প্রথম পর্ব – মৌলবি খুন
এলিয়ান রহস্যের খবর অমৃতলালে ছাপার পর, বাবার নাম দিকে দিকে ছড়িয়ে গেছিল। না বাবাকে কেমন দেখতে, তেমন কেউ জানেন না, তবে বাবার নাম সম্বন্ধে আপামর জনসাধারণ অবগত হয়ে উঠেছিল। সেটা বুঝলাম কি করে? বাবার এই কেসের পর, আমি মা আর বিদিপ্তাদিদি বাবাকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের স্করপিও গাড়িতে করে একটা ছোট ট্রিপে গেছিলাম। মা প্ল্যান করেছিল বাইরে কোথাও যাবে, কিন্তু বাবা বললেন, আমাদের এই বাংলা এমনই পুণ্যভূমি, যেখানে সব থেকে বেশি সংখ্যক শক্তিপিঠ রয়েছে, যার মধ্যে একাকী বীরভূম জেলাতেই ৪টে মূল শক্তিপিঠ রয়েছে, সেসব না দেখে, বাইরে কেন যাওয়া হবে।
তাই আমাদের গাড়ি ছোটে বীরভূমে। প্রথম শান্তিনিকেতন, সেখান থেকে কাছাকাছি কঙ্কালি, ফুল্লরা দেখে, সরাসররই এলাম বক্রেশ্বর। বক্রেশ্বরের মহাশক্তিপিঠ দেখে, সেখানে মহর্ষি বশিষ্ঠের তপভুমি দর্শন করে এলাম তারাপীঠ। তারাপীঠ থেকে বিরচন্দ্রপুরে গিয়ে, প্রভু নিত্যানন্দের জন্মভিটা দেখে, পাণ্ডবদের একচক্র গ্রাম দেখে, অন্যদিকে সাধক বামাখ্যাপার জন্মভিটা দর্শন করে, দেখে এলাম নলহাটির নলহাটেশ্বরীকে। এই পুরো যাত্রাপথে, যেখানে যেখানে বাবাকে পরিচয় দিতে হয়েছে, সেখানে সেখানে খাতিরদারি দেখার মত ছিল।
একটা কমন ডাইলগ – ও আপনি কি সেই রিপোর্টার, বিজয় সিংহ, যিনি পিলসিমা গ্রামকে বাঁচিয়েছিলেন! … আর তারপর তো লেগেই আছে কথা; আপনার সাহস মশাই বলিহারি। না আপনি পুলিশ, না গোয়েন্দা, আপনি এইসব করেন কি করে? ভয় লাগেনা! … এত বড় বড় ক্রিমিনালদের একাহাতে সাহেস্তা করেন কি করে। … আরো কত কি কথা – আপনি আমাদের বাস্তব জগতের হিরো, আপনি আমাদের প্রেরণা, আরো কত কিছু। … তারাপীঠে হোটেলের মালিক তো বাবাকে হোটেলের চিফ গেস্টই বানিয়ে দিল। সংবর্ধনা দিল, আর আমাদের থেকে একটা টাকাও নিলোনা। এমনকি তারাপীঠের পাণ্ডার সাথে কথা বলিয়ে, সেখানেও নিজের খরচে তারামায়ের দর্শনের সুবন্দোবস্ত করে দিলেন।
মায়ের মুখে দেখলাম একটা আনন্দের ছাপ, কিন্তু বাবার মুখে একটা বিরক্তির ছাপ। প্রশ্ন করতে, বাবা বলল, এরকম পশার হয়ে গেলে, কাজ করা খুব অসুবিধা হয়ে যাবে বুঝলি; একটা ছদ্মনাম ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে, সেই নামের নথিও সঙ্গে রাখতে হবে। আসল নাম এইভাবে ক্যারি করলে, ক্রিমিনাল তো আমার উপস্থিতিতেই সতর্ক হয়ে যাবে।
আমার কিন্তু ভারি আনন্দ হয়েছে। কিরকম একটা সেলিব্রিটি সেলিব্রিটি ভাব। সেদিন বুঝিনি, তবে আজ নিজে কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারি, নামের পশার থাকলে, থাকা খাওয়া, আতিথেয়তার খুব সুবিধা হয়, তবে কাজের খুব অসুবিধা হয়, বিশেষ করে যদি তদন্ত করার মত কাজ হয়, বা গোপনীয়তা বজায় রেখে খবর সংগ্রহ করার কাজ হয়।
