চতুর্থ পর্ব – সাখ্যাত
দিনটি আমার খুব মনে আছে; এখনো চোখের সামনে ভাসে দিনটি। ভারতের প্রথম লঞ্চঘাট, ফেয়ারলি প্লেস থেকে লঞ্চের টিকিট কেটে; আমি লঞ্চে উঠি। মাঝ গঙ্গায় লঞ্চ গেলে, আমি গঙ্গায় ঝাঁপ দেব, মনে মনে আমি নিশ্চিত, আজই আমার এই জীবনের শেষ দিন। তারিখটি ছিল ২৬শে জুলায়, সাল ১৯৩৪। বয়স আমার ১৭, সবে প্রেসিডেন্সিতে এডমিশন নিয়েছি; বিভাগ ইতিহাস। বর্ষায়, গঙ্গা সমুদ্রের সমান হয়ে গেছে। নাব্যতা প্রায় ১০ তোলা বাড়ি; তাঁতে ঝাঁপ দিলে, কনো ভাবে এই সময়ে বাঁচতে পারবো না।
আমি আসতে আসতে সকলের চোখ এড়িয়ে একটু একটু করে লঞ্চের কিনারার দিকে যাচ্ছিলাম। আত্মঘাতী হওয়া সামান্য কথা নয়; মনের ভিতরে যে কত কথা চলে সেই সময়ে, যে আত্মঘাতী হতে চায়, সেই জানে। সেই বর্ষার দিনেও, আমি দরদর করে ঘামছি। দাদুভাই, তুমি আমার কম বয়সের ছবি দেখেছো। হ্যাঁ সুন্দরী তো ছিলাম, তবে রূপের দিকে আমার নজর ছিলনা; আর তখনকার পুরুষরা জীবনের প্রতি এতটাই সচেতন যে, এই স্ত্রীদের রূপাদির দিকে তাদের নজর থাকতো না। … এছাড়াও, ছবিতে দেখে যা বুঝতে পারো না, তা এই যে, আমি অত্যন্ত ফরসা ছিলাম। হয়তো, সেই ফরসা হবার কারণেই, আমাকে দেখে একজন বুঝে যায় যে আমি অস্বাভাবিক রকম ভাবে ঘামছি, তাই নিশ্চয়ই আমার কনো মনসা আছে!
ভদ্রলোক আমার কাছে এগিয়ে আসেন। আমি খেয়াল করিনি, কারণ আমার সমস্ত ধ্যানজ্ঞান তখন জলে ঝাঁপ মারাতে। ভদ্রলোকের গলার স্বরে আমার ঘোর কেটে গেল। ভদ্রলোক চাপা স্বরে বললেন, বিপ্লবী! কনো সাহেব মারার চিন্তা আছে নাকি!
আমি আর চোখে দেখে চোখ নামিয়ে নিলাম। নজর করতে চাইনি ঠিক, কিন্তু ভদ্রলোকের চোখের দৃষ্টি এতটাই বুদ্ধিদীপ্ত যে, আমি দুবার তিনবার উনার দিকে তাকাতে বাধ্য হই। … শেষে ঘাড় নেরে বললাম, আমি কনো বিপ্লবী নই।
সেই সুপুরুষ ব্যক্তি আর একটু কাছে এগিয়ে এসে আসতে গলায় বললেন, দেশ মাতার সম্মান রক্ষার জন্য বিপ্লবী না হলেও, আত্মসম্মান রক্ষার জন্য তো বিপ্লবী বটেই আপনি। সেই জন্যই তো এই বর্ষায় ভরা গঙ্গায় ঝাঁপ দেবার চিন্তা করছেন, তাই না!
আমি এবার একটু নয়, বেশ খানিকটা চমকে গেলাম। আমি বললাম – আপনি ডাক্তার!
