প্রথম পর্ব – বিজয় সিংহ
বিজয় সিংহ, আমার বাবা, সামাজিক ভাবে তিনি একজন পেশাদার রিপোর্টার। আর আমি মিলি সিংহ, আজ একজন পেশাদার রিপোর্টার হলেও, এই পেশা সম্বন্ধে আমি জানি বা শিখি, আমার বাবার থেকেই। না, কোনো সংবাদমাধ্যমের হয়ে কাজ করতেন না তিনি। তিনি ফ্রিল্যান্সিং করতেন, রিপোর্টার হিসেবে। এখন তাঁরই সেই ফ্রিল্যান্সিং রিপোর্টার পেশাটি, তাঁর অবর্তমানে আমার পেশা হয়ে গেছে, এবং আমি এখন আর ফ্রিল্যান্সিং করিনা। বরং একটা কোম্পানি খুলেছি, “রিপোর্ট নাউ” নামে। আমার কোম্পানি যেই খবর সাপ্লাই করে, তা পেপারে দেখতে পাবেন; খবরের শেষে লেখা থাকে – “আর এন”।
তবে রিপোর্টারের কর্মকাণ্ড আমি শিখি বাবার থেকেই। আজ আমি অনেক রিপোর্টই প্রদান করি, আর বেশ নামডাকও হয়েছে আমার। কিন্তু বাবার কথা না বললে, আমার সমস্ত কিছুই অহেতুক হয়ে যায়। সত্যি বলতে, বাবা যেই কেশগুলি সল্ভ করতেন, বা করেছেন, বা যেই পরিমাণ রোমাঞ্চ আমি বাবার অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে লাভ করেছি, আমি নিজে রিপোর্টার হয়েও সেই রোমাঞ্চ কোনদিন পাইনি।
কি করে তিনি রিপোর্টার হলেন, তা বলতে পারবোনা, কারণ আমার জন্মের আগে থেকেই তিনি রিপোর্টার। তবে, আমার যখন বয়স ১৮, তখন থেকে আমি তাঁর সঙ্গী হই – এসিস্ট্যান্ট বলতে পারেন, কারণ বাবা সেইভাবেই আমার পরিচয় দিতেন সর্বত্র।
বাবা সবরকমের কেশই হ্যান্ডেল করতেন বলে শুনেছি, তবে আমি যবে থেকে সরাসরি বাবার সাথে যুক্ত, তবে থেকে দেখে এসেছি, বাবাকে সংবাদ মাধ্যমরা বাড়ি বয়ে এসে যেই কেশগুলো দিতেন, তা অত্যন্ত গোপন কেস হতো। কখনো সেগুলো রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের পিছনের ঘটনা উদ্ধার করা হতো, তো কখনো প্রকৃতির বা মানবজাতির ব্যাপারে কিছু গবেষণা জাতীয় গোপন তত্ত্ব উদঘাটন হতো।
কেসের ক্ষেত্রে বাবার কাছে কোনো না কোনো সংবাদ মাধ্যমের উচ্চপদস্থ ম্যানেজার আসতেন। কেসের বিবৃতি দিতেন, আর অগ্রিম টাকা পয়সা দিতেন। পুরো কেস রিসলভ হলে, বাবাকে দেখতাম রাতজেগে রিপোর্ট সাবমিট করতে, আর সেই রিপোর্ট সাবমিট হলে, বাকি টাকা দিতো। দেশবিদেশের যাতায়াতের, থাকাখাওয়ার খরচের বিল আলাদা করে করতে হতো বাবাকে। আর তাছাড়া পারিশ্রমিক বাবা ধার্য করলেও, সেই নিয়ে একটা স্বল্পসময়ের দরকষাকষি চলতো। এমন নয় যে বাবা, প্রচুর রোজগার করতেন, তবে যা করতেন, তাতে বাবা-মা-আমি এই ছোট্ট পরিবার বেশ আনন্দ করেই কাটাতাম।
মোটামুটি সমস্ত বড় পত্রিকার প্রযোজকদের সাথেই বাবার বেশ গভীর আলাপ। মি: ঘটক, সুখহাট সংবাদপত্রের প্রযোজক সেদিন আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন।
