দ্বিতীয় পর্ব – কোচির কাজ শেষ
গাড়িতে উঠেই প্রথম কথা যা বাবা প্রশ্ন করলো সিবরমনকে, তা হলো, স্লোগানে কি পরিবর্তন হলো। সিবরমন প্রথমে হিন্দিতেই বলছিল, কিন্তু উনার হিন্দি বোঝা সত্যিই কঠিন, তাই বাবা ইংরাজিতে বলতে বললেন। সিবরমন ইংরাজিতে যা বললেন, তা এরকম –
এঁদের ভাবগতিক কিছু বোঝা যায়না। এতক্ষণ বলছিল, এই প্রাইভেটাইজেশন, তারা কিছুতেই মানছে না, আবার এখন বলে, সরকার যদি বিক্রি না হওয়া মাছ কিনতে রাজি থাকে, তবে তারা রাজি, সরকারের দাবিতে।
সিবরমন আরো অনেক কথা বলছিল, সরকারের সাথে যখন স্ট্রাইক করে, কিছু করতেই পারবিনা, তখন স্ট্রাইক করার কি দরকার, আরো কত কি। … কিন্তু বাবাকে দেখলাম, গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে, ডান হাতটা ভাঁজ করা বা হাতের উপর রেখে, সেই ডান হাত দিয়ে, নিজের ভ্রু আর চোখকে হাত বুলিয়ে চলেছে। আমি বুঝলাম, বাবার যা জানার জানা হয়ে গেছে। এখন নিশ্চয়ই বাবা মনের মধ্যে অঙ্ক মেলাচ্ছে।
কিন্তু সেই সময়ে, আমি আর সত্যিই তাকাতে পারছিলাম না, প্লেনের জার্নি, তারপর ৭ ঘণ্টা গাড়িতে করে হোটেলে আসা, আবার এখন দুপুর ১২টা বেজে গেছে, কোন ঘুম নেই। চোখ খুলে রাখতে পারছিলাম না। তবে বাবা গাড়িতে ঘুমোতে দিল না। হোটেলের রুমে আস্তে, আমাকে তাড়াতাড়ি স্নান করতে পাঠিয়ে দিল, আর স্নান করে বেরোতেই, আমাদের রুমেই দেখলাম বড় বড় পমপ্লেটের ঝাল আর গরম গরম ভাত। সপাসপ খেয়ে নিয়ে, আমি শুয়ে পরলাম। বোধহয়, সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পরেছিলাম। ঘুম ভাঙলো যখন, তখন দেখি রুমের আলো জ্বলছে, আর বাবা কারুর সাথে ফোনে কথা বলে, সবে ফোন রাখছে।
যেটুকু কথা শুনতে পেয়েছিলাম, তা বাংলাতেই বাবা বললেন, অসংখ্য ধন্যবাদ, শুভরাত্রি।
বাবার দিকে তাকাতে, বাবা নিজের থেকেই বললেন, দু ঘণ্টা ঘুমিয়েছে, তারপর এয়ারপোর্ট গেছিল, আর এখন যেই কাজে এয়ারপোর্ট গেছিল, তা সম্পন্ন হলো। মাঝে, উনি সিবরমনকে নিয়ে আরেকবার ফিশিং ডেকে গেছিলেন। এখানের কাজ মোটামুটি শেষ। … কথাটা শুনে, আমার আনন্দ হলো না, বরং বিরক্তই লাগলো – আমি কিছু বুঝতেই পারলাম না, তার আগেই কাজ শেষ!
