প্রথম পর্ব – গৌরি আলাপ
যমুনা ছুটতে ছুটতে এলো নদীর ধার থেকে, “দিদি, দিদি গো”! দিদি, অর্থাৎ গঙ্গা, গঙ্গা চক্রবর্তী, তার একমাত্র বোনের এইরূপ আচরণে আর মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলো না। ধমকের সুরে সে বলে উঠল, “যমুনা তোকে কতবার বলেছি যে তুই আর বাচ্চাটি নেই! অনেক বড় হয়ে গেছিস। এখনো তোর বাচ্চাদের মত ব্যবহারগুলো গেল না। এখন আর এরকম তোকে মানায় না, লক্ষ্মী বোন আমার! আমার কথা শোন!এখন তোর স্কুল পেরিয়ে কলেজে যাওয়ার কথা। মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া হয়ে গেল। তোর এসব বাচ্চাদের মতো আচরণ এখন কি আর শোভা পায়? এই যে নদীর ধার থেকে ‘দিদি দিদি’ বলে চিৎকার করিস! তোর ধারনা আছে, নদীর ধার থেকে আমাদের বাড়ি কতটা দূর, প্রায় দেড় কিলোমিটার। সারা পাড়া জেনে যায়, যমুনা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দিদির কাছে আসছে!
এত বলি দিনকাল ভালো নয়। দেখতে পরীর মত হয়েছিস, সঙ্গে দুধে আলতা গায়ের রং। তার জন্যে এমনিতেই সকলে টেড়িয়ে টেড়িয়ে দেখে। লোকজনের তাকানো যে এক্কেবারে ভাল নয়। কিন্তু কে-কার কথাশোনে”। গঙ্গা বৈঠকখানা পেরিয়ে দুয়ারের সামনে বড় ফটকের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখ তার বেজায় ভার। অপরূপ সুন্দরী মুখশ্রী যেন অজানা ভয়ে সব সময়ে গুটিয়ে থাকে, বিশেষ করে যখন যমুনা এমন ছুটতে ছুটতে তার নাম হাঁকতে হাঁকতে আসে।
সে সময় তার হাতের যা কাজ থাকে, সব ফেলে দিয়ে চলে আসতে হয় যমুনার কাছে। ও কি বলতে আসছে সেটার জন্য নয়, বরং যারা তার বোনের দিকে বিষ নজরে তাকায়, তাদের যম হয়ে বোনকে পাহারা দিতে। বোনের কথার তো কনো মাথামুণ্ডু নেই! সারাদিন খালি নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা আর কখন মাছ উঠেছে, কখন সাপ উঠেছে, সেই খবর ছুটতে ছুটতে এসে দিদিকে দেওয়া। এটা তার বরাবরের কাজ। এখন তো মাধ্যমিক পরীক্ষাও হয়ে গেছে।
যমুনা ছুটতে ছুটতে এলো নদীর ধার থেকে, “দিদি, দিদি গো”! দিদি, অর্থাৎ গঙ্গা, গঙ্গা চক্রবর্তী, তার একমাত্র বোনের এইরূপ আচরণে আর মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলো না। ধমকের সুরে সে বলে উঠল, “যমুনা তোকে কতবার বলেছি যে তুই আর বাচ্চাটি নেই! অনেক বড় হয়ে গেছিস। এখনো তোর বাচ্চাদের মত ব্যবহারগুলো গেল না। এখন আর এরকম তোকে মানায় না, লক্ষ্মী বোন আমার! আমার কথা শোন!এখন তোর স্কুল পেরিয়ে কলেজে যাওয়ার কথা। মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া হয়ে গেল। তোর এসব বাচ্চাদের মতো আচরণ এখন কি আর শোভা পায়? এই যে নদীর ধার থেকে ‘দিদি দিদি’ বলে চিৎকার করিস! তোর ধারনা আছে, নদীর ধার থেকে আমাদের বাড়ি কতটা দূর, প্রায় দেড় কিলোমিটার। সারা পাড়া জেনে যায়, যমুনা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দিদির কাছে আসছে!
এত বলি দিনকাল ভালো নয়। দেখতে পরীর মত হয়েছিস, সঙ্গে দুধে আলতা গায়ের রং। তার জন্যে এমনিতেই সকলে টেড়িয়ে টেড়িয়ে দেখে। লোকজনের তাকানো যে এক্কেবারে ভাল নয়। কিন্তু কে-কার কথাশোনে”। গঙ্গা বৈঠকখানা পেরিয়ে দুয়ারের সামনে বড় ফটকের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখ তার বেজায় ভার। অপরূপ সুন্দরী মুখশ্রী যেন অজানা ভয়ে সব সময়ে গুটিয়ে থাকে, বিশেষ করে যখন যমুনা এমন ছুটতে ছুটতে তার নাম হাঁকতে হাঁকতে আসে।
সে সময় তার হাতের যা কাজ থাকে, সব ফেলে দিয়ে চলে আসতে হয় যমুনার কাছে। ও কি বলতে আসছে সেটার জন্য নয়, বরং যারা তার বোনের দিকে বিষ নজরে তাকায়, তাদের যম হয়ে বোনকে পাহারা দিতে। বোনের কথার তো কনো মাথামুণ্ডু নেই! সারাদিন খালি নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা আর কখন মাছ উঠেছে, কখন সাপ উঠেছে, সেই খবর ছুটতে ছুটতে এসে দিদিকে দেওয়া। এটা তার বরাবরের কাজ। এখন তো মাধ্যমিক পরীক্ষাও হয়ে গেছে।
ফলে পড়তে বসার তো কোন বালাই নেই, সোনায় সোহাগা। একটি মাঝিও নেই যে যমুনাকে চেনে না। একদিন তো কার একটি কোলের বাচ্চা পড়ে গেছে আর মাঝিরা দূরে ছিল বলে যমুনা নদীতে ঝাঁপই দিয়ে দিয়েছিল। তখনকি সুন্দর দুধে আলতা গায়ের রঙ ছিল তার। এক নজরে যমুনাকে দেখে মনে হতো বিদেশিনী। দেখতে এখনো পরীর মতন থাকলেও, গায়ের সেই রং পুরো চেপে গেছে। আর তাকে দুধে আলতা গায়ের রং বলা চলে না। গঙ্গার গায়ের রং কাঁচা হলুদ বাটার মতন। এখন পড়াশোনা নেই, শুধু গ্রামের সব মিলিয়ে কুড়ি পঁচিশটা বাচ্চা পড়তে আসে তার বাড়িতে, বাড়ি থেকে বিশেষ একটা বেরোতেও হয় না তাকে। সূর্যের আলো তার গায়ে প্রায় পরে না বললেই চলে। ফলে গঙ্গার গায়ের রং যেন ফেটে পড়ছে। তবে আগের মতো সে তহ্নি মেয়ে আর নেই।
চব্বিশ বছর বয়স হয়ে গেছে গঙ্গার, তবে কোন পুরুষ সঙ্গ নেই, না মানে আজকের দিনে সকলের থাকে কি না! কারুর সঙ্গে খুব একটা কথাও বলে না সে। পড়াশোনা গঙ্গার সব সময়ই প্রিয় ছিল। এখনো আছে। অন্যদিকে পুকুরের মাছ আর বাচ্চাদের পড়ানো, সব মিলিয়ে মাসে আঠারো থেকে কুড়ি হাজার টাকা এসেই যায়, তাই দুই বোনের সংসারে কোন টানাটানি নেই। যখন গঙ্গা-যমুনার পিতা-মাতা গত হয়েছিলেন, তখন যমুনার বয়স দশ আর গঙ্গা তখন তহ্নি মেয়ে। মাত্র আঠেরো বছর বয়সের একটি ডানা কাটা পরী।
গাঁয়ের লোক যেন ছিনে জোঁকের মত গঙ্গার দিকে তাকিয়ে থাকতো। পারলে ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখে যে সে কি কি করছে। গঙ্গার মুখখানি যেন মা জগদ্ধাত্রীর মত ভরাট, দৃষ্টি নরম অথচ প্রয়োজনে তেজস্বিনী হতে ছাড়ে না। সেই তেজ দিয়ে প্রথমে সে নিজেকে সুরক্ষিত করে আর তার পরে তার আদরের বোন যমুনাকে। একবার তো বাড়িতে দালানের উঁচু পাঁচিল টপকে দুটি পুরুষ মানুষ ঢুকেই পড়েছিল। সদ্য রূপান্তরিত যুবতীর চরিত্র হনন করতে তারা বদ্ধপরিকরই ছিল। তখন সেকি রণচণ্ডী রূপ গঙ্গার! যেন সাধারণ কোন কন্যা নয়, স্বয়ং দেবী গঙ্গা! হাতে শান দেওয়া খর কাটার দাঁ নিয়ে ধাওয়া করেছিল দুই মরদকে মারবে বলে! সেই দৃশ্যের পর থেকে গঙ্গার দিকে তাকানোর ভুল আর কোনো পুরুষেরই হয়নি। কিন্তু যমুনা! কৈশোর বয়স ছেড়ে সেও যে যৌবনের দিকে পা বাড়িয়েছে।
যমুনার আবার স্বভাব নরম। সবার সাথে কথা কয়, নারী-পুরুষ ভেদাভেদ করে না। তার উপরে আবার তার মন বহির্মুখী। ফটকের দরজা খোলা পেলো কি পেলোনা ধেয়ে ছুটে গেল নদীর পানে। গঙ্গাও মাঝে মাঝে ক্ষেতের মজুরদের সব পাওনা গণ্ডা মিটিয়ে দিয়ে, পুকুর থেকে ওঠা মাছ বিক্রির টাকা পয়সা বুঝে নিয়ে, যমুনার সাথে নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকতো। গঙ্গার বক্তব্য ছিল, পুরুষদের লোলুপ দৃষ্টির জন্য তার প্রিয় বোনটির প্রাণ কেন সীমিত থাকবে? তাই সে বোনকে নিয়ে যেত নদীর ধারে। এখন নদীর ধারে যমুনার আর আর কোন বিপদ নেই। একটি মাঝিও নেই যে যমুনার অচেনা, আর বিশেষত ওর মিষ্টি আর মিশুকে স্বভাবের জন্য সব মাঝি ভাইয়েরা ওকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করে। তবে চিন্তা একটা থেকেই যায়, বিশেষ করে যখন যমুনা ‘দিদি দিদি’ ডাকতে ডাকতে ছুটে আসে নদীর পাড় থেকে।
তাই গঙ্গা আজকাল দিদি দিদি ডাক শুনলেই ফটকের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। গঙ্গাকে দেখলে আর কারোর সাহস হয় না কিছু বলার বা করার। তাদের বাবা মা গত হয়েছেন, তা দেখতে দেখতে ছয় বছর হয়ে গেল। এই ছয় বছরে টাকা পয়সার প্রয়োজনও বেড়েছে অনেক। যমুনার এবার মাধ্যমিক হল, এবার তো তাকে ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে হবে! এই সব সাত-পাঁচ ভেবে গঙ্গা আরও দুটি পুকুর কেনে।
পড়াশোনাতে সে বরাবরই খুব ভাল ছিল – তাই গ্রামের প্রচুর ছেলেমেয়ে পড়তেও আসে তার কাছে। বাবা মা মারা যাবার পর, বোনকে মানুষ করতে হবে বলে নিজের পড়াশোনাটা ছাড়তেই হয়েছিল গঙ্গাকে। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি প্রচণ্ড নিষ্ঠা থাকার জন্য, স্কুল কলেজ না গিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সে। মাঝে মাঝে সে বোনকে নিয়েই কলকাতায় চলে যেত। ওখানে কলেজ স্ট্রিট থেকে প্রচুর পুরনো বই কিনে নিয়ে আসতো, এসে বাড়িতে নিজে নিজেই বইগুলো পড়তো।
এখন তার মেধা ও বিদ্যা ও জ্ঞানের সামনে তাদের গ্রাম, সিলামপুরে একটি শিক্ষক বা বিদ্বান ব্যক্তিও নেই যে পাঁচ মিনিটের বেশি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। তার জ্ঞানের পরিধি এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে আচ্ছা আচ্ছা বড় বড় পণ্ডিত এমনকি দামোদরের ওই পারে থাকা বেলারী রামকৃষ্ণ আশ্রমের মহারাজরাও গঙ্গার জ্ঞান আর বিশেষ করে বিচার ক্ষমতাকে সমীহ করে চলত। সব মিলিয়ে এখন গঙ্গার দিন বেশ ভালোই কাটে। ভোরবেলা উঠে ক্ষেত করে আসা মজুরদের খেতে দিয়ে তাদের থেকে বাজারে সবজি বিক্রির টাকা বুঝে নিয়ে বাকি টাকা তাদের ভাগ করে দেওয়া, পুকুরের মাছ বিক্রির টাকা ঘরে তুলে জেলেদের পয়সা বুঝিয়ে দেওয়া, তারপর এসে রুটি করে নেওয়া, যাতে যমুনা ঘুম থেকে উঠেই টোটো কোম্পানিতে বেরিয়ে যাবার আগে ওর জল খাবারটা করে দেওয়া যায়।
যমুনা উঠে খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে গেলে ভাত চাপিয়ে দিয়ে তরকারি কেটে দুপুর বারোটার মধ্যে সব প্রস্তুত করে ফেলা, যাতে যমুনা এসেই খেতে পায়। তারপর দুপুরের দিকটা একটু নিজের জ্ঞান চর্চা আর সন্ধেবেলায় তুলসীতলায় সন্ধ্যে দিয়ে ছেলেমেয়েগুলোকে পড়ানো। এই হল গঙ্গার সারাদিনের রোজ-নামচা। রাত্রের খাবারের বেশিরভাগ কাজটাই যমুনা নিজে করে; তরকারি কোটা, রুটি করা, তরকারি উনুনে চাপানো, সবটাই। দিদিকে সে বড্ড ভালবাসে। দুই বোনের টান যেন মায়ের পেটের বোনের থেকেও বেশী! যেন প্রচুর জন্ম ধরে ওরা একে-অপরের ভগিনী!
