দ্বিতীয় পর্ব – ট্র্যাপের প্রয়োজন
বাবা চিঠিগুলো ভালো করে দেখলেন। দেখে একটা মুচকি হাসি দিলেন, আর সোফাতে মাথাটা এলিয়ে দিলেন। আমি বাবার থেকে ওই চিঠিগুলো নিলাম। আর সামান্য দেখতেই বুঝেগেলাম বাবা কেন হাসলেন। … চিঠির লেখা আর হুমকির লেখার হাতেরলেখা সম্পূর্ণ এক। …
আমি বললাম – এর মানে তো পরিষ্কার বাবা! জয়জিত।
বাবা – হুম।
আমি – তাহলে অনিন্দিতাদিকে বলে দাওয়া উচিত না! … উনি পুলিশে কমপ্লেন করে, জয়জিতকে ধরিয়ে দিলেই তো কেসের সমাধান হয়ে গেল।
বাবা – সেটা করতে গেলে, আজরাত্রের মধ্যেই তোর অনিন্দিতাদি খুন হয়ে যাবে। … আর কিচ্ছু করা যাবেনা।
আমি – তাহলে করনিয় কি?
বাবা – একটা ট্র্যাপ বেছাতে হবে, সবার অজান্তেই। অনিন্দিতারও অজান্তে। … এমন ট্র্যাপ ছড়াতে হবে যাতে আততায়ীর মনে হয়, এর থেকে ভালো খুন করার সুযোগ আর হতে পারেনা। … আর তখন আমাদের হাতেনাতে ধরে ফেলতে হবে আততায়ীকে। … তবেই অনিন্দিতাকে বাঁচানো সম্ভব হবে।
বাবার ফোন বেজে উঠলো। ফোনটা চার্জ হচ্ছিল। উঠে গিয়ে দেখলাম, রথিনকাকার ফোন। বাবাকে এনে দিলাম। আর বললাম লাউডস্পিকারে দিতে।
বাবা ফোন ধরে লাউডস্পিকারে দিলেন। রথিনকাকা বললেন – বিজয়, একবার আসতে হবে বারাসাত থেকে টাকির দিকের রাস্তায়। … ইমিডীয়েট।
বাবা – কি হয়েছে বলবে তো?
রথিনকাকা – প্রখ্যাত মুভি ডিরেক্টর, মঞ্জুশ্রি সাহা খুন হয়েছেন। … কভারেজও করবে, আর একটু দেখেও নেবে। কারণ মাথায় কিছুই ঢুকছে না আমার।
বাবা – আচ্ছা যাচ্ছি। … আমি আর বাবা আমাদের গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম হাসনাবাদের রাস্তায়। বারাসাতের মোর থেকে, শঙ্করকাকু আমাদের গাড়িতে উঠে পরলেন আর আমাদের স্পটে নিয়ে গেলেন। গাড়ির একটা কাঁচই খোলা। ভিতরটা একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব। অর্থাৎ এসি চলছিল। সরকারি ডাক্তার বললেন, দুই ঘণ্টা হয়েছে খুন করা হয়েছে। … তখন বাজে রাত ১১টা। অর্থাৎ ৯টা নাগাদ খুন হয়েছে। …
আশেপাশের লোকেরা কেউ ছিলনা স্পটে। একটা বাচ্চাছেলে প্রথম দেখে লাসকে, তারপর গ্রামে খবর দিতে, পুলিশ আসে, আর তারপর রথিনকাকা, ডাক্তার, আর এখন আমরা। … ফরেনসিক দেখে বললেন, যে খুন করেছে, সে গ্লাভস পরে খুন করেছে। তাই কনো ট্রেস নেই, কনো ক্লু নেই।
বাবাকে রথিনকাকা বললেন – কি হতে পারে বলো তো?
বাবা – কি সিনেমার শুটিং চলছিল এখন?
রথিনকাকা – তুমি বলছো সিনেমাকে কেন্দ্র করেই?
বাবা – হবার সম্ভাবনাই বেশি। গাড়ি থেকে সিনেমার স্ক্রিপ্ট মেরামত হয়েছে না!
