ষষ্ঠম পর্ব – ঈর্ষার ঘনঘটা
সাল ১৯৩৮। ভাইস রয় তখন স্যার লিনিথ গাউ। তাঁর আমলেই আমি গ্রাজুয়েট হয়ে, জিপিওতে চাকরি পাই। বেতন ৯০ টাকা। অমিয়স্যার আর আমার স্যার নেই, এখন তিনি শুধুই আমার অমিয়বাবু। আমি তাঁর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। না বলতে পারিনি মনের কথা, ভয় হয় পাছে আমার আকাঙ্ক্ষার বিপরীত কিছু বলে দেন।
আসলে বেশ কিছুবার আমি প্রশ্ন করেছিলাম উনাকে। আপনি তো নিশ্চয়ই বিয়ে থাওয়া করবেন, তা কেমন স্ত্রী কামনা করেন আপনি!
উত্তরে তিনি বলতেন, সাধারণ, খুবই সাধারণ। দেখতে শুনতেও সাধারণ, আর সাধারণ সাদামাটা পরিবার থেকে হবেন। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে আমাকে ঠিক মেনে নিতে পারবে না। আমি একটু বাউন্ডূলে ধরনের আসলে। ভূগোল পড়ানো আমার পেশা হলেও, ভূগোল আমার জীবন। যেখানে দেখি বা শুনি যে ভৌগলিক কিছু দেখার আছে, বা নতুন কিছু ভৌগলিক পরিবর্তন ঘটছে, সেখানে আমি ছুটে চলে যাই। আর আমার এমন স্বভাবের জন্য, আমার বেশভূষা ইত্যাদি সেই প্রকারের নয়, যা একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের ব্যক্তি দেখে অভ্যস্ত। তাই আমাকে সেই ব্যক্তির পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হবে।
এবার এমন উত্তর শোনার পর, আমার তো বলতেই ভয় লাগতো, আমি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি আর সারাজীবন আপনার সাথেই কাটাতে চাই। না বলতে পারিনি। তবে উনার সাথে সম্পর্ক অনেক বেশি গভীর হয়ে গেছে, এটা তো বলতেই হয়। আর সত্যি বলতে, যতই গভীর হয়েছে উনার সাথে সম্পর্ক, ততই বেশি উনার প্রেমে পরেছি আমি। উনার খাদ্যপ্রেম, জ্ঞানের প্রতি প্রেম, বাংলার প্রতি প্রেম, জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে উদার দৃষ্টিকোণ যা জ্ঞানদ্বারা উদ্ভাসিত, সব মিলিয়ে, আমি মনে মনে সম্পূর্ণ ভাবে উনার স্ত্রীই হয়ে গেছিলাম।
আর তার সাথে মনে মনে ভাবতাম, উনি তো আমার মনের সব কথা পড়ে ফ্যালেন, তা এই গভীর কথাটা কেন পড়তে পারছেন না! … যাই হোক, এইসবের মাঝে অনেক কিছুই ঘটে গেছিল। প্রথমত আমাকে অমিয়স্যার বললেন, এমএ কোর্সে ভর্তি হবার কথা। উনি বললেন, কেরানীগিরিতে আটকে থেকে, ঈশ্বর যে প্রতিভা তোমাকে দিয়েছেন, তা আটকে রেখো না। এমএ করো ভারতীয় ইতিহাসে, আর তারপর থিসিস করো বঙ্গইতিহাসে।
ব্যবস্থাও উনিই করে দিয়েছিলেন, স্কটিশ চার্চের নাইট কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন। এতে আমি চাকরিও করতে থাকলাম, আর পড়াশুনাও। এমএ শেষ হলো ১৯৪০ সালে। আর সেটা করতে করতেই আমি মনঃস্থির করে ফেলি, এবার আমার বয়স হচ্ছে, বিয়ের বয়স তো হয়েই গেছে। তাই, এবার আর দেরি না করে, অমিয়স্যারকে আমার মনের কথা বলতেই হবে। আমার মনে হয়, উনি আমার মনের কথা জানেন, কিন্তু উনি অপেক্ষা করছেন, কবে আমি সেই কথা উনাকে বলি, তার জন্য।
আমি গেছিলাম সেদিনকে উনার ঘরে, এই কথাই বলবো বলে। কিন্তু সেখানে গিয়ে অন্য এক চিত্র দেখলাম। দেখলাম, আমার দাদা, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সেখানে উপস্থিত আর অমিয় স্যারের সাথে কথা বলছিলেন। কথা বলার ভঙ্গি উগ্র, আর কথাগুলোও একটু আক্রমণাত্মক। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, ঘরের মধ্যে না ঢুকে, সমস্ত কথা শুনতে থাকলাম।
শ্যামা দা – অমিয়, তুমি আমার বোনের পিছনে কেন লেগে আছো, আমাকে একটু খুলে বলবে?
