তৃতীয় পর্ব – গড়মিল
আসলে বাদল স্যার একটু কেসটা নিয়ে বাবার সাথে ডিসকাস করতেই বোধহয় এগিয়ে আসছিলেন। তাই বেশ খানিকটা মহিমাদেবীর বাড়ি থেকে দূরে আস্তেই, বাদল স্যার বাবার উদ্দেশ্যে বললেন – কি বুঝলে বিজয়দা!
বাবা – এখনো কিছু বুঝিনি, শুধুই কিছু তথ্য নিয়ে বাড়ি ফিরছি। একটু তথ্যমন্থন করতে হবে। দেখি সুর, অসুর, মন্দার পর্বত, বাসুকি সবাইকে একসঙ্গে করি। তারপর যদি শ্রীহরি কচ্ছপ হয়ে আসেন, তবে মন্থন হয়ে অমৃত, হলাহল সব বেরিয়ে আসবে নিশ্চয়। … তবে হ্যাঁ, ঠিক খুন তো এটা নয়, কিন্তু প্রেশার ক্রিয়েট করা হয়েছে একটা। … কিন্তু কে প্রেশার ক্রিয়েট করেছে, আর প্রেশার ক্রিয়েট করার কারণই বা কি, সেটা এখনও শুধুই একটা হেঁয়ালি।
বাদল স্যার – ওই সিন্দিয়াকে আমার ভালো লাগলো না একদম।
বাবা – আসলে উনি প্রডিউসার, এক্টর তো নন যে নিজের কদর্য মূর্তিকে লুকিয়ে রাখতে জানেন। … কিন্তু উনার এটিচিউড দেখে, সিদ্ধান্তে আসা সঠিক হবেনা। … সিনেমা আর্টিস্টরা উনার কাছে এমপ্লয়ি, আর উনি তাদের বস্, আর নির্দেশকরা হন ম্যানেজার। … তাই এমপ্লয়ারের এমপ্লয়িদের উদ্দেশ্যে যেমন ব্যবহার হওয়ার কথা, উনার ব্যবহারও ঠিক সেইরকমই। … তবে হ্যাঁ, লোকটা ডেঞ্জারাস।
বাদলস্যার – অভিনয়কে কেন্দ্র করেই এই প্রেশার বলতে চাইছো?
বাবা – অসম্ভব! … কেরিয়ার নিয়ে রেষারেষি থাকে, গালাগালি বা হুমকি, এমনকি ঝামেলাও থাকে। বাট আল্টিমেটলি, ওসব দুইদিনের ঝঞ্ঝাট। আবার একটা সিনেমাতে একসঙ্গে কাজ হলে, সব ভুলে যায়। যেমন প্রাইভেট ফার্মে এমপ্লয়িদের মধ্যে রেষারেষি দেখনা, সেরকমই। সেটা চুরিচামারির লেভেলে গেলেও, খুনোখুনির লেভেলে কখনোই যায়না। … অন্য কনো ব্যাপার আছে।… তবে হ্যাঁ, সিন্দিয়ার থেকে সাবধানে থাকতে হবে, ও কিন্তু মাথাগরমের লোক।
সুমনাপিসি – হ্যাঁ, খুব বাজে রেপুটেশন আছে উনার। এমনি লোক ভালো, কিন্তু উনার লেজে কেউ পা দিলে, উনি পুরো শিকারি কুকুর হয়ে যান। … তবে উনার সুখ্যাতও প্রচুর, নিজে মদ্যপান করেন না, কিন্তু প্রতি মাসে সমস্ত এক্টরদের ডেকে এনে, দেদার মদ খাওয়ান। … আর সিনেমালাইনে জানোতো, যে মদ খাওয়াবে, সেই শিকন্দর।
বাবা হেসে বললেন – হস্টেলের কালচার, তারমানে। যেই মদ খাওয়াবে, তার হয়ে সবাই কথা বলবে।