রথিনকাকা – হ্যাঁ।
বাবা – একবার দেখতে পারি?
রথিনকাকা একটু পিছিয়ে গিয়ে, একটা ফাইল নিয়ে এলেন। তারপর বাবার হাতে দিতে, বাবা মোবাইলের টর্চে খানিক উলটেপালটে দেখলেন, আর বললেন সিনেমার নাম, জাঁদরেল। প্রযোজক কে জানো?
রথিনকাকা – না ভাই, সেটা আমার তো জানা নেই।
একজন পুলিশঅফিসার বললেন – অতিশ বর্মণ। উনার বসিরহাটের আগে একটা বাংলো আছে স্যার।
বাবা – হুম সেখানেই যাচ্ছেন।
তারপর আরো একটু পাতা উল্টে দেখে, একজায়গায় বাবা একটু থমকে গেলেন।
রথিনকাকা – কি ভাই, কিছু পেলে নাকি?
বাবা – উমম, একটা কাজ করতে পারবে! ফাইলের এই একটি পাতা, আমাকে খুলে দিতে পারবে? আমি কাল ফটোকপি করে নিয়ে আসবো। সেটা এখানে এটাচ করে দিও। …
রথিন কাকা – ওকে দাঁড়াও। এই বলে যেই পাতাটা বাবা চাইছিলেন, সেটি খুলে দিয়ে দিলেন।
বাবা – কাল সকালে একবার উনার বাড়ি গিয়ে দেখলে কেমন হয় রথিন? এই সিনেমার সাথে কারা কারা যুক্ত, একটা তালিকা পাওয়া হয়ে যাবে।
রথিনকাকা – মন্দ হয়না। … কিন্তু এখন, এখানে কিছু কি করনিয় আছে?
বাবা – উমম… দ্যাখো। আততায়ী কনো ভাবে গাড়িকে দাঁড় করায় মিস মঞ্জুশ্রির। তারপর, কাঁচ খোলেন উনি, আর তারপর গলা কেটে দেওয়া হয়। … নাকে কিছু দিয়ে চাপা দেওয়া হয়েছিল বলে মনে হয়। … স্ট্রাগেল করেছেন, কিন্তু গাড়ির দরজা খোলার চেষ্টা করেন নি। তারমানে, আততায়ী উনার চেনা। আর আততায়ী আচমকাই ছুরি চালায়। … স্ট্রাগেলটা ছুরি চালানোর পরের স্ট্রাগেল, মানে মৃত্যু যন্ত্রণা। … আর নাকে চাপা দেওয়া হয়েছে, যাতে আওয়াজ আশেপাশে শোনা না যায়। …
বাবা একটু থেমে বললেন – আচ্ছা, ডাকবাংলোতে রাস্তায় সিসিটিভি আছে না! … ওটা একবার চেক করো না। মিস সাহার গাড়ি টাকির দিকে যাচ্ছিল। তাই মোস্ট প্রবাব্লি, আততায়ীর গাড়ি টাকির দিক থেকে ডাকবাংলোর দিকেই গেছে। … নাহলে উনার গাড়ি থামতো না।
রথিনকাকা – কতক্ষণ আগের টিভি দেখবো?
