পঞ্চম পর্ব – অমিয় স্যার
বাবা এমন অসুস্থ হয়ে গেলে, আমি একটু ঘাবড়ে যাই। মনে একটা অপরাধ বোধও কাজ করছিল। আমার জন্যই বাবার এমন অবস্থা। অমিয় স্যার আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, কিছুদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবেন উনি। সম্মানকে প্রাণবায়ু উনি মনে করতেন, আসলে তো আর সম্মানটা প্রাণবায়ু নয়। কিছুদিন সময় লাগবে উনার এটা বিছানয় শুয়ে শুয়ে বুঝতে। একবার বুঝে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
অমিয় স্যারের কথা অক্ষরে অক্ষরে ঠিক প্রমাণিত হলো। দিন পনেরো মত সময় লাগলো, আর বাবা একদমই সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু ঠিক হয়েই আমার প্রতি আগ্রাসনে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। সরাসরি আমার কাছে এগিয়ে এসে বললেন – কি বলেছিলিস তুই নিখিলেশকে?
আমি – কই আমি তো কিছু বলিনি!
কথাটা আমিই বলেছিলাম, কিন্তু কথাটা শেখানো ছিল আমাকে আগে থেকে। তাই কমন কয়েসচেন পেয়ে সরাসরি চোখে চোখ রেখে উত্তর দিয়ে দিলাম। আর এর পরে যেটা হলো, সেটাও যেমন বলা ছিল আমাকে, তেমনই হলো।
বাবা আমার উত্তরে উত্তর দিলেন – এর মানে নিখিলেশ জেনেছে যে তুই কলেজে পড়ছিস, আর তাই তোকে বিয়ে করা যাবে না। … আজ থেকে আর তুঁই কলেজ যাবি না।
আমি শেখানো উত্তরই দিলাম – আমি তো কলেজ যাবোই। কলেজ আমি যাই, পড়াশুনা আমি করি, যেই টাকা লাগে তাতে, সেই টাকা কিন্তু আমি তোমার থেকে নিই না বাবা। সেই টাকা আমি নিজেই উপার্জন করি। … হ্যাঁ তুমি বলতে পারো, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছি আমি। বলতেই পারো, কারণ কলেজের যাবতীয় খরচ, পড়াশুনার যাবতীয় খরচ আমি করছি, কিন্তু খাওয়াপরা তো তোমারই জমিদারীর পয়সায়। … তাই তুমি কলেজ যাওয়া তো বন্ধ করতে পারবে না, কিন্তু হ্যাঁ, তুমি আমার খাওয়াপরা বন্ধ করে দিতে পারো। … সেটা তোমার সিদ্ধান্ত।
বাবা রেগে উঠে বললেন – কলেজে গিয়ে এই শিখছ, বাবার মুখে মুখে তর্ক করা শিখছ!
আমি – কলেজ আমাকে এটা শিখিয়েছে যে, অন্যায্য কথা, তা সে যে-ই বলুক না কেন, তার উত্তর দেওয়া আবশ্যক। আমি তো ন্যায্য কথাই বললাম বাবা। আমার খাওয়াপরার ভার তুমি ওঠাও। তুমি সেটা বন্ধ করতে পারো, পড়াশুনার ভার তুমি ওঠাও না; তাই সেটা বন্ধ করার অধিকার তোমার নেই। আর শুধু বন্ধ করা কেন, তার সম্বন্ধে একটা কথা বলারও অধিকার তোমার নেই। হ্যাঁ অধিকার থাকতো, যদি তুমি সেই ভার ওঠাতে। কিন্তু তা তো তুমি ওঠাও না, তাই আমি দুঃখিত, তুমি অনধিকার বলপ্রয়োগ করার চেষ্টা করছো।
বাবা এই কথাতে ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। আর উত্তেজিত হয়ে বললেন – এত বড় আস্পর্ধা; বেশ তবে, আজ থেকে তুমি এই বাড়িতে থাকবে না। বেড়িয়ে যাও এখান থেকে।
আমি – ঠিক আছে বাবা। এইবার তুমি তো তোমার অধিকারের সঠিক প্রয়োগ করলে। তাই আমিও তোমার কথা মানতে বাধ্য। আমার নিজের উপার্জনে আমি যাকিছু কিনেছি, তা গুছিয়ে নিয়ে, আমি চলে যাচ্ছি।
এমন সময়ে মা সামনে বেড়িয়ে এসে বললেন – কি আরম্ভ করেছ তুমি? যুবতী সুন্দরী মেয়ে, একা একা যাবে কোথায়!
