চতুর্থ পর্ব – খোলসা
বাবা হেসে বললেন – বেশ তবে প্রথম থেকেই বলি। … তবে তার আগে, রথিনকে সেই প্রথম থেকে বলি, যখন থেকে আমি এই কেসের মধ্যে প্রবেশ করলাম। … রথিন, আজ থেকে প্রায়য় এক-দেড় সাপ্তাহ আগে, মিস অনিন্দিতা চক্রবর্তী আমার কাছে আসেন, এবং বলেন উনি দুটো হুমকির চিঠি পেয়েছেন। … চিঠিগুলো … মিলি, রথিনকাকুকে চিঠিগুলো দাও।
আমি রথিনকাকুর হাতে চিঠিগুলো দিলে, বাবা আবার বললেন – ভদ্রলোক বাংলা তেমন লেখেন না, বানানের গণ্ডগোল, আর সত্যি বলতে গেলে, উনি নিজে থেকে তেমন লেখেনই না, অর্থাৎ নিজের কাছে পুরাতন যেই পেন, তাতে কালিই ছিল না। … বুঝতে পারছো তো রথিন, লেখার ধরন দেখে।
রথিনকাকু – হ্যাঁ বুঝতে পারছি।
বাবা – এমন কার হয়? কনো কম্পিউটারে সর্বক্ষণ লিখতে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রেই হয়। তাই অনিন্দিতার বয়ফ্রেন্ড যখন জানলাম কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, স্বাভাবিক ভাবেই ওর উপরেই নজর এসে পড়লো। … তবে হ্যান্ডরাইটিং টা একটু মিলিয়ে দেখে নেবার দরকার। তাই অনিন্দিতার কাছে জয়জিতের হাতের লেখা কিছু আছে কিনা জানতে চাইলে, কলেজে থাকার সময়ে যেই ৫টি লাভ লেটার লেখা হয়েছিল, সেটা পেলাম। … মিলি, কাকুকে চিঠিগুলো …
আমি – হ্যাঁ দিচ্ছি।
রথিনকাকুর কাছে, চিঠিগুলো দিলাম।
বাবা – কি রথিন, হাতের লেখা এক্কেবারে এক। তাই না!
রথিনকাকা – হ্যাঁ, এ তো পরিষ্কার যে জয়জিতই হুমকি গুলো দিয়েছে!
বাবা – এটাই তো অনুপ চাইছিল। কাজ করবে ও, আর ফাঁসবে জয়জিত। লাভ! … লাভ এই যে জয়জিত ফেঁসে চলে যাবে জেলে, আর কলেজের সময়ের ক্রাশ অনিন্দিতাকে বিয়ে করবে ও। … তাই তো অনুপ! … জানি না বলবেন। তাই আপনার উত্তরটা কাউন্ট করলাম না।
বাবা আবার বললেন – রথিন, আসলে চিঠির হাতের লেখা জয়জিতের নয়ই। হাতেরলেখা অনুপের। … আসলে গল্প জয়জিতের মাথায় আসেনা। গল্প আসে অনুপের মাথায়। তাই লেখে সে-ই, কিন্তু নিজের ঘরে বসে লেখে না, লেখে জয়জিতের ঘরে বসে, জয়জিতের পেন দিয়েই। … কিন্তু হুমকি তো আর জয়জিতের ঘরে বসে লেখা সম্ভব নয়, তাই নিজের পেন ব্যবহার করতে যায়, কিন্তু তাতে কালি ছিলনা, আর তাই নতুন বলপেন নিয়ে এসে লেখে। …
একটু হেসে – তুমি বলবে, তাহলে জয়জিতকে নিজের কাজের সাথে ঢোকানো কেন? নিজেই স্ক্রিপ্ট লিখে, সমস্ত পয়সা, পসার নিজেই কামাতে পারতো! … না রথিন, অনুপের বাংলা বানান এমনই যে, ওর স্ক্রিপ্ট ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে। … অন্যদিকে জয়জিতের মাথায় গল্পের প্লট না থাকলেও, ওর বাংলা বানান অসাধারণ। তাই সমস্ত স্ক্রিপ্ট ওকে দিয়েই লেখাতো। … আগে নিজে জয়জিতের ঘরে বসে, জয়জিতের পেন ব্যবহার করেই গল্প লিখতো। আর সেগুলোকে জয়জিত কম্পিউটারে লিখতো, সমস্ত বানানের ভুল ঠিক করে। … কি জয়জিত বাবু, ঠিক বলছি তো!