মা উনাকে দেখেই বাবার আর উনার চা চাপিয়ে দিলেন। চায়ে চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলে রেখে, মিস্টার ঘটক বললেন – বিজয়, আর কতদিন তুমি একাএকা ট্রাভেল করবে বলতো? প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ, আর তাছাড়া আমরা সকল প্রযোজক তো তোমাকে দুজনের থাকাখাওয়া আর ট্রাভেল অ্যালোয়ান্স দিতে রাজি।
তুমি একজন মোস্ট ট্রাস্ট ওয়ারদি ফ্রিল্যান্স রিপোর্টার। উই আর হ্যাপি টু ইনভেস্ট অন ইউ। তোমার পিছনে লাগানো টাকা আজপর্যন্ত কোনোদিন জলে যায়নি। আর সত্যি বলতে, তোমার মত এমন ঠান্ডা মাথার রিপোর্টার আমি খুব কমই দেখেছি। ইউ আর পারফেক্টলি আ ব্রিলিয়ান্ট রিপোর্টার।
বাবা – আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো। আপনারা সকলেই, আমাকে এতো এসিস্ট্যান্ট নেবার জন্য ফোর্স করেন কেন?
ঘটক আঙ্কেল – এসিস্ট্যান্ট থাকলে, তোমাকে অনেক বেশি কেস দিতে পারি। একা হবার জন্য, তুমি বছরে ২-৩ এর বেশি কেস হ্যান্ডেলই করতে পারোনা। শুধু রাজনীতির কেস নয়, বিলিভ মী, আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে তোমার পছন্দের হিস্টরিক কেশও দেব। আই প্রমিশ। বাট, তার জন্য তো একটু বেশি কেস হ্যান্ডেল করতে হবে, তাই না।
চায়ে চুমুক দিয়ে আবার ঘটক বাবু বললেন – আমাদের সংবাদপত্র ছাড়াও অন্য ম্যাগাজিন আছে। সেখানে আমার ইচ্ছা, তোমার নাম দিয়ে কিছু অ্যাডভেঞ্চার থ্রিলার বা ঐতিহাসিক তত্ত্ব প্রকাশ করার। লোকের জানা উচিত, বাঙালি এখনও সোশ্যাল মিডিয়া সর্বস্ব হয়ে যায়নি। আই বিলিভ, বাই প্রজেক্টটিং ইউ, আই ক্যান ডেফিনিটলি এস্টাবলিস দ্যাট।
বাবা মৃদু হাস্যে চুপ করে বসে থাকলে, মিস্টার ঘটক আবার বললেন – ডোন্ট ইউ থিঙ্ক, বাঙালি কে উদ্বুদ্ধ করার জন্য আবার সত্যজিৎ রায়ের মত কাউকে প্রয়োজন? আমি জানিনা, তুমি নিজের সম্বন্ধে কি ভাবো। বাট, আমরা পত্রিকার প্রযোজকরা একসাথে হয়ে তোমার কথা উঠলে, আমাদের সবার মুখে, ওই একই কথা আসে।
বাবা এবার মুখ খুললেন – বেশ তবে, এতো করে যখন বলছেন, আমি এবার থেকে আমার এই কন্যাটিকে সঙ্গে নিতে চাই। আই ক্যান্ নট ট্রাস্ট অন এনি ওয়ান এলস।
ঘটক বাবুর মুখে যেই উজ্জ্বল হাসিটাকে কিছু কালো বাদল ঢেকেছিল, তা বোধহয় কেটে গেল। তিনি হেসে বললেন – ওয়েলকাম, ওয়েলকাম … (আমার দিকে তাকিয়ে) ওয়েলকাম লেডি সিন।
বলে রাখি এখানে, আমার পুরো নাম, মানে মিলি সিংহ নামটা কেউ নিতেন না। বাবাকে সকলে বিজয় বলেই ডাকতেন, আর অবাঙালীরা বলতেন, মিস্টার সিন। বাবা বলতেন, কি ভাগ্যিস সিংহ থেকে শুধু সিং হয়ে যায়নি। … আর আমাকে ডাকা হতো, মিলি, লেডি সিন – এই দুই নামে।
বাবা এবার বললেন – নতুন কোনো কেশও নিশ্চয়ই আপনার স্যুটকেসে করে এনেছেন, তাই তো মিস্টার ঘটক?
