বৎসনাভ | রহস্য ভেদ

সকালে ব্রেকফাস্ট দিয়ে ফাস্টিংকে ব্রেক করে, আমি আর বাবা চলে গেলাম সিএ ব্লক, সল্টলেক। ছোটোর উপর, সুন্দর বাড়িটা। কলিংবেলে হাত দিতে, একজন অপরূপা সুন্দরি মহিলা বেরিয়ে এলেন। পরনে বাড়িতে সাধারণ ভাবে পরা একটা কটনের সাদা শাড়ী, তাদের সামান্য ছাপ দেওয়া। মুখ দেখলে মনে হবে, আমার থেকেও বয়স কম। বাবা আর আমাকে বসালেন উনি, আর বললেন – চা করবো?

বাবা বললেন – আমার নাম বিজয় সিংহ।

ভদ্রমহিলা হাতজোড় করে বললেন – আপনার নাম শুনেছি। ইরার কেসটা আপনি অসাধারণ ভাবে করেছিলেন, এবং সকলের চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, ধর্ম কখনোই অন্ধবিশ্বাস হতে পারেনা। … ঈশ্বরের আশীর্বাদে একজন সাধিকা হবার সুবাদে আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ।

বাবাকে যেন মনে হলো একটু অপস্তুত হয়ে গেছেন। যেন উনি ঠিক করে এসেছিলেন কি বলবেন, কিন্তু সেটা আর বলা হলো না। … যাইহোক বাবা খুব তাড়াতাড়িই সামলে নিলেন নিজেকে, আর বললেন আপনার কৃতান্ত ছাপা তো বিশবাঁও জলে চলে গেল!

ভদ্রমহিলা একটা মিষ্টি হেসে বললেন – ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিলনা। তা কেন যে ঝোঁকের মাথায় ওটা পাবলিশ করার চিন্তা করলাম। শীর্ষবাবু একটা ভালো মানুষ ছিলেন। অঘোরে প্রাণটা দিতে হলো উনাকে।

বাবা একটু সিরিয়াস হয়েই বললেন – মানে আপনিও মানেন যে কৃতান্তের কারণেই তাঁর মৃত্যু!

ভদ্রমহিলা – অন্য কারণও থাকতে পারে, কিন্তু চোরের মন বোচকার দিকে। আমার চোখে তো আমারই কৃতকর্ম ধরা পরছে। অন্যের দোষ ধরে কি হবে, নিজের দোষকে মানুষের কাছে ঢাকতে পারবো, ঈশ্বরের কাছে পারবো! … আমার চোখে আমি একজন অপরাধী হয়ে রয়েগেলাম।

বাবা – বইটা সম্বন্ধে আপনিই কি বলেন উনাকে!

প্রতিভাদেবী – সবটাই আকস্মিক ভাবে ঘটে জানেন। … গতবছর অক্টোবর মাসে, উনি দুর্গাপূজা নিয়ে একটি বই পাবলিশ করেছিলেন দিশা পাবলিকেশন থেকে। দিশা পাবলিকেশনের সাথে আমার অনেক দিনের সম্পর্ক। তাই আমাকেও সেই অনুষ্ঠানে ডাকা হয়। আমি যেতে উনার সাথে আলাপ হয়। তো উনি সরাসরি ঈশ্বর বিদ্বেষী মনোভাব দেখালে, আমি উনাকে বলি, আপনি ঈশ্বর সম্বন্ধে কিছু জানেনই না। লোকমুখের কথা শুনে কি ঈশ্বরকে জানা যায়! আমার কাছে একটি অবতার-রচিত গ্রন্থ আছে। আপনাকে দেব। আপনি পরলে বুঝতে পারবেন, ঈশ্বর সম্বন্ধে আপনার ধারনা কতটা মিছে।

বাবা – তারপর! আপনি দিয়েছিলেন উনাকে কৃতান্ত!

