মুখোশ | রহস্য গল্প

বাবা মাঝে মাঝেই বলতেন, শিকারকে বুঝতে দিতে নেই যে তার শিকার হতে চলেছে, তবেই শিকার করা সম্ভব হয়। উনি বলতেন, যে শিকারকে জানিয়ে শিকার করতে যায়, সে শিকারকে দুর্বল মনে করে, আর সেখানেই সমস্ত কিছু গণ্ডগোল করে দেয়।

এই সুত্রে বাবা আন্দোলন ইত্যাদিকেও আমল দিতেন না। তিনি বলতেন, আন্দোলনের অর্থ এই যে, অর্ধেক বশ্যতা স্বীকার করে নেওয়া। এটা মেনে নেওয়া যে, যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করা হচ্ছে, তিনি হলেন মালিক, আর আমরা শ্রমিক, অর্থাৎ সিধাসিধা নিজের হাতে, নিজের গণতান্ত্রিক অধিকারকে হেলায় হেলানো ছাড়া অন্য কিছুই নয়। শ্রমিক মালিকের কাছে ন্যায়ের আবদার করছে, সেখানেই আন্দোলন শোভা পায়। তিনি বলতেন, আন্দোলনের অর্থ দাবি করা। আর দাবি তার কাছেই করতে হয়, যিনি আমার দাবি মেটাবেন এমন অঙ্গিকার করেন। যিনি দাবি মেটাবেন না, এমন মনস্থির করে রেখেছেন, তাঁর কাছে আন্দোলনের অর্থ, বৃথা সময় ও শক্তি নষ্ট করা।

এই সুত্রে, বাবার কাছে একজন আসতেন, যিনি শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা বলতেন বাবাকে। তিনি বাবাকে বলতেন, এই শিক্ষা ব্যবস্থায় সমস্ত কিছুই পণ্য। চাকরী করা বা বাণিজ্য করারই শিক্ষা দেওয়া হয় এই শিক্ষাব্যবস্থায়। প্রকৃত শিক্ষা, অর্থাৎ জ্ঞান অর্জনের জন্য শিক্ষা সমাজ থেকে অবলুপ্ত হয়ে গেছে। তাই তিনি আন্দোলন করতে চান এর বিরুদ্ধে, আর সেই জন্য তিনি ছেলেমেয়ে যোগার করছেন আর তাদের সেই আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করছেন। বাবার কাছে এই বিষয়ে সমর্থন চাইতে এসেছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে যোগদানও।

বাবা উনাকে স্পষ্ট করে একটি কথা বললেন। উনি বললেন – আপনি কি এই মনে করেন যে, আন্দোলন করলে, আপনি যেই শিক্ষানীতির প্রবর্তন চাইছেন, তা সরকার পুড়ন করতে পারবেন?

উনি উত্তরে বললেন – চাইলেই পারবেন। কিন্তু চাইছেন না তাঁরা।

বাবা – আপনার মনে হয় যে উনাদের নজরে পরছে না ব্যাপারটা, তাই চাইছেন না! আপনি আন্দোলন করলে, উনাদের নজরে এসে যাবে, আর উনারা সেটা চাইবেন?

উনি বললেন – না তা নয়। আসলে প্রকৃত শিক্ষার সাথে সরকারের কনো সম্পর্কই নেই। সরকারের চিন্তা সকলকে পেশা দেওয়া, শিক্ষা দেওয়া নয়। আর সরকার সেটাই করার চেষ্টা করছে।

বাবা এবার হেসে বললেন – তাহলে আন্দোলন করার চিন্তা করে বৃথা সময় নষ্ট করছেন কেন? যেটা আবশ্যক মনে হচ্ছে আপনার, সেটা হলো প্রকৃত শিক্ষাদান। তা আপনি সেই কাজ শুরু করে দিন। গণতন্ত্রের সুবিধাকে গ্রহণ করুন। গণতন্ত্রের কারণে আপনাকে তো আপনার কাজে কেউ বাঁধা দিতে আসবে না। তাই প্রতিবাদ ইত্যাদি করে সময় নষ্ট না করে, আর ফালতু নিজের মার্কেটিং না করে, যেই উদ্যম আপনি চাইছেন সরকার নিক, সেই উদ্যম আপনি নিজেই নিয়ে নিন।

