দেশপ্রেম | রহস্য গল্প

বাবা একদমই ঠিক বলেছিলেন। আমাদের গাড়ি পেলিং পৌছাতে ঘড়ি ধরে ৫ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট নিয়েছিল। আর সত্যিই শেষের দিকের রাস্তাটায় মা যদি বেল্ট না পরতেন, তাহলে পুরো বেড়ানোটাই মাটি হয়ে যেত।

পেলিং-এর কাছাকাছি আস্তেই, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেল, তবে দার্জিলিঙের ভিউ নয়। এ যেন কাঞ্চনজঙ্ঘার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন। যেন একজন দৈত্যকায়, শুভ্র চাদর গায়ে দিয়ে, আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যত দিনের বিভিন্ন সময় হতে থাকলো, ততই সেই শুভ্র চাদর কখনো লাল, তো কখনো হলুদ হতে থাকলো। সূর্যাস্তের সময়ে তো মনে হচ্ছিল, লাল আর ধুসর রঙের বেনারসি পরা নতুন কনে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের থেকে সামান্য দূরে। আর রাত্রে! যেন মনে হচ্ছিল সদ্য রবিন ব্লুতে ছোপানো কনো সাদা কাপর পরে, একজন বিধবা দাঁড়িয়ে রয়েছেন!

কি অদ্ভুত রূপ কাঞ্চনজঙ্ঘার! … যেন দশমহাবিদ্যাকে দেখছিলাম। ভোরে, মেঘের কারণে গলা দেখা যায়না, যেন ছিন্নমস্তা; তো বেলা বারতেই হলুদ শাড়ীতে মোরা মা বগলা। আবার বিকেল হতেই লাল বেনারসিতে মোরা ভুবনেশ্বরী; তো পড়ন্ত রোদে, বাঘছাল পরিধিত মা তারা। রাত্রের ঘনঅন্ধকারে যেন মা কালি, তো গভীর রাত্রে, চাঁদের আলোতে মা ধূমাবতী। … না শুধু যে কাঞ্চনজঙ্ঘাই দেখেছি, তা নয়, আমরা সেইদিনেই এগিয়ে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা ফলস্‌ দেখলাম; আর সেই ফলসের উপরের দিকে বাঁশের মই দিয়ে উঠে, সাখ্যাত কাঞ্চনজঙ্ঘাকে পূর্ণাঙ্গ রূপে দেখে স্তম্ভিত হলাম। আর দেখলাম মাউন্টেনিয়ারিং সেন্টার, আর সেন্সোর ব্রিজ। … কি উঁচু ব্রিজ! তলার দিকে তাকালে মাথা ঘোরে!

বাবা বললেন – এশিয়ার উচ্চতম ব্রিজগুলির মধ্যে একটি এই সেনসোর ব্রিজ। সমস্ত কিছু দেখে, ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে সেদিনের মত ঘুমিয়ে পরলাম। পরের দিন যেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আমরা এসেছি, তার ইনোগোরেশন। … সকাল ৯টার মধ্যে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে। ঠাণ্ডার মধ্যে, গরমজলে স্নান করে, ময়াসচারাইজার মেখে তৈরি হতে সময় লাগবে। তাই মা আমাকে একরকম টেনেই তুলে দিলেন সকাল ৭টায়। … বাবা আর বিদিপ্তাদিদি এই ঠাণ্ডার মধ্যে একচক্কর ঘুরে, চা খেয়ে এসেছেন! … মা ঠিকই বলেন, বাবা হলেন এস্কিমোদের দেশের মানুষ। ঠাণ্ডার কনো বালাই নেই। … একটা হাফসোয়েটার আর তার উপর, একটা উইন্ডচিটার পরে দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছেন। … আর বিদিপ্তাদিতো অষ্টম আশ্চর্যের অন্যতম! একটা পাতলা শাল খালি রয়েছে গায়ে, কিন্তু তাতেও কি কম্ফরটেবেল! কি করে যে এঁদের ঠাণ্ডা লাগেনা, বুঝিনা আমি!