সব মিশিয়ে সারাদিনটা, গঙ্গার প্রায় বাড়ির ভিতরেই কাটে, কেবল ‘দিদি দিদি’ ডাকটা শুনে ফটকে গিয়ে দাঁড়ানো ছাড়া। তাই বাপ মা গত হবার পর, কঠোর পরিশ্রমের ফলে তার যে অপূর্ব গায়ের রংটা চেপে গিয়েছিল, সেই রংটা আবার ফিরে এসেছে। কাঁচা হলুদের মত গায়ের রঙ, মা জগদম্বার মতো ভারী মুখের আদল, তাতে গম্ভীর ভাবটা বেশি থাকলেও, একটা যেন নমনীয়তা ও কমনীয়তা বর্তমান – তবে সেইভাবটা ফুটে ওঠে কেবল দুই সময়ে। বোনকে কিছু কাছে ডেকে বোঝানোর সময়, আর ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে পড়ানোর সময়। তবে শরীরের আদলটা তার আর তহ্নি মেয়ের মত নেই। একটু ভারিক্কি ভাব এসেছে। তা হলেও সেই ভার অত্যন্ত লঘু। তাই সব মিলিয়ে অপরূপ রূপ ফুটেছে তার। জ্ঞান, বুদ্ধি, কর্মদক্ষতা, রূপ, দেহের আদল সব মিশিয়ে প্রতিটা সতর্ক পুরুষের মধ্যে একবার অন্তত ইচ্ছা জাগে, ইস্ এই দেবীকে যদি নিজের স্ত্রী করা যেত।
দুই বছর আগে গঙ্গা তার বাপের দেওয়া জন্ম-ভিটেটাও মেরামত করিয়েছে। বৈঠকখানার ঘরটার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। ফটকের বাইরে দুপাশে বসার ধাপ ছিল। কিছু লোলুপ দৃষ্টি দেওয়া বয়স্ক লোক বিকাল হলেই সেখানে বসে পড়তো। তাদের বসা বন্ধ করতে ওই দুটো ধাপ ভেঙে দিয়ে ওই জায়গায় প্লাস্টার করিয়ে নিয়েছে। গ্রামের মোড়ল মতিলাল খাঁ-র এখন গঙ্গাদের বাড়িটার ওপর খুব নজর পরেছে। গঙ্গাদের বাড়িটা গ্রামের বড় বাড়ির মধ্যে একটা। তার ওপর এখন সে আবার প্রোমোটারি করছে। সিলামপুরের হাইস্কুলের হেডমাষ্টারমশাইয়ের বাড়ি বলে কথা।
বেশ কয়েকবার সে গঙ্গার কাছে মোটা টাকার প্রস্তাবও নিয়ে গেছে। গঙ্গা খুব বুদ্ধি করে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে এইবলে যে, “মতি কাকা, বোনের স্কুলটা হয়ে যাক, তারপর না হয় ওটা নিয়ে ভাবব! এখন বোনের পড়াশোনার খুব গুরুত্বপূর্ণ সময় কিনা! এখন যদি ওইসব যজ্ঞ হয়, তবে ওর সব পড়াশুনা মাথায় উঠবে আর এমনিতেই তো দেখো ওর পড়াশোনায় তেমন মন নেই! বাপ-মা মরা মেয়েতো – তেমন করে বকতেও তো পারি না। দেখো কাকা, কয়েক বছর পরে যখন তোমার কাছে বাড়িটা বিক্রি করবো, তখন আবার দাম কমিয়ে দিও না যেন!” অসামান্য বুদ্ধি হয়েছে গঙ্গার। না তো সে গ্রামের মোড়ল মতি কাকাকে চটালো, আর না তো বাড়িটা বিক্রি করল।
পাড়ার বৌদিরা মাঝে মাঝেই তাকে জিজ্ঞেস করে, “গঙ্গা তোমার তো যৌবন ঝরে যাচ্ছে! এবার বিয়ে থাওয়া করে নাও”! উত্তরে গঙ্গা সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী বৌদিদের উদ্দেশ্যে বলে, “আগে বোনটার একটা গতি করি, তারপর না হয় ওই নিয়ে ভাবা যাবে”! কিন্তু যারা শুধুই উস্কে দেবে বলে একই প্রশ্ন করে, (ওদের সংখ্যাই বেশি) তাদের উদ্দেশ্যে সে কিছু বলেই না। কারো ক্ষেত্রে তো এমন মুখ বানিয়ে রাখে, যেন তারা যে কি বলেছে, তা তার মাথাতেই ঢুকছে না, আবার কারোর ক্ষেত্রে, পাল্টা উস্কে দিয়ে বলে, “বৌদি! আর কিছু দিন সবুর কর। তোমায় বলে দেবো। তখন কিন্তু পিঠটান দিলে চলবে না। সেরা ছেলেটা দেখে দিতে হবে”!
কিন্তু, মনে মনে ভাবতো, কতদিন আর এই ভাবে ঠেকিয়ে রাখবে বা বন্ধ করে রাখবে সবার মুখ! মাঝে মাঝে তো মনে হয়, আর সে বিয়ে করবেই না। আবার পরের মুহূর্তে ভাবে, না: বোনটা বড় হচ্ছে, ওর তো বিয়ে দিতেই হবে। ওর বিয়ে দেবার পর, সে নিজে আর কি নিয়ে বেঁচে থাকবে। এইসব চিন্তা করতে বসলেই গঙ্গার আকাশকে পাতাল মনে হয়, আর পাতালকে আকাশ। তবে এই নিয়ে ভাবনার স্থায়িত্বকালটা বড়ই কম।
আপাতত চিন্তা সব যমুনাকে ঘিরে। বোন তো নয়, যেন নিজের মেয়েই! ’দিদি দিদি’ ডাক শুনে গঙ্গা ফটকে গিয়ে দাঁড়ালো। গ্রামের বেশ কিছু পুরুষ জানলা দিয়ে উঁকি মারার চেষ্টা করছিল, কিন্তু গঙ্গাকে দেখে জানলা থেকে সরে গেল। সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে যমুনা দিদির কাঁধে বাঁ হাতটা রাখল। মুখে অন্য কোনো কথা নেই। খালি হাঁপাচ্ছে আর একভাবে ‘দিদি দিদি’ করছে। গঙ্গা খানিকক্ষণ তাকে হাঁপাতে দিল। তারপর একরকম বকার সুরেই বললো, ‘অনেক হয়েছে, চল এবার ভিতরে চল। কটা বাজে সে দিকে কোন হুঁশ আছে? ভাত ঠাণ্ডা জল হয়ে গেছে’।
যমুনা বলল, ‘দিদি! আসলে’…….
গঙ্গা বলল, ‘এখন কনো কথা নয়! আগে স্নান করে নাও। তারপর খেতে বসো। খেতে খেতে সব কথা শুনব। চোখ-মুখের কি অবস্থা করেছে মেয়েটা! সারাদিন রোদে টোটো করে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে!’
দিদির মুখের ওপর কথা বলা যমুনার অভ্যাসে নেই। সে যত ডানপিটেই হোক না কেন, দিদি তার কাছে সব। সব মানে সব। তাই বাধ্য মেয়ের মত কলঘরে স্নান করতে চলে গেল। যমুনার শরীর পরিণত হয়েছে। নারীত্বের সব লক্ষণ এখন স্পষ্ট। তাই গঙ্গা চায় না যমুনা আর পুকুরে গিয়ে ডুব দিক। আগে এমন ছিল না। এখন যেন একটু বেশী বাড়াবাড়ি করছে লোকজন। গাছের আড়াল থেকে মেয়েদের স্নান করা দেখে। নিজেদের তো কোন মান সম্মান নেই, আর যাদের মান সম্মান আছে তাদের সম্মান টিকিয়ে রাখার কোন ইচ্ছাও নেই ! স্নান করে, ভেজা লম্বা চুলটা এলো করে দিয়ে, যমুনা আসন পেতে বাবু হয়ে বসল খেতে। দিদি ভাত বাড়ছিলো, কিন্তু যমুনার নজরে এলো, দিদির আসনটা পাতা নেই। তাই উঠে আরও একটি আসন পেতে দিলো। বোনকে খাবার দিয়ে, নিজের ভাত বেড়ে নিয়ে, গঙ্গা আসনে বসে বলল, ‘বল, কি বলছিলি তখন?’
যমুনা যেন দিদির এই আদেশের অপেক্ষাই করছিল। গঙ্গা শুধু বলার অনুমতি দিতেই যমুনা যেন মুখস্থ পড়ার মত করে বলতে শুরু করে দিল, ‘জানিস তো দিদি, আজ মাঝিরা নদী থেকে কি তুলেছে?’
গঙ্গা বলল, ‘আচ্ছা, বোন, তুই সব সময়ে নদী নদী করিস কেন বলতো! এটার নাম দামোদর। দামোদর কোন নদী নয়, নদ’।
যমুনা বলল, ‘ওই একই হল, নদী আর নদ। আরে শোন না, মাঝিরা আজ নদী থেকে যা তুলেছে সেটা শুনলে তোর চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবে !’
গঙ্গা বলল, ‘আচ্ছা বাবা বল, কত ওজনের মাছ তুলেছে আজ?’
যমুনা বলল, ‘মাছ না রে দিদি, মাছ না!’
গঙ্গা বলল, ‘তবে কি কুমীর তুলেছে?’
যমুনা বলল, ‘আরে না রে! তুই শুনলে অবাক বনে যাবি। আস্ত একটা মানুষ তুলেছে!’
গঙ্গা বলল, ‘মানুষ! কি বলিস রে? মরা নিশ্চয়ই!’
যমুনা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, মাঝি ভাইয়েরা বলাবলি করছিল – এখনো প্রাণ রয়েছে!’
গঙ্গা বলল, ‘বলিস কিরে? কেন যে মানুষ মরার জন্য নদীতে ঝাঁপ দেয়? মরবে কিনা কোনো নিশ্চয়তা আছে?’
যমুনা বলল, ‘অতশত জানিনে দিদি, তবে কি সুন্দর দেখতে মহিলাটিকে! বয়সে বোধ হয় আমার থেকে একটু বড়ই হবে, তবে তোর থেকে ছোট। মাথাভর্তি সিঁদুরের দাগ, পরনে লাল পেড়ে গরদের শাড়ি। আর কি অদ্ভুত গায়ের রং! এমনি দেখতে কাঁচা হলুদের মতন, কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় শরীরের ভিতরে যেন থেকে একটি লাল আভা বের হচ্ছে! মুখভর্তি কি অপরুপ মাধুর্য, হালকা নিঃশ্বাস নিচ্ছে আর শুয়ে আছে, যেন ঘুমিয়ে রয়েছে, কিন্তু চোখ মুখ থেকে যেন এক অদ্ভুত আনন্দধারা বেরিয়ে আসছে! গ্রামের মানুষ তো ভিড় করেছে ওকে দেখবে বলে! নদীর ধারে কি ভিড়, কি ভিড়!’
গঙ্গা যেন কি একটা ভাবনায় ডুবে গেল। মুখ তার থমথমে, গম্ভীর। কি যেন মনের অন্তরালে ভেবে চলেছে, আর সেটা এতটাই গভীর, যেন কেউই খবর পাবে না সেই গোপন কথার। যমুনার কথায় যেন ঘোর ভেঙে গেল গঙ্গার: ‘দিদি, ও দিদি! কি হল তোর? চুপ করে গেলি কেন?’
গঙ্গা বললো, ‘তুই আর কিছু নিবি? তুই ভালোবাসিস বলে তোর জন্য আজ গুগলি রান্না করেছি। খেতে ভালো হয়েছে’?
যমুনা মুখভর্তি ভাত নিয়ে তার দিদিকে বলল, ‘ দারুন খেতে হয়েছে। তোর জন্য আছে তো? আর নেব না। পেট ভরে গেছে’।
গঙ্গা বলল, ‘হ্যাঁ আমার আছে। তুই খেয়ে নিয়ে একটু শুবি তো’?
যমুনা বলল, ‘না, ভাবছি (একটু ইতস্তত করে, পাছে দিদি বকে) একবার নদীর ধারে যাব?’
গঙ্গা বলল, ‘বেশ, চট করে একবার ঘুরে আয় তো! ওখানে কি হচ্ছে না হচ্ছে, আমাকে এসে বলবি। আর শোন, বাড়ি এসে বলবি। রাস্তায় সবাইকে শোনানোর কোন দরকার নেই’।
যমুনা বলল, ‘আচ্ছা’।
গঙ্গা বললো, ‘মনে থাকবে তো? যা হয়েছে বাড়িতে এসে বলবি, যেন আমায় কিছু বলতে আসছিস, সেটা কেউ জানতে না পারে’।
যমুনা বলল, ‘কেন রে দিদি’?
গঙ্গা বলল, ‘অত শত বুঝে তোর কাম নাই। যেটা বললাম, সেটা কর। যা, চট করে হাত মুখ ধুয়ে ঘুরে আয়’।
যমুনা যেন এটাই চাইছিল। আজ তো তার দামোদরের ধার থেকে বাড়ি আসারও কোন মন ছিলো না। হাত মুখ ধুয়ে এক ছুটে সে চলে গেল। পায়ে যেন চাকা লাগানো আছে মেয়েটার। বাড়ি থেকে বেরোনোর পর যেন চোখের নিমেষে হারিয়ে গেল। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে যমুনা ফিরে এলো – আবার সেই হাঁপাতে হাঁপাতে। গঙ্গা যেন পথের দিকে তাকিয়েই বসছিল। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই সে ফটকের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। সন্তর্পণে যমুনাকে ঘরে ঢুকিয়ে নিয়ে গিয়ে, এক গ্লাস জল খাওয়ালো। তারপর জিজ্ঞেস করল–
‘কি হলো রে বোন?’
যমুনা বলল, ‘সে বিশাল ব্যাপার দিদি! বিশাল ব্যাপার’!