এরকম অনেক ক্ষেত্রেই বাবাকে দেখেছি, উনি সঠিক পন্থাকে প্রথম বেছে নিতে বলতেন। উনি বলতেন, যেটা করে উদ্দেশ্য পূর্তি হবে, সেটাই করা উচিত। যদি কনো এমন পরিবর্তন আনতে হয়, যেই পরিবর্তনকে সরকার বা শাসক গ্রহণ করবেন না, বা করতে পারবেন না, সেই ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন আনার জন্য আন্দোলনের পথে না গিয়ে, সেই পরিবর্তন করার দিকেই অগ্রসর হতে হয়। … উনি বলতেন সরকার অনেক কিছুই করতে চান, কিন্তু ভোটবাক্সের চিন্তা করে অনেক কিছুই করতে পারেন না। যাদের কাছে সেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার চেতনা এসে পৌঁছচ্ছে, তাঁদেরকেই উদ্যম নিতে হয়। সরকার ঠিক সময়ে, সেই উদ্যমকে অনুমোদন করে দেন।

বাবা এই সুত্রে বলতেন, সরকার কখনই আশ্রম স্থাপন করতে পারেন না। যদি সরকার এমন করেন, তবে সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ উঠে যাবে, যাতে সরকারের ভোটব্যাঙ্কে ধ্বস নেবে যাবে। আশ্রম নিজেদেরকেই খুলতে হয়। সরকার সঠিক সময়ে, সেই আশ্রমকে অনুমোদন করে দেন। ঠিক সেই ভাবেই, পরিবর্তন করার আবদার করতে নেই। গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে, পরিবর্তন করে দিতে হয়। সরকার সঠিক সময়ে, সেই পরিবর্তনকে সমর্থন দিয়েই দেন।

এই কথাগুলি বাবার হয়েছিল, খোদ মুখ্যমন্ত্রী ও লাহিড়ী মহাশয়ের সম্মুখে। লাহিড়ী মহাশয় বাবাকে এমনিই পছন্দ করতেন। কিন্তু সেদিনের পর থেকে মুখ্যমন্ত্রীও বাবাকে অত্যন্ত পছন্দ করতে শুরু করেন। তাঁর মতে, বাবা হলেন অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং বিচক্ষণ। তাঁর মতে অহেতুক বুদ্ধিদাতা অনেক হন। কিন্তু তারা সকলেই সরকারের কাছে নিজেদের কথার অনুমোদন খুঁজতে চলে আসেন, এবং নিজেদেরকে বিদ্যজন বলে দাবি করেন। বাবার কথাকে উনি সমর্থন করে বলেছিলেন, সরকার অনেক কিছুই করলে ভালো হয়, বুঝতে পারেন, কিন্তু ভোটের কথা মাথায় রেখে, অনেক কিছুই করতে পারেন না। কেউ যদি সেই উদ্যম নিয়ে, এগিয়ে যায়, ঠিক সময়ে সরকার তাঁকে মদত দিয়েই দেয়।

এমনই হলেন আমার বাবা। তিনি পরিবর্তন বিরোধী নন, তিনি পরিবর্তনের দাবি করার বিরোধী। তাঁর মতে পরিবর্তনের দাবি নয়, পরিবর্তন উদ্যম নিয়ে করতে হয়। দাবি করে অহেতুক সময় নষ্ট করা অর্থহীন, তাঁর মতে। ঠিক তেমনই বাবা আসামিদের ক্ষেত্রে মনে করতেন যে, ধরপাকড় করা হবে, এমন ভাবে তজ্জরি করে আসা মানে, আসামিকে পালিয়ে যাবার সুযোগ প্রদান করা। তিনি বলতেন, বাঘ যদি এক মুহূর্তের জন্যও বুঝতে পারে যে, তার শিকার করা হবে, তবে সে সেইদিন অনাহারেই কাটিয়ে দেবে। এমনিও বনের পশুরা, অধিকাংশ জীবন অনাহারেই কাটায়। তাই আরো একটা দিন অনাহারে কাটিয়ে দেওয়া এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়।

