প্রথম পর্ব – আমার ঠাম্মি
ইতিহাসে বাংলার অবদানকে যতই বর্তমান ভারত অবজ্ঞা করুক না কেন, বাংলার ইতিহাস ছাড়া ভারতের ইতিহাস বিবৃত করাই যায়না, এমনকি বাংলাকে উপেক্ষা করলে, গোটা ভারতবর্ষের মানচিত্রই পালটে যায়। আর সেই সমস্ত ঐতিহাসিক কথার মধ্যে, অনেক কিছুই আছে। যেমন রয়েছে সিপাহি বিদ্রোহ, তেমনই রয়েছে কংগ্রেস গঠন; এই বাংলা যেমন করে বর্তমান ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রণেতা, তেমনই ভাবে বর্তমান সেনাবাহিনীর ধারাপাতও আইএনএর উপর নির্ভর করে, যা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর দ্বারা নির্মিত। আবার যেমন এই বাংলাই সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্মস্থান, তেমনই এই বাংলাই বর্তমান ভারতে ধর্ম, ভাষা এবং অন্য সমস্ত বিপ্লবের জননী।
তাই, বাংলাকে ছেড়ে রাখলে, বা বাংলাকে অবজ্ঞা ও অবহেলা করলে, ভারত যতই প্রযুক্তিবিদ্যায় উন্নত হোক, সারা বিশ্বে সে তৃতীয়শ্রেণীর দেশ রূপেই পরিগন্য হবে, যেমনটা আজও হচ্ছে। এই বাংলারই ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায় হলো বঙ্গভঙ্গ। আর সেই বঙ্গভঙ্গ নিয়েই আজকের গল্প বা উপন্যাস।
গল্পটিতে মুখ্য যেই চরিত্র, তাঁরা সম্পূর্ণ ভাবে কাল্পনিক, এবং বাস্তবতার সাথে, তাঁদের কনো সম্পর্ক নেই। আলাদা করে এই কথাটি বলার কারণ এই যে, মুখ্য চরিত্রদের সাথে সংশ্লিষ্ট চরিত্ররা বাস্তব জীবনের চরিত্র, এবং তাঁদের কথা যা বলা আছে, তা কাল্পনিক কখনই নয়। অর্থাৎ, এটি একটি এমন বাংলা গল্প, যেখানে ঐতিহাসিক বাস্তবের সাথে লেখকের কল্পনার মেল হয়েছে। তাই এই গল্প বা উপন্যাস পাঠের সময়ে একটিবারও এমন ধারনা রাখবেন না যে এটি সম্পূর্ণ সত্যঘটনা, আবার এমনও ধারনা রাখবেন না যে সম্পূর্ণ উপন্যাসটিই কাল্পনিক।
এটা ২০২৩ সাল। আমি আগের বছর গ্র্যাজুয়েট হয়ে, এই বছর প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাসে মাস্টার ডিগ্রির প্রথম বছরের ছাত্র। আমার নাম অমিয়, অমিয় চৌধুরী। না না, আমি আমার প্রেমকথা বলছি না। আমার প্রেম কাহিনী তো সামান্য প্রেম কাহিনী। ক্লাস ইলেভেনে থাকতে একটা মেয়েকে ভালো লাগতো। টুয়েলভে আলাপ। মেয়েটা আমাকে পছন্দ করতো, কিন্তু হয়তো আমার কনো একটা জিনিস অপছন্দ করতো। আমি মেয়েটার জন্য, যাকে বলে ফিদা ছিলাম, আর এখনও আছি। তবে কি জন্য যে মেয়েটা আমাকে পছন্দ করেও অপছন্দ করতো, সেটা আজ থেকে ৪ বছর আগে বুঝিনি। তবে আজ বুঝে গেছি।
না না, আজকে এই ২০২৩এ এসে বুঝিনি, বুঝেছিলাম ২০১৮ সালে, যখন আমি ১২ ক্লাসে পড়ছিলাম। তবে বুঝে যাবার ফলে, আমি যা নিয়ে জীবনচিন্তা করছিলাম, সেই জীবনচিন্তা ছাড়িনি; ছেড়েছিলাম যার জন্য, তিনি হলেন আমার ঠাকুমা, যাকে আমি ঠাম্মি বলে ডাকতাম। … না আজ তিনি বেঁচে নেই; ২০১৯ সালে তিনি গত হয়েছেন। যখন গত হন তিনি, তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ১০৩; অর্থাৎ বুঝতে পারছেন তো! উনার জন্ম হয় ১৯১৬ সালে, মানে যখন ভারত ব্রিটিশের কাছে পরাধীন, তখন।