আমি উঠে সবে দাঁত মেজে গরম গরম কফি ফু দিয়ে দিয়ে খাচ্ছি, এবার স্নান করে, ড্রেস করবো; বাবাকে দেখলাম স্নান করে বেড়িয়ে আবার সেই হাফ সোয়েটার আর উইন্ডচিটার গলিয়ে, বিদিপ্তাদির সাথে আরেকচক্কর মেরে, চা খেয়ে এলেন।

মায়ের তো একবার সন্দেহই হয়ে গেল। বাবার মুখের কাছে নিজের নাক নিয়ে গিয়ে বেশ কিছুবার গন্ধ শুঁকলেন। বাবা সেই দেখে হেসে বললেন – এই ঠাণ্ডায় ব্র্যান্ডি খেতে হয়না। … নাথুলা গিয়ে থাকতে হলে, খেতে হতো।

মা একটা বিচিত্র মুখ করে স্নানে চলে গেলেন। মায়ের স্নানের পর আমার স্নান। তারপর আমরা দুই মামেয়ে মিলে প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে ময়াসচারাইজার নিয়ে ত্বকচর্চা করে, মিসেস সান্যালের গাড়িতে আমরা চারজন ও মিসেস সান্যাল একত্রে আমাদের ভেনুতে গেলাম। ভেনু হলো ব্রিগেডিয়ার সিং ও ব্রিগেডিয়ার গতির বাড়ি। বিশাল বাড়ির বিশাল হলঘরটা একটা ছোটখাটো অডিটোরিয়ামই।

সেখানে পৌছাতেই, মিসেস সান্যাল সকলের সাথে আমাদের আলাপ করিয়ে দিলেন। আর আমাদের সকলের হাতে একটা করে ব্রেকফাস্টের বাস্ক এসে উপস্থিত হলো। এই ব্রেকফাস্টের সাথে সাথেই, প্রথম সেই হলঘরে করা অস্থায়ী মঞ্চে উঠলেন দুই ব্রিগেডিয়ার। তাঁরা ব্রিগেডিয়ার সান্যালের বীরত্বের কথা বললেন, আর বললেন কি ভাবে কাশ্মীরি আতঙ্কবাদী মোরচার মাথার চেজ করতে গিয়ে, আততায়ীদের গুলিতে উনি বিদ্ধ হয়ে শহীদ হন সেই কথা।

ঘরে উপস্থিত ছিলেন, প্রায় জনা ২০ জন যুবক, আর ৫-৬ জনের মত যুবতি, আমাদের পাঁচজন, অর্থাৎ আমরা চারজন আর মিসেস সান্যাল ছাড়া। সকলেই সেই কথা শুনে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠলেন। ব্রেকফাস্ট শেষ করে, একজন একজন করে এবার সকল যুবকযুবতি ডাইসে গিয়ে, নিজেদের পরিচয় দিলেন আর বলতে থাকলেন যে তারা সকলেই ইন্ডিয়ান আর্মিতে জয়েন করে দেশের সেবা করতে চান।

এই ২৬ জন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন। কেউ কাশ্মীর থেকে, তো কেউ রাজস্থান থেকে; কেউ পাঞ্জাব থেকে, তো কেউ মধ্যপ্রদেশ থেকে; কেউ উত্তরখণ্ড থেকে তো কেউ নাগাল্যান্ড থেকে। তাই সকলে যাতে বুঝতে পায় সকলের কথা, সেই উদ্দেশ্যে ইংরাজিই সেই অনুষ্ঠানের ভাষা হয়ে ওঠে। … তবে নাগাল্যান্ড আর দক্ষিণ ভারত ছাড়া, বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে, যারা বাংলা, বিহার, কাশ্মীর, রাজস্থান থেকে এসেছিলেন, তারা আধো আধো ইংরাজি বলে, বেশিটা হিন্দিতেই বললেন।