আমার মনের ভাব বুঝেই বাবা বললেন – ঘটককে বলছি শুনে নে।
মিস্টার ঘটককে ফোন করলেন বাবা। বাবাই বেশির ভাগ কথা বললেন, তাই বাবার কথাগুলোই লিখলাম –
মিস্টার ঘটক…
– ঘটক কাকুর কথা
হুম কেস মোটামুটি সল্ভড
– ঘটক কাকুর কথা
হ্যাঁ, আমাদের সাথেই, রুলিং পার্টির তিনটি ভোটে হেরে যাওয়া ক্যান্ডিডেট এসেছিলেন, … হ্যাঁ, একই প্লেনে।
– ঘটক কাকুর কথা
হ্যাঁ, ভেরিফাই করে নিয়েছি, উত্তরখণ্ড থেকে দাঁড়ানো, মুকেশ শর্মা; রাজস্থান থেকে দাঁড়ানো, রজনিস গাইকন্ডে; আর ছত্তিসগড় থেকে দাঁড়ানো, মহুসিন তুতেন খান। …
– ঘটক কাকুর কথা
হ্যাঁ এয়ারপোর্টের লিস্ট থেকেও, আর এম.পি. লিস্টের সাথে ক্রশ ভেরিফিকেশন করেও।
– ঘটক কাকুর কথা
এই স্ট্রাইক, একটা লোকদেখানি স্ট্রাইক মাত্র, দেশের অন্যত্র যদি কোন স্ট্রাইক হয়, তা যাতে ধপে না টেঁকে, সেই উদ্দেশ্যে মেনিপুলেটেড।
– ঘটক কাকুর কথা
অর্থাৎ, রুলিং পার্টি নিজেদেরই এর্যাঞ্জ করা একটা স্ট্রাইক করেছে, যার থেকে দরকষাকষি করিয়ে, বিদেশী তিন কোম্পানিকে সমস্ত সামুদ্রিক মাছের মালিকানা দিয়ে দেওয়া যায়। তিনটে কোম্পানি যারা সমস্ত মালিকানা নিচ্ছে, তারা হলো টকিয়োজ শিফুডস, দি মিলান ফিসারিজ, আর আমস্টারডাম ফিস স্টক – এই তিন দেশের সাথেই ভারতের খুব একটা রপ্তানি চলেনা। অর্থাৎ, এঁরা কোন একটি কোম্পানির এজেন্ট হয়ে, বা কোন একটি কোম্পানির মাধ্যমে, এই কেনাব্যাচা করবে।
– ঘটক কাকুর কথা
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, বিক্রি না হওয়া মাছ, সরকার কেনার অঙ্গিকার করেছে। আর আমি ডেড শিয়র, সেই মাছ, সরকার এক অন্য সংস্থাকে বিক্রি করবে, যে এই তিন কোম্পানির ইনফ্লুএন্সার নয়। … আর যাতে এই সমস্ত কিছু করতে বাঁধা না পেতে হয়, সেই কারণে সরকার এই মেনিপুলেটেড স্ট্রাইক করিয়েছে, ভারতের সেই ফিশিং করিডরে, যেই ফিশিং করিডর রিলেটিভলি দুর্বল, অর্থাৎ যেখানে সাধারণ মৎস্যচাষিরা অংশগ্রহণ করবেন না, সেখানে।
– ঘটক কাকুর কথা
না … এবার আপনি বলুন, কেস ইজ সল্ভড্। … এবার আপনি যদি বলেন যে, তিনটি কোম্পানি কার এজেন্ট হয়ে কাজ করছে, বা সরকার যে সেই এজেন্টকে স্ট্রাইক দেখিয়ে, রাজি করালো যে যেই মাছ এই তিন কোম্পানি কিনবে না, সেটা সরকারের হবে, আর সরকার সেই মাছ কার কাছে বিক্রি করবে, তাহলে, আমাকে পরবর্তী তদন্ত করতে হবে। … এই তদন্ত এখানেই শেষ।
– ঘটক কাকুর কথা
