সপ্তম পর্ব – দেশভাগ
অমিয়বাবুর এনালিসিস ১০০ শতাংশ সঠিক ছিল। আমেরিকা ভয়ানক শক্তি হয়ে সামনে এলো পৃথিবীর রাজনীতিতে। নেতাজিকে অন্তর্ধানে যেতে হলো। আর তার ঠিক পরপরই, মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে না হতেই, ব্রিটিশ দেশছাড়ার কথা বলতে শুরু করলো। আর সঙ্গে সঙ্গে নেহেরুজি বলে উঠলেন, দেশ স্বাধীন হলে, মুসলমানকে এই দেশে মাইনরিটি হয়ে থাকতে হবে।
সেই কথায় মুসলিম লিগের প্রধান, মহম্মদ আলি জিন্যা গেলেন খেপে। উনি ব্রিটিশের কাছে বললেন, ৪০ কোটির দেশে, মুসলমানের সংখ্যা ১০ কোটিরও বেশি। মুসলিম লিগের সমর্থক ২০ কোটিরও বেশি। সেখানে দাঁড়িয়ে, আমরা মাইনরিটি হয়ে থাকতে পারবো না। যদি এমনই মনসা হয় কংগ্রেসের, তবে আমাদের আলাদা দেশ দেওয়া হোক।
ব্রিটিশ সেই কথাতে রাজি হলে, বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকে মত চাইলেন দেশভাগের পক্ষে আর বিপক্ষে। গান্ধীজী বললেন, দেশ ভাগ হলে আমার মৃতদেহের উপর দিয়ে হবে। কিন্তু কংগ্রেস আদাজল খেয়ে লেগে রয়েছে দেশভাগের পক্ষে, বিশেষ করে কংগ্রেসের মাথার দিকের নেতারা। আর এরই মধ্যে, অমিয়বাবু আমার উদ্দেশ্যে – আমাকে খুলনা যেতে হবে। দেশভাগাভাগি শুরু হয়ে গেলে, সব জায়গায় হই হট্টগোল লেগে যাবে। আমার মায়ের, কাকার, কাকিমার বয়স হয়েছে। উনারা ধকল সইতে পারবেন না। তাই দেশ ভাগের আগেই, আমাকে উনাদের নিয়ে আসতে হবে। তোমাকে কি বলেছিলাম মনে আছে তো! … যাও, বাংলার প্রাইম মিনিস্টার, সুরাওারদি সাহেবের সাথে দেখা করো, আর উনাকে এই অখণ্ড বাংলারাষ্ট্রের প্রস্তাব রাখতে বলো। যদি প্রয়োজন পরে, উনাকে উনার স্বার্থও দেখাবে যে, বাংলা রাষ্ট্র হলে, সেখানে মুসলিম লিগই সরকার গড়বে। … যাও দেরি করো না।
অমিয়বাবু চলে গেলেন খুলনা, আমি দেখা করতে চাইলাম সুরাওারদি সাহেবের সাথে। প্রায় একমাস চেষ্টা করে, একটা দিন পেলাম, উনার সাথে দেখা করার। যা বলেদিয়েছিলেন অমিয়বাবু, তাই বললাম। উনি আমার কথা মনোযোগ সহকারে শুনলেন, আর তারপর বললেন – যদি বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব কেউ তোলে, তখনই আমি এই প্রস্তাব তুলবো। তার আগে আমি দেশ ভাগের পক্ষে থাকবো না। এই দেশ আমাদের সকলের দেশ। আমরা সকলে মিলে এই দেশকে স্বাধীন করেছি। আমি তো মনে করি, এই সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশের উপর যতটা অধিকার মধ্যভারতের আছে, ততটা অধিকার আছে পাকিস্তান, মুলতান, সিন্ধেরও, আর সব থেকে বেশি অধিকার আছে এই বাংলার আর সমস্ত বাঙালীর, কারণ এই স্বাধীনতা সংগ্রামের মুল ধ্বজা তো এরাই ধরেছিল। তাই, আমি বঙ্গভঙ্গের কথা আগেভাগে বলে, আমি আমার বাঙালী ভাইবোনদের এই স্বতন্ত্র ভারতের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবো না।
