চতুর্থ পর্ব – নিউটাউনে
বাবা আর আমি এসে পৌঁছলাম মিসেস ভুঁইয়ার বাড়িতে। গাড়ি পার্ক করে, ডক্টর ভুঁইয়ার ডায়রি নিয়ে আমরা ঢুকলাম বাড়িতে। বাড়ির ড্রাইভার এবার বোধহয় জানতোই যে আমরা আসবো। তাই অপেক্ষাতেই ছিলেন। আমরা যেতেই দরজা খুলে দিলেন। বাবা সরাসরি বসার ঘরে চলে গিয়ে বললেন – সাবিত্রীদি, সেরেনা; ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড; আমি আপনাদের এখানে কিছু সিক্রেট কথা বলবো বলে ডেকেছি। যদি আপনারা আমাদের সাথে আমাদের গাড়ির ভিতরে গিয়ে বসেন। … মানে দেওয়ালেরও কান আছে তো, তাই দেওয়ালকেও এইক্ষেত্রে আমি ভরসা করতে পারছিনা।
মিসেস ভুঁইয়া আর সেরেনা আমাদের পিছনে পিছনে আমাদের গাড়িতে উঠলেন। বাবা গাড়ির সমস্ত কাঁচ বন্ধ করে দিয়ে, গাড়ির এসিটা চালিয়ে দিলেন। এতক্ষণ লক্ষ করিনি; সেরেনার দৃষ্টি যেন প্রখর ভাবে বাবার হাতে। খেয়াল করলাম যখন বাবাই বললেন – কি হলো সেরেনা, এই ডায়রিটা দেখে, এতো রাগ জন্মাচ্ছে কেন?
বাবা কথাটা বাংলায় বললেন। আর অবাক করা উত্তরটাও বাংলাতেই এলো। সেরেনা বলল – না তেমন কিছু নয়।
বাবা – তাহলে বাংলা তুমি বেশ ভালোই জানো, তাই না সেরেনা! … আর জানবে নাই বা কেন? তোমার বাঙালি মায়ের কাছেই তো তুমি বেশি সময়টা কাটিয়েছে। কি ভুল বললাম!
মিসেস ভুঁইয়া এই কথায় মাথা নামিয়ে নিলেন। বাবা তাই উনার দিকে তাকিয়ে বললেন – লজ্জা পাবার মত আপনি এমন কনো কাজ করেন নি, সাবিত্রীদি। … আপনি অবিবাহিত থেকেও যেই সন্তানকে গর্ভে এনেছিলেন, তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার মত দেশে থেকেও নষ্ট তো করেনই নি, উপরন্তু, সর্বক্ষণ তাঁর দেখভাল করেছেন। তাঁকে স্নেহ দিয়েছেন, আর তাঁকে উপযুক্তও করে তুলেছেন। …
সেরেনা একটু অবাক চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল; তাই বাবা ওকে বললেন – মুখের মিল সেরেনা। … হ্যাঁ তুমি একটা কথাও মিথ্যে বলো নি। … তোমার বাবা তোমাকে অফিসিয়ালি দত্তক নেন নি। একজন অসহায় স্ত্রীর সন্তানকে দত্তক নিয়েছিলেন। আর সেই অসহায় স্ত্রীটি হলেন তোমার মা, অর্থাৎ মিসেস সাবিত্রী ভুঁইয়া। … কি তাই তো?
সেরেনা কিছু বলতে গেলে, বাবা ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন – তুমি কিছু বলার আগে, আরো কিছু বলার আছে সেরেনা। তুমি যেমন তোমার মায়ের পরিচয় মায়ের থেকেই জেনেছিলে, তেমন তোমার বাবার পরিচয়ও তোমার মায়ের থেকেই জেনেছিলে। তাই তো? আর তোমার বায়োলজিক্যাল ফাদারের নামও তোমার দত্তক পিতাই, অর্থাৎ স্যামুয়েল ফ্লেমিং। … ঠিক বললাম?
সেরেনা – বাট, আপনি কি করে?
বাবা – ওই যে বললাম মুখের মিল, তোমার ঘরে তোমার বাবার মুখের ছবি দেখে, আর সাবিত্রীদেবীকে দেখে, একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে যায় আমার কাছে; সেরেনা তোমার মুখের গঠনটি মায়ের মত, আর চোখমুখ বাবার মত। … তা বাবার পরিচয় তো অনেকদিনই পেয়েছিলে। এখন উনার খুন করলে কেন?
মিসেস সাবিত্রী – কি বলছো বিজয়, সেরেনা খুন করতে পারেনা!
বাবা – ঠিকই বলছেন,পারেনা, কিন্তু পেরেছে। বাবা আসছে, আর কি কারণে আসছে জেনেই, আপনার সেলডিভ-এর শিশি থেকে ও বিষ চুরি করেছিল। সাতদিন – দশদিন পরপর আোপনি বিষ খালি করেন, তাই না! … তা দিদি, আপনি শেষ যখন বিষ খালি করতে গেছিলেন, কিছু পেয়েছিলেন? না। কিছু পান নি!
মিসেস ভুঁইয়া – আসলে!
