বিষাক্ত চাটনি | রহস্য উন্মোচন

ভিতরে ঢুকে, মৌলবি সাহেবের বাইরের ঘরের দিকে গেলাম আমরা। সকলেই সেখানে ছিলেন। আবার অনেকে সেখানে ছিলেন, যাদেরকে আমি চিনিও না। … বাবা ধীরকণ্ঠে রথিনকাকাকে বললেন – মৌলবি সাহাব!

রথিন কাকা – আছেন, পাসের ঘরে।

বাবা এবার একটু গলা খাকরে শুরু করতে গেলেন, উনার কেসের বিবৃতি। কিন্তু শুরুতেই বাঁধা। এসে হাজির হলেন শিকদার। রথিনকাকার উদ্দেশ্যে বললেন – স্যার, এতো নাটকের কি প্রয়োজন ছিল? আমি তো কেস শলভ করে ফেলেছি।

রথিন কাকা – আচ্ছা? কে খুনি?

শিকদার – মৌলবি সাহেবের স্ত্রী। আজকে এই মিটিং ডাকা না হলে, আজই আমি এরেস্ট করতাম উনাকে।

বাবা – আর এই এরেস্ট করার জন্য কত টাকা পেয়েছেন? ২ লাখ?

শিকদার – কি আজে বাজে কথা বলছেন? আপনাকে আমাদের ডিপার্টমেন্ট পছন্দ করে বলে, আপনি যা মুখে আসবেন তাই বলেবন?

বাবা একটা মুচকি হেসে – শিবুর থেকে নিয়েছেন তো?

শিকদারের এবার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। আসলে বাবার নামই শুনেছেন উনি। বাবার বুদ্ধির দাপট উনি কনোদিন সামনাসামনি করেন নি। … বাবা বললেন – হজম করে ফেলেছেন না গচ্ছিত আছে?

শিকদার – আছে।

বাবা – জলদি গিয়ে নিয়ে আসুন। … মুখ্যমন্ত্রী সবটা লাইভ দেখছেন। যদি না দেখা যায় টাকা, তাহলে আপনার চাকরি যেতে পারে।

শিকদার একটু ভয় পেয়ে গিয়ে – এখনি আসছি।

বাবা – একা যাবেন না, সিয়াইডি অফিসার আপনাকে নিয়ে যাবে, আর আপনার ফোন এখানে থাকবে।

শিকদার নিজের পকেট থেকে দুটো ফোন বাবার কাছে দিয়ে, সিয়াইডি অফিসারের সাথে চলে গেলেন। ফিরে এলেন প্রায় ১৫ মিনিট পর। উনি এসে গাড়ি থেকে নামছেন, সেই সময়ে রথিন কাকা মুখ্যমন্ত্রীর সাথে এই ঘরে একটা অডিওভিজিয়াল রেকর্ড করার ক্যেমারা লাগানো, সেটাকে জুরে দিলেন। এখন উনি সবটা লাইভ দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু সেটা আমি, বাবা, রথিনকাকা, আর শিকদার ছাড়া কেউ যানে না।

ঘরের মধ্যে অনেকে রয়েছেন, আর তাদেরকে ঘিরে রয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী, আর একটা প্রায় ২০ জনের সিয়াইডি টিম। বাবা সব দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে শুরু করলেন। একটু এগিয়ে গিয়ে আব্রামের কাছে গেলেন বাবা, আর বললেন – শেষ রক্ষে তো হলো না মিস্টার আব্রাম?

আব্রাম সেই কথা শুনে একটু থতমত খেয়ে গিয়ে বললেন – স্যার, আমি কুছ নেহি করেছি। …

বাবা – ও তাই? … রথিন?

রথিনকাকা হাঁক পারলেন – শুভ!

