মুখোশ | রহস্য গল্প

এয়ারপোর্টে আস্তেই, দেখি রথিনকাকা আর অতনু আঙ্কেল অপেক্ষা করছেন। বাবা উনাদের দেখে হেসে বললেন – নিশ্চয়ই আমার জন্য নয়; রাজপুত্র সিন্দিয়ার জন্য, তাই না!

রথিনকাকা – হ্যাঁ উনার সিকিউরিটির জন্য একটা আগে আর একটা পরে আর্মড ভ্যান রাখা হয়েছে। তবে, উনার গাড়িতেই তুমি যাচ্ছ। … তুমি কি কম বড় সেলিব্রিটি নাকি হে!

বাবা – কি বলছো রথিন! আমি আমার সেলিব্রিটি!

অতনু আঙ্কেল – না বলে থাকতে পারছি না বিজয়। তুমি যেই ভাবে তোলপাড় করে দিচ্ছ সমস্ত কিছু, কালকে যদি ভারতজুরে তোমার নাম হয়, আর ফর্বসের ম্যাগাজিনের কভার পেজে তোমার নাম ছাপে, তবে কিচ্ছুই অবাক হবো না ভায়া।

বাবা – ঠাট্টা থামাও আর বলো, মিস্টার সিন্দিয়া কি এসে গেছেন!

অতনু আঙ্কেল – হ্যাঁ, ১০ মিনিট হয়েছে। গাড়িতে অপেক্ষা করছেন তোমার আর মিলির।

বাবা আর আমি, সেই কথার পর আর কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম। সামনে যা দেখলাম, তাতে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে। রোলস্‌ রয়েস, ফ্যান্টম সিরিজের গাড়ি। আমরাও নাকি সেই গাড়িতেই উঠবো। … স্বপ্ন দেখেছি, কিন্তু এমন স্বপ্ন দেখারও দুঃসাহস করিনি কোনদিনও। বাবার দিকে তাকালাম। দেখলাম, বাবাও কেমন যেন একটু হকচকিয়ে গেছেন। বাবা রথিন কাকার দিকে তাকালেন। রথিনকাকা চোখের ইশারায় বললেন, উঠে পরো গাড়িতে।

বাবা একটু কেমন যেন যবুথবু হয়ে গেছিলেন, এই সমস্ত রাজকীয়তায়। যেন উনার স্মার্টনেস উধাও হয়ে গেছে। আমি আর বাবা গাড়িতে উঠলাম, গাড়ি ছেড়ে দিল। সামনে একটা পুলিশের গাড়ি, পিছনে একটা। বাবা একটাও কথা বলছেন না। রাজপুত্রই বললেন – কি ব্যাপার সিন, আজ যে বড় চুপচাপ! টেন্সড নাকি!

বাবা একটু নিজেকে সামলে নিয়ে – না স্যার। এমন রাজকীয়তাতে আমি একদমই অভ্যস্ত নই। অত্যন্ত সামান্য একজন ভারতীয় নাগরিক। এই প্রাচীন, ঋষিমুনিদের দেশে জন্ম লাভ করার জন্য, দিবারাত্র ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই। সামান্য একজন ভেতো বাঙালী স্যার আমি, আর এই নয় শক্তিপীঠ বিশিষ্ট, তিনতিনটি অবতারগরিষ্ঠের দ্বারা পবিত্র করে দেওয়া পীঠে জন্মগ্রহণ করতে পেরে, ঘুমের মধ্যেও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই। … আমার কাছে এই রাজকীয়তা যেন ভয়াবহ লাগছে স্যার।

মিস্টার সিন্দিয়া হেসে বললেন – বাট, আ ম্যান লাইক ইউ, উইথ সাছ জেনারাসিটি, ইন্টেলিজেন্স, অ্যান্ড ফেইথ অন নেশন, ডিজার্ভ ড্যাট। তোমার কি তা মনে হয়না!

বাবা – না স্যার, আজ যেই প্রকারে আমার মন মস্তিষ্ক চলছে, তা চলতে পারছেই কারণ আমি বিলাসিতাশূন্য হয়ে মাটির মানুষ বলেই। আজ যেই ভাবে অনেকের বিশ্বাসের পাত্র হয়ে উঠেছি আমি, একজন পুলিশও নই যে, তাকে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী এমন দায়িত্ব দিচ্ছেন যা একজন সিয়াইডিকেও দেন না উনি। … স্যার, এই সমস্ত এই কারণেই সম্ভব হয়েছে, কারণ এই মাটির সাথে আমি যুক্ত, আর এই ভারতমাতার পবিত্র মাটিকে আমি চিনি বলে। … স্যার, যদি এই মাটির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়, তবে আমিও নষ্ট হয়ে যাবো।

মিস্টার সিন্দিয়া সামান্য মুচকি হেসে বললেন – এটাই তো জিনিয়াসদের বিশেষত্ব সিন। আর এই রহস্য ভেদ করা সত্যিই অসম্ভব। বিজ্ঞান বুঝতেও পারেনা, মাটির গুণ ঠিক কি, আর ভেবে মরে যে কনো ফ্যাসিলিটি ছাড়া, এই গুণীরা কি করে এমন গুণী হতে পারে। … কিন্তু রহস্য এখানেই, গুণ এই মাটিরই। আর যে যে যখন যখন এই মাটির সাথে লেপটে পরে থেকেছে, সেই গুণী হয়ে উঠেছে।

