বিতর্কিত উষ্মা | রহস্য উন্মোচন

বাবা বেশ কিছুদিন ধরেই একটু বিষাদগ্রস্ত। কারণটা উনার প্রিয় একজন গবেষকের মৃত্যু, তাও আত্মহত্যা। খবরের কাগজে খবরটা পড়েছেন তা দিন সাতেক আগে। কিন্তু এখনো বাবার বিষাদগ্রস্ত ভাবের সমাপ্তি হয়নি। যিনি আত্মহত্যা করেছেন, তিনি হলেন ডক্টর সত্যব্রত ভুঁইয়া। তিনি নাকি মস্তবড় গবেষক এবং ভূতাত্ত্বিক ছিলেন। বিবিধ নতুন নতুন ভৌগলিক তত্ত্ব উপহার দিয়েছেন উনি। বাবা উনার সাথে বেশ কিছুবার সাখ্যাতও করেছেন, আমাকেও একবার সঙ্গে নিয়ে গেছিলেন। ভদ্রলোকের ভূগোল জ্ঞান সত্যিই অনবদ্য। আর আমার বাবারও ভূগোল এক আকর্ষণ ও অধ্যাবসায়ের স্থান। তাই হয়তো! …

বিমর্ষ অবস্থায় দেখতে না পেরে, একদিন চায়ের টেবিলে বাবাকে প্রশ্ন করলাম – এতো ভেঙে পরলে কেন তুমি বাবা, ডক্টর ভুঁইয়ার মৃত্যুতে?

বাবা – একজন মানুষ, যিনি সর্বক্ষণ নতুন কিছু খোঁজার জন্য ব্যস্ত, তাঁর জীবনে কি প্রকার অবসাদ আসতে পারে মিলি! … তোর মনে আছে কিনা জানিনা, তুই আমার সাথে উনার কাছে দুবার গেছিলিস। একবার বছর চারেক আগে, যখন উনাকে দেখেছিলিস অত্যন্ত প্রাণবন্ত, আর একবার এই দুইমাস আগে। তখনও উনাকে অবসাদগ্রস্ত দেখেছিলাম। … কিন্তু সেই অবসাদের কারণটা কি? এমন ভাবে সেই অবসাদ ঘনিয়ে এলো যে এমন একজন ব্রাইট ব্যক্তিত্ব সরাসরি আত্মহত্যা করে নিলেন! … কেরকম একটা মনে খচখচ করছে। স্বস্তিতে থাকতে পারছিনা।

বাবা কথাটা বলে বিদিপ্তাদির দিকে তাকালে, বিদিপ্তাদি নিজের স্বভাববশত মুচকি হেসে বললেন – বিজয়, অনেকসময়ে হতাশাই প্রাপ্য হয় একটি মানুষের, আর সেই হতাশা যতক্ষণ না তাঁর জীবনে আসছে, ততক্ষণ থাকে জীবনের প্রতি উৎসাহ। … যেমন ধর একজন ক্লাসে ফার্স্ট হবার জন্য খুব উৎসাহী। একের পর এক পড়া শেষ করছে, আর তার উৎসাহ বাড়তে থাকছে। শেষে যখন পরীক্ষার রেজাল্ট আউট হয়, তখন সে ফার্স্ট হয়না। আর কি আসে তার? হতাশা। … তাই…

দিদি হয়তো আরো কিছু বলতে চাইছিলেন, এমন সময়ে কলিং বেল বেজে উঠতে, আমি আইহোলে তাকিয়ে দেখলাম একজন বিদেশিনী। … বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম – বিদেশিনী!