অফ কোর্স নট, যেই তদন্ত করেছি, তার জন্য আমি ১৫র বেশি একটা টাকাও নেবনা। … আমি আপনাকে ১০ ফিরিয়ে দেব, কারণ আপনি ২৫ দিয়ে রেখেছিলেন। … তবে হ্যাঁ, এবার যদি এই তিনটি কোম্পানির ব্যাপারে, বা সরকার কার এজেন্ট হয়ে কাজ করছে, এই সমস্ত তদন্ত করতে বলেন, তাহলে, ২৫এ কিন্তু হবেনা। এগুলো এক্সট্রিম্লি কনফিডেন্সিয়াল, তাই এই তথ্য বার করা, বেশ কঠিনও হবে, আর প্রচুর রিস্কও থাকবে।
– ঘটক কাকুর কথা
কত লাগবে, সেটা কাজ করার পরেই জানতে পারবো। ফার্স্ট আমাকে লে-আউট তৈরি করতে হবে, সেই লে-আউটের ভিত্তিতে আপনাকে একটা এস্টিমেট দিতে পারি। …
– ঘটক কাকুর কথা
ওকে, আমি আপনাকে আজ রাত্রের মধ্যেই জানিয়ে দিচ্ছি। তবে হ্যাঁ, আমি শহর ছাড়ার আগে, খবর ফাঁশ করবেন না; যদি করেন, তবে আমাদের প্রাণের ঝুঁকি এসে যাবে।
বাবা ফোন রাখলেন, আমি বিদ্রোহের সুরে বললাম – এয়ারপোর্ট থেকে নামের তালিকা জানলে, কোন চেনা মন্ত্রীর থেকে নামের ভেরিফিকেসান করে জানলে যে রুলিং পার্টির ক্যান্ডিডেট; বন্দরে গিয়ে, এটাও জানলে, কি কি কোম্পানিতে মাছ বিক্রি করার কথা বলা হয়েছে। … কিন্তু স্ট্রাইকটা যে মেনিপুলেটেড, সেটা কি করে বুঝলে?
বাবা বললেন – রাজনীতি বড় কঠিন জিনিস জানিস মিলি… কিছু দুধে রাজনীতিবিদকে ইচ্ছা করে জনপ্রিয়শূন্য করে, হারিয়ে দেওয়া হয়, এই খবর আছে! … কেন হারায় জানিস? … এই সমস্ত মেনিপুলেসান গুলো করার জন্য। রাজনীতিবিদের ট্যাগটা অঙ্গে রইল, কিন্তু জনপ্রিয়তা নেই, তাই এঁদের খবর কেউ রাখেনা, এমনকি রিপোর্টাররাও নয়। আর সেই সুযোগ নিয়ে, এঁদেরকে পাঠানো হয়, এই সমস্ত মেনিপুলেশনগুলো কষে নেবার জন্য।
রাজনীতিবিদ প্রমাণ করতে হবে, নাহলে এঁদের কথা কেউ শুনবেনা, তাই ধুতিপাঞ্জাবি চাপিয়েই আস্তে হয়েছে। কিন্তু এরাও জানে, এঁদেরকে দেখলেই রিপোর্টাররা রাজনীতিবিদ বলে বুঝে নেবে, তাই ইচ্ছা করে, পার্টির উত্তরীয়টা শরীরে চাপায় নি। স্ট্রাইক হচ্ছে, সরকারি বিলের বিরুদ্ধে, তাই স্বাভাবিক ভাবেই রিপোর্টাররা ধরে নেবে যে, অপনেন্ট পার্টির নেতামন্ত্রী হবেন হয়তো। …
আমি আন্দাজ করেছিলাম, এই মেনিপুলেসান। ঘটকের সামনেই বলেছিলাম, ইস্ট করিডরে এই স্ট্রাইক হচ্ছেনা, মানেই তা সন্দেহজনক। আমি তখনই সন্দেহ করেছিলাম, এমন কিছুই একটা হচ্ছে। সেই জন্যই তো, যখন এঁরা গিয়ে কথা বললেন, তখন আমি সিবরমনকে দিয়ে, ওঁদের পাল্টে যাওয়া শ্লোগানটা জানলাম। … জানলাম, ওঁদের ভোল পাল্টে গেছে, ওরা সরকারকে বাকি মাছ বিক্রি করার কথা বলছে। … যেই মুহূর্তে এই পাল্টে যাওয়া ভোল শুনলাম, সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলাম, এর মানে, কারুর কাছে সরকার মাছ রপ্তানি করতে চাইছিল। অপনেন্ট পার্টি জেনে গেল, আর অমনি অপনেন্ট পার্টি একটা অন্য ইনফ্লুএন্সিয়াল বিদেশী কোম্পানিকে দিয়ে সরকারের কাছে প্রেশার ক্রিয়েট করলো।
