পঞ্চম পর্ব – সত্যই ছায়াছবি
বাবা বলতে শুরু করলেন – কেসের সূত্রপাত বাংলায় নয়, শুরু হয় মধ্যপ্রদেশে। প্রতিবার যেমন বেড়াতে যান, এবারেও তেমনই সুদেশ্না, ববি আর সুরের সাথে মহিমা মিত্র বেড়াতে যান। আনন্দই করছিলেন সেখানে, কিন্তু সেখানে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় তাঁর সঙ্গীদের অন্যরূপের সাথে। … উম্, মোস্ট প্রোবাবলি, হোটেলের রুমে নয়, বনের মধ্যে ঘোরার সময়ে।
হেরোইন আর কোকেইনের নেশা করা তাঁর সঙ্গীদের সাথে সেখানেই প্রথম আলাপ হয় মহিমা মিত্রের। খবর জানাজানি হলে ক্ষতি ছিলোনা, কারণ ব্যবসা বেশ ভালোই ফাঁদা ছিল। কিন্তু গড়বড় হবার সম্ভাবনা জাগে যখন মহিমা মিত্র এই সমস্ত ব্যাপার তাঁর ভাই, বাদলকে জানিয়ে দেবে বলে। শুরু হয়ে যায় নেক্সট লেভেল প্ল্যানিং।
কিছুই নয়, যেই সিরিয়াল বেশ রমরম করে চলছিলো, কি যেন নাম সিরিয়ালটার?
সুমনাপিসি – হাটেহাঁড়ি।
বাবা – হুম, খাসা নামখানা কিন্তু হাটে হাঁড়ি। সত্যিই, আজই সিরিয়ালটার আসল ক্লাইম্যাক্স হচ্ছে দেখুন। আজ পুরো হাটে হাঁড়ি ভাঙা হচ্ছে।
নিজের মনেই একটু হেসে নিয়ে বাবা ফের বলতে শুরু করলেন – তো হাটে হাঁড়ি যাতে না ভাঙা হয়, সেই উদ্দেশ্যে, হাটেহাঁড়ি সিরিয়াল থেকে সুনন্দাদেবীকে বাদ দিয়ে, সরাসরি এপ্রোচ, না না এপ্রোচ বললেও ভুল বলা হয়, সরাসরি প্রেসারাইজ করা হয় মহিমাদেবীকে। …
জানতেন তাঁরা, এই সমস্ত প্রফেশনাল হ্যারাসমেন্ট দিয়ে মহিমা মিত্রকে কিচ্ছু করা যাবেনা। এই সমস্ত হ্যারাসমেন্ট উনি অনেক দেখে এসেছেন। কিন্তু তাও করা হলো এই প্ল্যানটা। না না একদমই মেরে ফেলার জন্য নয়, বরং এটা দেখানোর জন্য যে উনার মৃত্যু এই কারণে হয়েছে কারণ তিনি প্রফেশনে প্রেশার হ্যান্ডেল করতেই পারেননি। … আর আসল প্ল্যান, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুকে নিশ্চয় করার অসাধারণ প্ল্যানকে রাখা হলো পিছনে।
কি সেই প্ল্যান? … প্ল্যান এই যে, মহিমাদেবীর এই বেড়াতে গিয়ে তোলা সোলো ছবিগুলির মধ্যে একটিতে, একটি অশরীরীর ট্যাটুকে রাখা হলো, সুপার-ইম্পোজ করে। আর সেই সুপার ইম্পোজিশন করে, তার একটা কপি সুর সাহেব আমাদের, নিজে হাতে নিয়ে গেলেন মহিমা দেবীর কাছে। … মহিমা দেবী ভুতে ভয় পান, তাঁর বন্ধুরা ছাড়া এটা ভালো করে আর কেই বা জানবেন! … তাই ভুতের ভয় দেখানো শুরু হলো।
তবে না, এখানেই ভয় দেখানো শেষ হয়নি। উল্টো দিকে এনিগ্মা হোটেল। হেরয়িন আর কোকেইন সাপ্লায়ারের অনেক জানাশুনা। তারউপর আবার অন্য শহরের স্টাররা এসে সেই হোটেলে থাকেন। তাঁদেরকেও তো এই সমস্ত সাপ্লাই দিতে হয়। তাই না! … তাই হোটেলের মালিকের সাথে খুবই দহরমমহরম। এনি ওয়েজ। তাই সেই হোটেলের একটি রুম নেওয়া হলো, আর সেখান থেকে লাল, নীল আর সবুজ লেজারের মুখে সেই একই ট্যাটু এঁকে নিয়ে, মারা হবে মহিমাদেবীর ঘরের দেওয়ালে।