একজন সিয়াইডি অফিসার সামনে এগিয়ে এসে বাবার হাতে একটা কালো রঙের কিছু দিলেন। বাবা সেটা আব্রামের দিকে দেখিয়ে বললেন – কি আব্রাম সাহেব? আপনার বাড়ি থেকে পাওয়া গেছে। চিনতে পারছেন তো? … লোভ খুব ভালো জানেন তো, মানুষকে কর্মঠ করে দেয়। কিন্তু অতি লোভ! ভয়ঙ্কর। মৌলবি সাহাব তো আপনাকে আপনার মেয়ের বিয়ের পুরো ৫ লক্ষ্য টাকাই দিচ্ছিলেন। তারপরেও কেন?

আব্রাম – স্যার, আমি খুন করি নি। বিশ্বাস করুন। আমি খুন করি নি।

বাবা – জানি আপনি খুন করেন নি। কিন্তু যিনি খুন করেছেন, তার সঙ্গ তো দিয়েছেন। তাকে সাহায্যও করেছেন, আর তার সাথে দরকষাকষিও করেছেন। … আরে আব্রাম সাহাব, যদি দরকষাকষিটা না করতেন, তবে আপনার ঘর থেকে এই ক্যামেরাটা পাওয়া যেতনা, কারণ আপনি তো সেটা তাকে দিয়েই দিতেন। … কিন্তু পুরো ৫ লাখ হাতানোর লোভে, নিজের কাছে ক্যামেরাটা রেখে দিয়ে, নিজের গুনহার প্রমাণ দিয়ে দিলেন। এবার আপনার মেয়ের বিয়ের কি হবে জানিনা, তবে আপনাকে তো জেল খাটতেই হবে। …

আব্রাম সরাসরি বাবার পায়ে পরে গেলেন – স্যার আমাকে বাছান স্যার। আমি কিছু করিনি। … আসলে আসলে …

বাবা – আসলে, মৌলবি সাহাব ৫ লাখ টাকা দিলে, সেই টাকা আপনাকে তো ফেরত দিতে হতো। হ্যাঁ, ফেরত দেবার জন্য কনো নির্দিষ্ট সময় থাকতো না, কিন্তু ফেরত তো দিতে হতো। … সেইখানে ২ লাখ টাকা আপনার কাছে এমনিই এসে গেল, যেটা ফেরত দিতে হবেনা। আর তাকে চাপ দিলে যদি ৫ লাখই চলে আসতো, তবে তো পোয়াবারো। পুরোপুরি মুফতে মেয়ের বিয়েতা হয়ে যেত, কি তাই না!

বাবা আবার হেসে বললেন – আব্রাম, ফালতু ফালতু কেসটা আপনি খেলেন। আপনি জানেন, যদি আপনি এই ক্যামেরাটা যে আপনার থেকে চেয়েছিলেন, তাকে দিতেন, তাহলে আপনাকে মরতেও হতে পারতো! … জানেন না তো? … আব্রাম, এটা শুধু ক্যামেরা, এতে মৌলবি সাহেবের সাথে খুনির যেই কথা হয়েছে, সেসব কিচ্ছু নেই। সেইসব যাতে আছে, সেটা হলো মেমরি, আর সেটার ব্যাপারে তো আপনি জানেনই না। তাই সেটা আপনি নেনও নি। … একবার ভেবে দেখুন, ওই ভিডিওতে যেই কথা আছে বলে, আপনি সেই খুনিকে সতর্ক করলেন যে ক্যামেরাতে সব বন্দি হয়ে গেছে। কি কথা হয়েছিলো, আপনি জানেন তো? বুঝতে পারছেন তো, কতটা ডেঞ্জারাস লোকটা! … কি মনে হয়, মেমরি না দিলে, আপনাকে জ্যান্ত ছেড়ে দিতো?

