প্রথম পর্ব – নতুন কেস
সুমনা পিসির কথা মনে আছে? রথিনকাকার বোন? যিনি বাবার সাথে একটা কেসে একসাথে কাজ করতে চেয়েছিলেন বলে বাবা তাঁকে রেইকি করতে বলেছিলেন। রেইকি উনি করেছেন কিনা জানিনা, তবে উনার স্বপ্নপুড়ন হয়। আমরা সিকিম থেকে ফেরার প্রায় ৪ মাস পরে, মানে সেই বছরের শেষের দিকে। সময়টা শীতকাল ছিল, যদিও সেটা বলাও যা না বলাও তাই।
ছোটবেলায় শীতকাল দেখেছি। সকাল সকাল প্রাইভেট পড়তে যেতাম, সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত ঠেকলেই হাত ঝনঝনিয়ে যেত। গরমজল মেশানো জল গায়ে ঢাললেও, যেন হারকেঁপে উঠতো। সেই বেলা বাড়লেই ছাদে মাদুর পেতে বসে পড়ার বই, গল্পের বই পড়া আর দুপুরে রোদে বসে বসে কমলালেবু খাওয়া, রাত্রিবেলা চাদর থেকে হাত বের করে রুটি খাওয়ার কষ্ট আর শুতে যাবার সময়ে বিছানায় গা ঠেকলেই, কেউ বিছানায় জল ঢেলে দিয়েছে মনে করে আঁতকে ওঠা, ওসব ইতিহাস হয়ে গেছে।
এরপরেও দেখি, জ্যাকেট, মাফলার, ইত্যাদি সব চাপিয়ে রাস্তাঘাটে চলছে। বয়স্কমানুষের রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, তাঁদের কথা না বোঝা যায়, কিন্তু অল্পবয়সের লোকজনের এমন আচরণে যেমন হাসি পায়, তেমন বিরক্তও লাগে। কি করে অতো ভারিভারি জিনিসগুলো শরীরে চাপায় কে জানে! … একটাই বাঁচোয়া। অই দুই তিনটে মাস পাখা চালাতে হয়না, আর ঘাম মুছতে হয়না, এই যা।
যাইহোক, সেই আধুনিক শীতকালই ছিল, যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বোঝায় কিনা জানিনা, কিন্তু হ্যাঁ ভুগলের পাতায় যে পরেছিলাম ৩০ বছর পরপর ওয়েদার পাল্টায়, সেটার বেশ জমিয়ে প্রমাণ দেয়। সেই শীত না পরা শীতের এক সকালে, আমার ঘুম ভাঙল একটা কলিংবেলের আওয়াজে। … বাবা পিছনের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলেন বোধহয়, তাই মা আইহোল দিয়ে দেখে দরজা খুললেন।
শেষ তিনচারটে কেস বড়ই সামান্য, তাই তাতে শরীরের কনো কসরত হয়নি। সেই জন্যেই বোধহয় একটু আলসে হয়ে উঠেছিলাম। ঘড়ির দিকে তাকালাম, দেখলাম ৮টা। বাবাকে দেখলাম ব্যালকনি থেকে তাড়াতাড়ি আসলেন। সিগারেট ফেলে দিয়েছেন, কিন্তু কথা বলার সময়ে নাকদিয়ে তখনও ধুয়া বেরচ্ছে। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন – তাড়াতাড়ি ব্রাশ করে বসার ঘরে আয়। বড় কেস এসেছে।