আমি উনাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে, আমরা স্বতন্ত্র দেশ হয়ে গেলেই ভালো হবে। ভারতকে ঋণে জর্জরিত করে দেবে আমেরিকা। আমরা স্বতন্ত্র দেশ হয়ে গেলে, সেই ঋণের বোঝার থেকে মুক্ত থাকবো, আর আমরা নিজেদেরকে স্বাধীন ভাবে গড়তে পারবো। …
উত্তরে তিনি বললেন – আমরা শুধু বাংলার স্বাধীনতার জন্য তো লড়াই করিনি, করেছি সম্পূর্ণ ভারতের স্বাধীনতার জন্য। যদি ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয় আমাদের উপর, তবে আমরা সবাই মিলে সেই ঋণ শোধ করবো। … এই বাংলা সারা ভারতের উপার্জনের সব থেকে বড় ভাগ প্রদান করে। প্রায় ৩৫ শতাংশ ভারতের অর্থনীতি এই বাংলার উপর দাঁড়িয়ে। … যদি এই বাংলা ভারতের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে ভারত অতি সহজেই সেই ঋণ শোধ করে দিতে পারবে।
আমি বললাম – ঠিক বলেছেন, কিন্তু তা তখনই সম্ভব হবে, যখন বাংলা অখণ্ড থাকবে। … যদি বাংলা অখণ্ড না থাকে, আর যদি বাংলার একটা ভাগকে ভারতের বাইরে করে দেওয়া হয়! তখনও কি ছবি একই রকম থাকবে! … দয়া করে এই বাংলাকে ভাগ হতে দেবেন না! … আপনি ভালো করেই বাংলাকে জানেন। … এখানে কি হিন্দু-ইসলাম ভাগাভাগি আছে!
উনি আমার এই কথা মানতে নারাজ ছিলেন, তাই এবার আমি বললাম – শুনুন, আমার আরো একটি পরিচয় আছে, আর তা হলো আমি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মাস্তুত বোন। আমি জানি আমার দাদা, জায়গায় জায়গায় গিয়ে, বিভিন্ন জমিদারদের, বিভিন্ন এমএলএ দের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে বাংলা ভাগ হলে সকলের কি লাভ হবে।… হিন্দু জমিদারদের বোঝাচ্ছেন যে বাংলা ভাগ হয়ে গেলে, বাংলার প্রাইম মিনিস্টার হিন্দু হবে। আর মুসলমান এমএলএদের কাছে গিয়ে বলছেন যে বাংলা ভাগ না হলে, হিন্দু জমিদাররা কিছুতেই মুসলমান প্রাইম মিনিস্টারকে মানবে না। আর এই ভাবে উনি নিজের ঘুটি সাজাচ্ছেন, বাংলা ভাগের জন্য। … আপনি তো জানেনই উনি কতটা মুসলমান বিরোধী। কিন্তু এটা জানেন না যে উনি মুসলমান বিরোধী, তার কারণটা হলো মুসলিম লিগ। মুসলমানদের উনি ঘৃণা করেন, কারণ মুসলমান উনাকে ক্ষমতায় আসীন হতে দেন না, আর উনি ভয়ানক ক্ষমতালোভী। … তাই দয়া করে আপনি হাতের উপর হাত রেখে বসে থাকবেন না। কিছু করুন। অন্তত আপনি নিজের দিক থেকে ঘুটিটা সাজাতে শুরু করুন।