তাই, বাঘকে জানতেও দেওয়া যায় না যে, তার শিকার হতে চলেছে। তবেই তার শিকার করা যায়। উনি বলতেন ক্রিমিনাল বিচিত্র মস্তিষ্কের হয়, তবে ক্রাইম করার জন্য অদম্য সাহস লাগে। তাই ক্রিমিনালকে ছাগল মনে করা হলো শ্রেষ্ঠ ছাগ্লামি। ক্রিমিনাল হলো বাঘ। আর তাই বাঘকে বুঝতেও দিতে নেই যে তার শিকার করা হবে, বা তার শিকার করার তজ্জরি চলছে।

বাড়ুইও শেষদিন বাবার প্রশংসা করে বলেছিলেন – মিস্টার সিংহ, আপনি একজন অদ্ভুত সাইকো গেমার। ক্রিমিনালের সাইকোলজি নিয়ে আপনি খেলেন। ক্রিমিনালকে আপনি চালনা করতে শুরু করেন। যাই হোক, এই সমস্ত কিছু কেসের নিষ্পত্তির দিন হয়। তাই সেই কথা আগেভাগে না বলে, চলে যাই কেসের কথায়।

এই নয়টা নাগাদ, বাড়ুই এলেন আর বাবার সাথে কি সমস্ত কথা হলো, তারপর বাড়ুই আর বাবা একটু বাগানের দিকে গেলেন। তারপরই সকলকে একত্রিত করে ঘোষণা করা হয়, সকাল দশটা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সকলকে একটু রিল্যাক্সেসন দেওয়া হবে, যাতে সকলে নিজেদের বাজার দোকান করে নিতে পারেন। বিকাল ৫টার পর, ৭ দিনের সময় চেয়ে নেওয়া হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর থেকে এই কেসের নিষ্পত্তির জন্য। তাই বিকাল ৫টার পর ৭দিন কড়া সিকিউরিটি থাকবে।

এমন কথা বলার পর, বাড়ুই চলে গেলেন। বাবাও দেখলাম তজ্জরি করে বেড়িয়ে পরলেন। কিছু সামগ্রী নিয়ে চলে গেলেন আর যৎসামান্যই রেখে গেলেন, যা আমার পিঠের ছোট স্কাইব্যাগেই ধরে যাবে।

ফিরে এলেন বাবা, তখন প্রায় ১টা কি আরো একটু বেশি। বাবাকে দেখলাম, পোশাক পালটে এসেছেন, মানে বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছেন উনি। বোধহয় গোয়ালিয়র যাবার প্যাকিং করে এসেছেন। হালদার বাড়িতে এসে, প্রথমে তিনি আমার কাছে এলেন না। প্রথমে গেলেন অম্বরিস বাবুর ঘরে। সেখান থেকে আমার কাছে ফিরে এসে বললেন – অম্বরিসকে বলে এলাম, ৭দিনের জন্য গোয়ালিয়র যাচ্ছি, কেসের নিষ্পত্তির জন্য। সঙ্গে এও বলে দিলাম যে, সেই কথা যেন কারুকে না বলেন কারণ, এই বাড়িতেই আসামি রয়েছে, তবে সেই আসামির মাথা বাইরে আছে। তাকে ধরতেই যাওয়া। বললাম, সকলের উদ্দেশ্যে বলতে যে, আমার দ্বারা কেস শলভ হয়নি, তাই আমাকে মুখ্যমন্ত্রী কেসের থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন।

বাবা এমনটা করে থাকেন প্রায়শই। নিজের নামে কলঙ্ক লেপে নিয়ে, গাঢাকা দিয়ে কাজ করা, এটা বাবার একটা অনবদ্য স্টাইল। প্রচণ্ড এফেক্টিভও হয় দেখেছি এই স্টাইল, কারণ শত্রু বাবাকে ম্যাপিং করাই বন্ধ করে দেয়। আর সেই সুযোগে, বাবা সমস্ত কিছুকে ম্যাপিং করে নেন। বাবার এমন কিছু ইউনিক স্টাইল দেখে রথিনকাকা আর অতনু আঙ্কেলও মাঝে মাঝে বাবাকে বলতেন, এই স্টাইলগুলো ক্রাইমডিপার্টমেন্টেও ইনক্লুড করা উচিত। অনবদ্য শিকারি আমার বাবা। মা এই ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ উক্তি করতেন। উনি বলতেন, বাবা হলেন জন্মগত শিকারি। উনার মজ্জায় মজ্জায় শিকার করার কৌশল লুকিয়ে আছে। তা যেটাই হোক, আমার মা কম বড় শিকারি নন, কারণ এই জন্মগত শিকারির শিকার উনিই করেছেন।