এই ঠাম্মি একদিন আমাকে নিজের প্রেম কাহিনী বলেছিলেন, আর সেদিনটি ছিল ২০১৮ সালের, ১২ই আগস্ট। এতো ভালো করে আমার এই তারিখ কেন মনে আছে! কারণ এই তারিখেই আমি ঠাম্মির প্রেম কাহিনী শুনি, আর এই প্রেম কাহিনী আমার জীবনের দর্শনই পালটে দেয়। আর তার সাথে সাথে, আমার অজানা এক বিশেষ জিনিসও জানতে পারি, যা জানার ফলে, আমি আমার এর আগে থাকা জীবনদর্শন থেকে সরে আসি। আর সেই সাথে সাথে, আমার গার্লফ্রেন্ড মানে তহ্নি যে আমাকে আমার আগের মানসিকতার জন্যই আমাকে পছন্দ করেও, আমার থেকে দূরে দূরে থাকতো, সেটাও জানতি পারি। কি ভাবে! সেই কথাটা দিয়েই শুরু করি প্রথম, তারপর ঠাম্মির প্রেম কথাতে ফিরে আসবো। আসলে আমার প্রেম কথাটা খুবই ছোটো আর ঠাম্মিরটা! এতটাই বিরাট, যে কে বলতে পারে, আমার এই লেখা যদি কনো ডিরেক্টারের চোখে পরে, তবে সেটা নিয়ে সিনেমাও হয়ে যেতে পারে। তাই আমার কথাটাই প্রথম বলি।
তখন আমার বয়স ১৭, আমি চুটিয়ে এনডিএ, মানে ন্যাসানাল ডিফেন্স একাডেমীর জন্য চেষ্টা করছি। পড়াশুনায় আমি খারাপ কনোদিনই ছিলাম না, কিন্তু খেলাধুলায় আমি বেশি ভালো ছিলাম, আর তাই থেকেই হয়তো এই ন্যাসানাল ডিফেন্স একাডেমী, মানে ইন্ডিয়ান আর্মিতে জগ দেবার চিন্তা আসে। কিন্তু আমার এই সিদ্ধান্তের কারণেই, তহ্নি আমাকে একটু আভোয়েড করতো, মানে তেমনটাই সে পরে আমাকে বলে। কিন্তু এবার কথা হলো, আমার মাথা থেকে এই এনডিএর ভুত গেল কি করে? … বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই। অই ভুত যদি না আমার মাথা থেকে যেতো, তবে তহ্নি আমাকে কিছুতেই মেনে নিচ্ছিল না, আর মেনে নিতোও না। অর্থাৎ ওই ভুত আমার মাথা থেকে নামার কারণেই তহ্নি আজ আমার সাথে, আর আজ আমরা দুজন মিলে বিয়ে থাওয়া করে সেটেল হবার চিন্তা করছি।
এই ভুত ছাড়ানোর কৃতিত্ব আমার ঠাকুমার, আর একমাত্র উনারই। … কি ভাবে? তাহলে এবার বলি শুনুন, কি সূত্র ধরে ঠাম্মি আমাকে উনার জীবনের প্রেম কাহিনী শোনালেন। হ্যাঁ সেটা বলতেই হবে আমাকে, কারণ সেটা না বললে যে, ঠাম্মির সেই অসাধারণ প্রেম কাহিনীর সাক্ষীও আমি হতে পারতাম না, আর আপনাদেরকে সেটা বলতেও পারতাম না আজকে।
সেদিন, আমার ছোটপিসির বউমার সাধ ছিল, মানে উনার বউমা তখন সন্তানসম্ভাবা। এখন আমি যুবা, তাই এই সমস্ত মেয়েলি অনুষ্ঠানে আমি যেতে পছন্দ করতাম না। … যাইহোক, ঠাম্মির বয়স তখন ১০২, বুঝতেই পারছেন, উনার আর কনো জায়গায় যাবার ক্ষমতা নেই, আর যদি হুইল চেয়ারে করে নিয়েও যাওয়া হতো, তবে সামান্য বাড়ির বাইরের পদুশনেই উনি মৃত্যুযাত্রীর ন্যায় অসুস্থ হয়ে পরতেন। তাই বাধ্য হয়েই ঠাম্মি বাড়িতে থাকেন, আর আমি ঠাম্মির কাছে থাকি, ঠাম্মির দেখাশুনা করার জন্য। সেই রাত্রে ঠাম্মির কাছে শুয়ে ছিলাম।
ঠাম্মি আমার আদ্যি কালের মানুষ হলেও, তিনি কিন্তু এতটাই বর্তমান মানুষ ছিলেন যে, আচ্ছা আচ্ছা মানুষ যারা নিজেদেরকে মডার্ন বলেন, তাঁরাও উনার কাছে হিমসিম খেয়ে যেতেন। তাই, আমি প্রায়শই উনার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতাম। আর সেই রাতেও, মানে ১২ই আগস্ট ২০১৮ সালের রাত্রে, আমি ঠাম্মির কাছে একটি প্রশ্ন করেছিলাম যে, আচ্ছা ঠাম্মি, আমাকে একটা কথা বলো, যেই ভারতীয় সেনা এখনো আইএনএ, মানে আজাদ হিন্দ ফৌজের নিয়মশৃঙ্খলা মেনেই চলে, সেই ভারতীয় সেনাতে, এই আজাদ হিন্দ ফৌজের উৎস, এই সুভাস চন্দ্র বসুর বাংলার নামে কনো রেজিমেন্ট কেন রাখেনা!