উনি আমার সমস্ত কথা শুনে, আমাকে সেদিনকে বিদায় দিলেন। আর তার কিছুদিন পরেই, দেশভাগের তিনটি আলাদা আলাদা খসরা জমা পরলো। প্রথমটি ন্যাসানাল কংগ্রেসের তরফ থেকে। সেখানে বলা হলো, ডিভাইড ইন্ডিয়া অ্যান্ড নট বেঙ্গল; একই কথা বলল মুসলিম লিগ। বিপরীত কথা বললেন শ্যামাপ্রসাদ। উনি বললেন, যদি ভারতকে হিন্দু আর ইসলামের মধ্যেই ভাগ করা হয়, তবে বেঙ্গল কেন ভাগ হবেনা। যেমন পাঞ্জাব আর সিন্ধে ৫০ শতাংশ ইসলাম, তেমন বেঙ্গলেও ৫০ শতাংশ ইসলাম। আর সেই কথা পাবলিশ হতেই, আমাদের বেঙ্গলের প্রাইম মিনিস্টার সুরাওারদি সাহাব লিখলেন, সম্পূর্ণ বাংলাকে অখণ্ড রাষ্ট্র ঘোষণা করে দেওয়া হোক।
সুরাওারদি সাহেবের এই মন্তব্য পরের দিন খবরের কাগজে আসতেই, বাংলায় একটা উৎসব শুরু হয়ে গেল, যে তারা একটা আলাদা রাষ্ট্র হতে চলেছে। সাধারণ মানুষ, হিন্দু ইসলাম নির্বিভেদে সেই উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে উঠলেন। সেদিন আমি অমিয়বাবুকে বড্ড দেখতে চাইছিলাম। উনি এখানে থাকলে কতই না আনন্দ হতো।
কিন্তু কথা এই যে ব্রিটিশ সরকারের কাছে, মুসলিম লিগ আর কংগ্রেস একই সঙ্গে সুরাওারদি সাহেবের এই মন্তব্যকে খারিজ করে দিলেন। সুরাওারদি সাহাব তখন খুব তড়িঘড়ি করে উঠলেন। আর সেই সময়ে একদিন নেহেরুজি, বল্লভভাই প্যাটেলজি, আর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি মিটিং রাখলেন মাউন্টব্যটন সাহেবের সাথে। কি কথা হলো বন্ধ ঘরে জানিনা। কিন্তু পরের দিন খবরের কাগজে বার হলো একটা বিচিত্র কথা, বেঙ্গল লেজিস্লেটিভ এসেম্বলির সদস্যদের দুই ভাগে ভাগ করে, তাদের মধ্যে ভোটাভুটি হবে। নেহেরুজি বলেছেন যে, যদি এই দুই ভাগের একটি ভাগেও বঙ্গভঙ্গের আবেদন ভোটে যেতে, তবে বঙ্গভঙ্গ হবে।
এ কেমন কথা! … আর সব থেকে বড় কথা এই যে, এই দুই ভাগ ভাঙাই হয়েছে বিচিত্র ভাবে। একটি ভাগে ৮০ জন, আর অন্য ভাগে ১৪৫ জন! … সমান ভাগে ভাঙা হলোনা কেন? … আমি জানি শ্যামাদা জমিদারদের আগে থেকেই বুঝিয়ে রেখেছেন এই বিষয়ে। মানে এই ভোটটা শুধুই লোকদেখানি! শ্যামাদা ঘুটি সাজিয়েই রেখেছেন। তাই এই ভটের ফলাফল কি হতে চলেছে, তা কেউ না জানলেও আমি জানি। …
আমি খুব ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। এখনো অমিয়বাবু এলেন না কেন? … না, আর অপেক্ষা নয়। দেশ ভাগাভাগির সাথে সাথে, বাংলা ভাগও হবে। কিছুতেই আটকানো যাবেনা। … অমিয়বাবুর তো এতক্ষণে এসে যাবার কথা খুলনা থেকে। … উনি যদি এই ভাগাভাগির মধ্যে আটকা পরেন, তবে তো ঘোর বিপদের মুখে পৌঁছে যাবেন। … আমার আর কনো পিছুটান নেই। বাবা বেঁচে নেই, মা-ও নেই। … তাই আমি নিজের ব্যাগ গুছিয়ে, শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেন ধরবো, ঠিক করলাম। আমাকে ঢাকা পৌছাতে হবে।