এই সমস্ত কথা বলছি আমরা, অমনি একটা লোহার রড আমাদের মধ্যে বাঁদিকে থাকা বাদলস্যারের দিকে ধেয়ে এলো। … বাবা বাদল স্যারকে তাড়াতাড়ি আটকে না নিলে, নির্ঘাত বড় আঘাত পেতেন উনি। … বাদলস্যার সেই দেখে, ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে আমাদের বললেন, সিন্দিয়া নিজেকে বড় কেউকেটা মনে করে না, আজ ওকে দেখাচ্ছি, কে আসল কেউটে, ও না আমি।
বাবা – উত্তেজিত হয়ো না। হাতি শিকার করেনা, হাতির বাচ্চাকে কেউ শিকার করবে মনে করলে, হাতি দেখিয়ে দেয় যে সে বনের রাজা নয়, কিন্তু সে বনের ঋষি। রাজাকে আক্রমণ করলেও করতে পারো, কিন্তু ঋষিকে আক্রমণ করলে, ফল ভয়ানক হয়ে যাবে। … যা হলো ভালোই হলো। এটা নাহলে, আমরা ভুল ট্র্যাকে হাঁটতাম। সিন্দিয়ার হিংস্রতা দেখে, আমরা ওকেই সন্দেহ করতাম, আর আসল আসামি পালিয়ে যেতো।
বাদলস্যার – তারমানে তুমি বলছো, সিন্দিয়ার এই ক্রাইমে কনো হাত নেই!
বাবা – না, নেই। ও যদি শিকারি হতো, তবে ও তোমায় নয়, আমায় আক্রমণ করতো। … কিন্তু তোমায় আক্রমণ করে ও বুঝিয়ে দিলো যে, ও আসলে শিকারি নয়, ও নিজের ইচ্ছামত ঘুরে বেড়াবে, এইটাই ওর সখ, আর ওর সখে কেউ হাত দিলে, ও তাকে ছেড়ে কথা বলবে না। … শিকার যদি করার হতো, ও এমন আহত করার অস্ত্রও ছারতো না, সরাসরি মেরে ফেলার চিন্তা করতো।
বাদল স্যার কিছু বলতে যাবেন, বাবা তার কথা থামিয়ে দিয়েই বললেন – সুনন্দার উপরও এমন আক্রমণ হতে পারে। … একমিনিট দাঁড়াও।
বাবা এবার পকেট থেকে ফোন বারকরে সুনন্দা দেবীকে ফোন লাগালেন। উনি ফোন তুলতে বললেন – সুনন্দাদেবী বিজয় বলছি। …
ফোনের অন্যদিকের কথা – হ্যাঁ বলুন।
বাবা – আপনার এই আগামী সপ্তাহের প্রোগাম কি আছে?
সুনন্দাদেবী – তেমন কিছু নেই। … শুধু দুটো সিনেমার শুটিং চলছে, সেটার সেটে যাওয়া আছে।
বাবা – আউটডোর!
সুনন্দাদেবী – না, স্টুডিওতে।
বাবা – পোস্টপোন করা যাবে?
সুনন্দাদেবী – কেন বলু… (ফোন মাটিতে পরে যাবার আওয়াজ)
ফোনে অস্পষ্ট ভাবে চিৎকার শোনা গেল – কি হলো কি?
অন্য কণ্ঠস্বর – ম্যাডাম, ব্রেকফেল হয়ে গেছে। ম্যাডাম কিছু করার নেই, স্পিড বেশি নেই। কনো ভাবে লর্ডসের মাঠ পৌছাতে হবে, তারপর মাঠে গাড়ি তুলে দিলে, ক্ষয়ক্ষতি কম হবে।
বাবা ফোন রেখে দিলেন। বাদলস্যার তাড়াতাড়ি গাড়ি বার করলেন। আমি, বাবা, সুমনাপিসি সকলে উঠে পরলাম গাড়িতে। আমাদের গাড়ি গোলপার্কের রাস্তার দিকে ছুটলো, তারপর যাদবপুর থানা হয়ে, বাঁদিকে আনোয়ার শাহতে আমাদের গাড়ি উঠলে প্রায় সাউথ সিটির কাছে সুনন্দাদেবীর গাড়িকে দেখতে পেলাম। … উনার পিছনে পুলিশের গাড়িও ধাওয়া করেছে। স্বাভাবিক; কতগুলো সিগনাল ভাঙতে হয়েছে, কে জানে!