কি বিশ্বাস হচ্ছে না! … এই সেই ট্যাটু, আর এই সেই ছবি। ছবি প্রিন্ট হয়েছিল বালিগঞ্জ স্টেশন চত্তরের দোকান আলোছায়া থেকে। দেখে নিয়েছেন। বাদল, রেখে দাও প্রমাণ গুলো, আদালতে প্রমাণ করতে কাজে লাগবে। … হ্যাঁ তো কি বলছিলাম, প্ল্যানের কথা। … কিন্তু সেই সমস্ত প্ল্যান যে ভেস্তে যেতে চলেছিলো! (হেসে) কারণ?… কারণ যেই দেওয়ালে এই লেজার মারা হবে বলে ঠিক করা হয়েছে, সেই দেওয়ালে যে অন্য বড় ধরনের একটা মূর্তির ওয়ালপেপার, মানে যাকে বলে ক্যানভাসের উপর পোড়ামাটির কাজকরা একটা ছবি টাঙানো। … লেজারের থেকে যেই ছবি দেওয়ালে পরবে, সেই ছবিই তো বিক্রিত হয়ে যাবে! তাই কিচ্ছু বোঝা যাবে না।
তাই আমাদের জনপ্রিয় অভিনেতা, সুর সাহেব সেখানে গিয়ে, বাস্তুর নাম ভাঙিয়ে, মহিমাদেবীকে দিয়ে সেই ছবি খুলিয়ে রাখলেন। … কি সুর সাহেব, ঠিক বলছি তো?
সুর – কিন্তু এতে কি প্রমাণ হয়!
বাবা – আহা, উদ্বিগ্ন হচ্ছেন কেন। আপনি তো আসল ক্রাইম করেনই নি। … আপনি একাও ড্রাগ সাপ্লায়ারকে ফোন করে জানানও নি। ড্রাগের নেশা তো, আপনাদের তিনজনেরই। … সেই ড্রাগ নেওয়া বন্ধ হয়ে গেলে, আপনারা তো আপনাদের কাজে কন্সেন্ট্রেটই করতে পারবেন না, তাই না! … সেই জন্যই তো ফোন করে বলেছিলেন সেই কথা। কিন্তু তখনও কি আপনারা জানতেন, আপনাদের এই ড্রাগ আর আপনাদের এই ফোন, আপনাদের বন্ধুর প্রাণ নিয়ে নেবে! … না ঘনাক্ষরেও জানতেন না। তবে হ্যাঁ, জানলে যে এমনটা করতেন না আপনারা, তা কখনোই নয়। ড্রাগের নেশা যারা করেন, তাঁদের কাছে ড্রাগের থেকে বড় যে কিছুই হতে পারেনা।
তবে সুর সাহেবকে সম্পূর্ণ দোষ দেওয়া একদমই ঠিক নয়। উনি কিন্তু এখানে শুধুই একজন আজ্ঞাবাহ দাস ছিলেন। দোষ যদি উনাকে কিছু দিতে হয়, তবে সেই দোষ তো সুদেশ্না আর ববিকেও দিতে হয়, কারণ অরাও তো সেই একই ড্রাগের নেশায় চুর। … প্রতিদিন রাত্রে, যেমন কালকে এসেছিলেন আর আমরা তাঁদের হাতেনাতে ধরি, সেই ভাবেই রোজ এসে ড্রাগের নেশা করে যান। … ইল্লিগাল নেশা করার অপরাধে, কিছু তো শাস্তি হবে, কি হবেনা বাদল!
বাদল স্যার – তাহলে এই সিন্দিয়াই আসল কালপ্রিট, তাই তো? সেই সবাইকে ড্রাগ সাপ্লাই করতো।
বাবা – দাঁড়াও দাঁড়াও, এত উত্তেজিত হলে চলবে বাদল। সরষের মধ্যে ভুত বোঝো। … এখানে মাছ অত্যন্ত গভীর জলের খেলারি। … একটু খেলিয়ে খেলিয়ে না তুললে, সরাসরি ছিপই ভেঙে দেবে … কি সিন্দিয়াজি, ঠিক বলছি তো?