বাবা এবার একটু সামান্য হয়ে বললেন – হ্যাঁ স্যার, এটাই রহস্য। আমরা কেউ গুণী নই। আমাদের দেশের এই পাবন মাটিই আমাদেরকে গুণী করে দেয়। এই মাটির গুণকে কেউ নষ্ট করতে পারেনা, তাই সহস্রবার লুটলেও ভারতকে গুণীমুক্ত করতে পারেনা কেউই। … উলটে, যেই যখন এই ভূমিকে ভালোবেসে ফেলেছেন, তিনিই গুণী হয়ে উঠেছেন, তা সে পাঠান শেরশাহই হন, আর মহামহিম আকবরই হন। …

মিস্টার সিন্দিয়া – কিন্তু এই মাটির সাথে ভারতীয়দের সম্পর্ক নষ্ট করে দিচ্ছে বিদেশিরা আস্তে আস্তে। ভারতবাসীকে যন্ত্রমুখর করে দিয়ে, মাটির সাথে যোগাযোগ নষ্ট করে দিচ্ছে, আর ফলে গুণেরও নাশ হচ্ছে।

বাবা এবার হেসে বললেন – ঋষিত্ব বোঝেন স্যার! … হুম ঋষিত্বের তেজ এই ভূমিতে বীজরূপে বপন করা আছে। এমনই বীজ তা যে, সহস্র সহস্র বছর ধরে সেই বীজ ভিতরে ভিতরেই মহীরুহে পরিণত হয়ে গেছে, এমনই বীজ তা যে, সমানে সেই বনস্পতির শেকড় বাড়তেই থাকছে। যদি ভারতভূমির সমস্ত মাটিকে খনন করে সমুদ্রে যদি ফেলে দেওয়া হয়, তবুও সেই বীজের নাশ হবেনা, কারণ ঋষির বীজ, সে যে কালজয়ী। স্থান, কাল, পাত্র, সমস্ত কিছুর উর্ধ্বে সেই বীজ। তাই ভারতকে গুণশূন্য করা অসম্ভব।

বাবা আবার থেমে বললেন – হ্যাঁ, যান্ত্রিকতার বিস্তার হয়েছে, মানুষ সমানে যন্ত্রনির্ভর হয়ে চলেছে। তাই সেই গুণ এখন সুপ্ত হয়ে রয়েছে। তবে যে যে যখন যখন এই মাটির মধ্যে যেই বীজ আছে, তা বুঝেছেন, তিনিই ঋষি হয়ে গেছেন স্যার। তা রাজনীতিবিদ, মহাত্মাগান্ধী বা নেতাজি হন, বা বিল্পবি অরবিন্দ ঘোষ হন। এই বীজের নাশ এখনও হে হয়নি, আর কনোদিনও হবে না, তার রিসেন্ট প্রমাণ হলেন এপিজে আব্দুল কালাম স্যার। … স্যার, এই মাটি তো সাম্প্রদায়িকতার রক্তে ভেজে না, এই মাটি তো হিন্দু-মুসলমান চেনে না। এই মাটি কেবল নিজের সন্তানকে চেনে। যে-ই এই মাটিকে আঁকড়ে ধরবেন, সেই উনার সন্তান, তা তিনি হিন্দু হন বা মুসলমান, জৈন হন বা খ্রিস্টান। এই মাটির গুণ নষ্ট হয়নি, আমরা সেই গুণের দিকে তাকাতে ভুলে গেছি।

বাবা বলতে থাকলেন – সেই গুণের দিকে আজও যিনি তাকান, তিনি আজও ঋষি হয়ে ওঠেন। আর যিনি না তাকিয়ে, যন্ত্রে আর আধুনিক ভেল্কিবাজীর বিজ্ঞানের দিকে তাকান, তিনি যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছেন। তবে আজও যে এই মাটি সমান ভাবে গুণসম্পন্না, তার প্রমাণ দেখানোর জন্যই তো আমি আপনাকে আমার বাড়িতে লাঞ্চের নিমন্ত্রণ করেছি। আপনি আসছেন তো?

মিস্টার সিন্দিয়া বললেন – হ্যাঁ নিশ্চয়ই, কিন্তু একটা কথা বলো, ঋষিত্বই কি এই মাটির প্রকৃত গুণ!

বাবা একটু হেসে বললেন – স্যার, ঋষিত্ব মানে কি জানেন! ঋষিত্ব মানে সত্যের জ্ঞান লাভ করা, বিজ্ঞানের মত অসত্যে সত্যের সন্ধান করে ফেরা নয়। সত্য সত্য, সত্যের সন্ধান লাভ করাকে ঋষিত্ব বলে। … (আবার হেসে)  আর স্যার এই মাটির গুণই হলো আমাদের অন্তর্মুখী অর্থাৎ সত্য অভিমুখী করে দেওয়া। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব কি বলতেন জানেন স্যার। উনি বলতেন, একবার নাচতে শিখে গেলে, উঠান ব্যাকা হলেও নাচা যায়। তেমনই স্যার, এই ভারতভূমি সিদ্ধিলাভ করে ফেলেছে। তাই এই ভূমির মধ্যে অজ্ঞানতা বিরাজ করতেই পারে না।

তাই যিনিই একবার এই মাটির সম্পর্কে চলে আসেন, তিনিই অন্তর্মুখী হয়ে যান, আর সহজেই ঋষিত্ব লাভ করে নেন। এই দেশে দাঁড়িয়ে ঋষিত্ব লাভ করা, স্যার, একটা বাচ্চাছেলে চাইলেও পারবে। কিন্তু সেই একই প্রয়াস, একই বাচ্চাকে দিয়ে অন্যদেশে করান। অসম্ভব হয়ে যাবে তার কাছে। … এই তো এই মাটির গুণ স্যার।

মিস্টার সিন্দিয়া – হুম, তুমি অন্যরকম সিন। আই মাস্ট সে, ইউ আর ভেরি মাচ প্র্যাক্টিকাল। কিন্তু একটা কথা বলো, আমাদের দেশ তো বিজ্ঞানের দিকেও বেশ এগোচ্ছে, তাই না!