ঘটক – তা ছাড়া কি তোমার মত ব্যস্ত লোকের দর্শন সৌভাগ্য লাভ হতে পারে সিন?
– তো বলে ফেলুন কি ব্যাপার।
– আচ্ছা তোমার কী মনে হয়, কেন্দ্র সরকারের মৎস্যচাষ বিল নিয়ে যে দেশ জুড়ে হরতাল হচ্ছে, তাতে কোনো জলঘোলা আছে?
– তা আছে বৈকি। আর দেশ জুড়ে হরতাল! না না, মিস্টার ঘটক, দেশ জুড়ে নয়, বলুন কেরল ওনলি। দেশজুড়ে সংবাদমাধ্যম প্রচার করছে মাত্র, কিন্তু হরতাল তো কেবল কেরোলে, অ্যান্ড সেখানেই সব থেকে সারপ্রাইজিং ব্যাপার।
– এখানে সারপ্রাইজিং কি পেলে?
– দেশের সব থেকে বড় ফিশিং হাব হলো ইস্ট করিডর, মানে অন্ধ্র, ওড়িশা, আর এই বাংলা। এই তিন জায়গায় কোন তাপূত্তাপ নেই! হওয়াই ওনলি কেরল?
– হুঁ, এই ব্যাপারটাই একটু গভীরে ঢুকে খবর চাই… কি পারবে তো সিন?
– কতটা গভীর খবর? দেশের মধ্যে কি চলছে, নাকি দেশের বাইরের ইনফ্লুয়েন্স টাও?
– দেশের বাইরেরটা খবর অনো, বাট পাবলিশ দেশের মধ্যেরটাই করবো।
– হুঁ বুঝি।
– কি বুঝলে?
– যা খবর ছাপা হবে, তার দ্বিগুণ খবর সঙ্গে রাখতে হয়। সরকারের সাথে টেক্কা নেওয়া তো, হুমকি তো আসবেই। চার্জ করতে এলে, কর্কে দেওয়া – বাড়াবাড়ি করলে, যা ছাপিনি এখনও, তাও ছেপে দেব।
বাবা আর মিস্টার ঘটকের একসাথে উচ্চস্বরে হাসি। মিস্টার ঘটক বললেন – দ্যাটস হয়ের ইউ সারপ্রাইজ আস। … যেই ব্যাপার একটা সংবাদমাধ্যমে সুদীর্ঘ ৩০ বছর কাজ করা এডিটারও বুঝতে পারেনা, হাউ ডু ইউ!!
আবার বললেন – এনি ওয়েজ, ট্রিপ প্ল্যান কি থাকবে?
– কেরল, তারপর দিল্লি, লাস্টে ইংল্যান্ড, বা অন্য দেশ। বাট হ্যাঁ, অন্য প্রোডিউসার রাও যেন, আমার এই কাজের ব্যাপারে না জানে, আপনি তো জানেনই।
– জানিনা আবার, ওরা তোমায় আফ্যোর্ড করতে পারে না, সো ফিল জেলাস। এনি ওয়েজ, টিকিট কি করবো?
– আজ সোমবার, ১৩ ই মার্চ। … উম…, আপনি ১৬ তারিখ কেরোলের ফ্লাইট, কোচিতে হোটেল, আর ১৮ই মার্চ রাত্রে দিল্লির ফ্লাইট আর ওখানে সাত দিনের হোটেল বুক করুন। বিদেশের ব্যাপারটা, আমি কোচির আবহাওয়া দেখে কনফার্ম করছি।
– কত এডভ্যান্স দেব?
