ছায়াছবি | রহস্য গল্প

বাড়ির প্রথম যেই জায়গায় বাবা গেলেন, তা হলো মহিমা মিত্রের ট্রফি কালেকশনের ঘর। ট্রফি, মেডেল এবং বিভিন্ন কৃতিত্ব অর্জনের ছবিতে ঘরটি ঠাঁসা। বাবা মিষ্টিকে প্রশ্ন করলেন – দিদি কি ডায়রি লিখতেন, মানে কিছু লেখা ঝোঁকা করতেন।

মিষ্টি প্রশ্নটা বুঝতে পারলো না, উত্তর এলো কাবেরির থেকে। উনি বললেন – দিদির সাথে পাঠ্যের একটিই সম্পর্ক থাকতো, আর তা হলো উনার স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করা। এছাড়া বইখাতার সাথে দিদির কনো সম্পর্কই থাকতো না।

বাবা বিভিন্ন বইখাতা পালটে পালটে দেখতে থাকলেন। এঁদের মধ্যে বেশ কিছু এল্ব্যামও ছিল, তাতে প্রচুর ছবি। বেশীর ভাগ ছবিই ভ্রমণের ছবি। সিঙ্গিল ছবি, বা ছবিতে ববি, সুদেশ্না আর সুরের ছবি, এই ছিল এল্ব্যামগুলিতে।

বাবা প্রশ্ন করলেন – মহিমাদেবী ভ্রমণে খুব রুচি রাখতেন?

কামিনীদেবী – খুব একটা নয়, তবে বছরে একবার অন্তত একটা বন্ধুদের সাথে, মানে সুর, ববি আর সুদেশ্নার সাথে ট্যুরে যেতেন। … এই তো দিন ১৫ আগেও তো মধ্যপ্রদেশে ঘুরতে গেছিলেন।

বাবা – হুম, এই ছবিগুলো না (কিছু ছবি এল্ব্যামে দেখিয়ে) … একদমই রিসেন্ট ছবিগুলো।

মিষ্টি – হ্যাঁ দাদাবাবু, খুব আনন্দ করে এসেছিলেন। আমার আর কাবেরিদির জন্য একটা করে শাড়ী আর কাবেরিদির ছেলের জন্য একটা খেলনা কিনে আনেন। … দিদি এসে বলেছিলেন, কাবেরিদির ছেলে এবার ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়ে গেলে, আমাদের দুইজন আর কাবেরিদের ছেলেকে নিয়ে গ্রীষ্মের ছুটিতে একটা পাহারের দেশে ঘুরতে নিয়ে যাবেন।

বাবা একটি কথাও বললেন না। শুধু উনার চোখ ঘুরতে থাকছিলো। বসার ঘর, সাজের ঘর, নাচের ঘর, সব ঘুরে এসে, যেই ঘরে মহিমাদেবীর লাশ ছিল, সেই ঘরে প্রবেশ করলেন বাবা। বাবা যাদেরকে জেরা করবেন বলে একসঙ্গে করতে বলেছিলেন, তাদেরকে বসার ঘরে একত্রিত করা হয়ে গেছে। … বাবার আবার জেরা করার ধরন অন্যরকম। বাবা একজন একজন করে জেরা করেন না। সকলকে একসঙ্গে বসিয়ে জেরা করেন।

বাবার এই ধারাকে দেখে প্রশ্ন করতে, বাবা বলেছিলেন, একসঙ্গে বসালে কি হয় জানিস! কেউ যখন মিথ্যে বলেন, তখন সেই কথাকে মিথ্যে বলে যারা যারা জানেন, তাঁদের মুখচোখের ধারা পালটে যায়, কারণ তাঁদেরকেও তো এবার সেই একই মিথ্যে বলতে হবে, আর তাঁরা মনে মনে যা বলবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন, সেটা পালটে ফেলতে হয়। …