অমিয়বাবু – তোমার বোন একজন প্রতিভাশালী নারী। উন্নত মনের, উন্নত ভাবধারার, এবং বাংলার গর্ব হবার যথেষ্ট ভাবেই যোগ্য। হ্যাঁ লেগে আছি ওর পিছনে, যাতে ওকে ঈশ্বর যেই প্রতিভা দিয়েছেন, তা ব্যর্থ না হয়ে যায়, সেই কারণে।
শ্যামা দা – আর সেই অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?
অমিয়বাবু – যার জীবন, সে দিয়েছে। মানে তোমার বোন দিয়েছে।
শ্যামা দা – বুঝতে পারছি, তোমার সাথে সরাসরি কথা না বললে, তুমি বুঝবে না। আমার স্পষ্ট কথা হচ্ছে, আমার বোনের মাথাটা কেন খাচ্ছ! … ওর বিয়ে থাওয়ার বয়স হয়ে গেছ। তুমি জানো ওর বাবা ওর সাথে কথা বলেন না। কিন্তু কথা না বললেই বা, বাবা তো উনি, তাই মেয়ের বয়স হচ্ছে, কিন্তু মেয়ের বিয়ে হয়নি, সেই নিয়ে উনি কতটা চিন্তিত।
অমিয়বাবু – শ্যামা দেখো, আমি ওর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তেমন কথা বলিনা, যদি না ও নিজে সেই বিষয়ে কথা উত্থাপন করে। আর সাধারণত সেও এই সমস্ত বিষয়ে কথা উত্থাপন করেনা। … আর আমি ওঁকে কখনোই বিবাহ না করার কথা বলিনা, বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বামীস্ত্রীর একত্রে এগিয়ে চলার কথাই বলি। … তাই তোমার অভিযোগ এখানে সম্পূর্ণ ভাবে ভিত্তিহীন।
শ্যামা দা – আমার অভিযোগটাই আসলে তুমি বঝোনি অমিয়। আমার অভিযোগ এই যে, তুমি জানো নিশ্চয়ই যে সুমি, মানে আমার বোন, তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, আর সেটার কারণ তুমি নিজেই।
অমিয়বাবু – হ্যাঁ জানি, সে আমাকে একটু নয়, খুবই বেশি পছন্দ করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সে আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। সুমিত্রা এমন দুর্বল মেয়েই নয়। সে একজন বাস্তববাদী মেয়ে।
শ্যামাদা – তুমি আমাকে বোকা পেয়েছ, আসল ব্যাপার তো এই যে, তুমি নিজেই ওঁকে নিজের জীবনে পেতে চাও। দেখো বামন হয়ে চাঁদ ধরতে যেও না। সুমি একজন জমিদার কন্যা, আর তুমি খুলনার একটা নায়েবের ছেলে। … দেখো আমি তোমাকে সতর্ক করে দিচ্ছি এইব্যাপারে। তুমি কিন্তু আমার থেকে আমার বাবাকে এর আগেই ছিনিয়ে নিয়েছ। তিনি আমাদের বাবা হয়েও, আমাদের থেকে অনেক বেশি তোমাকে বিশ্বাস করেন, আর তোমাকে স্নেহ করেন। কিন্তু আমার বোনের ক্ষেত্রে তা হতে দেবনা।
অমিয়বাবু হেসে উঠে বললেন – শ্যামা, অধিকার স্থাপনের চেষ্টা … এইটাই তো তোমাদের মন্দবুদ্ধি। … তুমি বলো স্যার তোমাদের বাবা হয়েও, আমাকে বেশি স্নেহ করেন। কেন করবেন না! … তোমরা তো তাঁর আদর্শই গ্রহণ করো নি। তাঁর আদর্শই এই যে অধিকার স্থাপন করে অধিকার লাভ হয়না, আর যদি হয়ও, সেই অধিকার যেকোনো দিন হারিয়ে যেতে পারে। … কিন্তু তুমি সেই অধিকার স্থাপনের পিছনে ছুটে চলেছ! … নিজের কাজ করে যাও, ভালোবেসে যাও, স্নেহ করে যাও, আর নিজের মাতৃভূমিকে প্রেম করতে থাকো। … কর্তৃত্ব স্থাপন করার মনসা যদি রাখো শ্যামা, তবে ইতিহাস তোমাকে মনে তো রাখবে, কিন্তু রাম করে নয়, রাবণ করে।
শ্যামা – তারমানে তুমি মানছ তো, সুমির উপর তুমি জাদু করছো?
