দেশপ্রেম | রহস্য গল্প

পরের দিন সকালে আমি নিজেই তাড়াতাড়ি উঠে পরলাম। বেশ আগ্রহ লাগছিল মিসেস সান্যালের কথা শোনার জন্য। ব্রিগেডিয়ার সান্যালের কথা শুনতে যেন খুব ইচ্ছা করছিল। তাই-ই হয়তো তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেল। লক্ষ্মী মেয়ের মত সেদিন নিজের স্নানটান ঠিক সময় মত করে নিয়ে, ৮তা ৪৫এই আমি আর মা রেডি। মাকেও আজ দেখলাম, একটু তাড়াতাড়ি করছেন। … আসলে সংসর্গের দোষগুণ সব। বাবার সংস্পর্শে থেকে এই সমস্ত উচ্চদার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এমনিই আমি আর মা এডিক্টেড হয়ে গেছিলাম। তারপরে আবার বিদিপ্তাদির আসার পরে, তো সেই সম্বন্ধে আর কিছু বলার প্রয়োজনই পড়েনা।

গাড়িতে যেতে যেতে বাবা বললেন – কালকে আপনার বক্তৃতা শুনে আমরা সকলে মুগ্ধ হয়ে গেছি ম্যডাম সান্যাল।

মিসেস সান্যাল – কথাগুলো সবই উনার। আমি তো কেবল কথক মাত্র।

বাবা হেসে বললেন – উনি বলেছেন। আপনিও তো এডপ্ট করেছেন। এডপ্ট করেছেন বলেই, যথার্থ ভাবে কথাগুলোকে পরিবেশন করে, সকলের মনের দরজা খুলে দিতে পারছেন। তাই না!

মিসেস সান্যাল – সুখ্যাতি শুনতে ইচ্ছা করে না আর জানো। … উনি ব্রিগেডিয়ার হিসাবে বা আর্মি জেনারাল হিসাবে যথেষ্ট সুখ্যাত অর্জন করেছেন, কিন্তু উনার এই উদার দৃষ্টিভঙ্গির জন্য উনি কনো সুখ্যাতই পেলেন না। … তাই সেই সুখ্যাত গ্রহণ করতে ইচ্ছা করেনা। আমার সেই কথা পরিবেশনে কনো প্রতিভা কাজ করছে কিনা, আমি জানিনা, আর সত্যি বলতে জানতেও চাই না। যখন কালকে হাততালি পরলো, তখন অন্তরমনে কেবলই উনার উদ্দেশ্যে বললাম, দেখো তোমার সুখ্যাত হচ্ছে। … এই সমস্ত হাততালি তোমার জন্য।

মা মাঝে বললেন – উনি আপনার হিরো ছিলেন তাই না!

মিসেস সান্যাল হেসে উত্তরে বললেন – তোমার কাছেও তো তোমার কর্তা হিরো, কি তাই না! … আসলে কি জানো তো, আমরা সকলেই হিরো খুঁজি আমাদের মনে মনে। ঠিকঠাক হিরো পাইনা, তাই বারেবারে হিরো পালটে যায়। আর একবার যদি ভাগ্যক্রমে পেয়ে যাই, মনে হয় জীবনটাই তাঁর জন্য বাঁচি। (হেসে) কি ঠিক তো?

মাকে আর উত্তর দিতে হলো না, আমরা এসেগেলাম সেই বিরাট বাড়ির সামনে । গাড়ি থেকে আমরা সকলে নেমে পরলাম। … সেই বড় হলঘরে চলে গেলাম সকলে। কালকের মতই ঘরে ঢোকার দরজাতেই সকলের হাতে একটা করে ব্রেকফাস্টের বক্স ধরিয়ে দেওয়া হলো। সেই বক্স নিয়ে, আমরা চারজন মিলে একটা সামনের দিকে টেবিল দখল করে, চারটে চেয়ার যোগ করে বসলাম। ব্রিগেডিয়ার সিং ও গতি সকালের একটা সম্ভাষণমার্কা বক্তৃতা দিয়ে, মিসেস সান্যালকে তাঁর কথা বলার জন্য স্টেজে ডাকলেন। এর মধ্যে আমাদের ব্রেকফাস্ট করাটাও হয়ে গেছে। টেবিলে টেবিলে, রেড ওয়াইন, চা আর কফি সার্ভ করা হচ্ছিল। আমি আর মা কফি নিলাম। বাবা আর বিদিপ্তাদি চা নিলেন। অন্যদিকে মিসেস পারমিতা সান্যাল তাঁর বক্তৃতা শুরু করলেন।

উনি বললেন – তোমরা সকলেই আমার ছোট ছোট ভাইবোন, দেশের ভবিষ্যৎ। তাই লেট ব্রিগেডিয়ার সুধীর সান্যাল এই দেশের ব্যাপারে কি কি বলেছিলেন, সেই সম্বন্ধে আজ তোমাদের বলি, শোনো তবে। উনি বলতেন, দেশপ্রেম কেন থাকা উচিত সেই ব্যাপারে। সেই উদ্দেশ্যে তিনি বলতেন, এই যে শরীর, কি দিয়ে তৈরি এটা? মাটি আর মাটির সাথে থাকা সমস্ত খনিজ থেকে। কি করে পাওয়া গেল এই শরীর? এই দেশের মাটির থেকেই এই শরীর নির্মিত। আমাদের এই শরীর নির্মাণ হয়েছে, আমাদের বাবার বীর্য থেকে, আমাদের মায়ের ডিম্ব থেকে, আর তাঁরা এই দুইই পেয়েছেন, এই মাটি থেকে, আর এই মাটির সমস্ত খনিজ মিলে যেই ফসল উৎপাদন করেছেন তার থেকে। … তাহলে এই শরীর কার কারণে পেয়েছি আমরা? এই দেশের কারণে।