ঠাম্মি ফোগলা দাতে হেসে বললেন, বোধ হয়, ভয় পায় এই বাংলাকে; ভাবে যদি আর্মির রেজিমেন্টে এঁরা থাকে, আর সমস্ত অস্ত্রশিক্ষায় পারদর্শী হয়ে যায়; বা যদি এঁদের কেউ প্রাইম মিনিস্টার হয়, আর সে যদি আগেকার সিদ্ধান্তে অর্থাৎ, দুটি বাংলা একত্রে একটি আলাদা দেশ হবার চিন্তায় চলে যায়, তখন এঁদেরকে আর আটকানো যাবেনা। এমন ভেবেই বোধহয় ভারত সরকার বাঙালী কারুকে যেমন প্রাইম মিনিস্টার হতে দেয়না, তেমনই আর্মিতে বাঙালী রেজিমেন্ট থাকতে দেয়না, আবার বড় বড় সরকারি আধিকারিকও হতে দেয়না; ইন্টার্ভিউতে বাদ দিয়ে দেয়।
আমার কাছে, ঠাম্মির এই কথা, সত্য বলতে গেলে, মাথায় বজ্রপাত। এ আবার কেমন ধারার কথা! … দুই বাংলা মিলে আলাদা দেশ হবার কথা! এমন কথা তো কস্মিনকালেও শুনিনি! … শুয়ে ছিলাম; এই কথা শুনে উঠে বসে পরলাম। অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, এমন কনো কথা তো ইতিহাসের পাতায় পড়িনি! ঠাম্মি হেসে বললেন, ইতিহাস নিয়ে তুমি পড়াশুনা করো দাদুভাই; আর বইতে তো তাই ছাপা হয়, যা সরকার আমাদের জানাতে চায়। কিন্তু সরকার যা আমাদের জানাতে চায়না! তা কি ইতিহাস নয়, দাদুভাই?
আগেই বলেছিলাম, আমার ঠাম্মি এমনই একজন ব্যক্তিত্ব, যার কাছে, আজকে যারা নিজেদের বিদ্যান বলেন নিজেকে, তাঁদের মধ্যে আচ্ছা আচ্ছা ব্যক্তির মুখ বন্ধ হয়ে যায়। এবার বুঝলেন তো, কেন এমন কথা বলেছিলাম! …
আমি ঠাম্মির এই উচ্চদার্শনিক কথাতে অবাক হয়নি, কারণ সেটির সাথে আমি পূর্বপরিচিত; আমি অবাক হয়েছিলাম এটা ভেবে যে ঠাম্মি এত কথা জানলেন কি করে? মানছি, তিনি স্বাধীনতার আগের সময়ের মানুষ, তাই তিনি যা কিছু বলছেন, তা সেই সময়েই ঘটেছে, যেই সময় নিয়ে মডার্ন হিস্ট্রির রচনা করা হয়। কিন্তু সেই সময়ে তো আজকের মত টিভি, ইন্টারনেট ছিলনা যে ঠাকুমা দেশবিদেশে যা কিছু হচ্ছে, তার খবর পাবেন! তবে কি করে জানলেন উনি এই ইতিহাস, যা ইতিহাসের পাতায় সচারচর খুঁজে পাওয়া যায়না, মানে অন্তত পাঠ্য বইয়ের পাতায় খুঁজে পাওয়া যায়না!