অমিয়বাবু – স্নেহ করি ওঁকে, হ্যাঁ খুবই স্নেহ করি। … আর তোমার বোনের মধ্যে এমন কনো অপগুণও নেই যার কারণে ওর উপর স্নেহ কম হয়ে যায়। তোমার বোন কারুর উপর কনো রকম কর্তৃত্ব স্থাপন করতে চায়না। সেও স্নেহ করতে চায়, গরীব বড়লোক, হিন্দু ইসলাম, সরকারি বেসরকারি, বাচ্চা বুড়ো, স্ত্রীপুরুষ, সকলের প্রতি ওর স্নেহ জন্মায়। এমন একজন ব্যক্তিত্বের কাছে থাকতে পারি আমি, সেটা আমার ভাগ্য, তাঁর নয়। আমি সুমিকে কখনোই বলিনা যে আমাকে অনুসরণ করতে, বরং আমি চাই যে সুমি এমন উচ্চতায় যাক যে আমি নিজে তাঁকে অনুসরণ করবো।
শ্যামা – আর আমার ক্ষেত্রে সেটা চাওনা কেন?
অমিয়বাবু – কারণ তুমি সত্ত্বার অভিলাষী। তুমি ক্ষমতার লোভী। এটা আমার কথা নয়, তোমার বাবার কথা। তাঁর কথা এই যে, তুমি বাংলাকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসো না। তাঁর কথা এই যে, তুমি রাজনীতি করছো, কেবল মাত্র সত্ত্বার লোভে। তুমি বাংলার প্রাইম মিনিস্টার যে একজন ইসলাম, ফজলুল সাহেব, সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারো না। তুমি অখণ্ড বাংলাকে অপছন্দ করো, কারণ তোমার মনে হয় যে বাংলা অখণ্ড থাকলে, এর প্রাইম মিনিস্টার সব সময়ে মুসলিম হবেন, আর তাহলে তো তুমি ক্ষমতায় বসতে পারবে না। তাই তুমি মনে প্রাণে বঙ্গভঙ্গ চাইছো। বুঝতে পারছো, এমন করে তুমি বাংলার সর্বনাশ ডেকে আনছ! … যেই বাংলা আজ সম্পূর্ণ ভাবে আত্মনির্ভর, কারণ কাঁচামালও এখানেই উৎপন্ন হয়, আর সেগুলোকে ফিনিসড গুডস করার কলকারখানাও এখানে, আবার সেগুলোকে এক্সপর্ট করার বন্দরও এখানেই, তাকে তুমি নষ্ট করে দিতে চাইছ!
আবার একটু থেমে, অমিয়বাবু বললেন – নিজের সত্ত্বাকে স্থাপনের লোভে, তুমি সম্পূর্ণ বাংলাকে খোরা করে দিতে চাইছ। তুমি একে দেশভক্তি বলতে পারো, কিন্তু দেশভক্তরা একে দেশদ্রোহীতাই বলে; আর যদি তুমি যা চাইছ, তা হয়ে যায়, তবে তুমি আজন্ম বাঙালীর কাছে বাঙালীর শত্রু বলেই চিহ্নিত হবে। … আর আরো জেনে রাখো শ্যামা। শেষমেশ তুমি কখনোই তুমি নিজের একচ্ছত্র সত্ত্বা স্থাপন করতে পারবে না, আর সেই কারণে তুমি যেই কংগ্রেসকে আঁকরে ধরে রয়েছ এই কারণে যে এই কংগ্রেস তোমাকে সত্ত্বা স্থাপন করতে দেবে, সেই কংগ্রেস ছেড়ে, তুমি নিজের দল করবে, কিন্তু সেই দলকে সত্ত্বায় স্থাপন তুমি করতে পারবেনা। … এটা বাংলা শ্যামা। এখানে রাবণ থাকতে পারেনা, কারণ এখানে ১২টি শক্তিপীঠ সবসময়ে পাহারা দিচ্ছেন।
শ্যামাদা – বেশ বেশ, আরো বলো। শুনতে ভালো লাগছে।