তিনি আরো বলতেন, এই দেশের উপরে যেই আকাশ, সেই আকাশই আমাদের সমানে প্রাণবায়ু জুগিয়ে যাচ্ছে; এই দেশের যত নদী, তারাই আমাদের পিপাসা মিটিয়ে, আমাদের শরীরের যে ৭০ শতাংশ জল, তার পরিমাণকে অক্ষুণ্ণ রেখে যাচ্ছেন। তাই এই দেশ আমাদের মা আর বাবা দুটিই। যিনি সৃজন করার সামগ্রী প্রদান করেন, তিনি বাবা; আর যিনি সৃজন করেন তিনি মা। আর বাবামা উভয় মিলেই সৃজিতকে লালনপালন করতে থাকেন। এই দেশ নিজের মাটিকে সামগ্রীরূপে দান করে এই দেহ সৃজন হতে দিয়েছেন। আর এই দেহকে জল ও বায়ু দিয়ে, আর দাঁড়িয়ে থাকার ভূমি দিয়ে লালনপালন করে চলেছেন। তাই এই দেশ আমাদের মাবাবা দুইটিই।

কিন্তু এই কথার সাথে সাথে উনি হতাশাও প্রকাশ করতেন। উনি বলতেন, কিন্তু আমরা আমাদের বাপমায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমের প্রতিদান দিই না। … আমি প্রশ্ন করলে, উনি বলতেন, কোথায় দিই প্রতিদান! … তিনি বলতেন, একবার ভাবো, তোমার যিনি জন্মদাত্রী, তাঁর মাটির দেহ কেটে, তার থেকে সমস্ত খনিজ তুলে নিলে কেমন লাগতো? আমরা তো তাই করছি না! … যতটা আমাদের প্রয়োজন, তার থেকে অনেক অনেক বেশি কয়লা, ম্যাঙ্গানিজ, ইত্যাদি খনিজ তুলে নিয়ে, এই দেশকে যেমন শূন্য করে দিচ্ছি, তেমনই এর মাটির যেখানে যেখানে সোনা পাচ্ছি, আমরা তুলে নিচ্ছি।

উনি এই সূত্রে বলতেন, প্রকৃতির কনো কিছুই অহেতুক নয়। গ্রীষ্মের ভয়ানক গরম। কি তার গুরুত্ব? মাটির নিচের সমস্ত খনিজকে ব্যবহারিক অবস্থায় উন্নীত করার জন্যই এই গ্রীষ্মকাল। তিনি বলতেন, চাষিরা জানেন, সোনা, রুপা, ইত্যাদি মহামূল্যবান খনিজই হলো সুস্বাস্থের কারণ। শুধু চাষিই জানেন না এটা। উনি বলতেন, আরো অনেকে জানেন। আর জানেন বলেই চ্যবনপ্রাস ইত্যাদিতে সোনা রুপার জল দেওয়া হয়। … চাষিরা জানেন যে এই সোনা রুপা তাঁদের ফসলকে সেই পুষ্টি দেবে, যা সেই ফসলের খাদক অর্থাৎ আমরা দেশের মানুষেরা খেয়ে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে উঠবো। তাই, অনেক জায়গার চাষিরাই বুঝতে পারেন যে মাটির নিচে সোনা রয়েছে, তাই এত সুন্দর ফসল হচ্ছে। কিন্তু তারা সেই কথা কারুকে বলে না। কেন? কারণ তারা জানে, সোনা আছে জানলেই, হামরে পরে, সমস্ত সোনা হাতিয়ে নেওয়া হবে, আর আমাদের এই দেশের মাটিকে, দেশের শরীরকে নগ্ন করে দেওয়া হবে। তাই বলেন না।

উনি এই সমস্ত কথা বলে বলতেন, কোনটা সেবা? কোনটা দেশের সেবা! এই সমস্ত সোনা তুলে নিয়ে, অহেতুক খনিজকে উত্তোলন করে বিদেশে বিক্রি করাটা, নাকি এই সমস্ত কিছুকে যথার্থ ভাবে মাটিতে রেখে দিয়েই, মাটিকে উর্বর হতে দিয়ে, দেশের সমস্ত মানুষকে একটি উজ্জ্বল সুস্বাস্থ উপহার দেওয়াটা! …

আরো বলতেন উনি। উনি বলতেন, এই এতো নদী আমাদের সমস্ত সময়ে জল দিয়ে যাচ্ছে। … আমরা কি আমাদের জননীর জলধারার উপর বাঁধ দিয়ে দিই? না… কিন্তু দেশমাতার উপরে নিশ্চয়ই দিই। … উনি বলতেন, তুমি বলবে চাষিদের সুবিধার জন্য এইসমস্ত কিছু। ইরিগেশনের প্রয়োজন না! গঙ্গা থেকে যমুনার, যমুনা থেকে নর্মদার, নর্মদা থেকে গঙ্গা, নর্মদা থেকে কৃষ্ণা, কৃষ্ণা থেকে গদাভরি পরিখা করা যেত না! … চাষি নিজের জমিতে জল দেয়। বাঁধ করে জল দেয়? না, পরিখা কেটে জমিতে জল আনে। ওরা ভূমির সাথে থাকে। ভূমিকে ভালোবাসে। তাই ওরা বাঁধ দেয়না, ওরা খাল কাটে। তারা কিন্তু একবারও দাবি করেন না যে তাঁরা দেশপ্রেমী। আর আমরা, যারা নিজদের দেশপ্রেমী বলে সর্বক্ষণ দাবি করে থাকি, তারা কি করি? নিজেদের মায়ের জলধারাকে আমরা বাধিত করে দিই। এটাই কি দেশপ্রেম!