বাবা – যে আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে পারেনা, তার ভরণপোষণের ভার আমি ওঠাতে পারবো না! তোমার মেয়েকে সেই কথা বলে দাও।
মা – তোমার সিদ্ধান্তের সম্মান করেনা, কিন্তু তোমার সম্মান তো করে! … তোমার সম্মান বাড়েও ওর কারণে। শেষবারে তোমার ঘরে বড়লাট স্বয়ং এসে তোমার মেয়ের প্রশংসা করে গেছিলেন। এবার সেই মেয়েকে তুমি বাড়ির বাইরে ফেলে দিলে, সে যখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে, তখন তোমার সম্মান বাড়বে তো!
বাবা – তো আমি কি করবো? আমি কি হিরণ্যকাশ্যপের মত, বাড়িতে প্রহ্লাদকে পুষে রেখে দেব? … ওঁকে আমি আজ থেকে চিনিনা। ও যেখানে খুশী যাক। বেশ্যা হয়ে যাক, আমার তাতেও কিছু এসে যায় না!
মা – বেশ, তবে আমার মেয়ে রাস্তায় রাস্তায় তো থাকবে না। তুমি জমিদার হতে পারো, কিন্তু আমার বাবাও আর এন মুখার্জি। … আমার মেয়ে, তাঁর কাছে গিয়ে উঠবে। … আর হ্যাঁ, আমার মেয়েকে যখন তুমি থাকতে দিতে পারবে না, তখন নিশ্চিত থাকো, তোমাকেও জমিদারী থেকে উৎখাত করিয়ে ছাড়বো আমি। … ভেবো না যে তোমার একারই বড়লাটের সাথে আলাপ আছে। আমার বাবা এখনো বড়লাটের কাছে সম্মানীয় ব্যক্তি, আর আমার ভগ্নিপতি বড়োলাটের প্রিয় ব্যক্তি। আর সেই কথা তো ছেড়েই দাও, তোমার এই মেয়ে, নিজেই বড়লাটের স্ত্রীকে পড়ায়। তাই তোমার জমিদারী ছিনিয়ে নিয়ে, তোমাকেও রাস্তায় এনে দাঁড়করাতে, আমার বেশি সময় লাগবে না!
বাবা – তুমি এসব কি কথা বলছো? আমি তোমার স্বামী!
মা – খাতায় কলমে, অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করেছিলে আমাকে, তাই অগ্নিদেবের কাছেও তুমি আমার স্বামী, কিন্তু সত্যিই যদি স্বামী হতে পারতে আমার, তবে এক সন্তানকে তাঁর মায়ের বুক থেকে কেড়ে নেবার কথা ভাবতেও তোমার বুক কাঁপতো। … এক মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে, তাঁর সন্তানকে কেড়ে নেবার কথা বলার সাহস তুমি দেখিয়েই ফেলেছো, এবার যদি সেটা করার সাহস দেখাও, তবে তোমার এই সম্পত্তি, এই ব্রহ্মাণ্ড মাটিতে মিশিয়ে দিতেও আমি দুইবার ভাববো না। … ঈশ্বর ভরসা করে, তাঁর সন্তান আমাদের মায়েদের গর্ভে দেন। সেই ঈশ্বর এই মায়েদের প্রতি যেই বিশ্বাস করেছেন, সেই বিশ্বাসের মান আমি কিছুতেই ভাঙবো না।
বাবা – বেশ, থাক তবে তোমার মেয়ে এই বাড়িতে। ওর খাওয়া দাওয়া, ভরণপোষণ যেমন হচ্ছে, তেমন চলুক। কিন্তু হ্যাঁ, আজকের পর থেকে আমি ওর মুখ দেখতে চাই না। … তোমার মেয়েকে বলে দাও যেন ও, ওর মুখ আমাকে জীবনে না দেখায়।
মা – সেটা তোমার ব্যক্তিগত রুচি। সুমিত্রা (আমার নাম) আর কনো দিন তোমাকে মুখ দেখাবে না।
সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। কিন্তু এমন সমাধান কি আমি চেয়েছিলাম! … মন খুবই ভারি হিয়ে গেছিল। আর সত্যি সত্যিই আমি বাবার মুখ দেখিনি কনোদিনও। মৃত্যুকালেও নয়, এমনকি মৃত্যুর পরেও নয়। কিন্তু সে তো পরের কথা, আমি সেই সময়ে অত্যন্ত আন্তরিক ভাবে ভেঙে পরেছিলাম।
আর আমার এই ভেঙে পরা আমার মিয়মান মুখের মধ্যে বোধহয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সেই মিয়মান মুখ দেখেই, অমিয় স্যার আমাকে দু-তিনদিন পরে কাছে এসে বললেন – বাবার সাথে মুখ দেখাদেখি বন্ধ!