বাবা – কিচ্ছু পাননি আপনি। আর তাই আমাকে বলার সময়ে, আপনার মনে পরছিল না যে কতদিন আগে তা ডিস্পোস করেছিলেন। … সত্ত্বর তো করেন নি, কিন্তু বিষ পাননি। … তাই আপনি ভেবেও নিয়েছিলেন যে মাকড়শাটা বোধহয় মরে গেছে। ফেলে দেবেন ভেবেওছিলেন, কিন্তু আপনার স্বামী তার মধ্যে মারা যান। আর আমার সাথে সেদিন কথা বলতে গিয়ে আপনার মনে পরে যে মাকড়সাটাকে তো ফেলা হয়নি! … কিন্তু শিশির দিকে তাকিয়ে, আপনি চমকে গেছিলেন, কারণ বিষ জমা হচ্ছিল, অর্থাৎ মাকড়সা তখনও মরেনি। … আপনার ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন আমি সেদিন পরেছিলাম সাবিত্রীদি। … কিন্তু ব্যাপারটা এই যে, আপনি সত্যিই বড্ড সরল। কিন্তু আপনার মেয়ে আপনার মত হলেও, বাপের থেকে জটিলতাও খানিকটা পেয়েছে; তাই ও শত্রু চিনতে পারে, যেটা আপনি পারেন না বলে, একবার নয়, দুদুবার আপনি প্রতারণার স্বীকার হয়েছেন। প্রথমবার, অবিবাহিত অবস্থায়, ডক্টর স্যামুয়েল ফ্লেমিংএর সন্তান গর্ভে লাভ করেছিলেন, যিনিই আপনার এই সুকন্যা সেরেনা ফ্লেমিং। আর দ্বিতীয়ক্ষেত্রে, আপনি আরো বড় বিপাকে পরেন।
বাবা বলতে থাকলেন – অস্ট্রেলিয়ায় থাকতেন আপনি তখন; সেখানে সিঙ্গিল মাদার হওয়া যায়, তাতে আইনগত ভাবে কনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতি আপনি যে ভুলতে পারেন নি; তাই আপনি ডেস্পারেটলি আপনার সন্তানের মাতাও যেমন হতে চেয়েছিলেন, তেমনই সে তার পিতাকে পাক, সেটাও চেয়েছিলেন। কিন্তু এমন অবস্থায় ডক্টর ফ্লেমিং আপনার দায়িত্ব নিতে রাজি হন না, কারণটাও খুবই স্পষ্ট। আপনি সুন্দরী, এবং অত্যন্ত বিশেষ ভাবে প্রকৃতিপ্রেমী; কিন্তু আপনি একজন মনপ্রাণ থেকে ভারতীয়; আর সত্য বলতে ভারতীয় মানসিকতাকে, বিশেষ করে বাঙালি মানসিকতাকে সারা পৃথিবীর মানুষ ব্যবহার করতে তো পছন্দ করে, কিন্তু গ্রহণ করতে নয়। অন্যদিকে, ডক্টর ভুঁইয়াও একই সাথে আপনার সৌন্দর্যের উপভোগকামী হয়ে ওঠেন, আর সাথে সাথে, উনার যে স্বপ্ন ছিল, তাতে আপনার প্রকৃতিপ্রেম ও জ্ঞান যে ভয়ানক ভাবে সহায়ক হবে, তাও তিনি আন্দাজ করে নেন।
তাই, উনি আপনাকে বিবাহ করতে চাইলেন, কিন্তু আপনার গর্ভে যেই ফ্লেমিং-সন্তান ছিল, তাঁকে তিনি গ্রহণ করতে রাজি হননা। এমন অবস্থায়, এক দায়িত্ববান মায়ের যা ভূমিকা, আপনি সেটাই পালন করলেন। ডক্টর ফ্লেমিং আপনার দায় নিতে না চাইলেও, আপনার গর্ভে যে উনারই সন্তান ছিল, তাঁর দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হন। আর তাই, আপনি সেরেনার জন্ম দিয়ে, ডক্টর ফ্লেমিংকেই সেই সন্তানের দত্তকপিতা করে সরকারি ভাবে হ্যান্ডওভার করলেন। আর আপনার সাথে সন্তান না থাকার কারণে, ডক্টর ভুঁইয়াও আপনাকে বিবাহ করলেন।
একটু হেসে বাবা আবার বললেন – আপনি অত্যন্ত সরল, তাই ভেবে নিয়েছিলেন যে ডক্টর ভুঁইয়া আপনাকে ভালোবাসেন, তাই আপনাকে বিবাহ করতে রাজি ছিলেন। কিন্তু বিবাহের পর, যখন আপনি আবার গর্ভবতী হন, অর্থাৎ আপনার গর্ভে যখন আপনার পুত্রসন্তান প্রিয়ম ছিল, তখন থেকেই আপনি ডক্টর ভুঁইয়ার আপনাকে বিবাহ করার আসল উদ্দেশ্য জানতে পারেন। আপনি জানতে পারেন যে, ডক্টর ভুঁইয়া একজন ভূতাত্ত্বিক হলেও, তিনি প্রকৃতিকে প্রেম করেন বলে সেই পেশায় যাননি, উপরন্তু উনি একটি গুপ্তধনের সন্ধানে এই পেশা গ্রহণ করেন, কারণ একমাত্র ভূতাত্ত্বিকের পক্ষেই কনো গুপ্তধন উদ্ধার সম্ভব।
