বঙ্গভঙ্গ | ঐতিহাসিক উপন্যাস

সময়টা মোটামুটি ১৯০০ হবে, কথা শুনিয়েছিলেন আমাকে আশুতোষ মেশমশাই। মজার মানুষ উনি এক্কেবারেই ছিলেন না। এক্কেবারে গুরুগম্ভীর মানুষ, এমনি এমনি কি উনাকে বাংলার বাঘ বলা হতো! … তবে যেমন পুঁথিগত বিদ্যা, তেমনই প্রকৃতি জ্ঞান; যেন মা সরস্বতীর বরপুত্র ছিলেন উনি। রসিকতা বিহীন হতো তাঁর সমস্ত কথা, কিন্তু জ্ঞানই প্রকৃত রস, এমন ধারণা রাখতে পারলে, তাঁর থেকে উচ্চকোটির শিক্ষক, সারা পৃথিবীতেই খুব কম পাওয়া যায়।

এই গুরুগম্ভীর ভাবের কারণে, উনি আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছে একদমই জনপ্রিয় ছিলেন না। কিন্তু আমার ছিল একটু ইতিহাস জানার ইচ্ছা, আর সেই ইতিহাসকে বাস্তবতার নজর দিয়ে দেখানোর সামর্থ্য উনার থেকে কারুরই বেশি ছিল না। তাই আমি উনার কাছে প্রায়ই বসে উনার কথা শুনতাম। উনি বলতেন, মানুষের সংগ্রামটা বাকি জীবদের থেকে অনেকটাই আলাদা। বাকি জীব আহার নিদ্রা আর মৈথুনের জন্য সংগ্রাম করে, কিন্তু মানুষ সংগ্রাম করে, মানের জন্য, আর যখন সেই সংগ্রামের সাথে বৈষয়িকতা যুক্ত হয়ে যায়, অর্থাৎ প্রকৃতিবিরুদ্ধ হয়ে ওঠে যখন এই সংগ্রাম, তখন মানুষের লড়াইটা আর সংস্কৃতি পর্যন্ত সীমিত থাকেনা, সেটা আধিপত্য স্থাপনের সংগ্রাম হয়ে ওঠে।

এমনই হয়েছিল বাংলায়। উনি বলেন, বাংলা একটি রাজ্য যা ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে মুসলিম নবাবজাদাদের শাসনে ছিল। না, তাতে না হিন্দুর আর না মুসলমানের কনো সমস্যা ছিল, কিন্তু সমস্যাটা হয় তাঁদের, যারা ক্ষমতায় ছিল। ব্রিটিশ শাসন কায়েম হবার কালে, মুসলিমরা ব্রিটিশদের গুরুত্ব দেয়নি, ওদের সাথে ব্যবসা করতে চায়নি। যদি ব্যবসা করতো, তবে হয়তো আজ ভারতের অবস্থান অন্য হতো; হয়তো এখানে ব্রিটিশ শাসক হয়ে নয়, শরণার্থী হয়েই থাকতো। কিন্তু মুসলমান নবাবরা এই গোরাদের স্বার্থপর বাণিজ্যনীতিকে মানতে পারেনি।

অর্থাৎ, নবাবরাও বাণিজ্য করতেন, কিন্তু সেই বাণিজ্য করার সময়ে, যেমন তাঁরা নিজেদের লাভের চিন্তা করতেন, তেমনই যাদের সাথে বাণিজ্য করছেন, তাঁদেরও যাতে ক্ষতি না হয়, সেটাও দেখতেন। কিন্তু এই গোরাদের ধারা অন্য। এরা মনে করে যে, সামনের জনের স্বার্থ যদি রক্ষা হয়, তবে তাঁদের নিজেদের স্বার্থ কিছুতেই চরিতার্থ হতে পারেনা। আর তাই এঁরা বাণিজ্য করার সময়ে, এটা অবশ্যই খেয়াল রাখতেন। মানে, এঁরা সব সময়ে এমন চেষ্টায় থাকে যে, যার সাথে বাণিজ্য করা হচ্ছে, তাদের স্বার্থে আঘাত লাগবে; এঁদের ধারণা অনুসারে, তখনই এঁদের স্বার্থ চরিতার্থ হবে।

