দেশপ্রেম | রহস্য গল্প

আজ তিন তারিখ। অনুষ্ঠান আবার শুরু হবে আজকে। বাবা নেই শহরে। একা একা লাগছিল। শুধু আমারই নয়, মায়েরও। আমি মাকে বেশ কয়েকবার বললাম– বাবা একবারও ফোন করেও তো খবর দেবে একটা।… মাঝে মাঝে যেন দায়িত্ববোধ উনার হারিয়ে যায় কোথায় একটা!

মা হেসে বললেন – দেখগে যা, হয়তো গ্যাংটক থেকে উনি ফিরেই এসেছেন। অতনুদাদের সাথে আছেন। চুপচাপ গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন!

মা এই সবগুলো বোঝেন কি করে? টেলিপ্যাথি না কি! কই আমি তো বুঝতে পারিনা! সত্যি সত্যি বাবা কাল রাত্রেই ফিরে এসেছিলেন। ছদ্মবেশে ঢুকে, অতনুকাকুদের সাথে ছিলেন। যদিও আমি এটা জানতে পারি শেষ দিন। কিন্তু মা! … উনি কি করে বুঝে যান এইসব!

দিদিকে পরে বলতে, দিদি বলেছিলেন – ভালোবাসার অনেক ধরন হয়। তার একটি ধরন হলো, যাকে ভালোবাসি তাকে জানা। এই পদ্ধতিতে সামনের মানুষটার প্রতি অসামান্য বিশ্বাস জন্ম নেয়। … আর তাই এই ভালোবাসাই হলো শ্রেষ্ঠ। কখনো কখনো এই ভালোবাসা, যেখানে যাকে ভালোবাসি, তাকে চেনাতেই মন থাকে, তার উৎকৃষ্ট ভাবের কারণে, এই ভালোবাসাকে ভক্তি বলা হয়। … হেসে দিদি বলেছিলেন, তোর মা, তোর বাবাকে শুধুই ভালোবাসেন না, উনি তোর বাবাকে ভক্তি করেন। যেমন ভক্ত তাঁর ভগবানকে কখনো কখনো তো ভগবানের থেকেও বেশি জানেন, তেমনই তোর মা কখনো কখনো তোর বাবাকে, তোর বাবার থেকেও বেশি জানেন।

যাই হোক, এই সমস্ত কিছু পরের কথা। আগে এইসমস্ত জানলে তো আমার টেনশনই চলে যেত। তবে না, যেত না। কারণ টেনশন কিছু বুঝতে দেয় কোথায় আমাদেরকে? ঘটনার শেষে না হয়ে, যদি আগে এইসব জানতাম, তবে আমার টেনশন এই সমস্ত কথাকে মনভোলানো কথা বলে উড়িয়ে দিতো। … যাই হোক, নিজের দুর্বলতা আর কি বলবো আপনাদেরকে। মেয়েদের স্বভাব, বাবার প্রতি তারা দুর্বল হয়। আমিও ব্যতিক্রম নই। মাকে ভীষণই ভালোবাসি, কিন্তু বাবার কথা ভাবলেই, মনে একটা কিরকম ভাব জন্মায় যেন… যেন মনে প্রচুর ভয়, শঙ্কা আরো কতকিছু জন্ম নিয়ে নেয়। … সব সময়ে হারিয়ে ফেলার ভয়, যেন সবসময়ে চোখের সামনে দেখতে পাবার এক অদম্য ইচ্ছা। … কেন এমন হয় বলতে পারবো না। তবে হয়, আর শুধু আমার নয়, আমার বিশ্বাস প্রায় ৭০ শতাংশ মেয়েদেরই বাবার প্রতি এমনই ভাব থাকে।

একবার আমি মায়ের উপর রেগে গিয়ে একটু নিজের এক্তিয়ার ছাড়িয়েই বলেছিলাম, তোমার তো বাবা নেই; তুমি বুঝবে না! … উত্তরে মা আমাকে যা বলেছিল, সেটা হলো কথার মাধ্যমে গালে সপাটে একটা থাপ্পড়। মা বলেছিলেন, আমার বাবা নেই, তাই! … একবার তোর বাবাকে জিজ্ঞেস করে দেখিস তো, উনার কয় মেয়ে! … উত্তরটা আমি আগে থেকে বলে দিচ্ছি, উনি বলবেন উনার দুই মেয়ে, আর তুই উনার ছোট মেয়ে। বড় মেয়েটা আমি। … তোর এমন মনে হয়না, কারণ তুই তোর বাবাকে কনোদিন জানার চেষ্টা করিস নি। তাই তোর থাকে উনাকে নিয়ে ভয় আর শঙ্কা। আর উনিই আমার সমস্ত কিছু, তাই উনাকে জানাই আমার একমাত্র জীবনের ব্রত মনে হবার জন্য, আমি উনাকে জানি। আর তাই উনাকে নিয়ে আমার ভয় বা শঙ্কা থাকে না, থাকে শুধুই অকাট্য বিশ্বাস।

যেটাই হোক, ৩ তারিখের কথাতে আসি। আমরা সেই বড় হলঘরে বসে সমস্ত ভাষণ বক্তৃতা শুনছি। এমন সময়ে, আমি দেখি আবার মিসেস সান্যালের কপালে সেই লেজার রশ্মি পড়ছে। … বাবাও নেই, অতনুকাকু নিজেকে অতনুকাকু বলে পরিচয় দেন নি। কি যে করি আমি, কিছু বুঝতে পারছিনা! … মিসেস সান্যালকে কি তবে বাঁচানো যাবেনা!