আপনার থেকে প্রকৃতির বিজ্ঞানকে ডক্টর ভুঁইয়া অসম্ভব ভাবে রপ্ত করতে থাকেন, আর ইতিমধ্যেই আপনার থেকে জাকার্তার কাছে একটি অজানা দ্বীপে যে গুপ্তধন আছে, সেই খবরও উনি লাভ করেন। তখন ডক্টর ভুঁইয়া আর আপনি, আপনাদের পুত্রসন্তানকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়াতেই বসবাস করতেন। আর সেরেনা আপনার অত্যন্ত প্রিয়, একই সাথে আপনিই সেরেনার একমাত্র প্রিয় ব্যক্তিত্ব। সেরেনা যে আপনারই কন্যা, সেটা আপনি জানতেন, আর সেরেনার বাবাও জানতেন। সেরেনা আপনার কাছে থাকতে, আপনার সাথে বাংলায় কথা বলতে, এবং বয়স বারার সাথে সাথে, আপনার থেকে প্রকৃতিজ্ঞান অর্জন করাকেই জীবনের উদ্দেশ্য মনে করেন। কিন্তু সে আপনার কাছে আসুক, সেটা ডক্টর ফ্লেমিংএর পছন্দ ছিলনা।
কারণটা খুবই স্পষ্ট। আপনি একজন প্রকৃতিপ্রেমী; আর ডক্টর ফ্লেমিং একজন ব্যক্তিত্ব যিনি প্রকৃতির জ্ঞানকে নিয়ে বাণিজ্য করাকেই পছন্দ করেন। উনি চাইতেন উনার কন্যা উনারই মত হোক, কিন্তু আপনার কন্যা সেরেনাকে উনি দেখেন, ক্রমশ সে আপনারই মত হতে থাকে। কিন্তু নিয়তি যে সবার থেকে, সব থেকে শক্তিশালী। তাই ডক্টর ফ্লেমিং উনার মেয়েকে আটকাতে পারলেন না। সেরেনা এবার কলেজে পড়তে গেলে, আপনি ওর টিচার হন; আর সেরেনা আপনি ওর মা জেনেও, ওর বাবার কাছে আপনাকে টিচার বলেই স্থাপিত করে; তাই ওর বাবার কনো উপায় ছিলনা মেয়েকে আটকানোর।
অন্যদিকে, ডক্টর ভুঁইয়া খুব ভালো করে উনার একসময়ের সহকর্মী, ডক্টর ফ্লেমিং-এর মানসিকতা জানতেন। উনি জানতেন যে, জাকার্তার সেই দ্বীপে যদি গুপ্তধন আছে, এমন উনি জেনে যান, তবে উনাকে টক্কর দিয়ে, ডক্টর ফ্লেমিং সেই দ্বীপে গিয়ে সম্পত্তি হাতিয়ে নেবেন। তাই এবার তিনি দেশে ফিরে আসার চিন্তা করেন। আর উনার পরিবার অর্থাৎ আপনাকে ও প্রিয়মকে নিয়ে উনি ভারতে চলে আসেন; এবং জাকার্তার সেই দ্বীপে যাবার পরিকল্পনা করেন।
একটা নিশ্বাস নিয়ে বাবা আবার বললেন – আপনি প্রকৃতিকে নিজের মায়ের সমান প্রেম করেন। আর সেটা ডক্টর ভুঁইয়া খুব ভালো করেই জানতেন। তাই আপনি যে সেই প্রকৃতির সম্পত্তি লুণ্ঠনের সঙ্গ দেবেন না, সেটাও জানতেন। তাই উনি অন্য ভাবে জাকার্তার সেই দ্বীপের একটি অভিযান নিশ্চিত করেন, আর দেখান যেন তাঁকে এই এক্সপিডিশনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে; আর উনি স্বেচ্ছায় সেখানে যাচ্ছেন না। … আপনি তাই কনো বাঁধা দিলেন না, আর উনি যাতে সেলডিভ-এর খপ্পরে না পরেন, তার উপায় বলে দিলেন।
সেখানে গিয়ে, উনি আপনার থেকে শোনা ম্যাপ ফলো করে, সেই বিপুল গুপ্তধনের কাছে পৌঁছে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে উনি দেখেন যে প্রচুর সংখ্যক পাইথনের থেকেও বড় সাপ, সেই গুপ্তধনের পাহারাদার। ডক্টর ভুঁইয়া নিজের সমস্ত এক্সপিডিশনে একাধিকবার বন্যপশুদের কারণে বড় বড় বিপদ থেকে বেঁচেছেন। তাই প্রাণীহত্যা তিনি করতে মন থেকে সায় পাননা। আর তাই উনি নিজের সেই এক্সপিডিশন সেখানেই সমাপ্ত করেন। কিন্তু তা করলেও, ছোট থেকে উনি যেই স্বপ্ন দেখে এসেছেন, সেই স্বপ্নকে নিজের চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখে, উনি অনন্ত অবসাদের মধ্যে পরে যান। আর সেই অবসাদের ফলে, উনি উনার পেশাও ছেড়ে দেন; কারণ সেই পেশার উদ্দেশ্যই যে সেই গুপ্তধন লাভ ছিল, আর তা তাঁর কাছে অসম্ভবপ্রাপ্য হয়ে গেল।