কথাটা শুনে যেন শরীরে, মনে, বুদ্ধিতে সর্বত্র একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। কিসের যেন একটা উত্তেজনা আমাকে ঘিরে ধরলো। যেই মেয়ে, বিছনায় ঘুম ছেড়ে উঠে বসার পর ১৫ মিনিট সময় নেয় বিছনা থেকে নিজের গতরকে ভূমিতে ল্যান্ড করাতে, সে ৫ মিনিটের মধ্যে ব্রাশ করে, ফ্রেস হয়ে বসার জায়গায় চলে গেল।
সেখানে গিয়ে দেখলাম সুমনাপিসি। দেখে কেমন যেন মেজাজটা চটকে গেল। বুঝলাম, বাবা আমাকে তাড়াতাড়ি বিছনা থেকে ওঠানোর জন্য, এমন একটা সিন ক্রিয়েট করে দিলেন। কথাটা ভাবতেই যেন বিশ্বের সমস্ত আলসেমো আমাকে আবার ঘিরে ধরলো। যাই হোক, সুমনা পিসি এখন ব্যস্ত হয়ে গেছেন রিপোর্টারের কাজে, কারণ পেজ থ্রির প্রাইম রিপোর্টার এখন তিনি সুখহাট পেপারের। তবে আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন উনার আমাদের বাড়িতে খুব আসাযাওয়া ছিল, আর সেই আসাযাওয়ার উদ্দেশ্য ছিলাম আমি। তাই তাঁকে দেখেও অবজ্ঞা করতে পারিনা।
দরজা দিয়ে বেরোতেই, সুমনা পিসির চোখ পরলো আমার দিকে। একমুখ হাসি নিয়ে বললেন – কি রে মিলি, ঘুম ভাঙল? … আরে কেসের কথা বলতে যাচ্ছিলাম, তোর বাবা বলল, মিলি আসছে ব্রাশটা করে। তাই অপেক্ষা করছি। … মাঝে মাঝে যেতে পারিস তো? তোর মুখটা দেখতে পাই।
আমিও হেসে, ঘুম থেকে সবে ওঠার কারণে ধরে যাওয়া গলা নিয়ে বললাম – তুমি তো সানডেতেও বাড়ি থাকো না!
পিসি আবার বলল – তা অবশ্য ঠিক, আমি যে কখন খালি হবো, তা আমিই জানিনা। … নিজে একজন কেরানী, কিন্তু সেলিব্রিটিদের পিছনে পিছনে ঘুরতে ঘুরতে এই কেরানীর লাইফস্টাইলটা হয়ে গেছে সেলিব্রিটিদের মতই।
আমি সেই কথায় আমার ঘুমিয়ে ফুলে যাওয়া চোখ নিয়ে হেসে সোফায় মায়ের পাসে বসলাম। ঘুম থেকে ওঠার পর, মায়ের গায়ের গন্ধটা আর উষ্মাটা না পেলে যেন দিন শুরুই হতে চায় না। আর অন্যদিকে সুমনা পিসি বলতে শুরু করলেন – বিজয়, তোমার মেয়েকে নিয়ে আমার সাথে মহিমা মিত্রের বাড়ি যেতে হবে এখনই।
বাবা – কাল রাত্রে মারা গেছেন তো উনি। নিউজে চোখ বোলানোর সময় দেখলাম।
পিসি – হ্যাঁ, স্বাভাবিক হৃদাক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, এমনটাই বলা হচ্ছে। তবে আমার সিক্সথ্ সেন্স বলছে, এতে অন্য গন্ধ আছে। একমাস আগেও আমি উনাকে দেখেছি, সম্পূর্ণ সুস্থ। আর একমাসের মধ্যে কি এমন হয়ে গেল যে একজন ৩২ বছরের মেয়ে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেল! একবার চলো বিজয়। তোমার দেখার দৃষ্টি আলাদা। তুমি খালিচোখে দেখলেও, অনেক কিছু বুঝতে পারো।
বাবা – কিন্তু আমি বুঝলেই বা আমাকে এন্টারটেন করবে কেন?