প্রতিভাদেবী – না, আমাদের, মানে আমাদের গুরুভাই-বোনদেরকে এই নির্দেশ দেওয়া আছে যে, কেউ যদি তোমার সম্মুখে ঈশ্বরজ্ঞান আহরণের জন্য ব্যকুল ব্যক্তি আসেন, তাঁকেই এই গ্রন্থ দেওয়া যেতে পারে, তাও তাঁকে প্রথমে এই গ্রন্থ ধারণ করার জন্য যথাযথ শিক্ষা প্রদান করার উপরান্তেই এই গ্রন্থ দেওয়া যেতে পারে। তাই তাঁকে দিইনি। তবে তিনি নিজেই দিশার থেকে আমার এড্রেস জেনে এখানে আসেন। আমার কাছে এসে, রোজ দুইঘণ্টা করে, এই বসার জায়গার সোফাতে বসে উনি পড়তেন কৃতান্ত।

বাবা – তারপর কি উনি ইনফ্লুয়েন্সড্‌ হন?

প্রতিভাদেবী – হ্যাঁ, আর উনি নাছোড়বান্দা করেন এই বই পাবলিশ করার জন্য। আমি বলি, আমার কাছে এর ওয়ার্ড ফাইল নেই, প্রিন্টিং-এর জন্য আবশ্যক ওটা। উনি বলেন, কনো সমস্যা নেই। উনি পুরো বইকে ওয়ার্ডে লিখবেন আর তারপর ছাপাবেন দিশার মাধ্যমে। … উনি দিশার কাছেই এই বইয়ের কথা বলেন, আর তাতে দিশাও খুব উৎসাহী হয়ে ওঠে। যদিও আমি না বলতে বলার কারণে, শীর্ষবাবু আমার নাম কোথাও উল্লেখ করেন নি। …

বাবা – কেউ কি জানতেন, আপনি এমন করছেন, মানে পাবলিশ করতে দেবার জন্য এগচ্ছেন?

প্রতিভাদেবী – হ্যাঁ জানতেন, আমার ৫ গুরুভাই আর ভগিনী আছে, সকলেই জানতেন। … আর জানতেন, আমারই গুরুর গুরুভগিনী।

বাবা – যার পিতা এই কথা লিখেছেন, তাই তো?

প্রতিভাদেবী বললেন – না না, যিনি লিখেছেন, তিনি নিজের নাম গ্রন্থে কোথাও উল্লেখ করেন নি, কিন্তু গ্রন্থ পাঠ করলেই জানা যায় যে তিনি পূর্ণ-অবতার ছিলেন। তাঁর একমাত্র কন্যা এই গ্রন্থের শিক্ষা প্রদান করেন তিনজনকে। ইনারা হলেন দেবী মিরা, দেবী কৃতা এবং দেবী বিদিপ্তা। … ইনাদের মধ্যে, দেবী মিরার তিন শিষ্যা, আমি, সঞ্চয়িতা এবং অপর্ণা। … দেবী কৃতার একটি শিষ্য এবং একটি শিষ্যা, তনয় ও সুহাগী। এবং দেবী বিদিপ্তার একটি শিষ্য, সমরেশ। … এঁদের সকলের মধ্যে আমি হলাম, দেবী সমর্পিতা, অর্থাৎ দেবী মিরা, বিদিপ্তা এবং কৃতার গুরু যিনি, তাঁর গর্ভজাত সন্তান।

বাবা – তারমানে, আপনার দাদু এই গ্রন্থ লিখেছেন?

প্রতিভাদেবী – হ্যাঁ। … আমাদের গুরুদের মধ্যে, একমাত্র দেবী বিদিপ্তাই এখনো দেহী, অর্থাৎ দেহে অবস্থান করছেন। বাকি দুইজনে সমাধি অবস্থায় দেহত্যাগ করেছেন।

বাবা – দেবী বিদিপ্তার সাথে সাখ্যাত সম্ভব?

প্রতিভাদেবী – না। … উনার শিষ্য, সমরেশের থেকে শুনেছি, উনি হিমালয়ে চলে গেছেন। … তবে হ্যাঁ, প্রতিবছর আমাদের নিউটাউনের ধাম, যেটাকেই আমাদের কার্যালয় বলতে পারেন, সেখানে দেবীর আরাধনা হয়, আশ্বিনের চতুর্থী থেকে আমাবস্যা। … সেই সময়ে মাতা বিদিপ্তা অবশ্যই আসেন। … অর্থাৎ তাঁর সাখ্যাত পেতে হলে, যেমন আমাদেরকে ওই আশ্বিন মাসের অপেক্ষা করতে হয়, তেমন আপনাকেও সেই অপেক্ষাই করতে হবে।

বাবা – তা আপনি শীর্ষবাবুর বাসায় কবে প্রথম যান।

প্রতিভাদেবী – কনোদিনও যাইনি। … উনি যেতেও বলেন নি। আর আমি উনাকে উনার এড্রেস জিজেসও করিনি কনোদিন। উনার মৃত্যুর পর, কাগজে খবর পড়ার সময়ে জানলাম, উনার বেহালায় বাড়ি ছিল।

বাবা – আপনার কারুকে সন্দেহ হয়?