আমাদের গাড়ি যতক্ষণে উনার গাড়ির কাছাকাছি পৌঁছল, ততক্ষণে সুনন্দাদেবীর ড্রাইভার উনার গারিকে লর্ডসের মাঠে তুলে দিয়েছেন। লম্বা লম্বা ঘাসের কারণে, গাড়ির স্পিড অনেকটাই কমে গেছিল। তারপরেও একটি বড়গাছে গিয়ে গাড়ি ধাক্কা মারতে, গাড়ি একটা বড় ঝাঁকুনি খেয়ে থামলো। গাড়ির পিছনের চাকা তখনও ঘুরছিল।
পুলিশও হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেলে, বাদলস্যার পিছন থেকে আওয়াজ মারলেন – ব্রেক ফেইল হয়ে গেছিল। … পুলিশ পিছন দিকে তাকাতে, বাদল স্যার নিজের পকেট থেকে সিয়াইডির আইকার্ড দেখালেন, তো পুলিশরা সকলে পিছনে সরে গেলেন। গাড়ি থেকে উদ্ধার হলেন, সুনন্দা দেবী, উনার হাতে ভালো চোট লেগেছে। ড্রাইভারের মাথার দিকে সামান্য কেটে গেছে। … দুজনকে গাড়ি থেকে বারকরে, সামনেই অরবিন্দ সেবাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হলে, ড্রাইভারকে সামান্য ফাস্টেড করে ছেড়ে দেওয়া হয়, আর সুনন্দা দেবীর হাতে এক্সরে করে প্লাস্টার করে দেওয়া হয়।
বাদল স্যার বললেন – যদি কিছু মনে না করেন, তবে আমার বাড়ি এখান থেকে কাছেই। … আপনি আমার সাথে আসুন। একটু বিশ্রাম নিয়ে যাবেন।
আমরা সকলেই গেলাম বাদলস্যারের বাড়িতে। … বাদলস্যার নিজেই চা বানিয়ে নিয়ে এলেন সকলের জন্য। বাবাও একটা সিগারেট খেয়ে এলেন বাইরের ব্যাল্কোনি থেকে। সুনন্দা দেবী মুখে বাঁহাতের চোটের ব্যাথায় অঙ্গভঙ্গি করছেন, আর ডান হাতে একবার করে ফোনে কিছু ছাপাচ্ছেন, পাশে রাখছেন, আবার মেসেজ আসছে, আবার তুলছেন।
সুনন্দাদেবী ব্যাল্কোনির দিকে পিছন করে বসেছিলেন। আর তাই বাবাকে দেখলাম, তীক্ষ্ণ নজর উনার সুনন্দাদেবীর ফোনের স্ক্রিনের দিকে। আর বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বাবার ভ্রুকুটিটা বেশ ভালো ঢেউ খেলে গেছে। … তারমানে বাবা যা অনুমান করছিলেন, তার সাথে কিছু একটা গড়মিল তো হচ্ছেই।
সুনন্দাদেবীকে এবার পুলিশ থেকেই একটা গাড়ি ঠিক করে দিয়ে, উনার বাড়িতে পৌঁছে দেন। আর আমাদেরকে বাদলস্যার গাড়িতে চাপিয়ে, ফিরিয়ে নিয়ে আসে বালিগঞ্জ সার্কুলারে, যেখানে সুমনাপিসির গাড়িটা পার্ক করা ছিল। …
বাবা একটাও কথা বললেন না। সুমনাপিসির গাড়িতে চেপেও, তেমনই । তাই বাধ্য হয়েই সুমনাপিসি বললেন – কি হলো বলোতো বিজয়দা! … কেমন যেন চুপ করে গেলে তুমি!