বাবা এবার উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠে বললেন – স্যার, বাঘ যে ব্যাঙের শিকার অনায়সেই করে নেবে, এতে চমকাবার কি আছে! … যে দ্রুতগামী হরিণের শিকার করে অভ্যস্ত, তার কাছে ব্যাঙের গতি কি করে বেশি লাগতে পারে স্যার! … এটা ভারতবর্ষ স্যার। এখানের মানুষ সাপ নয়, বাঘ। এরা হরিণের শিকার করে অভ্যস্ত। এঁদের কাছে ব্যাঙ ধরা যে বাচ্চাদের কাজ। … ওই গল্পটা পরেছিলাম আমরা সকলে ছোটবেলায়, একটা অন্তঃসত্ত্বা বাঘিনী ভেরা শিকার করতে গিয়ে মারা যায়, তারপর সেই বাঘিনীর বাচ্চা ভেড়ার পালের সাথেই মিশে থেকে ঘাস খায়। … আমাদের অবস্থাও ঠিক সেই রকম স্যার।

আরো বিস্তারে বলতে বাবা বললেন – আসলে, আমরা ভুলেই গেছি যে আমরা বাঘ। সারা পৃথিবী কায়েরের মত ব্যাঙ ধরাকেই রাজকীয় কর্ম বলে গণ্য করছে, তাই আমরাও সেই ব্যাঙ ধরাতেই মেতে উঠেছি। … স্যার, বিজ্ঞানের দৌরাত্ব হলো ব্যাঙের যাত্রা। … যেদিন যেই মানুষ ঋষিত্ব অর্জন করতে ছোটে, তখনই সে নিজের ওই ব্যাঙের পিছনে ছোটার কথা স্মরণ করে নিজের উপরেই নিজে হাসে। … ঋষিত্ব স্যার, জাত যুবতী হরিণ। … বাঘকে নিজের সর্বশক্তি লাগয়ে দিতে হয়, এই হরিণকে বাগে আনতে। সেই কাজ করে আমরা অভ্যস্ত, ব্যাঙ ধরতে গেলে, আমরা তো শিরপা লাভ করবোই, এতে আবার অস্বাভাবিক কি আছে!

সিন্দিয়া স্যার মন দিয়ে শুনছেন দেখে বাবা আবার বললেন – আসলে স্যার কি বলুন তো, কাকের গল্প শুনেছেন ময়ূরপুচ্ছ লাগিয়ে ময়ূর হতে চায়। কিন্তু আমরা হলাম ময়ূর, পেখম ঝেড়ে কাক হতে চেষ্টা করছি। বারে বারে পেখম ঝাড়ি, আর বারে বারে কাকেরা আমাদের ঠুকরে যায়। … স্যার, ভারত সারা দুনিয়ার রাজত্ব করতো একদিন, আবারও করতে পারে। যেদিন রাজত্ব করতো, সেদিনও ঋষিত্বের বলেই করতো, আর আবার যেদিন ঋষিত্বের বলে ভারত বলিয়ান হয়ে উঠবে, সেদিন আবার সারা দুনিয়ার শাসন করবে। ততদিন পর্যন্ত, ওই পেখম ঝেড়ে কাকের দলে ভিড়বে, বারে বারে ঠোকরাবে, বারে বারে ফিরে আসবে। … বাঘের কি সাপে ভয় থাকে স্যার! … কিন্তু দেখুন না, আমরা বাঘ হয়ে ব্যাঙ ধরতে নেমেছি বলে, আমেরিকা ইত্যাদিদের মত সাপেদের থেকেও ভয়ে রয়েছি।

সিন্দিয়া স্যার সমস্ত কথা শুনছিলেন। উনার চোখমুখের রঙ পালটে গেছিল বাবার কথা শুনে। শেষে গাড়ি থেকে নামার সময়ে একবার বললেন – আর কি কনোদিনও সমস্ত কিছু আগের মত হবেনা!

বাবা হেসে বললেন – ৫১ শক্তিপীঠের দেশ স্যার এটা, ১২টা জ্যোতিরলিঙ্গের দেশ স্যার এটা। কতদিন আর ভ্রমে ঘুরে বেড়াবে। সময় আসলে, ঠিকই জাত বেড়িয়ে আসবে। … যতই অধিরথ-রাধার সন্তান হয়ে  কর্ণ বিরাজ করুক, হাতে বিজয় ধনুক পরলে, তার ক্ষত্রিয়ত্ব বেড়িয়ে আস্তে বাধ্য স্যার। … রাজার ছেলে যতই বস্তিতে থাকুক স্যার, যখন শাসনের সময় আসবে, তখন তার রাজপুত্র হবার গুণাগুণ সামনে না বেড়িয়ে থাকতেই পারবে না। … তাই নিশ্চিন্তে থাকুন। একটু আবহাওয়া পালটাতে ইচ্ছা হয়েছে, তাই এই ভারতমাতা তাঁর সন্তানদের একটু ছুটি কাটাতে দিচ্ছেন। বিজ্ঞানের মত ব্যাঙ ধরতে মেতে থাকতে দিয়েছেন উনি। যখন উচিত সময় আসবে, তখন ভারতমাতা তাঁর সন্তানদের ঠিকই সমস্ত কিছু স্মরণ করিয়ে দেবেন।

