দ্বিতীয় পর্ব – বাঙ্গালীর উত্থান
দাদু ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে বলতেন, ব্রিটিশ যখন বনিক সেজে এই দেশে পা-রাখে, তখন আমরা তাদেরকে তেমন গুরুত্ব দিইনি। আসলে আমরা ছোট থেকে জেনে এসেছি যে, শিক্ষা দেয় ব্রাহ্মণ, তাই ব্রাহ্মণ হলেন গুরু; শাসন করেন ক্ষত্রিয়, তাই রাজা হলেন ক্ষত্রিয়; আর ব্যবসা করেন বনিক, তাই তারা তৃতীয় বর্ণ। কিন্তু বিদেশের মাটিতে তা কনো কালেই ছিলনা। বিদেশে বরাবরই বাণিজ্যের সেরারাই হতেন রাজা, বা নাইট। তাই আমরা ব্রিটিশদের প্রথমে দেখে তেমন গুরুত্ব দিইনি। …
আসলে রাজারাও যে বাণিজ্য করে, সেটা আমরা কোথায় জানতাম! … ঘুনি, দাস, পাঠান, মোঘল, সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০-৬০০ বছর ধরে আমরা দেখে আসছি যে কনো না কনো নবাব মানে জাহাঁপনাই দেশ চালাচ্ছেন। তাই আমরা রাজনীতির ভিতরে কি চলছে জানতাম না। কিন্তু যারা রাজত্ব করছিলেন, তাঁরা তো জানতেন। তাই ব্রিটিশ যখন যখন মুর্শিদাবাদ আর ঢাকায় বাণিজ্য করার চেষ্টা করতেন, তখন তখন নবাবরা তাদেরকে খেঁদিয়ে তারিয়ে দিতেন।
বারবার বিতাড়িত এই লালচামড়ার মানুষের মত দেখতে, কিন্তু কনো ভাবেই মানুষ নয়, সেই জীবদের প্রতি আমাদের, মানে এই দক্ষিণ বঙ্গের মানুষদের দয়া হয়। মনে হয় যেন, নবাবরা এমন করছে কেন? এঁদেরকে দেখলেই দুরদুর করে তারিয়ে দিচ্ছে! … এরা তো সামান্য বৈশ্য, মানে বনিক। … এঁদের সাথে এমন করার কারণ কি? … যাইহোক, নদীয়া, বা নদীয়া সংলগ্ন মুর্শিদাবাদ বা ২৪ পরগণার মানুষরা হয়তো এর কারণ জানতো, কিন্তু হুগলী বা হাওড়া বা গোবিন্দপুর, সুতানটির মানুষরা কিচ্ছু জানতো না এই ব্যাপারে। নবাব-বনিকের ব্যপার, হয়তো দামে পোষাচ্ছে না, তাই এই গোরাদের তারিয়ে দিচ্ছে। … এঁরাও হয়তো দাম কমিয়ে কমিয়ে, ঠিক একসময়ে বাণিজ্য শুরু করে দেবে। … এমন ভেবে, হুগলী, হাওড়া আর গোবিন্দপুর-সুতানটি চত্বরের মানুষরা এঁদেরকে আস্তানা দিল।
হুগলীতে তখন পর্তুগিজ, ডাচ, আর ফরাসীরা ইতিমধ্যেই বসে ব্যবসা করছে। তাই তাঁরা ব্রিটিশকে বলল, ভাই তুমি এখানে থাকতে পারবেনা। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখো, কনো ঝোপঝাড় পেলে, নিজের আস্তানা গেড়ে ফেল। … ব্রিটিশ তাই জঙ্গলজাতিয় এলাকা গোবিন্দপুর সুতানটিতে নিজেদের তাঁবু ফেলল। ধীরে ধীরে কলকাতা শহর গড়ে তুলল তারা, সুতানটি, গোবিন্দপুর তুলে দিয়ে, আর ধীরে ধীরে সেই শহর প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠতে থাকলো বাংলার। … মানে, যেই নবাবরা এই ব্রিটিশদের সাথে ব্যবসা করতে চাইছিল না, সেই নবাবরা যাদের সাথে বাণিজ্য করতো, তাদের সাথে লেনদেন শুরু করে দেয় ব্রিটিশ। …
