মুখোশ | রহস্য গল্প

আমি আর বাবা খাবার হলঘরে গিয়ে দেখলাম, একটা বিশাল বড় ঘর, যেখানে বিয়েবাড়ির মত টেবিল পাতলে, একবারে বসে ৫০০ জন খেতে পারবে। ঘরটাও অদ্ভুত। তিনটে দরজা। একটা দরজা রান্নাঘরে খোলে, একটা দরজা বাথরুমের দিকে খোলে, আর আরেকটা দরজা মেন-করিডরে খোলে। আর এই তিনটে দরজাকে ছেড়ে রেখে, গোল করে একটি একটি করে হাই-বেঞ্চি আর তার পিছনে লো-বেঞ্চি পাতা। না বেঞ্চিগুলো স্কুলের মত নয়। হাই বেঞ্চিটাও বেশ চওড়া, বার্মা-টিকের; আর লো-বেঞ্চিতেও সোফার মত গদি করা, আর সেটাও বেশ বসে আরাম করে খাবার মতই। অসাধারণ ব্যবস্থা। সৌখিন ছিলেন ভদ্রলোক, এই আয়োজন দেখেই বোঝা যায়।

সকলে সেখানে সান্ধ্যভোজনে বসেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রীও সেখানে ছিলেন। সেখান থেকে জানা গেল, হালদার মশাইয়ের তিন ছেলে, এক মেয়ে। তিন ছেলের মধ্যে এক ছেলেই সেখানে ছিলেন, কারণ তিনি কলকাতাতেই থাকেন, আর সেই বাড়িতেও। তাঁর নাম অম্বরিস, ও তাঁর স্ত্রীর নাম রেখা হালদার। অম্বরিস হালদার বাবার ব্যবসাতেই যোগদান করতেন। আর স্ত্রী আগে শ্বশুরের কোম্পানিতেই চাকরি করলেও, এখন গৃহবধূ।

অন্যদিকে, বাকি দুই পুত্রেরা বাইরে থাকেন। তাঁরা বাবার মৃত্যুর সংবাদ লাভ করে ফিরছেন। একজন থাকেন ব্যাঙ্গালুরুতে, অন্যজন থাকেন মিশরে। ব্যাঙ্গালরুতে যিনি থাকেন, তাঁর নাম সায়ন্তন হালদার। এবং তাঁর স্ত্রী ও তিনি দুইজনেই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আর ব্যাঙ্গালুরুতেই তাঁদের থাকা, গত পাঁচ বছর ধরে, চাকরিসূত্রে। আর মিশরে যিনি থাকেন, তিনি সেখানের ডাক্তার। তাঁর স্ত্রী একজন মনস্তত্ত্ববিদ, আর ছেলে, মানে সমরেশ বাবুর ছেলে, সমরেন্দু হালদার হলেন গাইনো। দুইজনেরই সমস্ত কাজ গুছিয়ে, ছুটি, ভিসা নিয়ে ফিরতে একটু সময় লাগবে, তাই বাবার মরদেহকে রাখতে বারং করেন।

উপস্থিত যারা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে হলেন অম্বরিশ বাবু ও তাঁর স্ত্রী রেখা, ও তাঁদের একটি ৩ বছরের ছেলে। ইনি হলেন কনিষ্ঠ পুত্র সমরেশ বাবুর। তবে কনিষ্ঠ সন্তান হলেন মিসেস রেবা।

ইনি একজন ড্রাইভারের সাথে প্রেম করে বিয়ে করেন। তাই তাঁর পিতা, অর্থাৎ সমরেশ বাবু, উনার পতিকে নিজের ড্রাইভার করেই রেখে দেন। সেই কারণে, উনি ও উনার পতি, উজ্জ্বল হাজরা এই বাড়িতেই থাকেন। ছেলেমেয়েদের মধ্যে, অম্বরিস বাবুর বয়স এই ২৮, আর উনার স্ত্রী হবেন এই ২৪ কি ২৫। মিসেস রেবার বয়স হবে ২৫-২৬, আর ড্রাইভার বা বাড়ির জামাই, উজ্জ্বল হাজরার বয়স ৩০ এর বেশী।