জয়জিত একটু মাথা নামিয়ে নিয়ে – আমি সেই কথা সকলকে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু …
বাবা – কিন্তু অনুপই আপনাকে বারণ করে দেন, আর আপনাকে বলেন, নাম আপনার হোক, এটা উনিও চান। এমনও বলেন আপনাকে যে এই নামের বলে আপনি অনিন্দিতাকে ইমপ্রেস করতে পারবেন, কারণ অনিন্দিতা নিজেও ক্রিয়েটিভ আর ক্রিয়েটিভিটি পছন্দ করেন। … কি ভুল বললাম!
জয়জিত মাথা নামিয়েই মাথা নাড়িয়ে বাবার কথায় সায় দিলেন।
বাবা হেসে – রথিন, চিঠিগুলো দেখা মাত্রই এই সত্য বুঝে যাই আমি। কিন্তু আমি বুঝে তো আর হবেনা, প্রমাণ দরকার। … তাই চুপ করে ছিলাম, আর অনুপ যেমন দেখাতে চাইছিল, তেমনই দেখতে থাকছিলাম। … আসলে রথিন, চিঠিগুলোতে দেখ, যিনি চিঠিটা লিখেছেন, তিনি পেন ব্যবহার করেই লেখেন। হাতের লেখার টান দেখে বুঝতে পারছো! … আর দেখো, বেশ কিছু জায়গায় বানান ঠিক করা আছে। সেগুলো জয়জিতের করা। হাতে করে মানে পেন ব্যবহার করে লেখেনই না প্রায় উনি। তাই হাতের লেখা তেমনই। বর্গিজ লখতে গিয়ে, ডাণ্ডি লাগানোর জায়গা ছাড়েন নি; পরে আলাদা করে যোগ করেছেন।
রথিনকাকা – হ্যাঁ, একদমই।
বাবা – এবার পুরো কেসের কথা বলি রথিন। প্রথম থেকে। … জয়জিত অনুপবাবুর কলেজেই পড়তেন আর অনিন্দিতাও। অনিন্দিতাকে প্রথম নজরে দেখেই অনুপের তথাকথিত আসক্তিযুক্ত প্রেম হয়ে যায়। কিন্তু জয়জিত আর অনিন্দিতা একই ক্লাসে পড়ার কারণে খুব কাছের বন্ধু হয়ে যায়। জয়জিত সরলমনা, আর সেটাই অনিন্দিতার কাছে জয়জিতের সবথেকে আকর্ষণীয় গুণ মনে হয়। অনুপ বুঝে যায়, সে কিছুতেই অনিন্দিতার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে পারবে না, জয়জিতকে সরিয়ে। …
আবার মুচকি হেসে – তাই জয়জিতকে নিজের প্রতি আকর্ষিত করলেন অনুপ। … গল্প উনি লিখতেন, আর জয়জিত গল্প পড়তে ভালোবাসে। তাই জয়জিতকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করে নেওয়া খুব কঠিন হয়না অনুপের। কিন্তু জয়জিতের বক্তব্য, অতিরিক্ত বানান ভুল। … উপায় বাতলে দেন অনুপ। … তিনি বলেন, তিনি লিখবেন, আর জয়জিত সেগুলোকে কম্পিউটারে ছাপাবে, বানান ভুল ঠিক করে। তারপর সেটা প্রিন্ট করে, স্ক্রিপ্ট হিসাবে দেওয়া হবে সিনেমা পাড়ায়। নাম আর পয়সা দুটোই হবে।
বাবা বলতে থাকলেন – প্রথমে জয়জিত এই প্রস্তাবে রাজি হয়না। সে বলে, গল্পের লেখক অনুপ, কিন্তু নাম কেন তার হবে! … অনুপের জটিল বুদ্ধি। সে জয়জিতকে বুঝিয়ে দিল যে অনিন্দিতাকে সে বন্ধু থেকে প্রেমিকা করে পেতে গেলে, এই নাম ওকে নিতেই হবে, কারণ অনিন্দিতা ক্রিয়েটিভিটি পছন্দ করে। … অনিন্দিতার প্রতি জয়জিতের ভালোবাসা মুরগী পোষা ছিল না। তাই সে ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নেয়। … কিন্তু অনুপের মন্তব্য সে বুঝতে পারে না। … অনুপ যে জয়জিতকে অনিন্দিতার সাথে ভিড়িয়ে, নিজেকে অনিন্দিতার কাছাকাছি রাখছিল, যেই সম্ভাবনাই ওর ছিলনা, সেটা জয়জিত বোঝেনি।