তাই স্বাভাবিক ভাবেই নবাবদের গায়ে লাগে। তাঁদের এত মেহনত করা ব্যবসাকে অন্যকেউ লুটে নিয়ে চলে যাবে, সেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে তাঁরা! তাই ব্রিটিশদের হুমকি দিতে থাকলো, কলকাতা থেকে সরে যাবার। …
কিন্তু ব্রিটিশ যে আমাদের ভারতীয় ধারার বৈশ্য নন; এরা যে সেই ক্ষত্রিয় যারা ব্যবসা করেন। তাই ব্রিটিশরা দিলেন বড় ধরনের বাঁধা। সেই বাঁধা এতটাই গভীর হয়ে উঠলো যে নবাবদের মাথায় চিন্তার ভাঁজ পরে গেল। সিরাজউদল্লা ব্রিটিশদের এবার সরাসরি হুমকি দিতে থাকলো। কিন্তু ব্রিটিশরা সেই ক্ষত্রিয় নয় যে, সিধা মাঠে নেমে তরোয়াল চালাবে। ব্রিটিশ দেখলো, এই নবাবের সেনা তরবারিতে অপ্রতিরোধ্য, কিন্তু এঁরা আগ্নেয়অস্ত্রে তেমন জোরালো নয়; গানপাউডারের ব্যবহার এঁরা তেমন জানেনা।
তাই ব্রিটিশ, নিজেদের অল্পসংখ্যক সেনাকে অক্ষত রাখতে, মিরকাশিমকে ধরলেন আর সিরাজকে দুর্বল করে রাখলেন ভিতরে ভিতরে, আর সামনে অগ্রাসন করলেন, মুর্শিদাবাদে। অতর্কিত আক্রমণ, তাই ঢাকায় নবাবের যেই সেনা ছিল, যারা সাধারণ মানুষকে সাহায্য করতেন, তাঁদেরকে ডেকে আনতে পারলেন না। অতর্কিত নয় আসলে আক্রমণটা, কারণ মিরকাশিম সেই আক্রমণের কথা জানতো, কিন্তু সে সিরাজকে সেই কথা না জানিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে, আর সিরাজ যখন জানলেন যে ব্রিটিশ আগ্রাসনে এগিয়ে আসছে, তখন যা সেনা হাতের কাছে ছিল, তা নিয়ে পলাশী পর্যন্ত যাত্রা করেছিলেন, ব্রিটিশদের আটকাতে। আর সাথে সাথে, মিরকাশিমকে দিয়েই ঢাকা আর খুলনার সেনাকে ডেকে আনতে বললেন, যা মিরকাশিম ব্রিটিশদের সাথে হাত মেলানোর জন্য করলেন না।
শান্তিপূর্ণ দেশ বাংলা। এখানে যুদ্ধ থাকেনা, সেনা তাই রাজকাজেই কৃষ্ণনগর, খুলনা, ঢাকার উজিরদের সাহায্য করতেন; আর মুর্শিদাবাদে সামান্যই সেনা থাকতো। সেই সামান্য সেনা খুবই তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যেতে থাকে, ব্রিটিশদের কামানের গোলার সামনে। সিরাজ বারেবারে মিরকাসিমকে জিজ্ঞেস করতে থাকলেন, বাকি সেনা কবে আসছে! … কিন্তু সেই সেনা আর এসে পউছালো না; সিরাজকে পরাজিত ও নিহত হতে হলো, আর ব্রিটিশ বাংলার আধিপত্য গ্রহণ করে নিলো।
এরপরে ব্রিটিশ এখানে শাসন করা শুরু করতে, রানিগঞ্জ থেকে কয়ালা উত্তোলন করতে, ঢাকাতে পাঠ চাষ করিয়ে, তাই দিয়ে জুটমিল চালাতে, এই সমস্ত কাজ করাতে, শুরু করলো ইংরাজি শিক্ষার প্রচলন। বাঙালীই ভারতবর্ষে প্রথম ইংরাজি শেখে।