পিসি – সব পুলিশরাই জানে, আমি রথিনের বোন। তাই আমাকে কেউ ঘাটায় না। আমি যদি বলি যে এই কেসের তদন্ত হোক, তবে কেউ আমাকে বাঁধা দেবে না।
বাবা – ওকে, ড্রেস করে নে। সাদা জাতীয় সালওয়ার পরবি।
আদেশের পালন হলো। বাবাকেও দেখলাম, একটা খয়েরি প্যান্টের উপর, একটা সাদা পাঞ্জাবি চাপিয়ে নিলেন। সুমনাপিসি গাড়ি নিয়ে এসেছেন। আমরা তিনজন সুমনাপিসির গাড়িতেই চলে গেলাম প্রখ্যাত অভিনেত্রী, মহিমা মিত্রের বাড়ি।
বালিগঞ্জ সার্কুলারে হাভেলি কারটিং বিশাল বাড়ি। বাড়ির সামনে ভিড় অনেকের। সেলিব্রিটি বলে কথা। ভীরের মধ্যে সমস্ত সেলিব্রিটিই রয়েছেন প্রায়। ভদ্রমহিলা শুধু সিনেমা করতেন না। টিভি সিরিয়ালও করতেন, ওয়েব সিরিজও করতেন, আবার অ্যাডও করতেন, সঙ্গে পুরনো অভ্যাস অর্থাৎ নাটকও করতেন। তাই বিভিন্ন ধরনের অভিনেতা, অভিনেত্রী, প্রযোজক, আর নির্দেশক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারসাথে ছিলেন পুলিশকর্মীরা, হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ আর রিপোর্টার।
সুমনাপিসি সেখানে ভিড় ঠেলে ভিতরে গেলেন। আমি আর বাবা উনার পিছুপিছু গেলাম। মৃতদেহকে এখনো স্থানচ্যুত করা হয়নি। মহিমা মিত্রের ভাই হলেন সিয়াইডি অফিসার, রথিনকাকুর জুনিয়ার, বাদল মিত্র। উনার কম্যান্ডে, উনি যতক্ষণ না এসে পৌঁছচ্ছেন, ততক্ষণ মৃতদেহকে সরানো হবেনা। তাই পুলিশ বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেউই মৃতদেহে হাত দেন নি।
এতে আমাদের সুবিধাই হলো। বাবাকে দেখে, পুলিস অফিসার, বালিগঞ্জ থানার ইন্সপেক্টর, সুব্রত সাঁতরা প্রশ্ন করলেন – সুমনা, ইনি কে? ইনাকে তো ঠিক চিনলাম না!
সুমনা পিসি – বিজয় সিংহ, ওরফে সিন। যিনি ইরার কেসে সিয়াইডিকে গাইড করেছিলেন।
বাবার নাম শুনেই যেন ভুত দেখার মত তটস্থ হয়ে গেলেন মিস্টার সাঁতরা। বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন – স্যার, সাধারণ মৃত্যু, এখানে তদন্তের কিছু আছে কি?
বাবা – আছে তো বটেই মিস্টার সাঁতরা। … উনার মৃত্যুর সময়ে সিটিং পসচারটা একবার দেখুন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, উনি কিছু দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলেন। আর উনার চোখের তলায় মোটা কালো দাগ বলছে যে, উনি বেশ কিছুদিন যাবত নিদ্রাহীন ভাবে রাত কাটাচ্ছিলেন। … অর্থাৎ মিস্টার সাঁতরা, স্ট্রোক হয়ে, মানে হার্ট অ্যাটাকে উনি যে দেহত্যাগ করেছেন, তা হতেই পারে, কিন্তু হার্ট অ্যাটাকটা কি রোগের কারণে হয়েছে? যদি তা না হয়, তবে কি এটা সাধারণ মৃত্যু না মার্ডার!
মিস্টার সাঁতরা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বাবার পিছনে তাকিয়ে, একটা স্যালুট মেরে দাঁড়িয়ে পরলেন। সেই দেখে বাবা পিছন ঘুরতে দেখলাম রথিনকাকুর জুনিয়ার, বাদল মিত্র দাঁড়িয়ে। … বাবার দিকে চোখ পরতেই উনি বললেন – আরে বিজয়দা! … এখানে?
বাবা – রথিন আমার বাল্যবন্ধু, তাই সুমনাও আমার বাল্যভগিনী। ওর সুত্রেই আসা হয়েছে।
বাদল মিত্র – হুম, দিদি বেশ কিছুদিন ধরেই কেমন একটা আনন্যাচারাল বিহেভ করছিলেন। আজ নয়তো কাল, একটা সাইক্রিয়াটিস্টের কাছেও দিদির যাবার কথা ছিল। তাই, আমারও তোমারই মত মনে হয় যে এই কেস সাধারণ মৃত্যু নয়। … তাই একবার মৃতদেহকে মৃত্যুঅবস্থাতেই দেখতে চেয়েছিলাম।
বাবা – একবার ঘরের তল্লাসি নিলে হয়তো কিছু সূত্র পাওয়া যেতে পারতো। কি বলো বাদল!