আমি – আপনি কি করে জানলেন!
অমিয়স্যার – একজন জাঁদরেল জমিদার! … বোধহয় বাড়ি থেকেই বার করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উনার স্ত্রী, মানে তোমার মা হলেন স্যার আর এন মুখার্জির মেয়ে। তাঁর সামনে তোমার বাবাকে আশা করি পদানত হতে হয়। কিন্তু জমিদার হবার অহংকার কোথায় যাবে! তাই হয়তো বাড়ি থেকে বার না করে, মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দিয়েছেন। আর সেই কারণেই তোমার মুখে এমন বেদনার আঁধার দেখা যাচ্ছে।
আমি – আপনি কি অন্তর্যামী! নাকি আপনি ত্রিকালদর্শী! … সেদিন যখন আমি আত্মঘাতী হতে যাচ্ছিলাম, সেদিনও আপনি আমার মনের সমস্ত কথা জেনে গেছিলেন, আর আজও! … বাড়িতে কি কি হয়েছে, আপনি সমস্ত জানলেন কি করে? আমার বাড়িতে কি আপনার কনো লোক কাজ করেন? তিনিই কি আপনাকে এই সমস্ত কথা বলেন?
অমিয়স্যার একটু হেসে বললেন – সুমিত্রা দেবী, কারুর অবস্থা বা কারুর বাড়িতে কি কি হচ্ছে, বা কি কি চলছে, সেটা জানার জন্য চামচা লাগেনা। … লাগে অনুভব শক্তি। তোমার মুখ বলছে, তুমি বেদনাগ্রস্ত। তোমার বাবা তোমার কারণে অসুস্থ হয়েছিলেন, কিন্তু তার জন্য তোমার বেদনা নয়, কারণ তিনি সুস্থ হয়ে গেছেন। … অর্থাৎ কি পরে থাকে?
আমি সন্দিহান দৃষ্টি নিয়ে উনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে, উনি হেসে বললেন – চোখ নামিয়ে নাও সুমিত্রা, এত সুন্দর ফুলের মত রূপ, আর এমন মিষ্টতা পূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকালে, বোঝার চেষ্টা করো, আমিও একজন অবিবাহিত যুবক; আমার মন দুর্বল হয়ে যাবে, সেটাই কি স্বাভাবিক নয়।
আমি বললাম – আপনি কিছু বলছিলেন, আমি সেটাই শুনছিলাম মন দিয়ে। না, আসলে আমি জানতে চাই, আপনি কি করে প্রতিবার আমার পরিস্থিতি অনুধাবন করে ফেলেন।
অমিয়স্যার হেসে বললেন – ওই যে বললাম, কি পরে থাকে। … এই পরে থাকে যে, তোমার বাবা বিছানয় শুয়ে শুয়ে এই বিষয় নিয়ে নিশ্চয়ই ভেবেছেন। আর ভেবে কি পেয়েছেন? এই পেয়েছেন যে নিশ্চয়ই তাঁর কন্যা পড়াশুনা করছে জেনে, নারীশিক্ষার বিরোধী নিখিলেশ তাঁর কন্যাকে বিবাহ করতে আপত্তি করেছেন। … এই মনে হওয়াতে উনার মনে হয়েছে যে তুমি উনার সম্মানহানির কারণ। … তাই তোমাকে তিনি অবশ্যই পড়াশুনা ছেড়ে দেবার কথা বলেছেন। … তুমি তাতে আপত্তিজনক কথা বলেছ। আর সেই আপত্তিজনক কথাকে উনি নিজের দ্বিতীয়বার অসম্মান মনে করে, তোমাকে জমিদারীর দম্ভে এসে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছেন।
আমি বললাম – কিন্তু একজন বাবা কি তাঁর মেয়েকে বাড়ির বাইরে চলে যেতে বলতে পারেন?