এমনই ভাবছি, একটা ফায়ারিং-এর শব্দ, আর তারপরেই আরো একটা ফায়ারিং-এর শব্দ, আর সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে একটা আর্তনাদ। … যেদিক থেকে আর্তনাদটা আসছিল, আমরা সকলে সেদিকে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, একটা দাড়ি দেওয়া লোক, বিচ্ছিরি ভাবে মাটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছে। ছেলেটার সামনেই সেট করা স্নিপার রাইফেল। বুঝলাম যে এই লোকই বারবার স্নিপার দিয়ে নিশানা লাগাচ্ছিল। ব্রিগেডিয়ার সিং চেঁচিয়ে উঠলেন – হু ঈশ ফায়ারিং হেয়ার!

অতনুআঙ্কেল সামনে এগিয়ে এসে বললেন – মাইসেলফ স্যার। আমি অতনু, সিবিয়াই ইস্ট করিডরের চিফ। (পকেট থেকে একটা কাগজের টুকরো বার করে, ব্রিগেডিয়ারের হাতে দিয়ে) আমি এখানে গভার্নমেন্টের স্পেশাল অর্ডারে এসেছি, এখানে যেই মার্ডার এটেম্পট চলছে, তার প্রতিকার করার জন্য, আর যিনি মার্ডার এটেম্পট করছেন, তিনি আপনাদের সামনে এখন, তার দুটো পায়ে গুলি লাগার জন্য,  মাটিতে কাতরাচ্ছে।

ব্রিগেডিয়ার গতি এবার চেঁচিয়ে উঠে বললেন – হু ইজ হি! … আউটসাইডার! … এরেস্ট হিম!

বাবা এবার সামনে এগিয়ে এলেন। সামনে এগিয়ে আসার সময়ে, মুখের দাড়িটা সরাতে থাকলে, আমরা বুঝলাম যে, যেই ১২ জন সিবিয়াইএর লোক এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যেই একজন ছিলেন বাবা। … সামনে এসে উনি বললেন – সত্যিই কি ইনি আউটসাইডার! … অতনু, একবার ছেলেটির নকল দাড়িটা খুলে দাও দেখি!

অতনু আঙ্কেল লোকটির দাড়ি টেনে খুলে দিলে, মিসেস সান্যালা চেঁচিয়ে উঠলেন – বাবু!

বাবা – হ্যাঁ, মিসেস সান্যাল, বাবু! অর্থাৎ আপনার ছেলে সুবীর। … না সে জব্বলপুর যায়নি। সে এখানেই ছিল। আপনার মুখ থেকে প্রথম দিনের ভাষণ শুনে, উনি আপনাকে হত্যা করবেন এমন মনস্থির করে, আপনাকে সুট করার চেষ্টা করেন। … আপনাকে আমি বাঁচিয়ে নিই, তাই আমি থাকতে আপনাকে হত্যা করতে পারবে না বলে, আমাকেও ও টার্গেট করে। আর আমি বেশ বুঝে যাই যে আমি এখানে আছি জানলে, ও আপনার উপর আবার এটাক করবে না, তাই আমি গা ঢাকা দিই। তবে হ্যাঁ, গ্যাংটক আমি গেছিলাম। তবে গেছিলাম এই কেসের ব্যাপারেই। তবে আমি সেখান থেকে একদিনের মধ্যেই ফিরে এসে, সিবিয়াই টিমের সাথেই থেকে যাই, যেই সিবিয়াই টিম আপনার ভাষণ শুনবেন বলে সিক্কিমের খবর দেখে এসেছেন বলে দাবি করেন।

মিসেস সান্যাল বিধ্বস্ত হয়ে বসে পরলেন। মা উনার কাঁধ হরে রইলেন। মিসেস সান্যাল চোখের জলে বলে উঠলেন – কিন্তু কেন? মা তোর কি করেছে বাবু!

সুবীর আগ্রাসী হয়ে বলে উঠলো – মা! … আমার বাবার মাথায় ওই সব আজেবাজে কথা তুমিই ঢুকিয়েছিলে। আর সেই কারণেই বাবাকে মরতে হয়, ওই মোর্চাদের হাতে। আমি মানছিলাম না, কিন্তু যখন সেই একই কথা তোমার মুখে প্রথমদিন শুনলাম, সেদিনই বুঝে যাই যে তুমিই আসলে দেশের শত্রু, আর তাই তোমার কারণেই আমার বাবার এমন অবন্নতি হয়, আর মোর্চা, যারা আতঙ্কবাদী, তাদেরকে বোঝাতে যায়, আর তাদের হাতে উনার মৃত্যু হয়। … আমি ছাড়ব না তোমাকে!

মিসেস সান্যাল কেঁদে উঠেই বললেন – আমি যা বলেছি, আমি তা তোর বাবার থেকে শিখেছি। আমার এতো জ্ঞানগুণ নেই যে তোর বাবার মত এমন একজন মহৎ ব্যক্তিকে কিছু শেখাই! … এই সব কি আবোলতাবোল বলছিস তুই বাবু!

সুবীর আবার আগ্রাসী হয়ে – মিথ্যে কথা, সম্পূর্ণ মিথ্যে। … তোমার কারণেই মোর্চার হাতে, আমার বাবার মৃত্যু হয়।

আমার বাবা এবার বললেন – মিস্টার সুবীর সান্যাল, আপনি একদম ঠিক বলেছেন যে, আপনার বাবার এমন মানসিকতার জন্যই উনাকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা যে, আপনার বাবাকে মোর্চারা মেরেছে। … এটা একদমই মিথ্যে কথা যে আপনার বাবা মোর্চাদের বোঝাতে গেছিলেন। মোর্চাদের উনি কেন বোঝাতে যাবেন? উনি যে নিজেই মোর্চাদের সমর্থন করতেন!