অমিয়স্যার – শ্যামা, আমি এমনি এমনি কিছু বলছিনা তোমাকে। তুমি এখন যেই মানসিকতায় নিজেকে আটকে রেখেছ, যদি এই মানসিকতাকেই স্থায়ী করে রাখো, তবে এটাই তোমার ভবিষ্যৎ হবে। তুমি এতটাই ক্ষমতালোভী যে, তুমি সেই নতুন পার্টিকে যতক্ষণ না সত্ত্বায় স্থাপন করতে পারবে, ততক্ষণ ছাড়বে না। তাই তুমি আবার জন্ম নেবে, বাংলার ঠিক বিপরীত দিশায়, আর নিজের আধিপত্য স্থাপনের জন্য কনো একজন মূর্খকে সিংহাসনে স্থাপন করবে। … কিন্তু আমার কথা স্মরণ রেখো, পারলে তখনও রেখো যে, এই বাংলাই তোমার সেই বিজয়রথকে আটকাবে; তোমার অশ্বমেধ যজ্ঞ এখানে এসেই থামবে, আর তারপর তুমি আর তোমার পার্টি সদা-সদার জন্য ইতিহাসের পাতাতেই আটকে থাকবে। … এটা আমার ভবিষ্যৎবানী, আর যদি আমি সত্যিই স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রিয় ছাত্র হয়ে থাকি, যদি তাঁর থেকে জীবনকে, ইতিহাসকে, রাজনীতিকে, আর বাংলাকে একটুও জেনে থাকি, তবে আমার এই কথা সত্য হবেই।
শ্যামাদা – বেশ, এবার আমার একটা ভবিষ্যৎবানী শুনে রাখো তুমি। না এটা আমি কারুর উপর নির্ভর করে বলছিনা তোমার মত। তুমি জানো ভালো করে যে আমি নিজেকে ছাড়া কারুকে বিশ্বাস করিনা। তাই আমি কেবলই নিজের উপর বিশ্বাস রেখেই কথাটা বলছি, শুনে রাখো। তোমার আর সুমির চারহাত আমি বেঁচে থাকতে এক হতে দেবো না। … এটা আমি হতে দেব না। … কিছুতেই হতে দেব না।
অমিয়স্যার – জানি কেন হতে দেবে না তুমি এটা। … তুমি জানো কি?
শ্যামাদা – বেশ বলো শুনি, কি জানো?
অমিয়স্যার – তোমার ধারণা, তোমার বোন সুমিত্রা লাহিড়ী রাজ্যরাজনীতিতে একদিন না একদিন আসবে। আর সে আসলে, তোমার এই স্বপ্ন, অর্থাৎ বাংলার অধিপতি হওয়া, সেটা কিছুতেই হতে দেবে না।
শ্যামাদা – না, সে এমনি এমনি আসবে না। সে বাংলাকে ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসা তোমার কারণে। তার রাজনীতির উপর কনো নজর ছিলোনা। কিন্তু তুমি আর বাবা মিলে ওর মধ্যে রাজনীতির বীজ স্থাপন করে দিয়েছ। আর তুমি যদি ওর হাত ধরে নাও, তবে ওঁকে তুমি রাজনীতিতে আনাবেই আর আমাকে আমার লক্ষ পুড়ন কিছুতেই করতে দেবে না।
অমিয়বাবু – আমি জানি, আমার কথা তুমি বিশ্বাস করবে না। তাও আমার কর্তব্য তোমাকে সত্য বলে রাখা। তাই বলছি শোনো, না তো স্যার, আর না আমি, সুমিত্রার মধ্যে রাজনীতির বীজ আমরা পুঁতিনি; আর না আমরা এমন ভাবে একজন সহজ সরল মেয়েকে এই পথে আনার কথা ভাবতে পারি। … সুমিত্রা ইতিহাসের ছাত্রী, আর রাজনীতি না জানলে ইতিহাসকে জানাই অসম্ভব হয়। আমাদের স্বপ্ন এই যে সুমিত্রা একদিন একজন নামকরা ঐতিহাসিক হন, যে বাংলার ইতিহাসকে ছবির মত সবার সামনে তুলে ধরবে। … আরো একটা কথা বলি, রাজনীতি করতে গেলে, সামান্য হলেও ধূর্তামি বুদ্ধি লাগে, কিন্তু তোমার বোনকে বোধহয় কিচ্ছুই চেন না। যদি জানতে তাহলে নিশ্চয়ই এটাও জানতে যে, সুমিত্রার মধ্যে না তো ধূর্তামি বুদ্ধি আছে, আর না ওর সরল শিশুর মত মনে ধূর্তামির কনো স্থান আছে। …