গঙ্গা বলল, ‘বিশাল বিশাল বলেই যাবি, নাকি কিছু বলবি’!
যমুনা বলল, ‘বলছি দিদি, বলছি! সেই মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছে! জ্ঞান ফিরে বলে, ‘আমি কোথায়?’ সবাই যখন বলল, তাকে নদী থেকে পাওয়া গেছে, সে যেন কিছুই হয়নি এমন করে বলল, ‘নদী! নদীতে আমি গেলুম কি করে? আমি তো নৌকায় বসেছিলুম! মাঝি বলল, ‘ভাঁটা চলে গেলে তবে নৌকো ছাড়বে’! সকলে যখন জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কে গা?’ সেই মেয়ে বলে, ‘আমি শিবের বউ। কেউ আমায় উনার কাছে নিয়ে চলো। আমি তার থেকে আলাদা থাকবো না। উনি যা বলবেন তাই করবো’।
গঙ্গা বললো, ‘তারপর সবাই কি করলো?’
যমুনা বলল, ‘সবাই তো বলাবলি করছিল – এ তো সন্ন্যাসিনী! মেয়েটি সেটা ঠিক শুনতে পেয়েছে!শুনে বলে, ‘না গো, আমি বললাম যে আমি শিবের বৌ! বৌ কি করে সন্ন্যাসিনী হয়? আমার শিব আমায় নিতে আসবে। সে আসছে। ততদিন কেউ আমায় তোমাদের বাড়ি রাখনা গো’! সেই শুনে অনেক পুরুষ এগিয়ে গেল। সে প্রায় চেঁচিয়ে উঠেই বলল, ‘কোন পুরুষ আমায় ছুঁবিনে! কেউ ছুঁবিনে! শুধু শিব আর তার ছেলে মেয়েরাই আমায় ছোঁবে। ছুঁবিনে ছুঁবিনে! এই বলে কি চিৎকার! সেসব না শুনেই, পাগলের প্রলাপ ভেবে বেশ কিছু লোক তাকে ধরতে গেল। ওমা ! জানিস না দিদি, কি হল তারপর! যা দেখলাম, সে তো নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হবে না’।
গঙ্গা বলল, ‘কেন কি এমন দেখলি রে?’
যমুনা বলল, ‘দিদি, যে কজন উনাকে ধরতে গিয়েছিলেন তারা তাঁকে ছুঁতেই পারলনা, ছিটকে প্রায় দু তিন ফুট দূরে পরে গ্যালো! সেই দেখে তো ওর কাছে কেউ যেতেই চায়না। একাকী গাছতলায় বসে রয়েছে। মাঝিরা যে যার মতন চলে গেল, আর বাকিরা সবাই ওঁকে একা ফেলে রেখে চলে গেলো। জানিস দিদি, আমার দিকে ওই মেয়ে কেমন করুন দৃষ্টিতে দেখছিল জানিস! কি যেন এক অদ্ভুত শক্তি রয়েছে মেয়েটার মধ্যে, তবে আমি কেমন যেন এখনও স্পষ্ট মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছি, যেন আমার সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে’!
যমুনার বরাবরই ভাবটা একটু বেশি। সবেতেই গদগদ হয়ে যায়। এই জন্যই তো এতো মুশকিল ওকে নিয়ে! একবার গঙ্গা, ওকে মেলায় নিয়ে গিয়েছিল। মেলায় এক মুসলমান, ভানুমতীর খেলা দেখাচ্ছিলো। সেই দেখে যমুনা বলে, যেন সেও আকাশে উড়ছে, তবে ওকে কেউ ছুঁতে পারছে না! এ ব্যাপারটা ঠিক কেমন হলো! গঙ্গা কিছুতেই বুঝতে পারলো না। এটা কি সত্যি হয়েছে, নাকি বোনের কল্পনা? এই সব সাত-পাঁচ ভাবছিল গঙ্গা। হঠাৎ যমুনার কণ্ঠস্বরে যেন ঘুম ভাঙার মতো করে গঙ্গা উঠে বসল।
যমুনা বলল, ‘কি রে দিদি! আজকাল তুই কোথায় যেন হারিয়ে যাস! যাবি নাকি একবার সেই মেয়েটাকে দেখতে?’
গঙ্গা হঠাৎ আবেগপ্রবণ হয়ে বলল (সে যে কেন আবেগপ্রবণ হয়ে উঠল, সে নিজেও বুঝতে পারলো না) ‘কি মেয়ে মেয়ে করছিস বলতো! তোর থেকে কত বড় না’!
যমুনা বকা খেয়েও যেন উদ্দীপনা ধরে রাখতে না পেরে বললো, ‘যাবি নদীর ধারে?’
গঙ্গা বললো, ‘চল তো দেখে আসি, তোর সেই অলৌকিক মহিলাটিকে, কেমন দেখতে সে’!
যমুনার সাথে পথে যেতে যেতে গঙ্গা ভাবতে থাকে, সে আবার কবে থেকে অলৌকিকতায় বিশ্বাস করতে আরম্ভ করল? কোন অলৌকিক টলৌকিক নয়, ওসব বোনের কল্পনা। যতসব আজগুবি গল্প। তাহলে কেন যাচ্ছে সে, কিসের টানে! কে যেন তার ভাবনা-শক্তিকে আটকে রেখেছে। কে যেন বাধ্য করছে তাকে দামোদরের ঘাট অবধি হেঁটে যেতে! সে যেন একটি পুতুলে পরিণত হয়ে গেছে! এইসব উল্টোপাল্টা চিন্তা করতে করতে গঙ্গা যে কখন দামোদরের ধারে গিয়ে পৌঁছেছে, তা সে খেয়ালই করেনি। হালিম চাচার কণ্ঠস্বর না শুনলে যেন হাঁটতে হাঁটতে নদে পরেই যেত! হঠাৎ ভেসে আসা কথাটা তার মাথা সম্পূর্ণ রূপে ঘুরিয়ে দিল! ‘গঙ্গা মা, ওদিক পানে যাসনে মা! ওইখানে ওই মাইয়া বইসা রইসে, ও আসলে জাদুকরী! ওর কাছে যে যায়, সেই সিটকে পরি যায়’!
গঙ্গার মন যেন, যমুনার বলা কথাগুলো আরেকবার স্মৃতিচারণ করে নিল। ‘তাহলে তো বোন ঠিকই বলেছে, তবে কি যাওয়া উচিত হবে না? ফিরে যাব! এতদূর এসেছি একবারও দেখব না! না একবার অন্তত দেখেই যাই!’ বারবার সে অনুভব করছিল কেউ যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, সে চেয়েও ফিরতে পারছে না! কোন কথা, কোন চিন্তা যেন কোনো সমস্যা তৈরি করছে না, তার এগিয়ে যাওয়াতে!
আবার কি সব ভাবতে বসে গেছে সে? এত ভাবনা কিসের? এত ভাবনা বা আসছে কোথা থেকে! একটা মানুষ দেখতে এসেছে, দেখবে চলে যাবে, তাতে এত ভাবনা আসছে কোথা থেকে?এবারে ভাবনার সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়লো যমুনার কণ্ঠস্বরে, ‘ওই দেখ দিদি, ওই সেই মেয়ে, মানে মহিলা (দিদির বকা খাবার ভয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল শুধরে নিল)’!
গঙ্গা ও যমুনা এবার এগিয়ে গেল সেই মহিলার দিকে! এগোতে গিয়ে গঙ্গা খানিকক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে পরলো। অনর্গল তার মন যেন প্রলাপ বকে যাচ্ছে – কি অপরূপ সুন্দরী এই মহিলা। এক নজরে দেখে সারা শরীরটায় যেন কোন খুঁত খুঁজে পাওয়াই ভার। এক মাথা কালো কাজলের মতো চুল, সেই চুল যেন ঘাড় ছেড়ে সমস্ত পিঠটাই ঢেকে দিয়েছে, যদিও না দাঁড়ালে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, ঠিক কতটা লম্বা সেই চুল। গায়ের রংও অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয় – তার নিজের গায়ের রঙের মত একেবারেই ক্যাটক্যাটে হলুদ নয়। গঙ্গার নিজের গায়ের রঙ তার নিজেরই পছন্দ নয়, যতই লোকে প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকুক। তবে এই মহিলার গায়ের রঙে যেন সব রঙের মিশ্রণ রয়েছে- দূর থেকে দেখলে সাদা, কাছাকাছি গেলে হলুদ, আর তার দেহের ও মুখের প্রতিটি ভাঁজ থেকে যেন ঘন সিঁদুরের মতো লাল রং ঠিকরে ঠিকরে বার হচ্ছে। চোখের আদল বড়ই মধুর – টানা টানা, অথচ কি সুন্দর নরম, যেন কোন উগ্রতাই নেই।
যমুনা কাছে যেতেই ভদ্রমহিলা ওর দিকে তাকাল – চোখের মনির রঙ খুব ঘন খয়েরি। কি যেন এক প্রতিভাকর প্রভা, চোখের প্রতিটি কোণে কোণে বিদ্যমান! টিকালো অথচ সুন্দর গড়নের নাক, ছোট কান – দুটোতেই হীরের মতো চকচকে পাথর। হীরে! হীরে কি করে হবে – চুল নেই চালা নেই, হীরে পরেছে, উম্!
তবে যেই পাথরই হোক, সূর্যের কিরণ প্রতিফলন করায় সেই আলোতে মুখটা আরো বেশি সুন্দর হয়ে উঠেছে। ঠোঁটের কাছটা যেন সারা মুখের সবথেকে সুন্দর অংশ! পাতলা অথচ ভাষা-পূর্ণ, অদ্ভুতভাবে যেন মনে হচ্ছে ওই দুটি ঠোঁট হাসতে ছাড়া অন্য কিছুই জানে না। মুখের আদলটা পানের মত, ঠিক গোল নয়, তবে ঠিক লম্বাও নয় – সব মিশিয়ে এক অদ্ভুত দিব্য ভাব।
ঈশ্ কি সব ভাবছি – দিব্য! সে আবার কি! এত কথা, গঙ্গার মন আজকের আগে তাকে কোনদিনও বলেনি। ওসব দিব্য টিব্য আবার হয় নাকি! সব মনের ভুল! কিন্তু শরীরটাও দেখো – কি অদ্ভুত তাইনা! গঙ্গার মন গঙ্গার বারণ না শুনেই তাকে বলতে থাকলো। প্রতিটি অঙ্গ যেন ততটাই যতটা হবার দরকার! এমন সুন্দরী নারী তো আজকের আগে আমি কখনো দেখিইনি! এত সুন্দরী টিভির পর্দাতেও কোনোদিন দেখিনি! যমুনা তার কাছে যেতেই ভদ্রমহিলা হাসলেন – কি সুন্দর দাঁতের পাটি! শুভ্র সতেজ- যেন মনে হচ্ছে এখুনি দাঁত মাজলো! বয়সটা মনে হয় যমুনা ঠিক বলেনি। এই নারীর বয়স আমার মতই হবে – এই ২৩ কি ২৪।
কি অদ্ভুত ব্যাপার তো! গঙ্গা মনে মনে ভেবে চলেছে – আমি তো সচরাচর কাউকে নারী বলতে পারিনা! মহিলা বলি – কিন্তু ইনার ক্ষেত্রে নারী শব্দটি বেরিয়ে এলো কেন? কেন যেন মনে হচ্ছে, শারীরিকভাবে অনেকেরই নারীত্ব থাকে, কিন্তু ইনি বাস্তবেই নারী –মায়া, মমতা, স্নেহ, জ্ঞান, চেতনা যুক্ত যেন শ্রী, বিদ্যা ও শক্তির আধার ইনি! কি ভাবছি! আমিও কি যমুনার মতো কল্পনাপ্রিয় হয়ে উঠলাম – মানুষ দেখেছি কিন্তু মনে করছি যেন সাক্ষাৎ মা ভগবতীর দর্শন করছি!
আজ বোধহয় যমুনা আর আমার মধ্যে সব পার্থক্য শেষ হয়ে গেল! গঙ্গার ভাবনা যেন কোন বাঁধই মানছিল না – এক সময় তো ওর মনে হতে থাকলো সারা জীবন এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওকে ভাবতে দিলে, ও তাই করবে। তবে আমায় কি যমুনার রোগে পেল?
এমন সময়ে যমুনার ডাক তার অবচেতন ভাব ভেঙে দিল। সত্যিই কি অবচেতনভাব ভাঙলো, নাকি চেতনা বিনষ্ট হল! আনমনা গঙ্গা একরকম তার বোনের কণ্ঠস্বরে কেঁপে উঠে সাড়া দিল ‘হ্যাঁ, বল। কি বলছিস!’
যমুনা বলল, ‘এই দিদি এখানে আয় দেখ আমি ওকে ছুঁয়েছি, আমার কিছু হয়নি। দেখ তুই নিজের চোখেই দেখ’!
গঙ্গা এগিয়ে গেল ভদ্রমহিলার দিকে, যেন কোন অশরীরী শক্তি তার সমস্ত শক্তিকে কুক্ষিগত করে নিয়েছে। সে যেমনটা বলছে, গঙ্গা ও তেমনটাই করছে। এগিয়ে গিয়ে, মহিলাটির সামনে বসে পরলো গঙ্গা।
গঙ্গা বলল, ‘কি নাম তোমার?’
মহিলা বললো, ‘আজ্ঞে গৌরী’।
এ কি কোন মানুষের কণ্ঠস্বর? না অন্য কিছু! এত সুমিষ্ট গলা! কারুর গলা কি এত সুন্দর হতে পারে? কে জানে! বয়স পূর্ণ যুবতীর, কিন্তু কণ্ঠস্বর বাচ্চা মেয়ের মতো!
গঙ্গা বলল, ‘তো নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলে কেন? তোমার অমতে বাড়ি থেকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে? দেখে তো মনে হচ্ছে এই সদ্য বিয়ে হয়েছে!