কিন্তু আমি সমস্ত কিছু গুছিয়ে বেরবার আগেই, হয়ে গেল সেই ঐতিহাসিক অঘটন। যেমন আমি জানতাম যে শ্যামাদা তাঁর নিকৃষ্ট চাল চেলে, জমিদারদের বঙ্গভঙ্গকে স্বাকার করার জন্য সমস্ত কিছু করেছিল, তার প্রতিফলন পরলো সেই দুই ধূর্তামি পূর্ণ ভোটে। ১৪৫ জনের করিডরে, বঙ্গভঙ্গ মাত্র ৩৫টি বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভোট পরলেও, ৮০ জনের করিডরে, ৫৪ জন বঙ্গভঙ্গকেই মেনে নিলো। ব্রেনওয়াস তো শ্যামাদা আগেই করে রেখেছিল সকলের। আর সঙ্গে সঙ্গে নেহেরুজী এবং তাঁর কোম্পানিকেও। নেহেরুজিকে কি সুন্দর ভাবে ব্রেনওয়াস করেছিল এই সর্বকালীন বাঙালীর শত্রু, শ্যামা চরণ মুখার্জি তার প্রতিফলন তো এই ৮০ আর ১৪৫এর অসম ভোটাভুটির ব্যবস্থায়ন দেখেই বোঝা যায়, আর তার ফল প্রত্যক্ষ করে শ্যামা চরণ মুখার্জির আসুরিক চরিত্রকে।
সারা বাংলা সেদিন নিস্তব্ধ হয়ে গেছিল। সকল ফাতিমা, নুস্রত, জাঁকির, ইফ্রানের চোখে জল; সকল সুমিত্রা, সাবিত্রী, অসীম, আকাশদের চোখে জল। জন্মের পর থেকে আমরা একে অপরের বন্ধু ছিলাম। একে অপরের আত্মীয় ছিলাম। আমরা তাঁদের ঈদে যেতাম; তাঁরা আমাদের দুর্গাপূজাতে প্রাণ খুলে আনন্দ করতো। ঈদে আমরাও নতুন জামা পরতাম, আর দুর্গাপুঁজাতে তাঁরাও। … বিসর্জনের কোলাকুলি তাঁরাও করতো। মা দুর্গা চলে যাচ্ছেন, তাই চোখে জল তাঁদেরও আসতো। হাসানহুসেনের মৃত্যুতে আমাদেরও চোখে জল আসতো। … আর আসবে নাই বা কেন, আমরা যে কখনোই আলাদা ছিলাম না। কেউ আমাদের আলাদা ভাবতেই শেখায় নি। … কেউ আমাদেরকে এমন মানতেই শেখায় নি যে ওরা-আমরা করতে, আমরা যে সর্বদা, সর্বক্ষণ আমরাই ছিলাম, ওরা-আমরা তো কোনদিনই ছিলাম না।
আমরা ওদের থেকে শিখেছি, ঈশ্বর যা দিয়েছেন, তাঁতে সন্তুষ্ট থাকতে; আর ওরা আমাদের থেকে শিখেছে, সকলকে ভালোবাসতে। দাদুভাই, আজ এতবছর হয়ে গেছে, আমাদেরকে রাজনৈতিক ভাবে শ্যামাপ্রসাদ আর তাঁর প্রভাবে আসা, নেহেরু কোম্পানি আলাদা করে দিয়েছে, কিন্তু আমরা তাও ভুলি নি, আমরা ওদের থেকে যা শিখেছি; আর ওরাও ভোলেনি, কারণ আমরা আজও মন থেকে আলাদা হতে পারিনি। আমরা হিন্দু নই, ওরাও মুসলমান নয়, আমরা বাঙালী। … আর কেন ভুলিনি জানো? কারণ আমরা সকলে সেই বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্ত নেবার দিন মনে মনে শপথ নিয়েছিলাম, ওরা খেয়েছিল কসম। কি কসম?