যারা বাড়িতে উপস্থিত নয়, তাঁদের বয়স জানতে চাইলে, এই জানা যায় যে, সমরেন্দু হালদার হলেন বাড়ির জ্যেষ্ঠ পুত্র, আর উনার বয়স ৩৩ মতন, আর সায়ন্তনের বয়স ৩১। মিসেস রেবার বিবাহ হয়েছে দুই বছর আগে। এখনো সেই দম্পতি নিঃসন্তান। বাড়ির এই মূল পাঁচ সদস্য, অর্থাৎ মিসেস রেবা, তাঁর পতি উজ্জ্বল হাজরা, অম্বরিস হালদার ও তাঁর স্ত্রী রেখা হালদার, ও ইনাদের ৩ বছরের একটি ছেলে, নাম সনাতন।

বাবা, এই বিষয়ে একটু টিপ্পনী কেটে বললেন – অম্বরিস বাবু, আপনার ছেলের নামে আপনাদের দম্পতিদের দেখা মেলা ভার। বরং আপনার দাদা, সায়ন্তনের ছাপ রয়েছে নামে।

অম্বরিস বাবু – হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। দাদা মানে বড়দা অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং সর্বক্ষণ পড়াশুনা নিয়েই থাকতেন। তাই, উনার বয়সের কাছাকাছি হলেও সানু, মানে সায়ন্তন ওর সাথে খুব একটা মিশত না। তবে সানু আমার বলতে পারেন ফ্রেন্ড, ফিলসফার, গাইড। আমি ওর ছায়া হয়ে স্কুল এমনকি কলেজেও থাকতাম। কলেজে আমি, প্রথমে ওর দেখা দেখি আইটি-ই নিয়েছিলাম ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। শেষে দেখলাম, আমার মাথায় কোডিং ঠিক ঢুকছে না। তাই স্ট্রিম পালটে, ইলেকট্রিকাল নিই। ও দূরে চলে যেতে, ওকে আমি খুব মিশ করতাম। আর তার এফেক্ট আমার ছেলের নামেই দেখতে পাচ্ছেন।

বাবা – আপনি তো বাবার ব্যবসাই দেখতেন?

অম্বরিস বাবু – দেখতাম বলা ভুল হবে। বাবার ব্যবসার ইঞ্জিনিয়ারিং পার্টটা আমি দেখতাম। মানে ফ্যাক্টরি গুলোর দেখাশুনা আর ওয়ার্ক লেআউট দেখাশুনা করতাম। বাবার অফিসের সব থেকে বেশী বেতনের কর্মচারী বলতে পারেন। পোস্ট ছিল প্রডাকশন ম্যানেজার।

বাবা – আর উনার ফিনেন্সিয়ালস কে দেখতেন তবে?

অম্বরিস বাবু – কোম্পানির ফিনেন্স দেখার জন্য বেতনভুক্ত অফিসিয়াল আছেন, চ্যাটার্ড আছেন। আর উনার ব্যক্তিগত ফিনান্সিয়ালস উজ্জ্বলদা দেখতেন।

বাবা এবার উজ্জ্বল হাজরার দিকে তাকিয়ে – আপনি একাএকাই করতেন, নাকি উনি আপনার সাথে সব সময়ে ব্যাঙ্কট্যাঙ্কে যেতেন!

উজ্জ্বল হাজরা – বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে কি করতে হবে বলে দিতেন, আমি করে আসতাম ব্যঙ্কে গিয়ে, বা অন্যত্রও।

বাবা – আর কিছু জায়গায় উনি ইনভেস্ট করতেন?

