বৎসনাভ | রহস্য ভেদ

মায়ের সাথে কি কথা হলো কে জানে, মায়ের সেই ঐতিহাসিক গ্রন্থ হাঁটকানো বন্ধুটি আমাদের বাড়িতে মায়েরই কলের উত্তরে এলেন।

আলাপ আলোচনার পর, আমি যখন থেকে কথা শুনলাম, সেটাই বলছি –

বাবা বললেন – আপনি যেতে পারেন আমার সাথে, কিন্তু ওখানে যেটা হবে, বা যেটা আপনি দেখবেন বা জানবেন, তার সমস্ত কথা আপনাকে চিরজীবনের জন্য হজম করে নিতে হবে। … যদি পারেন, তবেই আপনাকে উনার কাছে নিয়ে যাবো, নয়তো আমি একা আমার কন্যাকে নিয়ে যাবো।

ভদ্রমহিলা বললেন – আমি যাবো না উনার কাছে। উনি আমাকে দেখে একটু বিরক্তই হয়েছিলেন। বড় তাচ্ছিল্যস্বরে কথা বলেছিলেন। আমার ভালো লাগেনি। … আমি জায়গা দেখিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করবো। ফিরে এলে একসাথে চলে আসবো।

কথা শেষ হতে, আমি বাবা, আর সেই মহিলা অর্থাৎ সর্মিলা ধর্মতলা থেকে শিলিগুড়ির বাস ধরলাম। আজ সন্ধ্যায় উঠলাম, পরের দিন সকালে নামলাম। নেমে গ্যাংটকের জিপ ভারা করলাম। গ্যাংটক পৌছাতে প্রায় ৫ ঘণ্টা লেগে গেল। সেখানে রেস্ট না নিয়ে, আমরা চলে গেলাম পেংলঙ। ধুধু প্রান্তর, কনো জনমানুষ নেই, খালি পাহার আর বরফ, আর মাঝে মাঝে একটু একটু করে ঝোপ। সেখানে গিয়ে আমরা তাঁবু ফেললাম। রাত্রিটা সেখানে কাটিয়ে, পরের দিন আমরা ট্রেক করতে আরম্ভ করলাম ইখাবূ বলে একটি জায়গার উদ্দেশ্যে। … বিস্তর পথ। গাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলাম। ড্রাইভার তেঞ্জিং ছেত্রির ফোন নম্বর রাখা ছিল। সে বলে দিয়েছিল, ফেরার আগের দিন ফোন করে দিতে। ও চলে আসবে।

আমরা তিনদিন ধরে ট্রেক করেছিলাম। সর্মিলা আনটি আর শেষের দিকে হাঁটতে পারছিলেন না। আমিও হাঁপিয়ে গেছিলাম। বাবাকে আমাদের বিশ্রামের জন্যই অযথা অপেক্ষা করতে হয়। … রাত্রিটা আগুন জ্বালিয়ে, তাঁবু খাটিয়ে থাকা, আবার দিনের বেলায় হাঁটা। তিননম্বর দিন দুপুর বেলায়, আমরা ইখাবু পাহারের নিচে এসে পৌঁছলাম। আমাদের পাহাড়টি ছোট, কিন্তু পিছনে বরফের মালা পুরো। …

বাবা একটা তাঁবু খাটিয়ে দিলেন সর্মিলা আনটির জন্য; রাত্রিটা সেখানেই উনি থাকবেন। বন্য জন্তুর তেমন ভয় নেই এইদিকটায়। তাও আগুন জ্বালিয়ে থাকতে বললেন। আমাকেও থাকতে বলছিলেন। কিন্তু আমি বাবার সাথে যাবার জন্য জেদাজেদি করতে, বাধ্য হয়েই নিয়ে গেলেন আমাকে। তবে আমার থেকে গেলেই ভালো হতো। আমাকে দেখে, ওই মহিলা, যিনি এই তাঁবু থেকে ২০ মিটারের মধ্যে থাকা একটি গুহায় ছিলেন, তিনি ভয়ানক ক্ষেপে যান।

বাবা উনাকে শান্ত করতে বলেন – কিছু মনে করবেন না দেবী, আমার কন্যা। একা পাহাড়ের মধ্যে ছেড়ে আসি কি করে, তাই নিয়ে এলাম। … সেই শুনে উনি শান্ত হলেন।

বাবাকে নিজের পরিচয় দিতে হয়না। দেবী বিদিপ্তা, বাবাকে সরাসরি বিজয় বলেই ডাকলেন। আমি ভেবেছিলাম বাবাকে উনি চেনেন আগে থেকে। কিন্তু দেখলাম বাবাও চমকে গেলেন। বাবা বললেন – আপনি আমাকে চেনেন! 