গৌরী বলল, ‘না গো বিশ্বাস কর মেয়ে, আমি গঙ্গায় ঝাঁপ দিইনি! আমি তো মাঝি কাকুকে বলেছিলাম আমায় শিবের কাছে নিয়ে যেতে পার? সে বলেছিল, ‘হ্যাঁ নিয়ে যাব’। তাই তার নৌকায় উঠে পরেছিলাম। এ কোথায় গো’!
গঙ্গা বললো, ‘দেখো গৌরী ও সব গল্প অন্য কাউকে দেবে, আমাকে নয়! কোথা থেকে উঠেছিল নৌকায়?’
গৌরী বলল, ‘ওই দেখো মেয়ে, আমার কথা বিশ্বাস করে না! আমায় মাঝি নৌকায় নিয়েছিল বাউরিয়াতে। কিন্তু এটা কোথায়?’
গঙ্গা বলল, ‘গল্প দেওয়ার জায়গা পাওনি! বাউরিয়া থেকে শিবের কাছে যাবে বলে নৌকায় উঠে তুমি দক্ষিণ দিকে চলে এলে? ঠিক করে বলতো, বরের সাথে ঝগড়া করে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলে, তাই না?’
গৌরী বলল, ‘না গো মেয়ে, সত্যি বলছি! শিব তো বলেছিল ফিরে যেতে। আমি ফিরে এসেছিলাম। সে বলেছে, অনেক কাজ আছে। কাজের শেষে সে নিজে এসে আমায় নিয়ে যাবে। আমি যে কি করে জলে পরেছিলুম, কে জানে?’
গঙ্গা বলল, ‘তোমার বরের এমন কি রাজকার্য আছে, আমায় বল তো?’
গৌরী বলল, ‘কেন শিব বলেছে একটি বাড়ি করতে, যেখানে আমি আর সে একসাথে থাকবো। সাথে ওর ছেলেমেয়েরা আর অনুচরেরাও থাকবে। সে যেখানে থাকে, সেথায় নাকি আর থাকবে না গো’!
গঙ্গা বলল, ‘তুমি কোন শিবের কথা বলছো বলো দেখি?’
গৌরী বলল, ‘কেন আমার বর, শিব। আমাকে তো আমার মামা শিবের সাথে বিয়ে দিয়েছে! সেই শিব’।
গঙ্গা বলল, ‘তুমি দেখেছ শিবকে! সমানে শিব শিব করে যাচ্ছে যে! আবার নাকি শিব তোমার সাথে কথা কয়! সে নাকি তোমাকে আবার নিতে আসবে? উফ্, এতো এক অন্য ধারার গল্প! এই গল্পের গরু তো কৈলাসে ওঠে’!
গৌরী বলল, ‘এই মেয়ে, তুমি চলে যাও তো! খালি গল্প গল্প করে মাথা খাচ্ছে! খুব বাজে তুমি! যাও যাও! তোমার সাথে কথা নেই! এই করলাম আড়ি’!
অদ্ভুত সুন্দর এবং সাবলীল আচরণের জন্য সে যে মিথ্যা বলছে, তা মানাও যায় না আবার যা বলছে তা সত্যি তো হতেই পারে না। গঙ্গা বেশ বুঝলো যে এই নারীটির মাথা খারাপ হয়ে গেছে। হয়তো বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে খুব অত্যাচার করা হয়েছে। তা যাই হোক হঠাৎই গৌরীর কথাগুলো স্মরণে আসতে গঙ্গার মনে অভিমান চলে এল।
গঙ্গা বলল, ‘আচ্ছা গৌরী, তুমি আমাকে মেয়েটা, মেয়েটা বলছো কেন গো? আমার কি কোনো নাম নেই?’
গৌরী বলল, ‘নাম আছে নাকি? থাকলে আমায় বলেছ কই, যে ডাকবো’!
গঙ্গা বলল, ‘উম্, ‘এদিকে টনটনে জ্ঞান আছে! আমার নাম গঙ্গা, আর এই মেয়েটার নাম কি জানো?’
গৌরী বলল, ‘হ্যাঁ ওর নাম যমুনা তাই না বাছা’!
গঙ্গা বলল, ‘তুমি জানলে কি করে ওর নাম যমুনা?’
গৌরী বলল, ‘কেন সবাই তো ওকে এই নাম ধরে ডাকছিল! এত প্রশ্ন কেন রে তোর বাপু? আমি আর কথা বলতে পারছি না। যা:! আমার খুব খিদে পেয়েছে’।
গঙ্গা বলল, ‘তুমি যে বললে আমার সাথে আড়ি, আর কথা কইবে না! তাহলে এত কথা বলছ কেন?’
গৌরী বলল, ‘ওরে বোকা, তুইতো আমার কাছের লোক। দুটি খেতে দে না, বলছি না, খুব খিদে পেয়েছে! খালি কথা বলিয়ে চলেছে! এবার না খেলে একটাও কথা কইব না। এই বলে দিলুম’!
গঙ্গা হাসতে হাসতে বলল, ‘উম্, কাছের লোক! কতদিন সাথে ছিলে, যে কাছের লোক বানিয়ে দিলে! দেখো সন্ধ্যা পরবে। একা মেয়ে মানুষ, ভরা যৌবন। একা একা বসে থেকোনা। আমার সাথে আমার বাড়ি চল। সেখানে রাত টুকুনি থেকে তারপর কোথায় যাবে দেখা যাবে। চলো বাড়ি গিয়ে খাবে চলো’।
গৌরী বলল, ‘খাব হ্যাঁ খাব, খুব খিদে পেয়েছে! চল চল চল!’
এই বলে তিনজনেই হাঁটা দিল গঙ্গাদের বাড়ির দিকে। মাঝিরা মাথা নাড়তে নাড়তে দেখতে থাকলো। বাড়ির কাছাকাছি আসতে, গাঁয়ের লোকেরাও দেখল, ওদের পিছনে অনেক কথা বললেও, সামনে একটা কথাও বলল না।
বাড়ির পথে আসতে আসতে গৌরীর মুখ একেবারের জন্যও বন্ধ হলোনা। সমানে সে মুখ চালাতে থাকলো। হাঁটতে হাঁটতে গৌরী গঙ্গার উদ্দেশ্যে বলল, ‘কি খাওয়াবে আমাকে? মাখন দেবে? আমি মাখন খাব’।
গঙ্গা বলল, ‘এত বিকেলে গ্রামবাংলায় মাখন কোথায় পাব! আজ বাড়িতে যা আছে খেয়ে নিও। কাল সকালে মাখন কিনে এনে খাওয়াবো’।
গঙ্গা বলল, ‘আচ্ছা, আচ্ছা তুই যা খাওয়াবি, আমি তাই খাব’।
গঙ্গা বলল, ‘উম্ তা খাবে না! একটা মুরগি পেয়েছে তো! নে আর কেউ নেই, এটাকেই কর জবাই’।
গৌরী বলল, ‘এরকম বললি কেন? আমি কি তোকে বলেছিলুম, আমায় তোর বাড়ি নিয়ে চল! খুব বাজে তুই! একটা কথা বলবো না তোর সাথে’!
গঙ্গা বলল, ‘কেন কথা বলবে না কেন? বল, তোর বাড়ি যাব না! সে বেলায় নেই!’
যমুনার কথাগুলো ভাল লাগছিল না। ও যেন এই গৌরীর প্রতি কি এক আকর্ষণে মজে আছে! সঙ্গে সঙ্গেই সে বলে উঠলো, ‘উফ্ দিদি, কেন এত খোঁটা দিচ্ছিস ওকে? ও তো কত ভালো’!
গঙ্গা বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ এরকম ভালো মানুষের মুখোশে বদ লোক যে ভরে গেছে পৃথিবীটায়। সে ব্যাপারে কোন হুঁশ আছে তোর?’
গৌরী বলল, ‘নারে গঙ্গা মা, আমি থাকতে কোন বাজে লোক আসবে না। সত্যি বলছি’।
গঙ্গা বলল, ‘হ্যাঁ তা আসবে কেন? তুমি কি আর এমনি কেউ! তুমি কি এমনি গৌরী ? তুমি তো স্বয়ং ত্র্যম্বকে গৌরী, শিবের বউ বলে কথা, অসুর-দলনী! দ্যাখো বাপু, তোমার একটা কথাতেও আমার বিশ্বাস হয়নি। তবে এইটুকুনই জানি যে তুমি মিথ্যা বলছো না। আমি নিশ্চিত, তোমার শ্বশুরবাড়ি তোমার ওপর অকথ্য অত্যাচার করার জন্য, তোমার বোধ-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। এমন রূপ নিয়ে গাছতলায় থাকলেই হয়েছে! এটা তো আর শিবলোক নয়, এটা মর্ত-লোক! তাও আবার কলিযুগ! আর চরিত্র ধরে রাখতে পারবে না। যাই হোক, আগে বাড়ি চল, তারপর তোমার সব কথা শুনছি। খেয়েদেয়ে সব বলবে তো? নাকি আবার অন্য কোন গল্প দেবে?’
গৌরী বলল, ‘এতক্ষণ ধরে আমি তোকে গল্প দিলুম হতভাগী! যারা মিথ্যা বলে তাদের তো চোখ কান বন্ধ করে বিশ্বাস করিস, আমি সত্যি বলছি বলে অমনি গল্প হয়ে গেল?’
গঙ্গা বলল, ‘তাহলে কি এবার মিথ্যা বলবে!’
গৌরী বলল, ‘মিথ্যা আমি বলতে পারি না! একমাত্র শিব যখন বলে, একে মিথ্যা বললে ওর ভালো হবে, তখনই বলি। খেয়ে দেয়ে আগে তোর মাথাখানা ভালো করে ধোবো – বড্ড নোংরা জমেছে বই পড়ে পড়ে’!
গঙ্গা বলল, ‘বাবা, এ তো দেখছি সাক্ষাৎ মা জগদম্বা! বই পড়ি সেটা খবরও নিয়ে নিয়েছে! তুমি তো দারুন মানুষ গো? হ্যাঁ! তা, আমার মনে এখনো কালি পড়েনি, কি বল!’
গৌরী বলল, ‘নারে, মনটা এখনো পরিষ্কার রয়েছে। এই জন্যই তো যাচ্ছি তোর সাথে নাহলে কি আর যেতুম!’
গঙ্গা বলল, ‘হয়েছে হয়েছে, অনেক দশভুজা ডায়লগ হয়েছে, এবার চল, এসে গেছি। বাড়িতে ঢোক দেখি। গ্রামের শ’য়ে শ’য়ে চোখ তো, চোখ দিয়েই খেয়ে নেবে মনে হচ্ছে’!
দিদির মনোভাব যমুনা খুব ভালো বোঝে। দিদি মুখে অনেক খারাপ খারাপ কথা বললেও, মনের দিক থেকে খুবই নরম। খুব খিদে পেয়েছে গৌরীর। তাই যমুনা রান্নাঘরে ছুটে গিয়ে গোবিন্দ-ভোগ চাল এবং তার সাথে কিছু আলু কেটে হাঁড়িতে চাপিয়ে দিল।
খানিকক্ষণের মধ্যেই যমুনা থালায় ভাত বেড়ে, আলুর খোসা ছাড়িয়ে, থালার পাশে নুন নিয়ে চলে এলো। সাথে ঘি-এর শিশিটাও এনেছে। কতটা কি দেবে বুঝতে পারেনি, তাই পুরো শিশিটাই নিয়ে চলে এসেছে। এর মধ্যেই, গঙ্গা গৌরীকে কলঘরে নিয়ে গিয়ে হাত মুখ ধুইয়ে দিয়ে, পরনের মলিন গরদের শাড়িটা ছাড়িয়ে, তার একটি নতুন সিল্কের শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু গঙ্গা দেখলো, গৌরীর শাড়ির প্রতি কোনো নজরই নেই। সিল্কের শাড়ি, এমনিতেই নরম, কাঁধ থেকে আঁচল নেমে যাচ্ছে, তাতে গৌরীর কোন হুঁশই নেই। তাই সিল্কের শাড়ীটা ছাড়িয়ে গঙ্গার একটি নরম নিজের পরা ছাপা শাড়ি পরিয়ে দিল। প্রথমে অবশ্য একটি নতুন ছাপা শাড়ি ছিল, সেটাই পরাতে গিয়েছিল কিন্তু সেখানেও বিপদ। গৌরীর ত্বক এতটাই মসৃণ আর স্পর্শকাতর যে খড়খড়ে শাড়িতে ত্বক কেটেই যাবে!
তাই শেষমেশ গঙ্গা তার খুব পছন্দের একটি নীল ছাপা, সবুজ আর হলুদ মিশ্রিত পাড়ওয়ালা শাড়ি পরিয়ে দিল। গৌরীর যেন, কি শাড়ি পরানো হলো তা নিয়ে কোন মাথাব্যথাই নেই! কিন্তু শাড়িটা পরানোর পর গঙ্গার মনে হলো, এটি তার অত্যন্ত প্রিয় শাড়ি হলেও, গৌরীকে পরাতে আজ শাড়িটা আসল সার্থকতা পেলো। কি অপরূপ লাগছে ওকে! গায়ের রং যেন ফেটে পরছে!
