো সে, যে নাকি ক্লান্ত হয়নি, কিন্তু সে নিজে ক্লান্ত হয়ে গেছে!

যাই হোক রবার দশটার মধ্যেই আবার চাঙ্গা হয়ে উঠলো। আমায় নিয়ে আবার পথ চলতে আরম্ভ করে সে। খুব সুন্দর লাগছিল পরিবেশটা। একটাও গাছ নেই! শুধু বরফ আর তার মাঝে মাঝে পাহাড়ের রঙ দেখা যাচ্ছিল। উপরে নীল আকাশ আর তার মধ্যে ছোট ছোট কয়েকটা মেঘের টুকরো ভেসে ভেসে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে বরফ কমতে থাকলো।  যেন মনে হল বরফটা উপরের দিকে আর আমরা নিচে মেঘের মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি। রবার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পরল। আমাকে একটা বিস্তীর্ণ এলাকা দেখাল– ওটা নাকি সঙ্গম – গরমকালে সেখান দিয়ে অঝোর ধারায় বরফ গলে নিচের দিকে ঝিলাম নদীতে পরে। এইখান হতেই নাকি কাশ্মীর উপত্যকার সব নদীর জল নেমে আসে। তখন ঘড়ি দেখে সে বলল এখন বাজে –এগারোটা তিরিশ। সেখানে ও আর দাঁড়ালো না। বলল, খিদে পায়নি। একেবারে গুহার সামনে গিয়েই খাবে।

আবার চলতে আরম্ভ করি আমরা। দূরে একটা পাহাড় দেখতে পেলাম। সেখান দিয়ে বাবা অমরনাথের কাছে লোকে যায় ঘোড়ায় চেপে। সেটাই নাকি সব পর্যটকদের পথ – পেহেলগাও! আমরা নিচের দিকে আর না গিয়ে, এবার সোজা যেতে থাকলাম, সেই নদীর জল যাবার পথের পাস দিয়ে। কি সুন্দর জায়গাটা! কত রঙের ফুল ও আপেল গাছে পরিপূর্ণ।  রবার বলল, এই আপেল খেতে খুবই সুস্বাদু। আমাকে সে বলল যেহেতু আমি উপবাসে রয়েছি, তাই এখন সে গাছ থেকে আপেল পারছে না। কাল যখন ফিরবে, তখন সেই সুমিষ্ট আপেল আমায় পেড়ে খাওয়াবে। যাই হোক বেশিক্ষণ লাগেনি আমাদের গুহার সামনে পৌঁছাতে। কি বিশাল গুহা! কি বিশাল মুখটা! মানুষগুলোকে যেন খুদে খুদে লাগছিল!

গুহা দেখতে পাবার পর, প্রায় দশ মিনিট হাঁটলাম, শেষে আমরা পৌঁছলাম সেই পবিত্র গুহার মুখে! খানিকক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর রবার ঘড়ি দেখল – দুপুর একটা বাজে। ও বলল আমার সাথে ও ভিতরে যাবে, তবে আগে কিছু কাজ আছে। আগে ওকে দেখে নিতে হবে কোথায় ক্যাম্প খালি আছে। আজ রাত্রিটা সেই ক্যাম্পেই কাটাতে হবে। কাল ভোর চারটে নাগাদ আমরা আবার রওনা দেব। তাহলে বরারির জঙ্গল ৯ টা বাজার আগে পেরিয়ে যেতে পারব। আমাকে একটা পাথরের উপর বসিয়ে রেখে ও এগিয়ে গেল খবর নিতে।

দুই বোন অবাক হয়ে সেই গল্প শুনছিল। গৌরী একটু থামতে যমুনা বলে উঠল, ‘তারপর বল?’ গঙ্গা এবার দাবড়ানি দিয়ে বলে উঠল – ‘যমুনা! কটা বাজে খেয়াল আছে – বিকেল পাঁচটা বাজে। ও অনেকক্ষণ ধরে বলছে। এখন ওঠ তো। কাল আমি বাচ্চাগুলোকে বলে দিয়েছি দুদিন পড়াবো না। তাই সব কাজ শেষ করে সন্ধেবেলায় আবার গল্প শুনবো। চিরুনিটা গিয়ে নিয়ে আয় তো, আর শোন সিঁদুরের কৌটোটাও নিয়ে আসবি’।