সকলেরই মুখে একই কথা, তারা দেশের জোয়ান হয়ে দেশের সেবা করতে চান। … সকলের কথার শেষে ব্রিগেডিয়ার গতি ডাইসে উঠে ইংরাজিতে বললেন – আপনারা সকলেই দেশের সেবা করার জন্য আগ্রহী। আর সেই কারণেই, আপনাদেরকে আমরা এখানে নিয়ে এসেছি। … আপনাদের মাঝে আজকে রয়েছেন সেই শহীদ ব্রিগেডিয়ার সান্যালের স্ত্রী, মিসেস সান্যাল। … উনি আপনাদের এই দেশসেবার ব্যাপারে কিছু বলবেন। আজকে আমাদের সভা লাঞ্চের সময়ে পৌঁছে গেছে। … তাই আজকে উনি বেশিকিছু তো আপনাদের বলতে পারবেন না। তবে লাঞ্চের পর, প্রথম উনাকে সংবর্ধনা দিয়ে, তারপর উনার মুখ থেকে কিছু প্রেরণার কথা শুনে নেবেন আপনারা। কালকে উনি আপনাদের সকলকে দেশসেবার ব্যাপারে কিছু বলবেন।… আপনারা এখন লাঞ্চের জন্য যান। ফিরে এসে, মিসেস সান্যালকে সংবর্ধনা দিয়ে, উনার ভাষণ শুনে, টি-স্ন্যাক্সের মাধ্যমে, আজকের সভা শেষ করবো।

আমরা লাঞ্চ ব্রেকে গেলাম। ভেজ-ননভেজ, সব রকম ব্যবস্থা ছিল। বেশ ভালোই খেলাম। বাবা প্রশ্ন করলেন মিসেস সান্যালকে – আচ্ছা, এতগুলো ছেলেমেয়ে, থাকছে কোথায়?

মিসেস সান্যাল – এই যে বাড়ি দেখছেন, দুই ব্রিগেডিয়ার একসঙ্গে এই বাড়িটা করেছিলেন। এর নিচের তোলায় খালি গ্যরেজ আর এই হল। আর এর উপরের তোলায় রয়েছে চারটে ডরমেটারি টাইপের ঘর। … একটা ডরমেটারি তে মেয়েরা। বাকি তিনটেতে মেয়েরা। …

বাবা – আর ব্রিগেডিয়াররা থাকেন কোথায়?

মিসেস সান্যাল – ব্রিগেডিয়ার গতি, আজ তিন বছর হলো বিপত্নীক। উনার ছেলে বিদেশে থাকে, সেন ফ্রান্সিস্কোতে। আর ব্রিগেডিয়ার সিং –এর স্ত্রীর সাথে প্রায় ১২ বছর হয়ে গেছে ডিভোর্স হয়ে গেছে। উনার একটি মেয়ে, সে মায়ের সাথেই থাকে। … আর উনারা, তিনতোলায় থাকেন। দেখে মনে হবে রাজপ্রাসাদ।

বাবা – এখানে তিনতোলা বাড়ি এলাউড!

মিসেস সান্যাল – না না, এখানে তিন তোলা মানে, ছাদের উপর ঘর নয়। পাহাড়ের তিনটি তোলা একসাথে কেনা। আর তার একাকটাতে একাক তোলা। … তিনটে তোলারই নিজের নিজের রাস্তা আছে, যেটা এই মেন রোডে এসে পরে।

বাবা – বাকি সময়ে তাহলে এই দুই তোলা ফাঁকা থাকে?

মিসেস সান্যাল – না, কখনোই প্রায় ফাঁকা থাকেনা। … আমি যতদূর জানি, কিছু স্পেশাল আর্মি রেজিমেন্টকে দুই ব্রিগেডিয়ার এক সঙ্গে ট্রেনিং দেন। … সম্ভবত ব্যাটেল কমব্যাটের নয়, স্ত্র্যাটিজিকাল কমব্যাটের ট্রেনিং দেন উনারা। … এই আগস্ট থেকে নভেম্বর, মানে ফেস্টিভ টাইমটা, খালি থাকে ঘর। তাই এই সময়েই ওরা এই এরেঞ্জমেন্টটা করেছে।

আমাদের লাঞ্চ ব্রেক হয়ে গেল। বিদিপ্তাদিদির কাছে গিয়ে বললাম – খুব বোর হচ্ছ না তুমি! … একজনও তোমার ধারার নেই এখানে, তাই না!