যাইহোক এবার আমাদের কলকাতা ছাড়ার সময়। বাবা বললেন – বিকাল ৫টায় ফাইট গোয়ালিয়র বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে। এখান থেকে লাঞ্চ করে বাড়ি গিয়ে, লাগেজ ওখান থেকে উঠিয়ে কলকাতা বিমানবন্দরে যাত্রা করা হবে।

রাজপ্রাসাদ দেখবো, একটা থ্রিলিং থ্রিলিং ব্যাপার মনে হচ্ছিল। তাই কনো কথা নয়। লাঞ্চ করে, উবার ধরে বাড়ি। আর বাড়িতে মায়ের সাথে দেখা করে, লাগেজ নিয়ে ফের উবার ধরে এয়ারপোর্ট। প্লেন প্রথম যাবে নিউ দিল্লি, তারপর সেখান থেকে গোয়ালিয়র। পরের দিন ভোর ভোর, আমরা রাজবাড়ি পৌঁছলাম। এয়ারপোর্টেই আমাদের জন্য গাড়ি রাখা ছিল। পশ্চিমবঙ্গের চিফ মিনিস্টারের সুপারিশে যাচ্ছি অতিথি হয়ে। খাতিরদারিই আলাদা।

রাজবাড়িও এলাহি। একসময়ে এই রাজবাড়ির কতই না দাপাদাপি ছিল। দাপাদাপি এখন অবশ্য নেই, তবে হ্যাঁ, তার জৌলুস এখনো আছে। বড় বড় থাম, বড় বড় কড়িবরগা, সমস্ত কাঠ হলো বার্মাটিক। জায়গায় জায়গায় বার্মিজ আর জার্মানির কাঁচ। অসাধারণ ঝাড়লন্ঠন। দেখতে দেখতে চোখজুরিয়ে যাচ্ছিল। এমনই এদিক সেদিক দেখে চলছিলাম, একজনের কথাতে ঘোরটা ভেঙ্গে গেল।

একজন সুন্দর দেখতে পুরুষ সামনে বেড়িয়ে এসে হিন্দিতে বললেন – আপ আজ আয়ে, ওর হাম আপকা খাতিরদারি নেহি কর সক রাহা হে। মাফি চাতে হে। … আপকে আনে কি থোরা পেহেলে এক হাদশা হো গেয়া। ঈশলিয়ে।

এরপরের কথোপকথন সমস্ত হিন্দিতেই হয়। আমি বাংলায় লিখলাম।

বাবা বললেন – হাদশা, কেমন হাদশা!

ভদ্রলোক বললেন – আর বলবেন না, আমার কাছে একটা আকবরের তোফা দেওয়া কালারচেঞ্জিং এলেকজ্যান্ড্রাইট পাথরের হার ছিল, সেটা আজকেই, এই এক ঘণ্টা আগে একটা চিল ছিনতাই করে নিয়ে চলে যায়।

বাবা ভ্রু কুঁচকে – চিল হার চুরি করে নিলো! হাড় ছেরে শেষে হার!

ভদ্রলোক এবার হাত বারিয়ে হ্যান্ডসেক করে বললেন – আমি এখনকার রাজপুত্র, মহেশ ভেজা সিন্দিয়া। মিস্টার স্যান্যাল আপনার আসার কথা বলেছিলেন। সমস্ত ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। ঠিক ছিল, আমি নিজে গিয়েই গেটে আপনাকে এস্করট করে আনবো। … এই সমস্ত ব্যাপারে একটা ঝামেলায় আটকে গেলাম।

বাবা – হারটাকি বাইরেই থাকতো আপনার!

