দ্বিতীয় পর্ব – কেস মনে হয় শেষ
আমার প্রশ্নের উত্তর দুটি। তার প্রথমটি হলো এই যে, বাবা আমার পরবর্তী জীবনের সব থেকে কাছের বন্ধুটিকে নিয়ে এসেছিলেন সেদিন বাড়িতে। … হ্যাঁ, প্রতিভার সাথে আমার বন্ধুত্ব এই কেসের থেকেই বাড়তে শুরু করে, আর তা ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে, ও আর আমি অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাই। … আজ আমরা দুজনে অন্তত সপ্তাহে একদিন মিট করিই। আর সেখানে মিট করে, গল্প, আড্ডা, কেসের ব্যপারে কথা থাকে আর শেষে বাবার প্রসঙ্গ ওঠেই।
কিন্তু আমার প্রশ্নের যেই দ্বিতীয় উত্তর ছিল, তা পেলাম বাবার পরবর্তী কথা থেকে। বাবা বললেন – কিছু রিপোর্ট পেলে, পোস্ট মর্টাম থেকে?
প্রতিভা – হ্যাঁ স্যার, এক কানেকশন তো মিলা হে, কিন্তু সেই কানেকশন থেকে এটা বলা খুব কঠিন যে, এটা সুইসাইড না মার্ডার।
বাবা – মানে ডেথ ইন্সট্রুমেন্ট এমন যে, সেটা অন্যকেউও ব্যবহার করতে পারে, আবার ব্যক্তি নিজের উপরেও ব্যবহার করতে পারেন, তাই তো? … তো কি সেটা? … আমি কেসটা রিপোর্টার হিসাবে শুধু নয়, মৃতের ছেলে আমাকে এই কেসটা তদন্ত করতে বলেছেন। তাই আমাকে বলতে পারো, তোমার ফাইন্ডিং। আই উইল নট ডিশক্লোজ ডেম, বাট হ্যাঁ, আমার তদন্তে সাহায্য হবে।
প্রতিভা – নো প্রবলেম স্যার। আই নো, আই ক্যান ট্রাস্ট ইউ। … স্যার অয়েপনটা কি সেটা তো ফরেনসিক বলতে পারবেনা। তবে রানানকালসি নামক পদার্থ পায়া গেছে, ভিক্টিমের বডি থেকে।
বাবা – শুধু শরীরের ভিতরেই পেয়েছেন, নাকি শরীরের বাইরে বা অন্যত্রও?
প্রতিভা – নেহি, শরীরকা বাহার মে, কিছু নেই। … নো ক্লু।
বাবা – হাতে বা নখে?
প্রতিভা – না স্যার, ওসব বিলকুল সাফ। তবে রসুই মে, মানে কিচেন থেকে একটা ফিমেল হেয়ার পেয়েছি। ঘরে কেউ ফিমেল থাকেনা, তাই আই কালেক্টেড দ্যাট। ওই হেয়ারেও, আমরা রানানকালসির ট্রেস পেয়েছি। … বাট নোহয়ের এলস্।
বাবা – এবার তারমানে ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট হ্যান্ডেল করবে কেসটা?