বিদিপ্তাদি হেসে – কে বলেছে নেই! … আমাদের যিনি নিমন্ত্রণ করে এনেছেন, তিনি তো এখনও বক্তব্যই রাখেন নি। তিনি বক্তব্য রাখলে, বুঝতে পারবে, কেউ আছেন কিনা এখানে।

বিদিপ্তাদিদি যেন আগেভাগেই সমস্ত কিছু জেনে যায়। উনাকে তাই কিছুতেই চমকাতে পারিনা আমি। … পাল্টা, আমিই চমকে যাই উনার কথায়। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।… লাঞ্চের পর, সেশন শুরু হতে, প্রথমেই মিসেস সান্যালকে সংবর্ধনা দেওয়া হলো। আর তার পরে, উনাকে কিছু বলতে বলা হলো সবার উদ্দেশ্যে, যার শুরুটাই আজ হবে, বাকিটা কাল হবে।

মিসেস সান্যাল নিজের বক্তৃতা রাখলেন। উনি বললেন – আমি পারমিতা সান্যাল, লেট ব্রিগেডিয়ার সুধীর সান্যালের স্ত্রী। … আর্মি জেনারাল উনিই ছিলেন, ব্রিগেডিয়ারও উনিই ছিলেন, স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স স্কোয়াডের নেতৃত্ব উনিই করতেন। আর শহীদও উনিই হয়েছেন। … আমার তাতে একটিই অবদান ছিল, আমি সর্বদা উনার গুণমুগ্ধ ফ্যান হয়েই ছিলাম। উনি যখন জীবিত ছিলেন তখনও, আর উনার মৃত্যুর পরেও। … তবে আমাকে এই বক্তৃতা দিতে বলা হচ্ছে কেন? …

উনি বলতে থাকলেন – আমার ছোট ছোট ভাইবোনেরা, আমাকে বক্তৃতা দিতে দেওয়া হচ্ছে কারণ, আমি উনার গুণমুগ্ধ অনুগামী হবার কারণে, উনার দেশপ্রেমের দর্শন, উনার দেশসেবার দর্শন, সমস্ত কিছুর প্রত্যক্ষদর্শী। অর্থাৎ আমি এখানে উনারই দর্শন বলতে এসেছি। আর তাই আমি তোমাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেবার সুযোগ পেয়েছি।

সামান্য হেসে উনি আবার বললেন – তোমরা সকলে বললে, আমি শুনলাম যে আপনারা দেশের সেবা করতে চাও, তাই আর্মিতে জয়েন করতে চাও। … খুব ভালো লাগলো কথাগুলো শুনে, আর তার থেকেও বেশি ভালোলাগলো, তোমাদের দেশপ্রেমের মানসিকতা দেখে। … তবে কি জানো আমার ছোট বন্ধুরা, তোমাদের আঙ্কেল, ব্রিগেডিয়ার সুধীর সান্যাল আমাকে একটা কথা বলেছিলেন একবার। সেই কথাটা খুব মনে পরেগেল, তোমাদের কথাগুলো শুনতে শুনতে।

উনি বলতে থাকলেন – সত্যি বলছি, ব্রিগেডিয়ার সাহেব বেঁচে থাকা অবস্থায়, আমি তাঁর বলা কথাগুলো একদমই সিরিয়াসলি নিই নি, যেমন হয়ে থাকে আরকি। প্রতিটি গুণী ব্যক্তির স্ত্রীই আমার মত হয়ে থাকে। কেন, তা বলতে পারবো না, তবে এমনই হন। … স্বামীর গুণ তাঁর কাছে অত্যন্ত প্রিয় হয়, যদি তাঁর স্বামী সেই গুণের পরিবর্তে মান সম্মান বা সমাজে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন। … আর যদি সেই গুণ স্বামীকে সমাজের চোখে গুণী না করে, তবে সেই গুণকে প্রথম যিনি অবজ্ঞা করেন, তিনি হলেন তাঁর স্ত্রী। …