এই শিক্ষা দেবার সময়ে বাঙালীকে দেখে ব্রিটিশ চমকে যেতে শুরু করে। অসামান্য মেধা যেমন এঁদের, তেমনই অদ্ভুত সঙ্ঘবদ্ধ, আশ্চর্যরকমের আক্রমণাত্মক মানসিকতা আবার তারই সাথে কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা। কর্মদক্ষতা, নিপুণতা, কলার প্রতি নিষ্ঠা, একাগ্রতা, আর সব থেকে বড় কথা, বাঙালীদের নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা আর সংগঠন চালিয়ে রাখার ক্ষমতা, এবং সমস্ত কিছুকে অক্ষত করার জন্য আপামর বাঙালীর যেই অসামান্য দূরদৃষ্টি, সেই সকল দেখে, ব্রিটিশ ভারতকে ভয় পেতে শুরু করে। তারা মনে করে যে, এমন মানুষের দেশকে বেশিদিন লুণ্ঠন করাই যাবেনা। এঁদের যা দূরদৃষ্টি, তাতে কিছু দশকের মধ্যেই এরা বুঝে যাবে যে আমরা এই দেশকে লুঠতে এসেছি।
এমনই যখন ব্রিটিশদের জল্পনা, তখন একবার খনন করতে করতে, ব্রিটিশ চলে গেল কেওনঝাড় অঞ্চলে। আর সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখল যে, না এই মানুষরা তো বাংলার মানুষের থেকে আলাদা! … এখানকার মানুষ অনেক বেশি আগ্রাসী, বাংলার মত নয়। বাংলার মানুষ অনেক বেশি আক্রমণাত্মক, কিন্তু তখনই তাঁরা আক্রমণাত্মক, যখন তাঁদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়; কিন্তু এঁরা তো আগ্রাসী মানে ক্ষমতালোভী। বাঙালীদের তো লোভ দেখাতে গেলে, বাঙালী যার লোভ দেখাচ্ছি আমরা, তা লাভ করে নেবার জন্য অন্য সহজ আর যুদ্ধবিমুখ পন্থা খোঁজে, কিন্তু এঁরা তো তেমন নয়! এঁদেরকে সহজেই বুঝিয়ে রাখা যায় যে, এঁরা আমাদের দাস থেকেই ভালো থাকবে, যেখানে বাংলাকে এমন বোঝাতে গেলে, বাংলা নিজে আমাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে ঢুকে পরে, যাতে আমাদের কাজ চলে, কিন্তু সেই কাজের মধ্যে দিয়ে বাংলাকে বা বাঙালীকে আমরা লুঠতে না পারি। … মানে ওরা আমাদের অফিসিয়ালদের থেকেও অনেক বেশি যোগ্য, এমন প্রমাণ কোরে, শাসনের শীর্ষআসনে বসে পরে, আরে এই ভাবে বাংলাকে আমাদের লুণ্ঠন থেকে বাঁচিয়ে নেয়, কিন্তু এঁরা তো তেমন নয়।
এমন আবিষ্কার হতেই, যেই ব্রিটিশরা বাংলা দখলের পর নিজেদের আগ্রাসন আটকে রেখেছিল, তারা এবার আগ্রাসন শুরু করলো, আর কিছু বছরের মধ্যেই সমস্ত ভারতকে এককথায় গিলে নিলো। আর যেমনই গিলতে থাকলো, তেমনই ব্রিটিশ অধিকর্তারা বাঙালী জাতিকে বেশি বেশি করে সমীহ করতে থাকলো। তাঁরা দেখলো বাঙালী যেন এই সমস্ত ভারতের থেকে আলাদা একটা জাতি। সমস্ত ভারতেই শ্রমিক পাবার জন্য, পুলিশি দপ্তর চালানোর জন্য ইংরাজি শিক্ষা দিতে থাকলো তাঁরা, কিন্তু সেই শিক্ষা পেয়ে, সকলে ব্রিটিশের