এখানেও তাই করলেন বাবা। গুলশান সিন্দিয়া, সুনন্দা রায়, ববি, সুদেশ্না আর সুর একসঙ্গে বসেছিলেন। তাদের মধ্যে বাবা, বাদলস্যারকে, ইন্সপেক্টর সাঁতরাকে, মিষ্টি আর কামিনীদেবীকে নিয়ে একত্রে বসলেন। এমন ভাবেই বসলেন যাতে সকলে সকলের মুখ দেখতে পারেন, আর বাবাও সকলের মুখ দেখতে পারেন।

কথা শুরু করলেন বাবাই। আর সেটা শুরু করলেন গুলশন সিন্দিয়াকে দিয়ে। বাবা বললেন – আপনি তো মহিমাদেবীকে হুমকি দিয়েছিলেন, অন্য কনো কাজ দেবেন না বলে। কথাটা কি সত্যি?

সিন্দিয়া একটু গলা খাকরে বললেন – হ্যাঁ, উনি স্টার ছিলেন, কিন্তু স্টার বলে সমস্ত আবদার তো পুড়ন করা যায়না। … আমাকে আমার ব্যবসার চিন্তা করতে হবে। হ্যাঁ উনার স্টারডম নিয়ে উনি চিন্তা করবেন, আর আমাকেও সেটা দেখতে হবে, কিন্তু নিজের ব্যবসার লস্‌ করে নিশ্চয়ই নয়।

বাবা – থ্রেটনিং দেবার সময়ে শুধুই কি আর কাজ দেবেন না বলেছিলেন, না তার সাথে খুনের হুমকিও ছিল?

সিন্দিয়া – ডা ডগ ড্যাট বারক্স, ওন্ট বাইট। যে খুনের হুমকি দেয়, সে খুন করেনা মিস্টার সিন। যে খুন করে, সে খুন করে দেয়, হুমকি দিয়ে খাল কেটে কুমির আনেনা। … এজ এ বিজনেস ম্যান, আমাকেও কিছু গুণ্ডা পুষতে হয়, তাই যদি খুন করতেই হত, তবে কি খুনের হুমকি দিতাম! … বাট না, আমি না তো এমন আওয়াজ মেরেছিলাম, আর না খুন করেছি বা করিয়েছি। … মোরওভার, মহিমা ওয়াজ আ হার্মলেস লেডি। …

কথাটা যখন সিন্দিয়া বলছিলেন, তখন সুনন্দা রায়কে একটু অস্থির লাগছিল। বাবা তাই উনাকে বললেন – আপনি তো খুনের হুমকি দিয়ে দিয়েছিলেন, তাই না সুনন্দা দেবী?

সুনন্দা দেবী একটু উত্তেজিত হয়েই বললেন – হট অফ ডা মোমেন্টে মুখ থেকে এমন অনেক কথাই বেরিয়ে যায়, তার মানে কি আমি খুন করে দেব মহিমাকে। … দেখুন বিজয়, মহিমা আর আমি অনেকদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে একসঙ্গে কাজ করছি। হ্যাঁ, ও নাটক করে, তাই আমার থেকে অনেক বেটার এক্ট্রেস। রূপ বা নাচেও আমার থেকে ভালো। বাট আমার আর ওর ইম্প্রেশনটা আলাদা। … আমি একজন হট এক্ট্রেস আর মহিমা একজন সেলিব্রিটি।

বাবা – তাহলে আপনার পথের কাঁটা ছিলেন উনি, তাই তো?

