ট্র্যাপ | রহস্য গল্প

রথিনকাকার সমস্ত ব্যবস্থা করা হয়ে গেল। মহিলা সিয়াইডিদের যা বোঝানোর বাবা বুঝিয়ে দিলেন। সঙ্গে আমিও ছিলাম। … সন্ধ্যার সময়ে, অনিন্দিতাদিকে বাবা জানিয়ে, কালকে সকাল ১০টায় হোটেল প্যালেস ভেনু কনফার্ম করে দিলেন। অনিন্দিতাদি বললেন – উনার সাথে জয়জিত আর জয়জিতের এসিস্ট্যান্ট, অনুপও থাকবেন। বাবা বলে দিলেন নো প্রবলেম। অনিন্দিতাদির জন্য একটা রুম বুক করা হয়েছে, আর তাছাড়াও আরেকটা রুম বুক করা হয়েছে, সেখানে এসিস্ট্যান্ট সহ জয়জিত থাকবে।

সমস্ত প্রগাম সেট হয়ে গেলে, আমরা পরের দিন সকালে চলে গেলাম হোটেলে। প্রথমেই সকলে চেকইন করলাম। তারপর ৫জন সিয়াইডি মহিলার সাথে আলাপ করানো হলো। বলা হলো তারা উত্তরবঙ্গ থেকে এসেছেন, অনিন্দিতাদির কথা শুনবেন বলে। আর তারপরে, সেমিনার রুমে, অনিন্দিতাদি একটা অসাধারণ ভাষণ দিলেন। তারপরে হোটেলের রুমেই সকলে খেলাম। আবার সন্ধ্যায় একটা সেশন হবে। সেখানেও অনিন্দিতাদি দারুণ একটা ভাষণ দিলেন। আর তারপর ওই শয়তান জয়জিতটা স্টেজে উঠে, একটা অসাধারণ ভাষণ দিল।

আমার তখন যা রাগ হচ্ছিল না! … মনে হচ্ছিল, মুখে মুখোশ পরে, ভালোমানুষ সাজা, আর পিছনে খুন করা! … দাঁড়া, আজ আমার বাবা আর রথিনকাকু তোকে ধরার জন্য ট্র্যাপ ফেলেছে। তুই কিছুতেই পালাতে পারবি না। ধরা পরার পর, আমি এই প্রথম একজনকে একটা সপাটে থাপ্পড় মারবো। আমার এই ইচ্ছাতে, বাবা ও রথিনকাকু দুইজনেই রাজি।

ট্র্যাপের ভিতরের অংশ কি, সেটা আমি জানিনা। সমস্ত প্রগাম শেষ। সন্ধ্যার চা-টা একসাথে সকলে বসে খেলাম। তারপর যে যার ঘরে। … রাত্রে আমরা ডিনার খেলাম একটু তাড়াতাড়ি। আমরা সকলে প্রস্তুত, কিছু ঘটবে, আর আমরা ঝাঁপিয়ে পরবো। … ঘটলোও ঘটনা, তবে একটু রাত্রি করে। … আমরা সকলে জেগেই ছিলাম। প্রায় ১টা, আমাদের ঘরে টকটক করে আওয়াজ।

বাবা গিয়ে দরজাটা খুলতে, জয়জিতের এসিস্ট্যান্ট অনুপ হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে বোলন – স্যার, স্যার, বাছান অনিন্দিতাকে। জয়জিত ওকে মেরে ফেলবে।

বাবা চিন্তিত হয়ে বললেন – কেন কি হয়েছে?

অনুপ – দাদা, আমি নিজে চোখে দেখেছি, জয়জিত একটা কোল্ডড্রিঙ্কসের বোতলে, বিষ… এই এই … এই দেখুন, (পকেট হাতরে) এই দেখুন, এই জিনিসটা মিসিয়ে, সেটা নিয়ে অনিন্দিতার ঘরে গেল।

রথিনকাকু সেই ফয়েলটা দেখে বলল – বিজয় এখুনি চলো। এটা একটা চোরাই ড্রাগ। … এতে এমন বিষ থাকে যে খাবার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ মারা যায়। বিজয়, এতে ব্ল্যাক মাম্বার বিষ মেশানো হয়। … ফাস্ট ফাস্ট। … মিলি, তুই ওই মেয়েদের নিয়ে আয়, তাড়াতাড়ি রুমে। … চলো বিজয়, … অনুপ তুমিও এসো।

এই বলে বাবা, কাকু আর অনুপ ছুটে গেলেন অনিন্দিতাদির রুমের দিকে। আমি হোটেলের কর্তৃপক্ষ আর মেয়েদের নিয়ে সেখানে যেতে দেখলাম, জয়জিতের হাত থেকে সেই বোতল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর সে গালে একটা বেঘোরে পুলিশের থাপ্পড় খেয়ে থরথর করে কাঁপছে। … মেয়েরা গিয়ে, জয়জিতকে একটা চেয়ারে বসিয়ে হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিল।

বাবা চেঁচিয়ে উঠলেন – তোমার খেলা শেষ জয়জিত। একের পর এক খুন করে চলেছ তুমি হ্যাঁ!