তিনি আরো বলতেন, যেই আকাশ আমাদেরকে প্রাণবায়ু প্রদান করে জীবিত রাখে, আমরা সেই আকাশকেই দিনরাত্রি চিড়তে পছন্দ করি। … যেখানে আমার দেশে প্লেনে যাত্রা করার লোকের সংখ্যার থেকে ট্রেনে যাত্রা করা লোকের সংখ্যা প্রায় একশ গুণ বেশি, সেখানে একটা শহর থেকে অন্য শহরে দিনে প্লেনও যাচ্ছে ৪টি, আর ট্রেনও যাচ্ছে ৪টি। … আর সেই বিলাসিতা প্রশ্রয়দানকারিদের না ছেড়েই দিলাম, দেশের মানুষকে পরিসেবা দিতে একটা স্যাটেলাইট ছাড়া হলো, ঠিক আছে মানা যায়, কিন্তু চন্দ্রযান, মঙ্গলযান কি কারণে? … কেন এত বিষাক্ত গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে, ছোট ফ্যাক্টরি আর ছোট ছোট গাড়িদের পরিবেশদূষণের দোষারোপ করা! …

উনি বলতেন, কি পেলাম আমরা একটা চন্দ্রজান পাঠিয়ে? কি যোগ হলো আমাদের জিডিপিতে এই চন্দ্রজানের জন্য! … চন্দ্র থেকে প্রচুর খনিজ নিয়ে এলাম আমরা! … না প্রচুর পেট্রোল ডিজেল নিয়ে এসে দেশের ডিজেল পেট্রলের সঙ্কটকে নষ্ট করে দিলাম! … কি কারণে এতো হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে, কিছু পুঁজিপতি দেশের সাথে ইঁদুর দৌরে নেমে দেখানো যে আমরা কারুর থেকে কম নই! বেশ, সব করলাম আমরা, কিন্তু যেই আকাশ আমাদের সেবা করে চলেছে, সেই আকাশের বুক চিড়ে এই অপচয় করা কি দেশপ্রেম! … নিজের মায়ের ছাতিটা এইভাবে চিড়ে দিতে পারবে, যারা এই রকেট ছোড়াকে দেশপ্রেম বলেন! … যদি না পারেন, তারমানে ওরা কি খালি দেশমাতাকেই প্রেম করেন, নিজের জন্মদাত্রীকে প্রেম করেন না!

উনি বিরক্ত হয়ে বলতেন এই বিষয়ে যে, যদি দেশমাতার মাটি খুবলে নিয়ে সমস্ত খনিজ বার করে নিয়ে তা অন্যত্র গচ্ছিত করা বা বিক্রয় করা দেশমাতাকে প্রেম করা হয়, তবে হয় তাঁরা নিজের জন্মদাত্রীর মাংস কেটে বিক্রি করুন, নয় তাঁরা বলুন যে তাঁরাতাঁদের জন্মদাত্রী মাতাকে প্রেম করেন না, তাই তাঁর মাংস খোবলান না, দেশমাতাকে প্রেম করেন, তাই তাঁর মাংস খোবলান। যদি নিজের জন্মদাত্রী মায়ের শ্বাসরোধ করে, ছাতি চিড়ে না দেন, কিন্তু দেশমাতার আকাশ চিড়ে রকেট ক্ষেপণ করাকে দেশপ্রেম বলেন, তাঁরা তাহলে বলে দিন তাঁরা তাঁদের জন্মদাত্রী মাকে স্নেহ করেন না। কেবল মাত্র দেশমাতাকেই স্নেহ করেন, তাই তাঁরই ছাতি চিড়ে দেন।

সামান্য হেসে মিসেস সান্যাল বললেন – এই ছিল উনার দেশপ্রেমের ভাষা। উনি বলতেন দেশপ্রেম সকলে করেন; তাঁরা তাঁরা করেন যারা নিজের জন্মদাত্রী আর দেশমাতার মধ্যে কনো ভেদ করেন না, তাঁরা সকলেই দেশপ্রেমী। আর যারা নিজেদের উপর দেশপ্রেমের ট্যাগ লাগিয়ে নিয়ে, যা যা নিজের জন্মদাত্রী মায়ের সাথে করেন না, তাই তাই দেশমাতার সাথে করে, দেশবাসির সেবা করার অঙ্গিকার করে, তাঁরা কি সত্যই দেশপ্রেমী!

মিসেস সান্যাল সকলের উদ্দেশ্যে হেসে – উত্তর আপনারা দেবেন। ড্যাম না করে, খাল কেটে, সেই খালে ক্যাথোড এনোড লাগিয়ে প্রকৃতির গতিকে কনো ভাবে ক্ষুণ্ণ না করে, যখন বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে তোমরা, সেটাই দেশপ্রেম, কারণ সেই কাজে তোমরা যেমন দেশের মানুষকে বিদ্যুৎ দেবার সেবা করলে, তেমন দেশমাতার সাম্যতাকে ধরে রাখার সেবাও করলে।… বিপুল নদীমাত্রিক আমাদের এই দেশের জলধারাদের মধ্যে ক্যাথোড এনোড ব্যবহার করে বিপুল মেগাওয়াট ইলেকট্রিক উৎপাদন করে তাক লাগিয়ে দিয়ে, যখন সমস্ত যানবাহনকে এলেক্ট্রিকে চালিত করে দিয়ে, প্লেনের সংখ্যা কমিয়ে, ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে, জনসেবা করতে পারবে, সেটিই হবে প্রকৃত দেশপ্রেম।

মানুষের প্রয়োজন মেটানোটাই শুধু দেশপ্রেম নয়। এই দেশের মানুষ তো দীর্ঘকাল বিদ্যুৎ ছাড়াই দিন কাটিয়েছে, সুখে দিন কাটিয়েছে। … আজ যে বিদ্যুতের প্রয়োজন তাঁদের পরছে, সেই প্রয়োজনের রচয়িতা কারা! … মানুষের প্রয়োজনকে সীমিত রেখে, দেশের আকাশ, জল, আর মাটির সাম্যতা ধরে রাখার কাজ করবে সেটিই, সেটিই দেশপ্রেম। … তাই তোমাদের সকলের আদর্শ, লেট ব্রিগেডিয়ার সুধীর সান্যালের কথা অনুসরণ করেই বলছি, প্রকৃত দেশপ্রেমী হয়ে ওঠো। … শুধুই দেশপ্রেমীর ট্যাগ নিজের সাথে যুক্ত করার জন্য অন্ধের মত ছুটোনা; প্রকৃত দেশপ্রেমী হয়ে, দেশমাতার প্রিয় সন্তান হয়ে ওঠো। আর কিছু বলার নেই আমার। … কারুর কনো প্রশ্ন থাকলে আমাকে করতে পারো।