উজ্জ্বল – বাবা, মিউচুয়াল ফান্ডে অনেক ইনভেস্ট করতেন। সেই সূত্রে, সেখানেও যাতায়াত থাকতো।

বাবা – কটা সেভিংস আর কারেন্ট একাউন্ট ছিল উনার? আর কি কি ইনভেস্টমেন্ট ছিল, মনে আছে আপনার! মনে থাকলে, এখানেই বলুন।

উজ্জ্বল – সেভিংস একাউন্ট উনার নিজের নামে একটাই, স্টেট ব্যাঙ্কে। তবে আরেকটা সেভিংস একাউন্ট উনার মেয়ের নামে ছিল, কোটাক মাহিন্দ্রায়। সেটা উনিই করিয়েছিলেন, আর উনিই দেখাশুনা করতেন। কিছু এমাউন্ট ওখানে ঢুকিয়ে ট্যাক্স কম করতেন। উনার নিজের সেভিংস-এ লাস্ট এক সপ্তাহ আগে দেখেছিলাম ৩ কোটি ৭২ লাখ ছিল। আর রেবার একাউন্টে ১ কোটি। কারেন্ট একাউন্ট, প্রতিটি ফ্যাক্টরির নামে নামে একটা একটা, আর কোম্পানির নামে একটা। ফ্যাক্টরির গুলোতে তেমন কিছু পরে থাকতো না। যখন যেমন ছোড়দা বলতেন, তেমন ঢোকাতেন, সেটা ফ্যাক্টরির কাজেই লাগতো। আর কোম্পানির একাউন্টে, তিনদিন আগে ছিল ৪২ কোটি টাকা। … এই সমস্ত কিছু ছাড়া, উনার প্রায় ১ কোটির উপর মিউচুয়াল ফান্ড আছে, ব্যাস।

বাবা – উনি ক্যাশ বেশী ডিল করতেন নাকি ইলেক্ট্রনিক মোড!

উজ্জ্বল – কোম্পানির কাজে বেশীর ভাগ সময়েই ক্যাশ ডিল করতে হতো। কিন্তু নিজের কাজের ক্ষেত্রে উনি ইলেক্ট্রনিক মোডই বেশী ব্যবহার করতেন। ওই কাজ গুলো, কখনো রেবা করতো, আর কখনো ছোটবউদি, আবার কখনো নিজে।

মিসেস রেবা – বাবা নিজে নিজে কমই করতেন। ইলেক্ট্রনিক ভাবে কাজ করা উনি পছন্দ তো করতেন, কিন্তু অতটা অয়াকিবহল নন উনি, তাই আমাকে বা বউদিকে দিয়েই করাতেন।

বাবা আবার উজ্জ্বলের উদ্দেশ্যে বললেন – আপনি আপনার জীবন নিয়ে খুশী ছিলেন?

উজ্জ্বল – জীবন নিয়ে জীবনে কেউ খুশী তো হয়না। তবে হ্যাঁ, আমি ভাবিও নি, আমার জীবন এই জায়গায় এসে দাঁড়াবে। রেবা যখন আমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে উপস্থিত হয়, তখন আমি ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছিলাম বাড়ি ছেড়ে। বাড়িতে দুই দাদা ছাড়া আমার আর কেউ নেই। তাই পিছুটান তো ছিল না। বাবার অফিসের গাড়ি চালাতাম আমি। উনি যা বেতন দিতেন, তাতে দিব্যি চলে যেত আমার। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর শালার জামাই হবার যোগ্যতা আমার ছিল না। তাই রেবা ছেলেমানুষি করে বিয়ে করতে চেয়েছে, একরকম কথা। সেই কথা যদি বাবা, মানে তৎকালীন আমার স্যার জানতে পারতেন, তখন আমার যে কি হতো, সেই ভেবে আমি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছিলাম।

বাবা আর আমি দুইজনেই মনঃসংযোগ করে সেই কথা শুনছিলাম। প্রথমত কথাটা ইন্টারেস্টিং, দ্বিতীয়ত, পুলিশের কথা অনুসারে, উজ্জ্বল একজন প্রাইম সাস্পেক্ট, তাই। অন্যদিকে উজ্জ্বল বলতে থাকলো – রেবা তারপর খাওয়াদাওয়া ছেড়ে, উদাস হয়ে যাবার পর, বাবা নিজেই আমার বাড়িতে যোগাযোগ করেন। আমার বড়দার একটা সিম নিয়ে আমি পালিয়েছিলাম। সেই সিমে বড়দা ফোন করে আমাকে ডেকে পাঠালেন, আর আমার রেবার সাথে বিয়ে হলো। তাও ভয়ে ভয়ে থাকতাম। কিন্তু দেখলাম বাবা, প্রচণ্ড বিশ্বাস করেন আমায়। ভয় কেটে গেল একসময়ে। আর মনপ্রান থেকে এই পরিবারের সদস্য হয়ে গেলাম।

বাবা – পালিয়ে গেছিলেন কোথায়?