প্রশ্নটা কেবল আপনাদেরকে করছিনা, ঠাম্মিকেও আমি এই একই প্রশ্ন করি, আর উত্তরে ঠাকুমা যা বলেন, তাতে আমার বিস্ময় এবার উৎসাহে পরিণত হয়ে যায়। তিনি বললেন, দাদুভাই, আমি যেই পরিবারে জন্ম নিয়েছি, তারা দেশভাগ আর বঙ্গভঙ্গের সাথে আবার ব্রিটিশদের সাথেও অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত ছিল; আর তা ছাড়া আমি নিজেও কালের ফেরে, এই একই জিনিসের সাথে জরিয়ে গেছিলাম। তাই, এই সব কথা বিস্তারে আমি জানি, আর তা ইতিহাসের পাতা থেকে নয়, কিছুটা আমার দাদুর মুখ থেকে জানি, কিছুটা আমার মেশমশাইএর থেকে জানি, আর কিছুটা আমার দাদার থেকে জানি; আর বাকিটার সাক্ষী আমি নিজেই।
আমার রোমরোম খারা হয়ে গেছিল এবার। আমি বললাম, কি বলছো ঠাম্মি! … তোমার পরিবার, মানে আমার পরিবার এই সমস্ত কিছুর সাথে যুক্ত!
ঠাম্মি হেসে বললেন, না রে পাগল, তোর পরিবার এর সাথে যুক্ত নয়, আমার পরিবার এর সাথে যুক্ত ছিল, অর্থাৎ আমার বিয়ের আগে, আমি যেই পরিবারের সদস্য ছিলাম, তারা এই সমস্ত কিছুর সাথে সরাসরি ভাবে যুক্ত, আর সত্যি বলতে তাঁদের থেকে বেশি বঙ্গভঙ্গ আর ব্রিটিশ প্রশাসনের সাথে যুক্ত, সম্পূর্ণ ভারতবর্ষে খুব অল্পই পাবি।
আমি আর থাকতে না পেরে বললাম, আমাকে সমস্তটা বলো ঠাম্মি। আমি জানতে চাই, তোমার পরিবারের ব্যাপারে, তারা ব্রিটিশের সাথে কি ভাবে যুক্ত, সেই ব্যাপারে, আর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সাথেই বা তাঁরা কি ভাবে যুক্ত, বা তুমি নিজেই বা এইসবের সাথে কি ভাবে যুক্ত।
ঠাম্মি আমার থেকে নিজের দাঁতের পাটিটা চাইলেন, কারণ ফোগলা দাঁতে বলতে থাকলে, আমি অর্ধেকের বেশি কথা বুঝতে পারতাম না বলেই স্কিপ করে যেতাম। আমি জলের গ্লাস থেকে ফলস্ দাঁতটা তুলে, ঠাম্মির মুখে লাগিয়ে দিয়ে, ঠাম্মির বালিশটা খানিকটা উঠিয়ে দিলাম, যাতে উনি অনেকক্ষণ টানা কথা বলতে পারেন।
এই সমস্ত কিছু আয়োজন করা হয়ে গেলে ঠাম্মি বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, শোনো দাদুভাই, আমি কিন্তু যে সে পরিবারের মেয়ে নই। আমার বাবার নাম ছিল, শ্রী বিরেন লাহিড়ী, হিন্দু স্কুল গঠনের একজন অর্থবিনিয়োগকারী ছিলেন, আর ছিলেন বাংলাদেশের কাবেরিগঞ্জ ছেত্রের জমিদার। আর উনার স্ত্রী, মানে আমার মা ছিলেন বিস্বময়ি দেবী। জানো এই বিস্বময়ি দেবী কে ছিলেন?
আমি – কে?
ঠাম্মি – আর এন মুখোপাধ্যায়, মানে আর এন মুখার্জির ৫ কন্যার এক কন্যা।
আমি – এই আর এন মুখার্জিটি কে?
ঠাম্মি – আমার দাদু, আর ভারতবর্ষের প্রথম ইঞ্জিনিয়ার, এবং পোর্ট ট্রাস্টের প্রথম ভারতীয় প্রধান। … আরো যদি জানতে চাও উনার ব্যাপারে, তবে উনিই ছিলেন, হাওড়া ব্রিজের প্রথম সংস্করণ নির্মাতা, অর্থাৎ পন্টুন ব্রিজের প্ল্যান গঠনকারি এবং নির্মাণ কাজের তত্ত্বাবিধায়ক।
আমি অবাক হয়ে বললাম – কি বলছো গো ঠাম্মি, আমাদের মানে তোমার পূর্বপুরুষ এমন সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব!