বাবা আবার একটু হেসে বললেন – স্যার, সঠিক সময় আস্তে ধরিত্রী মাতা নরকাসুরকেও নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন যে তিনি হলেন বরাহরূপী নারায়ণের সন্তান। আবার লহিতাঙ্ককেও বলেছিলেন, তিনি হলেন মহাদেবের থেকে উদ্ভূত শিবাংশ। … নরকাসুর সেই সত্য জেনে, কৃষ্ণের হাতে নিহত হন। আবার লহিতাঙ্ক সত্য জেনে, মহাদের থেকে মুক্ত হয়ে মঙ্গল গ্রহ হয়ে অমর হয়ে যান। … তাই চিন্তা করবেন না স্যার, সঠিক সময় আসলে, আমাদের মা আমাদেরকে আমাদের সত্য জানিয়েই দেবেন। সত্য জানার পর, আমরা নরকাসুরের মত নিজের নাশ ডেকে আনবো না লহিতাঙ্কের মত উদ্ধার হয়ে যাবো, সেটা তখনের ভাবার বিষয়। আপাতত আমরা হালদার বাড়ি এসে গেছি। তাই চলুন কেসের নিষ্পত্তি করে আসি।

বাবা এবার আমাদের সকলকে নিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখলাম, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত। সঙ্গে বাড়ুই আর বাড়ির সকল সদস্য উপস্থিত, আর সঙ্গে রয়েছেন সেই তিন অতিথিও। বাবা দালানে উঠতে উঠতেই, মুখ্যমন্ত্রীর দিকে চোখ রেখে, চোখের ইশারায় একটা প্রণাম করে বললেন – কি বিনয় মিস্ত্রি! … তোমার বাঁদিকের ঝুল্পির রঙটাতোবাকি চুলদাড়ির সাথে ম্যাচ করছে না!

আমাদের দেখা সেই সাধুটি এবার বলে উঠলেন – কে বিনয় মিস্ত্রি!

বাবা হেসে উঠে বললেন – তাহলে তামিল সাধু, যিনি কোনরকমে হিন্দি বলছিলেন, তাঁর মুখ দিয়ে বাংলা বেড়িয়ে এলো এবার হ্যাঁ! … বাড়ুই, ওর পটচুলদাড়ি খুলে দাও দেখি।

ইন্সপেক্টর বাড়ুই এবার কয়েকজন কনস্টেবল দিয়ে চেপে ধরিয়ে, সাধুর পটচুলদাড়ি খুলে ফেললে, বাড়ির সকল সদস্যরা অবাক হয়ে বললেন – বিনয়!

বাবা হাস্যছলে বললেন – তামিল সাধু, যিনি ভাঙা ভাঙা হিন্দি বলতে পারেন। … ভাই বিনয়, একটা কাজ ঠিক করে যদি তুই করতে পারতিস! … একটা নাটক করার সময়ে একটু রিহার্সাল তো করবি! … তা না, সোজা স্টেজে মেকআপ! … মাঝে মাঝে তুই হিন্দি বলার সময়ে তামিল টানটা ভুলে যেতিস, মনে পরে সেই কথা! … নাকি কেউ বুঝতে পারছেনা, তাই বেমালুম চালিয়ে যাচ্ছিলি নাটকটা! …

এই বলে পকেট হাতরে, বাবা একটা ঝুল্পি বাড়িয়ে দিয়ে বললেন – এই নে, গোপাল লুকিয়ে রাখতে গিয়ে, মাটি কুপিয়ে ছিলিস তো! সেখানে তোর বাঁদিকের ঝুল্পিটা খুলে গেছিল। … আমরা যেদিন এখান থেকে গেলাম, নিউমার্কেট থেকে নতুন পটচুল লাগাচ্ছিলিস, তার ভিডিও এটা। … এই বাড়ুই, আমার থেকে নিয়ে নিও পরে এই ভিডিওগুলো। আদালতে এভিডেন্স প্লেস করতে কাজে দেবে।

অম্বরিস এবার ক্রুদ্ধ হয়ে গিয়ে বললেন – হারামজাদা আমার থেকে দুইলাখ টাকা ঝেড়েও শান্তি হলো না, আবার গোপাল নিতে এসেছিলিস!

বাবা একটু গলা চড়িয়ে বললেন – দাঁড়ান অম্বরিস বাবু, এখনো অনেক কিছুই বাকি আছে। … কেসটা তাহলে বলি প্রথম থেকেই হ্যাঁ।

এই বলে বাবা বলতে শুরু করলেন – কেসের শুরু হয় গোয়ালিয়র থেকে, বা বলা যেতে পারে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে। … ক্যালিফোর্নিয়াতে একটা মিউজিয়াম করা হচ্ছে, যেখানে আকবরের সমস্ত জিনিস রাখা হবে। … বেশ ভালো। এবার ভারতেই সেই সমস্ত জিনিস রাখা আছে, আর তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ভারতীয় সংরক্ষণেই আছে। মজার কথা এই যে সেই সমস্ত কিছুর আবার রেকর্ড রয়েছে ইউনেস্কোর কাছে। তাই সেই সমস্ত কিছু আমেরিকা নিয়ে যেতে পারছেনা। … তাই আমেরিকা কিছু বড়বড় ভারতের রাঘববোয়াল ক্রিমিনালদের সিলেক্ট করে নেয়, যাদের মাধ্যমে আকবরের ছোট ছোট সামগ্রীগুলোকে নিয়ে আসা যায়।

সেই থেকেই সমস্ত কিছুর আরম্ভ হয়। এই তালিকার মধ্যে অনেক কিছু আগের থেকেই ছিল, যাদের মধ্যে একটি হলো গোয়ালিয়র রাজপ্রসাদে থাকা আলেকজান্ড্রাইট পাথরের একটি হার। সেই হারের সন্ধান করতেই, রাজদরবারে একজন ভেল্কি দেখাতে গেলেন। … কি মিস্টার সিন্দিয়া, এই বিনয়ই তো গেছিল, আপনার প্রাসাদে!