শাড়ী পরানোর পর্ব শেষ হলে, এবার চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ালো ব্লাউজ! গঙ্গা যে আর তহ্নি মেয়ে নেই, সেই সম্বন্ধে ও কোনোদিন আগে ভাবেওনি, কিন্তু গৌরীর তহ্নি চেহারায় যখন ওর নিজের ব্লাউজ গুলো হচ্ছিলনা, তখন সে বুঝল–যে তার আগের সুন্দর চেহারাটা আর নেই! তাই একটু পুরানো ব্লাউজ ঘাটতে হল তাকে–এই বছর দুয়ের আগের ব্লাউজ। নীল রঙের শাড়ী তার সাথে নীলরঙের ব্লাউজ খুব মানাবে। আছেও তার ওই রঙের দুটো ব্লাউজ। পরিয়ে দেখল, একদম ঠিক ঠিক।
এদের মধ্যে একটা ব্লাউজ ছিল, পিঠের দিকটা ও সামনের দিকটা একটু বেশী কাটা। গঙ্গার ইচ্ছা হল একবারের জন্য হলেও এই ব্লাউজটাই পরায়। তারপর মনে হল, না ওইসব ভাবলে চলবেনা–আশপাশের লোক একেবারে ওর শরীরের উপর নজর দেওয়ার জন্য ওঁতপেতে রয়েছে! এই ব্লাউজ শয়তানের ব্যাকুলতাকে আরও উস্কে দেবে– তার থেকে অন্য ব্লাউজ পরানোই ভালো হবে।
অন্য একটি ব্লাউজ পরানোর পরও গৌরীকে যে এত সুন্দরী লাগবে, গঙ্গা তা কল্পনাতেও ভাবেনি! ‘আসলে, এমনিই ও ডানাকাটা পরী– ও যা পরবে তাতেই অপরূপা লাগবে!’ মনেমনে সেটাই ভাবছিল গঙ্গা। ‘গাঁয়ের লোক আমাদের দুইবোনকে সুন্দরী বলে – নে এবার এঁকে কি বলবি!’ গৌরীকে শাড়ী পরানো হয়ে গেলে, গঙ্গা ওকে রান্নাঘরের সামনে যে দেউলটি রয়েছে, সেখানে নিয়ে গিয়ে বসায়।
যমুনা একটু হন্তদন্ত হয়েই ভাতের থালা আর ঘিয়ের শিশিটা নিয়ে আসছিল– গৌরীর এই নতুনরূপ দেখে তারও যেন চোখ ধাঁধিয়ে গেল। অবস্থা এমন হল যে, গঙ্গাকে চিৎকারই করতে হল, ‘কিরে কোথায় হারিয়ে গেলি! হাতে ঘিয়ের শিশিটা পরে গেলে কিন্তু কেলেঙ্কারি কাণ্ড হয়ে যাবে!’ এই বকা শুনে, গৌরী একটু বিরক্ত হয়েই গঙ্গাকে বলল, ‘এই ছোট্ট ফুলের মত মেয়েটাকে তুই এত বকিস কেন রে বাপু! কি মিষ্টি মেয়েখানা!’ যমুনা কে কিছু বললেই যেন গৌরীর খুব গায়ে লাগছে– লক্ষ্য করেছে গঙ্গা।
তাই কিছু না বলে শুধুই মুখ টিপে হাসল। তবে তার দিদিকে কেউ কিছু বললে যমুনা আবার সহ্য করতে পারেনা। তা্ই মৃদুস্বরেই বলে উঠলো, ‘আসলে গৌরীদিদি, জানোতো, আমার দিদি আমাকে বড্ড ভালোবাসে। যে যাকে ভালোবাসে, তার তো তাকে বকার শাসন করার পুরো অধিকার থাকে– তাইনা!’
যমুনার মুখে এই কথাটা শুনে গৌরীর যেন বেজায় আনন্দ হল। সে বলে উঠলো, ‘বাহ, বেশবেশ! তুই এত সুন্দর কথা বলতে জানিস! আমি তো ভাবছিলুম, তুই গুছিয়ে কথা বলতে জানিসই না। বা বেশ ভালো, বেশ ভালো। এই দিদিই তোর, বাপ-মা সব কিনা!’
মাঝেমাঝে গৌরীর মুখ থেকে বেরোনো কিছু কথা খুব দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলো গঙ্গার? মনে হচ্ছিল, ‘ও কি করে এত কথা জানল?’ সব মিলিয়ে গৌরী চরিত্রটা গঙ্গার কাছে একটা ধাঁধার মতন হয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছে, ‘না ও খেয়ে নিক, তারপর সব ধাঁধার উত্তর বার করা যাবে।
থালাতে ভাত বেড়ে যমুনা তাতে ঘি দিচ্ছিল। গঙ্গা দেখে বলল, ‘বেশী ঘি দিসনা বোন! ও কতদিন ঠিক করে খায়নি তার ঠিক নেই। এক বারে এতো ঘি ও সহ্য করতে পারবে না!’
যমুনা তার দিদিকে, ঘিএর পরিমান দেখিয়ে গরম ভাতের উপর দিয়ে দিল , সামনে একটা আসন পেতে দিয়ে বলল, ‘নাও গো গৌরীদিদি, এবার বস। এক মুঠো খেয়ে নাও। খিদে কি চলে গেল নাকি তোমার ?’
গৌরী বাচ্চা মেয়ের মত উৎফুল্লতা নিয়ে বলল, ‘নারে খুব খিদে পেয়েছে! খুব খিদে পেয়েছে!’ এই বলে গরম ভাতের থালার সামনে বসে, এমন করে খেতে আরম্ভ করল, যেন গরম নয়, ঠাণ্ডা কনকনে ভাত খাচ্ছে ও। খানিক ক্ষণ খাওয়ার পর, হঠাৎ ওর হুঁশ হল। সে বলে উঠলো, ‘হ্যাঁরে আমি একা খাচ্ছি! তোরা কেউ খাবি না?’
যমুনার গোবিন্দ-ভোগচালের ভাত খুব প্রিয়। তবে ও কিছু বলার সুযোগই পেলনা। কিছু বলার আগেই, গঙ্গা বলেদিল, ‘নাগো! আমরা তো দুপুরবেলায় খেয়েছি! তুমি খাও!’
চোখের নিমেষে ভাতের থালা সাফ হয়ে গেল আর দুই বোন দেখল গৌরী থালা নিয়ে কলঘরের দিকে যাচ্ছে। সেই দেখে যমুনা ছুটে গিয়ে থালাটা একরকম কেড়েই নিয়ে নিলো। বলে উঠলো, ‘চল হাত ধোবে এস’।
গৌরী প্রথমে মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝিয়ে দিল, খাওয়া হয়ে গেছে, তাই থালাটা মাজতে যাচ্ছে। সেইটা বুঝেই যমুনা বলে উঠলো, ‘ওটা আমি মেজে নেব’।
হাত মুখ ধুয়ে আসলে, গঙ্গা গৌরীর উদ্দেশ্যে বলল, ‘একটু শুয়ে নেবে নাকি!’
গৌরী হেঁসে বলল, ‘না, শুলে চলবে কেমন করে! তুই যে ঠিক করে রেখেছিস, খাওয়া হয়ে গেলে অনেক প্রশ্ন করবি আমায়! তার উত্তর দিতে হবেনা! বল, কি জানতে চাস!’
গঙ্গা আবার একটু ধাক্কা খেল। মনেমনে বলল, ‘ও কি করে বারবার মনের কথা পড়ে নেয়? আমি তো একবারও এই কথাটা মুখ থেকে উচ্চারণও করিনি! তবে ও জানল কি করে!’
গঙ্গা চুপ দেখে, গৌরী বলতে থাকল, ‘বুঝেছি, কি শুধবি বুঝে উঠতে পারছিসনা তো! বেশ, তাহলে আমি প্রথম থেকেই বলি আমার কথা, শুনবি?’
এবারে আর গঙ্গা কথা বলার সুযোগ পেলনা, যমুনা আগে ভাগেই বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ শুনবো’। গঙ্গা দেখল তার মনের কথাই বলে দিয়েছে তার বোন। তাই চুপ করে গেল। অন্যদিকে গৌরী বলতে শুরু করল, ‘আমি তখনও জন্মাইনি বুঝলি, তার আগেই আমার জন্মদাতা বাবা উনার দেহ ত্যাগ করেছেন। মা সদ্যজাত আমায় নিয়ে আমার একমাত্র মামার কাছে গিয়ে ওঠে। বাবার বাড়িতে নাকি মার উপর খুব অত্যাচার হত। তারা নাকি বলতো, আমার মা আমার বাবাকে গিলে নিয়েছে। সেই খুদে বয়সেই আমার বক্রেশ্বর ত্যাগ আর কলকাতায় গমন।
মামা আমার আর মায়ের খুব যত্ন আত্তি করত। মামী যদিও আমাদের নিয়ে মামার এরকম বিগলিত হয়ে পরাটা একদম পছন্দ করতনা। মামার নিজের তিন মেয়ে– তাদের দিকে কোন হুঁশ নেই! যত নজর সব আমার দিকে! মামার তিন মেয়ের মধ্যে ছোটোটা আমার থেকে দুইবছরের বড়। আমি যখন পাঁচ বছরের, তখন আমার মায়ের মৃত্যু হয়। মামার বাড়িতে তারপর থেকে আশ্রিতের মতই বাস আমার। মামাকে মামী বুঝিয়ে দিয়েছে, তিনি যদি আমার দিকে বেশী দৃষ্টিপাত করেন, তবে তিন মেয়েকে নিয়ে উনি সোজা বাপের ঘরে চলে যাবেন। তাই কিনা জানিনা, মামা আমার প্রতি আস্তে আস্তে বিরক্ত বোধ করতে আরম্ভ করেছিলেন’।
একটু নড়েচড়ে গঙ্গার কোলের কাছে এগিয়ে এসে, গঙ্গার গায়ে একরকম ঠেস দিয়েই আবার গৌরী বলতে শুরু করল– ‘এই মামা আমার মায়ের থেকে প্রায় ১২ বছরের বড়। উনার বড়মেয়ে আমার থেকে ১১বছরের বড়। মামার বাড়িতে প্রায় সবাই, (মামীর তো দুচোখের বিষ আমি) মানে মামার ছোট মেয়ের নাকি আমার রূপের প্রতি ঈর্ষা ছিল–যদিও ওকে দেখতে খুবই সুন্দর, আর মেজদির যেন সময়ই নেই আমাকে দেখার– এই রকম অবহেলা সত্ত্বেও, বড়দি আমাকে খুব স্নেহ করত। বড়দি, মানে মেনকা দিদির কাছেই আমি মানুষ। মামা কোনোদিন আমাকে স্কুলে পাঠায়নি–পয়সা খরচ হবে বলেই হয়তো!’
ফিক করে খানিক হাসল গৌরী। যেন কতই না আনন্দ পেয়েছে! তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘বড়দিদিই আমাকে অক্ষরজ্ঞান করিয়েছিল চুপিচুপি। লুকিয়ে লুকিয়ে পুরাণাদি পড়ে শোনাত, আবার কখনো কখনো পড়তেও দিত। পাঠ্যবই দেখলে যদি চেঁচামেচি করে, তাই পুরাণাদি, মহাভারত, রামায়ণ, রামকৃষ্ণ কথামৃত এইসব পড়াত। বড়দিদির ভালোবাসা খুব পেয়েছি রে, খুব পেয়েছি’। বলতে বলতে গৌরী চোখের জল মুছতে আরম্ভ করল।
সেই দেখে গঙ্গা তাকে সান্ত্বনা দিতে যাবে, কিন্তু সুযোগই পেলনা। উঠে বসে পরা গৌরী আবার গঙ্গার গায়ে বাচ্চা মেয়ের মত ঠেশ দিয়ে বলতে শুরু করল, ‘আমার বয়স তখন এই ১৬। বড়দি তখন ২৭। সবাই বড়দির বিয়ে দিতে ব্যস্ত। কিন্তু পাত্রের বাড়ি থেকে বা পাত্র নিজে যখনই দিদিকে দেখতে আসত, দিদি সব সময়েই পুরো আয়োজনে জল ঢেলে দিত। আমি জিজ্ঞেস করলে বলত–আমি চলে গেলে তোকে তো সব কুকুর শিয়ালের মত ছিঁড়ে খাবে। আগে তুই বড় হয়ে ওঠ, তারপর না হয় বিয়ে! কিন্তু দিদির সেই সাধ আর পূর্ণ হলনা। সেই বছরেই ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে দিদির মৃত্যু হল। এই বলে আবার গৌরী চোখের জল মুছল।
এবার গঙ্গার নজর একটু অন্যদিকে গেল। একি! যমুনার চোখে জল কেন? আরে! শুধু যমুনা কেন, তার নিজের চোখেও যে জল। তাই গৌরীর সাথেসাথে সকলেই চোখের জল মুছলো, গৌরী আবার বলতে থাকল, ‘বড়দিদি আমায় দেখত বলে মামীর এমনিই চক্ষুশূল ছিল। কিন্তু সেই ব্যাপারটা যে এতটা গভীর, সেটা বুঝিনি! দিদির মৃত্যুর তিনমাসের মধ্যেই মামী মেজদিদির বিয়ে ঠিক করে দিল। সেখানে ও ঘটল অঘটন। বিয়ের শুভদৃষ্টির আগে আমার মামী যখন পিড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বরকে বরণ করছিল, মাথায় কলসি ঠেকাতে গিয়ে, মামীর পা পিছলে গিয়ে সেই কলসির এমন বেকায়দায় জামাই-দাদার মাথায় ঠোকর লাগে, যে সে মাটিতে পরে যায়। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়।
ডাক্তারবাবু বলে মাথায় আঘাত। দিদি লগ্নভ্রষ্টা হলেন, অন্যদিকে জামাই-দাদার স্মৃতি হারিয়ে যায়। সেই দেখে, বামুনঠাকুর বলে একটা যজ্ঞ করার কথা। সেই যজ্ঞের পরে বামুনঠাকুর মামামামীকে বলে যে, এইসব নাকি আমার জন্য হচ্ছে। আমার বিয়ে না দিলে মামার দুই মেয়ের বিয়ে হবেনা। এবার তাদের মাথায় ঢুকল চিন্তা– আমায় কত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়া যায়!’