আর তাই সরকার কি করলো, বিল পাশ করে, সেই তিন কোম্পানিকে রপ্তানি করার কথা বলে দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা হরতালও লাগিয়ে দিল – দেশবাসি জানলো, সরকার বিল এনেছে, আর অপনেন্ট বিরোধিতা করছে। সেই হরতালের মীমাংসা করতে হবে। তাই ট্যাগ না লাগিয়ে রুলিং পার্টির অনামা দুধে রাজনীতিবিদ এলো, আর সঙ্গে সঙ্গে সমঝোতা হয়ে গেল যে, বিক্রি না হওয়া মাছ কিনবে সরকার। আর সেই মাছ সরকার বিক্রি করবে, তাকে, যার সাথে প্রথম চুক্তি হয়েছিল। …
অর্থাৎ দাঁড়ালো ব্যাপারটা এই যে, অপনেন্ট পার্টি চাপ সৃষ্টি করলো, আর সেই চাপকে পাল্টে অপনেন্ট পার্টিকেই দেওয়া হলো। মানে? … মানে এই যে, অপনেন্ট পার্টি যেই কোম্পানিদের ঠিক করে দিয়েছিল, ওই তিন কোম্পানির থেকে কমিশন খেয়ে মাঝখানের মাখনটা ওরা খেয়ে নিয়ে সরকারকে বুড়ো আঙুল দেখাবে বলে। সরকার পাল্টা কি করলো এবার – ওই তিন কোম্পানি প্রথম দিকে কিছু মাছ পেলেও, কিছুদিন পর থেকে কোন মাছই পাবেনা। সেই মাছ বিক্রি না হওয়া মাছ, অর্থাৎ সরকার সেই মাছ কিনে নেবে, আর সরকার সেই মাছ বিক্রি করে দেবে, নিজের মনোনীত বিদেশী কোম্পানিকে।
আমি বললাম – অদ্ভুত চাল। … কিন্তু এতো ভালোই হলো। অপনেন্ট পার্টি কমিশন পেলে, সেটা তো দেশের টাকা হতো না, এখন তো সরকার নিজের পছন্দের বিদেশী কোম্পানিকে মাছ বিক্রি করবে, তাহলে সরকারি তহবিলে টাকা বাড়বে।
বাবা খানিকটা হো হো করে হেসে নিয়ে বললেন – বোকা মেয়ে, যদি সরকারি তহবিলেই সমস্ত টাকা ঢোকাত সরকার, তাহলে কি আর লুকিয়ে চুরিয়ে করতো এসব! … কলার উঁচিয়ে করতো যা করার।
আমি বললাম – তারমানে, দুই দিক থেকেই সাফারার দেশের মানুষই!
বাবা হেসে বললেন – হ্যাঁ, এই বিদেশী কোম্পানি তিনটে একটু বেশি টাকা দিতো মৎস্যচাষি বা জেলেদের, তাই ইস্টার্ন করিডর, যেখানে সব থেকে বেশি জেলে রয়েছে, তাদের থেকে কোন হরতাল হয়নি। আর সেই হরতাল করানো হলো এই ওয়েস্ট করিডরে, যেখানে জেলের সংখ্যা খুবই কম। সরকার কিনলে, কিনবে টাকার বিনিময়ে, আর তাই দর অনেক কম হবে, আর সরকার বেচবে সেই জিনিস ডলারে, আর সেই মাছই আবার বাজারে বিক্রি হবে, চরা দামে, সেখানেই সরকার ট্যাক্স নেবে। অর্থাৎ সরকার মাছ কেনার জন্য কম টাকা খরচ করবে, আর যা খরচ করবে, সেটা ট্যাক্স বাবদ সরকার তহবিলে তুলেই নেবে। কিন্তু টাকা দিয়ে কিনে, ডলার দিয়ে বেসরকারি কোম্পানির কাছে বেচে, সেই টাকাটা মুনাফা হবে, রুলিং পার্টির।
আমি বললাম – তারমানে এটা তো জালিয়াতি!