একটু হেসে – আর মজার কথা হলো এই যে, সমাজ স্বামীকে গুণী বললে স্ত্রীর ছাতি চওড়া হয়ে যায়, আর না বললে ছাতিতে বিরক্তির তিল গজিয়ে ওঠে। … কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই কমন ব্যাপার যেটা, সেটা হলো, স্বামীর মতাদর্শ স্ত্রী কিছুতেই গ্রহণ করতে পারেন না, বিশেষ করে সেই স্বামীর মতাদর্শ যদি অন্য সকলের থেকে আলাদা হয়, তবে তো আর কথাই নেই। … আমার ক্ষেত্রেও একই জিনিস হয়েছে। … সমাজ আমার স্বামীর গুণকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, তাই আমার ছাতি চওড়া হয়ে গেল। … কিন্তু উনার মতাদর্শ শুনলেও, সেই নিয়ে বিচার করার চিন্তা পর্যন্ত করিনি। … ওই বলে না, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝেনা। আমারও একই দশা। … উনি চলে যেতে, উনার স্মৃতির মধ্যে সবথেকে বড় অংশ, যেটা ছিল উনার মতাদর্শ, সেটিই আমার জীবনী হয়ে উঠতে থাকলো।… আর সেই কথা সম্বন্ধে বিস্তারে কালকে বললেও, আজকে একটিই কথা বলবো।

একটু নিশ্বাস নিয়ে, মিসেস সান্যাল বললেন – আমি প্রায়শই আমার স্বামীর কাছে দুঃখ করে বলতাম, তুমি তো দেশসেবা করছো; আমার তো আর সেই ক্ষমতা নেই। কিন্তু তুমি যখন থাকো না, তখন বড্ড একা একা লাগে। একটা কিছু করলে ভালো হতো। … তোমার মত দেশসেবা না করতে পারলেও… একটা কিছু!

উনি আমাকে একটা স্কুলের চাকরি করে দিয়েছিলেন। নামচি, যেখানে আমি থাকি, সেখানের টিচার হয়েছিলাম আমি। এখনো টিচিং করি সেখানে। … কিন্তু এই কাজটি দেবার আগে, আমাকে উনি একটা মজাদার কথা বলেছিলেন। সেটাই আমি তোমাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই। … উনি আমাকে প্রশ্ন করেন – আচ্ছা, এই পরিবারে তুমি কে?

আমি বললাম – হাউজ ওয়াইফ!

উনি বললেন – বেশ, তোমার কন্ট্রিবিউশান কি এই পরিবারের খরচাখরচে?

আমি বললাম – আমার তো কনো কন্ট্রিবিউশান নেই! … আমি তো খালি এই পরিবারের এডমিনিস্ট্রেশন করি, আর সুরক্ষিত রাখি তোমাকে, মানে যতক্ষণ এখানে থাকো, যাতে তোমার উপার্জনে কখনো ঘাটতি না হয়। উপার্জন মানে প্রোডাক্টিভিটি তো তোমার!

উনি বললেন – বেশ, তবে আমাকে এটা বলো যে দেশের যত পলিটিকাল লিডার আছে, তাদের প্রোডাক্টিভিটি কি? বা যত আইএএস বা আইপিএস আছে, তাদের প্রোডাক্টিভিটি কি?

আমি বললাম – দেশের ব্যবস্থায়ন করেন উনারা। আলাদা করে কনো প্রোডাক্টিভিটি…!

উনি আবার প্রশ্ন করলেন – আমি বলতে চাইছি, দেশের জিডিপিতে উনাদের অবদান কি?

আমি বললাম – আলাদা করে কিছু না। ব্যবস্থায়ন না করলে, জিডিপির যেই ঘাটতি হতো, সেটা থেকে উনারা সুরক্ষা প্রদান করেন।

উনি আবার প্রশ্ন করলেন – আচ্ছা এবার বলো দেশের আর্মির তরফ থেকে জিডিপিতে অবদান কি?

আমি বললাম – কিছুই না। উনারা দেশের সুরক্ষা করেন। মানে ঠিক করে বলতে গেলে, যারা জিডিপিতে যোগদান করেন, তাঁদের সুরক্ষিত করেন।

উনি হেসে বললেন – তাহলে দেখলে তো, আর্মি, পলিটিকাল লিডার, আইএএস, আইপিএস, ইউপিএসশি ক্লিয়ার করা সকলে জিডিপিতে কনো যোগদান করেন না। যারা যোগদান করেন, তাদের সুরক্ষা প্রদান করেন আর ব্যবস্থায়ন করেন। অর্থাৎ, তুমি এই পরিবারে যেই কাজটা করো, ব্যবস্থায়ন আর সুরক্ষা, সেটাই করেন। … তাহলে কি বুঝলে?