মিস্টার সিন্দিয়া মাথা নেরে বললেন – জি হা!

বাবা মুচকি হেসে বললেন – সেখানে গিয়ে যুবরাজকে ইমপ্রেস করিয়ে, একজনকে রাজপ্রাসাদে ঢোকাতে হতো, যিনি সেই হারটি চুরি করবেন। … সেই জন্য যুবরাজ বিনয়কেই আস্তে বললে, এঁদের মাথার কথা অনুসারে, বিনয়ের বদলে এংলো ইন্ডিয়ান, রবার্টশন গেলেন। … বৈজ্ঞানিক হয়ে, একটা যান্ত্রিক চিলের রচনা করলেন, আর সেই চিল দিয়ে হার চুরির প্ল্যান করলেন।

(সামান্য মুচকি হেসে) এরই মধ্যে মিস্টার হালদার রাজবাড়িতে গেলেন কাজের সুত্রে, আর উনার কাছে যেই আকবরের পত্নীর সম্পত্তি, গোপালটি ছিল, সেটির কথা বলেন। … কিন্তু মিস্টার হালদার একজন গোয়েন্দা গল্পের লেখকও ছিলেন। তিনি সেখানে কি চলছে, তার একটা আন্দাজ করেন, এবং বেশ কিছু জিনিস জেনেও ফেলেন, মানে এঁদের এজেন্ডা, এরা কি চায়, কি করতে চায়, সেই সমস্ত কিছু। … আর সেই সমস্ত কিছু জেনে ফেলার জন্যই রাজাবাহাদুরকে তিনি সতর্ক করে আসেন যে উনার হার যেন উনি লুকিয়ে রাখেন।

গণ্ডগোলটা এখানেই হয়। প্রথম গণ্ডগোল হলো, মিস্টার হালদারের কাছে একটা আরো আকবরি সম্পত্তি আছে জেনে, সেটা হাতিয়ে নেবার চিন্তা হয়, আর দ্বিতীয়টা হলো উনার মৃত্যু। মিস্টার সরকার ওদের এজেন্ডা জেনে ফেলেছেন। তাই উনাকে রাস্তা থেকে সরাতে হবে, নইলে বিপদ হতে পারে। … তাই কারুকে উনার কাছে পাঠাতে হতো। … আর সেই প্ল্যান করার জন্য, সুনীল শর্মা ইঞ্জিনিয়ারকে রাজবাড়িতে ঢোকানো হলো।

সুনীল শর্মা মিস্টার হালদারকে ইমপ্রেস করে, উনার বাড়িতে অতিথি হয়ে থাকার নিমন্ত্রণ পেলেন, আর সেই সুবাদে তিনি আরো দুইজনকে নিজের সাথে নিয়ে চলে এলেন। কি তাই তো, মিস্টার শর্মা!

অতিথিদের মধ্যে একজন ইতস্তত করছেন দেখে, বাবা মুখ বেঁকিয়ে হেসে উঠে বললেন – কেন এই অসৎ ব্যক্তিদের সাথে কাজে যুক্ত হন আপনারা! … এছাড়া কি একজন কাজ জানা লোকের চলে না! … একটু কম রোজগার করতেন। এখন তো আর রোজগারই করতে পারবেন না! … সারা জীবনের মত রোজগার বন্ধ হয়ে গেল! … যাই হোক, এখানে এসে আপনিই তো সিসিটিভি ক্যামেরার তার কেটে দিয়েছিলেন, আর ডিভিআরএ কারচুপি করে স্টিল ইমেজ লাগিয়ে রেখেছিলেন, কি তাই তো! … আবার একটা কাঁচা কাজ করলেন এখানে।

মিস্টার হালদার, সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে উনার উপর নজর রাখা হতে পারে ধরে নিয়ে, আগেই সমস্ত ক্যামেরা বন্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন। … একটু দেখে নিন, কি করছেন! … বশ যা বলল, তাই করতে হবে! … বশ তো আর জানতে পারছেন না, এখানে কি করা হয়েছে। সেটা তো আপনাকেই দেখতে হতো, কি হতো না মিস্টার শর্মা! …

মিস্টার বাড়ুই, এরেস্ট করে নিন উনাকে। … আর কিছু রোল উনি ডিরেক্টলি পলে করেন নি। … হ্যাঁ, এই বিনয়কে আনা হয়েছিল, কারণ সে আলমারির কোথায় গোপাল থাকে আর আলমারির চাবি কোথায় থাকে, সেটা জানতো বলে, আর উনার পুরানো মনিবের সমস্ত কিছুই উনি জানতেন তাই। … কি ঠিক বলছি তো! … বিনয়! (মুখ বিকৃত করে) আসলে কি জানো তো ক্রাইম একটা নেশা । একবার এই নেশা ধরে গেলে, সেটা ছেড়ে ফেলা খুব কঠিন। মিস্টার হালদার কম তো চেষ্টা করেন নি, তোকে ঠিক পথে নিয়ে আস্তে। কিন্তু তুই কি করলি! … এই ক্রিমিনালদের দলে যোগ দেবার জন্য, তোর ছোড়দাবাবুর থেকে ২ লাখটাকা হাতিয়ে নিয়ে, সেই দলে সেই টাকা দিয়ে যোগ দিলি। … একবারের জন্যও তোর মনে হলো না, যেই মানুষটা তোর জীবনকে সুদরে দেবার জন্য এতকিছু করলো, তার এমন দুর্দশা করতে একবারও তোর খারাপও লাগলো না!