ব্রিগেডিয়ার সিং এবার চেঁচিয়ে উঠলেন – এই মিস্টার, রাস্ক্যাল টিকটিকি একটা। মুখ বন্ধ রাখ।

বাবা এবার চেঁচিয়ে উঠলেন – আজকাল তাহলে, খুনির কথা শুনে আমাকে চলতে হবে নাকি! …

সুবীর বলে উঠলেন – হাউ ডেয়ার ইউ! … উনারা কারা আপনি জানেন! …

বাবা একটা ব্যাকা হাসি দিয়ে – জানি, খুনি উনারা দুইজন। … একজন ব্রিগেডিয়ারকে খুন করেছেন, অসংখ্য দেশের মানুষের বিশ্বাসকে খুন করেছেন, আর কত কত কুকীর্তি করেছেন, তার তো ইয়ত্তাও নেই।

সুবীর – কি সব আবোলতাবোল বলছেন! … কার সম্বন্ধে কি বলছেন! … উনারা ব্রিগেডিয়ার, দেশের জন্য প্রাণ দেন উনারা!  … দেশপ্রেম উনাদের থেকে শুরু হয়।

বাবা আবার বিকৃত ঠোঁট দেখিয়ে বললেন – দেশপ্রেমের ভ্রান্ত ধারনা নিয়ে মূর্খদের বোঝানো যায় যে আপনি দেশপ্রেমী, আমাদের নয়। … যাই হোক, আমার মুখের কথা শোনার আগে, একটা জিনিস আপনাদের সকলকে দেখাতে চাই। … এই অতনু… ব্যবস্থা করেছ!

অতনু আঙ্কেল – হ্যাঁ, … এই আনো।

তিনজন একটা রোলিং টেবিলের উপর একটা এলসিডি স্ক্রিন আনলে, বাবা একটা ভিডিও চালালেন। ভিডিও দেখে সকলে স্তম্ভিত। … ভিডিওতে দেখা গেল যে, একজন পাঠানড্রেস পরা লোক, একজন ব্রিগেডিয়ারের কাছে ছুটে গেলেন। … তারপর একদল আর্মির লোক, সেই দিকে গেলে, যেই ব্রিগেডিয়ারের কাছে ওই পাঠানড্রেস পরা ব্যক্তি ছুটে গেছিলেন, তিনি সামনে এসে দাঁড়িয়ে, সেই পাঠানড্রেসের মানুষকে সুরক্ষা দেবার চেষ্টা করতে কিছু বলছিলেন।

তারপর, সেই আর্মিট্রুপের সামনে থাকা ব্রিগেডিয়ার সিং ও ব্রিগেডিয়ার গতি, সুরক্ষা প্রদানকারি ব্রিগেডিয়ারের পায়ের ফাঁক দিয়ে সেই পাঠানড্রেস পরা ব্যক্তিটিকে গুলি করেন। তারপর সমস্ত জোয়ান প্রচুর গুলি মেরে, সেই পাঠানপোশাক পরা ব্যক্তির শরীর ঝাঁঝরা করে দেন। … এরপর ব্রিগেডিয়ার সিং সামনে এগিয়ে গিয়ে সেই পাঠানপোশাক পরা ব্যক্তির কাছ থেকে একটি বন্দুক উদ্ধার করে ব্রিগেডিয়ার গতিকে দেন, আর ব্রিগেডিয়ার গতি, সেই সামনে দাঁড়িয়ে সুরক্ষাদেওয়া ব্রিগেডিয়ারকে, পাঠানপোশাক পরা ব্যক্তির বন্দুক থেকে গুলি করে হত্যা করে দেন।

ভিডিও থেমে গেল। ব্রিগেডিয়ার গতি চেঁচিয়ে উঠলেন – ইটস এডিটেড। … ইটস ফেক।

বাবা ব্যাকা মুখে একটা হাসি দিয়ে বললেন – না মিস্টার গতি, সিবিয়াই আগেই টেস্ট করে দেখে নিয়েছে, এই ভিডিও এডিটেড কিনা। … এই ভিডিও এডিটেড নয়, আর এই ভিডিও যিনি করেছিলেন, তিনি হলেন একজন কাশ্মীরি রিপোর্টার, মিসেস নুশরত ফাতিমা ফারদিন। … উনি এই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গেই আছেন। … আসুন ফাতিমা!

একটি সুন্দরি ফুটফুটে মহিলা সামনে আসলে বাবা বললেন – ইনিই সেই ফাতিমা, যিনি সম্পূর্ণ খবরের কভারেজ করছিলেন, লুকিয়ে লুকিয়ে। … একটু বিস্তারে বলুন, পুরো ব্যাপারটা কি হয়েছিল!

ফাতিমা হিন্দিতেই বলল। আমি বাংলায় বলছি সেই কথা। উনি বললেন – জানাব, সমস্ত কিছুর শুরু হয়েছিল, যখন তিনটে কলোনির ১৮টি মহিলাকে রেপ করা হয়। রেপ আর মার্ডার করেছিল, ইন্ডিয়ান আর্মি। আর সেই ঘটনার পর থেকেই, ব্রিগেডিয়ার সান্যাল বিক্ষিপ্ত হয়ে যান। … উনি আর্মির সেই চারজনকে গ্রেফতার করেন, এবং কার অর্ডারে এমন করে তারা, সেটার তদন্ত করতে শুরু করেন। … সম্পূর্ণ রিপোর্ট তৈরি হলে, তবেই আর্মি কোর্টে ডকুমেন্ট দেওয়া হবে, এবং দোষীদের দণ্ড দেবার ব্যবস্থা হবে।