জমা হওয়া সমস্ত ছেলেমেয়ে উন্মুক্ত উৎসাহের সাথে করতালি দিলেন ম্যাডাম সান্যালের উদ্দেশ্যে। বাবাও খুব আনন্দিত ও উৎসাহী দেখলাম। কিন্তু বাবার মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম, আর দেখলাম বাবার মুখের ভাব পালটে যাচ্ছে। … তার পরমুহূর্তেই দেখলাম, বাবা স্টেজে ধড়ফড় করে উঠে পরলেন, আর খানিক পরে, মিসেস সান্যালের মাথা নামিয়ে নিয়ে, নিজের মাথাও নামিয়ে নিলেন। একটা ফায়ারের শব্দ। … ডাইসের পিছন দিকে যেই সিল্কজাতিয় চাদর ছিল, তাতে একটা ছিদ্র, আর সেই ছিদ্র থেকে ধুয়া বার হতে থাকলো।

কেউ গুলি চালালেন মিসেস সান্যালকে হত্যা করার জন্য। … লেজার লাইট পরেছিল উনার কপালে, বাবার থেকে পরে জেনেছিলাম। অর্থাৎ কেউ স্নিপার রাইফেল ব্যবহার করে, মিসেস সান্যালকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেন? কে সেই আততায়ী! … সমস্ত ঘরে হইচই লেগে গেল। সেদিনের মত সভা ভেঙে দেওয়া হলো। আর পরে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, দুইদিন সভা বন্ধ থাকবে।

ঘুরতে এসে, এমন রহস্য আমার সত্যিই ভালোলাগছিল না। ভেবেছিলাম, মাকে এই ব্যাপারে সঙ্গে পাবো, আর তা পেলে, বাবাকে এই রহস্যের থেকে দূরে রাখতে পারবো। কিন্তু মায়ের অন্যরূপ আজ। মা নিজে বাবাকে বললেন – তুমি এখানে থাকতে, মিসেস সান্যালের কিচ্ছু হতে পারে না। … উনার মতন একজন মহিলা, যিনি একটা নতুন ধারার হিল্লোল তুলে দিলেন কিছু যুবাযুবতির মধ্যে, তাঁর কিচ্ছু হতে পারেনা, তুমি থাকতে। … খুঁজে বার করো, কে উনাকে মারার চেষ্টা করেছিলেন। … আমরা তো এখানেই ৫ তারিখ পর্যন্ত আছি। আজ তো সবে ২৯ তারিক। তুমি খুঁজে বার করো তাকে।

বাবা গম্ভীর হয়ে বললেন – হুম করবো, তবে চুপচাপ। কারুকে বলতে যাবেনা আমি তদন্ত করছি। … জানবে এখানে সব এক্স-ব্রিগেডিয়ার। উনারা যদি জানতে পারি আমি তদন্ত করছি, আততায়ীকে ছেড়ে, ওরা হাতধুয়ে আমার পিছনেই লেগে যাবে। … তাই কেউ জানবে না যে আমি তদন্ত করছি। … পুরপুরি চেপে যাও ব্যাপারটা। আমি দেখছি।

মায়ের এই মূর্তি দেখে আমি একটু লজ্জাই পেয়ে গেলাম। সর্বক্ষণ আমি বাবাকে এসিস্ট করি। আমার মনে বিরক্তি এলো। আর মা তো বাবার সঙ্গই পান না। এই বেড়াতে এসে সঙ্গ পেয়েছিলেন। উনি নিজে এই কেসের তদন্ত করতে বলছেন। মিসেস সান্যালের মত একজন ব্যক্তিত্বের সুরক্ষাকে উনি নিজের ঘোরাবেরনোর থেকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারলেন, আর আমি পারলাম না এই সিদ্ধান্ত নিতে!

কারুকে সেই ব্যাপারে কিছু বলিনি। কোন মুখেই বা বলতাম! কিন্তু মনে মনে নিজের আচরণে নিজেই আঘাত পাচ্ছিলাম। বিদিপ্তাদি কাছে এসে বললেন – মা তোর দিদিভাই। … বড় হয়েছিস কিন্তু মায়ের থেকেও বড় হয়ে গেছিস!

কথাটা শুনে প্রথমে একটা মেকি হাসি দিলাম। তারপর মন থেকে একটা হাসি দিলাম। আর তারপরে বাবার সাথে সাথে মায়ের জন্যও গর্ব বোধ করে, একটা আনন্দের হাসি দিলাম। দিদি বোধ হয় এই তিননম্বর হাসির অপেক্ষা করছিলেন। তাই সেই হাসি দেখে তবেই সেখান থেকে গেলেন।

মা আর আমি বাবার পরামর্শেই মিসেস সান্যালের কাছে গেলাম, উনাকে সান্ত্বনা আর ভরসা দিতে। অন্যদিকে বাবা আর দিদি চলে গেলেন সেনসোর ব্রিজের দিকে, একটু চা খেয়ে আসতে। মিসেস সান্যালকে মা সান্ত্বনা দিতে গেলে, মিসেস সান্যাল বললেন – আমার কি করে কনো শত্রু থাকতে পারে! আমি তো কনো এক্টিভিস্টও নই। সামান্য গৃহবধূই ছিলাম বরাবর। আমার স্বামীর দেহাবসানের পর থেকে, তাঁর সমস্ত কথা আমার স্মৃতিতে ঘোরাফেরা করতে করতে, তাঁর সমস্ত কথার অর্থ উদ্ধার করতে পারছিলাম মাত্র। … আমার শত্রু!

মা বললেন – আপনার ছেলে মনে হয় এখানে নেই, তাই না!