ভদ্রলোক বললেন – না, ভূগোলের শিক্ষক। যদি আপনি বেঁচে থাকতেন, তবে আগামীকালই আপনার সাথে সাখ্যাত হতো, প্রেসিডেন্সির ক্লাসে, যেখানে আপনি হতেন ছাত্রী, আর আমি শিক্ষক; কিন্তু আপনি তো আর কালকের মুখ দেখতে চাননা, আর নিয়তি স্থির করে রেখেছে যে, আপনার সাথে আমার সাখ্যাত নিশ্চিত। তাই দেখুন, আপনার মৃত্যুর ঠিক আগে, আপনার সাথে আমার সাখ্যাত করিয়ে দিলেন। … তা, আপনার রূপ তো অসামান্য। সেই রূপে কনো পুরুষ মজে গিয়ে, আপনাকে কামদেবের বাণে আক্রান্ত করে, অন্তঃসত্ত্বা করে দিয়েছে নাকি! … সেই কারণেই কি এমন আত্মঘাতী হয়ে সম্মান রক্ষার চিন্তা!
আমি সেই কথাতে একটু চটে গেলাম। গিয়ে বললাম, আমাকে দেখে আপনার তেমন মনে হচ্ছে! … আমি একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। সম্ভ্রান্ত পরিবার বোঝেন! সম্ভ্রান্ত মানে যার কাছে টাকা আর পাওয়ার আছে, সে নয়, সম্ভ্রান্ত মানে যে জীবনে সংযত থাকার মানে বোঝে, যে বিলাসিতা বিহীন জীবন বাঁচতে জানে, আর যে জীবনের একটা নিশ্চিত উদ্দেশ্য আছে জেনে তা খোঁজার চেষ্টা করে।
ভদ্রলোক বললেন, হুম সে তো বুঝলাম। আশুতোষ স্যারের শ্যালিকার কন্যা আপনি, ভাইসরয় আলেগজান্দারের পত্নীর শিক্ষিকা আপনি; আপনি যে সম্ভ্রান্ত পরিবারের থেকে আসছেন, সেটা আর আলাদা করে বলার কি আছে। স্যার আর এন মুখারজি আপনার দাদু বোধহয়, তাঁর নাতনি যে সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে! … কিন্তু এই অসামান্য রূপ (এখানে বলে রাখি যে আমার ঠাম্মির অসামান্য রূপকে আমি প্রত্যক্ষ করিনি কারণ আমি যখন থেকে উনাকে দেখছি, উনার গাল তোবড়ানো, দাঁতফোগলা, আর চামরা কোঁচকানো। তবে হ্যাঁ, উনার কন্যা, মানে আমার ছোটপিসির রূপ দেখে বোঝা যায়, যে তাঁর মা কতটা ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন) আর তার সাথে আত্মঘাতী হবার চিন্তা, এইদুটি মেলাতে গিয়েই আপনার ওই অন্তঃসত্ত্বা হবার গল্পটিই মনে হলো সত্যি, তাই বললাম। আমার বাচালতার জন্য ক্ষমা করবেন।
আমি মনে মনে একটু রেগে গেছিলাম যুবকের প্রতি। যত বড় মুখ না তত বড় কথা, বলে কিনা আমি অসংযত হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেছি! সাহস কত বড়! নেহাত আমারই কলেজের প্রফেসার, তাই কিছু বলতে পারছিলাম না।
আমাকে কিছু বলতে হলোও না, তবে আমার মনে একটা নতুন সংশয় দেখা দিলো যে, আমি যে আত্মঘাতী হতে চলেছি, ইনি যে জেনে গেলেন। ইনি যদি সকলকে বলে দেন, তবে তো আমার আর আত্মঘাতী হওয়াই হবেনা। সেই চিন্তা করে বললাম, দেখুন আপনার সাথে আমার সাখ্যাত হওয়া নিয়তি ছিল, সেই সাখ্যাত হয়ে গেছে। এবার আমি যা করতে চলেছি, তা আমাকে করতে দিন। … আমাকে বাঁচাবার চেষ্টা করবেন না!