কিন্তু এরই মধ্যে, সেই তিনটে কলোনি থেকে, প্রায় ২৫জন পুরুষ একত্রিত হয়ে, মোর্চা গঠন করে। কাশ্মীরে আগ্নেয়অস্ত্র পাওয়াটা বড় ব্যাপার নয়। তাই, কিছুদিনের মধ্যেই মোর্চার কাছে অস্ত্রও এসে যায়। … আর শুরু হয়ে যায়, তাদের শুটিং ট্রেনিং। … কিন্তু ব্রিগেডিয়ার সান্যাল তাঁদের সাথে আলাদা করে দেখা করেন, এবং তাঁদের আশ্বস্ত করেন যে, উনি দোষীদের শাস্তি দেবেন। … তাই মোর্চা ট্রেনিং নেবার পরেও শান্ত হয়ে থাকে।

অন্যদিকে, ব্রিগেডিয়ার গতি আর ব্রিগেডিয়ার সিং সমস্ত কথা হায়ার অথারিটি, অর্থাৎ ইন্ডিয়া গভমেন্ট-এর নেতামন্ত্রীদের জানালে, সেখান থেকে অর্ডার আসে যে, মোর্চার প্রধানকে টেররিস্ট ঘোষণা করে, হত্যা করতে হবে। … আর তারপরেই, তারা মোর্চার মাথাকে অতর্কিতে আক্রমণ করে দেয়। … মোর্চার মাথা, প্রাণ বাঁচিয়ে পালাতে পালাতে, ব্রিগেডিয়ার সান্যালের কাছে যায়। আর সেখানে পৌঁছে যায় ব্রিগেডিয়ার সিং ও গতি এবং তাঁদের ট্রুপ। …

সেখানে দীর্ঘক্ষণ বচসা হয়, ব্রিগেডিয়ার গতি, সিং এবং ব্রিগেডিয়ার সান্যালের, যেখানে ব্রিগেডিয়ার সান্যাল বোঝাতে চান যে আর্মির করা ক্রাইমের জন্য মোর্চা গঠন হয়েছে। কিন্তু তারা কিচ্ছু করবে না, কারণ আর্মির সেই ক্রিমিনালরা, যারা কাশ্মীরবাসিকে অতিষ্ঠ করে রেখে দিয়েছে, আর যাদের কারণে সাধারণ কাশ্মীরঅধিবাসী ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে যেতে চায়, তাদেরকে আমরা শাস্তি দেব।

উত্তরে ব্রিগেডিয়ার সিং বলেন, আর্মি কনো দোষ করেনি। … আর্মিকে অর্ডার দেওয়া হয়েছিল যে, ওই তিন অঞ্চলের কাশ্মীরিদের মধ্যে আর্মির আতঙ্ক যেন এমন ভাবে ছড়ায় যাতে, আর্মির নাম শুনলেই তারা ভয় পায়। … আর সেই কারণেই এইসমস্ত করা হয়েছে। গভমেন্টের অর্ডারে যা করা হয়েছে, তা কখনোই ক্রাইম হতে পারেনা।

এই কথা নিয়ে তিন ব্রিগেডিয়ারের তুমুল বচসা হয়, কারণ ব্রিগেডিয়ার সান্যাল কিছুতেই মানতে রাজি ছিলেন না যে, আর্মির ভয় দেখিয়ে কাশ্মীরিদের ভারতে আটকে রাখার চেষ্টা একটি নিজেই ক্রাইম, সেই ক্রাইম আর্মি করুক আর গভমেন্ট, মানুষের উপরে কেউই নয়। … কিন্তু ব্রিগেডিয়ার সিং ও গতির কাছে দেশ ভক্তি ছিল, গভমেন্টের অর্ডার। সেটাই ওদের দেশপ্রেম, আর তার অন্যথা হলেই, তারা তাদেরকে দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করতো। … কিন্তু ব্রিগেডিয়ার সান্যাল উনাদের বিশিষ্ট বন্ধু, এবং উনার বিচিত্র দেশপ্রেমকে নিয়ে তাঁরা সবসময়েই চিন্তিত থাকতো। …

তাই, প্রথম ব্রিগেডিয়ার সান্যালের পায়ের ফাঁক দিয়ে মোর্চার মাথাকে গুলি করে ভূমিশায়ী করা হয়, তারপর আর্মির সকল জোয়ানকে অর্ডার দিয়ে, মোর্চার মাথাকে গুলি দিয়ে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়। … ব্রিগেডিয়ার সান্যাল এই দৃশ্য দেখে, প্রতিবাদ করতে গেলে, ব্রিগেডিয়ার সিং মোর্চার প্রধানের বন্দুক নিয়ে ব্রিগেডিয়ার গতিকে দেন। তারপর ব্রিগেডিয়ার গতি বলেন – তুমি দেশপ্রেমী, সেই নিয়ে কনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যে গভমেন্টের অর্ডার মানবে না, সে দেশের শত্রু। তাই তোমাকে মরতে হবে, কিন্তু তোমার দেশপ্রেম যাতে বৃথা না যায়, তাই মোর্চার গুলিতে মর তুমি। তাহলে এই এঙ্কাউন্টারে তুমি শহীদ হয়েছ, এই বলা হবে। এরপর উনাকে ফায়ার করে দেওয়া হয়, যেমন ভিডিওতে দেখতে পেলেন।

