বঙ্গভঙ্গ | ঐতিহাসিক উপন্যাস

ঠাম্মি – অমিয়বাবু ফিরলেন না আর। কনোদিনও ফিরলেন না। … যেদিন আমি ঢাকা যাবো বলে প্রস্তুত হয়ে বাড়ি থেকে বেরবো বলে অন্তিম প্রস্তুতি নিচ্ছি, দরজার কড়ায় আওয়াজ হলো। দরজা খুলে দেখলাম, নিখিলেশ বাবু দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

কি কারণে তিনি এসেছিলেন, আমি জানতাম না। ভিতরে নিয়ে এসে বসালাম তাঁকে। আমার ব্যাগপত্র গোছানো দেখে তিনি বললেন – কোথাও যাচ্ছেন?

আমি – হ্যাঁ, ঢাকা যাবো। অমিয়বাবু উনার মা-কাকাদের আনতে গেছেন, এখনো ফেরেন নি। … তাই উনার সন্ধান করতে যাবো।

নিখিলেশ বাবু – আর গিয়ে কাজ নেই। … উনার মা, কাকা, কাকিমা, আর একটি ভাইপো, একটি ভাইঝি, আমার আস্তানাতেই আছেন। … কিন্তু অমিয়বাবু আর ফিরতে পারেন নি!

কথাটা শুনে আমার হৃদপিণ্ড একমুহূর্তের জন্য যেন থেমে গেল, আর তারপরই আরম্ভ হলো ভয়ানক ধুকপুকুনি। নিখিলেশবাবু নিজের পকেট থেকে একটি চিঠি বার করে আমার হাতে দিলেন। চিঠিটি অমিয়বাবুর লেখা, খুলনা পোস্টঅফিসের পোস্টকার্ড। ডাকটিকিট পরেছে খুলনার, কিন্তু পোস্টমাস্টারের স্ট্যাম্প পরেনি।

নিখিলেশবাবু বললেন – চিঠিটি পোস্ট করতে পারেন নি অমিয়বাবু, উনার পরিবারের হাত থেকে আমি চিঠিটা পাই।

আমি আর কনো কথা না বাড়িয়ে চিঠিটি পড়তে থাকলাম –

প্রিয় নিখিলেশ,

খুবই বিপদের মুখে আমি এইমুহূর্তে দাঁড়াইয়া রহিয়াছি। যদি আমি পত্রখানি পোস্ট করিতে না পারি, তাহা হইলে আমার পরিবার তোমার নিকটে, কলিকাতায় উপস্থিত হইয়া, আমার এই পত্রখানি পৌঁছাইয়া দেবেন। আশা করি, তুমি আমার পরিবারকে জলে ফেলিয়া দিবে না।

আর তাহার সহিত আরো একটি আবদার করিতে অবকাশ লহিলাম। নিখিলেশ, আমি এখানে খুলনায় আসিয়াছিলাম, আমার পরিবারকে কলিকাতায় লইয়া যাইবার কারণে। কিন্তু এই স্থানে আসিবা মাত্র, আমি লক্ষ করিতেছি, কিছু বন্দুকধারি আরএসএস কর্মী আমাকে ফাঁকা স্থানে একাকী পাইতে আগ্রহী। এই কর্ম কার, আমি তা জানি, আর তাই আমি ইহাও জানি যে, আমাকে ইহারা কলিকাতায় পৌছাইতে দেবেন না; তার পূর্বেই আমার মৃত্যু নিশ্চিত করিবেন ইনারা।

তাই নিখিলেশ, আমার পরিবারের সহিত, আমার হবু পত্নী, শ্রীমতী সুমিত্রা লাহিড়ীর দায়িত্বও গ্রহণ করিও। আমার এই পত্রখানি তাহাকে দিও না; কারণ এই পত্রখানি তাহাকে দিলে, তিনি তোমাকে কখনোই স্বীকার করিবেন না। এই পত্র না দিইলে, তিনি আমাকে ভুল বুঝিবেন, তা বুঝুন। কিন্তু সত্য জানিলে, তাহার জীবন হইতেই মন উঠিয়া যাইবে। আশা করি, আমার মনসা তোমার নিকট স্বচ্ছ হইয়াছে।