উজ্জ্বল – মেজদাদার কাছে। ব্যাঙ্গালুরুতে। উনি একটা কাজে ওখানে ঢুকিয়ে দেবেনও বলেছিলেন।

বাবা – সায়ন্তনবাবুর সাথে আপনাদের সকলেরই খুব সদ্ভাব আছে, তাই না!

উজ্জ্বল – হ্যাঁ, উনি সকলকে খুব বোঝেন, আর সকলের যেমন যেমন করলে ঠিক হবে, তেমন সদবুদ্ধি দিতেন।

বাবা – আর অম্বরিস বাবু!

উজ্জ্বল – উনার বুদ্ধি খালি ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্রেই চলে, আর সেখানে অসাধারণ ভাবে চলে। অন্যত্র উনি উদাসীন। তবে হ্যাঁ, যদি কনো সময়ে টাকাপয়সার প্রয়োজন পরে, উনি নিজেকে দেউলিয়া করেও দিয়ে দেন। মেজদা আর আমি অনেক বুঝিয়েছি উনাকে, কাজ হয়নি। ছোটবউদি এখন সেইব্যাপারে একটু অঙ্কুশ লাগিয়েছেন উনার। তাও কেউ যদি কারে পরেছে দেখেন, তবে উনার দুর্বলতা সামনে বেড়িয়ে আসে।

আমারও মনে হচ্ছিল, তবে পরে ঘরে যাবার পর বাবাও এক কথা বলতে বুঝলাম, ঠিকই বুঝেছিলাম আমি – এই পরিবারে, সকলেই সকলকে চেনেন, আর বেশ সম্মানও করেন।

বাবা এই ক্ষেত্রে, অম্বরিস বাবুকে বললেন – কারুকে ধার দিয়ে, ডুবে যাননি!

অম্বরিস বাবু কিছু বলার আগেই, মিসেস রেবা বললেন – ডোবেন নি আবার। কিন্তু ওর শিক্ষা হয়না। ছোটবউদি ওর জীবনে না এলে, ও কোনদিন দেউলিয়া হয়ে যেত।

বাবা – কনো বিশেষ কেস আছে না কি এমন!

মিসেস রেবা – আমাদের বাড়িরই একটা কাজেরলোক ছিল। অনেকদিনের পুরনো, নাম বিনয়। ওর বউ মৃত্যু অভিমুখী হয়ে গেছে বলে দুই লাখ টাকা চাইলো, আর ছোড়দাও রাতারাতি তা দিয়ে দিল। পরের দিন সকাল থেকে তার কনো খবরই নেই।

বাবা – ফেরার হয়েছে, জানলেন কি করে?

উজ্জ্বল – আমি ওর বাড়ি গেছিলাম। সেখানে গিয়ে জানলাম, ও নাকি কনো একটা কাজ পেয়েছিল, কিন্তু সেখানে কাজ পেতে গেলে, প্রচুর টাকা লাগতো। ছোড়দার থেকে সেই টাকা নিয়ে, সে হাওয়া। …

রেবা – যদিও যা হয়, তা ভালোর জন্যই হয়। দাদার জীবনে ওটা একটা টারনিং পয়েন্ট। এই কেসের পরপরই, একটা ফ্যাক্টরিতে কাজ করার সময়ে, একজন শ্রমিক পরে গিয়ে ইঞ্জিওর্ড হন। সেই সময়ে বাবার কলাইটিস বেড়ে যাবার জন্য, হাসপাতালে ছিলেন। তাই টাকা তুলতেও পাচ্ছিলেন না। মেজদা আর বড়দা সঙ্গেসঙ্গে যা পেরেছিলেন, সেই দিয়ে ১০ লাখ টাকা হয়। কিন্তু তাতেও ঠিক ২ লাখেরই শর্ট পরছিল। বুঝতে পারছেন তো, এই শুশ্রূষা না করা হলে, ইউনিয়ন ম্যনেজমেন্টকে ছেড়ে দিতো না।