অমিয়স্যার – অন্য সামান্য ব্যক্তি তোমার বাবা হলে, এমনটা ভাবাই যায়না। কিন্তু তোমার বাবা যে বাবা কম, জমিদার বেশি। … আর জমিদারের দম্ভ কেমন হয়, তা তো সকলেই জানেন, তাই না! … তাঁর কাছে ঘর পরিবার, সমস্ত কিছু তুচ্ছ, নিজের জমিদারী, সম্পত্তি, সম্মান, এটাই সব। … আর তাই যে উনাকে সম্মান করবে না, সে-ই উনার শত্রু।
আমি বললাম – বেশ, তারপর মা আমার স্যার আর এন মুখার্জির কন্যা, তাই প্রতিবাদ তিনি করবেনই, আর সেই প্রতিবাদ বাবা মেনে নেবেন! তখন তিনি ভুলে যাবেন যে তিনি একজন জমিদার! তখন তাঁর জমিদারীর দম্ভ চলে যাবে!
অমিয়বাবু এবার একটু বেশিই জোরে হেসে উঠলেন। হেসে বললেন – সুমিত্রা দেবী, জমিদারীর দম্ভ ভুলে যাননি, কিন্তু তোমার মা যে উনাকে জমিদারীর দম্ভ ভুলতে হবে, এমনটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। … অর্থাৎ তোমার মা যখন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিলেন, তখন নিশ্চয়ই তোমার দাদুর নাম করেন, আর তোমার নামও করেন, আর হতে পারে যে তোমার মেশমশাই, স্যার আশুতোষ মুখার্জির নামও নিয়েছেন, আর এঁদের সকলের কথা বলে, তোমার মা তোমার বাবাকে বুঝিয়ে দেন যে, তাঁর জমিদারী কেড়ে নিতে, তাঁকে বেশি কষ্ট করতে হবেনা। … (হেসে) আর কি! … জমিদারী চলে যাবে, মানে তোমার বাবা তো আবার মৃত্যুদেবীর সাক্ষাতকার করে নেন। … তাই, মুখদেখাদেখি বন্ধ করলেও, বাকি সমস্ত কিছু চলতে থাকুক, এমন বলে গেলেন তোমাকে।
আমি অবাক হয়ে বললাম – আপনি তো অদ্ভুত মানুষ! … এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, আপনি অন্য জায়গায় কি কি হচ্ছে, এমন ছবির মত বলেন কি করে? ভাবেন কি করে এমন করে?
অমিয়বাবু হেসে একটু সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন – ভাবতে হয়না, ভাবলে কিছু পাওয়াও যায়না। … কারুকে বেষ্টন করে কোন কোন মানুষ রয়েছেন, সেটা দেখে নিতে হয়, আর সেই মানুষগুলো কেমন কেমন, সেটা বুঝে নিতে হয়। তারপর অঙ্ক।
আমি বললাম – বেশ, তবে এতকিছু যখন বলে দিলেন, তবে এটাও বলুন, আমার কি দুখী হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক?
অমিয়স্যার – একদমই নয়। প্রতিটি সন্তানই চায়, তাঁর পিতা তাঁর পায়ের নিচের মাটি হোক, আর মা হন পিঠের পিছনে দেওয়াল। … সেই মাটি যখন উত্তপ্ত হয়ে যায়, তখন তো পা-টা ঠিক করে মাটির উপর রাখাই যায়না। … আর পা মাটিতে ঠিক করে রাখা না গেলে, দাঁড়িয়ে থাকতেই কষ্ট হয়। … সেই কষ্টটাই তোমার হচ্ছে এখন।
আমি – তো আমার এখন কি করা উচিত?
অমিয়বাবু – তুমি একজন নারী। আর একজন নারী হবার সুবিধা কি জানো?
আমি – কি?