এই কসম যে, আমরা দুই বাংলা, মা গঙ্গার দুই চরণ বহন করি, হুগলী ও পদ্মা। … যতদিন না মা গঙ্গার এই দুই চরণকে আমরা এক করে দিচ্ছি, ততদিন আমরা মা গঙ্গার দিকে সঠিক ভাবে চোখ মেলাতে পারবো না। … যতদিন না, মা গঙ্গার এই দুইচরণকে ভাগ করে দেওয়া অসুর, শ্যামাচরণের মানসিকতা ভারতব্যাপী হয়ে পুনর্জন্ম নেবেনা, আর আমরা তাঁর নাশ করবো না, ততদিন আমরা মা গঙ্গাকে তাঁর এই চিরশত্রুর থেকে মুক্ত করতে পারবো না, আর ততদিন আমরা মা গঙ্গার দিকে নজর মেলাতে পারবোনা। তাই আমরা শপথ নিই, ওরা কসম খায়, যতদিন না এমন হচ্ছে, ততদিন আমরা মুখ বুঝে সহ্য করবো, আমাদের এই যন্ত্রণা।
বিশ্বের সব থেকে তীব্র অনুভবশক্তি যেই জাতির, সেই বাঙালী জাতির বুক চেরার ক্ষমতা কারুর নেই। যতই রাজনীতি করো না কেন, যতই সাম্প্রদায়িকতার নোংরা বিষ ছরাও না কেন, আমরা বাঙালী; সারা পৃথিবীর সব থেকে অধিক অনুভব শক্তিধারি জাতি আমরা। আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। আমাদের ভাষা এক, আমরা দুইজনেই খাদ্যরসিক, আমরা দুইজনেই ঘুরতে বেড়াতে, জগত দেখতে ভালোবাসি, আমরা দুইজনেই বই পড়তে ভালোবাসি, জানতে ভালোবাসি, যা সারা পৃথিবীর অনুভব করার ক্ষমতা নেই, তা জেনে, উপলব্ধি করে, আমরা কবিতা লিখতে, সাহিত্য গড়তে, সঙ্গীতের তালে তাদের সাজাতে ভালোবাসি। আমরা চিরকাল একই থাকবো, আর এই শপথ আমরা সেদিন মনে মনে নিয়েছিলাম।
হ্যাঁ দাদুভাই, তাই ওদেরকে আমাদের শেষবার কোলাকুলি করে যেতে হয়েছিল। আমরাও যতটা পেরেছিলাম ওদেরকে আগিয়ে দিয়েছিলাম, আর শেষ বেলায়, আমরা একে অপরের চোখের জল মুছিয়ে দিই। হ্যাঁ ওরা আমাদেরকে আমাদের শপথ মনে করিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দেয়, আর আমরা ওদেরকে ওদের কসম মনে করিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিই।
আমরা সকলেই ভারতমাতার সন্তান। ভারত আমাদের মা। যেমন মায়ের অভিশাপ থেকে সন্তান বাঁচতে পারেনা, তেমনই সন্তানের অভিশাপ থেকেও মা বাঁচতে পারেনা। সেদিন সারা বাংলার সকলে কেঁদেছিল, আর ৫ কোটি মানুষের ক্রন্দন ভারতমাতাকে অভিশাপ দিয়েছিল যে, যেই রাজনৈতিক স্বার্থকে তিনি আস্কারা দিয়ে, পৃথিবীর সবথেকে অনুভবি জাতীর সব্বাইকে তিনি কাঁদিয়েছেন, সেই কান্না তাঁকেও ততদিন কাঁদতে হবে, যতদিন ভারতমাতার বুকে একটিও রাজনৈতিক দল অবশিষ্ট থাকবে, কারণ প্রতিটি রাজনৈতিক দল কেবলই মুখোশ পরে থাকবে। মুখে তাঁরা ভারতমাতার জয়গান গাইবে, আর বাস্তবে ভারতমাতাকে অহোরাত্র লুণ্ঠন করবে।