প্রতিভাদেবী – উনি তো খুন হননি! তবে সন্দেহ কেন?

বাবা – আচ্ছা ভালো কথা, আপনি জানতেন উনি খুব ভুগছিলেন?

প্রতিভাদেবী – হ্যাঁ, শেষ সাতদিন ধরে। … আমার থেকে উনি রোজ একটি করে কৃতান্তের পাতা নিতেন হোয়াটসঅ্যাপে। আমার কথা মত উনি সেগুলোকে ডিলিট করে দিতেন, কিন্তু আগে সেটা নিজের খাতায় লিখে নেবার পর। … কিন্তু শেষ কিছুদিন উনি লিখতে পারছিলেন না। … আমি দুইবার ফোনও করেছিলাম মাঝে। প্রথমবার শরীর কেমন আছে জানতে, আর দ্বিতীয়বার বলতে যে আপনি কৃতান্ত নিয়ে কাজ করা বন্ধ করে দিন।

বাবা – উনি কি বললেন?

প্রতিভাদেবী – উনি মনে হয় কৃতান্তের মধ্যে খুবই গভীর ভাবে ডুবে গেছিলেন। তাই উনি আমাকে শেষ দিন বললেন, একটা দেবদূত উনার শরীর খারাপ হবার আগে থেকেই উনার কাছে আছেন। তাই কনো চিন্তা নেই। কৃতান্তই উনার রক্ষা করবেন। আমি আর কিছু কথা বাড়াতে পারলাম না।… তারপর তো পেপারে নিউজ শুনে, নিজেকেই অপরাধী মনে হতে থাকলো।

বাবা – আচ্ছা, আপনি কি সেই দেবদূতের গলা পেয়েছিলেন, এই দুইদিনের মধ্যে একদিনও?

প্রতিভাদেবী – প্রথমদিন উনি দেবদূতের কথা আমাকে বলেন নি। তবে উনার সাথে তো রোজই কথা হতো; আজ পর্যন্ত কনোদিনও উনার সাথে কথা বলার সময়ে, দ্বিতীয় একটি শব্দও পাইনি, বাইরের কোলাহল ছাড়া।

বাবা – হুম্‌, আচ্ছা আপনাকে কি কেউ কৃতান্ত পাবলিশ করা নিয়ে থ্রেট করে ছিলেন? বা শীর্ষবাবুও কি তেমন কিছু পেয়েছিলেন?

প্রতিভাদেবী – আমাকেও সকল গুরুভাইবোনরা বারং করেছিলেন, আর শীর্ষবাবুর কাছে আমি না গেলেও, এঁরা সকলেই একবার একবার করে গিয়ে উনাকে কৃতান্ত নিয়ে কাজ না করার কথা বলে আসেন। কিন্তু প্রতিবারই উনাকে কেউ বলে আসতেন, আর প্রতিবারই উনার জেদ বেড়ে যেত। শেষে আমিও উনাকে অনেকবার বলি – দাদা, আপনি নিজে পরুন। আপনার কাছে তা গেছে, আপনার পড়ার সময় হয়েছে বলেই। কিন্তু ছাপাবার কথা ভুলে যান। এই বইয়ের মধ্যে অসীমিত শক্তি রয়েছে, যা অযোগ্য হাতে পরলে, সেই মানুষেরই ক্ষতি করে দেবে।

বাবা – মানে আপনি বলছেন, সেই দৈবাৎ ভাবেই শীর্ষবাবুর হত্যা হয়, কনো মানুষের কাজ নয় এটা!