আবার একটু থেমে – এই কথা বলার পরেও, আমি তোমাকে যতটা চিনি, যতটা ঈর্ষা প্রবণ তুমি, আর যতটা সত্ত্বালোভী তুমি, তুমি এই কথাকে বিশ্বাসও করবে না, আর মানবেও না। … আমার এই শেষ কথাটা মনে রেখে দিও শ্যামা। কংস শুধুমাত্র কৃষ্ণ তাঁর হত্যা করবে, এই ভয়েতেই নিজের মৃত্যুকে নিশ্চিত করে ফেলেছিল। না কৃষ্ণকে নিজের শত্রু ভাবতো সে, আর না সে গকুলে বারবার আক্রমণ করতো, আর না কৃষ্ণকে সে বাধ্য করতো, তাঁকে শত্রু করে নিতে। … তাই শ্যামা, কারুকে অহেতুক নিজের শত্রু মেনো না, এতে সে বাধ্য হবে একসময়ে তোমাকে শত্রু মানতে। কথাটা যেমন তোমার বোন সুমিত্রার জন্য বললাম, তেমনই বাংলার ইসলাম প্রাইম মিনিস্টারের জন্যও বললাম।
শ্যামাদা – আমি যা বলার বলে দিয়েছি। অমিয়, আমার বাবাকে তুমি আমার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছ, আমি একটা কথাও বলিনি। কিন্তু আমার সত্ত্বাকে আমি আমার থেকে ছিনিয়ে নিতে কারুকে দেবনা। … এই আমার শেষ কথা।
সেই কথার পরে, আমি জুতার আওয়াজ পেয়ে, পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পরলাম। শ্যামাদা গটমট করে, আমার দিকে দৃষ্টিপাত না করেই চলে গেল। আমার দৃষ্টির সামনে থেকে উনি সরে গেলে, আমি বুকে বল পাই। উনার গাড়ির আওয়াজ দূরে চলে গেলে, আমি ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম অমিয়বাবু মাথায় হাত দিয়ে উনার ছোট্ট কাউচে বসে রয়েছেন।
আমি ঘরে ঢুকে বললাম – ভয় পেয়ে গেলেন নাকি, দাদার কথায়?
অমিয়বাবু চমকে উঠলেন আমার গলা পেয়ে। আমার দিকে হন্তদন্ত ভাবে এগিয়ে এসে, আমার কাঁধদুটো শক্ত করে ধরলেন। এতো বছরে এই প্রথম উনি আমাকে ছুঁলেন। উনি উৎকণ্ঠার সাথে এদিক সেদিক দেখতে থাকলেন। সেই দেখে আমি বললাম – শ্যামাদা চলে গেছেন। উনার গাড়ি ছুটে চলে গেছে অনেক দূর।
অমিয়বাবু – তুমি ওঁকে দেখেছ? ও তোমাকে দেখে নি?
আমি – আমি উনার চোখের সামনেই ছিলাম, কিন্তু এতটাই রেগে ছিলেন উনি যে, আমার দিকে তাকানও নি। … অমিয়বাবু আমার আপনাকে কিছু বলার আছে।
অমিয়বাবু – হ্যাঁ বলো।
আমি – অমিয়বাবু, দাদা কিন্তু একটি ঠিক কথাই বলেছেন। আমি কিন্তু আপনাকে নিজের স্বামীর আসনেই বসিয়ে ফেলেছি।
অমিয়বাবু – তুমি আমাদের কথা আড়াল থেকে শুনেছ! … বেশ, যখন শুনেই ফেলেছ, তখন তোমার দাদা কি বললেন, সেটাও নিশ্চয়ই শুনেছ। তিনি আমাদের চার হাত এক হতে দেবেন না। … তুমি হয়তো ঠিক করে জানো না, তোমার দাদা কতটা ভয়ানক। সে নিজের উদ্দেশ্য পূর্তি করার জন্য যেকোনো ধরনের ক্রাইম করতেও পিছুপা হয়না।
আমি – তারমানে আপনি ভয় পেয়ে গেছেন, তাই তো?
অমিয়বাবু – সুমিত্রা, যদি ভয়টা শুধু আমাকে দেখানো হতো, তবে আমি তার পরোয়া করতাম না। কিন্তু ওর প্রাইম টার্গেট তুমি। … না না … আমি তোমাকে এমন বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারিনা।
আমি – তারমানে, আপনি মানছেন তো, আপনি আমাকে স্নেহ করেন। সমস্ত বাঁধা কেটে গেলে অন্তত, আপনি আমাকে বিবাহ করতে রাজি তো!