ওই যে বললাম, সন্তানের অভিশাপ থেকে মা বাঁচতে পারেনা। ভারতমাতাও সেই অভিশাপ থেকে বাঁচেন নি, আর কেন বাঁচেননি জানো? কারণ বাঙালী ভারতমাতাকে অন্তর থেকে ভালোবাসে, রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ভালোবাসার মুখোশ পরে থাকা জাতি, বাঙালী নয়। … যাইহোক, দুই বাংলাই গরীব হয়ে গেল, কারণও খুব স্বাভাবিক, মা গঙ্গার যেই দুই চরণ আমাদের বাংলা বহন করতো; সেই দুই চরণ, হুগলী আর পদ্মা আলাদা হয়ে গেল। আমরা আর একসাথে তাঁর দুইচরণ ধরে আরাধনা করতে পারলাম না, আমাদেরকে আলাদা আলাদা করেই সেই চরণবন্দনা করতে হলো। তবে আমরাও জানতাম, ওরাও জানতো, না তো আমরা মা গঙ্গার চরণবন্দনা বন্ধ করবো, আর না ওরা করবে। … এ এক অদ্ভুত বিশ্বাস দাদুভাই, আর এই বিশ্বাসের কারণ এই যে, আমরা তো আলাদা নয়ই, না কনোকালে ছিলাম, আর না কনোকালে হবো।
হ্যাঁ গরীব হলাম আমরাও, কারন আমাদের বেশির ভাগ ক্ষেত, ফসল চলে গেল। গরীব ওরা তো আমাদের থেকেও বেশি হলো, কারণ ওদের সমস্ত কলকারখানা চলে গেল। … লুণ্ঠিত আমরা দুইজনেই হলাম। আমাদেরকে বাকি রাজনৈতিক সত্ত্বালোভী ভারত লুঠতে লাগলো, আর ওদেরকে তো পূর্বপাকিস্তান করে দেওয়া হলো, তাই বাকি ভারতের মত একই মানসিকতা রাখা রাজনৈতিক সয়তানরা লুঠতে থাকলো। … কিন্তু কর্মফল যাবে কোথায়! … আমরা তাঁর সহায়ক হই বা না হই, সেই রাবণকে, অর্থাৎ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে খারিজও তো করিনি। … তাই আমাদের সম্পূর্ণ বাংলার, আমাদের অখণ্ড বাংলার দুঃখের কারণ হলাম আমরা, আর দুঃখের ফললাভ করলো ওরা। … আর তাই, ১৯৭১এর পর, ওরা মুক্তিযুদ্ধ করে, পাকিস্তানের লুণ্ঠনের থেকে মুক্ত হয়ে গেল, কিন্তু আমরা আজও ইন্ডিয়ার দ্বারা লুণ্ঠিত হয়েই চলেছি।
ভারত শব্দটি ব্যবহার করলাম না দাদুভাই। ভারত আমাদের সকলের মা। মা কখনো সন্তানকে লুণ্ঠন করার কথা ভাবতেও পারেন না। তাই আমাদেরকে ভারত লুণ্ঠন করেনও নি, আর করবেনও না। আমাদের লুণ্ঠন করেছে, রাজনীতির কালিমামণ্ডিত ভারত, যার নাম ইন্ডিয়া। আর সেই লুণ্ঠন আজও পুরো দমে চলছে। আজও বাঙালীদের থেকে গলায় আঁকশি দিয়ে কর আদায় করা হয়, কিন্তু বৃহৎশিল্পপতিদের এই রাজ্যে আসতে দেওয়া হয়না, আর পাঠালেও, এর ভূমি নষ্ট করার জন্য পাঠানো হয়। আজও এঁদের থেকে ধান, চাল, খনিজ, কলাশিল্প সমস্ত কিছু লুণ্ঠন করা হয়, কিন্তু এঁদের কনোকিছুর পারিশ্রমিক দেওয়া হয়না। দ্বিচারিতার সমস্ত সীমাই অতিক্রম করে গিয়ে, এঁদেরকে দাম তো মুখে দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে এঁদেরকে সেই দামের অর্থ দেওয়া হয়না।
আজও ঝড় ঝাপটা হলে, এই বাংলাকে ভিক্ষুকের মত ব্যবহার করা হয়। আজও এই বাংলার মানুষদের পারিশ্রমিক দিতে হলে, রাজনৈতিক ইন্ডিয়ানদের বুক কাঁপে। আজও বাঙালীদের সেই মানসিকতা, অর্থাৎ অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন, যা বাঙালী ভুলে গিয়ে ভারতের সেবা করার চিন্তা করেছিল, তা বাকি ইন্ডিয়ান রাজনীতিবিদরা ভোলেন নি। আর তাই, আজও কনো বাঙালীকে আইএএস করতে, আইপিএস করতে, এঁদের বুক কাঁপে। এই বাঙালীর নির্মিত আজাদ হিন্দ ফৌজের নিয়মশৃঙ্খলাকে চুরি করেই ভারতীয় সেনাকে শিক্ষিত করা হয়, কিন্তু বাংলা অখণ্ড রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে, এই ভয়ে, আজও বাংলা রেজিমেন্ট করা হয়না।