মিসেস সান্যাল – না ও তো ওর ব্যবসা সেটআপের জন্য জব্বলপুর গেছে। ওকে কিছু জানাতে চাইছিনা। জানলে বড্ড টেনশন করবে। … আচ্ছা মিসেস সিন, বিজয় এখানে রয়েছে, আমার ছেলে এখানে ৪ তারিখের মধ্যে ফিরে আসবে। আজ ২৯ তারিখ, সময় আছে। ছেলে আসার আগে বিজয় যদি ঘটনার তদন্ত করে ফেলে, খুব ভালো হয়।

মা – আসলে আমিও উনাকে বলেছিলাম কথাটা। উনি বললেন, আর্মির লোকরা সাধারণ তদন্তকারি এমনকি পুলিশ ইত্যাদিকেও গুরুত্ব দেয়না। তাই আমাকে ব্রিগেডিয়ার রা তদন্ত আগিয়ে নিয়ে যেতে দেবে না!

মিসেস সান্যাল খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন – আমি যদি বিজয়কে এপয়েন্ট করি, তাহলে তো কারুর কিছু বলার থাকতে পারেনা। হ্যাঁ, কো-অপারেট করবে না, আমিও জানি; কিন্তু আমি এপয়েন্ট করলে, ওকে আটকাতেও পারবে না। … আর আমি বিজয়ের সম্বন্ধে যেটুকু জানি, ও তার মধ্যেই নিজের তদন্ত করে নিতে পারবে। … ওর উপর আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে।

মাও সেই কথা জানেন। কিন্তু যেন এই এপয়েন্ট করার কথাটা মা মিসেস সান্যালকে দিয়ে বলাতে চাইছিলেন। আমার মায়ের বুদ্ধিও কম নয় কনো অংশে। সূক্ষ্মবুদ্ধিতে উনিও অসাধারণ। এই কথাটা বাবা বলেছিলেন আমাকে। উনি বলেছিলেন, যদি কখনো পরিস্থিতি সহায়ক হয়, তবেই তোর মায়ের সাহস আর বুদ্ধির পরিচয় পাবি; গৃহবধূরা নিজেদের এইসকল গুণ লুকিয়ে রাখতেই পছন্দ করেন। সাহস তো এখনো দেখতে পাই নি, তবে হ্যাঁ বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে গেলাম।

আমি আর মা, আমাদের করনিয় যা কিছু ছিল, তা করে নিজেদের ঘরে ফিরে এলাম। বাবা আর দিদি বেড়িয়েছেন, তা প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে। এখনো ফেরেননি উনারা। আমি সেই চিন্তায় পায়চারি করতে থাকলাম আমাদের বড় ঘরটাতে। মা অনেকক্ষণ আমাকে পায়চারি করতে দেখলেন, তারপর বললেন – কি হচ্ছে কি মিলি! একজায়াগায় চুপ করে বোস।

আমি – চা খেতে এতক্ষণ সময় লাগে কারুর!

মা – এত কেসে বাবার সাথে ঘুরছিস, এখনো তোর বাবাকে চিনলি না, কি হবে বলতো তোর!

আমি ভ্রু কুঁচকে মায়ের দিকে সন্দিহান নেত্রে তাকালে, মা বললেন – কলেজে পরিস তো!

আমি – হ্যাঁ, হঠাৎ!

মা – যখন আচমকা কনো টিচার ক্লাসের ছুটি দিয়ে দেন, কি করে ছাত্ররা?

আমি – ক্যান্টিনে ভিড় করে। চা কফি খায়।

মা – আর কিছু কি বলতে হবে?

আমি – বুঝতে পারলাম না! … আচ্ছা, তুমি বলছো, এই আচমকা ছুটি পেয়ে সকলে  চা খেতে চলে এসেছে; আর বাবা সেই কারণেই চা খাবার জন্য বেড়িয়ে গেলেন যাতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়! …

মা – যাক বুঝলি তাহলে!

আমি – কিন্তু এইসবের কি দরকার ছিল! ব্রিগেডিয়ারের ঘরে গেলেই তো, সকলকে একসঙ্গে পাওয়া হয়ে যেত!

মা – পরাধীন মানুষের বক্তব্য, আর স্বাধীন মানুষের বক্তব্যে পার্থক্য থাকে তো, না কি! … ব্রিগেডিয়ারের বাড়িতে, ব্রিগেডিয়ারদের নিয়মে বাঁধা ওরা। আর বাইরে চা খেতে আসলে, সম্পূর্ণ স্বাধীন। … তুই একটা কাজ কর মিলি, এবার থেকে বাবার সাথে কেসে আর যাসনা।… না, বুঝতে পারছি, তোর বাবার মাথা খাস তুই। কিচ্ছু বুঝতে পারিস না, আর বাবাকে প্রশ্ন করে করে, উনাকে বিরক্ত করিস।

আমি মায়ের কাছে বসে বললাম – না, আমি প্রশ্ন করি না। … মানে প্রশ্ন করে কনো লাভ হয়না। বাবা কিচ্ছু উত্তর দেন না। … কিন্তু আমি সত্যি কিচ্ছু বুঝিনা।

মা – বোঝার জিনিস হলে তবে তো বুঝবি। … বুঝতে কি হয় মিলি! … একটা বইয়ের একটি লাইন, একটি প্যারাগ্রাফ কি বলছে, সেটা বোঝার জিনিস। কিন্তু পুরো বই কি বলছে, সেটা তো বোঝার জিনিসই নয়। সম্পূর্ণ বইয়ের মর্মার্থ উপলব্ধির বিষয়, অনুভবের বিষয়। … মিলি বাবু, বুঝতে হয় মাথা দিয়ে, যা ব্যবহার করে লোকে ইঞ্জিনিয়ার হন, হিস্টরিয়ান হন, আইএএস হন, আইপিএস হন, এমনকি প্রচুর পয়সাপিশাচ ডাক্তারও হন। কিন্তু অনুভব করতে হয় হৃদয় আর আত্মা দিয়ে। … যারা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন তাঁরা বিশ্ববরেণ্য ডাক্তার হন, শত শত বছর মানুষের কাছে আদর্শ হয়ে থাকা বৈজ্ঞানিক হন, দার্শনিক হন, লেখক বা কবি হন। … আর যারা আত্মা দিয়ে অনুভব করার সামর্থ্য ধরেন, তাঁরা হন ঋষি। … বাবু, বুদ্ধি কম খাটা, আর অনুভব বেশি করার চেষ্টা কর। বুদ্ধি খাটিয়ে কেবল ধন উপার্জন করা যায়, এর থেকে বেশি কিছু করা যায়না। বাবাকে দেখে শেখ। যা সকলের দৃষ্টির অগোচরে, আততায়ীর বুদ্ধি আর মনের অন্তরের কথাকে উনি টেনে বার করে আনেন। কি করে? বুদ্ধির জোরে!  বুদ্ধির এত ক্ষমতা আছে? দুর্বল গতি সম্পন্ন বুদ্ধির ক্ষমতা কতখানি! … অনুভব শক্তির মাধ্যমে বাবা করেন এইসব। শেখ মিলি শেখ। এখনো যদি না শিখিস আর কবে শিখবি!