আমি উত্তর দিতে না পারলে, উনিই উত্তর দিলেন – একটা দেশের হাউজ ওয়াইফের কাজটা করে এরা সকলে, আমরা আর্মির সকলে। … এবার উনি বললেন – এবার বলো, যারা জিডিপিতে যোগদান করেন, তাঁরা যদি না কাজ করতেন, তবে আমরা কি দেশ চালাতে পারতাম! … না পারতাম না। … অর্থাৎ তোমার এই যে ভাবনা যে আমরাই দেশপ্রেমী, এটি একটি ভুল ধারনা। … দেশের প্রতিটি মানুষ যারা জিডিপিতে যোগদান করছেন, তারাই দেশপ্রেমী। আর আমরাও দেশপ্রেমী, কারণ আমরা তাঁদের সুরক্ষা প্রদান করি, যারা দেশপ্রেমী।

এবার হেসে মিসেস সান্যাল বললেন – তাহলে কি বুঝলেন আমার ছোট বন্ধুরা! … যদি এমন ধারনা রাখেন আপনারা যে কেবল মাত্র আর্মিতে যোগদান করলেই, আপনারা দেশপ্রেমী, তাহলে সেই ধারনাকে খারিজ করে দিন। … যেই ব্যক্তি কৃষক হয়ে, কেবল নিজের পরিবার চালানোর মত শস্য উৎপাদন করে থেমে না থেকে, আমাদের সকলের খাবারের ব্যবস্থা করছেন, তিনিও দেশপ্রেমী; যিনি অমানুষিক পরিশ্রম করে ফ্যাক্টরিতে আমরা যাতে পরিষ্কার আর রোগমুক্ত থাকতে পারি তার জন্য সাবান, তেল, শ্যাম্পু নির্মাণ করছে তারাও দেশপ্রেমী। যারা সেই সমস্ত ফ্যাক্টরির জিনিস আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে ডিস্ট্রিবিউটার, বা সেলসম্যান, তারাও দেশপ্রেমী। সমস্ত কৃষকদের উৎপাদন করা শস্য আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে, যারা আরদ্দার বা যারা রেশন ডিলার, তারাও দেশপ্রেমী।

যে আমাদের চুল কেটে নাপিতের কাজ করে, সেও আমাদেরকে দেশের জিডিপিতে যোগদান করার জন্য প্রস্তুত করছে, তাই সেও দেশপ্রেমী; যেই দরজি আমাদের সকলের লজ্জা ঢাকছে, সেও দেশপ্রেমী। যে দিনরাত রোদে বৃষ্টিতে মাঠে নেমে খেলে আমাদের বিনোদন দিচ্ছে, সেও দেশপ্রেমী; যে থিয়েটার সিনেমা করে আমাদের বিনোদন দিচ্ছে, সেই দেশপ্রেমী। যেই লেখক আমাদের মনে দেশপ্রেমকে সতেজ করার জন্য কলম ধরেছে, সেও দেশপ্রেমী। কে নয় দেশপ্রেমী। সকলেই দেশপ্রেমী। … সকলে যা যা করছে, তা দিয়ে যেমন নিজেদের পেট ভরছে, নিজেদের পরিবারের পেট ভরছে, তেমনই আমাদেরকেও নিজেদের জীবন চালিয়ে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে দিয়ে, আমাদের দেশের জিডিপিতে কন্ট্রিবিউশান যাতে ঠিক থাকে, সেই চিন্তা করার জন্য দেশপ্রেমী। আর এই সমস্ত দেশপ্রেমীদের যেই মায়েরা, যেই স্ত্রীএরা, যেই বোনেরা নিঃশব্দে সেবা করে তাদের দেশের জিডিপিতে কন্ট্রিবিউশান ঠিক রাখতে সাহায্য করে, তারা তো সব থেকে বড় দেশপ্রেমী।