আজও এঁদের ভয় যায়নি যে, বাঙালী প্রাইম মিনিস্টার হলে, বাংলা অখণ্ড রাষ্ট্র গড়ে নেবে নাতো! তাই আজও দেশের প্রাইমমিনিস্টার হবার সব থেকে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব যদি বাঙালী হন, তবে তাঁর পিছনে পিছনে ষড়যন্ত্র করতে শুরু করে দেয়। কিন্তু এঁরা ভুলে গেছে, আমরা বাঙালী। ভারত আমাদের মা, তাই আমরা অন্য ভারতীয়দের সাথে, সম্পূর্ণ ভারতবর্ষের মানুষের সাথে দ্বিচারিতা, ষড়যন্ত্র, আর গায়েরজোয়ারি করবো না। তবে যেই অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র-এর স্বপ্নকে আমরা ভুলে গিয়ে, ভারতমাতার সেবা করতে এগচ্ছিলাম, সেই সেবাকে এঁরা প্রত্যাখ্যান করে, প্রতিমুহূর্তে বাঙলার অপমান করতে করতে, এঁরা আবার আমাদের সেই স্বপ্নকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। …
হ্যাঁ আমরা বাঙালী, আমাদের উদ্যম, আমাদের অনুভব, আর আমাদের সামর্থ্য কি, তার প্রমাণ আমাদের সাথেই আছে। এই বাংলার গানই আজ ভারতের জাতীয় সঙ্গীত; এই বাংলার মন্ত্রই সারা ভারতের জাতীয় মন্ত্র; এই বাংলার ধর্মচেতনাই সমস্ত ভারতের ধর্মচেতনা; এই বাংলার সেকুলারিজিমই, সমস্ত ভারতের সেকুলারাজিমএর মুলমন্ত্র। এই বাংলার ধান খেয়েই সমস্ত ভারতবাসী বেঁচে রয়েছে। এঁদের কলাবিদ্যাকে ভরসা করেই, সারা ভারত কিশোর, হেমন্ত, মান্না, সানু, শ্রেয়া, অরিজিতকে পেয়েছে। কিন্তু চিরকাল নয়। বাংলা আর বাঙালী এবার বুঝতে আর মানতে শেখা আরম্ব করে দিয়েছে যে, ভারতমাতা আমাদের মা হলেও, ইন্ডিয়া আর ভারতের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। বাংলা আর বাঙালী মানতে শুরু করে দিয়েছে যে, ইন্ডিয়া বাংলাকে লাভ করার যোগ্যই নয়। বাঙালী বুঝতে শুরু করে দিয়েছে যে, গঙ্গা মায়ের চরণ স্পর্শ করার অধিকার ইন্ডিয়ার নেই। একটি চরণ তাঁরা আগেই হারিয়েছে, যা এখন বাংলাদেশে পদ্মা হয়ে বইছেন। আর দ্বিতীয় চরণ এই হুগলীর চরণ ধরার অধিকার আর কিছু দশকের মধ্যেই ইন্ডিয়া হারাতে চলেছে।
আমরা আমাদের স্বপ্ন ভুলে, ইন্ডিয়াকে ভারত ভেবে সেবা করতে গেছিলাম। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদের ইন্ডিয়া, নেহেরুর ইন্ডিয়া আমদের ভ্রম ভাঙতে বাধ্য করছে। বাঙালীর ভ্রম ভাঙা শুরু হয়ে গেছে যে এটা ভারত নয়, এটা ইন্ডিয়া, এঁরা নোংরা রাজনীতি ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। এঁরা কলা, সাহিত্য, প্রেম, ভালোবাসা, স্নেহ, মাতৃত্ব, কিচ্ছু বোঝে না, আর বোঝার সামর্থ্যও ধরে না। বাঙালী এবার বুঝতে শিখে গেছে যে, পাকিস্তানের সাথে পূর্ববাংলাকে রাখা হয়েছিল যাতে তারা বাংলাকে লুঠতে পারে, আর পশ্চিম বাংলাকে ইন্ডিয়ার সাথে রাখা হয়েছিল যাতে শ্যামাপ্রসাদের আর নেহেরুর ইন্ডিয়াও বাংলাকে লুঠতে পারে।