অমিয়বাবু – সুবিধা এই যে, তাঁর পায়ের তলার মাটি বারবার পালটায়। প্রথম জীবনে সেটা বাবা হন, তো পরে সেটা স্বামী হন, আবার শেষ বয়সে সেটা সন্তান বা নাতিপুতিও হয়ে যান।
আমি – আর পুরুষের কি সেই সুবিধা নেই?
অমিয়বাবু – না নেই। পুরুষমানুষকে নিজেই সেই মাটি হতে হয়। তাঁর স্ত্রীর জন্য মাটি, তাঁর মায়ের জন্য মাটি, তাঁর সন্তানের জন্য মাটি। … এটাই একটা পুরুষের পরিণতি। … স্ত্রী যদি মা হারা হন, তবে তিনি সম্পূর্ণ একাকী হয়ে যান, কারণ আর তিনি কনোদিনই পিঠ ঠেস দেবার দেওয়াল পাননা; কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে কিন্তু এমন নয়। পুরুষ যখন মাছাড়া হন, তখন তাঁর স্ত্রীকে নিজের পিঠের পিছনে দেওয়াল করে পেয়ে যান। আবার যখন স্ত্রীছাড়া হন, তখন সন্তানকে পিঠের পিছনে দেওয়াল করে পেয়ে যান।
আমি – তারমানে আপনি বলছেন যে, একজন স্ত্রী যদি পিতাছাড়া হন, তবে সেই বেদনা একসময়ে শেষ হয়ে যায়, যখন তাঁর স্বামী তাঁর জীবনে এসে যায়। যখন তিনি বিধবা হন, তখনও সেই বেদনা ঘুচে যায়, তাঁর সন্তানকে কেন্দ্র করে। … কিন্তু যখন তিনি মা-ছাড়া হন, তখন তিনি সারা জীবনের মত দেওয়াল হারিয়ে ফেলেন, কারণ বাকি জীবনটা তাঁকেই সেই দেওয়াল হয়ে থাকতে হয়!
অমিয়বাবু – একদমই সঠিক কথা সাবিত্রীদেবী। স্বামীস্ত্রীর এই তো অদ্ভুত সম্বন্ধ। স্বামী হলেন সেই মাটি, যার উপর দেওয়াল দাঁড়িয়ে থাকে। আবার সেই মাটি সমানে ছাঁদ খোঁজে, কিন্তু সেই ছাঁদ সে পাবে কি করে, যদি দেওয়াল না থাকে? ছাঁদ যে দাঁড়িয়েই থাকে দেওয়ালের ভরসায়। …
আমি – তারমানে তো একজন স্ত্রী যিনি বিধবা হয়েছেন, আর তাঁর সন্তান আছে, তাঁর আরেকটা অন্য মাটি প্রয়োজন, নাহলে সে নিজেও ধসে যাবে, আর তাঁর সন্তানও।
অমিয়বাবু – সেই কারণেই তো বিদ্যাসাগর মহাশয়, বিধবাবিবাহের জন্য এতটা উঠে পরে লেগেছিলেন। উনি যে নিজের চোখে এমন স্ত্রীদের ও সন্তানদের ধুলিস্যাত হয়ে যেতে দেখেছিলেন। আর তা দেখে তাঁর হৃদয় কেঁদে উঠেছিল।
আমি – আর যদি একজন পুরুষ বিপত্নীক হন!
অমিয়বাবু – শোচনীয় অবস্থা হয়ে যায় সাবিত্রীদেবী। দেওয়াল ছাড়া ছাঁদ যে ভেঙে পরে যায়।
আমি – তারমানে দ্বিতীয় স্ত্রী আবশ্যক। আর সেই রীতি সমাজে রয়েওছে!
অমিয়বাবু – হুম, তবে একটা সমস্যা এখানে থেকেই যায়। আর সেটা হলো, আমাদের মন।
আমি – হ্যাঁ, প্রথম স্বামী যিনি, তাঁকে মনপ্রান থেকে আঁকরে ধরেন একজন স্ত্রী। কিন্তু পরের জনের ক্ষেত্রে মনপ্রাণ বা প্রেম থাকেনা, পরে থাকে কেবলই প্রয়োজন। … একই ব্যাপার পুরুষের ক্ষেত্রেও। … আচ্ছা এর কনো দ্বিতীয় উপায় নেই!