বাবা পায়চারী করতে করতে – এরপর অনিন্দিতা তো জয়জিতে ফিদা। সরল তাই ভালো লাগতো, আর ক্রিয়েটিভ মানুষ, তাই একটা গুণমুগ্ধ ভাবও এসে যায়। … সেই সুযোগে, জয়জিতকে অনুপ বলে, এবার অনিন্দিতাকে প্রপোস করতে। … কিন্তু জয়জিত যে নিজের থেকে গুছিয়ে প্রেমপত্রও লিখতে পারেনা। …তাই অনুপই সেই প্রেমপত্র গুলো লিখে দিল। … প্রেমপত্র তো আর কম্পিউটারে টাইপ করে দেওয়া যায়না। আর জয়জিতের নিজের হাতের লেখা যা, তাতে তো প্রেমপত্রটা পড়বেইনা অনিন্দিতা। তাই অগত্যা অনুপের লেখা চিঠিই দিতে হলো। কিন্তু তাতে বেশ কিছু বানান এমনই, যে না কারেকশন করে দেওয়া যায়না। … তাই রথিন চিঠিগুলোতে দেখ, কিছু যায়গায় বানান কারেকশন করা আছে।
বাবা নিজের দুটো কনুইকে বাঁধা থাকা অনুপের চেয়ারের পিছনে ঠেকান দিয়ে – চিঠিগুলো দেখে আমি সমস্তটা বুঝে গেলেও, কারুকে বোঝাতে পারবো না আমি যে, চিঠিটা আসলে অনুপের লেখা। তাই চুপ করে ছিলাম। … কিন্তু এরই মধ্যে মঞ্জুশ্রি সাহা খুন হলেন, পাওয়া গেল উনার কাছ থেকে জাঁদরেল সিনেমার স্ক্রিপ্ট। … কম্পিউটারে লেখা। আর তাতে, বেশ কিছু লাইন অ্যাড করা হয়েছে, হাতে লিখে, যাতে অজস্র বানান ভুল, আর যার হাতের লেখা চিঠি আর হুমকির সাথে এক। …
মিস্টার অনুপ, জয়জিত তো স্ক্রিপ্ট প্রথমবার দেওয়ার পর, আর ডিরেক্টরের কাছে যেতেনও না। … তা কারেকশনগুলো কার করা! … জয়জিতের!
অনুপ এবার মাথা নামিয়ে নিলো । … অর্থাৎ প্রমাণ হলো তো রথিন যে চিঠিগুলো আর হুমকিটা জয়জিতের নয়, অনুপের দেওয়া। … বেশ এটা গেল পার্ট ওয়ান। … এখনও আসল কাহানীতে তো আসিই নি।
রথিনকাকু – হ্যাঁ খুনগুলো।
বাবা – রাইট। অনুপ সেইদিনকেই ঠিক করে নেয় যে ও কি করতে চলেছে, যেদিন জয়জিতকে দিয়ে ও স্ক্রিপ্ট লেখাতে শুরু করে। … স্ত্রীদের বিকাশে জয়জিতের সমস্যা নয়, সমস্যা অনুপের। … আর তাই অনুপের প্রথম রাগ হয় হেরিটেজ কলেজের ওনার কাম ডিরেক্টর, শ্রীমতী সিপ্রা ঘারেওয়ালের উপর। … কিন্তু অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় প্ল্যান করলেন যে, সকলকে তিনি সরাবেন, কিন্তু দোষ দেবেন জয়জিতের উপর, আর একবার সেই দোষে জয়জিতের জেল হলে, যেই অনিন্দিতার প্রতি তার ক্রাশ, উনার আর সেই ক্রাশের মধ্যে আর কেউ থাকবে না। … তাই তখন তো সম্পূর্ণ ভাবে চেপে গেলেন অনুপ। … কিন্তু জয়জিত কেবল সরল নয়, অত্যন্ত বোকাও। …