যমুনা ছুটে গিয়ে ছোট আর বড় দাঁড়ার চিরুনি আর তার সাথে সিঁদুর কৌটো নিয়ে এলো।  গঙ্গা প্রথমে যমুনার চুল বেঁধে –দুদিকে দুটো বিনুনি করে দিল। এবার বসল গৌরীর চুল নিয়ে। কি বিশাল চুল! গৌরীর ওই বিশাল চুল নিয়ে, গঙ্গা হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিল। কিছুতেই বাগে আনতে পারছিল না। এমন কি একা পেরেও উঠলো না গঙ্গা, শেষে তলার দিকের চুলটা বাঁধে আর যমুনার হাতে ধরিয়ে দেয়। দিয়ে আগে এগিয়ে যায় এই ভাবে যখন চুল বেঁধে পুরোটা একটা বিনুনিতে দাঁড়াল, তখন একটা জাত কেউটের ছানায় পরিণত হয়েছে বিনুনিটা। গঙ্গা প্রায় পুরো বিনুনিটা করে নিয়ে সেটাকে গোল করে খোঁপা করবে, এমন সময়ে যমুনা বলে উঠল, ‘দাঁড়াও দিদি!’ বলেই ছুট্টে চলে গেল। চোখের নিমেষে কোথা থেকে এক থোক জুঁই ফুল নিয়ে এসে হাজির হল। মাটিতে ছড়িয়ে দিয়ে ছুঁচ সুতোর বাক্সটা নিয়ে চলে এলো – এসে টপাটপ একটা বিশাল চার ফুট বাঁ তার চেয়েও বড় মালা গেঁথে ফেলল – উফ্ কি তাড়াতাড়ি মালাটা গাঁথল ও! মালা গাঁথা হয়ে গেলে, গৌরীর পুরো বিনুনিটাকে বেষ্টন করে মালাটা পরিয়ে দিল – তারপর মুচকি হাসতে হাসতে গঙ্গা ওই বিশাল বিনুনিটাকে খোঁপা করে দিয়ে চার পাঁচটা কাঁটা দিয়ে আটকাল। কিন্তু কিছুতেই সেই খোঁপা থাকে না। তাই যমুনার বুদ্ধিতে চুলে সেটি বিনুনি অবস্থাতেই রেখে দিল। ঘন কালো চুল আর সেটাকে ঘিরে দুধ সাদা জুঁই ফুলের মালা – অপূর্ব শোভা আর গন্ধে পুরো ঘর ভরে গেল। এবার গৌরী গঙ্গার চুল বেঁধে দিল – কি সুন্দর করে বাঁধল চুলখানা! বেঁধে সুন্দর করে খোঁপা করে মাথায় গুঁজে দিল।

গঙ্গা উঠে গিয়ে গৌরীর জন্য আলমারি থেকে একটা লাল শাড়ী আর তুঁতে রঙের ব্লাউজ বার করে আনল। ওই শাড়ীটা ওদের মায়ের – কি নরম শাড়ীটা। শাড়ীটার গৌরীকে পরানোর পর এত সুন্দর লাগছিল যে, গঙ্গা একেবার জড়িয়ে ধরে গৌরীকে বলতে থাকলো, ‘যাই বলো আর তাই বলো, তোমায় দেখে কিন্তু মনে হয় যেন স্বয়ং গৌরীই নেমে এসেছে আমাদের সাথে থাকবে বলে!’

গৌরী বলল, ‘গঙ্গা মা, আমি তো এয় স্ত্রী। আমি তুলসীতলায় পুজো দেব? গঙ্গা বলল, ‘বেশ সেটা তো ভালই হয়’। তুমি তুলসী তলায় যাও, আমি শাঁখের সাথে, প্রদীপটা আর ধুপ জ্বেলে নিয়ে যাচ্ছি। প্রদীপ দেখিয়ে, ধুপ দেখিয়ে, শাঁখ বাজিয়ে তুলসীতলায় সন্ধ্যে দেওয়া হয়ে গেলে, গৌরী গড় হয়ে প্রণাম করে। তারপর ভিতরে এসে বসতে, যমুনা বলে উঠলো, ‘দিদি আজ আর রুটি খাব না! আজ সবাই মিলে গোবিন্দ ভোগের ভাত খাব!’ গঙ্গা বলল, ‘যেদিন থেকে ও গোবিন্দভোগের ভাত খেয়েছে, সেদিন থেকে তোর খাবার ইচ্ছা। আজ আবার গল্প শোনার আছে! বুঝি বুঝি, সবই বুঝি!’ অন্যদিকে গৌরী তো হেসেই খুন দুই বোনের কাণ্ডকারখানা দেখে! শেষে কিন্তু যমুনার কথাই থাকলো। যমুনা একটু চা বানিয়ে নিয়ে এলো সবার জন্য। সকলে চা খেয়েই বসে পরল গৌরীর দিকে মুখ করে, গল্প শোনার ইচ্ছা নিয়ে। গৌরীও বলতে শুরু করল –

শোনো তাহলে গুহার মধ্যে ঢুকে কি হল! বেশী লোক ছিল না। রবার বলল, তখনও নাকি সময় হয়নি সব পর্যটকদের যাবার। তাই ফাঁকা ফাঁকাই ছিল। বিশাল গুহাটা ঘুরে ঘুরে দেখছি, যখন গুহার ঠিক মাঝখানটা গিয়ে বসলাম, হঠাৎ মন কেমন যেন ব্যাকুল হয়ে উঠল। কিছু ভাবতে পারলুম না জানো! সোজা গিয়ে বসে পরলুম। বসতেই কি সব হতে থাকলো – কিছু মাথা মুণ্ডু বুঝেই পেলুম না। কি সব স্মৃতি, কি সব জিনিস যেন ভিতরে ঢুকতে থাকলো! ঠিক কি হল বুঝতে পারলুম না, তবে একটা জিনিস পরে উপলব্ধি করলুম – অনেক শক্তি আর অনেক জ্ঞান যেন ভিতরে ঢুকে গেল।