সুনন্দাদেবী – একদমই নয়। ওর আর আমার ফিল্ডটাই আলাদা। … মহিমা আজ নেই, তাতে আমার স্ট্রাগেল একদমই কমবে না। … আমার স্ট্রাগেল হট এক্ট্রেসদের সাথে, মানে জুহিন, সামিনা আর বনির সাথে। … আর মহিমার কম্পিটিশন ছিল নয়না, লাবনির সাথে। … কিন্তু হ্যাঁ, আমার জন্য হাটেহাড়ি সিরিয়াল ফ্লপ খাচ্ছিল, তাই সিন্দিয়াজি আমার জায়গায় মহিমাকে নিতে চেয়েছিল। … আমি তাতে খুব আপ্সেট হয়ে গেছিলাম, কারণ সেটা আমার কেরিয়ারে খুব বাজে ইমপ্যাক্ট ফেলতো। … এই যে সুমনার মত টপ রিপোর্টাররা আছে, ওরা আমাকে ছেড়ে দিতো, আমার এই ফেলিওর দেখিয়ে আমার তুলোধোনা করতো না।

বাবা – কিন্তু মহিমাদেবীর এতে কি কনো হাত ছিল?

সুনন্দাদেবী – না ছিল না বলেই তো উনার উপর চাপ সৃষ্টি করি। … উনি যদি না করেন রোলটা, তাহলে আমাকেও সরানো হবে না। … কারণ সিন্দিয়াজিকে বলে কনো লাভ নেই। আমি উনাকে চিনি। উনি যদি একবার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, তারপর কিছুতেই সরেন না সেখান থেকে।

বাবা – আর সেই কথোপকথনেই আপনি উত্তেজিত হয়ে যান?

সুনন্দাদেবী – মহিমাদি আমার থেকে সিনিয়ার। আর আমি নিজে উনার একজন ভক্ত। তাই আমি কি করে উনাকে এই সমস্ত কথা বলবো, কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। … একদিন রিকুয়েস্ট করেছিলাম, উনি আমার কথাকে এড়িয়ে যান। … তাই আমাকে একদিন রেগেমেগে কিছু বলতেই হতো। সেই কারণে আমি একদিন ফুল ড্রিঙ্ক করে, উনাকে কল করি, আর খুব অভদ্র ভাবে কথা বলি। … পরে একদিন এসেওছিলাম দিদির কাছে। … কারণ আমি জানতাম আমি নিশ্চয় মাত্রাতিরিক্ত বাজে ব্যবহার করেছি।

বাবা এবার কাবেরির দিকে তাকাতে, কাবেরি চোখের ইশারায় বলে দিলেন কথাটা সত্যি। বাবা আবার বললেন – সুরাহা হলো না, পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। …

সুনন্দাদেবী – মহিমাদি এতটা ইমসানাল আমি জানতাম না। … আমি ক্ষমা চাইতে উনি কান্নায় ভেঙে পরলেন, আর বললেন আমার থেকে এমন ব্যবহার উনি কিছুতেই ভাবতে পারছেন না। … আমি উনার হাতেপায়ে ধরি, সমস্ত কথা বলি যে ড্রিঙ্ক করেছিলাম যাতে রুড বিহেভ করতে পারি। কিন্তু তারপরেও উনি শুনছিলেন না। আমি তারপর হটটেম্পারড্‌ হয়ে গিয়ে কিছু গালাগালিও দিয়ে দিই, আর বলি ইচ্ছা করছে সত্যি সত্যিই তোমাকে খুন করে ফেলতে। … এক তো আমি নিজের জ্বালায় জ্বলেপুরে মরছি, তারপর তুমি আমাকে সমানে গিলটি ফিল করাচ্ছ। … শেষে রেগে মেগে বলি, বোঝো তুমি, যার ফ্যান তুমি, তাকে কটুকথা বলতে কিরকম লাগে! … ইরিটেটিং। … এই বলে আমি বেরিয়ে যাই। … বাইরে গাড়িতে উঠে যখন গেটের বাইরে যাচ্ছিলাম, তখন মহিমাদির চেঁচানো শুনেছিলাম। তারস্বরে উনি কাঁদতে কাঁদতে চেঁচাচ্ছিলেন, আমি শুনে খুব ডিপ্রেসড্‌ হয়ে যাই। আর মনে মনে একটা দ্বন্ধে ফেঁসে যাই যে, কি ভাবে দিদিকে আবার মুখ দেখাবো। … আই গট ইনটু আ টোটাল ট্রমা। … ডিসগাস্টিং হয়ে উঠেছে লাইফ আমার।

বাবা – সেই ডিসগাস্টিং অবস্থা থেকে বেরনোর জন্য মহিমাদেবীর উপর মানসিক চাপ বৃদ্ধি করা নয় তো?