দেবী বিদিপ্তা একটু মুচকি হেসে বললেন – আমার হাতে হাতকড়া পরাতে এসেছ তো?

বাবা – আজ্ঞে না। … আমি জানি আপনি যা কিছু করেছেন, তা নবনির্মিত আধ্যাত্মিক পথকে নির্মল রাখার জন্যই করেছেন। আর তা যে করতে পেরেছেন, তার কারণ সেটি দৈবাৎ তাই। … অর্থাৎ সেটি হবার ছিল, তাই আপনার প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। না হবার হলে, আপনি ব্যর্থ হতেন। আমার এখানে আসার হেতু, পুরো ঘটনাটা জানা অবশ্যই, কিন্তু তার থেকেও বেশি, আপনাকে দেখা।

দেবী বিদিপ্তা – যদি হাতকড়া না পরাও, তবে এই পুজোতে গিয়ে, তোমাকে ডেকে নেব। তোমাকে যা শিক্ষা দেবার দিয়ে দেব। … আমি আর ৩ বছর আছি। এই তিনবছর আমার খাওয়াপড়ার ভার নিতে পারবে বিজয়?

বাবা – আপনি চাইলে, নিশ্চয়ই পারবো।

দেবী বিদিপ্তা – তাহলে, আমাকে তোমার বাড়িতে এই তিনবছর রাখবে। আমি তোমাকে আর তোমার স্ত্রী আর এই কন্যাকে যা শিক্ষা দেবার তা দিয়ে, আবার এখানে চলে আসবো। এখানে আসার পর আমার হাতে আর একটি মাস সময় থাকবে। আমি মহাশূন্যে নিজের অস্তিত্ব লীন করবো, যেখানে আমার দুই গুরুভগিনী এবং গুরু স্বয়ং বিলীন হয়েছেন। … আর আমার চলে যাবার পর, যদি কিছু জানার থাকে, প্রতিভা আছে। … খুব ভালো মেয়ে ও। আমার গুরুর নিজের গর্ভজাত কন্যা। অবতারের রক্ত বইছে, ওঁর মধ্যে দিয়ে। … তবে এসব প্রকাশ করো না বাবা। … গয়না লকারেই রাখতে হয়, সামনে ফেলে রাখতে নেই। আধ্যাত্মিক তত্ত্ব হলো মহামূল্যবান রত্ন। এঁদেরকে বাইরে রাখতে নেই।

বাবা বললেন – আমি আসি তাহলে মা।

দেবী বিদিপ্তা – পাহারে সন্ধ্যা নামতে দেরি আছে। তোমার স্ত্রীর বান্ধবিকে একা রেখো না। … সে আগুনে ভয় পায়, তোমাকে বলে নি। …

বাবা এবার প্রশ্ন করলেন – আপনিও কি প্রণাম নেন না!

দেবী বিদিপ্তা হেসে বললেন – এক তিনিই প্রনম্য। তিনি সর্বত্র আছেন, তাই সমস্ত কিছুই প্রনম্য। বাকি সমস্ত কাজ ছেড়ে, তবে কি খালি প্রণামই করতে থাকবে বাবা!

বাবা হেসে বললেন – কিছু প্রশ্ন ছিল মা।

দেবী বিদিপ্তা – প্রতিভা এসেছিল আমার কাছে। সাহায্য চাইতে। … আমি শীর্ষের কাছে যাই। ওকে বলিও কৃতান্ত পাবলিশ করার হট ছেড়ে দাও, নাহলে আমি তোমায় হত্যা করতেই এসেছি। … সে বলে, আমাকে মেরে ফেলুন। আমি বুঝে গেছি কৃতান্ত পাবলিশ করা কেন অনুচিত। তারপরেও আমার বিকারে গ্রস্ত হয়ে যাওয়া শয়তান বুদ্ধি আমাকে কিছুতেই এই বই পাবলিশ করা থেকে দূরে সরতে দিচ্ছে না। …

বাবা হেসে – আর কিছু বলেছিলেন উনি শেষকালে?