সিন্দিয়া – আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, আপনি কি বলছেন? …
বাবা – ও তাই, সেদিনও কিচ্ছু বুঝতে পারেন নি, তাই না যখন সুনন্দাদেবীর গাড়িতে ব্রেকফেল হলো?
সিন্দিয়া – ওটার সাথে আমার কনো সম্পর্ক নেই। … আমি কিচ্ছু জানি না ওই ব্যাপারে। … ওটা একটা এক্সিডেন্ট ছিল।
বাবা – আচ্ছা, হুম। … তো এক্সিডেন্টে কি কি হয়েছিল?
সিন্দিয়া ভ্রু কুঁচকে বললেন – এইসা ফালতু শওয়াল করকে সময় কিউ বরবাদ করতে হে আপ। হামারা সময়কে বহত দাম হে।
বাবা এবার একবার বাদলস্যারের দিকে কটমট করে তাকালেন। বাদল স্যার সরাসরি গিয়ে, সিন্দিয়ার গালে একটি সপাটে থাপ্পড় কষিয়ে গালে পাঁচআঙ্গুলের দাগ বসিয়ে দিয়ে বললেন – ইল্লিগাল নেশা করা আর সকলকে করানো, তারপর আবার বড় বড় কথা! … আদালত যদি তোকে ছেড়ে দেয় না, তারপর আমি …
বাবা একটু কেশে বললেন – বাদল এখানে প্রচুর ক্যামেরা আছে, লাইভ হচ্ছে।
বাদল স্যার থেমে গেলেন। … বাবা এবার সিন্দিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, বলুন সেদিন এক্সিডেন্টে কি কি হয়েছিল। আধমরা হয়ে জেলে না যেতে চাইলে, বলে ফেলুন ভালো ছেলের মত। … আপনার বিজনেস, আপনার প্রতিষ্ঠা, তাতে আপনি নিজেই প্রস্রাব করে দিয়েছেন, সেই নিয়ে আর ধুয়ে খেতে পারবেন না। পেচ্ছাপের গন্ধ এসে গেছে তাতে। … তাই ভালো ছেলের মত বলে ফেলুন… (চেঁচিয়ে উঠে) কথা কানে ঢুকছে না। … বলুন ।
সিন্দিয়া একটু চমকে গিয়ে বললেন – ব্রে…ব্রেক ফেল হয়ে গেছিল গাড়ির। তাতে সুনন্দাজি আর উনার ড্রাইভার চোট পায়।
বাবা – হুম, সুনন্দা দেবী, কি ঠিক বলছেন সিন্দিয়া? … না আপনি কিছু এড করবেন তাতে?
সুনন্দা দেবী একটু কড়া ভাবে – যা হয়েছিল, তা তো আপনার সামনেই হয়েছিল। … আপনিও তো দেখেছিলেন, এক্সিডেন্ট হয় ব্রেক ফেলের জন্য।
বাবা – উমহুম, ভুল বললেন আপনি। আমাকে যেটা দেখানো হয়, সেটা হলো এই যে, আপনার ড্রাইভার হঠাৎ জানতে পারেন যে, আপনার গাড়ির ব্রেকফেল হয়ে গেছে। তারপর ভিড় রাস্তায়, আপনার গাড়ি একবারো ব্রেক না মেরে, সরাসরি লর্ডসের মাঠে নেমে পরে, গাছে ধাক্কা মেরে, সামান্য চোট দেয় আপনাদেরকে। … কি এটাই দেখিয়েছিলেন তো আপনি! …
সুনন্দা – এ আবার কেমন ধারার কথা। যা হয়েছে, তাই দেখেছেন আপনি। এখানে দেখানো হয়েছে, ইত্যাদি কথা বলে আপনি কি অহেতুক প্রেসারাইজ করার চেষ্টা করছেন!
বাবা – অহেতুক, তাও আবার প্রেসারাইজ। … কই বাদল, একটু ট্র্যাফিক রেকর্ডস্টা দাও তো। …
বাবা এবার মিডিয়ার দিকে ফিরে – লাইভ করছেন তো আপনারা। একটু এই সিটের উপর জুম করুন ক্যামেরা। সকলেই দেখতে পাবে। … কি লেখা রয়েছে এখানে? … গরিয়াহাট মোড়ে গাড়ির স্পিড কত, ৩২ কিমি প্রতি ঘণ্টা, গোলপার্কে কত দেখাচ্ছে?