অমিয়বাবু – আছে একটা উপায়, তবে সেটা সামাজিক প্রথা করা উচিত হবেনা। কারণটা এই যে, সেটা খুব অল্পসংখ্যক মানুষই করতে সক্ষম। সমাজ তো আর সেই অল্পসংখ্যক মানুষ নিয়ে নির্মিত নয়।
আমি – সেটা কি?
অমিয়বাবু – আমাদের ধর্মশাস্ত্র বলে, আমাদের সকলের মধ্যে পুরুষ আর প্রকৃতিতত্ত্ব উপস্থিত। যার মধ্যে পুরুষতত্ত্ব অধিক উপস্থিত আর প্রকৃতিতত্ত্বের প্রতি আনুগত্য উপস্থিত, সে পুরুষ শরীর পায়। আর যার মধ্যে প্রকৃতিতত্ত্ব অধিক উপস্থিত আর পুরুষতত্ত্বের প্রতি আনুগত্য উপস্থিত, তিনি নারী শরীর পান। … অর্থাৎ আমাদের মধ্যে দুই তত্ত্বই বিদ্যমান। একজন সাধক বা সাধিকা, নিজের মধ্যে এই দুই তত্ত্বকেই ফুটিয়ে তোলেন, আর তা তুলতে পারলে, তাঁর সাধনা চরমস্তরে অর্থাৎ ব্রহ্মসাধনায় উন্নীত হয়। … তেমনই ভাবে, একজন পুরুষ যদি নিজের অন্তরের প্রকৃতিতত্বকে জাগ্রত করতে পারেন, তবে তিনি একই সঙ্গে তাঁর সন্তানের মাতা ও পিতা, দুইই হতে সক্ষম। একই ভাবে, যদি এক স্ত্রী নিজের মধ্যে পুরুষতত্ত্ব ও প্রকৃতিতত্ত্ব, উভয়কেই জাগ্রত করতে পারেন, তখন তিনিও একাধারে নিজের সন্তানের মাতাপিতা উভয়ই হতে পারেন। … কিন্তু কথা হলো, শুধুই সাধক বা সাধিকা দিয়ে তো সমাজ গঠিত নয়, তাই না! … একটি সমাজে যদি এক লক্ষ্য মানুষ থাকেন, তাঁদের মধ্যে কয়জন সাধক বা সাধিকা হন, এক থেকে দুইজনের অধিক নন। তাঁদের দিয়ে কি আর সামাজিক নীতি স্থির করা যেতে পারে? নাকি তাঁদেরকে ভিত্তি করে সমাজের নীতি গঠন করা সঠিক হবে?
আমি – এই পুরুষতত্ত্ব আর প্রকৃতিতত্ত্ব আসলে কি?
অমিয়বাবু – বিস্তারে না গিয়ে বলতে হলে, এটাই বলবো যে পুরুষতত্ত্ব মানে আত্মাবোধ, অর্থাৎ আমি শরীর নই, পঞ্চভূতের অন্যগুলিও নই, মানে মন, বুদ্ধি, প্রাণ, উর্জা একটিও নেই। আমি হলাম আত্মা, যা এই সমসত কিছুর ঊর্ধ্বে, এই বোধ। … আর প্রকৃতিতত্ত্ব আরো এককাঠি উপরের অনুভূতি, অর্থাৎ আমি সেই আত্মাটিও নই, আমি সেই আত্মার চালক, অর্থাৎ চেতনা বা নিয়তি, এই বোধ।
আমি – আপনিকে ভূগোলের সাথে সাথে দর্শনচর্চাও করেন?
অমিয়বাবু – আমার স্যার, আপনার মেশমশাই কি শিখিয়েছিলেন জানেন আমাদের? উনি শিখিয়েছিলেন যে নিজের জ্ঞানের পরিধি এতটাই বিস্তৃত রাখো যাতে, তোমার পাঠ্যপুস্তক সেই জ্ঞানের কাছে খড়কুটো মনে হয়। যদি এমন করতে পারো, তবে পড়াশুনা করা কনো কষ্টকর কাজ হবেনা, বরং মজাদার কাজ হবে।
আমি – আপনি আপনার স্যারকে খুব মানেন, তাই না!