আবার একটু হেসে মিসেস সান্যাল বললেন – উনি বলতেন, আর্মিতে কাজ করলে দেশপ্রেমী ট্যাগটা গায়ে লাগে মাত্র। কারণ আর্মির লোকেরা জীবনকে বাজি রেখে দেশের সুরক্ষা করে। কিন্তু যারা দিননেই রাতনেই, গ্রীষ্ম নেই বর্ষা নেই, ক্ষেতে পরে পরে চাষ করছেন, তারা জীবন দিচ্ছেন না! … যারা লোডশেডিংএও মোবাইলের টর্চ জ্বেলে দরজির কাজ করছেন, যাতে সকলের লজ্জা নিবারণ হয়, তিনি জীবনকে প্রতিমুহূর্তে পণ করছেন না! …

সামান্য হেসে – তাই আমার ছোট বন্ধুরা, আপনারা সকলেই দেশকে ভালো বাসেন, সেই ব্যাপারে কনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এমন ধারনা রাখবেন না যে দেশকে ভালো বাসেন বলে, আপনাদের আর্মিতে জয়েন করতেই হবে। … যেই কাজই আপনারা করুন না কেন, তার দ্বারাই আপনারা দেশের সেবা করতে পারেন। … ব্রিগেডিয়ার সাহেব বলতেন, যেদিন দেশের প্রতিটি মানুষ নিজের নিজের কাজকে দেশের সেবা করা বলে অনুধাবন করতে পারবে, সেদিন দেখবে আর দেশের মধ্যে কনো ক্রাইম হবেনা। …

উনি বলতেন, দেশে ক্রাইম হবার কারণই এই যে, যাদেরকে খুন করা হয়, তাদেরকে দেশপ্রেমী বলে মনে করা হয়না, আর একই সঙ্গে যারা ক্রাইম করছেন তারাও নিজেদের দেশপ্রেমকে চিহ্নিত করতে পারছেন না। … যেদিন সকলে নিজের নিজের জায়গায় দেশপ্রেমী, এটি উপলব্ধি করতে পারবেন, সেদিন একটিও দেশের মানুষ, নিজের দেশের মানুষের উপর জোরজুলুম, ঠকানো, বা খুন করবে না। … আরো অনেক কথা ব্রিগেডিয়ার সাহেব বলতেন, দেশের ব্যাপারে। সেই ব্যাপারে তোমাদের নয় কালকে বলবো। … আজকে এটুকুই বলার ছিল যে, আর্মি মানেই দেশপ্রেম আর অন্য প্রফেশান মানে দেশপ্রেম নয়, এই ধারনা থেকে বেড়িয়ে আসো তোমরা। যতটা দেশপ্রেম বর্ডারে দাঁড়িয়ে থাকা জোয়ান দেশকে করেন, ততটাই দেশপ্রেম একটি কৃষক বা একজন সামান্য অফিসে কাজ করা কর্মচারীও করেন।

তাই এমন ভাবনা নিয়ে আর্মিতে জয়েন করো না যে, এটিই দেশপ্রেম স্থাপন করার একমাত্র উপায়। হ্যাঁ এখানে দেশপ্রেমের ট্যাগ দেওয়া হয় মানুষকে। কিন্তু এই দেড়শ কোটি মানুষের দেশে, মাত্র ১৫ লক্ষ্য দেশপ্রেমীই যদি থাকতো, তবে এতদিনে দেশটা বেশ কয়েকবার অন্য কনো শক্তির কাছে পরাধীন হয়ে যেত। তা যে হয়নি, তা এই প্রমাণই করে যে, দেশে মাত্র ১৫ লক্ষ্যই দেশপ্রেমী নেই, দেশে অন্তত একশ কোটি দেশপ্রেমী আছেন। … তাই যদি দেশপ্রেমী ট্যাগটার প্রতি আকর্ষণ থাকে তবে আমার আর কিছু বলার নেই, আর তা না হলে আর্মিতে তখনই জয়েন কর, যখন নিজেকে দেশের হাউজ ওয়াইফের ভূমিকায় দেখতে পছন্দ করছ। … অন্ধের মত পথ চলো না বন্ধুরা। এই অন্ধত্ব যদি থাকে, তাহলে সেই অন্ধত্ব ঘুচিয়ে দাও। কারণ এই অন্ধত্ব যদি থেকে যায়, তবে বেশিদিন সময় লাগবে না, দেশের পঙ্গু অবস্থা সামনে আস্তে।

মিসেস সান্যাল নিজের কথা শেষ করে ডাইস থেকে নেমে এলেন। প্রথমেই করতালি পরেনি। একটু পরে একজন করতালি দিলেন। তারপর আসতে আসতে পুরো ঘর করতালি দিতে শুরু করলেন। বিদিপ্তাদিদি আমার পাশে উঠে এসে বসে বললেন – কি দিদিভাই, কেউ আছে এখানে?