বাবা এবার আব্রামের থেকে মুখ সরিয়ে, গোয়েন্দা সুমন্তের কাছে গিয়ে বললেন – আপনিই বলুন না, ছেড়ে দিতো সে? … আপনাকেও তো সে শাসিয়ে টাকা দিয়ে এসেছিল। তাই না! … দুই লাখ টাকা! …

গোয়েন্দা সুমন্ত বাবার দিক থেকে এবার চোখ নামিয়ে নিলেন। বাবা উনার কাঁধে হাত রেখে বললেন – গোয়েন্দা আপনি, একটা শাসানি তে ভয় পেয়ে গেলে কি করে চলবে বলুন তো? … একটা শাসানি তে, সরাসরি চেতলা চলে গেলেন বিনা নিমন্ত্রণে; সেখানে গিয়ে নাজিরের সাথে দেখা করে নিজের কার্ড দিয়ে এলেন। (হেসে) ডিটেকটিভ স্যার, খুন হবার আগের মুহূর্তে খুনের তদন্তকারি একজনের সাথে আলাপ হলে, তাকেই ডাকা হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না মিস্টার সুমন্ত! 

সুমন্ত আমতা আমতা করলে, বাবা আবার বললেন – তো শাসিয়ে কি বলতে বলা হয়েছিল? এই যে বাড়ির লোক, বা উনার স্ত্রীই খুনটা করেছিলেন, তাই তো?

সুমন্তবাবু মস্তকহিলনে সম্মতি দিলে, বাবা হেসে বললেন – জানেন সুমন্ত বাবু, খুনি এই ক্ষেত্রে একটা বড় ভুল করে ফেলেছেন। কি ভুল জানেন?

সুমন্তবাবু – আমি না পাতি একজন টিকটিকি। মানে প্রেমিক এসে আমাকে বলে, তার প্রেমিকা কখন কোথায় যাচ্ছে, সেই খবর লাগবে, ওইসব খবর সংগ্রহ করি। এত জটিল ব্যাপার আমার মাথায় ঢোকে না!

বাবা এবার হেসে শিকদারের কাছে এগিয়ে এসে বললেন – আপনি বলুন?

শিকদারকে দেখে বুঝতে পারা যায়, সে এই কেস নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাই ঘামায়নি। … বাবা এবার একটা জোরে নিশ্বাস নিয়ে বললেন – পটাসিয়াম সায়েনাইড, এই বিষটা দিয়ে মারা হয় মৌলবি সাহেবকে, আর এখানেই বোঝা যায় যে, এই কেস সাধারণ কেস নয়। কারণ সাধারণ কেউ পটাসিয়াম সায়েনাইড হাতে পাবেনই না। অত্যন্ত ইনফ্লুএন্সিয়াল হলে, তবেই এই বিষ হাতে ঠেকতে পারে, কি জাকির, তোমার তো ওষুধের লাইসেন্স আছে। কিছু তো পড়াশুনা অবশ্যই আছে। ঠিক বলছি তো?

জাকির – হা জি। বিলকুল ঠিক।

কিন্তু এবার প্রশ্ন হলো এই ইনফ্লুএন্সিয়ায়ল মানুষটি কে? … মৌলবি সাহেবকে যিনি শাসিয়েছিলেন, যিনি ডিটেকটিভ সুপার ইনটেলিজেন্টকে শাসিয়েছিলেন, এমনকি পুলিশ অফিসার, শিকদারকেও যে টাকা খাইয়ে শাসিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেন নি, কারণ তিনি আমাকে সমস্ত কথা বলে দেন, এবং যেই দুই লাখ টাকা খাইয়ে উনাকে শাসানো হয়েছিল, তাও ফিরিয়ে দেন, সেই লোকটা কে? এতোই কি ইনফ্লুএন্সিয়াল সেই লোকটা? …

তার জন্য আমাদের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ আছে। … মিলি, একটু ভিডিওটা চালিয়ে দে। … সকলে দেখলেন একটা ইসলাম লোক মৌলবি সাহেবকে প্রচুর টাকা এগিয়ে দিয়ে কিছু বলছেন। কি বলছেন, শোনা গেল না, শুধুই দেখা গেল। … আর দেখা গেল একটা গেরুয়া ফতুয়া আর জিনস পরা লোক ডিটেকটিভ সুমন্তকে কিছু টাকা দিয়ে শাসাচ্ছেন। সেখানেও কি কথা বলা হলো, কেউ শুনতে পেলো না। …

ভিডিও শেষ। বাবা বললেন – কেউ চিনতে পারলেন লোকটা কে?