গোলামি করতে থাকলো; কিন্তু অন্যদিকে বাঙালী অত্যন্ত আত্মমর্যাদা সম্পন্ন এবং দেশপ্রেমী। তাঁরা, সেই একই শিক্ষা গ্রহণ করে, ব্রিটিশদের সাথে মেধায় পাল্লাদিয়েও নয়, একরকম টেক্কা দিয়ে, এঁরা শাসনের আসনে, শিক্ষকের আসনে, ডাক্তারের আসনে, উকিল, আর বিচারক হয়ে, নিজের দেশের মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে ব্যস্ত।
তাই ব্রিটিশ অধিকর্তা সমস্ত ভারতকে গুলামে পরিণত করে রাখলেও, বাংলাকে নিজের ঘাঁটি আর বাঙালীকে নিজের সমগোত্রীয় মানতে শুরু করে। যেই ব্রিটিশ সদাসর্বদা কালো চামড়ার মানুষকে ঘৃণা করে এসেছে, তাঁরা বাঙালীদের নিজেদের বন্ধু মানতে শুরু করে দেয়, এমনকি বাঙালী মহিলাদের বিয়ে পর্যন্ত করতে থাকে। প্রতিটি জায়গায়, মানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ন্যায়ালয়ে, হাসপাতালে, ইত্যাদি জায়গায়, ব্রিটিশরা নিজেদের সাদা চামড়ার লোককে সারা ভারতে নিয়োগ করতেন, আর ভারতীয়দের নিজেদের নিচে কেরানীর চাকরি দিতেন; কিন্তু বাংলায় নিজেরা সেই উচ্চআসনে বসতে পারতেন না, কারণ বাঙালীরা এই সামান্য কয়দিন ইংরাজি শিক্ষা পেয়ে, তাঁদেরকেও ছাপিয়ে গেছে প্রতিটি ক্ষেত্রে। তাই বাঙালীই এখানে সমস্ত শীর্ষপদে বসতে শুরু করেন।
অর্থাৎ স্কুলের শিক্ষক এমনকি প্রধান শিক্ষকও। কলেজের প্রফেসার এমনকি ভাইস চ্যান্সেলারও; হাসপাতালের ডাক্তার, এমনকি সুপারও। পুলিশের সুবেদার, এমনকি উচ্চপদস্ত অফিসারও। … আর সব শেষে, ন্যায়ালয়ের মানে কোর্টের উকিল ও ব্যারিস্টারও। … তাই বাঙালীদের ব্রিটিশরা বন্ধু মনে করেই বিশ্বাস করে, জমিদারী দিতে থাকলেন। জমিদারী বাকি ভারতেও দিতেন, কিন্তু বাকি ভারতের জমিদাররা থাকতেন কড়া শাসনে, মানে সময় অনুযায়ী কর উসুল করতেই হবে, খরা হোক বা বন্যা হোক; কিন্তু বাঙালী জমিদারদের উপর সেই জোর খাটাতে পারতেন না; কারণ ব্রিটিশরা জেনে গেছিলেন যে, বাংলার জমিদাররা সাধারণ বাংলার প্রজাকে কিছুতেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেবেনা।
এইভাবেই, সারা ভারত আর বাংলার মধ্যে এক ভিন্ন মতে শাসন করতে শুরু করে ব্রিটিশ; যেখানে ভারত হয় ব্রিটিশের গুলাম, আর বাংলা হয় ব্রিটিশের বন্ধু। কিন্তু এই সমস্ত কিছু যখন একদিকে চলছিল, তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতের অন্যস্থান থেকেও বদলি দিয়ে পুলিশ সুপার, হাই কমান্ড, গভারনর আনতে হয় এই বাংলায়, তাদেরই তৈরি করা পলিসির ভিত্তিতে। আর এই যারা নতুন ব্রিটিশার আসেন বাংলায়, তারা জানতেন না যে বাঙালী ব্রিটিশের দাস নয়, বন্ধু। আর তাই যেমন বাকি ভারতে জোরজুলুম চালাতেন তাঁরা, তেমনই বাংলাতেও চালাতে শুরু করেন।