যাই হোক, বেজায় মজা করে, প্রায় ১০ দিনের ট্রিপ করে, আমরা বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি ফেরার পরের দুইদিন, আমার মায়ের আর বিদিপ্তাদিদির কাপড় কাচতে আর আলমারি গোছাতেই সময় চলে যায়। বাবাকে এই সময়ে দেখে খুব রাগ হতো। পায়ের উপর পা তুলে, নিজের ছোট্ট বিছানায় সারাদিন বসে বসে, সমস্ত শক্তিপিঠের থিসিস লিখে চলেছেন। আমরা গাধার খাটনি খেটে চলেছি, আর উনি পায়ের উপর পা তুলে আয়েশ করছেন।
ফিরে আসার তিনদিনের দিন, সন্ধ্যায়, আমরা চারজনেই একত্রে চা খেয়ে, চায়ের টেবিলকে ঘিরেই গল্প করছিলাম। কলিংবেলটা বেজে উঠতে, আমি উঠে গিয়ে আইহোলে দেখলাম। দেখলাম একজন সামান্য দেখতে সুপুরুষ মানুষ দাড়িয়ে রয়েছেন। বাবাকে বলতে, বাবা দরজা খুলতে বললেন। ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে, হাতজোর করে বললেন – নমস্কার, আমি জাকির আব্বাস, পার্কসার্কাস মসজিদের মৌলবি সাহেবের বড় ছেলে।
বাবা ভিতর থেকে বললেন – নিয়ে আয় উনাকে।
আমি উনাকে চায়ের টেবিলে নিয়ে আসতে দেখলাম, মা আর বিদিপ্তাদিদি সেখান থেকে টেবিলের সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে ইতিমধ্যে উঠে গেছেন। ভদ্রলোককে সোফায় বসাতে বসাতেই বাবা বললেন – কাল রাত্রে রোজা ভাঙার খাবার খাওয়ার সময়ে বিষক্রিয়ায় দেহত্যাগ করেছেন তো মৌলবি?
জাকির – হা জি। কিন্তু কে কেন, কিছুই আমরা বুঝতে পারছি না!
বাবা – পুলিশের কাছে যান। এটা তো পুলিশ কেস!
জাকির – জি পুলিশ তো নিজে থেকেই এসেছে। বডি নিয়ে গেছে কাল রাত্রেই, আজ সকাল থেকে আমাদের সকলকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। আর বলেছে, কাল সকালে সবাইকে জেরা করবে।
বাবা – হুম, তো আমার এখানে কি কাজ?
জাকির – জি, আমি জানি যদি কেউ এই মার্ডারের আসল খুনিকে খুঁজে বার করতে পারে, তা আপনিই।
বাবা – কিন্তু আমি পারিবারিক কেস নিইনা। আর আমি তো আর ডিটেকটিভ নই, আর পুলিশের অনুমোদিত তদন্তকারিও নই। পুলিশ থাকতে, আমাকে সেখানে ভিড়তেই দেবে না পুলিশ।
জাকির – স্যার, আমি জানি সেইসব কথা; তাই তো চিফমিনিস্টারের থেকে একটা চিঠি লিখিয়ে এনেছি, আপনাকে এই কেসে এপোয়েন্ট করার জন্য। … (সাথে থাকা কালো চামড়ার ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বার করে) ইয়ে লিজিয়ে, … চিফমিনিস্টারের লেটার।
বাবা একবার চিঠিটা নিয়ে, চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন – বেশ। … আচ্ছা পার্কসার্কাস থানার ওসিই তদন্ত করছেন তো?
জাকির – জি হা, তাপস শিকদার উনার নাম।
বাবা – ওকে থ্যাঙ্ক ইউ। আমি উনার সাথে কথা বলে নিয়ে, কাল সকালে উনার জেরা করার সময়ে, উনার সাথেই যাচ্ছি আপনাদের বাড়ি।
জাকির সাহেব বললেন – স্যার, আপনার ফিজটা!