নাজির বললেন – এ তো ইমরান!

বাবা – একিউরেট। … মিস্টার ইমরান। … আচ্ছা নাজির, ইমরানের সম্বন্ধে কিছু বলো।

নাজির – ও আমাদের সবার খুব ভালো বন্ধু ছিল, মৌলবি সাহেব এমনকি আম্মিও ওকে খুব বিশ্বাস করতো। সুলেমানের তো গলায় গলায় বন্ধু হয়ে গেছিল।

বাবা – তো বেশ সুলেমানই বলুক ইমরানের অতীত সম্বন্ধে।

সুলেমান – ইমরান আগে হিন্দু ছিল। এই আট মাস হয়েছে, ও ইসলাম হয়েছে। …

বাবা – আপনার সাথে ওর পরিচয় কি করে? … অকস্মাৎ, আপনার সম্মুখে এসে, ইসলাম ধর্মের ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহী হয়ে ওঠেন, আর কিছুদিন পরে আপনার সামনে আচমকা উদয় হয়ে বলেন, সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। এই তো সত্য?

সুলেমান – কিন্তু এই কথা তো আমি ছাড়া কেউই জানে না, আর আমিও কারুকে এই ব্যাপারে কারুকে বলিনি!

বাবা একটা বিচিত্র হাসি হেসে বললেন – গিরগিটি কি করেছে আপনার সাথে, সেটা আপনাকে বলতে হয়না। যে গিরগিটিকে চেনে, সে এমনিই জানে, কারপর কি কি করেছে গিরগিটি আপনার সাথে।

একটা জোরে নিশ্বাস নিয়ে, ঘরে পাইচারি করতে করতে, বাবা বললেন – হ্যাঁ ঠিকই হিন্দু ছিল আগে ইমরান, আর ওর নাম ছিল শিবু। কিন্তু জানেন কি কেউ, কে ছিল সে, বা কেমন ছিল সে? … জানেন না তাই তো। … আমিও জানতাম না।

বাবা বলতে থাকলেন – প্রথম সন্দেহ হয় আমার যখন জানলাম যে পটাসিয়াম সায়েনাইড দিয়ে খুন করা হয়, আর চাটনি খাওয়ার পরেই মৌলবি সাহেব লুটিয়ে পরেন। জিজ্ঞাসা করে জানলাম যে চাটনি টা দিয়েছিলেন সুলেমান। সুলেমানের বাড়ি গেলাম, আর সুলতানা বেগমকে চাটনির ব্যাপারে প্রশ্ন করতে জানলাম, তিনি চাটনি নয় ফিরনি করেছিলেন মৌলবি সাহেবকে দেবার জন্য। ফিরনি এসেছিল ইমরানের থেকে, এমনই দেখানো হয়। অর্থাৎ টিফিন ক্যারি পালটাপালটি করে, ইমরান নিজের বিষমেশানো চাটনিটা সুলেমানকে দিয়ে দেয়, আর নিজে সুলেমানের ফিরনিটা দেন, যাতে ফাঁসলে সুলেমান ফাঁসে। …