প্রতিভা – দ্যাট, আই ডোন্ট নো স্যার। … আমি যা কিছু পেয়েছি, তা মিস্টার গাঙ্গুলিকে আর আমার বস্কে মেইল করে দিয়েছি। এবার তাঁরা ডিসাইড করবে, নেক্সট প্রসিডিওর কি হবে।
বাবা এই ব্যাপারে আর কিছু বললেন না। … তবে অনেক বিশয়েই কথা হলো। মায়ের সাথেও কথা বললো প্রতিভা, আর আমার সাথেও অনেককষন কথা হলো। … ওর সাথে কথা বলে, প্রথম দিনই খুব ভালো লাগে। তবে তখন জানতাম না, আমাদের সম্পর্ক এতো গভীর হয়ে যাবে পরবর্তীতে। কিন্তু তাও আমরা সেদিনই নিজেদের ফোন নম্বর চালাচালি করে নিয়েছিলাম, এবং প্রায়শই ওর সাথে বিস্তর কথা হতো। আমি আর ও, যখন বাবার কনো কেস থাকতো না, তখন একসাথে কফি বা ডিনারেও যেতাম।
কিন্তু সেদিনে, যখন প্রতিভা চলে গেল, তখন বাবাকে দেখলাম মোবাইল ফোন নিয়ে, কিসব পড়াশুনা করতে বসে গেছেন। … রাত্রে ডিনার করে, বাবা লাইট অফ করে, নিজের ছোট বিছানায় শুইয়ে রইলেন। আমি বাবার কাছে যাবো, মা বারণ করলেন; বললেন – উমম্ বিরক্ত করিসনা বাবাকে। … উনি ভাবছেন, ভাবতে দে।
মা আমার থেকে বাবাকে অনেক অনেক গুন বেশি চেনেন। তাই আর কথা বাড়ালাম না। তবে সত্যি বলতে, বাবা কোন দিশায় ভাবছেন, সেটাই জানার ছিল। … সকালে ঘুম ভাঙলো যখন তখন বাবা-মা টিটেবিলে। আমি ব্রাশ করে, সেখানে জয়েন করে প্রথম কথা বললাম – বাবা, কেসটাকি সত্যিই সিরিয়াস, নাকি..
বাবা – খুন না সুইসাইড বোঝা যাচ্ছে না।
আমি – খুন হতে পারে এইটা?
বাবা – শরীরের মধ্যে রানানকালসির ট্রেস পাওয়া গেছে। কিন্তু হাতে বা নখে তার চিহ্ন নেই। অর্থাৎ যদি নিজে হাতেও খান, তবে তরল খাবারের সাথে মিশিয়ে খেয়েছেন। এবার কথা হলো, যেটা তিনি খেয়েছেন, সেটাকি তিনি স্বেচ্ছায় খেয়েছেন, মানে তিনি খেতে চেয়েছেন বলে, তাঁর কাজের মেয়ে দিয়েছেন, নাকি কাজের মেয়েই সেই বিষ দিয়েছিলেন। …
বাবা বলতে থাকলেন – প্রশ্ন অনেক, উত্তর নেই। … যদি কাজের মেয়ে নিজের থেকে দিয়ে থাকে, তবে তো বোঝাই যাচ্ছে, এটা খুন; কিন্তু সেই ক্ষেত্রে প্রশ্ন করলেন যে এই কাজের লোক কার হয়ে কাজ করছিলেন! কার হয়ে এই বিষ দিলেন শীর্ষদাকে!… আর যার হয়ে কাজ করছিলেন, তার ইন্টেন্সান বা মটিভ কি! … আর এই সমস্ত কিছু যদি না হয়, যদি শীর্ষদার আদেশ পালন করার জন্যই, এই বিষ দেওয়া হয়, তবে প্রশ্ন এই যে শীর্ষদা কেন বিষ খেতে চাইবেন! … উনার সাথে উনার ছেলের সম্পর্কই বা কেমন! … সেই সম্পর্কের জন্যই নয়তো যে ছেলে তড়িঘড়ি করে বাবার ডেথ সার্টিফিকেট করিয়ে নিলেন!
মা – মানে তুমি বলছো, ছেলেই বাবার খুন করিয়েছে? … আর যাতে ফেঁসে না যায়, তাই তোমার শরণে এসেছে!
বাবা – হতে তো অনেক কিছুই পারে মধু, কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন? যদি ছেলেই মারতে চায় বাবাকে, তবে কেন? কি কারণে বাবার সাথে ছেলের বনিবনা হচ্ছিল না! … একটু ছেলের ব্যাপারেও খবর নিয়ে জানতে হবে। … মিলি, অফিসের নাম কি?
আমি – মিলিনিয়াম টেক বাইট।
বাবা – হুম, তারমানে বিদেশে মেমরি বিক্রি করে। … হুম, একটা এপয়েন্টমেন্ট নে, বিশিষ্টের কনো একটা কলিগের সাথে। … আর কালকে যেই যেই লেখকের নাম বলেছিলেন বিশিষ্টবাবু, তাঁদের নাম মনে আছে?