ভদ্রলোক সামান্য হাসিমুখে বললেন – আমাকে দেখে কি আপনার মনে হচ্ছে যে আমি পাগল! … এই বর্ষায় মাটিগোলা ফুঁসতে থাকা মাঝগঙ্গায় ঝাঁপ, তাও আবার আপনাকে বাঁচাতে! … পাগল হয়েছেন নাকি! … সাঁতার জানলেও সাঁতার কাটা যাবেনা এই গঙ্গায়, কিন্তু হ্যাঁ সাঁতার জানলে চেষ্টা তো করতেই হবে, হাতপা ছোরার। … বুঝতে পারছেন, কি পরিমাণ মৃত্যু যন্ত্রণা পেয়ে মরতে হবে। হ্যাঁ সাঁতার না জানলে, একটু সহজ হবে মৃত্যু, কিন্তু সামান্য সাঁতার জানলেও, মৃত্যুযন্ত্রণা ভয়াবহ হয়ে উঠবে। বেঁচে থাকতে মরতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু মৃত্যুর কবলে পরে গেলে, সেই ব্যক্তিই বাঁচার জন্য হাঁসফাঁস করে। আর এই হাঁসফাঁস, তার সঙ্গে এই মাটি গোলা ফুঁসতে থাকা গঙ্গা, ওরে বাবারে… না না, আপনি মরুন। আমি চলে যাচ্ছি। …
এই বলে ভদ্রলোক উঠে চলে যাচ্ছিলেন। আমিও একটু অবাক হয়ে গেলাম। ভাবলাম, এ আবার কেমন ধারার মানুষ! আমি মরতে চলেছি জেনেও, একবারও আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো না যে আত্মহত্যা মহাপাপ! … মনে মনে এইসব ভাবলেও, তাকিয়ে দেখিনি যে ভদ্রলোক সেখান থেকে চলে গেলেন নাকি। ভদ্রলোকের আবার গলা শুনে, চমকে গিয়ে উনার দিকে তাকালাম। উনি বললেন – আপনি, সাঁতার টাতার জানেন না তো!
আমি বললাম – জানি তো সাঁতার।
ভদ্রলোক বললেন – এই মেরেছে! আপনার ছাত্রী, ভাইসরয়ের স্ত্রীর থেকে উনার বন্দুকটা চেয়ে নিয়ে গুলি করে নিজেকে মারছেন না কেন! ওটা অনেক সহজমৃত্যু হতো। … যেটা আপনি করতে চলেছেন, আপনি কিন্তু ভয়ানক কষ্ট পাবেন। … বুঝতে পারছেন তো আমি কি বলছি! যখন নিজের ইচ্ছাতেই মরবেন, তখন একটু সহজ উপায় দেখে নিন, মরার জন্য, এটাই আমার বলার।
আমার ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। আমি একটু জোরেই বলে উঠলাম, আপনি তো অদ্ভুত কাপুরুষ! একজন মরতে চলেছে জেনে কি করা উচিত, তাকে বোঝানো উচিত যে আত্মহত্যা মহাপা। তা না করে, আপনি আমাকে মরার নতুন নতুন বুদ্ধি দিচ্ছেন!
ভদ্রলোক বললেন, আসতে আসতে। এমন জোরে চেঁচালে সবাই জেনে যাবে যে আপনি মরতে চলেছেন। তারপর কি আর আপনি মরতে পারবেন! … দেখুন, শুনুন আমার কথাটা। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব কি বলেছেন! হৃদয়ে ঈশ্বরের বাস। এর মানে বোঝেন নিশ্চয়ই। এর মানে হলো, এই দেহে এসে আমরা ঈশ্বরের কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করতে পারি। ঈশ্বর কে? আমাদের মাই-বাপ। তা আমরা, আমাদের মাবাবার কাছে যাবার জন্য এই দেহ ধরেছি। তাই কবে আমরা আর মাবাবার কাছে যাওয়ার চেষ্টা বন্ধ করবো, সেই ব্যাপারে অন্য কারুর কি কথা বলার অধিকার থাকে! … এবার বলুন, আমি আপনার মৃত্যুবরণ করার ইচ্ছাকে কোন অধিকারে আটকাই! এটা তো আপনার আর আপনার ভগবানের নিজেদের মধ্যে সমঝোতা, তাই না!