আর নবাবরা এঁদের এই মানসিকতাটাই সহ্য করতে পারেনা, কারণ তাঁরা শাসক হলেও, প্রজাকে শোষণের চিন্তা রাখতেন না; এঁরা বাণিজ্য করলেও, একা তাঁরই উন্নতি কামনা করতেন না। এঁদের ধারণা আমাদের প্রাচীন ভারতীয় ক্ষত্রিয়মতের সাথে খুবই মেলে। যেমন ক্ষত্রিয়দের ধারণা এমন ছিল যে, প্রজা ভালো থাকলে, তবেই রাজা সুখে থাকবে; যেমন তাঁরা ভাবতেন যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক তখনই সুদৃঢ় হয়, যখন বাণিজ্য করা দুই পক্ষরই স্বার্থ চরিতার্থ হয়, তেমনই নবাবরা মনে করতেন।

কিন্তু ব্রিটিশদের ধারণা অনেকটা ইহুদিদের মত, আর তাই ব্রিটিশ বা গোরারা, মুসলমান নবাবদের কাছে অনেকটা ইহুদির উত্তরসূরির মতই। ইতিহাস ঘাঁটলেও এমনই সত্য বেরিয়ে আসে। ইহুদিদের সাথে রোমানদের মেলবন্ধন হবার পর যেই জাতির উৎপত্তি হয়, তারাই ব্রিটিশ, ফরাসী, বা ইউরোপের অন্যদেশের লোক, এবং তাঁদের দ্বারা স্থাপন করা আমেরিকা। অর্থাৎ ইতিহাসও এই বলে যে, এঁরা যতই খ্রিস্টান হোক না কেন, এঁদের মধ্যে দিয়ে ইহুদি রক্তই বইছে। আর ইহুদিদের এই চূড়ান্ত স্বার্থপর মানসিকতার বরাবরই বিরোধী হলেন মুসলমান।

আর সেটিই হয়তো কারণ যে মুসলমান নবাবরা এই ব্রিটিশদের সাথে বাণিজ্য করতে কিছুতেই রাজি ছিলেন না। আর তার ফলে কি হয়, নাছোড়বান্দা মনোভাব তো ইহুদিদের বরাবরেরই স্বভাব। তারা নবাব অধিষ্ঠিত, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, ঢাকা ছেড়ে, একটা অন্য ঘাটি গোড়ে তুললো এই কলকাতায়। ব্রিটিশরা না বনিক আর না ক্ষত্রিয়; এঁরা দুই বর্ণের মেল হওয়া এমন এক জাতি, যারা একই সঙ্গে ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য জাতি, উভয়েরই থেকে সুবিধাটা নিয়ে নেয়, আর দায়বদ্ধতাটা ফেলে দেয়।

তাই এঁরা যখন দেখলো যে বৈশ্য ব্রিটিশ প্রাধান্য পচ্ছেনা, তখন ক্ষত্রিয় ব্রিটিশকে নিজেদের মধ্যে জাগালো, আর শক্তিসঞ্চয় সম্পন্ন হলে, শক্তির সাথে ছলরূপী কৌশলকে একত্রিত করে, ইসলাম নবাবদের হারিয়ে দিয়ে, নিজেরা শাসকের আসনে বসলো। এরপর আগ্রাসন, আর সেই আগ্রাসনের ফলে আজকের অখণ্ড ভারত, যা কাশ্মীর থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত লম্বায় ব্যপ্ত, আর মুলতান থেকে বর্মদেশের সীমান্ত পর্যন্ত চওড়ায় ব্যপ্ত।