আমি হ্যাঁ বলতে, বাবা বললেন – ওদের সকলের সাথে একটা করে এপয়েন্টমেন্ট নে। সমস্ত জেরা, আজই শেষ করতে হবে।
আমি ১০টা বাজতেই কাজে লেগে পরলাম। মিলিনিয়াম টেকে এপয়েন্টমেন্ট হলো, মিস রিমা ব্যানার্জির সাথে। বিশিষ্টবাবু উনার বস্, আর উনার সাথে বিশিষ্টবাবুর সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। … উনার নাইট শিফটের কাজ। বাড়ি শ্রীরামপুরে। অফিসে জয়েনিং রাত্রি ৮টার মধ্যে। … তাই ওর সাথে এপয়েন্টমেন্ট রাখা হলো সন্ধ্যা ৬টায়, বিধাননগর স্টেশনে উনি নামবেন। তাই কাছাকাছি সৌরভস্ বলে একটা স্ন্যাক্সের দোকানেই এপয়েন্টমেন্ট করলাম।
এপয়েন্টমেন্ট করার সময়ে বুদ্ধি ঠিকঠাক ভাবে খাটিয়েছি, তাই বাবার থেকে তারিফ পেলাম। আর দুপুর ১২টায়, ২টোয়, আর চারটেতে এপয়েন্টমেন্ট পেলাম সুন্দর স্যন্যালের সাথে, পবিত্র দাসগুপ্ত’র সাথে, আর ভবানী দেবীর সাথে। …
সুন্দরবাবুর বাড়ি সল্টলেকে। পবিত্রবাবুর বাড়ি দানেশসেখ লেনে মানে হাওড়ায় আর ভবানী দেবীর বাড়ি বিডন স্ট্রিটে। তাড়াতাড়ি ভাত খেয়ে, আমি আর বাবা বেরোলাম। ১২টার সময়ে দেখা করলাম সুন্দর সান্যালের সাথে।
বাবা প্রশ্ন করলেন – শেষ কবে কথা হয়েছিল শীর্ষবাবুর সাথে?
সুন্দরবাবু – তিনদিন আগে হবে।
বাবা – উনি তো খুবই অসুস্থ ছিলেন?
সুন্দরবাবু – হমম্, খুবই … ভালো করে ফোনে কথাও বলতে পারছিল না ও। … তবে হি অয়াজ ইন সাম ডিফারেন্ট ট্রোমা। … বলে কি, একজন দেবদূত এসে গেছেন, তাঁর এই অবস্থায় সেবা করার জন্য।
বাবা – সেই দেবদূতের ব্যাপারে আপনি আর কিছু জানতে চাননি?
সুন্দরবাবু – না, ইচ্ছা ছিল জানার। বাট, ও ঠিক করে কথা বলতেও পারছিল না। তাই আই লেফট দা কল।
বাবা – উনার ছেলের সাথে উনার সম্পর্ক কেমন ছিল জানেন?
সুন্দরবাবু – কুলাঙ্গার একটা। … অমন বাপের অমন ছেলে কি করে হয়! … হাজার একটা মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক। … মহিলাদের পিছনে টাকা উড়িয়ে উড়িয়ে সমস্ত শেষ। এখন বাপের থেকে টাকা চায়। … বাবা স্পষ্ট বলে দিয়েছিল, উইল না করলেও, একটিই সন্তান হবার জন্য সমস্ত সম্পত্তি সে এমনিই পাবে। কিন্তু উনার দেহ রাখার আগে, একটি আনাও উনি দেবেন না। উনার দেহাবসানে সমস্ত উপার্জন ছেলেরই। তারপর সেই টাকা নিয়ে কি করবে, না করবে, সে ছেলেই বুঝে নেবে। … তাই ছেলে আর বাবার সাথে কনো যোগাযোগই রাখেনা। …
বাবা – ফোনেও নয়!