অমিয়বাবু – আচ্ছা ঠিক আছে। আমি রাজি। কিন্তু যতক্ষণ তোমার বিপদ আসন্ন থাকবে, ততক্ষণ সেই বিষয়ে চিন্তাও করবে না, এই কথা তোমাকে দিতে হবে আমায়। আর সেই সময়টা নিজের ইতিহাসের চর্চাতে মনোনিয়োগ করবে, কথা দাও এটা।
আমি – নিশ্চয়ই করবো, আমার যে আর কিছুই চাওয়ার নেই অমিয়বাবু। আপনি আমাকে নিশ্চল ভালোবাসা দিয়েছেন। আমার থেকে আপনি কনোদিনও কিছু চানই নি। আপনি কিন্তু বরাবরই জানতেন যে আমি আপনার প্রতি দুর্বল। … কি জানতেন না! … তারপরেও কিন্তু আপনি সেই কথা যে জানেন সেটাও আমাকে বুঝতে দেননি, আর সেই জানার কারণে আপনি একটা পুরুষ যুবক একজন সুন্দরী যুবতির থেকে অনেক কিছুই আদায় করে নিতে পারতেন। কিন্তু আপনি সেই দিকে একবারের জন্যও তাকান নি, বরং সমানে আমাকে উচ্চতায় নিয়ে যাবার জন্য ব্যস্ত থাকেন। … আর আমার কিচ্ছু পাবার নেই অমিয়বাবু, খুব ভাগ্যবানই এমন নিশ্চল প্রেম লাভ করে জীবনে।
অমিয়বাবু – বেশ হয়েছে, প্রেমের বাখান করা। এবার ইতিহাসে মনোনিয়োগ করো।
আমি – সে তো করছি, কিন্তু দাদার কথা থেকে আমার একটা জিনিস মনে হলো, আর সেটা হলো বঙ্গভঙ্গ। সত্যিই কি বঙ্গভঙ্গ আবারও হবে! ১৯০৫এ তো সেই বিপদ কাটিয়ে দেওয়া গেছিল। আবারও! দুটি আলাদা রাজ্য হয়ে যাবে বাংলা! … এই ক্ষমতালোভীরা নিজেদের ক্ষমতা পাবার জন্য, বাংলাকে টুকরোটুকরো করে দেবে! … মুসলিম লিগকে তো বাঙালীই বিশ্বাস করে ক্ষমতা প্রদান করেছে। তাঁরা ক্ষমতা দিয়েছেন বলেই তো ফজলুল হক সাহেব সাহেব আমাদের এখন প্রাইম মিনিস্টার, তাই না! … নেতাজি যখন থেকে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ইস্তফা দিলেন, তখন থেকেই বাংলা কংগ্রেসের উপর বিশ্বাস করা বন্ধ করে দিয়েছে, আর তখন থেকেই মুসলিম লিগ ভোট একচ্ছত্র ভাবে জিতে আসছে। … আর সব থেকে বড় কথা এই যে, ফজলুল সাহেব আমাদের প্রধান মন্ত্রী, কিন্তু তিনি কি কনো অপশাসন করেছেন আমাদের উপর? সম্পূর্ণ বাংলা, সকল বাঙালী উনার ছত্রছায়ায় সুখেই আছেন!
অমিয়বাবু – দেখ, এই নিয়ে এখন কথা বলার সময় নয়। ব্রিটিশ এখন দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধের দামামা পেটাচ্ছে, আর সেই সময়ে নেতাজি ব্রিটিশকে বড়সর আঘাত আনতে আই এন এ ফর্ম করছেন। … এখনই বাংলা ভাগের কথা ব্রিটিশ ভাবছে না। … আর ব্রিটিশ যদি কনো ভাগাভাগির কথা না বলে, তবে এই ভাগ হবেই না। আর যদি তা না হয়, তবে আমাদের এই বিষয়ে চিন্তা করাই বৃথা। বরং আমাদের এবার চিন্তা করা উচিত যে, কি ভাবে বাংলার শাসনকে সঠিক করা উচিত, কারণ আমরা খুব তাড়াতাড়ি স্বতন্ত্রতার স্বাদ পেতে চলেছি।
আমি – কি বলছেন, আমরা স্বাধীনতা পেয়ে যাবো? … ব্রিটিশ আমাদের ছেড়ে দেবে? কিন্তু কি কারণে?
অমিয় – বিশ্বের দিকটা একটু দেখো সুমিত্রা। এটা ১৯৪১, বিশ্বযুদ্ধে এবারে একটি দেশের ভূমিকা খুবই বেশি, খেয়াল করেছ? সেটা হলো আমেরিকা। এই আমেরিকা কিন্তু ব্রিটিশদের মত নয়। এঁদের মধ্যে রোমান ভাবটা কম, আর ইহুদিভাবটা বেশি। … তাই এঁরা পিঠের পিছনে ছুরি মারতে ভালোবাসে। … আমেরিকার একটা আকাউন্ট ভালো করে আমরা পাই, স্বামী বিবেকানন্দের কথা থেকে। কি বলছে উনার জীবনী! … আমেরিকা এমন একটি দেশ যে মুখে মিষ্টি কথা বলে, আর পিছনে ছুরি মারে। … তাই বুঝতে পারছো, এবার কি হতে চলেছে। ব্রিটিশের আয়ত্ত্ব যত দেশ আছে, সকলকে স্বাধীন করে, এই বিশ্বযুদ্ধে অস্ত্রের মারণশক্তি প্রদর্শন করে, সকল দেশকে নিজের সুরক্ষার জন্য অস্ত্র কিনতে বাধ্য করবে।
আমি – কিন্তু সবে স্বাধীন হওয়া একটা দেশের কাছে এত পুঁজি কোথায় যে ওত দামি দামি অস্ত্র কিনবে?