অমিয়বাবু – আমার বাবা নেই সুমিত্রা। … আমি যখন খুবই ছোট, তখন মারা গেছিলেন। … আমার মা কিন্তু বিধবাবিবাহ আইন থাকতেও দ্বিতীয় বিবাহ করেন নি। আমার ছোটকাকা আমার বাবার থেকে অনেকটাই ছোট। বাবা ছিলেন খুলনা জমিদারের নায়েব। সেই কাজটি আমার ছোটকাকা পেয়েছেন। আর তিনিই আমার মায়ের দেখাশুনা করেন। এই কলকাতায় যখন প্রেসিডেন্সিতে চান্স পেলাম, ছোটকাকা আমাকে পড়তে পাঠিয়ে দিলেন। খরচের কথা উনি বলেন নি। কিন্তু আমার মা বলে দিয়েছিলেন আমাকে, কাকা নিজের সংসার টানছেন, উনার স্ত্রী সন্তান আছে, তার উপর আমার ভার টানছেন, আর কত ভার টানবেন; তুই পড়াশুনার পাশাপাশি একটা কাজও যোগার করে নিজের ভার নিজে ওঠা। … ভাগ্যবান আমি, খুবই ভাগ্যবান। এমন বড়দাদার মত কাকা পেয়েছি, যিনি আমার মাকে অত্যন্ত সম্মান করেন, এবং স্নেহ করেন। … কিন্তু আমি বাবাকে পাইনি সুমিত্রা।
এই বলে পকেট থেকে, এক তারা বিড়ি বারকরে, দেশলাইকাঠি দিয়ে একটি জ্বালিয়ে হেসে বললেন – ক্ষমা করবে সুমিত্রা, তুমি বনেদি বাড়িতে বড় হয়েছ, সকলকে চুরুট খেতে দেখেছ। আমার কাছে পাইপ, হুকো বড়ই বিলাসিতা। এই বিড়িই আমার জন্য সঠিক।
আমি হেসে বললাম – আমাদের বাড়ির হারাধনকাকা বিড়ি খান। বাবা দেখলে বকবেন, তাই আমার ঘরেই উনার বিড়ি থাকে। আমার ঘরে এসে খান।
অমিয়বাবু – হুম জানি, জমিদারের মেয়ে হলেও, তোমার মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের চিন্তা সবসময়ে থাকে, আমি লক্ষ করেছি সেটা। … যাই হোক, এই কলকাতায় এসে, আমি আমার বাবাকে ফিরে পেলাম। তোমার মেশমশাই, আমার স্যারই আমার সেই বাবা। … দায়িত্ববোধ তাঁর এমনই যে, তাঁর স্নেহকে চোখে দেখে বোঝা যায়না। তাঁর মুখে হাসি নেই, আসলে তাঁর কাঁধে দায়িত্বভার অনেক বেশি, তাই সেই ভারে হাসি চেপে গেছে, কিন্তু তাঁর স্নেহ কিন্তু চাপা যায়নি।
একটু থেমে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন – চিন্তা করো না। তোমার বাবা যদি জমিদার না হতেন, তাহলে বলতাম, কিছুদিন পরে উনার মান ভেঙে যাবে। কিন্তু জমিদার উনি, তাই স্পষ্টই বলছি, উনার মান ভাঙবে না। তবে হ্যাঁ, তুমি একজন স্ত্রী, আর তাই পায়ের তলার মাটি তুমি আবারও পেয়ে যাবে। এখন পড়াশুনায় মন দাও। ভারতের ইতিহাসে সকলে চোখ রাখছে, কিন্তু এই বাংলার ইতিহাসে কেউ নজর দিচ্ছে না। কিন্তু একটি কথা জেনে রেখো সুমিত্রা, এই বাংলার কারণেই ভারত স্বাধীনতার চিন্তা করতে শিখেছে, আর এই বাংলাই বারবার ভারতকে স্বাধীনতার স্বাদ চাকাবে। … কিন্তু তবুও এই বাংলাকে ভারত মান্যতা দেবেনা, কেন জানো?
আমি – কেন? সত্যি কথা বলতে গেলে, এখনও দেয়না। … যেন বাঙালী দেখলেই, বাকি ভারতীয়রা কেমন একটা সিটকে যায়, কেমন যেন একটা অস্বস্তির মধ্যে চলে যায়। কিন্তু এমন কেন?