সুন্দরবাবু – নো ওয়ে, শীর্ষ স্পষ্ট বলে দিয়েছিল, আই উইল নট কল হিম, ইফ আই ডাই ইভিন।
বাবা – খুনটা ছেলে করতে পারে?
সুন্দরবাবু একটু ভেবে বললেন – না … হ্যাঁ মটিভ তো ওর ছিল, কিন্তু খুন করার জন্য একটা অন্য রকম ইয়ে লাগে… ওটা সবার থাকে না। … কিন্তু আর ইউ শিওর, ওটা খুনই?
বাবা – কাইন্ড অফ, বাট নট অফিসিয়ালি। …. আচ্ছা উনার আর কনো শত্রু ছিল, এই ব্যাপারে জানেন কিছু?
সুন্দরবাবু – একজন লেখকের আবার শত্রু কে হবে? রাইভাল থাকতে পারে। যেমন আমিই ওর রাইভাল। … কিন্তু শত্রু কি বলা যায় রাইভাল কে? আর না তো আমরা কেউ বিদেশিদের মত বেষ্ট সেলার হয়ে কটি কটি টাকা কামাই যে রাইভাল একবারে শত্রু হয়ে যাবে। …
বাবা – আর কিছু জানেন উনার সম্বন্ধে।
সুন্দরবাবু – জানি বলা ভুল, বরং বলা উচিত জানিনা। … ও একটা কিছুর মধ্যে ছিল এখন, বাট সেটা প্রচণ্ড কনফিডেন্সিয়াল, আই থিংক। কারণ সেটার ব্যাপারে, আমার কাছে ও কিচ্ছু ডিশক্লোজ করেনি। … ইনফ্যাক্ট, একবার কথা প্রসঙ্গে ও আমাকে বলে ফেলেছিল, ও এমন একটা কাজ করছে, সেই কাজটা করার পরে, আর অন্য কনো কাজ করার মত আর ওর মেন্টালিটি থাকবেনা। … কিন্তু যাই প্রশ্ন করি যে সেটা কি, অমনি ও কথা ঘুরিয়ে দেয়। বলেনা সেই ব্যাপারে।
বাবা – ধন্যবাদ। … অনেক কিছুই আপনি বলেছেন। আশা করি, তার ভিত্তিতে আর বিরক্ত করতে হবেনা আপনাকে।
সুন্দরবাবু – আরে, তুমি আমার ল্পন্ট্যাক্ট নম্বর নিয়ে যাওনা। আর তোমারটাও দিয়ে যাও। … আমার যদি আরো কিছু মনে পরে, বা তোমার কিছু জানতে হয়, ফোন করে নেবে। … আরে বিজয়, তোমার নাম আমি শুনেছি। তোমার সাথে সাখ্যাত করে খুবই ভালো লাগলো। কিন্তু কাজের মধ্যে এইসব এপয়েন্টমেন্ট ইত্যাদিতে প্রচুর সময় যায়। … আর আমি! … আমরা এতটাও ব্যস্ত লোক নই যে, আমাদের থেকে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। … ফোন করে নিও, ব্যাস।
ভদ্রলোকের ব্যবহার অত্যন্ত অমায়িক। … বাবাকে বলতে, বাবা বললেন, ইনারা সকলে জাত লেখক। লেখকদের ব্যবহার এমনই হয়। … প্রতিটি ব্যক্তির সাথে উনারা দেখা করেন, উনাদের মাথায় নতুন গল্পের প্লট চলে আসে। বাবাকে দেখলাম, বাবার মন যেন রহস্যের সমুদ্রে স্নান করতে যাচ্ছে। তাই বাবা একদম চুপ। শুধু কাজের কথা, অন্য সমস্ত কথাতে ফুলস্টপ।
আমরা এবার পৌঁছলাম দানেশসেখলেন, পবিত্রবাবুর বাসা। … ভদ্রলোক বিয়েথাওয়া করেন নি। … আমাদেরকে ঘরে এনে বসাতে, উনি বাবার উদ্দেশ্যে বললেন – তাহলে বিজয়, তোমার আমার বাড়ি আসা হলো, বাট একটা সিচুয়েশনে, যেটা আমি-তুমি কেউই চাইনি।
বাবা হেসে বললেন – পবিত্রদা, শীর্ষদাকে আমি খুবই সমীহ করতাম, আর উনি চলে যেতে, আপনিও তো খুব একা হয়ে গেলেন, তাই না!