আর তাই এবার ব্রিটিশকে বাংলার অন্যরূপ দেখতে হলো, বা বলতে পারো, তাঁদের বাংলার নতুন রূপ দেখা শুরু হয়ে গেল। এতকাল বাংলার বন্ধু ছিল তারা, তাই বাঙালীর একরকম রূপ দেখেছে; কিন্তু এবার বাঙালীর উপর জুলুম খাটাতে গিয়ে, বাঙালীকে ব্রিটিশ নিজের শত্রু করে ফেলল। সীধুকানু থেকে শুরু করে মঙ্গলপাণ্ডে; আর অন্যদিকে জাঁদরেল জমিদার সকল যেমন রাজচন্দ্র মাড়, অর্থাৎ রানী রাশমণির স্বামী, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মত ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি হতে হলো ব্রিটিশকে।
এই জমিদারদের হাত ধরে, বাংলায় শুরু হয়ে যায় বিভিন্ন ধরনের বিপ্লব। যেই ব্রিটিশদের বন্ধু বলে জানতেন, তাঁদের আসল চেহারা এবার দেখে, বাঙালী বেশ বুঝলো যে ব্রিটিশরা ইংরাজি শিক্ষা নিজেদের বন্ধুত্বের জন্য নয়, আসলে নিজেদের আধিপত্য স্থাপনের জন্য শিখিয়েছিল আমাদের। তাই বাঙালী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসগরের হাত ধরে ভাষাবিপ্লবে যোগদান করলেন; আর সেই পতাকাকে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র এগিয়ে নিয়ে যান। আবার বাঙালী দ্বারকানাথের ন্যায় জমিদারের পৃষ্ঠপোষণে মহাবিদ্যান রামমোহন রায়কে এগিয়ে দিলেন ধর্ম বিপ্লব এনে বাংলাকে অন্ধবিশ্বাস মুক্ত, সদাচারী জাতিতে পরিণত করতে।
আর এই ধর্মবিপ্লবকে চরমস্তরে নিয়ে যান স্বয়ং রামকৃষ্ণদেব। আর এই বাংলা, রানী রাশমণির হাত ধরে, জমিদারী প্রথাতেও মহাবিপ্লব আনলেন, যেখানে এবার থেকে জমিদাররা কেবলই প্রজার কল্যাণচিন্তায় রত হতে থাকলেন। বাঙালী ভয়ানক বুদ্ধিমান জাতি; যতদিন বন্ধুত্ব দেখানো হয়েছে, ততদিন একরকম ছিল এঁরা; এক মুহূর্তের জন্য যাই প্রভুত্ব দেখানো হলো, সঙ্গে সঙ্গে বাঙালী বিপ্লবের জন্য সেজে উঠতে থাকলো। … সেই দেখে, কিছু ব্রিটিশ এঁদেরকে দমাতে চাইলেও, কিছু ব্রিটিশ সামনে এগিয়ে এসে বললেন, সম্পূর্ণ বিশ্বকে দমিয়ে রাখতে পারো তুমি, কিন্তু বাঙালীকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব। এতটাই মেধা এঁদের আর এতটাই দেশপ্রেম যে, এঁরা সমস্ত বাঁধা অতিক্রম করে জেগে উঠবে। তাই এঁদেরকে দমানোর চেষ্টা ছেড়ে, এঁদেরকে আবার প্রমাণ করে দাও যে, আমরা ওদের সত্যিই বন্ধু ছিলাম।