বাবা এতটাই মনোযোগ সহকারে ভাবছিলেন যে, পিসির কথা শুনতেই পাননি। তাই পিসি আমার দিকে তাকালেন। আমি চোখের ইশারায় বললাম, বাবা ভাবনায় মশগুল। পিসি তাই আর কথা বাড়ালেন না। আমরা পিসিদের বাড়িতেই নামলাম। পিসির কাজের লোক চা করে নিয়ে এলে, বাবা প্রথম কথা বললেন – অঙ্কটা খুবই জটিল বুঝলি সুমনা। আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলতে পারবি, আসলে তুই তো এদের অনেক কিছু কভার করিস, তাই বলতে পারলে তুই-ই পারবি।
সুমনাপিসি বেশ আগ্রহী হয়ে সামনে ঝুঁকে এলে, বাবা বললেন – আচ্ছা, মহিমা মিত্রের বাড়িতে পার্টি শেষ হলে, ববি, সুদেশ্না, আর সুর কি সরাসরি বাড়ি যেতেন নাকি, অন্যত্র যেতেন?
সুমনাপিসি – দেখো বিজয়দা, আমি এই তিনজনের ব্যাপারে যতটা জানি, এঁরা রাত্রি ২টো ৩টের আগে কখনোই বাড়ি ঢোকেন না। কিন্তু মাঝের সময়টা এঁরা কোথায় যান, সেই ডিটেল আমি তোমাকে দিতে পারবো, কিন্তু তার জন্যে আমাকে আমার নিচে যারা কাজ করে পেজ থ্রির জন্য, তাদের থেকে খবর সংগ্রহ করতে হবে। … কিন্তু কেন বলোতো
বাবা – হুম, তথ্যটা লাগবে। … কেমন যেন একটা অন্যরকম কিছু মনে হচ্ছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, একটা নাটক চলছে, চোখের সামনেই চলছে, কিন্তু ধরতে পারছিনা নাটকটা।
এতটা বলে বাবা চা খাওয়ায় মন দিলেন। প্রায় চা শেষের দিকে তখন বাবা আবার বললেন – আচ্ছা, কি সিরিয়ালে যেন সুনন্দা বেড়িয়ে যাচ্ছিল, আর মহিমা মিত্রকে ঢোকাতে চাইছিলেন সিন্দিয়া!
পিসি – হাটেহাড়ি।
বাবা – হুম, আচ্ছা সিরিয়ালের টিআরপি কি প্রথম থেকেই কম নাকি একটা পারটিকুলার সময়ের পর কমে?
পিসি – না প্রথমে খুব জনপ্রিয় ছিল। তারপরে কি হলো কে জানে, টিয়ারপি কমতে শুরু করলো। কিন্তু সিরিয়ালের দর্শকদের কিন্তু কনো কোমপ্লেন নেই জানো।
বাবা – কবে থেকে কমতে শুরু করে? মাস খানেক আগে থেকে, না আরো আগে থেকে?
পিসি – না না, এই তিন সপ্তাহ আগেও টিয়ারপি ফাটাফাটি ছিল। ভাবতে পারছো বড়পর্দার জনপ্রিয় হটস্টার, সুনন্দা। তাকে রোজ ছোটপর্দায় লোকে দেখতে পাচ্ছে।
বাবা – হুম, মানে এই দুই সাপ্তাহ থেকে ওটা ডাউন যেতে শুরু করে, তাই তো?
পিসি – হ্যাঁ, দিন পনেরো বলতে পারো।
বাবা – হুম, আজ উঠি বুঝলি। আমাকে না একটু ভাবতে হবে। … কোথায় যেন একটা সূত্র মিলে যাবার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সেই সূত্রটা মাথার মধ্যে এসেও যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
পিসি – সিন্দিয়া লোকটা কিন্তু খুব ডেঞ্জারাস দাদা। … বাদলদাকে আক্রমণ করলো। তুমি বলতে যাচ্ছিলে সুনন্দাকে প্রটেকশন দেবার কথা, কিন্তু সে তার আগেই ব্রেক ফেল করে দিলো ওর গাড়ির!