– ২৫ দিয়ে দিন। বাকি পরে দেখছি।
মিস্টার ঘটক চলে গেলেন এডভ্যান্স দিয়ে। আমার তো চুটিয়ে আনন্দ। বাবা আমার হিরো। তার সাথে যাচ্ছি কোচি, আরো কোথায় না কোথায়। চুটিয়ে আনন্দ। আমার ব্যাগ আমিই গোছালাম, আর বাবার নির্দেশে, বাবারটাও, যদিও বাবা ব্যগপ্যাক আমাকে দিয়ে প্রায় দুই বছর ধরেই করান।
আজ ১৬ই মার্চ
আমাদের ফ্লাইটের সময় বিকাল ৫টায়, এটাই সব থেকে কম সময় নেবে কোচি পৌছাতে। রাত্রি ৮.৩০ এ আমরা পউছাবো কোচি। সেখানে সিভরমন বলে একটি গাড়ি দারিয়ে থাকবে; গাড়ির নম্বর ৭৫৩১। সে আমাদের নিয়ে রওনা দেবে ওয়িলিংডম দ্বীপ ছাড়িয়ে থপ্পুমপাড়িতে, যেখানে আমাদের হোটেল। হোটেলের নাম ভাইগা হোমস। এয়ারপোর্ট থেকে অনেক দূর, প্রায় ৭ ঘণ্টার রাস্তা। তার মানে আমাদের পৌছাতে পৌছাতে প্রায় ভোর ৩টে। বুঝতে পারলাম না, বাবা এত দূরে কেন নিলো হোটেলটা। যাই হোক, বাবার সাথে সমস্ত যাত্রাই অত্যন্ত রোমাঞ্চকর হয়। তাই, নিশ্চিন্তে এয়ারপোর্ট থেকে নেমে বাবার পিছনে পিছনে সিভরমনের গাড়িতে উঠে বসলাম।
পথে মাভেলি রোডে একটা ধাবায় আমাদের গাড়ি দাঁড়ালো, আর আমরা রাতের খাওয়াটা সেরে নিলাম। আমাদের ফ্লাইটও প্রায় দুইঘণ্টা লেট ছিল। তাই আমাদের গাড়িতে উঠে বসতে বসতে, প্রায় ১০.৩০ হয়ে গেছিল। বাবার থেকে জানলাম, ৭ ঘণ্টা লাগবে, রাত্রি বেলা, দেরি হবেনা। মানে এই ৫.৩০ নাগাদ আমরা হোটেলে পউছাবো। বেশ সাজানো শহর, সেই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। চওড়া চওড়া রাস্তা, সুন্দর করে রাস্তার ধারের দৃশ্য সাজানো। বেশ ভালো লাগছিলো।
এরই মধ্যে, সুদ্ধ বাংলায়, বাবা আমাকে তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বরে প্রশ্ন করলো – কি কি দেখলি, প্লেনের মধ্যে? বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণীয় কিছু পেলি?
প্রশ্নটা আমাকে বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে দিয়েছিল, কারণ আমি তো ঠিক ভাবে কিছুই দেখিনি। … তাও যদি কিছু না বলি, তবে বাবার অ্যাসিস্ট্যান্ট রূপে বেমানান হয়ে যাই, তাই বললাম, – না তেমন বিশেষ কিছু দেখলাম না, তবে বেশ কিছু উত্তরভারতীয় ধরনের ধুতিপরা বয়স্ক লোক দেখলাম, মনে হলো রাজনীতিবিধ।
বাবা দেখলাম কথা শুনে খুশী হলেন, বললেন – গুড। আর বললেন – সাধারণত রাজনৈতিক নেতারা যেখানেই যান, সেখানেই নিজেদের পার্টির চিহ্নটা উত্তরীয় করে যান, কিন্তু এইক্ষেত্রে তেমনটা দেখলাম না, এমন কি বন্দরে উড়োজাহাজ এসে পৌঁছানোর পরেও তেমনটা দেখলাম না। … সেটা দেখে, কেমন যেন একটা রহস্যজনক লাগলো।
আমি বললাম – এতে রহস্যজনক কি আছে?