কিন্তু শেষ রক্ষে হলো না ইমরান। … সুলতানা বেগম যদি ধরেও নিই নিজেকে আর নিজের স্বামীকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যে কথা বলেছেন, কিন্তু ইমরান … মানে শিবু, তোমার মা তো আর মিথ্যে বলবেন না, তাও নিজের ছেলেকে ফাঁসিয়ে দেবার জন্য। … আমি যেদিন তোমাদের বাড়ি যাই, সেদিন তোমার মাকে কায়দা করে প্রশ্ন করে নিয়েছিলাম, তিনি ফিরনি বানানো কোথা থেকে শিখলেন, যেমন কায়দা করে সুলতানা বেগমের থেকে চাটনির কথা জেনে নি, তেমনই করে। শিবু, তোমার মা অকপট ভাবে বলে দিলেন, তিনি চাটনি বানিয়ে তোমাকে দিয়েছিলেন। … আর বিষটা কিসে ছিল? চাটনিতে। …

বেশ, এ তো গেল ক্রাইমের পার্ট ওয়ান। এখনও ক্রাইমের বাকি অংশগুলি তো জানেনই না আপনারা। … সিসিটিভিতে দেখলেন মৌলবি সাহেবকে প্রচুর টাকা দেওয়া হচ্ছিল, কিন্তু মৌলবি সাহেব সেটা ফিরিয়ে দেন। কি বলা হচ্ছিল জানেন? … জানেন না তো? বলছি সেই কথা। না না আমি বললে কি করে হবে শিবু? … তুমি যে আরো একজনকে সেই একই কথা বলেছিলে, তাই না? আর একই টাকা তাকেও দিতে চেষ্টা করেছিলে। একই ভাবে তিনিও সেই টাকা ফিরিয়ে দেন। …

কি ভাবছেন আপনারা? তিনি কে? … তিনি হলেন মৌলবি সাহেবের মৃত্যুর পর, উনার পরিবর্তে যিনি মৌলবি হন, তিনি। … আল্লা মেহেরবান উনার উপর। যেইদিন উনি এই টাকা নিতে অস্বীকার করে, শিবুকে বললেন, তিনি পুলিশকে সব বলে দেবেন, সেইদিনই উনাকে অপহরণ করা হয়। … কিন্তু শিবু! … তুমি তো জানো, তোমার লোক উনাকে অপহরণ করতে পারে নি। … কিন্তু কেন পারেনি জানো? কারণ আমি তাঁকে তাঁর সজ্ঞানে, তাঁকে অপহরণ করে নিয়েছিলাম। … মৌলবি সাহেব, সামনে আসুন দয়া করে।

সবার সামনে এবার মৌলবি সাহেব এসে দাঁড়ালে, সকলের মুখে একটা হাসি ফুটে উঠলো। … বাবা সবার উদ্দেশ্যে বললেন, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন আপনারা। আপনাদের কারুকে না জানিয়েই উনাকে আমি সরিয়ে নিয়েছিলাম। আপনারা ভেবেছিলেন উনাকে অপহরণ করা হয়েছে। … কিন্তু আমি যদি সেদিন উনাকে না সরিয়ে নিতাম, তাহলে উনার পরিণতি আমাদের পরলোকগত মৌলবি সাহেবের মতই হতো। তাই সরিয়ে নিয়েছিলাম। যাতে কি হয়েছে, কেউ ধরতে না পারেন, তাই ইসলামের পোশাক পরে, উনাকে এখান থেকে ধাবার মাঠের পাসে নিয়ে যাই আমি ওলা করে। তারপর, আমি আমার গাড়িতে করে উনাকে নিয়ে চলে যাই বারাসাতে, যেখানে উনি সুরক্ষিত ছিলেন।

আর উনি যে শিবুর কীর্তির একমাত্র সাক্ষী। … এবার বলুন মৌলবি সাহেব, কি বলেছিল আপনাকে শিবু?