বাবা – দুঘণ্টা আগে খুন হয়েছে। আর এখান থেকে ডাকবাংলো, ২০ মিনিটের পথ। যতগুলো গাড়ি এই ৯-১৫ থেকে ৯-৪০এর মধ্যে এখান থেকে বেড়িয়েছে, সমস্ত বাইক, সমস্ত চারচাকার ট্র্যাক করো। … আর সেই গাড়ি কার কার নামে লাইসেন্সড, সেটার তালিকা বার করো।… কালকে উনার বাড়ি গিয়ে, জাঁদরেল সিনেমা নিয়ে যারা কাজ করছিলেন, সেই সিনেমার ইউনিটে কে কে আছেন, সেই ব্যাপারে তদন্ত করলে, একটা দিশা পাওয়া যাবে।
রথিনকাকা – ভাই বিজয়। … আমার যদি এফোর্ড করার পয়সা থাকত না, আমি তোমাকে আমার এসিস্ট্যাট করে রাখতাম। … এনিঅয়েজ। চলো ডাকবাংলো।
আমরা সেখান থেকে ডাকবাংলো গিয়ে, সেখানের ট্র্যাফিক পুলিশের থেকে সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ বার করলাম। রথিনকাকা, ওদেরকে দিয়েই একটা এক্সেল সিট তৈরি করালো, আর সেই কপি লালবাজারে পাঠিয়ে দিয়ে বললেন – এই ১২টি বাইক, আর ৮টা চারচাকা গাড়ি, কার কার নামে রেজিস্টার্ড, কালকে আর্লি মর্নিংএর মধ্যে উনার লাগবে। আমরা চলে এলাম। কথা হলো, কাল দেশপ্রিয়পার্কে সকাল ৮টায় দেখা হবে। … মিস সাহার বাড়ি ট্রায়াঙ্গুলার পার্কে। আমরা সেখান থেকে একসাথে উনার বাড়ি যাবো।
বাড়ি গেলাম আমরা, আর সেখানে অনেক নথিই ঘেঁটে দেখা গেল। … ইউনিটের সকলের নাম পাওয়া গেল। আর রথিনকাকু নিজের কাছে একটা তালিকা ছিল, সেই তালিকার সাথে নাম মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতে থাকলো। সমস্ত কিছু দেখার পরে, বাবাকে বললেন রথিনকাকা – বিজয়, সিনেমার সাথে কানেকশন নেই বুঝলে। ইউনিটের কারুর নাম এই তালিকার সাথে মিলছে না।
বাবা বললেন, তালিকাতে কি রয়েছে? একবার বলো।
রথিনকাকা – ১২টা বাইক, তাদের কারুর সাথে লিংক নেই সিনেমার। সকলেই সাধারণ মানুষ। নিত্য যাতায়াত করেন বারাসাতে, নিজেদের দোকানের মাল তুলতে। আর ৮টা চারচাকা। তার মধ্যে ৫টা ওলা উবার। তিনজনের একজনের সাথেও এই তালিকার নামের কনো মিল নেই।
বাবা – তিনটে নাম কি কি?
রথিন কাকা – সুকান্ত সামুই। মিলন কুণ্ডু, আর জয়জিত চৌধুরী।
বাবা আর আমার, দুইজনেরই ভ্রুকুঁচকে গেল। আমি বাবার দিকে তাকালাম। … বাবা বললেন – জয়জিত চৌধুরীর সাথে এই সিনেমার কানেকশন কাছে রথিন।
রথিনকাকা – কি ভাবে? এই তালিকায় কই নাম নেই তো!
বাবা নিজের ছোট্ট সাইড ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বার করলেন। কাগজটা স্ক্রিপ্টের। কাল রাতে বাবা রথিনকাকার থেকে চেয়ে নিয়েছিলেন যেটা। … বাবা বললেন – এই স্ক্রিপ্টটা জয়জিত চৌধুরীর লেখা। … এখানে একটা কারেকশান করা দেখতে পাচ্ছ। … হাতের লেখাটা মোস্ট প্রবাবলি জয়জিত চৌধুরীর। … রথিন, একটা কাজ করো, তুমি এই জয়জিতের গাড়ির সমস্ত কাগজ বার করো। … এর এড্রেস, ইত্যাদি সমস্ত কিছু। … শহরে আরো অনেক জয়জিত চৌধুরী থাকতে পারে তো। আমাদের কনফার্ম হতে হবে যে এই জয়জিত চৌধুরীই সেই স্ক্রিপ্ট রাইটার জয়জিত চৌধুরী।
রথিনকাকা – তাহলে একে এরেস্ট করা দরকার।
বাবা – এখনই এরেস্ট করলে, কিচ্ছু করতে পারবে না। …
রথিনকাকা – কিন্তু ওইদিকে জয়জিত কি জন্য গেছিল। শুধুই খুন করার জন্য!