পবিত্রবাবু – জানো বিজয়, শীর্ষের সাথে আমার আলাপ কলেজ লাইফ থেকে। … স্কটিশচার্চে, আমি সায়েন্সে, আর শীর্ষ আর্টসে… সেম ইয়ার। … কলেজ ম্যাগাজিনে, দুজনেই লিখলাম, দুজনেই দুজনের লেখা পরলাম, দুজনেরই দারুণ লাগলো, আর তাই দেখা। … সেই আমাদের প্রথম আলাপ, আর সেই আলাপের পর থেকে, আমরা একটি দিনও যায়নি, যেদিন ১০ মিনিটও কথা বলিনি। শুধু মৃত্যুর তিনদিন আগে, ওর আর ক্ষমতা ছিলনা কথা বলার। তাই … (একটা জোরে নিশ্বাস) … যেদিন মৃত্যুর সংবাদ কাগজে পাবলিশ হলো, সেদিন একটা গাড়ি ঠিক করেছিলাম, ওর কাছে যাবো বলে। … আর যাওয়া হলোনা।
বাবা – উনার কাছে একজন এসেছিলেন না, মহিলা সেবিকা?
পবিত্রবাবু – ধুস… কে এসেছিল? … হ্যাঁ ও বলেছে, কিন্তু কোথায় কি? আমার মনে হয়, ওর মনের খেয়াল। মনের খেয়ালেই ও বলেছিল, একটা দেবদূত এসেছে ওর সেবা করতে। … (বাবা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পবিত্র বাবু বলছেন দেখে থেমে গেলেন, আর পবিত্রবাবু বলতে থাকলেন) দেখ, ওঁর স্ত্রী তো পাঁচ বছর হয়ে গেছে, চলে গেছেন। সেই স্ত্রীও একটিমাত্র কন্যাছিলেন বাবামায়ের। ব্রেন ক্যান্সার। চেষ্টা করে খুবই শীর্ষ। কিন্তু বাঁচে নাকি! … আর ওঁর ছেলে। … কি করে যে অমন মাটির মানুষের এমন ছেলে হয় কে জানে? … তোমার মনে হয়, যেই ছেলে ওঁর বাপ কবে মরবে, তারপর সম্পত্তি হাতাবে, এমন মানসিকতা রাখে, সে বাবার সেবার জন্য কনো কাজের লোক রাখবে! … তবে সেই কাজের লোক আসবে কি করে? দেবদূত!
বাবা – যদি সেবা করার জন্য না পাঠিয়ে, খুন করার জন্য ছেলে কারুকে পাঠায়!
পবিত্রবাবু – হুমম্ পসিবিল… বাট, যদি আজ থেকে একটি বছর আগের কথা হতো, তবে ঠিক ছিল। … কিন্তু এই একটি বছরে বিশিষ্ট, মানে শীর্ষের ছেলের জীবন অনেক পাল্টে গেছে। … একটি মেয়ে, রিমা না কি নাম। তার জন্য বিশিষ্টকে জেল খাটতে হয়। … তারপর, একটু শুধরেছে বিশিষ্ট। … শেষ ওঁর বাবা যা বলেন, তা অনুসারে সেই রিমা মেয়েটিকে শীঘ্রই বিয়ে করবে বিশিষ্ট।
বাবা – রিমা! শ্রীরামপুরের মেয়ে কি?
পবিত্রবাবু – হ্যাঁ! তুমি কি করে?
বাবা – কি হয়েছিল বিশিষ্টবাবুর সাথে উনার!