মৌলবি সাহেব বললেন – আমার কাছে তো ইমরানই এসেছিল। এসে আমার হাতে ১০ লাখ টাকা দিয়ে বলেছিল, সামনের রাম নবমীতে হাঙ্গামা হবে, তাতে বেশ কিছু ঘরবাড়ি জ্বালানো হবে, বেশ কিছু দোকানপাঠ ভাঙা হবে, সেই সমস্ত ঠিক করার জন্য, এই অগ্রিম ১০ লাখ টাকা। …

শিবু – মিথ্যা কথা। আমি আর হিন্দু নই। আমি ইসলাম এখন।

বাবা – তাই তো? সেই ব্যপারটা জানার জন্যই তো, আপনার বাড়ি গেছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, আপনার ছবি, তাও রথিন দত্তরায়ের সাথে, সেখানেও আবার আপনাকে জরিয়ে ধরে রয়েছেন উনি। মানে আপনি উনার খাস লোক, আর তা না হলে পটাসিয়াম সায়েনাইডের মত বিষ আপনি পাবেন কোথা থেকে? … কিন্তু একটা ছবি আর কত কথা বলতে পারে? আপনার অতীত বলতে পারে, কিন্তু আপনার বর্তমান তো আর সেই ছবি বলতে পারেনা। তাই আমার মেয়ে আপনার মায়ের কাছ থেকে রথিনের নাম করে, একাউন্ট নম্বর নিয়ে আসে।

কি হতে চলেছে, আমার সম্পূর্ণটাই অনুমান ছিল। তাই আমি রথিন, মানে সিয়াইডি চিফ, রথিনকে নিয়ে কালীঘাট এসবিআই, যেটা আপনার ব্রাঞ্চ, মানে শিবু গড়েনর একাউন্টের হোম ব্রাঞ্চ, সেখানে গিয়ে হাজির হলাম। … আটমাস হয়ে গেছে আপনি ইসলাম হয়েছেন। শিবু গড়েন নাম ছেড়ে, আপনি ইমরান। … অর্থাৎ শিবুর ব্যাঙ্ক আকাউন্ট তো ৬ মাস ইন-অপারেটিভ থাকলে, ডরম্যান্ট থাকবে। … তাই আপনার একাউন্টে রথিনের থেকে, মানে সিয়াইডির রথিনের নাম করে, ১০০০ টাকা ডিপোজিট করতে গেলাম। দেখলাম দিব্যি ক্যাশ জমা হয়ে গেল। যাই তেমন হলো, তাই আমাদের প্ল্যান মত, রথিন নিজের সিয়াইডি হবার কার্ড দেখিয়ে, শিবু গড়েনের একাউন্টের লাস্ট একমাসের স্টেটমেন্ট চাইলো। …

বাবা আমার দিকে তাকিয়ে – মিলি, ডেস্কটপে একটা স্টেটমেন্ট আছে। খোল ওটা। আমি খুলতে, বাবা সকলের নজর সেদিকে নিয়ে গিয়ে দেখালেন। দেখুন রথিন দত্তরায়ের থেকে ১০ লাখ টাকা ঢুকেছে। মৌলবি সাহেবকে যেইদিন ১০ লাখ টাকা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, সিসিটিভিতে এসেছে। সেই তারিখ কতো? … ৮ই এপ্রিল। আর এই ১০ লাখ টাকা কবে ঢুকেছে? (মুচকি হেসে) ৭ই এপ্রিল। কে দিয়েছেন? রথিন দত্তরায়। … কি জন্যে দিয়েছেন? দাঙ্গা হবে বলে। … কেন টাকা দিচ্ছেন দাঙ্গা করানোর জন্য? … কেননা, একযায়গায় পয়সা দিয়ে দাঙ্গা লাগিয়ে দিলে, সমস্ত যায়গায়, এমনিই দাঙ্গাকে ছড়িয়ে সম্পূর্ণ বাংলাকে জ্বালিয়ে রাজনীতি করা যাবে বলে।