বাবা ঘাড় উঁচিয়ে দরজা খুলতে বললে, আমি দরজা খুললাম। ইংরাজিতেই উনি সমস্ত কথা বললেন, সেদিনও আর পরেও, কারণ উনি বাংলা বা কনো ভারতীয় ভাষা বোঝেনই না। বাবাও উনার সাথে ইংরাজিতেই কথা বলতেন। আপনাদের জন্য, আমি উনার আর বাবার এই কেসে সমস্ত কথা বাংলাতেই বললাম।

উনার নাম উনি বলেছিলেন সেরেনা ফ্লেমিং। নিবাস অস্ট্রেলিয়ায়। সেরেনা বললেন – গত দুইমাস ধরে আমি ভারতে রয়েছি। আমার বাবার মৃত্যুর তদন্ত করছিল এফবিয়াই। আমার বাবার মৃত্যু ভারতেই হয়েছে।

বাবা – দাঁড়ান দাঁড়ান, বাবা ইন্ডিয়াতে মারা গেছেন। ডক্টর স্যামুয়েল ফ্লেমিং এঁর কথা বলছেন কি?

সেরেনার বয়স আমার থেকে সামান্য বড় হবে। এই ২৪ কি ২৫, তার বেশি নয়। দেখতে অপরূপ সুন্দরী নয়, তবে গায়ের ধবধবে লালচে রঙ, টানটান স্কিন, আর মুখে বা সারা শরীরে একটা পিম্পিলের দাগও না থাকার জন্য, এই ৫ ফুট ৮ ইঞ্চির ভদ্রমহিলাকে অদ্ভুত সুন্দরী দেখতে লাগছিল। উনি মিষ্টি হেসে এবার বললেন – হ্যাঁ, আমি ডক্টর স্যামুয়েল ফ্লেমিং এঁরই একমাত্র কন্যা। নিজের কন্যা নই আমি, এডপ্টেড চাইল্ড। উনি বিয়ে করেন নি।

বাবা – হুম, এফবিয়াই-এর রিপোর্ট অনুসারে, উনি তো জাকার্তা অঞ্চলের কনো এক জঙ্গলের মাকড়সার বিষের শিকার, তাই না!

সেরেনা – হ্যাঁ, এফবিয়াই রিপোর্ট তো তাই বলেছে। জাকার্তা অঞ্চলের সেই বিরল আর অজানা মাকড়সার নাম বাবা দিয়েছিলেন সেলডিভ; সেই মাকড়সার রস যদি কনো ভাবে আমাদের সেলাইভার সাথে মিশে যায়, তাহলে নিস্তব্ধে সমস্ত সেল এমনই গতিতে বিভাজন হতে থাকে যে, একমাসের মধ্যে আমাদের সমস্ত শরীরের সমস্ত কোষ বিভাজিত হয়ে, আমাদের সমস্ত শরীরকে নষ্ট করে দেয়। … আর এই ভাবেই বাবার মৃত্যু হয়েছে বলে এফবিয়াই জানিয়েছে।

বাবা – উনার মৃত্যু তো প্রায় ১৫ দিন মত হয়ে গেল। তা উনি কি তার একমাস আগে, জাকার্তা গেছিলেন নাকি?

সেরেনা – হ্যাঁ, আমি জানতাম না। আসলে বাবা তো বাইরে বাইরেই থাকতেন। তা, এফবিয়াই তো সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করে এমনই বলেছে।

বাবা – আর আপনি কি করেন?

সেরেনা – জিওলজি নিয়ে কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়ে, অস্ট্রেলিয়ান জিও সার্ভেতে কর্মরত আমি। এখন অবশ্য সেই কাজ ছেড়ে দিয়েছি। আরো দুই মাস পরে, ন্যাট জিও তে আমার জয়েনিং। লাভা স্পেশালিষ্ট হয়ে চাকরি পেয়েছি।

বাবা – আগের চাকরি ছেড়ে দিলেন কেন? মানে পরের চাকরিতে জয়েন করার এতো আগে! 

সেরেনা – চাকরি তো আমার অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়। প্রকৃতির সাথে থাকা আমার প্যাসান। আমি প্রকৃতির থেকে সামান্যও দূরে থাকতে পারিনা। … আর লাভা স্পেশালিষ্ট হবার কাজ আমি পেয়ে গেছি, তাই লাভা সংক্রান্ত বিস্তারিত পড়াশোনার একটু প্রয়োজন পরেছিল।

বাবা – তো, ইন্ডিয়াতে আপনি কি বাবার মৃত্যুর পরপরই আসেন?