এমনই চেষ্টা করে, একের পর এক ভালো ভালো ভাইসরয় আস্তে থাকলো। সমস্ত রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ, কিন্তু বাংলার প্রধানমন্ত্রী বাঙালী; আর তারই সাথে ব্রাহ্মসমাজের দাবি নিয়ে, রামমোহনকে রাজা উপাধি দিয়ে, সতীদাহপ্রথা তুলে ধর্মবিপ্লবকে নিজেদের পক্ষে নিতে চেষ্টা করলেন; বিধবাবিবাহ আইন করে, ভাষাবিপ্লবী বিদ্যাসাগরকে নিজেদের বন্ধু করে নিতে চাইলেন। … হিন্দুস্কুল, প্রেসিডেন্সি, সর্বত্রে হেডমাস্টার, ভাইস চ্যান্সেলার সমস্ত বাঙালীকে বসাতে থাকলেন। … বাঙালীকে উজাড় করে দিতে থাকলেন ব্রিটিশ, এটা বোঝাতে যে, আমাদের বিরোধিতা করো না, তোমরা আমাদের বন্ধু।
কিছুটা অবশ্যই শান্ত হলো বিপ্লবের আগুন, আর তা ধীরে ধীরে, গোপনে গুপগুপ করে জ্বলতে থাকলো। আর ব্রিটিশদের মধ্যে এই যে বাংলাকে আর বাঙালীকে সমস্ত ভারতের থেকে আলাদা নজরে দেখা হতে থাকলো, সেই নিয়ে দ্বিমত জাগতে থাকলো। একটা ব্রিটিশ সেনাশিবির যেখানে বাংলাকেও সেই একই ভাবে শোষণ করতে চেষ্টা করলো, যেই ভাবে সারা ভারতকে শোষণ করতো তারা; আর অন্যদিকে বড়লাটের গোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ভাবে, বাংলাকে নিজের বন্ধু মন থেকে মেনে, বাঙালীদের উচ্চপদ দিতে থাকলেন।
এরই মধ্যে, এই কলকাতায় একটা বিচিত্র ঘটনা হতে শুরু করে। গঙ্গায় প্রবল বাণ আসতে থাকে, আর তাতে বড় বড় জাহাজকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়, তেমনই নদী পারাপার করা বহু যাত্রীর প্রাণসংশয় হতে থাকে। অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রশাসন বলে, হাওড়াতে আর হুগলীতে তাদের পাঠ আর ল্যাথ শিল্প, আর সেটাকে কলকাতায় নিয়ে আসতে হয় বঝড়া করে, যা প্রায়শই নৌকাডুবিতে নষ্ট হয়ে ব্রিটিশ সরকারের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। তাই এর একটা বিহিত চাই।
এই বিহিতের সন্ধানে, ব্রিটিশ ঠিক করলো যে ভারতে প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নির্মাণ হবে শিবপুরে। আর সেখানে ভারতীয় মেধাবী ছাত্রদের ইঞ্জিনিয়ারিং শিখিয়ে, গঙ্গার উপর ব্রিজ নির্মাণ করা হবে, যা হাওড়া আর কলকাতাকে যুক্ত করবে। আমার দাদু, আর এন মুখার্জি হলেন সেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রথম শ্রেণীর ছাত্র, আর পরে উনি হন পোর্ট ট্রাস্টের প্রধান। উনিই প্রথম হাওড়া ব্রিজ, অর্থাৎ যাকে বলা হয় পন্টুন ব্রিজ, তার মডেল করেন। …
সেই সময়ের গঙ্গা এখনের মত ছিল না। পদ্মায় তখন এত জল যেতনা, যেমনটা এখন যায়, কারণ ফারাক্কা ব্যারেজ তখনও নির্মাণ হয়নি। তাই আজ যেমন পদ্মার নিচে ১০ তলা বাড়ি ডুবে যায়, তেমনই তখন হুগলী নদী ছিল। আজকে যেমন গঙ্গা দেখো কলকাতায়, তার থেকে প্রায় ২ থেকে আড়াই তোলা উপর দিয়ে গঙ্গা বইতো তখন কলকাতার বুক চিরে। আর এখন যেমন পদ্মায় পিলার ফেললে, পদ্মা ধুইয়ে নিয়ে চলে যায়, তখন হুগলী নদী ঠিক তেমনই ছিল, কারণ সম্পূর্ণ গঙ্গার এই হুগলী নদীই ছিল সমুদ্রে অর্থাৎ মোহনায় যাবার রাস্তা। তাই পিলার পুঁতলেও, গঙ্গার তলার মাটি সেই পিলারকে গিলে নিতো এক্কেবারে।