সুনন্দাদেবী – কি বলছেন আপনি? আপনি জানেন, আমি যখন স্টার হইনি, তখন একমাস রোজ আমি দিদির বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম, একবার দিদিকে ছোঁবো বলে! … আমি সিনেমা করার পরেও, মাঝে মাঝে দিদির কাছে আসতাম, শুধুই দিদির নরম হাতগুলো একবার ছোঁবো বলে। … আই এম আ হিউজ ফ্যান অফ হার। … শি ঈশ মাই লাইফস্‌ ওনলি লাভ।

কথাগুলো বলার সময়ে সুনন্দার চোখ ভরে এলো। বাবা অভিনেত্রীদের চোখের জলে ভিজবেন না জানি। উনারা যখন তখন চোখে জল নিয়ে আস্তে পারেন। তাই বললেন – কারুকে সাস্পেক্ট হয়?

সুনন্দাদেবী – হ্যাঁ এই সিন্দিয়াকে। … সিন্দিয়া যে বলছে, আর কনো সিনেমাতে উনি দিদিকে নেবেন না। উনাকে প্রশ্ন করুন তো, কটা মুভিতে দিদিকে উনি নিয়েছেন? … আরে কি নেবেন উনি? সিনেমার কি বোঝেন উনি? উনি নিজের ব্যবসা বোঝেন খালি। … উনি কমার্শিয়াল মুভি বানান খালি, আর দিদি! … দিদি ক্লাসিক মুভি করতেন। … বুঝতে পারছেন, আর বাংলা মুভিজের সেই গোল্ডেন টাইম নেই, তারপরও দিদি ভারতরত্ন পেয়েছেন, নিজের অভিনয় দিয়ে।

সিন্দিয়া গর্জিয়ে উঠলেন – আপ কেহেনা কেয়া চাতি হে? মেইনে মহিমাজি কি কাতিল কিয়া!

সুনন্দাদেবীও গর্জে উঠলেন – হ্যাঁ, ওর নেইতো কেয়া? … যেই মহিমা মিত্র কনোদিন কমার্শিয়াল মুভিই করেন না, তিনি কমার্শিয়াল মামাসিদের খোরাক সিরিয়াল করবেন? … কি করে ভাবতে পারেন আপনি! … আসলে, আপনি মহিমাদির কেরিয়ারকে নষ্ট করতে চাইছিলেন। … উনার সাক্সেস আর ফেমের উপর আপনার কম নজর তো নেই। … এই ফেমের কারণেই তো আপনি উনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাই না! … শেষে যখন দেখলেন সেই সাক্সেস আর ফেমের শেয়ার উনি আপনাকে দেবেন না, তখন উনাকেই রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে চাইলেন। … প্রতিটি বিগ-বাজেটের সিনেমা করেন, আর সেই সময়ে দিদির একটা কম-বাজেটের সিনেমা বক্স অফিস কাঁপিয়ে দিয়ে আপনার লস্‌ করে চলে যায়। … রাগ তো আপনার থাকবেই, তাই না!

সিন্দিয়া – হোয়াট ননসেন্স, আপনাকে সিরিয়াল থেকে সরিয়ে দিয়েছি বলে, এই ভাবে আমার উপর বদলা নেবেন! আমিও সিন্দিয়া, দেখবো আপনাকে কে কাজ দেয়! আপনার কেরিয়ার আমি শেষ করে দেব!