স্নেহ নিও,

তোমার প্রিয় বন্ধু,

অমিয় চ্যাটার্জি।

আমার হাত থেকে চিঠিটা পরে গেল। … নিখিলেশ বাবু বলতে থাকলেন – উনার কাকার হাত থেকে চিঠিটি আমি পাই। … উনার আজ থেকে তিনদিন আগে, আরএসএসএর গুলির আঘাতে মৃত্যু হয়েছে। খুলনা ও ঢাকার মুসলমানরা, অমিয়বাবুর মা সহ সম্পূর্ণ পরিবারকে বাংলাদেশের সীমান্ত পর্যন্ত সযত্নে পৌঁছে দিয়েছেন। …

অমিয়বাবু বলেছিলেন, স্বামী পায়ের তলার মাটি, আর স্ত্রী সেই মাটির উপরের দেওয়াল। … সেই দেওয়ালের পায়ের তলা থেকে সেদিন মাটি সরে গেছিল। শ্যামাপ্রসাদকে সারা বাংলা কনোদিনও ক্ষমা করবে না। কিন্তু আমি নিজে তো তাঁর রক্ত চাইতে শুরু করে দিয়েছিলাম। যেই রক্ত সে আমার প্রাণের দেহ থেকে বইয়েছিল, সেই রক্ত আমি তাঁর হৃদপিণ্ড থেকে চুষে নিতে চেয়েছিয়াম।

নিখিলবাবু বললেন – যদি আগে চিঠিতা পেতাম, তবে যে ভাবে হোক, বড়লাটের সাথে যোগাযোগ করে, ব্রিটিশ সেনা নিয়ে গিয়েআমি অমিয়বাবুকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসতাম। কিন্তু হয়তো বঙ্গমাতার এমন ইচ্ছা যে এই দুই বাংলার ভাতৃত্বকে আরো মজবুত করে, তবেই তাঁদেরকে অখণ্ড রাষ্ট্র করবে। অমিয়বাবু এক বিশাল বাহিনীর সঞ্চার করছিলেন, সকলের নজরের আড়ালে, যারা অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র গড়ার দাবি দিয়ে সারা বিশ্বকে তোলপাড় করে দিতে পারতো। ওর এই অকাল মৃত্যুতে, আমরা সকলে ধ্বসে গেলাম। না আর আমাদের কারুর সাহস নেই, অমিয়বাবুর স্বপ্নকে এই মুহূর্তে বিশ্বদরবারের সামনে রাখার।

নিখিলবাবুর কথাগুলো আমি যে তখন শুনেছিলাম, তাই আমার মনে ছিলনা। আমি এক অনন্ত হতাশার মধ্যে পতিত হয়ে গেছিলাম। আমি অবিবাহিত হয়েও মনেপ্রাণে বিধবা হয়ে গেছিলাম, ঠিক যেমন পশ্চিমবঙ্গ পূর্ববঙ্গকে হারিয়ে বিধবা হয়েগেছিল। … আমি মুর্ছা যাই। যখন চোখ খুলি তখন অমিয়বাবুর মা আমার মাথার উপরে বসে।

প্রায় একটি বছর লেগেছিল, আমার অবসাদ কাটতে। ভারত ইতিমধ্যেই স্বাধীন হয়ে গেছিল। নেহেরুর ইন্ডিয়া তার খুশী মানিয়েছিল। ভালোই লাগে, এক ফোঁটাও রক্ত ভারতমাতাকে না দিয়ে, এমন উৎসব করতে। কিন্তু যেই বাংলা অসম্ভব রক্তবন্যা বইয়েছিল নিজেদের দেহথেকে, তারা নীরব। পূর্ববঙ্গকে হারিয়ে সে যে বিধবা। তাই তারা কনো খুশী মানাতে পারেনি। আনন্দ তাঁদের হৃদয়ে স্পর্শ করতে পারেনি। একটি বছর পরে, অমিয়বাবুর শেষ ইচ্ছার মান রাখতে, আমি নিখিলবাবুকে বিবাহ করি। …

মন থেকে মানতে পারিনি তাঁকে। তবে অমিয়বাবুর ছত্রছায়ায় এসে, নিখিলবাবু আর আগের নিখিলবাবু ছিলেন না। উনিও জানতেন, আমার মনের অবস্থা কিরকম। প্রায় আরো তিন বচ্ছর পর, আমি মা হই, দাদুভাই, তোমার বাবার জন্ম হয়। শুধুমাত্র বংশ রক্ষার জন্যই আমি মা হই সেইবার। … পরের বার মা হই অনেক বয়সে। তখন আমার বয়স প্রায় ৪৫। আর তাই তোমার ছোট পিসি এখন কেবলই ৫৭। তবে সেও অনেক বয়সে বিয়ে করে। …