বাবা – অতিশ বর্মণের কাছে সে কাল গেছিল, স্ক্রিপ্টের কনো একটা অংশ নাকি ডিরেক্টর রাখছেন না, সেই অভিযোগ করতে। … আমি অতিশ বর্মণের সাথে ফোনে কথা বলে জেনেছি।
রথিনকাকা – কিন্তু এই জয়জিতকে তুমি চিনলে কি করে?
বাবা – সে অনেক কথা রথিন। … রথিন এই জয়জিত অত্যন্ত ধুরন্ধর। একে ধরা অত সহজ হবেনা। আমাদের একটা ফাঁদ পাততে হবে। ট্র্যাপ ছাড়া, একে ধরা যাবেনা। … তুমি আজ সন্ধ্যায় আমার কাছে এসো। সেই ট্র্যাপের ব্যাপারে একবার আলোচনা করা প্রয়োজন। … (একটু থেমে) আচ্ছা রথিন, ফুটেজে গাড়ির ভিতরে কে আছে, দেখা যাচ্ছে?
রথিনকাকা – আমার সাথে একবার অফিস চলো। চালিয়ে দেখাচ্ছি। দেখলেই বুঝতে পারবে।
বাবা আর আমি রথিনকাকার সাথে ভবানীভবন গেলাম। ফুটেজ চলল। জুম করে দেখা গেল, গাড়ির ভিতরে একজনই রয়েছেন, যিনি গাড়ি চালাচ্ছেন। … বাবা বললেন, এই ছবিটা উনার লাগবে। … রথিনকাকুর অফিসের এক্সপার্টরা জুম করা ছবিটাকে একটা কালার প্রিন্ট করে বাবাকে দিলেন। আমরা সেখান থেকে চলে এলাম। আসার শুধু বাবা বলে এলেন – সন্ধ্যায় কখন আসছো।
রথিনকাকা – ডট ৮টা।
আমরা বেড়িয়ে এলাম। তবে বাড়ি গেলাম না। সরাসরি হাইল্যান্ড পার্কে অনিন্দিতাদির অফিসে। সেখানে নেবে বাবা যেই ছবিটা নিয়ে এসেছিলেন, সেটা অনিন্দিতাদিকে দেখিয়ে বললেন – দেখে এই মানুষটাকে আইডেন্টিফাই করতে পারছেন?
অনিন্দিতাদি বেশি সময় নিল না। একবার দেখেই বললেন – এতো জয়জিত। … কালকে এই জামা পরেই ও বেরিয়েছিল। তবে ও একা কেন? … তাহলে এটা ফেরার সময়ে হবে। … ও আজকে সকালে বলল আমাকে, রাস্তায় অনুপদাকে ছেড়ে দিয়েছিল।
বাবা – হুম, আপনার সাথে জয়জিতের আলাপ কোথায় হয়?
অনিন্দিতাদি – আমরা হেরিটেজে পড়তাম। একসাথে। দুজনেই কম্পিউটার সায়েন্সে বিটেক। … ওখানেই।
বাবা – ওকে। একটা কথা। … একটা প্রগাম করা হবে, আপনাকে নিয়েই। … ইউ, বিং আ সাকসেসফুল অম্যান এজ এন্টারপ্রিনার, কিছু মেয়ে যারা ইন্টারপ্রিনার হতে চায়, তারা আপনার সাথে দুদিনের ওয়ার্কসপ করতে চাইছে। … সঙ্গে জয়জিতকেও নিয়ে নিতে পারো। ও-ও তো এনজিও কাজও করতে চাইছে এই সবের উপর। … তো ওরও ইন্টারেস্ট থাকতে পারে। … একবার কথা বলে আমাকে জানাও। … দুদিনের মধ্যেই এরেঞ্জমেন্টটা করে নিতে হবে, কারণ মেয়েগুলো উত্তরবঙ্গ থেকে আসছে, শুধু এই ওয়ার্কসপের জন্য। … এরেঞ্জ করেছে, আমার এক বন্ধু, রথিন। … না করবেন না। আমি কিন্তু ওকে কথা দিয়ে দিয়েছি।
অনিন্দিতাদি রাজি হয়ে গেল। … আমি বুঝে গেছিলাম, বাবা রথিনকাকা যে ট্র্যাপের কথা বলছিলেন, সেই ট্র্যাপ বেছানো আরম্ভ করে দিয়েছে বাবা। … চুপ করে থাকলাম।
বাবা বললেন – জয়জিত কি সকালে এসেছিল আপনার কাছে?