বাবা – কি সুবীর, বুঝতে পারলে তো! … তোমার বাবার সেই অসামান্য দেশপ্রেমের আদর্শ-এর কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু মোর্চা তোমার বাবাকে মারেন নি। … মেরেছেন, এই করাপ্টেড গভমেন্টের চামচা, নরকের কীটগুলোর হাতে। … আর হ্যাঁ, তোমার বাবার আদর্শে তোমার মা শিক্ষিত, তোমার মায়ের আদর্শে তোমার বাবা নন। … আর এই মিথ্যা কথা তোমাকে এই দুই চামচা শিখিয়েছিলেন, যাতে তোমার মাকে তুমি নিজে হাতে হত্যা করো।

গ্যাংটকে তোমার বন্দুকের দোকানের কি হলো সুবীর!… সেই লাইসেন্স উনারা তোমাকে কেন করিয়ে দিয়েছিলেন! … এই স্নিপার রাইফেল দেবার জন্য! … যদি তাই না হয়, তবে সেই লাইসেন্স তো ৩ বছর হয়ে গেছে তুমি পেয়েছ, তাও গান স্টোর হলো না কেন!  … ব্রিগেডিয়ার ছিলেন, এখনো আর্মির ট্রেনিং দেন। ইনাদেরকে গান ফ্যাক্টরির সাথে যোগাযোগ এমন নেই যে ৩ বছরের মধ্যে তোমার দোকান সেটআপ করে দিতে পারেন! … না সুবীর, ইনারা তো তোমার দোকানের জন্য চিন্তিতই নন। ইনারা তোমার মা যেদিন থেকে তোমার বাবার আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করলেন, সেদিন থেকে তোমার মায়ের হত্যা করার জন্য উঠে পরে লাগলেন, কারণ ইনাদের ভয় হতে শুরু করে যে, এই ভাবে চলতে থাকলে, মিসেস সান্যাল কনোদিন সত্য না জেনে যান। … রাতারাতি তিন বছর আগে, পেলিংএ বাড়ি কিনে নিলেন। তোমাকে পেলিংএ রেখে ট্রেনিং দেওয়ালেন। আরো কত কি করলেন।

ভেবো না তোমাকে ফাঁসিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলেন উনারা। … না না, একদমই করেন নি। দেখগে যাও, এখনও যা করছিলেন, তাও গভমেন্টের নির্দেশেই করছিলেন। গভমেন্টকে ইনফর্ম করেছেন যে, ব্রিগেডিয়ার সান্যালের আদর্শ আবার জেগে উঠছে, তাই গভমেন্ট হয়তো অর্ডার দিয়েছেন এদেরকে, সেই আদর্শকে আগাগোড়া উচ্ছেদ করে দিতে। … তাই তোমাকে মাধ্যম করে, তোমার মাকে হত্যা করার জন্য, তোমাকে তৈরি করে। … তুমি তৈরি হচ্ছিলেনা, তাই তো এই অনুষ্ঠান করেন উনারা। তুমি নিজের কানে মায়ের ভাষণ শুনবে, আর তারপর কনভিন্স হয়ে যাবে মাকে হত্যা করার। … আসলে এদের কাছে চামচাগিরিটাই আসলে দেশপ্রেম কিনা!

তবে ওই যে বললাম, তোমাকে ফাঁসিয়ে দিতো না। … তুমি যাতে না ফেঁসে যাও, তাই জন্য সেই কাশ্মীরি মোর্চারই ভগ্নাবশেষ থেকে এই দুই কাশ্মীরি ছেলেকে তুলে এনেছিলেন। সেই মোর্চা দলেরই দুই ব্যক্তির ছেলে এঁরা। এদেরকে ধরে নিয়ে আসে যাতে, মিসেস সান্যালের খুনের সমস্ত দোষ, এঁদের ঘাড়ে যায়। … আসলে পাবলিককে এই নিউজই তো দিয়েছেন না উনারা যে, মোর্চাকে আক্রমণ করতে গিয়ে ব্রিগেডিয়ার সান্যাল শহীদ হন। উনার কারণেই মোর্চা ভেঙ্গে গেছে, তাই তার প্রতিশোধ নিতেই ওরা এসেছে, এই বলে ওদেরকে ফাঁসিয়ে, তোমাকে বাঁচিয়ে নিত, তবে তোমার মাকে তোমার হাতেই মেরে ফেলত এই চামচাগুলো।

ব্রিগেডিয়ার গতি চেঁচিয়ে উঠলেন – হু হেভ গিভেন ইউ দা অথরিটি টু ইন্টারফেয়ার ইন দা মেটার অফ আর্মি!

বাবা – অথরিটি! … ইয়েস আই হ্যাভ ডা অথরিটি, আর সেই অথরিটি আমাকে ভারতমাতা দিয়েছেন। … তোদের মত কুসন্তানকে নষ্ট করার আদেশ দিয়েছেন উনি আমাকে। … এনিঅয়েজ, মিস ফতিমা, আপনি এই খবরটা পাবলিশ করেন নি কেন?