বাবা হেসে বললেন – হ্যাঁ, এক প্রকার জালিয়াতিই এটা। যা এভিডেন্স আমি দিয়েছি ঘটককে, বা এবার যা দেব, তার ভিত্তিতে, প্রমাণও করা যায়। … কিন্তু কথা হচ্ছে, সরকারের সাথে এই কেসটা লড়বে কে? সরকারের হয়ে তো সেই কেস ওই মাল্টিমিলিয়েনিয়ার কোম্পানি লড়বে, কিন্তু সরকারের বিপক্ষে, এই কেস কে লড়বে? সরকার তো কোর্টে কেসের ডেট পিছিয়ে পিছিয়ে, বিশাল বিল করে দেবে। কিন্তু উল্টোদিকে যে কেস লড়বে, তার এত টাকা আছে, এই কেস লড়ার মত?
আমি বললাম – তাহলে, তোমরা যে এই তদন্ত করে রিপোর্ট দিচ্ছ, এর দাম কি? এর গুরুত্ব কি?
বাবা বললেন – কিছুই নয়, দেশের মানুষের কাছে সত্যটাকে তুলে ধরা। যদি, এই সরকারের উপর মানুষের আস্থাটা একটু কমে, আর সেই অন্ধবিশ্বাস কমে এসে যদি একটু আত্মসচেতন হয়, এই আর কি। … কিন্তু এখানেও আবার গণ্ডগোল আছে। … তোর কি মনে হয়, সুখহাট সংবাদপত্র, এই কেস পুরো ছাপবে। … যখন ছাপবে, তখন দেখে নিবি চোখবুলিয়ে। দেখবি, সামান্যই সত্য বলেছে, আর তার সাথে রূপকথার গল্প জুরে দিয়েছে। … রুলিং পার্টিও বুঝে যাবে, এঁদের কাছে অনেক খবর আছে। আর সেই জন্য রুলিংপার্টি এঁদের সাথে আপোষ করতে আসবে, আর সেই সুবাদে এই পুরো কেস থেকে, যা রুলিং পার্টি উপার্জন করবে, তার থেকে একটা কমিশন আদায় করে নেবে – মাসহারা বলতে পারিস।
আমি – সেটাও কি সংবাদ কোম্পানির হবে, না কেবলই প্রযোজকের?
বাবা হেসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন – তোর মনে হয়, দিনের পর দিন একটা একটা করে নতুন নতুন সংবাদ মাধ্যম গজিয়ে উঠছে, প্রযোজক দিন প্রতিদিন বড়লোক হয়ে যাচ্ছে, এমনি এমনিই। … তবে হ্যাঁ, সমস্তটা নিজে পায়না, ডিপার্টমেন্টের মাথাদেরও কমিশন দিতে হয়। … তাই ওঁদেরকেও দেখ, ছেলে মেয়ে সব বিদেশে পড়াশুনা করছে।
আমি – আচ্ছা বাবা, এই তজ্রুপকে আটকানোর কি কোন উপায় নেই!
বাবা – এই ধর, আমি এই তিনটি কোম্পানির মাথার সাথে চোরাগোপ্তা দেখা করলাম, আর ওঁদেরকে এই খবরটা মোটা টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিলাম। … ওরা সেই খবর পেয়ে, সরকারের সাথে এক নতুন চুক্তি করবে, আর রুলিং পার্টির প্ল্যান ভেস্তে যাবে। … এমনও অনেক রিপোর্টার করে, আর এই করে প্রচুর টাকাও করে। … তবে, এতে আখেরে লাভ হয়না। … কোম্পানি নতুন চুক্তি করবে, রুলিং পার্টি আবার একটা যোজনা করবে, আর এই করতে করতে, শেষমেশ দেখবি, এখন যেই টাকাদিয়ে গ্রাহকরা মাছ কিনবে, সেই টাকাতেই এসে পৌঁছাবে। … তবে রিপোর্টার এমন করে, পয়সা রোজগার করে, বিশাল বৃত্তবান হয়ে যায়।
আমি জানি, আমার বাবা সেসব কোনদিন করবে না, অন্তত টাকা কামানোর জন্য তো নয়ই। তবে হ্যাঁ, আমি এও জানি যে, বাবা কারুর বাড়বাড়ন্ত আটকে দেবার সমস্ত উপায় জানে, আর কি ভাবে তা করতে হয়, তাও জানে। … কিন্তু হয়তো, সেই সমস্ত কিছু জেনেও, নিজের প্রফেসানে নিষ্ঠাবান, তাই সকল প্রযোজকের কাছে প্রিয়। বাবা ছক তৈরি করা শুরু করে দিয়েছিল, কিন্তু আমার তখনও শেষ প্রশ্ন বাকি ছিল। আমি বললাম – আমরা শহর ছাড়ার আগে, এই খবর ছাপতে বারং কেন করলে?