সেরেনা – না, ইন্ডিয়াতে আমার সব থেকে প্রিয় টিচার থাকেন। উনি আমার কলেজের জিওলজির টিচারও ছিলেন। তাই উনার কাছ থেকে লাভা সংক্রান্ত অনেক কিছু জানার জন্য, আজ থেকে প্রায় ২ মাস আগে, আগের চাকরিটা ছেড়ে, এখানে নভোটেলে আমি রয়েছি। … আমার বাবা তো আমারই হোটেলে এসে উঠেছিলেন।

বাবা – উনার এখানে আসার কারণ?

সেরেনা – তেমন বিশেষ কিছু কারণ ছিল কিনা বলতে পারবো না। তবে আমরা বাপবেটি এমনই করি। কেউ একজন যদি ছুটি পাই, তবে অন্যজন যেখানে থাকে, তাঁর কাছে গিয়ে আমরা থাকি; আর এই ভাবেই আমরা বছরের কিছুদিন অন্তত একসঙ্গে থাকতে পারি।

বাবা – আচ্ছা বেশ, এবার আমাকে বলুন, আমি আপনাকে কি ভাবে সাহায্য করতে পারি, আর তারও আগে জানতে ইচ্ছা রাখি যে, আপনি আমার সন্ধান পেলেন কিভাবে?

সেরেনা – স্যার, আমার বিশ্বাস আমার বাবার মৃত্যুর পিছনে আরো কিছু ব্যাপার আছে, যা এফবিয়াই খুঁজে পায়নি। আমি সেটা জানতে চাই। আর হ্যাঁ, আমি এখানে থাকার সময়ে, বেশ কিছু ইংলিশ পেপারে, আপনার শলভ করা কিছু কেসের ব্যাপারে জানি। আর সেটা জেনেই আমার মনে হয়েছে, এই কেসের যদি কেউ সমাধান করতে পারে, তা হলেন আপনি। … তাই আমি আপনার স্মরনাপন্ন হয়েছি। দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন।

বাবা মাথা নিচু করে কিছু চিন্তা করছিলেন; সেই দেখে সেরেনা বললেন – স্যার, আমি আপনাকে যথাযথ পারিশ্রমিক দেব। এই নিন অগ্রিম ১০ হাজার ডলার।

বাবা কিছু বলতে না পেরে, মুখের দিকে তাকালেন সেরেনার। সেরেনা আবার বললেন – যদি তদন্তের জন্য আপনাকে কোথাও যেতে হয়, সেই সম্পূর্ণ খরচ আমার; আর কেসের শেষে আপনাকে আরো ১০ হাজার ডলার পেমেন্ট করবো।

বাবা – আমি আপনার দেওয়া টাকাটা নিলাম, কিন্তু খুললাম না। … যদি দেখি যে এফবিয়াই যা বলেছে, তার বাইরে আমার আর কিছুই বলার নেই, তাহলে আপনার দেওয়া পেমেন্টটা আমি ফিরিয়ে দেব।

সেরেনা হেসে বললেন – একজন প্রকৃত প্রফেসানালের মত কথা। … নভোটেল ৩য় ওয়ার্ড, ৩১২ নম্বর রুম। রিসেপ্সনে বলা থাকবে, আপনি আপনার নাম বললেই, আপনাকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দেবে। এখন আসি তাহলে!

দরজা পর্যন্ত উনাকে ছেড়ে দিয়ে এসে বাবা সোফাতে বসে, মাথাটা এলিয়ে দিয়ে, কিছু ভাবলেন। আমি বললাম – কি হলো বাবা!

বাবা – সেরেনার ইংরাজি কথা বলার ধরনটা দেখলি!

আমি – হ্যাঁ, একদম সাবলীল ইংরাজি, যেমন বিদেশিদের হয়।

বাবা – হুম, তাই না!