এই আগ্রাসনের পর, এইদেশের অসম্ভব একত্রিত সম্পত্তি লুণ্ঠনের সময় আসে। আর তার জন্য প্রচুর দাসের প্রয়োজন হয়, আর সেই দাস নির্মাণের জন্য ইংরাজি শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়, আর জমিদারী প্রথা শুরু হয়। এই নতুন কর্মকাণ্ড শুরু হবার সময়ে চার ধরনের মানুষ একত্রিত হয়।

প্রথম হলো ব্রিটিশ নিজে, যারা অত্যন্ত স্বার্থপর, স্বার্থ চরিতার্থ করা ছাড়া যারা কিছু বোঝেই না। দ্বিতীয় ইসলাম বিশেষ ব্যক্তিত্বরা, যারা নিজের স্বার্থ আর প্রজার স্বার্থ মিলিয়ে যা হয়, তাকেই নিজের স্বার্থ মনে করে, আর সেই স্বার্থে কেউ যদি আঘাত আনতে চেষ্টা করে, তবে তাকে শত্রু মনে করে। তৃতীয়, হিন্দু ভারতবাসী, যারা নিজেদের স্বার্থ কি, সেটা বোঝেই না; যেমন বোঝানো হয়, তেমনটাকেই নিজের স্বার্থ মনে করে। আর চতুর্থ হলো বাঙালী হিন্দু, যারা নিজেদের স্বার্থ অসাধারণ ভাবে বোঝে, কিন্তু কনো ভাবে একগুঁয়ে নয়; অর্থাৎ যে তাঁদের স্বার্থ হনন করতে যাচ্ছে, তাঁর সাথে এঁরা মিশে যাবে আর মিশে গিয়ে তাঁদের মধ্যে থেকেই নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নেবে।

এই চতুর্থ জাতিটির মেধা দেখে, ব্রিটিশ হতবম্ব হয়ে যায়; ইহুদি ইসলাম দেখেছে, গোঁড়া ইহুদি দেখেছে, গোঁড়া হিন্দু দেখেছে, কিন্তু এই জাতি অর্থাৎ বাঙালী জাতি সবার থেকে আলাদা। এঁরা একদমই গোঁড়া নয়, কিন্তু অসামান্য মনযোদ্ধা এঁরা। সংগ্রাম এঁরা করে, আর সবার থেকে বেশি করে, কিন্তু মৌন ভাবেই এঁরা সংগ্রাম করে, যা দেখে মনে হয়না যে সেটা সংগ্রাম। অর্থাৎ এঁরা, সাধারণ জীবনযাপনকেই সংগ্রামের মত করে বাঁচে, আর তাই এঁরা জীবনের সমস্ত ব্যাপারে প্রচণ্ড ভাবে সতর্ক। এঁরা বিলাসিতা করলেও, মানবিকতার ভান হারিয়ে ফেলেনা; নিজে উন্নতি করলেও, পাশাপাশি অনেকের উন্নতি সাধন করতে সদাতৎপর; এঁরা অদ্ভুত ধরনের দেশপ্রেমী, যারা দাবি তো করেনা যে তাঁরা দেশপ্রেমী, কিন্তু দেশপ্রেম যেন তাঁদের রক্তের প্রতিটি কণাতে বইছে।