পুরানো সঙ্গী, ডক্টর ভুঁইয়ার স্বপ্ন সম্বন্ধে ভালো করেই জানতেন তাঁর একসময়ের সঙ্গী, ডক্টর ফ্লেমিং। আর তাই, আকস্মিক পেশা থেকে রিটায়ার করা, আর অনন্ত ডিপ্রেশনে চলে যাওয়া যে গুপ্তধনের সাথে সংযুক্ত, সেটা ধারনা করে নিতে, ডক্টর ফ্লেমিং-এর খুব একটা অসুবিধা হয়না। আর তাই তিনি নতুন করে ফেসবুকে যোগাযোগ করলেন ডক্টর ভুঁইয়ার সাথে। … যোগাযোগ আর কথাবার্তা থেকে উনি যা জানলেন, সেই অনুসারে এটাও জেনেগেলেন যে সেই জাকার্তা দ্বীপের সমস্ত মানচিত্র তথা গুপ্তকথাকে, ডক্টর ভুঁইয়া একটি ডায়রিতে লিখে রেখেছেন, কারণ সেটি ডক্টর ভুঁইয়ার কাছে সারা জীবনের স্বপ্নপুড়নের যাত্রা ছিল।
আর তাই সেই ডায়রিটি বারবার পাবার চিন্তা করছিলেন ডক্টর ফ্লেমিং। অন্যদিকে, ডক্টর ভুঁইয়া বুঝে যান যে ফ্লেমিং যদি সেখানে যায়, তবে সেই সাপেদের হত্যা করতে সে একবারও ভাববেনা। তাই কিছুতেই সেই ডায়রি দিতে চান না ডক্টর ভুঁইয়া। … অন্যদিকে ডক্টর ফ্লেমিং হয়ে ওঠেন নাছোড়বান্দা। উনি কনো কিছু ছাড়াই একবার জাকার্তার সেই দ্বীপে যাত্রা করলেন। মেয়ে সেরেনাকেও সঙ্গে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেরেনা সেই সময়ে নিজের পিএইচডি কমপ্লিট করা, আর ন্যাট জিওতে স্বপ্নের কাজ পেয়ে, নিজের মাকে সঙ্গে নেওয়ার জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত ছিল। তাঁর কাছে তাঁর মা, তাঁর দেখা শ্রেষ্ঠ প্রকৃতিপ্রেমী হওয়া সত্ত্বেও, জীবনের চক্রবাতে বন্দি হয়ে, প্রকৃতি থেকে আজ দূরে। তাই তাঁর স্বপ্নই হয়, তাঁর মাকে আবার প্রকৃতির বুকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং তাঁর জীবনের সবথেকে প্রিয় মানুষ, তাঁর মা ও তাঁর টিচার ডক্টর সাবিত্রী ভুঁইয়ার সর্বক্ষণ সঙ্গলাভ করা।
মেয়েকে সঙ্গে না পেলেও, মেয়েকে জাকার্তা দ্বীপে যাত্রা করার কথা বলার কারণে, মেয়ে আপনার সাথে সেই বিষয়ে কথা বলেন সাবিত্রীদি, আর আপনি সেলডিভের কথা বলেন ওঁকে। ডক্টর ভুঁইয়ার ডায়রি বলছে, সেই জঙ্গলে তেমন কনো বন্যপশু নেই; কিন্তু এই সেলডিভই যেন সেই জঙ্গলের রক্ষক। দিকে দিকে সেই দ্বিপে একটি করে এমন মাকড়সা সমস্ত দ্বিপকে সুরক্ষিত করে রাখে। কিন্তু সেই কথা ডক্টর স্লেমিং জানতেন না। উনি সেই দ্বীপে গেলেন, এবং সেই মাকড়শার কবলেও পরলেন। কিন্তু আপনার থেকে জেনে, উনার মেয়ে সেরেনা উনাকে প্রতিকার বলে দেবার কারণে উনি কনোভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে সেখান থেকে ফিরে আসেন, আর সিদ্ধান্ত নেন যে কনো না কনো ভাবে ডক্টর ভুঁইয়ার ডায়রি হাতিয়ে নিতে হবে; নিশ্চয়ই সেই ডায়রিতে এমন কনো দিক দিয়ে দ্বীপে ঢোকার কথা বলা আছে, যা তিনি জানেন না।
চৌর্যবৃত্তি আপনার রক্তে নেই, সেটা ডক্টর ফ্লেমিং খুব ভালো করেই জানতেন। তাই আপনার সাথে এমনিও উনি যোগাযোগ রাখতেন না, কারণ উনি চাইতেন না যে উনার কন্যা নিজের আসল মাতৃপরিচয় পান, আর উনি জানতেন না যে সেরেনা সেই পরিচয় অনেক ছোটবেলাতেই পেয়ে গেছে, এবং তাঁর কাছে তাঁর মা-ই তাঁর সমস্ত জগত। যাইহোক, আপনার সাথে উনি যোগাযোগ করতেও চাইছলেন না, আর আপনার সাথে যোগাযোগ করে সেই ডায়রিও পাওয়া যাবেনা, তাই অন্য মাধ্যম খুঁজলেন উনি।