বাদল স্যার – বিজয়দা, তুমি এই কেসটা হ্যান্ডেল করো। আমি, আমার ডিপার্টমেন্ট, আর ইন্সপেক্টর সাঁতরা তোমাকে এসিস্ট করবো। দিদি আমার খুব প্রিয়জন ছিলেন। সেই ১৫ বছর বয়সে একটা এক্সিডেন্টে বাবা-মা হারিয়েছিলাম। তারপর থেকে দিদিই সব। তাই আমি এই কেস হ্যান্ডেল করতে গেলে, ইমোসানাল হয়ে পরবো। … তাই তুমিই কেসটা হ্যান্ডেল করো। যা লাগবে আমি দেব। এটা আমার কেস। আর আমি তোমাকে ইরার কেসে সামনে থেকে দেখেছি। তাই আমি বিশ্বাস করি, যদি কেউ সত্য উদঘাটন করতে পারে, তবে সেটা তুমিই। ডোন্ট ওয়ারী এবউট ফিজ।
বাবা – আরে না না, সত্য উদ্ঘাটন আমার পেশা অবশ্যই, তবে পেশার থেকেও বেশি, ওটা আমার নেশা। তাই ফিজ নিয়ে চিন্তা কখনোই করিনা আমি। … যাইহোক, আমি একটু খতিয়েই দেখছি তাহলে, যখন তুমি পারমিশন দিয়েই দিয়েছ। … ইনচার্জ অফিসার, মিস্টার সাঁতরা, আপনার আপত্তি নেই তো?
সাঁতরা যেন একটু আনমোনা ছিলেন। তাই একটু এদিক সেদিক করেই তড়িঘড়ি করে উত্তর দিলেন – না…না…না স্যার। … স্যার যখন বলে দিয়েছেন, এরপর আমার আর কথাই থাকতে পারেনা।
বাবা আর কথা বাড়ালেন না। তবে সার্চ করার আগে, উনি মহিমা মিত্রের এসিস্ট্যান্ট, কাবেরি দেবীকে ডাকলেন।
কাবেরি দেবী – স্যার, আমি তেমন কিছুই জানিনা। তবে হ্যাঁ, মাড্যাম বেশ কিছুদিন ধরে খুব একটা আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটাচ্ছিলেন। … আর সেই কথাটা আমিই বাদল স্যারকে জানাই। তারপর উনি সাইক্রিয়াটিস্ট-এর সাথে যোগাযোগ করেন।
বাবা – হুম, আপনি কতক্ষণ থাকতেন ম্যাডামের কাছে?
কাবেরি দেবী – স্যার, সকাল ৯টার মধ্যে চলে আসতাম। … কিছু এপয়েন্টমেন্ট থাকলে, সেটার টাইম ঠিক করতাম, উনার সিডিউল অনুসারে, আর তারপর ব্যাঙ্কট্যাঙ্কের কাজ করতে যেতাম। সেখান থেকে ফিরে, উনার সিডিউল ম্যানেজ করতাম।
বাবা – উনার সাথে কোথাও যেতেন?
কাবেরি দেবী – হ্যাঁ স্যার। প্রায় সব জায়গাতেই যেতাম, যদি তিনি আলাদা করে বারং না করতেন। … মানে শুটিং-এর সেটে যেতাম, নাটকের মঞ্চে যেতাম, এমনকি উনার যখন কেউ ইন্টার্ভিউ নিতে আসতেন, তখনও ক্যামেরার বাইরে থাকতাম।
বাবা – বাড়ি যেতেন কটায়?
কাবেরি দেবী – তেমন কনো ফিক্সড টাইম নেই স্যার। … নর্মাল দিনে, ৮টার মধ্যে চলে যেতাম। আমিও যেতাম, আর আমার সাথে সাথে রান্নার মেয়েটাও যেত। রাত্রিটা উনি বাড়িতে কাউকে রাখতে চাইতেন না। একা থাকতেই পছন্দ করতেন। … তবে আলে কালে, যখন শুটিং-এর সেট থেকে খুব রাত্রি করে ফিরতেন, তখন আমাকে আর একা একা বাড়ি ফিরতে দিতেন না। … খুব কেয়ারিং ছিলেন স্যার। এতো ব্যস্ততার মধ্যেও আমার বলুন, সারাদিনের কাজের মেয়েটার কথা বলুন বা রান্নার মেয়েটার কথা বলুন, আমাদের পার্সোনাল লাইফের উপর খুঁটিনাটি বিশয়ে নজর রখতেন স্যার।
বাবা – সবসময়ের কাজের মেয়েও কি রাত্রে চলে যেতো? …
কাবেরি দেবী – না স্যার, ওর সারভেন্ট কওয়ারটার আছে। … ওখানেই ও থাকে।
বাবা – দাঁড়ান একটুখানি কাবেরি দেবী। … আপনার থেকে অনেক কিছু জানার আছে মহিমাদেবী সম্বন্ধে। আপনার এসিস্ট ছাড়া, উনার লাইফ অ্যান্ড সিডিউল সম্বন্ধে আমাদের পক্ষে সহজ ভাবে জানা অসম্ভব। … তবে, আগে একটু সবসময়ের কাজের মেয়েটার সাথে কথা বলে নি। কি নাম ওর?