দেবী বিদিপ্তা – হ্যাঁ, প্রশ্ন করেছিল সে। পরের জন্মে নিজেকে কৃতান্তের কাছে উৎসর্গ করতে পারবে কিনা। … শেষ সাতদিন ও নিজেকে অসুস্থ বলে ঘোষণা করে। আর আমার থেকে কৃতান্ত কথা অবিরাম শুনতে থাকে। … শেষ দিন আমাকে ও বলে, মৃত্যুকে সে একাকী উপভোগ করতে চায়। … তাই আলুপোস্ততে বৎসনাভ বা কাঠবিষ মিশিয়ে দিই। এবং আমি দরজা খুলেই চলে আসি। …

বাবা হেসে বললেন – উনি পরের দিন সকালে দেহ ছাড়েন।

দেবী বিদিপ্তা বললেন – না, ও রাত্রেই দেহ ছেড়ে দেয়। আমি ওকে কুম্ভক করতে শিখিয়ে এসেছিলাম। ও রাত্রের মধ্যে নিজের দেহ ছেড়ে দেয়। বিষ ওঁর শরীরে ক্রিয়া করে, রাত থেকে। … কিন্তু ও মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করার আগেই দেহত্যাগ করে দেয়।

বাবার চোখ ছলছল করে এলো। উনি বলে উঠলেন – প্রণাম করতে ইচ্ছা করছে মা বড়।

দেবী বিদিপ্তা বাবাকে স্নেহ ভরে আলিঙ্গন করে বললেন – তুই তো আমাদেরই একজন রে। … আমাদের গুরু ছিলেন এক, তার থেকে আমরা হলাম ৩, আমাদের থেকে হলো ৬, আর তাঁদের থেকে হবে ১২। আর সেই ১২-র প্রথম জনই তুই। … তুই তো তোর স্ত্রীকে ট্রেনে বসেই এই ছক বলে দিয়েছিলিস। ১-৩-৬-১২-২৪।

বাবা চলে এলেন আমাকে নিয়ে। যেই পথে গেছিলাম, সেই পথেই ফিরলাম। পথে বাবা একটিও কথা বললেন না। … সর্মিলা আনটি আর পারছিলেন না। … বাবা ছেত্রিকে ফোন করে দেন ঠিক সময়ে। আর সে এসে আমাদেরকে নিয়ে যায়। গ্যাংটকে পৌঁছে সর্মিলা আনটির খুব বমি পায়খানা হয়। দুদিন সেখানেই থাকতে হয়। তারপর আমরা ফিরে আসি। বাবা এসে মাকে সমস্ত কথা বলেন। মাও মাতা বিদিপ্তাকে বাড়িতে তিনবছর পাবেন, তাই খুব আনন্দ পান।

আমাকে নিয়ে এবার বাবা বিশিষ্টবাবুর কাছে গেলেন এবং উনার ৫০ হাজার টাকা ফিরিয়ে দিতে চেয়ে বললেন, আপনার বাবা খুন হননি। দৈবাৎ কারণেই উনার উপর বিষপ্রয়োগ হয়, তাও উনার সজ্ঞানে। আর উনি কুম্ভক করে, মৃত্যু উনার কাছে পৌঁছানোর পূর্বেই দেহত্যাগ করে দেন। তাই উনার খুন হয়নি। তাই এই টাকা আমি নিতে পারবো না বিশিষ্ট বাবু।

বিশিষ্টবাবু এবার বাবার হাতধরেই বললেন – জীবনে আমি বাবার হাতে কিচ্ছু দিতে পারিনি স্যার। … শেষে ইচ্ছা হয়েছিল উনাকে দিই, কারণ উনার শেষ বয়সে উনার প্রতি সম্মান আমার ঠিকঠাক ভাবে জন্মায়। … কিন্তু তা দিতে পারিনি। … আপনি উনার সমস্ত মৃত্যুরহস্য জেনেছেন। তাই প্লিজ এটা আমার তরফ থেকে নিন। আমি মনে করবো, বাবাকেই দিয়েছি টাকাটা।

বাবা আর কিছু বললেন না। চলে এলেন। পথে আমি বললাম – আমি না এই কেসটার কিচ্ছু বুঝলাম না।

বাবা বললেন – বুদ্ধি আমাদের পঞ্চভুতের একটি। পঞ্চভূত হল আকাশ মানে মন, জল মানে বুদ্ধি, পবন মানে প্রাণবায়ু, প্রগতি শক্তি মানে অগ্নি আর দেহ মানে মাটি। এই বুদ্ধি বিকারের প্রভাবে এসে শয়তান হয়ে ওঠে। শীর্ষবাবুও কৃতান্তের স্পর্শে আস্তে জীবনকে জানতে থেকেছিলেন। কিন্তু উনার বিকার উনাকে বলে, সবাইকে এই কৃতান্ত কথা বলতে হবে, তাই পাবলিশ করতে হবে। পরে সকল দেবী সমর্পিতার শিষ্যকুল বোঝাতে উনি বুঝে যান যে এটা পাবলিশ করা ঠিক নয়। তারপরেও উনার বিকার উনাকে ছেড়ে দিচ্ছিল না।