প্রতিভাদেবী হেসে বললেন – আপনিও সেই একই ধারায় কথা বলছেন, যেমন ভাবে শীর্ষবাবু প্রথমদিন কথা বলেছিলেন। … বিজয়বাবু, ঈশ্বর না চমৎকার করেন, আর না চমৎকার করা তিনি পছন্দ করেন। … হ্যাঁ, সমস্ত কিছু, যা সারা পৃথিবীতে ঘটছে, তা দৈবাৎই। ভেবে দেখুন না, পৃথিবীতে কত মানুষ সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌছাতে পারছেনা বলে মারা যাচ্ছেন, কিন্তু কারুকে শুনেছেন যে লেবার পেনে, গর্ভবতী অবস্থাতেই, সন্তানের জন্ম না দিয়েই, গর্ভে সন্তানকে ধারণ করেই মা মারা গেছেন! … না শোনেন নি, কারণ কেউ না কেউ তাঁর কাছে সেই সময়ে পৌঁছেই যান। … কি বলবেন এটাকে? দৈবাৎ ঘটনা নয় সেটা!

আবার হেসে বললেন – কিন্তু দৈবাৎ আর চমৎকারের মধ্যে বিপুল ভেদ রয়েছে বিজয়বাবু। … আপনি শেষ ট্রেনে এসে শেষ অটোর শেষ সিটটা পেলেন। এটা কি দৈবাৎ ঘটনা নয়? … অবশ্যই দৈবাৎ। সমস্ত যোগাযোগই দৈবাৎ। কিন্তু চমৎকার নয়। … চমৎকার না তো ভগবান করেন, আর না ভগবান পছন্দ করেন। ওটা ভগবানের নয়, শয়তানের প্রচেষ্টা নিজেকে ভগবান বলে দাবি করার। … তাই বিজয়বাবু, এমন নয় যে যদি শীর্ষবাবুর হত্যা হয়ে থাকেন, কনো চমৎকার সেটা, কিন্তু হ্যাঁ অবশ্যই সেটা দৈবাৎ, কারণ দৈবাৎ না হলে যে কারুকে ছুরির দ্বারা আঘাত করলেও, তিনি মরবেন না; সুইসাইড করার চেষ্টা করেও তিনি মরবেন না, যদি না তাঁর মৃত্যুর ক্ষণরূপে সেইক্ষণটিকে দৈবাৎভাবে চিহ্নিত করা হতো।

বাবা – আপনার কনো গুরুভাইবোনদের দ্বারা কি এই কাজ করা যেতে পারে, আপনার কি মনে হয়?

প্রতিভাদেবী একটু ভ্রুকুঁচকে বললেন – অসম্ভব নয়। কৃতান্ত সাধারণের জন্য নয়, শুধুমাত্র সেই মানুষদের জন্যই কৃতান্ত, যারা জীবনচক্র থেকে মুক্ত হতে ব্যকুল। … তাই যদি তাঁদের মনে হয়ে থাকে যে, কৃতান্ত পাবলিশ হয়ে গেলে, কৃতান্তের গুরুত্বই নাশ হয়ে যাবে, তাহলে তাঁদের পক্ষে, এমন কি আমার পক্ষেও এই কাজ করা অসম্ভব নয়। আমরা সাধক বিজয়বাবু, আর সাধকের কাজে জন্ম-মৃত্যু সমস্তই কল্পনার ফের। তাই কল্পনাথেকে মুক্ত হবার চাবিকাঠি, অর্থাৎ কৃতান্তকে রক্ষা করার জন্য আমরা নিজেদের সমস্ত কল্পনারই মৃত্যু দিয়েছি। তাই অন্যের কল্পনার মৃত্যু দেওয়া আমাদের কাছে কনো বড় ব্যাপার নয়। জীবনের দাম সাধকের কাছে থাকেনা, জীবনের দাম থাকে তাঁদের কাছে, যারা এই পঞ্চভুতের শরীরকেই সর্বস্ব মনে করেন।

বাবা একটু ব্যাঙ্গের হাসি হেসে – এই কথা বলে, আপনি আমার সন্দেহকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে নিচ্ছেন, সেটা কি আপনি বুঝতে পারছেন?