বাবা – হুম, ঠিকই বলেছিস। ব্রেক ফেল করাই হয়েছে। …
পিসি – সুনন্দা কি আন্ডার ডেঞ্জার!
বাবা – হুম, সোজাসাপটা দৃষ্টিতে দেখলে তো তাই মনে হচ্ছে। দেখা যাক। কিন্তু দেখার আগেও, যেটা করতে হবে, সেটা হলো আমাকে একটু ডিপ থিঙ্কিং করতে হবে। … তারজন্য দরকার একটা ভাতঘুম। … যাই বুঝলি, সন্ধ্যায় ফোন করছি। … কোথায় পৌছাই তার মধ্যে দেখি।
আমি আর বাবা উঠে গেলাম এবার। বাড়ি এলাম। বাবা একটা কথাও বললেন না। ভাত খেলেন। একটা সিগারেট ঠোঁটে গুঁজে এস্ট্রেটা নিয়ে সরাসরি নিজের ছোট বিছানায় টানটান শুয়ে পরলেন। আর সেখানে যাবার সময়ে আমাকে আলাদা করে বলে গেলেন। আমি একটু একা থাকবো এখন।
বুঝে গেলাম, আমার নো এন্ট্রি। … কি ভাবলেন, কি ভাবে ভাবলেন, বা আদোও কিছু ভাবলেন কিনা জানিনা। তবে একটু ঘুমিয়ে পরেছিলেন, সেটা পাশের ঘর থেকে বাবার নাক ডাকার আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারি। তবে সেটা এই ২০ মিনিটের বেশি নয়।
বাবার একটা বিশেষত্ব আছে। বাবা একটা কিছু নিয়ে ডিপ থিঙ্কিং করতে করতে ঘুমিয়ে পরেন। আর ঘুম থেকে যখন ওঠেন, তখন উনার ঘুমিয়ে পরার আগের ইনকমপ্লিট ভাবনাটা কমপ্লিট হয়ে যায়। কি করে হয় জানিনা, কিন্তু হয় এমনটা। কে জানে, ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও ভাবেন না কি?
ঘুম থেকে উঠে বাবা বললেন – অঙ্ক অনেকটাই পরিষ্কার, কিন্তু একটা ব্যাপার এখানে সব থেকে বড় প্রবলেম, সেটা হলো প্রমাণ যোগার করা অসম্ভব, আর দ্বিতীয় প্রবলেম হলো, মার্ডার ইন্সট্রুমেন্ট কি ব্যবহার হয়েছে, তার কনো আন্দাজ করতেই পারছিনা।
আমি তো এমনিই কিছু বুঝতে পারছিলাম না। এবার তো যদিও কিছু বোঝার চেষ্টা করছিলেম, সেই চেষ্টাও ছেড়ে দেবার অবস্থা হলো। আমি বললাম – কিছু ক্লু তো দাও।
বাবা – হুম, জানিস, শুটিংএর সময়ে প্লেনে বসে আছে অভিনেতা কি করে বোঝানো হয়?
আমি বললাম – একটা প্লেনের কাটিং তৈরি করা হয়, অভিনেতা চেয়ারে বসেন, আর উনার মুখের সামনে সেই প্লেনের স্লাইডটা ধরা হয়। ব্যাস, তারপর ডিরেক্টরের কেরামতি, মানে ক্যামেরার খেল।
বাবা – ভেরি গুড। ভুলে যাস না, এখানে যাদের সাথে ডিল করছি আমরা, তারা সকলেই সেই অভিনেতা বা অভিনেত্রী। তাই একটু সেরকম করে ভেবে দ্যাখ সমস্ত কিছুকে।
ওই আমি বললাম না, এবার আমার সমস্ত ভাবনা ঘেঁটে যাবে। … ঘেঁটে গেল।
বাবা দেখলাম এবার সুমনাপিসিকে ফোন করলেন। দুজনের কথাই লিখলাম এখানে।
বাবা – সুমনা যেই খবরগুলো নিতে বলেছিলাম, সেগুলো নিয়েছিস?