আমি – আরে খুলে বলবে তো! আমি তো কিছু বুঝতে পারছিনা।

বাবা – ঠিক আছে, কাল নভোটলে যাবো তো, তখন নয় আরেকবার ভালো করে শুনে বলিস, কিছু বিশেষত্ব পেলি কিনা।

কথা বাড়ালাম না, বুঝতে পারলাম, বাবা বলতে চাইছেন না, আমার থেকে শুনে ক্রশ চেক করতে চাইছেন। তাই চেপে গেলাম। আমাদের বাড়ি থেকে নভোটল খুব দূরে নয়। বাইপাস ধরে, চিংরিহাটা দিয়ে বেরিয়ে, একটা ফ্লাইওভার থেকে নেমেই সেক্টর ফাইভ, তারপর নিউটাউনে ঢুকে একটু এগোলেই নভোটেল। পরের দিন সকাল এই ৯-১০ নাগাদ আমি আর বাবা চলে গেলাম সেখানে। ৩ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে বলতে, আমাদের বলা হলো সেরেনা ঘরে নেই, সে আসলে আমরা তাঁর সাথে যেতে পারি। এর মধ্যে হয় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, নয় ঘুরে আসতে হবে। আমরা অপেক্ষাই করলাম।

বেশি অপেক্ষা করতে হলো না। এই মিনিট দশেকের মধ্যেই সেরেনা সেখানে উপস্থিত হলো। রিসেপ্সানে গিয়ে চাবি নিতে, তাকে রিসেপ্সানের মহিলা বললেন আমাদের কথা। পিছন ঘুরে দেখতে, বাবা হাত নাড়লো। আমাদের কাছে এসে আমাদের দিকে মিষ্টি হেসে গুড মর্নিং বলে, আমাদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল ৩১২ নম্বর রুমে। নভোটেল খুবই লাকজারি হোটেল, সেটা জানতাম, কিন্তু ভিতরে এই প্রথমবার। সত্যিই ভিতরটা ঝাঁচকচকে।

ঘরে ঢুকে আমাদের বসতে দিলে, আমরা দেখলাম আমরা যেমন নর্মাল হোটেলে উঠি, এটা সেরকম নয়। এতে দুটো আলাদা আলাদা ঘর আছে, আর সঙ্গে আছে একটা বড়ধরণের বাথট্যাব দেওয়া আর স্টিমবাথের এরেঞ্জমেন্ট দেওয়া বাথরুম আর একটা খাবার জায়গা। মনে হচ্ছিল কারুর কনো ফ্ল্যাটের এপার্টমেন্ট-এ চলে এসেছি, হোটেল নয়। দুটি ঘরের মধ্যে একটি হলো বসার ঘর, গেস্টদের জন্য। আমরা সেখানেই বসলাম।

সেরেনা বসতে বসতে বলল – চা কফি কিছু!

বাবা – না ব্রেকফাস্ট করে এসেছি। আপনি কি আপনার টিচারের কাছ থেকে আসছেন!

সেরেনা – হ্যাঁ, আমি ইন্ডিয়াতে আর কারুকে চিনি না।

বাবা – আচ্ছা, তা আপনার টিচারের নামটা কি?

সেরেনা – ডক্টর সাবিত্রী ভুঁইয়া।

বাবা – ডক্টর সাবিত্রী ভুঁইয়া! … কনো ভাবে কি উনি ডক্টর সত্যব্রত ভুঁইয়ার সাথে যুক্ত!

সেরেনা – হ্যাঁ, উনার প্রয়াত স্বামীর নাম ডক্টর সত্যব্রত ভুঁইয়া।

বাবা – হুম, উনার মৃত্যু তো কিছুদিন আগেই হয়েছে, তাই না!