 জয়জিত থতমত খেয়ে গিয়ে বলল – খুন! আমি! … কি সব বলছেন!

আমার সেই কথা শুনে মাথায় এত রাগ উঠে গেছিল যে, আমি তেড়ে গিয়ে জয়জিতকে দুটো গালে দুটো থাপ্পড় কষাতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। বাবা আমার হাতটা শক্ত করে ধরে নিলেন। আমি বাবার দিকে বেশ ক্রুদ্ধ হয়েই তাকালাম, কিন্তু বাবার মুখের গম্ভীর ভাব দেখে আমি একটু থিতিয়ে গেলাম।

বাবা ক্রোধমিশ্রিত গাম্ভীর্য নিয়েই বললেন – ন্যাকা সাজা হচ্ছে? চিঠি লিখে নিজের গার্লফ্রেন্ডকে হুমকি দিয়ে হয়নি! … প্রখ্যাত ডিরেক্টর, মঞ্জুশ্রি সাহাকে খুন করতেও হাত কাঁপল না! … আর নিজের কলেজের ওনারকে!

জয়জিত এখন চেয়ারে বাঁধা, হাতে হাতকড়া। নড়ার ক্ষমতাও ওর নেই। কিন্তু এর মধ্যেও, ও এতই বেয়াদপ যে একই ভাবে বলে চলল – আমি খুন করি নি, বিশ্বাস করুন। … আমি খুব ভিতু মানুষ। আমার পক্ষে খুন করা সম্ভবই নয়।

রথিনকাকা এবার উগ্র হয়ে উঠলেন। চেঁচিয়ে বলে উঠলেন – ইয়ার্কি মারা হচ্ছে আমাদের সাথে! … মঞ্জুশ্রি সাহা খুন যেখানে হয়, সেখান থেকে ডাকবাংলো মোর মাত্র ২০ মিনিটের পথ। আর যখন উনি খুন হয়েছে, ঠিক তার ২০ মিনিটের মাথায় একাকী নিজের গারি চালিয়ে যেতে দেখা গেছে তোমাকে জয়জিত! এবার কি বলবে?

বাবা বললেন – প্রমাণ চাই? এই দ্যাখো প্রমাণ।

এই বলে বাবা নিজের ব্যাগ থেকে একটা ছবি বার করলেন, যেই ছবিটা অনিন্দিতাদিকে বাবা দেখিয়ে কনফার্ম করেছিলেন যে ওটা জয়জিতই।

জয়জিতের মুখ কাঁচুমাচু। এখনও কিছু নাকি বলার আছে ওর। কিন্তু কারুর আর ওর কথা শোনার নেই। … তাই মাথা এদিক সেদিক করে একটা ভাব করতে চাইলো বেয়াদপটা যেন ও পুরো ব্যাপারটাইয় ফেঁসে গেছে। … যেই পরিমাণ রাগ হচ্ছিল না আমার ওই জয়জিতের উপর। ইচ্ছা করছিল, যেঁটুকু কুম্ফু জানি, পুরোটা ওর উপর উগড়ে দিই।

রথিনকাকা আবার বললেন – এলুমনির কথা বলার জন্য আপনি আপনার কলেজের ওনারের বাড়ি যাননি! … সেখান থেকে বেড়িয়ে কোথায় গেছিলেন! … মিস্টার জয়জিত, যেই যেই সিগনালে, মিসেস সিপ্রা ঘারেওয়ালের গাড়ি দেখা গেছে, ঠিক তার ৪-৫ মিনিট আগেই আপনার গাড়ি দেখা গেছে। … কি করে মিস্টার জয়জিত? … আসলে আপনি উনার গাড়ির সামনে সামনে ছিলেন আর যেই সময়ে দেখেন যে একটা জায়গা নিরিবিলি, কনো জনমানুষ নেই, কনো সিসিটিভি নেই, অমনি উনার গাড়িকে দাঁড় করিয়ে, উনার খুন করে দিলে!