আমি এবার আমার উদ্দেশ্য থেকে সম্পূর্ণ ভ্রমিত হয়ে গেছিলাম। মানে মরার চিন্তা মাথা থেকেই চলে গেছে। এমন উন্নত মনের কথা শুনে যেন, নতুন করে বেঁচে থাকার এক উদ্যম এলো আমার মধ্যে। আমি সেদিনের মত আমার আত্মঘাতী হবার চিন্তা ত্যাগ করলাম। পরের দিন ক্লাসে উনার সাথে আবার সাখ্যাত। অমিয় চট্টোপাধ্যায়, উনার নাম, ভূগোলের শিক্ষক; আর ভূগোল আমার ইতিহাস সম্বন্ধে পড়াশুনার সাপোর্ট সাবজেক্ট।
আমি উনার সাথে আলাদা করে কথা বললাম, আরো দুইচারদিন পরে। আমি কথা বলতে উদ্যত হলে, উনি এবার প্রশ্ন করলেন আমাকে, কেন মরতে চাইছিলে!
আমি বললাম – পড়াশুনা আমার প্রাণ, আর আমার বাবা আমাকে কিছুতেই পড়তে দেবেন না। নিখিলেশ চৌধুরীর সাথে আমার বিবাহও ঠিক করছেন।
উনি বললেন, নিখিলেশ, মানে ওই যে নারীশিক্ষা বিরোধী অভিযান চালায়, সে?
আমি – হ্যাঁ, বুঝতে পারছেন তো আমি পড়াশুনা না করে বাঁচতে পারবো না, আর আমাকে পড়াশুনা কিছুতেই করতে দেওয়া হবেনা। … এমন অবস্থায় আমি কি করি?
অমিয় স্যার বললেন – আমার সাথে একবার আসুন।
আমি প্রশ্ন করলাম – কোথায়?
উনি কনো উত্তর না দিয়ে, হনহন করে এগিয়ে গেলেন। তাই আমিও পিছনে পিছনে যেতে থাকলাম উনার। উনি আমাকে নিয়ে গেলেন ভাইস চ্যান্সেলার রুমে, মানে আশুতোষ মেশমশাইএর চেম্বারে। আমাকে দেখে, মেশমশাই কিছু না বলে, অমিয় স্যারের দিকে তাকিয়ে বললেন – কি ব্যাপার অমিয়!
অমিয় স্যার বললেন – স্যার, মেয়েটি মেধাবী, পড়াশুনা অন্ত প্রাণ, আপনার শ্যালিকার কন্যা, আপনি তো ভালো করেই জানেন। আশা করি, আপনিই স্যার, ওর পড়াশুনার খরচ যাতে ও নিজেই ওঠাতে পারে, তাই ভাইসরয়ের স্ত্রীকে বাংলা শেখানোর কাজ করিয়ে দিয়েছেন ওঁকে। কিন্তু স্যার, সমস্যা তো ওর বাড়িতে, ওর বাবা। এই ভাবে কতদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে থাকবে ও! … ওর বাবা তো ওর বিয়ের ব্যবস্থা করে, ওর পড়াশুনা বন্ধ করার সব রকম চক্রান্ত করছেন। এবার কি হবে স্যার! মেয়েটা পড়াশুনা করা বন্ধ করে দেবে! জগতকে জানতে চাইবার ইচ্ছা করা কি অপরাধ! … পুরুষ সেই ইচ্ছা করলে, তা অপরাধ নয়, আর স্ত্রী করলেই তা অপরাধ! … জগতটাকে স্ত্রীর নয়, শুধুই পুরুষের! … তা যদি না হয়, তবে স্ত্রীর এই জগত জানার অধিকার কেন থাকবে না!
আশুতোষ মেশমশাই বললেন – তা এইক্ষেত্রে আমরা কিই বা আর করতে পারি?