রিপোর্টারদের উত্তর এলো – ১৮ কিমি প্রতি ঘণ্টা।
বাবা – হুম, যাদবপুর থানায় স্পিড ৪৫ কিমি প্রতি ঘণ্টা, আর সাউথ সিটিতে কত স্পিড দেখাচ্ছে?
রিপোর্টাররা – ১৫ কিমি প্রতি ঘণ্টা।
বাবা এবার সুনন্দাদেবীর দিকে তাকিয়ে বললেন – যা হয়েছে, তাই দেখিয়েছেন না আপনি ম্যাডাম!
সুনন্দা দেবী এবার চুপ করে গেছেন। অন্তরে অন্তরে ফুঁসছেন যেন। সেই দেখে বাবা আবার বললেন – সন্দেহ আমার রাস্তাতেই হয়েছিল ম্যাডাম, কিন্তু সন্দেহ পাকাপাকি হয়, যখন বাদলের বাড়িতে বসে, আপনি হোয়াটসঅ্যাপে থাম্ব চালাচালি করছিলেন, আপনার সাক্রেদ, ওরফে সিন্দিয়ার সাথে।
বাবার দিকে এবার অগ্নিগর্ভ মুখ নিয়ে তাকিয়ে সুনন্দার হিংস্র মুখ প্রকাশ্যে এসে গেল। বাবা হেসে বললেন – চোরের মায়ের বড় গলা শুনেছিলাম, এতো দেখছি, চোরের রাগ পুলিশের মত।
বাবা আবার বলতে থাকলেন – সুনন্দাদেবী, ড্রাগের ব্যাবসা তো আপনার। … সমস্ত থানার ইস্পেক্টরদেরও কিনে রেখে দিয়েছেন আপনি। কিন্তু আপনার ইনফ্লুয়েন্সের কথা তো সুর, ববি আর সুদেশ্নাও জানেনা। … তাই তারা ডিল করেন শুধুই সিন্দিয়ার সাথে। তারা জানে যে সিন্দিয়াই সমস্ত সাপ্লাই দেন। কিন্তু সাপ্লায়ার তো আপনি। …
তাই সুরদের ফোন যায় সিন্দিয়ার কাছে, মধ্যপ্রদেশ থেকে কল, ১৮ই মার্চ, সকাল ১০.৩০এ। আর ঠিক ১০.৩২এ সিন্দিয়ার কল আপনাকে। আর তারপর আপনার দুই দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু। … ববির তোলা ছবি চেয়ে নিলেন, আর সেটা আলোছায়াতে দিয়ে, তাতে সুপার ইম্পোজ করালেন ভূতুরে ট্যাটু। … আর তারপর এনিগ্মা হোটেলে ঘর নিয়ে, সেখান থেকে লেজার ফেলে, ভয় দেখিয়ে মেরে ফেললেন মহিমা মিত্রকে।
কিন্তু সেটা তো আপনার প্ল্যানের একটা দিক। অন্য প্ল্যানের দিক ছিল এই যে সমস্ত এটেনশন সিন্দিয়ার দিকে নিয়ে গিয়ে, এমন ব্যবস্থা করা যাতে ফাঁসলে উনি ফাঁসেন, আর আপনি অক্ষত থাকেন। … কি তাই তো?
সুনন্দা – কি আবোলতাবোল বলছেন আপনি!
বাবা – হোটেল এনিগ্মার রুম আপনার সইসহ আপনার নামে বুক করা, আর লেজারেও আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট রয়েছে ম্যাডাম। আর তারই সাথে আলোছায়ার রেজিস্টারেও আপনার সই। … আর শুধু তাই নয়। … হাটেহাড়ি সিরিয়ালকে ডাউন করিয়ে দিয়ে, মহিমাদেবীকে সিন্দিয়াকে দিয়ে শাসানো, আর তারপর আপনার নিজের শাসানো, যা দিয়ে আপনি প্রমাণ করতে চাইছিলেন যে সমস্ত প্রেশারটাই কেরিয়ারের প্রেশার। … সেটাও তো আপনারই প্ল্যান। …
অর্থাৎ, আপনিই একদিকে ভুতের ভয় দেখানোর প্ল্যান অতি গোপনে, মানে ববি, সুদেশ্না, সুর, এমনকি আপনার সাক্রেত, সিন্দিয়াকে না জানিয়েই করেন। আর অন্যদিকে সিন্দিয়া আপনাকে শাসাচ্ছেন, আর সেটা প্রফেশনাল একটা ব্যাপার, সেটা দেখানোর চেষ্টা করে, এমন প্রমাণ করতে চান যে প্রফেশনের প্রেশার হ্যান্ডেল না করতে পেরে, মহিমা দেবী হার্ট অ্যাটাক করেন।
ইন্সপেক্টর সাঁতরা – আমাকে আটকে রাখা হলো কেন তবে? … একজন ইনচার্জ অফিসারকে আটকে রাখা কত বড় ক্রাইম, আপনি জানেন?