সেই সময়ে, ছোটবউদি দেবদূতের মতন দাদার সামনে এসে, ২ লাখ টাকা দেন। বাবা সুস্থ হতে, উনাদের বিয়ে দেন। বউদি যদি ওর জীবনে না আসতেন, তবে ওকে হাজতবাস করিয়ে ছাড়ত ইউনিয়ন। হাড়ে হাড়ে টের পাওয়ার পর থেকে একটু সুদরে গেছে।

বাবা – হুম, দেবতার খেলা। যখন কনো অঘটন ঘটে, তখন মনে হয় দেবতা কতই না নিষ্ঠুর। কিন্তু সেই ঘটনাই যখন সমাধান দিয়ে দেয়, তখন আর দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়না, ভুলে যাই আমরা।

বাবা আবার বললেন – তা আপনার দুই দাদা আর বাড়ি ফিরবেন না!

অম্বরিস – মেজদার কোম্পানি কলকাতায় অফিস করছে। দাদা ইস্ট জোনের চেয়ারম্যান হয়ে আসবে। … তবে বড়দা আর বড়বউদি দুইজনেরই মিশরে খুব পশার হয়েছে। তাই ফিরতে পাচ্ছে না। …

বাবা এবার উজ্জ্বলকে একটা আলটপকা প্রশ্ন করে দিলেন – আচ্ছা উজ্জ্বলবাবু, শ্বশুরমশাই আপনার হাতে কিছু ক্যাশ দিতেন নাকি!

উজ্জ্বল – উনার সব দিকে চোখ থাকে। আমার হাতে দিলে, আমি যদি খারাপ মনে করি, তাই নিজের মেয়ের হাতে মাস গেলে একটা টাকা দিয়ে বলতেন আমাকে দিয়ে দিতে। সেই পরিমাণও কম ছিল না, প্রায় ২০ হাজার। তাছাড়া, কোম্পানির গাড়ি আমি এখনও চালাই, তাই সেই সূত্রে ১০ হাজার তো পাইই।

অম্বরিস – এমনিও উজ্জ্বলের টাকাপয়সার খুব একটা দরকার পড়েনা। সামান্য সিগারেটের নেশাও নেই। তাই ওর খরচ কি? তবে আমার জন্য মাঝে মাঝে ওর খরচ হয় বটে। … আসলে, সেই ঘটনার পর থেকে, আমার হাতে বাবা একদমই টাকা দেন না। আমার স্যালারিটাও রেখার কাছেই দেন। … তবে আমার একটু এই পিজা, কেএফশি খাওয়ার খুব সখ। … সেটা উজ্জ্বলই মাঝে মধ্যে নিয়ে এসে খাওয়ায় আমাকে।

বাবা মুচকি হেসে চুপ করে গেলেন। আর এবার বাড়ির বাকি সদস্যদের দিকে একটু নজর দিলেন। হরিদাস ও তাঁর স্ত্রী সুজাতা হলেন বাড়ির সমস্ত কর্মকাণ্ডের দেখাদেখি করেন। কেনাকাটা করতে বউদি ও ননদ একসাথেই যেতেন, আর তাও উজ্জ্বল ড্রাইভিং করে নিয়ে যেত। তাই এর অতিরিক্ত লোকের প্রয়োজন ছিল না বাড়িতে।

বাবা বললেন – সেই কাজের লোক, কি নাম ছিল তার, যে ফেরার হয়ে যায়!

অম্বরিস – বিনয়

বাবা – হ্যাঁ, তো সে চলে যাবার পরে কি হরিদাস আর ওর স্ত্রীর আগমন এখানে!