অমিয়বাবুর ভবিষ্যৎবানী অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছিল। শ্যামাপ্রসাদ নেহেরুর কানভরেছিল, তাই বড় মন্ত্রিত্ব পেয়েছিল। কিন্তু সে নিজের সত্ত্বা স্থাপন করতে পারেনি। তাই আরএসএস-এর পাশাপাশি, সে আজকের যেই বিজেপি, সেই পার্টির উত্থাপন করে। … হয়তো, অমিয়বাবুর পরবর্তী ভবিষ্যৎবানীও সত্যই হয়েছে। শ্যামাপ্রসাদ মারা যাবার পরে, সে আবার বাংলার বিপরীতে জন্ম নিয়েছে। আর কেন বলছি সত্য হয়েছে হয়তো, কারণ সেই বিজেপির বিজয়রথও এই বাংলাতে এসেই ক্ষান্ত হয়, যেমন অমিয়বাবু বলেছিলেন।

আমি গেছিলাম শ্যামাপ্রসাদের সাথে দেখা করতে। যেদিন ওর মৃত্যু হয় সেদিনকে। আর সত্যি বলতে আমিই ওর হৃদস্পন্দন বন্ধ করার কাণ্ডারি। আমি তাঁর কাছে গেছিলাম নিখিলবাবুর সাথে। আর সেখানে গিয়ে আমি অমিয়বাবুর চিঠি দেখিয়ে বলি, আমার কাছে প্রমাণ আছে, তোমাকে খুনি প্রমাণ করার। বাংলার হত্যা তো তুমি করেইছো, আর তার কর্মফল তো তুমি সাতজন্ম ধরে বাংলার বাইরে জন্ম নিয়ে, বাংলায় দাঁড়াতে না পেরে পাবে, আর শেষে তোমার চোখের সামনে বাংলা ইন্ডিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবে, দুই বাংলা এক হবে, আর তোমারই শেষ জন্মের চোখের সামনে, বাংলা সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশরূপে স্থাপিত হবে। … কিন্তু আমার জীবন নষ্ট করার ফল, আমিই তোমায় দেব। … এই চিঠি নিয়ে আমি আইনের দ্বারস্থ হয়ে, তোমারই তৈরি করা ইন্ডিয়ার আইনে, তোমাকে জেল খাটাবো। … বড় সুনামের লোভ! বড় সত্ত্বার লোভ! … তোমার সমস্ত সুনাম, সমস্ত সত্ত্বা আমি ধুলায় মিশিয়ে দেব।

দ্বারস্থ হতে হয়নি আমাকে আইনের, কারণ সুনাম যাবে, সম্মান যাবে, আর সত্ত্বা যাবে, এই কথা শুনেই, উনার হৃদপিণ্ড ১৯৫১তে বন্ধ হয়ে যায়। … অমিয়বাবু সঠিক বলেছিলেন, নেহেরুজীর কান ভাঙিয়েছে এই বাংলার কুলাঙ্গার, শ্যামাপ্রসাদ। আর তাই, অমিয়বাবু যেমন বলেছিলেন, তেমন ভাবেই, যখন ওই রাবণ শ্যামাপ্রসাদ কংগ্রেস ছেড়ে নিজের পার্টি করে, তখন থেকে নেহেরুজি, ভারতকে সেকুলার করার জন্য উঠে পরে লাগেন, নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা শুরু করেন। … কিন্তু তাঁর পাপের প্রায়শ্চিত্ত সম্ভব নয়, তাই তাঁর জন্মভূমি, কাশ্মীর সদাসদার জন্য একটি কারাগার হয়ে রয়ে গেল, যা আজও রয়েছে, আর চিরকালই থাকবে।