সেরেনা – মিস, মানে আমার টিচার যখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকতেন, তখন উনার কাছেই আমি মোঘলাই খাবার খেতে শিখি। আর তখন থেকেই আমি বিরিয়ানির খুব ভক্ত। তা সেইদিন মিস বিরিয়ানি বানাচ্ছিলেন। যখন আমরা সকলে, মানে মিস, উনার কাজের মেয়ে, আমি খাবার টেবিলে, তখনও ডক্টর ভুঁইয়া, মানে মিসের হাজব্যান্ড সেখানে আসেন নি। তাই মিস উনাকে ডাকতে গেলেন। উনার ঘরের দরজা ধাক্কাচ্ছিলেন, উনি কিছুতেই খুলছিলেন না, আর কনো সারাশব্দও দিচ্ছিলেন না। তারপর যখন অনেকক্ষণ সেই ভাবে মিস দরজা ধাক্কানোর পরেও দরজা খোলা হলো না, তখন উনার ড্রাইভার দরজা ভাঙলেন, কিন্তু ততক্ষণে গলায় দড়ি দিয়ে উনার হৃদ স্পন্দন থেমে গেছিল।

বাবা – উনার একটি ছেলেও ছিল না!

সেরেনা – হ্যাঁ, ছেলে এই একমাসও হয়নি, ইউএসএতে চলে গেছে। ওখানে নাকি ওর গার্ল ফ্রেন্ড থাকে। তার সাথে বিয়ে করে ওখানেই এখন আছে সে। ওর নাম প্রিয়ম ভুঁইয়া।

বাবা – শুধু প্রিয়ম ভুঁইয়া নাকি, ডক্টর প্রিয়ম ভুঁইয়া!

সেরেনা হেসে বলল – না বাবা মা, দুইজনেই উচ্চশিক্ষিত হলেও, ছেলের মন পড়াশুনায় ছিলনা। ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিল দুইতিনবার। সব বারেই লস খেয়েছে। কিন্তু শেষ বারের ব্যবসা করার সময়ে ওই ইউএসএর মহিলার সাথে সম্পর্ক হয়। বেশ কয়েকবার ইউএসএতে ট্রাভেলিং ভিসা নিয়ে ঘুরে এসেছে, কিন্তু ওখানে থাকার পারমিশন পাচ্ছিল না। যতই ওর গার্লফ্রেন্ড ওকে বিয়ে করতে রাজি হোক, ওদের দেশ বাইরের দেশের মানুষ, বিশেষ করে ভারতের লোকদের তো কিছুতেই সিটিজেনসিপ দিতে চায়না, যদি না একটা বিপুল সম্পত্তি দেখাতে পারে, আর সঙ্গে নিয়ে যেতে না পারে। … মানে ততক্ষণ সেই ভারতীয়কে এমিগ্রেন্ট বলেই ধারনা করা হয়। তাই প্রিয়ম যেতে পাচ্ছিল না। কিন্তু সমস্ত ব্যবস্থা করে, এই কিছুদিন আগে সেখানে গেছে।

বাবা – বাবার মৃত্যুতে এসেছিল!

সেরেনা – না। মায়ের সাথে ফোনে কথা বলেছিল খালি।

বাবা এবার একটু উঠে ঘরে টাঙ্গানো একটা ছবির দিকে উঠে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ আমাদের দিকে পিছন করে, ছবির দিকে তাকিয়েই বললেন – ইনিই লেট ডক্টর স্যামুয়েল ফ্লেমিং!

সেরেনা – হ্যাঁ।

বাবা – আপনার কত বছর বয়সে উনি আপনাকে দত্তক নিয়েছেন, ঠিক জানেন?

সেরেনা – আমি যতদূর জানি, উনি আমাকে কনো অনাথ আশ্রম থেকে দত্তক নেন নি, মানে যেটাকে অফিসিয়ালি দত্তক নেওয়া বলে। উনার পরিচিত কনো এক মহিলা ছিলেন। সেই মহিলা তখন অবিবাহিত। কিন্তু তিনি সন্তানসম্ভবা ছিলেন। একজন মানুষ উনাকে বিয়ে করতে রাজি ছিলেন, কিন্তু উনার বাচ্চাকে দত্তক নিতে রাজি ছিলেন না। বাবা, উনার সন্তানকে দত্তক নেন, আর আমি সেই সন্তান।

বাবা আবার উঠে এসে কাউচে বসলেন আমার পাশে, আর বললেন – ডক্টর ফ্লেমিংএর সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্টগুলো এখন নিশ্চয়ই এফবিয়াই ছেড়ে দিয়েছে!