বাবা ভ্রুটা কুঁচকে, যেন নিজের মস্তিষ্কের গভীর স্থান থেকে বললেন – এমন হতে পারে যে, রাজনৈতিক নেতা তো এসেছেন, কিন্তু রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হয়ে আসেন নি, বা এমনও হতে পারে যে, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হয়ে এলেও, তা প্রকাশ করতে ইনারা অনিচ্ছুক।
আমি বললাম – এমন কেন?
উনি বললেন – কারণ তো অনেক কিছুই হতে পারে!… এমনও হতে পারে যে … (থেমে গিয়ে) যাকগে, কাল বন্দরে গিয়েই সমস্তটার আঁচ পাওয়া যাবে। … তোর মুখ গুলো মনে আছে, অই ধুতি পরা মানুষগুলোর?
আমি বললাম – সংখ্যায় তিনজন ছিলেন, আর তাদের সাথেও একজন করে ছিলেন।
বাবা বললেন – হুম, পার্টির দেওয়া সিকিউরিটি, মানে মন্ত্রী নন, অর্থাৎ পরিচিতি কম, প্রতিনিধি… কোন গোপন কর্ম চলছে… বুঝলি, … এবার দেখতে হবে, গোপন কর্মটি কোন দিক থেকে হচ্ছে।
বাবা একটা কথাতেও কোন ইংরাজি শব্দ প্রয়োগ করলেন না। আমি বেশ বুঝলাম, গাড়ির ড্রাইভারকেও এখানে বিশ্বাস করা যায়না। যেকেউ ইনফরমার হতে পারে। অর্থাৎ এই তামিল- কান্নাদার দেশে, সুদ্ধ বাংলাই হলো কথোপকথনের শ্রেষ্ঠ সুরক্ষিত উপায়। … আরো বুঝলাম, এবার থেকে সবসময়ে চোখকান খোলা রাখতে হবে। … যা খালিচোখে সামান্য মনে হয়, তারমধ্যে থেকেই রহস্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সামান্য উত্তরভারতীয় ধরনের ধুতির থেকে রাজনৈতিক নেতা, পার্টির উত্তরীয় ব্যবহার না করার অর্থ গোপনে কর্ম সারা, অধিক সিকিউরিটি নেই মানে মন্ত্রী নয়, অর্থাৎ কম প্রসিদ্ধ কারুকে দিয়ে গোপনে কোন রাজনৈতিক ক্রিয়া চলমান – বেশ বুঝলাম, সামান্য দেখতে ঘটনার মধ্যে থেকেই এত তথ্য সংগ্রহ করা যায়, অর্থাৎ আরো সচেতন থাকতে হবে আমাকে। আরো বেশি বেশি করে নিখুঁত ভাবে অবসারভেসন চালাতে হবে, তবেই বাবার যোগ্য সঙ্গী হয়ে উঠতে পারবো।
আমাদের হোটেলে উঠলাম ঠিক ৫.৪৫ সকালে। ঘরোয়া দেখতে হলেও, অদ্ভুত সাজানো হোটেলটা, আর আমাদের হোটেল থেকে বট ব্রিজটা খুব কাছে, বাইরের দিকে চোখ রাখলেই জলাশয় আর বট ব্রিজটা দেখা যায়। কিন্তু এখনো আমি বুঝিনি যে বাবা এয়ারপোর্ট থেকে এত দূরে হোটেল নিলেন কেন। বুঝলাম পরের দিন সকালে মাত্র ৩৯ মিনিটের পথ অতিক্রম করেই, আমাদের হোটেল থেকে কোচির বন্দরে পৌঁছান যায়, মাঝে কেবলই বট ব্রিজ আর ইন্দিরা গান্ধী রোড।
ব্রেকফাস্ট করেই, বাবা আমাকে নিয়ে, সিবরমনের গাড়িতে বন্দরে পৌঁছালেন। তখন মাত্র সকাল ৮.৩০। গাড়িতে যেতে যেতে জানলাম সিবরমন হলেন মিস্টার ঘটকের পরিচিত। বাবার থেকে জানলাম, সিবরমন আমাদের প্রতিটি মুভমেন্টের খবর সমানে ঘটককে দিয়ে যাচ্ছে। … একদিকে ভালো, বিপদের মুকাবিলা সহজে করা যাবে, কিন্তু তথ্য ফাঁশ করা যাবেনা, তাই সুদ্ধ বাংলায় কথোপকথন অনিবার্য।