বেশ খানিকক্ষণ গৌরী অট্ট হাসি হেঁসে আবার বলতে শুরু করল, ‘শুরু হল চিন্তার পর্ব। কি করে বিয়ে দেবে আমায়? আমার তো ১৮ বছর বয়স হয়নি? তবে কি এই দুবছর মামার মেয়েদের বিয়ে হবেনা? এইসব কথা বার্তা চলতে চলতে আমার ঠিকুজি কুষ্ঠিও নির্মাণ হল। সেই দেখে একেরপর এক জ্যোতিষ বলতে লাগল, – এই মেয়েকে তো শিবের কাছে দান করতে হবে! সপ্তম ঘরে এর রবি, বৃহস্পতি, শনি আর শুক্র একসাথে বসে রয়েছে! সপ্তম ঘর হল মিলনের ঘর– অর্থাৎ বিবাহের নির্ণায়ক। সেখানে রবির অবস্থান মানে–এর মিলন হবে সরকার অর্থাৎ হয় সরকারী উচ্চপদস্থকর্মী, নয় স্বয়ং সরকারের সাথে।
সেই সপ্তমঘরেই আবার বৃহস্পতির অবস্থান। মানে, এই মেয়ের মিলন হতেই বিদ্যা, বুদ্ধি, সিদ্ধি ও জ্ঞানলাভ করবে। এখানেই আবার শুক্র অর্থাৎ, এই মিলন অধ্যায় থেকেই ও লাভ করবে পরমতৃপ্তি। এমনকি এই ঘরেই শনির অধিষ্ঠান। অর্থাৎ ওর মিলন অধ্যায় থেকেই আধ্যাত্মিক জীবনের সূত্রপাত! এক সাথে মেলালে যা দাঁড়ায় সেটা হল, ওঁর স্বামী এমন কেউ হবে যে একা ধারে ওঁকে জ্ঞান, বিদ্যা, আধ্যাত্ম ও তৃপ্তিপ্রদান করবেন, এবং সে হবে সরকার স্বয়ং! আর সত্যিকথা বলতে কোন সরকারের যদি এইসব কিছু দেবার ক্ষমতা থাকে, তা হলেন একমাত্র দেবাদিদেব মহাদেব। তাই যথাসম্ভব শীঘ্রই ওঁকে মহাদেবের সাথে বিয়ে দেওয়া হোক’।
আবার খানিক হেঁসে গৌরী বলে চলল, ‘সেকি হুলুস্থুল কাণ্ড! মামীর তো প্রথমে খুব আনন্দ হল–শিবের সাথে বিয়ে দিতে তো আর রেজিস্ট্রি করতে হবেনা। তাই আর ১৮ অবধি অপেক্ষা করতেও হবেনা! সবাই মিলে আমার বিয়ের আয়োজন করল। মামাবাড়িতে এত কদর এর আগে কোনদিনও পাইনি। সেই প্রথমবার! মা বা বড়দি দেখলে খুব খুশী হত! বিয়ের বেনারসি পরিয়ে আমায় বিয়ে দেওয়া হল শিবের মূর্তির সাথে। সেখানেও আবার মামীর কপালে ভাঁজ! শিবের নাকি কোন বাড়িঘরদোর নেই, তাই নাকি আমাকে সেই মামাবাড়িতেই থাকতে হবে! অন্যদিকে, আমার আর মামাবাড়িতে ভালো লাগছিলোনা। জানো গঙ্গা ওরা বলে কিনা – শিবের নাকি কোন বাড়ি নেই। এত বড় বাড়ি রয়েছে কৈলাসে! তাও বলে বাড়ি নেই! আমিও ঠিক করে ফেললাম–ঘর আমি করবই আর স্বামীর সাথে গিয়েই ঘর করবো। তাই একদিন রাত্রে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরি শিবের কাছে যাবো বলে।
গঙ্গা আর যমুনা এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল গৌরীর কথা। এবার গঙ্গা ঝেড়ে মেরে উঠে বলল, ‘তো এখন তোমার বয়স কত?’
গৌরী হাসতে হাসতে গড়িয়েই পরল প্রশ্ন শুনে। গঙ্গা আর যমুনা ভাবতে থাকল, ‘কি এমন প্রশ্ন করলাম, যে এত হাসে?’ উত্তরে গৌরী বলল, ‘সেটা তো জানিনা, গঙ্গা দিদিমণি, তবে বছর দুই তো গেছেই সেই বাড়ি থেকে বেরনোর পর ’।
গঙ্গা ভাবতে থাকল, ‘উমম, হতে পারে। ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা ওর বয়সটা! রূপদেখে একেক সময়ে তো মনে হয় যমুনার থেকেও ছোট। উমম, যমুনা ঠিকই বলেছিল, আমার থেকে ছোট, আর ওর থেকে বড়। বাবা, আমার বোনটা কত বড় হয়ে গেছে! যা আমি বুঝতে পারছিনা, সেটাও বুঝে যাচ্ছে!’
গঙ্গা আবার প্রশ্ন করে উঠলো, ‘আচ্ছা তোমার মাথায় ওই সিঁদুর কি তবে ওই দুই বছর ধরেই এরকম রয়েছে? এতো বছর ধরে চানটান করনি?’
গৌরী উচ্চহাস্যে হেঁসে বলল, ‘কি যে বল না গঙ্গাদিদি! চার বছর চান না করলে যে পিত্তি পরেই মরে যেতুম গো! করেছি করেছি চানও করেছি, খাবারও খেয়েছি। শুধু কাশীর পথ থেকে ফেরার সময়ে আর চানও হয়নি, খাবারও খাওয়া হয়নি। একটা সাধু বাবার কি মনে হয়েছিল, ভালোবেসে একটা ট্রেনের টিকিট কেটে তাতে উঠিয়ে দিয়েছিল। সেই ট্রেনেই হাওড়া ষ্টেশনে আসি। সেখানে নেমে তো আরেক চব্ব! কেউ আমার পানে তাকায়ওনা! খালি হাতে, একটা সিঁদুর কৌটো নিয়ে হাঁটতে থাকি। আমার মামাবাড়ি হরিদেবপুরে। একজন ছোকরাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কিভাবে যাবো। সেবলে– কি দেবে বল, যদি কিছু দাও তবে তোমায় গাড়িতে তুলে দিতে পারি? আমি দেখলুম, আমার কাছে নাকের আর কানের দেওয়া গয়না, গলায় একটা সোনার হার, হাতে শাঁখা পলা ছাড়া একটা সোনার বালা আর পায়ে এক জোড়া রূপোর মল রয়েছে। তো এক পায়ের মল খুলে ছোকরাটাকে দিয়ে দিই।
সেই পেয়ে আমায় সে এক খানি বাসে তুলে দেয়। আমি শেষে পৌঁছে জানি, সেটা উলুবেড়িয়া। সেখান থেকে বাড়ি যাবো কি করে শুধাতে এক বয়স্কলোক বলল, সঙ্গে পয়সা আছে? আমি না বলতে বলল, তাহলে গঙ্গার ধারে চলে যাও, গঙ্গার পার বরাবর হাঁটতে থাক। হাওড়া সেতুর ছবি দেখিয়ে বলল, এটি দেখতে পেলে, সেখান থেকে হরিদেবপুরের মিনিবাস পাওয়া যায়, ধরে নেবে। আমি সবই শুনলাম, কিন্তু গঙ্গার পার ধরে কোনদিকে যেতে হবে সেটাই তাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। তাই হাঁটতে হাঁটতে বাউরিয়া পৌঁছে যাই। সেখানে গিয়ে ভাবি, ধুর পথ খুঁজে পাচ্ছিনা, আবার শিবের কাছে চলে যাব! তাই মাঝি কাকাকে বললুম, আমায় শিবের কাছে নিয়ে যেতে পারবে?
বলতেই পারত পারবনা, বললে হ্যাঁ পারবে। আমি তাই উঠে বসলুম। হেঁটেহেঁটে ক্লান্ত হয়ে গেছিলুম, তাই কখন ঘুমিয়ে পরেছিলুম বুঝতেই পারিনি। আর এইদেখ, মাঝি কাকা কিছুই জানতোনা, আমায় মাঝনদী তে ফেলে পালিয়েছে’।
গল্প শুনতে শুনতে যমুনা কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। পুরোটাই যেন তার কাছে একটা স্বপ্নের মতো। গঙ্গা বলে উঠলো, ‘তো তুমি কাশী গেছিলে কার সাথে? সেখানে কি শিবের সাথে দেখা করতে গেছিলে?’
গৌরী বাচ্চাদের মত দুলতে দুলতে বলল, ‘নাগো কাশী তো ফেরার পথে দেখেছিলুম। আমি তো কৈলাস গেছিলুম শিবের সাথে ঘর করতে!’
গঙ্গা এবারে রসিয়ে রসিয়ে বলল, ‘তা শিববাবু কি আসল গৌরীকে ছেড়ে নকল গৌরীতে মজল? নাকি খেদিয়ে দিল তোমায়!’
গৌরী রেগেমেগে বলল, ‘কে বলেছে খেদিয়ে দিয়েছে? উনি বলেছেন, একটা ভালো জায়গা করতে, উনি আমায় নিয়ে থাকবেন। তাইতো চলে এলাম, সেই ঘর করতে।
গঙ্গা যেন আর হাসি চেপে রাখতে পারছিলনা। উচ্চস্বরে হেঁসে উঠে, হাসতে হাসতেই বলল, ‘ও তুমি আবার ঘরও করেছ শিবের সাথে? তো শিববাবুকে কেমন দেখতে? কেমন আছে সে?’
‘তুমি আমার সাথে ঠাট্টা করছ তাইনা, গঙ্গাদিদি!’ একরকম বাচ্চাদের রাগ দেখিয়ে বলে উঠল গৌরী। ‘তবে বলি শোন’, এই বলে গৌরী আবার বলতে শুরু করল, ‘তিনি ভালো নেই! খুব শিগগির নাকি উনার ঘর ভেসে যাবে! কার্ত্তিক গণেশও তাই চিন্তায় আছে! পৃথিবীতে সব নাকি অসুর হয়ে যাচ্ছে। যে কটা মানুষ আছে, সেগুলোকে সুরক্ষিত করে নিয়ে যেতে হবে। আর তাঁকে কেমন দেখতে! গায়ে ভর্তি ছাই, খাপছাড়া খাপছাড়া! তার সাথে এই বড়বড় চুল, জট ধরে গেছে, কিন্তু পাক ধরেনি। পরনে একটা বাঘছাল, হাতে ত্রিশূল, ডমরু আর শিঙা। কোন আড়ম্বর নেই, একদম নেই।
‘ও তাই!’ গঙ্গা আর যমুনা উভয়ই উভয়ের দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করে এক সাথেই বলে উঠল কথাটি। গঙ্গা আবার মজা করে বলতে থাকল, ‘তো তুমি সেখানে গেলে কি করে গো? শুনেছি কৈলাস যেতে নাকি সরকারের অনুমোদন লাগে!’
গৌরী সরল ভাবেই বলতে থাকল, ‘সেতো অনেককথা। কাল বলব তোমায়, ঠিক আছে! সংক্ষিপ্তে আজ এটুকুনই জেনে রাখ, যে অনেক ভালো আর খারাপ সন্তানের মিলিত প্রচেষ্টায় সেখানে যেতে পেরেছি, না হলে কি আর পারতুম!’
এই সব কথা বলতে বলতে কখন সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে দুই বোন তার টেরই পায়নি! বাচ্চাগুলো পড়তে এসেছে দেখে হুঁশ হল তাদের। গৌরী আর যমুনা ওই ঘরেই রইল। গঙ্গা পাশের ঘরে, যেখানে ও পড়ায় সেখানে চলে গেল। দুঘণ্টা পড়াবে। সেই ফাঁকে যমুনা রাতের রান্নাটা সেরে নেয়। আজ গৌরীও রয়েছে হাতে হাতে করে দিতে। যদিও পুরো রান্নার মধ্যে দেখা গেল, যমুনা আজ যোগাড়ই করছে, গৌরী পুরো রান্নাটা করছে।
এই রান্নার ফাঁকে ফাঁকে, গৌরী আর যমুনার বেশ কিছু সময় গল্প করেও কাটল। যমুনা খুব সরল মনা। গঙ্গার আবার ভিতরে ভিতরে যতই সারল্য থাক, বাইরেটা পাথর হয়ে গেছে। তাই যমুনার সাথে গৌরীর খুব জমে।
তবে যমুনার প্রশ্নবাণ কম তীক্ষ্ণ ছিলনা। সরলতায় মাখানো নাহলে, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গৌরীকেও বোধহয় বেগ পেতে হত! যমুনা কুটনো কুটতে কুটতে প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা গৌরীদিদি! তোমায় ওই লোকগুলো ছুঁতে গিয়ে ছিটকে পরে গেল কেন? আমি নিজের চোখে দেখেছি, কেমন ছিটকে পরে গেল ওরা! কি করে করলে বলনা! আমাকে শিখিয়ে দেবে? দিদি আমাকে নিয়ে খুব ভয়ে থাকে। এটা শিখিয়ে দিলে, দিদির সব ভয় কেটে যাবে’।
গৌরী তখন ময়দা মাখছিল। মাখতে মাখতে হাসতে হাসতেই বলল, ‘কেন শেখাবনা! শিখিয়ে দেব। কালকেই শিখিয়ে দেব’।
‘আচ্ছা আমি আর দিদি তোমায় ছুঁলাম, তখন আমাদের কিছু হলনা কেন?’ পরের প্রশ্ন যমুনার। গৌরীও বিনা ব্যস্ততায় উত্তর দিল, হাসতে হাসতে, ‘আসলে তোমরা ভালোতো তাই। যারা বদ আর বদমতলব নিয়ে কাছে ঘেঁষে, তারাই আমার স্বামীর কৃপায় ছিটকে যায়। যারা ভালো মানুষ, তারা সহজেই আমার কাছে আসতে পারে’।
‘কি করে বোঝ? কে যে ভালো আর কে খারাপ!’ যমুনার পরের প্রশ্ন। গৌরীও কোনভাবে বিরক্ত না হয়ে বলতে থাকল, ‘আমি কি আর বুঝি মা-রে! তিনিই বোঝেন আর তিনিই করেন’।
যমুনার আবদার এসে পরল এবার, ‘আমায় শিখিয়ে দেবে কিন্তু। কথা দিলে তো?’ গৌরীর সহজ স্বীকারোক্তি, ‘দেব তবে তোমার দিদিকে বলতে পারবেনা। বললে, ও তোমাকে আমাকে দুজনকেই বকবে!’