পিসি – হ্যাঁ নিয়েছি। প্রথম হলো এই যে, মহিমা মিত্রের বাড়ি থেকে পার্টি করে বেড়িয়ে সরাসরি তিন বন্ধু চলে যেতেন হয় কনো পাবে, নয় সিন্দিয়ার বাড়িতে। … আর এর অন্যথা কখনোই নাকি হতো না।
বাবা – হুম, আর সেই ব্যাপারটা অদ্ভুত ভাবে সকলেই চেপে গেলেন, তাই না। … যাই হোক, মহিমা মিত্র যখন মধ্যপ্রদেশে বেড়িয়ে এলেন, তখন থেকেই ওই সিরিয়ালটা, কি যেন নাম … হ্যাঁ, হাটেহাড়ি ফ্লপ খেতে আরম্ভ করে। আমি কি ঠিক বলছি?
পিসি একটু অবাক হয়ে – হ্যাঁ, কিন্তু এখানে কি কিছু কানেকশন আছে?
বাবা – হুম, আছে। মেন কানেকশনটা এখান থেকেই তৈরি হচ্ছে। … আচ্ছা রথিন রয়েছে বাড়িতে?
পিসি – হুম আছে। দেব?
বাবা – হুম একবার দে তো।
রথিনকাকা – হুম বল্, কি ইনফরমেশন লাগবে?
বাবা – সুনন্দা দেবীর সাথে পুলিশের রিলেশন, এই খবরটা লাগবে।
রথিনকাকা – খবর নিতে হবেনা। কলকাতার সমস্ত, আর বিশেষ করে সাউথ কলকাতার প্রায় সব ইন্সপেক্টর উনাকে চেনেন, এবং উনার কাছে তাঁদের বেশ যাতায়াত থাকে। সিকিউরিটি পারপাশেই।
বাবা – উমহুম, সিকিউরিটি পারপাশে নয়। … অন্য পারপাশ আছে। আমাকে একটা হেল্প করতে হবে। কিন্তু সেই হেল্প আমার লাগবে, অত্যন্ত কনফিডেন্সিয়াল ভাবে। …
রথিনকাকা – কাল ডিপার্টমেন্টে চলে আয়। হয়ে যাবে।
কি হেল্প, সেটা আমি জানতে পারিনি কারণ বাবা পরেরদিন রথিনকাকার অফিসে একাকী গেছিলেন। আমাকে নেন নি সঙ্গে। … যখন ফিরলেন, তখন সোফায় শরীরটা হেলিয়ে দিলেন। বাবার ফোন বেজে উঠলো। বাদল স্যার।
বাদল স্যার – বিজয়দা, তোমার কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে।
বাবা – হুম, সারটিফিকেশন আর ভিডিও প্রুফ রাখতে বলেছিলাম, রেখেছ?
বাদল স্যার – হ্যাঁ দাদা, এবার ওকে এরেস্ট করে নি!
বাবা – না বাদল, এখনই যদি এরেস্ট করো, তবে খুনের দায়ে এরেস্ট করতে পারবে না। … একটু অপেক্ষা করো। সবে একটা প্রমাণ পাওয়া গেছে। … তাও সেটা প্রত্যক্ষ ভাবে এই খুনের সাথে উনি জড়িত, সেটা কনোভাবেই প্রমাণ করা যায়না। … তাই একটু অপেক্ষা করো। … চিন্তা করোনা। … তোমার দিদির মৃত্যুর পিছনে যারা যারা আছে, সকলকে সিয়াইডির হেফাজতে যেতে হবে। … আমার উপর আর ঈশ্বরের উপর ভরসা রাখো।
বাবা ফোন রেখে দিলেন। আমি বেশ বুঝতে পারলাম, কেস বাবার মাথায় সম্পূর্ণ ভাবেই এসে গেছে, কিন্তু বাবার কাছে প্রমাণের অভাব। সেটাও স্বাভাবিক। আসলে খুন তো হয়নি। প্রেসারাইজ করে হত্যা করা হয়েছে। সেটাকে হত্যা বলে দাবি করতে হলে, ভালো রকমের প্রমাণ না থাকলে, আসামিকে আটকে রাখা অসম্ভব।
কিন্তু কেসের ব্যাপারে এখন যদি আমি বাবাকে প্রশ্ন করি, জানি কনো সদোত্তর পাবো না, বাবা এমন কিছু বলবেন, তাতে আমার সমস্ত কিছু ঘেঁটে যাবে। তাই সেই ব্যাপারে কথা না বলে অন্য কিছু প্রশ্ন করলাম বাবাকে। আমি বললাম – আচ্ছা বাবা, তুমিই তো বলো, ঈশ্বরের ইচ্ছা ছাড়া কনো কিচ্ছু হয়না। তাই, যদি এই হত্যাও হয়ে থাকে, তবে তাতে ঈশ্বরের ইচ্ছাও সামিল ছিল। তবে হত্যাকারীকে ঈশ্বর খুঁজে পেতে সাহায্য করবেন কেন?