ফতিমা – স্যার, কাশ্মীরের পেপার এই খবর ছাপতে ভয় পেয়েছিল। তাই ছাপতে পারি নি। তবে আমি চুপ করে বসে থাকতেও পারিনি। একটা রিপোর্টারের দায়িত্ব সত্যখবর ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া। যখন খবরের কাগজে ছাপতে পারলাম না, তখন মোর্চাদের কাছে গিয়ে এই খবর দিই, আর এই ভিডিও দেখাই। আজও ওরা ব্রিগেডিয়ার সান্যালের মৃত্যুদিবস পালন করে, কারণ তিনি সত্যি কারের দেশপ্রেমী ছিলেন। … স্যার, আপনি এই দুই মোর্চা ছেলেদের মাধ্যমে যাদের সাথে যোগাযোগ করে, এই ভিডিওটা পেয়েছিলেন আর আমার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, তাঁদের কাছেই আমি গেছিলাম এই সমস্ত খবর দিতে।

বাবা বললেন এবার – ব্রিগেডিয়ার গতি আর সিং, আপনারা কি জানেন, আপনারা এই দুই মোর্চাদের ছেলেকে এখানে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য নিয়ে এসে খাল কেটে কুমীর এনেছেন! … জানেন না তো! … এঁরা এখানে আপনাদের আবাহনে আসতে রাজিই হয়েছিল, শেষদিনে আপনাদেরকে মেরে যাবে বলে। … ফরদিন আর আলি, তোমাদের বন্দুকগুলো দিয়ে দাও। একটা ব্যাডমিন্টন কোর্টের পিছনে লুকয়ে রেখেছিলে, উদ্ধার করে নিয়ে এসেছ; আরেকটা নিচে বাস্কেটবল কোর্টের পিছনে লুকানো ছিল, সেটা আমরা উদ্ধার করে নিয়েছি। অগুলোর লাইসেন্স নেই, তাই অগুলো সঙ্গে রাখার মানে, নিজেদেরকে আততায়ী প্রমাণ করা। তাই অগুলো আমরা আমাদের হেফাজতে নিয়ে নিয়েছি। … ও ভালো কথা, ফরদিন, সেদিন তুমি তোমার বন্দুকটা উদ্ধার করতেই তো এসেছিলেনা, এই ব্যাডমিন্টন কোর্টে! … আর আলি, সেদিন যখন তোমার পিছনে পিছনে গেলাম, তুমি তো তোমার বন্দুকটাই বাস্কেটবল কোর্ট থেকে উদ্ধার করতে গেছিলে না!

দুই কাশ্মীরি ছোকরা মাথা নামিয়ে নিলে, বাবা বললেন – ফরদিনকে ব্রিগেডিয়াররা ব্যাডমিন্টন খেলতে না দিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছেন, অথচ তার হাতের অনেকটাই মাটি লাগা। সেটা দেখেই বুঝে যাই যে তুমি এখানে মাটি কোপাতে এসেছিলে, আর তা যে সম্ভবত নিজেদের গোপন আগ্নেয়অস্ত্র উদ্ধার করতে, সেটা ধারনা করে নিই। আর সেই ধারনা পাকাপাকি হয়ে যায় যখন আলি বাস্কেটবলের কোর্টের দিকে যাচ্ছিল, আর আমি তার পিছু নিই। … আসলে আমি তখন মিসেস সান্যালের বাড়িতে আমার মেয়ের সাথে ঢুকছিলাম, সামনের কাঁচের পার্টিশনে দেখি তুমি হন্তদন্ত হয়ে নিচের দিকে যাচ্ছ; তাই মেয়েকে ফিরে যেতে বলে তোমার পিছু নিই। খানিকক্ষণ তুমি কি করো সামান্য দূর থেকে দেখেই, বুঝে গেছিলাম, আগ্নেয়অস্ত্র উদ্ধার করছো; জায়গাটা ভালো করে দেখা হয়ে গেলে, তোমাকে তোমার কাজ থেকে বিরত করতে আওয়াজ দিই।

বাবা আবার বললেন – হুম, তোমরা মোর্চার ছেলে জেনে, আমার প্রথম সন্দেহ তোমাদের উপরেই যায়। কিন্তু ফারদিনের হাতের মাটি আর আলির বন্দুক উদ্ধারের চেষ্টা আমার কাছে পরিষ্কার করে দেয় যে স্নিপার রাইফেল তোমরা চালাচ্ছিলে না। … তোমরা অন্য কারুকে খুন করার জন্য এসেছ। তারপর তোমাদের সাথে কথা বলে মোর্চার সাথে কথা, ভিডিও পাওয়া, আর শেষে গ্যাংটকে আসতে বলে, ফাতিমাকে এখানে নিয়ে এসে সমস্তই ক্লিয়ার হয়ে যায় যে তোমরা ব্রিগেডিয়ার গতি আর সিংকে হত্যা করতেই উনাদের ডাকে সারা দিয়ে, এখানে এসেছিলে।

বাবা এবার হেসে ব্রিগেডিয়ারদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন – সরি ব্রিগেডিয়ার স্যার, আপনাদের আরো একটা জিনিস জানা নেই। … আর সেটা হলো, আপনাদের সেই আর্মি ট্রুপ, যারা মোর্চা প্রধানকে হত্যা করেছিল, এবং আপনাদের ব্রিগেডিয়ার সান্যালকে হত্যা করতে দেখেছিলেন, তাদের একজন এখানেই আছেন এবং এখানেই থাকেন। … তিনি হলেন মিসেস সান্যালের ড্রাইভার। …

মিসেস সান্যাল – প্রভাস!

বাবা – হ্যাঁ ম্যাডাম, সেই কাশ্মীর অভিযানের পর, প্রভাসের কাশ্মীর থেকে মন উঠে যায়। উনি ব্রিগেডিয়ার সান্যালকে প্রচণ্ড স্নেহ করতেন। উনার সাথে করা দ্বিচারিতাকে উনি মেনে নিতে পারেন নি। আর তার সাথে ওর এমনও মনে হয় যে, এর পরের টার্গেট নিশ্চিত ভাবে আপনি মিসেস সান্যাল। তাই উনি আপনার ড্রাইভার হয়ে আসেন। … তবে এরই মাঝে একটি ঘটনা হয়ে যায়, সেটির একটা দিক জানলেও, অন্যদিকটা ব্রিগেডিয়ার সিং আর গতি জানেন না। … (ঈষৎ হেসে) মনে পরে মিস্টার সিং, আর্মি জেনারাল প্রভাস সিংহ আপনার এই সমস্ত কীর্তির প্রতিবাদ করেন, আর আপনি বন্দুকের বাঁট দিয়ে মেরে, ওর মুখ ফাটিয়ে দিয়েছিলেন! … প্রভাস তারপর কাশ্মীর নয় কেবল, আর্মিই ছেরে দেয়। নিজের মুখে প্লাস্টিক সার্জারি করায়, যেটা আপনি ভেঙে দিয়েছিলেন মেরে। আর তারপর মিসেস সান্যালের সেবা করে, নিজের পাপবোধ থেকে মুক্ত হতে চেষ্টা করেন।