পবিত্রবাবু – মদ, মেয়েছিলে, বার, পাব, এই তো ছিল বিশিষ্টের একসময়ের কারবার। … এই রিমা ওঁর আগের কোম্পানির সহকর্মী ছিল। … এই মেয়েকে একদিন পাবে নিয়ে গিয়ে, তার উপর মদ্যপ হয়ে অত্যাচার করে, … কি আর বলবো কেচ্ছার কথা। … তারপর মেয়েটা বিশিষ্টকে জেলে দেয়। … কে জানে তারপর বিশিষ্ট কেমন একটা শুধরে যায়। … কোম্পানি চেঞ্জ করে। শীর্ষই বলেছিল, ওই মেয়ের সাথে যা কেচ্ছা হয়েছে, তারজন্য নাকি আগের কোম্পানি ওকে ছেরে দিয়েছে। তারপর বিশিষ্ট ওকে নিজে এখন যেই নতুন কোম্পানিতে চাকরি করছে, সেখানেই চাকরি দেয়, আর এখন অরা নাকি বিয়ে করতে চলেছিল।
বাবা আর কিছু প্রশ্নই করলেন না। … সরাসরি উনাকে ধন্যবাদ প্রদান করে উঠে গেলেন। … তারমানে কি বাবা কনো ক্লু পেয়ে গেলেন!
বাবা সেখান থেকে বেড়িয়ে ফোন লাগালেন প্রতিভাকে। বাবা বললেন – আচ্ছা প্রতিভা, গিভ মি ওয়ান ইনফরমেশন। যেই মহিলার চুলের সেম্পেল তুমি কালেক্ট করেছিলে, ওটা কি কালো না সাদা!
প্রতিভা যা বলল, তার উত্তরে বাবা বললেন – ওকে, থ্যাংকস, থ্যাংকস আ লট।
বাবার চোখেমুখে যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। … আমি বাবাকে প্রশ্ন করলাম, কিছু উত্তর পেলে? বাবা হেসে বললেন, কুকুরের লেজ কি অত সহজে সোজা হয়!… আচ্ছা ঠিক আছে। এবারে চল, ভবানী দেবীর কাছে। … অল্প বয়সী মহিলা। সেরোগেসি করে মা হয়েছেন, আগের বছর।
আমরা গেলাম সেখানে আর দেখলাম, এই ৩২ বছরের একটি মহিলা দরজা খুললেন। … বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন – ভালো আছেন বিজয়দা। … এই কি আপনার মেয়ে, মিলি!
বাবা হাসতে, আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি ভাবে বললেন – হ্যালো।
আমিও সদাচার করতে, ভবানী দেবী বললেন – চা খাবে না কফি, বিজয়দা!
বাবা – বাড়িতে কোল্ডড্রিঙ্কস আছে? … থাকলে ওটা দে… জায়গায় জায়গায় গিয়ে মিষ্টি, আর খাস্তা কচুরি খেয়ে খেয়ে না, এসিডিটি হবো হবো করছে।
ভবানী দেবীকে দেখলাম বাবাকে বেশ চেনেন। ভবানী দেবী আমার উদ্দেশ্যে বললেন – তোমার বাবার কারণেই আমি আজ লেখক। … আমি একটা কাগজের এডিটর ছিলাম। … তোমার বাবা একটা কেস সল্ভ করে এনেছিলেন। আর আমাকে ঘটক স্যার যেমন কেস সাজাতে বলেছেন, আমি তেমনই সাজিয়েছি। … তোমার বাবার পরের দিন সকালে ফোন আসে। … উনি আমাকে বলেন, আমি যেন এডিটরের কাজ ছেড়ে, প্রেমের গল্প লিখি। ওটা আমি ভালোই লিখতে পারবো।
আমি যেই ভাবে উনার কেসটাকে বিকৃত করে দিয়েছিলাম, তার কারণে রেগে গিয়ে আমাকে কথাটা বলেছিলেন। কিন্তু আমি সিরিয়াসলি কথাটা নিয়ে, একটা পেমের উপন্যাস লিখি। (উনি হেসে বললেন) প্রথম পাঠক, তোমার বাবাই। … তবে উনি গল্পবই পড়ে আমাকে একদিন শীর্ষবাবুর কাছে নিয়ে গেলেন, আর আমার লেখা বইটা উনাকে দিলেন। …
এরপর, শীর্ষবাবু আমাকে আরো দুটো তিনটে সেরকমই গল্প এক মাসের মধ্যে লিখতে বললেন। … আমি লিখলাম। তারপর উনি দিশা প্রকাশনীর সাথে কথা বলে, আমাকে একজন লেখিকা করে দেন। … পরে পরে উনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আর একবার মনের দুঃখে বলেছিলেন, উনার ছেলে যদি ভালো মানুষ হতেন, তাহলে আমাকে তিনি পুত্রবধূও করে নিতেন। … কিন্তু মানুষটা কেমন হঠাৎ চলে গেলেন না!