বাবা একটু হেসে বললেন – মহিমাদেবীর মধ্যে অনেক দোষ ছিল। তিনি অত্যন্ত কুসংস্কারাচ্ছন্ন একজন ব্যক্তি ছিলেন, আর তা ছাড়া, উনি প্রচণ্ড ইমোসানাল ছিলেন। … কি বলতো, ইমোসানাল ব্যক্তি ঈশ্বরের কাছে গিয়ে, ঈশ্বরের কাছে পৌছাতে পারেন না, কারণ ঈশ্বর আবেগের বিরোধী, আর ভাবের পূজারী। কিন্তু মহিমা মিত্র একজন অত্যন্ত ভালো মানুষও ছিলেন, আর সেটা হওয়া খুবই স্বভাবিক। তিনি ঈশ্বরের অত্যন্ত কাছের লোক ছিলেন, তাই জন্যই তো তাঁর মধ্যে এমন অদ্ভুত অভিনয়ের প্রতিভা ছিল, যা সত্য অর্থে বিরল।
একটা সিগারেট ধরিয়ে বাবা আবার বললেন – আসলে কি বলতো, উনি উনার প্রতিভার অহংকার করতেন না। উনি উনার প্রতিভাকে সমানে একটি বিজ্ঞানে পরিণত করার চেষ্টা করতেন। … কাবেরিদেবী হয়তো জানেন না, মহিমা দেবী একটি বই লিখছিলেন। আমি উনার ল্যাপটপে দেখলাম। … সেই বইতে উনি অভিনয়ের বিজ্ঞান লিখছিলেন। … বুঝতে পারছিস, উনি উনাকে ঈশ্বর যেই প্রতিভা দিয়েছেন, তার রীতিমত পূজা করতেন। … আর নিজের কানেই তো শুনলি, তিনি নিজের কাছের লোকদের কতটা গুরুত্ব দিতেন।
চিন্তা করে দ্যাখ, একজন কাজের লোকের কথায় উনি মদ্যপান ছেড়ে দিলেন। কতটা স্নেহ থাকলে, এমনটা করা যায়। … সেই কাছের মানুষকে যে বা যারা এমন ভাবে হত্যা করলেন, ঈশ্বর কি তাঁদেরকে হাতেনাতে কর্মফল দেবেন না। … অর্থাৎ কি দাঁড়ালো? দাঁড়ালো এই যে, নিজের ইমোসান আর কুসংস্কারের জন্য, মহিমাদেবীর যাত্রাবদল করলেন ঈশ্বর, অর্থাৎ মৃত্যু প্রদান করলেন। আর অন্যদিকে যাদের নিকৃষ্ট মানসিকতাকে ব্যবহার করে ঈশ্বর এমন করলেন, তাঁদেরকে তিনি ছেড়ে দেবেন ভেবেছিস।
আমি অনেক কিছু বুঝছিলাম, কিন্তু সত্যি করে কিচ্ছুই বুঝতে পারছিলাম না। … মা যদি প্রশ্ন না করতেন এখানে, তাহলে বাবার কথার অর্থ সত্যই বুঝতে পারতাম না। মা প্রশ্ন করলেন – ঈশ্বর এমন ভাবে কাজ করেন, তুমি কি করে জানলে?