আর সেই মাধ্যম হলেন আপনার ছেলে প্রিয়ম। ফেসবুকে অনেক কথা বলে প্রিয়মের ব্যাপারে সমস্ত জেনে ফেলেন ডক্টর ফ্লেমিং। আর তাই ডক্টর ফ্লেমিং উনাকে আমেরিকা গিয়ে সেটেল হবার সমস্ত পয়সা দেবার প্রতিশ্রুতি দেন, সর্ত এই যে তাঁকে ওই ডায়রি দিতে হবে। … সমস্ত প্ল্যান রেডি হলে, ডায়রি নিতে ডক্টর ফ্লেমিং ভারতে এলেন, আর পিছনে পিছনে দুই ভারতীয়কে নিয়ে সেই জাকার্তা দ্বীপের অভিযানও সাজাতে থাকলেন। … এখানে এসে মেয়ের হোটেলেই উঠলেন। আর প্রিয়ম সেখানে তিনতিনবার যান।
প্রথমবার পরামর্শ করতে, দ্বিতীয়বার অর্ধেক পয়সা নিতে, আর তৃতীয়বার বাকি অর্ধেক পয়সা নিতে এবং ডায়রির জেরক্স কপি দিতে। সেরেনা সেই ডায়রির জেরক্স চুরি করে পড়ে, এবং পরে সেই ডায়রি কারুর হাতে পরলে, প্রকৃতির বিনাশলীলা চলতে পারে, তাই সেই জেরক্সকপি পরে পুরিয়েও দেয়। এই ডায়রি পড়ার পর, তার মাথা খারাপ হয়ে যায়। সাবিত্রীদি, আপনার মত আপনার কন্যাও একজন অনন্য প্রকৃতিপ্রেমী, কিছুটা আপনার ডিএনএ-র গুণে, আর বাকিটা আপনার তালিমের গুণে। আর সেই ডায়রির জেরক্স পড়ার পর, আমি নিশ্চিত, ওঁর মাথা ঘুরে যায়।
আমিও সেই ডায়রিট পড়েছি, আর তাই জানি যেকোনো প্রকৃত প্রকৃতিপ্রেমীরই সেই ডায়রি পরে মাথা ঘুরে যাবে। সেই ডায়রিতেই হয়তো প্রথমবার আপনার নামের অফুরন্ত সুখ্যাত করা আছে সাবিত্রীদি। আমার বিশ্বাস, সামনাসামনি ডক্টর ভুঁইয়া আপনার কনোদিনই প্রশংসা করেন নি, যদিও আপনার তাতে কনো মাথাব্যাথাই নেই, কারণ আপনি প্রশংসা পাবার জন্য প্রকৃতিকে প্রেম করেন না। কিন্তু সেই ডায়রির প্রথমে আপনার কথাই খালি বলা আছে। আপনার অসম্ভব প্রকৃতির প্রতি প্রেম; আপনার প্রকৃতির সম্বন্ধে অমানুষিক জ্ঞান, এবং প্রকৃতির সংলগ্ন থাকা অবস্থায়, আপনার অদ্ভুত রূপ, যা দেখে মনে হয় যেন আপনি এই প্রকৃতির নিজের সন্তান, সেই সমস্ত কথাই ওই ডায়রির প্রথম দিকে লেখা।
এরপরে যা লেখা তা হলো, উনার ছোটবেলা থেকেই গুপ্তধন লাভের লোভ আর সেই লোভের পূর্তির জন্যই ভূতাত্ত্বিক হয়ে ওঠার কথা। আপনার থেকে জাকার্তা দ্বীপের সম্বন্ধে যা জেনেছেন, তা হলো সেই ডায়রির তৃতীয় অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের থেকেই একটি ম্যাপ তৈরি করেছেন উনি, যেই ম্যাপ অনুসরণ করে, উনি একটিও সেলডিভ-এর সম্মুখীন না হয়ে, কি ভাবে দ্বীপের ঠিক মাঝামাঝি পৌঁছে গুপ্তধনের দেখা পেলেন, তা লেখা। আর শেষে সেই গুপ্তধন কারা আগলে রেখেছে, আর তা দেখে উনার নিজের হতাশা আর জীবন বাঁচার ইচ্ছার সমাপ্তির কথা লিখেছেন।
সেরেনা সেই লেখা পরে স্পষ্ট বুঝে যায় যে, ওর বাবা, মানে ডক্টর ফ্লেমিং এবার সেই দ্বীপে গিয়ে, অভিযান চালিয়ে, সেই দ্বীপকে সম্পূর্ণ ভাবে লুণ্ঠন করে, তার উপর আধিপত্য স্থাপন করবে, এবং প্রকৃতির ধ্বংস করবে। তাই সে কনো কথা না বারিয়ে, নিশ্চিত করে নেয় যে এবার ডক্টর ফ্লেমিংকে মরতে হবে। সাবিত্রীদি, আপনার কাছে তো সেরেনা রোজই আসতো। সেদিনকে আপনি যেই সময়টা বাড়ির মধ্যে থাকেন না, এবং একটু বাগানের পরিচর্যা করেন, সেই সময়ে এসে, আপনার সেলডিভের পাত্রে যতটা বিষ ছিল, সেই সমস্তটা কালেক্ট করে নিয়ে চলে যায়, এবং ডক্টর স্যামুয়েলের উপর তা প্রয়োগ করে তাঁর হত্যা করে।