সামান্য হেসে – কলেজের ফাইনাল সেমিস্টারের সময়ে যেখানে ক্যাম্পাস ইন্টার্ভিউতে মনোনিয়োগ করার দরকার ছিল, তখন অনুপ ওকে স্ক্রিপ্টে মাতিয়ে রেখেছিল। … আর তাই চাকরি পেল না জয়জিত। … অনুপ জয়জিতকে সর্বদা নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে রাখতে চেয়েছিল। তাই এমন কাজ করে, একটি বছর ওকে বেকার রেখে, অকস্মাৎ একদিন সামনে এসে, ওকে নিজে রেকমেন্ড করে, ইনফিনিটিতে চাকরি করিয়ে দেয়, আর নিজে চাকরি ছেড়ে, আবার জয়জিতের মাধ্যমে স্ক্রিপ্ট পাবলিশ করে, বিপুল অর্থ রোজগার করেন।
বেকার ছেলেকে চাকরি দিয়ে জাতে তুলে দিয়েছে। অনিন্দিতা সমানে পাজেলড হয়ে যাচ্ছিল, কি ভাবে একটা বেকার ছেলেকে বিয়ে করবে, তার সমাধান করে দিল। … আগে প্রেমপত্র লিখে, ওদের সম্পর্ক জুরে দিয়ে জয়জিতের কাছে অনুপ হিরো ছিলই, আবার নতুন করে হিরো হয়ে উঠলো, একই কারণে। আর তাই জয়জিত অন্ধের মত বিশ্বাস করতে শুরু করলেন অনুপকে।
এরই মধ্যে, স্ত্রীদের বহিরমুখি ভাবের তিনটে মুখ চলে আসে অনুপের কাছে। নিজের কলেজের ডীরেক্টার সিপ্রা ঘারেওয়াল তো ছিলই। আর এখন এসে যায় ডিরেক্টর মঞ্জুশ্রি সাহা। দুটো খুনেরই দায় চাপাবে জয়জিতের উপর। তাই অকারণে প্রযোজক অতিশ বর্মণকে বললেন স্ক্রিপ্টের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিয়ে দিচ্ছেন মঞ্জুশ্রি। উনার ডাক পড়লো বসিরহাটে। ডাকবাংলো থেকে বসিরহাটের রাস্তায় কোন সিসিটিভি নেই। তাই সেখানে ডেকে নিয়ে গিয়ে, মঞ্জুশ্রির গাড়ির সামনে হাত নাড়িয়ে উনাকে দাঁড় করানো হলো। জয়জিতকে ফিরে যেতে বলা হলো, আর অনুপ এমনও বলল যে ম্যাডাম মঞ্জুশ্রির সাথে উনি ঝামেলা চুকিয়ে আসছেন। …
জয়জিত একাকী এলো, আর ডাকবাংলোর সিগনালে ওর একার ছবি উঠে, ওকে সাস্পেক্ট করে দেওয়া হলো। আর অন্যদিকে, ফাঁকা রাস্তায় গলার নলি কেটে অনুপ খুন করলো মঞ্জুশ্রিকে। কারণ! … কারণ উনি মহিলা হয়ে সাকসেসের পিছনে কেন ছুটছেন, আর কেন অন্য মেয়েদের একই কাজের প্রেরণা দিচ্ছেন! খুন করে এগিয়ে এসে, একটা ওলা করে ফিরে এলেন অনুপ। কনো সন্দেহই তার দিকে গেল না। … রথিন গাড়ির নম্বর ডাবলু বি ০৩ডি ৭৮৫২, এই ওলা গাড়িতে অনুপ ফিরেছিল। অনুপের ছবি দেখে সে আইডেন্টিফাই করেছে। যোগাযোগ করে নিও, কোর্টের কেসে সাক্ষী পেয়ে যাবে।
একবার রক্তের ছোঁয়া পেয়ে গিয়ে, পরের দিনই এলুম্নির কথা বলার জন্য জয়জিতের সঙ্গে জোকায় অনুপ গেলেন মিসেস সিপ্রার কাছে। জয়জিতকে একা বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন, আর নিজে মিসেস ঘারেওয়ালের গাড়ির পিছনে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু তার আগে, ব্রেক ওয়েলের ক্যাপটা লুজ করে রেখেছিলেন, যাতে সামান্য দূরে গিয়ে, ফাঁকা জায়গাতে মিসেস ঘারেওয়ালের গাড়ির ব্রেকডাউন হয়।