বাবা – সুনন্দাদেবীকে সিন্দিয়া বলার পরেও তো উনি কনো একশন নেন নি ইন্সপেক্টর সাঁতরা। … মহিমাদেবী আপনার কাছে যখন এফআইআর করতে আসেন, তখন আপনি উনার একটা ডায়রি নেন, ডায়রি নম্বর ২০২২-০৩-১১৯। আর তার পরেপরেই আপনার ফোন যায়, সুনন্দাদেবীর কাছে, যেখানে আপনি বলেন, মহিমাদেবী একশন নিচ্ছেন, কারণ ববি, সুররা, না জানলেও, আপনি তো জানতেন, এই সমস্ত কিছুর পাণ্ডা হলেন সুনন্দা দেবী। … তাই, প্রথম আপনি ক্রিমিনালকে সাহায্য করার জন্য দোষী, এবং দ্বিতীয় অন-ডিউটি অ্যান্ড অফ-ডিউটি ড্রাগ নেবার জন্য আপনার পুলিশের চাকরি তো যাবেই, সঙ্গে জেলও হবে।
বাবা এবার বাদলস্যারের দিকে তাকিয়ে বললেন – বাদল, এরেস্ট ডেম অল। … ডা মেন ক্রিমিনাল অ্যান্ড মাস্টারপ্ল্যনার হলেন সুনন্দাদেবী। আর অন্য সকলেই ড্রাগ নেওয়া এবং সরবরাহ করার সাথে যুক্ত।… প্রমাণ সমস্ত তোমার কাছে আছে। … বাকি তুমি করে নিতে পারবে, আশা করি।
সকলকে নিয়ে চলে যাওয়া হলে, বাদল স্যার এবার বাবার কাছে এসে, বাবাকে জরিয়ে ধরলেন। … বাবা হাসিমুখে বললেন – বাদল, যা করেছেন, তা ঈশ্বর করেছেন। আমি শুধুই একটা মাধ্যম মাত্র। … তাই ধন্যবাদ দিও না আমায়।
বাদলস্যার – জানেন বিজয়দা, আমি আপনার কথা এসে দিদিকে বলেছিলাম, ইরা কেসের পরে। দিদি আপনার সাথে মিট করার জন্য খুব উত্তেজিত ছিলেন। পরে দুদুবার আমাকে মনেও করিয়েছিলেন, আপনাকে একবার উনার বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য। … আমিই কিছুতেই সময় বার করতে পারিনি। … দাদা, আপনাকে পারিশ্রমিক আমি কিই দিই বলুন তো। … দিদির মন উদার। … দিদি হয়তো, আপনাকে একটা খুব মূল্যবান জিনিস দিতেন, এমন মনে মনে ঠিক করেছিলেন। … কিন্তু আমি কি দিই?