কনো ভাবেই, এটিকে খুন বলা যায়না, বিশেষ করে তখন যখন উনি কিছু দিন আগেই জাকার্তার সেই দ্বীপ থেকে ঘুরে এসেছেন, যেখানে সেলডিভ-এর আখরা, আর সেই সেলডিভের বিষের কারণেই উনার মৃত্যু। তাই সেরেনা কনোভাবেই সন্দেহের তালিকায় আসে না, আর যখন এফবিআই জিজ্ঞাসাবাদ করে, তখন সেরেনা আপনার নামকে সম্পূর্ণ ভাবে গোপন করে যায়, আর তাতে অসুবিধাও হয়না, কারণ ডক্টর ফ্লেমিং আপনার সাথে যোগাযোগ রাখতেন না। সেরেনা জানতো যে কনোভাবে যদি ডক্টর ভুঁইয়ার সাথে এফবিআই যোগাযোগ স্থাপন করে নেয়, তবে আপনার বাড়িতে এসে এই সেলডিভ দেখা মাত্রই, সমস্ত সন্দেহ আপনার উপর চলে যাবে, আর সেরেনা নিজের প্রাণপ্রিয় মাকে কিছুতেই এই ভাবে আক্রান্ত হতে দেবেনা। তাই অতি কৌশলে এফবিয়াই-এর সামনে নিজেকে বাপসোহাগি মেয়ে বলে স্থাপন করে বেঁচে যান।
ঘটনা কিন্তু এখানেই শেষ হয়না সাবিত্রীদি। এর পরপর, সেরেনা কনো না কনো ভাবে ডক্টর ভুঁইয়ার সাথে কথা বলতে চাইছিল। সুযোগ পেতে একটু দেরী হয়। আর সেই সুযোগ ও এমনি এমনি পায়নি। সে আপনাকে বিরিয়ানি খাবার কথা বলে, কারণ ও জানে যে বিরিয়ানির বাজার আপনি নিজে হাতে করেন। তাই যেদিন বিরিয়ানি করবেন বলেন, ঠিক তার আগেরদিন বিকালে, যখন আপনি বাজারে যাবেন বিরিয়ানির যোগার করতে, তখন আপনার বাড়িতে আসেন। … ড্রাইভার আপনাকে নিয়ে বেরিয়েছেন, তাই বাড়িতে একাকী ডক্টর ভুঁইয়া ছিলেন। …
সেরেনা এবার উনাকে শাসাতে থাকলেন, এবং সেই কথাকাটাকাটি বেশ গুরুতর হয়ে ওঠে। সম্ভবত সেই কথার থিম ছিলেন আপনি সাবিত্রীদি। আপনি আপনাকে যেই দুই পুরুষ ব্যবহার করে গেছেন, তাঁদেরকে নিজের নির্বুদ্ধিতার দোহাই দিয়ে ক্ষমা করে দিলেও, আপনার কন্যা করেননি। আপনার কন্যা সেদিন আপনার সম্বন্ধে সমস্ত কথা বলেন, আর এই অভিযোগ করেন যে, আপনার ন্যায় এক বিদুষী, যাকে মাথায় করে রাখা উচিত ছিল, তাঁকে ব্যবহার করে, নিজেদের লোভচরিতার্থ করতে তাঁদের লজ্জা করেনা, ইত্যাদি ধরণের কথা।
ডক্টর ভুঁইয়া গোপনে আপনার গুণকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করলেও, প্রত্যক্ষ তা করতে পারতেন না, নিজের ইগো আর নিজের প্রতিষ্ঠার জন্য; উনি কিচ্ছু নন, আর সমস্ত কিছু আপনারই কারণে, এই কথাকে উনি নিতে পারতেন না; আর তাই সেই কথাকে সকলের থেকে গোপন করে আসতেন। সেইদিন প্রথম একজনকে উনি সামনে দেখেন যার থেকে সেই কথাকে উনি গোপন করতে পারলেন না। কিন্তু সেটিই উনার আত্মঘাতী হবার কারণ নয় শুধু। উনার আত্মঘাতী হবার পিছনে প্রথম চিন্তা ছিল এই যে, উনি আপনাকে সম্মান না করে ব্যবহার করে আসার জন্য যেই পরিমাণ লজ্জা পেয়েছিলেন, তার কারণে নিজের কাছেই উনি ছোট হয়ে যান; দ্বিতীয়ত, সেরেনা উনাকে প্রকৃতির অপরাধী বলে আখ্যা দেয়, আশা করি, আর সেটা উনাকে নিজের চোখেই অপরাধী করে দেয়; আর বাকি সমস্ত হলো এই যে তিনি নিজেকে নিজেই ক্ষমা করতে পারছিলেন না।
তাই তিনি ডায়রির সেই অংশ যেখানে উনি আপনার সম্বন্ধে কথা বলেছেন, সেটাকে অক্ষত রাখার চেষ্টা করে, বাকি অংশকে ছিঁড়ে ফেলতে চান। কিন্তু এই সমস্ত কিছুতেও উনি শান্ত হতে না পেরে, আত্মঘাতী হন। … এই হলো যা কিছু ঘটেছিল, তার সমস্ত বিস্তারিত বিবৃতি। এবার সেরেনা আমাকে বলবে, আমি কতটা ভুল, এই ব্যাপারে।
আমি বললাম – কিন্তু সেরেনা নিজে অপরাধী, আর সেই অপরাধ ও এফবিআই-এর থেকে গোপন করে বেঁচেও গেছে, তারপরেও ও তোমার কাছে খুঁচিয়ে ঘা করলো কেন?