আমি – কিন্তু সারা পৃথিবীতো বুদ্ধির জয়গান গেয়ে যাচ্ছে!

মা – সেটাই তো স্বাভাবিক। … মিলি, যার প্রভাবে এসে আমরা অবান্তর স্বপ্ন দেখতে পারি, তাকেই তো আমরা সাধারণতো হিরো মনে করি তাই না! … বুদ্ধিই যে অবান্তর স্বপ্ন দেখে। দ্যাখ বুদ্ধি কি স্বপ্ন দেখে চলেছে! … মঙ্গলে গিয়ে বসবাস করবে, স্পেসে হাঁটবে। যারা এই ছলনাকে ছলনা বলে জেনে, সেই ছলের সাথে হাত মিলিয়েছে, তারা সুরক্ষিত। কিন্তু যখনই কেউ বুদ্ধির এই নোংরামো কে নোংরামো বলে না বুঝে, স্বপ্নকেই সত্যি মেনে নিয়েছে, কি হয়েছে! কল্পনা চাওলার মত স্পেসে পা রাখা মাত্রই ধ্বংস হয়ে গেছে। … কি যায়নি!

আমি কিছু বলতে গেলাম, কিন্তু মা একটা ফ্লোতে ছিলেন। তাই চেপে গেলাম। মা বলতে থাকলেন – আসলে কি বলতো, আমরা ভারতীয়রা কমবেশি সকলে মিথ্যে কথা বলি। … শীতকালে স্নান করিনি। সামান্য গায়ে জল ছিটিয়ে, বাথরুম জলে পরিপূর্ণ করে, বাইরে এসে মাকে বলি, স্নান হয়ে গেছে। … এই সামান্য মিথ্যেকে আমরা ভারতীয়রা মিথ্যে মনেই করিনা। … কিন্তু আমরা না বড় মিথ্যে বলতে পারিনা। … ভাবতেও পারিনা এমন মিথ্যে বলার কথা, বা এমন মিথ্যে কেউ বলতে পারে, সেটা মেনে নেবার কথা। (ঈষৎ হেসে) কল্পনা চাওলাও বুঝতে পারেন নি, স্পেস মিশনের আড়ালে থাকা ভয়ানক মিথ্যাচারকে। ধরে নিয়েছিলেন, সত্যিই মানুষ স্পেসওয়াক করছেন। … আর সেই মিথ্যেকে মিথ্যে বলে মানতে না পারার ফল কি হলো? অঘোরে প্রাণ দিতে হলো।… বর্তমান বিজ্ঞান যা বুঝিয়েছে, সে তাই বুঝেছে, কিন্তু এই সহজ কথা ওর মাথায় ঢুকল না যে, যেই মাটি দিয়ে এই শরীর তৈরি, সেই শরীর ততক্ষণই টিকে থাকতে পারে, যতক্ষণ এটা মাটির সাথে সংযুক্ত থাকে।

নিজের মনেই সামান্য হেসে মা আবার বললেন – বর্তমান বিজ্ঞান যে তাঁকে পঞ্চভূতের বিদ্যা দিতেই পারেনি। তাই সে বুঝতেও পারলো না যে, যেই প্রাণবায়ুর কারণে আমরা দেহে অবস্থান করতে পারছি নিশ্চিন্তে, সেই প্রাণবায়ুর উৎস কেবল অক্সিজেন নয়, তার উৎস এই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। তাই যেই মুহূর্তে এই বায়ুমণ্ডলের সাথে তার সম্পর্ক নষ্ট হবে, সেই মুহূর্তে, তাঁর দেহধারণ অসম্ভব হয়ে যাবে। … আর কেন বোঝেনি জানিস! … কারণ সে জীবনকে বুঝতে গেছিল। তোদের আজকের বিজ্ঞান তো এই বোঝার কথাই বলে, অনুভবের কথা তো বলেই না। আর বলবেই বা কি করে, সে নিজে অনুভব করবে, তবেই না অনুভব করার কথা বলতে পারবে! … আর সেই অনুভব না থাকার জন্য কল্পনা চাওলাকে মরতে হলো। … মিলি, বাবার সাথে সর্বক্ষণ থেকেও তুই একটি জিনিস বুঝলি না যে, তোর বাবা বুদ্ধির জোরে একটিও কেস শলভ করেন না। উনার প্রখর অনুভবশক্তির কারনেই উনি আজ মিস্টার সিন।

আমি মায়ের দিকে অবাক দৃষ্টিতে দেখছিলাম। বাবা দিনরাত আমাকে বলেন, তোর মা একজন মহীয়সী। আমি শুনতাম, কিন্তু মনে মনে বলতাম, নিজের স্ত্রী, তাই এমন বলেন বাবা। কিন্তু আজ যেন ভুত দেখার মত মাকে দেখলাম। আমার মা যে এমন বিদুষী, আমি জানতামও না। … মা আবার একটু চুপ করে থেকে বললেন – আচ্ছা আমাকে একটা কথা বল মিলি। তোর বিদিপ্তাদিদি তো সামাজিক ভাবে একজন খুনি। ঠিক তো?