বাবা এবার মুখ খুললেন কোল্ডড্রিঙ্কস্ খেতে খেতে – ওঁর বাড়িতে একটা দেবদূত এসেছিলেন জানিস?
ভবানী দেবী – হ্যাঁ একজন মহিলা। আমাকে তিনি নিজে থেকে বলেন নি। … গলা পেয়েছিলাম ওই মহিলার, শীর্ষবাউর সাথে কথা হওয়া শেষ ফোনে। তো প্রশ্ন করি, কার গলা এটি মেশমশাই? তো উনি বললেন, তিনি অসুস্থ, তাই একজন দেবদূত এসেছেন।
বাবা – মজা করেছিলেন, তাই না। আসলে তো কাজের লোকই।
ভবানী দেবী – না বিজয়দা, বেশ কিছু মাস ধরেই, বিশেষ করে, এই নতুন বছরের শুরু থেকে তো, উনার মধ্যে কেমন একটা স্পিরিচুয়াল চেঞ্জ দেখতে পাচ্ছিলাম। … সমস্ত কিছুতেই একটা কেমন মায়ের কৃপা, এমন একটা অনুভব। … এমন ছিলেন না উনি। তুমি তো জানো। কিন্তু আমার মনে হয়, উনি শেষের দিকে একটা যে কনফিডেন্সিয়াল কাজ করছিলেন, সেটা একটা স্পিরিচুয়াল স্ক্রিপ্ট। নাহলে এই পরিবর্তন কেন? আর উনি বলতেনও, এই যে কাজ করছেন উনি, এরপর উনি রিটায়ারমেন্ট নেবেন। এবার নাকি উনি তপস্যা করবেন। সাডেন চেঞ্জ জানো বিজয়দা। … আগের বছর কালীপূজোর পর থেকেই উনার পরিবর্তনটা অব্সারভ্ করছি।
বাবা – আচ্ছা, ওই যে মহিলা উনার কাছে ছিলেন, আমি যদি উনার ভয়েস রেকর্ডিং দিই, তুই আইডেন্টিফাই করতে পারবি! … মানে, বলতে পারবি, দুটো গলা এক কিনা!
ভবানীদেবী – হ্যাঁ পারবো, কারণ ওই ভদ্রমহিলার কণ্ঠস্বর আমার মনে আছে। … সত্যিই যেন কনো দেবদূত। এমন কণ্ঠস্বর আমি এর আগে বা পরে কনোদিনও শুনিনি। যেন দেবতার কণ্ঠস্বর।
বাবা বললেন – ওকে ঠিক আছে ডেন। আমি রাত্রের মধ্যেই পাঠাচ্ছি তোকে একটা ভয়েস রেকর্ড। আমাকে যতটা তাড়াতাড়ি পাড়বি বলবি।
বাবার মনে হয় কেস সমাধান করা হয়ে গেছে। এবার বোধহয় শুধুই তথ্য সংগ্রহ বাকি। আমার তো অন্তত তাই মনে হলো। এবার আমি আর বাবা গেলাম বিধাননগর স্টেশনের দিকে। কথা বলবো রিমা ব্যানার্জির সাথে।