ঠাম্মি হেসে বললেন – দাঁড়াও দাদুভাই, এতো গেল আমার দাদুর কথা। আর আছে তো শোনো তবে। আমার দাদুর ৫ কন্যা, কনো পুত্রসন্তান ছিল না, আর এই পাঁচ কন্যার কনিষ্ঠ কন্যা হলেন আমার মা; আর এঁদের জ্যেষ্ঠ কন্যার নাম জানো কি!
আমি – কি?
ঠাম্মি – জগন্ময়ী দেবী।
আমি – ইনি আবার কে? কনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব?
ঠাম্মি – ইনি? ইনি হলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী, এবং শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মা।
আমার চক্ষু এবার চড়কগাছ। আমি বললাম – বলো কি ঠাম্মি! … স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মানে হাজরা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা! প্রেসিডেন্সির ভাইস চ্যান্স্যেলার! … আর শ্যামা প্রসদ মুখার্জি মানে যিনি ভারতীয় জনতা পার্টির জনক!
ঠাম্মি – হ্যাঁ, দাদুর মুখ থেকে যেমন বিস্তর কথা শুনেছি, তেমনই আশুতোষ মেশমশাইএর থেকেও শুনেছি, আবার শ্যামা দা, মানে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির থেকেও বহু তথ্য পেয়েছি। আর আরো একজনের থেকে সব থেকে বেশি জেনেছি, আর তিনি হলেন স্যার আশুতোষ মুখার্জির প্রিয়তম ছাত্র, অমিয় চট্টোপাধ্যায়ের থেকে।
আমি – ইনি আবার কে?
ঠাম্মি – ইতিহাসের পাতায় বিশেষ কেউ নন; স্যার আশুতোষ মুখার্জির প্রিয়তম ছাত্র এবং তাই শ্যামাদার ঈর্ষার পাত্র, এবং পরবর্তীতে ইনি প্রেসিডেন্সির প্রফেসার ছিলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে শ্যামাদার ঘোর বিরোধী ছিলেন। কিন্তু ইনি আমার জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন, এমন বলতে পারো।
আমি আমার বিস্ময় আর ধরে রাখতে পারলাম না। আমি বললাম – ঠাম্মি, আমায় সমস্ত কথা বলো, সমস্ত মানে সমস্ত। আমি যেন আমার চোখের সামনে ইতিহাসকে বর্তমান করে দেখতে পাচ্ছি। বলো ঠাম্মি, বলো। আমার যে আর তর সইছেনা!
ঠাম্মি বলতে শুরু করলেন – দাদু মানে আর এন মুখার্জি বলতেন, ব্রিটিশদের চোখে, বাঙালী একটা বিস্ময়কর জাতি ছিল। … বাকি সমস্ত ভারতীয়দের তাঁরা নিজেদের দাশের নজরে দেখতেন; হ্যাঁ কেউ কেউ সেখান থেকে একটু আধটু নজির গড়েছিল, কিন্তু কনো জাতি, মানে কনো জায়গার সাধারণ মানুষ, ব্রিটিশদের নজর কারতে পারেনি, এই বাংলা ছাড়া।
ঠাম্মি বলতে থাকলেন, আর এরপর আমাকে একটিবারও কথা বলতে হয়নি; সরাসরি শেষ বেলায় কথা বলেছিলাম। তাই আমি আর ঠাম্মি সিন থেকে সরে গেলাম, পরে রইলো কেবলই ঠাম্মির কাহিনী; তাই বারবার ঠাম্মি বললেন, ঠাম্মি বললেন, সেই কথাটি আর লিখলাম না।
এই শেষবারের মত, ঠাম্মির কথা শুরু করার আগে বললাম যে, ঠাম্মি বললেন – দাদু বলতেন, ব্রিটিশদের চোখে বাঙালী একটি বিস্ময়কর জাতি। আগেও মেধাবী ছিল, কিন্তু সেই মেধা তো আর ব্রিটিশরা বুঝতে পারতো না, কারণ ব্রিটিশরা তো আর আমাদের ভাষা বুঝতো না। কিন্তু যখন থেকে ইংরাজি শিক্ষার প্রচলন করে ব্রিটিশ, তখন থেকে ব্রিটিশ এই বাঙালী জাতির মেধা, ধারনা, চেতনা, ইত্যাদি দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়।