রাজপুত্র – আরে না না, আমার কাছে লাইট আর স্যানিটারি কাজ করছিল, কলকাতার মিস্টার হালদার। উনার কাছেও একটা আকবরের খাজানা আছে। আকবর উনার হিন্দু পত্নীকে একটা লাড্ডু গোপালের দামি মূর্তি করে দিয়েছিল, সেটা উনার কাছে আছে। তা উনি বলেছিলেন, উনি পরেরবার যখন আসবেন তখন দেখাবেন। তা আমি, আমার কাছে যেটা আকবরের খাজানা ছিল, সেটা দেখাতে হারটা বারকরেছিলাম। যাবার আগের দিন মিস্টার হালদার আমাকে বলে গেছিলেন, হারটা সামলে রাখতে, ওটা ছিনতাই হয়ে যেতে পারে। … আমার পত্নী, হারটা দেখে, আয়নার সামনে বসে দুদিন গলায় পরে দেখেছিলেন। আজও আমাকে গলায় পরে দেখালেন। আমি দেখে বললাম, ওটা আমায় খুলে দিতে, আমি সিন্দুকে উঠিয়ে রাখবো। যেমনই দিয়েছে হারটা আমাকে, অমনি একটি বিশাল চিল এসে আমার হাত থেকে হারটা ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল!

বাবা – হুম, স্ট্রেঞ্জ! … যাই হোক, আপনি জানেনকি মিস্টার হালদার আর নেই?

রাজপুত্র – হুম, ভেরি স্যাড নিউজ। হি হ্যাস বিন মার্ডারড্‌। হাউ কাম! … উনি একজন রীতিমত জেন্টিলম্যান। …

বাবা – হুম, আসলে, আমার কাছেও একটা আকবরের খাজানা আছে। আমার ব্যাগে আছে, নিচের দিকে। মিস্টার হালদারের থেকেই আমি জানি যে আপনার কাছে আকবরের হার আছে। তাই আপনারটাও দেখতে এসেছিলাম, আর আমারটাও দেখাতে এসেছিলাম।

বাবার কথা শুনে আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম! বাবার কাছে আবার আকবরের কি খাজানা আছে! … আমি ছাড়াও আরো একজন অবাক হয়ে গেছিলেন সেই কথা শুনে। সেই খ্যাপাটে দেখতে লোকটা আগিয়ে এসে বললেন – ইউ হ্যাভ আকবর প্রপার্টি! হোয়াট ইজ ড্যাট?

বাবা সেই খ্যাপাটে লোকের দিকে একটু ভ্রু কুঁচকে তাকালে, রাজপুত্র বললেন – উনি একজন বৈজ্ঞানিক। উনার অদ্ভুত স্কিল দেখে, উনাকে এখানে নিয়ে এসেছি। বৈজ্ঞানিক হলেও, পেট চালাবার জন্য, হাতসাফাইয়ের খেলা দেখাচ্ছিলেন গোয়ালিয়র স্টেশনের সামনে। তাই উনাকে নিয়ে এসেছি। এখন উনি এখানে, এই রাজপ্রাসাদেই থাকছেন।

বাবা হেসে বললেন – হাতসাফাইএর খেলা দেখাচ্ছেন, সেই খবর কে দিলো আপনাকে? আপনারই কনো লোক?

রাজপুত্র – হ্যাঁ, আমার লোককে একজন বলেছিলেন। আসলে, আমার দরবারে কিছুদিন আগে একজন এসে হাতসাফাইএর খেলা দেখিয়ে গেছিলেন। তারপর থেকেই আমার ইচ্ছা হয়, আমার কাছে যদি এমন একটা হাতসাফাইএর লোক থাকে! … তা আমি সেই লোকের কাছে আমার লোক পাঠিয়েছিলাম যে উনাকে আমি রাজপ্রাসাদের অতিথি করে রেখে দেব। কিন্তু উনি রাজি না হয়ে বলেন, উনার এক শিষ্য রেলস্টেশনের বাইরে খেলা দেখায়, তাকে গিয়ে বলতে। সেই সন্ধান করেই, উনাকে পেয়েছি।