আমি – হ্যাঁ।

মা – তারপরেও তোর বাবা, তাঁকে আইনের হাতে তুলে দিলেননা, আর তাঁকে নিজের কাছে রেখে, নিজের আরাধ্যার সমান স্নেহ করেন। কেন বলতে পারিস? এমনটা উনি কেন করেন?

আমি – উনি খুবই ভালো। আসলে পরিস্থিতির কারণে … না বুঝতে পারছিনা মা। … মানে আমি আসল কারণটা ধারনা করতে পারছিনা। যা বলছি, সেগুলো উনার খুন করার বাধ্যতা সম্বন্ধে বলছি।

মা – ঠিক বলেছিস, আসল কারণটা তুই এখনও উপলব্ধি করতেও পারিস নি। … আর আসল কারণ এই যে, তোর বাবা মন দিয়ে অনুভব করেন, আর কিছু কিছু সময়ে আত্মা দিয়েও অনুভব করেন, বিশেষ করে যখন ভারতমাতা বা বঙ্গমাতার কথা স্মরণ করেন। … কিন্তু তোর বিদিপ্তাদি, আমার দিদিভাই, না তো মন দিয়ে, আর না আত্মা দিয়ে কিছু অনুভব করেন। উনি অনুভব করেন চেতনা দিয়ে, যা সত্যি করে বলতে গেলে ঋষিদেরও পক্ষে করা অসম্ভব। … তাহলে দিদিভাই কেন করতে পারেন? কারণ তিনি ও তাঁর গুরুভগিনীরা এক পূর্ণঅবতারের ধারায় শিক্ষিত। … ঋষিরা চেতনার দ্বারা অনুভব করতে অপারগ। সেটা করার সামর্থ্য একমাত্র অবতারের থাকে। আর দিদিভাই-এর গুরু হলেন সেই অবতারের কন্যা, যিনি সেই অবতারের ধারাকেই ধারণ করে শিক্ষা প্রদান করেছেন। তাই দিদিভাই তোর বাবার কাছে আরাধ্যার সমান, কারণ তিনি চেতনার মাধ্যমে উপলব্ধি করেন।

আমি – তুমি তো মা বেশি প্রশ্ন করো না। বাবাও এত বিস্তারে কনো কিছু বলেন না। তবে তুমি এইসব জানলে কি করে?

মা – নীরব দর্শক হয়ে। হ্যাঁ তোর বাবাই আমাকে শিখিয়েছেন। উনিই শিখিয়েছেন, বুদ্ধির ব্যবহার হলো সামনে যা হচ্ছে, তার সমানে বিশ্লেষণ করতে থাকায়। আর অনুভব করতে হলে, নিরপেক্ষ দৃষ্টিদিয়ে সমস্ত কিছু দেখে যাও। ঠিক সময়ে যা কিছু দেখেছো, তার সার তোমার সামনে উপস্থিত হয়ে যাবে। … মিলি, বিশ্লেষণ আমরা কি দিয়ে করি! আমরা যেটুকুকে সত্য বলে মানি, তাই দিয়েই করি। তাই সামান্য কিছুই গ্রহণ করি একটা সম্পূর্ণ ঘটনা থেকে। আর বিশ্লেষণ না করলে, যখন উচিত সময়ে নিজে নিজে এই বিচার হতে থাকে, তখন সম্পূর্ণ সত্য তোর সামনে এসে উপস্থিত হয়ে যায়।

আমি – তারমানে বিশ্লেষণ করবো না! … হ্যাঁ বাবাকেও দেখেছি। আমি অনেক গোয়েন্দা গল্প পরেছি। সেখানে গোয়েন্দাকে দেখেছি বিশ্লেষণ করতে, চুলছেরা বিশ্লেষণ করতে; কিন্তু বাবা কনো বিশ্লেষণ করেন না। একের পর এক জিনিস উলটেপালটে দেখতে থাকেন, আর আচমকা সঠিক ঘটনা, যা সকলের চোখের আড়ালে ঘটেছে, তা বাবার দৃষ্টির সামনে এসে যায় যেন!

মা – হ্যাঁ, তোর বাবা বিশ্লেষণ করেন না, বিচার করেন। আর সেই কারনেই এই সকলের অসাধ্য কেসগুলো অতি সহজেই শলভ করে দেন।

আমি – কিন্তু এই বিচার কি করে করেন উনি!

মা – বিচার করা যায়না মিলি; বিচার হয়ে যায়। আর সেই বিচার যাতে হতে পারে, তারজন্য প্রয়োজন প্রচুর প্রচুর তথ্য আর বিদ্যা। … যখন তোর মনের মধ্যে অজস্র তথ্য আর সেই তথ্যদের মধ্যে সম্বন্ধ অর্থাৎ বিদ্যা একত্রিত হয়ে যায়, তখন আপনা আপনিই বিচার হয়ে যায়।… দেখনা, একটা চাল আর একটা ডাল, একসঙ্গে কড়ায় চাপিয়ে সেই সমস্ত কিছু কর, যা খিচুরি করার ক্ষেত্রে করিস। কি দেখবি, চাল আর ডাল আলাদা আলাদাই হয়ে আছে। … যখন একবাটি চাল আর একবাটি ডাল নিবি, তখন কি দেখবি, খিচুরি হয়ে গেছে। … তাই মিলি নীরব দর্শক হয়ে, সমস্ত তথ্য, সমস্ত বিদ্যা গ্রহণ করতে থাক। যখন স্টিম ঠিকঠিক অবস্থায় পৌঁছে যাবে, তখন ঠিকই খিচুরি হয়ে যাবে। তোর বাবা, ঠিক এটাই করেন।

আমি এবার মায়ের গলাটাকে পিছন থেকে জরিয়ে ধরে বললাম – বাবা ঠিকই বলেন, তুই তোর মাকে চিনিসই না। তিনি সারা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম মহয়সি নারী। … আজ পরিচয় পেলাম তার। … তুমি এত খুলে কথাই বলো না কখনো।