অমিয়বাবু – মহাতীর্থ এই বাংলা সুমিত্রা। কপিলমুনি, চৈতন্য মহাপ্রভু, রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ন্যায় শ্রেষ্ঠ অবতারদের অবতরণক্ষেত্র এই বাংলা; আর আমার বিশ্বাস যে ভাবিকালেও এই বাংলাই অন্য অবতারদের জন্ম ও কর্মভূমি হবে, কারণ এই বাংলার মানুষ পড়তে ভালোবাসে, ঘুরতে ভালোবাসে, জানতে ভালোবাসে, আর খেতে ভালোবাসে। বুঝতে পারছ কি বলছি? খাবারের মাধ্যমে দেহের খুদা মেটায়, বেড়ানোর মাধ্যমে মনের খিদে মেটায়, আর জানার মাধ্যমে আত্মার খিদে মেটায়। … এই বাঙালী একটি এমন জাতি, যা সারা পৃথিবীতে বিরল। আর যে যত বিরল, তাঁকে চেনা ততই কঠিন, ভারত এই ৫২ শক্তিপিঠের ১২টি শক্তিপিঠ ধারণকারি বাংলাকে কনোদিন চেনেও নি, আর কনোদিন চিন্তেও পারবেনা, আর সত্যি বলতে তাঁদের চেনার সামর্থ্যও নেই। … তাই এই বাংলার ইতিহাসে বিশেষ চোখ রাখো।
আমি – বিশ্বদরবারে আমরা আবেদন করবো না, আমাদের দিকে পৃথক করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে?
অমিয়বাবু – সুমিত্রা, কেউ মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রী কিনা, কি করে বোঝ?
আমি একটু এ-উ করে বললাম – মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রী বাকিরা কি করছে, সেই দিকে মনই দেয়না। সে নিজের কাজে নিজে ব্যস্ত থাকে।
অমিয়বাবু – সারা পৃথিবীর সব থেকে মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রী হলেন এই বঙ্গভূমি। তাই সে অন্যরা কি করছে, সেই দিকে তাকায়ই না। শুধুই নিজের কাজে, নিজের জ্ঞান অর্জনে, নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের হ্রদয়কে বিশাল করার দিকেই একাগ্রচিত্ত। … এইটিই তো বাঙালীর বিশেষত্ব; আর জানো একটা কথা, ব্রিটিশরা বাঙালীর মধ্যে এটা দেখে ফেলেছে। না ওরা আমাদের মেধার শুধুই একটা দিক দেখেছে, আমাদের আধ্যাত্মিক মেধার দিকে ওদের দৃষ্টি পরেনি, কারণ ওরা নিজেরাই আধ্যাত্মের কিছু বোঝেনা। তবে যেটুকু বোঝে, সেই নিরিখেই ওরা বুঝে গেছে, বাঙালী কি। … খেয়াল করে দেখো, একটু খবর নিয়ে দেখো। … ব্রিটিশরা সারা পৃথিবীর কত দেশকে নিজেদের অধীনে রেখে দিয়েছে, কিন্তু কনো জায়গায়, নিজেদের অধিকার করা সেরা স্থানগুলো, অর্থাৎ ভাইসচ্যান্সেলার, সুপারিন্টেনডেন্ট, এমনকি প্রাইম মিনিস্টারের জায়গা দিয়েছেন? … না, শুধু এই বাংলাতেই দিয়েছেন। … তাই এই বাংলার ইতিহাসে নজর দাও, কারণ ভারত বা বিশ্ব এতে নজর দিতে পারবেনা, তাঁদের সামর্থ্যের অতীত এই কাজ।
জানিনা কেন, আমি খুব তৃপ্ত হয়ে গেলাম। … আর সেই তৃপ্তি আমাকে অমিয়স্যার যা কিছু বলেছিল, সমস্ত সরিয়ে, একটি কথাকেই স্মরণে এনে দিল – অমন করে দেখো না, আমি তো একজন অবিবাহিত যুবক, প্রেমে পরে যাবো। … কেন স্মরণে এলো কথাটা! কারণ আমি নিজেই যে এই অদ্ভুত যুবার প্রেমে পরে গেছিলাম।