অনিন্দিতাদি – হ্যাঁ। আসলে ওর একটা স্ক্রিপ্টে কাজ হচ্ছিল সিনেমায়। সিনেমার নাম, কি যেন … জাঁদরেল, হ্যাঁ জাঁদরেল। … কিন্তু কাজটা বন্ধ হয়ে গেল। সেই জন্যই দুঃখ করছিল।
বাবা – সিনেমার ডিরেক্টর কাল মার্ডার হয়েছেন।
অনিন্দিতাদি – হ্যাঁ, সেটাই বলছিল।
বাবা – আর কি বলছিল?
অনিন্দিতাদি – বলছিল, মঞ্জুশ্রি সাহার সাথে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল ওর। অসামান্য ব্যক্তিত্ব তিনি। অনেক কিছু শিখছিল, উনার সংস্পর্শে এসে। কাজটা না হয়েই উনি চলে গেলেন…। এই সব।
বাবা – হুম। ঠিক আছে, আজ উঠি। … আপনি কিন্তু ফাইনাল করলেন, ওই এম্পাওয়ারমেন্ট প্রগামের ব্যাপারে।
অনিন্দিতাদি – ওকে। কালকের দিনটাতে স্রেফ রাখবেন না।
বাবা – ওকে, পরশু তাহলে। … একটা হোটেলে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেই রাত্রিটা হোটেলেই সকলে থেকে যাবেন। পরবর্তীদিন সকালে সকলকে এড্রেস করে, আপনার ছুটি।
অনিন্দিতাদি হেসে – ওকে ডান।
আমি ভাবলাম, বাবা এইসব প্ল্যান করেন কখন! গাড়ি চালাতে চালাতে! পথ চলতে চলতে! নাকি কথা বলতে বলতে! … যদিও কিছু বলিনি, কারণ কিছু বলতে ইচ্ছা করছিলনা।
বাবাই বললেন – কি ব্যাপার, মিলি চুপচাপ! … রাগ হচ্ছে জয়জিতের উপর! …
আমি – কিরকম শয়তান দেখেছ! … নিজে খুন করে, নিজেই দুঃখ করতে এসেছে!
বাবা হেসে – সেই জন্যই তো বললাম। ট্র্যাপ না ফেললে, ওকে ধরা অসম্ভব।
বাড়ি চলে গেলাম। স্নানখাওয়া করে ঘড়ির দিকে বারবার দেখতে থাকলাম। কখন ৮টা বাজবে, আর কখন রথিনকাকু আসবেন। কিন্তু ৮টা বেজে গেল। রথিন কাকু এলেন না। … রথিনকাকু তো এমন দেরি করেন না!
কাকুর আসতে, ঘড়ির দিকে তাকালাম, বাজে নটা। … কিছু প্রশ্ন করতে হলো না। রথিনকাকু নিজেই বললেন – একটু দেরি হয়ে গেল। বেরতে যাবো, একটা খুনের খবর এলো।
বাবা – কে খুন হলো আবার?
রথিনকাকু – হেরিটেজ কলেজের মালিক, মিসেস সিপ্রা ঘারেওয়াল।
বাবা একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন কথাটা শুনে। রথিনকাকু নিজের থেকেই বললেন – একটা এক্সস্টুডেন্টদের এলুম্নির কথা চলছিল। আজ দুপুরে। উনি উনার জোঁকার বাড়ি থেকে ড্রাইভ করে আসছিলেন। গাড়ি প্রায় বাড়ি থেকে ১৫ মিনিট পেরিয়ে এসে ফাঁকা জায়গায় থেমে যায়। ব্রেক ওয়েল নাকি লিক করছিল। … গাড়ি থামাতে। পিছন থেকে কেউ গলা কেটে খুন করেছে। … কালকের মতই। গলা কাটার পর, কেউ মুখটা রুমাল দিয়ে চেপে ধরেছিল। তাই উনি চেঁচাতে পারেন নি। জায়গাটা ফাঁকা, কনো বাড়িঘর নেই। গরমের দুপুর, রাস্তাঘাটও সুমসান। কেউ আততায়ীকে দেখেইনি।
বাবা – বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে, আজ সকালে নিশ্চয়ই জয়জিতের ফুটেজ পেয়েছ। তাই না!