বাবা হেসে – বাদল। দেহ ছেড়ে দিলেও, দেহের প্রতি আসক্তি মানুষের যায়না। … তোমার দিদি নিশ্চয়ই দেখছেন আমাকে; হয়তো তিনি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন এখন। তাঁর শ্রাদ্ধশান্তি ভালো করে করো, যাতে তিনি তাঁর পূর্বের শরীর থেকে মুক্ত হয়ে নতুন শরীর নিতে পারেন। … আর হ্যাঁ, পারিশ্রমিক। … পারিশ্রমিক তুমি দেবে অবশ্যই, কারণ কেসটা তোমার। … আমি কারুর থেকে আজ পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি পারিশ্রমিক নিই নি বাদল। এরপর তুমি সিদ্ধান্ত নেবে। … তবে আমার একটাই জিনিস এখানে চাওয়ার আছে। মহিমাদেবী একটি বই লিখছিলেন, অভিনয়-বিজ্ঞান বলে। … সমাপ্ত হয়েছে কিনা জানিনা। তবে আমাকে শুধু ওইটাই দাও। …
আর হ্যাঁ, ২৫এর বেশি তুমি আমায় দেবেনা। কারণ এই কেস অনেকের মনস্কাম পুড়ন করেছে। প্রথম তোমার প্রয়াত দিদির, আর দ্বিতীয়ত আমারই এই বোন, সুমনার। তার খুব ইচ্ছা ছিল, আমার সাথে একটি কেসে সে একসাথে কাজ করবে।
বাদলস্যার – আমি সমস্ত কাজ করে, দুদিনের মধ্যে আপনার বাড়ি যাচ্ছি। দিদির বই, আর পারিশ্রমিক নিয়ে উপস্থিত হচ্ছি আমি। … আর হ্যাঁ, দাদা, খুব খুব ধন্যবাদ আপনাকে। … সত্যি বলতে, আপনার বুদ্ধির রহস্য তো আমি ভেদ করতে পারিনি। কিন্তু এমন বুদ্ধি আমি নিজে কখনো সামনাসামনি দেখিনি।
বাবা হেসে বললেন – রহস্য হলো বিকারমুক্ত বুদ্ধি। … যাচনা, কল্পনা আর যোজনা, এই তিন বিকার বুদ্ধির গতি কমিয়ে দেয়, আর সত্যের অন্বেষণ করতে না দিয়ে, আজগুবি ভাবনার মধ্যে বুদ্ধিকে পতিত করে দেয়। … এই তিন বিকারের থেকে বুদ্ধিকে বার করে আনতে যেই পারবে, তার বুদ্ধিই এমন হয়ে যাবে। … তাই এই বুদ্ধি আমাকে ভগবান উপহার দেন নি, বরং যেই যাচনা, যোজনা আর কল্পনা করতে পারাকে জগত মনে করে ঈশ্বরের আশীর্বাদ, সেই সমাজকথিত আশীর্বাদের থেকে আমাকে তিনি মুক্ত রেখে, আমার উপর এই অভাবনীয় কৃপা করেছেন।
বাবা আর আমি সুমনাপিসির সাথে চলে এলাম। … বাবা ফিরতে ফিরতে পিসিকে বললেন – হ্যাঁ রে, মন ভরেছে, না এখনো ভরেনি।
পিসি হেসে বললেন – যা দেখলাম, তাতে মনে হলো কনোদিনও মন ভরবে না। … সমস্ত ড্রামার নির্দেশক ছিলেন সুনন্দা। এতো ভাবতেই পারা যায়না। … কি করে এমন করে ভাবতে পারলে তুমি?
বাবা – আবেগ রাখতে নেই ব্যাস। … ইনি ভালো, ইনি খারাপ, এই ভাবনাই আমাদেরকে ভুল পথে চালনা করে। … সুনন্দা যখন বাদলের ঘরে বসে হোয়াটসঅ্যাপ চালাচ্ছিল, আমি খালি দেখে নিয়েছিলেম দুটি কথা। সিন্দিয়ার মেসেজ, প্ল্যান একজিকিউটেড? … সুনন্দার থাম্ব দিয়ে উত্তর। … নেক্সট মেসেজ, চোট বেশি লাগে নি তো? … উত্তর, লাগেই নি। কিন্তু একটু তো এক্টিং করতেই হবে।
বাবা হেসে বললেন – ব্যাস বুঝে গেলাম, আসল কাণ্ডারি এই সুনন্দা আর সিন্দিয়া মিলে মিশে। … বাকিরা ওদের নেশার ট্র্যাপে পরে রয়েছে। … তারপর আর কি, মাথা সুনন্দা না সিন্দিয়া, সেটা বুঝতে হতো, তাই শান্ত মনে একটু কেশ সাজালাম ক্রিমিনাল সাইকোলজি অনুসারে। … সেখানে দেখলাম, ক্রিমিনাল নিশ্চয়ই নিজেকে ভিক্টিম করে দেখানোর চেষ্টা করবে। … ব্যাস তারপর কেস পরিষ্কার হয়ে গেল। …
এর সাথে ঈশ্বরের সহযোগিতা তো রয়েছেই। তিনি সাহায্য না করলে, লেজারের ব্যাপারটা কিছুতেই ধরা সম্ভব হতো না। …
পিসি – কিন্তু ড্রাগের ব্যাপারটা কি ভাবে বুঝলে তুমি?