সামনে একটা অল্পবয়সী ছিপছিপে দেখতে মেয়ে এগিয়ে এলেন। নিজে থেকেই বললেন – মিষ্টি।
বাবা – বাড়ি কোথায়?
মিষ্টি – কুচবিহারে। সেখানে দিদি শুটিং-এ গেছিলেন। … আমার উপর কিছু মরদ জোর খাটাচ্ছিল। সেই দেখে, ড্রাইভারকে নিয়ে দিদি ওদের দিকে এগিয়ে আস্তে, তারা দিদিকে দেখেই ভয়ে পালায়। … আমি দিদিকে বলি আমার কেউ নেই। অন্যবস্তির মেয়েদের থেকে গায়ের রঙ ভালো বলে, আমাকে প্রায়ই কনো না কনো মরদ এমন তারা করে। সেই শুনে দিদি আমাকে সোজা গাড়িতে উঠিয়ে এখানে নিয়ে আসেন। … উনি মানুষ ছিলেন না, দেবতা ছিলেন স্যার, দেবতা।
বাবা – হুম… তো তুমি কিছুদিন যাবত তোমার দিদিকে একটু চেঁচামেচি করতে দেখছিলে কি?
মিষ্টি – হ্যাঁ দাদাবাবু। রাত্রের দিক হলেই চেঁচাতেন। এমনি দিদি অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের। কারুর উপর রেগে না রেগে গেলে, উনি কখনোই চেঁচান না। … প্রথম দিকে আমি ভাবতাম, কারুর উপর রেগে গেছেন তিনি। … কিন্তু এই চারপাঁচ দিন আগে, সেই চিৎকার খুব ভয়ানক লাগে। … আমি ঘুমিয়ে পরেছিলাম। ঘুম ভেঙে যায় সেই চিৎকারে। … কিন্তু সেই চিন্তকার শুনে কেমন যেন মনে হয়, দিদি ভয় পাচ্ছেন, তাই তাড়াতাড়ি করে দিদির কাছে ছুটে আসি।
বাবা – হুম, তারপর কি দেখলে?
মিষ্টি – দাদাবাবু, দেখলাম, ওই, ওই রাস্তার দিকের জানলার নিচের দেওয়ালে দিদি গুটিসুটি মেরে বসে রয়েছেন। … আমি দরজা খুলতেই, আমাকে দেখে, উঠে না দাঁড়িয়ে হামাগরি দেওয়ার মত হেঁটে এসে আমাকে জরিয়ে ধরলেন। … আমিও কিছু বুঝতে পাইনি। … দিদিকে বেশ কিছুবার জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে দিদি… দিদি কেবলই দেওয়ালের দিকে হাত দেখালেন, আর কিছুই বলতে পারলেন না। বড্ড ভয় পেয়েছিলেন, সেই জন্যই বোধহয়, কথা বলতে পারছিলেন না।
বাবা – আর তুমি কি করলে?
মিষ্টি – তাড়াতাড়ি ফ্রিজে দুধ রাখাছিল। একগ্লাস দুধ গরম করে এনে দিদিকে খাওয়ালাম। … দিদি দেখলাম দুধ খেয়ে শান্তি পেয়ে ঘুমিয়ে পরলেন।
বাবা – পরের দিন এই বিশয়ে প্রশ্ন করো নি?
মিষ্টি – না দাদাবাবু, দেখলাম উনি দিব্যি রয়েছেন, তাই আর উনাকে সেই কথা মনে করিয়ে দিই নি। … তবে হ্যাঁ, আমি কাবেরিদিকে কথাখানা বলেছিলাম।
বাবা এবার কাবেরি দেবীর দিকে তাকিয়ে – তারপরেই কি আপনি বাদলের সাথে যোগাযোগ করেন?