রথিনকাকু – জয়জিত! … এখানেও জয়জিত! … দাঁড়াও তো, ফুটেজটা আমার ফোনে লোড করে দেখছিলাম। … ফোনে আছে। … দেখি তো!
রথিনকাকু ফুটেজ চালালেন। আর বাবা যেমন বললেন, আজ সকালে জয়জিতের ফুটেজ দেখা গেল।
রথিনকাকু – এই জয়জিত তো ভয়ানক ক্রিমিনাল! … একে আমরা এরেস্ট করছিনা কেন?
বাবা – কারণ এর নামে এরেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু হবার পরে পরেই, মিস অনিন্দিতা চক্রবর্তী খুন হয়ে যাবেন।
রথিনকাকু – অনিন্দিতা চক্রবর্তী, মানে এন্টারপ্রিনার! … আমরা উনাকে পুলিশ প্রটেকশন দিয়ে দিচ্ছে আগে থেকে।
বাবা – তাও আটকাতে পারবে না। … আততায়ী অত্যন্ত ধূর্ত।
রথিনকাকা – তাহলে কি আমরা হাতে চুরি পরে বসে থাকবো?
বাবা – আততায়ীকে ধরার জন্যই তো একটা ট্র্যাপ পাতা দরকার। … শোন, আমি ইনিশিয়াল কাজ করে রেখেছি। … একটা ভালো দেখে হোটেলে তিনটে ডবল রুম, আর একটা ডরমেটারি বুক করো। একটা রুমে, আমি তুমি মিলি থাকবো। একটা রুমে মিস অনিন্দিতা। একটা রুমে জয়জিত, আর ডরমেটরি তে, তোমার পুলিশের ৪-৫জন মেয়েকে রাখতে হবে। হোটেলের সেমিনার রুম বুক করো। সেখানে অনিন্দিতা এই ৪-৫টা মেয়েকে এড্রেস করবে পরশু। … রাত্রিটা ওখানেই থাকা হবে, আততায়ী এর থেকে ভালো সুযোগ পাবেনা অনিন্দিতাকে খুন করার। তাই সে ট্রাই করবে, আর আমরা সেই সুযোগে তাকে ধরে নেব।
রথিনকাকা – তাহলে তো অনিন্দিতাকে এই ব্যাপারে বলে রাখা প্রয়োজন।
বাবা – যতটুকু বলার, বলা আছে। … কালকের দিনটা সময় আছে। মহিলা পুলিশদের সিলেক্ট করে, ট্রেন করতে হবে। ট্রেনিং যা দেবার আমি দিয়ে দেব। আর হোটেল বুকিংটা তোমাকে কালকের মধ্যেই করে নিতে হবে।
রথিনকাকা – ঠিক আছে। আমি আজ রাতের মধ্যেই মেয়েদের সাথে কথা বলে, তোমাকে জানিয়ে দিচ্ছি। কালকে তুমি ওদেরকে শিখিয়েপড়িয়ে দেবে। আমি কালকের মধ্যে হোটেলের ব্যবস্থা করছি। তিনটে রুম, একটা ডরমেটারি, আর সেমিনার হল। … ডান। আজ উঠি।
মা চা নিয়ে হাজির। রথিনকাকা – মধু খুব টেন্সানে আছি।
মা – বাড়ি গিয়ে তো শুয়ে পরবে, চা টা খেয়ে যাও। টেনশন কমে যাবে।
মায়ের নির্দেশ ফেলার ক্ষমতা রথিনকাকুর কনোকালেই নেই। … চা খেয়ে রথিনকাকু চলে গেলেন।