অনুপ মিত্র, মিস সাহাকে মারার সময়ে আপনি উনার গাড়ির বাইরে ছিলেন, তাই মৃত্যুযন্ত্রণায় স্ট্রাগেল করার সময়ে উনি আপনার নাগাল পাননি। … কিন্তু মিসেস ঘারেওয়ালের ক্ষেত্রে আপনি গাড়ির ভিতরে ছিলেন, উনি তো স্ট্রাগেল করার সময়ে, আপনার হাত খিমছে রক্ত বার করে দিয়েছিলেন। তাই না! … উনার হাতে রক্তের ট্রেস পাওয়া গেছে। … রথিন তুমি ওভারলুক করলেও, ফরেনসিক ওভারলুক করেনি। … আমার চেনা একজন আছে ফরেনসিকে। … সেই আমাকে এই ইংফরমেশন দেয়। …
বাবা এই বলে, অনুপের কাছে গিয়ে – আপনি তো ফুল হাতা সার্ট পরেন না। খিমচানোর দাগ লুকনোর চেষ্টা! … এই বলে বাবা অনুপের হাতার বোতাম খুলে উপরে তুলে দিলে সকলে স্পষ্ট ভাবে দেখলাম, অনুপের বা হাতের কবজির নিচে গভীর খিমচানোর ক্ষতচিহ্ন।
সেখান থেকে এবার সরে এসে – আর অনিন্দিতাকে হুমকি! … প্রথমত জয়জিত যখন জেলে যাবে, তখন জয়জিতের সম্বন্ধে বিষ গুলে দেবার জন্য ওটা করা। আর দ্বিতীয়তো, স্ত্রীদের সমাজে অগ্রগতির বিরোধী অনুপ। ওর সমস্ত স্ক্রিপ্টে, সমস্ত গল্পে স্ত্রী গৃহবধূ, আর যখন তা নয়, তখন তাকে নিজের স্ক্রিপ্টে মেরে দিয়েছে অনুপ। … অর্থাৎ অনিন্দিতা তার আকর্ষণ হলেও, অনিন্দিতার এই সমাজে বাড়বাড়ন্ত, অনুপের কাছে অপ্রিয়, তাই তাকে সেই রাস্তা থেকে সরিয়ে আনার জন্য এই হুমকি। আর যখন এর পরেও দেখে যে অনিন্দিতা সেই হুমকিকে ডোন্ট কেয়ার করে এই ওমেন এম্পাওয়ারমেন্ট প্রগামে এসেছে, তখনই ওকে খুন করার প্ল্যান করে ফেলে।
বাবা একটা গভীর নিশ্বাস নিয়ে – কোল্ডড্রিঙ্কসের বোতলে বিষ মিশিয়ে, সেটা ধরিয়ে দিয়েছে জয়জিতের হাতে, আর আমাদেরকে বলতে এসেছে যে জয়জিত অনিন্দিতাকে মেরে ফেলবে, যাতে আমরা হাতেনাতে জয়জিতকে ধরে ফেলি, অনিন্দিতাকেও বিষ গ্রহণ করতে না হয়, আর অনিন্দিতাকে ও নিজের স্ত্রী করে নিতে পারে, জয়জিত জেলে গেলে। … আমার কথা অনুমানের ভিত্তিতে বলা কথা নয়। … অনুপ আর জয়জিতের ঘরের বিছনায় একটা হিডেন ক্যামেরা লাগানো আছে। আর তার ক্লিপ আমার মোবাইলে উঠছে। … এই দেখো ক্লিপ।
এই বলে বাবা সবার সামনে নিজের মোবাইলের স্ক্রিন ধরলে, সকলে দেখলো, অনুপ কোল্ডড্রিঙ্কসে কিছু একটা মিশিয়ে, বোতলটা ভালো করে ঝাঁকিয়ে দিলো। …
রথিনকাকু হেসে – অনুপ চাইছিল জয়জিতকে হাতেনাতে ধরিয়ে দেবার। আর সে সেই চালটা যাতে চালতে পারে, আর নিজে ধরা পরে যায়, তাই তুমি ট্র্যাপ বেছালে এই ভাবে। … হুম, এক্সিলেন্ট। … গার্লস, এরেস্ট হিম।
অনুপ, জয়জিত আর অনিন্দিতা অবাক হয়ে গেলে, বাবা বললেন – আসলে এই মেয়েরা উত্তরবঙ্গ থেকে আসেননি। এরা সকলেই সিয়াইডি অফিসার। আমাদের প্ল্যান মত ছদ্মবেশে ছিল।… যাই হোক, মিস্টার অনুপ, এবার আপনাকে আমার একটিই প্রশ্ন, কেন আপনি এমন স্ত্রীদের উন্নতির বিরোধী!