বাবা আবার হেসে বললেন – মিসেস সান্যালের উপর যখন এটাক হয় প্রথমবার, প্রভাসের মধ্যে যেই নার্ভাসনেস কাজ করছিলো, আর সেই নার্ভাসনেসে ও যেই ভাবে সব জায়গা দেখছিল, সেই দেখার ধরন দেখেই আমি বুঝি যে ওর সাথে আর্মির ট্রেনিং রয়েছে। … তাই ওকে গোপনে প্রশ্ন করি। ও প্রথমে আমার কথা এড়িয়ে যায়। তারপর যখন মোর্চার ভিডিও পাই। তখন একজনের চেহারা দেখে, আমি প্রভাসের সাথে মিল পাই। … তাই ভিডিওটা দেখিয়ে, ওকে চেপে ধরতে, ও নিজেই আমাকে সমস্তটা বলে দেয়। … আর এই ভিডিওতে দেখানো সমস্ত কথা যে সত্য, তাও বলে দেয়… তার আগে কি হয়, সেটাও বলে, যা ফাতিমা আমাদের বলল, আর তারপরে যা হয়, অর্থাৎ ওর মুখ ফাটিয়ে দেওয়া হয়, ও আর্মি ছেরে দেয়, আর এখানে ড্রাইভার হয়ে আসে, সেই সমস্ত কথা বলে দেয়। … তাই ব্রিগেডিয়ার স্যার, এবার কি বলবেন!

ব্রিগেডিয়ার গতি চেঁচিয়ে উঠে বললেন – আমরা যা কিছু করেছি, সমস্তই গভমেন্টের অর্ডারে করেছি। তাই আমরা সম্পূর্ণ ভাবে নির্দোষ।

বাবা – হুম, গভমেন্ট আপনাদের কাশ্মীরের ওই তিন অঞ্চলের উপর চাপ আর ভয় বাড়াতে বলে, তাই আপনারা রেপ করে মার্ডার করে দিলেন। যদিও রেপ করাটা গভমেন্টের অর্ডার কখনোই ছিল না, তবুও তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, সেটা গভমেন্টের অর্ডার। মোর্চার মাথাকে হত্যা করার অর্ডার পেলেন আপনারা, তাই হত্যা করলেন। … এটাও ধরে নিলাম ঠিক আছে। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার সান্যালের হত্যা করার অর্ডার তো আপনারা পাননি। সেই খুনের দায় কে নেবে, মিস্টার গতি আর মিস্টার সিং! … সেই খুনের দায় গভমেন্টও আপনাদের থেকে নিতে রাজি হয়নি। আর তাই আপনাদের সেই গভমেন্ট, যার চামচাগিরি করে, কাশ্মীরে নোংরামো করে এসেছেন, সে-ই আপনাদের বলে যে, এই সান্যালের ফাইল যেন আর কনোদিনও না খোলে। কিন্তু মিসেস সান্যালের স্বামীর পদাঙ্ক অনুসরণ করা দেখে আপনারা ঘাবড়ে গেলেন আর তাঁর নিজের ছেলের হাতেই তাঁকে খুন করিয়ে, সেই মোর্চাদের উপরেই সেই দোষ চাপাতে গেলেন। এই অর্ডারও তো আপনাদের দেওয়া হয়নি মিস্টার গতি আর সিং। তাই, আপনাদেরকে ব্রিগেডিয়ার সান্যালের মত শহীদ দেশপ্রেমীর খুন করার অভিযোগে, এবং তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করার চেষ্টা করার অভিযোগে, অর্থাৎ দেশদ্রোহিতার অভিযোগে সারা ভারতবর্ষের মানুষের কাছে দেশদ্রোহিতার দায় স্বীকার করে, আর নিজেদের দেশপ্রেমের ট্যাগ ত্যাগ করে, জীবনের অবসান করতেই হবে যে।

বাবা একটু বিকৃত হাসি হেসে – ফাতিমা, তুমি আমার সাথে বেঙ্গলে চলো। সেখানে আমার চেনা প্রচুর খবরের কাগজের ওনার আছে। … তোমার সেই খবর, আর এখানে যা হচ্ছে, সেই খবর সম্পূর্ণ ভাবে তাঁরা ছাপবেন। বাংলা, না মুঘলকে ভয় পেয়েছে, না ব্রিটিশ পর্তুগিজকে, না আমেরিকা কে, আর না এই গভমেন্টকে। … আজও আমাদের শরীরের মধ্যে দিয়ে, বাঘাজতিন, ক্ষুদিরাম, সুভাসচন্দ্র, চিত্তরঞ্জন, বিনয়বাদলদিনেশ আর অরবিন্দ ঘোষের রক্ত বইছে। … চলো সেখানে চলো, আর তোমার খবর পাবলিশ করো। … সারা ভারতবর্ষের মানুষের জানার সময় হয়ে গেছে, কি কারণে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যেতে যায়। সকলের জানার সময় হয়েছে, কেন কাশ্মীরের সমস্যা কোনদিনও মিটছে না। … জানা উচিত সারা ভারতের সমস্ত মানুষের যে কাশ্মীরের মানুষ কিসের বিদ্রোহ করে, কি কারণে বিদ্রোহ করে। … এবার সকলের জানার সময় হয়ে গেছে। …চলো।