ব্রিটিশ ক্রমশ বুঝতে শুরু করে যে এই বাঙালী জাতি এমনই এক জাতি যারা আধ্যাত্মিকভাবে, ভাষাগতভাবে, সংস্কৃতিগত ভাবে, এককথায় সমস্ত উপায়ে অদম্য। মেধা এঁদের বিশ্বশ্রেষ্ঠ, কিন্তু সেই মেধা কখনোই মানবিক মুখ হারিয়ে ফেলে না; শক্তি এঁদের অসিমিত, কিন্তু অহেতুক শক্তির ব্যবহারে এঁরা রুচি রাখেনা; জীবন সম্বন্ধে এঁদের অগাদ জ্ঞান, কিন্তু সেই জ্ঞানকেও এঁরা অকারণে প্রচার করে, নিজের জন্য নাম কেনে না। … এই বিরল জাতির সাথে শত্রুতা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে, এমন ধারণা করেই, ব্রিটিশ এঁদেরকে শাসন না করে এঁদেরকে বন্ধু মানতে শুরু করে। আর সেই কারণে, যখন ইসলামরা তাঁদেরকে আশ্রয় দেয়নি, তখন তাঁদের যেই অসামান্য প্রতিভাবান জাতি, যা সারা ভারতবর্ষের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনেরই মেধা, দেশপ্রেম এবং আধ্যাত্মিক উচ্চতা নিজের মধ্যে ধারণ করে রাখে, আর যারা তখন ব্রিটিশদের আশ্রয় প্রদান করেছিল, তাঁদেরকেই জমিদারী প্রদান করতে শুরু করে।

আর এখানথেকেই গোল বাঁধতে শুরু হয়। যেই মুসলমানরা যবে থেকে ভারতে এসেছে, তবে থেকে ভারতকে শাসনই করেছে, এখন তাঁদেরকে কারুর জমিদারীর মধ্যে থাকতে হচ্ছে। আর এটা তাঁদের কাছে একটা গলার কাঁটা হয়ে ওঠে। আর সেই কারণে, হিন্দু জমিদারদের জমিদারীর কাজে মাঝে মধ্যেই বাঁধা দিতে থাকছে তাঁরা। না এমন ভাবার কনো কারণ নেই, যে আপামর বাঙালী মানুষের মধ্যে এর কনো প্রভাব পরে, কারণ ৫০-৫০ হিন্দুমুসলমানের দেশ এই বাংলা সেই ৫০০ বছর ধরে; এঁদের কাছে হিন্দু আর ইসলাম আলাদা কিচ্ছুই নয়। সমস্যা এখানে এলিট ক্লাসের, মানে এলিট হিন্দু, যারা জমিদার আজকে, আর এলিট মুসলমান যারা নবাবপক্ষের ছিল ১০০ বছর আগেও, এই ফুইজনের মধ্যে।

হিন্দু জমিদার ব্রিটিশের বন্ধু, আর ব্রিটিশ বা ইহুদি এমন একটা জাতি, যারা না তো মানে বাবা-মা, না মানে স্বামী-স্ত্রী আর না মানে সন্তান-সন্ততি, কিন্তু হ্যাঁ, এঁরা বন্ধুকে অসম্ভব ধরনের শ্রদ্ধা করে। এঁদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করে, এঁরা তাঁকে একদমই গুরুত্ব দেয়না, বরং কুকুরছাগল মনে করে; কিন্তু এঁরা যাদের সাথে বন্ধুত্ব করে, তাঁদের জন্য এঁরা সবসময়ে মাথাব্যাথা করে। আর সত্যি বলতে কি, এই সমস্ত বিশ্বে, এই ইহুদিরা একমাত্র বাঙালীকেই নিজের বন্ধু মানতে পেরেছে, আর কারুকে সে নিজের সমগোত্রীয় বন্ধু হবার যোগ্য মনে করতে পারেনি।

তাই হিন্দু জমিদারদের সমস্যা, আর সেই সাথে সাথে নিজেদের জমিদারীতেও সমস্যাকে দেখে, এঁরা বাংলাকে ১৯০৫ সালে ভাগ করে দেবার কথা বলে। … কিন্তু ওই যে বললাম, বাঙালী একটা অদ্ভুত জাতি। যাই ভাগের কথা শুনলো এঁরা, তাই সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেল, আর বলতে থাকলো, না তারা এই ভাগ চায়না। … হিন্দু জমিদাররা দেখলো, তাঁদের জমিদারীর বেশিরভাগ অংশই তো ঢাকা কেন্দ্রিক। তাই যদি বাংলা ভাগ হয়ে যায়, তবে তাঁরা সমস্ত জমিদারী হারাবে। তবে মুসলমান এলিটরা এই প্রস্তাবে খুশী হলো; তাঁদের মনে হলো আবার তাঁরা শাসন করতে পারবে।