বিনয় কান্নার সুরে বলে উঠলো এবার – আমি দাদাবাবুকে খুন করি নি!

বাবা এবার একটু রাগের সাথেই ঝেঝিয়ে উঠে বললেন – একদম মরাকান্না কাঁদবি না। চুপ। … যখন তুই চুরিটা করতে গেলি, তখন দাদাবাবুর মৃতদেহকে রক্তাক্ত অবস্থায় পরে থাকতে দেখিস নি! … তখনও তোর একবারও হাত কাঁপল না!

অম্বরিস এবার বললেন – বিনয় করেনি তো, খুনটা কে করেছিল!

বাবা – কেন আর একজন যে অতিথি ছিল আপনাদের! … ডাক্তার এল্বার্ট মনোজ সিম্পসন! … সমরেন্দু বাবু, আপনি তো চিনেছিলেন উনাকে। কি তাই না!

সমরেন্দু বাবু বললেন – কিন্তু ও তো বলল, ও এল্বার্টের ভাই। … দেখলাম হ্যাঁ একটু চেহারাও ফুলে গেছে। তাই …

বাবা – হ্যাঁ, আমি সেদিনে আপনাদের কথা শুনে নিয়েছিলাম। … আসলে, খুন করা হয়েছে একটা সারজিকাল ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে। সেটা বড় কথা নয়, এমনি দোকান থেকেই সেটা যেকেউ কিনে নিতে পারে। কিন্তু যিনি সেই অস্ত্রটা চালিয়েছেন, তাঁর এনোটমির সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা থাকতেই হবে, নাহলে এমন নিখুঁত ভাবে গলার নলি কাটা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। … তাই আমি কনো ডাক্তার বা কম্পাউন্ডারের সন্ধান করছিলাম। … যখন আপনি উনাকে বললেন, আরে এল্বার্ট না, তখন আমার হিসাব মিলে যায়। আর তার আগেই, প্রথম আপনাকে দেখে, ইনি চমকে ওঠেন, আর সতর্ক হয়ে যান।  তখনই আমার সন্দেহ হয়।

এবার ডক্টর এল্বার্ট গর্জন করে উঠলেন – টকিং রাবিশ। … আমি একজন জ্যোতিষী, ডাক্তারির কিচ্ছু জানি না।

বাবা একটু গভীর হয়ে উঠে, নিজের ছোট হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট ধাতু বার করে, সমরেন্দু বাবুর হাতে সেটা দিয়ে চোখের ঈসারা করতে, উনি এল্বার্টের দিকে এগিয়ে গেলেন। … এল্বার্ট সেই দেখে চেঁচাতে থাকলেন – ও ওপেন হার্ট কি সারজিকাল নাইফ হে। যান লে লেগা ও। … দূর হাঁটো মুঝসে। … দূর হাঁটো হালদার। … তুমারা বাজপানা আভি গেয়া নেই কেয়া!

বাবা এবার উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠে হিন্দিতেই বললেন – কি হলো ডক্টর এল্বার্ট, আপনি নাকি ডাক্তারির কিছু জানেন না। আপনি নাকি ডাক্তার হালদারকেও চেনেন না! … ডাক্তার হালদারের বাড়ি এটা, আর উনার সাথে দেখা হয়ে যাবে, যদি আগে জানতেন তবে আপনিও নিশ্চয়ই বিনয়ের মত মেকআপ নিয়ে আসতেন তাই না! … আরেকটা ভুল আপনি করে ফেলেছেন। আপনি এল্বার্ট আর সিম্পসনটাকে তো ছেঁটে এলেন, কিন্তু মনোজটা আপনি ছাঁটতে পারলেন না। গয়ালিওরে গিয়ে, ডাক্তার মনোজকে জেনে আসা কি খুব কঠিন ব্যাপার ডাক্তার এল্বার্ট।

ডাক্তার এল্বার্ট এবার গর্জন করে উঠলেন – হ্যাঁ আমি ডাক্তার এল্বার্ট, তাতে কি প্রমাণ হয়!

বাবা – হুম, রাইট ইউ আর। তাতে কি প্রমাণ হয়! … আপনি যে আরো একটা ভুল করে ফেলেছেন তাড়াহুড়োর মাথায় ডাক্তার এল্বার্ট! … আপনি খুনটা করলেন হাতে সারজিকাল গ্লাপ্স পরে, কিন্তু মার্ডার অয়েপনটা ডাস্টবিনে ফেলতে গেলেন, উইথআউট এনি গ্লাপ্স! … সেখানে ফিঙ্গারপ্রিন্টতা এলো না! …

এই বলে বাবা নিজের মোবাইল ফোন খুলে সকলের সামনে রেখে দেখালেন, এই দেখুন যেদিন আমরা এখান থেকে যাই, সেইদিন বেলা ১২টা নাগাদ, ডাক্তার এল্বার্ট খালি হাতে নিজের মার্ডার অয়েপনটা আর গ্লাভস গুলো ডাস্টবিনে ফেলছেন। … বাড়ুই, ফরেনসিক টেস্ট হয়েছে!