এবার অতনু আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে – দেখছো কি! এরেস্ট করো এই দুই দেশদ্রোহীকে। … ব্রিগেডিয়ারকে মোর্চাদের গুলি দিয়ে মেরে, উনাকে শহীদ প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু উনারা যে সেই শহীদ হওয়া দেশপ্রেমীর খুনি, অর্থাৎ দেশদ্রোহীর ট্যাগ নিয়েই বাকি জীবনটা বাঁচবেন। … এরেস্ট করো। …

মিস্টার গতি, আর মিস্টার সিং, এবার বাবার পায়ের সামনে বসে পরে বললেন – মিস্টার সিন, আপনার কথা আমরা অনেক পড়েছি আর শুনেছিলাম। তাই ভয়ও পেয়েছিলাম, আর তাই সুবীরকে বিলেছিলাম যাতে ও আপনাকে শেষ করে ফেলে। … স্যার, আমাদের অনুমানের থেকেও অনেক বেশি ভয়ানক আপনি। … প্লিজ আমাদের ছেড়ে দিন। … এই দেশদ্রোহী ট্যাগ নিয়ে আমরা বাঁচতে পারবো না। … প্লিজ, আমাদের ছেড়ে দিন। … হ্যাঁ, আমরা বুঝতে পেরেছি, প্রকৃত দেশপ্রেম কি। … ব্রিগেডিয়ার সান্যাল যে একজন অসামান্য দেশপ্রেমী, সেই ব্যাপারে আমাদের কনো সন্দেহ ছিলনা স্যার। … হ্যাঁ, আমরা উনার মত দেশপ্রেমী হতে পারিনি। এতটা সাহস দেখাতে পারিনি। গভমেন্টের চেলাই থেকে গেছি। গভমেন্টের আগে দেশমাতাকে কনোদিনও বসাতে পারিনি। … কিন্তু স্যার, আমরা এই দেশদ্রোহী ট্যাগ নিয়ে বাঁচতে পারবো না। … প্লিজ স্যার, আমাদের হয় ছেড়ে দিন, নয় মেরে দিন।

বাবা – বেশ, যান, এই বাড়িঘর সমস্ত কিছু ফেলে, এমনকি নিজেদের আইডিকার্ডও ফেলে, সমস্ত আইডেন্টিটি ছেড়ে, পালিয়ে যান, এখনই। এই মুহূর্তে। … যান, কনো চার্জ হবে না। কনো খবর পাবলিশ হবেনা, কিচ্ছু হবেনা, যদি আপনারা পালিয়ে যেতে পারেন সব ছেরেছুরে। … যান চলে যান।

বাবার কথা শুনে, মিস্টার সিং এবং গতি, একবস্ত্রে সেখান থেকে চলে যেতে থাকলেন। উনারা এই ৪-৫ মিটার যাবার পরে, সুবীর উগ্র হয়ে উঠে বললেন – না আমার বাবাকে মেরেছে, আমার মাকে আমার হাতে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। এতোগুলো রেপকে, গভমেন্টের অর্ডার বলে মেনে নিয়েছে। … না স্যার, আমাকে ওদেরই শেখানো স্নিপার রাইফেল দিয়ে ওদের খুন করতে দিন। আমি তারপর জেলে যাবো খুনের দায়, তাও ভালো। কিন্তু স্যার মারতে দিন আমাকে।

বাবা হেসে বললেন – ভেরিগুড সুবীর। … আমি তো এটা তোমার মুখ থেকে শুনবো বলেই, ওদের যেতে দিলাম। … তবে ভাই, তোমার স্নিপার দিয়ে মারলে তো হবেনা। … ওরা তোমার বাবাকে মোর্চার গুলি দিয়ে মেরেছিল, শহীদ প্রমাণ করতে। … এবার তুমি সিবিয়াই-এর গুলিদিয়ে ওদের মারবে, ওদের দেশদ্রোহী প্রমাণ করতে। … অতনু, ওকে তোমার বন্দুক দাও। ..

অতনু আঙ্কেল নিজের লোডেড বন্দুক সুবীরকে দিলে, কনো সময় নষ্ট না করে, তিনটি বুলেট সরাসরি মিস্টার গতির পায়ে, পিঠে আর মাথায় মারলেন। … সিং পিছন ঘুরে দেখতে গেলে, সুবীর উনার পায়ে, বুকে আর মাথায় গুলি মারলেন। … অতনু আঙ্কেল এরপর ব্রিগেডিয়ার গতির বন্দুক হাতে নিয়ে, নিজের হাতে একটা ফায়ার করলেন। না গুলি ঢোকালেন না, তবে বেশ গভীর ক্ষত করলেন। …

ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে উনার ট্রিটমেন্ট করলে, বাবা ফাতিমার দিকে তাকিয়ে বললেন – উনাদের মৃত্যু কি করে হয় ফাতিমা!

ফাতিমা – স্যার, ফেঁসে গেছেন জেনে পালিয়ে যেতে গেলে, পায়ে গুলি করা হয়। তারপর পাল্টা গুলি চালালে, গুলিবিদ্ধ করে দুই দেশদ্রোহীকে হত্যা করা হয়। …

বাবা – থ্যাঙ্ক ইউ। … চলো বেঙ্গলে গিয়ে, এই খবর ছাপা হবে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5