‘না বলবনা। আচ্ছা গৌরীদিদি, তুমি কি চলে যাবে? আমাদের সাথে থাকনা! আমাকে গল্প বলবে। আমি শুনবো। যাবেনা তো?’ যমুনার কুটনো কোটা শেষ হতে না হতে বলতে থাকল।
গৌরী বলল, ‘সেটা তো তোমার দিদি জানে মা! আমায় রাখবে না ফেলে দেবে? আজ রাত্রে তোমায় গল্প শোনাবো হ্যাঁ! দক্ষরাজার গল্প। ঠিক আছে!’
‘দিদি তোমায় ফেলে দেবে কেন? দিদি কাউকে ফেলে দেয়না! ওঁকে দেখে মনে হয় খুব কঠিন। আসলে ও খুব নরম। ও কাউ কে ফেলতে পারেনা। তোমার মতন ভালোমানুষকে তো কিছুতেই নয়’। যমুনা দিদির বিরুদ্ধে একটা কথাও শুনতে রাজি নয়।
‘ভালো মানুষ! কি করে বুঝলে মা, যে আমি ভালোমানুষ? আমিতো খারাপও হতে পারি! খারাপ উদ্দেশ্য নিয়েও আসতে পারি!’ গৌরীর কাছ থেকে প্রথম বুদ্ধিদীপ্ত কথা শুনে যমুনা একটু থমকেই গেল। তারপর আবার বলে উঠলো, ‘তুমি ভালো মানুষ। না হলে দিদি তোমায় নিয়ে আসে? দিদি ভুল করতেই পারেনা’।
‘হুম’ হাসতে হাসতে বলল গৌরী, ‘হ্যাঁ সেটা ঠিকই বলেছ মা। তোমার দিদি খুব বিচক্ষণ ব্যক্তি। একা হাতে কিরকম সব সামলায়। আর ওঁকে তো সামলাতেও হবে। ওর উপরে কত দায়িত্ব!’
কথা বলতে বলতে রুটি করা শেষ হলে, তরকারিটা গৌরীই চাপাল। শেষে বলল, ‘আচ্ছা তুমি বড় হয়ে কি হতে চাও যমুনা!’
যমুনা সহজ মনে গৌরীর পাশে একরকম গাঘেঁষেই বসেছিল। সে একরকম আচমকাই বলে উঠলো, ‘বড় হলে মানে? আমি তো বড়ই হয়ে রয়েছি! জানো গৌরীদিদি, আমার না গান গাইতে খুব ভালো লাগে! আমার খুব সাধ, যাকে বিয়ে করবো সে খুব ভালো খোল বাজাবে, আর আমি গান গাইব। অনেক গান জানি শোনাবো হ্যাঁ– খেয়েদেয়ে নিয়ে শোনাবো। দিদিও আমার গলায় গান শুনতে খুব ভালোবাসে। বলে আমার নাকি খুব আবেগ!’
উত্তরে গৌরী বলল, ‘বেশ তরকারিটা একটু সাঁতলে নিই, তারপর গান শুনবো!’। অমনি যমুনা বলে উঠলো, ‘নানা বাচ্চা গুলো আগে যাক! ওগুলো থাকলে গান ধরলে, দিদি খুব বকাবকি করে। বলে ওই বাচ্চাগুলোর কাছ থেকে নাকি ওদের বাবামায়েরা এই বাড়ির খবর নেয়। দিদি বলে, বাইরের লোকের সহ্য হয়না কেউ আনন্দে থাকুক। এমনটা হয় বল! কেউ আনন্দে আছে জানলে তো আনন্দই হয়! কিন্তু দিদি বলে, কি করবো!’ গৌরী হেঁসে বলল, ‘দিদি ঠিকই বলে। মানুষ আগে নিজেকে ভালোবাসে, তারপর সংসারকে ভালবাসতে শেখে, তারপর সমাজ, বিশ্ব–এই ভাবে। তিনি মানে আমার স্বামীকেই দেখনা! সবসময়ে খালি বিশ্ব নিয়ে ভাবনা! নিজের কথা ভাবতেই ভুলে যায়!
কিন্তু কি জানোতো মা, সংসারটাকেই যারা সব মেনে ফেলেছে, সংসারটা যে বিশাল জগৎ সংসারের এক খণ্ডমাত্র- এটা ভুলে গেছে, তারা শুধু নিজের টুকুই দেখতে পায়। অন্য কিছু আর তাদের চোখে ভালই লাগেনা। তাই কারুর ভালো তারা সহ্য করতে পারেনা। দেখলেই ভাবে, আমার থেকেও ভালো! কেন থাকবে আমার থেকে ভালো! আমিই সেরা থাকবো। আসলে এরা সেরা থাকতে ভালোবাসে, সকলে সেরা আছে দেখতে না!’
‘এমন কেন গো দিদি!’ যমুনা খেয়ালই করেনি কখন, গৌরীদিদি থেকে শুধু দিদিতে নেমে এসেছে সে! আসলে মনে মনে ও গৌরীকে বড় আপন করে ফেলেছে। সরল মন কিনা!
গৌরী সেই কথার উত্তর না দিয়ে বলে উঠলো, ‘ঘরটা কি ধোঁয়া হয়ে গেছে, না? এই শীতের সন্ধ্যেতেও গরম লাগছে! তোমার লাগছেনা!’ যমুনা তিড়িং করে উঠে গিয়ে একটা জানলা খুলে দিল। দিয়েই আবার গৌরীর কাছে এসে বসল। গৌরী যমুনাকে দেখাল, ‘ওই দেখ। কেমন ধোঁয়াগুলো জানলা দিয়ে চলে যাচ্ছে, আর ঘরটাও ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, তাই না!’ যমুনা সেটা দেখে কোন কারণ ছাড়াই খুব আনন্দ পেল। গৌরী এবার খুব স্নেহের সাথে বলল, ‘দেখলে মা, কেমন এই জগৎটা!’ যমুনা বলল, ‘এতে আবার জগৎ দেখার কি আছে!’
হাসতে হাসতে যমুনার মাথাটা কোলের মধ্যে নিয়ে গৌরী বলতে থাকল, ‘বুঝতে পারলেনা! দেখনা যতক্ষণ না আলু গুলোর, বেগুন গুলোর খোলা ছাড়িয়ে রান্না করতে দেওয়া হচ্ছিল না, ততক্ষণ কেমন নিজেদের মধ্যে লড়াই করছিল! আলু বলে আমায় সারা বাজারের মধ্যে সব থেকে বেশী কেনা হয়, তাই আমিই সেরা। আর বেগুন বলে, আমার রূপ দেখেছো, আমার ত্বক দেখ কত মসৃণ আর চকচক করছে। আমিই সেরা’। যমুনার কথাটা শুনে খুব ভালও লাগল, আবার হাসিও পেল। গৌরী আরো বলতে থাকে, ‘মানুষের মনটাও ঠিক এইরকম। যতক্ষণ না ওদের অহংকার, লজ্জা, ঘৃণা ও দ্বেষরূপী খোল ছাড়িয়ে তরকারি করতে দেবে, ততক্ষণ ওরা আমি সেরা, আমি সেরা করে বেড়ায়’। যমুনা এবার বলল, ‘তরকারিটা কেমন তাহলে!’
মিষ্টি হেঁসে গৌরী বলতে থাকে, ‘তরকারিটাই যে মন তৈরির কল! এই কলটার নাম সংসার। সংসার নিজেই প্রথমে আঁচটা দেয়। সেই আঁচেই অহংকার, লজ্জা, ঘৃণা সব ছেড়ে মন প্রথম সেদ্ধ হতে বসে–তোমরা একে বল পড়াশুনা। কিন্তু যখন তরকারি শেষ হবে হবে, তখন যেই তাপ আর ধোঁয়া বের হয়, তাকে সংসার ধন্যধন্য করে। আসলে তার তখন অনেক উপযোগিতা আসতে চলেছে কিনা! তার নাম হবে, যশ হবে, টাকা হবে! সেইটাতো সংসারেই কাজে লাগবে! কিন্তু যখন পুরো সেদ্ধ হয়ে যায়, তখন সেই সংসারের মানুষেরাই আর তাপটা নিতে পারেনা। উড়ি বাবা গো, উড়ি মা গো করে ওঠে। সেই মানুষটার আচার আচরণ, কথাবার্তা তখন বড্ড ভারী ভারী লাগে। সংসারীরা ভাবতে আরম্ভ করে দেয় – কি করে একে সংসারে ধরে রাখা যায়! শেষে আর নিতে পারেনা সেই তাপ! দমবন্ধ হয়ে আসে! তখন সংসারীরা বাধ্য হয়, তাকে আটকে রাখার জন্য যে জানলাদরজা বন্ধ করে রেখেছিল, সব খুলে দিতে। আর সেই তাপ অর্থাৎ সেই পরিপক্ব মানুষটি মহানন্দে জানলা দিয়ে বাইরের জগৎসংসারের কর্ম করতে বেড়িয়ে পরে! এইটাই তো জগতের নিয়ম বাছা!’
গৌরীর কথা শেষ হতে না হতেই সেখানে এসে হাজির হল গঙ্গা। গঙ্গার গম্ভীর কণ্ঠে যমুনা ধরমরিয়ে উঠে বসে পড়েছে। ‘রান্নাঘরে শুয়ে পরেছিস কেন? রান্নাঘরটা কি শোবার জায়গা?’ গঙ্গার উচ্চস্বরে কথার মাঝে, গৌরীর কথা বেরিয়ে এলো, ‘থাকনা! আমিতো বসে রয়েছি। আমিকি ওর কোন ক্ষতি হতে দিতুম?’ গঙ্গা গলা নামিয়েই এবার বলল, ‘নাগো তুমি জানোনা, গল্প শুনতে পেলে ও আর কিছু চায়না! এখানে বটি, শীলনোড়া ছড়ানো রয়েছে। এইখানে কেউ শোয়?’ খানিক বিরতি দিতেই যমুনা উঠে বটি, শীলনোড়া সব ধুতে লেগে গেল। গঙ্গা আবার বলতে থাকল, ‘রান্না হয়ে গেল আজ! এত তাড়াতাড়ি!’ গৌরী কিছু বলতে যাচ্ছিল। যমুনা বলতে শুরু করে দেওয়াতে গৌরী থেমে গেল। যমুনা আনন্দের স্বরে বলল, ‘জানিস দিদি আজ গৌরীদিদি রান্না করেছে! আমি শুধু জোগান দিয়েছি। তরকারিটা চেখেছি। কি ভালো খেতে হয়েছে!’
গঙ্গা মুচকি হেঁসে বলল, ‘চল গৌরী, ওঘরে যাই। বাচ্চাগুলো আসে বলে, ওই ঘরে মশার ধুপ দিয়েছিলাম। এখনও তো খেতে এক ঘণ্টার মতন দেরী! (গৌরীর দিকে তাকিয়ে) তোমার কি খিদে পেয়েছে নাকি!’ প্রত্যুত্তরে গৌরী হেঁসে বলল, ‘না, এই তো তখন অতগুলো ভাত খেলুম! আর এবার বাপু একসাথে খাব। আমি খাই তোমরা দেখ, খুব খারাপ লাগে!’ গঙ্গা হাসতে হাসতে বলল, ‘আচ্ছা তাই হবে। চল এখন ওই ঘরে চল তো!’
গৌরী এবার গঙ্গার উদ্দেশ্যে বলল, ‘এবার যমুনা একটা গান গাক না! বাচ্চাগুলো থাকলে, গান গাইলে নাকি তুমি ওঁকে বকো!’
‘না, আসলে কি জানোতো!’ গঙ্গা যেন আত্মপক্ষসমর্থনে বলতে থাকল, ‘বাচ্চাগুলো বাড়ি গিয়ে সব কথা বলে। বুঝতেই তো পারছ। ছোট মেয়ে, তাই সরল সাদাসিধে!’ গৌরী সেই কথায় মুচকি হেঁসে সমর্থন জানিয়ে আবার বলল, ‘এবার তাহলে একটা গান গাও!’
গঙ্গা মনের আনন্দেই বোনকে বলল, ‘নে তোর গৌরীদিদিকে কি গান শোনাবি শোনা! অনেক দিন হয়ে গেল, আমিও তোর গলায় গান শুনিনি!’
যমুনা গান ধরল, –
বাউলের দল যে যায় চলে।
কত নামে ডাকে তোমারে।।
কখনো তোমায় বানায় পুরুষ।
কখনো বা নারীর আবেশ।।
শিব না শক্তি কে তুমি?
বুঝে যে পাইনা আমি!
এত নাম তোর শুনি।
বুঝিনে কোন নামে ডাকি।।
কেউ তোমায় বলে কমলা।
কেউ বা বলে নন্দলালা।।
কেউ ডাকে কালি বলে।
কেউ বা বলে রাধে রাধে।।
সব নামেই যাই ডাকতে তোকে।
শেষে দেখি মন কাঁদিছে।।
বল না মাগো, কি নামে ডাকি!
কোন নামে তুই আসবি ছুটি!
বুঝেছি বুঝেছি মা।
ছিলি ঊমা, হলি শ্যামা।।
আসলে তুই শিবশিবা।
মাগো তুই কতনামা!
বুঝতে গেলে তোর মহিমা।
না বুঝলে শুধুই লীলা।।
ডাকবো এবার শুধুই মা বলে।
মা’রে কেউ নাম ধরে কি ডাকে রে?
আসবি না মা, মা ডাকেতে?
এসে তুই নেনা কোলে তুলে।।
গানটা শুনে গৌরীর কেমন যেন এক অদ্ভুত ঘোর লেগে গেছে। ও আর নিজেকে সামলাতে পারছে না! ঘাড় পিছন দিকে হেলে গিয়ে পিঠ ছুঁতে চাইছে! এই দেখে গঙ্গার তো মাথা খারাপ হয়ে গেল! এরকি কোন রোগভোগ আছে নাকি?