সেরেনা – হ্যাঁ, আমি একাউন্ট ডিলিটের জন্য আবেদন করেছি, তবে এখনো একাউন্ট ডিলিট হয়নি। ৩০ দিন পর্যন্ত সময় আছে রিভোক করার। … মানে যদি ৩০ দিনের মধ্যে আবার একাউন্টটা ইউজ করা হয়, তবে অটোমেটিক্যালি রিভোক হয়ে যাবে।

বাবা – আপনার কাছে আইডি পাশওয়ার্ড আছে?

সেরেনা – শুধু ফেসবুকেরটা আছে। এফবিয়াই ওটাকে ইউজ করে, আমাকে নতুন আইডি আর পাশওয়ার্ডটা দিয়েছিল। দাঁড়ান আমি আনছি, আমার ডায়রিতে নোট করা আছে।

সেরেনা উঠে চলে গেল আর কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ডায়রি নিয়ে এলো, আর ডায়রি থেকে একটা পাতার খানিকটা ছিঁড়ে বাবার হাতে দিয়ে দিল।

বাবা – আপনার লাগবে না, এটা!

সেরেনা – আমার এতে কি কাজ! 

বাবা – আচ্ছা, একটা কথা বলুন আমায়। আপনার বাবা তো অস্ট্রেলিয়ার সিটিজেন ছিলেন। তবে এফবিয়াই আপনার বাবার মৃত্যুর তদন্ত কেন করলো?

সেরেনা – বাবা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমেরিকান একটি ভূতাত্ত্বিক সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন। তাই সেই কোম্পানির হয়ে এফবিয়াই তদন্ত করেছিল।

বাবা – আচ্ছা, ঠিক আছে। … আজ আসি। যদি আবার প্রয়োজন হয়, আসবো, নয়তো ফোনে কথা বলে নেব।

সেরেনা লিফট পর্যন্ত আমাদের ছেড়ে দিল। আমরা বাইরে এসে নিজেদের স্করপিওতে উঠতে, আমি আবদার করলাম গাড়ি চালাবো। তাই চালকের আসনে আমি, আর আমার পাশে বাবা। … পথে যেতে যেতে বাবা বললেন – আজকে কি লক্ষ্য করেছিস কিছু! মানে সেরেনার ইংরাজিটা!

আমি – হ্যাঁ, ওর ইংরাজিটার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ান টান থাকলেও, বেশ কিছু শব্দ উচ্চারণ ওর অস্ট্রেলিয়ান নয়।

বাবা – বিশেষ করে, ভারতীয় ব্যক্তির নাম উচ্চারণের ক্ষেত্রে। ইংরাজি যাদের মাতৃভাষা, সত্যব্রত উচ্চারণ করতে গেলে তাদের দাঁত ভেঙে যাবার কথা। কিন্তু সেরেনার উচ্চারণ অত্যন্ত স্পষ্ট আর তাও বাঙালিদের মতই।

আমি – হয়তো ওর মিস, মানে ডক্টর সাবিত্রী ভুঁইয়ার সংস্পর্শের কারণে হতে পারে।

বাবা – হতে পারে… একটা কাজ কর তো। … যখন এখানে নিউটাউনে এসেইছি, একবার ডক্টর ভুঁইয়ার বাড়ি ঘুরে যাই। … বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং জিনিস আমার মাথায় ঘুরছে। দেখি কনো দিশা পায় কিনা ভাবনা গুলো!

আমি গাড়ি নিয়ে গেলাম ডক্টর ভুঁইয়াদের বাড়ির দিকে। রাস্তা চেনালেন বাবাই। … বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করে, বেল বাজাতে হলো না। উনাদের ড্রাইভার স্যান্ডো গেঞ্জি আর বারমুডা পরে গাড়ি ধুচ্ছিলেন। উনিই আমাদের প্রশ্ন করলেন – আপনাদের পরিচয়?