চোখ খুলে দেখি রবার একটা পুলিশের সাথে কথা বলছে। যেন কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে ও! তবে কিছু বলতে ইচ্ছা করল না ওকে। মনটা খুব খারাপ খারাপ লাগছিল। শিবের দেখা পেলাম না! তাই চোখ বুঝে শিবকে ডাকছিলাম। খানিক ডাকতেই শিব এসে হাজির হলেন। তিনি বললেন – আবার এখানে কেন! এখানের কাজ ফুরিয়েছে। আমার ঘরে এস গৌরী! আমার ঘরে এস।  আমি অপেক্ষা করছি তোমার! অনেক কথা বলার আছে! অনেক, অনেক কথা!

তাঁর মুখটা বেদনায় ভর্তি ছিল, জানো! তাঁর সেই বেদনা আক্রান্ত স্বর শুনে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল! চোখ না খুলেই বলে উঠলাম, তুমি তো চাইলেই আমায় নিয়ে যেতে পার – নিয়ে যাচ্ছ না কেন? অনেকক্ষণ হয়ে গেল, প্রশ্নটা করলাম! কোন সাড়া পাচ্ছি না দেখে, চোখটা খুলতে যাবো – এমন সময়ে তিনি আবার বললেন, না এবারে তোমাকে নিতে যাবার ক্ষমতা আমার নেই। আমি যে এখন শিব নই, শব মাত্র। তুমি ঘরে ফিরলে, আমি আবার শিব হব! তখন তুমি তোমার সাথে আমায় যেখানে নিয়ে যাবে, সেখানে যাব! এই শুনে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল! ছটফট করতে থাকলাম, জল থেকে তোলা মাছের মত – যেন এখুনি কৈলাস চলে যাব – এমন ইচ্ছা আরো প্রবল হল!

আমি এবার চোখ খুলে– রবার, রবার বলে চেঁচাতে থাকি! রবার প্রায় ছুটেই এলো আমার দিকে – যেন আমার এই ডাকটারই অপেক্ষা করছিল সে! এসে হিন্দিতে বলল, বলুন মাতাজি!

আমি জোরে জোরেই বলতে থাকলুম, আমি কৈলাস যাব! আমি এখনই কৈলাস যাব! রবার যেন খুব বিপদে পড়ে গেছিল আমার এই আবদার শুনে! সেটা আমি অনেক পরে বুঝতে পারলুম। বুঝতে পেরে রবারকে হিন্দিতেই জিজ্ঞেস করলুম – কি! কিছু হয়েছে!

রবার উত্তর দিল – মাতাজি, এখান থেকে বেরিয়ে আসুন! জলদি বেরিয়ে আসুন!

আমি আর কিছু না বুঝে, রবারের হাতখানা ধরে উপরের দিকে উঠলাম আর ও একরকম প্রায় টেনেই গুহার ভিতর থেকে বার করে নিয়ে এলো!

এসে বলল, মাতাজি, কটা বাজে জানেন! আমি বুঝলাম, খুব বড় কোন ভুল করে ফেলেছি! তাই মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়লুম! সে বলে, সন্ধ্যা সাতটা বাজে! পুলিশ বকাবকি করছিলো – বলছিল আপনাকে টেনে তুলে দেবার কথা! আমি অনেক কষ্টে বুঝিয়েছি – উনি ধ্যানস্থ হয়ে পরেছেন – কি করব?

এতটা শুনে, আমার আরও খারাপ লাগল, আহা রে আমার জন্য ছেলেটার কত হয়রানি! এখন কি করি! ওর সাথে অনেকক্ষণ কথা বলছি না দেখে, ও অনেকটা কাছে এসে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, মাতাজি… ও মাতাজি…! মাতাজি…!

আমি ততক্ষণে ওকে কষ্ট দেবার জন্য কেঁদে ফেলেছি…! আমি চোখ ভর্তি জল নিয়েই ওর দিকে তাকালাম!

আমার চোখে জল দেখে, জানো কি ভালো ছেলে রবার, সেও কেঁদে ফেলল… হ্যাঁ ব্যাটা ছেলে তো … ওরকম করে তো কাঁদতে পারে না… তবে পরের বার যখন মাতাজি বলে ডাকল, তখন স্পষ্ট বুঝলাম, ওর ভিতরটাও কাঁদছে।

ও আমাকে একটা পাথরের উপর বসিয়ে, আমার পায়ের কাছে মাটিতে বসে পরে, আমার হাঁটুতে হাত রেখে হিন্দিতেই বলল, মাতাজি, আমার কি কোন ভুল হয়ে গেছে মাতাজি? ও যখন কথাটা বলছে, ওর হাত গুলো ঠক ঠক করে কাঁপছিল, জানো!

আমি, ওর মাথায় হাত রেখে বললাম, খুব হয়রানি হল না তোমার, বাবা!

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6