তাই আর এন মুখার্জি, অর্থাৎ আমার দাদু বললেন, পিলার ছাড়া ব্রিজ করতে হবে। উনার মত অনুসারেই, দুই ভাগে ভেঙ্গে পন্টুন ব্রিজ তৈরি হলো। কিন্তু সেই ব্রিজের উপর এতটাই চাপ পরলো পরে যে, একটা অখণ্ড ব্রিজ আবশ্যক ছিল, আর তাই হাওড়া ব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাব আসে, যার বেশীর ভাগ স্টিল আসে ব্রিটেন থেকেই, কিন্তু শেষ সামান্য এখানের এক পাঠান ব্যবসাদার, জামসেদ টাটা প্রদান করে। …
অন্যদিকে, ওই যেমন বললাম বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালীদের বড়লাট সেরা সেরা স্থানে নিযুক্ত করতে থাকলেন। তেমনই আশুতোষ মেশমশাইয়ের সাথেও হয়। কিন্তু একদিকে যখন বাংলায় বড়লাট সব ঠিক রাখতে ব্যস্ত, অন্যদিকে কিছু এঁচোরেপাকা ব্রিটিশ কর্মকর্তা বড়লাটের পিছনে পিছনে, বাঙালীকে বাকি ভারতের মত শোষণ করতে শুরু করে। আর বাংলা সত্যিই বাকি ভারতের মত নয় যে, শোষণ হচ্ছে দেখেও চুপ থাকবে। তাই বাংলায় একের পর এক বিপ্লবী জাগতে থাকলেন। বাঘাযতীনের মত, অরবিন্দ ঘোষের মত, বিনয় বাদল দিনেশের মত, অজস্র বিপ্লবী জাগতে শুরু করে, যার আঁচ বাংলা ছাড়িয়ে উড়িষ্যার কটকেও পুছে গেছিল, যেখানে অপেক্ষা করছিল তরুণ মহাযোদ্ধা, সুভাসচন্দ্র বসু।
বাবা উকিল, তাই কটকে পোস্টিং। সেখান থেকে সিমলা ব্যাম সমিতি, নিজের বাড়িতে বদলি হতেই, সুভাসচন্দ্র বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ রাখা শুরু করে দেয়, আর তারপর কি হয়ে, সেটা ইতিহাসের পাতায় থাকে তোমাদের, মানে আইএনশির প্রেসিডেন্ট হওয়া, তারপর মুক্তিযুদ্ধ, আইএনএ ফরমেশন, ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধ ইত্যাদি। …
কিন্তু এই সমস্ত কিছু যখন চলছিল, যেখানে প্রায় ৪০-৫০ বছর একা বাংলা আর বাঙালীই ব্রিটিশের সাথে স্বাধিনিতা সংগ্রামে জড়িয়েছিল, আর তারপর বাংলা সফল হয়, বরাবরের মত স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন বাকি ভারতকে এটা বোঝাতে যে, তারা ব্রিটিশের কাছে পরাধীন, সেই সময়ে, বাংলায় এক নতুন সমস্যার সম্মুখীন হয় ব্রিটিশ, আর এবারের সমস্যা ছিল বাংলার এলিট রাজনীতিবিদদের, যা রীতিমত গুরুতর আঘাত দেয় ব্রিটিশদের, আর সেই আঘাতের ফলেই তারা ১৯০৫ এ বাংলা বিভাজনের প্রস্তাবও এনে ফেলে।