বাড়ুই – হ্যাঁ স্যার, ছুরির ব্লাড সেম্পেল মিস্টার হালদারের ডেড বডির সেম্পেলের সাথে মিলে গেছে। আর ছুরিতে, আর সঙ্গে সঙ্গে গ্লাভসএরও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হয়ে গেছে। … এল্বার্টের সাথে ওটা ম্যাচ করিয়ে দেখে নিতে হবে খালি।

বাবা হেসে বললেন – আপনারা খুব বোকা আসলে। কি ভাবলেন, বাজার দোকান করার জন্য ১০টা থেকে ৫টার রিল্যাক্সেশন দেওয়া হয়েছে! … আরে না না! … আপনারা গোপালটা লুকিয়ে রেখেছিলেন, সেটাকে পাচার করতে হতো। আপনাদের মার্ডার অয়েপন ফেলতে হতো। আপনাদের পটচুলের জুলফি হারিয়ে গেছে সেটাকে রিপ্লেস করতে হতো। সেই কারণেই তো এই রিল্যাক্সেশন দেওয়া হলো। … আপনারাও আপনাদের কাজ করলেন, আর আপনারা কি কি করলেন, সেই সমস্ত কিছু আমরাও এভিডেন্স রূপে কালেক্ট করে নিলাম। …

বাবা এবার অম্বরিস বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন – এই নিন অম্বরিস বাবু। যেই গোপাল এখান থেকে পাচার করা হয়েছিল, আর গোয়ালিয়রে উদ্ধার করা হয়েছে, সেটা।

অম্বরিস বাবু ম্লান একটা হাসি দিয়ে বললেন – বাবাকে হারিয়ে ফেললাম যখন, এই গোপাল নিয়ে আর কি হবে স্যার। … এটা আপনিই রেখে দিন।

বাবা হেসে বললেন – বেশ, আমার কন্যার এন্টিক পিস কালেকশনের হবি আছে। ওর জন্যই বরং এটা রেখে দিই। … তবে ওটা আপনি আপনার কাছে রাখতে পারেন, ওটা নকল।

অম্বরিস বাবু বললেন – নকল! …

বাবা হেসে বললেন – আসলটা বাড়ুইএর কাছে। আমি এখান থেকে যাবার দিন সকালেই বাগান থেকে আসলটাকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থা থেকে উদ্ধার করি। … বাড়ুইকে ডেকে এনে, ওর একটা ডুপ্লিকেট করে দিতে বলি। ও নটার সময় সেটা নিয়ে আসে। … নকলটাকে, যেমন আসলটা মাটি চাপা রাখা ছিল, তেমনই ভাবে রেখে দিই, যাতে চোরকে হাতেনাতে ফুটেজ সহ দেখা যায়। … আর আসলটা বাড়ুইএর কাছেই, সেফ কাস্টডিতে ছিল। … বাড়ুই, ফুটেজ উঠেছে ওখান থেকে?

বাড়ুই – একদম স্যার। … তবে বিনয় তখনও পটচুলদাড়ি লাগানোই ছিল।

বাবা – অসুবিধা নেই তাতে। দুটো ছবি তুলতে হবে তোমাদের, একটা চুলদাড়ি দেওয়া, আরেকটা মেকআপ ছাড়া। … চুলদাড়ি দেওয়াটার এভিডেন্স হবে বাগান থেকে গোপাল তোলার ফুটেজ।  আর নিউমার্কেট থেকে পটচুলদাড়ি কেনা হয়ে যাবে বিনয়ের জন্য এভিডেন্স।

বাবা আবার বললেন – তবে, আমার মতে এই অরিজিনাল গোপালকে আপনারাই রাখুন, আর বাড়ির কুলদেবতা করে রাখুন। … আপনাদের বাবার স্মৃতি সকলের সামনে থেকে যাবে।

সায়ন্তন বাবু বললেন – হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আপনি যেই অসাধ্য সাধন করলেন, তার পুরস্কার হিসেবে এই মূর্তি হতে পারে, কিন্তু তার পারিশ্রমিক কখনোই তেমন একটা মূর্তি হতে পারেনা, যেটাকে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করা যাবেনা।

মুখ্যমন্ত্রী এবার বললেন – বাড়ুই, সমস্ত আসামিদের নিয়ে তুমি যাও তাহলে এবার।

বাড়ুইএর সমস্ত কনস্টেবল তিন অতিথিকে এরেস্ট করে নিতে এলে, ডাক্তার এল্বার্ট হুঙ্কার দিয়ে বললেন – আমাদের এরেস্টের ওয়ারেন্ট কোথায়?

বাড়ুই হেসে বললেন – আপনাদেরকে যে এরেস্ট করা হবে, তা আমাকে কালই বিজয় স্যার বলে দেন, আমি ওয়ারেন্ট বার করেই রেখেছি। … কনস্টেবল, ওদেরকে নিয়ে গিয়ে লকআপে দিয়ে দাও। আমি বাইকে এসেছি। যাচ্ছি এখনই।

কনস্টেবলরা আসামিদের ধরে নিয়ে গেলেন। … বাড়ুই এবার বাবার সামনে এসে ঢিপ করে একটা প্রণাম ঠুকে দিয়ে বললেন – স্যার, অনেক মাতব্বর দেখেছি। কিন্তু এই ভাবে ক্রিমিনালকে লেজে খেলাতে কনোদিনও দেখিনি। … আজ একজন বাঘের দেখা পেয়ে যাচ্ছি স্যার। … স্যার আমার পারসোনাল নম্বর আপনার কাছে রইল। … কখনো কনো অসুবিধা হলে, এই ছোট ভাইটিকে বলুন আর ফ্যানটিকে বলুন, একবার স্মরণ করবেন। আসি স্যার।