বাবা হেসে বললেন – ও রেসিডেন্ট অফ ইন্ডিয়া হয়ে, সর্বক্ষণ মায়ের কাছে থাকতে চায়। বাবা স্যামুয়েল বেঁচে থাকতে তা হতে পারতো না; ডক্টর ভুঁইয়া বেঁচে থাকতে এমন করা হলে, সাবিত্রীদির চরিত্রে দাগ লেগে, উনার সম্মান হানি হতো, এমনকি প্রিয়ম আমেরিকাতে সেটেল হয়ে যাবার ফলেও এবার আর কনো বাঁধা নেই। তথ্যপ্রমাণ ওর কাছে সব আছে, কিন্তু সেটা নিয়ে এগোনোর রাস্তা ওর জানা নেই। তাই আমার দ্বারস্থ হয়েছে।
সেরেনা একটু কাঁপা কাঁপা গলায় বাংলায় বলে উঠলো – আমি কিন্তু মায়ের কাছে থাকবো বলে বাবাকে খুন করিনি। বাবা যা করতে যাচ্ছিলেন, তা প্রকৃতির ধ্বংস অভিযান। উনাকে বুঝিয়ে লাভ নেই, কারণ উনি অত্যধিক লোভী, আর উনি যখন লোভের অভিযানে চলেন, তখন উনি একজন রাক্ষস। তাই … উনাকে মেরে ফেলা ছাড়া, আর কনো উপায়ই আমার কাছে ছিলনা। … সমস্ত কিছুর শেষে, আমার মনে হয় যে আমার আর মায়ের কাছে থাকা কনো ভাবেই বাঁধা হতে পারেনা। … আমি মাকে ছাড়া থাকতে পারিনা। মা আমার কাছে সবকিছু। তাই …
বাবা – জানি, বুঝিও। আর আমার চোখে সেরেনা তুমি কনো অপরাধ করো নি। … কিন্তু শুধু আমার দৃষ্টি দিয়ে দেখলেই হবেনা এখানে, ডক্টর সাবিত্রী ভুঁইয়ার দৃষ্টিকোনও এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই উনার মত আমি জানতে চাইবো।
মিসেস ভুঁইয়া – আমি কি আর বলবো এখানে! … সেরেনা আমার প্রাণ। … অস্ট্রেলিয়া থেকে চলে আসার পর থেকে আমি খুব বিষণ্ণ থাকতাম, কারণ ওকে দেখতে পেতাম না আর। … না আমি কনো ভাবেই প্রতিশোধ স্পৃহাগ্রস্ত নই। আমি তো ওদের দুইজনকেই ক্ষমা করে দিয়েছিলাম, আর তাও যে করতে পেরেছিলাম, তা একমাত্র সেরেনার কারণে। ওর থেকে যেই ভালোবাসা পেয়েছি, তারপর আর কারুর প্রতি আমার কনো ক্ষোভ ছিলনা। … তবে সত্যি করে বলতে গেলে, প্রকৃতিকে হনন করার আরো এক ব্যক্তি আমার সম্মুখে এসেছিলেন, আর তাঁর নাম ডক্টর মারগারেট এলিনা ডসন, একজন আমেরিকান। … আজ নিজে মুখে স্বীকার করছি আমি, আমি উনাকে খুন করেছিলাম, উত্তর প্যাসিফিকের এক জঙ্গলে। বনের পশুরা মানুষ খায়না, কারণ মানুষের দেহের কীটাণু ওরা সহ্য করতে পারেনা। কিন্তু হাঙর মানুষ খায়। … আমি একটা ট্র্যাপ ফেলে, হাঙরের খাদ্য করে দিয়েছিলাম মারগারেটকে। তাই, যেই কালে আমি নিজেই এমন কাজ করেছি, সেই ক্ষেত্রে আমি আমার মেয়েকে কি আর বলবো। … তবে কিছু মনে করো না বিজয়, একজন তদন্তকারির সামনে এমন কথা বলা কখনোই উচিত নয়, তা জেনেও বলছি, আবার যদি এমন কনো প্রকৃতিবিদ্বেষী সামনে আসে, আবারও তাকে এমন ভাবে হত্যা করতে, আমি পিছুপা হবোনা। … আমার মাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য, আমি অসুর কেন রাক্ষস হতেও প্রস্তুত।