প্রখ্যাত অভিনেতা সুর এবার বললেন – আঃ! কি হচ্ছেটাকি। এমন সময়ে সকলেরই মাথা একটু আধটু খারাপ হয়ে আছে। সিন্দিয়াজি, এই সময়ে এই ভাবে রিয়েক্ট করবেন না।

সিন্দিয়া – আমি বিজনেস ম্যান আছি। আমি মুখে শুধু বলতে পারিনা যে খুন করে দেব। প্র্যাক্টিকালিও করতে পারি।

এবার বাদল স্যার একটু উত্তেজিত হয়ে গিয়ে বললেন – আর সেই কথাটা আপনি সিয়াইডি অফিসারের সামনে বলছেন, সেটা কি জন্য! নিজের বিপদ বাড়াবার জন্য!

সিন্দিয়া – হাম দিখা দেঙ্গে হাম কেয়া কার শাকতে হে। … দিখা দেঙ্গে হাম!

এই কথা বলে কারুর দিকে না তাকিয়ে সরাসরি উঠে চলে গেলেন সিন্দিয়াজি। রাগে গোমরালেও, উঠে গেলেন না সুনন্দা। তবে রাগে উনার ধবধবে ফরসা মুখ পুরো লাল হয়ে গেল।

বাবা পরিস্থিতিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য এবার সুরকে বললেন – তাহলে, লাস্ট ট্রিপে আপনারা খুব আনন্দ করেছেন, তাই তো?

সুর একটু অস্থির হয়েছিলেন, এই সমস্ত বাক্যালাপের কারণে। এবার একটু সিরিয়াস হয়ে বসে বললেন – হ্যাঁ, বছরে একটা করে এমন ট্রিপ হতো। … উদ্যোক্তা আমরা হলেও, উত্তেজনা বা স্পিরিট আমাদের যোগাতো মহিমাই। … সেই যখন রইলো না, আর আমাদের ট্রিপ হবে কিনা, সেটাই এখন আনসারটেন।

বাবা – তো মধ্যপ্রদেশে কি নতুন কনো লোকেশন করেছে, যেখানে হন্টেড ব্যাপার স্যাপার রেখেছে।

বাবার এ কথাটা শুনে, সুদেশ্না, ববি আর সুর, তিনজনেই কেমন যেন একটা ভুত দেখার মত তাকালো বাবার দিকে। বাবা ব্যাপারটাকে একটু হাল্কা করে দেবার জন্য বললেন – না অনেক আপনাদের বেড়াতে যাবার ছবি দেখছিলাম তো। তাই বললাম। … এনি ওয়েজ, আপনারা শুনলাম রাত পর্যন্ত পার্টি করতেন, এখানে এসে।

সুর – আসলে মহিমা বাইরে ড্রিঙ্ক করতো না। আর আমরা চারজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। … তাই অন্য সবদিন আমরা তিনজন পার্টি করলেও, মাসে একটা দিন মহিমার কাছে এসেই পার্টি করতাম। … তবে এই ব্যাপারটা ওই আমাদেরকে করতে বলে।

ববি মাঝখান থেকে বললেন – কিন্তু অনেক রাত পর্যন্ত তো আমরা এখানে পার্টি করতাম না। … এই ১০টা ১১টার মধ্যেই মহিমা লাট খেয়ে যেত। তারপর আমরা চলে যেতাম।

বাবা – কোথায় যেতেন? নিজের নিজের বাড়ি নাকি, বাকি থেকে যাওয়া পার্টিটা সম্পূর্ণ করতে অন্য কোথাও?

ববি একটু আমতা আমতা করছিলেন বাবার প্রশ্নের উত্তর দিতে। তাই সুর মাঝখান থেকে বললেন – মাঝে মাঝে আমরা আমাদেরই কারুর বাড়িতে পার্টিটা কমপ্লিট করতে যেতাম ঠিকই, তবে রোজ নয়। … আসলে যেদিন ঠিক করে ট্রিপটা হতো না, সেদিনই।