বাড়ুই চলে গেলেন। মুখ্যমন্ত্রী সামনে এসে বললেন – পারিশ্রমিক যাই দিই তোমায় বিজয়, তোমার তো কনো চাহিদা নেই। … কিন্তু সত্যি বলতে কনো পারিশ্রমিকই তোমার ট্যালেন্টের মূল্য হতে পারেনা। … এই নাও, একটা এক লাখ টাকার চেক। … আমার কথা শুনে তো আর তোমার পেট ভরবে না। তাই এই চেকটা নাও। … আর একটা কেস আছে। খুবই ক্রিটিকাল কেস। পুলিশ, সিয়াইডি দিয়ে ওই কেস শলভ হবেনা। … একবার আমার বাড়িতে তোমার কন্যাকে নিয়ে এসো। … না না, স্ত্রীকেও নিয়ে এসো। … নিমন্ত্রণই করলাম তোমাদেরকে। আমার বাড়িতে এসে লাঞ্চ করবে, এই সানডে। … সপরিবারে। সেখানেই ওই কেসের ব্যাপারে কথা বলবো।

মিস্টার সিন্দিয়ার দিকে তাকিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বললেন – আপনি তো উনার বাড়ি যাবেন না। … ঠিক আছে। রথিন, সিয়াইডি চিফ, আর অতনু, কলকাতার সিবিয়াই হেড। … ওরা আপনাকে ওখান থেকে হোটেলে পৌঁছে দেবে। … সন্ধ্যায় আমি আপনার হোটেলে যাচ্ছি। সেখানে কথা হবে, ঠিক আছে!

সিন্দিয়াজি এবার একটু এগিয়ে গিয়ে বললেন – আপসে কুছ বাত হে। … ইধার আইয়ে। …

মুখ্যমন্ত্রী একটু সরে গেলেন। কি কথা হলো জানিনা, তবে মুখ্যমন্ত্রী বাবার দিকে একবার হাসিমুখে তাকালেন, তারপর সিন্দিয়ার কাঁধে হাত রেখে কিছুর আশ্বাসন দিয়ে চলে গেলেন। … বাবা আর আমি আবার সিন্দিয়ার সাথে রোলস্‌ রয়েসে চেপে আমাদের বাড়ি গেলাম।

সেখানে গিয়ে আমাদের ছোট্ট বাড়িটি দেখলেন সিন্দিয়া। আর বললেন, বাড়ির সব থেকে ভালো জায়গা হলো, সামনের খোলা জায়গাটা। … বাবার সেখানে মিস্টার সিন্দিয়াকে নিয়ে আসার কারণ ছিল মাতা বিদিপ্তার সাথে দেখা করানো। … উনার সাথে আলাপ করে, আর উনার অদ্ভুত বাগ্মিতা, এবং ঋষিত্বের তেজ দেখে, সিন্দিয়া হতবম্ব হয়ে বাবার দিকে তাকালেন।

বাবা সেই দেখে হেসে বললেন – কি দেখলেন তো সিন্দিয়াজি, ঋষিত্বের প্রকৃত তেজ। … যেদিন ভারত আবার এই তেজকে বরণ করতে পারবে, সেদিন আর কাক সাজতে হবেনা, মুয়ুর হয়েই সারা জগতের রানী হয়ে বিরাজ করবে। …

সিন্দিয়াজি বাবার কাঁধে হাত রেখে বললেন – যা দিলে তুমি সিন, আমি তার কিছুই দিতে পারব না। … মুখ্যমন্ত্রী তো তোমার বুদ্ধির খোরাক দিয়ে দিলেন আরেকটা কেস দিয়ে। কিন্তু আমার কাছে সেটাও নেই। আমাকে বুদ্ধির বহর দেখালে, ঋষিত্বের কথা শোনালে আর সাথে সাথে একজন ঋষিকে দেখিয়েও দিলে। … আমার জীবন তো ধন্য হয়ে গেল। … এনি অয়েজ, আমি একটা প্রেজেন্ট তোমাকে দিতে চাই। না এমন কিছু দেবনা, যার জন্য তোমাকে মাটি থেকে দূরে চলে যেতে হয়। … তবে তোমার কাজে একটু সাহায্য হবে। …

আসলে যা বুঝলাম, গাড়ির জন্য তোমাকে কারুর না কারুর উপর, নয়ত উবারের উপর ওয়েট করতে হয়। এন ইনটেলিজেন্ট লাইক ইউ মাস্ট নট ওয়েট ফর এনিবডি। … তাই (বাইরের দিকে তাকিয়ে, আবার ঘার ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন) বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বলেরোটা আজ থেকে তোমার।

বাবা একটু ইতস্তত করছিলেন দেখে, সিন্দিয়াজি মায়ের কাছে এসে বললেন – সামঝাইয়ে ইনকো, রাজা হু, ইনাম ভি রাজা জেইসাই হোনা চাইয়ে না! … ইচ্ছা তো থি, এক রোলস্‌ রয়েসই দে দু। … লেকিন সোচা, যেই সমাজে আপনারা থাকেন, সেখানে ওটা হলে, আপনাদের অনেকে ঈর্ষা করবে, তাই এটা। … ইনকার মাত কজিয়ে ভাবিজী। আপ ভি জানতি হে, আপকে পতি … হি ডিজার্ভ, মাচ মোর দ্যান দিস।

মা কিছু না বলে মুচকি হাসলেন। সিন্দিয়াজি মাতা বিদিপ্তাকে প্রণাম করে, বাবার সাথে গলা লাগিয়ে চলে গেলেন। একটা দারুণ কেসের নিষ্পত্তি হলো।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6