বন্দরে পৌঁছলাম যখন, তখন সেখানে দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু লেখা প্রচুর শ্লোগানযুক্ত প্ল্যাকার্ট নিয়ে, সমস্ত হরতাল চলছিল, আর মুখেও সেই দুর্বোধ্য ভাষাগুলিই নিশ্চয় উচ্চারিত হচ্ছিল, তাই কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। আসলে, বেশ কিছু ইংরাজিতে লেখা শ্লোগানও ছিল তাদের মধ্যে, কিন্তু আমার মনে তখন অন্য বিচার চলছিল, তাই খেয়াল করিনি। … আমার মাথায় একটা জিনিস তখনও ঘুরপাক খাচ্ছিল যে, বাবার জন্য যেই কিটটা রেডি করি আমি প্রতিবার, সেখানে সুখহাট পত্রিকার প্রযোজক, ঘটককাকুর দেওয়া একটা ইলেক্ট্রনিক নোটপ্যাড, আমি রেখেছিলাম কিন্তু ছিলনা, আর তার সাথে প্রভাতসন্দেশের প্রযোজক, মজুমদারকাকুর দেওয়া ভয়েস রেকর্ডারটাও ছিলনা – সেই নিয়ে।
হঠাৎই বাবার কথায় আমার ঘোরটা কেটে গেল। বাবা বলে উঠলো – সংবাদ জগতে কেউ কারুকে বিশ্বাস করেনা মিলি। সকলেই চায়, সাংবাদিক সংবাদ দেবার আগেই, সংবাদ সংগ্রহ করে নিতে। চাকরিরত সাংবাদিকের ক্ষেত্রে, কোন রাজনৈতিক কাণ্ডকারখানার মধ্যে সাংবাদিক জরিয়ে যাচ্ছে দেখলেই, তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়, আর আমাদের মত ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষেত্রে তো, যত অধিক সংবাদ সংগ্রহ করবো, তত আমাদের পেমেন্টের বিল বারে। তাই আগে ভাগে যদি আমাদের সংবাদ নিয়ে নেওয়া যায়, তবে তদন্ত বন্ধ করে, ফিরিয়ে নিলে, বিল কমে যায়।
সেই কারণেই, ঘটক আমাকে ইলেক্ট্রনিক নোটপ্যাড দিয়েছিল, মজুমদার দিয়েছিল ভয়েস রেকর্ডার, অবিরামখবরের দাসগুপ্ত দিয়েছিল সেভিং ট্রিমার, আর সন্দেশআজকের-এর লাহিড়ীর দেওয়া ইলেক্ট্রনিক ঘড়ি। … আর তাই, অগুলোকে বাক্সবন্দি করে, তুলে রেখে দিবি চিলেকোঠা ঘরে। তুই আসতিস না, তাই তকে বলিনি। প্রতিবারই তুই অগুলো ঢোকাস, আর আমি বার করে দিই।
আমি বললাম – এর মানেটা কি? ওগুলো কি রেকর্ডার?
বাবা – না, শুধু রেকর্ডার নয়, ওগুলো সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত কথা রেকর্ড করে যার যার দেওয়া, তাদের সিস্টেমে ফাইল পাঠিয়ে দেয়, মানে পুরো কেস ফাঁশ।
আমি খানিক ভেবে বললাম – নোটপ্যাড না বুঝলাম, যা লিখবে, তাই জেনে যাবে; ঘড়িও বুঝলাম, যা বলবে সব জেনে যাবে, ভয়েস রেকর্ডারও বুঝলাম, কিন্তু দাসগুপ্ত কাকুর দেওয়া সেভিং ট্রিমারটা বুঝলাম না তো!