বাবা হেসে বললেন – সাবিত্রীদি, একটা কথা বলবো? … আমার চোখে একজন রিয়েল লাইফ হিরো হলেন আমার বিদিপ্তাদি, যিনি মানবজাতির সত্যের পথে যাত্রাকে অনবরুদ্ধ রাখার জন্য কারুকে হত্যা করতে দুইবার ভাবেন না। আর আপনি ও আপনার কন্যা হলেন দ্বিতীয় হিরো আমার চোখে, যারা প্রকৃতির রক্ষা করার জন্য, কারুকে হত্যা করার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার ভাবেন না। … আপনারা কার কাছে কি জানিনা, আমার চোখে রাক্ষসও নন, আর অসুরও নন। আপনারা তিনজনেই আমার চোখে অসুরদলনী মাদুর্গা। নিজের সুবিধার জন্য যারা হত্যা করেন, বা যিনি নির্দোষ তাঁকে যিনি হত্যা করেন, আমার চোখে তিনিই হত্যাকারী। যারা আমাদের জন্মজন্মের মাবাপ, সেই ঈশ্বর আর এই ধরণী আর এই ভারতমাতার কল্যাণের জন্য হত্যা করেন, তাঁরা সত্যকারের হিরো।
আবার একটু নিজের মনে হেসে – ধরা পরিলে, সাজা পাইবো আমি, কিন্তু তবুও করিব রক্ষা এই ধরণী। সেরেনা, আমি তোমার রেসিডেন্সিয়ালের জন্য সব কিছু করবো। তবে একটু আইনি ঝঞ্ঝাট পোয়াতে হবে তোমাকে।
মিসেস ভুঁইয়া – আমার কিন্তু চূড়ান্ত বিস্ময় জেগেছে বিজয়। তুমি একজায়গায় দাঁড়িয়ে, শুধুমাত্র একটা ডায়রি পরে, আমার আর সেরেনার সমস্ত জীবনকথা জানলে কি করে?
উত্তর দিলো সেরেনা – আমার মুখ বাবার সাথে আর তোমার সাথে মেলে মা, সেটাই উনার কাছে প্রথম সূত্র। তারপর আমার আর তোমার কথাগুলোকে সাজিয়ে সাজিয়ে, আর নিজের অসামান্য অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করে করে; সঙ্গে ডক্টর ভুঁইয়ার ডায়রি থেকে বাবার, উনার, তোমার আর আমার মানসিকতাকে ধরেন উনি। আর এরপর, কি কি কারণে সেই মানসিকতা জন্ম নিতে পারে, সেই অনুসারে সমস্ত সূত্রগুলোকে সাজিয়ে আমাদের জীবন এঁকে দেন উনি। … মা, উনার সম্বন্ধে দুইতিনটি কেস আমি পরেছিলাম ইন্ডিয়ার পেপারে, আর সেখান থেকেই বুঝেছিলাম, সম্পূর্ণ সত্য যদি কেউ উদ্ধার করতে পারেন, তা একমাত্র উনি। আর তার সাথে সাথে উনি একজন প্রকৃতিপ্রেমীও। তাই হয়তো আমাদের কীর্তিকে অন্যচোখে দেখতেও পারেন। তাই … একতা বড়সর রিস্ক নিয়ে ফেলি আর কি!
আমরা সেদিন চলে এলাম বাড়ি। বাবা দিন ১৫ খুব ছোটাছুটি করে, সেরেনাকে ভারতীয় অধিবাসী করে দিলেন, যদিও মুখ্যমন্ত্রীর সাহায্য এখানে খুবই লেগেছিল। … এখন সেরেনা আর সেরেনা ফ্লেমিং নয়, সে এখন ডক্টর সেরেনা ভুঁইয়া। এফিডএফিড করে নিয়ে, ন্যাট জিওতেও এখন সে ডক্টর সেরেনা ভুঁইয়া, আর তাঁর এসিস্ট্যান্ট ডক্টর সাবিত্রী ভুঁইয়া। … বাবা আর বাকি টাকাটা নেন নি। … আমরা সকলে মিলে একদিন মিসেস ভুঁইয়ার হাতে বিরিয়ানি খেলাম। সত্যিই অসামান্য বিরিয়ানি করেন উনি। …
তবে বলতেই হয়, ডক্টর সাবিত্রী ভুঁইয়া একজন সত্যিই সাধিকা। প্রকৃতির সাধিকা উনি। … এখন আমার বাবাও বেঁচে নেই, আর ডক্টর সাবিত্রীও নেই। তবে আমি আর সেরেনা খুবই কাছের বন্ধু। … ওর সাথে আমি বেশ কয়েকবার আগ্নেয়গিরির মুখেও গেছি। সেরেনাও কিন্তু কম প্রকৃতিপ্রেমী নন। তবে এঁদের কথা বলতে গেলে, আরেকজন প্রকৃতিপ্রেমীকে বাদ দেবেন না কিন্তু; তিনি আমার বাবা। যিনি প্রকৃতিপ্রেমী বলেই প্রকৃত-প্রকৃতিপ্রেমীদের সনাক্ত করতে পেরেছিলেন।