অমিয় – এটাই তো! … ঠিক এটাই তো আমেরিকা! … সুমিত্রা, সেই পয়সা কারুর কাছে থাকবে না, তাই সবাইকে পয়সা ধার দেবে। আর সেই বিপুল টাকার ধার শতশত বছরেও পরিশোধ করতে পারবে না, অর্থাৎ! অর্থাৎ এই যে সেই শতশত বছর সেই সমস্ত দেশ পরাধীন না হয়েও পরাধীন হয়েই থাকবে। … ব্রিটিশরা একরকম ইউদি ছিল, যাদের দেশে সামগ্রীর অভাব, তাই অন্য দেশে পরে থেকে তাদের সামগ্রীকে তুলে নিয়ে যেত। কিন্তু আমেরিকা অন্য দেশ। ওদের কাছে সমস্ত সামগ্রী আছে, ওদের দরকার খালি ক্ষমতা আর পয়সা, অর্থাৎ আধিপত্য। … তাই চিন্তার বিষয় আমাদের এখন এই হওয়া উচিত যে, আমরা কি করে সেই বিপুল টাকা, যা আমাদেরকে ধার দেওয়া হবে, তা তাড়াতাড়ি পরিশোধ করতে পারবো।
আমি – কিন্তু আমার অন্য হাওয়া লাগছে অমিয়বাবু। আমার কেন জানা মনে হচ্ছে যে আমার দাদা একাই সত্ত্বার লোভী নন, এই সত্ত্বার লোভ নেহেরুজীরও রয়েছে। জ্ঞানীগুনি দুইজনেই, কিন্তু এই দুইজনেরই চোখে মুখে দেশপ্রেম কম আর সত্ত্বার লোভ বেশি দেখা যায়। … ভেবে দেখুন অমিয়বাবু, আমার দাদা যদি সত্ত্বার লোভে রাজ্যভাগ করতে রাজি থাকে, তবে নেহেরুজি সত্ত্বার লোভে দেশভাগ চেয়ে বসবেন না তো!
অমিয়বাবু – এটা কি বলছো সুমিত্রা! … যদি দেশ ভাগ চেয়ে বসেন, তবে তো বঙ্গভঙ্গ আবার উঠে আসবে, আর তা উঠে আসলেই, তোমার দাদা … না না, ভালো কথা বলো। এতো ঋণাত্মক হওয়া ঠিক নয়।
আমি – কিন্তু অমিয়বাবু, মুসলিম লিগের উত্থান, অনেকেরই মাথাব্যাথার কারণ। তারমধ্যে নেহেরুজিও যেমন রয়েছেন, তেমন বল্লভজিও আছেন, আর আমার দাদাও আছেন। … অন্যদিকে নেতাজি কংগ্রেস ছাড়ার পর যেন, পূর্ব ভারত আর কংগ্রেসের উপর ভরসাই রাখতে পারছেনা! … আর এতে বিশাল আপত্তি এই প্রমুখ কংগ্রেস নেতাদের।
অমিয়বাবু – তোমার কথা অনুসারে যদি দেশ ভাগের প্রসঙ্গই ওঠে, তারমানে সেটা কংগ্রেস আর মুসলিম লিগের বাটোয়ারা হবে। … আর মুসলিম লিগ ভারতের চার জায়গাতে সব থেকে বেশি শক্তিধর। প্রথম পাঞ্জাব আর সিন্ধে, দ্বিতীয় হাদ্রাবাদে, কিন্তু সেখানে বড্ডই বিচ্ছিন্ন, লাকনউতে, আর এই বাংলায়। … অর্থাৎ দেশ ভাগ হলে, এই চার জায়গায় কোপ পরবে, হায়দ্রাবাদে যদি কোপ নাও পরে, তবে বাকি তিন জায়গা তো থাকেই।
আমি – তাহলে দেশ ভাগের কালে, অখণ্ড বাংলাকেই ভারত ছেড়ে দিক। সেটাই ভালো হবে, বাকি ভারত এমনিই মানসিকতায় বাংলার সাথে তাল মেলাতে পারেনা। তাই বাংলা একটা আলাদা দেশ হওয়াই ভালো।
অমিয়বাবু – কি দৃশ্য দেখালে সুমিত্রা তুমি! … বুঝতে পারছো কি বলছো তুমি! … পুরো বাংলাকে একটা দেশ হতে দেবেনা এই কংগ্রেস, কেন জানো?