বাবা একটু হেসে বললেন – মধু, পুরাণে ঋষিগণ যেই যেই দিব্য কথনের কথা লিখেছেন, তা তো ঈশ্বরের মহিমাকীর্তনই। আর কারুর মহিমাকীর্তন কি করে করা সম্ভব? তাঁর কর্মের ধারার প্রশস্তিই সেই উপায়। তাই না! …
সিগারেটে একটা লম্বা টান মেরে বাবা বললেন – গণেশের বুদ্ধির অহংকার হয়েছে, আর সেই বুদ্ধির নাশ করে, তাঁকে বিবেকে পরিণত করতে হবে, তাই তাঁর মাথা অর্থাৎ অহংকার কাটা যাবে। … এই বিধান তো মাতা পার্বতীই করলেন। সেরকমই তো পুরাণের পাতায় বলছে। পুরাণের পাতা এমন বলছে যে, শনিদেবকে নবগ্রহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়ে, মানুষকে বুদ্ধির বিকারের নাশের উপায় করবেন বলে, মাতা পার্বতী কি করলেন? তিনি শনির চেতনা, অর্থাৎ ধামিনিকে দিয়ে শ্রাপ দিলেন শনিকে যে তাঁর ছায়া যার উপর পরবে, তার বিকারের নাশ হবে।
সেই শনিদেবকেই আবার ধামিনির মুখে গণেশের সুন্দররূপের প্রশস্তি দিয়ে আকর্ষিত করে, কৈলাসে নিয়ে এলেন, আর নিজের পুত্রের উপর শনির ছায়া পরতে, তিনি ন্যায়দণ্ড দিয়ে শনির পায়ে আঘাত করে, তার গতি কম করে, তাকে দিয়ে সারেসাতির প্রভাব বিস্তার করালেন, আর শনির শ্রাপকে কাজে লাগিয়ে মহাদেবেরও শাপমোচন করালেন।
আমি – মহাদেবের শাপ?
বাবা – হুম, মহর্ষি কাশ্যপের শাপ, যেখানে মহাদেব নিজের হাতে নিজের সন্তানের মুণ্ডচ্ছেদ করবেন। … সেই শ্রাপকে কাজে লাগিয়ে, শনির শ্রাপকে জগতে স্থাপিত করলেন, আর সেই করম করার পিছনেও মুল কারণ কি? না সন্তানের অহংকারের নাশ করে, তাঁর মধ্যে বিবেকের সঞ্চার করা। আবার তারই সাথে সাথে, দেবতা আর মহাদেবের গণদের যেই দম্ভ, তাকেও তিনি দমন করলেন, গণেশের হাতে ন্যায়দণ্ড ধরিয়ে দিয়ে। … সব মিলিয়ে কি হলো? প্রথমে নিজের সন্তানকে তিনি শাসন করে, তাঁর অহংকারের নাশ করে তাঁর মধ্যে বিবেকের সঞ্চার করলেন। আর তারই সাথে সাথে, সমস্ত দেবদের, সমস্ত গ্রহদের নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত করে, বুদ্ধির বিকারের যিনি নাশ করেন, সেই শনিকে উন্নত স্থান দিলেন। … এবার বুঝলে?
মা বললেন – হুম, গভীর কথা। এতো দেখি সিরিয়ালে, কিন্তু মাথায় খালি একটাই কথা ঢোকে, একটা মানুষের গলা কেটে, হাতির মুখ লাগানো হলো। … এরা যে কেউই মানুষ নয়, সকলেই দেব, অর্থাৎ আমাদেরই অন্তরের বিভিন্ন ভাব, সেটা জেনেও, যখনই দেখি সিরিয়ালে, সব ভুলে যাই।
আমি বাবার কথা বুঝলাম, আর এও বুঝলাম যে বাবা কেন বললেন ঈশ্বর দোষীদের দণ্ডের ব্যবস্থা ঠিকই করবেন। কিন্তু কেসটা হয়েছিল কি? আসল দোষী কে?