অনুপ রাগে গজগজ করতে করতে বলে উঠলো – এই বাইরে বেড়িয়ে সমস্ত সমাজকে নষ্ট করে দিচ্ছে মেয়েরা। … কেন? কেন? কিসের দরকার ওদের নাম যশ টাকা খ্যাতির! … কেন প্রয়োজন! … ওরা কি টাকা না কামালে, ওদের কেউ নিন্দা করবে? … না করবে না, কিন্তু ওরা যেই ছেলেদের চাকরি খেয়ে নিচ্ছে, তারা টাকা না কামাতে পারলে, সমাজ থেকে তাদের বহিষ্কৃত করে দেবার মত অবস্থা হয়। … কার কারণে এমন হয়! … এই মেয়েদের কারণে। … ঘরে বসে সংসার করলে, ছেলেরাও কাজ পায়, আর সংসারও টেকে। কাজ করতে বেড়িয়ে সংসার টেকাতে পারছে! … না! যেদিকে তাকাও ডিভোর্স। … বাইরে চাকরি নেই, অশান্তি; ঘরে ডিভোর্স। শান্তি … সমস্ত ছেলেদের থেকে শান্তি ছিনিয়ে নিয়েছে মেয়েরা। … আই হেট ওয়ার্কিং ওমেন। … অ্যান্ড আই বেট, মেনি আর দেয়ার লাইক মি।
রথিনকাকা এবার রেগে গিয়ে এগিয়ে যেতে গেলে, বাবা উনার হাত ধরে নিলেন। বাবা এবার বললেন – ঠিক বলেছেন আপনি, কোথাও শান্তি নেই। … সুন্দরি মেয়েদের দেখে বস, তার প্রতি আসক্ত, আর পুরুষদের দুচ্ছাই করে। বাড়িতে কাজ করে না, তাই অশান্তি, ডিভোর্স। … ঠিক বলেছেন। … কিন্তু বলতে পারেন মিস্টার অনুপ মিত্র, কেন মেয়েরা এমন করলেন? আগে তো এমন করতেন না!
অনুপ সেই রাগের মুখে – বিকজ দে আর ইডিয়টস।
বাবা – না মিস্টার মিত্র, এখানটাতেই আপনি ডাহা ফেল করে গেলেন। … বেসিক্যালি আপনি বা আপনি যেমন বললেন না, আপনার মত অনেকেই আছে, তারা সবাই … (হেসে) স্ত্রীজাতিকে কনোদিন চেনার চেষ্টাই করলেন না। … মিস্টার মিত্র, স্ত্রীদের স্বভাবই হলো নেপথ্যে থেকে, সম্মুখে পুরুষদের এগিয়ে দেওয়া। … এটা ওদের ইন্সটিংট। নিজে সর্বক্ষণ গৃহবধূর কাজে ব্যস্ত থেকে, সর্বক্ষণ সেই সমস্ত কিছু করতেন, যা একটা পুরুষ চেয়েও করতে পারেন না, আর যাতে পুরুষটি বাইরে গিয়ে নিজেদের আদর্শকে স্থাপন করতে পারেন। …
একটা ধিক্কারের হাসি হেসে, আবার বাবা বললেন – কিন্তু তাঁদের এই সেক্রিফাইসের গুরুত্ব দিয়েছেন কনোদিন! … না, দেন নি। … বছরের পর বছর, জেনারেশনের পর জেনারেশন এই আত্মত্যাগ করেছেন স্ত্রীরা। কি প্রতিদান দিয়েছেন তাদের! … কিচ্ছু না; উপরন্তু কি বলে গেছেন, ঘর সামলানো ছাড়া তমরা কিছু পারো না, তাই সেটাই করো। …
বাবা আবার বললেন – মিস্টার অনুপ, আপনারা এই ভাবে যেই দিনেরপরদিন স্ত্রীদের অপমান করে গেছেন, তার ফল হলো এই আজকে উনারা বাইরে বেড়িয়ে জগতকে জয় করছেন। … আপনাদের করা প্রতিটি অপমানের উত্তর দিতেই ওরা আজকে সেই সেই কাজ করছেন, যা পুরুষরা দাবি করে এসেছেন যে তাঁরা ছাড়া কেউ করতে পারেন না। … চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন আজ যে, তাঁরা যেমন ঘর সামলাতেও পারেন, তেমন বার সামলাতেও পারেন। … আপনাদের মুখে জুতো মেরে বলে দিচ্ছেন তাঁরা যে, তাঁরা ঘর সামলাতেন, কারণ পুরুষ ঘর সামলাতে পারেনা। … আর বলে দিলেন যে, তাঁরা দুটোই পারেন।