বাবা বলতে থাকলেন – শেষে দেবী বিদিপ্তার হস্তক্ষেপ কামনা করেন দেবী প্রতিভা, যার কারণেই এই বিকারগ্রস্তের হাতে এই গ্রন্থ উঠে আসে। আর তাই দেবী বিদিপ্তা নিজে এসে শীর্ষদাকে বোঝান। শীর্ষদাকে বলেন, হয় তাঁকে বুঝতে হবে, নয় তাঁকে মরতে হবে। … শীর্ষদা বুঝে গেছিলেন, তিনি তাঁর বিকারের কাছে বন্দি হয়ে গেছেন। তাই বলেন, তাঁকে মৃত্যু দিতে, এবং উদ্ধারের পথ দেখাতে। … তাই দেবী বিদিপ্তা তাঁকে সাতদিন ধরে কৃতান্ত কথার শ্রবণ করিয়ে, আর কুম্ভক শিখিয়ে, শীর্ষদাকে উদ্ধার করেন। তবুও উনার বিকার উনাকে ছাড়ছিলেন না। তাই উনাকে জানিয়েই উনাকে বিষ দেন। বৎসনাভ ভয়ানক বিষ, যা হিমালয়ের সেই অঞ্চলে পাওয়া যায়, যেখানে দেবী বিদিপ্তার গুহা। আর বিষ প্রয়োগের আগে আগে একটা ছেলেকে কল, শেষ বার ছেলের গলা শোনার ইচ্ছা। (হাসি)

কিন্তু শীর্ষদা মানসিক ভাবে এবং আধ্যাত্মিক ভাবে উন্নত হয়ে গেছিলেন। তাই উনি মৃত্যুর আগেই দেহ ছেড়ে দেন কুম্ভক করে। তবে উনার দেহকে পরীক্ষা করে বিষপ্রয়োগেই উনার মৃত্যু হয়, এমনই ধারনা হয়, আমাদের মত ভৌতিক জগতই সমস্ত কিছু, এই ধারনা রাখা মানুষদের।

অর্থাৎ কৃতান্তের সুরক্ষার জন্যই এই সমস্ত কিছু অনুষ্ঠিত হয়। … ধর্মগ্রন্থ হলো শ্রেষ্ঠ ধন মানবজাতির জন্য। কিন্তু মানবজাতি সার্বিক ভাবে ধর্মগ্রন্থের অন্তরে বলা সূক্ষ্ম এবং কারণ তত্ত্বের ধারনা করতেও অক্ষম, কারণ তাঁরা স্থূল জগতকেই, মানে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতকেই সর্বস্ব কিছু মনে করে। তাই ধর্মগ্রন্থ তাঁর জন্যই উপযোগী, যিনি মোক্ষের দ্বারের সন্ধান করছেন, অর্থাৎ সমস্ত যোনির থেকে মুক্তির সন্ধান করছেন। … তাই ধর্মগ্রন্থ আগেকার দিনে কেবল ঋষিদের কাছেই থাকতো।

যেই যেই ধর্মগ্রন্থ ঋষিদের থেকে সমস্ত মানুষের কাছে ছড়িয়ে গেছে, সেই সেই ধর্মগ্রন্থ সম্বন্ধে অপব্যাখ্যাও শুরু হয়ে যায়। মনে করা হয় যেন সেখানে বর্ণিত সমস্ত কথা ভৌতিক জগতের ইতিহাসের কথা। … তাই এই নবধর্মগ্রন্থ, যা সত্যই ভগবানের চরণের সমান, তাঁকে সুরক্ষিত রাখার জন্যই, এবং মানবের মুক্তির সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখার কারণেই এই কেস। একটা সম্পূর্ণ দিব্য কেস এটি।

আমি আর কিছু বললাম না, তবে বুঝলাম অনেক কিছুই। বুঝলাম, ধর্মের রক্ষার প্রশ্ন যখন আসে, তখন জাতি, জীবন, মৃত্যু, এসব কনো কিছুরই কনো দাম থাকেনা। … ধর্ম তাই যা মানুষকে মোক্ষের পথ দেখায়। আর যার মোক্ষ লাভের সময় হয়েছে, তাঁরই ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা উচিত, কারণ তিনিই ধর্মগ্রন্থের থেকে যেই ধারনা করা প্রয়োজন তা করতে সক্ষম। সেই সময়ের আগে যিনি গায়েরজোয়ারি করবেন, যদি ধর্মগ্রন্থ কৃতান্তের মতই শক্তিশালী হয়, তবে তাঁর এমন অকালমৃত্যু হবে, আর যদি ধর্মগ্রন্থের শক্তি হ্রাস পেয়ে থাকে, তবে ধর্মগ্রন্থেরই ধর্মত্যাগ হবে। … সত্যিই একটা দৈবাৎ কেস। বোধহয়, পৃথিবীর প্রথম দৈবাৎ কেস এটি।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5