সুদেশ্না – আসলে কি বলুন তো, আমাদের প্রচুর চাপে কাজ করতে হয়। … সারাদিনে ২০-২৫ জন এসে বলছেন ম্যাডাম একটা কাজ দিন না। তাদের মধ্যে আবার ৩-৪ জন আমাদের সেক্রেটারিদের কাছে হুমকিও দিয়ে যেত, তো কেউ কেউ সেক্রেটারিকে পয়সাও খাইয়ে যায়, আমাদেরকে কনভিন্স করানোর জন্য। … তার সাথে ডিরাক্টারের বকাবকি তো থাকতোই, যদিও সুরদা আর মহিমার সেইসব গল্প থাকতো না। সুরদা তো দ্বিতীয় টেক নিতই না, আর মহিমা সুদক্ষ অভিনেত্রী, ওকে নিতে হতো না।

ববি যোগ দিলো কথাতে – এছাড়াও ফ্যানদের আবদার, মাচা করতে যাবার আব্দার, আর প্রডিউসারদের প্রমোশন তো লেগেই থাকে। … অত্যন্ত হেক্টিক শিডিউল আমাদের বুঝলেন তো। … সারাদিনে কম সে কম, ৩০-৪০জন চেনা মুখের সাথে কথাবার্তা, আর ৫০-৬০জন অপরিচিতের সাথে কথা। তাছাড়া মেকআপ টেকআপের, জিম-টিমের, আর রিহার্সালের গল্প তো লেগেই থাকে।

সুর কথার সমাপ্তি করলো এবার – আর সেই কারণেই আমাদের সহজে ঘুম আসেনা বুঝলেন তো। শান্ত হয়ে বসলেই, হাজার একটা চিন্তা, দশদিক থেকে চেপে ধরে। তাই একটু ভালো মত ড্রিঙ্কস করে, ঘুম আনতে হয়। ডিল করার থাকলে, পাব-টাবে গিয়ে ড্রিঙ্কস, নাহলে এই একে অপরের বাড়িতে বসে।

মাঝে ফোড়ন কাটলেন সুনন্দা। তিনি বললেন – দিদি তো নিজের বাড়িতেই ড্রিঙ্ক করতেন!

সুদেশ্না – ওর ব্যাপারটাই অন্যরকম ছিল। ও ড্রিঙ্ক করে, অভিনয় করা চরিত্রের মধ্যে নিজেকে ঢুকিয়ে নিতো। … মানে ও আমাদের মত রিল্যাক্স হবার জন্য আমাদের সাথেই খালি ড্রিঙ্ক করতো, তাছাড়া ও নিজের অভিনয়কে ঠিক করে করার জন্যই ড্রিঙ্ক করতো।

ববি – নন্দা, দিদি একটা অন্য জাত ছিল, জানিস তো তুই। … উনি অভিনয় ছাড়া কনো কিছু নিয়ে মাথাই ঘামাতেন না। (বাবার দিকে তাকিয়ে) আমরা যখন একসাথে ড্রিঙ্ক করতাম বা ট্রিপে যেতাম, জানেন বেশীর ভাগ সময়ে, মহি বিভিন্ন এক্সপ্রেশনের পিছনে থাকা ইমোশনগুলো দেখাতো। আর আমরা অবাক হয়ে দেখতাম।

সুর – অবাক হয়ে ওরা দেখতো না। অবাক হয়ে দেখতাম আমি। … ওরা তো পয়সা রোজগারের জন্য অভিনয় করে। আমি একটু চেষ্টা করতাম অভিনয়তা প্যাসানেট ভাবে করার জন্য। আর যখন মহিকে দেখতাম, তখন অবাক হয়ে যেতাম যে, অভিনয়ও কতবড় বিজ্ঞান। … হ্যাঁ, মহি আমাদেরকে একটা এক্সপ্রেশন দেখাতো, তার পিছনে থাকা ইমোশনকে এক্সপ্লেন করতো, আর আমাদেরকে বোঝাতো যে কখন কখন সেই ইমশন জাগে। … আমরা তো অবাক হয়ে মাঝে মাঝে বলতাম, অভিনয় করতে গেলে কি সাইক্রিয়াটিস্ট হতে হয় নাকি!