আমি – কেন? বাংলাকে এমনিই তো এঁদের সহ্য হয়না। বাংলাকে উঠতে দিলে, ওদের নামই আর কেউ নেয়না, তাই বাংলার প্রতি এমনিই একটা বিতৃষ্ণা রয়েছে ওদের।
অমিয়বাবু – কিন্তু ভেবে দেখো… পুরো বাংলা! অন্তত উত্তর বাংলা যদি সেই নতুন দেশের আয়ত্বে চলে যায়, তবে কি আর পূর্বের অরুণাচল, মনিপুর, আসম ভারতে থাকবে? … তাদের মধ্যে হয়তো আসম, ত্রিপুরা বাংলায় ঢুকে যাবে, আর বাকিরা বর্মদেশের সাথে চলে যাবে। … মানে গোটা বাংলাকে আলাদা দেশ হতে দিলে, ভারত চার ভাগের একভাগ হয়ে যাবে, অযাচিত ভাবেই।
আমি – তাহলে তো নিশ্চিন্ত আমরা, বাংলা ভাগ হবেনা।
অমিয়বাবু – তোমার দাদা কি চুপ করে বসে থাকার ব্যক্তি! … সে নেহেরুজীর কানে নিজের কথা তুলবে না ভেবেছ! দেশ ভাগের প্রসঙ্গ যদি ওঠে, তোমার দাদা যেই ধরনের সত্ত্বালোভী, দেশ ভাগ হোক আর না হোক, সে বাংলা ভাগ করিয়েই ছাড়বে। … দেখগে যাও হয়তো, নেহেরুজি যে মুসলিম লিগের বিরোধী হয়ে উঠেছেন, তাও তোমার দাদার কান ভাঙ্গানোর জন্যই কিনা!
আমি – সেটা তো আর জানা যাবেনা!
অমিয়বাবু – কেন যাবেনা! যদি ব্রিটিশ দেশ ছেড়ে যায়, তাহলে কেন্দ্রে মন্ত্রিত্ব গঠন হবে। যদি দেশ ভাগ হয়ে যায়, তাহলে নেহেরুজিই দেশের প্রাইম মিনিস্টার হবেন। যদি তোমার দাদা উনার কান ভাঙ্গিয়ে থাকে, তবে আমার কথা মিলিয়ে নিও, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি একটি বিশেষ মন্ত্রীর পদ পাবেনই।
আমি – কিন্তু নেহেরুজি তো জ্ঞানীগুনি ব্যক্তি; তিনি এই বণ্টন স্বীকার করে নেবেন? তিনি নিজেই তো কাশ্মীরের এক পণ্ডিত পরিবারের ছেলে। তিনি কাশ্মীরে মুসলমানদের দেখেননি! … তাহলে তিনি মুসলমানদের উপর এমন কঠোর হতে পারবেন?
অমিয়বাবু – সেটা বুঝতে বুঝতে দেশভাগ হয়ে যাবে। তখন হয়তো নেহেরুজি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ধর্মনিরপেক্ষতার চেষ্টা করবেন দেশে। আর যদি তা করেন, তোমার দাদা কংগ্রেস ছেড়ে অন্য পার্টি তৈরি করে নেবে, দেখো। উনি মুসলমানদের সহ্য করতে পারেন না।
আমি – কিন্তু এখন আমাদের করনিয় কি তবে?
অমিয়বাবু – চুপচাপ বসে দেখা। সুমিত্রা, তোমার থিসিস তাড়াতাড়ি শেষ করো। তুমি থিসিস শেষ করতে পারলে, বেঙ্গল প্রাইম মিনিস্টারের থেকে তুমি পুরস্কার পাবে। তাঁর সাথে আলাপ করবে। যদি দেখো যে দেশ ভাগের কথা হচ্ছে, তাহলে আমাকে তো আমার দেশের বাড়ি খুলনায় যেতে হবে, আমার মা, কাকা, কাকী আর ভাইপো ভাইজিকে ফিরিয়ে আনতে। সেই সময়ে তুমি বেঙ্গল প্রাইম মিনিস্টার যিনিই থাকবে, তাঁর কাছে গিয়ে অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্রের প্রস্তাব অবশ্যই দেবে।