অমিয় স্যার – অনেক কিছু স্যার। নিখিলেশের সাথে ওর বিয়ের কথা হচ্ছে, আপনি যদি আমার সাথে যান, তবে নিখিলেশকে কড়কে দিয়ে আসতে পারি; আমাকে সে ফেলে দেবে, কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের সাথে আপনার সখ্যতা নিখিলেশ জানে। তাই আপনি ওর সামনে গিয়ে ওঁকে কড়কে দিলে, ওই কায়েরের প্রাণপাখি উড়ে যাবার মত অবস্থা হবে। বুঝতে পারছেন স্যার, আমি কি বলছি!
আশুতোষ মেশমশাই – সেই খবর তো ওর বাবার কাছেও যাবে। আর সে তো আমার শ্যালিকার স্বামী। সে আমাকে যদি বলে যে আমি কোন অধিকারে, তাঁর কন্যার উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করছি, তখন আমি কি বলবো?
অমিয় স্যার – তখন আপনি নন, উত্তর দেবে, আপনার এই ছাত্রী। ও বলবে গোলা উঁচিয়ে যে, জীবনটা ওর, তাই কে ওর জীবনে হস্তক্ষেপ করবে আর কে করবে না, সেই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার একাকী ওর। ও সেই অধিকার উনার থেকে কেড়ে নিয়েছে, আর আপনাকে দিয়েছে।
আশুতোষ মেশমশাই – আর যদি এমন করার পরে, ওঁকে পরিবার থেকে বার করে দেয়!
অমিয় স্যার – আপনার মনে হয়, নিজের সামাজিক চিত্রকে সেই ব্যক্তি কলুষিত হতে দেবে! … যদি তাই করতেন উনি, তবে কি উনার মেয়ে যে ভাইসরয়ের স্ত্রীকে পড়াতে যান, তা হতে দিতেন! … স্যার, এঁরা প্রচণ্ড ভীরু, নিজেদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে এঁরা সব সময়ে সতর্ক থাকেন, তাই নয়কি স্যার! … শুধু সাহস করে, এঁদের সামনা করতে হয়। ক্ষমা করবেন স্যার, আমার অপশব্দ প্রয়োগের জন্য, কিন্তু বাঁদরের থেকে পালালে বাঁদর আপনাকে সারা শহর তারিয়ে তারিয়ে ছোটাবে। একবার যদি পাল্টা তেরে যান, তাহলে সেই যে গাছের ডালে উঠবে, আর নামবে না। … যদি ভুল বলি তবে ধরিয়ে দেবেন স্যার। বাঁদর হলো পৃথিবীর সব থেকে ভিতু প্রজাতি। আর সেই কারণেই তো মহর্ষি বাল্মীকি দেখিয়েছিলেন যে, রামনামে ভরসা করে, পৃথিবীর সব থেকে ভীরু প্রজাতিও সাহসী হয়ে গেছিল। ভুল বললাম স্যার!
আশুতোষ মেশমশাই রাজি হলেন অমিয় স্যারের কথাতে। আমাকে নিয়েই অমিয় স্যার আর আশুতোষ মেশমশাই চলে গেলেন নিখিলেশ বাবুর বাড়ি। আশুতোষ স্যারকে দেখা মাত্রই, জমিদারবাবু অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে গেলেন। জ্ঞানীগুনির উনারা কিছুই বোঝেন না; শুধু এটুকু বোঝেন যে, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় একজন ব্রিটিশের খাস লোক। ইনার সম্মান মানে সরকারকে সম্মান করা। তাই রীতিমত তোষামোদ করতে শুরু করলেন আমাদেরকে।
অমিয় স্যার মাঝখান থেকে বললেন – জমিদারবাবু, ইনাকে তো আপনি চেনেনই। আমি উনারই ছাত্র, এবং বর্তমানে প্রেসিডেন্সির একজন অধ্যাপক। আর এই মেয়েটিকে কি আপনি চেনেন?