হ্যাঁ দাদুভাই, নিখিলবাবুই তোমাদের ঠাকুরদা। আর তাই তোমরা সকলে চৌধুরী। …

ঠাম্মি নিজের কথা থামালেন। দাঁত খুলে জলে ভিজিয়ে দিলাম, ঠাম্মি ঘুমিয়ে পরলেন। আমার সারারাত ঘুম আসেনি। ভারতীয় সেনাতে যাবার ইচ্ছা আমার শেষ, হয়তো এই জন্মের জন্য নয়, সমস্ত জন্মের জন্য শেষ। ইন্ডিয়ার সেবা করার ভুতও মাথা থেকে নেমে গেছে। নতুন ভুত জেগে উঠেছে মাথায়, আর তা হলো এই বাংলার সেবা করা। … ঠাকুমার থেকে বাংলার ইতিহাস যা জানলাম, তা আমি জনেজনে বলবো। বলবো বাঙালীর স্বপ্নই এই যে তাঁরা অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র হবে। বলবো, ৭৫ বছর ধরে ইন্ডিয়া বাংলাকে লুণ্ঠন করে চলেছে, সেই কথা। বলবো, বাঙালীকে ধারণ করার সামর্থ্য বা অধিকার কনোটিই ইন্ডিয়ার নেই, সেই কথা। বলবো ইন্ডিয়ান হয়ে নই, আমি বাঙালী হয়ে গর্ববোধ করি , কারণ এই বাংলা সারা পৃথিবীর সবচাইতে বিরল মানবজাতি।

আর উচ্চ কেন্দ্রীয়সরকারি পদে চাকরি পাবার আশাও রাখিনা, ইচ্ছাও রাখিনা। সঙ্গে সঙ্গে, আমার এনডিএর ইচ্ছাও চলে গেছে। হ্যাঁ মুসলমান বন্ধু আমার আগেও ছিল, আর তাদের অনেকে আমার খুবই কাছের বন্ধু। তবে মন থেকে আমার তাঁদের প্রতি ঘনিষ্ঠতা অনেক বেড়ে গেছিল। ঠাম্মি আর বেঁচে নেই। তবে আমি নিশ্চিত, তিনি আবার এই বাংলাতেই কোথাও না কোথাও জন্ম নেবেন। এই বাংলার প্রতি উনার ভালোবাসা আমি উনার চোখেমুখে সর্বত্র দেখেছি। যেদিন আমাকে তিনি এই কথার বিবরণ দিয়েছিলেন, সেদিন প্রায় ৪ ঘণ্টা টানা আমাকে সেই বিবরণ দিয়েছিলেন, যাতে তাঁর নিজের প্রেমকথা তো ছিলই, সঙ্গে ছিল সম্পূর্ণ বঙ্গভঙ্গ কথা, সম্পূর্ণ বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস।

আর মজার কথা এই যে, ঠাম্মিকে না তো এর আগের ১০ বছরে কোনদিন এতক্ষণ টানা কথা বলতে শুনেছি, আর না এর পরে, তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। আজ আমি প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ভাবে। আমার বিয়ের তজ্জরি চলছে, আমারই প্রেমিকার সাথে। আমার প্রেমিকা, সত্যিই খুব গর্ব হয় তাঁর কথা বলতেও। যেদিনকে আমার মধ্যে এনডিএর প্রতি অনীহা দেখেছিল, সেদিনই আমার প্রস্তাবে সারা দিয়েছিল। আর আমাকে প্রশ্নও করেছিল, আমার এই পরিবর্তন কার কারণে। আমার ঠাম্মির ব্যাপারে বলতে, তাঁর কাছে ছুটে এসেছিল, বাংলার কথা জানতে। আমার প্রেমিকা যে এতবড় বঙ্গপ্রেমি, সেটা আমার জানা ছিল না।

কিছুদিন পরে আমার সাথে তাঁর বিয়ে। আর আজ আমি তাঁকে ভালোবাসার সাথে সাথে সম্মানটা একটু বেশি করি। এখানেও ঠাম্মির একটা কথা মনে পরে গেল আমার। তহ্নিকে ঠাম্মি প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি দাদুভাইকে সম্মান করো তো! ভালোবাসা না থাকলেও সংসার করা যায়, কিন্তু সম্মান না থাকলে, সংসার করা যায়না। দেখছোনা, দক্ষিণভারত আর বাংলাকে নিয়ে ইন্ডিয়া সংসার করতে পারছে না, … (ফোগলা দাঁতে হেসে বললেন) সম্মানটা নেই যে!

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8