প্রতিভাদেবী আবার একটু হেসে বললেন – শারীরিক ভাবে আমি খুন করি আর না করি, শীর্ষবাবুর মৃত্যুর জন্য, আমি ইতিমধ্যেই নিজেকে দায়ী করে ফেলেছি, আর সেটা আমার সাথে চিরকাল চলবে, আমার কর্মফলরূপে। আইন আমাকে সাজা দিন আর না দিন, আমি আমার এই কর্মের ফল নিজেকে ঠিক সময়েই প্রদান করবো, কারণ যতক্ষণ না তা করবো, ততক্ষণ আমার মুক্তি নেই। এই ভাবনার থেকে মুক্তি নেই। যাই হোক, এই সমস্ত অনেক গভীর তত্ত্ব। আমি এইসমস্ত কথা আপনাকে বলতে চাই না। ন্যাড়া একবার বেলতলায় যায়। আমি একবার বেলতলায় গিয়ে, শীর্ষবাবুকে এইসমস্ত কথা বলে উনার মাথা খেয়ে, একটা কর্মফল কুড়িয়েছি। আর দ্বিতীয়বার সেই একই কাজ আমি করতে চাইনা।

বাবা বললেন, আপনার সাথে কথা বলে সত্যিই খুব ভালো লাগলো প্রতিভাদেবী। এই প্রথম কনো আধ্যাত্মিক ব্যক্তির সাথে কথা বললাম, যিনি প্রকৃত অর্থে সত্যের পূজারি। … হ্যাঁ মাথা নষ্ট করার ইচ্ছা আমার রয়েই গেল এই কৃতান্ত নিয়ে। কারণ আমার আধ্যাত্মের ব্যাপারে বরাবরই আকর্ষণ সব থেকে বেশি, তবে যেই ভাবে আপনি বললেন, অর্থাৎ দৈবাৎতত্ত্ব, এই ভাবে কারুর থেকে আমি শুনিনি, তবে শুনতে চেয়েছিলাম। … তাই যদি আসি আপনার কাছে, কৃতান্ত শ্রবণ করার জন্য, আপনি কি আমাকে সেই কৃপা প্রদান করবেন?

প্রতিভা দেবী হেসে বললেন – স্বয়ং অবতার বলে গেছেন যে তিনি ঈশ্বরের বাহন, তো আমি কে বিজয়বাবু। তোমার শুনতে ইচ্ছা হলে, সেও তোমার অন্তরে নিবাস করা তাঁর ইচ্ছা, আর আমাকে বলতে বাধ্য করলে, আমার অন্তরে নিবাস করা তাঁরই আমাকে কৃতান্ত কথা বলার নির্দেশ প্রদান। আমরা সকলেই মাধ্যম মাত্র বিজয়।

এবার বাবা হাতজর করে ধন্যবাদ বলে উঠে পরলে, প্রতিভাদেবীর উদ্দেশ্যে বাবা বললেন – আপনাকে দিশা পাবলিকেশন কি করে চেনে?

প্রতিভা দেবী – আমার মা, মানে দেবী সমর্পিতা তাঁর পিতার, মানে কৃতান্তের রচয়িতার অন্য সমস্ত লেখা গ্রন্থকে দিশা পাবলিকেশনের মাধ্যমে পাবলিশ করতেন। সেই বই পড়েই, মিরাদেবী, বিদিপ্তা দেবী আর কৃতাদেবী উনার কাছে আসেন। আমি তাঁর কন্যা, তাই রয়ালটি পাই। সেই সূত্রেই দিশা আমাকে চেনে।

বাবা – চলে যায় রয়ালটিতে?

প্রতিভাদেবী – যা আসে, সমস্তই আমাদের ট্রাস্টেই দিই। মা প্রচুর পয়সা করেছিলেন সেই বই বিক্রি করে। সেই পয়সায় উনি তিনটি বাড়ি করেছিলেন। এঁদের একটা এই বাড়িটি, আর এছাড়াও সল্টলেকেই দুটি বাড়ি আছে। বাড়ি ভাড়ার পয়সার পর আমার আর কিছু লাগেনা। তবে রয়ালটির টাকার উপর আমার একার অধিকার থাকতে পারেনা। উনার সমস্ত শিষ্যের সন্তানদেরই তার উপর অধিকার আছে। … সেই পয়সাতেই প্রতিবছর মাতৃআরাধনা হয় আমাদের, মায়ের আর দাদুর নিউটাউনের ভিটেতেই।

বাবা এবার হেসে আমাকে নিয়ে বেড়িয়ে চলে আসছিলেন। ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন – আপনারা কেউ সন্ন্যাসিনী নন, তাই না!

প্রতিভাদেবী হেসে বললেন – সংসার হলো কুরুক্ষেত্র, যেখানে রিপুপাশদের সাথে প্রত্যক্ষ লড়াই করতে হয়। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন গাণ্ডিব ধরো, যুদ্ধ করো। আর আমরা কি করে, রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যাই বলুন তো!