বাবা – উনাকে দেখে তো দেশী মনে হচ্ছে না! … এংলো মনে হচ্ছে। … যাইহোক, আমার কাছে আকবরের সিন্দুকের একটা তালা আছে। তালাটা একটি বিচিত্র ধাতু দিয়ে নির্মিত, যার কারণে তালাটির তিনটি চাবি হয়। বাইরের আবহাওয়া অনুসারে তালার মুখ পালটে যায়, তাই চাবিও অন্য লাগে।

রাজপুত্র সেই কথা শুনে বললেন – মিরাকিউলাস! সত্যিই ভাবা যায়না। আমাদের দেশে যে কি কি জিনিস রয়েছে, আমরা তার কিচ্ছু জানিনা। … আমি আপনার ওই তালাটা অবশ্যই দেখবো।  … আপনি আগে ফ্রেস হয়ে, লাঞ্চ করে নিন। তারপর না হয় দেখছি। … আমারটা তো আপনাকে দেখাতে পারলাম না। আপনারটাই দেখবো।

বাবা আর কথা বাড়ালেন না। … আমাকে নিয়ে গেস্টরুমে চলে গেলেন। গেস্ট রুম দেখেও, আমার মাথা ঘুরে গেল। যেকোনো ফাইভস্টার হোটেল এর কাছে তুচ্ছ! … স্নানের জায়গায় রাজকীয় বাথটাব। প্রথমবার জীবনে বাথটাবে স্নান করলাম। বিছনায় এসে একটু শুতে মনে হলো যেন, মেঘের মধ্যে শুইয়ে পরেছি। নিজেকে রাজরানি রাজরানি মনে হচ্ছিল, এক সময়ে। বাবাকে দেখলাম, নিজের কাজে মত্ত। কোথা থেকে ঘুরে এলেন আর হেসে বললেন, দাঁড়া, ওই তালাটা বার করতে হবে না!

এই বলে ব্যাগ হাতরে, একটি তালা বার করলেন। তালাটা আমার খুব চেনা। আসলে আমার এন্টিক জিনিসের সখ আছে। তাই আমি কিছু কিছু কালেকশন করতাম। সেই কালেকশনেরই একটি সেই তালা। আমি বললাম – কিন্তু এটা তো আকবরের নয়! এটা তো ব্রিটিশদের!

বাবা – জানি, তবে মনে হয়েছিল, এমন একটা কিছু সঙ্গে রাখলে কাজ দেবে। তাই হাতের সামনে যেটাকে দেখে মনে হয়েছে বেশ রাজকীয় লাগবে, সেটাই তুলে নিয়ে চলে এসেছি।

বাবাকে দেখলাম, মোবাইল নিয়ে কি একটা ঘাটাঘাটি করছেন। বললাম – কিছু কি খুঁজছো!

বাবা – হুম, এখানে চিল হাড় ছেরে হার চুরি করছে, ওখানে গোপাল চুরি হচ্ছে। দুটোই আকবরের সামগ্রী। একটা কেমন গন্ধ গন্ধ লাগছে। … তাই একটু দেখছি। … আচ্ছা চল, একটু এখানের পুলিশ স্টেশনে যেতে হবে। … তুই যাবি না, আমি একাই ঘুরে আসবো?

আমি – আমার যাবার কি দরকার আছে? এই বিলাসিতাটা একটু এনজয় করছিলাম আর কি।

বাবা হেসে বললেন – হুম, … ঠিক আছে, ঘুরে ঘুরে দেখ একটু। আমি আসছি। বেশ কিছু কাজও আছে, সেরে আসছি। ফিরে আস্তে আস্তে রাজঘরানার লাঞ্চ রেডি হয়ে যাবে। তখন জমিয়ে খাওয়া যাবে। তবে এখানে কাঁটা চামচে খেতে হবে। চিফ মিনিস্টারের খাস লোক হয়ে এসেছি। উনার প্রেস্টিজ রাখতে হবে।

আমি – চামচে করে রাজকীয় খাবার খাওয়া যায় না কি!

বাবা হেসে বললেন – সুখ কি খালি খেয়ে হয়! এখানে খাবার সুখ নয়, রাজকীয়তার সুখ নিতে হবে। যাইহোক, তুই ঘুরে দেখ আমি আসছি।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6