বাবা – ববির নার্ভ দুর্বল। … ওকে জেরা করার সময়েই দেখেছিলাম, ওর হাত মাঝে মধ্যেই কেঁপে উঠছে। … আর এটাও দেখলাম যে সুদেশ্না সেটা বারবার থামিয়ে দেবার জন্য ওর হাতে হাত রাখছে। আর সুরকেও একবার দেখি যে সুদেশ্নাকে চোখের ঈসারা করে বলে দেয় যে ববির হাত কাঁপানো বন্ধ করতে। … বুঝে গেলাম যে এঁরা কিছু লুকাচ্ছে। হাত নার্ভাস ব্রেকডাউনের কারণে কাঁপে। সেটা রোগ হতে পারে, কিন্তু রোগ হলে, হাত কাঁপাতে কারুর আপত্তি থাকতো না। … ববির দুই বন্ধুর সেই হাত কাঁপাতে আপত্তি, এর মানে, সেই হাত কাঁপলে, তারাও ফেঁসে যেতে পারে। … এরপর তো শুধুই দুয়ে দুয়ে চার।
তারপর যখন সুনন্দা আর সিন্দিয়ার মধ্যে চয়েসের অপশন এসে যায়, তখন কার সাথে পুলিশের যোগাযোগ খুব বেশি, সেটা তো তোর দাদাকে প্রশ্ন করেই জেনে গেছিলাম। তুইই লাইনটা তোর দাদাকে দিয়েছিলিস, মনে আছে তো!
পিসি – পুলিশের সাথে তারই যোগাযোগ র্যান্ডম ভাবে থাকবে, যে ড্রাগের ব্যবসা করে। … হুম। কিন্তু তুমি ডায়রির নম্বরটা কি করে জানলে, যেটা মহিমা মিত্র, সাঁতরাকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন?
বাবা এবার জোরে হেসে উঠলেন – তোর মনে হয় একজন ড্রাগ অ্যাডিক্টের ডায়রি নম্বর মুখস্থ থাকবে। … সুনন্দা যখন থেকে মুভ করতে আরম্ভ করেছিলেন, সেটা মেলালেই বোঝা যায় যে, মহিমাদেবীরা বেড়িয়ে ফিরে আসার পরই সেই প্রসিডিং শুরু করেন উনি। … তাই, মহিমাদেবী যদি মুভ না করতেন, তবে সুনন্দাও মুভ করা শুরু করবে না। … বাদলকে তিনি বলেন নি, কারণ যদি বলতেন বাদল এই কেসের ব্যাপারে অনেক কিছুই আগে থেকে জানতো। … অর্থাৎ পুলিশে কমপ্লেন করতে গেছিলেন মহিমা দেবী। … কিন্তু পুলিশ তো সুনন্দার সাথে যুক্ত। তাই এফআইআর তো নেবে না পুলিশ। …
ডায়রি নিয়ে, সরাসরি সুনন্দাকে ইনফর্ম করা হয়; তারপরেই সুনন্দার মুভমেন্ট শুরু হয়। … তাই একটা ডায়রির নম্বর বলে দিলাম। ডায়রির নম্বরের প্যাটার্ন তো জানাই আছে। … আর মাসের মাঝখান, মানে ১০০টার উপর কেস তো হয়েই গেছে। … তাই একটা বলে দিলাম, ডায়রির নম্বর তো সাঁতরারও মনে নেই। কিন্তু গল্প মিলে যেতে, ও বুঝলো যে ও ধরা পরে গেছে। তাই চুপ করে গেল। পিসি – আসল কথাটা কি জানো বিজয়দা। … তুমি জিনিয়াস, এক্সট্রাওরডিনারি, এসব অনেক পরের কথা; আসল কথা হল এই যে তোমার মনঃসংযোগ। … এতটা বেশি মনঃসংযোগ তোমার যে, সময়ে গতিকেও ছাড়িয়ে আর ছাপিয়ে বেড়িয়ে যাও তুমি। … যদি এটা প্রতিভা হতো, তবে হয়তো কপি করা যেত। কিন্তু তোমারটা কনো প্রতিভা নয়। … এমন মনঃসংযোগ রাখতে পারলে, যে কেউ এই ভাবে কেস সল্ভ করতে পারবে, কিন্তু এমন মনঃসংযোগ যে এক ঋষির থাকে, আর কারুর থাকে নাকি?