বাবা, কাজের মধ্যে ব্যস্ত হয়েই বললেন – খবরটা প্রচণ্ড গোপন খবর, আর খবরটা সুখহাট বার করার মানে, বাংলায় খবরটা বেরুবে। তারপর কি, মার্চ মাসের এই পচা গরমের অফ সিসিনে, এডমিনিস্ট্রেশনের সাথে একসাথে হয়ে, রুলিং পার্টির জন্য খুব অসুবিধে হবে কি, কোন বাঙালি রিপোর্টারকে খুঁজে নিতে?
আমি বুঝলাম, আমার বয়স খুবই কম। এখনো অনেক কিছু বোঝা বাকি। তবে সঙ্গে সঙ্গে এটাও বুঝলাম, একটা জাত রিপোর্টার প্রকৃতপক্ষে একটা প্রাইভেট ডিটেকটিভই হয়, শুধু তার কাছে কোল্ট থাকেনা, আর থাকেনা কেসের সলুউসান করার কৃতিত্ব। মুখ ধুতে উঠে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ কি মনে হলো ঘুরে গিয়ে বললাম – কিন্তু সে তো আমরা চলে যাবার পরেও, সন্ধান করে জেনে যাবে!
বাবা – হুম, যাবে বইকি, তাই তো যেখানে যাবো, সেখানের সন্ধান দেওয়া যাবে না। দিল্লির টিকিট ক্যান্সেল করতে হবে। মেসেজ করে দিয়েছি, ক্যান্সেলসান এসেও গেছে।
আমি – আমরা এবার তবে কোথায় যাবো?
বাবা – ভাইজ্যাকে দি মিলানের অফিস, চেন্নাই-এ আমস্টারডাম ফিস স্টকের, আর টকিয়জের অফিস কটকে। … আর প্রশ্ন না… এবার দেখতে পাবি। … যা দেখবি, তার উপর প্রশ্ন হবে।
আমি বুঝে গেলাম এবার রেড সিগনাল। বাথরুম চলে গেলাম। বাথরুমে যেতে যেতে বললাম, রাত্রে চিকেন খাবো বাবা। … বাবা বললেন, ট্রিপিল রিফাইন্ড নারকেল তেলের চিকেন বিরিয়ানি চলবে?
বিরিয়ানি আমার খুব প্রিয়। তাই বললাম – হ্যাঁ, বাইরে যেতে হবে? … বাবা উত্তরে বললেন, – বিলকুল নেহি, রাইট ইন ডি হোটেল রুম। তবে আমরা রাত্রেই বেরুবো। মুখচোখ ধুয়ে এসে, প্যাক করে নিবি।
আমি বলতে গেলাম – আজই! … কিন্তু রেড সিগনাল মনে পরে গেল। বাথরুমে চলে গেলাম।
ফিরে এলাম যখন, তখন বুঝলাম বাবা ঘটক আঙ্কেলের সাথে কথা বলছেন –
আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলুন, সিবরমনকে কি আমাকে কিছু পে করতে হবে?