আগের সময়ে যদি আপনারা স্ত্রীরা যেই আত্মত্যাগ করে, আপনাদেরকে বাইরের কাজে নিঝঞ্ঝাট ভাবে এগোতে দিতেন, তার কদর করতেন; উনাদের প্রাপ্য সম্মানটা দিতেন, তাহলে আজ উনারা বাইরে বেরতেনই না, পুরুষদের পিছিনে ফেলে জগতকে জয়ও করতেন না। … মিস্টার অনুপ, আজ যে স্ত্রীরা পুরুষদের দুর্দশার কারণ, তার কারণ স্ত্রীরা নন, তার কারণ পুরুষদের অহংকার। … অনেক পুরুষই আজকে বুঝে গেছেন যে তাঁদের অহংকার মিথ্যা ছিল। স্ত্রীরা ঘরবার দুই সামলাতে পারে, কিন্তু পুরুষ ঘর সামলাতে অক্ষম। … কিন্তু আপনাদের মতও অনেক পুরুষ আছে, যারা এখনও বোঝেন নি এই সত্য। … যেদিন আপনারাও বুঝে যাবেন, সেদিন আবার স্ত্রীরা ঘরে চলে যাবেন। … উনারা যে নেপথ্যে থেকেই আনন্দ পান। … নিজে নাম করে উনারা আনন্দ পান না। অন্যের নামে, আর তাঁকে সাহায্য করাতেই উনাদের আনন্দ। …
বিশ্বাস হচ্ছেনা আমার কথায়। অনিন্দিতাকেই প্রশ্ন করে নিন। … প্রতিবার জয়জিত সামনে এগিয়েছে, প্রতিবার উনার আনন্দ হয়েছে। … আমার সাথে উনার দুই থেকে তিনবার দ্যাখা হয়েছে। একটিবারও উনি নিজের বিস্তারের কথা বলেন নি, বলেছেন জয়জিতের প্রতিভার কথা। … এটাই স্ত্রীদের স্বভাব। … যেদিন এই মহান উদারতাকে অনুভব করতে পারবে সম্পূর্ণ সমাজ, সেদিন আবার স্ত্রীরা ঘরসামলাতে ঘরে চলে যাবেন। … উনারা খুব ভালো করেই জানেন, বোঝেনও যে উনারা আগে এগচ্ছেন তাই পুরুষদের অসুবিধা হচ্ছে। যতটা না কষ্ট এতে পুরুষদের হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট স্ত্রীদের হচ্ছে। …
কিন্তু যতক্ষণ না পুরুষ সমাজ এই সত্য বুঝে যাবে যে স্ত্রীশক্তি আসলে ঈশ্বরের পূর্ণপ্রকাশ, ততদিন তাঁরা পিছনে যাবেন না। আর যাওয়াটা উচিতও না। যেই লড়াই করতে নামা হয়েছে, তা শেষ হবার আগে, পিছনে যাওয়ার অর্থ, জীবনকেই ছোট করে দেওয়া। … তাই মিস্টার অনুপ, এই ঈর্ষা মন থেকে মিটিয়ে ফেলুন, আর অন্তত একটি কি দুটি নারীর পাসে নিজেকে রাখুন, তাঁর সাথে আপনি আছেন, আর থাকবেন এটা বলার জন্য। যদি সত্যিই মন থেকে কনো নারীর প্রতি এই আচরণ দেখাতে পারেন, তখন অনুভব করবেন, প্রেম কাকে বলে। … দেহরূপরস ভোগ করা প্রেম নয়, কাম, যা সম্পূর্ণ মানবজাতির প্রধান শত্রু। যেদিন নারীর প্রেম দেখবেন, সেদিন বুঝতে পারবেন প্রেম কাকে বলে। … স্নেহ মমতা কাকে বলে, সেদিন বুঝবেন। আর সেদিন এও বুঝে যাবেন যে এতটা স্নেহ মমতা না পুরুষ কনোদিন নিজে ধারণ করতে পেরেছে আর না পারবে। … যাও রথিন, এই মানসিক রোগীকে নিয়ে যাও।
রথিনকাকা অনুপকে সিয়াইডি ভ্যানে তুলে দিলেন। তারপর বাবাকে এসে বললেন – তুমি আমাকেও দ্বন্ধে রেখে দিলে যে জয়জিতই আসল খুনি!