আরো দেখুন, আমাদের এই মৌলবি সাহেব তো মিথ্যাও বলতে পারেন। … দেখুন। যেই ১০ লাখ টাকা তুলেছিলেন, তার থেকে ৪ লাখ টাকা ফিরে এসেছে। বাকি ৬ লাখ কোথায় গেল? … ২ লাখ ডিটেকটিভ সুপার ইনটেলিজেন্টকে দেওয়া হয়েছে; দুলাখ টাকা মৌলবি সাহেব খুন হবার পর ক্যামেরা ফিরিয়ে দেবেন বলে, আব্রামকে দেওয়া হয়েছে, আর দু লাখ টাকা মিস্টার শিকদারকে, পুরো কেসটা একটা পারিবারিক কেস, এই ভাবে শাসানোর জন্য দেওয়া হয়েছে। … তাই বাকি ৪ লাখ একাউন্টে ফিরে গেছে।

কিন্তু কাজ তো শেষ হয়নি। তাই আবার ১০ লাখ টাকা ঢুকেছে, রথিন দত্তরায়ের কাছ থেকে। আর সেই টাকা নিয়ে আবার দেওয়া হয়েছে এখনকার মৌলবি সাহেবের কাছে। … কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। …

বাবা এবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্যারের উদ্দেশ্যে বললেন – স্যার, এই শিবু গড়েন, ৮ মাস আগে ইসলাম হয়েইছিলেন এই দাঙ্গাকে বিশাল আকার দেবার জন্য। … প্রচুর টাকা সমস্ত বাংলায় ছড়ানো হয়েছে, এই দাঙ্গাকে বড় আকার দেবার জন্য। … আর এই দাঙ্গা লাগানো হচ্ছে, যেই মাথার থেকে, সেই মাথার নাম রথিন দত্তরায়, যিনি আপনার বিরোধী রাজনীতিবিদ। … স্যার, শিবু গড়েন মৌলবি সাহেবের খুনের অপরাধী। তাই ওকে গ্রেফতার করা হবে। … কিন্তু রথিন দত্তরায়ের উপর আপনি একশান না নিলে, এই দাঙ্গা করানো হবেই। … প্লিজ স্যার এটাকে আটকান। হতে পারে শিবু অনেক কিছু জানে এই ব্যাপারে, কারণ ও পুরো কলকাতার এই রামনবমী মিছিলের হর্তাকর্তা। হ্যাঁ স্যার, শিবু গড়েনই লালবাজার থেকে এই র‍্যালির পারমিট করিয়ে তারপর শিকদারের কাছে ওকে শাসাতে গেছিল। … তাই স্যার, ওর থেকেও অনেক খবর পেতে পারেন, কিন্তু এই দাঙ্গাকে আটকান স্যার।

বাবা কেসের নিষ্পত্তি করলেন। শিবু গড়েনকে এরেস্ট করলো সিয়াইডি, যাতে ওকে জেরা করে অনেক সত্য জানা যায়। খুনিকে সহযোগিতা করার অপরাধে এরেস্ট করা হলো আব্রামকে। আর ঘুস গ্রহণের জন্য সুমন্তকেও। সুমন্ত-এর বেলের ব্যবস্থা করা হলো, যাতে উনি তাড়াতাড়ি মুক্ত হয়ে যান। … আমাদের বাড়িতে এসে বাবার কাছে ধন্যবাদ জানিয়ে গেছিলেন উনি, আর বলে গেছিলেন বাবা উনাকে খুব জোর বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। …

অন্যদিকে রথিন দত্তরায়কে সিয়াইডি কাস্টডিতে নেয়। … শিবু আর রথিনের থেকে অনেক কথা বার করে, বড়ধরনের দাঙ্গাকে আটকানো গেছিল। তাও কিছু অনামা যায়গায় সামান্য কিছু বিক্ষিপ্ত দাঙ্গার চেষ্টা হয়েছিল বাংলায়। … পরে কোর্টের কেসে শিবুর ১৪ বছরের, আর রথিনের আমৃত্যু জেল হয়। … বাবাকেও এর ঝামেলা সহ্য করতে হয়েছিল। বাবার কাছে কিছু ভুয়ো ফোন এসেছিল। সেই ফোনের কথা এই ছিল – তোর জন্য, আমাদের নেতাকে আমৃত্যু জেল খাটতে হয়েছে, তোকে এবার কে বাঁচায় আমরাও দেখবো।