ওকে, তাহলে, পরের ট্রিপগুলোর বিল আমি আপনাকে দিয়ে দেব। সিবরমনের সাথে আমি মাদুরাই জংশন পর্যন্তই যাবো।
ওকে, আমি আপনাকে একবারে কলকাতায় গিয়ে রিপরটিং করছি।
হ্যাঁ, প্রথম চেন্নাই, তারপর ভাইজ্যাক, লাস্ট কটক, গাড়ি আর হোটেলের বিল আমার কাছে থাকবে। … আমি আপনাকে হাতে হাতে দিয়ে দেব। …
ওকে ফাইন।
ফোন রাখলেন বাবা। বিরিয়ানি খেয়ে, সিবরমনের সাথে, আমরা চললাম মাদুরাই জংশন স্টেশনে। ওখানেই ওকে ছেড়ে দেব। তারপর, আমাদের যাত্রা আমরা বুঝে নেব। রাস্তায় একটি কথাও বাবা বলেনি, বরং বললেন, একটু ঘুমিয়ে নে। … সাত ঘণ্টার রাস্তা। আমি ঘুমিয়ে নিলাম, বাবা ঘুমিয়েছেন কিনা জানিনা। … বাবা মনেহয়, এই ট্রিপগুলোতে অত্যন্ত কম ঘুমায়। তাই হয়তো, একটা কেস শেষ হবার পর, দুই তিনদিন, বাবা খালি ঘুমায়। … কারণ বুঝতে পারতাম না, এবার বাবার সাথে এসে দেখলাম, তাই জানলাম।
ভোর ৬টা ২২ মিনিটে আমরা মাদুরাই জংশনে প্রবেশ করলাম। … বাবা একটা অ্যাপ ডাউনলোড করে রেখেছিল, সেই অ্যাপ দিয়ে, দুজনের দুটো প্ল্যাটফর্মটিকিট কেটে, আমার হাতে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের প্যাকেট দিয়ে দিলেন, আর বললেন, লেডিস টয়লেট থেকে এই পোশাকটা যেন পরে আসি। … কিচ্ছু যেন না ফেলি, সব যেন ব্যবহার করি। … ড্রেস পাল্টে আয়নায় দেখে, রীতিমত ভয় পেয়ে গেলাম। আমার গালগুলো ফুলে গেছে, যেই জ্যাকেটটা চাপিয়েছি, সেটাতে আরো মোটা মোটা লাগছে, মাথায় টুপি, চোখে এত বড় একটা গগলস – ছদ্মবেশ, ভেবেই মনটা দারুণ হয়ে গেল।
কিন্তু বেড়িয়ে, বাবাকে আর খুঁজে পাইনা। শেষে দেখলাম, একটা সাদা দক্ষিণদেশের ধুতিপরা উসকোখুসকো চুলদাড়ি দেওয়া লোক, আমার কাছে এসে বাংলায় বললেন, “চল, মেলুর যাবো। ট্যাক্সি বুক করেছি, উবার… গাড়ির নম্বর ৫৩৪২”।
কি অদ্ভুত, নিজের বাবাকেই চিনতে পারলাম না! … কিন্তু এই ছদ্মবেশের মানে কি?
কোন কথা নেই। গাড়িতে উঠলাম, মেলুর পৌঁছলাম। ৫২০ টাকা নিলো গাড়ি, আট ঘণ্টার জার্নি! কি সস্তা! আমার ফোন থেকে বুকিং করেছিল বাবা। আমার ফোনটা মাদুরাই স্টেশনে আসার আগেই নিয়ে রেখেছিলেন বাবা, সেটা থেকেই বুকিং। মেলুর গিয়ে, সেখানের কর্পোরেশন বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে, সমস্ত মেকআপ তুলে ফেলতে বললেন বাবা। পে অ্যান্ড ইউজ টয়লেটের দিদিটা কেমন করে যেন দেখছিল আমার দিকে, মেকআপ তুলে ফেলার পর। … বাবা আগেই বলে দিয়েছিলেন, কোনদিকে তাকাবি না, ডাঁটসে যাবি, ডাঁটসে আসবি। তাই করলাম। এবার আবার গাড়ি বুকিং, ৭ ঘণ্টা লাগলো, চেন্নাই পৌছাতে। … এই ১৮ই মার্চ আমার চিরকাল মনে থাকবে। খালি গাড়িতে চরছি, নামছি, খাচ্ছি, আবার গাড়ি চরছি। … চেন্নাই এসে, বাবা একটা হোটেল বুকিং করে, আমাকে নিয়ে উঠে, বিছনায় বসে বললেন – বল এবার কি প্রশ্ন আছে।