জমিদারবাবুর ঘরে এই প্রশ্ন করার সময়েই নিখিলেশের আবির্ভাব ঘটে। উনি আমাকে দেখেই চিনে ফেললেন। উনিই তাই উত্তর দিলেন – উনার সাথে আমার বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে। বোধহয় আপনারা সেটা জানতেন না; নাহলে বিয়ের আগেই বাড়ির লক্ষ্মীকে বাড়িতে আনতেন না।
আশুতোষ মেশমশাই এবার মুখ খুললেন। উনি বললেন – ভুল ধারণা রয়েছে তোমার নিখিলেশ। বোধহয় স্কুলে অতিরিক্ত ফাঁকি মেরেছ, আর বাবার অন্নধ্বংস করেছ, বন্ধুদের সাথে মিলেমিশে। যদি স্কুলটা এমন ফাঁকি না মারতে, তাহলে নিশ্চয়ই জানতে বাড়ির প্রাণ থাকেনা; বাড়ি একটা নন-লিভিং অবজেক্ট। প্রাণ ব্যক্তির থাকে, আর ব্যক্তির স্ত্রী, সেই ব্যক্তির জীবনের লক্ষ্মী হন। … স্কুল তো ফাঁকি মেরেছ, বুঝতেই পারা যাচ্ছে, তা ব্রাহ্মণ তো তুমি! শাস্ত্র পাঠ করা হয়েছে, নাকি সেখানেও ফাঁকি? তাহলে তো নিশ্চয়ই জানো, লক্ষ্মী মানে যিনি লক্ষ, অর্থাৎ স্বামীর লক্ষ হয়, স্ত্রীর মান রক্ষা; আর কিসে স্ত্রীর মান রক্ষা হয়? তখনই স্ত্রীর মান রক্ষা হয়, যখন স্ত্রীকে সেই মানের অর্থ বুঝতে দেওয়া হয়। … তা একটু বলো তো বাবা, স্ত্রীকে মানের অর্থ কি করে বোঝানো সম্ভব?
নিখিলেশ যেন এমন প্রতিপক্ষ কনোদিনও পাননি। তাই অসম্ভব ধরনের অপ্রস্তুত হয়ে উঠলেন। … উনি কিন্তু কিন্তু করতে থাকলে, অমিয় স্যার উনাকে বললেন, দিকে দিকে ভাষণ দিয়ে বেড়ান নারীশিক্ষা বন্ধ করার ব্যাপারে, এখন মুখে খই ফুটছে না কেন?
জমিদারবাবুর মাথায় বোধহয় চলছিল একটাই কথা, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে খুশী করা, নাহলে ব্রিটিশ সরকার যে তাঁর অবস্থা খারাপ করে দেবে, হয়তো জমিদারিও নিয়ে নেবে! … তাই উনি ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন – স্যার কি প্রশ্ন করছেন বলো নিখিল, বলো। … স্যার খুব ভালো, একদম চিন্তা করো না, বলো।
আমার এই দৃশ্য দেখে এত হাসি পাচ্ছিল, কি বলবো। যেন মনে হচ্ছিল, ক্লাস ওয়ানের বাচ্চা আগন্তুকের সামনে মুখ খুলতে লজ্জা পাচ্ছে, তাই বাবা বলছে, বলো মানিক আমার, ওই যে নামতা মুখস্ত করেছ, বলো সেটা। কাকুকে শুনিয়ে দাও একবার। দাও দাও, কাকু লেবু লজেন দেবে। বলো…!