তবে বাবা এসবে পাত্তা দেন না। … শুধু বললেন, পাগলে কি না বলে। … তবে মুখ্যমন্ত্রীর থেকে বাবাকে পরে দপ্তরে ডেকে পাঠানো হয়। বাবাকে বহু কিছুদিয়ে সম্মানিত করা হয়, আর সঙ্গে ১০ লাখ টাকার সরকারি চেকও দেওয়া হয়। … জাকির পরে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, বাবাকে পারিশ্রমিক দিতে। বাবা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন উনাকে। বলেছিলেন – কেসটা বাবা নিয়েই ছিলেন, এই দাঙ্গাবাজরা এর সাথে যুক্ত বলে, যার পুরস্কার সরকার উনাকে দিয়েছে। তাই উনি এর কনো অন্য পারিশ্রমিক নিতে পারবেন না। … তবে পারিশ্রমিক না নিলেও, ওই পরিবারের সাথে আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়, যেটা আজও আছে। … জাকির সাহেবের মেয়ে, আমার একজন অনুগামী আজ। … আমার সাথে সে কাজ করে। জারনালিজিম করে।

তবে আজ বাবা নেই। যখন ভাবি বাবার কথা, তখন বাবার অদ্ভুত বুদ্ধির কথা আমাকে এখনও স্তভিত করে দেয়। পরিবারের মধ্যে খাওয়ার সময়ে বিষ দেওয়া হয়েছে বলে মৃত্যু। কিন্তু সেই মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিষ প্রয়োগ হয়েছে পটাসিয়াম সায়েনাইড। এই একটি জিনিসকে কেন্দ্র করে, একটা মানুষ কি করে, অত বড় একটা চক্র এর সাথে যুক্ত থাকতে পারে, এমনটা ভাবতেও পারে? … বাবার এই অয়াইড ক্রাইম সেন্সই, উনার এতো বড় বড় কেস শলভ করার মুখ্য কারণ। … উনি যেন গন্ধ পেয়ে জেতেন যে, এই কেসের সাথে বড় কনো র‍্যাকেট জড়িত… কিন্তু আমি আজও সেই গন্ধটা পাইনা। তাই আজও বাবার মত, এতো সহজে কেসের সমাধান করতে পারিনা।

যদিও রথিন কাকা এখানে অন্য কথা বলেন। উনি বলেন – মিলি তোর বাবা, ক্রাইম কন্ট্রোলের একটা নতুন দিক খুলে দিয়েছে। এতদিন পর্যন্ত ক্রিমিনালের মোটিভ ধরা হত। তোর বাবা একটা নতুন ধারা চালু করে দিলো যেখানে ক্রিমিনালের নয়, ক্রাইমেরই মোটিভ ধরে নেওয়া হয়। বুঝতে পারছিস ব্যাপারটা? ক্রাইমটা কেন করা হয় ধরে নেন উনি। ফলে সেই ক্রাইমের সাথে যারা যারা, যে যে ভাবে যুক্ত সকলে সামনে চলে আসে। চেষ্টা করেও গা ঢাকা দিতে পারে না। পলিটিকাল লিডার হোক, বা আশ্রমের মাথা; সিনেমার জগতের সাহেনশাহ হোক বা সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। ক্রাইমের মোটিভ ধরে নেবার মানে হলো, গাছটাকেই ধরে নেওয়া। একবার গাছ কেটে ফেললে, সব ডালই নেমে আসে।

আমি এই কথার খুব বিচার করেছি। অনেক দিন বিচার করে বুঝেছি, একদমই সঠিক বলতেন কাকু। বাবা, যেকোনো ধরনের ক্রাইম কেন করা হয়, সেই রহস্যের সমাধান করতেন। ফলে যারা যারা ক্রাইমের সাথে যুক্ত, তারা এমনিই সামনে চলে আসতো।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5