কাবেরিদেবী – হ্যাঁ, মিষ্টি বলার পরেপরেই।
বাবা এবার মিষ্টির দিকে তাকিয়ে – যেই দেওয়ালের দিকে তোমার দিদি দেখাচ্ছিলেন, সেই দেওয়ালে কিছু দেখেছিলে?
মিষ্টি – না দাদাবাবু, সেখানে তো কিছুই নেই। … একটা বড় ছবি ছিল। সেটাও তো দিদি সরিয়ে দিয়েছিলেন, এই দু সপ্তাহ আগে।
বাবা – হুম… আচ্ছা, কাল রাত্রে কনো তেমন আওয়াজ পাওনি?
মিষ্টি – হ্যাঁ পেয়েছিলাম। তবে একবার সেই চিৎকার শোনার পরেই চুপ হয়ে যায়, কনো সাড়াশব্দ নেই। তাই ঘুমিয়ে পরি। …
বাবা – কি হতে পারে, এই চিৎকারের কারণ, ধারণা আছে?
মিষ্টি – দিদি টিকটিকি খুব ভয় পেতেন। আর টিকটিকি দেখে খুব চেঁচাতেন। … দিদির ঘরে পরশু একটা টিকটিকি দেখেছিলাম। দিদিকে বলিনি, কিন্তু কাল যখন দিদি স্নানে গেছিলেন, তখন তাড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারিনি। … আমি ভেবেছিলাম, সেই টিকটিকি দেখেই দিদি চিৎকার করে ওঠেন। তারপর চেঁচানি শুনে টিকটিকি ভয় পেয়ে চলে যায়, তাই দিদিও শান্ত হয়ে যান।
বাবা – হুম, ঠিক আছে তুমি এসো এখন। কিছু মনে পরলে, কাবেরিদির কাছে আমার নম্বর থাকবে, আমাকে ফোন করে দেবে। আর আমার যদি কিছু আর জানার থাকে, আমি তোমাকে এসে জিজ্ঞেস করে নেব।
বাবা এবার কাবেরিদেবীকে বললেন – আপনার পরিবারে কে আছে?
কাবেরিদেবী – আমি আর আমার ছোট একটা ছেলে। স্বামী ডিভোর্স দিয়েদিয়েছেন।… ম্যাডামের এই সাপ্তাহ খানেক ধরে দেখছিলাম, রাত্রি হলেই, কেমন যেন একটু বেশি মদ্যপান করছেন। বুঝতে পারছিলাম, কনো টেনশনে রয়েছেন। তাই বলেছিলাম, আমি এসে কদিন থেকে যাবো? … ছেলেকে ওর দাদুদিদার কাছে কদিন রেখে দেব? … দিদি বললেন, না তোর ছেলের এখন ক্লাস ওয়ানে এডমিশনের চেষ্টা করছিস। এই সময়ে মাকে কাছে পাওয়া বাচ্চার খুব প্রয়োজন। তুই বাড়ি যা।
বাবা – হুম, ঠিক কবে থেকে এই টেনশন দেখতে পাচ্ছিলেন, বলতে পারবেন?
কাবেরিদেবী – দিন ১০ কি ১২ হবে, তার বেশি নয়।
বাবা – কনো আন্দাজ, সেই টেনশনের কারণ কি হতে পারে?
কাবেরিদেবী – সিন্দিয়া গ্রুপের সাথে একটা ঝামেলা চলছিল, বেশ কিছুদিন ধরেই। … একটা প্রোজেক্টে, ওরা সুনন্দা রায়কে অভিনেত্রী করে নিয়েছিলেন। আর মধ্যে থেকে উনারা ম্যাডামকে নিতে চাইছিলেন। … ম্যাডাম এতে আপত্তি করেন। উনি বলেন, উনি একজন স্টার। একজন স্টার কখনোই কনো অভিনয়ে মাঝখান থেকে ঢুকতে পারেন না, অন্য একজনকে রিপ্লেস করে। … ম্যাডাম এমনও বলেছিলেন যে আপনার স্ক্রিপ্টরাইটারকে নতুন করে গল্প সাজাতে বলুন। … আমি একটা অন্য চরিত্রে ঢুকে, আস্তে আস্তে মুখ্য চরিত্র হয়ে যাবো। … নির্দেশক ভাস্কর মজুমদার রাজিও ছিলেন তাতে, কিন্তু গুলশান সিন্দিয়া, মানে সিন্দিয়া গ্রুপের মালিক এতে ম্যাডামকে বলতে থাকেন যে উনি আর কনো প্রযোজনায় ম্যাডামকে নেবেন না। … সেই নিয়ে একটা টেনশন চলছিল। …
বাবা – আর সুনন্দা রায়-এর এই বিশয়ে কি মতামত ছিল?