বাবা – মিসেস ভুঁইয়ার কাছে এসেছিলাম। আমি উনার হাজব্যান্ডের একজন গুণমুগ্ধ অনুগামী ছিলাম। সেই সূত্রে, উনার মৃত্যুর পর, উনার স্ত্রীর সাথে দেখা করতে এসেছি। আর … এই আমার মেয়ে।

ড্রাইভার ভিতরে চলে গেলেন, আর মিনিট দুইয়েক পরে বাইরে এসে আমাদেরকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসার জায়গায় বসালেন।

মিসেস ভুঁইয়া এলেন। একজন ২২ বছর ছেলের মা উনি, দেখে বোঝার উপায় নেই। … চুলের পাক হয়তো কলপ করা বলে বোঝা যাচ্ছেনা, কিন্তু স্কিন টানটান। … দেখতেও বেশ সুন্দরী। বেশ বলা ভুল হবে, খুবই সুন্দরী। … গায়ের রঙ হলদেটে ফরসা, লম্বা প্রায় ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি। স্বাস্থ্যও খুব সুন্দর।

বসার ঘরে ঢুকতে, বাবা উঠে দাঁড়ালেন। তাই আমিও দাঁড়ালাম। বাবা বললেন – নমস্কার, আমি ডক্টর সত্যব্রত ভুঁইয়ার একজন অনুগামী ছিলাম। আমি উনাকে তিনবার ইন্টার্ভিউও করেছি। একবার আমি একাকী, আর একবার আমার এই কন্যাকে নিয়ে উনার কাছে, এই বাড়িতেও এসেছিলাম। তবে আপনার সাথে কনোবারই সাক্ষাত হয়নি, তাই হয়তো আপনি আমাকে চিনতে পারবেন না।

ভদ্রমহিলা হেসে বললেন – নমস্কার। … আপনার নামটা!

বাবা – বিজয় সিংহ।

ভদ্রমহিলা – আচ্ছা, বিজয় … মানে আপনিই কি মিস্টার সিন! … যিনি অনেক অদ্ভুত রহস্যের সমাধান করেছেন! …

বাবা – হ্যাঁ, আমি সেই ব্যক্তিই।

ভদ্রমহিলা – সো নাইস টু মিট ইউ। … জানেন, আমি আপনার একজন ফ্যান হয়ে গেছি বলতে পারেন। … বয়সে আপনি আমার থেকে অনেকটাই ছোটো। জানেন আমি আপনার সাথে একবার দেখা করতে চাই, এমনও আমার স্বামীকে বলেছিলাম। উনি বলেছিলেন, উনি আপনাকে চেনেন, মানে পারসোনালি চেনেন। উনি নিয়ে যাবেন আমাকে। … কিন্তু তারপর তো…

আবার থেমে মিসেস ভুঁইয়া বললেন – আমার এক অস্ট্রেলিয়ান ছাত্রী আছে। সেও আপনার বেশ কিছু কেস পেপারে পড়ে বলে, আপনি নাকি জীবন্ত সার্লক হোমস। …

বাবা – আজ্ঞে, মার্জনা করবেন, আপনার সেই অস্ট্রেলিয়ান ছাত্রী আমার সাথে দ্যাখা করে, আমাকে উনার বাবার মৃত্যুর তদন্ত করতে বলেন। আমার এখানে আসার একটা কারণ সেটাও বলতে পারেন।

মিসেস ভুঁইয়া উৎসাহী হয়ে বললেন – আচ্ছা, এর মধ্যে ও আপনার সাথে যোগাযোগও করে নিয়েছে! … আচ্ছা আমি কার কথা বলছি, আপনি জানেন?

বাবা – হ্যাঁ, আপনার ছাত্রীর নাম বোধ হয়, সেরেনা ফ্লেমিং, তাই না!

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4