নিখিলেস মুখ খুললেন। কিন্তু আবোল তাবোল বললেন। বললেন, নারী … মানে নারীকে স্বামীর অনুসরণ করতে হয়। এটা করলেই নারী লক্ষ্মী, না হলেই অলক্ষ্মী।
আশুতোষ মেশমশাই এই কথায় ভয়ানক চটে উঠলেন। উনি বললেন – কি? একটা কুলাঙ্গার পুরুষকেও অনুসরণ করবে, তবেই লক্ষ্মী হবে! … এমন কথা তো শাস্ত্রে কোথাও লেখা নেই। তুমি কোথা থেকে এসব বস্তাপচা মিথ্যার ঝুড়ি কুরিয়ে এনেছ! … শাস্ত্র কি বলছে? পরাসর মুনি কি লিখেছেন নারীর ব্যাপারে? নারীর সতী হবার ব্যাপারে? … উনি বলেছেন, সেই নারীই সতী যিনি স্বামীকে সদা সত্যের মার্গে রাখেন। স্বামী যাতে সমস্ত অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে, সমস্ত ভ্রম থেকে, সমস্ত অহংকার থেকে, সমস্ত অজপঙ্কিল থেকে, মানে বোঝ, অজ মানে রিপুপাশ, আর পঙ্কিল মানে পাঁক, মানে সমস্ত রিপুপাশের পাঁক থেকে স্বামীকে মুক্ত করে, একজন পূর্ণ সাধু করে দেওয়াই স্ত্রীর কর্তব্য।
অমিয় স্যার এবার বললেন, কিচ্ছু বুঝলে না তো? কি করে বুঝবে, তোমাদের কাছে তো নারী কেবলই তোমাদের দেহকাম যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করে, তোমাদের সন্তানের জননী হবার জন্যই লক্ষ্মী। মুখ বন্ধ করে তোমাদের ফরমাইস পালন করে যাবে, তবেই তিনি নারী। … শাস্ত্র এই কথা বলে না। শাস্ত্র বলে, এক পুরুষ কামজর্জরিত থাকেন, অজপূর্ণ, অর্থাৎ রিপুপাশে সম্পূর্ণ ভাবে ঘিরে থাকে। আর তিনিই একজন সতী স্ত্রী, যিনি স্বামীর সমস্ত কামনাবাসনাকে ক্ষান্ত করে, তাঁকে রিপুপাশের থেকে মুক্ত করে, সন্তানের পিতা করে, সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণ করতে শিখিয়ে, সমস্ত সঙ্কীর্ণতা থেকে উদ্ধার করিয়ে, তাঁকে মধ্য জীবন থেকে সাধু করে তোলা।
অমিয় স্যার আবার বললেন, সত্য বলতে কি জানো নিখিলেস, আমাদের দেশের পুরুষেরা ভ্রমিত হয়েছে, কিন্তু নারীরা হননি। তাঁরা এখনও ঠিক এই কাজগটিই করে চলেছেন। আর তাই বাংলার ঘরে ঘরে এমন সাধু জেগে উঠছে। … কিন্তু তোমরা কি করছো, সেই নারীদের উপর অত্যাচারের মন্ত্রণা দিচ্ছ। সেই নারী যখন বহির বিশ্বকে জানতে চাইছে, আর সেই জানাকে নিজের সংসারে প্রয়োগ করতে চাইছে, তাদের বাঁধা দিচ্ছ। কেন দিচ্ছ? যাতে, তোমাদের মদ্যপান, বেশ্যালয়ে যাওয়া, বাইজি নাচ দেখা, জুয়া খেলা অব্যাহত থাকে, এই তো কারণ! …
আশুতোষ মেশমশাই আবার মুখ খুললেন। তিনি বললেন – শোনো নিখিলেশ, তোমরা যেই ভাবে স্ত্রীদের আটকে রাখার চেষ্টা করছো না, এতে হিতে বিপরীত করে দিচ্ছ। এখনও পর্যন্ত স্ত্রীরা কেবল জগতকে দেখে, তার থেকে শিক্ষা নিতে, এবং তাকে সংসারে প্রয়োগ করে, সংসারের পুরুষগুলিকে উন্নত করতে আগ্রহী। কিন্তু যেই আচরণ করতে তোমরা পুরুষদের শেখাচ্ছ, আর স্ত্রীদের যেই ভাবে নজরবন্দি করার চেষ্টা করছো, এর ফল কি হবে জানো? এর ফল এই হবে যে, স্ত্রীরা আর পুরুষদের কল্যাণের চিন্তা করাই বন্ধ করে দেবে, আর কেবল জগত দেখার জন্য নয়, জগতে নিজেদের সত্ত্বা স্থাপনে এগিয়ে যাবে। … একবার যদি তা হয়, নিখিলেশ, সমস্ত পুরুষজাতি চাকরি, বাণিজ্য, সমস্ত কিছু থেকে মুক্ত হয়ে যাবে, আর হতাশায় দিন কাটাবে।