জয়জিতের মুখের ভাব এমন যেন ওর মাথায় আকাশ ভেঙে পরছে। এমন চোখ মুখ করছে যেন মনে হচ্ছে – এ বাবা! এরা কি সব বলছে! … আমি তো দুধুভাতু ছেলে! আমাকে এমন কি করে বলছে! … মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, দি একটা কষিয়ে থাপ্পড়, মুখের সব দাঁত ফেলে দিই মেরে।

বাবা এবার গম্ভীর ভাবে পায়চারী করতে করতে অনুপের পিছনে গিয়ে, অনুপের কাঁধে হাত রেখে বললেন – কেন জয়জিত বাবু! … এই খুন গুলো করার উদ্দেশ্য কি? … স্ত্রীরা বাড়ির হেঁসেল ছেড়ে, এই সমস্ত কিছু করলে, আপনার আপত্তিটা কোথায়? কেন এই আপত্তি! … কেন আপনি স্ত্রীদের এই উচ্চপদে দেখলে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন! … কি করেছে তাঁরা আপনার! … তাঁরা অনেক স্ত্রীদের প্রেরণা হলে, আপনার অসুবিধাটা ঠিক কোথায়! …

এবার অনুপের উদ্দেশ্যে বাবা বললেন – আচ্ছা অনুপ বাবু! আপনি তো উনাকে অনেকদিন চেনেন! উনি কি বরাবরই এরকম, মানে স্ত্রীদের বাড়বাড়ন্ত দেখলে উনার এমন গাজ্বালা করে ওঠে!

অনুপ – জানিনা দাদা, ওর যে এমন বিকার আছে, সেটাই তো আমি জানতাম না! … ও আমাকে ঘনাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি কনোদিন। … আর অনিন্দিতাও ওকে অনেকদিন চেনে। ইনফ্যাক্ট, আমরা দুইজন একই সময় থেকে জয়জিতকে চিনি। … বরাবরই ওকে একজন অত্যন্ত সাধাসিধা মানুষ মনে হয়েছে। ওর পেটে পেটে এত কিছু যে রয়েছে, সেটা আমরা কেউ টেরই পাইনি!

বাবা – হুম, রথিন এরেস্ট হিম।

রথিনকাকু এবার হাতকড়ায় চাবি পরাতে গেলে, বাবা বলে উঠলেন – ওকে নয়, একে। এই বলে অনুপকে সামনে এগিয়ে দিলেন।

অনুপ চেঁচিয়ে উঠলেন – আমি! আমি কি করলাম আবার! আমায় … এটা কি হচ্ছে! … চক্রান্ত! … কি করছেন আপনারা, ওই ক্রিমিনাল আপনাদের কত টাকা দিয়েছে, আমাকে ফাঁসানোর জন্য!

রথিনকাকাও একটু অবাক হয়ে গেলেন। আর আমার তো সমস্ত হিসাবই এলোমেলো হয়ে গেল! কি বলছে বাবা!

বাবা বললেন – রথিন, তাড়াতাড়ি ওকে হাতকড়াটা পরাও, না হলে, বুঝতে পারছ তো, এটা ভোলাভালা জয়জিত নয় যে, তুমি বসিয়ে রাখবে আর ও বসে থাকবে। … এ দুটো খুনের আসামি।

রথিনকাকা কনো কথা না বারিয়ে আগে অনুপকে হাতকড়া পরালেন। তারপর বললেন – কি হচ্ছে বলো তো বিজয় এইসব!

বাবা মুচকি হেসে – রথিন, যদি জয়জিতই আততায়ী হতো, তাহলে এই ট্র্যাপের কি দরকার ছিল! ওর বিরুদ্ধে তো যথেষ্ট প্রমাণ ছিল আমাদের হাতে ওকে গ্রেফতার করার জন্য। … কিন্তু আসল আসামীর বিরুদ্ধে আমাদের কাছে কনো প্রত্যক্ষ প্রমাণই নেই, তাই তো এই ট্র্যাপ। … জয়জিতকে ছেড়ে দাও রথিন, ও সম্পূর্ণ ভাবেই নির্দোষ।

অনুপ চেঁচিয়ে উঠলো বাবার উদ্দেশ্যে – এই যে মিস্টার, আপনি কে আমি জানিনা, আর জানতেও চাইনা!  … আমাকে আপনি মিথ্যা দোষ দিচ্ছেন। আমি রেহাই পেয়ে গেলে আপনার যা অবস্থা করবো না!

বাবা – কেমন অবস্থা করবেন? যেমনটা মঞ্জুশ্রি সাহাকে করেছিলেন, নাকি যেমনটা সিপ্রা ঘারেওয়ালের সাথে করেছিলেন। … না নাজেহাল করে রেখেছিলেন আপনি তো আপনার কাঙ্ক্ষিত, অত্যন্ত ভাবে কাঙ্ক্ষিত অনিন্দিতা চক্রবর্তীকে। … আর বোকা পাঁঠা করে রেখেছিলেন আপনার অনুগামী জয়জিতকে! আমার সাথে কোনটা করবেন মিস্টার অনুপ মিত্র! 

রথিনকাকা – বিজয়, প্লিজ আমাকে একটু ডিটেল করো। আমি সত্যি বলছি কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা।

অনিন্দিতাদি – হ্যাঁ স্যার, প্লিজ একটু খুলে বলুন না। … আমার যেন সমস্ত হিসাব এদিক সেদিক হয়ে যাচ্ছে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4