বাবা এবার হেসে বললেন – আপনাকে প্রণাম করতে পারি!

প্রতিভাদেবী হেসে বললেন – আমার ভিতরে তাঁকে অনুভব করলে, আর নিজের ভিতরের তাঁকে অসম্মান করবে! … তিনি তো তোমার অন্তরেও রয়েছেন, তাই না! … আমাকে প্রণাম করার অর্থ, আমার অন্তরে তাঁকে সম্মান করলে, আর তোমার অন্তরে তাঁকেই অসম্মান করলে, তাই না!

বাবা হেসে বললেন – আজ আসি দিদি। আবার আস্তে পারি তো?

প্রতিভাদেবী হেসে বললেন – তিনি চাইলে, তুমি না চাইলেও আসবে। …

বাবা – একটা প্রশ্ন করবো, মানে স্রেফ কৌতূহল।

প্রতিভাদেবী বললেন – ৩৫

বাবা – আপনার বয়স?

প্রতিভাদেবী – সেটাই তো জানতে চাইছিলে, তাই না!

বাবা – আপনাকে দেখে কিছুতেই বোঝার উপায় নেই। ২০-২২ লাগে।

প্রতিভাদেবী হেসে বললেন – আমাদের মাতাতুল্যা দেবী বিদিপ্তা এখন ৫৫। তাঁকে দেখেও বুঝবে না। না তাঁর চুলে পাক ধরেছে, আর না চামড়ায় টান পরেছে।

বাবা এবার হাতজোর করে আমাকে নিয়ে বেড়িয়ে এলেন। মোরের মাথায় একটা চায়ের দোকানে চা আর সিগারেট খেতে খেতে বাবা বললেন – সাধিকা কাকে বলে দেখলি মিলি?

আমি বললাম – উনার তো প্রতিটি শব্দে শব্দে ঈশ্বরের ধারনা বিদ্যমান বাবা! … এমন হন সাধক!

বাবা – ঠিক এমনই হন। ১০০% খাটি তপস্বিনী। যেই কৃতান্তের উপর ভর করে, ইনারা এমন হয়েছেন, সেটি যে তাঁর চরণ, সেই ব্যাপারে শীর্ষদা একদমই ভুল করেন নি। তবে একটি ভুল উনি করেছিলেন। সেটি হলো, ধর্মগ্রন্থ সকলের জন্য নয়, ধর্মগ্রন্থ শুধুমাত্র সাধকের সম্বল, সাধারণ মানুষ না তাঁর মানে বোঝেন আর না তাঁর ধারনা করতে পারেন। মাঝখান থেকে কেবলই বইপাঠ করে নেবার দম্ভ আসে, আর সেই দম্ভ থেকে একটা নতুন ভেদভাবের সৃষ্টি হয়। …

আমি – তারমানে এই বই ছাপাতে যাবার জন্যই উনার মৃত্যু হয়?

বাবা – হুম, এবার এই কেস নিয়ে এগোবো না এগবোনা, সেটাই বুঝতে পারছি না।

আমি – কেন এগবে না কেন? খুনির তো সাজা পাওয়া উচিত, তাই না!

বাবা একটা ধিক্কারের হাসি হেসে বললেন – ঈশ্বরের বই যদি ঈশ্বরের পথযাত্রী ছাড়া কেউ পড়েন, তবে কি হয় জানিস?

আমি – কি হয়?

বাবা – ঈশ্বর নিজের সেই যাত্রাপথকেই চিরতরে বন্ধ করে দেন। … তাই ঈশ্বরের পথে যাত্রার পথকে উন্মুক্ত রাখার জন্য, যিনি সেই দরজা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিলেন, তাঁর হত্যা কি করে অপরাধ হতে পারে মিলি! … আইনের চোখে সে অপরাধী, কিন্তু মানবজাতির চোখে, তিনি একজন মহামানুষ, যদিও মানবজাতির মধ্যে, সেই ব্যক্তিই এই কথা বোঝেন, যিনি ঈশ্বরের পথের যাত্রী, অন্যেরা বুঝতেও পারেন না। … তাই … (একটা জোরে নিশ্বাস ফেলে) … দেখি তোর মা কি বলেন। … চল বাড়ি চল।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5