অমিয় স্যার সেই কথার রেশ ধরে বললেন, নিখিলেশ, নারীদের বাইরে বার হওয়া থেকে আটকে রাখার সঙ্কীর্ণ এই প্রয়াস বন্ধ করো, আর নারীদের বারবার তাঁদের গুরুদায়িত্ব পালন করতে শেখাও। নারীদের শেখাও যে, তাঁদের হাতেই নির্ভর করছে, সমাজ সুন্দর সুশীল হবে কিনা। তাঁরা নিজেরা বাইরে বেরিয়ে সত্য জেনে, পুরুষকে যদি সত্য মার্গে, অর্থাৎ অজপঙ্কিল থেকে উদ্ধার করতে পারে, তবেই সমাজ সুন্দর ও সুশীল হবে। যেই কাজ তুমি করছো নিখিল, তাতে সমাজে অস্বস্তি বাড়ছে বই কমছে না।
তোমাদের কাজের ফলে, নারীদের মধ্যে ক্ষোভ বিক্ষোভ বাড়ছে, আর এখন তাঁদের যে বাইরে বেরিয়ে নিজের চোখে জগত দেখার ইচ্ছা রয়েছে, তা ক্রমশ জগতকে নিজের পায়ের তলায় রাখার ইচ্ছায় পরিণীত হতে চলেছে। আর একবার যদি তা হয়ে যায়, নিখিল, নারীশক্তিকে ভুলে যেও না। তাঁরা পুরুষকে এগোতে দেয়, তাই পুরুষ এগিয়ে যায়। যেদিন তাঁরা পুরুষকে এগোতে না দিয়ে, নিজেরা আগ্রাসনে নামবে, এই সভ্যতার সমস্ত ভারসম্যতা নষ্ট হয়ে যাবে, আর যদি সামান্যও শিক্ষা থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই জানো, বাকি পশুদের থেকে আমরা আলাদা আমাদের এই সৌখিন ভাবে সাজিয়ে রাখা এই সমাজের জন্য। এই সমাজ একবার বিগরে গেলে, সম্পূর্ণ মানবজাতিকে প্রকৃতি বিলীন করে দিতে ব্যাস কিছু দশক বছরই নেবে। সেই বুঝে সামনে চলো।
আর হ্যাঁ, ইনাকে কেন এনেছিলাম তোমার বাড়ি? উনি পড়াশুনা করবেন। যদি বিয়ের পরও পোড়ানোর প্রতিশ্রুতি সরকারি ভাবে দাও, মানে তোমার কথাকে ব্রিটিশ সরকারের নোটারি করে নেব। আর যদি তার অন্যথা হয়, তবে বুঝতে পারছ, ব্রিটিশের জেলে তোমাকে বাকি জীবনটা … বাকিটা, তুমি বুদ্ধিমান, তাই আর বললাম না।
এর বেশি আর কিছু বললেন না, আমরা চলে এলাম। আশুতোষ মেশমশাইএর প্রিয় ছাত্র হলেন অমিয় স্যার। পুরো নাম অমিয় চট্টোপাধ্যায়। সত্যিই প্রিয় হবারই যোগ্য উনি। উনার তেজ আর প্রতাপ যেমন, তেমনই উনার জ্ঞান, বুদ্ধি ও শিক্ষার প্রখরতা।
এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই বাবার কাছে নিখিলেশ ও তাঁর পিতা আসেন, আর আমাদের কথা ঘনাক্ষরেও উচ্চারণ না করে, এই বিবাহ বাঞ্চাল করে দিয়ে চলে যান। বাবা অনেক হাতেপায়ে ধরেন, কারণ জানার জন্য, কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের ভয়ে, উনারা সেই কথা উচ্চারণও করতে পারেন না। সেই ঘটনার পর, বাবাকে দেখলাম, অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে যেতে। ঠিকই বলেছিলেন অমিয় স্যার। ইনাদের মানসম্মানই প্রাণবায়ু। সেটা চলে গেলেই, এঁরা মৃত্যুশয্যায় চলে যান। …