মিসেস রেবা – না না, হরিকাকাকে আমরা ছোট থেকে দেখছি। বাবা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে হরিকাকার বিয়ে দেন। উনারা নিঃসন্তান, তবে আমাদের কারুকে উনারা সন্তানের থেকে কনো ভাবে কম চোখে দেখেন না।

উজ্জ্বল – বিনয়কে স্যার নিয়ে এসেছিলেন, ডালখোলা থেকে। আমার গাড়িতেই স্যার ছিলেন। ডালখোলার একটা ধাবায়, আমরা দাঁড়িয়েছিলাম। স্যার গেলেই ওখানে দাঁড়াতেন। সেখানের তড়কারুটি স্যারের খুব পছন্দ ছিল। সেই সময়ে একটা কলকাতার বাসের এক প্যাসেঞ্জারের থেকে, কিছু জিনিস ছিনতাই করে বিনয় পালাচ্ছিল। যা নিয়েছিল, তাতে ছেলেটির চাকরির এপয়েন্টমেন্ট লেটারও ছিল। তাই স্যার আমাকে নিয়ে বেড়িয়ে পরে বিনয়কে ধরেন। তারপর সেই ব্যাগ স্যার ফিরিয়ে দেন, কিন্তু বিনয়কে ওদের হাতে না দিয়ে বলেন, সে পালিয়ে গেছে। সেখান থেকেই বিনয়কে নিয়ে আসেন স্যার, আর এখানের কাজের লোক করে বহাল করেন।

বাবা – এমনি কেমন ছিল?

অম্বরিস – এমনি ভালোই ছিল, অভাবের জন্য চুরিছিনতাই করতো।

উজ্জ্বল – ছাড়ুন তো ওর কথা। ভালমানুষের মুখোশ পরে ছিল, নাহলে ২ লাখ টাকা নিয়ে চম্পট দেয়! চুরির স্বভাব ওর ভিতরেই বাসা বেধেছিল, কোনদিনও যায়নি।

বাবা এবার সেই বিষয়ে আর আগে না এগিয়ে, বাড়ির তিন অতিথির দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনারা নিজেদের ব্যাপারে কিছু বলুন।

এঁদের মধ্যে একজন জটাধারী সাধুবেশের, অন্যজন ফিটফাট, আর তৃতীয়জন একটু লম্বা করে, কুরূপ কিন্তু অত্যন্ত সৌখিন। যিনি সুপুরুষ তিনিই হিন্দিতে বললেন। যা বললেন, আমি তার বাংলা বলছি – স্যারের সাথে আমার আলাপ গোয়ালিয়রে। সেখানের রাজবাড়িতে কাজ করতে গিয়ে, বেশ কিছু জায়গায় উনি আটকে যান, আর আমি ঠিক করে দিই। … তাই আমাকে নিমন্ত্রণ করে এনেছেন উনি এখানে।

বাবা এবার সাধু মহারাজের দিকে তাকালে, উনি তামিলভাষীর ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বললেন – হামারে সাথ বাবুকা বহত দিন কি পেহেচান হে। মে হি তো ঊনকো গোয়ালিয়র রাজঘরানে কি কাম দিয়ে থে।

শেষে সেই সৌখিন কুরূপের দিকে তাকাতে, উনি বললেন – মিস্টার হালদারের লাইফলাইন দেখতাম আমি। আই আম আ জ্যোতিষ।

বাবা এবার একটা অন্য প্রসঙ্গে কথা বললেন – তো মিস্টার অম্বরিস, এবার বাবার বিজনেসের কি হবে?

অম্বরিস – আমি মেজদাকে বলেছি। মেজদা অবশ্য বলছে, রেখাকে দায়িত্ব দিতে। রেখা সেই দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করছে।

রেখা – দিদির সাথে (সায়ন্তনের স্ত্রী) আমি কথা বলেছি। দিদিকে বলেছি, আমরা দুই বউ, আর রেবা বাড়ির আর পরিবারের দেখভাল করবো, আর উনারা দুই ভাই ব্যবসা দেখুক।

অম্বরিস – আমরা দুই ভাই হলেই হবে না। উজ্জ্বল না থাকলে, আমরা অনেক কিছুই দেখতে পারবো না। উজ্জ্বল অবশ্য তাতে আপত্তি করেনি।

বাবা আর সেই বিষয়ে কথা বাড়ালেন না। সন্ধ্যাভোজনের পর্ব শেষ। যে-যার ঘরে ফিরে গেলাম। বাবা একটা সিগারেট জ্বালালেন। আমিও পাশে গিয়ে বসলাম।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6