বাবা হেসে বললেন – আমাকে সব থেকে বেশি অ্যাসিস্ট্যান্ট নেবার জন্য জোরাজোরি কে করছিল?
আমি বললাম, দাসগুপ্ত কাকু।
বাবা হেসে বললেন – সঙ্গে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকলে, আমি সব থেকে বেশি সময় গভীর তদন্তের কথা কখন তার সাথে বলবো?
আমি বুঝে গিয়ে, আর কিছু না বলে হাসলাম।
বাবা এবার হেসে বললেন – হরতালটা কিসের জন্য বুঝেছিস?
আমি বললাম – কি করে বুঝবো, অদের ভাষা যে আমি কিছু বুঝতেই পারছিনা!
বাবা বুঝতেই পারলেন, আমি অমনোযোগী ছিলাম, তাই একটু বিরক্ত হয়েই বললেন – ইংরাজিতেও শ্লোগান আছে, দেখে নে।
আমি এবার সব ইংরাজি পোস্টারগুলো দেখে বুঝলাম, পার্লামেন্টের বিল অনুসারে, সমস্ত সমুদ্র থেকে ধরা মাছ প্রাইভেট কিছু কোম্পানিরাই কিনবে, সরকার এর কোন দায়িত্ব নেবে না, এমনই বলা হচ্ছে। আর বিরোধিতা সেটারই হচ্ছে।
বাবাকে দেখলাম, ভ্রুকুটি কুঁচকে, গভীর দৃষ্টি দিয়ে কিছু দেখছেন। বুঝলাম না, এখানে দেখার কি আছে। তবে সেই সময়ে প্রশ্ন করার সাহস হলো না, হয়তো আমার প্রশ্নের কারণে, উনার মনোযোগ নষ্ট হয়ে যাবে! … প্রায় দেড় দুইঘণ্টা ছিলাম আমরা সেখানে। সারারাত ঘুম নেই, গাড়িতে যতখানি খাপছাড়া খাপছাড়া হয়েছে আর কি, তাই আর শরীর দিচ্ছিল না। …
বাবাকে বলতে, বাবা বললেন – চল্ হোটেলের রুমে গিয়ে, স্নান করে, একবারে লাঞ্চ করে, একটা ভাতঘুম দেওয়া যাবে। এখানের ট্রিপিল রিফাইন্ড নারকেল তেলের রান্না, খেয়ে দেখবি চ, খেয়ে বুঝতেও পারবিনা যে নারকেল তেলে রান্না।
বাবার কথা অনুসারে, হোটেলে যাবার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু দেখলাম, কিছু সাদা দামি গাড়িতে করে কালকের প্লেনের ওই লোকগুলো নামলো। বাবা, আমার হাতটা চেপে ধরতে, বুঝতে পারলাম, কাজ আছে, হোটেলে এখনই ফেরা যাবেনা। … আমরা সেই লোকগুলোর থেকে একটু দূরত্ব রেখেই চলছিলাম, তাদের অনুসরণ করে। …
গলা নামিয়ে, বাবা কে বললাম – কি বলছে শুনতেই পাবো না তো! বাবা বললেন – শুনতে হবেনা। এদের ভাবভঙ্গি পাল্টে যাবে, ওঁদের কথা অনুসারে। … একটা কাজ করতো, সিবরমনকে ডেকে নিয়ে আয়তো। … ভোল পালটানোর পর, কি ভোল হয়, সেটা জানাটা খুব দরকার। … আদেশ পালন করলাম বাবার। … সিবরমন এলো, প্রায় আধঘণ্টা পরে, সিবরমনের মুখে একটা বিরক্তির ছাপ দেখতে পাওয়া গেল – ওঁদের কান্নাদা ভাষাতেই কিছু বিরক্তির সুরে বললেন সিবরমন। … আর তা বলতেই, বাবা আমাদের সকলকে নিয়ে গাড়িতে উঠলো।