বাবা হেসে – বলে না মৃত্যুর আগে মানুষের শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করতে হয়; অনুপের তো শেষ ইচ্ছা এটাই ছিল। তাই সেটাই পূর্ণ করলাম মাত্র।
রথিনকাকা – তবে যাই বল, তুমি যদি না থাকতে, আমি কিন্তু জয়জিতকেই এরেস্ট করে নিয়ে যেতাম। সত্যি বলছি। … চলো, তুমি এসো মিলিকে নিয়ে। আমি ওই শয়তানটাকে নিয়ে কাস্টডিতে যাই।
রথিনকাকা চলে গেলে, অনিন্দিতাদি বাবার সামনে এসে, বাবার চরণ ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। …
বাবা একটু লজ্জা পেয়ে গিয়ে বললেন – আহা, এসব আবার কি!
অনিন্দিতাদি – না স্যার, কেসের মীমাংসা করার জন্য এটা ছিল না। স্যার, নারী জাতির স্বভাব, কর্তব্য, আর ভূমিকা আপনার কাছ থেকে যেমন শুনলাম, এমন কখনও শুনিনি, এমন কনোদিনও ভাবিনি। … এতটা আমি স্ত্রী হয়েও বুঝিনি। … সত্যি বলতে কি জানেন তো, খ্যাতি একটা নেশা। একবার এই নেশার ছোঁয়া মনে লেগে গেলে না, কি, কেন, কি জন্য সব ভুলে যায় মানুষ। … স্যার, আপনার মেয়ে আমার থেকে খুব একটা ছোট নয়, তাই আমি আপনার মেয়ের মতই। আর সত্যি বলছি, আমার বাবার থেকে আজ আমি জীবনের সেরা শিক্ষাটাই পেলাম। …
ব্যাগ হাতরে, একটা চেকবই বার করে। অনিন্দিতাদি বাবার নামে একটা ১০ লাখের চেক কেটে দিলেন। … বাবা বললেন – এমাউন্টটা একটু বেশি হয়ে গেল না!
জয়জিত সামনে এসে বললেন – এতে আমারও অর্ধেক ভাগ আছে ধরে নিন। … যার খপ্পরে পরেছিলাম, জানিনা আমাকে মাধ্যম করে, আর কত মানুষের প্রাণ নিতো। সেই দায় থেকে আমাকে মুক্ত করার জন্য, এই এমাউন্টের অর্ধেক ধরে নিন। … আর হ্যাঁ স্যার, আমরা শীঘ্রই বিয়ে করবো। … আপনাকে কিন্তু সপরিবারে আসতে হবে আমাদের বিয়েতে। …
বাবা হেসে বললেন – নিশ্চয়ই আসবো।
বাবা আর আমি চলে এলাম। রাস্তায় একটা কথাও বলিনি। শুধু বাবার কথাগুলো ভাবছিলাম। বাবা যা বললেন সত্যিই অক্ষরে অক্ষরে মায়ের ক্ষেত্রে পালন করেন। … মাও বলেন, বাবা যেই প্রমাণ সম্মান আর স্নেহ দিয়েছেন উনাকে, খুব ভাগ্যবান স্ত্রীই তা পেয়ে থাকে। … বাবার বুদ্ধির জন্য গর্ব তো হয়ই, আজ বাবার উদার দর্শনের জন্যও খুব গর্ব হচ্ছিল।