কিন্তু বাঙালী যে এক বিচিত্র জাতি। এখানে এলিট ক্লাসের ভরসায় সাধারণ মানুষ থাকেনা, বাকি ভারতের মত। মেশমশাই বলতেন, লোকে বলে, যা বাংলা আজকে ভাবে, সারা ভারত ১০ বছর পরে ভাবে, কিন্তু কথাটা ডাহা মিথ্যা। একই কথা অন্য আরেকজনও বলতেন, তাঁর নাম ছিল অমিয়। তবে তিনি বলতেন, সত্য এই যে বাঙালী যা ভাবে, ভারত তা কস্মিনকালেও অনুভব করতে পারেনা, আর কনোদিনও পারবে না।

উনি বলতেন, বাংলা কখনোই একাকী ভৌতিকজগতে উন্নতিকে উন্নতি বলেনা। যেই উন্নতির মধ্যে কলার বিস্তার নেই, আধ্যাত্ম্যের বিস্তার নেই, আর প্রকৃতিপ্রেম নেই, তাকে বাঙালী উন্নতিই মনে করেনা। সেই কারণেই প্রতিবেশী দেশ যখন চাণক্যের রাজত্বে এসে জঙ্গল সাফ করে, শহর আর কৃষিক্ষেত্র নির্মাণে ব্যস্ত ছিল, তখন এই প্রকৃতিবিদ্বেষী, মানুষের নামে কলঙ্ক, চাণক্যকে বাংলা  স্বীকার করেনি। স্বীকার করেনি তারা আধ্যাত্মবিরোধী, আগ্রাসননীতিকে, যেখানে আধিপত্যই শেষ কথা। বাংলা কখনোই মনে করেনা বড় টেরিটরি মানেই শক্তিশালী দেশ। বাঙালী মনে করে শক্তি আমাদের অন্তরে স্থিত, আর যতটা অন্তর থেকে আমরা শক্তিশালী, ততটাই শক্তি আমাদের; অর্থ, দেশের পরিধি, এই সমস্ত কেবলই বাহ্যিক উন্নতির লক্ষণ, যা বাস্তবে ধ্বংসের প্রতীক।

বাঙালী তাই ইতিহাস দেখিয়ে বলে, যদি এই অশান্তি আর স্বার্থপরতা আর প্রকৃতিবিরোধী চাণক্যের নীতি ভারতবন্ধু হতো, তবে কখনোই সেই অশোক মৌর্যপরিবারে জন্মগ্রহণ করতো না, যেই অশোক একাকী সহস্র মানুষের হত্যা করেছিল। চাণক্যের নিকৃষ্ট প্রকৃতিবিরোধী এবং মনুষ্যত্ব বিহীন আগ্রাসনকে যিনি অনুসরণ করেছিলেন, তিনি হলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। আমাত্য যতই হতচ্ছাড়া হোক, কখনোই তিনি প্রজার অবস্থার উত্তরাধিকার নন, তাই প্রজার মধ্যে যে বিষ চাণক্যের কারণে সঞ্চার হয়, যেই আগ্রাসনের নীতি সঞ্চার হয়, আর যেই প্রকৃতি বিরোধী, অর্থাৎ জঙ্গল সাফ করে ক্ষেতের নির্মাণ করার মনোভাব জন্ম নিক না কেন, তার ফল চাণক্য কিছুতেই পাবেনা, কারণ সে মাত্রই আমাত্য। কর্ম করেছেন রাজা, আর তাই ফলও পেতে হয়েছে রাজাকেই, আর তাই বিন্দুসার আসে, আর তাঁর ছেলে অশোক হয়ে ওঠে সেই প্রকৃতির প্রতি অক্ষম্য অপরাধ করা চাণক্যনীতি অনুসরণকারি চন্দ্রগুপ্তের কর্মের ফল, যা সম্পূর্ণ মগধ, কলিঙ্গ সমস্ত ক্ষেত্রকে রক্তাক্ত করে দেয়।