সুনন্দা – দিদি একজন জিনিয়াস ছিলেন। হয়তো অভিনয় জগতে শেষ জিনিয়াস, কারণ আমাদের জেনারেশনের কেউই উনার মত জানপ্রান দিয়ে অভিনয় করেনা।

বাবা – তা আপনাদের কি মদ্যপানেই সারাদিনের ক্লান্তি মিটতো, নাকি অন্য কিছুও লাগতো?

সুর বললেন – সখে যেতাম হুঁকা পাবে। … নেশা নেই।

বাবা – ওকে, আপনাদের কন্ট্যাক্ট নম্বরটা আমাকে দিয়ে রাখুন। যদি কিছু জানার হয়, কল করে নেব। এপায়ন্টমেন্ট নিয়ে আপনাদের সময় নষ্ট করবো না।

সুনন্দা – নম্বর নিয়ে নিন, কলে আপনি আমাদের পাবেন না। … একটা মেসেজ দিয়ে রাখবেন হোয়াটসঅ্যাপে। আমরাই আপনাকে কলব্যাক করে নেব।

বাবা সকলের নম্বর নিচ্ছিলেন, এমন সময় সুমনাপিসি সুরকে প্রশ্ন করলেন – আচ্ছা সুর, মহিমাদি তোমাদের তিনজনের উপর এই মধ্যপ্রদেশ ট্রিপ থেকে এসে খেপে গেলেন কেন? ওখানে কিছু হয়েছিল নাকি? … না আসলে যেদিন দিদি ওখান থেকে ফেরেন, সেদিনই আমি দিদির সাথে একবার ফোনে কথা বলি, ওই হাটেহাড়ি সিরিয়ালে উনার যুক্ত হবার ব্যাপারে একটা ইন্টার্ভিউ চাইছিলাম। … উনি সরাসরি বলে দিলেন, সুমনা, দুদিন পরে ফোন কর আমার মাথাটা না একদম ঠিক নেই।

সুর – আরে না না, ও তেমন কিছু নয়। সুমনা তুমি তো জানোই মহি খাবার ব্যাপারে কতটা রিডিকিউলাস। … আমাদের ঠিক ছিল যে নেতাজি সুভাষে ল্যান্ড করে, আমরা জমিয়ে চিনারপার্ক আরসেলানে খেয়ে বাড়ি ফিরবো। … তা ববিরও একটা কল এসে যায়, আর আমারও। সেই জন্য খাওয়াটা কেন্স্যেল হয়ে গেছিল। সেই রাগ ওর আমার আর ববির উপর তিন-চারদিন ছিল। তারপর শেষে তো আমি ওর বাড়িতে এসে, ওকে বললাম, এতো রাগ থাকলে, শরীর ডিটারিওট করবে। তখন ও আমাকে বলল, এই রাগ কি করে হ্যান্ডেল করা যায় বলো তো। তাই আমি বললাম বাস্তু মতে, পুব দেওয়ালে ছবি টাঙাতে নেই। … সেই জন্য ও ওর ঘরের দিওয়াল থেকে ছবিটা খুলে নিলো।

সুমনাপিসি হেসে চুপ করে গেল, বাবাও আর কথা বাড়ালেন না। … এবার আমরা সেখান থেকে চলে এলাম। মহিমাদির বডির পোস্ট মর্টাম হবে। তাই তজ্জরি চলছিল সেই উদ্দেশ্যে। আর সেই কারণে সাঁতরা সেখানে থেকে গেলেন আর বাদল স্যার আমাদেরকে, মানে বাবাকে আর সুমনাপিসিকে গাড়িতে তুলে দেওয়ার জন্য এগিয়ে এলেন। আসলে এতো সেলিব্রিটির ভিড় যে, সুমনাপিসির গাড়িটা এই তল্লাটে রাখতেই পারা যায়নি। … তাই বাদল স্যার আমাদেরকে একটু এগিয়ে দিতে আসছিলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5