যমুনা খুব তৎপরতার সাথে গৌরীর কাছে উঠে এসে, কানে কানে বলতে থাকল, – ‘ওঁ নমঃ শিবায়’। বেশ কয়েকবার এমন বলতে বলতে, গৌরী প্রকৃতিস্থ হল। যেন সে কোন ভিন্নজগতে চলেগেছিল! হুঁশ আসতেই গৌরীকে যমুনা খানিকক্ষণ শুয়ে বিশ্রাম করতে বলল। গৌরীও বিছানায় নিজেকে এলিয়ে দিল। গঙ্গার হাতপা ভয়ে সিটিয়ে রয়েছে। সেই দেখে যমুনা বলল, ‘দিদি গো, আর চিন্তার কিছু নেই। ঠিক হয়ে গেছে গৌরীদিদি’। ‘কি হয়েছিল ওর!’ ভয় থেকে প্রশ্ন করল গঙ্গা।
যমুনা বলল, ‘ওটাকে ভাব বলে গো দিদি। ঈশ্বরের নাম শুনলে, খুব পুণ্যাত্মাদের ওরকম হয়। তখন কানের কাছে ইষ্টের নাম জপলে ঠিক হয়ে যায়’। বিস্ময়ের সাথে গঙ্গা যমুনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই এই সব কথা জানলি কোথা থেকে?’ যমুনা আবার সেই বাচ্চা মেয়ের মতই বলল, ‘নদীর ধারে মাঝে মাঝে কীর্তনিয়ার দল আসে। ওরা গান শেষ করে চৈতন্যদেবের কথা বলে। বলে মহাপ্রভুর নাকি এরকম ভাব হত! মাথা পিঠ ছুঁতে চায়! শরীর ছেড়ে দেয়। তখন নিত্যানন্দ গিয়ে উনার কানে, উনার ইষ্টদেব, শ্রীকৃষ্ণের নাম করেন। তাতে আবার উনি ইহ-জগতে ফিরে আসেন। গৌরীদিদিরও সেরকম দশা দেখলাম কিনা! আর গৌরী দিদি শিবের দেখা পেতে কৈলাস চলে গেছিলেন। তাই তিনিই ওর আরাধ্য হবে মনে করে, কানে কানে তাঁর নাম করলাম। দেখ কাজ হয়েছে। উনি ঠিক হয়ে গেছে। একটু শুলেই পুরো ঠিক হয়ে যাবেন’।
গঙ্গার যেন বোনের উপর খুব গর্ব হল। সে যমুনার কপালে চুমু খেয়ে মাথাটা বুকের মাঝে নিয়েনিল। অন্যদিকে মনে মনে ভাবতে শুরু করে দিল– এই গৌরীর রহস্য ভেদ করতেই হবে। এতো যেসে মেয়ে নয়। দেবীর মত রূপ, শিবের সাথে বিয়ে, মহাপ্রভুর মতন ভাব, আবার নাকি শিবের সাথে সংসার করে এসেছে! উফ, কত কিছুই না শুনতে হবে! সবের শেষে গঙ্গা বলে উঠলো, ‘এবার কি ডাকবি নাকি তোর গৌরী দিদিকে? খাবার সময় হল তো। নে ডেকে নিয়ে আয় ওঘরে। আমি গিয়ে খাবার বাড়ছি’।
যমুনা গৌরীর মাথার কাছে গিয়ে বসল, নিজে মনেই বিড়বিড় করে বলতে শুরু করল, ‘কে গো তুমি মা! আমাদের মধ্যে এমন দিব্যরূপ নিয়ে এসেছ! আমাদের ছেড়ে যেও না মাগো! আমাদের সাথে থাক না। তোমার বর তো শিব। ওঁকে বলনা, কিছু একটা করতে, যাতে তুমি আমাদের সাথেই থাক! বলনা, বলনা!’ এবার গৌরীর উত্তরে যমুনা ভয় পেয়ে গেছে। মনেমনে বলল, ‘ও কি সব শুনেছে? নাহলেও বলল কেন যে “আচ্ছা বলব”!’ যমুনা এবার গৌরীকে ডাকল, ‘কি গো কেন বললে “আচ্ছা বলব”?’ গৌরীর কণ্ঠস্বর যেন আরও মিষ্টি হয়ে গেছে, ‘কেন, তুমি যে শিব কে বলতে বললে, যাতে আমি তোমাদের সাথেই থাকি!’
যমুনা বসে পরল, ‘তুমি ঘুমাও নি?’
গৌরী আস্তেআস্তে উঠে বসে বলল, ‘ঘুম কিনা জানিনা, তবে যেটাতেই ছিলুম, তোমার শেষ কথাগুলো শুনতে পেলুম’। মনে মনে যমুনা ভাবল, সেই সময়ে বোধহয় গৌরীর ঘোরটা ভাঙছিল। কিন্তু যদি গৌরী গঙ্গাদিদিকে সব বলে দেয়! ‘নানা কাউকে কিছু বলব না, শুধু তাঁকে বলব’- গৌরীর এই কথায় যমুনা যেন আকাশ থেকে পড়ল, ‘ইনি কি অন্তর্যামী নাকি?’ কিন্তু সে কথা না বলে, যমুনা গৌরীকে জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁগো, তুমি সবসময়ে খেলুম, গেলুম এরকম বল কেন গো?’ গৌরী হেঁসে বলল, ‘ওটা কলকাতার কথা বলার ধরন’।
‘কিরে এখনও গৌরীর ঘুম ভাঙেনি?’ হাঁক পরল গঙ্গার দিক থেকে।
‘হ্যাঁ উঠেছে। নিয়ে আসছি’। পাল্টা বলে যমুনা গৌরীর উদ্দেশ্যে বলল, ‘চল রুটি ঠাণ্ডা হয়ে চামড়া মত শক্ত হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, রাত্রে কিন্তু আমাকে দক্ষের গল্প বলতে হবে। আজ আমি তোমার কাছে শোব, হ্যাঁ?’
‘কিন্তু সেটা তো, তোমার দিদির কাছ থেকে অনুমতি করিয়ে নিতে হবে। তাইনা? খেতে খেতে সেটা করিয়ে ফেল। তাহলেই বলব। কি করাবে তো!’ গৌরী যমুনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কথাগুলি বলল। যমুনা মাথা নাড়িয়ে সাড়া দিয়ে বলল, ‘এখন চল, না হলে সব ভেস্তে যাবে!’
খাবার জায়গায় গঙ্গা দুজনকে দুটো আসনে বসতে বলল আর নিজে একটা ছোট কাঁথা ভাঁজ করে তার উপর বসল। আসলে বাড়িতে দুটোই মাত্র আসন। আরেকটা গঙ্গা বুনছিল, কিন্তু শেষ হয়নি।
যমুনা খেতে বসেই আব্দার করে, দিদির থেকে কথাটা ঠিক আদায় করে নিল–আজ সে গৌরী দিদির কাছে শোবে। গঙ্গা দেখল, এ তো ভালই হল। সে তো সব কাজের জন্য কোন সকালে উঠে পরে। আর যমুনার ঘুমটা পাতলা। ওর ওঠার সাথে সাথেই যমুনার ঘুমটাও ভেঙে যায়। ভালই হল, যতই গৌরীকে বিশ্বাস করতে খুব মন চাইছে, কিন্তু ওর কিছু কিছু আচরণের মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। যমুনা ওর সাথে থাকলে, ওর উপর নজরটা রাখা যাবে।
খাওয়া শেষ হলে গঙ্গা, দুই ঘরে বিছানা করে, মশারী টানিয়ে দিল। দিয়ে যমুনার উদ্দেশ্যে বলল, ‘কলসিতে জল আছে তো? গৌরীকে দেখিয়ে দে। রাত্রে যদি জল তেষ্টা পায়! উপরের কলঘরটাও দেখিয়ে দিস। যাতে কোন অসুবিধে না হয়। বেশী রাত করিসনা, বুঝলি!’এবার গৌরীর উদ্দেশ্যে গঙ্গা বলল, ‘দেখ গৌরী, ওর কিন্তু রাত্রে ঘুম আসে না। বেশী বিরক্ত করলে, পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পোরো। ওকে অত গুরুত্ব দিয়ো না। বুঝলে! আমি শুতে গেলাম। আমার আবার সকাল সকাল ওঠা আছে!’
যমুনার খুশীর তো কোন সীমাই নেই! দুজনেই কলঘর থেকে ঘুরে এসে মশারীর মধ্যে ঢুকে পরল। যমুনা ছোট্ট নীল রঙের একটা আলো জ্বালিয়ে, বড় আলো বন্ধ করে বিছানায় উঠে পরল। কলকাতার দিকে এখনও তেমন ঠাণ্ডা পড়েনি, তবে গ্রাম বাংলা তো! এখানে এখনই লেপ ব্যবহার করতে হচ্ছে। একটাই বড় লেপ। যমুনা নিজেকে ঢেকে গৌরীকেও সুন্দর করে ঢেকে দিল। গৌরীকে এমনিই যমুনার খুব ভালো লাগছিলো, ভাব হবার পর থেকে যেন ওর একটু বেশীই যত্ন নিচ্ছে, ভিতরে ভালো লাগার সাথে যেন একটা ভক্তি ঢুকে গেছে!
যমুনা গল্প শুরু করার কথা বলবে এমনটা ভাবছে, কিন্তু এক অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ(অনেকটা শিউলি ফুলের গন্ধের মতো) তার নাকে ভেসে এলো। ভালো করে শুঁকে দেখল, হ্যাঁ গৌরী দিদির শরীর থেকেই আসছে গন্ধটা! সরল মন, তাই সাতপাঁচ না ভেবে সে জিজ্ঞাসাই করে বসল, ‘হ্যাঁ গো দিদি, তুমি কি কিছু আতর মাখো! কি সুন্দর শিউলি ফুলের গন্ধ আসছে গো তোমার গা থেকে?’
গৌরী বলে উঠলো, ‘কই না তো? আমি তো কিছু মাখিনি! ওই একেকটা মানুষের গায়ে একেক রকমের গন্ধ থাকে। আমার গায়ে একটু শিউলি ফুলের গন্ধ থাকে, আগেও অনেকে বলেছে। আমার বড়দিদি খুব বলতো এই গন্ধের ব্যাপারে। আমি কিন্তু জানো, কোনদিনও এই গন্ধটা পাইনি! যমুনার শিশুসুলভ মন। অত মার প্যাঁচ নেই। যা বলল, তার উপর আর কিছুই যেন ভাবতে পারলো না ও! আসলে অধীর আগ্রহে ও বসে আছে দক্ষের গল্প শুনবে বলে। এদিকে গৌরী কিছুই বলে না! খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে, যমুনাই বলে উঠলো, ‘কি গো দক্ষের গল্প বলবে না! আমি কিন্তু এরকম করলে কথা বলব না!’
শিশু মনের আব্দার শুনে, গৌরী বলল, ‘আসলে মনে ছিল না, তাই। রাগ করে না! এস আমার কাছে এস’। এই বলে গৌরী তার হাতটা যমুনার দিকে বাড়িয়ে দিল। যমুনা সেই হাতের উপর মাথা রাখতে, একবারের জন্য তার মনে হল যেন কি সুন্দর এক নরম গদির উপর মাথা রেখেছে সে। কিন্তু গল্প শোনার এত ব্যাকুলতা, সেসব ভুলে গিয়ে অধীর আগ্রহে গল্পে মনোনিয়োগ করল। আর গৌরী বলতে আরম্ভ করল–
‘সে অনেকদিন আগেকার কথা। অনেক দিন মানে অনেকদিন! জানো তো, তোমরা যাকে যুগ বল – মানে সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর-কলি, এই সত্য থেকে কলি হল একটি যুগচক্র। এরকম সাতখানা যুগচক্র নিয়ে হল একটি মন্বন্তর। এই গল্পটা সেই সময়কার যখন এই মন্বন্তরের আগের মন্বন্তরের শেষ সময় চলছে। পরমপিতা ব্রহ্মার বহু সন্তান, যেমন নারদ মুনি, মনু, বশিষ্ঠ, আরও অনেকে…। তাদের মধ্যেই একজন ছিলেন দক্ষ। কিন্তু তিনি ব্রহ্মার আর পাঁচটা সন্তানের মতন ছিলেন না! ইনি ছিলেন অহংকারী। সবসময়ই এঁর জগতকে পদানত করার ইচ্ছা ছিল! এঁর একটা বিশাল রাজ্য ছিল যার রাজধানী ছিল প্রাগজ্যোতিষে, অর্থাৎ বর্তমানে যাকে তোমরা আসাম রাজ্য বল, সেখানে। নিজের ইচ্ছাপূরণ করতে, নিজেরই মত বলশালী, আর নিজেরই মত হীন মনোভাবের এক বিশাল সেনা ছিল তার। এইসব কিছু সে একটা বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্তির জন্য গড়েছিল। তার জীবনের উদ্দেশ্য ছিল সারা জগতের উপর রাজত্ব আর কর্তৃত্ব স্থাপন করা। সে এক বিশাল যজ্ঞ করেছিল সেই উদ্দেশ্যপূর্তির জন্য। সেই যজ্ঞের কথা বলার আগে, কেন সেই যজ্ঞ, সেটা বলি হ্যাঁ!
গৌরি দেখলো যমুনার থেকে কনো উত্তর এলো না। বুঝতে পারলো, সারাদিন দামোদারের ধার আর বাড়ি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে মেয়ে ঘুমিয়ে পরেছে। মিষ্ট হাসি দিয়ে গৌরী যমুনার মাথার নিচের হাতখানি আস্তে করে সরিয়ে, বালিশে মাথাখানা দিয়ে দেয়। মাঝরাতে অবশ্য একবার গৌরীর ঘুম ভেঙেছিল, তবে উঠতে আর পারেনি –যমুনা গৌরীকে জড়িয়ে ধরেছিল কিনা! উঠতে গেলে যমুনার যে ঘুম ভেঙে যাবে, তাই!