জঙ্গল সাফ করিয়েছিল চাণক্য, করেছিল চন্দ্রগুপ্ত, আর সেই বৃক্ষদের প্রাণ নেবার, প্রকৃতিকে অত্যাচার করার প্রতিদান নিলো প্রকৃতি, সেই চন্দ্রগুপ্তের নাতি, অশোকের হাত দিয়ে রক্তপাত করিয়ে। কিন্তু বাঙালী এই চাণক্যকে না অসুসরন তখন করেছিল, আর না এখন করে। সারা ভারতের কাছে চাণক্য হিরো, কারণ সারা ভারত কেবল ধন আর ক্ষমতা বোঝে; কিন্তু বাংলার কাছে চাণক্য সেদিনও ভিলেন ছিল, আর আজও আছে, কারণ বাঙালী সেই অর্থকেই অর্থ বলে, যা জীবনকে অর্থপূর্ণ করে, বাকি অর্থ বাঙালীর কাছে অনর্থের কারণ মাত্র। … কিন্তু অমিয় বলতেন, সারা ভারত না তো এতকাল পরেও সেই সত্য বুঝেছে, আর না কনোদিন বুঝবে। তাই বাঙালী আজ যা ভাবে, ভারত দশবছর পরে কেন, কস্মিনকালেও বুঝবে না। বাংলা বুদ্ধি দিয়ে অনুভব করার মত মুর্খামি করেনা, কারণ বাঙালী জানে বুদ্ধি আমাদের অনুভব করাতে সক্ষমই নয়। বাঙালী হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, আর বাকি ভারতের পক্ষে, সেটা করা অসবম্ভব এক কাজ, কারণ ভারতবাসি হৃদয়কে অনুভবই করতে ব্যর্থ।

যাইহোক, এবার আশুতোষ মেশমশাইএর কথাতে ফিরে আসি। উনি বললেন, ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ চিত্র, মুসলমান শাসক ছাড়া সকলের কাছে বিভীষিকা হয়ে ওঠে। আর পরে মুসলমান শাসকরাও মত পালটে নেন কারণ সাধারণ মুসলিম বাঙালী এই বঙ্গভঙ্গকে বিষনজরে দেখতে শুরু করে; কারণ তারা আর হিন্দুরা এই বাংলায় আলাদা একটা সাম্প্রদায়িক বিশ্বাস নিয়ে থাকলেও, এঁদের ওঠাবসা, খাওয়াদাওয়া, সভ্যতা,  সংস্কৃতি, সমস্ত কিছু একই সাথে চলে। এঁরা একে অপরকে আলাদা বলে কিছু মনেই করতে পারেনা।

তাই শেষে মুসলমান শাসকরাও নিজেদের বঙ্গভঙ্গের ইচ্ছাকে ঝেড়ে ফেলে দেয়। আর তাই দেখে ব্রিটিশও সেই একই কাজ করে। কিন্তু এখানে হিন্দু জমিদাররা আর মুসলিম আধিকারিকরা একটা বিষয়ে একত্রিত হতে শুরু করে। তারা মানতে শুরু করে যে, না এমন করলে চলবে না যে, খালি হিন্দু জমিদার থাকবে। কিছু একটা বিহিত প্রয়োজন এর। আর তাই হিন্দু জমিদাররা, মুসলমান ভাইদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে, ব্রিটিশ সরকারের কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, এই শুধু হিন্দু আর শুধু মুসলমান ব্যাপারটা চলবে না। এর একটা বিহিত দরকার।