পূর্ব বাংলা নিজেদের লুণ্ঠনকে অনেকদিন স্তব্ধ করে দিয়েছে। আর এবার পশ্চিম বাংলার সময় আসন্ন সেই লুণ্ঠন বন্ধ করার। মা গঙ্গার এই দুই চরণকে মা গঙ্গা মন ভরে সাজিয়ে রেখেছেন। যেমন খনি দিয়েছেন, তেমন ফসল; যেমন পাহার দিয়েছেন, তেমনই মালভূমি আর তেমনই সমুদ্র। তাই, এই দুই বাংলা নিজে নিজে রাষ্ট্র হতে চাইলেই হতে পারে, আর এমনিই বাঙালীকে আটকাবার সামর্থ্য সারা পৃথিবীর কারুর নেই। না তো ব্রিটিশের ছিল, আর না ব্রিটিশের এই পোলাপান মানে, ইন্ডিয়ার আছে।
হ্যাঁ, মা গঙ্গার দুই চরণ একত্রে থাকতে পারলে, সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গুপ্তধন হয়ে উঠত এই বাংলা, কিন্তু আমরা পূর্ববাংলার কাছে অপরাধী। না, তাঁরা হয়তো আমাদের অপরাধী মনে করেন না, কিন্তু আমরা নিজেদের অপরাধী মানা থেকে সরে আসতে পারছিনা। সেই অপরাধ বোধেই আমরা আমাদের ভাইদের কাছে বলার মুখ রাখিনা যে আমাদের তোমার সংসারে নিয়ে নাও। … কিন্তু যদি আমাদের সেই ভাই একবার আমাদের বলেন যে তাঁদের সংসারে চলে যাবার জন্য, তবে আমরা আবার মা গঙ্গার দুই চরণকে একত্রে ধারণ করে, সারা পৃথিবীর সব থেকে উর্বর দেশ হয়ে উঠবো।
এই দুই বাংলার কাছে যেই পরিমাণ সাহিত্য, কলা, সঙ্গীত, হস্তকলার বিদ্যা আছে, তা সারা বিশ্বের কাছে নেই। এই দুই বাংলার কাছে যেই খনিজভাণ্ডার আছে, তাতে দুই বাংলায় কনোদিনও বিদ্যুতের অভাব হবেনা। এই দুই বাংলার যা ফসল ফলানোর, যা ফল ও ফুল ফলানোর সামর্থ্য আছে, যা মৎস্য উৎপাদনের সামর্থ্য আছে, যা জাহাজ নির্মাণের সামর্থ্য আছে, তা সারা পৃথিবীর কারুর কাছে নেই। এই দুইবাংলার কাছে যা ভাতৃত্ববোধ, প্রেম, স্নেহ, আর উর্বর ভাষা ও সংস্কার আছে, তা সারা পৃথিবীর কনো দেশে নেই। এই দুই বাংলার হৃদয়ে যেই অনুভব শক্তি আছে, যেই সাবলীল দেশপ্রেম আছে, তা সারা বিশ্বে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর এই দুই বাংলা,র মধ্যে এমনই গহন ধর্মবোধ আছে, যা যেকোনো সাম্প্রদায়কিতার বীজ থেকে বটবৃক্ষকে মুহূর্তের মধ্যে উৎপাটন করার সামর্থ্য ধরে।
তাই দাদুভাই, ভারত ভেঙে পাকিস্তান ও ইন্ডিয়া হয়ে, পাকিস্তান পূর্ববাংলাকে ২৫ বছর লুণ্ঠন করেছে, আর ইন্ডিয়া পশ্চিম বাংলাকে খুব বেশি হলে ১২৫ বছর লুণ্ঠন করতে পারবে। … তারপর এই দুই বাংলা এক হবেই, অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র হবেই। আর সেদিন, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান বুঝতে পারবে যে ভারত যে ভারত ছিল, তা এই বাংলার জন্যই ছিল। আমি বললাম – ঠাম্মি, কিন্তু অমিয়বাবুর কি হলো?