কাবেরিদেবী – উনি ম্যাডামকে ফোন করে শাসিয়েছিলেন। ম্যাডাম উনাকে যদিও বুঝিয়েছিলেন যে, উনি এমন মাঝখান থেকে কিছুতেই করবেন না সেই চরিত্র। উনি বলেছেন স্ক্রিপ্ট পালটাতে, যদি পালটায়, তবেই করবেন। … তাতে মনে হয় সুনন্দা রায় শান্ত হয়েছিলেন।
বাবা – হুম, আর কনো টেনশন-এর কারণ কি ছিল ম্যাডামের?
কাবেরিদেবী – না, আর তো কনো তেমন কিছু ঘটেনি, আর যদি ঘটেও, তাহলে সেটা অভিনয়ের সাথে জড়িত নয়। … উনি ব্যক্তিগত ভাবে বন্ধুদের সাথে মিশতেন বা ঘুরতে যেতেন, সেগুলি আমাকে জানাতেন না। … আমাকে শুধুই প্রফেশন রিলেটেড ব্যাপারগুলিই জানাতেন, এপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করাতেন, অনেক ক্ষেত্রে ফোনে কথাও আমাকে দিয়ে বলিয়ে নিতেন। তবে ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে শুধুই ব্যঙ্কে গিয়ে টাকা রেখে আসা ব্যাস।
বাবা – উনার খুব কাছের বন্ধু বলে কেউ ছিলেন?
কাবেরিদেবী – দেবজিত সুর, মানে সুরদা; সুদেশ্না হালদার; আর ববি মানে মীনাক্ষী বাজপেয়ী। ইনারা উনার খুব অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। দিদি মদ্যপান করলেও, বাড়ির বাইরে করতেন না, এমনকি কনো পার্টিতে গিয়েও নয়। তাই ইনারা তিনজন মাসে প্রায় দুই থেকে তিনদিন একসাথে এখানেই গেটটুগেদার করতেন, একটা ছোট মদ্যপানের পার্টির মত করে। … সেদিন আমাকেও থাকতে হতো, কারণ দিদি চার পেকের বেশি খেলেই, আর নড়তে পারতেন না; তখন আমি আর মিষ্টি উনাকে শুইয়ে দিতাম, আর ববি, সুরদা আর সুদেশ্নাদিকে গাড়িতে তুলে আসতাম।
বাবা – আর কনো নেশা করতেন মহিমাদি?
কাবেরিদেবী – না সিগারেট খেতেন আর একসঙ্গে হলে মদ্যপান। … তবে ইদানীং, এই ৭ দিন হলো দিদি রোজ মদ্যপান করছিলেন, একাএকা।
বাবা – এই প্রথমবার?
কাবেরিদেবী – না, আগে নিয়ম করে খেতেন। মিষ্টি উনার হাতে পায়ে ধরে কান্নাকাটি করার পর, উনি বন্ধ করে দেন নিয়মিত খাওয়া। … আসলে, মিষ্টিকে উনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন। আমাকে আর আমার ছেলেকেও করতেন, আর করতেন উনার ভাইকে।
বাবা – ঠিক আছে, বাদল, একটা কাজ করো। এখানে তো আশা করা যায়, আজকে সকলেই আছেন। গুলশান সিন্দিয়া, সুনন্দা রায়, ববি, সুদেশ্না আর সুরকে নিজেদের সমস্ত সিডিউল ক্যান্সেল করে থাকতে বলো। … আমি, তুমি আর সাঁতরা মিলে ওদেরকে একটু জেরা করে নেব। … এদেরকে অপেক্ষা করাও, আমি একটু বাড়িটার তল্লাসি নিয়ে আসি আমার এসিস্ট্যান্টকে নিয়ে, চল মিলি। আমি বাবার সাথে এবার বাড়ির বিভিন্ন ঘরে যেতে থাকলাম, বাবা সঙ্গে নিলেন কাবেরি আর মিষ্টিকে।