মা হেসে বললেন – ধুত পাগল মেয়ে। আমি যা কিছু, তার কারিগর তো তোর বাবাই। … তিনিই তো আমাকে এইভাবে তৈরি করেছেন। … জানিস, তুই যখনও হস নি, তখন তোর বাবা দিনরাত আমাকে বিভিন্ন জিনিস শেখাতেন, আর কি বলতেন জানিস! … বলতেন, সন্তানের প্রথম গুরু হলেন মা। … তাই মাকে সেই অবস্থায় উন্নীত হতে হবে, যার ফলে সন্তান হবে কল্পনামুক্ত, কামনামুক্ত, আর সমস্ত বিকারমুক্ত। …

কথাটা বলে মা একটু হাসলেন নিজের খেয়ালে। আমি মায়ের গলা জরিয়েই বললাম – আচ্ছা মা, দিদিকে বাবা নিয়ে গেলেন, আর আমাকে নিয়ে গেলেন না। এদিকে আমাকে তোমার সাথে মিসেস সান্যালের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এর পিছনে রহস্যটা কি বলোতো!

মা – দিদিভাই চেতনার প্রকাশদ্বারা অনুভব করেন। আর চেতনার কাছে না, শোকতাপ, ভয় চিন্তা, এসব কিচ্ছুই কিচ্ছু নয়। সম্পূর্ণ ভাবে বিকারমুক্ত, সম্পূর্ণ ভাবে সমস্ত ভ্রমের থেকে মুক্ত পরমেশ্বর হলেন চেতনা। সম্পূর্ণ বৈরাগী হলেন চেতনা। তাই কারুকে সান্ত্বনা দেওয়া একজন চেতনাজাগ্রত মানুষের কাছে নিছকই একটা অভিনয়; বাস্তবে তিনি কনো সান্ত্বনা কারুকে দেনই না, কারণ সান্ত্বনা দেবার প্রয়োজনই মনে করেননা উনি। উনি তো জানেন, যা নিয়তিতে লিখিত, তাই হবে। আমরা কেবলই নিজেদের নিয়তিকে নিজেরা জানিনা বলে, নিজেদের কর্তা জ্ঞান করি, বা সাফারার মনে করি, যেটা সম্পূর্ণ ভাবেই একটা ভ্রম। … তাই উনি দিদিভাইকে এই সান্ত্বনার কাজে পাঠালেন না।

মা একটু থেমে আবার বললেন – কিন্তু অন্যদিকে, যাদের জেরা করছেন এখন তোর বাবা, তারা সকলেই তথ্য আর সত্য গোপন করবে। এমনও কিছু সত্য গোপন করবে তারা, যা তোর বাবাও অনুভব করতে পারবেন না। কিন্তু চেতনার দ্বারা চালিত, দিদিভাইয়ের চোখ এড়িয়ে জাওয়া যে অসম্ভব। তাই দিদিভাইকে উনি সেখানে নিয়ে গেলেন।

আমি – মাথা না চালিয়েই এরকম করা যায়!

মা – মাথা না চালালেই এরকম করা যায়। মাথা চালালে কেবলই ভয়, শঙ্কা, ধূর্তামি, ধোঁকাবাজি, সুবিধাবাদী মনোভাব সামনে আসে; তাছাড়া কিছুই আসেনা। মনে আছে, ফেলুদাকে যখন জটায়ু প্রশ্ন করতো, এর পর আপনার প্ল্যান কি মহাই! তখন ফেলুদা কি বলতো! … ফেলুদা বলতো, আমি কনো প্ল্যান করিনা। পরিস্থিতি যেমন যেমন হতে থাকে, আমি তেমন তেমন করতে থাকি। … মাথা না চালানোই আসলে বুদ্ধিমানি, বুঝলি বোকা মেয়ে!

আমি এবার একটু বাইরের দিকে ঘুরতে গেলাম। আর মা একটু ব্যাগ গোছাতে থাকলেন। বাইরে বেড়িয়ে বাবার অপেক্ষা করতে থাকলাম। … আর মনে মনে ভাবলাম, আমাকে এমন হতে হবে যাতে আমি আমার মাবাবার যোগ্য সন্তান হই। … এমন অদ্ভুত দুই ব্যক্তিত্বের সন্তান তো বায়োলজিকালি আমি হয়ে গেছি। কিন্তু নিজেকে এই দুই অসামান্য ব্যক্তিত্বের অংশ বলতে, মন থেকে সায় পাচ্ছিনা। … মাবাবা নয়, আমি তো দেবীদেবতার সন্তান হয়েছি। কিন্তু দেবদেবীর সন্তান হয়েও, আমি এখনও দেবসন্তান হয়ে উঠতে পারিনি। অনেকটা ইন্দ্র আর শচিমাতার পুত্র জয়ন্তের মত। … দেবরাজ আর স্বয়ং শচিমাতার সন্তান হয়েও কাক সেজে সীতামাকে ঠোকরাতে চলে গেল! … আমিও সেইরকমই একটা হয়ে রয়েছি। … আমাকে দেবসন্তান হয়ে উঠতে হবে; আমার মাবাবার যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠতে হবে আমাকে।

হাতের কফির মগের কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেল, কারণ কফি খাবার কথা ভুলে গিয়ে, এই সমস্ত ভাবনা ভাবছিলাম। একটু উপরের দিকে তাকাতে দেখি, দিদি আর বাবা আসছেন। … স্বর্গের জয়ন্ত থেকে মর্তের মিলি হয়ে গেলাম আবার। বাবাকে দেখে যেন ধরে প্রাণও ফিরে এলো; কেন এমন হলো জানিনা। তবে হলো। মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে বললাম – মা বাবা আসছে।

মা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম – কি হলো আবার! মা – তুই যখন ৬-৭ বছরের মেয়ে ছিলিস, তখন এমনই বারন্দায় হা করে বসে থাকতিস, বাবা কাজ থেকে ফিরবে, সেই রাহা দেখতিস। … একনজর দেখতে পেলেই, এমনই ভাবে ছুটে এসে বলতিস – মা বাবা আসছে। … কিচ্ছু পালটাস নি। … সেই ছোট্ট মিলিক্ষেপীই আছিস এখনও।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5