আমি দুষ্টু হেসে বললাম – আমি কি আর তোমার মত ত্রিকালদর্শী!

ঘরে চলে গেলাম চা-টা খেয়ে। বাবাকে দেখলাম দারুণ মেজাজে রয়েছেন। বিদিপ্তাদি আর আমি মা বসেছিলাম, এমন সময়ে বাবা বললেন – এই ব্রিগেডিয়ার সান্যালের সম্বন্ধে আরো জানতে ইচ্ছা করছে দিদি। … অদ্ভুত দৃষ্টিকোণ ভদ্রলোকের। এতো উদার দৃষ্টিকোন সরকারি কর্মীদের থাকেনা বললেই চলে। কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারছি, উনি নিজের সরকারি কর্মচারী বা আর্মি জেনারালের ট্যাগেই নিজেকে আটকে রাখেন নি। … একজন প্রকৃত দেশপ্রেমী। … হ্যাঁ দিদি, প্রকৃত দেশপ্রেমী বলেই তো দেশের প্রতিটি প্রফেশানের মানুষকে দেশপ্রেমী বলতে পেরেছেন। … আর এই কথাই বলে দেয় যে উনি দেশের আর্মিতে থেকে নিজেকে বড় মনে করতেন না, বরং মনে করতেন যে তিনি সেই সমস্ত দেশপ্রেমীদের সুরক্ষা প্রদান করে দেশকে প্রেম করছেন। … কি বিরাট দৃষ্টিভঙ্গি। … এটাই তো সেবা ভাব, না দিদি!

বিদিপ্তা দিদি হেসে বললেন – হ্যাঁ বিজয়। যখন সামনের ব্যক্তিকে অসামান্য আর নিজেকে তার কাছে নগণ্য মনে হয়, তখনই তো সেবা ভাব। যদি সামনের ব্যক্তিকে অসহায় মনে হয়, আর নিজেকে মনে করা হয় যে আমি না দেখলে একে কে দেখবে, তখন তো দম্ভ কাজ করে, সেবা ভাব আর কোথায় থাকে তখন!

বাবা হেসে বললেন – করিতে পারি তোমারও সেবা, ধন্য হইল জীবন মোর। তোমা কর্ম করিতে দিলে, আনন্দে করি করজোর। অজস্র তোমা সন্তান মাঝে, বাছিলে অতি তুচ্ছ আমারে। তোমা করুণা অপার মারে, লহ হে প্রণাম বারে বারে।

বিদিপ্তাদি – ঠিক বাবা। একদম ঠিক। … তাঁর অজস্র সন্তান। সমস্ত মুখ তাঁর, সমস্ত হাত তাঁর, সমস্ত চরণ তাঁর। সেই সকলের মাঝে, তুমি আমারে বেছে নিলে তোমার কর্ম করার জন্য। ধন্য করে দিলে আমাকে। আমার ইহজীবন পরজীবন, সমস্ত জীবনকেই ধন্য করে দিলে। … এটাই তো সেবাভাব। সেবা করে আমি কিচ্ছু উপকার করি নি। সেবা করতে পরেছি যে, সেটা আমার উপর উপকরা করা হয়েছে। এটাই তো সেবা ভাব।

এই কথাগুলো বাবা যখন বলেন, বিদিপ্তাদিদির সাথেই বলেন। … মায়ের সাথে নয়। তবে মাকেও দেখেছি যখন এই ধরনের কথা হয়, তখন মশগুল হয়ে কথাগুলো শোনেন। যেন একটা অন্য দেশে হারিয়ে যান। … কি অদ্ভুত পরিবার আমি পেয়েছি। সেবা করার সুযোগ এখনও পর্যন্ত আমি পেয়েছি কিনা জানিনা, তবে হ্যাঁ, এমন পরিবারে জন্মাতে পেরেই আমার জীবন ধন্য হয়ে গেছে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5