সেই বিহিতের চিন্তাতে ব্রিটিশ এবার একটি যজ্ঞ শুরু করে, যার কারণে ভারতবর্ষে প্রথম শাসক কে হবে, সেই নিয়ে ইলেকশন কমিশন বসে। আর সেই কমিশনকে বলা হতো বেঙ্গল লেজিস্লেটিভ এসেম্বলি। আর সেই এসেম্বলি অনুসারে, মুসলিম সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা এই ৮০ মত থাকে, আর বাকি ১৪০টা মত আসনে হিন্দু জমিদার ও মুসলমান নবাবরা ইলেকশানের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে, এসেম্বলিতে এমএলএ, মানে মেম্বার অফ লেজিস্লেটিভ এসেম্বলি হয়ে যোগদান করবে।

আর সেই অনুসারেই এই ভোটাভুটি চলছে। আসলে, আমি মেশমশাইকে এই ভোটাভুটি, যা তখন সারা ভারতে প্রচলিত ছিলনা, তার ইতিহাস জানতে চেয়েছিলাম। সালটা বোধহয় ১৯৩৬ হবে, আমি তখন প্রেসডেন্সি থেকে গ্রেজুয়েশন করছি, সেই সময়ের কথা। 

এখানে আমি মাঝে এই প্রথম কথা বললাম। আমি বললাম – ঠাম্মি, তুমি সেই সময়ে, প্রেসিডেন্সি থেকে গ্যেজুএট!

ঠাম্মি বললেন – আর বলো না দাদুভাই, এই পড়াশুনা নিয়ে কম হট্টগোল হয়েছিল! … আমার বাবা নারী শিক্ষার ঘোর বিরোধী, আর আমার ছিলো পলিটিক্স, হিস্ট্রি আর ভূগোল জানার প্রচণ্ড উদ্যম। শেষে, আশুতোষ মেশমশাই তখনকার ভাইসরয়, আলেকজান্ডার হোপের স্ত্রীকে বাংলা শেখানোর কাজে নিযুক্ত করে দিলেন। ভদ্রমহিলার বাংলা শেখার খুব প্রচেষ্টা, আর তাই আশুতোষ মেশমশাই, আমাকে উনার বাংলা শিক্ষিকা করে নিয়োগ করলেন। মাসে ২০ টাকা দিতেন। সেই সময়ে ২০ টাকা মানে বুঝতে পারছো, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ২০ হাজার টাকার সমান। … আশুতোষ মেশমশাই নিজেই ১০০ টাকার বেতনে কাজ করতেন, আর সেই বেতনের কারণে তিনি ছিলেন একজন বিশেষ বিত্তবান ব্যক্তিত্ব।

সেই ২০ টাকা দিয়ে আমি প্রেসিডেন্সিতে ছাত্রী হই। আর আমার বাবা যখন দেখলেন, আমাকে কিছুতেই আটকাতে পারছেন না, তখন একটা জমিদারের ছেলের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করতে শুরু করে দেন। আমার তখন বিকট অবস্থা। একদিকে জানার প্রচণ্ড খিদে, আর প্রেসিডেন্সিতে চান্স পেয়ে সেই জানার খিদে মেটানোর সুযোগ পেয়েছি, আর অন্যদিকে বিয়ে দেবার চিন্তা করছেন বাবা তাঁর সাথে, যিনি নারীদের কেন শিক্ষা দেওয়া উচিত নয়, সেই নিয়ে সভা করেন জায়গায় জায়গায়। অর্থাৎ এই বিয়ে হলে আমার পড়াশুনার ইতি।

এই সমস্ত কিছুনিয়ে এমনই বিপাকে আমার জীবন চলে গেল যে, আমি একদিন ঠিক করে নি যে, আমি আত্মহত্যা করবো। বেঁচে থাকলেই জানার খিদে আমাকে পড়াশুনা না করে থাকতে দেবেনা। আর বাবা থাকতে আমার পড়াশুনা হতে দেবেন না। তাই মরে গেলেই, সব দিক থেকে শান্তি। মরা ওত সোজা নাকি! … সিদ্ধান্ত নিতে প্রায় একমাস চলে গেল। আর একমাস পরে আমি নিশ্চিত করি আমার মনকে যে আমি এবার আত্মঘাতী হবো।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8