বাবা – আমার কনো ফিজ নেই। আমি কনো পেশাদার নই। … আপনাকে সাফ বলে রাখি কিছু কথা আগেভাগেই। যদি দেখি যে পারিবারিক কেস, তবে কিন্তু আই উইল কুইট। … আমি মনে করিনা, পারিবারিক কেসের তদন্ত করার জন্য আমি সঠিক ব্যক্তি। তার জন্য পুলিশই যথেষ্ট। আর সেই ক্ষেত্রে আমি কনো ফিজই নেবনা। … আর যদি দেখি যে না, এই কেস পারবিবারিক নয়, বরং তা অন্যধারার কেস, তবেই আমি এগবো। আর সেই ক্ষেত্রেও আমার কনো ফিজ নেই। যে যা কিছু আমার পারিশ্রমিক মনে করে দেন, আমি তাই নিই।
জাকির সাহেব চলে গেলেন। বাবা কিছু ফোন করতে বসলেন। দুতিনটে চেনা পুলিশ অফিসারের সাথে কথা বলে নিয়ে, বাবা কল করলেন তাপস শিকদারকে, মানে পার্ক সার্কাস থানার ওসিকে।
ফোনে বাবা বিশেষ কিছুই বললেন না। খালি বললেন যে মৌলবিসাহেবের বড় ছেলে, বাবার শরণাপন্ন হয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর থেকে চিঠি করে নিয়ে। তাই তিনি কালকে কেসের তদন্তের বিষয়ে যাবেন। … কথাবার্তার মধ্যে বাবা এও বলে দিলেন যে, যদি দেখেন যে পারিবারিক কেস, তাহলে তিনি এই কেসে আর যুক্ত হবেন না। … অন্যদিক থেকে তাপসবাবু বললেন – বেশ, কাল সকালে দেখা হচ্ছে।
আমি আর বাবা, পরেরদিন সকাল সকাল উঠেই পার্কসার্কাস চলে গেলাম। কি বিশাল বাড়ি! আর অসম্ভব রকম খানদানি বাড়ির গঠন আর সাজনগোছনটাও। বাড়ির দরজাতেই দাঁড়িয়েছিলেন ইন্সপেক্টর শিকদার, আর তার সাথে দুটি কনস্টেবল আর আরেকজন কালো কোর্ট পরা লোক। বাবা আর আমি সেখানে যেতেই, মিস্টার শিকদার এগিয়ে এসে হ্যান্ডসেকের জন্য হাত বাড়িয়ে বললেন – অনেক শুনেছি আপনার ব্যাপারে। নাইস টু মিট ইউ, মিস্টার সিংহ।
বাবা উনার সাথে হ্যান্ডসেক করছেন, এমন সময়ে সেই কালো কোর্ট পরা লোকটা এগিয়ে হেসে বললেন – হাই, আই এম ডিটেকটিভ সুপার ইনটেলিজেন্ট।
বাবা হাত মিলয়ে বললেন – আচ্ছা, আপনাকেও কি এখানে ডাকা হয়েছে নাকি?
ডিটেকটিভ বললেন – হ্যাঁ, আমাকে ডেকেছে এই বাড়ির একমাত্র জামাই, নাজির ওমার সাহেব।
বাবা – ওকে, তা আপনাকে কি বলে ডাকা হোক, আপনি পছন্দ করবেন?
ডিটেকটিভ – ফাইন, মাই অরিজিনাল নেম ইজ সুমন্ত দত্তরায়। ইউ ক্যান কল মি সুমন্ত।
বাবা – নাইস টু মিট ইউ, মিস্টার সুমন্ত। (মিস্টার শিকদারের দিকে তাকিয়ে) তাহলে এবার ভিতরে যাওয়া যাক।
মিস্টার শিকদার – হ্যাঁ চলুন, আপনি কি আলাদা করে জেরা করবেন?
বাবা – আপাতত আপনারাই করুন। যা নোট করার আমি তার থেকেই করে নেব। যদি তারপরেও কিছু লাগে, আই উইল মুভ ইন্ডিভিজুয়ালি। … আশা করি, তাতে আপনাদের আপত্তি থাকবেনা!
মিস্টার শিকদার – আরে মশাই, আপনাকে আটকালে, আমার কি অবস্থা হবে বুঝতে পারছেন! পুরো পুলিশ, সিয়াইডি ডিপার্টমেন্ট আপনার ফ্যান; স্বয়ং চিফমিনিস্টার আপনার ভক্ত। আমাকে তো আমার চাকরি বাঁচিয়ে রাখতে হবে নাকি!
বাবা ও সকলের হাসি। আর তারপর হাসি থামিয়ে অন্দরমহলে প্রবেশ। জেরা সুত্রে জানা গেল যে মৌলবি সাহেবের প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন, ১০ বছর আগে। উনার তিন সন্তান, দুই পুত্র এবং একটি কন্যা। বর্তমান স্ত্রী নিঃসন্তান। তবে, উনাকে সকল মৌলবিসাহেবের সন্তানই অত্যন্ত স্নেহ করেন, এবং মন থেকেই আম্মি বলে ডাকেন। আমি বরং আপনাদের জেরাতে কে কি বলল, সেটা বিস্তারেই বলি। অনেক তথ্যই পেয়েছিলাম এই জেরা থেকে। আর যা বুঝলাম যে, আমি আর বাবাই একমাত্র যারা কনো পড়াশুনা না করে এই কেসের তদন্তে নেমেছিলাম। ইন্সপেক্টর শিকদার আর গোয়েন্দা সুমন্ত রীতিমত পড়াশুনা করে এসেছিলেন। কেন বলছি এই কথা? জেরা শুনলেই বুঝতে পারবেন। শুনুন তবে –
